উপন্যাস | অন্দরমহল | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

উপন্যাস
অন্দরমহল
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


শৈবালের ফিরতে রোজই বেশি রাত হয়। অফিস থেকে সোজাসুজি বাড়ি ফেরার ধাত নেই। বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি কিংবা দু-একটা ক্লাব ঘুরে আসে। যেদিন তাসের আড্ডায় জমে যায়, সেদিন এগারোটা বেজে যায়।

এজন্য তার প্রত্যেক দিনেরই একটা বকুনির কোটা আছে। প্রমিতা তার জন্য জেগে বসে থাকে। ঝি-চাকরদের বেশি খাটাবার পক্ষপাতী নয় প্রমিতা। রান্নার লোকটিকে সে রোজ রাত দশটার সময় ছুটি দিয়ে দেয়। শৈবাল তারও পরে ফিরলে প্রমিতা নিজেই তার খাবার গরম করে দেবে, পরিবেশন করবে আর সেইসঙ্গে চলতে থাকবে বকুনি।

শৈবাল তখন দুষ্টু ছেলের মতন মুখ করে শোনে।

প্রত্যেক দিনই সে প্রতিজ্ঞা করে যে, কাল আর কিছুতেই দেরি হবে না। এক-একদিন মেজাজ খারাপ থাকলে সে অবশ্য উলটে কিছু কড়াকথা শুনিয়ে দেয় প্রমিতাকে। সাধারণত তাসে হারলেই তার এ-রকম মেজাজ খারাপ হয়।

ওদের দু-টি ছেলে-মেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে দশটার মধ্যে। সুতরাং, বাবা-মায়ের ঝগড়া তাদের শুনতে হয় না। শৈবাল প্রমিতাও প্রাণ খুলে চোখাচোখা বাক্য বিনিময় করে যেতে পারে।

সেদিন রাত্রে শৈবাল খাবার টেবিলে বসে মাছের ঝোল পর্যন্ত পৌঁচেছে, ঝগড়াও বেশ জমে উঠেছে, এইসময় সে দেখল, সতেরো-আঠেরো বছরের একটি সম্পূর্ণ অচেনা মেয়ে তাদের রান্নাঘরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে, লাজুক ভঙ্গিতে মুখ নীচু করে হেঁটে বারান্দার দিকে চলে গেল।

বিস্ময়ে ভুরু উঁচু হয়ে গেল শৈবালের।

ছোটগল্প : কথা কতিপয় | সৈয়দ শামসুল হক | রবিবারের প্রবন্ধ ৭


ছোটগল্প : কথা কতিপয়
সৈয়দ শামসুল হক

বাংলাদেশে মনে হয় কবিতার পরে-পরেই ছোটগল্প অধিক লেখা হয়। লাগসই অনুমানে বলতে পারি, দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী, মাসিক সাহিত্যপত্র আর ছোটকাগজ মিলিয়ে বছরে চার-পাঁচ হাজার কবিতার বিপরীতে, প্রায় হাজার দেড়েক ছোটগল্প তো ছাপা হয়ই; এর বেশি ছাড়া কম হবে না। উপন্যাস সে-তুলনায় সত্যিকার উপন্যাস, ঈদসংখ্যার তাড়া-লিখনে উপন্যাসের ভেক ধরা বড়গল্পগুলো ধরছি না বছরে? বড়জোর শ’দেড়েক!

আমাদের কথাসাহিত্যে তাহলে ছোটগল্পেরই ফলন বেশি। এর একটা কারণ কিংবা উৎসাহ বোধহয় এই ছোটগল্প না হলে সাহিত্য সাময়িকী অচল, মাসিকপত্র অচল, ছোটকাগজেরও তথা বাস্তবতা। অতএব নিরন্ত চাহিদা আছে ছোটগল্পের, নতুন লেখকেরা শুরুও করছেন ছোটগল্প দিয়েই। ছোটগল্পের জন্যে সম্পাদক পথ চেয়ে আছেন, বেশ ব্যাকুলভাবেই; লেখা ছাপা হবার সম্ভাবনাও সেই কারণে অনেক বেশি। লেখক লিখেই চলেছেন, সম্পাদকও ছেপে দিচ্ছেন লেখাটা চলনসই হলেই পত্রপত্রিকায় নিরন্তর যে-গল্পগুলো বেরোচ্ছে তা অভিজ্ঞ চোখে পাঠ করলেই ধরা পড়বে, এর অধিকাংশই অনেকটা কাঁচা, প্রায় শিক্ষানবিশের রচনা। তবু, পাঠযোগ্য কিছু গল্প তো আমরা পাচ্ছিই। কিন্তু সেই ছোটগল্প নিয়ে লেখক যখন বই করতে চান, নতুন লেখক হলে প্রকাশক মুখ ফিরিয়ে নেবেন; আর কিছুটা বা যথেষ্টই খ্যাতি আছে এমন লেখকের গল্পের বই প্রকাশক নিমরাজি হয়ে ছাপবেন বটে, তবে এই কড়ারে যে এরপরে তাকে কিন্তু একটা আস্ত গোটা উপন্যাস দিতে হবে। কারণ, ছোটগল্পের বই বাজারে চলে না; চলে না মানে এর বিক্রিটা নেহাতই নগণ্য। প্রকাশকের কথা বিশ্বাস না করলে, আমরাও বাজারে বা বইমেলায় বেরিয়ে দেখবো ছোটগল্পের বই মোটে চলছে না। ভাবতে অবাক লাগে, যে-ছোটগল্প না হলে পত্রপত্রিকা অচল, বই হয়ে বেরোলে সেই ছোটগল্পেরই সংকলন এমন বেজার বাজার পায় কী করে! বা, কেন?

আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কি ইতিহাসের সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়?


কাউকে বড় করার জন্য আমরা অন্যকে ছোট করতে ভালবাসি অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা, সহিঞ্চুতার কোনো বালাই আমাদের নেই। ‘সমালোচনার মর্যাদা’ বস্তুটির নামগন্ধ সমাজের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বির্তক শুরু নব্বই দশকের গোড়ার দিকে। সূত্রপাত হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এক মুক্তিযোদ্ধাকে ‘বড়’ করতে জাতিরজনককে খাটো করতে। এই প্রচেষ্টার বিরোধীরা তখন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি, বিবৃতি দিয়ে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। পরবর্তীতে আইন-আদালতের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে চেয়েছেন। তারপরে মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন তাঁদের লেখায় এ বিষয়ে অভিমত প্রকাশ করে সেই বির্তককে উস্কে দিয়েছেন। 

এবারের বইমেলায় প্রকাশিত “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও প্রাসঙ্গিক বিতর্ক” গ্রন্থে লেখক মোঃ আবদুল জব্বার আবার ঐ সব বক্তব্য খণ্ডনের প্রয়াস পেয়েছেন। বইগুলো হলো মঈদুল হাসানের মূলধারা '৭১, এ কে খন্দকারের ১৯৭১ ভেতর বাইরে, হুমায়ূন আহমেদের জোছনা ও জননীর গল্প, গোলাম মুরশিদের মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর, শারমিন আহমদের তাজউদ্দিন আহমদ - নেতা ও পিতা।
এখানে লেখক এর আগে প্রকাশিত সাড়া জাগানো পাঁচটি বইয়ের বক্তব্যকে ভ্রান্ত প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। এ ব্যাপারে লেখক মোঃ আবদুল জব্বার আমাদের ঐতিহ্য মতো কাউকে ‘ছোট’ না করে, তীব্র আক্রমণ না করে, যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে তাঁর মত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন। যা পাঠকের মনোযোগ দাবি ক... 




এভাবেও ভিন্নমত প্রকাশ করা যায় তা আমাদের রাজনীতির ‘খিস্তি-খেউড়ে’ মধ্যে কিঞ্চিৎ স্বস্তিদায়ক। গ্রন্থলেখক আদালতের রায়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা বির্তকের অবসানের কথা অনেকবার উল্লেখ করেছেন। যা তাঁর বক্তব্য প্রতিষ্ঠার বারংবার অবতারিত হয়েছে এ বইয়ে। কিন্তু আইন বা আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কি ইতিহাসের সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়? এই প্রশ্নটি থেকেই যায়। প্রচ্ছদ করেছেন অশোক কর্মকার, আরো একটু দৃষ্টিনন্দন হতে পারতো। তবু বলছি এবার বইমেলায় অনেক বইয়ের মাঝে এটি একটি মূল্যবান ও বুদ্ধিদীপ্ত বই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও প্রাসঙ্গিক বিতর্ক
মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
সাহিত্য প্রকাশ
প্রচ্ছদঃ অশোক কর্মকার
৩৫০ টাকা

আপনি তুমি রইলে দূরে | রফিক কায়সার | রবিবারের প্রবন্ধ ৬

আপনি তুমি রইলে দূরে
রফিক কায়সার

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে কবি-প্রয়াণের পর থেকেই। তাঁকে নিয়ে কবির জীবৎকালেও ব্যক্তিবিশেষের নেতিবাচক মতামত বা মন্তব্যকে কবি যথেষ্ট গুরুতব দিয়ে খন্ডন করেছেন বা জবাব দিয়েছেন। ব্যক্তিবিশেষের মন্তব্য বা মতামত কবির জীবৎকালে সামাজিক পরিবাদ বা শান্তিনিকেতনে রথীন্দ্রনাথবিরোধী জনমত তীব্রতা পায়নি। কবি-প্রয়াণের পর থেকেই রথীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন নিয়ে শান্তিনিকেতনের বাসিন্দাদের জনরব তৈরি হতে থাকে। তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মী নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। যৌক্তিক কারণেই রবীন্দ্রনাথের পরিবারের পক্ষ থেকে এই সম্পর্ক নিয়ে কথা ওঠে, তাঁর গোচরে আনা হয় সামাজিক লোকনিন্দার প্রসঙ্গ। এ-প্রসঙ্গে রথীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল নেতিবাচক – তিনি মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে অস্বীকার না করে শান্তিনিকেতন থেকে প্রস্থানকে বিবেচনায় আনেন। ইন্দিরা চৌধুরী সরাসরি রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। বিশ্বভারতীর আচার্য ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কানেও খবরটি পৌঁছে যায়। রথীন্দ্রনাথের ছোট বোন মীরা ঠাকুর প্রথম থেকেই এই সম্পর্ক নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অগ্রজের প্রতি, আবার লুপ্ত করেননি অগ্রজের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধাবোধ। ভ্রাতৃবধূর প্রতি অব্যাহতভাবে জ্ঞাপন করেছে সহমর্মিতা এবং সহানুভূতি। রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি কটাক্ষ করেছেন রথীন্দ্রনাথের ভাগ্নি নন্দিতা।

রথীন্দ্রনাথের সম্পর্ক-বহির্ভূত আচরণ যেমন শান্তিনিকেতনে নিন্দার ঝড় তুলেছিল, তেমনি উপাচার্য হিসেবে তাঁর কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জড়িয়ে পড়েন তহবিল তছরুপের মামলায়। একপর্যায়ে মামলায় হাজিরা দিতেও অনাগ্রহী হয়ে পড়েন রথীন্দ্রনাথ। এই পর্যায়ে সবকিছু ছাপিয়ে মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাজারীবাগে ‘হাওয়া বদল’ করতে যাওয়ার ঘটনা তাঁর পদমর্যাদা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। বিশ্বভারতীর স্থানীয় এবং দিল্লির প্রধানমন্ত্রীর দফতর ঘটনাটিকে সহজভাবে নিতে পারেনি। রবীন্দ্রানুরাগী নেহেরু নিজেও রথীন্দ্রনাথের বিষয়ে বিব্রত হন। প্রশান্ত মহালনবীশকে দিয়ে তাঁর কাছে খবর পাঠানো হলো যে, ‘বার্তা’র সারমর্ম হলো, চট্টোপাধ্যায় দম্পতিকে শান্তিনিকেতন থেকে হটাও। রথীন্দ্রনাথ উল্লিখিত ‘বার্তা’র মর্মার্থ গ্রহণ না করে বেছে নিলেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত। অভিমান করে ছেড়ে এলেন শান্তিনিকেতন। সঙ্গে এলেন মীরা চট্টোপাধ্যায়। জীবনের শেষ আট বছর অতিবাহিত করেছেন এই নারীর সান্নিধ্যে – দেরাদুনে। এই ঘটনাক্রম বিশ্বভারতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে কমবেশি জানা।

বোর্হেসের গোলকধাঁধা | অশ্রুকুমার সিকদার


অশ্রুকুমার সিকদার
বোর্হেসের গোলকধাঁধা

কোনও লেখক নোবেল পুরস্কার পেলে তখনই তাঁকে নিয়ে আমাদের কাগজে হইচই করা হয়। ইয়োর্গে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) এখনও নোবেল পুরস্কার পাননি, তাছাড়া তিনি এমন এক দেশের মানুষ যার কথা খবরের কাগজের চূড়ায় সচরাচর জায়গা পায় না, তাই তাঁর সম্বন্ধে পত্রপত্রিকার এমন নীরবতা। আমাদের দেশেরই বা দোষ কী, বস্তুত ১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে ফেরমেন্টর পুরস্কার পাবার আগে দক্ষিণ আমেরিকার অন্তর্গত আর্জেন্টিনার এই লেখক সম্বন্ধে ইয়োরোপও সাধারণভাবে অজ্ঞ ছিল। অথচ এই বহুপাঠী চিন্তাশীল লেখক যে অন্ধকারময় গোলকধাঁধার জগৎ রচনা করেছেন তা বিশেষভাবে আধুনিক মানুষের উপযোগী। ১৮৯৯ সালের ২৪ অগস্ট বুয়েনোস এয়ার্সে বোর্হেসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বুদ্ধিজীবী লেখক মানুষ। তাঁরই বিশাল গ্রন্থাগারে শৈশব থেকে বোর্হেসের ইচ্ছামতো মানসিক ভ্রমণ আরম্ভ হয়। তাঁর মা এখনও জীবিত, এই অকৃতদার লেখকের ব্যক্তিগত জীবনে তিনিই কেন্দ্রস্বরূপ। বোর্হেসের ধমনীতে হিস্পানি, ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ইহুদি পূর্বপুরুষের রক্ত প্রবহমান। তাঁর একজন পূর্বপুরুষ এসেছিলেন ইংল্যান্ডের অন্তঃপাতী নর্থাম্বারল্যান্ড থেকে। আর একজন ছিলেন পর্তুগিজ জাহাজের ক্যাপ্টেন। অন্য একজন পূর্বপুরুষ আর্জেন্টিনার গৃহযুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেছিলেন। শিক্ষাসংস্কৃতির দিক থেকেও তিনি মিশ্র ঐতিহ্যের মানুষ। কিছুদিন সুইটজারল্যান্ডের জেনিভায়, কিছুদিন স্পেনে তিনি অধ্যয়ন করেন। স্পেনে তিন বছর অধ্যয়নকালে তিনি Ultraista কবিগোষ্ঠীর সংস্রবে আসেন এবং ১৯২১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি আর্জেন্টিনার Ultraismo কবিতার প্রবর্তক ও নেতা হন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত কবিতা-লেখক। তাঁর মুক্তছন্দে লেখা কবিতায় বুয়েনোস এয়ার্সের দৃশ্য ও পরিমণ্ডল মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই সময়ের কবিতায় তাঁর পরবর্তী গদ্যের নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, তাঁর প্রথম যুগের কবিতা অনেক বেশি হার্দ্যগুণে মণ্ডিত। সময়স্রোত ও মৃত্যুচেতনা সেই কবিতাবলিতে প্রমূর্ত ও প্রতিধ্বনিত, এক চরম তাড়নায় যেন তারা পরস্পর একাকার হয়ে গেছে। কবিতা ছাড়া তিনি এই সময় লিখতেন সাহিত্যবিষয়ে প্রবন্ধ।

১৯৩০-এর পর তাঁর রচনায় এক মৌলিক পরিবর্তন এল। তাঁর গদ্যে গল্প লেখার বাইরের ইতিহাস বড় বিচিত্র। একবার পড়ে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান এবং অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী ছিলেন। কয়েক মাস একটি অক্ষরও লেখেননি, কবিতা লেখায় হাত দিতে সাহসই পাননি। তাঁর ভয় হয়েছিল হয়তো লেখার শক্তি চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। অবশেষে তিনি এই ভেবে গল্প লেখায় সন্তর্পণে হাত দেন যে তাঁর গল্প একটা নতুন ব্যাপার হবে এবং পাঠকেরা পুরোনো লেখার সঙ্গে নতুন লেখাকে তুলনা করে খারাপ বলার সুযোগ পাবে না, যেহেতু দুই ধরনের লেখার ধর্ম একেবারে আলাদা। এইভাবে গল্পের উৎস খুলে গেল। তাঁর গদ্যরচনায় হাত দেওয়ার ব্যাপারে এই ঘটনা থেকে যতটা আকস্মিক মনে হয় ততটা আকস্মিক নয়, তার পিছনে আন্তরিক প্রবর্তনাও ছিল। এই মাধ্যম পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। তাঁর কবিতার ইন্দ্রিয়জ জগৎ হয়ে উঠেছিল অবাস্তব, হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। ইন্দ্রিয়জ জগৎ অবাস্তব হয়ে উঠেছিল, কারণ তাঁর বাবা, তাঁর শিল্পী বোন নোরা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের মতো তিনিও দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছিলেন। ইন্দ্রিয়জ জগৎ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনায় পেরোনের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায়। যে আর্জেন্টিনাকে তিনি 'this dismantled republic' বলেছিলেন তার রাজনীতিতে যোগ দেবার উৎসাহ তাঁর ছিল না। রাজনীতিতে নিরুৎসাহ হলেও কিন্তু পেরোনের একনায়কত্বে তাঁকে কম বিব্রত হতে হয় না। প্রথমে মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে সামান্য চাকরি নিয়ে তিনি প্রচুর এলোমেলো অধ্যয়নের যে সুযোগ পেয়েছিলেন তা থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। পেরোন তাঁকে বরখাস্ত করে নিযুক্ত করে হাঁসমুরগির খামারের ইন্সপেকটর পদে। এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে বন্ধুদের উদ্যোগে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন। তাঁদের চেষ্টায় তিনি ইংরেজিমার্কিন সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন, যে বিষয়ে তাঁর সন্দেহাতীত যোগ্যতা ছিল। এইসব অভিজ্ঞতার বশেই হয়তো একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রের চিন্তা তাঁকে কম ভারাক্রান্ত করেনি। Deutsches Requiem গল্পে তাই সহজেই তিনি বক্তার মুখ দিয়ে নাজি-মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে পারেন। The secret Miracle গল্পের চেক নায়ক একদিনভোরে শোনে

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট