সাম্প্রতিক কিছু বইয়ের লিঙ্ক

রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা - সত্যজিৎ রায়

প্রবন্ধ
রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা
সত্যজিৎ রায়


আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে, দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে কথোপকথনে রবীন্দ্রনাথ লোকের মুখে তাঁর গানের কী দশা হচ্ছে সেই নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন

গানের ভিতর দিয়ে আমি যে জিনিসটি ফুটিয়ে তুলতে চাই সেটা আমি কারও গলায় মূর্ত হয়ে ফুটে উঠতে দেখলুম না। আমার যদি গলা থাকত তাহলে হয়তো বা বোঝাতে পারতুম কী জিনিস আমার মনে আছে। আমার গান অনেকেই গায়, কিন্তু নিরাশ হই শুনে।


আজকাল অনেকেই রবীন্দ্রসংগীতের পক্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই খেদোক্তির পুনরাবৃত্তি করছেন। স্বরলিপিতে অনেক গানের মূল সুর বিকৃত হচ্ছে, বা পুরোনো স্বরলিপির সঙ্গে তার নতুন সংস্করণের বেমিল পাওয়া যাচ্ছে, সে দিকেও কেউ কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।


এসব কথা উঠছে এই কারণেই যে, রবীন্দ্রসংগীতের একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আছে যেটা আগে কোনও ভারতীয় গানে ছিল না। রামপ্রসাদীর সর্বনাশ হচ্ছে, বা কীর্তনের সুর বিকৃত হচ্ছে - এ ধরনের অভিযোগ বড় একটা শোনা যায় না। এসব গানের বেলা, বা বাংলা টপ্পা, লোকসংগীত ইত্যাদির বেলা, স্বরলিপি রচনা করে গানকে জিইয়ে রাখার কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। মার্গসংগীতেই হোক বা লোকসংগীতেই হোক, ভারতবর্ষে চিরকালই যে জিনিসটার উপর জোর দিয়ে আসা হয়েছে সেটা হল গানের জাত। কীর্তনকে কেউ ভুল করেও খেয়ালের মতো গায় না বা বাউলের সঙ্গে পাখোয়াজ বাজিয়ে তাকে ধ্রুপদের আসনে বসানোর চেষ্টা করে না। এক গানের গাইবার রীতি আরেক গানে প্রয়োগ করা হয় না, কারণ তাদের জাত আলাদা।

গানে রবীন্দ্রনাথের যা একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি, প্রচলিত নিয়মে তার জাত নির্ণয় করা চলে না, কারণ রবীন্দ্রনাথ জাতের কথা ভাবেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দিকে, এক একটি বিশেষ ভাবকে বিশেষ কথা, বিশেষ সুর-ছন্দে প্রকাশ করার দিকে। জাতের দোহাই যেখানে দেওয়া চলে না, সেখানে চরিত্র রক্ষা করার প্রশ্নটাই বড় হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথকেও এই প্রশ্নটাই ভাবিয়ে তুলেছিল।

একটি গানের এই যে অবিকল্প রূপের ধারণা, এটা এদেশের নয়। বঙ্কিমের উপন্যাস রচনার মতোই রবীন্দ্রনাথের গীত রচনার ধারণাটা আসলে ইউরোপীয়। ভক্ত রামপ্রসাদ এককালে কীর্তনের মেজাজে একটি শ্যামাবিষয়ক গান রচনা করেন, যাতে তাঁর একান্ত নিজস্ব একটি ভাব নিজস্ব একটি কাঠামোয় প্রকাশিত হয়েছিল। এটা ছিল একটি মৌলিক রচনা, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই সেটা হয়ে দাঁড়ালো একটি ছাঁচ, যে ছাঁচে রামপ্রসাদ নিজেই একের পর এক অজস্র ভাবসংগীত রচনা করলেন। এই বিশেষ ঢংয়ের গান তাই আজ স্বরলিপি ছাড়াই টিকে আছে। এর মোটামুটি চেহারাটা সকলেই জানে, কিন্তু গাইবার সময় গায়ক ভেদে এর রদবদল হবেই। মূল সুর যদি বজায় থাকে, তাহলে অলংকরণের রকমফেরে রামপ্রসাদীর সর্বনাশ হয় না। তবে এই অলংকারেও সংগীতের কতকগুলি নিয়ম বজায় রাখতে হয়। একটা উদাহরণ দিলে জিনিসটা পরিষ্কার হবে।

রামপ্রসাদীর আস্থায়ী-অন্তরার সুর থেকে অলংকার একেবারে বাদ দিয়ে তার নিরাভরণ চেহারাটা দাঁড়ায় এই রকম

আস্থায়ী

I গা - পা মা I গা সা - রা I গা গা -া I মা পা -া I

I গা - পা মা I গা সা - রা I গা গা -া I মা পা -া I

I পা ধা - র্রা I র্সা - া না I ধা পা - ধা I মা পা -া I

I গা - পা মা I গা সা - রা I গা গা - া I মা পা -া II

অন্তরা

II া া পা I ধা ধা ধা I র্সা -া র্সা I না ধপা -া I

I া া না I না র্সা র্রা I র্সা ধা র্সা I র্সা পা ধা I

I র্সা র্সা -া I র্সা র্সা -া I র্সা র্সা -া I র্সা না -া I

I ধা ধা র্রা I র্সা না -া I ধা পা -ধা I মা পা -া II

এই সুরে এমন একটা বিশেষত্ব আছে যে এতটা নেড়া ভাবে গাইলেও একে চেনা যায়। কিন্তু কোনও গায়ক বা ভক্ত একে এমনভাবে গাইবেন না, কারণ রামপ্রসাদীর কথায় সচরাচর যে আবেগ- অভিমান অভিযোগ-মিশ্রিত ভাবটা থাকে সেটা ফুটিয়ে তুলতে অলংকারের প্রয়োজন হয়। শুধু প্রথম লাইনটি গাইবার নানারকম সম্ভাব্য ঢং-এর মধ্যে তিনটি নীচে দেওয়া গেল

১. I গা - পা পমা I - গা রসা রা I গা গমগা - রগা I মা পা -া I

ব ল মা ০ তা রা দাঁ ড়া ০ ০ ই ০ কো থা ০

২. I গা -মপা মপমা I -গা রসা সরা I গা গমগমগা -রগা I মা পা -া I

ব ল০ মা০০ ০ তা০ রা০ দাঁ ড়া০০০০ ই০ কো থা০

৩. I গা - মপা পমগরা I -গা রসরসা রা I গা মা -গরগা I মা পা -া I

ব ল ০ মা০০ ০ তা০০০ রা দাঁ ড়া ই০০ কো থা ০

এই যে জাত ঠাট বজায় রেখে গায়কের ক্ষমতা ও অভিরুচি অনুযায়ী গানের একটু এদিক-ওদিক করবার রীতি, এটা আমাদের দেশে যেমন মার্গসংগীতে। তেমনি লোকসংগীতে চিরকালই আছে। অক্ষম গায়কের হাতে এই রামপ্রসাদীর সুর তাল ভাব সবই নষ্ট হতে পারে ; সাধারণ গায়ক সুর-তাল বজায় রেখে ভাবের অভাবে গানের প্রাণহানি ঘটাতে পারে, আবার তেমন তেমন গাইয়ে হলে এই প্রাচীন অতিপরিচিত সুর নবীন সরসতা লাভ করতে পারে।

যন্ত্রসংগীত, তেলেনা ও খেয়ালের আলাপের অংশ বাদ দিলে এদেশের সব গানেই কথার ব্যবহার হয়ে থাকে। মার্গসংগীতের মধ্যে ধ্রুপদ রীতিতে কথার একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। ধ্রুপদে যে সমস্ত তাল ব্যবহার হয়, তাতে স্বভাবতই সংগীতে একটা উদাত্ত মেজাজ এসে পড়ে। গানের কথা এই মেজাজের সঙ্গে সংগতি রাখার চেষ্টা করে। তবে শব্দচয়নে যেমন ভাবের কথা ভাবতে হয়, তেমনি স্বরব্যঞ্জন-সংবলিত শব্দের যে একটা বিমূর্ত ধ্বনির দিক আছে, সেদিকটাও দেখতে হয়। বলা বাহুল্য, এই দুইয়ের সার্থক সমন্বয় সহজ ব্যাপার নয়। দুইয়ের মধ্যে যখন দ্বন্দ্বের প্রশ্ন আসে, তখন ধ্বনির দিকটাকেই প্রাধান্য দিতে হয়। কারণ, গান জিনিসটা আগে সংগীত, পরে কাব্য - এই ধারণাই প্রচলিত। এই কারণে গায়করাই সব সময় আমাদের দেশে গান রচনা করেছেন। কবি কথার জোগান দিয়েছে, তারপর গায়ক-সুরকার তাতে গান বেঁধেছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।

