টা-নেহেসি কোট্‌স্‌-এর প্রথম উপন্যাসে ইতিহাসের সাথে অতিবাস্তব কল্পনা মিশেছে - এসি এডুগিয়ান - নিউ ইয়র্ক টাইমস - অনুবাদ আশফাক স্বপন


(নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পুস্তক সমালোচক মিচিকো কাকুতানি টা-নেহিসি কোট্‌স্‌-এর প্রবন্ধ সঙ্কলন ‘Between the World and Me’ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বইটি বর্তমান আমেরিকায় কালো মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে ধীর, মর্মবিদারক বিশ্লেষণ।‘ কাকুতানির সমালোচনার লিঙ্ক এখানে)
(https://riton.in/2NnCjl8)


টা-নেহেসি কোট্‌স্‌-এর প্রথম উপন্যাসে ইতিহাসের সাথে অতিবাস্তব কল্পনা মিশেছে
এসি এডুগিয়ান


নিউ ইয়র্ক টাইমস
২৪ সেপ্টেমবর ২০১৯

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনা
(https://riton.in/32rwW93)

Ta-Nehisi Coates’s Debut Novel Mingles History and Fantasy
By Esi Edugyan
New York Times, Sept. 24, 2019

The Water Dancer
By Ta-Nehisi Coates

কথাসাহিত্যে টা-নেহেসি কোট্‌স্‌ এর অভিষেক ঘটল The Water Dancer (জলনর্তকী) শীর্ষক বহুমেজাজি উপন্যাসের মাধ্যমে। এর আগে কোট্‌স্‌-এর নানান অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ত প্রবন্ধ আমেরিকায় বর্নবৈষম্য নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে। উপন্যাসের কাহিনি হিরাম ওয়াকার (ডাক নাম ‘হাই’) নামের এক ১২ বছর বয়স্ক ক্রীতদাসকে অনুসরণ করে। সে ভার্জিনিয়ার এক ক্রীতদাস শ্রমনির্ভর বড় খামারে কাজ করে। খামারের নামটি যেন বাস্তবতাকে ব্যঙ্গ করে - Lockless (তালাবিহীন)। হাই বুদ্ধিমান, তার নানান গুণের মধ্যে একটি হল নিখুঁত স্মৃতিক্ষমতা।

হাই খামার মালিকের ঔরসজাত পুত্র। দাসপ্রথার নির্মমতা যে কেমন স্বেচ্ছাচারী আর বিকৃত, সেটা একটি ঘটনায় প্রকাশ পেল। ঘটনাচক্রে তাকে মালিকবাড়িতে ডাকা হল তার আপন ভাইয়ের ভৃত্যের দায়িত্বপালনের জন্য। কিন্তু এক সন্ধ্যায় দুই ভাই বাড়ি ফেরার পথে একট সেতু পার হবার সময় সেতুটি ধ্বসে পড়ে। হাই-এর ভাইয়ের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু সে নিজে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। সে যে বাঁচল, সেটা শ্রেফ ভাগ্যক্রমে নয়। সে স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ করে যে তার একটা বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে সেটা সে ভালো করে বোঝে না, এমনকি চায়ও না।

মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে সে নিজের জীবনের মূল্য কী, সেটা সম্বন্ধে নতুন করেউপলব্ধি করে। সে ঠিক করে, তার প্রেয়সী সোফিয়াকে নিয়ে লকলেস খামার থেকে পালিয়ে যাবে। কিন্তু সব গণ্ডগোল হয়ে যায়, এবং অবশেষে হাই আন্ডারগ্রাউন্ড নামের একটি গোপন সংগঠনের সদস্যদের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এই সংগঠন ক্রীতদাসদের পালিয়ে উত্তরে মুক্তজীবন লাভ করায় সাহায্য করে।

আন্ডারগ্রাউন্ড হাই-এর অলৌকিক ক্ষমতা অত্যন্ত মূল্যবান সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করল। আবার হাইয়ের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ডের সাহায্যের প্রস্তাব একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে হল। এই সুযোগ শুধু সোফিয়াকে উদ্ধার করা নয়। যেই বিষময় ব্যবস্থা তার আপনজনকে বন্দী করেছে, এবার তার ক্ষতি করা, এবং অবশেষে ধ্বংস করার সুযোগ এল। তাই মাঠের ক্রীতদাসের স্বরূপ বদলে গেল, সে হয়ে উঠল মাঠপর্যায়ের কর্মী। এই বদল হাইকে রোমাঞ্চিত করে, আবার গভীরভাবে ভাবায়। হাই পরিবর্তন আনায় তার নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়।

কোলসন হোয়াইটহেডের-এর (Colson Whitehead) The Underground Railroad (পাতাল রেল) উপন্যাসে আমরা যেমনটা দেখেছি, এখানেও কোট্‌স্‌ দাসপ্রথার ভয়াবহতার সাথে অতিবাস্তব কল্পনার একটা ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। যারা ক্ষমতাহীন, লেখক তাদের গুণের চৌহদ্দি প্রসারিত করেছেন, সেখানে অতিবাস্তব ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে ‘জলনর্তকী’ একেবারেই নিজস্ব সৃষ্টি, এর অতিবাস্তবের ইঙ্গিত বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত। মোদ্দা কথা হল, উপন্যাসটির আগ্রহ ক্রীতদাসপ্রথার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া আবিষ্কারে। এই মর্মান্তিক বেদনার স্বরূপের নানান দিক উদ্ধারে কোট্‌স্‌-এর মুনসীয়ানা উল্লেখ্য।

মালিক ও ক্রীতদাস উভয়ের জীবনে যে বৈপরীত্য বিদ্যমান, সেটা বিশেষ দক্ষতার সাথে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন, একই সাথে ক্রীতদাস ও তাদের ভাবী মালিকদের লালন-পালন করার যে প্রথা চালু ছিল, যার ফলে লেখকের ভাষায় ‘একজন বড় হয়ে রাণী হবে, আরেকজন, পা-দানি,’ তার প্রতি বিশদভাবে নজর দেওয়া হয়। ঠিক একইভাবে গভীর দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে ক্রীতদাস নিলামের সভায় অসম্মানজনক শারীরিক পরীক্ষার প্রতি, যেখানে লেখকের ভাষায় ‘মানুষ আরেকটি মানুষকে সম্পূর্ণ মাংসপিণ্ড হিসেবে যাচাই করবার ক্ষমতা নিয়ে আত্মপ্রসাদ পায়।’ কোট্‌স্‌ দাসপ্রথায় আবদ্ধ মানুষের মধ্যেও যে দ্বন্দ্ব সংঘাত রয়েছে সেটা তলিয়ে দেখেন। কোন ক্রীতদাস হয়েতো অন্য ক্রীতদাসের ওপর গোয়েন্দাগিরি করে, বা কখনো কোন ক্রীতদাস নিজের উন্নতির জন্য অন্য কারো সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।

হাই নিজের অবস্থানকে আত্মস্থ করে যেভাবে সেই সম্বন্ধে আত্মসচেতনতা লাভ করে, সেটা পাঠককে সবচাইতে বিচলিত করে। ক্রীতদাস হিসেবে তার সামাজিক অবস্থান এমন গভীরভাবে তার চেতনায় গেঁথে গেছে, যে ভাল উদ্দেশ্য নিয়েও একজন শ্বেতাঙ্গ - সম্পত্তি হিসেবে নয় - একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে যখন তাকে অভিবাদন জানায়, সে আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়। কোট্‌স্‌-এর সৃষ্ট জগতে যে কোন একটা আলিঙ্গনে একটি দুর্লক্ষ্য বিস্ময়কর নতুন উপলব্ধি ঘটতে পারে।

উপন্যাসে কিছু হৃদয়বিদারক দৃশ্য আছে। উপন্যাসের এক জায়গায় এক বয়োজ্যেষ্ঠ ক্রীতদাস কী করে নাশকতার জন্য কঠোর শাস্তিভোগ করে সেই কাহিনি বলে। কাজটি সে অপরাধবোধের কারণে করেছিল। তার পুত্রের অনুপস্থিতিতে সে পুত্রের প্রেমিকাকে নিজের প্রণয়িনী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু পুত্র ফিরে আসে। সেই গ্লানি দুঃসহ। আরেকটি মর্মান্তিক দৃশ্যে এক মুক্তিপ্রাপ্ত মা ১২ বছর বয়স্ক ক্রীতদাস পুত্রকে প্রতিদিন দেখতে আসে। হঠাৎ বালকটি বিক্রি হয়ে যায়। মা পরস্পর-দড়িতে বাঁধা ক্রীতদাসের সারিতে চলমান পুত্রের পাশে হাঁটে আর অঝোর নয়নে কাঁদে।

কোট্‌স্‌ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন কীভাবে সচেতনভাবে অজ্ঞতার সাহায্যে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়। কালো মানুষের প্রতি ইচ্ছাকৃত নিস্পৃহতা দ্বারা ওদের মানবিকতা অস্বীকার করা হয়। বিষয়টি বোঝা মানেই কালো মানুষের প্রতি কিছুটা সহমর্মিতা অনুভব করা, এবং মালিকের মনে এমন অনুভূতির অনুপ্রবেশ পুরো ব্যবস্থাটির পতন ঘটাতে পারে। লেখকের ভাষায় ‘কোন মায়ের সামনে একটা ছোট বাচ্চাকে বিক্রি করতে হলে প্রয়োজন সেই মাকে যতটা সম্ভব কম চেনা। একটা পুরুষকে নগ্ন করে, তাকে প্রহারের আদেশ দিয়ে, তাকে চাবুকে চাবুকে ক্ষত বিক্ষত করে তাতে লবণপানি ছিটাতে গেলে কোনভাবেই তার প্রতি নিজের আপনজনের মতো অনুভব করা চলবে না। ওর মধ্যে নিজেকে দেখা চলবে না, পাছে হাত আটকে যায়।’

তবে একথা সত্যি যে এতে প্রথম উপন্যাসের কিছু অসংলগ্নতা রয়েছে। রোমাঞ্চকর ঘটনা সত্ত্বেও লেখায় কখনো কখনো গতিশীলতার অভাব রয়েছে। সংলাপ বড্ড বেশি বর্ণনামুখর। প্রায় প্রতিবারই হাই কোন নতুন চরিত্রের সাক্ষাত পেলেই সে বিশদভাবে হাইকে তার নিজের ইতিহাস শোনায়। যদিও কাহিনির শুরুতে আমাদের বলা হয়েছে যে মানুষ হাই-কে একজন মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাই তারা তাকে নিজের মনের কথা না বলে থাকতে পারে না, তবুও এইসব আত্মকথন বড্ড কষ্টকল্পিত আর অস্বাভাবিক মনে হয়।

তবে উপন্যাসের অঙ্গুলিমেয় কিছু দুর্বলতায় তুলনায় এর বিশাল গুণের পাল্লাই ভারী। যখন হাই নিজে ভিটায় ফিরে আসে, নিজের জন্মস্থানের সাথে সে একধরনের দূরত্ব অনুভব করে। লেখকের ভাষায় ‘এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, নতুন দৃষ্টিতে এই স্থানটিকে দেখা। যেই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমি দৌড়েছি, কঠোর প্রশিক্ষণের সময়ে এই সম্পূর্ণ এলাকাটির পরিচয় আমি জেনেছি। এই তো লতাপাতার বাহারে সুশোভিত গাছ গাছালি দেখছি। একটু পড়েই পাহাড়। সেখানে খোলা একটুখানি জায়গা আছে, পাথরের ছাদ আছে। সেখানে দৃষ্টির কাছে বিশ্ব নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এই আঁধারী সময়ের সম্পদ মাইলের পর মাইল জুড়ে পরিষ্কার দেখা যায়। কিন্তু মনের গভীরে আমার ভয় হয়, এই বুঝি আমি ক্রীতদাসের দেশে ফিরে এসেছি, এবং এবার এই দেশের আমার ওপর নজর পড়েছে।’

হাই এর জন্য বাড়ি এখন আর একটা স্থান নয়, এটা এখন একটা মনের অবস্থা,যার অবস্থান তার প্রিয়জনের মাঝে যারা তাকে ভালোবাসে। যখন হাই ভাবে, ‘আমি জীবনে কদাচিত কাউকে বিদায় জানাবার অধিকার লাভ করেছি,’ তখন সে যেন ক্রীতদাসপ্রথায় বন্দী মানুষের মানবিক সম্পর্কের বেদনাবিদ্ধ বাস্তবতার সারকথাটি বলে। এখানে ভালোবাসা যায়, কিন্তু অধিকার লাভ করা যায় না। হাই-এর মতে সেই ভালো। কারণ মানুষের কখনো একে অপরের অধিকার লাভ করে সমীচীন নয়, এমনকি উদ্দেশ্য নিঃস্বার্থও হলেও নয়।

অবশেষে হাই আবিষ্কার করে যে মুক্তি সম্বন্ধে তার নিজের মত যাই হোক না কেন, অন্যে কীভাবে তার স্বরূপ নির্ণয় করবে সেটা হাই-এর ওপর নির্ভর করে না। এমনকি কেউ যদি খাঁচায় বন্দী থাকার পথও বেঁছে নেয়, সে তাঁদের ওপর তার নিজের মুক্তির ধারণা চাপিয়ে দিতে পারেনা। প্রতিটি মানুষকে তার নিজ নিজ মুক্তির স্বপ্ন অনুযায়ী এগোতে হবে। উপন্যাসের একটি চরিত্রের ভাষায়, ‘এই নরক থেকে সবাই বের হয়ে আসতে চায়। কীভাবে বের হবে, সেটাই আসল কথা।’

হাই যদিও কিছুটা শান্তি লাভ করে, তবুও কোথায় একটা ছায়া রয়ে যায়। এখনো যেই অনাচার চলতে থাকবে, সেটা নিয়ে তার মনে তিক্ততা রয়ে যায়। অতিবাস্তব ক্ষমতাও এই মর্ত্যে তার জীবনের নিশানা নির্ধারণ করার শক্তি দিতে পারে না। বহু শতাব্দীর অবিচার খণ্ডন বা সংশোধন করা সেই ক্ষমতার সাধ্যের অতীত। তার ক্ষমতা নেই চিরস্থায়ী সুবিচার সৃষ্টি করবার।

LISTEN TO A SAMPLE FROM THE WATER DANCER (OPRAH’S BOOK CLUB)


আশফাক স্বপন ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী উপমহাদেশীয় সংবাদ মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে ঢাকার Daily Star ও কালি ও কলম পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। তার লেখা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো ছাড়াও পাকিস্তানের Dawn, ভারতের Times of India ও Statesman পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আটলান্টায় থাকেন।

ও, এবার বুঝি আমি বাংলাদেশি? জিয়া হায়দার রহমান অনুবাদ : আশফাক স্বপন

ও, এবার বুঝি আমি বাংলাদেশি?

লেখক: জিয়া হায়দার রহমান

অনুবাদ : আশফাক স্বপন


প্রথম প্রকাশ কালি ও কলম আগস্ট ২০১৯

[যে-জনগোষ্ঠী অন্যরকম, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ থেকে ভিন্ন, তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার সারাবিশ্বে রাজনৈতিক পরিম-লকে ভয়াবহ সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। এই হিংস্র ভেদবুদ্ধিতে ভর করে মার্কিন দেশে ট্রাম্প, বিলেতে ব্রেক্সিটপন্থিরা, পূর্ব ইউরোপে নানান দেশের ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী ডানপন্থীরা এবং পশ্চিম ইউরোপে বর্ণবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভিন্ন বর্ণের অভিবাসীর জ্বালা যে কী বিষময়, সেটা নিয়ে ২০১৬ সালে লেখা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক জিয়া হায়দার রহমানের এই ক্রুদ্ধ প্রবন্ধটি এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জিয়া হায়দার রহমানের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস In the Light of What We Know সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। – অনুবাদক]

কুড়ি বছর আগে নিউইয়র্কের লোকে যখন আমায় জিজ্ঞেস করত, আমি কোথাকার লোক, আমি স্রেফ বলতাম, আমি বিলেতে বড় হয়েছি। বাংলাদেশে জন্ম হয়েছে বললে আরো একগাদা প্রশ্ন আসবে, তাছাড়া নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, আমার সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা অর্থাৎ আমার বিলেতি উচ্চারণ – সেটার উৎস সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া।

এই খাস বিলেতি উচ্চারণ সেকালের ক্যাসেট রেকর্ডারে ধারণকৃত বিবিসি সংবাদ-পাঠকদের অনুকরণ করে শেখা। ছোটবেলায় লাখ লাখ ইহুদি নিধনের কাহিনি পড়ার পর আতঙ্কিত হয়েছি; শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়রা যদি নিজেদের এত কাছাকাছি একটা জনগোষ্ঠীর

এ-অবস্থা করে, না জানি আমার কী দশা করবে।

তাই আমি খাপ খাইয়ে, তাল মিলিয়ে চলতে শিখেছি। উদ্দেশ্য এসব মানুষ, যারা জাতিগত বিভিন্নতায় এত অসোয়াস্তিতে ভোগে, তাদের কাছে যেন আরেকটু কম বিজাতীয় বলে প্রতীয়মান হই। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, আমি এমন একটা ব্রিটেনে বড় হয়েছি, যে ব্রিটেন অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি অবজ্ঞায় ঘৃণায় থুথু মেরেছে, আমাদের ঠেঙিয়েছে, দেয়ালে নাৎসি স্বস্তিকা চিহ্ন এঁকেছে।

ব্রিটেন স্বজাতীয়দের ঘরের শত্রম্ন বিভীষণের ভয় দেখায়। অভিবাসীদের বলে, মূলস্রোতে মিলেমিশে যাও, বিলেতি মূল্যবোধ আত্মস্থ করো। এই কাজটি করো, তোমার সম্মান বাড়বে। কিন্তু এই প্রতিশ্রম্নতির পুরোটাই ফাঁকি, কারণ প্রতিশ্রম্নতি পূরণের কোনো ইচ্ছাই ব্রিটেনের নেই।

সম্প্রতি আমাকে PEN Pinter Prize পাওয়া নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের সম্মানে নামাঙ্কিত বিলেতের PEN পুরস্কারের বিচারকম-লীতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই পুরস্কার এমন একজন লেখককে দেওয়া হবে, যিনি বিশ্বকে ‘নিঃসংকোচ, অবিচল দৃষ্টিতে’ দেখেন, ‘তীব্র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বুদ্ধিবৃত্তি’ দিয়ে ‘আমাদের সমাজ ও জীবনের আসল সত্যকে’ শনাক্ত করেন। সালমান রুশদি ও নাট্যকার টম স্টপার্ড আগে এ-পুরস্কার পেয়েছেন।

বিচারকম-লীর ঘোষণায় Times Literary Supplement-এর সম্পাদক পিটার স্টোথার্ডের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঘোষণায় আমার পরিচিতি এরকম : ‘জিয়া হায়দার রহমানের জন্ম বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে, লেখাপড়া করেন অক্সফোর্ডের বেলিয়ল কলেজে‌, এবং আরো শিক্ষালাভ করেন ক্যামব্রিজ, মিউনিখ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিনিয়োগ ব্যাংকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন।’

ম্যান বুকার পুরস্কার কর্তৃপক্ষ স্টোথার্ডকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বিবৃতি দিলো। তিনি একসময় বুকার পুরস্কারের বিচারক ছিলেন। বিবৃতিতে আরো দুজনের কথা উল্লেলখ করা হয় : ‘রয়াল কোর্ট থিয়েটারের সামগ্রিক শিল্পকলা-পরিচালক ভিকি ফেদারস্টোন, এবং বাংলাদেশি ব্যাংকার ঔপন্যাসিক জিয়া হায়দার রহমান।’

আমার সঙ্গে বিচারকম-লীতে আর যাঁরা সদস্য, তাঁদের নাগরিকত্ব কী সে-বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। ম্যান বুকার সে-বিষয়ে কোনো তথ্য সরবরাহ করেনি। তবে আমি যে বাংলাদেশি, সে-কথা জেনে বিস্মিত হলাম। আমার বাংলাদেশি কোনো পাসপোর্ট নেই, তবে ব্রিটিশ পাসপোর্ট রয়েছে বটে। একটা নয়, দু-দুটো, সম্পূর্ণ আইনসংগতভাবে (অহিনকুল সম্পর্ক এমন দুটি দেশ যেমন ইসরায়েল ও জর্ডানে ভ্রমণের জন্য)।

বোঝা গেল, দুটো পাসপোর্ট থাকায় আমি দ্বিগুণ ব্রিটিশ হতে পারিনি। তবে ব্রিটিশ সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার একটা প্রভাবশালী অংশ আমাকে যদি বাংলাদেশি বলে, আমি যে সত্যিই তাই তার যথেষ্ট কারণ থাকবে তো? তা না হলে এই ভুলের কারণ কী? আমরা কি ধরে নেব লাখ লাখ ব্রিটিশ নাগরিক যে উপনিবেশোত্তর নানান দেশে জন্ম নিয়েছে, বা তাদের উত্তরসূরি, সে-বিষয়ে এরা অজ্ঞ? অবশ্য আমাকে বাংলাদেশি বলার একটা সুবিধা হলো কিছু লোক এবার আমাকে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ধমকাতে পারে।

আমি নিজেকে কী বলে অভিহিত করতে চাই সেটা বড় কথা নয়, আসল কথা হলো এদেশের আপাত শিক্ষিত ব্রিটিশ মানুষ অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকদের কী বলে অভিহিত করতে চায়। মানুষের ভিন্নতা নিয়েই ব্রিটেনের সমস্যা।

এই সমস্যা এককভাবে ব্রিটেনের নয়, ইউরোপীয় সংঘ থেকে বের হওয়ার জন্য গণভোট নিয়ে ব্রেক্সিট আন্দোলন আজ ব্রিটেনে ইউরোপীয়দের প্রতি জঘন্য বিদ্বেষের চোরাস্রোত সবার কাছে উন্মোচিত করে দিয়েছে বটে; কিন্তু ইউরোপীয় মূল মহাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের একটা মিলও রয়েছে।

সম্প্রতি ওলন্দাজ টেলিভিশনে Buitenhof নামে একটি রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠানে আমি বলেছি, ইউরোপের ঔপনিবেশিক ইতিহাস তার অমত্মঃকরণে একটা কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, সেটা হলো বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ। অনুষ্ঠানের পর গতানুগতিক বর্ণবাদী চিঠিপত্র ছাড়াও অশ্বেতাঙ্গ ওলন্দাজ মানুষের কাছ থেকেও বার্তা এসেছে, যার মোদ্দা কথা একটাই। অনুষ্ঠানে যে আমি বলেছি ব্রিটেনের অবস্থা আরো খারাপ সেটা নাকি বলা প্রয়োজন ছিল না। নেদারল্যান্ডসেও অবস্থা একই রকম খারাপ। ইউরোপে অভিবাসীদের জন্য জীবন মানে প্রতিদিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আক্রমণ, তারা যে বহিরাগত সেটার নানান প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত, এসব মোকাবেলা করা।

গত কয়েক মাস আমাকে অ্যামস্টারডামে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা হয়েছে। এখানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি আবাসিক লেখক। আমার উপন্যাসের কাটতি এখানে খুব ভালো। গত মাসে আমি Boekenbale বলে ওলন্দাজ প্রকাশনা শিল্পের একটা বার্ষিক উৎসবে গিয়েছি। শুনলাম এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো উৎসবে কে কে প্রবেশাধিকার পাওয়ার যোগ্য সেই সম্বন্ধে গুজব উৎপাদন করা। অর্থাৎ একটা বিশিষ্ট, বাছাই গোষ্ঠী তৈরি করা।

আমার প্রকাশক অনুষ্ঠানের আগে এক রেসেত্মারাঁয় নৈশভোজের নিমন্ত্রণ করলেন। মাঝপথে আমার কোটের কথা মনে পড়ল – আসার পর কোথাও কোটটা রেখে আমি তার কথা ভুলে গেছি। একজন কর্মচারী আর আমি মিলে সেটা উদ্ধার করলাম। তার মধ্যে মূল্যবান জিনিসপত্র সব ঠিকঠাক ছিল। আমি ধন্যবাদ জানালাম।

‘আপনাকে এখানে পাওয়া আমাদের আনন্দ।’ উত্তরে তিনি জানালেন। কথাটা একটু কানে বাজল। ভাবলাম অনুবাদের কারণেই হয়তোবা।

‘না স্যার’, এবার স্বর নিচু। ‘বলতে চাইছি আপনাকে এখানে পাওয়া আমাদের জন্য সম্মানের ব্যাপার।’ লোকটার দিকে আবার তাকালাম। ‘আমি আপনাকে গত সপ্তাহে ‘Buitenhof’ অনুষ্ঠানে দেখেছি। আপনার কথা একদম ঠিক। তবে ওলন্দাজরা কিছু বোঝে না, কারণ তারা দেখেও দেখতে চায় না।’

‘আপনার নাম কী?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘এমিল’, আমার সঙ্গে করমর্দন করতে করতে বললেন। ‘কাজের সময় আমি এই নাম ব্যবহার করি। আমার বাবা-মা মিসরের। আমার জন্ম নেদারল্যান্ডসে। আমি এখানে সুরা বিশেষজ্ঞ। সুরা সম্বন্ধে যা কিছু জানার আছে সব আমার নখদর্পণে।’

‘আমি খুব ভালো ডাচ ভাষা বলি,’ তিনি ইংরেজিতে বলতে লাগলেন। ‘ওলন্দাজ সংস্কৃতি সম্বন্ধে বেশিরভাগ ওলন্দাজ লোকের চেয়ে আমার জ্ঞান বেশি। আমি ডাচ, কিন্তু আমাকে কিছুতেই এরা ডাচ হিসেবে গ্রহণ করবে না।’

এই কথোপকথন আমার মনে গভীরভাবে দাগ কাটল। আমি অ্যামস্টারডামের ঠান্ডা নিশীথে বেরিয়ে পড়লাম মনকে শান্ত করার জন্য।

আজকাল নিউইয়র্কের লোকে যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কোথাকার লোক, মাঝে মাঝে আমার কী খেয়াল হয়, আমি বলি ‘আমার বাংলাদেশে জন্ম।’ প্রায় কোনোবারই এই উত্তরে মানুষ নিবৃত্ত হয় না। আমার বাচনভঙ্গি শুনে বলে, ‘বুঝলাম, কিন্তু আসলে তো আপনি ব্রিটিশ, তাই না?’ নিউইয়র্কের লোকের জয় হোক! এই কথাটা শুনতে আমাকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে হয়।

আমি মানিয়ে চলতে শিখেছি। কিন্তু যখন আমার শৈশবের পাড়ার মতো হতদরিদ্র পাড়া অথবা ইস্ট লন্ডনের বঞ্চিত অঞ্চলের যে-স্কুলের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ছিলাম সেই স্কুল – এসব এলাকার শিশুদের কথা ভাবি, তখন উপলব্ধি করি যে, ঔপন্যাসিকের মতো জনসমাজের অন্তরালে আশ্রয়গ্রহণ নীতিভঙ্গের শামিল।

চিন্তাভাবনার প্রতিটি সংঘাত ঘটে ভাষার রণাঙ্গনে। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ লোকের কাছে যুক্ত পরিচয় – বাংলাদেশি-ব্রিটিশ, পাকিস্তানি-ব্রিটিশ – শুধু বিভিন্নতাকে প্রকট করে তোলে। এই নব্য পরিচয়কে একটি বহু-সাংস্কৃতিক রামধনু-সদৃশ রাষ্ট্রের নতুন সংযোজন হিসেবে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে উভয়পক্ষই এই যুক্ত পরিচিতিকে অপরপক্ষের প্রতি সাংস্কৃতিক ছাড় হিসেবেই দেখে।

শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকের জাতীয়তা নিয়ে মুখোমুখি, সরাসরি কথা বলতে আড়ষ্টতা অনুভব করে। ইতসত্মত পা নাড়ানো, গলা খাঁকারি দেওয়া, চোখে চোখ রাখতে সংকোচ – নানান ইঙ্গিতে সেটা ধরা পড়ে যায়। যুক্তচিহ্ন দিয়ে পরিচয় নির্দেশ ব্যাপারটা গোলমেলে, বেখাপ্পা; আবার এমনতরো কাউকে শুধু ব্রিটিশ বলে অভিহিত করা যেন ঠিক যথেষ্ট শাণিত নয়। ব্রিটিশদের রয়েছে ইতিহাস, বাংলাদেশি-ব্রিটিশদের সম্বল যুক্ত পরিচয়ের যতিচিহ্ন।

মানুষের গোষ্ঠীগত ভিন্নতা নিয়ে ব্রিটেনের অমত্মঃস্থ সাংস্কৃতিক জটিলতার কারণেই স্বজাতীয় ব্রিটিশের পক্ষে আমাকে ব্রিটিশ বলে অভিহিত করতে এতো কষ্ট হয়। সরল বিশ্বাসে যাদের সচেতনতা নিয়ে আশাবাদী হয়েছি, কষ্ট হয় তাদেরও।

আমি তো ব্রিটেনেই বড় হয়েছি; আমার পাসপোর্ট ব্রিটিশ, বাংলাদেশি নয়; আমি আদপেই বাংলা বলি না; সৎ নাগরিক হওয়ার সদ্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পড়শির আইকিয়া খাট জুড়তে সাহায্য করি, আরেকজনের পুরনো লাইলাক গাছ উপড়াতে সাহায্য করি; ব্রিটেনে আমার লেখাপড়া, ব্রিটেনই কর্মক্ষেত্র; ‘এই শরীর ইংল্যান্ডের, প্রতি শ্বাসে ইংল্যান্ডের বাতাস/ এর নদীর জলে বিধৌত, এই স্বদেশের সূর্যালোকে ধন্য’*; স্থানীয় গির্জার গৃহহীনদের সাহায্যার্থে চাঁদা তোলার অনুষ্ঠানে বাসনপত্র ধুয়ে দিই (কারণ ধর্মমত যাই হোক, আমরা তো সবাই নিশ্চিতভাবে সামূহিক সামাজিক আত্মীয়তার ধারণায় বিশ্বাসী); এবং আবারো বলি – এই কথা পুনরুচ্চারণের প্রয়োজন রয়েছে – আমার ব্রিটিশ পাসপোর্টে ‘বিনা বাধায়’ কথাটার উল্লেলখ রয়েছে তবু আপনি আমাকে ব্রিটিশ বলে স্বীকার করবেন না? এরপর আমি যদি আপনার সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় পোষণ করি, বাক্সপ্যাঁটরা বেঁধে দেশ থেকে পালাই, আপনি আশ্চর্য হবেন না।

আর কাঁহাতক আমি আপনাদের সঙ্গে মিলেমিশে যাব? আর কী চান আমাদের কাছে? শ্বেতাঙ্গ হতে হবে? ঠিক হুবহু আপনি হয়ে যাব?

নিউইয়র্ক টাইমস; এপ্রিল ৮, ২০১৬

মূল ইংরেজি প্রবন্ধে উলিস্নলখিত পঙ্ক্তি :

‘a body of England’s, breathing English air/ Washed by the rivers, blest by suns of home’

সম্পূর্ণ কবিতা এখানে : https://www.bartleby.com/103/149.html

মূল ইংরেজি নিবন্ধ

https://www.nytimes.com/2016/04/10/opinion/oh-so-now-im-bangladeshi.html?searchResultPosition = 9জিয়া হায়দার রহমান সম্বন্ধে New Yorker সাময়িকীতে মূল্যায়ন

https://www.newyorker.com/magazine/2014/05/19/the-world-as-we-know-itThe New York Times-এ তাঁর উপন্যাসের সমালোচনা

https://www.nytimes.com/2014/04/13/books/review/in-the-light-of-what-we-know-by-zia-haider-rahman.html?_r = 0

সাঁকো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছোটগল্প

সাঁকো

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ওরা আমার হাত দুটো পেছনদিকে মুড়ে বাঁধল নাইলনের দড়ি দিয়ে। চোখে বেঁধে দিল নিরেট কালো কাপড়। মুখের মধ্যে একটা বেশ বড় তুলোর গোল্লা ভরে দিয়ে ঠোঁটে আটকে দিল স্টিকিং প্লাস্টার। তারপর বুঝতে পারলুম, দু-তিনজন লোক আমাকে উঁচু করে তুলে বেশ খানিকটা বয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল একটা কাঠের তক্তার ওপরে।

একজন খুব ঝকঝকে পালিশ করা গলায় বলল, এবারে তুমি হাঁটো সামনের দিকে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, এক-পা এক-পা করে হাঁটো।

আমি এক-পা বুলিয়ে দেখলুম, কাঠের তক্তাটা মাত্র বিঘতখানেক চওড়া, তলার দিকে শূন্যতা।

এটা একটা সাঁকো? নীচে কোনও পাহাড়ি নদী? জ্যোৎস্নাহীন রাতে আমরা আসছিলুম একটা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, গাড়ি থেমেছিল একটা জঙ্গলের মধ্যে। এমন নিস্তব্ধতা যে বাতাসেরও কোনও শব্দ নেই।

যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই আততায়ীদের একজন হেসে বলল, হ্যাঁ, এটা তিস্তা নদীর ওপর একটা অস্থায়ী সাঁকো। জল প্রায় পাঁচ-ছ'শো ফুট নীচে। যদি পা পিছলে পড়ে যাও সঙ্গে-সঙ্গে ছাতু হয়ে যাবে। তোমাকে আর খুঁজেও পাওয়া যাবে না।

আমি বুঁবুঁ শব্দ করে বলতে চাইলুম, আমাকে এই সেতুটা পার হতে বলছ কেন?

সে ঠিক বুঝতে পেরে বলল, এটা একটা খেলা।

আমি ওইভাবেই আবার বললুম, এ-খেলা যদি আমি খেলতে না চাই?

সকৌতুক উত্তর এল, তাহলে তোমাকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হবে। তুমি গড়াতে-গড়াতে পড়বে, আমরা সেটা টর্চ ফেলে দেখব।

এরপর আমি নিজেই জিগ্যেস করলুম, আর যদি ওপারে পৌঁছোতে পারি?

আবার হাসির সঙ্গে উত্তর এল, তখন দেখবে কী হয়। নিশ্চয়ই একটা কিছু খুব মজার ব্যাপার হবে। নাউ স্টার্ট। আমরা ঠিক দশ গুনব, তার মধ্যে এগোতে শুরু না করলে...এক, দুই, তিন...

প্রথম পা ফেললুম সামনের দিকে। খুব একটা শক্ত কিছু মনে হল না। কাঠের পাটাতনটা বেশ মজবুত। এক পা সামনে দিয়ে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে তারপর দ্বিতীয় পা এগিয়ে ঠিক মতোন বুঝে নিয়ে সেটা ফেলতে হবে। এইরকম ভাবে প্রত্যেকবার। একটুও অন্যমনস্ক হলে চলবে না। অসম্ভব কিছু নয়। এর থেকেও অনেক শক্ত খেলা আছে পৃথিবীতে।

ওদের গোনা শেষ হওয়ার আগেই আমি তিন পা এগিয়ে এসেছি। কী ভাবে ওরা আমাকে? ওরা গায়ের জোরে আমাকে ধরে এনেছে বলেই আমি ওদের কাছে হার স্বীকার করব? ওরা কি ভেবেছিল, আমি কেঁদে কেটে, প্রথমেই ভয় পেয়ে গিয়ে দয়া চাইব ওদের কাছে? আমাকে এখনও চেনে না।

এই সাঁকোটা কতখানি লম্বা? তিস্তা নদী তো কম চওড়া নয়। জুবিলি ব্রিজ পার হয়েছি অনেকবার। উঁচু পাহাড়ের ওপরে হয়তো কিছুটা সরু। এ জায়গাটা কোথায়?

এ কী, আমার পা কাঁপছে কেন? মাথা ঠিক আছে, তবু পা কাঁপছে? সামনের দিকে এগোবার জন্য একটা পা তুলতেই অন্য পা-টা যেন শরীরের ভর রাখতে পারছে না। মানুষ তো এক পায়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সামনের দিকে পা বাড়ানোই দারুণ শক্ত। পাশের দিকে নয়, শুধু সামনের দিকে। একেবারে সোজা হাঁটতে মানুষ জন্ম থেকেই শেখে না।

ওদের একজন চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, কী হল, থামলি কেন? গুঁতো খাবি কিন্তু।

আমার মুখ বন্ধ, আমি উত্তর দেব কী করে? ওরা তা জানে না? অবশ্য ওদের ওই প্রশ্নের কোনও উত্তরও হয় না।

আবার ওরা বলল, হয় গুঁতো খাবি, নইলে গুলি করা হবে। থেমে থাকা চলবে না। আবার দশ গুনছি, এক-দুই-তিন...

একটা যদি লাঠি দিত ব্যালান্স রাখার জন্য! হাঃ, লাঠি, হাত দুটোই খোলা রাখেনি। ছেলেবেলায় যখন কোনও পাঁচিলের ওপর দিয়ে কিংবা রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটেছি, হাত দুটো এমনিতেই দুপাশে সোজা হয়ে গেছে, হাত দুটো তখন ডানা হয়ে যায়।

অন্ধকার রাত্তিরে চোখ খোলা থাকলেও এরকম একটু সরু সাঁকো পার হওয়া কথার কথা নয়। তবু ওরা চোখ বাঁধতে গেল কেন? তেমন প্রয়োজন হলে মানুষ নাকি অন্ধকারেও দেখতে পায়। চোখ খোলা থাকলে, আর কিছু না হোক শুধু অন্ধকারও তো দেখা যেত। অন্ধকার কি দেখার জিনিস নয়। অন্ধকার কতরকম। পৃথিবীতে কোথাও খাঁটি কালো অন্ধকার নেই।

না, অসম্ভব পা কাঁপছে। আমি পারব না। এরই মধ্যে একবার টলে পড়ে যাচ্ছিলুম আর একটু হলে। এটা অন্যায় খেলা।

ওরা আর লাঠি-ফাঠি নিয়ে গুঁতো মারতে পারবে না। তার থেকে দূরে চলে এসেছি নিশ্চয়ই! গুলি করতে পারে। কিন্তু ওদের গুলি খেয়ে আমি কিছুতেই মরব না। ওরা গুনতে শুরু করলে নয় পর্যন্ত গোনার পরই আমি ঝাঁপ দেব।

—নীলু! নীলু!

বাবার গলায় আওয়াজ। বাবা মারা গেছেন অনেকদিন আগে। বাবা এখানে এই নদীর ওপর এসে আমায় ডাকতে পারেন না। মানুষের আত্মা বলে কিছু যদি থেকেও থাকে, কিন্তু সেই আত্মা কি পাখি যে অন্ধকার নদীর ওপর এসে উড়বে? এটা আমার কল্পনা, গল্প-উপন্যাসে এরকম থাকে। অবচেতনে আমি কি শিশু হয়ে গিয়ে বাবার সাহায্য চাইছি?

—নীলু, নীলু, তুই পারছিস না? আমি তোর হাত ধরব?

—বাবা, আমার হাত বাঁধা। তোমারও কি হাত আছে?

—না, আমার হাত নেই। কিন্তু তোকে থামলে চলবে না। তুই এগিয়ে আয়, আস্তে-আস্তে, মনে কর, একটু সামনেই তোর মা বসে আছে।

—মা কি সামনে থাকে, না পেছনে?

একটা দমকা হাওয়া দিল। এতক্ষণ বাতাসের অস্তিত্বও টের পাওয়া যাচ্ছিল না। বেশ গরম, কিন্তু বেশি জোর হাওয়া ভালো নয়। একটা পা তুললেই আমার শরীরটা যেন একটা শুকনো ফুলের পাপড়ির মতন পলকা হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের ধাক্কাতেও পড়ে যেতে পারি।

আমি আর এগোতে পারছি না। না, পারব না।

পেছন থেকে ওরা গুনছে, এক দুই তিন...সাত আট...

—নীলু, নীলু, ঝাঁপ দিও না।

মায়ের গলা? না তো, অন্যরকম, অথচ খুব চেনা-চেনা। কে, তুমি কে?

—নীলু, ঝাঁপ দিও না। এসো সামনে এসো। তুমি আমায় চিনতে পারছ না নীলু?

—রিনি! সত্যি প্রথমটা চিনতে পারিনি। অথচ ভেবেছিলুম, সারা জীবনে তোমাকে ভুলব না। আশ্চর্য।

—সত্যিই তুমি আমায় ভুলে গিয়েছিলে, নীলু?

—না, রিনি, ভুলে যাইনি, আবার অনেকদিন মনেও পড়েনি তোমার কথা। এতদিন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?

—আমি তো হারিয়ে যাইনি, তুমিই অনেক দূরে চলে গেলে।

—রিনি আমার চোখ বাঁধা, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি কি আগের মতোই আছ? ঘুঘু পাখির চোখের মতন অবাক-অবাক ভাব, একটা উড়ন্ত পালকের মতন তোমার শরীর।

—কথা বলো না, নীলু, এগিয়ে এসে আমার হাত ধরো।

—আমি পারছি না রিনি, আমি আর পারব না, এই দ্যাখো, একটা পা তুলতে কতক্ষণ সময় লেগে যাচ্ছে।

—তুমি একসময় তোমার সবকিছু ছেড়ে আমার দিকে ছুটে এসেছিলে।

—আমি ছুটে গিয়েছিলুম না তুমি আমাকে চুম্বকের মতন টেনেছিলে? এখন আবার সেই রকমভাবে টানতে পারো না?

—মাঝখানে কতগুলো বছর...নীলু, তুমি সামনাসামনি না এগিয়ে পাশ ফিরে হাঁটো। দ্যাখো, তাহলে পা তুলতে হবে না। একটা পা ঘষে-ঘষে এগোবে। পা কাঁপবে না। আমি হাত বাড়িয়ে আছি তোমার দিকে।

—তাই তো, পাশ ফিরে হাঁটা কিছুটা সহজ লাগছে। রিনি তুমি কী করে জানলে? তোমাকে কি এরকম সাঁকো পার হতে হয়েছে কখনও?

আর কোনও উত্তর নেই। রিনি আসেনি। আবার অবচেতন? পাশ ফিরে হাঁটার বুদ্ধিটা রিনি দিয়ে গেল, না আমি নিজেই উদ্ভাবন করলুম? বহুদিন রিনির কথা মনে পড়েনি, রিনি হারিয়ে গেছে, না আমি দূরে চলে গেছি? একসময় রিনির খুব কাছে পৌঁছনোর জন্য সাংঘাতিক ব্যাকুলতা ছিল। কত আছে? রোদ্দুর যেমন বহু লক্ষ মাইল দূর থেকে ছুটে এসে মানুষের শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে ভেতরে চলে যায়, অন্ধকার মজ্জা-মাংস শিরা-রক্তে আলো জ্বালিয়ে দেয়, সেইরকম? না, আমি আলো জ্বালিনি, রিনিই জ্বালিয়েছিল, এক চিল-ডাকা দুপুরে ওদের বাড়ির একতলায় বসবার ঘরে রিনি আমার চোখের সামনে ওর একটা হাত তুলে বলেছিল, এই আঙুলের ডগায় কী আছে বলো তো? আমার মনে হয়েছিল, সেখানে থেমে আছে অনন্ত মুহূর্ত।

তবু আমরা পরস্পরকে হারিয়ে ফেললুম কী করে? আর রিনিকে ছাড়ব না, এবার রিনিকে পেতেই হবে। মনে করা যাক এখান থেকে ঠিক দশ পা দূরে দাঁড়িয়ে আছে রিনি, সেই আঙুলটা তুলে, আমার ওই পর্যন্ত যেতেই হবে।

—নীলু, আমি কিন্তু ঠিক দশ পা দূরেই দাঁড়িয়ে আছি। তুমি গুনে-গুনে পা ফেলে এসো।

—রিনি তোমার কাছে পৌঁছোলে তুমি আমার চোখের বাঁধনটা অন্তত খুলে দেবে? তোমাকে একবার দেখব।

—তোমার চোখ বাঁধা আছে, তাতে এক হিসেবে ভালোই হয়েছে। নীচের দিকে তাকালে তোমার মাথা ঘুরে যেত। নদীর জলে একটু আলো চিকচিক করছে। অনেক নীচে।

—নীচের দিকে তাকাব না, শুধু তোমার আঙুলের ডগাটা আর-একবার ভালো করে দেখব।

এই দশ পা যেতে আমার পা কাঁপল না। রিনি সেখানে নেই। কীসের শব্দ, অনেক নীচের নদীর জলস্রোতের? ওহে অবচেতন, তুমি আরও শক্তিশালী হয়ে রিনিকে রক্তমাংসে তৈরি করতে পারলে না? কী গাধা আমি, মাত্র দশ পা দূরে রিনি থাকবে, কেন একথা ভাবতে গেলুম? যদি ভাবতুম পঞ্চাশ পা দূরে, কিংবা সাঁকোর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে রিনি, আকাশে কালপুরুষের দিকে তার কোমল আঙুলখানি তুলে, তাহলে সেই টানে হয়তো পৌঁছে যাওয়া যেত।

কৃপণের মতন আমি মাত্র দশ পা উচ্চারণ করে রিনিকে খরচ করে ফেলেছি। এখন অবচেতন তোলপাড় করলেও আর রিনি ফিরে আসবে না।

পেছন থেকে কর্কশ হুংকার ভেসে এল—এই হারামজাদা, দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? আমরা কি এখানে সারারাত কাটাতে এসেছি? গুলি চালাব?

ওরা কি টর্চ ফেলে দেখছে আমাকে? ওরা সব মিলিয়ে ছ'জন, আমি গুনেছি। ওদের বাধা দেওয়ার কোনও উপায় ছিল না। ওরা কি অপেক্ষা করে আছে, কখন আমি পড়ে যাব? কিংবা ওরা নিজেদের মধ্যে বাজি ফেলেছে? সিনেমায় এরকম দৃশ্যে থাকে, হঠাৎ একবার পা ফসকে পড়ে যায় নায়ক। দর্শকদের বুক ধড়াস করে ওঠে। নায়ক কিন্তু সত্যি-সত্যি পড়ে যায় না, শেষ মুহূর্তে ধরে ফেলে এক হাতে। ঝুলতে থাকে। তলায় হাঁ করে আছে কুমির। নায়ক সেই অবস্থাতেও উঠে আসে কায়দা করে।

আমি পড়ে গেলেও ধরতে পারব না, আমার হাত বাঁধা। মুখ দিয়ে কাঠটাকে কামড়ে ধরারও উপায় নেই। আমার এক চুলও ভুল করলে চলবে না। তা ছাড়া আমি নায়কও নই। এটা সিনেমা নয়, এটা বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা।

বাঁচতেই যে হবে, তার কী মানে আছে! একটা কুঁড়েঘরের চাল থেকে ঝুঁকে পড়া রোমশ, হালকা সবুজ লাউডগায় বসে আছে একটা লালচে রঙের ফড়িং, তিরতির করে কাঁপছে তার ডানা, কী নিশ্চিন্ত ও আনন্দময় তার বসে থাকার ভঙ্গি, যদিও যে-কোনও মুহূর্তে একটা শালিক তাকে ঠোঁটে চেপে নিয়ে যেতে পারে। কেন এই দৃশ্যটা মনে আসছে!

আর কত দূর যেতে হবে? অর্ধেক এসেছি কি? একটা মুহূর্ত, যদি লাফ দিয়ে পড়ি, তাহলে আর কোনও যাতনা সহ্য করতে হবে না। অনেক উঁচু থেকে পড়লে বাতাসের চাপেই নাকি নিশ্বাস শেষ হয়ে যায়। অন্য যে-কোনও মৃত্যুর চেয়ে নদীর বুকে হারিয়ে যাওয়া অনেক ভালো।

দুলছে, দুলছে সেতুটা, দুলছে। ওপার থেকে কি ওরা ইচ্ছে করে দোলাচ্ছে? তাহলে ওদের খেলাটা এই, আমাকে কিছুতেই পার হতে দেবে না। মাঝ নদীতে ফেলে দেবে।

কিংবা এত লম্বা কাঠের সেতু, নীচে যদি কোনও সাপোর্ট না থাকে, তাহলে মাঝখানটা বেঁকে যেতে তো পারেই। এইখানটা চালু হয়ে গেছে, দুলছে। মানুষ নয়, এই কাঠের তক্তার দুর্বলতাই ফেলে দেবে আমাকে।

—নীলু, নীলু তুমিও তোমার শরীরটা দোলাও। নইলে ভারসাম্য রাখতে পারবে না।

—কে, গগনদা? আপনি কোথা থেকে এলেন?

—কথা বলার সময় নেই নীলু। নিজের শরীরটা দোলাও, তারই সঙ্গে একটু-একটু করে এগিয়ে এসো।

—আমি আর পারছি না, গগনদা। জল আমাকে টানছে। আর, গেলাম...

—না-না, তুমি পারবে, তোমাকে পারতেই হবে, নীলু। কাঠের তক্তার দুলুনির সঙ্গে শরীরটা দোলাও সেইসঙ্গে একটা পা বাড়িয়ে দাও, মনের জোর আন, শরীরে জোর আন, নীলু—তুমি ঠিক জয়ী হবে।

আঃ এসব কী হচ্ছে, অবচেতন! গগনদাকে কোথা থেকে এনে হাজির করলে? একইসঙ্গে শরীর দোলাব, পা বাড়াব, মনের জোর আনব, আমি কি ভেল্কিবাজি জানি? কলেজ জীবনে গগনদা আমাকে যত রাজ্যের ভুল জিনিস শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে গ্রামের ভাষায় কথা বলতে শেখ। বলেছিলেন, বিপ্লবের জন্য অস্ত্র তুল নাও। বলেছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম-ভালোবাসা বিসর্জন দাও। বলেছিলেন আদর্শের জন্য বন্ধুর বুকেও ছুরি মারবার জন্য তৈরি হও। সবগুলো এক সঙ্গে, আমার মাথা গুলিয়ে গিয়েছিল, আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলুম। যখন আমি চোখ মেললুম, তখন দেখলুম গগনদা নিজে এসব কিছু মানেননি, নিজে দিব্যি ফুরফুরে জীবন কাটাচ্ছেন। আমাকে চোখ মেলতে দেখেই তিনি বললেন, তুমি কে, আমি তোমাকে চিনি না।

বাবা, রিনি, গগনদার কথা অবচেতন থেকে উঠে আসছে কেন? এটা কি রূপক নাকি? অন্ধকার রাত্তিরে একটা খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর ওপরের বিপজ্জনক সাঁকো দিয়ে আমি একলা পার হচ্ছি, এটা কোনও প্রতীকের ব্যাপার। ক্ষুরস্য ধারা নিশিতয়া...ধারালো ক্ষুরের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার নামই জীবন, উপনিষদ-ফুপনিষদে এরকম কিছু গালভরা কথা আছে না? ষাঁড়ের পেচ্ছাপ। রূপক-টুপক কিছু না হলে বাঁচা যেত। ছ'খানা উৎকট আততায়ী জোর করে আমাকে ধরে নিয়ে এল, কেন আমার ওপর তাদের রাগ তা জানি না, আমাকে এক গুলিতে খতম না করে তারা আমাকে এই বীভৎস তামাসায় নামিয়ে দিয়েছে, সামান্য পদলন হলেই সোজা মৃত্যু, এটাই কঠোর বাস্তব। আমার জীবনে আজকের এই রাতটা শেষ হবে না বোধহয়।

—এই দুই-তিন-চার-পাঁচ...

—যাচ্ছিরে বাবা, যাচ্ছি। বাঁচতে কার না সাধ হয়? যে-কোনও উপায়ে, দাঁতে দাঁত কামড়ে সবাই বেঁচে থাকতে চায়। যাচ্ছি-যাচ্ছি।

—কাঠের তক্তার দুলুনিটা থেমে গেছে হঠাৎ। তাহলে সম্ভবত পেরিয়ে এসেছি মধ্যপথ। খুব গরম লাগছে। জামাটা খুলে ফেলতে পারলে ভালো হত। এই অন্ধকারে প্যান্টটা খুলে ফেললেই বা ক্ষতি কী ছিল, শরীরটা আরও হালকা হত। ওরা একটা ভালো কাজ করেছে, হয়তো ভুল করেই, আমাকে খালি পায়ে আসতে দিয়েছে। পায়ের আঙুলগুলো আমার বহুকাল আগের পূর্বপুরুষের মতন আঁকড়ে ধরেছে তলার অবলম্বনটা।

—নীলু তুই ভয় পাসনি, আমি সবসময় তোর সঙ্গে আছি।

—বাবা, তুমি আবার এসেছ? বাবা, তুমি যখন সঙ্গে থাকতে, তখনও কি আমি অনেক অচেনা রাস্তায় হারিয়ে যাইনি? আমি নিজেই তো শেষপর্যন্ত পথ খুঁজে পেয়েছি।

—নীলু সেইসব সময়েও বাবা-মায়ের স্নেহ ঘিরে থাকে সন্তানকে। সন্তানেরা বোঝে না, স্নেহ নিম্নগামী বলেই তারা বোঝে না, তারা বাবা-মায়ের কথা ভুলে গিয়ে নিজের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে থাকে...

ভাই অবচেতন, কেন বাবাকে ফিরিয়ে আনলে? এতে যে আমি আরও দুর্বল হয়ে পড়ব। বাবার মৃত্যুশয্যার পাশে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি, বাবার অনেক সঠিক নির্দেশ আমি মানিনি, বন্ধুবান্ধব সান্নিধ্যে, একটা অদ্ভুত ছটফটানির মধ্যে মত্ত হয়ে ছিলুম। কিন্তু এই কি সেইসব ব্যাপার নিয়ে অনুশোচনার সময়? যদি কারুকে আনতেই হয়, রিনিকে নিয়ে এসো। আর কিছু না হোক, রিনির কণ্ঠস্বরই আমাকে সঞ্জীবনী শক্তি এনে দেবে।

ওঃ হো আমার নিজেরই অবচেতন, অথচ আমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। চাইলুম রিনিকে, নিয়ে এল গগনদাকে। ওগো প্রিয় অবচেতন, তুমিও কি ওই ছ'জন অপরাধ কর্মীর মতন মজা মারছ আমাকে নিয়ে? নইলে এখন গগনদাকে নিয়ে আসার কী মানে হয়? গগনদার মতন মানুষেরা চিরকালই এইরকম বড়-বড় গালভরা বাণী দিয়ে যাবে। তা শুনে হয়তো দু-চারজন শেষ পর্যন্ত পৌঁছোবে মুক্তির দরজায়, আর বাকি যে কয়েকশো বা কয়েক হাজার টুপটাপ করে খসে পড়ে যাবে অতলে, তাদের হিসেব কে রাখবে? আমি ওই খসে পড়ার দলে। অথচ আমার বাঁচতে ইচ্ছে করে। সত্যি বলছি, মা কালীর দিব্যি, আমার ভীষণ বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। যারা নেমন্তন্ন বাড়ির বাইরে বসে এঁটো পাতা চাটে, আমি তাদের একজন হয়েও বেঁচে থাকতে চাই। আমি নদীতে আছড়ে পড়ে টুকরো-টুকরো হতে চাই না।

ডান পা, বাঁ-পা, ডান পা, বাঁ-পা, ডান পা, বাঁ-পা। আমার অবচেতন নেই। এখন সমস্ত মন শুধু আমার পায়ে। আমার চোখ বাঁধা, মুখ বাঁধা, আমার হাত বাঁধা। শুধু পা দুটো খোলা। এই পা নিয়েই আমাকে বাঁচতে হবে। আমি পিছিয়ে যেতে পারব না। আমি থেমে থাকতে পারব না। ওরা রাইফেল উঁচিয়ে টর্চ ফেলে কি এখনও দেখছে আমাকে? আর কত দূর, কত দূর, কত দূর, আমি কতক্ষণ ধরে হাঁটছি!

কাছেই যেন গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সত্যি-সত্যি মানুষের গলা, অবচেতন নয়, পিওর অ্যান্ড সিম্পল বাস্তব। আমি কি তাহলে পৌঁছে গেছি, বেঁচে গেছি। ব্রিজের এপারেও মানুষ আছে, তারা কথা বলছে। ভাগ্যিস ওরা আমার কানও বেঁধে দেয়নি। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।

একজন বলল, বাক আপ! বাক আপ! এসে গেছে! এসে গেছে! আর কয়েক পা!

আর-একজন বলল, মাই গড, সত্যি হারামজাটা পৌঁছে গেল?

আরও একজন বলল, ওনাট ইজ টু ফোর। আমি বলেছিলুম না, প্রাণের টান বড় টান। এ শালা ঠিক পার হয়ে যাবে। আমার বাজির টাকা দিতে হবে কিন্তু।

আমি থমকে গেলুম। কণ্ঠস্বরগুলো আমার চেনা। এরাই ওপারে ছিল, এরাই আমাকে জোর করে ধরে এনেছে।

কাছাকাছি আর কোনও সুবিধেজনক, নিরাপদ, সংক্ষিপ্ত সেতু আছে নিশ্চয়ই, তা দিয়ে ওরা পেরিয়ে এসেছে। সেইসব সেতুর সন্ধান, এমনকী এই অন্ধকার রাত্তিরেও ওরাই শুধু জেনে যায়। ওরা সবকিছু সহজে পায়।

ওদের একজন বলল, থামলি কেন রে। এবার জোর কদমে চলে আয়, আর কোনও ভয় নেই।

অন্য একজন বলল, এই লোকটা যে কামাল করবে, ভাবতেই পারিনি। একে একটা কিছু পুরস্কার-টুরস্কার দেওয়া উচিত।

আর-একজন বলল, নিশ্চয়ই, আমরা স্পোর্টসম্যান স্পিরিট দেখাতে জানি। ও এপাশের মাটিতে পা দিলেই ওকে উইনার বলে ডিক্লেয়ার করব। ওরে, তুই কী চাস, দেড় বিঘে জমির ওপর বাড়ি, ফরেন ট্রিপ, ওষুধের এজেন্সি, রাস্তা তৈরির কন্ট্রাকটরি—কী চাস বল?

আমার পা দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। ছেলেবেলায় একটা কথা শুনেছিলুম, খেজুর গাছের তিন হাত। সাধারণ লোকের পক্ষে খেজুর গাছ বেয়ে ওঠাই শক্ত, সবচেয়ে শক্ত শেষ তিন হাত ওঠা। তীরে এসে যেমন তরী ডোবে। আমি আর এগুতে পারছি না। না, আর-এক পা-ও বাড়ানো যাবে না।

আমার অবচেতন বলল, যাঃ, এ কী করছ মাইরি। এখানে সাঁকোর তলায় জল নেই, মাটি, তুমি এখন এক দৌড়ে পার হয়ে যেতে পারো।

আমি হেসে পেছন ফিরলুম।

ওপারে পৌঁছলেই লোকগুলো আমাকে কিছু পুরস্কার দেবে বলছে। এটা ওদের খেলা। সবাই বাঁচতে চায়, অমিও বাঁচতে চাই। কিন্তু বেঁচে থাকার মধ্যে একটা আত্মগরিমা থাকবে না? তা না হলে শুধু পোকামাকড়ের মতন...। শুধু একটা বাস্তব জীবন? কেউ সামনে একটা গাজরের টুকরো ঝুলিয়ে রাখবে, তাই দেখে ছুটে যাওয়া? আমাদের ওদের নিয়মে খেলতে হবে!

আমি উলটো দিকে ফিরে পা বাড়াতেই এপারের লোকজন হইহই করে বলে উঠল আরে-আরে লোকটা পাগল হয়ে গেছে নাকি? ওরে গাধা, কোন দিকে যাচ্ছিস? এদিকে আয়, দৌড়ে আয়, তুই বেঁচে গেছিস...

আমার মুখ বন্ধ, তবু আমি বললুম, এবার শুরু হবে আমার নিজস্ব খেলা।

পুঁজিবাদের কবলে শিক্ষা - সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

পুঁজিবাদের কবলে শিক্ষা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১.

গুণ নির্ভর করে মানের ওপর। বাংলা ভাষায় মানের অর্থ একটা নয়, একাধিক; একটা অর্থ মাত্রা, আরেকটা অর্থ সম্মান। মাত্রা অর্থে মানের সঙ্গে সম্মান অর্থে মানের খুবই নিকট আত্মীয়তা। যে বস্তুর মানসম্মান বেশী তার মাত্রাও উঁচু হবে এমনটা প্রত্যাশিত। সম্মান কমলে মানও কমবে। অন্য ক্ষেত্রে যেমন শিক্ষাক্ষেত্রেও এটা সত্য। বাংলাদেশে শিক্ষার মানও শিক্ষার সম্মানের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে সংযুক্ত।

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। গল্প নয় সত্য ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকাতেই রোকেয়া হলের সামনে এক অধ্যাপক রাস্তা পার হচ্ছিলেন। দ্রুতগামী একটি মোটর গাড়ী তাকে প্রায় চাপা দিয়ে ফেলছিল; কিন্তু দেয় নি, গাড়ীটি থেমে গেছে, ভেতর থেকে আরোহী বের হয়ে এসে অধ্যাপককে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, বন্ধু, তোমার কাছে আমি কত যে ঋণী তা তুমি জানো না।' তারপর তিনি ঋণের কথা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এবং সংক্ষেপে জানালেন। বললেন, তুমি সাহায্য করেছিলে বলেই আমি দ্বিতীয় শ্রেণী পেয়েছিলাম, আরও বেশী যে সাহায্য করোনি তার জন্যও আমি বিশেষ ভাবে ঋণী, কারণ সেটা করলে আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রান্তিক অবস্থানে না গিয়ে কিছুটা উঁচুতে থাকতাম, মাস্টার হতাম কলেজে, জীবন হতো অধঃপতিত। দ্বিতীয় শ্রেণীতে নীচু স্থান পেয়ে ইপিসিএস দিলাম, পেলাম কাস্টমস, তাতে দেখো আমার দাপট। আর খোদা না করুন যদি তোমার মতো ফাস্ট ক্লাস পেয়ে যেতাম, তাহলে আমার দশাও তোমার দশাই হতো। তারপর হাসাহাসি করে পরস্পরের পিঠ চাপড়িয়ে তারা বিদায় নিয়েছিলেন।

এটা পাকিস্তান আমলের ঘটনা। সে রাষ্ট্রটি ছিল ঘৃণিত, আমরা স্বপ্ন দেখতাম মুক্তির; মুক্তি আমরা পেয়েছি বলেও প্রচার আছে, তবে শিক্ষার মানমর্যাদা কী বেড়েছে, নাকি কমেছে? মানতেই হবে সত্য তো এটা যে মানসম্মান বৃদ্ধি পায় নি, হ্রাস পেয়েছে। তবে শিক্ষার মান জিনিসটা কেবল যে শিক্ষার মানসম্মানের ওপর ভর করে থাকে তা নয়, দেশের মানসম্মানের বৃদ্ধির ওপরও শিক্ষার মানের ওপরে ওঠাটা নির্ভর করে। এরা পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। পানি যেমন একই স্তরে থাকাটা পছন্দ করে শিক্ষার মানও তেমনি দেশের মানসম্মানের স্তরেই রয়ে যায়।

স্বাধীনতার পরে যুদ্ধের কারণে দেশের মানসম্মান বেড়েছিল, তারপর সেটা ক্রমাগত নেমেছে। এই লেখা লিখতে লিখতেই খবর পড়লাম বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে অনিরাপদ দেশগুলোর একটি; অথচ এখন এখানে কোনো যুদ্ধ নেই, পরিবেশ শান্ত, এবং উন্নতির ধারা অব্যাহত। মাস দুয়েক আগে খবরের কাগজে শিরোনাম পড়েছি বায়ুদূষণে মৃত্যুর ঝুঁকিতে বাংলাদেশের স্থান এখন শীর্ষে। আরও জানা গেল যে বাংলাদেশে গত দশ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে সাড়ে পঁচিশ হাজার মানুষ । এটা সরকারী হিসাব, বেসরকারী হিসাব বলবে সংখ্যা আরও অধিক, আহতের সংখ্যা হিসাব করা নিশ্চয়ই কঠিন। ওদিকে ঘরে বাইরে পথে ঘাটে যে ভাবে গণধর্ষণ, শিশুধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যা, এমনকি মৃত নারীকে ধর্ষণের সব খবর পাওয়া যায় তাতেও একটা সত্যেরই সমর্থন মেলে, সেটা হলো, জীবনের নিরাপত্তার উন্নতি ঘটে নি, বরঞ্চ অবনতিই পরিস্ফুট; ওদিকে অভাবের দরুন আত্মহত্যার ঘটনাও বাড়তির দিকেই। নিরাপত্তাহীনতা যে শিক্ষার জন্য অনুকূল নয় সেটা তো জানা কথা। একাত্তর সালে বাংলাদেশের মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল, তখন দেশের শিক্ষার চর্চা সম্ভব ছিল না।

শিক্ষার মান আর শিক্ষকের সম্মান, এরাও অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশে শিক্ষকদের সম্মান কতটা বেড়েছে তা কোনো লুকানো ব্যাপার নয়। ইউএনও গেছেন পরীক্ষা কেন্দ্রে, তাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছেন কর্তব্যরত শিক্ষক। এই অপরাধে শিক্ষকের কঠিন শাস্তি হয়ে যাচ্ছিল, কোনোমতে রক্ষা পেয়েছেন, আনুষ্ঠানিক ভাবে মাপ চেয়ে। পরে জানা গেছে সেই প্রশাসক এবং ওই শিক্ষক বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে, একই সময়ে সরকারী চাকরীতে ঢুকেছিলেন; একজন গেছেন প্রশাসনে অপরজন শিক্ষায়, দু’জনের বন্ধুত্ব থাকার কথা, কিন্তু অবস্থা এমন যে এখন শিক্ষককে নতজানু হতে হয় প্রশাসকের কাছে। এ খবর পত্রিকায় এসেছে।
হাতী যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে, বেড়াতে। রোজই যায়, আর বোজই দেখা যায় অন্যরা সরে দাঁড়ায়, সম্মান করে, কিন্তু একটি ব্যাঙ লাফিয়ে উঠে হাতীর গায়ে লাথি মারে। বেচারা হাতী আর কী করে, ব্যাঙের সাথে তো লড়াই চলে না। কিন্তু অন্যদের কৌতূহল বাগ মানে না, তারা জানতে চায় ব্যাঙ কী করে এমন সাহসী হলো যে সে হাতীকে লাথি মারে। গোয়েন্দা তদন্তে প্রকাশ পেল যে ব্যাঙটি যেখানে বসে থাকে তার নীচে একটা পুরানো টাকা আছে পোতা; তার গরমেই ব্যাঙের অমন সাহস ও দম্ভ। সাধারণ ব্যাঙ নয়, যে ব্যাঙ টাকার গরমে তপ্ত সেই শুধু পারে হাতীকে ওই ভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে। এই গল্পের গরম ব্যাঙ ও নরম হাতীর সম্পর্কটা বহুক্ষেত্রেই সত্য, সত্য সে বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রও। জ্ঞান এখানে বেশ কুণ্ঠিত অবস্থায় আছে, টাকা ও টাকাওয়ালাদের দাপটে।
আর যদি এমন হয় যে বেসরকারী স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ডেকে আনেন স্থানীয় এমপি (যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তোট না পেয়েও) এবং কল্পিত এক অপরাধে শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করান এবং পরে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থায় ওই শিক্ষক যদি কান্নাভেজা কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন তাকে নিয়ে হৈচৈ না করাটাই ভালো, কারণ তিনি একজন দুর্দশাগ্রস্ত পিতা ঘরে যার তিনটি বিবাহযোগ্যা কন্যা সন্তান বর্তমান, তাহলে শিক্ষার মান ওপরের দিকে উঠবে কি ভাবে? এসব ঘটনাকে ব্যতিক্রমী বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। বিভিন্ন মাত্রায় এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে, অতিমাত্রায় হলেই খবর হয়, নইলে চাপা থাকে। পার্থক্যটা আসলে পরিমাণেরই, গুণের নয়। ওদিকে শিক্ষকরা যে বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করেন, রাস্তায় নামেন, পুলিশের হাতে মার খান, অনশন করেন, এমন কি দুয়েকজনকে মৃত্যুবরণও করতে হয়, এসবও বাস্তব সত্য। এমনটা হলে তো শিক্ষার মান বাড়বে না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে দেখতে চায় বীর হিসেবে, যে বীরের খোজ তারা অন্যত্র পায় না। শিক্ষকদের সামাজিক দীনতা শিক্ষার্থীদেরকে ভেতরে ভেতরে খুবই হতাশ করে।

স্বভাবতঃই শিক্ষার মান বাড়ছে না। বিশ্ব জরীপে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরই সম্মানজনক উল্লেখ নেই। ওই জরীপ কী ভাবে তৈরী হয়, তথ্য সরবরাহে ঘাটতি ছিল কি না, এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু এই সত্য কেউ অস্বীকার করবেন না যে মান উঠছে না, নামছেই। এবং সেটা অবশ্যই দুশ্চিন্তার ব্যাপার। কিন্তু শিক্ষার মান কিছুতেই বাড়বে না যদি শিক্ষার মানসম্মান বাড়ানো না যায়। বাংলাদেশে এখন মান বাড়ছে একটা জিনিসেরই, সেটা হলো টাকা। টাকায় সব কিছুই কেনা যায়, কেনা যায় শিক্ষাও। কেবল কেনা যায় না, টাকা না থাকলে শিক্ষাকে আয়ত্তে আনা অসম্ভব। যে জন্য হাজার হাজার ছেলেমেয়ে প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে, তারপরেও ছিটকে পড়ে যাওয়া সংখ্যা বাড়তেই থাকে। যাদের টাকা নেই, তাদের শিক্ষাও নেই, মানসম্মত শিক্ষার কথা দুরে থাক। একটি গল্প চালু আছে; ঈশপের আধুনিক গল্প, যাতে আমাদের বর্তমান অবস্থাটা সুন্দর ভাবে ধরা পড়ে। হাতী যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে, বেড়াতে। রোজই যায়, আর বোজই দেখা যায় অন্যরা সরে দাঁড়ায়, সম্মান করে, কিন্তু একটি ব্যাঙ লাফিয়ে উঠে হাতীর গায়ে লাথি মারে। বেচারা হাতী আর কী করে, ব্যাঙের সাথে তো লড়াই চলে না। কিন্তু অন্যদের কৌতূহল বাগ মানে না, তারা জানতে চায় ব্যাঙ কী করে এমন সাহসী হলো যে সে হাতীকে লাথি মারে। গোয়েন্দা তদন্তে প্রকাশ পেল যে ব্যাঙটি যেখানে বসে থাকে তার নীচে একটা পুরানো টাকা আছে পোতা; তার গরমেই ব্যাঙের অমন সাহস ও দম্ভ। সাধারণ ব্যাঙ নয়, যে ব্যাঙ টাকার গরমে তপ্ত সেই শুধু পারে হাতীকে ওই ভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে। এই গল্পের গরম ব্যাঙ ও নরম হাতীর সম্পর্কটা বহুক্ষেত্রেই সত্য, সত্য সে বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রও। জ্ঞান এখানে বেশ কুণ্ঠিত অবস্থায় আছে, টাকা ও টাকাওয়ালাদের দাপটে।

ধানের ব্যাপারটা তো আর গল্প নয়। ধানের দাম পড়ে গেছে, কাণ্ডটা ঘটেছে। মিলমালিকদের কারসাজিতে। মিলমালিকরা টাকাওয়ালা, গরীব ধানচাষী অসহায় শ্রমিক বটে, তাই তার দুরবস্থা। বাজারে এখন জ্ঞানের ও ধানের একই অবস্থা, এবং তারা পরস্পর-সম্পর্কিত এই দিক থেকে যে উভয়েই টাকার কারণে অবমূল্যায়িত, এবং টাকার দ্বারা শাসিত। উন্মুক্ত বাজার টাকা চেনে, কোনটা ধান আর কোনটা জ্ঞান তা তার জানার দরকার নেই, এবং বাজারের পক্ষে এটাতো কোনো বিবেচনার বিষয় নয় যে ধান ছাড়া দেশের মানুষ প্রাণে মরবে, জ্ঞান ছাড়া মরবে মনে।

২.

ধানের মতোই জ্ঞানও শ্রামেরই ফসল । বিদ্যালয়ে জ্ঞানের চর্চা হয়, সেখানে দুটি পক্ষ থাকে; শিক্ষক এবং ছাত্র। এদের মিলিত শ্রমেই শিক্ষার অনুশীলন। শিক্ষার মান সরাসরি নির্ভর করে শিক্ষকের মানের ওপর। শিক্ষকও একজন কর্মী। তিনি জ্ঞান আহরণ করেন, এবং বিতরণ করেন। কিন্তু শিক্ষক কেবল যে দাতা তা নয়, তিনি গ্রহীতাও। ছাত্রের কাছ থেকে তিনি গ্রহণ করেন আগ্রহ ও প্রাণবন্ততা। ছাত্র আগ্রহী হলে শিক্ষকের আগ্রহ বাড়ে; ছাত্রের কৌতূহল, উচ্ছলতা শিক্ষককে প্রাণবন্ত করে তোলে। ছাত্রের প্রশ্ন ও কৌতূহল শিক্ষককে পাঠদানের বিষয়কে আরও ভালোভাবে জানার ব্যাপারে উৎসাহী করে। শিক্ষকতার কাজটা তখন জীবিকার্জনের একঘেয়ে গ্লানিকর কর্তব্য থাকে না। শিক্ষক চরিতার্থতা পান; যে চরিতার্থতা শিক্ষাদানের জন্য একান্ত অপরিহার্য। ভালো শিক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রে বেতন-ভাতার তুলনায় এই চরিতার্থতা কম মূল্যবান নয়। ভালো শিক্ষক না পেলে তো শিক্ষার গুণ ও মান বাড়বে না। বাংলাদেশে ভালো শিক্ষক পাওয়াটা এখন বড় একটা সমস্যা।
শিক্ষার মান আর শিক্ষকের সম্মান, এরাও অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশে শিক্ষকদের সম্মান কতটা বেড়েছে তা কোনো লুকানো ব্যাপার নয়। ইউএনও গেছেন পরীক্ষা কেন্দ্রে, তাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছেন কর্তব্যরত শিক্ষক। এই অপরাধে শিক্ষকের কঠিন শাস্তি হয়ে যাচ্ছিল, কোনোমতে রক্ষা পেয়েছেন, আনুষ্ঠানিক ভাবে মাপ চেয়ে। পরে জানা গেছে সেই প্রশাসক এবং ওই শিক্ষক বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে, একই সময়ে সরকারী চাকরীতে ঢুকেছিলেন; একজন গেছেন প্রশাসনে অপরজন শিক্ষায়, দু’জনের বন্ধুত্ব থাকার কথা, কিন্তু অবস্থা এমন যে এখন শিক্ষককে নতজানু হতে হয় প্রশাসকের কাছে। এ খবর পত্রিকায় এসেছে।
মেধাবানদেরকে শিক্ষকতায় নিয়ে আসা চাই। মেধাবান হওয়া অর্থ কেবল যে জ্ঞানী হওয়া তা নয়, শিক্ষকতাতে আগ্রহী হওয়াও চাই। অন্য চাকরী পান নি বলে শিক্ষক হয়েছেন এমন লোকদের দিয়ে কুলাবে না। তেমন শিক্ষক চাই যিনি জ্ঞানী এবং একই সঙ্গে উৎসাহী সেই জ্ঞানকে অন্যের কাছে পৌছে দিতে, এবং পৌছে দেবার প্রক্রিয়াতে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তুলতে। এই রকমের মানুষদেরকে শিক্ষাক্ষেত্রে টেনে আনতে হলে বেতন-ভাতার বিষয়টা দেখতে হবে বৈকি। বেতন ভাতা সম্মানজনক হওয়া চাই, এবং অন্য পেশার চাইতে বেশী হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়, যাতে করে মেধাবীরা আসেন, এবং কোচিং সেন্টারে না গিয়ে ক্লাসরুমে শিক্ষাদানেই নিবিষ্টচিত্ত হন।

কিন্তু শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র ও উন্নত বেতন স্কেল তো বাস্তবে নেই। আর তার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষাখাতে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ আনুপাতিক হারে বাড়ছে না, জাতীয় বাজেটের ১১ শতাংশের ওপরে সেটা কিছুতেই ওঠে না, ভীষণ তার গড়িমসি। জিডিপি’র শতকরা ২ ভাগ বরাদ্দ করলে কিছুই চলবে না, অন্তত ৬ ভাগ বরাদ্দ চাই। অনুৎপাদক ও আমলাতান্ত্রিক খাতগুলো থেকে টাকা কেটে সেটা নিয়ে আসা চাই শিক্ষায়।

কিন্তু সমস্যাটা কেবল বরাদ্দের নয়, বরাদ্দের যথাযথ খরচেরও। টাকা কেবল ঢাললেই চলবে না, দেখতে হবে ঠিক জায়গাতে গিয়ে পড়ছে কি না। দুর্নীতি কত যে ব্যাপক সে তো আমরা জানি। পুলিশের ডিআইজি যখন স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালককে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা নগদ ঘুষ দেয় তখন তো বোঝাই যায় যে নজরদারীটা কত দুর্বল। আর ফাস-হয়ে-যাওয়া এ খবর তাৎপর্যও উপেক্ষণীয় নয় যে একজন শিক্ষাকর্মকর্তা ওই দুর্নীতি দমন কমিশনেরই একজন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘুষের অঙ্কটিকে এক কোটি থেকে পঞ্চাশ লক্ষতে নামিয়ে আনা যায় কি না এ নিয়ে দরকষাকষি করছেন। অন্য ক্ষেত্রের মতোই শিক্ষাক্ষেত্র দুষ্ট হবার পরে এখন নষ্ট হবার পথে রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এটা আমরা জানি, আর এটাও জানি, বাধ্য হই জানতে যে, শিক্ষক হতে হলে নগদ টাকা ঘুষ দিতে হয়, আর সে-টাকা যে সামান্য তা নয়, বিপুল পরিমাণেরই। নজরদারী তাই অত্যাবশ্যক। তবে তার জন্য সরকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, সামাজিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবকদের এগিয়ে আসা চাই। সমাজে সৎ লোক যে নেই তা নয়, সংখ্যায় তারাই অধিক, কিন্তু তাদের ক্ষমতা নেই, কারণ তারা বিচ্ছিন্ন, অন্যক্ষেত্রে যেমন এক্ষেত্রেও তেমনি সন্মানুষদের ঐক্য চাই। আবার শুধু যে সরকারী বরাদ্দেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলবে এমনও নয়। বেসরকারী দান অনুদানও আসতে হবে। কিছু কিছু আসেও; আরও আসবে যদি আবহাওয়া তৈরী করা যায়। আবহাওয়া এখন বিরূপ। প্রকৃতিরও, সমাজেরও।

বিদ্যালয় ছাত্র শিক্ষকের মিলন কেন্দ্র ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশী কিছু । বিদ্যালয় হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠান; যেখানে বিদ্যার চর্চা হয় সামাজিক ভাবে, এবং সাংস্কৃতিক ভাবেও। সামাজিকতাটাই প্রধান। একজন শিক্ষার্থী যখন বাড়ী থেকে বিদ্যায়তনে আসে, তখন ছােট জায়গা থেকে বড় জায়গায় তার প্রবেশ ঘটে। জায়গাটা মুক্তির। শিক্ষার্থীর জন্য একেবারে প্রথম শিক্ষাটাই হলো সামাজিকতার। এই শিক্ষা তার বাকি জীবনের জন্য হবে সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। পরে তার জ্ঞান বাড়বে, বাড়বে তার সামাজিকতাও। সামাজিকতাটা বিঘ্নিত হয় যদি সে আনন্দ না পায়, যদি মনে করে সে মুক্ত প্রাঙ্গণে আসে নি, এসে পড়েছে কয়েদখানায় কিংবা কারখানায়। সে ক্ষেত্রে তার শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা যাবে সংকুচিত হয়ে।

এখন ওই সংকোচনটা বড় বেশী ঘটছে। শিক্ষা যা দেওয়া হচ্ছে সেটা পর্যাপ্ত নয়, আর যেটুকুই বা দেওয়া হচ্ছে তাও শিক্ষার্থী ঠিক ভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। তার সার্বক্ষণিক ভয় পরীক্ষার। আমাদের বিদ্যায়তনিক শিক্ষা সবসময়েই ছিল পরীক্ষামুখী, এখন সেটা রীতিমত পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। পড়ানো যা হচ্ছে তা পরীক্ষায় পাশের জন্য। পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, এবং চেষ্টা হয়েছিল একেবারে প্রাথমিক স্তরেই পরীক্ষার হলে শিশুদেরকে টেনে আনার। আশা করি সেটা পরিত্যক্ত হবে। পরীক্ষা যত কম হয় ততই মঙ্গল, বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষা। পরীক্ষার ব্যাপারে চাপ যত বাড়ে মূল বই পড়ার প্রয়োজন তত কমে যায়। শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের উত্তর রপ্ত করতে ব্যস্ত থাকে, শিক্ষার দিকে মনোেযোগ না-দিয়ে । শিক্ষকরাও ওই ভাবেই পড়ান। ছাত্রদেরকে ভালো নম্বর পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করাটাই শিক্ষক হিসেবে তাদের সাফল্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরিখ হয়ে দাঁড়ায়। আর পরীক্ষায় যে এম সি কিউ প্রশ্নরীতি চালু হয়েছে এটা খুবই ক্ষতিকর। এতে শিক্ষার্থীরা এমনকি প্রশ্নটাও ভালো করে বুঝতে চায় না। এ বি সি ডি-তে দাগ দেবার কায়দা শেখে। আরেক উৎপাত সৃজনশীল পদ্ধতি। এটা শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক কেউই ঠিক মতো বোঝেন না। ছাত্ররা তো বটেই শিক্ষকরাও গাইড বুকের শরণাপন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা, এম সি কিউ, সৃজনশীল পদ্ধতি, সবকিছুই একত্র হয় কোচিং সেন্টার ও গাইড বুক ব্যবসাকে সরগরম করতে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার কথা ধরা যাক। সবাই বলেন শিক্ষার মান এখানে বেশ ভালো ভাবেই নেমে গেছে। বাড়িয়েই বলেন কারণ মান যে অতীতে খুব উঁচু ছিল আর এখনও যে একেবারে অধঃপতিত তা নয়, আসলে যা কমেছে তা হলো শিক্ষার্থীদের আগ্রহ। শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় কম আগ্রহী। তারা আসে, থাকে, চলে যায়; কিন্তু শিক্ষার ব্যাপারে তাদের প্রবল আগ্রহ দেখা যায় না। এর কারণ আছে। মূল কারণটা ভবিষ্যৎ দেখতে না-পাওয়া। অধিকাংশের চোখেই স্বপ্ন নেই, মুছে গেছে। যাদের আছে তাদেরটাও ম্রিয়মান। শিক্ষার্থীরা জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা দেখতে পায় না। এই অনিশ্চয়তা আগের দিনেও ছিল; কিন্তু তখন তবু আশা করা যেত যে কিছু একটা ব্যবস্থা হবে, এখন সে আশাটা ক্ষীণ। দেশে যে উন্নতি হয়েছে তার দুর্বলতাগুলোর মধ্যে খুব বড়মাপের একটি হলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়া। উন্নতি যা হয়েছে তার প্রায় সবটাই শ্রমের কারণেই; কিন্তু বিনিয়োগ ঘটছে না। কর্মের বিপুল শক্তি আটকা পড়ে গেছে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার জাঁতাকলে। বেকারত্বের সমস্যাটা ক্রমাগত বাড়ছেই; বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা তো এখন ভয়াবহ। যে তরুণ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে; তার দুশ্চিন্তা হয় বের হয়ে কি করবে। পড়ালেখায় তার সেই দুর্দান্ত আকর্ষণটা নেই যেটা থাকা আবশ্যক ছিল। ছাত্রের এই অনাগ্রহ, শিক্ষককে নীরবে পীড়িত করে; জ্ঞানের অনুশীলনটায় প্রাণের ঘাটতি ঘটে যায়।

শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর গ্রহণক্ষমতা আসলে খুবই বড় ব্যাপার। আগ্রহের অভাব ঘটলে গ্রহণক্ষমতা হ্রাস পায়। হ্রাস প্রাপ্তির অবশ্য আরও কারণ আছে। সেগুলোর একটা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক জীবনের স্তিমিতদশা। শিক্ষার অনুশীলন কেবল ক্লাসে, লাইব্রেরীতে ও লেবরটারিতেই চলে না, ঘটে ছাত্রাবাসে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, পরস্পরের মেলামেশায়। এবং ছাত্রসংসদের নির্বাচনে। এটা অবশ্যই তাৎপর্যহীন নয় যে বিগত আঠাশ বছর ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদের কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নি; এমনটা পরাধীনতার আমলে কখনো ঘটে নি; না ব্রিটিশ শাসনে, না পাকিস্তানী শাসনে। এটা সার্বিক ব্যবস্থারই একটি প্রতিফলন। বোঝা যাচ্ছে প্রচারকার্য যতোই চলুক, সারবস্তুতে গণতন্ত্র আসে নি। ছাত্রসংসদ হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক-সামাজিক প্রাণবন্ততার কেবল ধারক এবং বাহকই নয়, প্রধান উদ্যোক্তাও। ছাত্র সংসদের নির্বাচন শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসব, মেধাবানদের জন্য সামাজিক স্বীকৃতি লাভের সুযোগ, এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে সজীব রাখার কর্মাধ্যক্ষ। শিক্ষাঙ্গন যদি আলোচনায়, বিতর্কে, নাটকে, গানে, সাহিত্যসৃষ্টিতে, খেলাধুলায়, জ্ঞানীদের বক্তৃতায় মুখরিত না থাকে তাহলে তো শিক্ষাঙ্গন তার প্রাণই

পুঁজিবাদের কবলে শিক্ষা ৭১ হারিয়ে ফেলে । দেখা দেয় আবিলতা। ছেলেমেয়েরা টের পায় যে সুস্থ বিনোদন নেই, আদান-প্রদান নেই চিন্তার ও কল্পনার, অনুশীলন নেই সাংস্কৃতিক মেধার, বিকাশ নেই নেতৃত্ব দানের শক্তির। তারা হতাশ হয়, অবসাদে ভোগে, মাদক ধরে কেউ কেউ, অন্যরা ঝিমায়, দেখা দেয় কলহ-বিবাদ । আত্মহত্যা পর্যন্ত করে। আর অতীতে যা কখনো শোনা যায় নি তা এখন শোনা যায়। সেটি হচ্ছে যৌন হয়রানি। চরম দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘটনায় যেখানে তথাকথিত এক ছাত্র ধর্ষণের শতসংখ্যা পূর্তির ঘোষণা দিয়েছিল। যৌন হয়রানির অভিযোগ কেবল ছাত্রদের নয়, শিক্ষকদের ব্যাপারেও উঠছে। সােনাগাজীতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ যখন ছাত্রীকে হয়রানি করে এবং ছাত্রী তার প্রতিবাদ জানালে অধ্যক্ষটি যখন তার রাজনৈতিক আর্থিক প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে জীবন্ত অবস্থায় ছাত্রীটিকে পুড়িয়ে মারে তখন একটি চরম বিয়োগান্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাটা যে কতদূর প্রসারিত হয়েছে সেই সত্যটাই বের হয়ে আসে।

৩.

শিক্ষার ব্যাপারে এই ধরনের বিভিন্ন অসুবিধার কথা আমরা বলতে পারবো, বলবোও; কিন্তু মূল প্রতিবন্ধকতাকে যেন না ভুলি। সেটা হলো তিন ধারার শিক্ষা। তিন ধারা দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করবে কি, উল্টো বিভক্ত করছে। এবং বিভাজনটা ঘটছে শ্ৰেণী পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করেই। জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হয়, কিন্তু ঐক্য যে নষ্ট করা হচ্ছে শিক্ষার মধ্য দিয়েই সেই সত্যটা অস্বীকতই রয়ে যায়। শিক্ষা সংস্কারের জন্য কমিশন ও কমিটি নিয়মিত গঠিত হতে থাকে, কিন্তু কোনো সংস্কারকই বলতে পারে না, হয় তো সাহসই করে না বলতে, তিন ধারাকে কী করে এক ধারাতে নিয়ে আসা যাবে। কারণ এটা তো স্পষ্ট যে এটি সংস্কারের ব্যাপার নয়, ব্যাপার সামাজিক বিপ্লবের, যে বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ যুগের পর যুগ ধরে সংগ্রাম করেছে, যে-সংগ্রামের একটি বড় পর্যায় ছিল একাত্তরের ওই মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়েছে, কিন্তু মানুষের মুক্তি আসে নি। আসার কারণ সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন না হওয়া। আর না-হওয়ার অনেক প্রমাণের একটি হচ্ছে তিন ধারার শিক্ষা।

তিন ধারা আগেও ছিল। ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তানের কালে সেটা বিকশিত হচ্ছিল, বাংলাদেশে এই বিভাজন থাকার আপাত-গ্রাহ্য কোনো অজুহাত ছিল না। সুবিধাভোগী বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা পড়বে ইংরেজী মাধ্যমে, মধ্যবিত্তের জন্য রইলো বাংলা মাধ্যম, আর যারা গরীব তাদের জন্য মাদ্রাসা, এটা তো ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিধান। সেই রাষ্ট্র শ্রেণীভেদকে জিইয়ে রাখতে চেয়েছিল, এবং শিক্ষাকে বিভেদ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বাসনা পোষণ করতো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল; ধারণাটি যে ভ্রান্ত ছিল তার বহু প্রমাণ পাওয়া গেছে, খুব পরিষ্কার প্রমাণ এটা যে তিন ধারার শিক্ষা রয়ে গেল। রাষ্ট্র চাইছিল সেটা থাকুক। কারণ রাষ্ট্র ছিল ব্রিটিশের উপনিবেশিক রাষ্ট্রের একটি নতুন সংস্করণ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধটা উপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোকে ঠিক রেখে বড় রাষ্ট্র ভেঙে একটি ছােট রাষ্ট্র তৈরী করার ছিল না, ছিল পুরাতন রাষ্ট্রের খোলনলচে বদলে ফেলে নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার, যেটি হবে গণতান্ত্রিক, অর্থাৎ শ্ৰেণী বৈষম্যবিহীন। কিন্তু সে রাষ্ট্র আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি নি; কারণ রাষ্ট্রক্ষমতা যাদের হাতে চলে গেল শ্রেণীগত দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা পূর্ববর্তী রাষ্ট্রশাসকদের মতোই পুঁজিবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক চরিত্রেও তাদের আপত্তি ছিল না। ফলে দেখা গেল রাষ্ট্রের বাইরের পরিচয় যাই হােক অন্তর্গত স্বভাব চরিত্রে কোনো পরিবর্তন এলো না। দেশে সরকার বদল হয়েছে, একটির পর আরেকটি এসেছে, কিন্তু দেখা গেছে তারা অন্য ব্যাপারে ভিন্ন, এমন কি কোনো কোনো ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী হলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পুঁজিবাদের প্রতি পক্ষপাতে অভিন্ন। যে জন্য সংবিধানে উল্লেখিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিকে একটি সরকার এসে কেটে ফেললো, কিন্তু পরের কোনো সরকারই তাকে আর ফেরৎ আনতে আগ্রহ প্রকাশ করল না। সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার এখন অতীতের বিলুপ্ত স্মৃতি।

একধারার শিক্ষার ভিত্তিটা কী? সেটা হলো মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা। সকল শিক্ষা অবশ্যই এক প্রকারের হবে না, ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সকল শিক্ষাই হবে মাতৃভাষার মাধ্যমে, সার কথা এটাই। এ বিষয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই যে শিক্ষার জন্য মাতৃভাষাই সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। আসলে মাতৃভাষা ছাড়া শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ গভীর স্থায়ী স্বাভাবিক ও সৃষ্টিশীল, এগুলোর কোনোটাই হতে পারে না। তদুপরি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাই ঘটেছে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী-নিয়েই এই সংগ্রামের সূচনা। বাংলা যে এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হবে এ নিয়ে কোনো দ্বিমত ছিল না; এবং মাতৃভাষার সেই স্বীকৃতি লাভে কোনো বিলম্বও ঘটে নি। কিন্তু দেখা গেছে যে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলো বটে কিন্তু রাষ্ট্রের ভাষা হলো না। উচ্চ আদালতে বাংলা কখনোই চালু ছিল না, স্বাধীন বাংলাদেশেও চালু করা যায় নি। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা মাধ্যমের অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত; কোনো কোনো এলাকাতে তো সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এটাও স্মরণীয় যে বাঙালীর সংখ্যা বাংলাদেশেই সতের কোটি ছুঁই ছুই, বাঙালী অন্যত্র এবং অন্য রাষ্ট্রেও আছে, সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা ত্রিশ কোটির কাছাকাছি হবার কথা। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের মাতৃভাষার মাধ্যমে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তো নয়ই, এমনকি নিম্নতর স্তরেও শিক্ষালাভ করতে পারছে না। এটা বাঙালীদের জন্য মোটেই সম্মানজনক নয়।

সবচেয়ে বড় কথা এই যে, মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে শিক্ষা লাভ না করাতে তাদের শিক্ষা মোটেই মানসম্মত হচ্ছে না। বাংলাদেশে যদি আমরা মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারতাম তাহলে একটি বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটে যেতে। বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হতো, শিক্ষার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটতো, এবং আমরা নিজেরাও বদলে যেতাম। প্রকৃত উন্নতি আটকে যেতো না শ্রেণীর খাদে পড়ে।

তিন ধারা এক হলে বিত্তবানেরা মূলধারার ব্যাপারে এখন যে উদাসীনতা দেখাচ্ছে সেটা দেখাতে পারতো না। কারণ অভিন্ন শিক্ষার মানের সঙ্গে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে পড়তো। এখন তো দেখা যাচ্ছে ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষার মান নিয়ে কোনো সংশয় নেই; সে-মান নামছে না; সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস নেই, সেশনজট ঘটে না, সিলেবাসে ও ক্যারিকুলামে রদবদল হয় না; সরকারী সিদ্ধান্তে পরীক্ষার ফলের ইতরবিশেষও ঘটে না। বিত্তবান অভিভাবকেরা তাই সন্তানদের ওইসব বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে নিশ্চিত থাকেন। মূলধারায় নিমগতিতে তাদের কোনো ক্ষতি নেই। সুবিধাই আছে, কারণ মূলধারার শিক্ষার্থীরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আসবে না। শিক্ষা এক ধারাতে থাকলে এরা সেই ধারার উন্নতিতে সচেষ্ট হতেন; সেখানে অর্থ, যত্ন ও উদ্বেগের বিনিয়োগ ঘটাতেন। আর রাষ্ট্র যেহেতু তাদেরই কর্তৃতাধীন তাই সরকারী মনোযোগের অভাব ঘটতো না। যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষার জন্য ব্যয় হয় সেটা চলে আসতো মূলধারাতে। আসততা দান অনুদান, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন। শিক্ষার মানসম্মান অনেক বৃদ্ধি পেতো।
শিক্ষকদের সামাজিক দীনতা শিক্ষার্থীদেরকে ভেতরে ভেতরে খুবই হতাশ করে।
সম্ভাবনা আরও ছিল। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেশের মেধাশক্তিকে অবারিত করে দিতে পারতো। তাতে জ্ঞানের চর্চা, উদ্ভাবনারও বিতরণ দেশকে নতুন নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতো। শিক্ষা এবং বৈষয়িক উন্নতি পরস্পরের ওপর ক্রিয়াশীল হতো, ফলে উভয়েরই বৃদ্ধি ঘটতো। তার দরুন উন্নতির ইতিহাস বৈষম্যবৃদ্ধির ইতিহাস না হয়ে সর্বজনীন মঙ্গলের ইতিহাসে পরিণত হতো, আর দেশের মানুষের ভেতরে যে বিপুল কর্মশক্তি শ্রেণীবিভাজনের খাদে অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে তা অবারিত হয়ে দারিদ্র্য সরিয়ে প্রাচুর্য নিয়ে আসতো। এই শক্তিটা যে কেমন অসাধ্য সাধন করতে পারে তার প্রমাণ তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেই লেখা আছে। কৃত্রিম হলেও, এবং খণ্ডিত মানুষ তৈরী করতে থাকলেও ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষার শক্তি আছে, আর সে শক্তি নিহিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরেই। রাষ্ট্রের কর্তারা পুঁজিবাদে দীক্ষিত আর ইংরেজী হচ্ছে বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রধান ভাষা, তদুপরি রাষ্ট্রের ভেতর প্রবহমান রয়েছে ইংরেজশাসনের উপনিবেশিক উত্তরাধিকার। ওদিকে আবার পুঁজিবাদী বিশ্বের ওপর রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতাও ইংরেজীর কদর বাড়িয়েছে। মনে রাখা দরকার যে ইংরেজী ভাষা যখন শিক্ষার মাধ্যম হয় তখন এটা যে কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ ঘটায় তাই নয়, একটা ভাবাদর্শ ও সংক্রমিত করে। সেটা হলো পুঁজিবাদী ভাবাদর্শ, যার ভেতর রয়েছে মুনাফালিপ্সা, বিচ্ছিন্নতা ও ভোগবাদিতা। বলা বাহুল্য, এগুলোর প্রত্যেকটি অত্যন্ত ক্ষতিকর।

পশ্চিমবঙ্গে এখন দেখছি সরকারী দল আওয়াজ তুলেছে ‘জয় বাংলা’র। বিজেপি দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে এখন বাঙালী সত্তাকে জাগিয়ে ভোলা আবশ্যক-উপলব্ধিটা এই রকমেরই। বিজেপির আগ্রাসনের ভেতর রয়েছে হিন্দী ভাষার আধিপত্যবাদিতা। হিন্দী বাংলাকে দখল করে নেবে, এই বিপদের কথাটা ভেবে সেখানকার অনেক মানুষ এখন সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন চাইছে। আমাদের বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, সেখানেই যখন বাংলাকে ব্যবহার নিয়ে আমরা এত অসুবিধার ভেতর আছি তখন বিশাল ভারতের ছােট একটি অঙ্গ রাজ্যে বাংলাকে একক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা যে মোটেই সহজ হবে না সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। সাতচল্লিশের সেই ভয়ঙ্কর দেশভাগ বাংলার মানুষের জন্য অনেক দুর্ভোগের কারণ হয়েছে, মস্ত বড় ক্ষতি হয়েছে বাংলা ভাষার। পশ্চিমবঙ্গের বিত্তবানরা তখন ভয় পাচ্ছিলেন মুসলিম আধিপত্যের, এখন সেখানকার বাঙালীরা বিপদগ্রস্ত হিন্দীর অগ্রাভিযানে। যে কলকাতাকে তারা পাকিস্তানের হাত থেকে রক্ষা করবেন ভেবেছিলেন সেই শহর এখন আর বাঙালীদের নেই। ওদিকে আক্রমণটা যে কেবল হিন্দীর তা তো নয়, ইংরেজীরও। হিন্দীকে রোখার চাইতেও কঠিন কাজ ইংরেজীকে রোখা, যেমনটা আমরা টের পাচ্ছি। উর্দুকে চাপানোর অভিসন্ধিকে আমরা পরাজিত করেছি, কিন্তু ইংরেজীর জন্য পথ দিয়েছি খুলে। মূল শত্রুটা পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। মাতৃভাষা লড়াইটা আসলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেই ।

৪.

স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশে এখনো আমরা বাংলা প্রচলনের লড়াইতে আছি। এই রাষ্ট্রের অভ্যুদয় মানুষকে মুক্তি দেবার অঙ্গীকার নিয়ে। এর সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রধান চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক। সাতচল্লিশে আমরা যখন স্বাধীন হই তখন দুর্ভিক্ষের অবস্থা তৈরী হয়েছিল, একাত্তরের পরেও দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছে; সে বিপদ কাটিয়ে উঠে যে চ্যালেঞ্জটা রয়ে গেল সেটা বাংলাভাষাকে সর্বক্ষেত্রে ও সর্বস্তরে ব্যবহার করার । সুস্পষ্ট কর্তব্য ছিল বাংলাকে উচ্চস্তরে শিক্ষার মাধ্যম করা। উচ্চ শিক্ষায় বাংলার ব্যবহারের উদ্যোগ পাকিস্তান আমলে যে নেয়া হয় নি তা নয়। উর্দুর উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলা উন্নয়নের চেষ্টাও রাষ্ট্রকে করতে হয়েছে, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড নামে একটি সরকারী সংস্থার প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল যার মূল কর্তব্য ছিল বাংলা ভাষায় উচ্চপর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা। সে কাজ অবশ্য বেশী দূর এগোয় নি। স্বাধীনতার পরে ওই বোর্ডটি আর থাকে নি, বাংলা একাডেমীর সঙ্গে মিশে গেছে। প্রত্যাশিত ছিল যে একাডেমী বোর্ডের কাজটিকে আরো বিস্তৃত করবে; সকল বিষয়ে উন্নত মানের পাঠ্যপুস্তক ও অনুষঙ্গী বই পাওয়া যাবে। কাজটা শুরুও হয়েছিল; কিন্তু এগোয় নি, এখন তো প্রায় পরিত্যক্ত ।

বাংলাভাষায় জ্ঞানের চর্চাকে উন্নত এবং সেই সাথে ভাষার ধারণ ও প্রকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ছিল মৌলিক গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি অন্যভাষা থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের বই প্রচুর পরিমাণে ও ক্রমবর্ধমান হারে অনুবাদ করা। অনুবাদের কাজটা মোটেই সহজ নয়, ক্ষেত্রবিশেষ মৌলিক সৃষ্টির চেয়েও কঠিন। অনুবাদ করতে হয় সতর্কতার সাথে, মূল রচনাকে যথার্থ ভাবে পাঠ করে। অর্থবিকৃতি অমার্জনীয়, যান্ত্রিকতা পরিহার্য। একাজে মূল ভাষা ও বাংলা ভাষা, দুটোতেই বিস্তর জ্ঞান দরকার। আর কাজটা কখনোই একা করা সম্ভব নয়। অন্যকে দেখাতে হয়, পরামর্শ নেওয়ার দরকার পড়ে, সম্পাদনা ও সংশোধন ছাড়া চলে না। আমরা বলছি ও শুনছি যে; বাংলাদেশে এখন গবেষণার মান ও পরিমাণ সন্তোষজনক নয়; বরাদ্দ অল্প, যেটুকু আছে তাও ঠিকমত খরচ হয় না; অনুবাদের বেলাতে দৃশ্যটা আরও করুণ; সেখানে বরাদ্দে প্রায় হাতই পড়ে না, অব্যবহৃত রয়ে যায়। অনুবাদের উদ্যোগ তেমন একটা দেখা যায় না, প্রেরণাও নেই। বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠাকালীন মূল অঙ্গীকার ছিল তিনটি; গবেষণা, সংকলন ও অনুবাদ। পরবর্তীতে দেখা গেছে তার আয়োজনে গবেষণা অল্প, সংকলনও উল্লেখযোগ্য নয়, অনুবাদ একেবারেই কম। আর সংকলনের ক্ষেত্রে তাদের প্রধান কৃতিত্ব যদিও অভিধান প্রস্তুত করা, এবং সে কাজ মোটামুটি প্রশংসনীয়ও; কিন্তু বাংলা অভিধানের ক্ষেত্রে তারা যে কারগুলোকে নির্বিচারে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন তাতে বাংলাভাষার কোনো উপকার হয় নি; শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিভ্রান্তিতে, আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতার । রচনাবলী’কে তাঁরা রচনাবলি করছেন, যেন হত্যাকাণ্ড। বাংলা ‘একাডেমী’কে নিজের নামে ‘ী'কে কর্তন করার জন্য জাতীয় পরিষদের শরণাপন্ন হয়েছে। এ যেন একটা মহাকীর্তি। বাংলা একাডেমী খুব ভালো করবে যদি বিভিন্ন দিবস উদযাপন ও উৎসব অনুষ্ঠানের ব্যাপারে মনোযোগ কমিয়ে, এমনকি বইমেলার দায়িত্বটা প্রকাশকদের হাতে ছেড়ে দিয়ে যেসব কাজের জন্য তার প্রতিষ্ঠান সেদিকে দৃষ্টি দেয়। বাংলাভাষার জ্ঞানচর্চায় এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমরা উক্তৃষ্ট প্রকাশনাও আশা করি। প্রকাশনা প্রসঙ্গে বলা দরকার যে বইমেলা উপলক্ষে হাজার হাজার বই ছাপা হয় ঠিকই কিন্তু জ্ঞান-সমৃদ্ধ বইয়ের সংখ্যা থাকে একেবারেই অকিঞ্চিতকর। গ্রন্থ প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবার কথা; বস্তুত একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে যে নিরিখগুলো দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব তার একটি হচ্ছে প্রকাশনা। এক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা যে প্রশংসা করবো এমন উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা যে হয় না তা নয়, হয়; কিন্তু সেগুলো জনসমক্ষে আসে কম, কারণ অধিকাংশ গবেষণাই হয় ইংরেজী ভাষাতে, এবং অনেক গবেষণাই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় না।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সবকিছুর ওপরে রাখে বাজারকে, যেখান থেকে মুনাফা আসবে। শিক্ষাবিদদের কাছ থেকে এমন বক্তব্যও আমরা পাই যে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নীতি চালু করাই মঙ্গলজনক। শিক্ষা যেন মানুষের জন্মগত অধিকার নয়, শিক্ষা ছাড়া যেন জাতি চলতে পারে। বাজার এখন নিয়ন্ত্রণভার নিয়ে নিয়েছে, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই, শিক্ষাক্ষেত্র বাদ থাকে কী করে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বেলাতে এখন আর কিছু বাকি নেই।

প্রতিষ্ঠাকালে, ১৯২১ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য শিক্ষার কোনো স্বতন্ত্র। বিভাগ ছিল না, পরে স্বতন্ত্র ফ্যাকাল্টি হয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে বিভাগের সংখ্যা; আইবিএও একসময়ে ছিল না, এখন কেবল আছে যে তা নয়, সেখানে ভর্তিতে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র, এবং শিক্ষাদান চলে দিবারাত্রি। কলেজে বাণিজ্য শাখায় এখন মেধাবী ছাত্রদের উপচেপড়া ভিড়। এসবই উন্নতির এবং বাজারের শক্তিবৃদ্ধির সাক্ষী। দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন একশ’ ছাড়িয়েছে, এদের বিস্তারের পেছনে বাণিজ্যিক প্রণােদনাই প্রধান, এবং প্রায় সকল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই বাণিজ্য-শাখায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের ওপর নির্ভরশীল। ওদিকে মানবিক বিদ্যার চর্চা ক্রমাগত কোণঠাসা হচ্ছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পাঠের কোনো বিভাগ নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও দর্শনের দশা ম্রিয়মান। দু'য়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্বতন্ত্র বিভাগ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইতিহাসের চর্চায় আগ্রহ কমেছে। ইতিহাস না জানলে অতীতের ব্যাখ্যা, বর্তমানের বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশ~-সবকিছুই বিঘ্নিত হতে বাধ্য। আবার ভুল ইতিহাস হচ্ছে বিষের মতো ভয়ঙ্কর। অত্যন্ত উঁচুমাপের ইতিহাসবিদ ছিলেন স্যার যদুনাথ সরকার। তিনি এরকম জানিয়েছেন যে, পলাশীতে ইংরেজের বিজয় ভারতবর্ষের জন্য এক রেনেসাঁর সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, যে রেনেসাঁ ইউরোপের রেনেসাঁর সঙ্গে তুলনাতে মোটেই খাটো নয় বরং বড়ই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত History of Bengal গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে যদুনাথ সরকারের এই রকমের মন্তব্য আছে যে, দুই শত বছরের ইংরেজ শাসন ও প্রতিবেশী ইংরেজ সমাজের দৃষ্টান্ত বাঙালীদের জীবন-যাপন ও চিন্তাধারায় এমন একটি ঐক্য উপহার দিয়ে গেছে যা দিয়ে জাতি সৃষ্টি হতে পারে। এটা লিখেছেন নিশ্চয়ই কিছুদিন আগে, হয়তো ঠিক সেই সময়েই বাঙালী জাতি যখন দ্বিখণ্ডিত হচ্ছিল, এবং যেটা ঘটছিল ইংরেজের শাসনের কারণেই। প্রাতঃস্মরণীয় ইতিহাসবিদরাও যে সবসময়ে নির্ভরযোগ্য হন তা নয়। মূল কথাটা হলো দৃষ্টিভঙ্গির; দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে সাদা কালো হয়ে যেতে পারে, যেমন কালো পারে সাদা হিসেবে হাজির হতে। মানবিক বিদ্যার গুরুত্ব হ্রাস শিক্ষার জন্য কোনো সুসংবাদ বহন করে না। শিক্ষার উদ্দেশ্যই তো শিক্ষার্থীকে মানবিক গুণসম্পন্ন করা, সে যাতে সংবেদনশীল হয়, বিচ্ছিন্ন না হয়ে সামাজিক হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

আরেকটা কথা; আমরা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে খুব বেশী করে ভাবি। কিন্তু প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে কী ঘটছে তার দিকে তাকাই না। শিক্ষার গুণগত মানটা কেমন দাঁড়াবে সে সিদ্ধান্ত কিন্তু ওই স্তরেই গৃহীত হয়ে যায় এবং যাচ্ছে।

৫.

সার কথাটা দাঁড়ায় এই যে সংস্কার, সংশোধন, পরিবর্তন সবই দরকার; কিন্তু সবার আগে চাই এই সিদ্ধান্ত যে শিক্ষা হবে মাতৃভাষার মাধ্যমে। আর সেটা হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হলো বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। ইউনেস্কো যে আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গ্রহণ করেছে তার কারণ তো এটাই যে বর্তমান বিশ্বে পুঁজিবাদের দৌরাত্মে দুর্বল জাতিগুলোর মাতৃভাষা বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

আবারও স্মরণ করা যাক যে, জ্ঞানের চাষ আর ধানের চাষের ভেতর পার্থক্য অবশ্যই বিস্তর, কিন্তু মিল এইখানে যে দুটোই শ্রমের ফসল। এবং তারা উভয়েই আজ উপেক্ষার পাত্র, যদিও তাদের ওপরই মানুষের প্রধান ভরসা। জ্ঞান এবং ধানের শত্রুপক্ষটিও অভিন্ন; সেটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। পুঁজিবাদ যখন আসর জাঁকিয়ে বসছে সেই সময়ে নাট্যকার শেকসপীয়র তার দি মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে দেখিয়েছেন যে পণ্যব্যবসায়ী এন্টনিওর প্রাণ সুদব্যবসায়ী শায়লকের হাতে বিপন্ন। চুক্তির বরখেলাফ হয়েছে দাবী করে শায়লক এন্টনিওর হৃদপিণ্ডের কাছের জায়গা থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নিতে চায়। আদালত তাকে নিবৃত্ত করতে পারছে না, কারণ আইন অনুযায়ী ওই মাংস শায়লকের প্রাপ্য। এন্টনিওকে বাঁচিয়েছে বিজ্ঞ পোর্শিয়ার হস্তক্ষেপ; সে বলেছে ঠিক আছে এক পাউন্ড মাংস কেটে নাও কিন্তু এক ফোঁটা রক্ত ঝরাতে পারবে না, কারণ চুক্তি ওই অধিকার তোমাকে দেয় নি। পুঁজিবাদের বর্তমান কালে ওই দুই ব্যবসায়ী, এন্টনিও এবং শায়লক আর পরস্পরের সঙ্গে আগের সম্পর্কে নেই, মানুষকে শোষণ করার অভিন্ন ক্ষেত্রটিতে; তারা এক হয়ে গেছে, এবং বিপন্ন মানুষকে বাঁচাননাও এখন আর আইনের সাহায্যে সম্ভব নয়। কেননা আইন হয়ে গেছে ব্যবসার দাস। আর কোনো একজন পোর্শিয়ার একার পক্ষেও রক্তলোলুপদের উদ্যত ছুরি থেকে বিপন্ন মানুষকে বাঁচানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত উদ্যোগ এবং যে ব্যবস্থা রক্তলোলুপদেরকে প্রশ্রয় দেয় সেটাকে ভেঙে ফেলে সম্পদের ওপর সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠার।

শিক্ষার মান উন্নয়ন চেষ্টা আর পুঁজিবাদবিরোধিতা আসলে অভিন্ন সূত্রে গ্রথিত। পুঁজিবাদ শিক্ষাকে যথার্থ অর্থে উন্নত হতে দেবে না, এবং যেটুকু দেবে সে উন্নতিটুকুও সর্বজনীন হবে না। তাই বলে শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের সংস্কারমূলক চেষ্টা যে চলবে না তা নয়, অবশ্যই চলবে; তবে দেখতে হবে উন্নতি যাতে সকলের উপকারে আসে। নইলে টাকার গরমে উত্তপ্ত ব্যাঙ শান্ত হস্তিটিকে লাথি মারা অব্যাহত রাখবে, এবং বলবে, হস্তি, তুমি আসলেই হস্তিমূখ।

কিন্তু হতাশ হবার কারণ নেই। মানুষ সচেতন হচ্ছে। অবস্থা বদলাবে, আমরা মানসম্মত শিক্ষা পাবো, এবং আমরা সবাই সম্মানিত হবো। ইতিহাসের অগ্রগতি পশ্চাৎমুখী হবে না, সম্মুখমুখীই হবে। কিন্তু এটি এমনি ঘটবে না। এগিয়ে আসতে হবে সমাজ নিয়ে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে। সমবেত ভাবে।

শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামই এখন ভারতীয় জনগণের অপরিহার্য কর্তব্য - বদরুদ্দীন উমর

শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামই এখন ভারতীয় জনগণের অপরিহার্য কর্তব্য

বদরুদ্দীন উমর

ভারতে সাম্প্রদায়িকতার সাথে শ্রেণী প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে বরাবরই সম্পর্কিত থেকেছে। কিন্তু এখন এটা যেভাবে স্পষ্ট হয়েছে এটা আগে কোন দিন দেখা যায় নি। বিগত লোকসভা নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণী শোষণ কিভাবে জনস্বার্থ, কৃষক শ্রমিকের স্বার্থের প্রশ্নকে ছাপিয়ে নিজের আধিপত্য রাজনীতি ক্ষেত্রে বিস্তার করছে। এই নির্বাচনে দেখা গেছে, সাম্প্রদায়িকতা ও তার নিকৃষ্টতম রূপ হিন্দুত্ববাদ কিভাবে জনস্বার্থকে পদদলিত করে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করেছে। এরা জনগণকে তাদের নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিজেপিকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এটা ভারতের রাজনীতি ক্ষেত্রে এক মস্ত ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কিছু নয়।

২০১৪ সালের নির্বাচনে আম্বানি, টাটা ইত্যাদি থেকে বিশাল অঙ্কের হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিজেপি ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানোর সময় ভারতের জনগণকে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কিছুই তারা রক্ষা করে নি। উপরন্তু তাদের শাসন আমলে জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে। কৃষকদেরকে বিজেপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কোনটিই বাস্তবায়ন না হওয়ায় কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় দাড়িয়েছে। এ কারণে নির্বাচনের বেশ কিছু দিন আগে থেকেই তারা বড় আকারে সর্বত্র সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। সারা দেশে লক্ষ লক্ষ কৃষক বিশাল বিশাল মিছিল করে দিল্লী, মুম্বাই সহ ভারতের প্রধান শহরগুলিতে দীর্ঘ মিছিল করে এসে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ জানিয়েছে। এই কৃষকদের প্রায় সমস্ত অংশই গরীব এবং দলিত বা নিম্ন বর্ণের হিন্দু। তাদের ওপর নির্যাতন কমিয়ে আনার পরিবর্তে বৃদ্ধিই কৃষকদের এই বিক্ষোভের মূল কারণ। কিন্তু শুধু কৃষকই নয়, শ্রমিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মধ্যবিত্তের মধ্যেও এই বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ বড় আকারে দেখা গেছে।

কিন্তু এই সব বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কৃষকসহ শোষিত জনগণের বিশাল অংশ, অধিকাংশই, ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। বিজেপিকে ভোট দেওয়ার অর্থ সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুত্ববাদকে ভোট দেওয়া। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুত্ববাদের শ্রেণী চরিত্র উপলব্ধি করতে তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এটা ঘটেছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও কৃষকসহ অন্যদের মধ্যে শ্রেণী চেতনার নিদারুণ অভাব, তাদের ওপর শোষণকে শ্রেণী শোষণ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতার কারণে।

এর মূল কারণ শ্রেণী প্রশ্ন থেকে হিন্দুত্ববাদকে পৃথক করে দেখানোর চেষ্টা বিজেপির পক্ষ থেকে করা হলেও সেই সাথে ভারতের বামপন্থী দলগুলিসহ অন্যেরা হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সাথে শ্রেণী প্রশ্নের বিষয় সামনে আনা থেকে বিরত থেকেছে। কাজেই তাদের প্রচার প্রচারণার মধ্যেও কৃষক শ্রমিক জনগণের শ্রেণী স্বার্থ সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুত্ববাদ থেকে বিচ্ছিন্নই থেকে গেছে।

এই পরিস্থিতি ভারতের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে রীতিমত বিপজ্জনক। শুধু বিপজ্জনকই নয়, আতঙ্কজনক। কারণ ভারতে এখন সাম্প্রদায়িকতা যেভাবে ব্যাপকভাবে জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে সেটা জনগণের শ্রেণী স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগ্রামকে বিভ্রান্ত করে রেখেছে। জনগণ নিজেদের শ্রেণী স্বার্থকে তার যথার্থ পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে না শেখার কারণে তাদের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও বিহারের রাজনীতি দীর্ঘদিন বর্ণ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এ কারণে কংগ্রেসও এ দুই বড় রাজ্য থেকে রাজনৈতিকভাবে প্রকৃতপক্ষে বহিস্কৃত হয়েছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি এ দুই রাজ্যের নিম্নবর্ণের হিন্দু ও দলিতদের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর সাথে তারা উত্তর প্রদেশে যে বিজয় লাভ করেছিল তা বিস্ময়কর। কিন্তু বিজেপি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নি। উপরন্তু গরীব কৃষক ও দলিতদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছিল। এ কারণে তারা উত্তর প্রদেশের বিধান সভার কয়েকটি নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। তাদের ভোটের এই বিষয়টি বিবেচনা করে মনে করা হয়েছিল যে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা বিজেপিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করবে। কিন্তু বাস্তবতঃ এর উল্টোটিই দেখা গেল। বিজেপি উত্তর প্রদেশে বিপুল বিজয় লাভ করলো! কৃষক ও দলিতরা নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে আবার বিজেপিকেই ভোট দিল। এর মূল কারণটি ভেবে দেখার বিষয়। কিন্তু লোকসভা নির্বাচন উত্তর যে সব বিশ্লেষণ এক্ষেত্রে ভারতে দেখা গেছে তাতে এ বিষয়টির বিশেষ গুরুত্ব দেখা যায় নি। এক্ষেত্রে ভারতের বামপন্থী দলগুলি থেকে নিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলির দেউলিয়াপনাই চোখে পড়ার মত।

কিন্তু শুধু রাজনৈতিক দলগুলিই নয়, ভারতের লেখক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক সহ বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় ও প্রভাবশালী অংশ বিজেপির নির্যাতন, ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ, গণতন্ত্রের শ্বাস রোধ ইত্যাদি নিয়ে অনেক বক্তৃতা বিবৃতি লেখালেখি করেছেন। বিজেপির আমলে উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন সাংবাদিক, লেখক বুদ্ধিজীবী হত্যার বিরুদ্ধে তারা জোরালো প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলির মত তাঁদের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও শ্রেণী প্রশ্ন প্রায় বাইরেই থেকে গেছে। এর ফলে নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদের প্রকত রূপ জনগণের চোখের আড়ালেই থেকে গেছে। তাদের প্রতিবাদের কোন প্রভাব কৃষক শ্রমিকসহ দরিদ্র জনগণের কাছে পৌছায় নি। অথচ নির্বাচনে ভোট এই গরীব জনগণেরই। তাদেরকে বিজেপির পক্ষে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কোন কাজেই আসে নি।

ভারতে শ্রেণী দ্বন্দ্বের ভিত্তিতে কৃষক শ্রমিকের রাজনীতি আজ কোন পর্যায় এসে দাড়িয়েছে এটা লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যেই দেখা গেল। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এর নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্ট ৩৪ বছর একটানা ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে ৪০টি আসনের মধ্যে তারা একটি আসনেও জয়লাভ করে নি। অর্থাৎ শ্ৰেণী রাজনীতির নাম পশ্চিমবঙ্গে এতদিন নামমাত্র হলেও যা অবশিষ্ট ছিল আজ আর তা নেই। প্রায় সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। সারা ভারতেও তাদের অবস্থা একই রকম। মাত্র তিন চারটি আসনে তারা লোকসভার নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। এই পরিস্থিতি হঠাৎ করে, একদিনে তৈরী হয় নি। দীর্ঘদিন বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতি চর্চার যে পরিণতি স্বাভাবিক সেটাই পশ্চিমবঙ্গ, কেরালাসহ সারা ভারতে হয়েছে। এভাবে শ্রেণী রাজনীতির ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে সেই শূন্যতা পূরণ করেছে চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। ভারতে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও গণতান্ত্রিক মহলের শ্রেণী প্রশ্ন এখন প্রায় সম্পূর্ণ আড়ালে চলে গেছে যার প্রতিফলন ভারতের বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পীদের বক্তৃতা বিবৃতি ও প্রতিরোধের মধ্যেই ঘটেছে। তারা তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ জোরালোভাবে করলেও তাতে শ্রেণীর প্রশ্ন থাকে নি, এখনো নেই। এ কারণেই তাদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ লোকসভা নির্বাচনে কোন প্রভাব বিস্তার করে নি। উপরন্তু বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী কৃষক শ্রমিকসহ গরীব জনগণের পক্ষে সম্ভব হয়েছে বিজেপির নির্যাতন এবং হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট দেওয়া। এছাড়া এই নিবাচনের ফলাফলের অন্য কোন ব্যাখ্যা নেই।

মুসলিম লীগ ঘোষণা দিয়ে দ্বিজাতি তত্ত্ব প্রচার করেছিল এবং তার ভিত্তিতে পাকিস্তান দাবী করেছিল। কিন্তু কংগ্রেস ১৯৪০ এর দশক থেকে নিয়ে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়ে অঘোষিতভাবে সেই একই দ্বিজাতি তত্ত্বের ও নীতির চর্চা তাদের শাসন আমলে করে এসেছে। এ কারণে কংগ্রেসের শাসন আমলেই ভারতের মুসলমানরা পরিণত হয়েছে সে দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে। চাকরী ক্ষেত্রে তাদেরকে এমনভাবে বঞ্চিত রাখা হয়েছে যাতে দেশের জনসংখ্যার ১৫% এর ওপর মুসলমান হলেও তাদের কর্মসংস্থান ২% এরও কম। পশ্চিমবঙ্গে এদিক দিয়ে অবস্থা সব থেকে খারাপ। কংগ্রেস শাসনে এবং তার পর ৩৪ বছরের সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্টের শাসনে সেখানে জনসংখ্যার ৩০% এর বেশী মুসলমান হলেও কর্ম

সংস্থান ২% এর কম! এর থেকে যদি এই সিদ্ধান্ত টানা যায় যে, মুসলমানদের প্রতি তাদের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী এবং আচরণ কংগ্রেসের থেকে আলাদা কিছু ছিল না তাহলে কি ভুল বলা হবে? এর থেকে এই সিদ্ধান্ত যদি টানা যায় যে, মুসলমানরা পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের আমলের মতই বাস্তবতঃ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে থেকেছে তাহলে এই বক্তব্যের কোন যুক্তিসংগত বিরোধিতা করা চলে? কাজেই নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি আকাশ থেকে পড়ে নি। তারা এখন সাম্প্রদায়িকতা এবং হিন্দুত্বের ক্ষেত্রে যে নীতি কার্যকর করছে তার মধ্যে কি ভারতে বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতাই রক্ষিত হচ্ছেনা? এদিক দিয়ে বিজেপি কি কংগ্রেস, এমন কি সিপিএম এর মত কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির পরিণতি না?

১৯৪৮ সালে হঠাৎ করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের দ্বিতীয় কংগ্রেসে বিপ্লবের ডাক দিয়ে এক ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিল। বিপ্লবের কোন তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতিই তাদের ছিল না। এ কারণে মাত্র দুই বছরের মাথায় তাদের ‘বিপ্লব’ প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল এবং তারা দল হিসেবে ছিন্নভিন্ন হয়েছিল। এর পর পঞ্চাশের দশক থেকে তারা শ্রেণী সগ্রাম ও বিপ্লবের চিন্তা শিকেয় তুলে সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করেছিল। বিপ্লবের ক্ষেত্রে হলেও সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে কেরালা এবং পরে পশ্চিমবঙ্গে তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারা সরকার গঠন করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে তারা ৩৪ বছর ধরে শাসন ক্ষমতায় ছিল। এভাবে শাসন ক্ষমতায় থেকে ভারতীয় সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে অন্যান্য সংসদীয় দলের সাথে প্রতিযােগিতা করতে গিয়ে, নির্বাচনী রাজনীতির জন্য যা করা দরকার সেটা করতে গিয়ে শ্রেণী সংগ্রামের নাম আর তারা নেয় নি। সংসদীয় দল হিসেবে আসলে তার মধ্যে যে সব সংকট দেখা দেয় সিপিএম এর মধ্যে সেই সব সংকট দেখা দিয়েছিল এবং তার পরিণামে ২০১১ সালে তারা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারিয়েছিল এবং পরবর্তী পর্যায়ে এখন তাদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রায় নির্মূল হওয়ার মত।

সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে থাকলে শ্রেণী সংগ্রাম চলে না। সকলকে দেশের সংসদীয় ব্যবস্থাকে স্বীকার করে নিয়েই রাজনীতি করতে হয়। সিপিএম এবং সিপিআইকে তাই করতে হয়েছিল। এ কারণে তৃণমূলে কৃষক শ্রমিকের স্বার্থের সাথে তাদের আর কোন সম্পর্ক থাকে নি। অন্যদিকে যে কমিউনিস্টরা সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর বাইরে থেকে শ্রেণী সংগ্রামের চেষ্টা করেছিল বা এখনো করে যাচ্ছে তারা মাওবাদের খপ্পরে পড়ে ব্যাপক কৃষক সমাজ ও শ্রমিকদের মধ্যে সাংগঠনিক কাজ না করে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঝুঁকে ছিল। সংগ্রাম করতে গিয়ে তারা নিজেদের কাজের এলাকা বনজঙ্গলের কিছু আদিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। তারা মাঝে মাঝে ভারতের সেনা বাহিনী ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে এবং পুলিশ ও সেনা সদস্যদের হত্যা করছে। কিন্তু তার দ্বারা ভারতের মতাে শক্তিশালী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কোন প্রকৃত ক্ষতিই হচ্ছে না। তারা অনায়াসে মাওবাদীদের সশস্ত্র বিপ্লবের মোকাবেলা বেশ সাফল্যের সাথেই করছে। নক্সালবাড়ী আন্দোলনের সময় কিছুটা ভিন্নভাবে এ চেষ্টা হলেও এ কারণে সে আন্দোলনও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।

ভারতে প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণী সংগ্রাম চালাতে হলে তার জন্য সমতল ভূমির ব্যাপক কৃষক জনগণ ও শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তােলা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। কিন্তু এ ধরনের সংগঠন কৃষক শ্রমিকের মধ্যে কোথাও নেই। ব্রিটিশ আমলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক শ্রমিকদের মধ্যে যে সামান্য বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলেছিল তার তুলনায় এখন কিছুই নেই। এই পরিস্থিতি যে সামগ্রিকভাবে ভারতের রাজনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করবে এটাই স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতির কারণেই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি জনগণকে যতই ধােকা দিক এবং তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন করুক তার বিরুদ্ধে কোন প্রকৃত প্রতিরোধ কোন ক্ষেত্রেই হচ্ছে না। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে বিজেপির নির্বাচন বিজয়ের এটাই মূল কারণ।

এই কারণের বিশ্লেষণ আজ পর্যন্ত ভারতের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী, লেখক, ঐতিহাসিক থেকে রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত কোন ক্ষেত্রেই হচ্ছে না। কিন্তু এই বিশ্লেষণই আজ ভারতের বিপ্লবীদের মূল কর্তব্য। এই বিশ্লেষণ না করে ভারতে নতুনভাবে বিপ্লবী শ্রেণী সংগ্রাম সংগঠিত করা সম্ভব নয়। এদিক দিয়ে ভারতের বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন আজ এক সংকটময় অবস্থায় এসে দাড়িয়েছে। শ্রেণী সংগ্রাম নতুনভাবে ও যথাযথভাবে সংগঠিত করা সংসদীয় রাজনীতি ও মাওবাদী লাইন থেকে সম্ভব নয়। আর শ্রেণী সংগ্রাম ছাড়া ভারতের পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম সংগঠিত করা ও সেই সংগ্রামে জয়যুক্ত হয়ে ভারতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এক সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার।

ভারতে সাম্প্রদায়িকতা এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে এবং তারই প্রতিফলন ঘটেছে ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে বিজেপির নির্বাচন বিজয়ে। এর মোকাবেলা করা সম্ভব একমাত্র ভারতে শ্রেণী সগ্রাম সংগঠিত করে। শ্ৰেণী সংগ্রাম সংগঠিত না করলে ভারতে চরম দক্ষিণপন্থী ও ফ্যাসিস্ট বিজেপি এবং আর.এস.এস. ঘরানার অন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির প্রভাব নির্মূল করা ও তাদেরকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে পরবর্তি নির্বাচনেও বিজেপি হিন্দুত্ববাদের আওয়াজ তুলে কৃষক শ্রমিককে বিভ্রান্ত করে তাদের রাজনীতির জোয়ারেই আবার তাদেরকে ভাসিয়ে দেবে।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট