সাম্প্রতিক কিছু বইয়ের লিঙ্ক

মার্কস কি মার্কসবাদী ছিলেন? - হায়দার আকবর খান রনো

মার্কস কি মার্কসবাদী ছিলেন?
হায়দার আকবর খান রনো

কার্ল মার্কসের জীবদ্দশা থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর বক্তব্য ও তত্ত্বকে বিকৃত করে এমনভাবে পরিবেশন করা যাতে মনে হয় বিকৃতটাই মার্কসীয় তত্ত্ব। প্রবণতাটা এখনও আছে। মার্কসকে যারা ভালভাবে অধ্যয়ন করেন নি তাদেরকে সহজেই একটা বুঝ দেয়া যায় যে, মার্কসবাদ কোন প্রমাণিত ও বিশ্বাসযোগ্য মতবাদ নয়। আরও বলা হয় যে, মার্কসবাদ এখন প্রাচীন হয়ে গেছে, বর্তমান যুগে সে অচল। উনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবের তত্ত্ব এখন নাকি বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খায় না, ইত্যাদি। আমি এই রচনার সংক্ষিপ্ত পরিসরে মার্কস সংক্রান্ত বহুবিধ প্রচলিত ভুল ধারণা খণ্ডন করার চেষ্টা করছি না। টেরি ইংগলটন একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। Why Marx was Right এই শিরোনামে। সেখানে তিনি এই রকম কয়েকটি ভুল ধারণা খণ্ডন করেছেন খুবই কার্যকর যুক্তি ও তথ্য সহকারে। আগ্রহী মার্কসবাদী কর্মীদের আমি বইটি পাঠ করার জন্য অনুরোধ করবো।

বিচারক - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিচারক    
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রথম পরিচ্ছেদ

অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।

যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।

মানুষটা খুন হয়ে যাচ্ছে - হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হকের
ছোটগল্প
মানুষটা খুন হয়ে যাচ্ছে


আজকাল প্রায়ই লক্ষ করি আমি বাসা থেকে বেরিয়ে এলেই বাসার পিছনদিকে দেয়ালের ছায়ার আড়ালে একটা মুখ লুকিয়ে পড়ে। একতলা বাড়ির ওদিকটা নির্জন, অনেকটা ঘুরে না গেলে ওখানে যাওয়া যায় না। বড়ো বড়ো কটা আম-জাম গাছে অন্ধকারও বটে জায়গাটা।

আজও বেরিয়ে আসার পরে আমার মনে হলো ওখানে চোখ পড়ার আগেই একটা মুখ টুক করে ছায়ার মধ্যে সরে গেল। বাড়ির সীমানার পাঁচিলটা ভাঙা, সেদিক দিয়ে গেলে সহজেই বড়ো রাস্তায় রোদে অন্য মানুষদের সঙ্গে মিশে যাওয়া চলে। আমি তাড়াতাড়ি হেঁটে বড়ো রাস্তায় পড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ ভালো করে দেখি। নাঃ, কাউকে দেখা যায় না। তাহলে সাঁৎ করে সরে গেল কে? একদিন দেখি বাসায় ঢোকার দরজাটার ঠিক পাশে চকখড়ি দিয়ে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা রয়েছে : ‘হারামজাদা গণআদালতী’। আমাকে শাসানোর জন্যই লেখা বুঝতে পারি। আমি জানি আমার পিছু পিছু সব সময়েই কেউ-না-কেউ হাঁটছে। ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে চাইলে কাউকেই দেখি না। যে পিছনে হাঁটছিলো সে কি থেমে গেল? আমি চলতে শুরু করলেই সে আবার চলতে থাকবে আমার পিছু পিছু? ভালো চাকরি নিয়েছে লোকটা। এর চেয়ে আমাকে মেরে ফেলা অনেক সহজ। পাশ দিয়ে চলতে চলতে কিংবা সামনাসামনি থমকে দাঁড়িয়ে ঝোলা থেকে বোমাটা বের করে ছুঁড়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। এ রকম তো রাতদিন করছে ওরা। আমাকে চিঠিতে লেখেও তো সেইরকম : ‘হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা গোলাম আযম কি তোমার পাকা ধানে মই দিয়েছে? ওর তো একটা ... ও ছিঁড়তে পারবি না, গণআদালত মারিয়ে বেড়াচ্ছিস। তোর দিন শেষ।’ কিন্তু কিছুই তো করে না ওরা। সুতোর মতো শুধু লেগে আছে। আলো অন্ধকারের মধ্যে, রাস্তায় হাটে বাজারে। গায়ের উপর দিয়ে চলা ছিনেজোঁকের মতো।

রাশিয়া ভ্রমণ - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

রাশিয়া ভ্রমণ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মস্কো বিমানবন্দরে পা দিলুম খুব ভোরবেলায়। সারা রাত প্রায় জেগেই কাটাতে হয়েছে। কলকাতা থেকে এরোফ্লোট বিমানে চেপেছিলুম বিকেলবেলা, তারপর বোম্বে, করাচি আর তাসকেন্টে বিমানটি মাটি ছুঁয়েছিল, আমাদেরও নামতে হয়েছিল দুবার। তার মধ্যে শেষ রাতে তাসকেন্টে নেমে আমি ঝোলা থেকে একটা সোয়েটার বার করে পরে নিয়েছিলুম। রাশিয়ার ঠান্ডা সম্পর্কে অনেকেই ভয় দেখিয়েছিল আগে থেকে, কিন্তু আমি খুব একটা শীত-কাতুরে নই, তা ছাড়া কিছুদিন আগেই ডিসেম্বর-জানুয়ারির ক্যানাডার তুষারের রাজ্য ঘুরে এসেছি, সুতরাং মে মাসের রাশিয়াকে ডরাব কেন? অবশ্য সঙ্গে একটা পাতলা ওভারকোটও এনেছি।

বিমানে রাত্তিরটা বেশ গল্প-গুজবেই কেটে গেছে। সহযাত্রী পেয়েছিলুম দুই বাঙালি তরুণকে। একজনের নাম সুবোধ রায়, সে মস্কোতে আছে প্রায় সাত-আট বছর, উচ্চশিক্ষার্থে। কিছুদিনের জন্য কলকাতায় ছুটি কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছে আবার। সুবোধ খুব দিলদরিয়া ধরনের, উচ্ছ্বাসপ্রবণ এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। অন্যজনের নাম অসিতবরণ দে, সে প্রায় চোদ্দো বছর বাদে চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে কলকাতা-দর্শনে এসেছিল। সে একটু চাপা ও লাজুক স্বভাবের। আমরা তিনজনে মিলে মস্কো-প্রাহা-কলকাতার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছিলুম। সন্ধে থেকে মাঝেমধ্যেই আমাদের খাদ্য-পানীয় পরিবেশন করা হচ্ছিল, বিমানযাত্রার একঘেয়েমি কাটাবার জন্যই বোধহয় ওরা অত ঘন ঘন খাবার দেয়, কিন্তু অত কি খাওয়া যায়? শেষবারের খাবার আমি প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছিলুম।

রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা - সত্যজিৎ রায়

প্রবন্ধ
রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা
সত্যজিৎ রায়


আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে, দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে কথোপকথনে রবীন্দ্রনাথ লোকের মুখে তাঁর গানের কী দশা হচ্ছে সেই নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন

গানের ভিতর দিয়ে আমি যে জিনিসটি ফুটিয়ে তুলতে চাই সেটা আমি কারও গলায় মূর্ত হয়ে ফুটে উঠতে দেখলুম না। আমার যদি গলা থাকত তাহলে হয়তো বা বোঝাতে পারতুম কী জিনিস আমার মনে আছে। আমার গান অনেকেই গায়, কিন্তু নিরাশ হই শুনে।


আজকাল অনেকেই রবীন্দ্রসংগীতের পক্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই খেদোক্তির পুনরাবৃত্তি করছেন। স্বরলিপিতে অনেক গানের মূল সুর বিকৃত হচ্ছে, বা পুরোনো স্বরলিপির সঙ্গে তার নতুন সংস্করণের বেমিল পাওয়া যাচ্ছে, সে দিকেও কেউ কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2017. All rights reserved by বইয়ের হাট