এক যে ছিল প্রেসিডেন্ট: ব্যারাক ওবামার স্মৃতিকথার আলোচনা অনুবাদ আশফাক স্বপন

এক যে ছিল প্রেসিডেন্ট: ব্যারাক ওবামার স্মৃতিকথা

চিমানান্ডা ন্‌গোসি আডিচি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১২ নভেম্বর ২০২০ অনুবাদ আশফাক স্বপন

Chimamanda Ngozi Adichie on Barack Obama’s ‘A Promised Land’ The New York Times, Nov. 12, 2020

A PROMISED LAND By Barack Obama Illustrated. 768 pp. Crown. $45.

(আজ সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ব্যারাক ওবামার স্মৃতিকথার প্রথম খণ্ড A Promised Land প্রকাশিত হলো। গত চার বছরে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভব্য আচরণ আমাদের বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, চার বছর আগেও এই দেশে প্রেসিডেন্ট এমন একজন লোক ছিলেন যিনি নানাভাবে অসাধারণ। পড়াশোনায় তুখোড়, বাগ্মী, জ্ঞানী, স্বভাবে নম্র ও মিতবাক এমন চৌকশ প্রেসিডেন্ট আমেরিকায় খুব কম এসেছে। আর হ্যা, তাঁর গাত্রবর্ণ কালো ছিল।

ওবামার সম্বন্ধে দুটো বিষয় আমার লক্ষণীয় মনে হয়। প্রথম বিষয়টি হচ্ছে পৃথিবীতে হেন বিষয় নেই – সেটা পরিবেশ সঙ্কট হোক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হোক - যে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তৎক্ষণাৎ অত্যন্ত সুচিন্তিত, সারবান, বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিতে পারতেন, এমনই ছিল তার জ্ঞানের ভাণ্ডার। আর দ্বিতীয় বিষয় হলো তাকে তার রাজনৈতিক শত্রুরা কুৎসিততম ভাষায় গালাগাল করার পরও (‘ওবামার এদেশে জন্ম নয়,’ ‘ও আসলে মার্ক্সিস্ট দেশদ্রোহী’) কক্ষনো, এক মূহুর্তের জন্য তাঁর মুখ দিয়ে কোন অসৌজন্যমূলক কথা বের হয় নি।

ওবামার কথা ভাবলে মনে হয় আসলে ওবামার বিচার আমরা কী করব, ওবামার সাথে আমেরিকা কী আচরণ করল, সেজন্য আমেরিকাকেই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে।

এবার বইটির সমালোচনা নিয়ে দুই-একটা কথা। আমি মাঝে মাঝেই ইংরেজিতে লেখা বইয়ের সমালোচনার বাংলা অনুবাদ পোস্ট করি। এই দেশে পুস্তক সমালোচনা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও পরিণত একটি শিল্প এবং সেটা পুস্তকপাঠ ও তার প্রসারে অমূল্য ভূমিকা রাখে। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার পুস্তক সমালোচনা এদেশে সবচেয়ে নন্দিত। তারা ওবামার বইটি সমালোচনার ভার দিয়েছেন এক তেজস্বিনী নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভুদ লেখিকাকে যিনি নিজেও স্বনামধন্যা। ওবামার মতো তিনিও কালো, আবার সুশিক্ষিতা, সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তার দৃষ্টিতে ওবামার স্বভাব আর লেখায় যেন অন্যভাবে আলো পড়ে – ওবামার গুণে তিনি যেমন মুগ্ধ, তেমন তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে কড়া কথা বলতে পিছপা নন।

হ্যা পুস্তক সমালোচনাটা একটু দীর্ঘ। Facebook আর instant gratification যুগে কার বাপু এতো সময় আছে? এই বিচারটা পাঠকের, তবে পড়লে ঠকবেন না, এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। মন্তব্য ও সমালোচনার অপেক্ষায় রইলাম। কড়া সমালোচনা করতে দ্বিধা করবেন না। - অনুবাদক)

লেখক হিসেবে ব্যারাক ওবামা অতি উঁচুমানের। আয়তনে এতো বড়ো ভাবগম্ভীর একটা আত্মজীবনীর বইয়ে একটা ভারিক্কী চাল থাকতেই পারতো, এবং সেটা থাকলে আমরা হয়তো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতেই দেখতাম। কিন্তু ওঁর বইটা শুধু যে সেদিক মাড়ায় না তাই নয়, বইটা প্রায় সবসময়ই অত্যন্ত সুখপাঠ্য। একেবারে বাক্য ধরে ধরে এই কথাটা বলা যায় - গদ্যলাবণ্য ঝলমলে, অনুপুঙ্খের বর্ণনায় সুবিশদ ও প্রাঞ্জল। দক্ষিণপূর্ব এশিয়াই হোক বা দক্ষিণ ক্যারোলাইনার কোন ভুলে যাওয়া স্কুল, ওবামার আলতো, সুদক্ষ লেখনীর ছোঁয়ায় সেই স্থানের আবহটা যেন বই থেকে উঠে বাস্তবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। এই বইটি তার দুইটি খণ্ডের প্রথম খণ্ড। তার জীবনের শুরু দিয়ে বইয়ের সূচনা, আর শেষ হয় কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের এক সভায়। সেই সভায় পাকিস্তানের এবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার অভিযানে সংশ্লিষ্ট চৌকশ SEAL কমান্ডোদের সাথে ওবামা দেখা করেন।

ওবামার নজরটা যত না ব্যক্তিগত তার চাইতে বেশি রাজনৈতিক। তবে পরিবারের কথা যখন তিনি লেখেন, তখন তার ভাষার সৌন্দর্য মনকে স্মৃতিমেদুর করে তোলে। কতো উজ্জ্বল টুকরো টুকরো স্মৃতি। ছোট্ট মালিয়াকে শরীর চেপে ব্যালের আটোসাঁটো পায়জামাকে পরানো। শিশু সাশার ছোট্ট পায়ে কামড় দেবার পর তার খিলখিল হাসি। ক্লান্ত মিশেল তার ঘাড়ে মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ঢিমে হয়ে যাওয়া। ওবামার অসুস্থ মা বরফ চুষছেন, ক্যান্সারে তার সমস্ত গ্ল্যান্ড নষ্ট হয়ে গেছে। এই সাবলীল গল্প বলার গুণটির মূলে কথকতার একটা পরম্পরা রয়েছে, তাতে অনেক প্রতীকী উদাহরণ রয়েছে। যেমন ইলিনয় রাজ্য সেনেটের নির্বাচনী অভিযানের এক মহিলা কর্মীর বর্ণনা - ‘সিগারেটে সে সুখটান দিয়ে কুণ্ডুলি পাকিয়ে ধোঁয়া ছাদের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে।’ হিলারি ক্লিন্টনকে নিয়ে পরিবেশ নিয়ে এক শীর্ষ সম্মেলন চীনের সাথে জোর করে এক বৈঠকের বন্দোবস্ত করার বর্ণনায় এতটা টান টান নাটকীয় উত্তেজনা যে সেই বর্ণনায় আলো-আঁধারি রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের স্বাদু মেজাজ রয়েছে। সাধে কি ঐ সময়ে তার কাণ্ডকারখানা দেখে তার অন্তরঙ্গ সহকারী রেজি লাভ মন্তব্য করেছিলেন, ‘এ তো দেখছি দিনে দুপুরে সন্ত্রাস।’ তার বর্ণনায় কল্পনা যখন পাখা মেলে তখন তিনি পিছু হটেন না। এক ক্যাথলিক নান মহিলা তাকে একটা ক্রুশ দেয়। তার চেহারায় ‘পরতে পরতে ভাঁজে ভরা, ঠিক যেন পিচ ফলের বিচি।’ হোয়াইট হাউসের মালিরা যেন ‘কোন এক খৃষ্টীয় যাজক সম্প্রদায়ের নিরব পাদ্রী।’ নিজেকে নিয়ে তাঁর সংশয় - ‘মানবসেবার মোহময় আবরণ কি আসলে আমার ক্ষমতার ক্ষুধাকে আড়াল করে রেখেছে?’ তার সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোথায় একটা রোমান্টিকতা রয়েছে, যার ভেতরে বিষণ্ণতার একটা সুরও রয়েছে। অসলোতে যখন তিনি বাইরে তাকিয়ে দেখেন ভিড় করে লোকে হাতে মোমবাতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অন্ধকার রাতে শিখাগুলো নড়ে নড়ে উঠছে, তখন আমরা বুঝি নোবেল পুরস্কার বিতরণী সভার আনুষ্ঠানিকতার চাইতে এই ঘটনাই তার মনকে বেশি ছুঁয়ে যায়।

আর সেই নোবেল! যখন তিনি পুরস্কার পাবার খবর পান ওবামা তো বিশ্বাসই করতে পারেননি।

‘কীসের জন্য পুরস্কার?’ ওবামার প্রশ্ন। বাস্তবে তিনি যেমন আর তার সম্বন্ধে মানুষের যে আশা তার মধ্যে যে একটা মস্তবড় ফাঁক রয়েছে, এই পুরস্কার তাকে সে বিষয়ে সচেতন করে তোলে। তিনি মনে করেন তার সম্বন্ধে মানুষের প্রচলিত ধারণায় অতিরঞ্জন রয়েছে, নিজের সম্বন্ধে নানান রঙিন ধারণার ফানুস তিনি নিজেই নাকচ করে দেন।

তার রাজনৈতিক কর্মজীবন যারা লক্ষ করেছেন তারা সবাই জানেন ওবামা মানুষ হিসেবে কতটা চিন্তাশীল, সংবেদনশীল। এই বইয়ে আমরা তার গভীর আত্মজিজ্ঞাসার পরিচয় পাই। সে বড় নির্মম আত্মজিজ্ঞাসা। প্রথম যেবার তিনি নির্বাচনে নামেন, তখন তার উদ্দেশ্য কি সত্যি সত্যি জনসেবা ছিল? নাকি আত্মম্ভরিতা বা আত্মপ্রশ্রয়? নাকি আশেপাশের সফলতর মানুষকে দেখে ঈর্ষা? তিনি লিখেছেন যে পাড়ার মানুষকে সংগঠিত করার কাজ ছেড়ে যখন তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ স্কুলে পড়তে যান, তখন তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন অসঙ্গত নয়। যেন উচ্চাশা থাকাটাই প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি স্বভাবে কিছুটা অলস কিনা এই কথাটা তাকে ভাবায়। স্বামী হিসেবে তার দোষের কথা তিনি স্বীকার করেন, তার ভুল ভ্রান্তি নিয় আক্ষেপ করেন এবং ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের লড়াইয়ের প্রথম দিকে কোথায় কী উলটাপালটা কথা বলেছেন তাই নিয়ে আজও মন খারাপ করেন। নিজের জীবনটাকে ভালোভাবে জানতে বুঝতে ওবামা কতখানি আগ্রহী, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। তবে এটা কি আত্মরক্ষামূলক চাল, যার ফলে অন্যরা তার খুঁত ধরবার আগে তিনিই সেই কাজটা সেরে রাখছেন? তিনি লেখেন যে নিজের সম্বন্ধে তার বেশ খানিকটা স্পর্শকাতরতা রয়েছে, মানুষের তাচ্ছিল্য বা মানুষের কাছে বোকা প্রতিপন্ন হবার ব্যাপারে তার বড্ড আপত্তি।

নিজের অর্জন নিয়ে গর্ব করতে তার অনীহা রয়েছে। এই ধরনের ন্যাকামি মার্কিন দেশে একটি প্রচলিত প্রবণতা। তার আগে আরো অনেক তুখোর মেধাবী আমেরিকান উদারপন্থী মানুষের মাঝে একই ধরনের বিনয় দেখা গেছে – এ যেন অনেকটা বহুচর্চিত, আরোপিত ভঙ্গিমা। দেখে দেখে বলতে ইচ্ছে করে, আরে বাপু, মেলা হয়েছে, এবার নিজের পাওনা তারিফ খানিকটা গ্রহণ করো!

ওবামা অবশ্য বলেছেন যে তার অর্থনৈতিক পুনুরুদ্ধার নীতির ফলে আমেরিকার অর্থব্যবস্থা যেভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়, বিশ্ব ইতিহাসে এত তাড়াতাড়ি এত বড় সঙ্কট থেকে আর কোন দেশে সেটা করতে পারেনি। তবে ওবামা এতটা কালে ভদ্রে নিজের কৃতিত্বের কথা বলেন যে তার এধরনের কথা একটু কানে বাজে। তার বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে প্রথম সামাজিক সচেতনতার কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজের ওপর বড্ড খড়্গহস্ত হয়েছেন। তখনকার আত্মমগ্নতার রাজনীতি নিয়ে কড়া, প্রাপ্তবয়স্ক রায় দিয়ে বলেছেন, যে সেই রাজনীতি বড্ড বেশি নিজের সততা নিয়ে তুষ্ট ছিল, একটু বেশি নিবেদিত ছিল, নিরস, কাঠখোট্টা ছিল। তা তো ছিলই, ঐ বয়সে তাই তো হবার কথা।

ওবামার এই প্রবণতা আত্মসচেতনতার চাইতে একটু বেশি নেতিবাচক, তবে ঠিক আত্মধিক্কারের পর্যায়ে পৌছে না। কিন্তু এর একটা ভালো দিকও রয়েছে। এর ফলে যেন ওবামার মনটা আরো বড়ো হয়েছে, তার চরিত্রে মানবিকতা আর গভীর ঔদার্য যুক্ত হয়েছে। এ যেন নিজেকে কঠোরভাবে বিচার করবার ফলে তিনি মানসিক মুক্তিলাভ করেছেন, নিজেকে আর দশজনের চাইতে অনেক উঁচুতে বসাতে পেরেছেন। ফলে অকাতরে তিনি মানুষকে ক্ষমা করে দেন, তাদের তারিফ করেন, এমনকি অনেক সময় যারা উপযুক্ত নন তাদের ব্যাপারেও উদারমনস্ক হন। কিছু কিছু নেতাদের তিনি বড়ো মাপের মানুষের মর্যাদা দেন। এদের মধ্যে রয়েছে এক কালের সেনেটর ক্লেয়ার ম্যাকক্যাস্কিল, যিনি বিবেকের দোহাই দিয়ে অল্পবয়স্ক অভিবাসীদের সমর্থনে Dream Act- এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন; অর্থব্যবস্থার সঙ্কটের উথালপাথাল সময়ের তখনকার বড় নীতিনির্ধারক টিম গাইথনারের যার শিষ্টতা ওবামার সম্ভ্রম আকর্ষণ করেছে; রিপাবলিকান সেনেটর চাক হেগেল, যিনি ওবামার পররাষ্ট্রনীতির প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়েছেন। মন ছুঁয়ে যায় ওবামার প্রেসিডেন্ট থাকার প্রথম মেয়াদের সময়কালের একেবারে ঘনিষ্ঠ সহকারীদের প্রতি গভীর মমতা – ভ্যালের জ্যারেট, ডেভিড এ্যাক্সেলরড, ডেভিড প্লাফ, রবার্ট গিবস, রাম এমানুয়েল। মনে সম্ভ্রম যায়গায় তার অত্যন্ত উঁচু মাপের কর্মস্পৃহা ও মূল্যবোধ – কোন সমস্যা হলে কখনো তিনি দোষী ধরার জন্য ব্যস্ত হতেন না। শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ সম্বন্ধে জানবার জন্য নয়, নিজের মনকে চাঙ্গা করবার জন্য, নিজের সংশয় দূর করার জন্য তিনি নিয়মিতভাবে সাধারণ আমেরিকান মানুষের চিঠিপত্র পড়তেন।

প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লু বুশের কর্মজীবনের শেষ দিনে প্রতিবাদীদের দেখে তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন। তার কথা হলো মানুষটার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দিনে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অশিষ্টতা, কারণ এখন তার কোন প্রয়োজন নেই। খুব সুন্দর, মানবিক ভাবনা। তবে এখানেও ওবামার নিজেকে দূষবার বাতিকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ওবামা বলছেন, বুশের প্রতি সমবেদনায় তার নিজের খানিকটা স্বার্থও আছে, কারণ এখন তিনিই তো প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন।

তবে যতই কঠোরভাবে নিজেকে বিচার করুন, সেরা স্মৃতিকথাগুলোতে একটা মূল্যবান জিনিস থাকে সেটা কিন্তু ওবামার বইটিতে নেই। সেটা হলো যথার্থ লেখকসত্তার আত্মোদ্ঘাটন। মানুষটার সত্তা যেন একটা চৌকশ আস্তরণের নীচে চাপা পড়ে গেছে। যেন আবেগের আতিশয্যের প্রতি বিরাগের ফলে মানবিক আবেগকেও কঠোর শাসনে রাখা হয়েছে। ঐতিহাসিক ওবামাকেয়ার স্বাস্থ্য আইন পাশের খুঁটিনাটি নিয়ে তিনি বিশদভাবে লিখেছেন, কিন্তু সেই বিবরণে তার মনের অন্তর্জগতটা যেন অধরাই থেকে গেল। মার্কিন সেনেট-এ যখন ওবামাকেয়ার ঠেকাতে রিপাবলিকান সেনেটররা ফন্দি আঁটছে, তখন ওবামা মার্কিন হাউসের পরাক্রান্ত ডেমোক্র্যাট নেত্রী ন্যান্সি পেলোসির সাথে কথা বলেন। প্রসঙ্গ রিপাবলিকানদের ঠেকাতে একমাত্র উপায় সেনেটে যে বিল রয়েছে, হুবহু সেটা হাউসে পাশ করা। এই প্রসঙ্গে ওবামা বলেন - ‘ঐ মহিলাকে আমি দারুণ ভালোবাসি।’ কিন্তু যেই কারণে ফোনের কথোপকথন এতো জরুরি হলো, সেই হীন রিপাবলিকান কৌশল, তাদের বিদ্বেষের ফলে তার মনোকষ্ট বা বৌদ্ধিক কী খেসারত দিতে হয়েছে, তার কোন হদিস আমরা তার বইটিতে আর পাইনা। ‘মাঝে মাঝে চতুর্দিকে (স্বাস্থ্য নীতি নিয়ে) মিথ্যা কুৎসার ছড়াছড়ি দেখে যদিবা মনটা খারাপ হতো, এমনকি রাগও হতো, আমার এই অভিযানের সহযাত্রীদের হতোদ্যম না হয়ে আরো একনিষ্ঠভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাবার উদ্যম দেখে মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে যেত।’ শুনেই মনে প্রশ্ন জাগে – যদিবা মানে?

আজ যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন রিপাবলিকানদের ইচ্ছাকৃত একগুঁয়ে ওবামা বিরোধিতা খুব বেপরোয়া মনে হয়। হাউসের কংগ্রেস সদস্যরা প্রস্তাবিত বিল না পড়েই বিরোধিতা করছে, শুধুমাত্র প্রস্তাবগুলো ওবামা করছেন বলেই। তাদের বিরোধিতার ফলে দেশ রসাতলে গেলেও তাদের তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। রিপাবলিকানদরা এভাবে শত্রুতা না করলে কেমন হতো ওবামার শাসন? এই নিয়ে ওবামা কী ভেবেছেন সেটা জানতে মন চায়। যদি কট্টর রক্ষণশীল মতাদর্শে বিশ্বাসী বিলিয়নেয়ার ধনপতি ডেভিড ও চার্লস কোক শুধুমাত্র ওবামাকে ঠেকানোর জন্য আমেরিকার সবচাইতে ধনাঢ্য রক্ষণশীল মতাবলম্বী মানুষদের এক অশুভ জমায়েতের আয়োজন না করতেন? কেমন হতো যদি ওবামার শাসনের প্রতি মিডিয়া এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তীব্র রিপাবলিকান বিরোধিতার কারণে এতটা বিকৃত না হতো? ‘ওবামাকেয়ার’ কথাটা প্রথমদিকে ওবামার স্বাস্থ্যসেবার আইনের প্রতি তাচ্ছিল্যসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। সেই ‘ওবামাকেয়ার’ কথাটা ওবামা যখন নিজেই ব্যবহার করেন, তাতেই বোঝা যায় তার শাসনের সময় ডানপন্থীরা আলোচনার দিকনির্দেশে কতখানি প্রভাবশালী ছিল। ওবামা যখন লেখেন যে ডানপন্থী তৃণমূল আন্দোলন টি পার্টি শুধূ তার নীতিমালার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে তাই নয়, ব্যক্তিগতভাবে তাকেও কটুভাবে আক্রমণ করেছে, তখন তার কথায় কেমন যেন একটা দূরত্ব রচিত হয়, যেন তার হৃদয় বহুদূরে, আমাদের অগম্য।

বিদেশ নীতির ব্যাপারে অবশ্য ওবামা অতটা রয়ে সয়ে কথা বলেন না। তার মধ্যে একধরনের কাব্যিক, ভাবালুতামগ্ন কড়া জাতীয়তাবাদ দেখি। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যে কোন সমালোচনা যেন স্বদেশের সপক্ষে উচ্চকণ্ঠ, চৌকশ বক্তব্য রাখবার মুখবন্ধ মাত্র। সেই অর্থে মার্কিন উদারপন্থী প্রবণতা সম্বন্ধে যে ধারণা চালু রয়েছে – যে সচরাচর বিশ্বের রাজনৈতিক মঞ্চে মার্কিন বিদেশ নীতির ব্যর্থতা কোন গৌণ বিষয় নয় বরঞ্চ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, সেদিক থেকে ওবামা একেবারেই ভিন্ন। তিনি বরঞ্চ আমেরিকার অপ্রতিম উৎকর্ষের মুগ্ধ সমর্থক। ওবামার যুক্তি হলো মার্কিন দেশকে শুধু অন্যরা ভয় করে না, সমীহও করে। তাতেই প্রমাণ হয় যে অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও মার্কিন দেশ পৃথিবীকে নিশ্চয়ই ভালো কিছু দিয়েছে। ওবামা লিখেছেন: ‘বিশ্বে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে যারা সবচাইতে বেশি অভিযোগ করেছে, তারাই আবার বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে আমেরিকার ওপর নির্ভর করেছে।’ এই ধরনের চিন্তায় প্রতিক্রিয়াশীলতার ছাপ পরিষ্কার। ওবামার ভাবখানা এমন যে সারা বিশ্বে মোড়লী করবার যে দায়িত্ব আমেরিকা নিজেই নিয়েছে, সেখানে তার সুষ্ঠু ভূমিকা আশা করলে সেই সাথে আমেরিকার বাড়াবাড়ি ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় মৌলিক একটা অসামঞ্জস্য রয়েছে।

রাজনৈতিক স্মৃতিকথার সবচাইতে আকর্ষনীয় দিক হলো একেবারের ভেতরের সব গোপন মুখরোচক কাহিনি। এমন সব ছোট ছোট তথ্য যা আমাদের প্রচলিত ধারণ উলটে দেয়। ওবামার নির্বাচনী অভিযানের সেই বিখ্যাত শ্লোগান, ‘হ্যা, আমরা পারি।’ (Yes, We Can)-এর কথা ধরা যাক। এটা ওবামার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ডেভিড আক্সেলরড-এর মস্তিষ্কপ্রসূত। ওবামার অবশ্য বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল। কিন্তু ওর স্ত্রী মিশেল বললেন মোটেও বাড়াবাড়ি নয়। অথবা কৃষ্ণাঙ্গ মানবাধিকার নেতা জেসি জ্যাকসনের কথা ধরা যাক। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওবামার প্রথম বিজয়ের পর, যখন ওবামা শিকাগোতে বিজয়ীর ভাষণ দেন, তখন জেসি জ্যাকসনের অশ্রুসজল মুখ বহু লক্ষ মানুষের মনে গেঁথে আছে। অথচ বইটিতে আমরা জানতে পারি যে ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেসি জ্যাকসনের সমর্থন অকুণ্ঠ ছিলনা, বরঞ্চ তার ছেলে জেসি জ্যাকসন জুনিয়রের সমর্থন অনেক জোরালো ছিল। আরো বিচিত্র কিছু তথ্য। যেমন হোয়াইট হাউসে থাকাকালে নিজেদের টয়লেট টিস্যু আর খাওয়া দাওয়ার খরচ ওবামা পরিবার নিজে বহন করেছে। আরেকটা কথা। কেউ কি ভাবতে পারে যে আট বছর প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বেসামরিক উপদেষ্টা নয়, সামরিক জেনারেলরাই ওবামাকে শক্তিপ্রয়োগের ব্যাপারের সংযমের পরামর্শ দিয়েছেন? এতদিন আমরা যারা তাকে টিভি পর্দায় বহুবার হন হন করে হোয়াইট হাউসে ঘাসের গালিচার ওপর দিয়ে চলতে দেখেছি বা দ্রুতপদে প্লেনে উঠতে দেখেছি, তারা কি জানি যে ওবামা হাঁটেন ধীরে ধীরে, তার স্ত্রী মিশেল যাকে ঠাট্টা করে বলেন হাওয়াইয়ান চালে। আমরা বরাবর তার সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের তারিফ করেছি। কিন্তু বাস্তবে তিনি ছেলেমানুষের মতো অগোছাল। এর মধ্যে একটুখানি পুরুষতান্ত্রিকতা আছে, কারণ এর পেছনে যে যুক্তি কাজ করে তা হলো আর কেউ এসে সব গোছগাছ করে দেবে। সেই ব্যক্তি সচরাচর একজন নারীই হয়ে থাকে।

মিশেলের সাথে তার মমতাময় বন্ধুত্ব খুব খাঁটি বলেই এতটা উজ্জ্বল। তার জন্য মিশেল অনেক আত্মত্যাগ করেছেন, তার রাজনৈতিক কর্মজীবনের অনেক ঝক্কি মিশেলকে সামাল দিতে হয়েছে, এসব কথা ওবামা খোলাখুলি স্বীকার করেন। যখন মিশেলের সাথে তার প্রথম সাক্ষাত হয়, তখন ‘মিশেল এক কেতাদুরস্ত মহিলা, কর্মজীবনের ওপর তার পূর্ণ মনোযোগ, জীবনে সঠিক, শুদ্ধ পথে চলতে সে বদ্ধপরিকর, কোন এলেবেলে ব্যাপারে এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করতে নারাজ।’ খুব অল্প সময়ের জন্য মিশেল তার পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন। ওবামার জীবনে মিশেল এবং আরো দুজন অসাধারণ নারী - ওবামার মা আর নানী - এঁদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলেই হয়তোবা ওবামা নারীবিদ্বেষের ব্যাপারে এতটা সচেতন। মেয়েদের নানান প্রতিবন্ধকতা, তাদের প্রতি অবিচার, তাদের বেলায় ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরস্পরবিরোধী প্রবণতা – এইসব কিছু ওবামা এত স্বচ্ছন্দে আর সহজে বর্ণনা করেন যে তাতে একটা অদ্ভুত ক্ষোভ জন্মায়। যেন মধ্যবিত্ত আমেরিকায় এক নবজাতকের মা তার ধৈর্যশীল, সবরকম-সাহায্য-করতে-প্রস্তুত স্বামীকে দেখে ক্ষেপে যান কারণ তার কাছে যেটা কাঙ্খিত সেটা স্বামীর সমবেদনা নয়, সেটা হলো এমন একটা সমাজ যেখানে সেই সমবেদনার আর কোন প্রয়োজন নেই। এতদিন পর একজন পুরুষমানুষের দেখা মিলল যিনি নারীর অবস্থাটা সত্যি বুঝতে পারেন। কিন্তু এতটাই ভালোভাবে বুঝতে পারেন যে তার মধ্যে যেন একটা প্রচ্ছন্ন অপমান নিহিত। আরেকটা বিষয় – ওবামা বারবার পুরুষের দৈহিক সৌন্দর্যের উল্লেখ করেন কিন্তু নারীদের ব্যাপারে নিরব – এর মধ্য দিয়ে ওবামা কি নারী-পুরুষের অসম সামাজিক অবস্থান উলটে দিয়ে তাকে ঠারেঠোরে কটাক্ষ করছেন? চার্লি ক্রিস্ট বা রাম এমানুয়েল যে কত সুপুরুষ সে কথা আমরা শুনি, কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর মতো দুই একটা উদাহরণ ছাড়া আমরা নারীর সৌন্দর্য নিয়ে আর কিছু শুনি না।

বাস্তবজীবনে ওবামা নারীদের চাকুরিতে নিয়োগ করেন, তার অধীনস্থ নারী কর্মীরা পুরুষ সহকর্মীদের নারীবিদ্বেষী আচরণ নিয়ে অভিযোগ করলে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করেন। তবে হিলারি রড্যাম ক্লিনটন-এর সাথে আর একটা গোলমেলে ইতিহাস আছে বলে হিলারির যে চিত্র তিনি আঁকেন, তাতে তিনি রাজনীতিতে নারীদের সমকক্ষ মনে করেন কিনা সে ব্যাপারে কোন বৃহত্তর পরামর্শ আছে কিনা সেটার খোঁজ নেবার জন্য সেটা খুঁটিয়ে পড়ার লোভ সম্বরন করা কঠিন। হিলারির জন্য তার সমীহে কোন খাদ নেই। সেনেটে প্রথম দিকের দিনগুলোতে ওবামা আর তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা হিলারির থেকে অনুপ্রেরণা পেতেন, তাকে পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখতেন। ঠিক যেমন তিনি রাজনৈতিক স্টান্টবাজিতে বিশ্বাস না করে অর্থবহ রাজনৈতিক পরিবর্তনে কাজ করায় বিশ্বাস করতেন, ওবামা ও তার সহকর্মীদেরও তেমন লক্ষ্য ছিল। নিউ হ্যাম্পশায়ারে যখন হিলারি প্রকাশ্যে কাঁদেন, তখন মিডিয়াতে অন্যায়ভাবে তার বিদ্রুপ করা হয়। ওবামা সেই অশ্রুবর্ষণকে বলেন ‘এমন সত্যিকার আবেগের বহিঃপ্রকাশ, যা কালে ভদ্রে দেখা যায়।’ বিতর্কের সময় ওবামা হিলারিকে বলেন, ‘তোমাকে মানুষ তো যথেষ্ট পছন্দ করে।’ কথাটা কেন বলেছিলেন বইয়ে ওবামা তার কৈফিয়ত দেন। ওবামা কথাটা এই ভেবে বলেছিলেন যে প্রশ্নটাই আপত্তিকর, কারণ সেখানে এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে মেয়েদের মানুষের কাছে পছন্দনীয় হবার নানান হ্যাপা আছে যেসব পুরুষদের পোয়াতে হয় না। এই বিষয়ে আলোচনার সন্তোষজনক সমাপ্তি ঘটতে না ঘটতেই ওবামা বলেন যে তিনি হিলারিকে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাছাই করার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু পরে ঠিক করেন যে তাতে ঝামেলা বাঁধতে পারে। যথার্থই ঝামেলা বাঁধাবার মতো কারণ আছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে ওবামার আসল কারণ কি ছিল শুনবেন? হোয়াইট হাউসের মূল দফতর ওয়েস্ট উইং-এ একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট কোন সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছাড়া ঘোরাঘুরি করবে, সেটা বড্ড অস্বস্তিকর। অর্থাৎ তার স্বামীর কারণে হিলারি দায়িত্বটা পেলেন না।

বইটিতে ওবামার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবনীমূলক রেখাচিত্র রয়েছে সেগুলো সংক্ষিপ্ত অথচ সুক্ষ্ম রসবোধ আর তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিতে ঋদ্ধ। যেমন আইওয়া অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী অভিযানে নির্বাচন কর্মী এমিলির সম্বন্ধে ওবামা বলছেন ‘আমার রসবোধ, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব সবই তার নির্মোহ দৃষ্টির কাছে সম্পূর্ণ পরাস্ত হলো, শেষমেশ ঠিক করলাম ও যা যা বলবে ঠিক তাই করবো।’ ভ্লাদিমির পুতিনকে দেখে তার শিকাগোর ধূর্ত, মাস্তান ওয়ার্ড প্রধানদের কথা মনে পড়ে যায় – এরাই শিকাগোর স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বব গেটস বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ-এর মধ্যে ওবামা একধরনের নিরাসক্ত সততা দেখতে পান। জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালকে দেখে তার মনে হয় ‘মানুষটা যেন জীবন থেকে সব আলতু ফালতু কাজ ও চিন্তা ভাবনা ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন।’ রাহুল গান্ধী সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘ওর মধ্যে কেমন একটা অপরিপক্ক, কম্পমান ভাব রয়েছে, যেন সে এক শিক্ষার্থী, পাঠ্যসূচি অধ্যয়ন সমাপ্ত করে শিক্ষককে সন্তুষ্ট করতে আগ্রহী, কিন্তু অধীত বিষয় আত্মস্থ করবার ক্ষমতা অথবা নিষ্ঠা নেই।’ জো বাইডেন একজন সজ্জন, সৎ, স্বজননিষ্ঠ লোক। তবে ওবামার অনুমান ‘বাইডেন যদি মনে করেন তাকে যথাযোগ্য সম্মান করা হচ্ছে না তাহলে ক্ষেপে যেতে পারেন। বয়সে তরুণ ওপরওয়ালার ক্ষেত্রে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।’ রিপাবলিকান সেনেটর চাক গ্রাসলি ‘ঠারে ঠোরে প্রস্তাবিত বিল নিয়ে তার দ্বিধার কথা বললেও ঠিক কী পরিবর্তন আনলে তার সম্মতি পাওয়া যাবে সেই কথাটা আর আমাদের বলেন না।’ স্যারা পেলিন দেশশাসন সম্বন্ধে ‘কী যে বলে তার মাথামুণ্ডু সে নিজেই কিসসু বোঝে না।’ সেনেটের রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল-এর ‘ব্যক্তিত্ব বা রাষ্ট্রনীতিতে যে খামতি রয়েছে সেটা তিনি পুষিয়ে নিয়েছেন সুশৃঙ্খল, ধূর্ত নির্লজ্জতা দিয়ে – এবং সেটা তিনি নির্মোহ্ একাগ্রতার সাথে ক্ষমতা আহরণের উদ্দেশ্যে ব্যয় করেন।’ ফরাসী প্রেসিডেন্ট নিকলাস সার্কজি সাহসী, সুযোগসন্ধানী, ওবামার চোখে তিনি ‘উদ্ধত ছোট্ট মোরগের মতো বুক চিতিয়ে চলেন।’

এক একান্ত বৈঠকে চীনের রাষ্ট্রপ্রধান হু জিনতাও যখন একগুচ্ছ নথি থেকে পাঠ করেন তখন সেটা এতটা একঘেয়ে হয়ে ওঠে যে ওবামা একবার ভাবেন যে তিনি পরামর্শ দেবেন ‘নথি বিনিময় করে নিজে নিজে সুবিধামতো পড়ে নিলে তাতে উভয়েরই সময় বাঁচবে।’ সাউথ ক্যারোলাইনার সেনেটর লিন্ডসে গ্যায়াম সম্বন্ধে ওবামার মন্তব্য, তিনি হলেন গোয়েন্দা ছবি বা ব্যাঙ্ক ডাকাতির ছবির সেই চরিত্রের মতো ‘যে নিজেকে রক্ষার জন্য সবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।’ ডেমোক্র্যাট সেনেট নেতা হ্যারি রিড ঠোঁটকাটা স্বভাবের, তবে মানুষটা সজ্জন ও সৎ। ওবামা জিততে পারবেন এই আত্মবিশ্বাস হবার বহু আগেই তাকে চমকে দিয়ে রিড বলেছিলেন: ‘তোমার জেতার ক্ষমতা রয়েছে।’ সেনেটর টেড কেনেডি ওবামাকে কেনেডি ঘরানার ঐতিহাসিক পরম্পরার সুর টেনে বলেছিলেন, ‘তুমি সঠিক সময় বাছাই করবে না, সময়ই সঠিক মূহুর্তে তোমাকে বাছাই করবে।’

কেনেডির কথায় নিয়তির একটা আভাস রয়েছে, কিন্তু ওবামা সেই নিয়তিকে স্বাগত জানিয়েছেন কিনা সেটা কিন্তু মোটেও পরিষ্কার নয়। রাজনীতিতে তার অংশগ্রহণে দ্বিধা ও কখনো কখনো কুণ্ঠা রয়েছে। তার জন্য মানুষের ভীড় যত স্ফীত হয়, তার একাকীত্ব যেন আরো বাড়ে। তার মনের ভেতরে যে বাউন্ডুলে মানুষটা বাস করে সে প্রথাগত রাজনীতিকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখে, আবার তার মধ্যে একটা বাস্তববাদী মানুষ আছে সে রাজনীতির সীমাবদ্ধতার ব্যাপারেও সজাগ। কী অভাবিতভাবেই না তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে! যখন ২০০০ সালে ওবামা এক বন্ধুর অনুরোধে ডেমোক্র্যাটিক সম্মেলনে যান, তখন তার ভবিষ্যত অন্ধকার, ক্রেডিট কার্ডে পয়সা নেই বলে গাড়িভাড়া করবারও সামর্থ্য নেই। সম্মেলনের মূল মিলনায়তনে তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়না, কারণ দলীয় পদমর্যাদায় তিনি অকিঞ্চিতকর। তার মাত্র চার বছর পরে তিনি এমন এক মূল বক্তৃতা দেন যে সেটাই শেষ পর্যন্ত তার প্রেসিডেন্ট হবার যাত্রাপথ সুগম করে। প্রথম থেকেই যেন কেমন একটা আবহ ছিল তাঁকে ঘিরে – তিনি গড়পড়তা রাজনীতির নোংরামি থেকে ঊর্দ্ধে। ইলিনয় রাজ্য সেনেটে এক সহকর্মী একবার একটি নৈতিকভাবে ধোঁয়াটে সমঝোতায় সমর্থনের জন্য ওবামাকে আর চাপ দিলেন না – কারণ ‘ব্যারাক অন্যরকম, ও অনেক ওপরে উঠবে।’

ওবামা যখন মার্কিন সেনেটের পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তখন বেশ বড় ঝুঁকি নেন। মিশেল ঘোর আপত্তি করেন। একে তো লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার আরামটার বারোটা বাজবে। তার ওপর ব্যাঙ্কে সঞ্চয় যৎসামান্য, ওবামার আইনের প্র্যাকটিস বন্ধ করলে সেটা আরো সঙ্কুচিত হবে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওবামা যথেষ্ট মেহনত করেন, কিন্তু তারপরও বোঝা যায় যে পরাজয় হলে যে তার জীবন বৃথা হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী অভিযানের সময় তার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ডেভিড এ্যাক্সেলরড ওবামাকে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় না প্রেসিডেন্ট না হলে আপনি খুব দুঃখ পাবেন।’ হয়ত তিনি প্রেসিডেন্ট হতে চান, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হতেই হবে এমনটা নয়। তিনি শুধু ক্ষমতার জন্য ক্ষমতা চান না, ক্ষমতা পেলে কী করতে পারবেন সেই কথা ভেবেই ক্ষমতা চান, এবং পরিবর্তন আনার জন্য তিনি যে কোন পথে যেতে পারেন, তাতে যদি ক্ষমতা অর্জন না হয় তাও সই।

হয়তো এজন্যই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার আট বুছর পরও তাকে হাবেভাবে আগন্তুক মনে হয়। মনে হয় যেন একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, তিনি যেন একজন বহিরাগতের চোখ দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রত্যক্ষ করছেন। প্রতি বছর হাউস ও সেনেটের মিলিত সভায় প্রেসিডেন্টের State of the Union বক্তৃতা নিয়ে তার বর্ণনায় একতা শ্রান্তির সুর রয়েছে। যখন ওবামা এই বক্তৃতার গতবাঁধা নাটুকে ধরন, একমাত্র বিদেশে মার্কিন সেনাবাহিনীর উল্লেখ ছাড়া সর্বদলীয় করতালির অভাব – এসব কথা উল্লেখ করেন, তখন তাতে একটা প্রচ্ছন্ন শ্লেষ রয়েছে, আবার ভগ্নহৃদয়ের বেদনাও রয়েছে। ওবামার খুব সাধ পরিস্থিতি অন্যরকম হোক। সেনেটে প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত প্রার্থীদের সেনেটে অনুমোদনের ব্যাপারে শুধু প্রশাসনকে বিপাকে ফেলার জন্যই বিপক্ষ দল যদি সব সময় বাগড়া না দিত? যদি সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্ব বহন করে এমন সব বিষয় শুধুমাত্র তাদের পক্ষে জাঁদরেল লবিইস্ট নেই বলে উপেক্ষা না করা হতো? রিপাবলিকান সেনেটর অলিম্পিয়া স্নো যখন ওবামার স্বাস্থ্য নীতির সপক্ষে ভোট দেবার কথা ভাবছিলেন তখন রিপাবলিকান সেনেট নেতা মিচ ম্যাককনেল বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাকে উচ্চপর্যায়ের কমিটি পদ থেকে বরখাস্ত করা হবে, এই শাসানি দিয়ে নিরস্ত করেছিলেন। যদি সেনেটরদের ভোট দিতে এভাবে শাসানি না দেওয়া হতো?

এই অন্য রকম একটা বিপক্ষবান্ধব পরিবেশের জন্য ওবামার আকুতি এতটাই পরিষ্কার যে তিনি সেনেটের তেজী বর্ষীয়ান নেতাদের বিপক্ষ দলের সহকর্মীদের সাঙ্গে বন্ধুত্বকে শ্রদ্ধা করেন। ডেমোক্র্যাট টেড কেনেডি, জন ওয়ার্নার আর রিপাবলিকান অরিন হ্যাচ-এর মধ্যে যে গভীর সৌভ্রাতৃত্ব বিদ্যমান, সেটা আরো অল্প বয়সের সেনেটরদের মধ্যে নেই। এদের মধ্যে ওবামা “আরো কট্টর মতাদর্শগত উগ্রতা দেখেন, যেটা সাবেক রিপাবলিকান হাউস স্পিকার নিউট গিংগ্রিচ-এর আমলের হাউসের রাজনৈতিক আবহের মতো।’ দুই দলের মধ্যে সমঝোতা তার কাছে খুব বড়ো জিনিস। তিনি রিপাবলিকান বব গেটসকে তার প্রশাসনে চেয়েছেন যাতে তার নিজের পক্ষপাতের ব্যাপারে তিনি সাবধান করতে পারেন। এই কথাটা বারবার মনে হয় ওবামা যাদের মন জয় করতে পারেননি তাদেরকে যেন যাদের মন জয় করতে পেরেছেন তাদের সমান, এমনকি তাদের চাইতে বেশি সমীহ করেন। কিছু কিছু প্রগতিশীল আশাহত হয়েছেন, কিন্তু ওবামার কাছে তারা যা চেয়েছেন সেটা তো তিনি কখনোই দেবেন বলে কথা দেননি। তাদের উদ্দেশ্যে বইটিতে তার পরিষ্কার বক্তব্য রয়েছে। তার সম্বন্ধে কল্পনাবিলাসী আদর্শবাদী হিসেবে যে ধারণা চালু হয়েছে সেটা সঠিক নয়। তার আদর্শবাদ অনেক বেশি বাস্তবমুখী, তাতে তার নানীর গভীর প্রভাব রয়েছে। ওবামা লিখছেন: ‘ওর কারণেই তরুণ বয়সে আমার সবচাইতে বৈপ্লবিক চেতনার মূহুর্তেও আমি একটা সুপরিচালিত ব্যবসা দেখে বাহবা দিতাম, আর পত্রিকার ব্যবসার পাতার খোঁজখবর রাখতাম। সেকারণেই আমি সবকিছু ভেঙে আবার নতুন করে সমাজ গড়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছি।’

একই কারণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি খুব স্বচ্ছ দৃষ্টিতে শাসনের বাস্তবতা উপলব্ধি করেন। ‘যে সমঝোতাটা হলো, সেটা আমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু এ যেন এক পরিচিত ছক হয় উঠছে। বিকল্প যা আছে, সেগুলো আরো খারাপ।’ এখানে ওবামা যা লিখেছেন, সেটা তার প্রায় সব বড়ো বড়ো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খাটে। মার্কিন দেশের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র ওয়াল স্ট্রিট-এ তাকে কখনো বলা হয় ওয়াল স্ট্রিট-বিরোধী আবার প্রগতিশীলরা তাকে কখনো বলে ওয়াল স্ট্রিট-বান্ধব, এটা ওবামা এবং তার প্রেসিডেন্ট শাসনামলের জটিল বাস্তবতার ইঙ্গিতবহ। আর যাদের মনে এখনো প্রশ্ন রয়েছে, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ যেভাবে ইরাক যুদ্ধ সমাপ্তি ঘটিয়ে ছিলেন, সেখানে তার বিদেশ নীতির অনুরাগী। তিনি ইরাক যুদ্ধ সমর্থন করেননি, তবে আফগানিস্তানে যুদ্ধ প্রয়োজনীয় মনে করেন।

তিনি লেখেন যে রিপাবলিকানরা জয়ের জন্য লড়াই করতে বেশি দক্ষ। বামপন্থীদের মাঝে ঠিক একই রকম ঐক্যের জন্য তার অনুচ্চারিত আকুতি দেখি। স্বাস্থ্য আইনের থেকে সরকার-চালিত স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা বাদ দেওয়া হলো কারণ সেটা থাকলে আইন পাশ করা সম্ভব হতো না। বহু ডেমোক্র্যাট বোধগম্য কারণে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। ওবামা আশা করেছিলেন প্রগতিশীলরা তার বাস্তববাদিতার সাথে একমত হবেন, তারা বুঝতে পারবেন যে বিলটি পাশ করার জন্য তার আর কোন বিকল্প ছিলনা। বইয়ে তিনি এই অশুদ্ধ স্বাস্থ্যনীতির আইন পাশের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। এর আগেও নাগরিক অধিকার আইন, ১৯৪০ দশকে ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের New Deal এর মতো গভীর অর্থবহ সমাজ সংস্কারমূলক আইনগুলো সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাশ করানো হয়েছিল। তারপর সেগুলো ঠিকঠাক করা হয়। কিন্তু তখন ওবামা খোলাখুলিভাবে ঘনঘন এই যুক্তির পক্ষে বলেন নি কেন?

বর্ণবাদ নিয়ে তার কাছে আরো কিছু কথা আশা করেছিলাম। তিনি বর্ণবাদ নিয়ে এমনভাবে মন্তব্য করেন যেন সারাক্ষণ তার মনে এই চিন্তাটা ঘুরপাক খাচ্ছে যে একজন স্পর্শকাতর শাদা পাঠক তার কথায় ক্ষুব্ধ হতে পারেন। বর্ণবাদের কোন উদাহরণ উল্লেখ করলেই তার আগে আরো কিছু উদাহরণ দেন যাতে আপাতদৃষ্টিতে বর্ণবাদের অভাব প্রতীয়মাণ হয়। সেজন্য যখন আমরা শুনি যে আইওয়াতে এক সমর্থক বলছে ‘ভাবছি নিগারটাকেই ভোট দেব,’ তখন আমরা আরো বহু ভালো আইওয়া বাসিন্দাদের কথা শুনি যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে ভাবছেন। এই যে বর্ণবাদী মূহুর্ত, সেটাকে কখনো ঠিক খোলাসা করে, বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া হয় না, তার ওপর জটিলতার মায়াজাল বিস্তার করা হয়। বর্ণবাদ বিষয়টি অবশ্যই জটিল, তবে জটিলতার ধারণাটা গা বাঁচানোর ছুতো হিসেবে বড্ড বেশি ব্যবহার করা হয়, যাতে আলোচনাটা স্বস্তিকর থাকে, বর্ণবাদের পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি বিবেচনা করার ফলে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের দূরে না ঠেলে দেওয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনী লড়াইয়ে ওবামা উপলব্ধি করেন যে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে হোক, বা গেরস্থ অধিকার বা অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণের দাবি, ইত্যাদির ভিত্তিতেই হোক, গোষ্ঠীগত স্বার্থে রাজনীতি আমেরিকার মজ্জাগত। শুধুমাত্র কালো আমেরিকানরাই এই রাজনীতি করলে সমূহ বিপদ। নাগরিক অধিকার বা পুলিশী অত্যাচারের মতো ‘কালো বিষয়’ নিয়ে বেশি মাতামাতি করলে শাদারা বিগড়ে যেতে পারে। আইওয়া-তে নিজ দলের মনোনয়নের নির্বাচনী লড়াইয়ে ওবামার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা রবার্ট গিবস ওবামাকে বলেন – ‘বিশ্বাস করুন, আপনার সম্বন্ধে লোকে আর কিছু জানুক বা না জানুক, আপনি যে আমেরিকার প্রথম ৪২ জন প্রেসিডেন্টের চাইতে দেখতে অন্যরকম, সেটা লোকে ঠিকই দেখেছে।’ অর্থাৎ - ‘ওদের আবার মনে করিয়ে দেবার দরকার নেই যে আপনি কালো।’ যেই কথাটা অনুচ্চারিত রয়ে গেল সেটা হচ্ছে কালো হওয়াতে যদি সমস্যা না থাকত, তাহলে ভোটারদের সেটা মনে করিয়ে দিলে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। এটা এত বড় অন্যায়, অথচ আমরা বুঝতে পারি যে এই পন্থাই সবচাইতে বাস্তবানুগ, জেতার একমাত্র উপায় – যদিও এই বিষয়ে বাস্তবানুগ হওয়াটাই গর্হিত।