খেয়ালের আলাপে কথার কোনও স্থান নেই। রাগরাগিণীর একেবারে নিভাঁজ অ্যাবস্ট্র্যাক্ট চেহারাটা এই আলাপে পাওয়া যায়। এখানে সুর আছে, কিন্তু গৎ নেই ; লয় আছে, তাল নেই ; ভাব আছে, বক্তব্য নেই। আলাপের ধারণাটা একেবারে ষোলআনাই এদেশের। ভারতীয় সংগীতের রেখাবিন্যস্ত রূপটা আলাপে যেভাবে ফুটে ওঠে, তেমন আর কিছুতেই ওঠে না। স্বভাবতই এর তুলনীয় কোনও কিছুই ইউরোপীয় সংগীতে নেই।

খেয়ালে কথার দরকার হয় আলাপের পরের পর্বে। কিন্তু এ গানে কথার স্থান ধ্রুপদের তুলনায় গৌণ হতে বাধ্য। গতের শুরুতে কথার একটা মূল্য থাকলেও ক্রমে তানবাটের প্রাচুর্যে ভাবের বাহন হিসেবে তার আর কোনও মূল্য থাকে না।

টপ্পা-ঠুংরিতে এসে কথা আবার একটা বড় জায়গা দখল করে বসে। প্রধানত আদিরসাত্মক এই দুই শ্রেণীর গানে ভাবের খাতিরেই অলংকারের ব্যবহারটা একটু বেশি। ভাবের বাহন হিসেবে কথা এখানে যেটুকু মর্যাদা লাভ করে, সেটা রচয়িতার কাব্যগুণের চেয়েও ওস্তাদের নিজস্ব 'ভাও'-এর উপর নির্ভর করে বেশি। এখানে কথায় রীতিমতো নাট্যরস সঞ্চার করা হয়। বিশেষত ঠুংরির প্রকৃতি এমনই যে গায়ক-শ্রোতার মধ্যে একটা সংযোগ বা rapport স্থাপিত না হলে এখানে গান খোলেই না।

চৈতন্যদেবের আমলে রাগসংগীতকে গড়ে-পিটে বাঙালি ক'রে কীর্তন গানের সৃষ্টিতে একটা প্রথম শ্রেণীর সংগীত-প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। কীর্তনের বাঙালিয়ানা তার ভাবে-ছন্দে-সুরে অলংকারে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে। এতে রাগের আমেজ আছে, কিন্তু তার বিস্তারের শাস্ত্রীয় বাধ্যবাধকতা নেই; এতে কাব্যের মাধুর্য আছে-অর্থাৎ, সাহিত্যবিচারে কথার মূল্য আছে, এবং গাইবার রীতিতে কথাকে মর্যাদা দেবার সুযোগ আছে, কিন্তু সেটা অলংকার বাদ দিয়ে নয়। তাছাড়া কীর্তনে একক ও সমবেত কণ্ঠের বৈপরীত্য প্রকাশ করার যে রীতিটা আছে, সেটাও আশ্চর্য নতুন। সবশেষে, কীর্তনের যা উদ্দেশ্য-অর্থাৎ শ্রোতার মনে উদ্দীপনা সঞ্চার করা-সেটা পূরণ করার স্বাভাবিক ও অসীম ক্ষমতা আছে। এছাড়া আরও যে জিনিসটা আছে, সেটা হল এর তালের বৈচিত্র্যে রচয়িতার মননশীলতার পরিচয়। এই কারণেই কীর্তনকে কেউ কোনও দিন লোকসংগীতের পর্যায়ে ফেলতে পারেনি।

লোকসংগীতের-সব দেশেরই-একটা প্রধান লক্ষণ হল তার সরলতা। কিন্তু সেইসঙ্গে মাটি ও মানুষের সংযোগে তৈরি বলে এর মধ্যে একটা সজীবতা থাকে যেটা তার সুর-ছন্দ-কথা তিনের মধ্যেই পরিব্যাপ্ত। সংগীতর একটা ঘনীভূত চেহারা লোকসংগীতে পাওয়া যায়। মাটির জিনিস বলেই এতে খানিকটা অমার্জিত ভাব-হয় সুরে, না হয় কথায়, না হয় গাওয়ার ঢংয়ে-থাকা অসম্ভব নয়। কিন্তু এটাও এই সজীবতারই একটা অংশ। এর সংস্কার চলে না, বা সংস্কার করতে গেলে এর বৈশিষ্ট্যটুকু আর থাকে না, এবং যা দাঁড়ায় তাকে আর লোকসংগীত বলা চলে না।



ধ্রুপদ-খেয়াল-ঠুংরি-টপ্পা-কীর্তন-লোকসংগীত-এর প্রত্যেকটিই রবীন্দ্রনাথকে কমবেশি প্রভাবিত করেছিল, এবং সবক'টিরই স্পষ্ট আভাস রবীন্দ্রসংগীতে পাওয়া যায়। এ ছাড়া কিছু বিদেশি, কিছু কর্ণাটকি, আর ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের কিছু গানের প্রতিরূপও তাঁর গানে দেখি। এর বাইরে যা আছে, সেগুলিকে একেবারে নতুন জিনিস বলা চলে। তাতে রাগরাগিণীর বা অন্য কোনও প্রচলিত রীতির আমেজ থাকতে পারে, কিন্তু তাতে তার মৌলিকত্ব কমে না। কোনও প্রচলিত রীতি যখন রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন, তখনও তার কথায় বা সুরে বা ছন্দে কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য এনেছেন। ফলে সেগুলিকে অনুকরণ না বলে নবীকরণ বলা চলতে পারে। বাংলা তথা ভারতীয় গানের এই নবীকৃত রূপই হল রবীন্দ্রসংগীত।

প্রথম থেকে শেষ অবধি যে বিশেষত্বটা রবীন্দ্রনাথের সব রচনার মধ্যে একটা ঐক্যস্থাপন করেছে, সেটা হল এর বাঙালিত্ব। তবে বাংলা রাগসংগীত, কীর্তন, রামপ্রসাদী, লোকসংগীত বা নিধুবাবুর টপ্পায় যে বাঙালি ভাব, এটা সে ভাবে নয়। এটা হল রবীন্দ্রনাথের একান্ত নিজস্ব একটি বিশেষ শ্রেণীর বাঙালিয়ানার সাংগীতিক প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের রুচি, তাঁর সংস্কার, তাঁর পরিবেশ, শিক্ষাদীক্ষা, শিল্পবোধ, সাহিত্যবোধ-অর্থাৎ তাঁর পুরো চরিত্রটাই এই গানে প্রতিফলিত। এটাও লক্ষণীয় যে গানই তাঁর একমাত্র সৃষ্টি যার পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে কাব্য-উপন্যাসের তুলনায় বিবর্তনের মাত্রাটা এতে অনেক কম।

আসলে গান সম্বন্ধে যে মতামত তিনি তাঁর প্রথম জীবনেই ব্যক্ত করেছিলেন সেটা প্রায় শেষ জীবন পর্যন্ত অটুট ছিল। বিশ বছর বয়সের একটি লেখায় তিনি বলেছিলেন

(ওস্তাদেরা) গানের কথার উপর সুর দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপর দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহারা কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।

এই একই কথা-অর্থাৎ বাণী ও সুরের অর্ধনারীশ্বর সম্পর্ক-তিনি বহুবার বহুভাবে বলেছেন। আর যেটা নানান ভাবে প্রকাশ করেছেন সেটা হল রাগ-রাগিণী সম্পর্কে তাঁর ধারণা। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোয় যদু ভট্টের মুখে ধ্রুপদ গান তাঁর অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সমাদরের জিনিস ছিল। এ জিনিসটা এত ভালোবেসেছিলেন বলেই বোধ হয় একের পর এক এত আশ্চর্য সব ধ্রুপদাঙ্গ গান রচনা করে ব্রহ্মসংগীতকে তিনি সমৃদ্ধ করতে পেরেছিলেন। ধ্রুপদের বাণী যেভাবে ভাবপ্রকাশে সহায়তা করে, সেটা স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথকে আকর্ষণ করেছিল। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তাঁর রচিত ধ্রুপদ গানের মতো সর্বগুণসম্পন্ন রচনা কমই আছে। এর অনেকগুলিতেই অবশ্য তিনি হিন্দির ছাঁচ অবিকল বজায় রেখে কেবলমাত্র তাতে হিন্দির জায়গায় বাংলা কথা বসিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি যে শুধু কাব্যগুণেই মূল রচনাকে অতিক্রম করে গেছেন তা নয়। ভাবের সঙ্গে শব্দের হ্রস্ব দীর্ঘ স্বরব্যঞ্জনের সুনিপুণ প্রয়োগে সাংগীতিক ধ্বনিবিচারেও হিন্দিকে অনায়াসে ছাড়িয়ে গেছেন। একটা হিন্দি গানের পাশে তার রবীন্দ্রসংস্করণ রাখলেই এটা বোঝা যাবে। -

১. হিন্দি দেবনদেব মহাদেব,

ত্রিশূল খপ্পর ডমরু লিয়ে

বৃখবাহন, অঙ্গে বিভূতি

গরে রণ্ডমালা চন্দ্রমুণ্ড লাটরি।

২. রবীন্দ্রনাথ কোটি কণ্ঠে গাহে জয় জয় জয় হে।

দেবাধিদেব মহাদেব

অসীম সম্পদ অসীম মহিমা

মহাসভা তব আকাশে

এবারে হিন্দুস্থানি রাগসংগীত সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন সময়ের কিছু মতামত তুলে দেওয়া প্রয়োজন। কবে কোথায় এসব কথা বলা হয়েছে সেটা অবান্তর, কারণ এগুলি তাঁর একেবারে পাকা অভিমত, সারা জীবনে যার কোনও পরিবর্তন হয়নি।

যে রাগরাগিণীর হস্তে ভাবটিকে সমর্পণ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল, সে রাগরাগিণী আজ মাত্র বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক ভাবটিকে হত্যা করিয়া স্বয়ং সিংহাসন দখল করিয়া বসিয়া আছেন। আজ গান শুনিলেই সকলে দেখিতে চান, জয়জয়ন্তী, বেহাগ বা কানাড়া বজায় আছে কিনা। আরে মহাশয়, জয়জয়ন্তীর কাছে আমরা এমন কী ঋণে বদ্ধ যে তাহার নিকটে অমনতর অন্ধ দাস্যবৃত্তি করিতে হইবে?

ভাবকে স্বাধীনতা দিতে হইলে সুর এবং তালকেও অনেকটা স্বাধীন করিয়া দেওয়া আবশ্যক, নহিলে তাহারা চারি দিক হইতে বাঁধিয়া রাখে। ... আমার বোধ হয় আমাদের সংগীতে যে নিয়ম আছে যে, যেমন-তেমন করিয়া ঠিক একই স্থানে সমে আসিয়া পড়িতেই হয়, সেটা উঠাইয়া দিলে ভালো হয়।

হিন্দুস্থানী সংগীত ভালো লাগে বলেই যে ক্রমাগত তার পুনরাবৃত্তি করতে হবে এ একটা কথাই নয়।

ওস্তাদি গান রবীন্দ্রনাথের ভালো লাগলেও শাস্ত্রীয় নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা রাগসংগীতের দীর্ঘ বিস্তারকে তিনি কোনওদিনই বরদাস্ত করতে পারেননি। তাঁর মত ছিল, তানসেনের যুগে যে নিয়ম মানা হয়েছে, আজকের দিনেও কেন সেই একই নিয়ম মানতে হবে তিনি এ কাজটার সঙ্গে 'আধুনিক চিত্রশিল্পীর অজন্তার ছবির উপর দাগা বুলনো'-র তুলনা করেছেন।

এখানে প্রশ্ন ওঠে-দু'শো বছর আগের হিন্দুস্তানি সংগীতের শাস্ত্রসম্মত ও শিল্পগুণসম্পন্ন বিস্তারের যদি স্বরলিপি থাকত, আর আজকের দিনের ওস্তাদ যদি তাকে অবিকলভাবে আসরে পরিবেশন করতেন, তাহলে রবীন্দ্রনাথ কী বলতেন? ওদেশে আজও কি বাখ-মোৎসার্ট বা আরও অনেক বেশি প্রাচীন সুরকারদের রচনা ওস্তাদদের হাতে আধুনিক শ্রোতাদের কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠে না? একথা ঠিকই যে আজ আর কোনও আধুনিক সুরকার প্রাচীন রীতিতে সংগীত রচনা করেন না। কিন্তু প্রাচীন সংগীতের ব্যাখ্যাকারদের যে ভূমিকা, সেটা তো তা বলে লোপ পেয়ে যেতে পারে না। আজকের চিত্রশিল্পীর কাছে কি অজন্তার কোনও মূল্য নেই? সংগীত যখন গুহার দেয়ালে আঁকা থাকে না, তখন তাকে ওস্তাদের হাত দিয়ে ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যাবে কী করে? আর আমাদের দেশের যে ওস্তাদ, তার কাজ তো শুধু পুনরাবৃত্তি নয়, তাকে তো সৃষ্টিও করতে হয়। শাস্ত্রে যা লেখা আছে সে তো কেবল সংগীতের সূত্র ; তাকে তো আর রচনা বলা যায় না। রচনা সব সময় ওস্তাদই করেন। ওদেশে সুরকারের রচনা যদি দুর্বল হয়, তাহলে ওস্তাদ সেই রচনার দুর্বলতাটাই প্রকাশ করে। এদেশে রচনার ভালোমন্দ ষোলো আনাই ওস্তাদের উপর নির্ভর করে। এটা কি অনুমান করা যায় না যে তানসেনের আমলে রাগরাগিণীর রূপ যেভাবে প্রকাশিত হত, কালে হয়তো তার বিবর্তন হয়েছে, এবং আমাদের যুগে ফৈয়াজ খাঁ যেভাবে রাগরাগিণীর পরিবেশন করেছেন তার বিস্তারে অলংকারের আঙ্গিকে ইভলিউশনের ইঙ্গিত আছে? ঘরানার তফাতেই তো রাগরাগিনীর পরিবেশনে তফাত হয়। তাহলে সে রীতিকে বন্ধ্যা জরাগ্রস্ত বলা চলে কী করে? ওস্তাদদের মধ্যে যার সত্যিই গুণ আছে, সৃষ্টিশক্তি আছে, তার হাতেই রাগরাগিণী বারবার পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে।

এইসব কারণেই মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ রাগসংগীতের রীতিটা তেমন ভাবে তলিয়ে দেখেননি। তিনি গান রচনার কাজে লেগেছিলেন প্রধানত বিদ্রোহের ভাব নিয়েই। প্রাচীন রীতিকে ভেঙে ফেলতে হবে, এই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। এই বিদ্রোহের চেহারাটা তাঁর গানে কীভাবে প্রকাশ পেয়েছিল সেটা দেখা দরকার; দেখা দরকার যে, যা ছিল, যা হচ্ছিল তার জায়গায় কী এল কী হল।



বাংলা গান রচনায় শাস্ত্রীয় রীতির দাসত্ব না মানলেও চলে, একথা রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বলেছিলেন, কিন্তু সেটা এই কারণে নয় যে সে রীতির প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। গান জিনিসটায় চিরকালই একটা স্বাতন্ত্র্য থাকতে বাধ্য, কিন্তু সংগীতের কোনও না কোনও নিয়ম সেখানে মানতেই হবে। তবে এক গানের যা নিয়ম, অন্য গানে তা নাও খাটতে পারে। কেবল এটুকু বলা যেতে পারে, যে কথা সুর আর ছন্দ - এই তিনটি জিনিস ছাড়া গান হয় না।

রবীন্দ্রনাথ কথার সঙ্গে সুরের অর্ধনারীশ্বর সম্পর্কের কথা বলেছেন। সাধারণত সব দেশে সব কালেই গানের কথাকে সুরের বাহন হিসেবেই মনে করা হয়। অর্থাৎ সুরই কথাকে চালায়। তার মানে এই নয় যে, কথার ভাবার্থের কোনও দাম নেই। তবে ভাব বজায় রাখতে গিয়ে যদি যদি সুরের স্বাচ্ছন্দ্য ব্যাহত হয়, তাহলে বলতে হয় কথা আর বাহনের কাজ করছে না, লাগামটা আর চালকের হাতে নেই। কথা সেখানে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংগীতের রাজ্য ছেড়ে ভাবের রাজ্যে গিয়ে উপস্থিত হয়। তখন সে কথার উপর জোর করে সুর যোগ করতে গেলে একাধারে কাব্যের অবমাননা ও সংগীতের অপব্যবহার হয়। গানের যে সুর-ছন্দের কথা-নিরপেক্ষ দিকটা আছে, সেটার বিচার সংগীতের মাপকাঠিতেই হয়। কিন্তু সুর-নিরপেক্ষ ভাবে যদি গানের কথার বিচার করতে হয়, তাহলে সেখানে কাব্যের মাপকাঠি লাগে। ভের্দি শেক্সপীয়রের ওথেলো অবলম্বনে একটি অপেরা লেখেন। সেখানে ভাব ও ভাষা ছিল শেক্সপীয়রের। সুরে সামঞ্জস্য রক্ষার চেষ্টাও ছিল। কিন্তু সংগীতের মাপকাঠিতে বোমার্সের প্রহসন অবলম্বনে লেখা মোৎসার্টের Marriage of Figaro অপেরা ভের্দির ওথেলোর অনেক উপরে। গানে তাই কথা আগে, সুর পরে-এ নিয়ম মানতেই হয়।

ভাব ও সুরের সামঞ্জস্য তাই গানের একমাত্র গুণ নয়। তারও উপরে যেটা আছে সেটা হল সুর ও ছন্দের স্বকীয়তা, যেটা ছাড়া সার্থক নতুন সংগীত সৃষ্টি হতে পারে না।

যিনি একাধারে কবি ও সুরকার, তাঁর কাব্যপ্রতিভা যদি তাঁর গীত-প্রতিভার চেয়ে কোনও অংশে কম না হয়, তাঁর পক্ষে বোধ হয় গানের খাতিরে কথার ওজন কমানো ভারি শক্ত। ফলে যেটা প্রায়ই হয়, কথার খাতিরে সুরকে দাবিয়ে রাখতে হয়, অথবা কথার ছন্দ অতিমাত্রায় সুরে সঞ্চারিত হয়ে গানকে দুর্বল করে ফেলে।

রবীন্দ্রনাথের আগে যাঁরা বাংলা গান লিখেছেন, কীর্তন ও লোকসংগীত বাদ দিয়ে তাঁরা সকলেই মার্গসংগীতের ঠাট মেজাজ বজায় রেখেছেন। যাত্রা, থিয়েটার, পাঁচালির গান রাগসংগীতেই লেখা হয়। কিন্তু রাগাশ্রিত হলেও এ গান কথা ও ভাবের জোরেই বাঙালি হয়ে পড়ত। অনেক পুরোনো গ্রামোফোন রেকর্ডেই এ গানের চেহারাটা বেশ পরিষ্কারভাবেই পাওয়া যায়। এটা বোঝাই যায় যে বাঙালি ভাব না থাকলে এ গানের জনপ্রিয় হবার কোনও সম্ভাবনা থাকত না, কারণ বাংলাদেশে হিন্দুস্তানি সংগীতরীতির চল থাকলেও সেটা এদেশে কোনওদিনই শিকড় গেড়ে বসতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথ এ রীতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু এটার চর্চা তিনি তেমনভাবে করেননি। অর্থাৎ -তিনি গলা সাধেননি, বা সাধলেও, তাঁর ইস্কুলে পড়ার মতোই সে সাধনা অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়েছিল। শুনেছি রবীন্দ্রনাথ সুকণ্ঠ ছিলেন। তিনি নিজেও একথা বলেছেন। তাঁর চল্লিশ বছর বয়সে গাওয়া গ্রামোফোন রেকর্ডের বন্দেমাতরম গানে এর প্রমাণও আছে। কিন্তু এ গান শুনলে এটাও বোঝা যায় যে তাঁর গলার 'কাজ' খুব বেশি ছিল না। অন্তত, যে কাজে খেয়ালের তান হয়, তা তো নয়ই। রবীন্দ্রনাথের চরিত্রের একটা বিশেষত্ব বেশ লক্ষ করা যায় যে, তাঁর সহজাত ক্ষমতার বাইরে কোনও কিছু শিখে আয়ত্ত করায় তাঁর চিরকালই একটা আপত্তি ছিল। তাঁর শিক্ষায়তনের বিরুদ্ধে আপত্তিটা অ্যাকাডেমিক সব কিছুর বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য ছিল। তাঁর শিল্পবোধ ছিল সহজাত, instinctive। চিত্রপটে তার আশ্চর্য প্রকাশ তাঁর শেষ বয়সে আমরা দেখেছি। কিন্তু কবিতার করুকারিতায় তাঁর সে স্বাভাবিক দখল ছিল, অঙ্কনরীতিতে সেটা ছিল না। তাঁর আঁকা ছবিতে রং-তুলির কাজে তাই তথাকথিত পারিপাট্য নেই, যেটা কবিতায় আছে। যেটা আছে সেটা রং, ছন্দ ও স্পেস সম্পর্কে তাঁর সহজ অথচ গভীর উপলব্ধির নিরবরুদ্ধ অভিব্যক্তি। ছবিতে তিনি চিত্রশিল্পের নিয়ম ছাড়া কোনও নিয়ম মানেননি, এবং এর বিচারও সে নিয়মের বাইরে হতে পারে না।

সংগীতের বেলা রবীন্দ্রনাথ অ্যাকাডেমিক পদ্ধতির অনেক কিছুই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তান জিনিসটা তিনি বাদ দিয়েছিলেন, তার একটা কারণ বোধহয় এই যে সেটা তাঁর আয়ত্ত ছিল না। তবে রাগসংগীতের প্রতি তাঁর ঋণ কম নয়। খাম্বাজ-বেহাগ-পিলু-কাফি-ভৈবরী-ইমন-দেশ-পূরবী ইত্যাদি বহু রাগরাগিণী ; ত্রিতাল-দাদরা-খেমটা-কাহারবা-কাওয়ালি-তেওরা প্রভৃতি তাল; গানের আস্থায়ী অন্তরার ভাগ - এ সবই তাঁর অনেক গানেই প্রায় অবিকৃতভাবে পাওয়া যায়। বিশেষ করে প্রথম দিকের কিছু রচনাতে রাগরাগিণীর চমৎকার একটা ঘনীভূত চেহারা পাওয়া যায়। ইমন রাগে মায়ার খেলার 'পথহারা তুমি পথিক যেন গো' গানটির উল্লেখ করা যেতে পারে। এ গানে রাগের স্বচ্ছন্দ বিহার কথাকে ব্যাহত তো করেইনি, বরং গানের লঘু রোমান্টিক মেজাজে কাব্যের স্পর্শ এনে দিয়েছে। এ সময়ের আরও অনেক গান সম্বন্ধেই এ কথা খাটে। বোধহয় ঠাকুরবাড়ির সাংগীতিক আবহাওয়া ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পিয়ানোতে রাগোচ্ছ্বাস তাঁর প্রথম দিকের রচনাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। এসব গানে যে গুণ দেখতে পাই, তাঁর ব্রহ্মসংগীতের ধ্রুপদেও সেই একই গুণ, তফাত কেবল ওজনে। তবে এখানে তিনি সার্থক স্রষ্টা হলেও মৌলিক স্রষ্টা নন, বিদ্রোহীও নন। ঠাকুরবাড়িতেই তখন এমন গান অনেক রচিত হচ্ছিল, তার মধ্যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের রচনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আমার বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট সংগীতপ্রতিভার বিকাশ ঠাকুরবাড়ির প্রভাব থেকে সরে আসার পর। রাগরাগিণীর প্রভাব তিনি কোনওদিন সম্পূর্ণ ভাবে কাটাতে পারেননি। কিন্তু যে জিনিসটা ক্রমে দেখা দিল, সেটাতে রাগ-সংগীতের শুদ্ধতা আর বজায় রইল না, রইল কিছু রাগের পর্দা, এবং তার সঙ্গে যোগ হল বিশেষ একটি নতুন ঢং। ইমনেরই আরেকটা উদাহরণ দিলে এটা বোঝা যাবে। 'পরবাসী, চলে এসো ঘরে' গানে ইমনের রং আছে, কিন্তু এ গান রাগসংগীতের কথা মনে করায় না। এ হল খাঁটি রবীন্দ্রসংগীত।

তফাতটা আসছে প্রথমত ছন্দ থেকে। এই ছন্দের যেটা বিশেষত্ব, সেটা বারো আনা রবীন্দ্রসংগীতে পাওয়া যায়। সেটা হল কথার ছন্দের প্রতি এর আনুগত্য। 'পথহারা' গানে ইমন রাগ যেন তার গণ্ডির মধ্যে অবলীলাক্রমে কথাকে নিয়ে খেলিয়ে বেড়াচ্ছে, আর দ্বিতীয় গানে কথার ভাব ও ছন্দ যেন গানের রাগ ও ছন্দের উপর কর্তৃত্ব করছে, তাদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে দাবিয়ে রাখছে। অথচ প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি বলে তাদের ফেলেও দেওয়া যায়নি। রাগের এই অপ্রতিহত চেহারাটা অনেক রবীন্দ্রসংগীতেই পাওয়া যায়। আর তারই পাশে পাশে পাওয়া যায় ছন্দের একটা কাব্যঘেঁষা ঢং। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের স্বরলিপিতে রাগের উল্লেখ নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু মার্গসংগীতের সঙ্গে যাদের সামান্য পরিচয়ও আছে তারা রাগের এই আভাস লক্ষ করে তার ইম্যাসকুলেশনে আক্ষেপ বোধ না করে পারে না।

এবারে রবীন্দ্রসংগীতের ছন্দের দিকটা আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক।

রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন, কাব্যের যেটা ছন্দ, সংগীতের সেইটেই লয়...অতএব কাব্যেই কী, গানেই কী, এই লয়কে যদি মানি তবে তালের সঙ্গে বিবাদ ঘটিলেও ভয় করিবার কোন প্রয়োজন নাই।

এই উক্তির সমর্থনে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচিত কয়েকটি নতুন তালের উদাহরণ দেন। এই তালে গানও রচনা করেছিলেন তিনি। তার মধ্যে একটি ন-মাত্রার ও একটি এগারো মাত্রার দুটি গানের স্বরলিপির প্রথম কয়েকটি লাইন নীচে দেওয়া গেল।

১. নব তাল

II না র্সা র্ঋা I র্ঋা র্সা র্সনা -দা না র্সা I র্সনা দা দা I পা পহ্মা গা গা ঋা সা I

ব্যা কু ল ব কু লে র ফু লে ভ্র ম র ম রে প থ ভু লে

I সা মা মা I গা গা মা দা না র্সা I র্সনা র্সা র্গা I র্ঋা র্সা র্সনা দা না দা I

ভ্র ম র ম রে প থ ভু লে ভ্র ম র ম রে প থ ভু লে

২. একাদশী তাল

II রা পা মা I গা রা রা রা I রমা মা গা পমগা I

কাঁ পি ছে দে হ ল তা থ র থ র ০

I রা গা মা I পা ধা ধা ণধা I পধা পা মগা রা I

চো খে র জ লে আঁ খি ভ০ র ভ০ র০

দুটি গানেরই বাকি অংশের চেহারা ঠিক প্রথম দিকের মতোই, অর্থাৎ প্রতি লাইনের প্রত্যেকটি মাত্রা উচ্চারিত, এবং কোথাও যতির কোনও চিহ্ন নেই।

সংগীতরসিক মাত্রেই বুঝবেন যে এ গান গাওয়া যায় না, কারণ এতে দম নেবার কোনও সুযোগ রচয়িতা রাখেননি। তাহলে এই রচনার অর্থ কী? রবীন্দ্রনাথ কেন এমন অসাংগীতিক তালের উদ্ভব করলেন? এর একঘেয়েমির দিকটা বাদ দিলেও তালের গাণিতিক দিকটা এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার কোনও সমর্থন তো কোনও সংগীতরীতিতে পাওয়া যায় না। আর সবচেয়ে আশ্চর্য এই যে গান যদি আবৃত্তি করা যায়, তাহলে স্বভাবতই প্রথমটিকে দশ মাত্রা এবং দ্বিতীয়টিকে হয় বারো না হয় চোদ্দ ধরে নিতে হবে। পয়ার যখন সুর করে পড়া হয়, তখন তাকেও ষোলোমাত্রা ধরে নিয়ে শেষের দু-মাত্রার দম নিয়ে নেওয়া হয়।

সৌভাগ্যবশত, ছন্দের সেই বিদ্রোহী চেহারাটা খুব কম রবীন্দ্রসংগীতেই পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে তাঁর অপেক্ষাকৃত দুর্বল যে সমস্ত গান, তার বেশির ভাগেই ছন্দের এই যান্ত্রিক দিকটা দেখা যাবে। কিছুটা হয়তো নৃত্যনাট্যের প্রয়োজনে গানের বক্তব্য আরও বেশি পরিষ্কার করার জন্য তাঁকে এ রীতি অবলম্বন করতে হয়েছিল, কারণ নৃত্যনাট্যের গানেই এই আড়ষ্টতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পরের দিকের উদাত্ত ভাবের বা রৌদ্ররসের অনেক গান ছন্দের দুর্বলতার জন্য ব্যর্থ বলে মনে হয়। 'ঐ মহামানব আসে' বা 'আগুন জ্বালো'র সঙ্গে যে কোনও একটি ব্রহ্মসংগীতের ধ্রুপদের তুলনা করলেই এটা বোঝা যাবে। দ্বিতীয় গানের স্বভাবতই লঘু ত্রিমাত্রিক ছন্দের সঙ্গে সুরে বাউলের ধাঁচ মিশে যা হয়েছে, তা যতই আস্ফালন করুক না কেন, এ গান সংগীতের বিচারে সুরফাক্তা তালের ব্রহ্মসংগীত 'শান্তি কর বরিষণ'র চেয়ে কম শক্তিশালী হতে বাধ্য।

এখানে রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে আরেকটা গুরুতর প্রশ্নের উত্থাপন করতে হয়। গানের ভাবে ভাষায় সুরে ছন্দে শিষ্টাচারের যে অমোঘ নিয়ম রবীন্দ্রনাথ ষাট বছর ধরে মেনে এসেছিলেন, সে নিয়ম কি সমের নিয়ম বা বাদী সংবাদীর নিয়মের চেয়ে কিছুমাত্র কম inhibiting? এই যে বকুল-পারুল-টগর চামেলির সম্ভার, এই যে শরতের আলো, ফাগুনের রং, বরষার গুরুগুরু, বসন্তের হাওয়ার হিল্লোল যা মনের দোলায় দেয় দোল, এই যে মনের বীণার সুরের পরশ, হৃদয়ের তন্ত্রীতে বেদনার ঝংকার - এই যে দূরে যাওয়া কাছে আসা আধো চাওয়া আধো হাসা - এও কি 'কৈসে পনিঘট জাঁউ' আর 'পিয়া পিয়া পাপিয়া' আর 'ভরুভরু আঈ আঁখিয়ার' মতোই ফরমুলা নয়, cliché নয় - আজকের দিনে ঠুংরির গানের কথার মতোই যা প্রায় অর্থহীন? এ কথায় বিদ্রোহের ছাপ কোথায়? রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছেন, 'অধিকাংশ আধুনিক গানের অমূল্যতা চলে গেছে, তা চলতি হাটের সস্তা দামের জিনিস হয়ে পথে পথে বিকোচ্ছে।' তা সত্বেও বাউল-ভাটিয়ালের প্রতি রবীন্দ্রনাথের দরদ ছিল। তাই তিনি লিখলেন 'গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ'। সুর লোকসংগীতের, কিন্তু ভাষা ভদ্র মার্জিত। প্রশ্ন ওঠে-এ সংগীতের স্থান কোথায়? পদ্মার বুকে পানসিতে নয় নিশ্চয়ই, কারণ কর্তার হাতে বৈঠা দেখলে যে মাঝি হাসবে। এ গানকে যদি গ্রাম-প্রকৃতি সম্বন্ধে শিক্ষিত, দরদী-নাগরিক মনোভাবের সংগীতরূপ বলা হয়, তাহলে প্রশ্ন হবে-সে গানে লোকসংগীতের সুর কেন ছন্দ কেন?

রবীন্দ্রসংগীতের যা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের রচনা তাঁর সেরা ছবির মতোই সতেজ, সাবলীল ও অননুকরণীয়। এখানে রাগরাগিণীর প্রশ্ন আসে না, বাউল-কীর্তনের প্রশ্ন আসে না, বাদী-সংবাদীর প্রশ্ন আসে না। এখানে সবই আছে, আবার সবই যেন নতুন। এমনকি এখানে কথা ও সুরের সামঞ্জস্যের বিচারটাও অবাস্তব বলে মনে হয়, কারণ সব শ্রেষ্ঠ শিল্পরচনার মতোই এ গানও বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। এসব গানের আদর্শ গীতরূপ আজ স্বপ্নের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু অনেকের মধ্যে কিছু নাম বেছে দিলাম, কারণ গায়কের যদি অভাব হয়, যাঁরা এই গান জানেন, তাঁরা এই গান কল্পনা করেও অনেকটা রস পেতে পারেন 'আছে দুঃখ আছে মৃত্যু 'তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী', 'অন্ধজনে দেহ আলো', 'বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি', ' মোর বীণা উঠে কোন সুরে বাজি', 'যদি তারে নাই চিনি গো', 'মম চিত্তে নিতি নৃত্যে', 'বাজিল কাহার বীণা', 'না যেয়ো না যেয়ো না কো', ' বেদনা কী ভাষায় রে' 'ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে', 'অনেক দিনের শূন্যতা মোর'।



তাঁর গান সুগীত হচ্ছে না এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করলেও তাঁর স্বরলিপির হুবহু অনুসরণ নিয়ে তিনি কোনওদিন কিছু বলেছেন বলে মনে পড়ে না। তাঁর গান কীভাবে গাওয়া উচিত, শেখানো উচিত, সে সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের শেষ উক্তি হল

একটু দরদ দিয়ে, রস দিয়ে, গান শিখিয়ো। এইটেই আমার গানের বিশেষত্ব। তার উপর যদি তোমরা স্টিমরোলার চালিয়ে দাও, আমার গান চ্যাপটা হয়ে যাবে। আমার গান যাতে একটু রস থাকে, তাল থাকে, দরদ থাকে, মীড় থাকে, তুর চেষ্টা তুমি করো।

এছাড়া আরও একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য

সাহানার মুখে যখন আমার গান শুনতাম তখন কি শুধু আমাকেই শুনতাম? না তো। সাহানাকেও শুনতাম, বলতে হত, আমার গান সাহানা গাইছে।

আমার মনে হয় রবীন্দ্রসংগীত কীভাবে গাওয়া উচিত, এবং সে ব্যাপারে স্বরলিপির ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত এই দুটি উক্তিতে আছে। দরদ, তান, রস, মীড় - এগুলোর কোনওটাই প্রধানত স্বরলিপির জিনিস নয়। সত্যি বলতে কী, স্বরলিপিতে অধিকাংশ গানেরই যে চেহারাটা পাওয়া যায়, সেটাকে চ্যাপটা বললে বোধ হয় খুব ভুল হবে না। সেটাকে হুবহু অনুসরণ করে যদি রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া যায়, তাহলে রবীন্দ্রনাথ যে গুণবোধের কথা বলেছিলেন তার কোনওটাই গানে পাওয়া যাবে না। গায়ককে সব সময়ই তার ক্ষমতা অনুযায়ী গানের মূল কাঠামো ও ভাব বজায় রেখে ওই চ্যাপটা চেহারায় প্রাণ-সঞ্চার করতে হয়। তার মানে গানে কোনও অতিরিক্ত তান প্রয়োগ নয় ; তার মানে যেটুকু না করলে নয়, সেইটুকুই। এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে সাহানা দেবী স্বরলিপির পাখি-পড়া পুনরাবৃত্তি করতেন না, কারণ সেটা করে গানের প্রতি দরদ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যাকে ভালোবাসা যায় তার আসল রূপের পরিবর্তন কেউ সাধ করে করে না, কিন্তু সামান্য সাজগোজ করালে যদি তার রূপ আরও খোলে তাহলে সেটাই বা করা হবে না কেন? সাহানা দেবী রবীন্দ্রসংগীতকে যেভাবে সাজিয়ে উপস্থিত করতেন, তাতে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল না এই কারণেই যেন এতে তিনি তাঁর গানের আসল রূপটি নতুন করে ফিরে পেতেন।

রবীন্দ্রনাথের গান যে আজকাল খুব ভালোভাবে গাওয়া হচ্ছে না তার একটা সোজা কারণ অবশ্য এই যে ভালো গাইয়ে ছাড়া ভালো গান ভালোভাবে কেউ গাইতে পারে না। এসব গাইয়েদের অধিকাংশই, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, মাঝারির দলভুক্ত। অথচ এই মাঝারিদের মধ্যেই রবীন্দ্রসংগীতের প্রচলন, এই মাঝারিদের মধ্যেই রবীন্দ্রসংগীতকে যথাসম্ভব বিশুদ্ধভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এটুকুও বেশ বোঝা যাচ্ছে যে স্বরলিপি ছাড়া একাজ সম্ভব নয়। সুতরাং স্বরলিপির দিকটাই আগে দেখতে হবে।

এ বিষয়ে কিছু বলার আগে আমি রবীন্দ্রনাথের একটি অতিপরিচিত গানের তিনটি বিভিন্ন স্বরলিপির প্রথম দু-লাইন করে তুলে দিচ্ছি। প্রথমটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের করা, দ্বিতীয়টি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ও তৃতীয়টি সরলা দেবীর।

'আমি চিনি গো চিনি তোমারে....'

১. জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

I া সা রা II রগা গা গা I গা গা গা I গমা -া গমগা I

০ আ মি চি নি গো চি নি তো মা ০ ০০০

I রা -া রগা I রা -গা রা I রা -পা হ্মা I পধপা -া -া ) I -া

রে ০ ও০ গো ০ বি দে ০ শি নী০০ ০ ০ ০

২. দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

I া সা রা II গা গা গা I গা গা গা I গমা -গপা -মগা I

আ মি চি নি গো চি নি তো মা ০ ০০ ০০

I গরা -া রা I রা -গা গরা I রা -পা পহ্মা I ধপা -া -া I -া

রে ০ ও গো ০ বি দে ০ শি নী ০ ০ ০

৩. সরলা দেবী

I া সা রা II গা গা গা I সগা গা গা I মা -া মগা I

আ মি চি নি গো চি নি তো মা ০ ০০

I রা -া রগা I রা গা রা I ধা পা হ্মা I ধপহ্মা -া পা I -া

রে ০ ও০ গো বি দে ০ শি নী০০ ০ ০ ০

বলা বাহুল্য, এই তিনটেই রবীন্দ্রনাথের জীবিত কালে রচিত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কোনওটার সঙ্গে কোনওটার হুবহু মিল নেই। অথচ এটাও ঠিক যে, এর কোনওটাই এমন নয় যে এতে মূল গানটা চেনা যায় না। এখানে কি সব কটিই ঠিক বলে মানতে হবে? তাহলে রবীন্দ্রসংগীতের বিশুদ্ধ রূপ বলে যে কথাটা বলা হয়, তার কী হবে? পরস্পরে এমন বেমিল কিন্তু শুধু একটা নয়, একাধিক গানের স্বরলিপিতে পাওয়া যাবে। সেখানে গায়ক বা শিক্ষকের কী করা উচিত?

এখানে শুধু একটি ছাড়া আর রাস্তা নেই। সংগীতের বিচারে যে স্বরলিপি সবচেয়ে ভালো, তাকেই বেছে নিতে হবে। এ বিচারে গানের প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথের রচনার স্বভাব-এ দুটো জিনিসই খেয়ালে রাখতে হবে।

'চিনি গো চিনি'-র মূল মেজাজে, কথা বাদ দিয়েও, একটা বিদেশি ভাব আছে। তার কারণ এর ছন্দের চালটা ঠিক দিশি নয়, এটা কতকটা waltz-এর মতো। এ চালটা রবীন্দ্রনাথের অনেক গানেই আছে-যেমন 'পাদপ্রান্তে রাখ সেবকে', 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে', 'আমাদের শান্তিনিকেতন'-ইত্যাদি। যুবা বয়সে বিলেতের ভিক্টোরীয় পরিবেশে waltz-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়াটা অসম্ভব নয়। হয়তো এ ছন্দে তিনি ইংরিজি গানও গেয়েছেন। যাই হোক, waltz-এ তার সহজাত ত্রিমাত্রিক ছন্দটাকে প্রাধান্য দেবার জন্য তার সুরের অলংকারটা খুব হিসেব করে প্রয়োগ করতে হয়-বিশেষ করে প্রথম লাইনেই যদি একটা গিটকিরি চোখে পড়ে তাহলে মনে সন্দেহ জাগে। দিনেন্দ্রনাথের স্বরলিপির প্রথম লাইনের তোমারে-র মা-তে গমা-গপা-মগা সেই কারণে অন্য দুটির তুলনায় কম গ্রাহ্য বলে মনে হয়। আবার সরলা দেবীর স্বরলিপিতে চিনি তোমারে-র চি-তে সগা একটু বেশি মাত্রায় বিলিতি বলে মনে হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্বরলিপিতে প্রথম তাল যেখানে পড়ছে সেই চি-তে রগা দিনেন্দ্রনাথের গা-এর চেয়ে ভালো, কারণ তালের আরম্ভে ওই ধাক্কাটায় একটা মজা আছে। গানের বিদেশিনী-অংশে সরলা দেবীর রা ধা পা হ্মা ইত্যাদি নেহাতই বিলিতি এবং অ-রাবীন্দ্রিকও বটে। এই অংশে দিনেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দুটোই চলতে পারে, তবে সব মিলিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে অনুসরণ করাই উচিত বলে মনে হয়।

এক স্বরলিপির সঙ্গে আরেক স্বরলিপির, অথবা সুরের পরিচিত চেহারার সঙ্গে স্বরলিপির প্রভেদের দৃষ্টান্ত যেখানেই আসবে, সেখানেই এইভাবে তুলনামূলক বিচার ছাড়া গতি নেই। যে কোনও গানেরই একই সুরে বিশেষ বিশেষ উপযুক্ত মুহূর্তে মীড় গমকের প্রয়োগভেদে তার চেহারার যে তফাত হয় তাতে কোনও শ্রেণীর ভারতীয় গানেরই কোনও অনিষ্ট হতে পারে না, বা গানের রচয়িতার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ হতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদ গানের যে স্বরলিপি আছে, তাতে মীড়-গমক কমই আছে। এ গানের অনেকগুলিই কোরাসে গাওয়া হত বলে এ স্বরলিপি তার পক্ষে অনুপযুক্ত নয়। কিন্তু একা গাইতে গেলে এ স্বরলিপিতে সামান্য অলংকরণের প্রয়োজন হবেই, কারণ মনে রাখতে হবে এখানে রাগ-তাল মিলিয়ে গানে ষোলোআনা রাগসংগীতের মেজাজ। স্বরলিপিতে আছে -

II ণা -া পা I মরা -মা পা I ণা -মা -পা I পর্সা -া -া I

ম ন দি রে০ ০ ম ম ০ ০ কে ০ ০

কোরাসের পক্ষে এটা ঠিক। একক কণ্ঠে গাইতে হলে সংগত হবে-

II পণা -া ণপা I মরা মরমা পা I পণধণা -মা -পা I র্সনর্সা -া -া I

ম ন দি রে০ ০০০ ম ম ০ ০ কে ০ ০

রবীন্দ্রনাথের অনেক রাগাশ্রিত গান আছে যা গাইবার সময় সামান্য এদিক ওদিক হলে তার কোনও ক্ষতি হয় না ; বরঞ্চ স্বরলিপির নিরেস পুনরাবৃত্তিতেই তার সৌন্দর্যহানির সম্ভাবনা বেশি। স্বরলিপিতে আছে -

র্সা র্সা II ধণা -পা -া মা I মপা -জ্ঞা -মা -জ্ঞা I জ্ঞণা -পা না না) I র্সা

ও হে সু ০ ন দ র ০ ০ ০ ম ০ রি ম রি

এটা যদি এইভাবে গাওয়া যায় তাতে কোনও দোষ নেই -

পর্সা র্সা II ধণা -া -া পমা I পা -জ্ঞা -মা জ্ঞমা I পণা -পা না না I র্সা

ও হে সু ০ ন দ০ র ০ ০ ০ ম ০ রি ম রি

গানের কোনখানে তার মোক্ষম বিশেষত্ব সেইটে বুঝতে না পারলে বিকৃতি হল কী না হল, বা কী পরিমাণে সে বিকৃতি গানের ক্ষতি করল, সেটা বোঝা যাবে না। সে বিশেষত্ব ছন্দে থাকতে পারে, যেটার সঙ্গে শব্দের বিভক্তি জড়িত, অথবা সেটা সুরে থাকতে পারে। সবচেয়ে বেশি সাবধানতার প্রয়োজন সেখানেই, যেখানে গান একেবারে মৌলিক সৃষ্টির পর্যায়ে পড়ে। যেমন -

II পর্সা -া র্সা I সা র্সা -া I র্সনা -া না I নধা পা -া I

কা ন না হা সি র দো ল দো লা নো ০

পনা -া না I নধা পা -হ্মা I পা দা -া I -া -া -া I

পৌ ষ ফা গু নে র পা লা ০ ০ ০ ০

I দা দা -া I দা -া পা I পমা -া -পা I দা দপা -া I

তা রি ০ ম ধ ধে চি ০ ০ র জী ০

এ গান শুনলে সহজেই বোঝা যাবে যে এর বিশেষত্ব হচ্ছে 'পালা'-র 'লা'-তে আচমকা কোমল ধৈবতের প্রয়োগ। পুরো গানটাতেই সুরের মধ্যে দ্রুত রং পরিবর্তনের দিকটা লক্ষণীয় এবং সেটা গানের কথার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে সংগতি রক্ষা করেছে। এখানে যদি এর দ্বিতীয় লাইনের স্বরলিপি এইভাবে করা হয় -

পনা -া না I নধা ধা -না I ধা পা -া I -া -া -া I

পৌ ষ ফা গু নে র পা লা ০ ০ ০ ০

এবং এর পরে তারি-র তা-এ যদি প্রথম কোমল ধৈবত লাগে, তাহলে সুর তৎক্ষণাৎ একটা মামুলি চেহারা নেয়। এইভাবে গাওয়া বা স্বরলিপি করা হলে সত্যিই বলা চলে যে রবীন্দ্রনাথের রচনার সর্বনাশ হয়েছে।

তবে এটাও ঠিক যে, সুর বা ছন্দের দিক দিয়ে যে সব গানে তেমন কোনও চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য থাকে, সেগুলি বিকৃত হবার সম্ভাবনাও কম, কারণ তাদের বৈশিষ্ট্যের জন্যই মনে তারা দাগ কাটে বেশি।

কিন্তু শুধু সুর বা ছন্দ ছাড়াও আরও যেসব দিকে দৃষ্টি রাখা দরকার, সেগুলির কোনও ইঙ্গিত স্বরলিপিতে পাওয়া যাবে না।

এক হল উচ্চারণ। কথা যাতে স্পষ্ট হয় তার জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান থেকে তান তুলে দিলেন। রাগসংগীতের শ্রুতি-মীড়-গমক-এ সবের ব্যবহারও কথার খাতিরেই এখানে অনেকটা কম। অর্থাৎ সুরে চেহারাটা এখানে রাগসংগীতের চেয়ে অনেকটা সহজ, সরল। তাহলে উচ্চারণ স্পষ্ট হবে না কেন? কথার উপযুক্ত মূল্য দেওয়া হবে না কেন? কথা যদি অস্পষ্ট হয় তাহলে তার ভাবের দিকটা ব্যাহত হতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, কথার অস্পষ্টতা কোনও গানেই চলে না, এবং তাল গমকের খাতিরে ছাড়া তার কোনও বিকৃতি বা অস্পষ্টতা বরদাস্ত করা যায় না। শান্তিনিকেতনে এককালে এক ধরনের বাংলা উচ্চারণের চল হয়েছিল যেটা রবীন্দ্রনাথের তথা ঠাকুরবাড়ির একটা বিশেষ বাচনভঙ্গি থেকেই এসেছিল। সে কৌন বৌনেইর হৌরিন ছিইলোউ আউমার মৌনেই - এই ছিল সে উচ্চারণের ঢং। এ জিনিস আজকের দিনের শহরে আর চলে না, এবং একে রবীন্দ্রসংগীতের আদর্শ উচ্চারণ বলা চলে না। এখানে গানের কথাটা কেবল সুরের বাহন বলে ভেবে নিলে তার প্রতি যথেষ্ট দৃষ্টি দেওয়া হবে না - কারণ রবীন্দ্রনাথ সেভাবে কথাকে ব্যবহার করেন নি। যেখানে সুরে তেমন বৈচিত্র্য নেই সেখানে কথা স্পষ্ট না হলে গানে আর কিছুই থাকবে না। সে গানের কদর আজকের মাঝারির বাজারে খুব একটা আশাও করা যায় না, কিন্তু তাও, তার পরিবেশন যখন বন্ধ হয়নি, তার গাওয়ার সাবেক রীতিগুলো মানতেই হবে। যিনি স্পষ্ট উচ্চারণ করবেন, শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করা তাঁর পক্ষে আরও সহজ হবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

আরেকটা জিনিস যেটা স্বরলিপিতে পাওয়া যাবে না সেটা হল গানের সংগতের নির্দেশ। সংগত সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ কোথাও কিছু বলে যাননি। এখানে সুরকারের একটা বড় দায়িত্ব তিনি পালন করেন নি। রবীন্দ্রনাথ নিজের গলায় শুধু তাঁর গান গেয়েছেন এবং এইভাবে অনেকের মুখেই রবীন্দ্রসংগীত ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছি। যাঁরা যন্ত্র ছাড়া গলা সুরে রাখতে পারেন, তাঁদের গলায় যদি দরদ থাকে, গানের ভাব যদি তাঁরা হৃদয়ংগম করতে পারেন, তাঁদের উচ্চারণ যদি সংগীতোপযোগী বিশুদ্ধতা থাকে, তবে যন্ত্র ছাড়াও গান গেয়েও রবীন্দ্রসংগীতের সমস্ত সৌন্দর্য তাঁরা প্রকাশ করতে পারেন। এইভাবে গাওয়ায় কী হতে পারে তার দৃষ্টান্ত গ্রামোফোন রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের নিজের গাওয়া 'তবু মনে রেখো' গানে আছে। সব না হলেও অনেক গানই এভাবে গাওয়া সম্ভব এবং উচিত, এটা আমি বিশ্বাস করি। তালের গান তাল-সংগত ছাড়া গাইতে হলে গায়কের যে জিনিসটার দরকার সেটাকে ইংরাজিতে বলে phrasing। এতে আরও আনা গানের সঙ্গে চার আনা আবৃত্তির মিশ্রণ - যেন প্রায় সুর করে ভাব দিয়ে কথা বলা।

তবে সাধারণের জন্য এ রীতি নয়। সত্যি বলতে কী-আজকাল যা হচ্ছে, তাতে সাধারণের বাজারে রবীন্দ্রসংগীতের কোনও ভবিষ্যৎ আছে কিনা সন্দেহ। সাধারণের কাছে এ গানের ভাবের মূল্য কিছুমাত্র আছে বা থাকতে পারে বলে মনে হয় না ; আর যুগটাও যে পালটেছে সে বিষয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রোত্তর যুগে রবীন্দ্রসংগীত বেঁচে থাকতে পারে কেবল তার সুর আর ছন্দের জোরে এবং যেটার আসলে দরকার সেটা হল এই দুটো দিককে উপযুক্ত সংগতে আরও সমৃদ্ধ করা।

ধ্রুপদের বাইরে যে গান, তাতে সংগতের কোনও সুচিন্তিত রীতি আজও পর্যন্ত চালু হয়নি। কোনও ছকে বাঁধা একই রীতি সব গানে চলতে পারে না। কীর্তনাঙ্গ গানে খোল-করতাল, ঢিমে লয়ের গানে ছড়ে-টানা যন্ত্রের সঙ্গে তবলা, আর দ্রুত লয়ের সঙ্গে তবলা এবং যা কিছু হোক যন্ত্র - এই মোটামুটি চলে এসেছে।

আর কিছু না হোক, গায়কের বিরামমুহূর্তে সংগীতের রেশ যাতে বজায় থাকে, তার জন্যই সংগতের একটা প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন বার বার বলে গেলেন তাঁর গান রাগসংগীত নয়, এর মেজাজ ও উদ্দেশ্য দুই আলাদা, এটা একটা নতুন জিনিস - তখন সে গানের সঙ্গে ওস্তাদি বাজনা বাজিয়ে রচয়িতার উদ্দেশ্য ব্যর্থ করা হয় না কি? এ জিনিসটা করলে রচনায় অযথা একটা diuhotomy এসে পড়ে যেটা গানের পক্ষে কখনই মঙ্গলকর হতে পারে না। আসলে যেটা করা উচিত সেটা দুরূহ কাজ-কিন্তু সে ছাড়া গতি নেই।

গানের তাল বুঝে, মেজাজ বুঝে প্রত্যেক গানের জন্য আলাদা সংগত রচনা করা উচিত। কীর্তন জাতের গানে সরাসরি খোল-করতাল চলবে না, কিন্তু তার ছোঁয়া থাকতে পারে, কারণ সে গান আসলে কীর্তন নয়, কীর্তনের ছায়া। লোকসংগীতেও এই একই পন্থা চলতে পারে - একতারা- দোতারা ইত্যাদি হিসেব করে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

এখানে একটা জিনিসের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার- খাঁটি লোকসংগীতে সংগত যেভাবে কাজ করে, তা থেকে রবীন্দ্রসংগীতের সংগত রচয়িতারা অনেক কিছু শিখতে পারেন। সুরের যেমন গোড়ার কথা বাউল-ভাটিয়ালি বলা আছে, তেমনি তার সংগতে গানকে কীভাবে যন্ত্রর তালে কী সুরে সমৃদ্ধ করা যেতে পারে তারও আশ্চর্য ইঙ্গিত আছে। হার্মনি না হলেও, কর্ডের ব্যবহার ছাড়া গান খোলে না। এই কর্ডের সবচেয়ে সহজ ব্যবহার সানাইয়ের পোঁয়ে। এই পোঁ শুধু সুর নয়। এই সুর বা খরজের সঙ্গে রাগের অন্যান্য পর্দা মিশে যে বিশেষ বিশেষ ধ্বনির উদ্ভব হতে থাকে, সেটা সুররেখায় বর্ণাঢ্যতা প্রয়োগ করে। গান বা যন্ত্রের সঙ্গে তানপুরার 'সা পা সা' ও ওই একই কাজ করে। কিন্তু লোকসংগীতে সারিন্দা-দোতারার যে ব্যবহার, তার বৈচিত্র ও sophistication এর সঙ্গে কোনও তুলনাই হয় না। যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে সেটা এই যে, দুটো যন্ত্রকে দিয়েই একাধারে সুরবাদ্য ও তালবাদ্যের কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। সারিন্দা বাজানোর যে রীতি তাতে তো মনে হয় আরেক ধাপ এগোলেই হার্মনির গণ্ডিতে এসে পড়বে। এতে তিন তারের একটাতে বাঁধা সা, একটাতে প্রয়োজনমতো মধ্যম ও পঞ্চমের প্রয়োগ ও তৃতীয় গানের মেলডির টীকা। ছড় টানা হতে থাকে মাত্রায় মাত্রায়, এ মাথা থেকে ও মাথা, তিন তারের উপর দিয়ে একসঙ্গে। এই জমাট সুরতাল-সমন্বিত ধ্বনির বনিয়াদের উপর গান চলতে থাকে। এরই মধ্যে সারিন্দাবাদক গানের খেয়াল রেখে প্রয়োজনমতো পঞ্চমের জায়গায় মধ্যম প্রয়োগ করেন। এর ফলে গানের লয় ঢিমে হলেও সংগতের অবিরাম এনার্জি সে গানকে কখনও এলিয়ে পড়তে দেয় না।

দোতারার যে রীতি, তার সঙ্গে অন্য দেশের লোকসংগীতের সংগতে মিল পাওয়া যায়। স্প্যানিশ গিটার, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জো, রাজস্থানি বীণ-এ সবই দোতারার সমগোত্রীয় এবং এর সবগুলিই সুর তাল একসঙ্গে চলে। দোতারার বাজনার ঢংয়ে যে wit, সেটাও সারা বিশ্বের নানান জাতের লোকসংগীতে পাওয়া যায়। গান শুরু হচ্ছে -

পা ধর্সা II র্সা -া -া -া I -া -া -া -া I -া -া -া I -া -া ণা ধা I পা

বন ধু ০ রে ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০০ ০ ০ বনধু রে

আর সেই সঙ্গে দোতারা বলছে -

া া II পা া পা পা সা I পা া ণা ধা সা I পা া পা ধা সা I পা া ণা ধা সা I পা

wit ওই কোমল নিখাদ ও ধৈবতের ব্যবহারে। সংগত যেন এখানে বলছে - তুমি কোন পথে যাবে আমি জানি, আমিও সেই পথেই আছি, আমি ছাড়া তোমার গতি নেই।

গানে কথার মূল্য যাই হোক না কেন, উপযুক্ত সংগতে সে মূল্য বাড়ে বই কমে না। আজকাল সংগতের যে নিয়মটা রবীন্দ্রসংগীতে মানা হয় সেটা হল টানাটানা সুরের গানে টানা সুরের যন্ত্র ব্যবহার - তা এসরাজই হোক বা বাঁশিই হোক বা বেহালাই হোক। এছাড়া কোনও প্রচলিত নিয়ম চোখে পড়ে না। টানা গানের সঙ্গে যদি টানা যন্ত্রে তার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, তাহলে সংগীত টটলজি-দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে। একমাত্র অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ছাড়া ছড়ের যন্ত্রে গানের সৌন্দর্যবৃদ্ধির কোনও দৃষ্টান্ত আমি দেখিনি। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছে রাগসংগীতের জ্ঞান ও রীতির সাহায্যে। এ জিনিসও মাঝারির কমমো নয়। কাজেই সংগতে একজনের উপর নির্ভর না করাই ভালো। যন্ত্রের ব্যবহারে দিশি-বিলিতি বাছবিচার না থাকাই ভালো, তবে হাওয়াইয়ান গিটার হারমোনিয়ামের চেয়েও অনেক গুণে বেশি অসহ্য। ওটা দূর না করা অবধি নিশ্চিন্তি নেই। তবলার সংগতে ওস্তাদি মেজাজটাই বড় চট করে এসে পড়ে। ওটা ব্যবহার করতে হলে তানবিস্তারের রাস্তাও খুলে দিতে হয়। কাজেই ওটার বদলে যন্ত্রকেই তালের কাজে লাগানো উচিত।

কাজে করার চেয়ে মুখে বলা সহজ তা জানি। আর কাজও অনেক। বললে যদি কাজের লোক কিছু করে তারই চেষ্টা। এটা ঠিক, অবিলম্বে কিছু না করলে, কেবল স্বরলিপির শুদ্ধতা নিয়ে মাতামাতি করে বা সংগীত শিক্ষায়তনে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে বা সিনেমা-রেডিয়ো-গ্রামোফোনে গান গেয়ে রবীন্দ্রসংগীতকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2017. All rights reserved by বইয়ের হাট