লাইক আ বার্ড | নিউ ইয়র্ক টাইমসের বই আলোচনা | অনুবাদঃ আশফাক স্বপন | মূলঃ প্রিয়া অরোরা



পুরুষতান্ত্রিকতার সিন্দবাদের ভূত। বর্ণ, যৌনপরিচয়/প্রবণতা সম্বন্ধে সুতীব্র ঘৃণা। বাঙালির মধ্যে বহুরকমের ভেদবুদ্ধি, সেটা মূল ভুখণ্ডে যেমন, তার বিরূপ প্রভাব সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা অভিবাসী সমাজে। সেই সমাজে অস্ট্রেলিয়া আর ক্যানাডায় বাংলাদেশি বাবা-মায়ের ঘরে বড় হয়েছেন ফারিহা রোশিন। নিজে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তারপর ঘুরে রুখে দাঁড়িয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম উপন্যাস। এই নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রতিবেদন। 



জীবনে টিকে থাকার সংগ্রামটা ঠিক কেমন? লেখিকার আশা, যন্ত্রণা নিয়ে তার বইটি সেই বাস্তবতা তুলে ধরবে


প্রিয়া অরোরা

নিউ ইয়র্ক টাইমস; ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০


অনুবাদ আশফাক স্বপন


In a Book About Trauma, She Hopes to Show What Survival Looks Like


By Priya Arora

The New York Times | Sept. 27, 2020


Like a Bird

By Fariha Roisin

The Unnamed Press. 288 pp. $26 


ফারিহা রোশিন-এর বয়স যখন ১২, তখন যেই চিন্তাটা অবশেষে তার প্রথম উপন্যাসের রূপগ্রহণ করে, সেটা তার কাছে এক স্বপ্নে আবির্ভূত হয়। তখনও  তার যা বলার ছিল তার জন্য সব শব্দ তার আয়ত্তে ছিল না, কিন্তু তাতে কি? তিনি কাজ শুরু করলেন।


আজ তার বয়স ৩০, আর আস্তে আস্তে তার লেখার ভাণ্ডারও সমৃদ্ধ হয়েছে। সেখানে কবিতা, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ এবং আরো অন্যান্য রচনা রয়েছে। এই সব লেখা তার নিজের নিপীড়ন, শারীরিক আক্রমণ আর লজ্জার অভিজ্ঞতার গভীর অনুসন্ধান করেছে। Unnamed Press প্রকাশিত তার প্রথম বই Like a Bird (পাখির মতো)-এর বেলায়ও এই কথা সত্যি। এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এতো বছর ধরে এই বইটি লেখার প্রক্রিয়া তার মানসিক আরোগ্য পুনুরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। কেউ নির্যাতনের শিকার হলে কী ঘটে সেই বিষয়ে গল্পের খুব অভাব। বইটি সেই নিরবতার বিরুদ্ধে একটি প্রত্যুত্তর।


‘আমার ধারণা আমার লেখালেখির একটা বিরাট অংশ মানসিক আরোগ্যলাভ নিয়ে, কারণ আমার নিজের মানসিক আরোগ্যলাভ প্রয়োজন, এবং সারাক্ষণ বর্তমান সময়েই সেই অভিজ্ঞতার সাথে বোঝাপড়া করছি,’ ফারিহা বলেন। ‘আমি বাঁচব, আমি জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে পারব, এই ধারণার প্রতি আমার আস্থা জন্মানো দরকার। আমার যে একটা ভবিষ্যত আছে, এই বিষয়ে আমার আস্থা থাকা দরকার। সেটা পাতায় লিখিতভাবে না দেখলে, সেটা আমার দিব্যচক্ষুতে না দেখতে পেলে আমি নিজেকে সেই নিশ্চয়তা দিতে পারি না।’


Like a Bird তাইলিয়া চ্যাটার্জীর গল্প। তাইলিয়া এক অল্পবয়স্কা তরুণী। নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানের অবস্থাপন্ন উত্তর পশ্চিম দিকে বড় হয়েছেন। কিন্তু বাবা মা দুজনই মানসিকভাবে যেন অধরা, তাকে কঠোরভাবে দমন করে রাখে। তার মনে হয় তার চার পাশের সবার কাছে তিনি যেন অদৃশ্য। ব্যতিক্রম তার স্নেহময়ী বড় বোন আলিসা।


তাইলিয়ার ওপর যৌন নির্যাতন হবার পর তার পরিবার তাকে ত্যাগ করে। মানসিকভাবে, শারীরিকভাবে, আর্থিকভাবে তার নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণ তার নিজের কাঁধে এসে পড়ে। তার নানীর আত্মার সস্নেহ পথপ্রদর্শনায়, তার নতুন বন্ধু ও প্রণয়ীদের সাহায্যে তিনি ধীরে ধীরে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাথে বোঝাপড়া করে মানসিক আরোগ্যলাভের অর্থ কী সেটা বুঝতে সক্ষম হন। তার মতো যেসব মানুষ নির্যাতন-নিপীড়ন-হিংসার সাথে সংগ্রাম করে নিজেকে রক্ষা করেছেন, এই ফারিহা তাদের উৎসর্গ করেছেন।


‘আমার মনে হয়েছে আমি নিজ অভিজ্ঞতা, নিজ সত্তার বাইরে থেকে যেন কিছু আহরণ করতে পেরেছি, সেটা আত্মস্থ করতে পেরেছি,’ তিনি বলেন।


অস্ট্রেলিয়া আর কানাডায় বাংলাদেশি বাবা-মায়ের ঘরে ফারিহা বড় হন। তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা সঙ্কলনসহ পূর্ববর্তী রচনায় তিনি যন্ত্রণার ঐতিহ্য ও মরমী ভাবনার মতো বিষয় অনুসন্ধান করেছেন। তার কবিতা সঙ্কলনের নাম How to Cure a Ghost (প্রেতাত্মা কী করে সারাতে হয়)। ‘আমার পূর্বপুরুষদের থেকে যে আমার কত কিছু শেখার আছে! আমার ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাস, আমার জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, আমাদের অঞ্চলের ইতিহাস – এই সবকিছু থেকে আমার অনেক, অনেক কিছু জানার, শেখার আছে,’ তিনি বলেন।


এই শেকড়সন্ধান ফারিহার ভারতপ্রেমের গভীরে প্রোথিত। তবে তিনি ভারতকে অভিহিত করেন বৃহত্তর ভারত হিসেবে, অর্থাৎ উপনিবেশ হবার আগের ভারত। তানাইস (Tanais) একজন লেখিকা। পাঁচ বছর আগে তিনি ফারিহার লেখার সাথে পরিচিত হন। তাকে যে বিষয়টা চমকে দেয় তা হলো ফারিহার বাংলাদেশের সাথে আত্মীয়তা এবং তার যৌন পরিচয় নিয়ে লেখালেখির ফলে তার সাহিত্যকৃতি যেন একই সাথে দক্ষিণ এশীয় কথাসাহিত্যের অংশ, আবার একই সাথে সে সম্বন্ধে প্রচলিত ধ্যানধারণার প্রতি চ্যালেঞ্জ। কারণ দক্ষিণ এশীয় কথাসাহিত্য সচরাচর ভারতকেন্দ্রিক, সেখানে উঁচুবর্ণের হিন্দুদের কাহিনির প্রায় একচ্ছত্র দাপট।


‘এই ব্যাপারটা খুব ভেবে দেখার মতো যে এত বিস্তৃত একটা অভিবাসী সমাজের অংশ আমি, অথচ বাঙলা সমকামী নারীত্ব নিয়ে খুব সুনির্দিষ্টভাবে কেউ লিখছেন, তেমনটা একেবারেই মনে হচ্ছে না,’ তানাইস বলেন।


এই দুই লেখক এখন বন্ধু হয়ে গেছেন। Like a Bird-এর প্রাথমিক খসড়া পড়বার পর তানাইস ফারিহাকে পাণ্ডুলিপির কিছু কিছু অংশ - যা তিনি আরেকটু কম বয়সে লিখেছিলেন - সেসব  ঘষামাজার পরামর্শ দেন। কারণ সেই অংশগুলোতে যেন অন্য একটা কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। এই পরামর্শ তার খুব কাজে এসেছিল। এর ফলে তিনি নিজে তফাতটা আরো ভালো করে শনাক্ত করতে পারলেন, এবং সেটা শুদ্ধির আত্মবিশ্বাস লাভ করলেন। ‘এর ফলে ও যেন এক ধরনের মুক্তি লাভ করে, তার মনোবল বেড়ে যায়।’


ফারিহার আরেক বন্ধু, জেবা ব্লে, ফারিহার খসড়া দেখার পর তার অধ্যবসায় দেখে চমৎকৃত হন। ‘সে যেন দূর পাহাড়ে চলে যায়, তারপর এক অপূর্ব সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসে।’


ফারিহা বলেন বইটি লেখা শুরু করার সময় তিনি অনেক কিছু জানতেন না। Audre Lorde, Susan Sontag, June Jordan-এর মতো লেখিকারা, যারা তাদের লেখায় মানসিক আরোগ্যলাভ নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করেছেন, ফারিহা এদের বই গোগ্রাসে পড়েছেন। কিন্তু প্রথম দিককার খসড়াগুলোর ভাষা যে শুধু আরো সরল ছিল তাই নয়, কিছু কিছু বিষয় – যেমন তার যৌন প্রবণতা – সেটা নিয়ে আদৌ লেখা যায় কিনা সেটাই তিনি বুঝতে পারছিলেন না।


‘পুরনো পাতা দেখলে মনে হয়, কী অবাক কাণ্ড, আমার গল্পবলা সম্বন্ধে ধারণাটাও কত কোণঠাসা,’ তিনি বলেন। যেমন প্রথম দিকে গল্পে একটা প্রেমিক পুরুষের উপস্থিতি ছিল। ফারিহা পরে তাইলিয়ার গল্পের মোড় অন্যদিকে নিয়ে যান যেখানে প্রেম নয়, তার সমাজের সাথে আত্মীয়তার মধ্য দিয়ে সে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। এই অবস্থাটাই ফারিহার বেশি সত্য মনে হয়েছে কারণ যৌন পরিচয় ও প্রবণতায় ব্যতিক্রমী যে সমাজ ফারিহার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এটাই বাস্তব অবস্থা।


‘আমার মনে হয়েছে যেন আমার পরিচয়ের একটা অংশ মুছে যেতে বসেছে কারণ আমার আর গত্যন্তর ছিল না,’ ফারিহা বলেন। ‘মানে আমি কি করে এতটা দুঃসাহস দেখাব যার ফলে এমন যৌন পরিচয়/প্রবণতা নিয়ে লিখব অথবা এমন একটা চরিত্র সৃষ্টি করবে যেটা ততটা গ্রহণযোগ্য নয়?’ ওই অংশগুলো আবার ঘষামাজা করে, বিদেশিবিদ্বেষ, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ আর বর্ণবাদের মত অশুভ শক্তিগুলো স্বনামে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে বইটি তার চুড়ান্ত আকার নেয়।


‘আমার তো মনে হয় এই বইটার সবচাইতে বড় গুণ হলো বইটি আমাদের সমাজের বহু বিষয় নিয়ে নিরবতা ভঙ্গ করেছে,’ তানাইস বলেন। ‘আমার মতো মানুষ, যারা নিপীড়ন থেকে বেরিয়ে নিজেদের যন্ত্রণামুক্ত করে মানসিক আরোগ্যলাভ করেছে, যারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজেদের রক্ষা করেছে, তাদের জন্য, আর আপামর অল্পবয়সী মানুষের জন্য এই যে আরেকটি অল্পবয়স্ক মানুষ তার বেদনা, তার যন্ত্রণার ব্যাপারে মুখ খুললো, এবং সেই কষ্টকে অতিক্রম করলো, সেটার ঘোষণা একটা বড় প্রাপ্তি।’


ফারিহা যন্ত্রণার অভিজ্ঞতাকে অনেক সময় প্রেতাত্মা আর ভূতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন। এই উপন্যাসে তাইলিয়ার নানী একজন প্রেতাত্মা হয়ে আবির্ভূত হন। তার সবচাইতে বিপদের সময় নানীর আত্মা তাকে পথ দেখান। এর কারণ বাংলাদেশি সংস্কৃতি এবং ইসলামী ঐতিহ্যে জ্বিনের উপস্থিতি। ছোটবেলা থেকে ফারিহা বুহু জ্বিনের কথা শুনেছেন।


‘অশরীরী আত্মার জগতে আমার চেতনা গভীরভাবে নিমগ্ন,’ ফারিহা বলেন। ‘আমরা সবাই তো তাই। আমাদের সবার এই নিয়ে ধারণা, বিশ্বাস বা ভাষা রয়েছে। শুধু প্রশ্নটা হলো আপনি কতখানি এসবে বিশ্বাস করতে চান আর আপনি কি এদের সাথে সহাবস্থান করার ব্যাপারে ইচ্ছুক কিনা।’


এতবছর ধরে এই বইটি লেখার পর ফারিহা বলেন তার এখন নিজের স্বার্থে সমাজ বদলের দরকার। ‘মানসিক আরোগ্যলাভের ব্যাপারে যুক্তি আর জ্ঞানের বিরোধিতা করবার একধরণের প্রবণতা রয়েছে। আমি এই অবস্থাটা বদলাতে চাই,’ ফারিহা বলেন। ‘আমি চাই লোকে এই বই পড়ে যৌন নিপীড়ন সম্বন্ধে আরেকটু সার্বিক ভাবে, আরো গভীর বিশ্লেষণের সাথে বুঝতে শিখুন, আর সেই নিপীড়ন থেকে মানুষের পরিত্রাণ, তার মানসিক আরোগ্যলাভের ব্যাপারে আস্থাবান হোন, সেটা কীরকম হবে সেই সম্ভাবনাটা নিয়ে একটু ভাবুন।’



[প্রিয়া অরোরা নিউ ইয়র্ক শহরবাসী সম্পাদিকা। ২০১৮ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে যোগদান করার আগে HuffPost এবং অন্য পত্রিকায় কাজ করেছেন। তার লস এঞ্জেলেস-এ বড় হয়েছেন।‘


জগতের সবচেয়ে-সুন্দর জলে-ডোবা পুরুষ মূল গল্প : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস অনুবাদঃ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

জগতের সবচেয়ে-সুন্দর জলে-ডোবা পুরুষ
মূল গল্প : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়



যে বাচ্চারা প্রথম দেখেছিল ওই কালো আর চুপি-চুপি আসা ফোলা-ফোলা জিনিসটা সমুদ্দুরের মধ্য থেকে আসছে, তারা গোড়ায় নিজেদের বুঝিয়েছিল এ নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষের কোনো জাহাজ।

তারপর তারা দেখতে পেলে যে এর কোনো নিশেনও নেই কিংবা নেই এমনকি মাস্তুলও, তখন তারা ভাবলে যে এ নিশ্চয়ই কোনো তিমিঙ্গিল। কিন্তু ঢেউ যখন সেটা ধুতে-ধুতে আছড়ে এনে ফেললো বেলাভূমিতে, তারা সরালে শ্যাওলার আস্তর, জেলিমাছের সব কর্ষিক আর মাছ আর জাহাজডুবির টুকিটাকি যা লেগে আছে গায়ে, আর তখনই তারা দেখতে পেলে এ-যে এক ডুবে-যাওয়া পুরুষমানুষ। 

সারা বিকেলটা তারা তাকে নিয়ে খেলেছিল, কবর দিচ্ছিল তাকে বালিতে, ফের তাকে খুঁড়ে-খুঁড়ে তুলছিল, এমন-সময় দৈবাৎ কে-একজন তাদের দেখতে পেলে আর গাঁয়ে গিয়ে বিপদের সংকেত ছড়িয়ে দিলে। যে-পুরুষরা তাকে ধরাধরি করে সবচেয়ে কাছের বাড়িটায় নিয়ে এলো তারা খেয়াল করলে যে অ্যাদ্দিন তারা যত-সব মৃতদেহ দেখেছে তাদের সকলের চাইতেই এ-লাশটার ওজন অনেক বেশি, প্রায় কোনো একটা ঘোড়ারই মতো ওজন, আর তারা পরস্পরকে বললে, হয়তো সে অনেকদিন ধরেই জলে ভাসছিল, আর তাইতে এমনকি তার হাড়ের মধ্যেও বোধহয় জল ঢুকে গিয়েছে। তারা তখন লাশটাকে মেঝেয় শুইয়ে দিলে আর তারা বলাবলি করলে সব লোকের চাইতেও এ-যে দেখছি লম্বা, ঘরটায় সে প্রায় আঁটেই না যে; তবে, তারা ভাবলে, হয়তো কোনো-কোনো ডুবে-মরা মানুষের প্রকৃতিই থাকে মৃত্যুর পরেও কেবলই বড়ো-হতে-থাকা। গায়ে তার দূর সিন্ধুর গন্ধ, শুধু তার আকৃতি দেখেই কেউ আন্দাজ করে নিতে পারে যে সে এক মানুষেরই লাশ, কারণ চামড়াটা তার কাদা আর আঁশের একটা শক্ত আস্তরে ঢেকে গিয়েছে।

মৃত লোকটা যে অচেনা-কেউ, এটা জানবার জন্যে তাদের এমনকি তার মুখটাও ধুয়েমুছে সাফ করতে হলো না। গ্রামটা গড়ে উঠেছে শুধুমাত্র বিশ-পঁচিশটা কাঠের বাড়িতে; সেসব বাড়ির উঠোন শান-বাঁধানো, কিন্তু কোথাও কোনো ফুল নেই, আর গ্রামটা ছড়িয়ে গেছে কোনো-একটা অন্তরীপের মরুভূমির মতো ঊষর প্রান্তে। ডাঙা এখানে এতই কম যে মায়েরা সবসময়েই ভয়ে-ভয়ে থাকে কখন হাওয়া এসে তাদের ছেলেমেয়েদের উড়িয়ে নিয়ে যায়, আর বছরগুলো তাদের মধ্যে যে-কজনকে এখানে সাবাড় করেছে, তাদের তীরের পাহাড় থেকে জলে ছুঁড়ে ফেলতে হয়েছে, কিন্তু সমুদ্র এখানে শান্ত, নিস্তরঙ্গ ও সুন্দর, আর সাত-সাতটা নৌকোতেই গ্রামের সব্বাই এঁটে যায়। কাজেই যখন তারা এই ডুবন্ত লোকটাকে আবিষ্কার করলে, পরস্পরের দিকে শুধু একবার তাকিয়েই তারা নিশ্চিন্ত হয়ে নিলে যে সকলেই তারা এখানে আছে।

সে-রাতে তারা আর সমুদ্রে কাজ করতে গেলো না। যখন লোকে হদিস নিতে গেলো যে আশপাশের গাঁগুলো থেকে কেউ হারিয়ে গেছে কি না, মেয়েরা থেকে গেলো পেছনে, এই ডুবন্ত লোকটার যত্ন-আত্তি করবার জন্যে। ঘাসের চাপড়া দিয়ে ডলে-ডলে তারা তাঁর গা থেকে কাদা তুলে নিলে, তারা সরিয়ে দিলে জলের তলার যেসব নুড়িপাথর তার চুলে জট পাকিয়ে ছিল, আর যা দিয়ে তারা মাছের আঁশ ছাড়ায় তা-ই দিয়ে তারা তার গায়ের শক্ত আস্তরটা চেঁচে নিলে। এসব করতে করতেই তারা খেয়াল করে দেখলো যে উদ্ভিদ বা শ্যাওলা যা তার গায়ে লেপটে আছে সেসব এসেছে দূর-দূরান্তের সাগর থেকে, গভীর জল থেকে, তার জামাকাপড় সব ফালি-ফালি চিলতে মাত্র, যেন সে প্রবালের গোলকধাঁধার মধ্য দিয়েই পাল খাটিয়ে গিয়েছিল। তারা আরো খেয়াল করলো যে সে মৃত্যু বহন করেছে স্বগর্বেই, কারণ অন্য-যেসব ডুবে-যাওয়া লোক আসে সমুদ্র থেকে সে-রকম কোনো নিঃসঙ্গ ভঙ্গি তার নেই, কিংবা নেই সেই কোটরে-বসা খ্যাপা কাতর চোখ যারা ডুবে মরে নদীতে। তবে শুধু যখন তারা তাকে আগাপাশতলা সাফ করলে তখনই আবিষ্কার করলে কেমনতর পুরুষ ছিল সে আসলে, আর এই আবিষ্কার যেন তাদের দম আটকে দিলে। তাদের দেখা সব পুরুষের মধ্যে সে-যে শুধু সবচেয়ে লম্বা, বলবান, তেজস্বী আর সবচেয়ে সুঠাম সুগঠন পুরুষ ছিল তা-ই নয়, আরো-কিছু-একটা ছিল যেন তার মধ্যে; তবে যদিও তারা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল তাদের কল্পনায় কিন্তু তার জন্যে কোনো ঠাঁই ছিল না।

সারা গাঁ খুঁজে তারা এমন-একটা বড়ো বিছানা পেলে না যার ওপর তারা তাকে শোয়াতে পারে কিংবা কোনো শক্তপোক্ত টেবিলও মিললো না যেটা তারা ব্যবহার করতে পারে মৃতদেহের নিশিজাগরের সময়। সবচেয়ে ঢ্যাঙা লোকের ছুটির দিনের পাতলুনও তার গায়ে লাগে না, সবচেয়ে হোঁত্কা লোকের রোববারের জামাও তার খাটো হয়, আর সবচেয়ে বড়োমাপের পায়ের জুতোতেও তার পা গলে না। তার এই অতিকায় আকৃতি আর রূপে মোহিত হয়ে, মন্ত্রমুগ্ধ মেয়েরা ঠিক করলে মস্ত একটা পালের কেম্বিস কাপড় দিয়ে তারা তার জন্যে একটা পাতলুন বানাবে, আর একটা জামা বানাবে কারো বিয়ের মূল্যবান ক্ষৌম বস্ত্রে, যাতে সে মৃত্যুর মধ্যেও নিজের মর্যাদা বজায় রেখে শুয়ে থাকতে পারে। গোল হয়ে ঘিরে বসে তারা যখন সেলাই করছে, আর সেলাইয়ের ফোঁড়ের মাঝে-মাঝে লাশটার দিকে তাকাচ্ছে, তখন তাদের মনে হলো সে-রাত্রির মতো হাওয়া যেন কখনও এমন অস্থির ছিল না অথবা সমুদ্রও এমন অশান্ত ছিল না, আর তারা আন্দাজ করলে এই বদলের সঙ্গে এই মৃতদেহের কোনো সম্বন্ধ আছে নিশ্চয়ই। তারা ভাবলে যে যদি এই গরীয়ান পুরুষ তাদের গাঁয়ে থাকতো, তবে তার বাড়ির দরোজা হতো সবচেয়ে প্রশস্ত, ছাত হতো সবচেয়ে উঁচু, মেঝে হতো সবচেয়ে পোক্ত, তার খাট বানানো হতো কোনো জাহাজের পাটাতন দিয়ে যেটা লোহার বলটু দিয়ে লাগানো থাকতো, আর তার স্ত্রী নিশ্চয়ই হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়ে। তারা ভাবলে, তার নিশ্চয়ই এতটাই কর্তৃত্ব থাকতো যে সে সমুদ্র থেকে মাছ নিয়ে আসতে পারতো শুধু তাদের নাম ধরে ডেকে-ডেকেই আর সে তার জমিতে এতই কাজ করতো যে পাথরের মধ্য থেকেও নিশ্চয়ই ফেটে বেরুতো ফোয়ারা, যাতে সে তীরের শৈলশিরায় বুনে দিতে পারতো ফুলগাছ। গোপনে-গোপনে তারা তাদের নিজেদের পুরুষদের সঙ্গে তার তুলনা করলে, এ-কথাই ভাবলে যে সারা জীবন ধরে তারা যা করতে পারতো না সে নিশ্চয়ই সে-কাজ করতে পারতো মাত্র একরাত্রের মধ্যেই, আর তারা তাদের হৃদয়ের একেবারে গভীরে নিজেদের পুরুষদের খারিজ করে দিলে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে তুচ্ছ ও হীন, সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জীব হিসেবে। তারা তাদের স্বপ্নবিলাসের গোলকধাঁধাতেই এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন সময় তাদের মধ্যে সবচেয়ে যে প্রবীণা, যে বয়সে বুড়ি হয়ে গিয়েছে বলেই ডুবে-যাওয়া পুরুষটির দিকে কামনার চাইতে সহানুভূতির সঙ্গেই তাকিয়েছিল, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললে :

‘এর মুখটা যেন এস্তেবানের।’

সে-কথা সত্যি। বেশিরভাগই তার দিকে আরেকবার তাকিয়ে নিয়েই বুঝতে পারলে যে এস্তেবান ছাড়া অন্য আর-কোনো নামই তার হতে পারতো না। তাদের মধ্যে যারা একটু বেশি জেদি আর একরোখা, তারা আবার বয়েসেও সবার ছোট; তারা তখনও কয়েক ঘণ্টার জন্যে এই মায়াবিভ্রমে কাটিয়ে দিলে যে যখন তারা তাকে পোশাক পরাবে আর পেটেন্ট চামড়ার জুতো পরিয়ে শোয়াবে ফুলের মধ্যে, তার নাম হয়তো হয়ে উঠবে লাউতারো। কিন্তু এ তো শুধু এক অলীক বিভ্রম। কেম্বিস কাপড় যথেষ্ট ছিল না, বিচ্ছিরিভাবে কাটা আর সেলাই করা পাতলুনটা খুব আঁটো হলো, আর তার বুকের গোপন বল তার জামার বোতামগুলো পটপট করে ছিঁড়ে ফেললো। মাঝরাতের পর হাওয়ার শিস মরে গেলো, সমুদ্র ঢুলে পড়লো তার বুধবারের ঘুমে। স্তব্ধতাই শেষ সন্দেহগুলোতে ইতি টেনে দিলে, এস্তেবানই ছিল সে, এস্তেবান। যে-মেয়েরা তাকে পোশাক পরিয়েছিল, তার চুলে কাঁকই দিয়েছিল, তার নখ কেটে তার দাড়ি কামিয়ে দিয়েছিল, তারা তাদের করুণার শিহরণ চেপে রাখতে পারলে না যখন তাকে মাটির ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাবার ব্যাপারটা মেনে নিতে হলো। তখনই তারা বুঝতে পারলে কতটা অসুখী ছিল সে, নিশ্চয়ই অসুখী ছিল, তার ওই বিশাল বপুটা নিয়ে, কারণ মৃত্যুর পরেও সেটা তাকে জ্বালাতন করছে। তারা তাকে যেন দেখতে পারছিল সজীব, হেলে মাথা নুইয়ে দরোজার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করবার দণ্ড পেয়েছে সে, মাথা ঠুকে-ঠুকে যাচ্ছে কড়িবরগায়, কারো সঙ্গে দেখা করতে গেলে দাঁড়িয়েই থাকতে হচ্ছে তাকে, তার নরম গোলাপি সী-লায়ন মাছের মতো হাত দুটি নিয়ে সে যে কী করবে ভেবেই পাচ্ছে না, বিশেষত যখন গৃহকর্ত্রী খুঁজছেন তাঁর সবচেয়ে দুর্দম্য চৌকি, আর তাঁকে অনুনয় করছেন, এদিকে যদিও আতঙ্কে মরো-মরো, বসুন এখানে, এস্তেবান একটু বসুন, অনুগ্রহ করে, আর সে, দেয়ালে হেলান দিয়ে, মৃদু হেসে, আপনি মোটেই ব্যস্ত হবেন না সেনিওরা, আমি এই-তো বেশ আছি, এখানে, তার গোড়ালি ঘায়ে-ঘায়ে দগদগে, তার পিঠ পুড়ে ঝামা, সেই একই জিনিস করে-করে, এতবার, এত জায়গায়, যখনই কারো সঙ্গে দেখা করতে যায়, আপনি ব্যস্ত হবেন না সেনিওরা, আমি এই-তো বেশ আছি, শুধু একটা চৌকি ভেঙে দেবার ভয়ে আর সংকোচে, কখনও এটা না-জেনেই যে হয়তো তাঁরা বলতো, যাবেন না এস্তেবান, অন্তত কফি খেয়ে যান, এই-তো তৈরি হয়ে গেছে, হয়তো তাঁরাই পরে ফিসফিস করে বলাবলি করতেন, যাক, অবশেষে মস্ত আপদটা বিদেয় হয়েছে, কী ভালো, কী-যে সুপুরুষ এই আকাটটা, কিন্তু অবশেষে চলে গিয়েছে। এইভাবেই মেয়েরা দেহটার পাশে বসে-বসে ভাবছিল ভোরের একটু আগে। পরে, যখন তারা তার মুখ ঢেকে দিলে একটা রুমালে, যাতে চোখে আলো পড়ে তাকে বিরক্ত না-করে, তাকে এমন মৃত দেখালো, এমন চিরকাল-মৃত দেখালো, এত অসহায় আর প্রতিরোধহীন, এত তাদের নিজেদের পুরুষদের মতোই যে তাদের বুকে খাঁজ কেটে-কেটে বেরুলো প্রথম অশ্রুর ফোঁটাগুলো। অল্প বয়েসিদের মধ্যে একজন সরাসরি কাঁদতে শুরু করে দিলে। অন্যরা, যোগ দিয়ে, দীর্ঘশ্বাস থেকে বিলাপের পথে চলে গেলো, আর যত তারা ফোঁপালো ততই তাদের গলা ছেড়ে ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করলো, কারণ এই জলে-ডোবা পুরুষটি ক্রমেই তাদের কাছে আরো এস্তেবান হয়ে উঠছে, এর ফলে তারা এতই কান্নাকাটি করলে যে তার যেন শেষই নেই, কারণ সে যে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্ব, সবচেয়ে পরিত্যক্ত, সবচেয়ে শান্তিপ্রিয়, সবচেয়ে কৃতজ্ঞ, সবচেয়ে বাধ্য ও বশম্বদ পুরুষ, বেচারা এস্তেবান। কাজেই পুরুষরা যখন খবর নিয়ে ফিরে এলো যে জলে-ডোবা এই লোকটা আশপাশের গ্রামেরও কেউ নয়, মেয়েরা তাদের দরোদরো চোখের জলের মধ্যেও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের একটা ফাঁক পেয়ে গেলো :

‘ঈশ্বরই ধন্য,’ দীর্ঘশ্বাস ফেললে তারা, ‘এ শুধু আমাদেরই।’

পুরুষরা ভাবলে এই আদিখ্যেতা নেহাতই মামুলি মেয়েলি খামখেয়াল। রাত্তির-জোড়া কঠিন খোঁজখবরের পর ক্লান্ত আর অবসন্ন, তারা শুধু চাচ্ছিল এই নবাগত আপদটাকে এই ঊষর; হাওয়াবিহীন; দিনটায় রোদ তেতে-ওঠার আগেই বিদেয় করে দিতে। তারা মুখমাস্তুল আর কোঁচের ঝরতি-পড়তি দিয়ে উদ্ভাবন করে নিলে এক খাটুলি, সব জড়ো করে দড়িদড়া দিয়ে শক্ত করে বেঁধে, যাতে, যতক্ষণ-না তারা উপকূলের পাহাড়ে পৌঁছোয়, লাশটার ওজন সামলাতে পারে। তারা চেয়েছিল এক মালের জাহাজের নোঙরও তার সঙ্গে বেঁধে দিতে, যাতে সে গহন ঢেউয়ে সহজেই ডুবে যেতে পারে, যেখানে, গভীরে, মাছেরা সব অন্ধ আর ডুবুরিরা মরে পিছুটানে, আর মন্দ চোরাটানগুলো যাতে তাকে আর ফিরিয়ে না-আনে বেলাভূমিতে, যেমন ঘটেছিল অন্য অনেক মৃতদেহের বেলায়। কিন্তু যতই তারা তাড়াহুড়ো করলে, ততই মেয়েরা সময় নষ্ট করার কৌশল বার করতে লাগলো। আঁতকে-ওঠা মুরগিদের মতো হাঁটছিল তারা, বুকের মধ্যে সমুদ্দুরের মাদুলি-তাবিজ ঠুকরে-ঠুকরে, কেউ তার কাঁধে সুবাতাসের অংসফলক বেঁধে দেবে বলে বাধা দিচ্ছে, অন্যপাশে কেউ তার মণিবন্ধে বেঁধে দিচ্ছে কব্জিদিগ্‌দর্শিকা, আর বহুৎ, ‘ওখান থেকে সরো তো মেয়ে, কই, দেখি, পথ থেকে সরো,’ ‘এই দ্যাখো, তুমি আমাকে এক্ষুনি লাশটার ওপর ফেলে দিচ্ছিলে,’ কথাবার্তার পর, পুরুষরা টের পেতে শুরু করলে নিজের জীবনেরই অবিশ্বাস অনাস্থা, আর ঘ্যান-ঘ্যান করতে শুরু করে দিলে অচেনা একটা লোকের জন্যে কেন এমন আদিখ্যেতা, কেন প্রধান বেদির এত-সব শোভাভূষণ, কারণ যত-খুশি ক্রুশের পেরেক বা দিব্য-জলের শিশিই তার সঙ্গে দেখা যাক-না কেন, হাঙররা তাকে একইভাবে চিবিয়ে খাবে। তবু মেয়েরা তার ওপর স্তূপ করেই চললো অর্থহীন সব প্রত্ননিদর্শন, সাধু-সন্তের নখ-চুল ইত্যাদি, ছুটলো বারে-বারে সামনে-পেছনে, টালমাটাল, থুবড়ে পড়তে-পড়তে, যখন চোখের জলে যা তারা প্রকাশ করেনি তা প্রকাশ করতে শুরু করলে ঘন-ঘন দীর্ঘশ্বাসে; শেষটায় পুরুষরা সব ফেটে পড়লো এই বলে ‘কবে থেকে, শুনি, ভেসে-যাওয়া কোনো মড়ার জন্যে কেউ এমন আদিখ্যেতা করেছে, জলে-ডোবা একটা কেউ-না, বুধবারের মাংসের একটা হিমঠাণ্ডা চাক আর-কিছুই সে নয়,’ তখন মেয়েদের একজন, এত অযত্নে মরমে মরে গিয়ে, মরা পুরুষটির মুখ থেকে একটানে খুলে দিলে রুমাল, আর পুরুষদেরও তার মুখ দেখে দম আটকে গেলো।

এ যে এস্তেবান। তাকে চেনবার জন্যে নামটা ফিরে আওড়াবারও দরকার নেই। যদি তাদের বলা হতো এ হলো সার ওয়ালটার র‍্যলে, তার গ্রিঙ্গো উচ্চারণের ঝোঁকে তাদের ওপর ছাপ ফেললেও ফেলতে পারতো, কাঁধে ল্যাজ ঝোলা সবুজ টিয়া, নরখাদক-মারা গাদাবন্দুক; কিন্তু জগতে শুধু একজনই এস্তেবান হতে পারে, আর এই-তো সে, হাত-পা ছড়িয়ে চিত পড়ে আছে তিমিঙ্গিলের মতো, পায়ে জুতো নেই, পরে আছে এক বাঁটকুল বাচ্চার পাতলুন, আর হাত-পায়ের পাথুরে ওইসব নখ যাকে কাটতে হলো একটা ছুরি দিয়ে। তার মুখ থেকে রুমালটা একবার সরাবামাত্র দেখা গেলো লজ্জায়শরমে সে গুটিয়ে আছে, এ-তো আর তার দোষ নয় যে সে এমন অতিকায়, কিংবা এত ভারী, কিংবা এত সুন্দর, আর যদি সে জানতো যে সে তা-ই হতে চলেছে তবে জলে ডুবে মরবার জন্যে সে নিশ্চয় আরো-দূর কোনো গহনগোপন জল বেছে নিতো, সত্যি, আমি হলে গলায় ঝুলিয়ে নিতাম এস্পানিয়ার বৃহৎ রণতরীর নোঙরটাই, আর টলতে টলতে আছড়ে পড়তাম কোনো সুদূর শৈলচূড়া থেকে সেই-তার মতো যে খামকা-খামকা ব্যস্তসমস্ত করে তুলতে চায় না লোকজনদের নিজের এই বুধবারের লাশটা দিয়ে, যেমন বাপু তোমরা বলো, কাউকে এই নোংরা ঠাণ্ডা মাংসের চাকটা দিয়ে বিরক্ত করতে চাই না বাপু — এই মাংসের টুকরোর সঙ্গে আমার কিন্তু কোনো সম্পর্কই নেই। তার ভাবেভঙ্গিতে এতটাই সত্য ছিল যে এমনকি সবচেয়ে অবিশ্বাসী সন্দেহপ্রবণ পুরুষও — সেই যারা সমুদ্রের মধ্যে অন্তবিহীন রাত্রির তিক্ততা টের পায় হাড়ে-হাড়ে যখন ভাবে যে তাদের স্ত্রীরা তাদের সম্বন্ধে স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে শেষটায় কোনো জলে-ডোবা পুরুষেরই স্বপ্ন দেখবে — এমনকি তারাও, আর অন্যরাও — যাদের বুক আরো ডাকাবুকো কঠিন — তারা শুদ্ধ তাদের অস্থির মধ্যে মজ্জায় মজ্জায় শিউরে-শিউরে উঠলো এস্তেবানের এই অকৃত্রিমতায়।

এমনি করেই তারা সবচেয়ে জমকালো সবচেয়ে চমত্কার সবচেয়ে আশ্চর্য এক অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থা করলে, যতটা তারা ভাবতে পারে ততটাই, আর তা কি না কোনো এক নিঃস্ব দুস্থ পরিত্যক্ত জলে-ডোবা পুরুষের জন্যে। কয়েকজন মেয়ে গেলো আশপাশের গ্রাম থেকে ফুল আনতে, ফিরে এলো আরো-অনেক মেয়ের সঙ্গে, যারা শুনেও বিশ্বাস করেনি তাদের কী বলা হলো, আর যখন তারা নিজের চোখে দেখলো মৃতদেহটা ফিরে গেলো আরো, আরো ফুল আনতে, আর তারা আনলো তো আনলোই, আরো আরো ফুল, কত-কত ফুল, শেষটায় সেখানে স্তূপ হয়ে রইলো এত ফুল আর জড়ো হয়ে গেলো এত লোকজন যে সেখানে এক-পা হাঁটাও মুশকিল হয়ে উঠলো। শেষ মুহূর্তে তাদের ভারি কষ্ট হলো তাকে অনাথের মতো জলে ফিরিয়ে দিতে, আর তারা সেরা লোকজনদের মধ্য থেকে তার জন্যে বেছে নিলে বাবা আর মা আর মাসি-পিসি, মামা-খুড়ো-তুতোভাই, তুতোবোন যে এর মারফতই গাঁয়ের সবাই হয়ে উঠলো একে-আরের আত্মীয়। কয়েকজন খালাসি যাঁরা দূর থেকে শুনলো কান্নার রোল, পথ ভুল করলো জাহাজের; আর লোকে শুনতে পেলো এমন একজনের কথা যে নিজেকে বড়ো মাস্তুলটায় বাঁধিয়ে নিয়ে মনে করলো প্রত্নপ্রাচীন মোহিনী মায়াবিনী সাইরেনদের কথা ও কাহিনী। কারা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যাবে সেই গৌরবের অধিকারের জন্যে যখন তারা হাতাহাতি করলে — তারা যাবে উপকূলের শৈলচূড়ার খাড়া গড়খাই বেয়ে — নারীপুরুষ সকলেই প্রথমবারের মতো সচেতন হয়ে পড়লো তাদের পথঘাটের ঊষর নিরানন্দ অবস্থার কথা, কেমন শুষ্ক খরখরে তাদের উঠোন, কতটা সংকীর্ণ তাদের স্বপ্ন, যখন তারা মুখোমুখি দাঁড়ালে তাদের জলে-ডোবা পুরুষটির সুঠামসৌষ্ঠব আর সৌন্দর্যের সামনে। তারা তাকে যেতে দিলে কোনো নোঙর ছাড়াই যাতে সে ফিরে আসতে পারে, আবার যদি তার ইচ্ছে করে, আর তারা সবাই শতাব্দীর একটা টুকরোর জন্যে শ্বাস রোধ করে রইলো যখন মৃতদেহ আছড়ে পড়লো পাতালের উদ্দেশে। পরস্পরের দিকে তাকাবারও কোনো দরকার হলো না তাদের এটা জানতে যে এখন আর তারা সকলে একসঙ্গে উপস্থিত নেই, যে তারা কখনোই আর সবাই মিলে একসঙ্গে উপস্থিত থাকবে না। কিন্তু তারা এও জেনে গেলো যে সবকিছুই এখন থেকে অন্যরকম হয়ে যাবে, যে তাদের বাড়িঘরে থাকবে প্রশস্ত সব দরোজা, উঁচু-উঁচু কড়িবরগা, শক্তপোক্ত মেঝে যাতে এস্তেবানের স্মৃতি যে-কোনোখানেই ঘুরে বেড়াতে পারে থামে-ছাতে ঘা না খেয়ে, যাতে কেউ পরে ফিসফিস করে বলতেও সাহস না-পায় যে মস্ত আপদটা অবশেষে টেঁশে গিয়েছে, খুবই খারাপ ব্যাপার, তবে সুপুরুষ হাঁদাটা অবশেষে মরেই গেলো, কারণ এখন তারা তাদের বাড়িঘর রঙ করে দেবে হাসিখুশির রঙে আর ছটায়, এস্তেবানের স্মৃতিকে শাশ্বত করে তোলবার জন্যে; আর তারা পাথর ফাটিয়ে জলের ফোয়ারা বার করে দেবার জন্যে অক্লান্ত খেটে-খেটে তাদের শিরদাঁড়া ভাঙবে, শৈলচূড়ায় রুইবে ফুলগাছ যাতে ভবিষ্যৎ বছরগুলোয় ঊষার সময় বড়ো-বড়ো যাত্রীজাহাজের লোকেরা বারদরিয়ায় জেগে যায় বাগানের ফুলের গন্ধে ঝিম ধরে গিয়ে আর কাপ্তেন নেমে আসে তার পোশাকি উর্দি গায়ে সাঁকো থেকে, তার নভশ্চরী, তার ধ্রুবতারা, উর্দিতে তার যুদ্ধপদকের সারি-সারি ভূষণ বসানো, দিগন্তের দিকে অন্তরীপের গোলাপি ভাঙা টুকরোটা দেখিয়ে কাপ্তেন বলে উঠবে চোদ্দটা ভাষায়, দ্যাখো-দ্যাখো, দ্যাখো ওখানে, যেখানে হাওয়া এখন এত শান্ত যে এ যেন ঊনপঞ্চাশ বিছানার তলায় ঘুমোতে গিয়েছে, ওই ওখানে, যেখানে রৌদ্র এত উজ্জ্বল যে সূর্যমুখীরা জানেই না কোনদিকে মুখ ফেরাবে, হ্যাঁ, ওই ওখানে, ওটা তো এস্তেবানের গ্রাম।

কায়েস আহমেদের সততা সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল - আখতারুজ্জামান ইলিয়াস


কায়েস আহমেদের সততা সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

কায়েস আহমেদের বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর হওয়ার আগেই তার রচনাসমগ্র প্রকাশের উদ্যোগে উৎসবের আভাস নেই, এই প্রকাশ বরং শোক উদযাপনের আয়ােজন; এখানেই তার লেখার সঙ্গে শেষ যোগাযোগ, তার আর নতুন লেখা পড়ার সম্ভাবনার ইতি ঘটলো এখানেই।

গত বছর (১৯৯২) ১৪ জুন তারিখে কায়েস আহমেদের মৃত্যু হয়েছে। জীবনের বিনাশ ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ও এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন নিজেই। মরবার পর কোনোকিছু করা আর কিছুতেই সম্ভব নয়, নইলে নিজের দাফনের কাজটিও কায়েস মনে হয় নিজে নিজেই করতেন। নিজের কোনো কাজে কারো ওপর নির্ভর করা তার ধাতে ছিলো না। সংকলন ও সম্পাদনা করে তাঁর লেখা-প্রকাশের দায়িত্ব আর কারো ওপর চাপানো কায়েসের পক্ষে অচিন্তনীয়। তাঁর প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ, বিরল সততা ও অসীম সাহসের পরিণতিতে আত্মহত্যা অনিবার্য কি-না এবং কাজটি তাঁর শিল্পচর্চার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ-এর জবাব খোজার জন্যে কায়েস আহমেদের শিল্পকর্ম পাঠকের মনোযোগ দাবি করে।

ঘনিষ্ঠ কারো মৃত্যুর কয়েক মাসের ভেতর তাঁর রচনার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা লেখা খুব ভোঁতা মানুষের জন্যেও সহজ কাজ নয়। তা অত নিরপেক্ষতার দরকারই-বা কী? তার আগ্রহী পাঠক হিসাবে কথা বলতে বলতে নিজের ভাবনার জটগুলো খোলার চেষ্টা করা এবং কায়েস সম্বন্ধে আর দশজনের ভাবনা একটু উসকিয়ে তোলা যায়।

কায়েস আহমেদ লিখতে শুরু করেন স্কুলে থাকতেই। ১৯৬৫ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজে এইচএসসি-র ছাত্র, তখন তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এর পরপরই কামাল বিন মাহতাবের সম্পাদনায় ‘ছোটগল্প' প্রকাশিত হলে এখানকার এই প্রথম ছোটগল্প-পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। নিজে গল্প লেখা ছাড়াও প্রতিষ্ঠিত তরুণ এবং সম্ভাবনাময় তরুণতরদের মূল্যায়ন ও পরিচিত করার জন্যে তিনি উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। লেখার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে স্বভাবের লোক ছিলেন, আবার পাঠকের মনোরঞ্জন সাধন তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো না; তাই প্রথম বই অন্ধ তীরন্দাজ প্রকাশের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত।

কায়েস আহমেদের সাহিত্যকর্মে তাঁর প্রকাশরীতি, পর্যবেক্ষণের ভঙ্গি ও অনুসন্ধানের পদ্ধতির বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু তার গল্পের মানুষদের সঙ্গে আমরা পরিচিত হই প্রথম বইতেই। মিলনের জন্যে কাতর বিচ্ছিন্ন মানুষের পাশাপাশি এখানে দেখি দমবন্ধ-করা বৃত্তের ভেতর বন্দি অসহায় চরিত্র। রেলে কাটা মানুষের ছিন্নভিন্ন শরীর দেখি প্রেমের প্রেক্ষাপটে। মিষ্টি স্বভাবের বৌ স্বামীর সঙ্গে বিছানায় শুয়ে মিলনের চরম মুহূর্তে স্বামীর বন্ধুকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারে না কিছুতেই। নস্টালজিয়ায় কাতর মানুষ, নিঃসঙ্গ মানুষ, ক্লান্ত মানুষ, স্মৃতির স্বাদে ও কষ্টে আচ্ছন্ন মানুষ—এরা সবাই তাঁর পরবর্তী রচনার সূচিপত্র।

আট বছর পর ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় কায়েসের প্রথম উপন্যাস নির্বাসিত একজন। কায়েসের প্রথম বইয়ের প্রায় সব লোকই এখানে কোনো-না-কোনোভাবে এসে হাজির হয়েছে, কিন্তু এর প্রেক্ষাপট সমস্ত দেশের সমাজ। দাঙা এই উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, দাঙাকে এই লেখার নায়ক বলেও চিহ্নিত করতে পারি। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার সঙ্গী দাঙার ফলে মানুষকে মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়, এই স্বাধীনতা তাই শুধু মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার অধিকার অর্জন। তার স্বাভাবিক জীবনের বিকাশ শােচনীয়ভাবে বিঘ্নিত। ক্ষোভ, অপমান ও গ্লানির ভেতর অহরহ যে-জীবন সে যাপন করে সেখানে এই উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষকে দিব্যি শনাক্ত করতে পারি। কিন্তু কাহিনীর শেষে এই প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব আড়ালে পড়ে যায় যখন লেখক প্রধান চরিত্রের ভেতর একটি সিদ্ধান্ত আরোপ করিয়ে দেন যা তার জীবনযাপন বা স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। এখানে কায়েস ঝুঁকে পড়েন নিটোল কাহিনী রচনা করার দিকে এবং এদিক থেকে তিনি গড়পড়তা উপন্যাসের রীতির কাছেই আত্মসমর্পণ করে বসেন। মনে হয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক কাহিনী-বর্ণনার প্রবণতা তাঁর পরবর্তী রচনায় অব্যাহত থাকবে এবং একজন জনপ্রিয় লেখক হিসাবে তিনি পাঠককে আঠার মতো সেঁটে রাখবেন এবং তাঁর উপন্যাস পাঠের পর পাঠক পরম তৃপ্তিতে গা এলিয়ে দেবেন।

সৌভাগ্যক্রমে কায়েস আহমেদের পরিণতি তা হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ উপন্যাস দিনযাপন পড়ে কায়েসের বিকাশ দেখে বিস্মিত হতে হয়। প্রথম বইতে মোটামুটি আয়ত্ত গল্প বলার রীতিটিকে তিনি এখানে এসে বর্জন করেছেন। প্রকরণের নতুনত্ব এখানে বড় কথা নয়, এই নতুন পথ অনুসরণের প্ররোচনা তিনি পান অনুসন্ধানের তীব্র স্পৃহা থেকে। ‘দিনযাপন’ কিন্তু কায়েস আহমেদের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, দুই উপন্যাসের মাঝখানে লেখা একটি গল্প ‘জগদ্দল’ তার সাক্ষী। একই বইয়ের ভেতর ‘জগদ্দল’-এর সহ-অবস্থানের কারণ কি কেবল রোগা বইটির শরীরে মাংস যোগ করা? না। এই রচনা দুটির মধ্যে প্রধান সম্পর্কটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বৈইকী!—একটিতে আমাদের ১ নম্বর স্বাধীনতা ও তার সঙ্গী দাঙার দক্ষযজ্ঞের ভয়াবহ বিবরণ এবং আরেকটিতে ২ নম্বর স্বাধীনতার পর তুমুল অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের ছবি। কিন্তু কি গল্প বলার রীতি, কি চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক, কি দৃষ্টিভঙ্গি—সব ব্যাপারেই দুটি লেখায় লেখকের ভিন্ন স্বভাবের পরিচয় পাই। | ‘জগদ্দল’ গল্পে কায়েস আহমেদের স্যাতসেঁতে প্রকাশ ঝরে পড়েছে। কোনো চরিত্রের প্রতি তরল ভালোবাসা নেই। যে-যুবসম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ নিজেদের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি নরখাদক সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছে, স্বাধীনতার পর দায়িত্বহীন রাষ্ট্রীয় শাসনের ফলে সেই যুবকদের মধ্যে প্রবলরকম অস্থিরতা, ক্ষোভ এবং এর পরিণামে চরম হতাশার সৃষ্টি হয় তাকে তেতো করে দেখানো হয়েছে এই গল্পে। ঐ সময়ের বাস্তবতা একটু রং পাল্টে কিন্তু এখনো অব্যাহত রয়েছে। এর ওপরকার দৃশ্যটি হলো লুটপাট, ছিনতাই, একবার উগ্র জাতীয়তাবাদী হুঙ্কার এবং আরেকবার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ঘেউঘেউ। কিন্তু ভেতরকার সত্যটি হলো এই যে, অনাচারের বিরুদ্ধে যাদের রুখে দাড়াবার কথা তারা নিদারুণভাবে পঙ্গু ও নপুংসক। | ‘জগদ্দল’-এর ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত দিনযাপন’-এর নায়ক। ঢাকা শহরের পুরনো এলাকায় একটি নড়বড়ে বাড়ির অধিবাসীরা হলো এর বিভিন্ন চরিত্র। তাদের সমস্যা ঠিক একরকমের না হলেও বড় করে দেখলে প্রায় একই ধরনের। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে এরা দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং এই কারণে এক ধরনের হীনম্মন্যতার শিকার। উপন্যাসের নায়ক হিসাবে বিশেষ একটি লোককে শনাক্ত করা যায় না। কোনো একক মানুষ কাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করা তত দূরের কথা, আলাদাভাবে চোখে পড়ার মতো ক্ষমতাও অর্জন করে না। এখানে সুস্থ জীবনযাপনের জন্যে উন্মুখ মানুষও আছে, কিন্তু সেই উন্মুখতা কখনো আকাঙ্ক্ষার পর্যায়ে ওঠে না বলে সেখানে কোনো সংকল্প নেই, তা শেষ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে লোভ হয়ে। পড়তে পড়তে পাঠক গ্লানিবোধ করতে পারেন, এখানেই কায়েসের সাফল্য। মধ্যবিত্ত, যে মানুষ নাম ধারণের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে---এই সত্যটিকে ঘােষণা করে পাঠককে অস্বস্তির মধ্যে ফেলার ভেতরই তার সার্থকতা।

ঐ সত্যটি কায়েস নিজেও উপভোগ করেন না। তাই গোটা উপন্যাসে তাঁর অস্থিরতা বড় প্রকট, মাঝে মাঝে প্রায় আপত্তিকর। নিজের উপলব্ধিকে জানাবার জন্যে তার তাড়াহুড়া ভাবটা চোখে খচখচ করে বেঁধে। একেকটি চরিত্রের স্কেচ এঁকেই তিনি মন দেন আরেকজনের দিকে, তাদের স্বাভাবিক বিকাশ দেখাবার জন্যে ধৈর্য ধরার মতো অবসর তিনি পান না।

অথচ তার সততা সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যে বিরল। এই সততার বলেই কাহিনীর নামে কেচ্ছা বয়ান করার লোভ থেকে তিনি বিরত থাকতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথম উপন্যাসে গল্প বলার যে-প্রবণতা তার মধ্যে পেয়ে বসেছিলো তা অব্যাহত থাকলে এখানে এসে পরিণতরূপ লাভ করতে পারত। এই বইতে যে-শক্তির পরিচয় পাই, তাতে নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, ঐ প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করলে মসৃণ ও গতানুগতিক কাহিনী ফেঁদে ব্যাপকসংখ্যক পাঠক এবং সমালোচকদের পৃষ্ঠপোষকতা তিনি লাভ করতেন। সহজ সাফল্যের ঐ নিরাপদ ও সুনিশ্চিত পথ পরিহার করতে পারাটাই তাঁর সততা ও শক্তির প্রকাশ। অনেক দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও কায়েস আহমদ নায়কবর্জিত, ছিমছাম গপ্পোমুক্ত একটি ভাষাচলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। সততা ও শক্তির অধিকারী বলেই জীবনের জয়গান করার জন্যে ইচ্ছাপূরণের নাবালক বাণী ছাড়ার পথ তিনি অনায়াসে পরিহার করতে পেরেছেন। আবার এরই মধ্যে দেখি, নড়বড়ে বাড়িটির আসন্ন মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের সাহায্যে।

কায়েস আহমেদের সর্বশেষ বই লাশকাটা ঘর একটি গল্পগ্রন্থ। এই বইতেই তার শক্তির সবচেয়ে পরিণত প্রকাশ ঘটেছে। মানুষের নানারকম বেদনা ও ফাপড়কে তিনি দেখতে পান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের অজস্র বিস্ফোরণ বলে। এখানে মানুষের কেবলই মার খাওয়ার অসহায় বেদনা নেই, রোগের চিকিৎসা করতে সংকল্পবদ্ধ মানুষকেও এখানে পাওয়া যায়। এমন সব হতাশ যুবকদের দেখি যাদের কাছে দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের স্বাধীনতা সমার্থক নয়। সামাজিক মূল্যবোধের নামে প্রচলিত সংস্কারকে ঝেড়ে ফেলে মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে হাতিয়ার তুলে নেয় নতুন যুবক। আবার এর ভেতরেই বেজে চলে তার নস্টালজিয়া, তবে নিজের স্মৃতিকে কেবল একটি ব্যক্তির কষ্টের মধ্যে না দেখে তিনি তা স্থাপন করেন মানুষের বেদনার পটভূমিতে। তার উপন্যাসের কোনো কোনো চরিত্র এখানে ফের হাজির হয়, তবে তাতে আমাদের একঘেয়ে লাগে না, বরং চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার উত্তাপ বোধ করি এবং ঐসব মানুষের গভীর ভেতর জগৎ আমাদের চোখে উন্মোচিত হয়। | ছোটোগল্পের প্রচলিত ও ধরাবাধা ছক তাঁর অনুসন্ধান প্রকাশের জন্যে যথেষ্ট বিবেচিত হয় না, প্রকরণ ভেঙে তিনি বেরিয়ে পড়েন নতুন ও অনিশ্চিত পথের দিকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভিটেমাটি খুঁজতে যাওয়ার একটি অভিযানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে একটি গল্পে, প্রথমে এটিকে একটি সাদামাটা প্রতিবেদন বলে ভুল হতে পারে । কিন্তু পড়তে পড়তেই কয়েকজন লোককে পেয়ে যাই যারা কেবল ঐ গ্রামের মানুষ নয়, নিরাপত্তার অভাব, গ্লানি ও অনিশ্চয়তা নিয়ে যারা দাবি করে গল্পের চরিত্রের মর্যাদা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষের ভিটে খোঁজ করতে গিয়ে লেখক এদের দেখেন এবং এদের আসন্ন-গৃহত্যাগের সম্ভাবনায় দেখতে পারেন নিজের ভিটেমাটি ত্যাগ করে আসার অভিজ্ঞতা। কিন্তু নিজে তিনি আড়ালেই রয়ে যান। এমনকি যেসব চরিত্র সৃষ্টি করেন তারাও কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকে না। দেশের রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি—সবকিছুর বিশ্লেষণ ধরা পড়ে তাদের তৎপরতা ও এমনকি কেবল নীরব অবস্থানের ভেতরেও। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কায়েসকে মুগ্ধ করেছেন বললে মোটেই ঠিক বলা হয় না, বরং তার অস্থিরতা এই শিল্পীর কল্যাণে রূপ পায় বাঁচার প্রেরণায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি পাঠ করেছিলেন সৃজনশীল পাঠকের উত্তেজনা ও উদ্বেগ নিয়ে। কেবল নিজে পড়ে ক্ষান্ত হননি, কোন লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কীভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাও দেখতে চেয়েছিলেন বলে তাঁর প্রিয় লেখকের ওপর একটি রচনা সংকলন সম্পাদনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, চিঠির পর চিঠি ও তাগাদার পর তাগাদা দিয়ে তাদের অনেকের লেখা জোগাড় করেন এবং নিজেও একটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় লেখার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এই কাজটি শেষ করার আগেই তিনি নিজেই শেষ হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

রথীন্দ্র ঘটক চৌধুরীকে নিয়ে লেখা তার বইটিকে কেবল একটি গবেষণা বই বললে সত্যের ধারেকাছেও যাওয়া যায় না। এই বইয়ের সব তথ্য তিনি সংগ্রহ করেছেন পরম নিষ্ঠার সঙ্গে, এজন্যে বিপুল পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু এই বস্তুনিষ্ঠ কাজের মধ্যে প্রবাহিত রয়েছে তার মানুষকে পর্যবেক্ষণ করার গভীর প্রবণতা। রথীন্দ্র ঘটক খুব পরিচিত লেখক নন বলেই কায়েস তাঁর গভীর সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বকে উপস্থিত করার কঠিন দায়িত্বটি গ্রহণ করেন।

গল্প-উপন্যাস লেখা, প্রিয় লেখকের ওপর প্রবন্ধের সংকলন সম্পাদনা, অপরিচিত লেখকের ভেতর সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বের উন্মোচন, অনিয়মিত হলেও সাময়িকীতে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা, সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকা——সবই তাঁর সৃজনশীল অনুসন্ধানের অবিচ্ছিন্ন অংশ।

এই শিল্পীর আত্মহত্যা কি কেবল আকস্মিকভাবে নিজেকে প্রত্যাহত করার স্পৃহার ফল? তার প্রিয় কবির সেই বহুপঠিত কবিতার লোকটি আর তিনি কি এক ব্যক্তি? মেনে নেওয়া মুশকিল।


কাল রাতে—ফাগুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হলো তার সাধ;
জীবনানন্দ দাশ আট বছর আগের একদিন

কিন্তু ফাগুনের তখনো ঢের বাকি। বসন্তকালের রাত্রির অন্ধকার নয়; তখন ঘােরল বিকাল, জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ দিন সেদিন যতক্ষণ পারে আকাশ জুড়ে চড়া রোদ ঝেড়েছে। ঈদের একদিন পর পবিত্র কোরবানির গোরুখাসির রক্ত দীননাথ সেন রোডের এখানে ওখানে শুখিয়ে কালচে হয়ে এসেছে, নিহত জীবজন্তুর নাড়িভুড়ি ছড়িয়ে রয়েছে গোটা সতীশ সরকার রোড় জুড়ে, তার গন্ধে দম-বন্ধ-করা গরম বাতাস। এরই মধ্যে তিনতলা বাড়ির ছাদে চিলেকোঠার ফ্ল্যাটে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়েন কায়েস আহমেদ। একটু-আগে-ডুবে-যাওয়া পঞ্চমীর চাঁদের স্মৃতিতে কোমল ও স্নিগ্ধ অন্ধকারে শেষনিশ্বাসটা টেনে নেওয়ার সুযোগ কায়েস আহমেদ নেননি। কোমল ও মিষ্টি, নিরাপদ ও অনায়াস, সরল ও স্নিগ্ধ কোনো ব্যাপারে কায়েস আহমেদ স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন না। নিজের তৈরি প্রকরণটিতে অভ্যস্ত হতে-না-হতে তিনি অন্য পথের সন্ধান করতেন। কায়েস আহমেদ সব সময়েই ছিলেন নতুন লেখক। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন নতুন লেখকের প্রেরণা ও কষ্ট এবং নতুন লেখকের উদ্বেগ ও অতৃপ্তি নিয়ে। মানুষের গভীর ভেতরটাকে খুঁজে দেখার জন্যেই একটির পর একটি রাস্তায় তাঁর ক্লান্তিহীন পদসঞ্চার। তাঁর পায়ের নিচে বিরতিহীন ভূমিকম্প, তাই তাঁর এই অবিরত ছুটে চলা। এইসব রাস্তাই তার পছন্দের। ধীর ও শান্ত, সন্তুষ্ট ও নিস্তরঙ্গ সমতল তাকে কখনোই কাছে টানতে পারে না।

ব্যক্তিগত জীবনেও কোনো ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকা তার ধাতে ছিলো না । প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ব্যাপারে জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক সম্মান শ্রেণীতে ঢুকেছিলেন ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষাগুলোতে খুব ভালো ফল করার আভাস দেখালেও, কিংবা হয়তো এই কারণেই, দ্বিতীয় বর্ষে উঠেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন পশ্চিমবাংলার হুগলি জেলার বড়তাজপুর গ্রামে, ঐ গ্রামের বিখ্যাত শেখ পরিবারের ছেলে। আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত, তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখতেন না।

তিনি উপার্জন করতে নামেন এসএসসি পাশ করার পরই, অল্প কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছিলেন, এরপর কেবল শিক্ষকতাই করেছেন। ঢাকার একটি প্রথম শ্রেণীর স্কুল তাকে যেচে চাকরি দেয়, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেখানেই কাজ করে গেছেন। ডিগ্রি ছিলো না বলে সেখানেও যে-কোনো মুহূর্তে কর্মচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। বন্ধুদের অনেক অনুরোধেও ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে বসেননি। মনে হয়, অনিশ্চিত অবস্থা তিনি ভালোবাসতেন।

১৯৬৯ সালে কায়েসের পিতা শেখ কামালউদ্দিন আহমদের মৃত্যু হয় তাদের গ্রামে। ঐ সময় গ্রামে যাবার জন্যে কায়েস একবার চেষ্টা করেছিলেন, পাসপোর্ট করতে গিয়ে দেখা গেলো যে, তিনি যে পাকিস্তানি নাগরিক তার কোনো প্রমাণ নেই ! ঝামেলা বাড়লো। গণ-আন্দোলনের ধাক্কা সামলাতে পুলিশ ব্যতিব্যস্ত ছিলো বলে কায়েসকে বিপদে ফেলার সময় পায়নি।

১৯৭১ সালে কায়েস আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে যান। এ-বছর অনেকটা সময় কাটিয়েছেন নিজের গ্রামে মা এবং ভাইয়ের সঙ্গে। মায়ের ভালোবাসায় বেশিদিন থাকা বোধহয় তার স্বভাবে কুলায়নি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ঢাকায় ফিরে এলেন, নিজের গ্রামে আর কোনোদিন ফিরে যাননি। বড়তাজপুর গ্রামে তাদের পুরনো নোনা-ধরা বাড়ির সামনে শেফালি গাছের নিচে মোড়ায় বসে ছেলের জন্যে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মায়ের চোখে ছানি পড়ে গেলো—এই ছবিটা ভেবে কায়েস অস্থির হয়ে পড়তেন। কিন্তু মায়ের আঁচলের নিচে কটা দিন থেকে দুই চোখ ভরে ঘুমিয়ে আসার ইচ্ছা করা তার স্বভাবের বাইরে। ভালোবেসে বিয়ে করলেন। আত্মবিশ্বাস ছিলো প্রবল, দৃঢ় ধারণা ছিলো যে প্রেম দিয়ে, যত্ন দিয়ে সেবা দিয়ে স্ত্রীর মানসিক রোগ সারিয়ে তুলতে পারবেন। প্রায় দশটি বছর একনিষ্ঠভাবে স্ত্রীর সেবা করে গেছেন, যত্ন করলেন তাঁকে মায়ের মতো, বাপের মতো চোখে-চোখে রাখলেন। কতরকম চিকিৎসা করলেন। কারো কাছে কোনো সাহায্য চাননি, কাউকে জানতেও দিতে চাননি নিজের সমস্যার কথা।

নিজের পর্যবেক্ষণ, ধারণা, আদর্শ, বিশ্বাস—এসবের কোনো সাহিত্যিক কি অসাহিত্যিক আলাদা চেহারা ছিলো না তার কাছে। কি লেখা, কি পেশা, কি গৃহ সব জায়গায় তিনি ছিলেন একজন অভিন্ন মানুষ। সাহিত্যচর্চা করে সামাজিক সুবিধা আদায়ের বিন্দুমাত্র চেষ্টাও কোনোদিন করেননি। এককালে সাংবাদিকতা করেছিলেন, সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যক্তিগত কাজে লাগানো তার রুচির বাইরে। তার মাপের লেখক বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাননি, আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে এই গ্লানি বহন করতে হবে সারাজীবন ধরে। আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন কেবল বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য সামান্য, লেখক শিবিরের সঙ্গে তিনি জড়িতও ছিলেন না কোনোদিন। কিন্তু সংগঠনটির প্রাতিষ্ঠানিকতা-বিরোধিতায় তার নিরঙ্কুশ আস্থা ছিলো বলেই পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। আবার প্রকাশকের তাগাদা সত্ত্বেও বিপুল অর্থমূল্যের পুরস্কারের জন্য বই জমা দিতে অস্বীকার করেছেন, কারণ পুরস্কার প্রদানকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতি ও তাঁর স্বভাব সম্পূর্ণভাবে পরস্পরবিরোধী। দারিদ্র্যপীড়িত লেখকের এই প্রত্যাখ্যান আমরা যেন ভুলে না যাই।

তিনি প্রত্যেকটি পদক্ষেপ ফেলেছেন নিজের সিদ্ধান্ত অনুসারে। ১৯৯২ সালের ১৪ জুন যে শেষ কাজটি করলেন তাও সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত অনুসারে। কারো কাছে অভিযোগ করেননি, কারো করুণা প্রার্থনা করেননি। মানুষকে জানবার জন্যে, মানুষকে অনুসন্ধান করার জন্যে, নিজেকে নিয়ে হলেও নিরীক্ষা করতে তাঁকে অনেক চড়া দাম দিতে হয়েছে। দারিদ্র্য, পারিবারিক দুর্যোগ, বিচ্ছিন্নতা, বিরামহীন উদ্বেগ—সবই বহন করতে হয়েছে একা। অনুসন্ধান হলো একই সঙ্গে তার প্রবণতা এবং দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফল যা পেয়েছেন তা তার জন্যে সুখের নয়, যা দেখেছেন তার অনেকটাই, বলতে গেলে বেশির ভাগই অনুমোদন করতে পারেননি। অনুসন্ধান তাই তার প্রতিবাদও বটে। প্রতিবাদ তো আর ইচ্ছাপূরণের আবদার নয়, মস্ত মস্ত কাঠের পুতুল বানিয়ে তার মাথায় সূর্যোদয়ের ছবি লেখার নাবালক তৎপরতা নয়, সমাজ ও মানুষের জটিলতা, এই জটিলতায় অসহায় ও ছোট-হয়ে-পড়া মানুষকে দেখা ও দেখানোই হলো তার প্রতিবাদ জ্ঞাপন। তাঁর স্বেচ্ছামৃত্যু কি তার অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার আর প্রতিবাদ জানাবার চরম সংকল্পের সোচ্চার প্রকাশ?

কায়েস আহমেদ রচনাসমগ্র
ভূমিকা
ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩

বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় পরিচয়ের সৃষ্টি | রেহমান সোবহান | অনুবাদ : আশফাক স্বপন

বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় পরিচয়ের সৃষ্টি
রেহমান সোবহান

অনুবাদ : আশফাক স্বপন

ছয় দফা কার্যক্রম

বাংলাদেশের জাতীয়তার অভ্যুদয় একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঘটে।হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং মওলানা ভাসানীর মতো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।তবে বাঙালিদের মধ্যে জাতীয় চেতনাসৃষ্টির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবার জন্য যে রাজনৈতিক উদ্যমের প্রয়োজন ছিল, সেটি বঙ্গবন্ধুর অবদান।১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচির সূচনা থেকে মার্চ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ – এই নিয়ামক দুটি বছরে অনন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ একটি নির্বাচনী অভিযানের মধ্য দিয়ে, বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার মাধ্যমে যে জাতীয় পরিচয় সৃষ্টি হয়, বঙ্গবন্ধু তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

পাকিস্তানের দুটি প্রদেশে সম্পূর্ণ স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ছয় দফা কার্যক্রম বাঙালিদের জন্য স্বতন্ত্র ভবিষ্যৎ রচনার সাংবিধানিক পূর্বশর্ত প্রদান করে।এই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে একজন বড় মাপের বাঙালি রাজনৈতিক নেতা স্বীকার করলেন যে বাংলাদেশের মানুষের জন্য, এমনকি একটি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনেও, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক সহাবস্থান রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং সেইসঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পদের কর্তৃত্ব – এই সব কিছুর ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ হলেই পাকিস্তানের দুটি প্রদেশ একটা রাষ্ট্রের অধীনে টিকে থাকতে পারে।পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা ত্যাগ করায় অনীহা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠল।ফলে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের গোড়ার দিকে ছয় দফা ঘোষণা করার সময় দেখা গেল যে শুধু ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোও সেটা প্রত্যাখ্যান করল, কারণ তারাও শাসকশ্রেণির অংশ। এই শাসকশ্রেণির দৃষ্টিতে ছয় দফার দাবির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) মানুষের স্বায়ত্তশাসনের দাবি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে গেল। ফলে ছয় দফা ঘিরে যে রাজনৈতিক আন্দোলন, তাকে দমন করবার প্রচেষ্টা এককভাবে বাঙালিদের ওপর এসে পড়ল। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বসহ বঙ্গবন্ধুকে ১৯৬৬ সালের জুন-জুলাই মাসে গ্রেপ্তার করা হলো, তাঁদের দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে কারারুদ্ধ রাখা হলো। অবশেষে পাকিস্তানের উভয় প্রদেশে রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহকর্মীরা মুক্তিলাভ করেন।

বর্ণবাদ প্রসঙ্গে: নীল ডিগ্রাসি টাইসন | অনুবাদ আশফাক স্বপন


বর্ণবাদ প্রসঙ্গে: নীল ডিগ্রাসি টাইসন 
অনুবাদ আশফাক স্বপন

বর্ণবাদী শাদাদের কালোদের প্রতি তাচ্ছিল্য, ক্ষোভ, ঘৃণা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মস্ত রাজনৈতিক পুঁজি। কালোদের কথা উঠলেই ওরা বলে: আরে দুরবস্থা হবে না কেন? লেখাপড়া করে না, ঠিকমত সংসার করে না, গণ্ডায় গণ্ডায় বাচ্চা পয়দা করে, ঠিকমত বাচ্চা মানুষ করে না, চুরি-চামারি, খুন-খারাপি করে। তারপর শুধু সরকারী সাহায্যের জন্য ঘ্যানর ঘ্যানর, নাহলে অত্যাচারের ইতিহাসের পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটে। অলস অপদার্থের দল! হ্যা, অতি লজ্জার কথা – অনেক বাঙালি অভিবাসীরাও একথা বলে।

আচ্ছা, ধরা যাক একজন কালো মানুষ সমাজের সব নিয়ম মেনে চলল। মধ্যবিত্ত ঘরে মানুষ হলো। প্রচণ্ড পরিশ্রমী, মেধাবী। এমনই মেধাবী যে সে আজ আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের অধ্যাপক। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ব্রতে এমনই সফল যে ঘরে ঘরে লোকে তার চেহারা টিভিতে দেখে। তার তো হেনস্তা হবার কথা নয়, তাই না?

কিন্তু সেও বর্ণবাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। বিশ্ববিখ্যাত মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানী প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নীল ডিগ্রাস টাইসন-এর কাছে শুনুন তার সারা জীবনের বিষময় অভিজ্ঞতার কথা।

(লেখাটা ভালো লাগলে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব Riton Khan-এর। ও-ই আমাকে ইংরেজি লেখাটা পাঠায়। অনুবাদের জন্য অষ্টপ্রহর ও আমার পেছনে চীনা জোকের মত লেগে থাকে।

আমার চামড়ার রঙ নিয়ে চিন্তাভাবনা
নীল ডিগ্রাস টাইসন
৩ জুন ২০২০
অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনার লিঙ্ক (ইংরেজি)

বহুদিন আগে পদার্থবিজ্ঞানের এক সম্মেলনে গিয়েছিলাম। সর্বশেষ নৈশভোজের পড়ে থাকা ওয়াইন পান করতে করতে আমরা গোটা বারোজন আলাদা একটা জটলায় বিজ্ঞানের খটোমটো অথচ মজার মজার ব্যাপার নিয়ে তর্ক শুরু করলাম। আচ্ছা, সুপারম্যানের পিঠে চাদর বাঁধতে হয় কেন? ডায়েট পেপসিভরা টিনের কৌটো পানিতে ভাসে, কিন্তু চিনিভরা পেপসির কৌটো ডোবে কেন? আচ্ছা, কল্পবিজ্ঞানের জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল স্টার ট্রেক (জ্যোতিষ্ক বিহার)-এ যে পরিবহকযন্ত্র মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহুদূর নিয়ে যায়, সেটা আসলে কীভাবে কাজ করে? সন্ধ্যা গড়াতে লাগল। গাড়ি দুর্ঘটনায় ভরবেগ প্রতিস্থাপনের আড্ডার ঠিক পরপরই আমাদের মধ্যে একজন গাড়ি চালাবার সময় তাকে পুলিশ ধরে কী করেছিল সেই ঘটনার উল্লেখ করল। পুলিশ তাকে তার স্পোর্টস গাড়ি থেকে নামার নির্দেশ দিয়ে, তার শরীর, গাড়ির ভেতর এবং জিনিসপত্র রাখার স্থান তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করল। তারপর মোটা অঙ্কের জরিমানা ধার্য করে তাকে বাড়ি পাঠাল। কী অপরাধে তাকে থামানো হয়েছিল? স্থানীয় গতিসীমার ২০ মাইলের বেশি দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছিল সে। অনেক চেষ্টা করেও আমরা তার জন্য তেমন একটা সমবেদনার উদ্রেক করতে পারলাম না।

সেই রাতে আমার সহকর্মী আইনরক্ষাকারী সংস্থার সাথে তার আরো মোলাকাতের গল্প করেছিল, তবে তার প্রথম গল্পটি আমাদের মধ্যে একটার পর একটা লাগাতার গল্পের ধারা শুরু করে দিল। একে একে আমরা সবাই পুলিশ আমাদের কখন কখন থামিয়েছে তার একাধিক ঘটনার কথা বলতে শুরু করলাম। কোন ঘটনাতেই যে খুব বলপ্রয়োগ করা হয়েছে বা জান নিয়ে টানাটানি পড়ে গেছে তা নয়, যদিও তার হাত ধরে একটু এগুলেই এমন বহুচর্চিত ঘটনায় আসা যায় যেখানে সত্যি জানমালের ক্ষতি হয়েছে। আমার এক সহকর্মীকে অতিরিক্ত আস্তে গাড়ি চালাবার জন্য আটকানো হয়েছিল। হেমন্তে নিউ ইংল্যান্ডের এক শহরে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সে ঘণ্টায় ৫ মাইল বেগে গাড়ি চালাচ্ছিল। আরেকজনকে পুলিশ বেশী তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাবার জন্য ধরেছিল। অবশ্য সে গতিসীমার চাইতে মাত্র ৫ মাইল বেশি বেগে চালাচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ কোন জরিমানা না করেই ছেড়ে দেয়। আরেকজন সহকর্মীকে গভীর রাতে জগিং করার জন্য পুলিশ থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

আমার নিজের বেলায় গোটা বারো এধরনের অভিজ্ঞতার রয়েছে। একবার নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যে একটা সেতুর তলা দিয়ে যাবার সময় পাশের লেইনে সঙ্কেত না দিয়ে যাবার জন্য আমাকে পুলিশ আটকায়। গাড়ির পেছনে দাড় করিয়ে, পুলিশের গাড়ির কড়া আলো আমার মুখে ফেলে আমাকে দশ মিনিট ধরে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। এটা আপনার গাড়ি? হ্যা। পাশে বসা মহিলাটি কে? আমার স্ত্রী। কোথার থেকে আসছেন? আমার বাবা-মার বাসা থেকে। কোথায় যাচ্ছেন? বাড়ি। কী করেন? আমি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানী। আপনার গাড়ির পেছনে কী আছে? একটা বাড়তি টায়ার, আর তেলচিটচিটে কিছু ফেলনা টুকিটাকি। পুলিশ আমায় বলল যে আমাকে আটকাবার ‘আসল কারণ’ আমার ১৭ বছর পুরনো ফোর্ড গাড়ির তুলনায় তার নম্বর প্লেটটা অনেক বেশি নতুন আর চকচকে। গাড়ি কিম্বা নম্বর প্লেট কোনটাই চোরাই নয় সেটা পুলিশ অফিসার নিশ্চিত করল আর কি।

অন্যান্য ঘটনার মধ্যে একবার স্নাতোকোত্তর কলেজের নতুন অফিসে বাড়ি থেকে পদার্থবিদ্যার পাঠ্যবই নেবার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ আমাকে আটকায়। পদার্থবিদ্যা ভবনের প্রবেশপথে আমাকে আটকে আমি এখানে কী করছি, এ নিয়ে নানান সন্দেহপূর্ণ প্রশ্ন করে। তখন রাত ১১:৩০। গাড়ির পেছনে খোলা বাক্সভর্তি স্নাতকোত্তর গণিত আর পদার্থবিদ্যার পাঠ্যবই। সেই বইগুলো আমি ভবনের ভেতর নিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, এইরকম একটা পরিস্থিতি কীভাবে পুলিশ প্রশিক্ষণের ভিডিওতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সম্ভব।

এই নিয়ে ঘণ্টা দুই আমাদের আড্ডা চলল। রাতে বিদায় নেবার আগে এই সব ঘটনায় কোন জায়গাটাতে মিল রয়েছে আমরা সেটার খোঁজ করলাম। আমরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের গাড়ি চালাই – কারোটা পুরনো, কারো নতুন, কারো অতি সাধারণ, কারও দামী বিদেশী গাড়ি। পুলিশ কখনো দিনে থামিয়েছে, কখনো রাতে। একটা একটা করে আইনের সাথে মোলাকাতের ঘটনা আলাদা করে বিবেচনা করলে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আধুনিক যুগে সবার জন্য নিরাপদ সমাজ নিশ্চিত করার জন্য আমাদের খানিকটা স্বাধীনতা তো ছাড়তে হবেই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে, আপনার এই ধারণা হবেই, যে পুলিশ পদার্থবিদদের ওপর একহাত নিতে বদ্ধপরিকর। কারণ আমাদের সবার মধ্যে ঐ একটা বিষয়েরই মিল। গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির এই গল্পগুলোতে একটা কথা পরিষ্কার – এগুলো হাল্কা মেজাজে চর্চিত অনন্য ঘটনা নয়। এধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। আমাদের প্রত্যেকের দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি – পিএইচ ডি – থাকা সত্ত্বেও এই সব উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানীর দল কি করে বারবার পুলিশি অনুসন্ধানের খপ্পরে পড়ছে? হয়তো আমাদের চামড়ার রঙ এর জন্য দায়ী। আমি যেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছি, সেটা জাতীয় কৃষ্ণাঙ্গ পদার্থবিদ সমিতির ২৩তম অধিবেশন। আমরা মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাবার দোষে দোষী নই। আমরা হয়তো বা এমন সব অপরাধে অভিযুক্ত, যে সব অপরাধ আমাদের জানামতে কোন দণ্ডবিধিতে নেই – যেমন কালো মানুষ হয়ে গাড়ি চালানো, বা কালো মানুষ হয়ে হাঁটা, এবং অবশ্যই, স্রেফ কালো মানুষ হওয়া।

আমাদের কাউকেই পিটিয়ে সংজ্ঞাহীন করা হয়নি। কাউকে গুলিবিদ্ধও করা হয়নি। তবে পুলিশের সাথে মোলাকাত কখন মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসে? গড়পরতায় আমেরিকায় পুলিশ প্রতিবছর ১০০জন নিরস্ত্র কালো মানুষ হত্যা করে। আমাদের চক্রে ওদের মধ্যে কে কে শরীক হতে ব্যর্থ হয়েছে? আমার তো গভীর সন্দেহ হয় আমাদের কয়েক ঘণ্টা যেই প্রসঙ্গ নিয়ে আড্ডা হলো এমনটা আর কোন নীতিনিষ্ঠ ভদ্র জনগোষ্ঠীতে অত্যন্ত বিরল।

আমি যখন এই প্রবন্ধটি লিখছি, তখন নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানে আমার জানালার সামনে দিয়ে মিছিলে ১০,০০০ আন্দোলনকারী শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ মুখর করে এগিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে লুটপাট হয়েছে, সেই সাথে কিছুটা সহিংসতার কারণে গত কয়েক দিনের রাত ১১টার বদলে সান্ধ্য আইন আজ রাত ৮টায় এগিয়ে আনা হয়েছে। মিছিলে সবচেয়ে বেশি যে পোস্টারটা দেখলাম সেটা হলো ‘কৃষ্ণপ্রাণ মূল্যবান’ (Black Lives Matter). অন্য পোস্টারে শুধুমাত্র জর্জ ফ্লয়েড-এর নাম। জর্জ ফ্লয়েডকে হাতকড়া পড়িয়ে মাথা নীচের দিকে দিয়ে মাটিতে শুইয়ে পুলিশ তার ঘাড় হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছিল। পুলিশ অফিসারটি তার শরীরের ওজনের অন্তত অর্ধেক ভার দিয়ে ঘাড় চেপে বসেছিল। ফলে তার মৃত্যু ঘটে। এ এক অদ্ভুত ভাগ্যের পরিহাস যে আমেরিকান ফুটবল তারকা কলিন কেপারনিকও মাটিতে হাঁটু চেপে বসেছিলেন, সেটা ফুটবল খেলা শুরু হবার আগে মার্কিন জাতীয় সঙ্গীত বাজবার সময়ে। সেটা ছিল পুলিশের হাতে কালো মানুষের ভয়াবহ দুর্গতির প্রতি সহমর্মিতা ও উদ্বেগ প্রকাশ। (একটি সংবাদ মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয় যে ও জাতীয় সঙ্গীতের প্রতিবাদ করছিল।) একটি জাতীয় সমস্যার প্রতি তার নিরব উদ্বেগের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের সারা খেলার মৌসুমে উত্তপ্ত ক্ষোভ প্রকাশিত হয়, ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে কোন দল তাকে চুক্তিবদ্ধ করতে অস্বীকার করায় ফুটবলার হিসেবে তার জীবিকা পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে হাঁটু গেড়ে বসার থেকে এখন ঘাড়ে হাঁটু গেড়ে খুন করায় পৌঁছেছি।

যেভাবে আমাদের শহরের রাজপথে রাজপথে বিষাক্ত পদার্থ, কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়ে, ধাক্কাধাক্কি ও ধ্বস্তাধ্বস্তি করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী ও সাংবাদিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়েছে (যেখানে পুলিশের উচিত ছিল যারা লুটপাট করছে তাদের ধরপাকড় করা), তাতে মনে হয় যেন আন্দোলনকারীরা এমন কিছু করছিল যেটা হয় বেআইনি অথবা আমেরিকা-বিরোধী। এ সম্বন্ধে আমাদের মার্কিন সংবিধানের কিছু বলবার আছে।

মার্কিন সংসদ এমন কোন আইন পাশ করবে না ... যাতে সংবাদ মাধ্যম, অথবা মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে একত্র হওয়া, বা সরকারের কাছে অভিযোগের প্রতিকারের জন্য আবেদন করা ... এসবের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়।

এটা কোন সংশোধনী? মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী। সুতরাং এদেশের যারা ভিত্তি স্থাপন করেছে, তাদের জোরালো অভিমত ছিল যে অভিযোগের প্রতিকারের জন্য প্রতিবাদ করার অধিকার দেওয়াটা অত্যন্ত আমেরিকান একটি কাজ। যদি আপনি পুলিশ হন, তাহলে এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখুন – যে দেশের সংবিধানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সমর্থন রয়েছে তা কি অত্যাশ্চর্য দেশ!

আমরা আমাদের পুলিশ অফিসারদের থেকে কী আশা করি? শান্তি রক্ষা করা আর খারাপ লোকগুলোকে ধরা, এই তো? সেই সাথে প্রয়োজনে মারণাস্ত্র প্রয়োগের ক্ষমতাও থাকবে। তার জন্য কখন ও কীভাবে সেটা প্রয়োগ করবে (বা করবে না) তার যথাযথ প্রশিক্ষণ আবশ্যক। মিনিয়াপোলিস পুলিশ একাডেমির ‘নিবিড়’ প্রশিক্ষণের সময়কাল মাত্র ছয় মাস।

অথচ কোন নামকরা রান্না শেখার স্কুলেও পেস্ট্রি বাবুর্চির সনদ পেতে আট মাস প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ক্রোয়াসো রুটি নিখুঁত বানাবার জন্য কোন ছাড় সম্ভব নয়। সুতরাং পুলিশ শিক্ষার্থীরা হয়ত অফিসার হবার আগে আরেকটুখানি বেশি সময় প্রশিক্ষণ পেলে লাভবান হবে।

১৯৯১ সালে লস এঞ্জেলেসের চারজন পুলিশ অফিসার ২৫ বছর বয়স্ক রডনি কিং-কে প্রথমে বিদ্যুতস্পৃষ্ট করে, তারপর মাটিতে শায়িত অবস্থায় পঞ্চাশ বারের বেশি লাঠি দিয়ে মারে। সেই ১৯৯০ দশকের ঝাপসা ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যে কোন দর্শক দেখে স্তম্ভিত, মর্মাহত হয়।

আমি কিন্তু বিন্দুমাত্র স্তম্ভিত হইনি।

আমার চারপাশের পৃথিবী সম্বন্ধে আমি যা জানি, তার ওপর নির্ভর করে প্রথম যে চিন্তাটা মাথায় এল তা হলো: ‘অবশেষে এসব ঘটনা একটা ভিডিওতে ধরা পড়েছে।’ তারপর ভাবলাম: ‘হয়ত এবার তাহলে এর একটা বিহিত হবে।’ হ্যা, ঠিক তাই ভেবেছি। কেন? সেই ছেলেবেলা থেকে প্রতি মাসে, কখনো প্রতি সপ্তাহে আমার আর আমার ভাইবোনদের বাবা-মা আমাদের পুলিশের গুলি এড়াবার জন্য কী করা আবশ্যক তার নিয়মকানুন শেখাতেন।

‘পুলিশ থামালে সে যেন সব সময় তোমার দুই হাত দেখতে পায়, সেটা নিশ্চিত করবে।’

‘হঠাৎ নড়াচড়া করবেনা।’

‘আগাম পুলিশকে না জানিয়ে কোন কিছু বের করার জন্য পকেটে হাত দেবে না।’

‘যদি নড়তেই হয়, আগে পুলিশকে বলে নেবে কী করছ।’

আমি তখন ইস্কুলে উদীয়মান বিজ্ঞানী, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে যত কিছু জানার আছে সব কিছু জানার চেষ্টায় মগ্ন। আমার গায়ের চামড়ার কী রঙ সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই – মহাবিশ্ব নিয়ে ভাবনার সময় সেটা খুব প্রাসঙ্গিক নয় কিনা। অথচ বাড়ির সদর দরজা পেরুলেই আমি সন্দেহভাজন, সম্ভাব্য অপরাধী। তার সাথে যুক্ত হয়েছে ইদানিং যাকে বলা হয় ‘শাদা মানুষের সন্দেহ’ – যেখানে নিরীহ কালো মানুষ কোন অপরাধ করছে এই সন্দেহে ভীত শাদা লোকে পুলিশ ডাকে। এত কাণ্ডের মধ্যে আমরা কীভাবে বিকশিত হই সে এক তাজ্জব ব্যাপার।

কী হারে এই হেনস্থা ঘটেছে? আমার সারাজীবন প্রতি সপ্তাহে এক থেকে পাঁচটি গাত্রবর্ণ সম্পর্কিত ঘটনা ঘটেছে। আমাদের এই সংগ্রামের কথা খোলাখুলিভাবে না হলেও নিশ্চয়ই মনে মনে শাদা মানুষ জানত। নাহলে কেন সেই কুখ্যাত বচন, ‘আমি মুক্ত, শাদা, এবং আমার বয়স ২১’ -এই কথাটার সৃষ্টি হয়েছে? পুরনো কত ছায়াছবিতে কথাটা ব্যবহৃত হয়েছে। কথাটা অত্যন্ত আপত্তিকর। কিন্তু আমেরিকায় কথাটা সত্যিও বটে। আজ ‘শাদা অগ্রাধিকার’-এর অপবাদ যতই অস্বীকার করা হোক না, ঐ সময় সেটা খোলাখুলিভাবে সগর্বে ঘোষণা করা হতো।

রডনি কিং-এর ঘটনার সাথে জড়িত লস এঞ্জেলেস-এর যে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়, সেটাকে অনেক সময় পুলিশের পিটুনির প্রতিক্রিয়া বলে ভাবা হয়। কিন্তু না। পিটুনির পর লস এঞ্জেলেস ১৩ মাস শান্ত ছিল। আদালতে ক্ষমতার অপব্যবহারের অপরাধ প্রমাণের জন্য ঐ ভিডিওটাই মোক্ষম প্রমাণ, এই ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত ছিল। আমিও ছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তো সেটা ঘটেনি। সেই পিটুনির ঘটনা নয়, বরঞ্চ সেই ঘটনায় জড়িত চারজন পুলিশের বেকসুর খালাস হওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসাবে দাঙ্গা বাঁধে। আসলে দাঙ্গা অসহায় হতাশার সর্বশেষ আর্তনাদ ছাড়া আর কি?

স্পাইক লি-এর ১৯৮৯ সালের ছবি ‘Do the Right Thing’ (‘ঠিক কাজটি করুন’) - এই ছবিতে নিউ ইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনে ১৯৮০-এর দশকে শাদা পুলিশ বনাম কালো মানুষের মধ্যে উত্তেজনা মূল বিষয়। ছবিটির শেষে ছয়জন মানুষের পরিবারের প্রতি ছবিটি উৎসর্গ করার কথা ঘোষিত হয়। এরা হল: এলেনর বাম্পার্স (৬৬ বছর), মাইকেল গ্রিফিথ (২৩ বছর), এডমান্ড পেরি (১৭ বছর), ইভন স্মলউড (২৮ বছর) ও মাইকেল স্টুয়ার্ট। সবাই কালো। একজনকে উন্মত্ত শাদা জনতা খুন করেছে। বাকিরা সবাই নিরস্ত্র ছিল। হয় পুলিশের গুলিতে নতুবা ওদের জিম্মায় মারা গিয়েছে। ছবিটি তৈরির আগে ১০ বছরের মধ্যে খোদ নিউ ইয়র্ক শহরেই এই সব মৃত্যু ঘটেছে। পুলিশি কারণে এই সব মৃত্যুর জন্য কেউ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়নি। পুলিশি হত্যার ৯৯% ক্ষেত্রে এই কথা সত্যি।

এই সব ঘটনা সম্বন্ধে আমরা জানতে পেরেছি কারণ প্রতিটি ঘটনার শেষে কারো মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু তারপরও সেই সময় এসব শুধুমাত্র স্থানীয় সংবাদ ছিল। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম: তাহলে কি এটা শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক শহরের সমস্যা? যে কোন স্থানে পুলিশের সাথে জড়িত কোন মৃত্যুর কত গুণ নিরস্ত্র মানুষকে পুলিশ গুলি করে কিন্তু তাদের মৃত্যু হয় না? অথবা অন্যায়ভাবে তারা আহত হয়, পঙ্গু হয়? এইসব ঘটনা তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদেও স্থান পায় না। তবে আপনি সেখানে থাকলে ঠিক জানতে পারতেন। আমরা সবাই জানতাম। কে জানে এই তথ্যের মূল্য কতটুকু, তবে মার্কিন দেশের সবচাইতে বড় ৬০টি শহরের মধ্যে নিউ ইয়র্ক শহরে জনপ্রতি পুলিশি হত্যার হার সব চাইতে কম। এ কি পুলিশ একাডেমিতে বাড়তি দুই মাস প্রশিক্ষণের ফল?

ভিডিও প্রমাণ সত্ত্বেও এই ধরনের ঘটনার ফলে আইন ব্যবস্থার ওপর আমাদের আস্থার অবক্ষয় ঘটতে ঘটতে তলানিতে এসে ঠেকেছে, আর সেই কারণেই প্রতিবাদের ৎসুনামিতে পৃথিবী কেঁপে উঠেছে। এই অন্যায়ের যারা শিকার, তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে মিছিলে মিছিলে নানা শহরের রাজপথ ভরে গিয়েছে। যেখানে এইরকম আচরণের জন্য কারাবাসের ঝুঁকি নেই – যা থাকলে হয়ত এসব ঠেকানো যেত – সেখানে নিজে নিজেই এইরকম আচরণ থামতে হবে।

কিছু সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পুলিশের হাতে নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি গাত্রবর্ণনির্বিশেষে সবার বেলাতেই মোটামুটি এক। বেশ। কিন্তু আপনার যে বর্ণ, সেই বর্ণের মানুষকে যদি পুলিশ ১০গুণ বেশি থামায়, তাহলে আপনার বর্ণের মানুষের মৃত্যুর হারও দশগুণ হবে। সুতরাং শাদা পক্ষপাতের দিকটাকে প্রথমে শূন্যের কোঠায় আনতে হব। তারপরও নিরস্ত্র মানুষকে – শাদা মানুষসহ - অপরাধী সন্দেহে পুলিশের হত্যার ব্যাপারটি রয়ে যায়।

আমি মেলা বকবক করি, নানা জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়াই। কিন্তু এই যে দুর্গম বাধার দুস্তরতম পথ পেরোতে গিয়ে কত অজস্র ঘটনার সাক্ষী হলাম, এসব নিয়ে তেমন মুখ খুলিনা। কেন? কারণ সারাজীবন এইসব ঘটনা আমি আরো সাফল্যের দিকে এগিয়ে চলার প্রেরণার উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছি। হ্যা, সমাজের প্রত্যাখ্যান – যা আজ ক্ষুদ্র আক্রমণ হিসেবে অভিহিত হবে - তাকে আমি অর্জনের চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছি। আমার বাবা ছিলেন ১৯৫০ আর ১৯৬০ দশকে কালোদের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী, তাঁর থেকেই এটা শিখেছি।

এক অর্থে আমি যে আজ যেখানে এসেছি, তার জন্য দায়ী অজস্র মানুষ, যারা তাদের আচরণ অথবা নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে আমাকে পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে আমি কোনদিন ঠিক এখানে এসে পৌঁছুতে পারবনা। কিন্তু আপনার যদি সেরকম মানসিক শক্তির উৎস না থাকে? তখন আপনার পরিণতি কি হবে? প্রান্তিক, ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠী – এদের মধ্যে নারী, সমকামী, শাদা ভিন্ন অন্য বর্ণের মানুষ রয়েছে - এদের মধ্যে এমন কত মানুষ আছে যারা অনুপ্রেরণার অভাবে হাল ছেড়ে দেবার ফলে সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছুতে পারেনি।

আজ কি সেদিনের চেয়ে অবস্থার উন্নতি হয়েছে? তা হয়েছে। তবে এই বিচারের মানদণ্ডটি একটু অদ্ভুত। কয়েক দশক আগে পুলিশ নিরস্ত্র কালো মানুষকে মারধর করলে বা মেরে ফেললে সেটা হত স্থানীয় সংবাদ। আজ দেশের যেখানেই এমন ঘটুক সেটা জাতীয় সংবাদ, এমনকি শীর্ষ সংবাদ হয়েছে।

এখন কথা হচ্ছে এই অবস্থা পরিবর্তনের উপায় কি? নানা সংগঠন নিশ্চিতভাবে পুলিশের সংস্কারের ব্যাপারে তাদের দাবি দাওয়া পেশ করবে। আমার নিজেরও একটা তালিকা আছে, যেটা বিশেষজ্ঞ নীতি-নির্ধারকদের বিবেচনার জন্য নিবেদন করছি।

পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলোতে কয়েক মাস শিক্ষার্থীদের বহুবর্ণের সমাজ সম্বন্ধে সচেতনতা, সংবেদনশীলতা ভালোভাবে শেখানো হোক – যাতে পুলিশ মারাত্মক শক্তি প্রয়োগ করা থেকে বিরত হতে শেখে।

প্রত্যেক পুলিশ অফিসারের চিন্তাভাবনায় ভেদবুদ্ধি বা পক্ষপাত আছে কিনা, সেটা পুলিশ একাডেমির গ্রহণযোগ্যতার ঘোষিত মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। একথা সত্যি আমাদের সবার কমবেশি পক্ষপাত রয়েছে। তবে আমাদের প্রায় কারোরই ওপর অন্য কারো বাঁচা-মরা নির্ভর করেনা।

প্রতিবাদের সময় জানমাল ও সম্পত্তি রক্ষা করুন। যদি আপনি অহিংস প্রতিবাদীদের আক্রমণ করেন, তাহলে আপনি মার্কিন মূল্যবোধের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। পুলিশ যদি প্রতিবাদকারীদের ধরপাকড় না করে যারা লুটপাট করে তাদের ধরত, তাহলে আর সান্ধ্য আইনের প্রয়োজন হতো না।

যদি সহকর্মী পুলিশ অফিসার অনৈতিক বা মাত্রাতিরিক্ত সহিংস আচরণ করে, আর আপনি তার প্রত্যক্ষদর্শী হন, অনুগ্রহ করে তাকে থামান। কেউ না কেউ এটার ভিডিও ধারণ করবে, এবং ফলে আপনারা যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম সেই বিষয়ে আমাদের বাকি সবার আস্থা সুদঢ় হবে। এই রকম পরিস্থিতিতে আপনারা পরস্পরকে কতটুকু রক্ষা করছেন তার চাইতে আপনাদের প্রতি আমাদের কতখানি আস্থা আছে সেটা সুশীল সমাজের কাছে বেশি জরুরি।

মিনিয়াপোলিস পুলিশ বিভাগের জন্য একটা অভূতপূর্ব পরামর্শ – দায়িত্বে থাকাকালীন মৃত্যু ঘটলে পুলিশকে যেমন আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিদায় জানান, জর্জ ফ্লয়েডকে সেভাবে বিদায় জানালে কেমন হয়? সেই সাথে শপথ নিন আর কখনো এইরকম মৃত্যু ঘটবে না।

আর সবার শেষে একটা কথা: যখন কালো কিশোরদের দেখেন, তাদের আপনি কী মনে করেন, সেটা না ভেবে তার বদলে তারা কী হতে পারে, সেই কথাটা একটু ভাবার চেষ্টা করুন।

বিনীত নিবেদন
নীল ডিগ্রাস টাইসন – এখনো আশাবাদী হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টায়
নিউ ইয়র্ক সিটি
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট