সাম্প্রতিক কিছু বইয়ের লিঙ্ক

তিরতিরে নদী আর শাল জঙ্গলের দেশে - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

ভ্রমণ কাহিনী
তিরতিরে নদী আর শাল জঙ্গলের দেশে
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী


আমরা যখন কলকাতা থেকে কোথাও যাই, তখন আসলে কলকাতার দিকেই আবার যাত্রা করি-ঘুরে তো সেই কলকাতাতেই আসতে হয় ৷ একটু ঘুরপথে আবার সেই কলকাতায় ফিরি ৷ বললাম বটে এটা ঘুরপথ, কিন্তু এই পথে ঘোরার মধ্যে একটু আনন্দ রয়েছে ৷ কলকাতা থেকে যে কারণে আমরা পথ ধরে বেরিয়ে পড়ি, তার তো একটা উদ্দেশ্য আছে ৷ সেই উদ্দেশ্যটা খুব একটা সিদ্ধ হয় না, যখন আমরা আবার কোনও বড় রকমের শহর-টহরে যাই ৷

আমার নিজের বেড়াতে খুব ভালো লাগে, ছোটখাটো মফস্বল শহরে ৷ খুব ছেলেবেলায় বাবা আমাদের প্রত্যেক বছর বাইরে নিয়ে যেতেন ৷ আমাদের তো দেশের বাড়ি ছিল ৷ দেশ বলতে পুববাংলার গ্রামের বাড়ি ৷ সে-ও ছিল খুব চমৎকার ব্যাপার ৷ দেশের বাড়িতে গিয়ে মাসখানেক কাটিয়ে তারপর কলকাতায় ফেরা-সেটা খুব মজার ব্যাপার ছিল আমাদের কাছে ৷


পুজো যখন এসে পড়ছে-তখন দেশের বাড়ি থেকে ঠাকুমা চিঠি লিখতেন আমার কাছে যে তোমার বাবা-মায়ের হয়তো কেনাকাটা করে আসতে দেরি হবে ৷ কিন্তু তুমি তাই বলে দেরি করো না ৷ তুমি তোমার যে-কোনও কাকার সঙ্গে আগে-আগে বেরিয়ে পড়ে চলে এসো আমাদের বাড়ি ফরিদপুরে ৷ আমার মনে আছে ওই ছেলেবেলায় ভোরবেলায় ট্রেন একটা ছাড়ত শিয়ালদা স্টেশন থেকে-চিটাগঙ এক্সপ্রেস ৷ চিটাগঙ এক্সপ্রেস-এটা দুপুর পেরিয়ে রাজবাড়িতে পৌঁছত ৷ রাজবাড়ি হচ্ছে গিয়ে গোয়ালন্দের হেডকোয়ার্টার ৷ রাজবাড়িতে আমার মামারবাড়ির কোয়ার্টার ৷ রাতে তখন ঘুম হত না ৷ গোলাপ ফুল আঁকা সে কালের টিনের সুটকেসের মধ্যে রাতারাতি সমস্ত জিনিস গোছগাছ করে তাড়াতাড়ি সাত সকালে, রাত না কাটতেই, কাকুনকে (আমার এক কাকাকে) ঠেলে তুলে দিতাম ৷ তারপর ভোর না হতেই রাস্তায় তখনও গ্যাসের আলো জ্বলছে, আমরা কাকা-ভাইপো দৌড় লাগাতাম ইস্টিশানের দিকে ৷ শিয়ালদা ইস্টিশানে ৷

সেই বয়সে ট্রেনে করে কোথাও যাওয়ার একটা মজা ছিল ৷ তখন এত ভিড়ভাট্টা ছিল না ৷ আর চিটাগঙ এক্সপ্রেস ভোরবেলায় ছাড়ত বলে ভিড়ও হত না বিশেষ ৷ এই পথে যেতে যেতে চারদিকে দেখতে দেখতে যাওয়া ৷ রেললাইনের পাশে একটা খেলার মাঠ, সেখানে ছেলেরা খেলছে, টেলিগ্রাফের তারে একটা পাখি বসে রয়েছে ৷ দূরের গাছপালাগুলো খুব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ কিন্তু কাছের গাছপালাগুলো একেবারে পড়িমরি উল্টোদিকে ছুট লাগাচ্ছে ৷ এসব দেখতে খুব ভালো লাগত ৷