তার শাসনামলে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো অধ্যাপক হেনরি লুইস গেইটস একবার যখন নিজের বাড়িতে তালা ভেঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করেন তখন তাকে এক শাদা পুলিশ অফিসার গ্রেফতার করেন। ওবামা অধ্যাপকের দৃষ্টিভঙ্গি ‘সোজা-সাপ্টা ভালো বনাম মনের নীতিকাহিনি নয়, বরঞ্চ আরেও ব্যক্তিগত, মানবিক’ মনে করেন। ওবামার যুক্তি হলো গেইটসকে গ্রেফতার করতে পুলিশ যেমন বাড়াবাড়ি করেছে, ঠিক যেমন তার বাড়িতে পুলিশ আসায় অধ্যাপকের প্রতিক্রিয়াতেও বাড়াবাড়ি রয়েছে। এমন যুক্তি বর্ণবাদ সম্বন্ধে অসচেতন, অজ্ঞ লোকে করে থাকে। উভয় পক্ষেরই দোষ, যেন ক্ষমতা উভয় পক্ষেই সমান! (অভ্যন্তরীণ জরিপে ওবামা জানতে পারেন যে গেইটসের ঘটনার ফলে শাদা ভোটারদের মাঝে তার প্রতি সমর্থন সবচাইতে বেশি হ্রাস পায়।)

শিকাগো শহরে থাকার সময় ওবামা সপরিবারে মাঝে মাঝে একটা গীর্জায় প্রার্থনায় যেতেন, তার ধর্মযাজক ছিলেন জেরেমায়া রাইট। গীর্জায় রাইটের অগ্নিঝরা বক্তৃতা ওবামার শাসনামলে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। তার সম্বন্ধে আলোচনার সময়ও ওবামার মধ্যে খানিকটা উন্নাসিকতা, কিঞ্চিত তাচ্ছল্যমিশ্রিত প্রশ্রয় দেখি। ওবামা লেখেন যে ‘তার উচ্চকণ্ঠ গালাগালে সত্যতা যদিবা ছিল প্রেক্ষিত বিচার ছিল না।’ ওবামা যেন বলতে চাইছেন যে অবস্থাপন্ন সফল কালো মানুষের ধর্মসভায় এসব কথা ঠিক মানায় না। যেন উচ্চশ্রেণির সামাজিক সুবিধায় বর্ণবাদের বিষ নির্মূল হয়ে যায়! আমেরিকার বর্ণবাদ সম্বন্ধে ওবামার উপলব্ধি অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবিষয়ে কোন সংশয় নেই, তবে তার অনন্য পারিবারিক ইতিহাসের কারণে হয়তো তিনি নিজেকে মধ্যস্থতাকারী মেঝো সন্তানের ভূমিকায় রাখেন। ফলে যেসব সত্য তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করবে সেটা তিনি অনুচ্চারিত রাখার পক্ষপাতী, আর কিছু সত্য যদিবা উচ্চারণও করেন, সেসব নানান মধুর ছলনার চাদরে জড়িয়ে রাখেন।

গ্রামীণ শাদা মজুর শ্রেণি সম্বন্ধে তার যে মন্তব্য – ‘ওদের মনে পুঞ্জিভূত তিক্ততার কারণে ওরা বন্দুক বা ধর্মবিশ্বাস, বা নিজেদের থেকে দেখতে ভিন্ন এমন মানুষের প্রতি বিদ্বেষ, বা অবাধ বাণিজ্য-বিরোধী ভাবনা – এইসব আঁকড়ে ধরেন, তাদের নিজেদের হতাশা প্রকাশ করবার জন্য এসব ক্ষোভ ব্যবহার করেন’ – সেটা নিয়ে এখনও ওবামা অনেক ভাবেন। কারণ মানুষ তাকে ভুল বুঝুক, এতে তার প্রবল আপত্তি। সঙ্গত কথা। শাদা মজুর শ্রেণির প্রতি তার সমবেদনা রয়েছে, কারণ তাকে কোলে পিঠে বড় করেছে যে নানা, উনিও তো খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু যখন নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য তিনি বলেন, ‘আমেরিকার ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, নিজেদের অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা নিয়ে শ্বেতাঙ্গ খেটে খাওয়া মানুষের মনে যে ক্ষোভ, রাজনীতিকড়া সেটাকে কালো বা বাদামী মানুষের প্রতি বিদ্বেষে পরিণত করেছে।’ কথাটার মধ্যে একটা আশ্চর্য ফাঁকি রয়েছে, সত্য কথা স্পষ্টভাবে বলার দায় এড়াবার প্রবণতা রয়েছে। শাদা শ্রমিক শ্রেণির বর্ণবাদ কি শুধুমাত্র নিরীহ শাদা লোককে বজ্জাত রাজনীতিবিদরা ধোকা দেবার ফলশ্রুতি? যখন ওবামা লেখেন যে রিপাবলিকান সেনেটর জন ম্যাককেনের মধ্যে কখনো অন্য অনেক রিপাবলিকান রাজনীতিবিদদের মতো ‘বর্ণাশ্রয়ী স্বজাতির প্রতি পক্ষপাত’ দেখা যায় নি, তখন এই ধরনের ভেদবুদ্ধির আরো পুর্ণাঙ্গ উদাহরণ বইটিতে দেখার ইচ্ছে হয়। বইটি পড়ে মনে হয় অত্যন্ত বিদগ্ধ দৃষ্টিতে বর্ণবাদের বিচার করতে গিয়ে বর্ণবাদকে খানিকটা খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যনীতি আইন নিয়ে বিতর্কে মাত্রাগত পরিবর্তন আনতে ওবামা কংগ্রেসে সেনেট ও হাউসের যৌথ অধিবেশনে বক্তৃতা দেন। এই আইনে বেআইনি অভিবাসীদের স্বাস্থ্য সুবিধা দেওয়া হবে, এই সর্বৈব মিথ্যা কথাটা যখন ওবামা খণ্ডন করেন, তখন জো উইলসন নামে এক নাম-না-জানা কংগ্রেসম্যান রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে (আমার মতে সেটা বর্ণবাদী ক্রোধ) চীৎকার করে বলেন, ‘আপনি মিথ্যা কথা বলছেন!’ এই মূহুর্তটি আমেরিকার ইতিহাসে অতি পরিচিত। সামাজিকভাবে উচ্চতর অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও একজন কালো মানুষের একজন অধস্থন শাদা মানুষের কাছে অপমানিত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম বা শেষ নয়। ওবামা লেখেন যে ‘আমার ইচ্ছে হয়েছিল আমার সুউচ্চ অবস্থান থেকে নেমে গিয়ে আসন সারির মাঝখানের পথ বেয়ে গিয়ে লোকটার মাথায় একটা চাটি মারি।’ ব্যাপারটা খানিকটা ধামাচাপা দেবার চেষ্টার কারণটা আমি বুঝতে পারি – উনি কালো মানুষ, তাই ওঁর রাগ করার অধিকার নেই – কিন্তু আজ সেই ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে চাটি মারার বালখিল্য ভাষা ব্যবহার করছেন দেখে একটু হতবুদ্ধি হলাম। যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের যৌথ সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে এই প্রথম এভাবে জনসমক্ষে অপমানিত হলেন। এর তাৎপর্য কী?

একথা ঠিক তার মধ্যে একটা বিদেশী বিদেশী ভাব ছিল, তার বাবা এমনকি তার নামও বেশ অন্যরকম – এই সব কারণ তার প্রতি আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু তার বিদেশী ভাবটা যদি শ্বেতাঙ্গ বর্ণের হতো, যেমন তার বাবা যদি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান, বা আইরিশ বা পূর্ব ইউরোপীয় হতো, তার ডাকনাম যদি ওলাফ বা এমনকি ভ্লাদিমির হতো, তাহলে তার চরিত্রহনন এতটা বীভৎস হতো না। গায়ের রঙ কালো না হলে তিনি এত বেশি হত্যার হুমকির মুখোমুখি হতেন না যে কারণে নির্বাচনের গোড়া থেকেই সিক্রেট সার্ভিসের সুরক্ষা প্রয়োজন হয়েছিল, নির্বাচনে জয়লাভের অনেক, অনেক আগে থেকেই তার শোবার ঘরে বুলেটনিরোধক দেয়াল বসানো হয়েছিল।

অনেক কালো আমেরিকানরা ‘আত্মরক্ষামূলক নেতিবাচকতার’ শিকার হয়েছিলেন। ওরা ধরেই নিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্ট পদে দাড়াবার ঔদ্ধত্য দেখাবার জন্য ওবামাকে হত্যা করা হবে। এতে কালো আমেরিকানদের সম্বন্ধে দেশটার চিন্তার বন্ধ্যাত্যই প্রকাশ পায়। নামে হুসেন থাকা সত্ত্বেও ওবামা হোয়াইট হাউসে যেতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন কেন? কেন উনি যখন জিতেছিলেন আমরা সবাই কেঁদেছি?

ওবামার শাসনামলে আমি সরোষে আমার বন্ধু ও তর্কের সাথী চিনাকু কে ধমক দিতাম – ‘আবার তুই ওবামার চাল মারছিস।’ ওবামার চাল মানে চিনাকু প্রতিটি বিষয় ৭৩টা দিক থেকে দেখত এবং সেটা সবিস্তারে বোঝাত। আমার কাছে ব্যাপারটার মধ্যে একটা ধাপ্পা রয়েছে বলে মনে হতো। মানে এতো বিশদে একটা জিনিস দেখলে সেই দেখায় আর সারবস্তু বলে কিছু থাকেনা, ফলে ঠিক কোন পক্ষই নেওয়া হয় না। এই বইটাতে ওবামা নিজেই মাঝে মাঝে ওবামার চাল মেরেছেন। যেন এক লোক কীভাবে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে সেইটাও পর্যবেক্ষণ করছেন। তার সংশয় বাতিকটা এতই গোঁড়া, সব দিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর যেন কোনটাই তার পছন্দ নয়। কোন মতাদর্শের কট্টর অনুসারী হওয়া তো তার ধাতেই নেই। তাঁদের সম্পর্কের প্রথম দিকে মিশেল তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সব সময় ও সবচাইতে কঠিন পথটা বেছে নেয় কেন। সত্যি তো। এই বইটিতে একজন অবিশ্বাস্যরকমের সজ্জন লোক নিজের সম্বন্ধে সত্যনিষ্ঠ বিবরণ দিয়েছেন। আজকাল একটা কথা খুব চালু হয়েছে, কোন বিখ্যাত মানুষের প্রশংসা করার আগে বলে নেয়া হয় যে লোকটার স্বভাবে সীমাবদ্ধতা আছে। কার স্বভাবে সীমাবদ্ধতা নেই? রীতি হিসেবে এটা একটা অভদ্র চালাকি মনে হয়, যেন একজন ক্ষমতাশালী বা বিখ্যাত ব্যক্তির যতই তারিফ পাওনা হোক, তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে আমাদের একধরনের সংকীর্ণ কুণ্ঠা রয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে ওবামার এই গল্প আরো এগোবে, তবে ইতোমধ্যেই ব্যারাক ওবামা মার্কিন ইতিহাসের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ উজ্জ্বলভাবে আলোকিত করেছেন। আমেরিকা একদম বদলে গেছে, কিন্তু আবার বদলায়ওনি।

লাইক আ বার্ড | নিউ ইয়র্ক টাইমসের বই আলোচনা | অনুবাদঃ আশফাক স্বপন | মূলঃ প্রিয়া অরোরা



পুরুষতান্ত্রিকতার সিন্দবাদের ভূত। বর্ণ, যৌনপরিচয়/প্রবণতা সম্বন্ধে সুতীব্র ঘৃণা। বাঙালির মধ্যে বহুরকমের ভেদবুদ্ধি, সেটা মূল ভুখণ্ডে যেমন, তার বিরূপ প্রভাব সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা অভিবাসী সমাজে। সেই সমাজে অস্ট্রেলিয়া আর ক্যানাডায় বাংলাদেশি বাবা-মায়ের ঘরে বড় হয়েছেন ফারিহা রোশিন। নিজে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তারপর ঘুরে রুখে দাঁড়িয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম উপন্যাস। এই নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রতিবেদন। 



জীবনে টিকে থাকার সংগ্রামটা ঠিক কেমন? লেখিকার আশা, যন্ত্রণা নিয়ে তার বইটি সেই বাস্তবতা তুলে ধরবে


প্রিয়া অরোরা

নিউ ইয়র্ক টাইমস; ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০


অনুবাদ আশফাক স্বপন


In a Book About Trauma, She Hopes to Show What Survival Looks Like


By Priya Arora

The New York Times | Sept. 27, 2020


Like a Bird

By Fariha Roisin

The Unnamed Press. 288 pp. $26 


ফারিহা রোশিন-এর বয়স যখন ১২, তখন যেই চিন্তাটা অবশেষে তার প্রথম উপন্যাসের রূপগ্রহণ করে, সেটা তার কাছে এক স্বপ্নে আবির্ভূত হয়। তখনও  তার যা বলার ছিল তার জন্য সব শব্দ তার আয়ত্তে ছিল না, কিন্তু তাতে কি? তিনি কাজ শুরু করলেন।


আজ তার বয়স ৩০, আর আস্তে আস্তে তার লেখার ভাণ্ডারও সমৃদ্ধ হয়েছে। সেখানে কবিতা, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ এবং আরো অন্যান্য রচনা রয়েছে। এই সব লেখা তার নিজের নিপীড়ন, শারীরিক আক্রমণ আর লজ্জার অভিজ্ঞতার গভীর অনুসন্ধান করেছে। Unnamed Press প্রকাশিত তার প্রথম বই Like a Bird (পাখির মতো)-এর বেলায়ও এই কথা সত্যি। এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এতো বছর ধরে এই বইটি লেখার প্রক্রিয়া তার মানসিক আরোগ্য পুনুরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। কেউ নির্যাতনের শিকার হলে কী ঘটে সেই বিষয়ে গল্পের খুব অভাব। বইটি সেই নিরবতার বিরুদ্ধে একটি প্রত্যুত্তর।


‘আমার ধারণা আমার লেখালেখির একটা বিরাট অংশ মানসিক আরোগ্যলাভ নিয়ে, কারণ আমার নিজের মানসিক আরোগ্যলাভ প্রয়োজন, এবং সারাক্ষণ বর্তমান সময়েই সেই অভিজ্ঞতার সাথে বোঝাপড়া করছি,’ ফারিহা বলেন। ‘আমি বাঁচব, আমি জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে পারব, এই ধারণার প্রতি আমার আস্থা জন্মানো দরকার। আমার যে একটা ভবিষ্যত আছে, এই বিষয়ে আমার আস্থা থাকা দরকার। সেটা পাতায় লিখিতভাবে না দেখলে, সেটা আমার দিব্যচক্ষুতে না দেখতে পেলে আমি নিজেকে সেই নিশ্চয়তা দিতে পারি না।’


Like a Bird তাইলিয়া চ্যাটার্জীর গল্প। তাইলিয়া এক অল্পবয়স্কা তরুণী। নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানের অবস্থাপন্ন উত্তর পশ্চিম দিকে বড় হয়েছেন। কিন্তু বাবা মা দুজনই মানসিকভাবে যেন অধরা, তাকে কঠোরভাবে দমন করে রাখে। তার মনে হয় তার চার পাশের সবার কাছে তিনি যেন অদৃশ্য। ব্যতিক্রম তার স্নেহময়ী বড় বোন আলিসা।


তাইলিয়ার ওপর যৌন নির্যাতন হবার পর তার পরিবার তাকে ত্যাগ করে। মানসিকভাবে, শারীরিকভাবে, আর্থিকভাবে তার নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণ তার নিজের কাঁধে এসে পড়ে। তার নানীর আত্মার সস্নেহ পথপ্রদর্শনায়, তার নতুন বন্ধু ও প্রণয়ীদের সাহায্যে তিনি ধীরে ধীরে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাথে বোঝাপড়া করে মানসিক আরোগ্যলাভের অর্থ কী সেটা বুঝতে সক্ষম হন। তার মতো যেসব মানুষ নির্যাতন-নিপীড়ন-হিংসার সাথে সংগ্রাম করে নিজেকে রক্ষা করেছেন, এই ফারিহা তাদের উৎসর্গ করেছেন।


‘আমার মনে হয়েছে আমি নিজ অভিজ্ঞতা, নিজ সত্তার বাইরে থেকে যেন কিছু আহরণ করতে পেরেছি, সেটা আত্মস্থ করতে পেরেছি,’ তিনি বলেন।


অস্ট্রেলিয়া আর কানাডায় বাংলাদেশি বাবা-মায়ের ঘরে ফারিহা বড় হন। তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা সঙ্কলনসহ পূর্ববর্তী রচনায় তিনি যন্ত্রণার ঐতিহ্য ও মরমী ভাবনার মতো বিষয় অনুসন্ধান করেছেন। তার কবিতা সঙ্কলনের নাম How to Cure a Ghost (প্রেতাত্মা কী করে সারাতে হয়)। ‘আমার পূর্বপুরুষদের থেকে যে আমার কত কিছু শেখার আছে! আমার ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাস, আমার জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, আমাদের অঞ্চলের ইতিহাস – এই সবকিছু থেকে আমার অনেক, অনেক কিছু জানার, শেখার আছে,’ তিনি বলেন।


এই শেকড়সন্ধান ফারিহার ভারতপ্রেমের গভীরে প্রোথিত। তবে তিনি ভারতকে অভিহিত করেন বৃহত্তর ভারত হিসেবে, অর্থাৎ উপনিবেশ হবার আগের ভারত। তানাইস (Tanais) একজন লেখিকা। পাঁচ বছর আগে তিনি ফারিহার লেখার সাথে পরিচিত হন। তাকে যে বিষয়টা চমকে দেয় তা হলো ফারিহার বাংলাদেশের সাথে আত্মীয়তা এবং তার যৌন পরিচয় নিয়ে লেখালেখির ফলে তার সাহিত্যকৃতি যেন একই সাথে দক্ষিণ এশীয় কথাসাহিত্যের অংশ, আবার একই সাথে সে সম্বন্ধে প্রচলিত ধ্যানধারণার প্রতি চ্যালেঞ্জ। কারণ দক্ষিণ এশীয় কথাসাহিত্য সচরাচর ভারতকেন্দ্রিক, সেখানে উঁচুবর্ণের হিন্দুদের কাহিনির প্রায় একচ্ছত্র দাপট।


‘এই ব্যাপারটা খুব ভেবে দেখার মতো যে এত বিস্তৃত একটা অভিবাসী সমাজের অংশ আমি, অথচ বাঙলা সমকামী নারীত্ব নিয়ে খুব সুনির্দিষ্টভাবে কেউ লিখছেন, তেমনটা একেবারেই মনে হচ্ছে না,’ তানাইস বলেন।


এই দুই লেখক এখন বন্ধু হয়ে গেছেন। Like a Bird-এর প্রাথমিক খসড়া পড়বার পর তানাইস ফারিহাকে পাণ্ডুলিপির কিছু কিছু অংশ - যা তিনি আরেকটু কম বয়সে লিখেছিলেন - সেসব  ঘষামাজার পরামর্শ দেন। কারণ সেই অংশগুলোতে যেন অন্য একটা কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। এই পরামর্শ তার খুব কাজে এসেছিল। এর ফলে তিনি নিজে তফাতটা আরো ভালো করে শনাক্ত করতে পারলেন, এবং সেটা শুদ্ধির আত্মবিশ্বাস লাভ করলেন। ‘এর ফলে ও যেন এক ধরনের মুক্তি লাভ করে, তার মনোবল বেড়ে যায়।’


ফারিহার আরেক বন্ধু, জেবা ব্লে, ফারিহার খসড়া দেখার পর তার অধ্যবসায় দেখে চমৎকৃত হন। ‘সে যেন দূর পাহাড়ে চলে যায়, তারপর এক অপূর্ব সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসে।’


ফারিহা বলেন বইটি লেখা শুরু করার সময় তিনি অনেক কিছু জানতেন না। Audre Lorde, Susan Sontag, June Jordan-এর মতো লেখিকারা, যারা তাদের লেখায় মানসিক আরোগ্যলাভ নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করেছেন, ফারিহা এদের বই গোগ্রাসে পড়েছেন। কিন্তু প্রথম দিককার খসড়াগুলোর ভাষা যে শুধু আরো সরল ছিল তাই নয়, কিছু কিছু বিষয় – যেমন তার যৌন প্রবণতা – সেটা নিয়ে আদৌ লেখা যায় কিনা সেটাই তিনি বুঝতে পারছিলেন না।


‘পুরনো পাতা দেখলে মনে হয়, কী অবাক কাণ্ড, আমার গল্পবলা সম্বন্ধে ধারণাটাও কত কোণঠাসা,’ তিনি বলেন। যেমন প্রথম দিকে গল্পে একটা প্রেমিক পুরুষের উপস্থিতি ছিল। ফারিহা পরে তাইলিয়ার গল্পের মোড় অন্যদিকে নিয়ে যান যেখানে প্রেম নয়, তার সমাজের সাথে আত্মীয়তার মধ্য দিয়ে সে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। এই অবস্থাটাই ফারিহার বেশি সত্য মনে হয়েছে কারণ যৌন পরিচয় ও প্রবণতায় ব্যতিক্রমী যে সমাজ ফারিহার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এটাই বাস্তব অবস্থা।


‘আমার মনে হয়েছে যেন আমার পরিচয়ের একটা অংশ মুছে যেতে বসেছে কারণ আমার আর গত্যন্তর ছিল না,’ ফারিহা বলেন। ‘মানে আমি কি করে এতটা দুঃসাহস দেখাব যার ফলে এমন যৌন পরিচয়/প্রবণতা নিয়ে লিখব অথবা এমন একটা চরিত্র সৃষ্টি করবে যেটা ততটা গ্রহণযোগ্য নয়?’ ওই অংশগুলো আবার ঘষামাজা করে, বিদেশিবিদ্বেষ, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ আর বর্ণবাদের মত অশুভ শক্তিগুলো স্বনামে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে বইটি তার চুড়ান্ত আকার নেয়।


‘আমার তো মনে হয় এই বইটার সবচাইতে বড় গুণ হলো বইটি আমাদের সমাজের বহু বিষয় নিয়ে নিরবতা ভঙ্গ করেছে,’ তানাইস বলেন। ‘আমার মতো মানুষ, যারা নিপীড়ন থেকে বেরিয়ে নিজেদের যন্ত্রণামুক্ত করে মানসিক আরোগ্যলাভ করেছে, যারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজেদের রক্ষা করেছে, তাদের জন্য, আর আপামর অল্পবয়সী মানুষের জন্য এই যে আরেকটি অল্পবয়স্ক মানুষ তার বেদনা, তার যন্ত্রণার ব্যাপারে মুখ খুললো, এবং সেই কষ্টকে অতিক্রম করলো, সেটার ঘোষণা একটা বড় প্রাপ্তি।’


ফারিহা যন্ত্রণার অভিজ্ঞতাকে অনেক সময় প্রেতাত্মা আর ভূতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন। এই উপন্যাসে তাইলিয়ার নানী একজন প্রেতাত্মা হয়ে আবির্ভূত হন। তার সবচাইতে বিপদের সময় নানীর আত্মা তাকে পথ দেখান। এর কারণ বাংলাদেশি সংস্কৃতি এবং ইসলামী ঐতিহ্যে জ্বিনের উপস্থিতি। ছোটবেলা থেকে ফারিহা বুহু জ্বিনের কথা শুনেছেন।


‘অশরীরী আত্মার জগতে আমার চেতনা গভীরভাবে নিমগ্ন,’ ফারিহা বলেন। ‘আমরা সবাই তো তাই। আমাদের সবার এই নিয়ে ধারণা, বিশ্বাস বা ভাষা রয়েছে। শুধু প্রশ্নটা হলো আপনি কতখানি এসবে বিশ্বাস করতে চান আর আপনি কি এদের সাথে সহাবস্থান করার ব্যাপারে ইচ্ছুক কিনা।’


এতবছর ধরে এই বইটি লেখার পর ফারিহা বলেন তার এখন নিজের স্বার্থে সমাজ বদলের দরকার। ‘মানসিক আরোগ্যলাভের ব্যাপারে যুক্তি আর জ্ঞানের বিরোধিতা করবার একধরণের প্রবণতা রয়েছে। আমি এই অবস্থাটা বদলাতে চাই,’ ফারিহা বলেন। ‘আমি চাই লোকে এই বই পড়ে যৌন নিপীড়ন সম্বন্ধে আরেকটু সার্বিক ভাবে, আরো গভীর বিশ্লেষণের সাথে বুঝতে শিখুন, আর সেই নিপীড়ন থেকে মানুষের পরিত্রাণ, তার মানসিক আরোগ্যলাভের ব্যাপারে আস্থাবান হোন, সেটা কীরকম হবে সেই সম্ভাবনাটা নিয়ে একটু ভাবুন।’



[প্রিয়া অরোরা নিউ ইয়র্ক শহরবাসী সম্পাদিকা। ২০১৮ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে যোগদান করার আগে HuffPost এবং অন্য পত্রিকায় কাজ করেছেন। তার লস এঞ্জেলেস-এ বড় হয়েছেন।‘


জগতের সবচেয়ে-সুন্দর জলে-ডোবা পুরুষ মূল গল্প : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস অনুবাদঃ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

জগতের সবচেয়ে-সুন্দর জলে-ডোবা পুরুষ
মূল গল্প : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়



যে বাচ্চারা প্রথম দেখেছিল ওই কালো আর চুপি-চুপি আসা ফোলা-ফোলা জিনিসটা সমুদ্দুরের মধ্য থেকে আসছে, তারা গোড়ায় নিজেদের বুঝিয়েছিল এ নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষের কোনো জাহাজ।

তারপর তারা দেখতে পেলে যে এর কোনো নিশেনও নেই কিংবা নেই এমনকি মাস্তুলও, তখন তারা ভাবলে যে এ নিশ্চয়ই কোনো তিমিঙ্গিল। কিন্তু ঢেউ যখন সেটা ধুতে-ধুতে আছড়ে এনে ফেললো বেলাভূমিতে, তারা সরালে শ্যাওলার আস্তর, জেলিমাছের সব কর্ষিক আর মাছ আর জাহাজডুবির টুকিটাকি যা লেগে আছে গায়ে, আর তখনই তারা দেখতে পেলে এ-যে এক ডুবে-যাওয়া পুরুষমানুষ। 

সারা বিকেলটা তারা তাকে নিয়ে খেলেছিল, কবর দিচ্ছিল তাকে বালিতে, ফের তাকে খুঁড়ে-খুঁড়ে তুলছিল, এমন-সময় দৈবাৎ কে-একজন তাদের দেখতে পেলে আর গাঁয়ে গিয়ে বিপদের সংকেত ছড়িয়ে দিলে। যে-পুরুষরা তাকে ধরাধরি করে সবচেয়ে কাছের বাড়িটায় নিয়ে এলো তারা খেয়াল করলে যে অ্যাদ্দিন তারা যত-সব মৃতদেহ দেখেছে তাদের সকলের চাইতেই এ-লাশটার ওজন অনেক বেশি, প্রায় কোনো একটা ঘোড়ারই মতো ওজন, আর তারা পরস্পরকে বললে, হয়তো সে অনেকদিন ধরেই জলে ভাসছিল, আর তাইতে এমনকি তার হাড়ের মধ্যেও বোধহয় জল ঢুকে গিয়েছে। তারা তখন লাশটাকে মেঝেয় শুইয়ে দিলে আর তারা বলাবলি করলে সব লোকের চাইতেও এ-যে দেখছি লম্বা, ঘরটায় সে প্রায় আঁটেই না যে; তবে, তারা ভাবলে, হয়তো কোনো-কোনো ডুবে-মরা মানুষের প্রকৃতিই থাকে মৃত্যুর পরেও কেবলই বড়ো-হতে-থাকা। গায়ে তার দূর সিন্ধুর গন্ধ, শুধু তার আকৃতি দেখেই কেউ আন্দাজ করে নিতে পারে যে সে এক মানুষেরই লাশ, কারণ চামড়াটা তার কাদা আর আঁশের একটা শক্ত আস্তরে ঢেকে গিয়েছে।

মৃত লোকটা যে অচেনা-কেউ, এটা জানবার জন্যে তাদের এমনকি তার মুখটাও ধুয়েমুছে সাফ করতে হলো না। গ্রামটা গড়ে উঠেছে শুধুমাত্র বিশ-পঁচিশটা কাঠের বাড়িতে; সেসব বাড়ির উঠোন শান-বাঁধানো, কিন্তু কোথাও কোনো ফুল নেই, আর গ্রামটা ছড়িয়ে গেছে কোনো-একটা অন্তরীপের মরুভূমির মতো ঊষর প্রান্তে। ডাঙা এখানে এতই কম যে মায়েরা সবসময়েই ভয়ে-ভয়ে থাকে কখন হাওয়া এসে তাদের ছেলেমেয়েদের উড়িয়ে নিয়ে যায়, আর বছরগুলো তাদের মধ্যে যে-কজনকে এখানে সাবাড় করেছে, তাদের তীরের পাহাড় থেকে জলে ছুঁড়ে ফেলতে হয়েছে, কিন্তু সমুদ্র এখানে শান্ত, নিস্তরঙ্গ ও সুন্দর, আর সাত-সাতটা নৌকোতেই গ্রামের সব্বাই এঁটে যায়। কাজেই যখন তারা এই ডুবন্ত লোকটাকে আবিষ্কার করলে, পরস্পরের দিকে শুধু একবার তাকিয়েই তারা নিশ্চিন্ত হয়ে নিলে যে সকলেই তারা এখানে আছে।

সে-রাতে তারা আর সমুদ্রে কাজ করতে গেলো না। যখন লোকে হদিস নিতে গেলো যে আশপাশের গাঁগুলো থেকে কেউ হারিয়ে গেছে কি না, মেয়েরা থেকে গেলো পেছনে, এই ডুবন্ত লোকটার যত্ন-আত্তি করবার জন্যে। ঘাসের চাপড়া দিয়ে ডলে-ডলে তারা তাঁর গা থেকে কাদা তুলে নিলে, তারা সরিয়ে দিলে জলের তলার যেসব নুড়িপাথর তার চুলে জট পাকিয়ে ছিল, আর যা দিয়ে তারা মাছের আঁশ ছাড়ায় তা-ই দিয়ে তারা তার গায়ের শক্ত আস্তরটা চেঁচে নিলে। এসব করতে করতেই তারা খেয়াল করে দেখলো যে উদ্ভিদ বা শ্যাওলা যা তার গায়ে লেপটে আছে সেসব এসেছে দূর-দূরান্তের সাগর থেকে, গভীর জল থেকে, তার জামাকাপড় সব ফালি-ফালি চিলতে মাত্র, যেন সে প্রবালের গোলকধাঁধার মধ্য দিয়েই পাল খাটিয়ে গিয়েছিল। তারা আরো খেয়াল করলো যে সে মৃত্যু বহন করেছে স্বগর্বেই, কারণ অন্য-যেসব ডুবে-যাওয়া লোক আসে সমুদ্র থেকে সে-রকম কোনো নিঃসঙ্গ ভঙ্গি তার নেই, কিংবা নেই সেই কোটরে-বসা খ্যাপা কাতর চোখ যারা ডুবে মরে নদীতে। তবে শুধু যখন তারা তাকে আগাপাশতলা সাফ করলে তখনই আবিষ্কার করলে কেমনতর পুরুষ ছিল সে আসলে, আর এই আবিষ্কার যেন তাদের দম আটকে দিলে। তাদের দেখা সব পুরুষের মধ্যে সে-যে শুধু সবচেয়ে লম্বা, বলবান, তেজস্বী আর সবচেয়ে সুঠাম সুগঠন পুরুষ ছিল তা-ই নয়, আরো-কিছু-একটা ছিল যেন তার মধ্যে; তবে যদিও তারা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল তাদের কল্পনায় কিন্তু তার জন্যে কোনো ঠাঁই ছিল না।

সারা গাঁ খুঁজে তারা এমন-একটা বড়ো বিছানা পেলে না যার ওপর তারা তাকে শোয়াতে পারে কিংবা কোনো শক্তপোক্ত টেবিলও মিললো না যেটা তারা ব্যবহার করতে পারে মৃতদেহের নিশিজাগরের সময়। সবচেয়ে ঢ্যাঙা লোকের ছুটির দিনের পাতলুনও তার গায়ে লাগে না, সবচেয়ে হোঁত্কা লোকের রোববারের জামাও তার খাটো হয়, আর সবচেয়ে বড়োমাপের পায়ের জুতোতেও তার পা গলে না। তার এই অতিকায় আকৃতি আর রূপে মোহিত হয়ে, মন্ত্রমুগ্ধ মেয়েরা ঠিক করলে মস্ত একটা পালের কেম্বিস কাপড় দিয়ে তারা তার জন্যে একটা পাতলুন বানাবে, আর একটা জামা বানাবে কারো বিয়ের মূল্যবান ক্ষৌম বস্ত্রে, যাতে সে মৃত্যুর মধ্যেও নিজের মর্যাদা বজায় রেখে শুয়ে থাকতে পারে। গোল হয়ে ঘিরে বসে তারা যখন সেলাই করছে, আর সেলাইয়ের ফোঁড়ের মাঝে-মাঝে লাশটার দিকে তাকাচ্ছে, তখন তাদের মনে হলো সে-রাত্রির মতো হাওয়া যেন কখনও এমন অস্থির ছিল না অথবা সমুদ্রও এমন অশান্ত ছিল না, আর তারা আন্দাজ করলে এই বদলের সঙ্গে এই মৃতদেহের কোনো সম্বন্ধ আছে নিশ্চয়ই। তারা ভাবলে যে যদি এই গরীয়ান পুরুষ তাদের গাঁয়ে থাকতো, তবে তার বাড়ির দরোজা হতো সবচেয়ে প্রশস্ত, ছাত হতো সবচেয়ে উঁচু, মেঝে হতো সবচেয়ে পোক্ত, তার খাট বানানো হতো কোনো জাহাজের পাটাতন দিয়ে যেটা লোহার বলটু দিয়ে লাগানো থাকতো, আর তার স্ত্রী নিশ্চয়ই হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়ে। তারা ভাবলে, তার নিশ্চয়ই এতটাই কর্তৃত্ব থাকতো যে সে সমুদ্র থেকে মাছ নিয়ে আসতে পারতো শুধু তাদের নাম ধরে ডেকে-ডেকেই আর সে তার জমিতে এতই কাজ করতো যে পাথরের মধ্য থেকেও নিশ্চয়ই ফেটে বেরুতো ফোয়ারা, যাতে সে তীরের শৈলশিরায় বুনে দিতে পারতো ফুলগাছ। গোপনে-গোপনে তারা তাদের নিজেদের পুরুষদের সঙ্গে তার তুলনা করলে, এ-কথাই ভাবলে যে সারা জীবন ধরে তারা যা করতে পারতো না সে নিশ্চয়ই সে-কাজ করতে পারতো মাত্র একরাত্রের মধ্যেই, আর তারা তাদের হৃদয়ের একেবারে গভীরে নিজেদের পুরুষদের খারিজ করে দিলে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে তুচ্ছ ও হীন, সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জীব হিসেবে। তারা তাদের স্বপ্নবিলাসের গোলকধাঁধাতেই এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন সময় তাদের মধ্যে সবচেয়ে যে প্রবীণা, যে বয়সে বুড়ি হয়ে গিয়েছে বলেই ডুবে-যাওয়া পুরুষটির দিকে কামনার চাইতে সহানুভূতির সঙ্গেই তাকিয়েছিল, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললে :

‘এর মুখটা যেন এস্তেবানের।’

সে-কথা সত্যি। বেশিরভাগই তার দিকে আরেকবার তাকিয়ে নিয়েই বুঝতে পারলে যে এস্তেবান ছাড়া অন্য আর-কোনো নামই তার হতে পারতো না। তাদের মধ্যে যারা একটু বেশি জেদি আর একরোখা, তারা আবার বয়েসেও সবার ছোট; তারা তখনও কয়েক ঘণ্টার জন্যে এই মায়াবিভ্রমে কাটিয়ে দিলে যে যখন তারা তাকে পোশাক পরাবে আর পেটেন্ট চামড়ার জুতো পরিয়ে শোয়াবে ফুলের মধ্যে, তার নাম হয়তো হয়ে উঠবে লাউতারো। কিন্তু এ তো শুধু এক অলীক বিভ্রম। কেম্বিস কাপড় যথেষ্ট ছিল না, বিচ্ছিরিভাবে কাটা আর সেলাই করা পাতলুনটা খুব আঁটো হলো, আর তার বুকের গোপন বল তার জামার বোতামগুলো পটপট করে ছিঁড়ে ফেললো। মাঝরাতের পর হাওয়ার শিস মরে গেলো, সমুদ্র ঢুলে পড়লো তার বুধবারের ঘুমে। স্তব্ধতাই শেষ সন্দেহগুলোতে ইতি টেনে দিলে, এস্তেবানই ছিল সে, এস্তেবান। যে-মেয়েরা তাকে পোশাক পরিয়েছিল, তার চুলে কাঁকই দিয়েছিল, তার নখ কেটে তার দাড়ি কামিয়ে দিয়েছিল, তারা তাদের করুণার শিহরণ চেপে রাখতে পারলে না যখন তাকে মাটির ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাবার ব্যাপারটা মেনে নিতে হলো। তখনই তারা বুঝতে পারলে কতটা অসুখী ছিল সে, নিশ্চয়ই অসুখী ছিল, তার ওই বিশাল বপুটা নিয়ে, কারণ মৃত্যুর পরেও সেটা তাকে জ্বালাতন করছে। তারা তাকে যেন দেখতে পারছিল সজীব, হেলে মাথা নুইয়ে দরোজার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করবার দণ্ড পেয়েছে সে, মাথা ঠুকে-ঠুকে যাচ্ছে কড়িবরগায়, কারো সঙ্গে দেখা করতে গেলে দাঁড়িয়েই থাকতে হচ্ছে তাকে, তার নরম গোলাপি সী-লায়ন মাছের মতো হাত দুটি নিয়ে সে যে কী করবে ভেবেই পাচ্ছে না, বিশেষত যখন গৃহকর্ত্রী খুঁজছেন তাঁর সবচেয়ে দুর্দম্য চৌকি, আর তাঁকে অনুনয় করছেন, এদিকে যদিও আতঙ্কে মরো-মরো, বসুন এখানে, এস্তেবান একটু বসুন, অনুগ্রহ করে, আর সে, দেয়ালে হেলান দিয়ে, মৃদু হেসে, আপনি মোটেই ব্যস্ত হবেন না সেনিওরা, আমি এই-তো বেশ আছি, এখানে, তার গোড়ালি ঘায়ে-ঘায়ে দগদগে, তার পিঠ পুড়ে ঝামা, সেই একই জিনিস করে-করে, এতবার, এত জায়গায়, যখনই কারো সঙ্গে দেখা করতে যায়, আপনি ব্যস্ত হবেন না সেনিওরা, আমি এই-তো বেশ আছি, শুধু একটা চৌকি ভেঙে দেবার ভয়ে আর সংকোচে, কখনও এটা না-জেনেই যে হয়তো তাঁরা বলতো, যাবেন না এস্তেবান, অন্তত কফি খেয়ে যান, এই-তো তৈরি হয়ে গেছে, হয়তো তাঁরাই পরে ফিসফিস করে বলাবলি করতেন, যাক, অবশেষে মস্ত আপদটা বিদেয় হয়েছে, কী ভালো, কী-যে সুপুরুষ এই আকাটটা, কিন্তু অবশেষে চলে গিয়েছে। এইভাবেই মেয়েরা দেহটার পাশে বসে-বসে ভাবছিল ভোরের একটু আগে। পরে, যখন তারা তার মুখ ঢেকে দিলে একটা রুমালে, যাতে চোখে আলো পড়ে তাকে বিরক্ত না-করে, তাকে এমন মৃত দেখালো, এমন চিরকাল-মৃত দেখালো, এত অসহায় আর প্রতিরোধহীন, এত তাদের নিজেদের পুরুষদের মতোই যে তাদের বুকে খাঁজ কেটে-কেটে বেরুলো প্রথম অশ্রুর ফোঁটাগুলো। অল্প বয়েসিদের মধ্যে একজন সরাসরি কাঁদতে শুরু করে দিলে। অন্যরা, যোগ দিয়ে, দীর্ঘশ্বাস থেকে বিলাপের পথে চলে গেলো, আর যত তারা ফোঁপালো ততই তাদের গলা ছেড়ে ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করলো, কারণ এই জলে-ডোবা পুরুষটি ক্রমেই তাদের কাছে আরো এস্তেবান হয়ে উঠছে, এর ফলে তারা এতই কান্নাকাটি করলে যে তার যেন শেষই নেই, কারণ সে যে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব, সবচেয়ে পরিত্যক্ত, সবচেয়ে শান্তিপ্রিয়, সবচেয়ে কৃতজ্ঞ, সবচেয়ে বাধ্য ও বশম্বদ পুরুষ, বেচারা এস্তেবান। কাজেই পুরুষরা যখন খবর নিয়ে ফিরে এলো যে জলে-ডোবা এই লোকটা আশপাশের গ্রামেরও কেউ নয়, মেয়েরা তাদের দরোদরো চোখের জলের মধ্যেও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের একটা ফাঁক পেয়ে গেলো :

‘ঈশ্বরই ধন্য,’ দীর্ঘশ্বাস ফেললে তারা, ‘এ শুধু আমাদেরই।’

পুরুষরা ভাবলে এই আদিখ্যেতা নেহাতই মামুলি মেয়েলি খামখেয়াল। রাত্তির-জোড়া কঠিন খোঁজখবরের পর ক্লান্ত আর অবসন্ন, তারা শুধু চাচ্ছিল এই নবাগত আপদটাকে এই ঊষর; হাওয়াবিহীন; দিনটায় রোদ তেতে-ওঠার আগেই বিদেয় করে দিতে। তারা মুখমাস্তুল আর কোঁচের ঝরতি-পড়তি দিয়ে উদ্ভাবন করে নিলে এক খাটুলি, সব জড়ো করে দড়িদড়া দিয়ে শক্ত করে বেঁধে, যাতে, যতক্ষণ-না তারা উপকূলের পাহাড়ে পৌঁছোয়, লাশটার ওজন সামলাতে পারে। তারা চেয়েছিল এক মালের জাহাজের নোঙরও তার সঙ্গে বেঁধে দিতে, যাতে সে গহন ঢেউয়ে সহজেই ডুবে যেতে পারে, যেখানে, গভীরে, মাছেরা সব অন্ধ আর ডুবুরিরা মরে পিছুটানে, আর মন্দ চোরাটানগুলো যাতে তাকে আর ফিরিয়ে না-আনে বেলাভূমিতে, যেমন ঘটেছিল অন্য অনেক মৃতদেহের বেলায়। কিন্তু যতই তারা তাড়াহুড়ো করলে, ততই মেয়েরা সময় নষ্ট করার কৌশল বার করতে লাগলো। আঁতকে-ওঠা মুরগিদের মতো হাঁটছিল তারা, বুকের মধ্যে সমুদ্দুরের মাদুলি-তাবিজ ঠুকরে-ঠুকরে, কেউ তার কাঁধে সুবাতাসের অংসফলক বেঁধে দেবে বলে বাধা দিচ্ছে, অন্যপাশে কেউ তার মণিবন্ধে বেঁধে দিচ্ছে কব্জিদিগ্‌দর্শিকা, আর বহুৎ, ‘ওখান থেকে সরো তো মেয়ে, কই, দেখি, পথ থেকে সরো,’ ‘এই দ্যাখো, তুমি আমাকে এক্ষুনি লাশটার ওপর ফেলে দিচ্ছিলে,’ কথাবার্তার পর, পুরুষরা টের পেতে শুরু করলে নিজের জীবনেরই অবিশ্বাস অনাস্থা, আর ঘ্যান-ঘ্যান করতে শুরু করে দিলে অচেনা একটা লোকের জন্যে কেন এমন আদিখ্যেতা, কেন প্রধান বেদির এত-সব শোভাভূষণ, কারণ যত-খুশি ক্রুশের পেরেক বা দিব্য-জলের শিশিই তার সঙ্গে দেখা যাক-না কেন, হাঙররা তাকে একইভাবে চিবিয়ে খাবে। তবু মেয়েরা তার ওপর স্তূপ করেই চললো অর্থহীন সব প্রত্ননিদর্শন, সাধু-সন্তের নখ-চুল ইত্যাদি, ছুটলো বারে-বারে সামনে-পেছনে, টালমাটাল, থুবড়ে পড়তে-পড়তে, যখন চোখের জলে যা তারা প্রকাশ করেনি তা প্রকাশ করতে শুরু করলে ঘন-ঘন দীর্ঘশ্বাসে; শেষটায় পুরুষরা সব ফেটে পড়লো এই বলে ‘কবে থেকে, শুনি, ভেসে-যাওয়া কোনো মড়ার জন্যে কেউ এমন আদিখ্যেতা করেছে, জলে-ডোবা একটা কেউ-না, বুধবারের মাংসের একটা হিমঠাণ্ডা চাক আর-কিছুই সে নয়,’ তখন মেয়েদের একজন, এত অযত্নে মরমে মরে গিয়ে, মরা পুরুষটির মুখ থেকে একটানে খুলে দিলে রুমাল, আর পুরুষদেরও তার মুখ দেখে দম আটকে গেলো।

এ যে এস্তেবান। তাকে চেনবার জন্যে নামটা ফিরে আওড়াবারও দরকার নেই। যদি তাদের বলা হতো এ হলো সার ওয়ালটার র‍্যলে, তার গ্রিঙ্গো উচ্চারণের ঝোঁকে তাদের ওপর ছাপ ফেললেও ফেলতে পারতো, কাঁধে ল্যাজ ঝোলা সবুজ টিয়া, নরখাদক-মারা গাদাবন্দুক; কিন্তু জগতে শুধু একজনই এস্তেবান হতে পারে, আর এই-তো সে, হাত-পা ছড়িয়ে চিত পড়ে আছে তিমিঙ্গিলের মতো, পায়ে জুতো নেই, পরে আছে এক বাঁটকুল বাচ্চার পাতলুন, আর হাত-পায়ের পাথুরে ওইসব নখ যাকে কাটতে হলো একটা ছুরি দিয়ে। তার মুখ থেকে রুমালটা একবার সরাবামাত্র দেখা গেলো লজ্জায়শরমে সে গুটিয়ে আছে, এ-তো আর তার দোষ নয় যে সে এমন অতিকায়, কিংবা এত ভারী, কিংবা এত সুন্দর, আর যদি সে জানতো যে সে তা-ই হতে চলেছে তবে জলে ডুবে মরবার জন্যে সে নিশ্চয় আরো-দূর কোনো গহনগোপন জল বেছে নিতো, সত্যি, আমি হলে গলায় ঝুলিয়ে নিতাম এস্পানিয়ার বৃহৎ রণতরীর নোঙরটাই, আর টলতে টলতে আছড়ে পড়তাম কোনো সুদূর শৈলচূড়া থেকে সেই-তার মতো যে খামকা-খামকা ব্যস্তসমস্ত করে তুলতে চায় না লোকজনদের নিজের এই বুধবারের লাশটা দিয়ে, যেমন বাপু তোমরা বলো, কাউকে এই নোংরা ঠাণ্ডা মাংসের চাকটা দিয়ে বিরক্ত করতে চাই না বাপু — এই মাংসের টুকরোর সঙ্গে আমার কিন্তু কোনো সম্পর্কই নেই। তার ভাবেভঙ্গিতে এতটাই সত্য ছিল যে এমনকি সবচেয়ে অবিশ্বাসী সন্দেহপ্রবণ পুরুষও — সেই যারা সমুদ্রের মধ্যে অন্তবিহীন রাত্রির তিক্ততা টের পায় হাড়ে-হাড়ে যখন ভাবে যে তাদের স্ত্রীরা তাদের সম্বন্ধে স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে শেষটায় কোনো জলে-ডোবা পুরুষেরই স্বপ্ন দেখবে — এমনকি তারাও, আর অন্যরাও — যাদের বুক আরো ডাকাবুকো কঠিন — তারা শুদ্ধ তাদের অস্থির মধ্যে মজ্জায় মজ্জায় শিউরে-শিউরে উঠলো এস্তেবানের এই অকৃত্রিমতায়।

এমনি করেই তারা সবচেয়ে জমকালো সবচেয়ে চমত্কার সবচেয়ে আশ্চর্য এক অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থা করলে, যতটা তারা ভাবতে পারে ততটাই, আর তা কি না কোনো এক নিঃস্ব দুস্থ পরিত্যক্ত জলে-ডোবা পুরুষের জন্যে। কয়েকজন মেয়ে গেলো আশপাশের গ্রাম থেকে ফুল আনতে, ফিরে এলো আরো-অনেক মেয়ের সঙ্গে, যারা শুনেও বিশ্বাস করেনি তাদের কী বলা হলো, আর যখন তারা নিজের চোখে দেখলো মৃতদেহটা ফিরে গেলো আরো, আরো ফুল আনতে, আর তারা আনলো তো আনলোই, আরো আরো ফুল, কত-কত ফুল, শেষটায় সেখানে স্তূপ হয়ে রইলো এত ফুল আর জড়ো হয়ে গেলো এত লোকজন যে সেখানে এক-পা হাঁটাও মুশকিল হয়ে উঠলো। শেষ মুহূর্তে তাদের ভারি কষ্ট হলো তাকে অনাথের মতো জলে ফিরিয়ে দিতে, আর তারা সেরা লোকজনদের মধ্য থেকে তার জন্যে বেছে নিলে বাবা আর মা আর মাসি-পিসি, মামা-খুড়ো-তুতোভাই, তুতোবোন যে এর মারফতই গাঁয়ের সবাই হয়ে উঠলো একে-আরের আত্মীয়। কয়েকজন খালাসি যাঁরা দূর থেকে শুনলো কান্নার রোল, পথ ভুল করলো জাহাজের; আর লোকে শুনতে পেলো এমন একজনের কথা যে নিজেকে বড়ো মাস্তুলটায় বাঁধিয়ে নিয়ে মনে করলো প্রত্নপ্রাচীন মোহিনী মায়াবিনী সাইরেনদের কথা ও কাহিনী। কারা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যাবে সেই গৌরবের অধিকারের জন্যে যখন তারা হাতাহাতি করলে — তারা যাবে উপকূলের শৈলচূড়ার খাড়া গড়খাই বেয়ে — নারীপুরুষ সকলেই প্রথমবারের মতো সচেতন হয়ে পড়লো তাদের পথঘাটের ঊষর নিরানন্দ অবস্থার কথা, কেমন শুষ্ক খরখরে তাদের উঠোন, কতটা সংকীর্ণ তাদের স্বপ্ন, যখন তারা মুখোমুখি দাঁড়ালে তাদের জলে-ডোবা পুরুষটির সুঠামসৌষ্ঠব আর সৌন্দর্যের সামনে। তারা তাকে যেতে দিলে কোনো নোঙর ছাড়াই যাতে সে ফিরে আসতে পারে, আবার যদি তার ইচ্ছে করে, আর তারা সবাই শতাব্দীর একটা টুকরোর জন্যে শ্বাস রোধ করে রইলো যখন মৃতদেহ আছড়ে পড়লো পাতালের উদ্দেশে। পরস্পরের দিকে তাকাবারও কোনো দরকার হলো না তাদের এটা জানতে যে এখন আর তারা সকলে একসঙ্গে উপস্থিত নেই, যে তারা কখনোই আর সবাই মিলে একসঙ্গে উপস্থিত থাকবে না। কিন্তু তারা এও জেনে গেলো যে সবকিছুই এখন থেকে অন্যরকম হয়ে যাবে, যে তাদের বাড়িঘরে থাকবে প্রশস্ত সব দরোজা, উঁচু-উঁচু কড়িবরগা, শক্তপোক্ত মেঝে যাতে এস্তেবানের স্মৃতি যে-কোনোখানেই ঘুরে বেড়াতে পারে থামে-ছাতে ঘা না খেয়ে, যাতে কেউ পরে ফিসফিস করে বলতেও সাহস না-পায় যে মস্ত আপদটা অবশেষে টেঁশে গিয়েছে, খুবই খারাপ ব্যাপার, তবে সুপুরুষ হাঁদাটা অবশেষে মরেই গেলো, কারণ এখন তারা তাদের বাড়িঘর রঙ করে দেবে হাসিখুশির রঙে আর ছটায়, এস্তেবানের স্মৃতিকে শাশ্বত করে তোলবার জন্যে; আর তারা পাথর ফাটিয়ে জলের ফোয়ারা বার করে দেবার জন্যে অক্লান্ত খেটে-খেটে তাদের শিরদাঁড়া ভাঙবে, শৈলচূড়ায় রুইবে ফুলগাছ যাতে ভবিষ্যৎ বছরগুলোয় ঊষার সময় বড়ো-বড়ো যাত্রীজাহাজের লোকেরা বারদরিয়ায় জেগে যায় বাগানের ফুলের গন্ধে ঝিম ধরে গিয়ে আর কাপ্তেন নেমে আসে তার পোশাকি উর্দি গায়ে সাঁকো থেকে, তার নভশ্চরী, তার ধ্রুবতারা, উর্দিতে তার যুদ্ধপদকের সারি-সারি ভূষণ বসানো, দিগন্তের দিকে অন্তরীপের গোলাপি ভাঙা টুকরোটা দেখিয়ে কাপ্তেন বলে উঠবে চোদ্দটা ভাষায়, দ্যাখো-দ্যাখো, দ্যাখো ওখানে, যেখানে হাওয়া এখন এত শান্ত যে এ যেন ঊনপঞ্চাশ বিছানার তলায় ঘুমোতে গিয়েছে, ওই ওখানে, যেখানে রৌদ্র এত উজ্জ্বল যে সূর্যমুখীরা জানেই না কোনদিকে মুখ ফেরাবে, হ্যাঁ, ওই ওখানে, ওটা তো এস্তেবানের গ্রাম।

কায়েস আহমেদের সততা সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল - আখতারুজ্জামান ইলিয়াস


কায়েস আহমেদের সততা সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

কায়েস আহমেদের বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর হওয়ার আগেই তার রচনাসমগ্র প্রকাশের উদ্যোগে উৎসবের আভাস নেই, এই প্রকাশ বরং শোক উদযাপনের আয়ােজন; এখানেই তার লেখার সঙ্গে শেষ যোগাযোগ, তার আর নতুন লেখা পড়ার সম্ভাবনার ইতি ঘটলো এখানেই।

গত বছর (১৯৯২) ১৪ জুন তারিখে কায়েস আহমেদের মৃত্যু হয়েছে। জীবনের বিনাশ ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ও এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন নিজেই। মরবার পর কোনোকিছু করা আর কিছুতেই সম্ভব নয়, নইলে নিজের দাফনের কাজটিও কায়েস মনে হয় নিজে নিজেই করতেন। নিজের কোনো কাজে কারো ওপর নির্ভর করা তার ধাতে ছিলো না। সংকলন ও সম্পাদনা করে তাঁর লেখা-প্রকাশের দায়িত্ব আর কারো ওপর চাপানো কায়েসের পক্ষে অচিন্তনীয়। তাঁর প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ, বিরল সততা ও অসীম সাহসের পরিণতিতে আত্মহত্যা অনিবার্য কি-না এবং কাজটি তাঁর শিল্পচর্চার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ-এর জবাব খোজার জন্যে কায়েস আহমেদের শিল্পকর্ম পাঠকের মনোযোগ দাবি করে।

ঘনিষ্ঠ কারো মৃত্যুর কয়েক মাসের ভেতর তাঁর রচনার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা লেখা খুব ভোঁতা মানুষের জন্যেও সহজ কাজ নয়। তা অত নিরপেক্ষতার দরকারই-বা কী? তার আগ্রহী পাঠক হিসাবে কথা বলতে বলতে নিজের ভাবনার জটগুলো খোলার চেষ্টা করা এবং কায়েস সম্বন্ধে আর দশজনের ভাবনা একটু উসকিয়ে তোলা যায়।

কায়েস আহমেদ লিখতে শুরু করেন স্কুলে থাকতেই। ১৯৬৫ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজে এইচএসসি-র ছাত্র, তখন তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এর পরপরই কামাল বিন মাহতাবের সম্পাদনায় ‘ছোটগল্প' প্রকাশিত হলে এখানকার এই প্রথম ছোটগল্প-পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। নিজে গল্প লেখা ছাড়াও প্রতিষ্ঠিত তরুণ এবং সম্ভাবনাময় তরুণতরদের মূল্যায়ন ও পরিচিত করার জন্যে তিনি উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। লেখার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে স্বভাবের লোক ছিলেন, আবার পাঠকের মনোরঞ্জন সাধন তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো না; তাই প্রথম বই অন্ধ তীরন্দাজ প্রকাশের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত।

কায়েস আহমেদের সাহিত্যকর্মে তাঁর প্রকাশরীতি, পর্যবেক্ষণের ভঙ্গি ও অনুসন্ধানের পদ্ধতির বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু তার গল্পের মানুষদের সঙ্গে আমরা পরিচিত হই প্রথম বইতেই। মিলনের জন্যে কাতর বিচ্ছিন্ন মানুষের পাশাপাশি এখানে দেখি দমবন্ধ-করা বৃত্তের ভেতর বন্দি অসহায় চরিত্র। রেলে কাটা মানুষের ছিন্নভিন্ন শরীর দেখি প্রেমের প্রেক্ষাপটে। মিষ্টি স্বভাবের বৌ স্বামীর সঙ্গে বিছানায় শুয়ে মিলনের চরম মুহূর্তে স্বামীর বন্ধুকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারে না কিছুতেই। নস্টালজিয়ায় কাতর মানুষ, নিঃসঙ্গ মানুষ, ক্লান্ত মানুষ, স্মৃতির স্বাদে ও কষ্টে আচ্ছন্ন মানুষ—এরা সবাই তাঁর পরবর্তী রচনার সূচিপত্র।

আট বছর পর ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় কায়েসের প্রথম উপন্যাস নির্বাসিত একজন। কায়েসের প্রথম বইয়ের প্রায় সব লোকই এখানে কোনো-না-কোনোভাবে এসে হাজির হয়েছে, কিন্তু এর প্রেক্ষাপট সমস্ত দেশের সমাজ। দাঙা এই উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, দাঙাকে এই লেখার নায়ক বলেও চিহ্নিত করতে পারি। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার সঙ্গী দাঙার ফলে মানুষকে মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়, এই স্বাধীনতা তাই শুধু মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার অধিকার অর্জন। তার স্বাভাবিক জীবনের বিকাশ শােচনীয়ভাবে বিঘ্নিত। ক্ষোভ, অপমান ও গ্লানির ভেতর অহরহ যে-জীবন সে যাপন করে সেখানে এই উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষকে দিব্যি শনাক্ত করতে পারি। কিন্তু কাহিনীর শেষে এই প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব আড়ালে পড়ে যায় যখন লেখক প্রধান চরিত্রের ভেতর একটি সিদ্ধান্ত আরোপ করিয়ে দেন যা তার জীবনযাপন বা স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। এখানে কায়েস ঝুঁকে পড়েন নিটোল কাহিনী রচনা করার দিকে এবং এদিক থেকে তিনি গড়পড়তা উপন্যাসের রীতির কাছেই আত্মসমর্পণ করে বসেন। মনে হয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক কাহিনী-বর্ণনার প্রবণতা তাঁর পরবর্তী রচনায় অব্যাহত থাকবে এবং একজন জনপ্রিয় লেখক হিসাবে তিনি পাঠককে আঠার মতো সেঁটে রাখবেন এবং তাঁর উপন্যাস পাঠের পর পাঠক পরম তৃপ্তিতে গা এলিয়ে দেবেন।

সৌভাগ্যক্রমে কায়েস আহমেদের পরিণতি তা হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ উপন্যাস দিনযাপন পড়ে কায়েসের বিকাশ দেখে বিস্মিত হতে হয়। প্রথম বইতে মোটামুটি আয়ত্ত গল্প বলার রীতিটিকে তিনি এখানে এসে বর্জন করেছেন। প্রকরণের নতুনত্ব এখানে বড় কথা নয়, এই নতুন পথ অনুসরণের প্ররোচনা তিনি পান অনুসন্ধানের তীব্র স্পৃহা থেকে। ‘দিনযাপন’ কিন্তু কায়েস আহমেদের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, দুই উপন্যাসের মাঝখানে লেখা একটি গল্প ‘জগদ্দল’ তার সাক্ষী। একই বইয়ের ভেতর ‘জগদ্দল’-এর সহ-অবস্থানের কারণ কি কেবল রোগা বইটির শরীরে মাংস যোগ করা? না। এই রচনা দুটির মধ্যে প্রধান সম্পর্কটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বৈইকী!—একটিতে আমাদের ১ নম্বর স্বাধীনতা ও তার সঙ্গী দাঙার দক্ষযজ্ঞের ভয়াবহ বিবরণ এবং আরেকটিতে ২ নম্বর স্বাধীনতার পর তুমুল অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের ছবি। কিন্তু কি গল্প বলার রীতি, কি চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক, কি দৃষ্টিভঙ্গি—সব ব্যাপারেই দুটি লেখায় লেখকের ভিন্ন স্বভাবের পরিচয় পাই। | ‘জগদ্দল’ গল্পে কায়েস আহমেদের স্যাতসেঁতে প্রকাশ ঝরে পড়েছে। কোনো চরিত্রের প্রতি তরল ভালোবাসা নেই। যে-যুবসম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ নিজেদের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি নরখাদক সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছে, স্বাধীনতার পর দায়িত্বহীন রাষ্ট্রীয় শাসনের ফলে সেই যুবকদের মধ্যে প্রবলরকম অস্থিরতা, ক্ষোভ এবং এর পরিণামে চরম হতাশার সৃষ্টি হয় তাকে তেতো করে দেখানো হয়েছে এই গল্পে। ঐ সময়ের বাস্তবতা একটু রং পাল্টে কিন্তু এখনো অব্যাহত রয়েছে। এর ওপরকার দৃশ্যটি হলো লুটপাট, ছিনতাই, একবার উগ্র জাতীয়তাবাদী হুঙ্কার এবং আরেকবার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ঘেউঘেউ। কিন্তু ভেতরকার সত্যটি হলো এই যে, অনাচারের বিরুদ্ধে যাদের রুখে দাড়াবার কথা তারা নিদারুণভাবে পঙ্গু ও নপুংসক। | ‘জগদ্দল’-এর ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত দিনযাপন’-এর নায়ক। ঢাকা শহরের পুরনো এলাকায় একটি নড়বড়ে বাড়ির অধিবাসীরা হলো এর বিভিন্ন চরিত্র। তাদের সমস্যা ঠিক একরকমের না হলেও বড় করে দেখলে প্রায় একই ধরনের। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে এরা দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং এই কারণে এক ধরনের হীনম্মন্যতার শিকার। উপন্যাসের নায়ক হিসাবে বিশেষ একটি লোককে শনাক্ত করা যায় না। কোনো একক মানুষ কাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করা তত দূরের কথা, আলাদাভাবে চোখে পড়ার মতো ক্ষমতাও অর্জন করে না। এখানে সুস্থ জীবনযাপনের জন্যে উন্মুখ মানুষও আছে, কিন্তু সেই উন্মুখতা কখনো আকাঙ্ক্ষার পর্যায়ে ওঠে না বলে সেখানে কোনো সংকল্প নেই, তা শেষ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে লোভ হয়ে। পড়তে পড়তে পাঠক গ্লানিবোধ করতে পারেন, এখানেই কায়েসের সাফল্য। মধ্যবিত্ত, যে মানুষ নাম ধারণের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে---এই সত্যটিকে ঘােষণা করে পাঠককে অস্বস্তির মধ্যে ফেলার ভেতরই তার সার্থকতা।

ঐ সত্যটি কায়েস নিজেও উপভোগ করেন না। তাই গোটা উপন্যাসে তাঁর অস্থিরতা বড় প্রকট, মাঝে মাঝে প্রায় আপত্তিকর। নিজের উপলব্ধিকে জানাবার জন্যে তার তাড়াহুড়া ভাবটা চোখে খচখচ করে বেঁধে। একেকটি চরিত্রের স্কেচ এঁকেই তিনি মন দেন আরেকজনের দিকে, তাদের স্বাভাবিক বিকাশ দেখাবার জন্যে ধৈর্য ধরার মতো অবসর তিনি পান না।

অথচ তার সততা সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল। এই সততার বলেই কাহিনীর নামে কেচ্ছা বয়ান করার লোভ থেকে তিনি বিরত থাকতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথম উপন্যাসে গল্প বলার যে-প্রবণতা তার মধ্যে পেয়ে বসেছিলো তা অব্যাহত থাকলে এখানে এসে পরিণতরূপ লাভ করতে পারত। এই বইতে যে-শক্তির পরিচয় পাই, তাতে নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, ঐ প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করলে মসৃণ ও গতানুগতিক কাহিনী ফেঁদে ব্যাপকসংখ্যক পাঠক এবং সমালোচকদের পৃষ্ঠপোষকতা তিনি লাভ করতেন। সহজ সাফল্যের ঐ নিরাপদ ও সুনিশ্চিত পথ পরিহার করতে পারাটাই তাঁর সততা ও শক্তির প্রকাশ। অনেক দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও কায়েস আহমদ নায়কবর্জিত, ছিমছাম গপ্পোমুক্ত একটি ভাষাচলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। সততা ও শক্তির অধিকারী বলেই জীবনের জয়গান করার জন্যে ইচ্ছাপূরণের নাবালক বাণী ছাড়ার পথ তিনি অনায়াসে পরিহার করতে পেরেছেন। আবার এরই মধ্যে দেখি, নড়বড়ে বাড়িটির আসন্ন মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের সাহায্যে।

কায়েস আহমেদের সর্বশেষ বই লাশকাটা ঘর একটি গল্পগ্রন্থ। এই বইতেই তার শক্তির সবচেয়ে পরিণত প্রকাশ ঘটেছে। মানুষের নানারকম বেদনা ও ফাপড়কে তিনি দেখতে পান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের অজস্র বিস্ফোরণ বলে। এখানে মানুষের কেবলই মার খাওয়ার অসহায় বেদনা নেই, রোগের চিকিৎসা করতে সংকল্পবদ্ধ মানুষকেও এখানে পাওয়া যায়। এমন সব হতাশ যুবকদের দেখি যাদের কাছে দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের স্বাধীনতা সমার্থক নয়। সামাজিক মূল্যবোধের নামে প্রচলিত সংস্কারকে ঝেড়ে ফেলে মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে হাতিয়ার তুলে নেয় নতুন যুবক। আবার এর ভেতরেই বেজে চলে তার নস্টালজিয়া, তবে নিজের স্মৃতিকে কেবল একটি ব্যক্তির কষ্টের মধ্যে না দেখে তিনি তা স্থাপন করেন মানুষের বেদনার পটভূমিতে। তার উপন্যাসের কোনো কোনো চরিত্র এখানে ফের হাজির হয়, তবে তাতে আমাদের একঘেয়ে লাগে না, বরং চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার উত্তাপ বোধ করি এবং ঐসব মানুষের গভীর ভেতর জগৎ আমাদের চোখে উন্মোচিত হয়। | ছোটোগল্পের প্রচলিত ও ধরাবাধা ছক তাঁর অনুসন্ধান প্রকাশের জন্যে যথেষ্ট বিবেচিত হয় না, প্রকরণ ভেঙে তিনি বেরিয়ে পড়েন নতুন ও অনিশ্চিত পথের দিকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভিটেমাটি খুঁজতে যাওয়ার একটি অভিযানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে একটি গল্পে, প্রথমে এটিকে একটি সাদামাটা প্রতিবেদন বলে ভুল হতে পারে । কিন্তু পড়তে পড়তেই কয়েকজন লোককে পেয়ে যাই যারা কেবল ঐ গ্রামের মানুষ নয়, নিরাপত্তার অভাব, গ্লানি ও অনিশ্চয়তা নিয়ে যারা দাবি করে গল্পের চরিত্রের মর্যাদা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষের ভিটে খোঁজ করতে গিয়ে লেখক এদের দেখেন এবং এদের আসন্ন-গৃহত্যাগের সম্ভাবনায় দেখতে পারেন নিজের ভিটেমাটি ত্যাগ করে আসার অভিজ্ঞতা। কিন্তু নিজে তিনি আড়ালেই রয়ে যান। এমনকি যেসব চরিত্র সৃষ্টি করেন তারাও কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকে না। দেশের রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি—সবকিছুর বিশ্লেষণ ধরা পড়ে তাদের তৎপরতা ও এমনকি কেবল নীরব অবস্থানের ভেতরেও। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কায়েসকে মুগ্ধ করেছেন বললে মোটেই ঠিক বলা হয় না, বরং তার অস্থিরতা এই শিল্পীর কল্যাণে রূপ পায় বাঁচার প্রেরণায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি পাঠ করেছিলেন সৃজনশীল পাঠকের উত্তেজনা ও উদ্বেগ নিয়ে। কেবল নিজে পড়ে ক্ষান্ত হননি, কোন লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কীভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাও দেখতে চেয়েছিলেন বলে তাঁর প্রিয় লেখকের ওপর একটি রচনা সংকলন সম্পাদনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, চিঠির পর চিঠি ও তাগাদার পর তাগাদা দিয়ে তাদের অনেকের লেখা জোগাড় করেন এবং নিজেও একটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় লেখার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এই কাজটি শেষ করার আগেই তিনি নিজেই শেষ হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

রথীন্দ্র ঘটক চৌধুরীকে নিয়ে লেখা তার বইটিকে কেবল একটি গবেষণা বই বললে সত্যের ধারেকাছেও যাওয়া যায় না। এই বইয়ের সব তথ্য তিনি সংগ্রহ করেছেন পরম নিষ্ঠার সঙ্গে, এজন্যে বিপুল পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু এই বস্তুনিষ্ঠ কাজের মধ্যে প্রবাহিত রয়েছে তার মানুষকে পর্যবেক্ষণ করার গভীর প্রবণতা। রথীন্দ্র ঘটক খুব পরিচিত লেখক নন বলেই কায়েস তাঁর গভীর সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বকে উপস্থিত করার কঠিন দায়িত্বটি গ্রহণ করেন।

গল্প-উপন্যাস লেখা, প্রিয় লেখকের ওপর প্রবন্ধের সংকলন সম্পাদনা, অপরিচিত লেখকের ভেতর সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বের উন্মোচন, অনিয়মিত হলেও সাময়িকীতে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা, সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকা——সবই তাঁর সৃজনশীল অনুসন্ধানের অবিচ্ছিন্ন অংশ।

এই শিল্পীর আত্মহত্যা কি কেবল আকস্মিকভাবে নিজেকে প্রত্যাহত করার স্পৃহার ফল? তার প্রিয় কবির সেই বহুপঠিত কবিতার লোকটি আর তিনি কি এক ব্যক্তি? মেনে নেওয়া মুশকিল।


কাল রাতে—ফাগুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হলো তার সাধ;
জীবনানন্দ দাশ আট বছর আগের একদিন

কিন্তু ফাগুনের তখনো ঢের বাকি। বসন্তকালের রাত্রির অন্ধকার নয়; তখন ঘােরল বিকাল, জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিন সেদিন যতক্ষণ পারে আকাশ জুড়ে চড়া রোদ ঝেড়েছে। ঈদের একদিন পর পবিত্র কোরবানির গোরুখাসির রক্ত দীননাথ সেন রোডের এখানে ওখানে শুখিয়ে কালচে হয়ে এসেছে, নিহত জীবজন্তুর নাড়িভুড়ি ছড়িয়ে রয়েছে গোটা সতীশ সরকার রোড় জুড়ে, তার গন্ধে দম-বন্ধ-করা গরম বাতাস। এরই মধ্যে তিনতলা বাড়ির ছাদে চিলেকোঠার ফ্ল্যাটে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়েন কায়েস আহমেদ। একটু-আগে-ডুবে-যাওয়া পঞ্চমীর চাঁদের স্মৃতিতে কোমল ও স্নিগ্ধ অন্ধকারে শেষনিশ্বাসটা টেনে নেওয়ার সুযোগ কায়েস আহমেদ নেননি। কোমল ও মিষ্টি, নিরাপদ ও অনায়াস, সরল ও স্নিগ্ধ কোনো ব্যাপারে কায়েস আহমেদ স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন না। নিজের তৈরি প্রকরণটিতে অভ্যস্ত হতে-না-হতে তিনি অন্য পথের সন্ধান করতেন। কায়েস আহমেদ সব সময়েই ছিলেন নতুন লেখক। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন নতুন লেখকের প্রেরণা ও কষ্ট এবং নতুন লেখকের উদ্বেগ ও অতৃপ্তি নিয়ে। মানুষের গভীর ভেতরটাকে খুঁজে দেখার জন্যেই একটির পর একটি রাস্তায় তাঁর ক্লান্তিহীন পদসঞ্চার। তাঁর পায়ের নিচে বিরতিহীন ভূমিকম্প, তাই তাঁর এই অবিরত ছুটে চলা। এইসব রাস্তাই তার পছন্দের। ধীর ও শান্ত, সন্তুষ্ট ও নিস্তরঙ্গ সমতল তাকে কখনোই কাছে টানতে পারে না।

ব্যক্তিগত জীবনেও কোনো ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকা তার ধাতে ছিলো না । প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ব্যাপারে জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক সম্মান শ্রেণীতে ঢুকেছিলেন ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষাগুলোতে খুব ভালো ফল করার আভাস দেখালেও, কিংবা হয়তো এই কারণেই, দ্বিতীয় বর্ষে উঠেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন পশ্চিমবাংলার হুগলি জেলার বড়তাজপুর গ্রামে, ঐ গ্রামের বিখ্যাত শেখ পরিবারের ছেলে। আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত, তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখতেন না।

তিনি উপার্জন করতে নামেন এসএসসি পাশ করার পরই, অল্প কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছিলেন, এরপর কেবল শিক্ষকতাই করেছেন। ঢাকার একটি প্রথম শ্রেণীর স্কুল তাকে যেচে চাকরি দেয়, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেখানেই কাজ করে গেছেন। ডিগ্রি ছিলো না বলে সেখানেও যে-কোনো মুহূর্তে কর্মচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। বন্ধুদের অনেক অনুরোধেও ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে বসেননি। মনে হয়, অনিশ্চিত অবস্থা তিনি ভালোবাসতেন।

১৯৬৯ সালে কায়েসের পিতা শেখ কামালউদ্দিন আহমদের মৃত্যু হয় তাদের গ্রামে। ঐ সময় গ্রামে যাবার জন্যে কায়েস একবার চেষ্টা করেছিলেন, পাসপোর্ট করতে গিয়ে দেখা গেলো যে, তিনি যে পাকিস্তানি নাগরিক তার কোনো প্রমাণ নেই ! ঝামেলা বাড়লো। গণ-আন্দোলনের ধাক্কা সামলাতে পুলিশ ব্যতিব্যস্ত ছিলো বলে কায়েসকে বিপদে ফেলার সময় পায়নি।

১৯৭১ সালে কায়েস আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে যান। এ-বছর অনেকটা সময় কাটিয়েছেন নিজের গ্রামে মা এবং ভাইয়ের সঙ্গে। মায়ের ভালোবাসায় বেশিদিন থাকা বোধহয় তার স্বভাবে কুলায়নি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ঢাকায় ফিরে এলেন, নিজের গ্রামে আর কোনোদিন ফিরে যাননি। বড়তাজপুর গ্রামে তাদের পুরনো নোনা-ধরা বাড়ির সামনে শেফালি গাছের নিচে মোড়ায় বসে ছেলের জন্যে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মায়ের চোখে ছানি পড়ে গেলো—এই ছবিটা ভেবে কায়েস অস্থির হয়ে পড়তেন। কিন্তু মায়ের আঁচলের নিচে কটা দিন থেকে দুই চোখ ভরে ঘুমিয়ে আসার ইচ্ছা করা তার স্বভাবের বাইরে। ভালোবেসে বিয়ে করলেন। আত্মবিশ্বাস ছিলো প্রবল, দৃঢ় ধারণা ছিলো যে প্রেম দিয়ে, যত্ন দিয়ে সেবা দিয়ে স্ত্রীর মানসিক রোগ সারিয়ে তুলতে পারবেন। প্রায় দশটি বছর একনিষ্ঠভাবে স্ত্রীর সেবা করে গেছেন, যত্ন করলেন তাঁকে মায়ের মতো, বাপের মতো চোখে-চোখে রাখলেন। কতরকম চিকিৎসা করলেন। কারো কাছে কোনো সাহায্য চাননি, কাউকে জানতেও দিতে চাননি নিজের সমস্যার কথা।

নিজের পর্যবেক্ষণ, ধারণা, আদর্শ, বিশ্বাস—এসবের কোনো সাহিত্যিক কি অসাহিত্যিক আলাদা চেহারা ছিলো না তার কাছে। কি লেখা, কি পেশা, কি গৃহ সব জায়গায় তিনি ছিলেন একজন অভিন্ন মানুষ। সাহিত্যচর্চা করে সামাজিক সুবিধা আদায়ের বিন্দুমাত্র চেষ্টাও কোনোদিন করেননি। এককালে সাংবাদিকতা করেছিলেন, সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যক্তিগত কাজে লাগানো তার রুচির বাইরে। তার মাপের লেখক বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাননি, আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে এই গ্লানি বহন করতে হবে সারাজীবন ধরে। আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন কেবল বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য সামান্য, লেখক শিবিরের সঙ্গে তিনি জড়িতও ছিলেন না কোনোদিন। কিন্তু সংগঠনটির প্রাতিষ্ঠানিকতা-বিরোধিতায় তার নিরঙ্কুশ আস্থা ছিলো বলেই পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। আবার প্রকাশকের তাগাদা সত্ত্বেও বিপুল অর্থমূল্যের পুরস্কারের জন্য বই জমা দিতে অস্বীকার করেছেন, কারণ পুরস্কার প্রদানকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতি ও তাঁর স্বভাব সম্পূর্ণভাবে পরস্পরবিরোধী। দারিদ্র্যপীড়িত লেখকের এই প্রত্যাখ্যান আমরা যেন ভুলে না যাই।

তিনি প্রত্যেকটি পদক্ষেপ ফেলেছেন নিজের সিদ্ধান্ত অনুসারে। ১৯৯২ সালের ১৪ জুন যে শেষ কাজটি করলেন তাও সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত অনুসারে। কারো কাছে অভিযোগ করেননি, কারো করুণা প্রার্থনা করেননি। মানুষকে জানবার জন্যে, মানুষকে অনুসন্ধান করার জন্যে, নিজেকে নিয়ে হলেও নিরীক্ষা করতে তাঁকে অনেক চড়া দাম দিতে হয়েছে। দারিদ্র্য, পারিবারিক দুর্যোগ, বিচ্ছিন্নতা, বিরামহীন উদ্বেগ—সবই বহন করতে হয়েছে একা। অনুসন্ধান হলো একই সঙ্গে তার প্রবণতা এবং দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফল যা পেয়েছেন তা তার জন্যে সুখের নয়, যা দেখেছেন তার অনেকটাই, বলতে গেলে বেশির ভাগই অনুমোদন করতে পারেননি। অনুসন্ধান তাই তার প্রতিবাদও বটে। প্রতিবাদ তো আর ইচ্ছাপূরণের আবদার নয়, মস্ত মস্ত কাঠের পুতুল বানিয়ে তার মাথায় সূর্যোদয়ের ছবি লেখার নাবালক তৎপরতা নয়, সমাজ ও মানুষের জটিলতা, এই জটিলতায় অসহায় ও ছোট-হয়ে-পড়া মানুষকে দেখা ও দেখানোই হলো তার প্রতিবাদ জ্ঞাপন। তাঁর স্বেচ্ছামৃত্যু কি তার অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার আর প্রতিবাদ জানাবার চরম সংকল্পের সোচ্চার প্রকাশ?

কায়েস আহমেদ রচনাসমগ্র
ভূমিকা
ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩

বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় পরিচয়ের সৃষ্টি | রেহমান সোবহান | অনুবাদ : আশফাক স্বপন

বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় পরিচয়ের সৃষ্টি
রেহমান সোবহান

অনুবাদ : আশফাক স্বপন

ছয় দফা কার্যক্রম

বাংলাদেশের জাতীয়তার অভ্যুদয় একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঘটে।হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং মওলানা ভাসানীর মতো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।তবে বাঙালিদের মধ্যে জাতীয় চেতনাসৃষ্টির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবার জন্য যে রাজনৈতিক উদ্যমের প্রয়োজন ছিল, সেটি বঙ্গবন্ধুর অবদান।১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচির সূচনা থেকে মার্চ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ – এই নিয়ামক দুটি বছরে অনন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ একটি নির্বাচনী অভিযানের মধ্য দিয়ে, বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার মাধ্যমে যে জাতীয় পরিচয় সৃষ্টি হয়, বঙ্গবন্ধু তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

পাকিস্তানের দুটি প্রদেশে সম্পূর্ণ স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ছয় দফা কার্যক্রম বাঙালিদের জন্য স্বতন্ত্র ভবিষ্যৎ রচনার সাংবিধানিক পূর্বশর্ত প্রদান করে।এই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে একজন বড় মাপের বাঙালি রাজনৈতিক নেতা স্বীকার করলেন যে বাংলাদেশের মানুষের জন্য, এমনকি একটি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনেও, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক সহাবস্থান রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং সেইসঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পদের কর্তৃত্ব – এই সব কিছুর ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ হলেই পাকিস্তানের দুটি প্রদেশ একটা রাষ্ট্রের অধীনে টিকে থাকতে পারে।পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা ত্যাগ করায় অনীহা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠল।ফলে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের গোড়ার দিকে ছয় দফা ঘোষণা করার সময় দেখা গেল যে শুধু ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোও সেটা প্রত্যাখ্যান করল, কারণ তারাও শাসকশ্রেণির অংশ। এই শাসকশ্রেণির দৃষ্টিতে ছয় দফার দাবির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) মানুষের স্বায়ত্তশাসনের দাবি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে গেল। ফলে ছয় দফা ঘিরে যে রাজনৈতিক আন্দোলন, তাকে দমন করবার প্রচেষ্টা এককভাবে বাঙালিদের ওপর এসে পড়ল। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বসহ বঙ্গবন্ধুকে ১৯৬৬ সালের জুন-জুলাই মাসে গ্রেপ্তার করা হলো, তাঁদের দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে কারারুদ্ধ রাখা হলো। অবশেষে পাকিস্তানের উভয় প্রদেশে রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহকর্মীরা মুক্তিলাভ করেন।

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট