যুক্তরাষ্ট্রে শতাধিক বছরের বর্ণবাদের বিষময় ফল - আশফাক স্বপন

পরের বার জ্বল্বে আগুন!

যুক্তরাষ্ট্রে শতাধিক বছরের বর্ণবাদের বিষময় ফল

আশফাক স্বপন

দ্য ডেইলি স্টার। ৫ জুন ২০২০

‘ঈশ্বর নূহ নবীকে রংধনুর সংকেত দিয়েছেন। পরের বার পানি নয়, জ্বলবে আগুন!’

গৃহযুদ্ধপূর্ব আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ ভক্তিমূলক গান

ভয়ার্ত বিশ্ব অবাক হয়ে দেখছে, সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে যেন আগুন লেগেছে। পুলিশের জঘন্য একটি বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ড ছিল স্ফুলিঙ্গ – সেখানে থেকে দাবানলের মতো প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছ যুক্তরাষ্ট্রের ১৪০টি শহরে বিশাল মিছিল রাস্তায় নেমেছে। দাঙ্গা, লুটপাট, শহরে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের অত্যাচার, বড় বড় শহরগুলোতে রাতে সান্ধ্য আইন – সব একসাথে ঘটছে। কেন্দ্রীয় সরকার সে্নাবাহিনী নামিয়ে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

আচ্ছা, আমরা কোন দেশে আছে? মাঝে মাঝে মনে হয় এমন এক নামহীন গোত্রহীন দেশে বসবাস করছি যেখানে স্বৈরাচারী শাসকের গদি কেঁপে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার এর মধ্যে কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে শান্তিপূর্ণ মিছিল ছত্রভঙ্গ করিয়েছেন, যাতে তিনি গীর্জায় গিয়ে হাতে বাইবেল নিয়ে লোকদেখানো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন। সঙ্গত কারণে গীর্জার লোকজন এই অসভ্যতার তীব্র নিন্দা করেছেন।

জেমস বল্ডউইন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের একজন তীক্ষধী, নির্মম বিশ্লেষক। তিনি ১৯৬৭ সালে রচিত বই ‘এর পরের বার জ্বলবে আগুন’-এ (The Fire Next Time) বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সময় এসেছে দেশটির মূল মহাপাপ – এইদেশে আসার পর থেকে আফ্রিকান আমেরিকানদের নির্যাতন – তার ফলে যে বিষময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার সুরাহার উদ্যোগ নেওয়া।

তিনি লেখেন, ‘এখানে, ওখানে, যে কোনখানেই হোক,’ বর্ণবাদ ‘যুক্তরাষ্ট্রের সকল উন্নয়ন প্রচেষ্টা হয় কলুষিত করে, নয়তো খর্ব করে। মানুষের ক্ষেত্রে, বা ব্যক্তিগতভাবে গাত্রবর্ণের কোন অস্তিত্ব নেই – এর অস্তিত্ব সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। কিন্তু এই তফাতটা পাশ্চাত্যের উপলব্ধি করা এমনই কঠিন যে আজো পাশ্চাত্য সেই তফাতটা চিনতে পারে না।’

বল্ডউইন কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

‘আমরা যদি জান বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে না পড়ি, তাহলে বাইবেলের কাহিনির বরাত দিয়ে ক্রীতদাসের গানে যে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারিত হয়েছে, সেটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হবে: ঈশ্বর নূহ নবীকে রংধনুর সংকেত দিয়েছেন। পরের বার পানি নয়, জ্বলবে আগুন!’

আমেরিকায় শাদা-কালো মানুষের সম্পর্ক জটিল – তার ভালো মন্দ দুই দিকই আছে। কিছু কিছু বিষয়ে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, আবার কিছু ব্যাপারে আফ্রিকান আমেরিকানদের অবস্থা ভয়ঙ্কর রকমের খারাপ।

জিম ক্রো নামক ভয়াবহ বর্ণবাদী আইন বহু বছর হলো গত হয়েছে। কালো-শাদা মেলামেশায় আজ বিন্দুমাত্র নিষেধ নেই। এক সময় দক্ষিণে কালোদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল, তারও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০৮ সালে প্রথম কালো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে।

তারপরও আফ্রিকান আমেরিকানরা ভীষণ পিছিয়ে রয়েছে। বাড়ি মালিকানা হোক, ব্যাপক হারে কারাবাস হোক, স্বাস্থ্যের অবস্থা হোক – নানান ক্ষেত্রে আফ্রিকান আমেরিকানদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে খুব খারাপ।

এর ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। ১৯৪০ দশকে আমেরিকার ঐতিহাসিক সোশাল সিকিউরিটি আইন পাশ হয়। এই আইন খেটে খাওয়া মানুষের অবসর জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আইনটি পাশ করার সময় দক্ষিণের বর্ণবাদী ডেমোক্র্যাট দলের নেতারা গৃহকর্মী আর কৃষিকর্মীদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখেন। এদের বেশির ভাগ কালো মানুষ। আবার গৃহঋণ দেওয়ার ব্যাপারে ঐতিহাসিকভাবে কালোদের সাথে সাংঘাতিক বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। ফলে এদেশে সম্পদ সৃষ্টির সবচাইতে মৌলিক পথ – বাড়ির মালিকানা – কালোদের জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়।

মিনিয়াপোলিস শহরে ২৫ মার্চ জর্জ ফ্লয়েডকে পুলিশের হত্যা করার ঘটনা সাম্প্রতিক প্রতিবাদের ঝড় উস্কে দেয়। এর আগে সম্প্রতি আরো দুজন আফ্রিকান আমেরিকানকে সন্দেহজনক কারণে হত্যা করা হয়। মার্চ মাসে কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের লুইভিল শহরে পুলিশ মাদক উদ্ধার অভিযানে ব্রিওনা টেইলরের এপার্টমেন্টে প্রবেশ করে তাকে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করে। তার বাড়িতে কোন মাদকদ্রব্য পাওয়া যায় নাই। সপ্তাহের পর সপ্তাহ কিছুই হয় নি। তারপর জোর প্রতিবাদের ফলে কর্তৃপক্ষ হত্যাকাণ্ড অনুসন্ধান শুরু করে।

ফেব্রুয়ারি মাসে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চলে একজন শাদা প্রাক্তন পুলিশ আর তার ছেলে আহমাড আরবারিকে ধাওয়া করে। তারপর তার সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তির পর তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দুই মাস পর্যন্ত কেউ এব্যাপারে কিছু করেনি। জাতীয় পর্যায়ে সংবাদপত্র হৈচৈ করার পর কর্তৃপক্ষ বাপ-বেটাকে গ্রেফতার করে।

ন্যায়বিচারের জন্য বিশাল বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বেরিয়েছে, এ আর আশ্চর্য কি।

পরিস্থিতি খুব বেদনাদায়ক হলেও কোথাও কোথাও ক্ষীণ আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মোটের ওপর প্রতিবাদ মিছিল শান্তিপূর্ণ। সব মিছিলে শাদা আমেরিকান – এরা বেশির ভাগ অল্পবয়স্ক – এর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আশা জাগায়। নিউ ইয়র্ক শহরে পুলিশ প্রধান টেরেন্স মনাহান জনসমক্ষে এক হাঁটু গেড়ে বসেছেন। এটি আমেরিকায় কালোদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের প্রতীকী প্রতিবাদ, যা সচরাচর কালো লোকে করে থাকে। একইভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন অরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ডের পুলিশ প্রধান, ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান্টা ক্রুজ ও নাপা শহরের পুলিশ প্রধান।

তবে প্রতিবাদের একটা অন্ধকার দিকও রয়েছে। মার্কিন দেশের ইতিহাসে ব্যাপক বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদ অনেক সময় জ্বালাও-পোড়াও সহিংসতায় পর্যবসিত হয়।

এব্যাপারে একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান: ১৯৯২ সালে দক্ষিণ-কেন্দ্রীয় লস এঞ্জেলেসে যেই দাঙ্গা হয়, সেখানে কোরিয়ান আমেরিকান ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৫০ কোটি ডলার। পরিশ্রমী, কোনমতে-টিকে-থাকা অভিবাসীদের কয়েক দশকের হাড়ভাঙা খাটুনিতে তৈরি সাধের ছোট ব্যবসাগুলোর সর্বনাশ হয়।

আমার নিজের মত হচ্ছে যারা এসব লুটপাট আর অগ্নিসংযোগে অংশ নেই এরা সব বদয়ায়েশ আর গুণ্ডা – প্রতিবাদের কারণ নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নাই।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সঙ্গত কারণে রাগে যখন মানুষ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয় তখন শান্তি বজায় রাখা কঠিন – কিন্তু সেটা করতে পারলে তাতে মস্ত সুবিধা। মার্টিন লুথার কিং-এর কথা ধরা যাক। কালোদের নাগরিক অধিকারের সংগ্রামে তিনি আরো হিংস্র, বর্ণবাদী প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করেছেন, অথচ সব সময় সম্পূর্ণ অহিংস ছিলেন। অনেকে এজন্য তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে, বলেছে তিনি দুর্বল। অবশেষে ওঁরই বিজয় হয়েছে, কারণ ওঁর অহিংসার ফলে বর্ণবাদী প্রতিপক্ষ কালোদের আন্দোলনকে গালমন্দ করার আরো একটি অজুহাত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

আজও অবস্থার তারতম্য হয়নি। অগ্নিসংযোগ, লুটপাটে আজকের আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়ার এতটুকু সুরাহা হবে না, বরঞ্চ তার থেকে মানুষের দৃষ্টি সরে যাবে, তাতে তাদের প্রতিপক্ষ আহ্লাদিত হবে। ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে এই বিষয়ে একটা কঠিন শিক্ষামূলক উদাহরণ রয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ যখন সহিংস রূপ নেয়, তখন শাদা মধ্যবিত্ত মানুষ বিরক্ত হয়ে ওঠে। তার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে রিপাবলিকান দলের দুই গভর্ণর রিচার্ড নিক্সন আর রোনাল্ড রেগান আইন শৃঙ্খলার দাবিকে মূলমন্ত্র করে দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল রাজনীতির আধিপত্যের সূচনা করেন।

জানি, আমার কথায় কোন কোন জঙ্গি প্রতিবাদী মুখ বাঁকাবেন। তাচ্ছিল্যের সাথে প্রশ্ন করবেন: তুমি কে বাপু আমাদের জ্ঞান দিতে এসেছ?

হক কথা।

আমার কথায় কর্ণপাত করবেন না। এবার এমন একজনের কথা বলছি, যার এবিষয়ে মত দেবার নৈতিক অধিকার প্রশ্নাতীত। ইনি মিনিয়াপোলিসে নিহত আফ্রিকান আমেরিকান ব্যক্তিটির ভাই।

যে রাস্তার মোড়ে তার বড় ভাই মারা গিয়েছেন, সেখানে দাড়িয়ে টেরেন্স ফ্লয়েড সম্প্রতি সমর্থকদের বলেন: ‘আমিই যদি এখানে এসে জিনিসপত্র ভাঙচুর না করি, পাড়া লণ্ডভণ্ড না করি, তাহলে আপনারা সবাই কি করছেন? কিসসু না! কারণ এসব কাজ আমার ভাইকে আর ফিরিয়ে আনবে না।

‘তার চাইতে আসুন, একটু অন্যভাবে কাজ করি । এমন চিন্তা মন থেকে দূর করুন যে আমাদের প্রতিবাদে কিছু যায় আসে না। ভোট দিন। কারণ আমরা সংখ্যায় অনেক। আসুন, সহিংসতা বাদ দিয়ে আমাদের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাই।’

এবার শুনলেন তো? যত খুশি প্রতিবাদ করুন। কিন্তু সেই সাথে সংগঠিত হোন। ভোট দিন।

মনে রাখবেন, একদিনে সব পাল্টাবে না, সময় লাগবে। অনুপ্রেরণার জন্য মার্টিন লুথার কিং-এর এই কথাটা মনের রাখুন: ‘জগতে নৈতিকতার সঞ্চারপথ দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু তার গন্তব্য সুবিচার।’ এটি প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রিয় বচন। ওবামার মতের গুরুত্ব যথেষ্ট – মার্কিন রাজনীতিতে কি করে জিততে হয়, এই ব্যাপারে তার কিঞ্চিত হাতযশ আছে কিনা।

Dailystar এর লিঙ্ক

মনের আঙিনা থেকে পত্র - জেমস বল্ডউইন - অনুবাদ: আশফাক স্বপন

আজ সারা আমেরিকায় আগুন জ্বলছে কেন?