আমরা দুপুরবেলা রাজবাড়িতে পৌঁছে সেখান থেকে ট্রেন পাল্টে চলে যেতাম ফরিদপুরে ৷ ওখান থেকে বেশি দূর নয় ফরিদপুর ৷ শহর থেকে আমরা পুজোর সময় নৌকো কিংবা লঞ্চে করে চলে যেতাম আমাদের দেশের বাড়িতে ৷ ফরিদপুর শহর থেকে চব্বিশ মাইল দূরে ৷

তবে, পুজোর সময় আমাদের দেশের বাড়িতে খুব একটা যাওয়া হত না ৷ পুজোয় কম যেতাম, তার কারণ, আমাদের গ্রামে কোনও পুজো ছিল না ৷ গ্রামের পুজো না থাকলে সেই গ্রামের ছেলেপুলেদের বড় কষ্ট ৷ যখন পুজোর সময় দেশের বাড়িতে যেতুম তখন আমাদের গ্রাম থেকে ছ’মাইল দূরে একটা গ্রাম, সেখানে আমার বাবার মামার বাড়ি, সেখানে চলে যেতুম ৷ সেখানে খুব বড় করে পুজো হত ৷ তবে সাধারণত আমরা গরমের সময় দেশের বাড়িতে যেতাম, বড়দিনের ছুটিতে দেশের বাড়িতে যেতাম ৷ আমার বাবা তো কলেজে অধ্যাপনা করতেন, তার ফলে বছরে তিনটে বড় ছুটি পাওয়া যেত ৷ পুজোয়, গ্রীষ্মে আর বড়দিনে ৷

সাধারণত পুজোর ছুটিতে পশ্চিমে যাওয়া হত ৷ ছেলেবেলা থেকেই আমাদের এরকম একটা চলে এসেছে ৷ পুজো আসছে আসছে, এই সময়টা-বৃষ্টিটা কমে এসেছে, আকাশটা মাঝে মাঝে খুব নীল হয়ে যাচ্ছে ৷ এই সময়টায় আমরা বুঝতে পারতাম, বাড়ির কাকারা খোঁজখবর লাগাচ্ছেন কোথায় বাড়ি পাওয়া যায় ৷ তখন এই সমস্ত হোটেল-টোটেলে থাকার ব্যবস্থা ছিল না ৷ একজন লোক গেলে হোটেলে গিয়ে থাকতে পারত ৷ গোটা সংসার যাচ্ছে, অতএব আমাদের বাড়ি চাই ৷ তখন এত হোটেল ছিল না, এত হলিডে হোম-টোমও ছিল না, ফলে পুজোর প্রায় মাসখানেক আগে থেকে একটা ছুটোছুটি শুরু হয়ে যেত বাড়ি ঠিক করবার জন্য ৷

তার ওপরে বাড়ি আবার যে-কোনও রকমের পেলে হবে না ৷ আমার মায়ের আবার এসব ব্যাপারে খুব বায়নাক্কা ছিল ৷ আমার কাকারা মাকে খুব মান্যি করে চলতেন ৷ আমার বাবার চাইতে কাকারা বয়েসে অনেক ছোট ৷ এঁরা মাকে খুব ভয়ও পেতেন, ভালোও বাসতেন ৷ এঁদেরই কাউকে মা পাঠিয়ে দিতেন, যাও তুমি গিয়ে দেখে এসো ৷ কিংবা, যাও তুমি পুরী চলে যাও, তুমি চলে যাও দেওঘর-এইভাবে মা কাকাদের পাঠিয়ে দিতেন ৷ ওঁরা বাড়ি ঠিক করে আসতেন ৷ মায়ের কতকগুলো ব্যাপার বলে দেওয়া থাকত ৷ খোঁজ নেবে এর আগে বাড়িতে কোনও কঠিন অসুখের রোগী মারা গেছে কিনা তাহলে সেই বাড়িতে যাওয়া চলবে না ৷ বাড়ির কোনও দুর্নাম আছে কিনা-সেটা দেখে আসতে হবে ৷ দুর্নাম মানে কোনও ভূতটুত আছে কিনা ৷ হানাবাড়ি কিনা ৷ এগুলো সমস্ত জেনে আসতে হবে ৷ বাড়িটা একেবারে ভীষণ ভিড়টিড় জায়গায় শহরের মাঝখানে হলে চলবে না ৷ আবার শহর থেকে বেশি দূরে হলেও চলবে না ৷ এত রকমের দাবিদাওয়া মিটিয়ে বাড়ি পাওয়া শক্ত ৷ চার-পাঁচটা বাড়ির খোঁজ আসত, তার মধ্যে একটা বাড়ি পছন্দ হত ৷ তারপর আমরা একদিন দুগগা দুগগা বলে চলে যেতাম ৷

কিন্তু ঘটনা হচ্ছে এই যে যাওয়াটাও একটা পর্ব ছিল ৷

তখনকার দিনে এইসব হোল্ডঅল-টোল্ডঅলের চল বিশেষ ছিল না ৷ প্রচুর ছেলেপিলে আমাদের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করত-সেকালের অধ্যাপক ছিলেন তো আমার বাবা ৷ প্রচুর ছেলে ৷ তারাও যেমন আছে ৷ আমরাও সে’রকম থাকতাম ৷ ঘরে পাশাপাশি শতরঞ্চি পড়ে রয়েছে-একটা শতরঞ্চি একটা বালিশ আর একটা পাতলা চাদর-টাদর ৷ সকালবেলা সেই বিছানাটাকে পাটিসাপটা পিঠের মতো পাক দিয়ে তার ওপর বই রেখে পড়াশুনো করত সকলে ৷ আমাদের ওপর একটা হুকুম ছিল যে ওই ছাত্ররা, যখন কলেজে চলে যেত, দুপুরবেলায়, তাদের শতরঞ্চিগুলো জোগাড় করা ৷ এটা কাকার অর্ডার ছিল ৷ আমাদের এই কাকা বাঁধাছাঁদার ব্যাপারে খুব ওস্তাদ ছিলেন ৷ তাঁর হুকুম, শতরঞ্চি পাঁচ ছ’খানা যে করেই হোক, জোগাড় করে ফেলো ৷ তারা ফিরে এসে হয়তো চেঁচামেচি করবে, আমার শতরঞ্চি কোথায় গেল বলে, কিন্তু সে আর কি করা যাবে ৷ তো পাঁচ সাতখানা শতরঞ্চি আমরা গায়েব করে ফেলতাম ৷ সেই শতরঞ্চিতে সমস্ত জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করা হত ৷ কাকা বিশাল বড় করে একটা বেডিং করতেন ৷ তার মধ্যে কী যে থাকত না বলা মুশকিল ৷ প্রথমে তো তিন-চারটে তোরঙ্গ ভরে ফেলা হত এটা-সেটা গরম জামা কাপড়ে ৷ তারপরেও মা এসে বলতেন এটা নেওয়া হল না সেটা নেওয়া হল না, সেগুলো সমস্ত চলে যেত বেডিং-এর মধ্যে-সব থেকে শেষে সেটা বাঁধা হত ৷ ফলে সেটা একটা ঢাউস চেহারার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত ৷ লেপ কাঁথা কম্বল সব তার মধ্যে ৷ বালিশ, মশারি ৷ তার মধ্যে আমার ক্রিকেট ব্যাটও ঢুকে যেত ৷ ঢুকত আমার ছোট ভাইয়ের ট্রাইসাইকেল ৷ মায় আমার ছোটকাকা ডাক্তারি পড়তেন, তাঁর গ্রে’জ অ্যানাটমিটাও ৷ সে এক বিশাল কাণ্ড ৷ একবার আমার ছোটভাই বায়না ধরেছিল যে তার ক্যারাম বোর্ডটাও ওর মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে ৷ তাতে কাকা অবশ্য রাজি হননি ৷ বলেছিলেন, না না, ক্যারাম ঢোকানো যাবে না তাহলে বেডিংয়ের শেপ খারাপ হয়ে যাবে ৷ মা ভয় পেতেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেন ৷ কাকা সব সময় একটাই বেডিং করতেন, দুটো করতেন না ৷ মা বলতেন, দুটো কর ৷ দুটো কর ৷ কাকা বলতেন, না একটা ৷ তাহলে আবার মাল বেড়ে যাবে ৷

ফলে, যা হবার, এক বছর তাই হল ৷ সেবারে আমরা ময়ূরভঞ্জে বেড়াতে গিয়েছিলাম ৷ সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়েতে-তখন সেটা ছিল বেঙ্গল-নাগপুর রেলওয়ে-রূপসা নামে একটা জংশন আছে ৷ রূপসা থেকে একটা লাইট রেলওয়ে ছিল ৷ বারিপদা হচ্ছে গিয়ে ময়ূরভঞ্জের রাজধানী ৷ রূপসা থেকে ওই পর্যন্ত ঝিক-ঝিক ঝিক-ঝিক করে সে ট্রেনটা যেত শাল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ৷ এই ট্রেনটা সকালবেলা রওনা হত ৷ এর আবার কোনও ছাদ-টাদ ছিল না ৷ ওয়াগনের মতো দেখতে ৷ ফলে দরজা দিয়ে না ঢুকলেও ওপর দিয়ে ফেলে দেওয়া যায় ৷ গেলাম ঠিক ৷ ফিরতি পথে আরও প্রচুর মালপত্র বেড়ে গেল ৷ যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই কিছু কিছু করে জমে যাচ্ছে ৷ সেগুলো নিয়ে বেডিং আরও ঢাউস হয়ে গেল ৷ আমরা তো টুক টুক করে এলাম রূপসায় ৷ ওখান থেকে মাঝরাত্তিরে ট্রেন ৷ ম্যাড্রাস মেল ৷ কলকাতায় আসছি ৷ এক মিনিটের বেশি ট্রেন থামে না ৷ সেই ট্রেনে উঠতে গিয়ে বেডিং গেল দরজায় আটকে ৷ আর ভেতরে ঢোকে না ৷ দু-পাশের দেওয়ালের মাঝখানে সেটা স্যান্ডউইচ হয়ে গেল ৷ কিছুটা ঢুকল, ঢুকে আটকে গেল ৷ এবার না আসছে এদিকে, না ওদিকে ৷ আমি আগেই ঢুকে গেছি ৷ আমাকে ডেকে কাকা বললেন, চেন ধরে ঝুলে পড়ো ৷ তাই পড়লাম, খানিক গিয়ে খ্যাঁচ করে ট্রেন আটকে গেল ৷ তখন তো সব লালমুখো গার্ড-টার্ড, তারা এসে মহা হম্বিতম্বি লাগিয়ে দিল ৷ পাঁচ মিনিট ওইখানে ম্যাড্রাস মেলকে দাঁড় করিয়ে রাখা হল ৷ তার মধ্যেই কাকুন যে কি করে একটা বেডিংকে পঞ্চাশটা করে ফেললেন ৷ সব ছত্রখান করে ভেতরে ঢোকাচ্ছেন ৷ কুলি-ফুলি এসে সবাই মিলে টেনে হিঁচড়ে তাড়াতাড়ি সব ভেতরে ঢোকাল ৷ ভেতরে লোকজন ঘুমিয়ে রয়েছেন ৷ সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্ট ৷ খেপে অস্থির তাঁরা ৷ মাঝরাত্তিরে ঘুম ভাঙানো হয়েছে তো! সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা!




যা হোক এইরকম জায়গাতে ঘুরে বেড়াতেই কিন্তু আমার বেশি ভালো লাগে ৷ দেওঘরের কথা মনে পড়ে ৷ চিত্রকূটে যাওয়া, বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা, লোকজন হাটে যাচ্ছে, একটা তিরতিরে নদী-সেটা হেঁটে লোক পার হয়ে যাচ্ছে ৷ এসব দেখা ৷ যারা হাটে যাচ্ছে জিনিসপত্র নিয়ে বাড়িতে তাদের আটকে তাদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কেনা-এর মধ্যে একটা মজা আছে ৷ আজকাল এটা খুব একটা হচ্ছে না ৷ সবাই যায়-এক শহর থেকে আরেক শহরে ৷ এসব জায়গায় গিয়ে লোকেরা আর মজা পাচ্ছে না, লোকে খুব যেতেও চাইছে না ৷ একটু নিরালা জায়গায় লোকে খুব একটা যেতে চায় না ৷ অবশ্য আরও একটা কথা ভাববার আছে, নিরালা জায়গা খুব একটা নেইও আর আগের মতো ৷ পুজোয় আমরা এমন কোথাও গিয়েছি যে সেখানে বালির মধ্যে প্রচুর আতাগাছ নেই, এমন আমি ভাবতে পারছি না ৷ বাড়ির মধ্যে পেঁপে গাছ রয়েছে, আতা গাছ রয়েছে-এরকম গাছগাছালি ভরা যে বাড়ি, তা-ও তো আজকাল আর দেখি না ৷

ট্রেনে করে আসানসোল কি বরাকর পেরোলেই দেখবে হাওয়াটা একদম বদলে গেছে, গোটা ভূ-প্রকৃতিটাই অন্যরকম ৷ আসানসোল থেকে যদি সীতারামপুর জংশন দিয়ে চলে যাই, পরপর কারমাটার পড়ছে, মধুপুর পড়ছে, গিরিডি পড়ছে-এইরকম আরও কিছু ৷ ধর গিরিডিতে গেলাম, সেখান থেকে বাসে ধানবাদ, ধানবাদ থেকে চলে গেলাম রাঁচি কি হাজারিবাগে ৷ অপরদিকেও আছে-চক্রধরপুর কি চাইবাসা ৷ সাঁওতাল পরগনা আর ছোটনাগপুর, এই দুটো জায়গায় ছোট ছোট জায়গাগুলোতে যশিডি, মধুপুর, ঝাঁঝা, শিমুলতলা-প্রত্যেকটা জায়গাতেই আগে একটু সম্ভ্রান্ত বাঙালিদের নিজেদের বাড়ি ছিল এবং তাঁরা সময় পেলেই সেখানে যেতেন ৷ সে-সব বাড়ি এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ৷ কারণ, যাঁরা সে-সব বাড়ি বানিয়েছিলেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম আর ওখানে যায় না ৷ তারা রেলগাড়িতেই চাপে না, এরোপ্লেন করে ঘুরে বেড়ায় ৷ এরোপ্লেন তো আর ওসব জায়গায় নামে না ৷

আমার মনে আছে বি এ পরীক্ষা দিয়ে আমি আর আমার এক বন্ধু, সে এখন আমেরিকায় অধ্যাপক, দুজনে দুটো ঝোলা কাঁধে করে বেরিয়ে পড়েছিলাম ৷ কলকাতা থেকে প্রথমে মধুপুর, সেখান থেকে গিরিডি, গিরিডি থেকে ধানবাদ-গোটা এলাকাটা আমরা একেবারে টৈ টৈ করে ঘুরেছিলাম ৷ ঠিক এই ধরনের ঘোরার নেশা এখন আর কারও দেখি না ৷

বড় বড় শহরেই যেন যাবার ঝোঁকটা বেশি ৷ পুরী কিংবা দার্জিলিংয়ের মতো বড় শহরে গেলে আমার মনে হয় পটলডাঙা কি পটুয়াটোলাই যেন সটান উঠে এসেছে ৷ পুরীতে যদি আমি যাই কখনও তো স্বর্গদ্বারে উঠি না, উঠি চক্রতীর্থে ৷ ওদিকটা এখনও পর্যন্ত নিরিবিলি ৷




পুরী যাই ৷ কারণ, অমন সমুদ্র তো গোটা পৃথিবীতেই দুর্লভ ৷ আমার মোটামুটি গোটা বিশ্বজগৎটা দেখা হয়ে গেল ৷ সেই কারণে বুঝি যে এর কোনও তুলনা হয় না ৷ নর্থ সী কি আটলান্টিক কিংবা ধরো ইংল্যান্ডের ব্রাইটনের সমুদ্রের তো এত নাম শুনি ৷ পুরীর কাছে ওসব কিছু না ৷ তবে হ্যাঁ, ওরা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে জানে ৷ আমরা তা জানি না ৷ ফারাকটা এইখানেই ৷ আবার উল্টোদিকেও বলি যে অত সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার দরকারই বা কি! খুব বেশি সাজানো গোছানো জিনিস ভালো না ৷

১৯৫৩য় আমি এক বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে ছিলাম হিমালয় ভ্রমণে ৷ দুশো কিলোমিটার হেঁটেছিলাম ৷ তখন বদ্রী পর্যন্ত বাস যেত না, যেত চামোলি অবধি ৷ সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার আমরা হেঁটে গিয়েছি ৷ বর্ষাকাল, ধসের সময় ৷ আমি আর সেই বন্ধু হেঁটে হেঁটে ঘুরেছি ৷ একেকটা চটিতে থেকেছি ৷ রাত কাটিয়েছি ৷ লোক নেই জন নেই-অমন নিরালা নির্জন জায়গায় ৷ গিয়েছিলাম বদ্রীনাথ ছাড়িয়ে বসুধারায় ৷ সেখানে বহু ওপর থেকে পড়ছে একটা জলের ধারা ৷ যমুনোত্রী যাওয়ার সময় আমাদের সায়না চটি থেকে বাইশ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছিল ৷ এইভাবে যে যাওয়া-এটাই হল আসল যাওয়া ৷ যমুনোত্রী থেকে ফেরার সময় বরকোট বলে একটা জায়গা পড়ে ৷ এই বরকোট আর উত্তরকাশীর মাঝখানে ডুনডা ভ্যালি বলে একটা জায়গা আছে ৷ অসাধারণ সুন্দর লেগেছিল সে বার ৷ মনে পড়ে, বিকেলের পড়ন্ত আলো পড়েছে লাল টালির ছাদে ৷ ডানদিকে সরু গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে, বাঁদিকে হিমালয় ৷ এক সুন্দর ভ্যালি, মনে হয়, এখানেই তো জীবনটা কেটে যেতে পারত ৷

দেশের বাইরে যে যাই, এরোপ্লেনে একটা শহর থেকে উড়ে আরেকটা শহরে গিয়ে নামি ৷ মাঝখানে কী যে পেরিয়ে গেল কিছুই বোঝা হয় না ৷ এক শহরে মিটিং সেমিনার সেরে হয়তো আবার উড়ি আরেক শহরের দিকে ৷ অবশ্য কয়েকদিন আগে বিদেশে গিয়েছিলাম মাস চারেকের জন্য ৷ সকালে বেরিয়ে পড়তাম, একটা খবরের কাগজ কিনে পার্কে গিয়ে বসতাম ৷ নিজের ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতাম ৷ আমার ল্যান্ডলেডি খাবার বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিতেন ৷ আমার যখন সময় হত ফিরে গিয়ে খেয়ে নিতাম ৷ এই বেড়ানোটাই আমার পছন্দ ৷ আমি কোনও একটা জায়গায় গিয়ে একটু ঘুরে বেড়াতে চাইছি আপনমনে ৷ কোনও চাপ থাকবে না ৷ নিজেকে গড়ে তোলার একটা চেষ্টা ভেতরে ভেতরে চলে এই সময় ৷ যাতে, আমি কলকাতায় যখন ফিরে আসব তখন একটু নতুন হয়ে যেন ফিরতে পারি ৷

কলকাতায় থাকতে যে টেনশনগুলো আমাদের সঙ্গী, অনেকে বাইরে যায় সেই টেনশনগুলো মাথার মধ্যে নিয়েই, সেটা ঠিক না ৷

মনে পড়ছে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে টিলার ওপরে একটা গেস্টহাউস ৷ তার বারান্দায় আমি বসে আছি ৷ নিচে শালজঙ্গলের ভেতর দিয়ে রেললাইন ৷ সেখানে একটা ট্রেন ঝিকঝিক ঝিকঝিক করে চলে যাচ্ছে নিরুদ্দেশে ৷ এরকমই আমি চাই ৷ এর বেশি বাহুল্য মাত্র ৷

সাক্ষাৎকার: যুধাজিৎ দাশগুপ্ত
ভ্রমণ শারদীয় সংকলন, ১৯৯২

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2017. All rights reserved by বইয়ের হাট