আসিতেছে শুভদিন
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ।
- কাজী নজরুল ইসলাম



আমি আটলান্টায় থাকি। কাল CNN সদর দফতরের সামনে সহিংস প্রতিবাদে পুলিশেরর গাড়ি পুড়েছে, দোকান লুট হয়েছে। মেয়র হাত জোড় করে নগরবাসীকে বাড়ি ফিরতে বলেছে। আজ শহরে সান্ধ্য আইন চালু।

সারা আমেরিকা রাগে কাঁপছে। শহরে শহরে বিক্ষোভ, কত স্থানে আগুন জ্বলছে। একাধিক শহরে সান্ধ্য আইন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নগর প্রশাসন হিমসিম খাচ্ছে।

মিনিয়াপোলিস শহরে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক আফ্রিকান আমেরিকান ব্যক্তিকে হাতকড়া পরাবার পরও পুলিশ তাকে মাটিতে ফেলে গলায় হাঁটু চেপে জনসমক্ষে হত্যা করে। এতে সারাদেশে ক্রুদ্ধ প্রতিবাদের যে ঝড় উঠেছে তা যেন আর থামতে চায় না।

বর্ণবাদী অত্যাচারের বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিবাদ এই প্রথম নয়। আমি তখন ক্যালিফোর্নিয়ায়। ১৯৯২ সালে মে মাসে নির্দয়ভাবে আফ্রিকান আমেরিকান রডনি কিঙকে প্রহার করার পরও মামলায় চারজন পুলিশ বেকসুর খালাস হবার পর সাউথ সেন্ট্রাল লস এঞ্জেলেসে প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে। তিনদিনের ভয়াবহ প্রতিবাদ, অগ্নিসংযোগ আর লুটপাটে ৬৩ জন মারা যায় আর ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়।

ইদানিং বারবার খবর আসছে, পুলিশ নিরস্ত্র আফ্রিকান আমেরিকানদের হত্যা করছে। অনেক সময় তাদের বিচার হয় না, বিচারে হলেও শাস্তি হয় না। সম্প্রতি যেই জর্জিয়াতে আমি থাকি, সেখানে আফ্রিকান আমেরিকান তরুণ আমড আরবারিকে চোর সন্দেহে ধাওয়া করে সাদা পিতা-পুত্র তাকে গুলি করে খুন করে, অথচ আড়াই মাস তাদের গায়ে আঁচড়টি পড়েনি। মার্চ মাসে কেন্টাকির লুইভিল শহরে পুলিশ এ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে আফ্রিকান আমেরিকান জরুরি সেবাকর্মী ব্রিওনা টেইলরকে গুলি করে হত্যা করে।

দেশ অস্থির, জনতার ক্রদ্ধ। এর কারণ বুঝতে হলে এদেশে কালোদের ওপর পুলিশী নির্যাতনের পেছনে আমেরিকার দীর্ঘদিনের কলঙ্কময় বর্ণবাদী নিপীড়নের ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে হবে। এই অত্যাচারে ভুক্তভোগী আফ্রিকান আমেরিকান সমাজের এক ক্ষুরধার বিশ্লেষণী লেখক জেমস বল্ডউইন। ১৯৬২ সালে নিউ ইয়র্কার সাময়িকীতে তার একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ ছাপা হয়। কুড়ি হাজার শব্দের বিশাল এই প্রবন্ধটি প্রায় একটি ছোট্ট পুস্তিকার সমান। সেখানে সামাজিক বিশ্লেষণের সাথে সাথে নানান বর্ণনা ও স্মৃতিচারণ রয়েছে। তার থেকে অল্প খানিকটা চুম্বক অংশ বাংলায় অনুবাদ করে নিবেদন করছি।

ষাটের দশকে এদেশে আফ্রিকান আমেরিকানদের ওপর যে ভয়ানক বর্ণবাদী স্বেচ্ছাচারের বর্ণনা বল্ডউইন করেছেন, আজ নানা দিক থেকে আমেরিকায় অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এই উন্নতিতে ভয়াবহ ফাঁকও রয়ে গেছে। প্রায় ৬০ বছর আগে লেখা প্রবন্ধটি পড়লে পাঠক বার বার চমকে উঠবেন। মনে হবে বল্ডউইন-এর ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর যেন আজকের পরিস্থিতি বর্ণনা করছে। (নিগ্রো শব্দটা এখন ভদ্রসমাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও যে সময়ে বল্ডউইন লিখেছেন, তখন সাদা কালো সকলেই আফ্রিকান আমেরিকানদের নিগ্রো বলে অভিহিত করত।)



মনের আঙিনা থেকে পত্র (অংশবিশেষ)
জেমস বল্ডউইন


দ্য নিউ ইয়র্কার। ১৭ নভেম্বর, ১৯৬২
অনুবাদ: আশফাক স্বপন

মূল রচনা
Letters from a region of my mind
By James Baldwin
The New Yorker | November 17, 1962
মূল রচনার লিঙ্ক

এই বিষম দুরবস্থার পরিবর্তন যে সম্ভব নয় বুঝতে সেটা বুঝতে তেমন বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি কর্মদিবসে সারাক্ষণ বিনা কারণে লাঞ্ছনা আর বিপদের মুখোমুখি হতে হতে মানুষ যদি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সেজন্য তেমন স্পর্শকাতর হবারও প্রয়োজন নেই। এই লাঞ্ছনা শুধু খেটে খাওয়া মানুষকে ভোগ করতে হয় না। আমার যখন ১৩ বছর বয়স, তখন একদিন আমি নিউইয়র্ক-এর ফিফথ এভিনিউ পার হয় লাইব্রেরীর দিকে যাচ্ছি। রাস্তার মাঝখানে পুলিশ। আমি পাশ দিয়ে যাবার সময় বিড়বিড় করে বলল, ‘এখানে মরতে এসেছিস কেন, নিগার? তোদের পাড়ায় থাকতে পারিস না?’

তাই ত্রাস সৃষ্টির জন্য যে কোন একটা উপায় বড্ড প্রয়োজন। একথা সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে পুলিশ আপনাকে পেটাবে, গারদে পুরবে, যদি সে এই সব কাজ করে পার পেয়ে যায়। তারা নিজেদের প্রতি যেমন আচরণ কামনা করে, সভ্যতার বা খ্রীষ্টীয় প্রেমের দোহাই দিলেও তারা আপনার সাথে সেই রকম আচরণ করবে, তার সম্ভাবনা নেই। শুধুমাত্র যদি আপনার জোর পালটা আক্রমণের ক্ষমতা থাকে, তাহলেই তার ভয়ে ওরা সভ্য আচরণ করবে, বা ভালোমানুষির ভাণ করবে (তাই সই)। আমিতো খুব বেশি নিগ্রো চিনি না যারা চায় সাদারা তাকে গ্রহণ করুক। সাদাদের ভালোবাসা চাইবার তো প্রশ্নই ওঠেনা। ওদের চাওয়া সামান্যই – এই ধরণীতে তাদের ক্ষণস্থায়ী উপস্থিতির সময়টুকু যেন সর্বক্ষণ সাদাদের শারীরিক আক্রমণ থেকে তারা নিষ্কৃতি পায়।

সাদারা সামাজিক শিষ্টতার রীতিনীতি মেনে চলে বলে দাবি করে। কিন্তু সাদাদের জগতে বসবাস করে নিগ্রোসমাজের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার ফলে তাদের মাঝে এই দাবির প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা সৃষ্টি সম্ভব নয়। নিগ্রোদের নিজের অবস্থাই তর্কাতীতভাবে প্রমাণ করে যে সাদা লোকে এইসব রীতি মেনে চলেনা।

সাদা লোকে কালো মানুষের স্বাধীনতা চুরি করেছে, তারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এই আত্মসাতের সুবিধা ভোগ করছে। তাদের কোনরকমের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাই নেই। তাদের পক্ষে হাকিম, জুরি, বন্দুক, আইন রয়েছে – অর্থাৎ সব ক্ষমতাই তাদের। কিন্তু এই ক্ষমতা অপরাধীর ক্ষমতা। একে ভয় করা যায়, শ্রদ্ধা করা যায় না।

সাদাদের সমাজে নীতিকথার বুলি কপচানো হয়। তবে সেসব অনুসরণ না করাটা কালোদের দমন করবার আরেকটা ফন্দি।

আমি বজ্রকঠিন পণ করেছিলাম– আমি নিজেই উপলব্ধি করিনি কতো কঠোর সেই পণ – ঘেটো নামের এই বর্ণবিভাজিত আবাসনের ঘেরাটোপের সাথে কোনদিন আমি আপস করবনা। দরকার হলে জাহান্নামে যাব, তবুও কোন সাদা লোক আমার ওপর থুথু মারবে, সেটা মানবো না। এই প্রজাতন্ত্রে আমার জন্য যে ‘জায়গা’ বরাদ্দ করা হয়েছে আমি কিছুতেই সেটা মেনে নেবনা। এই দেশের সাদা লোক আমার পরিচয় নির্ধারণ করে আমার সম্ভাবনাকে খর্ব করবে, সে আমি কিছুতেই হতে দেবনা।

জন্মলগ্ন থেকে নিগ্রোরদের এদেশে – আর কোন দেশে নিগ্রোর অস্তিত্ব নেই – নিজেদের ঘৃণা করতে শেখানো হয়। পৃথিবীটা সাদা আর ওরা কালো। সাদা লোকের হাতে ক্ষমতা, তার অর্থ ওরা কালো লোকের চাইতে শ্রেয় (মৌলিকভাবে শ্রেয়, ঈশ্বরের এমনটাই নির্দেশ কিনা), এবং পৃথিবীর এই ভিন্নতা সম্বন্ধে সজাগ করবার, সেটা উপলব্ধি করবার এবং সেটাকে ভয় করবার অজস্র উপায় রয়েছে।

আমাদের ওপর যে নির্যাতন হয়, তার প্রকৃতি, আমাদের যেই বিশেষধরনের জটিল ঝুঁকির সামাল দিতে হয়, এসবকিছু হয়তো আমাদের – গণিকা, দালাল, জোচ্চর, গীর্জার উপাসক, বাচ্চা – সবাইকে একসূত্রে বেঁধেছে। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এই সীমার মধ্যেই আমরা পরস্পরের সাথে এক ধরনের মুক্তি অর্জন করেছি যা প্রায় প্রেমের কাছাকাছি।

এই মুক্তির ঈঙ্গিত পাই কিছু ভক্তিমূলক গস্পেল গানে বা জ্যাজ সঙ্গীতে। জ্যাজ সঙ্গীতের পুরোটা জুড়ে, বিশেষ করে বেদনবিধুর ব্লুজ সঙ্গীতে কী যেন একটা তীক্ষ্ণ, তীর্যক, ব্যঙ্গাত্মক সুর আছে, আধিপত্যের ছাপ আছে, সেটা যেন খানিকটা শাঁখের করাতের মতো ধারাল। সাদা আমেরিকানরা ভাবে আনন্দের গানে শুধুই আনন্দ, আর দুঃখের গান শুধুই দুঃখের। অদ্ভুত ব্যাপার হলো বেশির ভাগ সাদা আমেরিকানরা গায়ও সেইভাবে। উভয়ক্ষেত্রেই শুনতে এমন ভীষণরকমের ফাঁকা আর অন্তঃসারশূন্য লাগে, যে বোধহীনতার কোন অতল থেকে তাদের প্রাণহীন সুর উঠে আসে সে কথা ভেবে ভেবে আমি হয়রান হয়ে যাই।

উপলব্ধির যেই গভীরতা থেকে এরকম তীর্যক শক্তিময়তা উঠে আসে সেটা সাদা আমেরিকানরা বোঝে না। ওরা সন্দেহ করে এই শক্তি জৈবিক, তারা সেটার হদিশ পায়না বলে আতঙ্কিত হয়। ‘জৈবিক’ কথাটা কিন্তু আদিরসে উত্তেজিত কালো নারী বা সুঠামদেহী কালো পুরুষদের বোঝানো হচ্ছে না। আমি যার কথা বলছি সেটা আরো অনেক সরল। জৈবিক তাড়না বলতে আমি বোঝাচ্ছি নিজের সহজাত প্রাণশক্তিকে সমীহ করা, তাকে নিয়ে, জীবনকে নিয়ে, উল্লসিত হওয়া। এ হলো ভালোবাসা থেকে শুরু করে সবাইকে নিয়ে ভোজন করা পর্যন্ত মানুষের প্রতিটি কাজে সপ্রাণ উপস্থিতি রক্ষা করা।

সাদা খ্রীষ্টানরা ইতিহাসের কিছু গোড়ার কথা ভুলে গেছেন। তারা ভুলে গেছেন, যেই ধর্ম তাদের ন্যায়পরায়ণতা ও ক্ষমতার পরাকাষ্ঠা – ‘ঈশ্বর আমার পক্ষে’ বলে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী নেতা ডক্টর ভেরভোর্ড ঘোষণা করেছেন – সেটা যে পাথুরে স্থান থেকে এসেছে, তার নাম মধ্যপ্রাচ্য। তখনও মানুষের বর্ণভেদ আবিষ্কৃত হয়নি। খ্রীষ্টীয় ধর্মব্যবস্থার পত্তনের জন্য রোমের আদেশে যীশুকে মৃত্যুদণ্ডিত করার প্রয়োজন হয়। ঈষৎ দুর্নামগ্রস্ত, রোদেপোড়া হিব্রু যীশুখ্রীষ্ট, যার নামে এই ধর্ম, সেই খ্রীষ্টীয় ধর্মব্যবস্থার আসল স্থপতি কিন্তু আরেক জন। তিনি নীতিবাগীশ, নির্মম ধর্মান্ধ সেন্ট পল।

সাদা মানুষ যখন আফ্রিকায় আসে, তখন সাদা মানুষের হাতে বাইবেল, আর আফ্রিকান মানুষের কব্জায় জমি। কিন্তু এখন সাদা মানুষকে তার অনিচ্ছায়, কখনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমে জমি থেকে উৎখাত করা হচ্ছে। আর আফ্রিকান এখন সেই বাইবেল হয় আত্মস্থ করার চেষ্টা করছে অথবা যেটুকু গলাধঃকরণ করেছে সেটা উগরে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

আমেরিকায় সাদা আমেরিকানরা পরস্পরের প্রতি যেমন আচরণ করে, কালো মানুষের প্রতি সেরকম আচরণ করেনা। সাদা মানুষ যখন কালো মানুষের মুখোমুখি হয়, বিশেষ করে কালো মানুষটি যদি অসহায় হয়, তাহলে ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটে।

কালের থাবা বড় কঠিন। সে এক সময়ে ঠিকই রাজত্বের নাগাল পায়, তাকে ধ্বংস করে। রাজত্বের শাসন আর নীতির মূলমন্ত্রে কাল তার তীক্ষ্ণ দাঁত বসিয়ে তার কাটাছেঁড়া করে। কালের ব্যবধানে সেই সব মূলমন্ত্রের অসারতা প্রমাণ হয়, সেইসব মূলমন্ত্র তখন মুখ থুবড়ে পরে। এই তো, খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, রোমে গীর্জার পাদ্রীরা একটা অসহায় কালো দেশে হানাদার আক্রমণে পাঠাবার সময় তরুণ ইতালীয় সেনাদের আশীর্বাদ করেছেন। সেই ঘটনার আগ পর্যন্ত ঐ দেশটি নিজেকে কালো বলেই ভাবত না।

কিন্তু তারপর বেশ কিছু কাল অতিবাহিত হয়েছে, এবং সেই সময়ে খ্রীষ্টান জগৎ যে নৈতিকভাবে দেউলিয়া আর রাজনৈতিকভাবে অস্থির সেটা প্রমাণিত হয়েছে। যখন একটা খ্রীষ্টান জাত একটা জঘন্য হিংস্র তাণ্ডবে মত্ত হয়, যেমন তৃতীয় রাইখে জার্মানীর নাৎসিরা, তখন ‘খ্রীষ্টান’ এবং ‘সভ্য’ কথাগুলো শুনতে অদ্ভুত লাগে। বিশেষ করে যাদের সভ্য বা খ্রীষ্টান কোনটাই বিবেচনা করা হয় না, তাদের কানে ঐ কথাগুলো বেখাপ্পা শোনায়। পূর্বপুরুষের পরিচয়টাই পাপ, সেই কারণে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র – ঈশ্বরের মন্দিরে – এমন সুসংবদ্ধভাবে, এমন ভয়ঙ্করভাবে, এত দীর্ঘসময় ধরে প্রাণসংহার করা হয়, যে এই আলোকিত যুগের আগে আর অন্য কোন যুগে এমন ভয়াবহ নরমেধযজ্ঞ সংঘটন ও নথিবদ্ধ করা দূরে থাক, সেটা কল্পনাই করা যায়নি।

আমার নিজের অভিমত হলো তৃতীয় রাইখের ফলে শুধুমাত্র প্রযুক্তি ছাড়া খ্রীষ্টানদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নটি চিরতরের জন্য অবান্তর হয়ে গেছে। জার্মানির ইহুদি হত্যাযজ্ঞ সাদা লোককে স্তম্ভিত করেছে, আজও করে। তারা ভাবতেই পারেনি তাদের পক্ষে এমন আচরণ সম্ভব। কিন্তু কালো মানুষ স্তম্ভিত হয়েছিল কি? অন্তত যেভাবে সাদারা হয়েছিল? আমার সেবিষয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিগ্রোদের সাথে যে আচরণ করা হয়, আমার মতে সেটা আমেরিকার সাথে নিগ্রোর সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে -হয়তো একটু বেশি সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে – বলতে হয়, একটা আশার মৃত্যু ঘটে, সাদা আমেরিকানদের প্রতি শ্রদ্ধা আরো খানিকটা মুছে যায়।

কল্পনা করুন আপনি এমন একজন মানুষ যে তার দেশের জন্য উর্দি পরেছে, তাকে রক্ষায় আপনার মৃত্যু ঘটতে পারে। তার সহযোদ্ধা আর ঊর্ধতন অফিসাররা তাকে ‘নিগার বলে ডাকে। তাকে প্রায় অবধারিতভাবে সবচাইতে নিকৃষ্ট, কুৎসিত, কঠিন, বাজে কাজগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আপনাকে কল্পনা করতে হবে এত কিছু সহ্য করার পর, দেশে ফেরার পর এই নাগরিকের বরাতে কি জোটে। সে কালো চামড়া নিয়ে বর্ণবিভাজিত বাসে চড়ে, বিভিন্ন স্থানে ‘সাদা’ ‘কালো’ সাইনবোর্ড, বিশেষে করে ‘সাদা ভদ্রমহিলা’ আর ‘কালো মহিলা’ সাইনবোর্ড স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে।

এই সমাজ সম্পূর্ণভাবে বৈরিভাবাপন্ন। তার স্বভাবই হলো আপনাকে পদদলিত করবে। ঠিক যেমন আগে বহু মানুষকে করেছে, এখনো প্রতিদিন বহু লোককে করছে। তখন কোন একটা অপমান কি সত্যি ঘটেছে, নাকি সবটাই আপনার কল্পনা, সেটার তফাৎ বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

যেমন ধরুন আমার জন্য ফ্ল্যাটের দারোয়ান আর পুলিশ সব্বাই এক। আমার এদের সাথে আচরণের মূলসূত্র হলো ওরা আমাকে আতঙ্কিত করার আগে আমি ওদের আতঙ্কিত করব। কারো কারো প্রতি নিঃসন্দেহে আমি অবিচার করছি, কিন্তু আমি নাচার। এই সব মানুষের কাছে এদের ঊর্দির চাইতে যে মানবিকতা বড় হতে পারে, সেটা ধরে নেওয়া আমার জন্য বড্ড বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সাদা মানুষ কি গাত্রবর্ণের চাইতে মানবিকতাকে প্রাধান্য দেয়? বেশির ভাগ নিগ্রো এটা ধরে নেবার মত বড় ঝুঁকি নিতে রাজি না।

মোদ্দা কথা হলো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে, মানুষ হিসেবে কালো মানুষের সম্বন্ধে সত্য কথাটা তার কাছ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে, অন্যায়ভাবে গোপন রাখা হয়েছে। একজন কালো মানুষ যখন সাদা সমাজের সংজ্ঞা মানতে অস্বীকার করে, তখন সাদা সমাজের ক্ষমতার ভিত্তি কেঁপে ওঠে। ফলে কালো মানুষকে খর্ব করার কোন সুযোগ হাতছাড়া করা হয় না।

আজ তো এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে পৃথিবীতে সাদা মানুষ সংখ্যালঘু। এত ভীষণ রকমের সংখ্যালঘু যে পুরো সাদা সমাজের ধারণাটাই কল্পিত মনে হয়। তাদের শাসনের আশাও আঁকড়ে থাকা সম্ভব নয়। যদি তাই হয়, চোরাগোপ্তা চাতূর্য আর ভয়াবহ রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে তারা যে প্রাধান্য অর্জন করেছে তারা দাবি করে তাতে ঈশ্বরের আশীর্বাদ রয়েছে। কিন্তু আসলে সেটা যদি ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়ে থাকে? তাই যদি হয়, তাহলে যেই তরবারি এতদিন তারা অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, সেটা আজ নির্মমভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।

আমেরিকার নিগ্রো দেশটির এক অনন্য সৃষ্টি। তার কোন পূর্বসূরী নেই, তার সাথে তুলনীয় এমন কিছু আর কোথাও নেই।

এটাতো সত্যি কথা যে প্রতিটি আমেরিকান নিগ্রোর নাম মূলত সে যেই সাদা লোকের সম্পত্তি ছিল, তার নাম। আমার নাম বল্ডউইন, কারণ বল্ডউইন নামে এক সাদা খ্রীষ্টানের কাছে হয় আমার আফ্রিকান গোষ্ঠী আমাকে বিক্রি করেছিল, নতুবা আমাকে অপহরণ করার পর সে আমায় পেয়েছে। সে আমাকে ক্রুশের কাছে কুর্নিশ করতে বাধ্য করেছিল। আমি দৃশ্যত ও আইনত একটা সাদা প্রোটেস্টান্ট ধর্মাবলম্বী দেশে ক্রীতদাসের বংশধর। এই হলো আমেরিকান নিগ্রো হবার তাৎপর্য – এই হলো তার পরিচয়। একজন অপহৃত বিধর্মী, যাকে পশুর মত বিক্রি করা হয়, তার সাথে পশুর মতো আচরণ করা হয়, যাকে আমেরিকার সংবিধানে এক সময় ‘তিন-পঞ্চমাংশ’ মানুষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, এবং সুপ্রীম কোর্টের ড্রেড স্কট মামলার রায় অনুযায়ী যার এমন কোন নাগরিক অধিকার ছিলনা যেটা সম্মান করতে কোন সাদা মানুষ বাধ্য।

এখন কথা হচ্ছে, আমেরিকার রাজনৈতিক আর সামাজিক কাঠামোর খোল নলচে পালটে তাকে ঢেলে সাজানো ছাড়া নিগ্রোর পরিস্থিতিতে সত্যিকার পরিবর্তন আনার কোনরকম সম্ভাবনা নেই। আবার এটাও পরিষ্কার যে সাদা আমেরিকানদের শুধু যে এসব পরিবর্তন আনার কোন ইচ্ছা নেই তাই নয়, মোটের ওপর তারা এই বিষয়ে এমন মানসিক জড়তায় আচ্ছন্ন যে তারা এই পরিবর্তন কল্পনা করতেও অক্ষম। এখানে উল্লেক্ষ্য যে সাদা আমেরিকানদের সদিচ্ছার প্রতি নিগ্রোর নিজেরও আর কোন আস্থা নাই। অবশ্য কস্মিনকালেও ছিল কি?

কাউকে মুক্ত করে দিলেই তাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব। নিগ্রোর ব্যাপারে এই কথাতা খাটে। আমেরিকার প্রজাতন্ত্র এই কাজটি করবার মতো যথেষ্ট মানসিক প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারেনি। সাদা আমেরিকানরা নিগ্রোদের উন্নয়নে যে সব কাজ করে সন্তুষ্টি লাভ করে, তাকে আজকাল লোকদেখানো চাল বলে খারিজ করা হয়। পাকাপোক্ত উদাহরণ হিসেবে ১৯৫৪ সালের সুপ্রীম কোর্টের রায়ের কথা বলা যায়। এই রায়ে স্কুলশিক্ষায় বর্ণবাদী বিভাজন নিষিদ্ধ করা হয়, এবং সেইজন্য আমেরিকানরা গর্ব অনুভব করে। সাদা আমেরিকানরা ভাবে এই রায় আন্তরিক মতবদলের প্রমাণ, যদিও তার বিপক্ষে বিশাল প্রমাণ রয়েছে।

সাদা লোকের শুধু একটা জিনিসই আছে যেটা কালো মানুষের প্রয়োজন, বা তাদের চাওয়া উচিত – সেটা হলো ক্ষমতা। কেউ চিরদিনের জন্য ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনা।

আবারো বলছি: সাদা মানুষের নিজের মুক্তির জন্য যে মূল্য দিতে হবে সেটা হলো কালো মানুষের মুক্তি – সম্পূর্ণ মুক্তি। সেই মুক্তি আসতে হবে শহরে, শহরতলীতে, আইনের দৃষ্টিতে, চেতনায়।

সংক্ষেপে বলা যায়, আমরা সবাই মিলিতভাবে একটি জাতি গড়তে চাইলে, আমরা, কালো আর সাদা মানুষ – আমাদের পরস্পরকে গভীরভাবে প্রয়োজন। অর্থাৎ যদি আমরা সত্যি পুরুষ আর নারী হিসেবে আমাদের পরিচয়, মানসিক পরিণতি অর্জন করতে চাই। তবে একটি মিলিত জাতিসত্ত্বা সৃষ্টি অবিশ্বাস্যরকমের কঠিন কাজ।

এই যে নিগ্রোর অতীত – দড়ি, আগুন, অত্যাচার, পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা, শিশুহত্যা, ধর্ষণ, মৃত্যূ, লাঞ্ছনা, অহোরাত্রি ত্রাস - সে এমন ত্রাস যা মজ্জার গভীর পর্যন্ত চলে যায়; তার নিজ জীবনের মূল্য সম্বন্ধে সংশয় হয়, কারণ চারপাশে সবাই সেটার মূল্য অস্বীকার করে; তার নারী, স্বজন, সন্তান, যাদের তার রক্ষা করা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু যাদের সে রক্ষা করতে পারেনি - তাদের জন্য বেদনা; ক্রোধ ঘৃণায় মাথায় খুন চেপে যায়, সাদা মানুষের প্রতি এমন গভীর ঘৃণা জন্মায় যে সেই ঘৃণা উলটে তার ও তার নিজের মানুষের ওপর এসে পড়ে, যার ফলে সবরকমের ভালোবাসা, বিশ্বাস, আনন্দ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই অতীত, যেখানে একটা মানবিক পরিচয়, মানবিক কর্তৃত্ব অর্জন, তার বিকাশ, সেটাকে নিশ্চিত করার এক সীমাহীন সংগ্রাম। এই অতীত – যার ভয়াবহতা সত্ত্বেও এতে কী যেন একটা সৌন্দর্য আছে। তবে দুঃখ কষ্ট সম্বন্ধে আমি কোন মোহকে প্রশ্রয় দিতে চাইনা।

যেই মানুষকে মানব নৃশংসতার লেলিহান আগুনের শিখার ভেতর থেকে তার ব্যক্তিত্ব, তার পরিচয়কে দিনের পর দিন ছিনিয়ে বের করে আনতে হয়, সে এই যাত্রায় রক্ষা পাক বা না পাক, সে নিজের সম্বন্ধে, মানবজীবন সম্বন্ধে এমন কিছু আবিষ্কার করে যেটা পৃথিবীর কোন ইস্কুল, কোন গীর্জা শেখাতে পারে না। সে নিজের ওপর কর্তৃত্ব অর্জন করেছে, যেটা আর কিছুতেই আলগা হবে না।

এই মানুষগুলো নিয়ে আমার অনেক গর্ব। সেটা তাদের গাত্রবর্ণের জন্য নয়, তাদের বুদ্ধিমত্তা, তাদের চারিত্রিক বলিষ্ঠতার জন্য, তাদের সত্ত্বার সৌন্দর্যের জন্য। জাতিরও তাদের নিয়ে গর্ব করা উচিত, কিন্তু হায়, খুব বেশি মানুষ তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধেও জানে না। এই অজ্ঞতার কারণ হচ্ছে মার্কিন জীবনে এসব মানুষের যে ভূমিকা ছিল – এবং আছে – তাতে আমেরিকা সম্বন্ধে আমেরিকানরা যা জানবে, সেকথা তারা শুনতে চায় না।

সাদা আমেরিকানরা নিজেদের সম্বন্ধে নানারকম কল্পকথা আঁকড়ে থাকে – তারা বিশ্বাস করে যে তাদের পূর্বপুরুষেরা সব মুক্তিকামী বীর, তাদের জন্ম পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ দেশে, আমেরিকানরা যুদ্ধে অদম্য, শান্তির সময় বিজ্ঞ, আমেরিকানরা মেক্সিকান, বা আদিবাসী বা অধস্তন মানুষ বা আর সব পড়শিদের সাথে সব সময় ন্যায্য আচরণ করেছে, আমেরিকান পুরুষ পৃথিবীর সবচাইতে সহজ-সরল আর পৌরুষদীপ্ত, আমেরিকান মেয়েরা সবচাইতে নির্মল। আমেরিকান নিগ্রোদের মস্ত সুবিধা হলো তারা কখনই এসব গালগল্পে বিশ্বাস করেনি।

সাদা মানুষের মাঝে আমি এমন একটা গোয়ার্তুমি আর অজ্ঞতা দেখি তাতে প্রতিহি্ংসা অবশ্যম্ভাবী মনে হয়। এই প্রতিহিংসা কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের ওপর নির্ভর করে না, তাদের দ্বারা সংগঠিতও নয়। কোন পুলিশ বাহিনি বা সেনাবাহিনীর সাধ্য নাই একে ঠেকাবার। এটা হলো ইতিহাসের প্রতিহিংসা – এর উৎস সেই ধ্রুব সত্য যেটা স্বীকার করে আমরা বলি: ‘যা ওপরে যায়, তা ঠিক আবার নীচে নেমে আসে।’

আজ আমরা সেই যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

যদি আমরা – আমি তুলনামূলকভাবে সচেতন সাদা আর কালোদের কথা বলছি, যাদের প্রেমিকের মতো একের অন্যের মধ্যে পূর্ণ সচেতনতা সঞ্চারিত করতে হবে – তারা যদি নিজ দায়িত্বপালনে পিছপা না হই, তাহলে সংখ্যায় অঙ্গুলিমেয় হলেও আমরা হয়তো এই বর্ণবাদী দুঃস্বপ্নের পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারব, আমাদের জাতিকে দাড় করাতে পারব, পৃথিবীর ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারব। আর আমরা যদি আজ জান বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে না পড়ি, তাহলে বাইবেল থেকে আহরিত এক ক্রীতদাসের গানের যেই ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, সেটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হবে। সেই গানের চরণের মূল কথা, মানব জাতি যখন প্রথমবার ভুল করেছিল তখন ঈশ্বর মহাপ্লাবন দিয়ে শাস্তি দিয়েছিল আর নূহ নবীকে নির্দেশ দিয়েছিল বিশাল এক জাহাজ বানিয়ে তাতে আশ্রয় নিতে। এবার আর পানি আসবে না। সেই চরণের কথা: ‘নূহ নবীকে ঈশ্বর রঙধনুর সঙ্কেত দিয়েছিলেন/ পরের বার আর পানি নয়, আগুন ঝরবে!’

বিশ্বমহামারির বিস্ময়: নারীর শাসন (সেরা) - আশফাক স্বপন


ফেসবুকের মেয়ে বন্ধুরা, এই লেখাটি তোমাদের উদ্দেশ্যেও উৎসর্গ করা হয়েছে! দেখা যাচ্ছে, করোনা মহামারি মোকাবেলায় যেসব দেশ এগিয়ে, তার অনেকগুলোর নেতৃত্বে নারী। তাহলে কি নারীর নেতৃত্ব শ্রেয়? এই প্রসঙ্গে আমার অভিমত। The Daily Star-এ প্রকাশিত ইংরেজী প্রবন্ধে লিঙ্ক নীচে। পাঠকদের সুবিধার্থে বাংলা অনুবাদ নীচে নিবেদন করলাম।

বিশ্বমহামারির বিস্ময়: নারীর শাসন (সেরা)
নারীর উপযুক্ত মর্যাদাদানে সকলের কল্যাণ

আশফাক স্বপন

ডেইলি স্টার। ৩০ মে, ২০২০

আমাদের জীবদ্দশায় এত বড় স্বাস্থ্য সঙ্কট আমরা দেখিনি। সারা পৃথিবীর আজ টালমাটাল অবস্থা। তার মধ্যে এই করোনা মহামারির মোকাবেলায় অঙ্গুলিমেয় কিছু দেশ বেশ সফল হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে: ‘ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি অথবা স্পেনের চাইতে আঙ্গেলা মার্কেলের নেতৃত্বে জার্মানিতে মৃত্যুর হার অনেক কম। ফিনল্যান্ডে প্রতিটি দলের নেতৃত্বে মহিলা, এমন চারটি দলের জোট সরকারে চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিন। মাত্র ৩৪ বছর বয়স তার। পাশের দেশ সুইডেনের তুলনায় তার দেশে করোনায় মৃত্যুর হার শতকরা ১০ ভাগেরও কম। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট ৎসাই ইং-ওয়েন-এর নেতৃত্বে করোনা সংক্রমণের পরীক্ষা, তার গতিবিধি অনুসরণ করে সংক্রমিত ব্যক্তিদের আলাদা করা – এই নিয়ে দেশটির ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ অভিযান। দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন না করে এটি সারা পৃথিবীতে সফলতম ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ অভিযানের একটি।’

নিউ জিল্যান্ডের দুর্দান্ত প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্টা আর্ডার্নের কথা ভুললে চলবে না।

লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশ: ‘মাত্র ৩৯ বছর বয়স্কা নিউ জিল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী আর্ডার্ন পুরো লকডাউনের সময়টা যেন সমগ্র দেশবাসীর হাতে হাত ধরে গভীর সহানুভূতির সাথে ‘বাড়িতে থাকুন, জীবন বাঁচান’ ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন, প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনে নির্বিবাদী ভঙ্গিতে মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।’

‘নিউ জিল্যান্ডের মানুষ যেন পড়শিদের দেখভাল করে, দুর্বলকে রক্ষা করে, আর বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভেবে যেন হাসিমুখে ব্যক্তিগত ত্যাগে সম্মত হয়, এই বিষয়গুলোর ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। এতে তার ভক্তের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।’

সেই সাথে এতে হাতেনাতে অবিশ্বাস্য ফল পাওয়া গেছে। নিউ জিল্যান্ডের ৪৮ লক্ষ মানুষের মধ্যে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা শুনলে চমকে উঠতে হয়। মাত্র ২২ জন। নতুন সংক্রমণের সংখ্যা এখন শূন্যের কোঠায়।

একটা জিনিস লক্ষ করছেন? ওপরের সবকটা নেত্রীই নারী।

এবার করোনা প্রতিরোধে কোন দেশগুলোর অবস্থা সবচাইতে খারাপ, তার দিকে নজর দেওয়া যাক। যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসেব অনুযায়ী ২৭ মার্চ যে দেশগুলোতে সবচাইতে বেশি করোনা সংক্রমণ ঘটেছে, তার মধ্যে শীর্ষে যথাক্রম যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল আর রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা শুনে আঁতকে উঠতে হয়। ১৬.৭ লক্ষ। নিকটতম দেশ ব্রাজিলের চার গুণ। ব্রাজিলে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ৪ লক্ষ ছুঁই ছুঁই। রাশিয়াও খুব পিছিয়ে নেই।

এই দেশগুলোর নেতৃত্বে কারা? যথাক্রমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রেসিডেন্ট জায়ির বোলসোনারো আর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের মধ্যে এমন উগ্র, উদ্ধত পৌরুষের নজির খুঁজে পাওয়া ভার।

ট্রাম্প জনসমক্ষে করোনা চিকিৎসায় বিষাক্ত জীবাণুনাশক সেবনের পরামর্শ দিয়েছেন। (পরে বলেন, সবটাই নাকি ব্যঙ্গ!) করোনার জন্য যে ওষুধ বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে বাতিল করে দিয়েছেন বোলসোনারো সেই হাইড্রোক্লোরোকিউন খাচ্ছেন বলে জানান। যাদের তাতে আপত্তি, তাদের প্রতি তাচ্ছিল্যভরে বলেছেন – তাদের ইচ্ছা হলে তারা সোডাভর্তি কোমল পানীয় পান করতে পারে।

এককালের হলিউড তারকা জা জা গাবর একবার রসিকতা করে বলেছেন: ‘উদ্ধত পৌরুষের লম্ফঝম্পই সার, ভেতরে ঠনঠন।’

এই করোনা মহামারির মোকাবেলায় বহু নেত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

দ্য এ্যাটলান্টিক সাময়িকীতে হেলেন লুইস লিখেছেন: ‘আইসল্যান্ডের কাটরিন জ্যাকব্‌স্‌ডটির বিনামূল্যে সারা দেশের নাগরিকদের করোনা পরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছেন। নরওয়ের এর্না সোলবার্গ শুধু শিশুদের জন্য একটা সংবাদ সম্মেলন ডেকে বাচ্চাদের বলেন, শোন, তোমরা যদি ভয় পাও তাতে একদম ঘাবড়াবে না। এটা মোটেও অন্যায় কিছু নয়।’

তবে একে শ্রেফ উদ্ধত পৌরুষ বনাম মমতাময়ী নারীর দ্বন্দ্ব ভাবলে সেটা কিন্তু অতিসরলীকরণ হয়ে যাবে। রাজনৈতিক সামাজিক বাস্তবতা আরো জটিল, অতো সোজা-সাপ্টা নয়। যেমন মন-মানসিকতায় নিউ জিল্যান্ডের আর্ডার্নের অনেক মিল কানাডার পুরুষ নেতা জাস্টিন ট্রডোর সাথে। যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সমর্থক মহিলা গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারের রিপাবলিকান মহিলা গভর্নর – যেমন আলাবামার কে আইভি বা সাউথ ডাকোটার ক্রিস্টি নোম – এদের চাইতে বরং ডেমোক্র্যাট সমর্থক পুরুষ গভর্নর – যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার গ্যাভিন নিউসোম বা নিউ ইয়র্কের এ্যান্ড্রু কুওমো – এদের সাথে মিল অনেক বেশি। আর চীনের কড়া একনায়ক শাসক শি জিনপি পুরুষ হলে কী হবে –করোনা মহামারি মোকাবেলায় গোড়ার দিকে ভয়ঙ্কর হোঁচট খেলেও পরে যেভাবে ঐ বিশাল দেশটাকে করোনার শনির গ্রাস থেকে বের করে এনেছেন তাতে সারা বিশ্ব তাজ্জব বনে গেছে।

আমাদের নারী নেত্রী আর পুরুষ নেতার বাছবিচার অতিক্রম করে আরো গভীরে গিয়ে সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটা উপলব্ধি করতে হবে। নেত্রীরা যে সব সময় নেতাদের চাইতে শ্রেয়, আসল কথা সেটা নয়।। আসল কথা হলো যেই জাতি নারী নেতৃত্বকে সাদরে গ্রহণ করে সেই জাতিটা শ্রেয়।

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ক্যাথলিন গার্সন দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকাকে এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘যে রাজনৈতিক আবহে সরকারে আস্থা ও সমর্থন তুলনামুলকভাবে বেশি, যেখানে নারী পুরুষে তেমন ভেদাভেদ নেই,’ সেখানে নারী নেত্রীদের নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা বেশি। ঐ আবহের ফলেই ‘আপনি একধাপ এগিয়ে গেলেন।’

দ্য আটলান্টিক সাময়িকীতে হেলেন লুইস লেখেন: ‘যে দেশ একনায়ক নির্বাচিত করে – অথবা ভুয়ো নির্বাচনের পর একনায়ক ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে – সেই দেশের এমনিতেই অবস্থা সুবিধার নয়।’

লুইস আরো লেখেন: ‘সুতরাং ঐ বস্তাপচা লিঙ্গবাদী বুলি উলটে দিয়ে কিছু লাভ নেই। শত শত বছর ধরে এই মন্ত্র আউড়ানো হয়েছে যে পুরুষমানুষের প্রকৃতি তাকে নেতৃত্বের জন্য আরো উত্তমভাবে প্রস্তুত করেছে। আজ হঠাৎ করে তার উল্টোটা সত্যি হয়ে যায়নি। নারী নেতৃত্বের কারণে সুশাসন আসেনি। বরঞ্চ সুশাসনের গুণে নারী নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছে।’

বৃহত্তর পরিসরে সমাজের ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। সমাজে নারীর কদর কতখানি, সেটা দিয়ে সেই সমাজ কতখানি আলোকিত তার পরিচয় পাওয়া যায়।

সবচাইতে যেটা অবাক কাণ্ড তা হলো আজও আমাদের এতটা পথ বাকি। কিছু দেশ নিজেদের খুব উন্নত মনে করে, কিন্তু তাদের অনেক দূর পথ বাকি। যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্টের অপেক্ষা করছে। দেশের সেনেট-এ প্রতি চারজনে মাত্র একজন মহিলা সেনেটর। অর্থনৈতিক আয়তনের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কুড়িটি দেশের সংগঠন জি-২০। সেখানে সবেধন নীলমণি আঙ্গেলা মার্কেল একমাত্র মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান।

দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্তা আরো খারাপ। ধর্মীয় গোঁড়ামির ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন যে পিতৃতান্ত্রিকতা আর নারীবিদ্বেষ লালিত হয়েছে, তার ভারি বোঝা আজও আমাদের টানতে হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে এই ব্যাপারে ধর্মভেদে বিশেষ তারতম্য নাই – সব ধর্মেই গোঁড়ামি মানেই যে করে হোক নারীকে শৃঙ্খলিত রাখার চেষ্টা। আমাদের অঞ্চলের নারী রাষ্ট্রপ্রধান নিয়ে আমাদের আত্মপ্রসাদ অর্থহীন, কারণ এর ষোল আনাই ফাঁকি। (অধিকাংশ নারী রাষ্ট্রনায়কদের রাজনৈতিক সাফল্য পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত – সে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী হোক, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়াই হোক, পাকিস্তানের বেনজীর ভুট্টোই হোক, আর শ্রীলঙ্কার সিরিমা বন্দরনায়েকেই হোক।)

নারী-পুরুষের সমতার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অগ্রগতি অনেক সময় পড়শি দেশগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে – সেটা খুব আশার কথা। তবে আমাদের কিছুতেই ভুলে গেলে চলবে না যে আমাদের এখনও অনেক, অনেক কাজ বাকি।

আমাদের কবে যে বোধোদয় হবে! আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে জাতির অর্ধেকের মধ্যে যে সুপ্ত সম্ভাবনা, তাকে পূর্ণভাবে বিকশিত হবার উদার, অবারিত সুযোগদান করলে তাতে লাভ আমাদের সকলের – বস্তুগতভাবে, নীতিগতভাবেও।

নারীর সম্পূর্ণ মুক্তি আসতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু একদিন না একদিন সেই মুক্তি আসবেই। নারীপুরুষ নির্বিশেষে সেই দিনটি সবার জন্য এক নতুন স্বর্ণালী অধ্যায়ের সূচনা করবে।

(অজস্র ভালোবাসা, আনন্দ আর ভরসা দিয়ে যেসব নারী আমার জীবনকে আলোকিত করেছেন, এই ছোট্ট প্রবন্ধটি তাদের সবাইকে উৎসর্গ করলাম। এঁদের মধ্যে আছেন: ঢাকায় আমার আদরের ছোট দুই বোন আলপনা আর কল্পনা – রূপে, গুণে সাফল্যে তারা তাদের বাউণ্ডুলে ভাইয়াকে বহু আগে অতিক্রম করেছে, তবে ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা তাদের একবিন্দু কমেনি; আমার প্রয়াত মা, যার ঊষ্ণ হৃদয় ছিল অফুরন্ত স্নেহের উৎস; আমাদের বৃহত্তর পরিবারের অবিসংবাদিত অভিভাবক আমার বড়ো খালা – যার রক্তচক্ষু আর কড়া শাসনের আড়ালে লুকানো ছিল মমতার গাঢ় প্রস্রবণ; মেলবোর্ণে আমার অতি আদরের খালাত বোন আপুমণি, যিনি এখনো আমার আরেকটি স্নেহময়ী মায়ের মতো, শুধু তফাত এই যে তার থেকে সারাজীবন ভালোবাসাই পেয়েছি, কোনদিন বকুনি খেলাম না; হিউস্টন আর নিউজার্সির ভুরহিস শহরে আমার দুই বন্ধুপত্নী, আমার প্রতি যাদের গভীর মমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে অপূর্ব সব রান্নায়। এছাড়া আরো অনেকে আছে, স্থানাভাবে যাদের নাম উল্লেখ সম্ভব নয়।

তোমাদের কাছে আমি হাতে কলমে মেয়েদের ভালোবাসতে শিখেছি, শ্রদ্ধা করতে শিখেছি, সমীহ করতে শিখেছি। তোমাদের কাছে আমি নারীর সমতা ও সম্মানের অবিচ্ছেদ্দ্য অধিকারকে অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন করতে শিখেছি। তোমাদের জন্য আজ আমি একজন আলোকিত পুরুষ হতে শিখেছি।)

ভূমিপুত্র - পারভীন সুলতানা [ছোটগল্প]

ভূমিপুত্র
পারভীন সুলতানা।


আজ অমাবশ্যা। সমস্ত আলো শিকার করে নিয়ে গেছে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ।রাত এখানে র্নিজন,অচঞ্চল। স্থলচর আমরা কয়জন এখন জলের কাছাকাছি। গাঙচরা বিলে জয়নাল ভাই,উসমান আর আবেদ আলীর সাথে মাছ মারা কিস্তি নাওয়ের গলুইয়ে বসে ওদের নিরলস র্কমকাণ্ড দেখি । এরা মাছ ধরার সময় কথা কয় না। যেন ধ্যান রত মুনি-ঋষি! বর্ষার শুরু কেবল। আজ সারাদিন মনের সুখে বৃষ্টি হয়েছে। আবেদ আলীর ভাষ্য, তাজা পানির গন্ধে মাছের নিশা দরে! নয়া পানিতে ঝাঁক ঝাঁক নবজাতক নিয়ে ভ্রমণরত শোল জননীর উপর জয়নাল ভাইয়ের র্নিদয় কোঁচের নিশানা ফসকায় না। বৈঠাতে উসমান। বড় জ্যাঠার ছেলে।আবেদ আলীর কাজ কেবল র্টচ মারা। ও আমাদের বছুরে কামলা হলেও সর্ম্পকটা প্রায় ইয়ার দোস্তের মতো। অপ্রাসঙ্গিক আলোয় উসমানের ঘাড় শিকারি বকের মতো একটুখানি বাঁকতে দেখি কেবল। বিলম্বিত র্বষায় পানি এখনও কোমর সমান হয়নি। নৌকার তলে আউসের চারা । মাঝে মঝে অস্পস্ট ক্রিচ্স্স্ শব্দ হয় কী হয় না! শোল বড় তেজিলা মাছ! কোঁচ থেকে তুলে এর বন্দোবস্তু করতে এরা বিরতি নেয়। র্টচ টিপতে টিপতে আবেদ আলীর পেট ফোলা র্তজনি চেপ্টে গেছে। অনেক্ষণ পর শুক্লপক্ষ স্ব মেজাজে ফিরে যায়। অন্ধকারে উসমান পকেট থেকে বেনসন বের করে। বয়সে আমার চেয়ে মাস ছয়েকের বড়। যদিও এইসব ছোট-বড় আমরা মানি না। উপহার হিসেবে ওকে আমিই দিয়েছি। লাইটারে আগুনের যোগান দিতে না দিতেই নিবিড় অন্ধাকার নেমে আসে। আঁঠালো এ অন্ধকারকে আরো মজবুত করে তোলে বিদ্যুতের অনুপস্থিতি। পল্লী বিদ্যুৎ থাকলেও প্রায়ই অদৃশ্য এখানে! কাছেই বিলের পাশ ঘেষা পাকা রাস্তা। এবার বর্ষা সিডিউল ট্রেন মিস করেছে। লাস্ট ট্রিপের লোকাল ধরে আসছে বোধ হয়! আষাঢ়ের আজ সাত। হাওড়ের পানি এখনও কোমর ছাড়ায়নি! কালো বোরখা পরা নিপাট অন্ধকার ফুটো করে দেয় বিলের পাশের পাকা রাস্তায় দৌড়ে আসা একটা ট্রাক। হেড লাইটের উজ্জ্বল আলো মসৃণ আঁধার ফালা ফালা করে তুললে আমাদের পলাতক ছায়ারা কিছুক্ষণের জন্য ফিরে আসে। কায়ার ঘেরটোপে বন্দি আমরা আবার ভুস করে জেগে উঠি। তবে বেশিক্ষণ সঙ্গ দেয় না পিছলে যাওয়া ভৌতিক আলো। বাহনটি অদৃশ্য হতেই রাত তার আগের অবয়বে ফেরে। বৈচিত্রহীন অন্ধকার কিন্তু রাতপাখির নিঃসঙ্গ রোদন, পোকার ডাক,বিলে ঘাই দেয়া মাছের সংলাপ, গাছ-গাছালিতে জড়ানো-মড়ানো লতা-পাতার বনজ গন্ধের ওপর খবরদারি করতে পারে না। নাওএর তলানির সাথে ঘষা খাওয়া পানির টলল্ টলল্ শ্রুতিমধুর গান শুনতে শুনতে মন বেভুলা হয় দুর অতীতে।কিছু আব্বার মুখে শোনা, কিছু আমার শৈশবে দেখা।

জলো বিল,নিরলস বয়ে চলা কংসঘেষা নদীর গলাগলি ধরা আমার বাপ-দাদার গ্রাম চিরাং। দাদা জাহাবক্স তালুকদারের বেশুমার জোত-জমি।বিশাল সয়-সম্পত্তির মালিক হলেও দাদা কী তার ছেলেরা ঠেঙের উপর ঠেঙ তুলে বসে থাকতো না। ধুম কাজের দিনে বাড়ির কায়-কামলার সাথে তারাও খাটতো সমান তালে । রোয়া লাগানো,জমিতে লাঙল দেয়া এসব কায়িক শ্রমে আলসেমি ছিলো না কোন । আব্বাদের ছয় ভাই-তিন বোনের মধ্যে একজনেরই মন ছিলো উচাটন! আব্বার সব চেয়ে ছোট ভাই চানফর আলী গাথক,নিজেই গান বানায়,নিজেই গায়। গানের দলের সাথে কই কই ঘুরে বেড়ায়! সুনাম গঞ্জ, নিকলি,মিঠামইন,খালিয়াজুড়ি! বাড়ি ফিরলে হাটবার ছাড়া সেও হাওরে চাষের জমিনে পড়ে থাকে। মনফর জ্যাঠার ঝোঁক ব্যবসায় । বাজারে জ্যাঠার থান কাপড়ের বড় দোকান। বাড়ির লাগোয়া বিছানে আবার আনাজপাতির চাষ করতো। এটা ছিলো তার হাউশ! । এদের সবার প্রাণ ভোমরা যেন মাটির অতলে গোঁজা! এতো বড় বাড়ির মধ্যে খালি আব্বারই লেখা-পড়ার শখ জাগে। হ্যাঁ, এ বাড়ির রেসালামতে এইটারে শখই বলা লাগে! ধান-ফান, সরিষা-তিসি,আলু- মরিচের আবাদ করার ইচ্ছা পিছলে কেমনে কেমনে যে আমার আব্বার ইস্কুলে যাওয়ার মন লাগে! সেটা বোধ হয় দাদার বাড়িতে লজিং থাকা প্রাইমারি স্কুলের ইসমাইল স্যারের সুবাদে। লজিং মাস্টারের বাড়ি ২০/৩০ মাইল উজানে। সেদিনের হিসাবে এই পথের দূরত্ব অনেক বেশী বৈকি! নাই রাস্তা-ঘাট,নাই যান-বাহন। বর্ষাকালে নাও-নৌকাই ভরসা। লজিং মাস্টার নিয়া আমার কিচ্ছা না,কিচ্ছা আব্বারে নিয়া। চৌদ্দগুষ্টির মধ্যে পড়ালেখা না থাকলে কী! আব্বা স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তেলেসমাতি দেখানো শুরু করে। শুধু ক্লাসে প্রথম হয়ে না ; মেট্রিক পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে স্টেন্ড করে (পঞ্চম) তালুকদার বাড়ির মধ্যে একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটায়। আব্বা আরো লেখা-পড়া করার জন্য টাউনে পাড়ি জমায়। বাপের টাকা-পয়সার অভাব নাই আর পুত্রের র্ধৈয্যের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্নাস ,এমএ শেষ করে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। অনার্স পড়ার সময়ই আব্বার শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। গাঁয়ের আলো-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা আম্মাও গ্রাম ভালোবাসেন। আব্বা সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। বদলির চাকরি। আগের মতো হুটহাট বাড়ি যাওয়া কমে যায়। তবে বার্ষিক পরীক্ষার পর স্কুলের র্দীঘ ছুটিতে গ্রামে যাওয়া ছিলো আমাদের জন্য উৎসব।

সড়ক উঁচা করে এর মধ্যে রাস্তাঘাট হয়েছে।তবু ভাটির দেশ বলে কথা! বাড়ি অবধি গাড়ি যায় না। চৈতার হাওরের কাছে নেমে বাড়ি যাবার বাকিটা পথ হাঁটতে হয়। পথে ফসলি মাঠেই দেখা হয়ে যায় জ্যাঠা,কাকাদের সাথে। ওদের পরিশ্রমী পিঠের নানামাত্রিক ঘামের রেখা আমার শিশু হৃদয়ে গভীর হয়ে দেবে থাকে।সে সব তরল জলকণা আমার বুকে সযতনে লিখে দেয় ‘ভূমিপুত্র’ শব্দটা। বাড়ির দিনগুলো খড়ের গাদায় লুটোপুটি করে,ছিপ দিয়ে মাছ ধরে, গাছের ফল-পাকুর খেয়ে ব্যাখ্যাতিত আনন্দে ফুরুৎ করে শেষ হয়ে যেতো! দিন তো পায়ে পায়ে হাঁটে না, দৌড়ায়! বড় হওয়ার পর গ্রাম প্রীতি ক্রমশ ফিকে হয়ে আসতে থাকে। নগরের চটকদার জীবন গ্রামের সবুজ আকর্ষণ কেড়ে নেয়ায় ঘোর তৎপর হয়ে ওঠে। আম্মাও শহরে গোছানো সংসারের ছককাটা ফ্রেমে ঢুকে পড়ে। ঢাকা এক রকম আমাদের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে ওঠে। ইস্ত্রি করা মসৃন আভিজাত্য ধান ক্ষেতের ইঁদুরের মতো ঢুকে পড়ে আমাদের গিরস্ত ঘরে। কেবল আমার বোধের কোথায় যেন মাটির নেশা রয়ে যায়! টবের অনুর্বর মৃত্তিকায় নানাজাতের গাছ লাগাই। অচেনা লাল মাটিতে অভিমানি গাছ বাড়ে না। বিরক্ত হয়ে হাল ছাড়ি।

ভাইজান উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকা উড়াল দেয়; বড় আপাও বিয়ের পর কানাডা পাড়ি জমায়। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আমি ময়মনসিংহ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে পিওর অ্যাগ্রিকালচারে ভর্তি হই। ব্রহ্মপুত্র নদ, বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে থাকা চারপাশের দৃশ্যমান গ্রামগুলো আমার ভেতরের ভূমিপুত্রকে খুঁচিয়ে তোলে। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে ক্যাম্পাসের জমিতে হাল-চাষ করতে করতে আমার পিঠেও র্পূবপুরুষের মতো শ্রমক্লান্ত ঘাম জমে। ওদের আদলে তর্জনির পেট দিয়ে কপালের ঘাম ঝরাই।ক্লান্তির সাথে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ বোধ করি। ফসলের জমি তৈরি,আবাদের সঠিক পদ্ধতি,পর্যাপ্ত ফসল ফলানোর থিউরি খুব নতুন লাগে না আমার কাছে।বেশি ফলনের জন্য সারি বেঁধে ধানের চারা লাগানো,পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের জন্য মাটিকে মিহি তুলতুলে করে তোলা, পানির যোগান দেয়া চাচা-জ্যাঠাদের কাছে দেখা এসব আমার শৈশবের পাঠ । এখন বাসে ময়মনসিংহ থেকে বাড়ি যাওয়া যেন এক দৌড়ের পথ!। যোগাযোগের নড়বড়ে সাঁকোটা মেরামতে তৎপর হই। সত্যি বলতে কী, দাদা-দাদি মারা যাবার পর আব্বাও গাঁয়ে যাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে...।উসমানের শিকারি চোখ ঘুরতে আসা এক বে-ভুলা কালা বাউসের পিঠ ক্কচাৎ শব্দে গেঁথে নিলে আমার স্মৃতি ভ্রমনে আবেদ আলীর উল্লাস ঢুকে পড়ে। বিড়ি টানার উছিলায় সবাই গাল-গল্পে মাতি। -তাইলে তুমি ঠিক করছো বিদেশ চইলাই যাইবা? আবেদ আলী সকাল থেকে এ নিয়ে ৬/৭ বারের মতো জিগেশ করেছে কথাটা।যতোবার আমি জানাই হ্যাঁ,চইলাই যাইতাছি ;ততোবার হতাশায় ওর লম্বা থুতনি আরো লম্বা হয়ে যায়। ফজরের আজানের আগে আগে বাড়ি ফিরি আমরা। ঘুমের ওজনে কেউ কারো দিকে তাকাতে পারি না।

এক আজানে ঘুমিয়ে আরেক আজানে ঘুম থেকে জেগে দেখি আলো ঝলমলে দুপুর। ক্ষিধায় পেট জ্বলছে। সকাল থেকে পেটে কোন দানা-পানি পড়েনি। জ্যাঠি ভাত বেড়ে আমাকে ডাকে- এলা খাইতো আয়া ফরো, বহুত মাছ ধরা অইছে! আমি হাত ধুতে ধুতে জানতে চাই জয়নাল,উসমান আর আবেদ আলী খেয়েছে কী না। -হেরা এক গড়ান ঘুমানি শেষ কইরা কুমবালা উঠ্যা রায়ের বাজারো গেছে গা! জ্যোঠির কথায় মনে পড়ে, আরে আজকে না হাটবার!

হাটবার আমার একটা পছন্দের দিন। আশ-পাশের পুরা এলাকার পরিস্কার একটা নকশা পাওয়া যায় হাটে গেলে। রায়ের বাজারের হাট অনেক বড় হাট! কত জিনিস বেচা-কেনা হয়! শুধু কী কেনা বেচা! গায়েন আর কবিয়ালরা আসে। আসে কিচ্ছা গাথকের দল। আরো কত রকমের পসরা বসে! মিঠাই এর দোকানই বসে নানা কিসিমের। গজা, তিলের খাজা, আঙ্গুর ভাজা, তিলুয়া। আর রসগোল্লা,কালোজাম, ছানার মিষ্টির কথা বাদই থাক। বিশাল মাছের আরত দেখার মতো। সেই মোহন গঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন থেকে জাউল্লারা মাছ নিয়ে আসে। ভাত খেতে খেতে খেয়াল করি জ্যাঠি আঁচলে চোখ মুছছে। আমি এ অশ্রুর কারণ জানি তাই আর জিগেশ করি না। বরং খেয়ে অন্যদিন যেখানে বসে আরো একটু গল্প করি; আজ হাত ধোয়া শেষ করে সোজা উঠে ছাদে চলে যাই। এও এক গপ্পো, আব্বা নিয়মিত না এলেও বাড়িতে পাকা তিনতলা বিল্ডিং তুলে রেখেছে। তাঁর উপ সচীব হওয়ার গরীমা এখানে এভাবে টাঙ্গিয়ে রেখেছেন তিনি। আগে আমাদের বাড়িটাকে ‘তালুকদার ’বাড়ি নামে চিনতো সবাই,এখন ডাকে তিনতলা বাড়ি। ইটের প্রাণহীন কাঠামো বংশের পরিচয় উপরে নেয়ার পায়তারা জুড়েছে। অনিয়মিত হলেও বেশ আগে থেকেই এখানে কারেন্ট চলে এসেছে। ফলে সবুজের বিস্তারে একখণ্ড নগরের অপ্রাসঙ্গিক জবরদস্তি! বাড়িটাকে দূর থেকে লক্ষ করলে গ্রামের সবুজের মাঝখানে কেমন বেমানান লাগে।

ছাদে দাঁড়িয়ে প্রিয় বেনসন ধরাই। সড়ক ধরে যাওয়া লোকজন দেখি। বেশির ভাগের গন্তব্য হাট। মাথায় আনাজ-তরকারি , হাতে ঝুলানো হাসটা,মুরগিটা। হাটে বেচবে। এ দৃশ্যও অচিরে লোপ পেয়ে যাবে। ভাটির রিমোট এলাকা হলে কী! দালাল আর ফড়িয়াদের লম্বা হাত এখান র্পযন্ত পৌঁছে গেছে। বাড়ি-বাড়ি ঘুরে এরা এলাকার সেরা জিনিসগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যায় শহরের পেটমোটা লোভিদের জন্য। যাদের বিন্দুমাত্র মায়া নাই ,ভালোবাসা নাই আপ্রাণ ভুলে যাওয়া গাঁয়ের মাটি ও মানুষের প্রতি। র্বষার আকাশে মেঘের খঞ্জনি বেজে ওঠে । মেঘের সাঁজোয়া বাহিনী দলবল নিয়ে নামার পায়তারা করছে। বিকেল মোহময় হয়ে উঠলে আমার যুবক হৃদয়ে আয়েশার স্মৃতি উজিয়ে ওঠে। কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দ্বিতীয় র্বষ থেকে মধুর আনন্দে প্রেমের গাঁটছড়া বাঁধি আমরা। কথা হয় পাশ করার পর গ্রামে থাকবো। স্বপ্নে নয়, বাস্তবের মৃত্তিকায়। ফাইনালের পর কথা না রেখে আয়েশা উড়াল দিলো জাপান। বুক টনটন করলেও এক রোখার মতো আমি রোজ তাকে ভুলে যেতে থাকি। কিন্তু প্রেম ভোলা সহজ কথা ! একটা মচমচে হুল্লুরে রাস্তায় তাকাই।সামনের সড়কে হৈহৈ করে ফিরছে হাটুরে দল। এদের কয়েকজনের হাতে মানুষ সমান বিশাল এক বোয়াল। মাছটা দেখার মতো বটে। ওদের দলে ভিড়ে যায় কৌতূহলী আমুদে লোকজন। দূরে দেখা যায় চানফর চাচার গাথক দলটাকে। ওরা হাটবার এলে বিনে পয়সায় গান ফেরি করে। ঠোঁটে বহন করে নিয়ে আসা সুরকে প্রান্তরে প্রান্তরে ছড়িয়ে অপার আনন্দে মাতে গায়েনরা ।
ও বন্ধুরে পরান বন্ধু আমার
তুমারো বিচ্ছেদে কান্দি
অন্তরে পাষানও বান্ধি
তেও পিরিতির কমেনা গো ধার...।
গানের বেভুলা কষ্টের বাণী আর মীরের মসৃণ মুন্সিয়ানা ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয় আমাকে। এক বেবুঝ মায়া আরো মাটি সংলগ্ন করে আমাকে! আব্বার খুব ইচ্ছা আমি অস্ট্রেলিয়া গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি র্অজন করি। যাবার আয়োজনও সম্পন্ন প্রায়। সবাই তাই জানে। শুধু আমি জানি যে, কোথাও যাচ্ছি না আমি। কোন দেশ এমন আপনতা দেবে আমাকে! চানফর চাচার গায়েন দলের মতো এমন মিঠাস গান কোন দেশের গাথকরা শোনাবে এমন চেনা দরদি গলায়! কোথায় হাটুরেদের দল স্রেফ একটা মাছ কিনে এমন আনন্দ আয়োজনে মাতে!

থানা কৃষি অফিসারের পোস্টে পরীক্ষা দিয়েছি। চাকরি হবে জানি। কোন দিন পরীক্ষায় দ্বিতীয় হইনি । আমিতো আব্বারই ছেলে! পরিকল্পনা করে কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হয়েছিলাম। শৈশবে দেখা মগ্ন কৃষকের সেই সব পাঠ সযতনে কে কখন আমার কলবের ভেতর সিলগালা মেরে দিলো নিজেও জানি না। গ্রামের সবুজ,ফসলি মাঠ যেন আমার ইবাদতের জায়নামায হয়ে ওঠে! ফসলের সূরা পড়ে বাতাস আমাকে ফুঁ দিলে যেন জিকির ওঠে আমার পরানে!

স্বপ্ন দেখি বাপের ঘর-ভিটায় সংসার পাতার। নয়া টিনের ঘর তুলবো। টিনের চালে আষাঢ়ের বৃষ্টি নামবে ঝম ঝম। বকুল আর কদমের ফুল ফুটবে বেশুমার। এ বাড়িটাকে সবাই আগের মতো ‘তালুকদার বাড়ি’ ডাকবে।বিশাল উঠানে ধান মাড়াইয়ের আয়োজনে কামলারা বেসুরে গলায় চানফর চাচার ফসলি গান গাওয়ার সময় আমার পুত্রও সে গানে গলা মিলাবে।
ও বন্ধু পরান বন্ধুরে আমার...।
উডান ভরা ধান যে বেশুমার
কই যে গেলা ঠিকানা নাই তুমার
তেও পিরিতির কমেনা যে ধার
বাবিজানে ঢেঁকিতে দেয় পার
ও বন্ধু পরান বন্ধুরে আমার।
জাহাবক্স তালুকদারের মাঠ মাঠ জমিন। সেখানে সবুজ ফসলের কাব্য বুনবে তার উত্তর ভূমিপুত্র। আব্বা পড়াশোনা শিখে নকল সাহেব বনে গেছে ; আমি সন্তান হিসেবে তার প্রায়শ্চিত্য করার জন্য অপার আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করি।

দ্য নিকেল বয়জ (গ্রন্থ আলোচনা) - নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুবাদ আশফাক স্বপন

গল্প হলেও বিস্মৃত এক ভয়াবহ সত্য
ফ্র্যাঙ্ক রিচ
নিউ ইয়র্ক টাইমস। ১৪ জুলাই, ২০১৯

In ‘The Nickel Boys,’ Colson Whitehead Depicts a Real-Life House of Horrors
By Frank Rich
The New York Times | July 14, 2019

আমেরিকার পুলিৎজার পুরস্কার এদেশে বিশাল ব্যাপার। কালো আমেরিকান লেখক কোলসন হোয়াইটহেড-এর ‘The Nickel Boys’ উপন্যাসটি ক’দিন আগেই এবছর কথাসাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করে। এই নিয়ে কথাসাহিত্যে দুই-দুইবার এই পুরষ্কার পেয়ে লেখক আমেরিকার সুধীমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
এদেশে কালো আমেরিকানদের ওপর অত্যাচারের ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমন ভয়াবহ। হোয়াইটহেডের উপন্যাস গল্প, কিন্তু তার ভিত্তি ভয়ঙ্কর বাস্তব একটি ঘটনা। গত বছর নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ উপন্যাসটির পুস্তক সমালোচনা বেরোয়।


THE NICKEL BOYS
By Colson Whitehead

মূল পুস্তক সমালোচনার লিঙ্ক

যে স্কুলের বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে উপন্যাসটি রচিত সে সম্বন্ধে National Public Radio-এর প্রতিবেদনের লিঙ্ক (ইংরেজি)

Tampa Bay Times পত্রিকায় উপন্যাসের ভিত্তি Dozier School নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের লিঙ্ক (ইংরেজি)

দশকের পর দশক ধরে এই হৃদয়বিদারক বাস্তবতা প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে উপস্থিত, অথচ সেটা কীভাবে যেন আমাদের সবার চেতনার আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছে। অবশেষে ২০১৪ সালে আচমকা একটা পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে কোলসন হোয়াইটহেড তাঁর ভয়ার্ত মর্মভেদী নতুন উপন্যাস The Nickel Boys (পাঁচ পয়সার পোলাপান)-এর অনুপ্রেরণা পেলেন। তার বইয়ের ঋণস্বীকারে যেমনটা তিনি বলেছেন, খবরটা তিনি The Tampa Bay Times সংবাদপত্র থেকে পেয়েছিলেন। খবরে প্রকাশ, দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্বের কিছু ছাত্রছাত্রী কিছু কালো স্কুলছাত্রের দেহাবশেষ খুঁড়ে উদ্ধার করে তাদের সনাক্ত করার চেষ্টা করছে। মৃত ছাত্ররা ম্যারিয়ানা শহরে রাজ্য সরকার-চালিত ডোজার আবাসিক বালক বিদ্যালয়ের ছাত্র । এই কিশোর ছাত্রদের ওপর অত্যাচার করে, ওদের ধর্ষণ করে, দেহ ক্ষতবিক্ষত করে, ইস্কুল চত্ত্বরে একটা গোপন গোরস্থানে পুঁতে রাখা হয়েছিল। ডোজার ইস্কুলের ১০০ বছরের বেশি দীর্ঘ ত্রাসের রাজত্ব সবেমাত্র ২০১১ সালে শেষ হয়েছে। হোয়াইটহেডের উপন্যাস যখন ছাপা হচ্ছে, তখনো নতুন নতুন কবর আবিষ্কৃত হচ্ছে। মার্চ মাসে খুঁড়ে পাওয়া নতুন প্রমাণের ফলে মনে হচ্ছে মৃতের সংখ্যা ৮০ ছুঁতে পারে। সঠিক সংখ্যাটা আমরা কোনদিন জানতে পারব না। ঠিক যেমন এই দেশের জন্মলগ্নের পর থেকে আরো কত ক্ষতবিক্ষত কালো দেহ আবর্জনার মত গুপ্ত কবরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে তারও সম্পূর্ণ হিসাব-নিকাশ কখনো করা হবে না।

The Nickel Boys উপন্যাসে এই ভয়ঙ্কর স্কুলঘরটির কাল্পনিক নাম দেওয়া হয়েছে Nickel Academy of Eleanor, Fla. এটি ফ্লোরিডার এলেনর শহরে। একটা বেনামী গোরস্থান এই স্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে এখন এক গৃহনির্মাণ কোম্পানি অফিসপাড়া নির্মাণ করছে। সেই কোম্পানি ভাবল, এ আবার কী উটকো ঝামেলা রে বাবা! একই প্রতিক্রিয়া সরকারপক্ষের উকিলের। তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন একাডেমির অপরাধ তদন্তের কাজ সমাপ্ত হয়ে গেছে। উপন্যাসের পূর্বকথায় নিস্পৃহ কণ্ঠে হোয়াইটহেড লেখেন, ‘শালার পুরো জায়গাটা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে, আবর্জনা পরিষ্কার করে ইতিহাস থেকে এর অস্তিত্ব মুছে ফেলা দরকার। কাজটা যে বহু আগেই করা উচিত ছিল, সে বিষয়ে সবাই একমত।’ এই তো আমেরিকার স্বভাব। দেশের ক্রীতদাসপ্রথার মূল পাপটা (সাধারণত) স্বীকার করে, তার সূচনার পর থেকে কালো আমেরিকানদের বিরুদ্ধে লাগাতার অপরাধ (মাঝে মাঝে) স্বীকার করৈ, ইতিহাসের ক্ষণে ক্ষণে আশার দিকচিহ্ন (শীর্ষ আদালতের রায়, নাগরিক অধিকারের আইন, ‘বর্ণবাদ-উত্তর’ প্রেসিডেন্ট) নিয়ে আত্মপ্রসাদ পাও, তারপর সামনে এগিয়া চলো, যতক্ষণ না আরেকটা রর্ণবাদী বিস্ফোরণ ঘটে। তখন আবার নতুন একটা ‘বর্ণবাদ নিয়ে মতবিনিময়’-এর ডাক দাও। হোয়াইটহেডের মতো একজন আফ্রিকান আমেরিকান লেখকও যদি ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত ডোজার স্কুলের কথা না শুনে থাকেন, ভেবে দেখুন এমন কতো ভয়ঙ্কর কাহিনি আজও প্রকাশের অপেক্ষায় লুকিয়ে রয়েছে। কখনো আক্ষরিক অর্থেই লুকানোর ব্যাপারটা ঘটে, হয়তো বা কোন এলাকার সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক বিত্তায়ন (gentrification)-এর নীচে অপ্রিয় সত্য চাপা পড়ে যায় (যেমন ১৯২১ সালের টালসা শহরে শত শত কালোদের হত্যাকাণ্ডের পর গণকবর দেওয়া)। কখনো অপ্রিয় সত্যকে অস্বীকারের প্রবণতার ফলে জাতীয় চেতনায় সেই মর্মান্তিক বাস্তবতা চাপা পড়ে যায়। নিকেল ‘তো শুধু একটিমাত্র স্থান,’ বইটি বেশ অনেকখানি পড়ার পর হোয়াইটহেড আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন। ‘কিন্তু যেখানে এমন একটি স্থান আছে, সেখানে শ’য়ে শ’য়ে এমন স্থান আছে। এগুলো সারা দেশে বেদনার কারখানার মতো ছড়িয়ে রয়েছে।’ নিকেল-এর মতো এদের কাহিনিও প্রকাশিত হবে, যদি ‘কেউ শুনতে চায়।’

আমেরিকার ইতিহাসে বর্ণবাদী সন্ত্রাসের একটি ধামাচাপা দেওয়া অধ্যায়ের ওপর নির্মম আলো ফেলাই যদি হোয়াইটহেডের উপন্যাসের একমাত্র লক্ষ্য হতো, সেটাই একটা বড় অর্জন হতো। এই নতুন উপন্যাস এবং তার আগের উপন্যাস The Underground Railroad (ভুগর্ভস্থ রেলপথ) – এই দুটি রচনায় তিনি বাড়তি যা করেছেন, সেটা তার চাইতেও বেশী দুরুহ। আমেরিকার নিজের ইতিহাস সম্বন্ধে কল্পনাবিলাস যেখানে বর্ণবাদের মুখোমুখি হয়, সেই বিষয়টির উপলব্ধি সেই ১৯৯৮-এ প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস The Intuitionist থেকে তার লেখকচিত্তকে জারিত করে আসছে। এরপর উপন্যাসের নানান বিচিত্র প্রকরণে তার বিহার ঘটেছে (বড় হয়ে ওঠার স্বপ্নময় উপন্যাস Sag Harbor থেকে zombie বা পিশাচ নিয়ে উপন্যাস Zone One)। এবার পরপর দুটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেন। আমেরিকার প্রবণতা তার মূল পাপের কথাটা নামমাত্র স্বীকার করা অথচ দেশটা তার ভয়াবহতা, তার অবিরত অনাচারের অপরিমোচনীয় ইতিহাসের মুখোমুখি হতে ব্যর্থ হয়েছে। মহাকাব্যের গভীর ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত এই দুটি উপন্যাস সেই ভয়াল ইতিহাসের ইতিবৃত্ত।

বইটি মনে হয় লেখকের একটা মহান ব্রতের ফসল, এবং অপরিহার্য সেই ব্রত। আমাদের দেশের আম জনতার সংস্কৃতিতে অন্য শিরোনামে ক্রীতদাসপ্রথা এবং তার পরিণতি নিয়ে কথাসাহিত্য, প্রামাণ্য রচনা, কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্রের তো অভাব নেই (সে গত শতাব্দীর দক্ষিণ অঞ্চলের ভয়ঙ্কর বর্ণবাদী Jim Crow আইনই হোক, বা গণহারে কালো মানুষের কারাবরণ হোক বা সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র ‘I can’t breathe’ [শ্বাস নিতে পারছি না] হোক)। হোয়াইটহেড আমাদের দিকে একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন: এত কাজ হচ্ছে, কিন্তু তার প্রভাব এত সামান্য কেন? যাও বা প্রভাব, তার স্থায়িত্বই বা এত ক্ষণস্থায়ী কেন? তাঁর গল্পবলার দুর্দান্ত ক্ষমতা দিয়ে তিনি শুধু যে একটি ক্ষতবিক্ষত অতীত পুনুরুদ্ধার করেছেন তাই নয়, সেই সাথে তিনি যেই গল্পগুলো বলতে চাইছেন সেগুলো আমেরিকানরা কীভাবে খর্ব করে, বিকৃত করে, গোপন করে বা ‘পরিষ্কারভাবে মুছে’ দেয় সেই প্রক্রিয়াটি তিনি গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখেছেন। যেমন, Underground Railroad উপন্যাসে প্রাকৃতিক বিস্ময়ের জাদুঘরের একটা পরাবাস্তব মেজাজ আছে। অল্পবয়সী পলাতক ক্রীতদাসী কোরা বহু অত্যাচার সহ্য করেছে। সে এই জাদুঘরে কাঁচের বদ্ধ ঘরে ‘ক্রীতদাসের জাহাজে জীবনচিত্র’ বা ক্রীতদাসের শ্রমনির্ভর বিশাল খামারে ‘একটা প্রাত্যহিক দিনের চিত্র’ এই সব আয়োজনে সাদা দর্শকদের সামনে অভিনয়ের কাজ পেয়েছে। এ যেন মুক্তির ক্ষণস্থায়ী ভাণ। হোয়াইটহেড লেখেন: ‘সত্য যেন দোকানের জানালায় সাজানো এক নিয়ত পরিবর্তনশীল প্রদর্শনী। আপনার নজরের আড়ালে অদৃশ্য হাত তার অদলবদল করছে। সত্য – সে বড়ো মোহময়, আর চিরকালই নাগালের বাইরে।’ এই লেখকের শক্তিশালী রায় - যারা ইতিহাসের বিস্মরণকে সম্ভব করে তুলে, তারা মানবতার বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ মুছে ফেলায় সহায়তা করে, তারা নিজেরাও সেই সমস্ত পাপের অংশীদার।

মাত্র ২০০ পাতার বই। The Nickel Boys লেখকের পূর্ববর্তী বইয়ের চাইতেও সুতনুকা, কিন্তু তাই বলে বইটির নৈতিক কষাঘাত বিন্দুমাত্র কম শক্তিশালী নয়। The Underground Railway-এর পর ইতিহাস যদিবা অপরিবর্তিত রয়েছে, সময় আরো এক শতাব্দী এগিয়েছে। বইটির সময়কাল ১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিক। মূল চরিত্র এক কিশোর, তার নাম এলউড কার্টিস। আগের উপন্যাসের কোরার মতো তাকেও মা খুব বিরূপ পরিস্থিতিতে ত্যাগ করেছে। মা তাকে তার নানী হ্যারিয়েটের জিম্মায় ছেড়া চলে গেছে। হ্যারিয়েট ফ্লোরিডার ট্যালাহাসি শহরে এক হোটেলে ঘরদোর পরিষ্কারের কাজ করেন । দৃঢ়চিত্ত এই মহিলা সহজে হার মানার পাত্রী নন। হ্যারিয়েট আর এলউডের পারিবারিক ইতিহাসের পেছনে আরো বৃহত্তর ইতিহাস রয়েছে। হ্যারিয়েটের বাবা ‘কারাগারে মারা যান। শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় এক সাদা মহিলা অভিযোগ করেছিলেন তিনি ফুটপাথে সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দেননি।’ ওঁর স্বামী, এলউডের নানা, ‘বিলিয়ার্ডের টেবিলে কে আগে, এই নিয়ে একদল টালাহাসির গ্রাম্য সাদা লোকের সাথে মারপিটে’ মারা যান। তার মেয়ে জামাই - এলঊডের বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের রণক্ষেত্রে সেনাবাহিনীতে ছিলেন। ‘তিনি সেনাবাহিনীকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি তাঁর ঊর্দ্ধতন ক্যাপ্টেনকে কালো সেনাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে একটা চিঠি লিখেছিলেন, তার জন্য সেনাবাহিনীর থেকে প্রশংসাপত্র পেয়েছিলেন,’ হোয়াইটহেড জানাচ্ছেন। কিন্তু তিনি দেশে ফিরে আবিষ্কার করলেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রাক্তন যোদ্ধাদের সাহায্যার্থে G.I. Bill নামে যে সরকারী আইন হয়, কঠোর বর্ণবাদী বাস্তবতার সাথে সেটা কিছুতেই এঁটে উঠতে পারেনা। ‘যেখানে সাদারা ব্যাঙ্কের ভেতর কালোদের ঢুকতেই দেয় না, সেখানে বিনাসুদের ঋণ থাকলেই বা কী লাভ?’ তার ওপর যেই শহরে থাকেন, সেখানে ‘সাদা ছেলেদের’ ‘জনসমক্ষে উর্দিপরা কালো মানুষদের খুন করার’ প্রবণতা রয়েছে। ক্রুদ্ধ ও তিতিবিরক্ত হয়ে একদিন মাঝরাতে সেই যে এলউডের মাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন – ছেলের বয়স তখন ছয় বছর – তারপর ‘একটি পোস্টকার্ডও পাঠায়নি।’

যে ছেলেটি তারা ফেলে যায়, তার সাথে যখন আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে সে তখন ইস্কুলে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। সে পড়ে ট্যালাহাসির একটা বর্ণবিভাজিত কালোদের স্কুলে। স্কুলটার কার্যক্রম দেখে কে বলবে ততদিনে সুপ্রিম কোর্ট Brown v Board of Education মামলার (ব্রাউন বনাম শিক্ষা বোর্ড) রায়ে বর্ণের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা স্কুল পরিচালনা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে? এলউড নিজে অবশ্য অস্বাভাবিকরকমের ‘শক্ত সামর্থ।’ ‘বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী, কালো জাতির গর্ব’ – এমনটাই সবার অভিমত। ক্রীতদাস মুক্তি দিবসে ছাত্রদের নাটকে মধ্যমণি সে। এই নাটক আগের উপন্যাসের সেই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের জাদুঘরের কাঁচের কক্ষের প্রদর্শনীর কথা মনে করিয়ে দেয়। সে যার ভূমিকায় অভিনয় করছে সে হলো টমাস জ্যাকসন – ‘যে ট্যালাহাসির ক্রীতদাসদের সংবাদ দেয় যে তারা এখন মুক্ত।’ এলউড এখনো অলীক আশা আঁকড়ে আছে যে ‘মুক্ত বিশ্ব’ তারও নাগালের মধ্যে। সহিংস বর্ণবাদী Jim Crow আমেরিকা দাসত্বে শৃংখলিত পূর্বসুরীদের মতো এলউডকেও সাক্ষরতা থেকে বঞ্চিত করতে বদ্ধপরিকর – সাদা স্কুল থেকে যে পুরনো পাঠ্যবই আসে তাতে কারা যেন বর্ণবাদী গালমন্দপূর্ণ মন্তব্য লিখে রেখেছে। কিন্তু সে অধ্যাবসয়ী, হাল ছাড়ে না। এলউডের বাড়িতে টিভি না থাকলে কী হবে, পাড়ার যে সিগারেটের দোকানে সে স্কুলের পরে কাজ করে, সেখানে সে ‘লাইফ সাময়িকীর বিলাসী মোহজালে আবদ্ধ হয়ে যায়। সেই সাময়িকীতে সে কালোদের তখনকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের স্থিরচিত্র দেখে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়।’ ১৯৬২ সালে ক্রিসমাসে পাওয়া একটি উপহার তার ভীষণ প্রিয়। সেটি তার সংগ্রহে একমাত্র রেকর্ড। রেকর্ডটির নাম ‘জায়ন হিল-এ মার্টিন লুথার কিং’। কালোদের কিংবদন্তী নেতার গীর্জায় বক্তৃতার রেকর্ড। সে কতবার যে সেই বক্তৃতা শোনে! বরাতটা তার ভালো, সে এক শিক্ষকের সুনজরে পড়ে। তিনি নিকটস্থ কারিগরী কলেজে ওপরের ক্লাসের কোর্সের প্রতি দৃষ্টি তার আকর্ষণ করেন।

কিন্তু হাই স্কুলের ১২শ শ্রেণি থেকে পাশ করে বের হবার আগেই এলউডকে নিকেল ইস্কুলে পাঠানো হয়। যেমন তার আগে ও পরে অসংখ্য কালো মানুষের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তারও স্রেফ কালো মানুষ হয়ে গাড়িতে চড়ার জন্য কারাবাস ঘটলো। (এলউডের ক্ষেত্রে সে শুধুমাত্র যাত্রী ছিল।) নিকেল ইস্কুল আনুষ্ঠানিকভাবে কারাগার ছিলনা। ১৮৯৯ সালে ফ্লোরিডা বালক কারিগরী বিদ্যালয় নামে এটি স্থাপিত হয়। নিজেকে এটি সংস্কারমূলক বিদ্যালয় হিসেবে অভিহিত করে। বন্দীদের ‘কারাগারের সহিংস বন্দীদের থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করার জন্য এদের বন্দী না বলে ছাত্র বলে ডাকা হয়।’ তাতে কী? এলউড টের পায় এখানে আসলে ‘সব সহিংস অপরাধীরা ইস্কুলের বেতনভুক কর্মচারী’। ট্রেভর নিকেল ‘সংস্কারের অঙ্গীকার’ নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্কুলের পরিচালক হন। তিনি এই চাকরি পেলেন কীভাবে? ভয়ঙ্কর বর্ণবাদী সংগঠন কু ক্লাক্স ক্ল্যান-এর সভায় ‘নৈতিক উন্নতি ও কাজের মূল্য’ নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে শ্রোতাদের সমীহ আদায় করে তিনি চাকরিটা হস্তগত করেন। যেই একবার কাজটা পেয়ে গেলেন, সবকিছুর ওপরে তিনি “শারীরিক সুস্থতার’ প্রতি জোর দিলেন এবং প্রায়ই ‘শারীরিক শিক্ষার উন্নতি কেমন হচ্ছে সেটা দেখার জন্য স্নানঘরের উলঙ্গ ছাত্রদের ওপর নজর রাখতেন।’

নিকেল ইস্কুলে সাদা ছেলেও ছিল। তাদের সাথেও বর্বর আচরণ করা হতো। সাদা কালো ছাত্রদের আলাদা থাকার বর্ণবাদী বন্দোবস্ত। সাদা ছেলেরা অবশ্য একটু ভাল খাবার পেত, আর তাদের শ্রম কালোদের মতো অত নির্মম ছিলনা। নিকেল ইস্কুলে সাদা-কালো সব ছেলেদের এক সাথে হবার সুযোগ ছিল একটাই – বাৎসরিক সাদা বনাম কালোর মুষ্টিযুদ্ধ। রক্তের নেশা জাগানো এই ক্রীড়া দেখার জন্য স্থানীয় জনসাধারণ লালায়িত থাকত, এবং এটাই একমাত্র সময় যখন কালো ছেলেরা ‘ন্যায্য অধিকারের সাক্ষাৎ’ পেত।। আরেকটা স্থানেও কালো আর সাদা বন্দীরা এক সমান ছিল – সেটা হলো হোয়াইট হাউস বা সাদা বাড়ি। এটি একটি পুরনো গুদাম ঘর। এখানে স্কুলের পরিচালক ‘আইনের প্রয়োগ’ করতেন। সেই জন্য ব্যবহৃত হতো তিন ফুট লম্বা চামড়ার দড়ি, নাম ‘কৃষ্ণ সুন্দরী’। এছাড়া আরো মধ্যযুগীয় সরঞ্জাম তো ছিলই। পিটুনিতে চামড়া ফেটে যেত, তার ফলে প্রাণকাঁপানো চিৎকার। বিশাল কারখানার ফ্যানের আওয়াজে সেই সপাং সপাং পিটুনি, চিৎকারের শব্দ, সব ঢাকা পড়ে যেত । সেই আওয়াজ ‘বিজ্ঞানের সকল নিয়ম ভঙ্গ করে পুরো স্কুল এলাকায় ছড়িয়ে পড়তো।’ সেই পাখার বাতাস সাদা বাড়িটার দেয়ালে দেয়ালে রক্তের ছিটা ছড়্রিয়ে দিত। ‘আরো পেছনে’ আরো বীভৎস শাস্তি দেওয়া হতো। সেটা চিহ্নবিহীন কবরে পৌঁছুবার আগে সর্বশেষ গন্তব্য।

কোরার মত এলউডের গল্পও আসলে ক্রীতদাসের কাহিনি। Underground Railway উপন্যাসের মতো এখানেও হোয়াইটহেডের গোঁ - তিনি সহিংসতার ভয়ঙ্কর চিত্রতে কোনরকম কাট-ছাঁট করবেন না। এবং গল্পের চরিত্র বা পাঠক, কাউকেই পালাবার পথ দিতে রাজি নন তিনি। আগের উপন্যাসে যেমন কোরার বিরতিহীন অত্যাচারে সাদা সমর্থকরা সাময়িক আশ্রয়ের বেশি দিতে অক্ষম ছিলেন, এখানেও ফ্লোরিডার পাড়াগাঁয়ে কোন ত্রাণকর্তার আবির্ভাব ঘটেনা (যেমনটা ঘটেছিল বর্ণবাদ নিয়ে রচিত আরেকটি কালজয়ী উপন্যাস To Kill a Mockingbird-এ। সেখানে ধর্ষণের মিথ্যা বর্ণবাদী অভিযোগের শিকার একজন কালো মানুষের সমর্থনে এক সাদা উকিল এগিয়ে আসে।) আগের উপন্যাসের মতো এখানেও কিম্ভুত সব প্রতিবন্ধকতার দুর্ভেদ্য জাল ভেদ করে, শিকারী কুকুর সদৃশ হিংস্র মানুষ (কখনো বা সত্যিকারের কুকুর)-এর তাড়া থেকে পালিয়ে গল্পের চরিত্ররা মুক্তি নামের মরীচিকার পেছনে ছোটে। আবারও হোয়াইটহেড গল্পে বিশাল সময়ের ব্যবধানের মধ্যে যাওয়া-আসা করেন। কখনো এক দৃশ্যে হয়তো তুলনামূলকভাবে একটুখানি আশা, একটু নিরাপদ আশ্রয়ের দেখা মিলল, পরমুহূর্তেই লেখক সেই অলীক কল্পনাকে কালের এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে ভেঙে চুরমার করে দিলেন। এইসব গল্পে সমাপ্তি দূরে থাক, মধুরেণ সমাপয়েত তো আরো দুরস্ত, আদৌ কোন আশ্রয় যে মিলতে পারে লেখক এমন সম্ভাবনাও নাকচ করে দেন। The Nickel Boys উপন্যাসে সময়ের এই বিচিত্র লুকোচুরি কাহিনির শরীরের সাথে এত অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গেছে যে পড়া শেষ করার আগ পর্যন্ত টেরই পাবেন না যে কাহিনির সময়ের ব্যাপ্তি এই শতাব্দী এবং গত শতাব্দীর অনেকটা জুড়ে রয়েছে। আমেরিকায় ক্রীতদাসপ্রথার আমলে যেসব ক্রীতদাস পালিয়ে ‘মুক্ত’ অঙ্গরাজ্যে বা কানাডায় যাবার চেষ্টা করত, সেইসব গোপন রাস্তা এবং পথে থাকবার নিরাপদ আশ্রয়, সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাটাকে Underground Railroad বলা হয়। কিন্তু হোয়াইটহেডের ঐ নামের উপন্যাসে কিন্তু সত্যি সত্যি একটা ভূগর্ভস্থ রেলপথ রয়েছে। ঐ উপন্যাসের জাদুবাস্তবতা নতুন উপন্যাসে পুরোপুরি আমদানি না করলেও, লেখক একটা জাদুকরি চমকের মাধ্যমে এলউডের লুকানো গল্প পুনরুজ্জীবিত করেছেন। ফলে একই সাথে একটা বিস্ময় ও একটি বেদনাবিধুর কাহিনি সৃষ্ট হয়েছে।

মার্টিন লুথার কিং-এর বাণী এলউডের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত, অথচ সেটা Jim Crow- এর বর্বর বর্ণবাদী বাস্তবতার প্রেক্ষিতে হোয়াইটহেড সেটা মেনে নিতে হিমসিম খান। মধ্যরাতের পর সাদা মুখোশ পরা হিংস্র সন্ত্রাসীদের আমাদের পাড়াগুলোতে পাঠাও, আমাদের কোন পাড়ার গলিতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাও, তারপর আমাদের মারতে মারতে আধমরা করে ফেলে রেখে যাও, তবুও আমরা তোমাদের ভালোবাসব? যারা আপনার মনোবল ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর তাঁদের বেলায় ‘প্রতিটি হৃদয়ে শুভবুদ্ধি নিহিত সেটা বিশ্বাস’ করা কীভাবে সম্ভব? ‘হিংসায় হিংসা দূর হয়না, শুধু ভালোবাসা দিয়েই সেটা সম্ভব’ কী করে সত্য হতে পারে? ‘কী কথা!’ এলউড ভাবে। ‘যতসব অসম্ভব ভাবনা!’

এই জটিল সমস্যার হৃদয়বিদারক প্রত্যুত্তর দেয় The Nickel Boys। এই দুই বইয়ে হোয়াইটহেড ইতিহাসের যেই সঞ্চারপথ তুলে ধরেন – ১৮২০ থেকে ২০১৪ – সেটা শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে যায়। যেই জায়গা থেকে দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্বের ছাত্রছাত্রীরা ডোজার ইস্কুলের বিস্মৃত মৃতদেহ উদ্ধার করছে, তার থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে একটা কণ্ঠস্বরের চিৎকার শোনা গেল: ‘ওদের গুলি করো!’ এইবার প্রসঙ্গ অন্য আরেকটা ঘৃণিত জনগোষ্ঠী – এইক্ষেত্রে মেক্সিকো সীমান্তের অভিবাসী শ্রমিক। মে মাসের হট্টগোলপূর্ণ এক জনসভায় ঘটনাটি ঘটে। ‘শুধু এইরকম জায়গাতেই এমন কথা বলে পার পাওয়া যায়,’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বললেন। জনসমাবেশে মুগ্ধ সাদা মানুষ মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি ও অট্টহাসি দিয়ে প্রেসিডেন্টের উক্তিকে স্বাগত জানায়। বাস্তবতা হলো ওদের ‘গুলি করে পার পাওয়া যায়।’ এ শুধু কথার কথা নয়। আমেরিকার অন্যখানেও এরকম জায়গা আছে। উইলিয়াম ফকনার বলেছিলেন অতীত ‘এখনো অতীতই হয়নি।’ এ যেন আমাদের চিরন্তন মন্ত্র। কিন্তু আজকের দিনে সেই কথাটাও যথেষ্ট মনে হয় না।আমরা আমাদের অতীতের নাগাল পেতে পারি বলে আমাদের যে নিশ্চিন্ত প্রতীতি, হোয়াইটহেড তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এমন লেখক আজকের দিনে অত্যাবশ্যক।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট