একটি ছাগলের গল্প - পেরুমাল মুরুগান | নিউ ইয়র্ক টাইমসের পুস্তক সমালোচনা | আনুবাদঃ আশফাক স্বপন


সাম্প্রতিককালে ভারতে মুক্তবুদ্ধিচর্চা নানাভাবে হিন্দুত্ববাদীদের গণরোষের শিকার হয়েছে, এবং সেটা নিয়ে সেদেশের বুদ্ধিজীবী ও লেখকরাও সোচ্চার হয়েছেন। তামিল লেখক পেরুমাল মুরুগান আক্রান্ত হন কয়েক বছর আগে। তার সাম্প্রতিক উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সেটা নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ পুস্তক সমালোচনা।
ভারতের অন্যতম শীর্ষ মৌলিক ও বিতর্কিত ঔপন্যাসিক ফিরলেন এক শক্তিশালী উপকথা নিয়ে।

পারুল সেহগাল
অনুবাদ: আশফাক স্বপন
মূল রচনা:
One of India’s Most Original and Controversial Novelists Returns with a Powerful Parable
By Parul Sehgal
The New York Times, Dec. 11, 2019

The Story of a Goat
By Perumal Murugan
Translated by N. Kalyan Raman
183 pages. Black Cat. $16, paper.

লিঙ্ক
https://www.nytimes.com/2019/12/11/books/review-story-of-goat-perumal-murugan.html

গত বছর স্টকহোমে নোবেল পুরস্কারের অভিভাষণে পোলিশ লেখিকা ওলগা তোকারচুক সাহিত্যজগতের প্রতি দৃষ্টিপাত করে হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন: সাহিত্যে যে শক্তি ও সম্ভাবনা নিহিত, সেটা আজ কোথায় গেছে? সাহিত্য তার আপন অধিকারবলে আমাদের আটপৌরে জীবন থেকে ঘাড় ধরে টেনে এনে চিরন্তন সত্যের মোকাবেলা করতে বাধ্য করে, আমাদের ইতিহাস ও পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত করে। কী হল সাহিত্যের সেই অধিকারের? তার পরিবর্তে আমরা স্মৃতিচারণ আর আত্মচরিতের কোলাহলে বুঁদ হয়ে গিয়েছি – এ যেন ‘একক শিল্পীদের নিয়ে গঠিত সম্মিলিত সঙ্গীত’। উপন্যাসে উপকথার ব্যবহার আজকাল লোপ পেতে বসেছে বলে তোকারচুক দুঃখ প্রকাশ করেন। সাহিত্য আমাদের এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারে যেখানে সুতীব্র মরমী দরদের সাহায্যে আত্মকেন্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার একটা সুযোগ আসে, তাতে আমাদের চারপাশের জগৎ সম্বন্ধে সংবেদনশীলতার পুনর্জাগরণ ঘটে। তারও আজ বড় ক্ষয়িষ্ণু রূপ দেখে তিনি আক্ষেপ করেন।

স্বীকার করতেই হবে অবস্থা যে এতটা খারাপ আমার ধারণা ছিলনা। তবে হতাশ হবেন না, ওলগা তোকারচুক। আমার হাতের কাছেই রয়েছে অব্যর্থ মহৌষধ। ‘The Story of a Goat’ (একটি ছাগলের গল্প) পেরুমাল মুরুগানের সদ্য অনূদিত উপন্যাস। ২০১৫ সালে তার বহুবিশ্রুত ‘সাহিত্যিক আত্মহত্যা’-এর পর এটি তার প্রথম কাজ। দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী গুণ্ডারা ‘One Part Woman’ (এক ভাগ নারী) বইটি লেখার কারণে তাকে আক্রমণ করে। সেই উপন্যাসে একটি সনাতন মন্দিরের আচারের বর্ণনা রয়েছে। তাতে নিঃসন্তান নারীদের সন্তানলাভের আশায় অপরিচিত পুরুষের সাথে সহবাসের অনুমোদন রয়েছে। মুরুগানকে তার গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হয়, জোরপূর্বক তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। তিনি লেখালেখি ছেড়ে দেন। ফেসবুকে তিনি পোস্ট দেন: ‘লেখক পেরুমাল মুরুগান মৃত। তাকে রেহাই দিন।‘

আদালতের রায়ে তাঁর বাকস্বাধীনতার অধিকার রক্ষিত হয়। মুরুগান আবার কাজে ফেরেন, যদিও বেশ বড় একটা ঝাঁকুনিতে তিনি মানসিকভাবে বেসামাল হন। তিনি বলেন মানুষের সম্বন্ধে লিখতে তার অনীহা জন্মেছে (‘আমার ভেতরে একজন রক্তচক্ষু সেন্সর বসে আছে’)। তার প্রিয় বিষয়গুলো – জাতপাতের রাজনীতি, ক্রোধোন্মাদ জনতার ভয়ঙ্কর শক্তি – সেসব নিয়ে লেখার তো প্রশ্নই ওঠেনা।

ভাগ্যিস ছাগল ছিল!

লেখক পেরুমাল মুরুগান বহাল তবিয়তে আছেন, বরাবরের মতই নির্ভীক। গ্রামীণ জীবনের আরেকটি উপকথা নিয়ে তিনি ফিরেছেন। তারঁ লেখনভঙ্গির আপাতসরলতা স্তম্ভিত করে। তামিল থেকে অনুবাদ করেছেন এন কল্যাণ রমণ। এই উপন্যাসে গাত্রবর্ণ আর জাতপাতের ভিত্তিতে অত্যাচার, সরকারী নজরদারী, নারীর লাঞ্ছনা – এই সব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, তবে সবটাই সুচতুরভাবে লুকানো হয়েছে একটি অসুখী ছোট্ট ছাগলের জীবনবৃত্তান্তের অভ্যন্তরে।
সমগ্র সাহিত্যে পুনাচির মত অভাগা জীব পাওয়া যাবে কিনা বলা ভার। সে তার মায়ের সপ্তম ও সবচেয়ে ছোট্ট সন্তান। মায়ের জরায়ু থেকে বেরিয়ে যখন সে ভূমিষ্ঠ হয়, তখন সে ফুলের মত ভঙ্গুর, বর্ণে নিকষ কালো।

এক বুড়ো চাষী ও তার স্ত্রী তার পালনের দায়িত্ব নেয়। তারা অবাক হয়ে লক্ষ করে, তাদের নিস্তরঙ্গ গৃহকোণ যেন নতুন ঊষ্ণতা আর প্রত্যয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লেখকের ভাষায়: ‘স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বহুদিন এত মধুর গল্পগুজব হয় নি। তাদের জীবনে ছোট্ট ছাগলের আবির্ভাবের ফলে তারা এখন পূরনো দিনের গল্প করে।’ তারা ছাগলটিকে খাইয়ে দাইয়ে নাদুস-নুদুস করে তুলল, তারপর নিজেদের ছাগলের পালের সাথে তাকে ভিড়িয়ে দিল। ছাগলটি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। সে সব কিছু খেয়াল করে, সহজে রাগে না। তার পেটটা নিয়ে সে সঙ্কোচ অনুভব করে। জীবনের শুরুতে ক্ষুধার কারণে তার পেটটা বড়। তার গায়ের লোমের জটা নিয়েও সে বিব্রত। ছোট বাচ্চার মত সে বুড়ো-বুড়িকে আকঁড়ে থাকে।

সাহিত্যে এর কৌলিন্য যাই থাক, জীবজন্তুর গল্পের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার সমালোচনা করবার এই পরম্পরাটি নিয়ে বরাবরই আমার সংশয়। ‘বাচ্চা ছাগল’ কথাটা আমার মগজে যেভাবে আঘাত করে তাতে আমি বেশ বিরক্ত হই। তবে কিনা মুরুগান কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত আপন পরিবারের ছাগলের দেখভাল করেছেন, তাই প্রাণীর জীবন (মৃত্যু, যৌন আকাঙ্ক্ষা, অসুয়া) নিয়ে তার লেখায় বিন্দুমাত্র অতিনাটকীয়তা নেই। তিনি এইসব প্রাণী দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। তিনি জানেন বাচ্চা ছাগল যখন প্রথম মাতৃস্তন্য থেকে দুগ্ধপান করে, তখন তার চোয়াল ব্যথা করে। রাতের অন্ধকারে কেউটে সাপের গা থেকে কী গন্ধ বের হয় সেটাও তিনি জানেন।

এক ধরনের পাঠক আছে যারা এই পুস্তক সমালোচনার এতখানি পড়বার পর খানিকটা অন্যমনস্ক, কিছুটা অস্বস্তিতে পড়বেন। ভাবেন, ঈশ এই ছোট্ট ছাগলের বাচ্চাটিকে কী অনেক কষ্টভোগ করানো হয়েছে? যদি খুব কষ্টভোগ করানো হয়ে থাকে, তাহলে কী দরকার এমন গল্প পড়ার? কেন দুঃখ-কষ্ট দেখার জন্য সাহিত্যের কাছে যাওয়া? এই প্রশ্নের উত্তর ‘একটি ছাগলের গল্প’ এতটা সৌকর্য, রসবোধ আর দরদের সাথে দিয়েছে যার তুলনা আমি নিকট অতীতের কোন বইয়ে পাইনি। আসলে আমরা এসব গল্পের কাছে যাই সততার মধ্য দিয়ে স্বস্তির অণ্বেষণে; যা লুকানো, সেটা আলোয় কীভাবে আসে সেটা দেখার জন্য। আমাদের আশেপাশে কত জীবন, সেসব এতই অকিঞ্চিতকর যে তা মহৎ সাহিত্যের বিষয়বস্তু হতে পারে না। সেইসব জীবন অহরহ বেদনায় জর্জরিত হচ্ছে, সেই সত্যটি – হয়ত শুধু এখানেই – স্বীকার করার জন্য আমরা এসব গল্পের কাছে ছুটে আসি।

ছোট্ট ছাগলটার কী কষ্টটাই না ভোগ করতে হয়! তার সঙ্গীদের যৌনক্ষমতা লাভ করতে না করতেই পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা হয়। সে প্রেমে পড়ে। (মুরুগান ছাগলের রতিক্রিয়ার একটি অস্বস্তিকর রকমের ভাল বর্ণনা দিয়েছেন।) বুড়ি চাষীবৌ কিছুতেই তার পোষা ছোট্ট ছাগলের সঙ্গ ছাড়বেন না, অথচ পুনাচিকে তার প্রিয়তম থেকে আলাদা করা হয়। সে তার মানুষ-মায়ের ওপর রাগে টগবগ করে। তাকে সহিংসভাবে সন্তানসম্ভবা করা হয়। এদিকে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

এই সমাজের নানান অদ্ভত লক্ষণ গল্পে প্রবেশ করতে শুরু করে। মানুষ বা জন্তু – প্রতিটি নতুন সন্তানের হিসেব রাখতে হয়, এবং তার কর্ণ সূচিবিদ্ধ করতে হয়। চাষা ও রাখালদের জন্তুর বাবা-মা কে এই বিষয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে যাদের কালো ছাগল রয়েছে। কালো ছাগলের প্রতি বিশেষ বিরাগ। ২০১৬ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটিতে ভবিষ্যতদ্রষ্টার সুর রয়েছে। ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইন অভিবাসীদের অধিকারদানের ক্ষেত্রে তাঁদের ধর্ম বিবেচনা করে, যা কার্যত দেশটিকে একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী দেশে পরিণত করেছে। এই উপন্যাসটি যেন আগে থেকেই সেটা আঁচ করতে পেরেছে।

চেকভের স্বচ্ছদৃষ্টি নিয়ে মুরুগান তার ছোট্ট ছাগলটির গোটা জীবন অনুসরণ করেন – তার হতাশা, তার ছোট ছোট বীরত্বের ঘটনা, তার আকুতি। রমণের সুষ্ঠু অনুবাদে প্রতিটি বাক্য আতিশয্যমুক্ত, সুগঠিত ও পরিষ্কার। কিন্তু এই আপাতসরল বাক্যগুলোর মধ্যে নিহিত রয়েছে বৃষ্টি, রাজনীতি, মানুষের আচরণ – এই সবকিছুর খামখেয়ালিপনা সম্বন্ধে এক গভীর প্রাজ্ঞ উপলব্ধি, সেটা আমরা কীভাবে যেন বুঝতে পারি। চেকভই তো একবার বলেছিলেন যে সক্রেটিসের জীবনী যে কেউ লিখতে পারে, কিন্তু এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অজ্ঞাতনামা মানুষ, এদের গল্প বলতে গেলে মুনশীয়ানা প্রয়োজন।

‘একবার, একটি গ্রামে, এক যে ছিল ছাগল।’ এভাবে বইটির শুরু। ‘সাধারণ একটি প্রাণির জন্ম কোন চিহ্ন রেখে যায় না, যায় কী?’ মুরুগান আমাদের কাছে এই সত্য প্রকাশ করেন যে আমরা সবাই এই রকম সাধারণ প্রাণী। যদিবা আমাদের কোন পলাতক চিহ্ন রয়েই যায়, সেটা আমরা একে অপরের কাছে সমর্পণ করে যাই।

Sultana’s Dream | সুলতানার স্বপ্ন

সুলতানার স্বপ্ন
বেগম রোকেয়া



(বর্তমান লেখিকার Sultana’s Dream গত ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে Indian Ladies Magazine-এ প্রকাশিত হইয়াছিল।)

একদা আমার শয়নকক্ষে আরামকেদারায় বসিয়া ভারত-ললনার জীবন সম্বন্ধে চিন্তা করিতেছিলাম–আমাদের দ্বারা কি দেশের কোনো ভালো কাজ হইতে পারে না?–এইসব ভাবিতেছিলাম। সে-সময় মেঘমুক্ত আকাশে শারদীয় পূর্ণিমার শশধর পূর্ণগৌরবে শোভমান ছিল; কোটি লক্ষ তারকা শশীকে বেষ্টন করিয়া হীরক-প্রভায় দেদীপ্যমান ছিল। মুক্ত বাতায়ন হইতে কৌমুদীস্নাত উদ্যানটি স্পষ্টই আমার দৃষ্টিগোচর হইতেছিল। এক-একবার মৃদুস্নিগ্ধ সমীরণ শেফালি-সৌরভ বহিয়া আনিয়া ঘরখানি আমোদিত করিয়া দিতেছিল। দেখিলাম, সুধাকরের পূর্ণকান্তি, সুমিষ্ট কুসুমের সুমিষ্ট সৌরভ, সমীরণের সুমন্দ হিল্লোল, রজতচন্দ্রিকা, ইহারা সকলে মিলিয়া আমার সাধের উদ্যানে এক অনির্বচণীয় স্বপ্নরাজ্য রচনা করিয়া ফেলিয়াছে। তদ্দর্শনে আমি আনন্দে আত্মহারা হইলাম, যেন জাগিয়াই স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম! ঠিক বলিতে পারি না আমি তন্দ্রাভিভূত হইয়াছিলাম কি না–কিন্তু যতদূর মনে পড়ে, আমার বিশ্বাস আমি জাগ্রত ছিলাম।

সহসা আমার পার্শ্বে একটি ইউরোপীয় রমণীকে দণ্ডায়মানা দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। তিনি কী প্রকারে আসিলেন, বুঝিতে পারিলাম না। তাঁহাকে আমার পরিচিতা ‘ভগিনী সারা’ (Sister Sara) বলিয়া বোধ হইল। ভগিনী সারা ‘সুপ্রভাত’ বলিয়া আমাকে অভিবাদন করিলেন! আমি মনে মনে হাসিলাম–এমন শুভ্র জোছনাপ্লাবিত রজনীতে তিনি বলিলেন, ‘সুপ্রভাত।’ তাঁহার দৃষ্টিশক্তি কেমন? যাহা হউক, প্রকাশ্যে আমি প্রত্যুত্তরে বলিলাম–

‘আপনি কেমন আছেন?’

‘আমি ভালো আছি, ধন্যবাদ। আপনি একবার আমাদের বাগানে বেড়াইতে আসিবেন কি?’

আমি মুক্তবাতায়ণ হইতে আবার পূর্ণিমাচন্দ্রের প্রতি চাহিলাম–ভাবিলাম, এ সময় যাইতে আপত্তি কী? চাকরেরা এখন গভীর নিদ্রামগ্ন; এই অবসরে ভগিনী সারার সমভিব্যাহারে বেড়াইয়া বেশ একটু আনন্দ উপভোগ করা যাইবে। দার্লিলিং অবস্থানকালে আমি সর্বদাই ভগিনী সারার সহিত ভ্রমণ করিতাম। কত দিন উদ্ভিদকাননে (বোটানিকাল গার্ডেনে) বেড়াইতে বেড়াইতে উভয়ে লতাপাতা সম্বন্ধে–ফুলের লিঙ্গ নির্ণয় সম্বন্ধে কত তর্কবিতর্ক করিয়াছি, সে-সব কথা মনে পড়িল। ভগিনী সারা সম্ভবত আমাকে তদ্রূপ কোনো উদ্যানে লইয়া যাইবার নিমিত্তে আসিয়াছেন; আমি বিনাবাক্যব্যয়ে তাঁহার সহিত বাহির হইলাম।

ভ্রমণকালে দেখি কী–এ তো সে জোছনাময়ী রজনী নহে!–এ যে দিব্য প্রভাত! নগরের লোকেরা জাগিয়া উঠিয়াছে, রাজপথে লোকে লোকারণ্য! কী বিপদ! আমি দিনের বেলায় এভাবে পথে বেড়াইতেছি! ইহা ভাবিয়া লজ্জায় জড়সড় হইলাম–যদিও পথে একজনও পুরুষ দেখিতে পাই নাই।

পথিকা স্ত্রীলোকেরা আমার দিকে চাহিয়া হাস্য পরিহাস করিতেছিল। তাহাদের ভাষা না বুঝিলেও ইহা স্পষ্ট বুঝিলাম যে, তাহাদের উপহাসের লক্ষ আমিই। সঙ্গিনীকে জিজ্ঞাসা করিলাম–

‘উহারা কি বলিতেছে?’ উত্তর পাইলাম,–“উহারা বলে যে, আপনি অনেকটা পুরুষ ভাবাপন্ন।

‘পুরুষভাবাপন্ন। ইহার মানে কি?’

‘ইহার অর্থ এই যে, আপনাকে পুরুষের মত ভীরু ও লজ্জানম্র দেখায়।’

‘পুরুষের মত লজ্জানম্র!’ এমন ঠাট্টা! এরূপ উপহাস ত কখন শুনি নাই। ক্রমে বুঝিতে পারিলাম, আমার সঙ্গিনী সে দার্জিলিংবাসিনী ভগিনী সারা নহেন–ইঁহাকে কখনও দেখি নাই! ওহো! আমি কেমন বোকা–একজন অপরিচিতার সহিত হঠাৎ চলিয়া আসিলাম। কেমন একটু বিস্ময়ে ও ভয়ে অভিভূত হইলাম। আমার সর্বাঙ্গে রোমাঞ্চিত ও ইষৎ কম্পিত হইল। তাঁহার হাত ধরিয়া চলিতেছিলাম কিনা, তিনি আমার হস্তকম্পন অনুভব করিয়া সস্নেহে বলিলেন–

‘আপনার কি হইয়াছে? আপনি কাঁপিতেছেন যে!’

এরূপে ধরা পড়ায় আমি লজ্জিত হইলাম। ইতস্তত করিয়া বলিলাম, ‘আমার কেমন একটু সংকোচ বোধ হইতেছে; আমরা পর্দানশীন স্ত্রীলোক, আমাদের বিনা অবগুন্ঠনে বাহির হইবার অভ্যাস নাই।’

‘আপনার ভয় নাই–এখানে আপনি কোন পুরুষের সম্মুখে পড়িবেন না। এ দেশের নাম ‘নারীস্থান’ (১) এখানে স্বয়ং পুণ্য নারীবেশে রাজত্ব করেন।’

ক্রমে নগরের দৃশ্যাবলী দেখিয়া আমি অন্যমনষ্ক হইলাম। বাস্তবিক পথের উভয় পাশ্বস্থিত দৃশ্য অতিশয় রমনীয় ছিল।

সুনীল অম্বর দর্শনে মনে হইল যেন ইতিপূর্বে আর কখন ও এত পরিষ্কার আকাশ দেখি নাই। একটি তৃণাচ্ছাদিত প্রান্তর দেখিয়া ভ্রম হইল, যেন হরিৎ মখমলের গালিচা পাতা রহিয়াছে। ভ্রমনকালে আমার বোধ হইতেছিল, যেন কোমল মসনদের উপর বেড়াইতেছি,-ভূমির দিকে দৃকপাত করিয়া দেখি, পথটি শৈবাল ও বিবিধ পুষ্পে আবৃত! আমি তখন সানন্দে বলিয়া উঠিলাম, ‘আহা! কি সুন্দর!

ভগিনী সারা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আপনি এ সব পছন্দ করেন কি?’ (আমি তাঁহাকে ‘ভগিনী সারা’ই বলিতে থাকিলাম এবং তিনিও আমার নাম ধরিয়া সম্বোধন করিতেছিলেন।)

‘হ্যাঁ এসব দেখিয়ে বড়ই চমৎকার। কিন্তু আমি এ সুকুমার কুসুমস্তবক পদদলিত করিতে চাই না।’

‘সেজন্য ভাবিবেন না, প্রিয় সুলতানা! আপনার পদস্পর্শে এ-ফুলের কোন ক্ষতি হইবে না। এগুলি বিশেষ এক জাতীয় ফুল ইহা রাজপথেই রোপন করা হয়।’

দুই ধারে পুষ্পচূড়াধারী পাদপশ্রেণী সহাস্যে শাখা দোলাইয়া দোলইয়া যেন আমার অভ্যর্থনা করিতেছিলাম। দূরাগত কেতকী-সৌরভে দিক পরিপূরিত ছিল। সে সৌন্দর্য ভাষায় ব্যক্ত করা দুঃসাধ্য–আমি মুগ্ধ নয়নে চাহিয়া দেখিতে দেখিতে বলিলাম, ‘সমস্ত নগরখানি একটি কুঞ্জভবনের মত দেখায়! যেন ইহা প্রকৃতিরানীর লীলাকানন! আপনাদের উদ্যান-রচনা-নৈপুণ্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’

‘ভারতবাসী ইচ্ছা করিলে কলিকাতাকে ইহা অপেক্ষা অধিক সুন্দর পুষ্পোদ্যানে পরিণত করিতে পারেন।’

‘তাঁহাদিগকে অনেক গুরুতর কার্য করিতে হয়, তাঁহারা কেবল পুষ্পবনের উন্নতিকল্পে অধিক সময় ব্যয় করা অনাবশ্যক মনে করিবেন।’

‘ইহা ছাড়া তাঁহারা আর কী বলিতে পারেন? জানেন তো অলসেরা অতিশয় বাক্‌পটু হয়!’

আমার বড় আশ্চর্যবোধ হইতেছিল যে, দেশের পুরুষেরা কোথায় থাকে? রাজপথে শতাধিক ললনা দেখিলাম, কিন্তু পুরুষ বলিতে একটি বালক পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হইল না। শেষে কৌতূহল গোপন করিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘পুরুষেরা কোথায়?’

উত্তর পাইলাম, ‘যেখানে তাহাদের থাকা উচিত সেইখানে, অর্থাৎ তাহাদের উপযুক্ত স্থানে।’

ভাবিলাম, তাহাদের ‘উপযুক্ত স্থান’ আবার কোথায়–আকাশে না পাতালে? পুনরায় বলিলাম, ‘মাফ করিবেন, আপনার কথা ভালোমতো বুঝিতে পারিলাম না। তাহাদের ‘উপযুক্ত স্থানের’ অর্থ কী?’

‘ওহো! আমার কী ভ্রম!–আপনি আমাদের নিয়মআচার জ্ঞাত নহেন, এ-কথা আমার মনেই ছিল না। এদেশে পুরুষজাতি গৃহাভ্যন্তরে অবরুদ্ধ থাকে।’

‘কী! যেমন আমরা অন্তঃপুরে থাকি, সেইরূপ তাঁহারাও থাকেন নাকি?’

‘হ্যাঁ, ঠিক তদ্রূপই।’

‘বাহ্‌! কী আশ্চর্য ব্যাপার!’ বলিয়া আমি উচ্চহাস্য করিলাম। ভগিনী সারাও হাসিলেন। আমি প্রাণে বড় আরাম পাইলাম;–পৃথিবীতে অন্তত এমন একটি দেশও আছে, যেখানে পুরুষজাতি অন্তঃপুরে অবরুদ্ধ থাকে! ইহা ভাবিয়া অনেকটা সান্ত্বনা অনুভব করা গেল!

তিনি বলিলেন, ‘ইহা কেমন অন্যায়, যে নিরীহ রমণী অন্তঃপুরে আবদ্ধ থাকে, আর পুরুষেরা মুক্ত, স্বাধীনতা ভোগ করে। কী বলেন, সুলতানা, আপনি ইহা অন্যায় মনে করেন না?’

আমি আজন্ম অন্তঃপুরবাসিনী, আমি এ-প্রথাকে অন্যায় মনে করিব কিরূপে? প্রকাশ্যে বলিলাম–‘অন্যায় কিসের? রমণী স্বভাবত দুর্বলা, তাহাদের পক্ষে অন্তঃপুরের বাহিরে থাকা নিরাপদ নহে।’

‘হ্যাঁ, নিরাপদ নহে ততদিন–যতদিন পুরুষজাতি বাহিরে থাকে। তা কোনো বন্য জন্তু কোনো একটা গ্রামে আসিয়া পড়িলেও তো সে গ্রামখানি নিরাপদ থাকে না। কি বলেন?’

‘তাহা ঠিক; হিংস্র জন্তুটা ধরা না-পড়া পর্যন্ত গ্রামটি নিরাপদ হইতে পারে না।’

‘মনে করুন, কতকগুলি পাগল যদি বাতুলাশ্রম হইতে বাহির হইয়া পড়ে, আর তাহার অশ্ব, গবাদি–এমনকি ভালো মানুষের প্রতিও নানাপ্রকার উপদ্রব উৎপীড়ন আরম্ভ করে, তবে ভারতবর্ষের লোকে কী করিবে?’

‘তবে তাহারা পাগলগুলিকে ধরিয়া পুনরায় বাতুলাগারে আবদ্ধ করিতে প্রয়াস পাইবে।’

‘বেশ! বুদ্ধিমান লোককে বাতুলালয়ে আবদ্ধ রাখিয়া দেশের সমস্ত পাগলকে মুক্তি দেওয়াটা বোধহয় আপনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন, না?’

‘অবশ্যই না! শান্তশিষ্ট লোককে বন্দি করিয়া পাগলকে মুক্তি দিবে কে?’

‘কিন্তু কার্যত আপনাদের দেশে আমরা ইহাই দেখিতে পাই! পুরুষেরা ____ করে, নানা প্রকার দুষ্টামি করে, বা অন্তত করিতে সক্ষম, তাহারা দিব্য স্বাধীনতা ভোগ করে, আর নিরীহ কোমলাঙ্গী অবলারা বন্দিনী থাকে। আপনারা কিরূপে তাহাদিগকে মুক্তি দিয়া নিশ্চিন্ত থাকেন?’

‘জানেন, ভগিনী সারা! সামাজিক বিধিব্যবস্থার উপর আমাদের কোনো হাত নাই। ভারতে পুরুষজাতি প্রভু–তাহারা সমুদয় সুখসুবিধা ও প্রভূত্ব আপনাদের জন্য হস্তগত করিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর রূপ পিঞ্জরে রাখিয়াছে! উড়িতে শিখিবার পূর্বেই আমাদের ডানা কাটিয়া দেওয়া হয়–তদ্ব্যতীত সামাজিক রীতিনীতির কতশত কঠিন শৃঙ্খল পদে পদে জড়াইয়া আছে।’

‘তাই তো! আমার বলিতে ইচ্ছা হয়–‘দোষ কার, বন্দী হয় কে!’ কিন্তু বলি, আপনারা ওসব নিগড় পরেন কেন?’

‘না পরিয়া করি কী? জোর যার মুলুক তার’; যাহার বল বেশি, সেই স্বামিত্ব করিবে–ইহা অনিবার্য।’

‘কেবল শারীরিক বল বেশি হইলেই কেহ প্রভুত্ব করিবে, ইহা আমরা স্বীকার করি না। সিংহ কি বলেবিক্রমে মানবাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নহে? তাই বলিয়া কি কেশবী মানবজাতির উপর প্রভুত্ব করিবে? আপনাদের কর্তব্যের ত্রুটি হইয়াছে, সন্দেহ নাই। আপনারা সমাজের উপর কর্তৃত্ব ছাড়িয়া একাধারে নিজের প্রতি অত্যাচার এবং স্বদেশের অনিষ্ট দুই-ই করিয়াছেন। আপনাদের কল্যাণে সমাজ আরও উন্নত হইত–আপনাদের সাহায্য অভাবে সমাজ অর্ধেক শক্তি হারাইয়া দুর্বল ও অবনত হইয়া পড়িয়াছে।’

‘শুনুন ভগিনী সারা! যদি আমরাই সংসারের সমুদয় কার্য করি, তবে পুরুষেরা কী করিবে?’

‘তাহারা কিছুই করিবে না–তাহারা কোনো ভালো কাজের উপযুক্ত নহে। তাহাদিগকে ধরিয়া অন্তঃপুরে বন্দি করিয়া রাখুন।’

‘কিন্তু ক্ষমতাশালী নরবরদিগকে চতুষ্প্রাচীরের অভ্যন্তরে বন্দি করা কি সম্ভব, না সহজ ব্যাপার? আর তাহা যদিই সাধিত হয়, তবে দেশের যাবতীয় কার্য যথা রাজকার্য, বাণিজ্য ইত্যাদি সকল কাজই অন্তঃপুরে আশ্রয় গ্রহণ করিবে যে!’

এবার ভগিনী সারা কিছু উত্তর দিলেন না, সম্ভবত আমার ন্যায় অজ্ঞান তমসাচ্ছন্ন অবলার সহিত তর্ক করা তিনি অনাবশ্যক মনে করিলেন।

ক্রমে আমার ভগিনী সারা গৃহতোরণে উপনীত হইলাম। দেখিলাম, বাড়িখানি একটি বৃহৎ হৃদয়াকৃতি উদ্যানের মধ্যস্থলে অবস্থিত। এ ভাবটি কী চমৎকার!–ধরিত্রী জননীর হৃদয়ে মানবের বাসভবন। বাড়ি বলিতে একটি টিনের বাঙ্গালা মাত্র; কিন্তু সৌন্দর্যে ও নৈপূন্যে ইহার নিকট আমাদের দেশের বড় বড় রাজপ্রসাদ পরাজিত। সাজসজ্জা কেমন নয়নাভিরাম ছিল; তাহা ভাষায় বর্ণনীয় নহে–তাহা কেবল দেখিবার জিনিস।

আমরা উভয়ে পাশাপাশি উপবেশন করিলাম। তিনি সেলাই করিতে আরম্ভ করিলেন; একটি খঞ্চিপোষে রেশমের কাজ করা হইতেছিল। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমিও সেলাই জানি কি না। আমি বলিলাম,–

‘আমরা অন্তপুরে থাকি, সেলাই ব্যতীত অন্য কাজ জানি না।’

‘কিন্তু এদেশের অন্তঃপুরবাসীদের হাতে আমরা কারচোবের কাজ দিয়া বিশ্বাস করিতে পারি না।’ এই বলিয়া তিনি হাসিলেন, ‘পুরুষদের এতখানি সহিষ্ণুতা কই, যে তাহারা ধৈর্যের সহিত ছুঁচে সুতা পরাইবে?’

তাহা শুনিয়া আমি বলিলাম, ‘তবে কি কারচোবের কাজগুলি সব আপনিই করিয়াছেন?’ তাঁহার ঘরে বিবিধ ত্রিপদীর উপর নানাপ্রকার সলমা চুমকির কারুকার্যখচিত বস্ত্রাবরণ ছিল।

তিনি বলিলেন, ‘হাঁ, এ-সব আমারই স্বহস্ত প্রস্তুত।’

‘আপনি কিরূপে সময় পান? আপনাকে তো অফিসের কাজও করিতে হয়, না? কি বলেন?’

‘হাঁ। তা আমি সমস্তদিন রসায়নাগারে আবদ্ধ থাকি না। আমি দুই ঘণ্টায় দৈনিক কর্তব্য শেষ করি।’

‘দুই ঘণ্টায়! আপনি এ কী বলেন?–দুই ঘণ্টায় আপনার কার্য শেষ হয়! আমাদের দেশে রাজকর্মচারীগণ–যেমন মাজিস্ট্রেট, মুন্সেফ, জজ প্রমুখ প্রতিদিন ৭ ঘণ্টা কাজ করিয়া থাকেন।’

‘আমি ভারতের রাজপুরুষদের কার্যপ্রণালী দেখিয়াছি। আপনি কি মনে করেন যে, তাহারা সাত-আট ঘণ্টাকাল অনবরত কাজ করেন?’

‘নিশ্চয়, বরং এতদপেক্ষা অধিক পরিশ্রমই করেন।’

‘না প্রিয় সুলতানা। ইহা আপনার ভ্রম। তাঁহারা অলসভাবে বেত্রাসনে বসিয়া ধূমপানে সময় অতিবাহিত করেন। কেহ আবার অফিসে থাকিয়া ক্রমাগত দুই-তিনটি চুরুট ধ্বংস করেন। তাঁহারা মুখে যত বলেন, কার্যত তত করেন না। রাজপুরুষেরা যদি কিছু করেন, তাহা এই যে, কেবল তাঁহাদের নিম্নতম কর্মচারীদের ছিদ্রান্বেষণ। মনে করুন একটি চুরুট ভস্মীভূত হইতে অর্ধঘণ্টা সময় লাগে, আর কেহ দৈনিক ১২টি চুরুট ধ্বংস করেন, তবে সে ভদ্রলোকটি প্রতিদিন ধূমপানে মাত্র ছয় ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন।’

তাই তো। অথচ ভ্রাতৃমহোদয়গণ জীবিকা অর্জন করেন, এই অহঙ্কারেই বাঁচেন না। ভগিনী সারা সহিত বিবিধ প্রসঙ্গ হইল। শুনিলাম, তাঁহাদের নারীস্থান কখনো মহামারী রোগে আক্রান্ত হয় না। আর তাঁহারা আমাদের ন্যায় হুলধর মশার দংশনেও অধীর হন না! বিশেষ একটি কথা শুনিয়া আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম–নারীস্থানে নাকি কাহারও অকাল-মৃত্যু হয় না। তবে বিশেষ কোনো দুর্ঘটনা হইলে লোকে অপ্রাপ্ত বয়সে মরে, সে স্বতন্ত্র কথা। ভগিনী সারা আবার হিন্দুস্থানের অসংখ্য শিশুর মৃত্যু সংবাদে অবাক হইলেন! তাঁহার মতে যেন এই ঘটনা সর্বাপেক্ষা অসম্ভব! তিনি বলিলেন, যে প্রদীপ সবেমাত্র তৈল সলিতা যোগে জ্বলিতে আরম্ভ করিয়াছে, সে কেন (তৈল বর্তমানে) নির্বাপিত হইবে। যে নব কিশলয় সবেমাত্র অঙ্কুরিত হইয়াছে, সে কেন পূর্ণতা প্রাপ্তির পূর্বে ঝরিবে!

ভারতের প্লেগ সম্বন্ধেও অনেক কথা হইল, তিনি বলিলেন, ‘প্লেগ-টেলেগ কিছুই নহে–কেবল দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত লোকেরা নানা রগের আধার হইয়া পড়ে। একটু অনুধাবন করিলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, গ্রাম অপেক্ষা নগরে প্লেগ বেশি–নগরের ধনী অপেক্ষা নির্ধনের ঘরে প্লেগ বেশি হয় এবং প্লেগে দরিদ্র পুরুষ অপেক্ষা দরিদ্র রমনী অধিক মারা যায়। সুতরাং বেশ বুঝা যায়, প্লেগের মূল কোথায়–মূল কারণ ঐ অন্নাভাব। আমাদের এখানে প্লেগ বা ম্যালেরিয়া আসুক তো দেখি!’

তাই তো, ধনধান্যপূর্ণা নারীস্থানে ম্যালেরিয়া কিংবা প্লেগের অত্যাচার হইবে কেন, প্লীহা-স্ফীত উদর ম্যালেরিয়াক্লিষ্ট বাঙ্গালায় দরিদ্রদিগের অবস্থা স্মরন করিয়া আমি নীরবে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিলাম।

অতঃপর তিনি আমাকে তাঁহাদের রন্ধনশালা দেখাইবার জন্য লইয়া গেলেন। অবশ্য যথাবিধি পরদা করিয়া যাওয়া হইয়াছিল! একি রন্ধনগৃহ, না নন্দনকানন! রন্ধনশালার চতুর্দিকে সবজিবাগান এবং নানাপ্রকার তরিতরকারির লতাগুল্মো পরিপূর্ণ; ঘরের ভিতর ধূম বা ইন্ধনের কোনো চিহ্ন নাই–মেজেখানি অমল ধবল মর্মর প্রস্তর নির্মিত; মুক্ত বাতায়নগুলি সদ্যপ্রস্ফুটিত পুষ্পদামে সুসজ্জিত। আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিলাম–

‘আপনারা রাঁধেন কিরূপে? কোথাও তো অগ্নি জ্বালিবার স্থান দেখিতেছি না।’

তিনি বলিলেন, ‘সূর্যোত্তাপে রান্না হয়।’ অতঃপর কীপ্রকারে সৌরকর একটি নলের ভিতর দিয়া আইছে, সেই নলটা তিনি আমাকে দেখিইলেন। কেবল ইহাই নহে, তিনি তৎক্ষণাৎ একপাত্র ব্যঞ্জন (যাহা পূর্ব হইতে তথায় রন্ধনের নিমিত্ত প্রস্তুত ছিল) রাঁধিয়া আমাকে সেই অদ্ভুত রন্ধনপ্রণালী দেখাইলেন।

আমি কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘আপনারা সৌরোত্তাপ সংগ্রহ করেন কী প্রকারে?’

ভগিনী বলিলেন, ‘কিরূপে সৌরকর আমাদের করায়ত্ত হইয়াছে, তাহার ইতিহাস শুনিবেন? ত্রিশ বৎসর পূর্বে যখন আমাদের বর্তমান মহারানি সিংহাসনপ্রাপ্ত হন, তখন তিনি ত্রয়োদশ বর্ষীয়া বালিকা ছিলেন। তিনি নামত রানি ছিলেন, প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য-শাসন করিতেন।

‘মহারানি বাল্যকাল হইতেই বিজ্ঞানচর্চা করিতে ভালোবাসিতেন। সাধারণ রাজকন্যাদের ন্যায় তিনি বৃথা সময় যাপন করিতেন না। একদিন তাঁহার খেয়াল হইল যে, তাঁহার রাজ্যের সমুদয় স্ত্রীলোকই সুশিক্ষাপ্রাপ্ত হউক। মহারানির খেয়াল–সে খেয়াল তৎক্ষণাৎ কার্যে পরিণত হইল! অচিরে গভর্মেন্ট পক্ষ হইতে অসংখ্য বালিকা স্কুল স্থাপিত হইত। এমনকি পল্লিগ্রামেও উচ্চশিক্ষার অমিয় স্রোত-প্রবাহিত হইল। শিক্ষার বিমল জ্যোতিতে কুসংস্কাররূপ অন্ধকার তিরোহিত হইতে লাগিল, এবং বাল্যবিবাহ প্রথাও রহিত হইল। একুশ বৎসর বয়ঃক্রমের পূর্বে কোনো কন্যার বিবাহ হইতে পারিবে না–এই আইন হইল। আর এক-কথা–এই পরিবর্তনের পূর্বে আমরাও আপনাদের মতো কঠোর অবরোধে বন্দিনী থাকিতাম।’

‘এখন কিন্তু বিপরীত অবস্থা!’ এই বলিয়া আমি হাসিলাম।

‘কিন্তু স্ত্রীলোক ও পুরুষের মধ্যে ব্যবধান সেই প্রকারই আছে! কতদিন তাহারা বাহিরে, আমরা ঘরে ছিলাম; এখন তাঁহারা ঘরে, আমরা বাহিরে আছি! পরিবর্তন প্রকৃতিরই নিয়ম! কয়েব বৎসরের মধ্যে আমাদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হইল; তথায় বালকদের প্রবেশ নিষেধ ছিল।

‘আমাদের পৃষ্ঠপোষিকা স্বয়ং মহারানি–আর কি কোনো অভাব থাকিতে পারে? অবলাগণ অত্যন্ত নিবিষ্টচিত্তে বিজ্ঞান আলোচনা আরম্ভ করিলেন। এই সময় রাজধানীর ___ বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলা প্রিন্সিপ্যাল একটি অভিনব বেলুন নির্মাণ করিলেন, এই বেলুনে কতকগুলি নল সংযোগ করা হইল। বেলুনটি শূন্যে মেঘের উপর স্থাপন করা গেল–বায়ুর আর্দ্রতা ঐ বেলুনে সংগ্রহ করিবে উপায় ছিল–এইরূপে জলধরকে ফাঁকি দিয়া তাঁহার বৃষ্টিজল করায়ত্ত করিলেন। বিদ্যালয়ের লোকেরা সর্বদা ওই বেলুনের সাহায্যে জলগ্রহণ করিত কি না, তাই আর মেঘমালায় আকাশ আচ্ছন্ন হইতে পারিত না। এই অদ্ভুত উপায়ে বুদ্ধিমতী লেডি প্রিন্সিপ্যাল প্রাকৃতিক ঝড়বৃষ্টি নিবারণ করিলেন।’

‘বটে? তাই আপনাদের এখানে পথে কর্দম দেখিলাম না।’ কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝিতে পারিলাম না–নলের ভিতর বায়ুর আর্দ্রতা কিরূপে আবদ্ধ থাকতে পারে; আর ঐরূপে বায়ু হইতে জল সংগ্রহ করাই বা কিরূপে সম্ভব। তিনি আমাকে ইহা বুঝাইতে অনেক চেষ্টা করিলেন, কিন্তু আমার যে বুদ্ধি–তাহাতে আবার বিজ্ঞান রসায়নের সঙ্গে আমাদের (অর্থাৎ মোসলেম ললনাদের) কোনো পুরুষে পরিচয় নাই। সুতরাং ভগিনী সারার ব্যাখ্যা কোনোমতেই আমার বোধগম্য হইল না। যাহা হউক তিনি বলিয়া যাইতে লাগিলেন।

‘দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই জলধর বেলুন দর্শনে অতীব বিস্মিত হইল–অতিহিংসায় (২) তাহারা উচ্চাকাঙ্খা সহস্রগুণ বর্ধিত হইল। প্রিন্সিপ্যাল মনস্থ করিলেন যে, এমন কিছু অসাধারণ বস্তু চাই, যাহাতে কাদম্বিনী বিজয়ী বিদ্যালয়কে পরাভূত করা যায়। কেবল ইহাই নহে, তাঁহার প্রচুর পরিমাণে ঐ উত্তাপ সংগ্রহ করিয়া রাখিতে এবং ইচ্ছামত যথাতথা বিতরণ করিতে পারেন।

‘যৎকালে এদেশের রমণীবৃন্দ নানাবিধ বৈজ্ঞানিক অনুশীলনে নিযুক্ত ছিলেন, পুরুষেরা তখন সৈনিক বিভাগের বলবৃদ্ধির চেষ্টায় ছিলেন। যখন নরনারীগণ শুনিতে পাইলেন যে, জেনানা বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয় বায়ু হইতে জল গ্রহণ করিতে এবং সূর্যোত্তাপ সংগ্রহ করিতে পারে, তাহারা তাচ্ছিল্যের ভাবে হাসিলেন। এমনকি তাঁহারা বিদ্যালয়ের সমুদয় কার্যপ্রণালীকে ‘স্বপ্নকল্পনা’ বলিয়া উপহাস করিতেও বিরত হন নাই।’

আমি বলিলাম, ‘আপনাদের কার্যকলাপ বাস্তবিক অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু এখন বলুন দেখি, আপনারা পুরুষদের কী প্রকারে অন্তঃপুরে বন্দি করিলেন? কোনোরূপ ফাঁদ পাতিয়াছিলেন নাকি?’

‘না এদেশের পুরুষদের বাহুবলে পরাস্ত করা হয় নাই।’

‘হাঁ ইহা অসম্ভব বটে, কারণ পুরুষের বাহু নারীর বাহু অপেক্ষা দুর্বল নহে, তবে?’

‘মস্তিষ্ক-বলে।’

‘তাহাদের মস্তিষ্কও তো রমণীয় তুলনায় বৃহত্তর ও গুরুতর। না–কী বলেন?’

‘মস্তিষ্ক গুরুতর হইলেই কী? হস্তীর মস্তিষ্কও তো মানবের তুলনায় বৃহৎ এবং ভারী, তবু তো মানুষ হস্তীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছে।’

‘ঠিক তো। কিন্তু কী প্রকারে কর্তারা বন্দি হইলেন, এ-কথা জানিবার জন্য আমি বড় উৎসুক হইয়াছি। শীঘ্র বলুন, আর বিলম্ব সহে না।’

‘স্ত্রীলোকের মস্তিষ্ক পুরুষের অপেক্ষা ক্ষিপ্রকারী, এ-কথা অনেকেই স্বীকার করেন। পুরুষ কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হইবার পূর্বে অনেক ভাবে–অনেক যুক্তিতর্কের সাহায্যে বিষয়টি বোধগম্য করে। কিন্তু রমণী বিনাচিন্তায় হঠাৎ সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। যাহা হউক, দশ বৎসর পূর্বে যখন সৈনিক বিভাগের কর্মচারীগণ আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইত্যাদিকে ‘স্বপ্নকল্পনা’ বলিয়া উপহাস করিয়াছিলেন, তখন কতিপয় ছাত্রী তদুত্তরে কিছু বলিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্ত উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লেড প্রিন্সিপ্যালদ্বয় বাধা দিলেন। তাঁহারা বলিলেন যে, তোমরা বাক্যে উতর না দিয়া সুযোগ পাইলে কার্য দ্বারা উত্তর দিও। ঈশ্বর কৃপায় এই উত্তর দিবার সুযোগের জন্য ছাত্রীদিগকে অধিক দিন অপেক্ষা করিতে হয় নাই।’

‘ভারি আশ্চর্য!’ আমি অতিআনন্দে আত্মসম্বরণ করিতে না পারিয়া করতালি দিয়া বলিলাম, ‘এখন দাম্ভিক ভদ্রলোকেরা অন্তঃপুরে বসিয়া ‘স্বপ্নকল্পনায়’ বিভোর রহিয়াছেন।’

সারা বলিয়া যাইতে লাগিলেন–

‘কিছুদিন পরে কয়েকজন বিদেশী লোক এদেশে আসিয়া আশ্রয় লইল। তাহারা কোনোপ্রকার রাজনৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত ছিল। তাহাদের রাজা ন্যায়সঙ্গত সুশাসন বা সুবিচারের পক্ষপাতী ছিলেন না, তিনি কেবল স্বামিত্ব ও অপ্রতিহত বিক্রম প্রকাশে তৎপর ছিলেন। তিনি আমাদের সহৃদয়া মহারানিকে ঐ আসামি ধরিয়া দিতে অনুরোধ করিলেন। কিন্তু মহারানি তো দয়াপ্রতিমা জননীর জাতি–সুতরাং তাঁহার আশ্রিত হতভাগ্যদিগকে ক্রুদ্ধ রাজার শোণিত-পিপাসা নিবৃত্তের জন্য ধরিয়া দিলেন না। প্রবল ক্ষমতাশালী রাজা ইহাতে ক্রোধান্ধ হইয়া আমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত হইলেন।

‘আমাদের রনসজ্জাও প্রস্তুত ছিল, সৈন্য সেনানীগণও নিশ্চিন্ত ছিলেন। তাঁহারা বিরোচিত উৎসাহে শত্রুর সম্মুখীন হইলেন। তুমুল সংগ্রাম বাঁধিল, রক্তগঙ্গায় যেন ডুবিয়া গেল! প্রতিদিন যোদ্ধাগণ অম্লানবদনে পতঙ্গপ্রায় সমরানলে প্রাণ বিসর্জন দিতে লাগিল।

‘কিন্তু শত্রুপক্ষ অত্যন্ত প্রবল ছিল, তাহাদের গতিরোধ করা অসম্ভব হইয়া পড়িল। আমাদের সেনাদল প্রাণপণে কেশরীবিক্রমে যুদ্ধ করিয়াও শনৈ শনৈ পশ্চাদবর্তী হইতে লাগিল, এবং শত্রুগণ ক্রমশ অগ্রসর হইল।

‘কেবল বেতনভোগী সেনা কেন, দেশে ইতর-ভদ্র–সকল লোকই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইল। এমনকি ৬০ বৎসরের বৃদ্ধ হইতে ষোড়শবর্ষীয় বালক পর্যন্ত সমরশায়ী হইতে চলিল। কতিপয় প্রধান সেনাপতি নিহত হইলেন; অসংখ্য সেনা প্রাণ হারাইয়া অবশিষ্ট যোদ্ধাগণ বিতাড়িত হইয়া পৃষ্ঠপ্রদর্শনে বাধ্য হইল। শত্রু এখন রাজধানী হইতে মাত্র ১২/১৩ ক্রোশ দূরে অবস্থিত। আর দুই-চারি দিবসের যুদ্ধের পরেই তাহারা রাজধানী আক্রমণ করিবেন।

‘এই সঙ্কট সময়ে সম্রাজ্ঞী জন-কতক বুদ্ধিমতী মহিলাকে লইয়া সভা আহ্বান করিলেন। এখন কি কর্তব্য ইহাই সভার আলোচ্য বিষয় ছিল।

‘কেহ প্রস্তাব করিলেন যে, রীতিমতো যুদ্ধ করিতে করিতে যাইবেন, অন্যদল বলিলেন যে, ইহা অসম্ভব–কারণ একে তো অবলারা সমরনৈপুণ্যে অনভিজ্ঞ তাহাতে আবার কৃপান, তোষাদান, বন্দুক ধারণেও অক্ষমা; তৃতীয়া দল বলিলেন যে, যুদ্ধনৈপুণ্য দূরে থাকুক–রমণীর শারীরিক দুর্বলতাই প্রধান অন্তরায়।’

মহারানি বলিলেন, ‘যদি আপনারা বাহুবলে দেশরক্ষা করিতে না পারেন, তবে মস্তিষ্কবলে দেশরক্ষার চেষ্টা করুন।’

সকলে নিরুত্তর, সভাস্থল নীরব। মহারানি মৌনভঙ্গ করিয়া পুনরায় বলিলেন, ‘যদি দেশ ও সম্ভ্রম রক্ষা করিতে না পারি, তবে আমি নিশ্চয় আত্মহত্যা করিব।’

‘এইবার দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লেডি প্রিন্সিপ্যাল (যিনি সৌরকত করায়ত্ত করিয়াছেন) উত্তর দিলেন। তিনি এতক্ষণে নীরবে চিন্তা করিতেছিলেন–এখন অতি ধীরে গম্ভীরভাবে বলিলেন যে, বিজয় লাভের আশাভরসা তো নাই–শত্রু প্রায় গৃহতোরণে। তবে তিনি একটি সঙ্কল্প স্থির করিয়াছেন–যদি এই উপায় শত্রু পরাজিত হয়, তবে তো সুখের বিষয়। এই উপায় ইতিপূর্বে আর কেহ অবলম্বন করে নাই–তিনি প্রথমে এই উপায়ে শত্রু জয়ের চেষ্টা করিবেন। এই তাঁহার শেষ চেষ্টা–যদি এই উপায়ে কৃতকার্য হওয়া না যায়, তবে অবশ্য সকলে আত্মহত্যা করিবেন। উপস্থিত মহিলাবৃন্দ দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, তাঁহারা কিছুতেই দাসত্ব-শৃঙ্খল পরিবেন না। সেই গভীর নিস্তব্ধ রজনীতে মহারানির সভাগৃহ অবলাকণ্ঠের প্রতিজ্ঞা ধ্বনিতে পুন পুন প্রতিধ্বনিত হইল। প্রতিধ্বনি ততোধিক উল্লাসের স্বরে বলিল, ‘আত্মহত্যা করিব!’ সে যেন ততোধিক তোজোব্যঞ্জক স্বরে বলিল, ‘বিদেশীয় অধীনতা অস্বীকার করিব না।’

‘সম্রাজ্ঞী তাঁহাদিগকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিলেন যে লেডি প্রিন্সিপ্যালকে তাঁহার নূতন উপায় অবলম্বন করিতে অনুরোধ করিলেন।

লেডি প্রিন্সিপ্যাল পুনরায় দণ্ডায়মান হইয়া সসম্ভ্রমে বলিলেন, ‘আমরা যুদ্ধযাত্রা করিবার পূর্বে পুরুষদের অন্ত;পুরে প্রবেশ করা উচিত। আমি পরদার অনুরোধে এই প্রার্থনা করি।’ মহারানি উত্তর করিলেন, ‘অবশ্য! তাহা তো হইবেনই।’

‘পর দিন মহারানির আদেশপত্রে দেশের পুরুষদিগকে জ্ঞাপন করা হইল যে অবলারা যুদ্ধযাত্রা করিবেন, সেজন্য সমস্ত নগরে পর্দা হওয়া উচিত। সুতরাং স্বদেশ ও স্বাধীনতা রক্ষার অনুরোধে পুরুষদের অন্তঃপুরে থাকিতে হইবে।

‘অবলার যুদ্ধযাত্রার কথা শুনিয়া ভদ্রলোকেরা প্রথমে হাস্যসম্বরণ করিতে পারিলেন না। পরে ভাবিলেন, মন্দ কী? তাঁহারা আহত এবং অত্যন্ত শ্রান্তক্লান্ত ছিলেন–যুদ্ধে আর রুচি ছিল না, কাজেই মহারানির এই আদেশকে তাঁহারা ঈশ্বরপ্রেরিত শুভআশীর্বাদ মনে করিলেন। মহারানিকে ভক্তি সহকারে নমস্কার করিয়া তাঁহারা বিনাবাক্যব্যয়ে অন্তঃপুরে আশ্রয় লইলেন। তাঁহাদের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যে, দেশরক্ষার কোনো আশা নাই–মরণ ভিন্ন গত্যন্তর নাই। দেশের ভক্তিমতী কন্যাগণ সমরচ্ছলে মৃত্যু আলিঙ্গন করিতে যাইতেছেন, তাহাদের এই অন্তিম বাসনায় বাধা দেওয়ার প্রয়োজন কী? শেষটা কী হয়, দেখিয়া দেশভক্ত সম্ভ্রান্ত পুরুষগণও আত্মহত্যা করিবেন।

‘অতঃপর লেডি প্রিন্সিপ্যাল দুই সহস্র ছাত্রী সমভিব্যাহারে সমরপ্রাঙ্গনে যাত্রা করিলেন–‘

আমি বাধা দিয়া বলিলাম, ‘দেশের পুরুষদিগকে তো পরদার অনুরোধে জেনানায় বন্দি করিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে পরদার আয়োজন করিলেন কিরূপে? উচ্চ প্রাচীরের ছিদ্র দিয়া গুলিবর্ষণ করিয়াছিলেন নাকি?’

‘না ভাই! বন্দুক-গুলি তো নারী যোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল না–অস্ত্রদ্বারা যুদ্ধজয়ের সম্ভাবনা থাকিলে আর বিদ্যালয়ের ছাত্রীর প্রয়োজন ছিল কি? আর শত্রুর বিরুদ্ধে পরদার বন্দোবস্ত করিবার আবশ্যক ছিল না–যেহেতু তাহারা অনেক দূরে ছিল; বিশেষত তাহারা আমাদের দিকে দৃষ্টিপাত করিতেই অক্ষম ছিল।’

আমি রঙ্গ করিয়া বলিলাম–‘হয়তো রণভূমে মূর্তিমতী সৌদামিনীদের প্রভাদর্শনে তাহাদেরই নয়ন ঝলসিয়া গিয়াছিল–‘

‘তাহাদের নয়ন ঝলসিয়াছিল সত্য, কিন্তু সৌদামিনীর প্রভায় নয়–স্বয়ং তপনের প্রখর কিরণে।’

‘বটে? কী প্রকারে? আর আপনারা বিনাঅস্ত্রে যুদ্ধ করিলেন কিরূপে?’

‘যোদ্ধার সঙ্গে সেই সূর্যোত্তাপ-সংগ্রহের যন্ত্র ছিল মাত্র। আপনি কখনো স্টিমারের সার্চলাইট (search light) দেখিয়াছেন কি?’

‘দেখিয়াছি।’

‘তবে মনে করুন, আমাদের সঙ্গে অন্যূন দ্বি-সহস্র সার্চলাইট ছিল–অবশ্য সে যন্ত্রগুলি ঠিক সার্চলাইটের মতো নয়, তবে অনেকটা সাদৃশ্য আছে, কেবল আপনাকে বুঝাইবার জন্য তাহাকে ‘সার্চলাইট’ বলিতেছি। স্টিমারের সার্চলাইটে উত্তাপের প্রখরতা থাকে না, কিন্তু আমাদের সার্চলাইটে ভয়ানক উত্তাপ ছিল। ছাত্রীগণ যখন সেই সার্চলাইটের কেন্দ্রীভূত উত্তাপরশ্মি শত্রুর দিকে পরিচালিত করিলেন–তখন তাহারা হয়তো ভাবিয়াছিল, একি ব্যাপার! শত-সহস্র সূর্য মর্ত্যে অবতীর্ণ। সে উগ্র উত্তাপ__ আলোক সহ্য করিতে না পারিয়া শত্রুগণ দিগ্‌বিদিগ্‌ জ্ঞানশূন্য হইয়া পলায়ন করিল। নারীর হস্তে একটি লোকেরও মৃত্যু হয় নাই–একবিন্দু নরশোণিতেও বসুন্ধরা কলঙ্কিত হয় নাই–অথচ শত্রু পরাজিত হইল। তাহারা প্রস্থান করিলে পর তাহাদের সমুদয় অস্ত্রসস্ত্র সূর্যকিরণে দগ্ধ করা গেল।’

আমি বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া বলিলাম, ‘যদি বারুদ দগ্ধকালে ভয়ানক দুর্ঘটনা হইয়া আপনাদের কোনো অনিষ্ট হইত!’

‘আমাদের অনিষ্টের সম্ভাবনা ছিল না, কারণ বারুদ ছিল বহুদূরে। আমরা রাজধানীতে থাকিয়াই সার্চলাইটের তীব্র উত্তাপ প্রেরণ করিয়াছিলাম। তবু অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য জলধর বেলুন সঙ্গে রাখা হইয়াছিল। তদবধি আর কোন প্রতিবেশী রাজা-মহারাজা আমাদের দেশ আক্রমণ করিতে আইসেন নাই।’

‘তারপর পুরুষ-প্রবরেরা অন্তঃপুরের বাহিরে আসিতে চেষ্টা করেন নাই কি?’

‘হাঁ, তাঁহারা মুক্তি পাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কতিপয় পুলিশ কমিশনার ও জেলার ম্যাজিস্ট্রেট এই মর্মে মহারানি সমীপে আবেদন করিয়াছিলেন যে, যুদ্ধে অকৃতকার্য হওয়ার দোষে সমর বিভাগের রাজকর্মচারীগণই দোষী, সেজন্য তাঁহাদিগকে বন্দি করা ন্যায়সঙ্গত হইয়াছে, কিন্তু অপর রাজপুরুষেরা তো কদাচ কর্তব্যে অবহেলা করেন নাই, তবে তাঁহারা অন্তঃপুর কারাগারে বন্দি থাকিবেন কেন? তাঁহাদের পুনরায় স্ব-স্ব কার্যে নিযুক্ত করিতে আজ্ঞা হউক।’

‘মহারানি তাঁহাদিগকে জানাইলেন যে, যদি আবার কখনো রাজকার্যে তাহাদের সহায়তার আবশ্যক হয়, তবে তাঁহাদিগকে যথাবিধি কার্যে নিযুক্ত করা হইবে। রাজ্যশাসন ব্যাপারে তাঁহাদের সাহায্যের প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত তাঁহারা যেখানে আছেন, সেইখানে থাকুন।

আমরা এই প্রথাকে ‘জেনানা’ না বলিয়া ‘মর্দানা’ বলি।’

আমি বলিলাম, ‘বেশ তো। কিন্তু এক-কথা–পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদি তো ‘মর্দানায়’ আছেন, আর চুরি ডাকাতির তদন্ত এবং হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি অত্যাচার অনাচারের বিচার করে কে?’

‘যদবধি ‘মর্দানা’ প্রথা প্রচলিত হইয়াছে, তদবধি এদেশে কোনোপ্রকার পাপ কিংবা অপরাধ হয় নাই, সেইজন্য আসামি গ্রেফতারের নিমিত্ত আর পুলিশের প্রয়োজন হয় না–ফৌজদারি মোকদ্দমার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটেরও আবশ্যক নাই।’

‘তাই তো আপনারা স্বয়ং শয়তানকেই (৩) শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, আর দেশে শয়তানি (৪) থাকিবে কিরূপে। যদি কোনো স্ত্রীলোক কখনো কোনো বেআইনি কাজ করে, তবে তাহাকে সংশোধন করা আপনাদের পক্ষে কঠিন নয়। যাহারা বিনারক্তপাতা যুদ্ধ জয় করিতে পারেন–অপরাধ ও অপরাধীকে তাড়াইতে তাঁহাদের কতক্ষণ লাগিবে?’

অতঃপর তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘প্রিয় সুলতানা! আপনি এখানে আরও কিছুক্ষণ বসিবেন, না আমার বসিবার ঘরে চলিবেন?’

আমি সহাস্যে বলিলাম, ‘আপনার রান্নাঘরটি রানির বসিবার ঘর অপেক্ষা কোনো অংশে নিকৃষ্ট নয়। কিন্তু কর্তাদের কাজ বন্ধ করিয়া এখানে আমাদের বসা অন্যায়; আমি তাঁহাদের যে-দখল করিয়াছি বলিয়া হয়তো তাঁহারা আমাকে গালি দিতেছেন।’

আমি ভগিনী সারা বসিবার ঘরে যাইবার সময় ইতস্তত উদ্যানের সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করিয়া বলিলাম–‘আমার বন্ধুবান্ধবেরা ভারি আশ্চর্য হইবেন, যখন আমি দেশে গিয়া নারীস্থানের কথা বলিল–নন্দনকাননতুল্য নারীস্থানে নারীর পূর্ণ আধিপত্য, যৎকালে পুরুষেরা মর্দানায় থাকিয়া রন্ধন করেন, শিশুদের খেলা দেন, এক-কথায় যাবতীয় গৃহকার্য করেন। আর রন্ধনপ্রণালী এমন সহজ ও চমৎকার, যে, রন্ধনটা অত্যন্ত আমোদজনক ব্যাপার। ভারতে যে সকল বেগম খানম প্রমুখ বড়ঘরের গৃহিণীরা রন্ধনশালার ত্রিসীমায় যাইতে চাহেন না, তাঁহারা এমন কেন্দ্রীভূত সৌরকর পাইলে আর রন্ধনকার্যে আপত্তি করিতেন না।’

ভারতের লোকেরা একটু চেষ্টা করিলেই সূর্যোত্তাপ লাভের উপায় করিতে পারেন। বিশেষ একখণ্ড কাচ (convex glass) দ্বারা যেমন রবিকর একত্রিত করিয়া কাগজাদি দগ্ধ করা যায়, সেইরূপ কাচবিশিষ্ট যন্ত্র নির্মাণ করিতে অধিক বুদ্ধি ও টাকা ব্যয় হইবে না।’

‘জানেন ভগিনী সারা। ভারতবাসীর বুদ্ধি সুপথে চালিত হয় না–জ্ঞানবিজ্ঞানের সহিত আমাদের সম্পর্ক নাই। আমাদের সবকার্যের সমাপ্তি বক্তৃতায়, সিদ্ধি করতালি লাভে। কোণো দেশ আপনা হইতে উন্নত হয় না, তাহাকে উন্নত করিতে হয়। নারীস্থানে কখনও স্বর্ণবৃষ্টি হয় নাই–কিংবা জোয়ারের জলেও মণিমুক্তা ভাসিয়া আইসে নাই।’

তিনি হাসিয়া বলিলেন, ‘না।’

‘তবেই দেখুন, ত্রিশ বৎসরে আপনারা একটা নগণ্য দেশকে সুসভ্য করিলেন আর প্রকৃতপক্ষে দশ বৎসরেই আপনারা এদেশকে স্বর্গতুল্য পুণ্যভূমিতে পরিণত করিতে পারিলেন। আর আমরা একটা সুসভ্য রত্নগর্ভা দেশকে ক্রমে উন্নত করিব দূরের কথা–বরং ক্রমশ তাহাকে দীনতমা শ্মশানে পরিণত করিতে বসিয়াছি।’

‘পুরুষের কার্যে আর রমণীর কার্যে এই প্রভেদ। আমি যে বলিয়াছিলাম পুরুষেরা কোনো ভালো কাজ সুচারুরূপে করিবার উপযুক্ত নয়, আপনি বোধ হয় এতক্ষণে সে কথাটা বুঝিতে পারিলেন।’

‘হাঁ এখন বুঝিলাম, নারী যাহা দশ বৎসরে করিতে পারে, পুরুষ তাহা শত শত বর্ষেও করিতে অক্ষম। আচ্ছা ভগিণী সারা, আপনারা ভূমিকর্ষণাদি কঠিন কার্য করেন কিরূপে?’

‘আমরা বিদ্যুৎসাহায্যে চাষ করিয়া থাকি। চপলা আমাদের অনেক কাজ করিয়া দেয়–ভারী বোঝা উত্তোলন ও বহনের কার্যও সে-ই করে। আমাদের বায়ুশকটও তদ্‌দ্বারা চালিত হয়। দেখিতেছেন, এদেশে রেল-বর্ত্ম বা পাকা বাঁধ সড়ক নাই, কেবল পদব্রজে ভ্রমণের পথ আছে।’

‘সেইজন্য এখানে রেলওয়ে দুর্ঘটনার ভয় নাই–রাজপথেও লোকে শকটচক্রে পেষিত হয় না। যে-সব পথ আছে, তাহা তো কুসুমশয্যা বিশেষ। বলি, আপনারা কখনো কখনো অনাবৃষ্টিজনিত ক্লেশ ভোগ করেন কি?’

‘দশ-এগার বৎসর হইতে এখানে অনাবৃষ্টিতে কষ্ট পাইতে হয় না। আপনি ঐ যে বৃহৎ বেলুন এবং তাহাতে নল দেখিতে পাইতেছেন–উহা দ্বারা আমরা ইচ্ছা বারিবর্ষণ করিতে পারি। আবশ্যকমতো সমস্ত শস্যক্ষেত্রে জলসেচ করা হয়। আবার জলপ্লাবনেও আমরা ঈশ্বর কৃপায় কষ্টভোগ করি না। ঝঞ্ঝাবাত এবং বজ্রপাতেরও উপদ্রব নাই।’

‘তবে তো এদেশ বড় সুখের স্থান। আহা মরি! ইহার নাম ‘সুখস্থান’ হয় নাই কেন? আপনারা ভারতবাসীর ন্যায় ঝগড়াকলহ করেন কি? এখানে কেহ গৃহবিবাদে সর্বস্বান্ত হয় কি?’

‘না ভগিনী। আমাদের কোঁদল করিবার অবসর কই? আমরা সকলেই সর্বদা কাজে ব্যস্ত থাকি–প্রকৃতির ভাণ্ডার অন্বেষণ করিয়া নানাপ্রকার সুখস্বচ্ছন্দতা আহরণের চেষ্টায় থাকি। অলসেরা কলহ করিতে সময় পায়–আমাদের সময় নাই। আমাদের গুণবতী মহারানির সাধ–সমস্ত দেশটাকে একটি উদ্যানে পরিণত করিবেন।’

‘রানির এ-আকাঙ্খা অতি চমৎকার। আপনাদের প্রধান খাদ্য কী?’

‘ফল।’

‘ভালো কথা, আপনারাই তো সব কাজ করেন, তবে পুরুষেরা কী করেন?’

‘বড় বড় ফল কারখানায় যন্ত্রাদি পরিচালিত করেন, খাতাপত্র রাখেন–এক-কথায় বলি, তাঁহারা যাবতীয় কঠিন পরিশ্রম অর্থাৎ যে-কার্যে কায়িকবলের প্রয়োজন সেইসব কার্য করেন।’

আমি হাসিয়া বলিলাম–‘ওহ্‌। তাঁহারা কেরানি মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন।’

‘কিন্তু কেরানি ও শ্রমজীবী বলিতে ঠিক যাহা বুঝায় এদেশের ভদ্রলোকেরা তাহা নহেন। তাঁহারা বিদ্যা, বুদ্ধি, সুশিক্ষায় আমাদের অপেক্ষা কোনো অংশে হীন নহেন। আমরা শ্রম বণ্টন করিয়া লইয়াছি–তাঁহারা শারীরিক পরিশ্রম করেন, আমরা মস্তিষ্কচালনা করি। আমরা যে-সকল যন্ত্রের উদ্ভাবনা বা সৃষ্টি কল্পনা করি, তাঁহারা তাহা নির্মাণ করেন। নরনারী উভয়ে একই সমাজদেহের বিভিন্ন অঙ্গ–পুরুষ শরীর, রমণী মন।’

‘তা বেশ। কিন্তু ভারতবাদী পুরুষেরা এ-কথা শুনিলে খড়্গহস্ত হইবেন। তাঁহাদের মতে তাঁহারা একাই এক সহস্র–‘তনমন’ সব তাঁহারা নিজেই। আমরা তাঁহাদের ‘ছাই ফেলিবার জন্য ভাঙাকুলা’ মাত্র। আপনাকে আর-একটি কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া থাকতে পারিতেছি না, আপনারা গ্রীষ্মকালে বাড়িঘর ঠাণ্ডা রাখেন কিরূপে? আমরা তো বৃষ্টিধারাকে স্বর্গের অমিয় ধারা মনে করি।’

‘আমাদের সুস্নিগ্ধ বৃষ্টিধারার অভাব হয় না। তবে আমরা পিপাসী চাতকের ন্যায় জলধরের কৃপা প্রার্থনা করি না, এখানে কাদম্বিনী আমাদের সেবিকা–সে আমাদের ইচ্ছানুসারে শীতল ফোয়ারায় ধরণী সিক্ত করিয়া দেয়। আবার শীতকালে সূর্যোত্তাপে গৃহগুলি ঈষৎ উত্তপ্ত রাখা হয়।’

অতঃপর তিনি আমাকে তাঁহার স্নানাগার দেখাইলেন। এ-কক্ষের ছাদটা বাক্সের ডালার মতো। ছাদ তুলিয়া ফেলিয়া ইচ্ছামতো বৃষ্টিজলে স্নান করা যায়। প্রত্যেকের গৃহপ্রাঙ্গণে বেলুনের ন্যায় বৃহৎ জলাধার আছে–আদি বেলুনের সহিত ঐ জলাধারগুলির যোগ আছে। আমি মুগ্ধভাবে বলিলাম, ‘আপনারা ধন্য। স্বয়ং প্রকৃতি আপনাদের সেবাদাসী, আর কী চাই! পার্থব সম্পদে তো আপনারা অতিশয় ধনী, আপনাদের ধর্মবিধান কিরূপ–জিজ্ঞাসা করিতে পারি কি?’

‘আমাদের ধর্ম–প্রেম ও সত্য। আমরা পরস্পরকে ভালোবাসিতে ধর্মত বাধ্য এবং প্রাণান্তেও সত্যত্যাগ করিতে পারি না। যদি কালেভদ্রে কেহ মিথ্যা বলে…’

‘তবে তাহার প্রাণদণ্ড হয়?’

‘না, প্রাণদণ্ড হয় না। আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টিজগতের জীবহত্যায়, বিশেষত মানবহত্যায় আমোদবোধ করি না। কাহারও প্রাণনাশ করিতে অপর প্রাণীর কী অধিকার? অপরাধীকে নির্বাসিত করা হয়, এবং তাহাকে এদেশে কিছুতেই পুনঃপ্রবেশ করিতে দেওয়া হয় না।’

‘কোনো মিথ্যাবাদীকে কখনো ক্ষমা করা হয় না কি?’

‘যদি কেহ অকপট হৃদয়ে অনুতপ্ত হয়, তাহাকে ক্ষমা করা যায়।’

‘এ-নিয়ম অতি উত্তম। এখানে যে ধর্মই রাজত্ব করিতেছে। ভালো, একবার, মহারানিকে দেখিতে পাইব কি? যিনি করুণাপ্রতিমা, নানা গুণের আধার, তাঁহাকে দেখিলেও পুণ্য হয়।’

‘বেশ চলুন।’ এই বলিয়া ভগিনী সারা যাত্রার আয়োজন করিতে লাগিলেন। একখণ্ড তক্তায় দুখানি আসন স্ক্রু দ্বারা আঁটা হইল। পরে তিনি কতিপয় গোলা আনিলেন। গোলা কয়টি দেখিতে বেশ চক্‌চকে ছিল, কোন্‌ ধাতুতে গঠিত তাহা ঠিক বুঝিতে পারিলাম না, আমার মনে হইল উৎকৃষ্ট রোপ্য-নির্মিত বলিয়া। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার ওজন কত। আমি জীবনে কোনোদিন ওজন হই নাই, কাজেই নিজের গুরুত্ব আমার জানা ছিল না, ভগিনী বলিলেন, ‘আসুন তবে আপনাকে ওজন করি। ওজনটা জানা প্রয়োজন।’

আমি ভাবিলাম, একি ব্যাপার! যাহা হউক ওজনে আমি একমণ ষোল সের হইলাম। শুনিলাম, তিনি আটত্রিশ সের মাত্র। তবে ভগিনী সারার অপেক্ষা আর কোনো গুণে না হউক আমি গুরুত্বে বেশি তো।

তারপর দেখিলাম, ঐ চক্‌চকে গোলার ছোটবড় দুইটি গোলা এই তক্তায় সংযোগ করা হইল। আমি প্রশ্ন করিয়া জানিলাম, সে-গোলা হাইড্রোজেন পূর্ন। তাহারই সাহায্যে আমরা শূন্যে উত্থিত হইব। বিভিন্ন ওজনের বস্তু উত্তোলনের নিমিত্ত ছোটবড় বিবিধ ওজনের হাইড্রোজেন গোলা ব্যবহৃত হয়। এখন বুঝিলাম, এইজন্য আমার ওজন অবগত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। অতঃপর এইরূপ বায়ুযানে দুইটি পাখার মতো ফলা সংযুক্ত হইল, শুনিলাম ইহা বিদ্যুৎ দ্বারা পরিচালিত হয়। আমরা উভয়ে আসনে উপবেশন করিলে পর তিনি ঐ পাখার কল টিপিলেন। প্রথমে আমাদের ‘তখ্‌তে রওয়াঁ’খানি (৫) ধীরে ধীরে ৭/৮ হাত ঊর্ধ্বে উত্থিত হইল, তারপর বায়ুভরে উড়িয়া চলিল। আমি ভাবলাম, এমন জ্ঞানেবিজ্ঞানে উন্নত দেশের অধীশ্বরীকে দেখিতে যাইতেছি, যদি আমার কথাবার্তায় তিনি আমাকে নিতান্ত মূর্খ ভাবেন–এবং সেইসঙ্গে আমাদের সাধের হিন্দুস্থানকে ‘মূর্খস্থান’ মনে করেন? কিন্তু অধিক ভাবিবার সময় ছিল না–সবে তখ্‌তে রওয়াঁ শূন্যে উড়িতে আরম্ভ করিয়াছে আর অমনই দেখি আমরা চপলাগতিতে রাজধানীতে উপনীত। সেই বায়ুযানে বসিয়াই দেখিতে পাইলাম, সখী-সহচরী পরিবেষ্টিতা মহারানি তাহার চারি বৎসর বয়স্কা কন্যার হাত ধরিয়া উদ্যানে ভ্রমণ করিতেছেন। সমস্ত রাজধানী যেন একটি বিরাট কুসুমকুঞ্জ বিশেষ। তাহার সৌন্দর্যের তুলনা এ-জগতে নাই।

মহারানি দূর হইতে ভগিনী সারাকে চিনিতা পারিয়া বলিলেন, ‘বা! আপনি এখানে।’ ভগিনী সারা রানিকে অভিবাদন করিয়া ধীরে ধীরে তখ্‌তে রওয়াঁ অবনত করিলে আমরা অবতরণ করিলাম।

আমি যথারীতি মহারানির সহিত পরিচিতা হইলাম। তাঁহার অমায়িক ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হইলাম। আমার আশঙ্কা ছিল, তিনি আমাকে কী যেন মন করিবেন, এখন সে ভয় দূর হইল। তাঁহার সহিত রাজনীতি সম্বন্ধে বিবিধ প্রসঙ্গ হইল। বাণিজ্য-ব্যবসায় সম্বন্ধেও কথা উঠিয়াছিল। তিনি বলিলেন যে, ‘অবাধ বাণিজ্যে তাহার আপত্তি নাই, কিন্তু যে-সকল দেশে রমণীবৃন্দ অন্তঃপুরে থাকে অথবা যে-সব দেশে নারী কেবল বিবিধ বসন ভূষণে সজ্জিতা হইয়া পুত্তলিকাবৎ জীবনে বহন করে, দেশের কোনো কাজ করে না, তাহারা বাণিজ্যের নিমিত্ত নারীস্থানে আসিতে বা আমাদের সহিত কাজকর্ম করিতে অক্ষম। এই কারণে অন্য দেশের সহিত আমাদের বাণিজ্য-ব্যবসায় চলিতে পারে না। পুরুষেরা নৈতিক জীবনে অনেকটা হীন বলিয়া আমরা তাহাদের সহিত কোনোপ্রকার কারবার করিতে ইচ্ছুক নহি। আমরা অপরের জমিজমার প্রতি লোভ করিয়া দুই-দশ বিঘা ভূমির জন্য রক্তপাত করি না, অথবা একখণ্ড হীরকের জন্যও যুদ্ধ করি না–যদ্যপি তাহা কোহেনুর অপেক্ষা শতগুণ শ্রেষ্ঠ হয়, কিংবা কাহারও ময়ূরসিংহাসন দর্শনেও হিংসা করি না। আমরা অতল জ্ঞানসাগরে ডুবিয়া রত্ন আহরণ করি। প্রকৃতি মানবের জন্য তাহার অক্ষয় ভাণ্ডারে যে অমূল্য রত্নবাজি সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছে আমরা তাহাই ভোগ করি। তাহাতেই আমরা সন্তুষ্টচিত্তে জগদীশ্বরকে ধন্যবাদ দিই।’

মহারানির নিকট বিদায় লইয়া আমি সেই সুপ্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় দেখিতে গেলাম, এবং কতিপয় কলকারখানা, রসায়নাগার এবং মানমন্দিরও দেখিলাম।

উপরোক্ত দ্রষ্টব্য স্থানসমূহ পরিদর্শনের পর আমরা পুনরায় সেই বায়ুযানে আরোহণ করিলাম। কিন্তু সেই আমাদের তখতে রওয়াঁখানি ঈষৎ হেলিয়া ঊর্ধ্বে উঠিতে লাগিল, আমি কী জানি কিরূপে আসনচ্যুত হইলাম–সেই পতনে আমি চমকিয়া উঠিলাম। চক্ষু খুলিয়া দেখি, আমি তখনো সেই আরামকেদারায় উপবিষ্ট।


(১) “পরিস্থান” শব্দের অনুকরণে “নারীস্থান” বলা হইল। ইংরাজিতে “লেডি ল্যাণ্ড” বলা গিয়াছে।

(২) হিংসা বৃত্তিটা কি বাস্তবিক বড় দোষণীয়? কিন্তু হিংসা না থাকিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা হয় কই? এই হিংসাই তো মানবকে উন্নতির দিকে আকর্ষণ করে। তবে দেশকাল ভেঙে ঈর্ষায় পতন হয়, সত্য। তা যে-কোনো মনোবৃত্তির মাত্রাধিক্যেই অনিষ্ট হয়; সকল বিষয়েরই সীমা আছে।

(৩) পুরুষ জাতিকে।

(৪) পাপ।

(৫) ইংরেজিতে ‘Travelling throne’ বলা যাইতে পারে।


Sultana's Dream
One evening I was lounging in an easy chair in my bedroom and thinking lazily of the condition of Indian womanhood. I am not sure whether I dozed off or not. But, as far as I remember, I was wide awake. I saw the moonlit sky sparkling with thousands of diamond-like stars, very distinctly.

All on a sudden a lady stood before me; how she came in, I do not know. I took her for my friend, Sister Sara.

'Good morning,' said Sister Sara. I smiled inwardly as I knew it was not morning, but starry night. However, I replied to her, saying, 'How do you do?'

'I am all right, thank you. Will you please come out and have a look at our garden?'

I looked again at the moon through the open window, and thought there was no harm in going out at that time. The men-servants outside were fast asleep just then, and I could have a pleasant walk with Sister Sara.

I used to have my walks with Sister Sara, when we were at Darjeeling. Many a time did we walk hand in hand and talk light-heartedly in the botanical gardens there. I fancied, Sister Sara had probably come to take me to some such garden and I readily accepted her offer and went out with her.

When walking I found to my surprise that it was a fine morning. The town was fully awake and the streets alive with bustling crowds. I was feeling very shy, thinking I was walking in the street in broad daylight, but there was not a single man visible.

Some of the passers-by made jokes at me. Though I could not understand their language, yet I felt sure they were joking. I asked my friend, 'What do they say?'

'The women say that you look very mannish.'

'Mannish?' said I, 'What do they mean by that?'

'They mean that you are shy and timid like men.'

'Shy and timid like men?' It was really a joke. I became very nervous, when I found that my companion was not Sister Sara, but a stranger. Oh, what a fool had I been to mistake this lady for my dear old friend, Sister Sara.

She felt my fingers tremble in her hand, as we were walking hand in hand.

'What is the matter, dear?' she said affectionately. 'I feel somewhat awkward,' I said in a rather apologizing tone, 'as being a purdahnishin woman I am not accustomed to walking about unveiled.'

'You need not be afraid of coming across a man here. This is Ladyland, free from sin and harm. Virtue herself reigns here.'

By and by I was enjoying the scenery. Really it was very grand. I mistook a patch of green grass for a velvet cushion. Feeling as if I were walking on a soft carpet, I looked down and found the path covered with moss and flowers.

'How nice it is,' said I.

'Do you like it?' asked Sister Sara. (I continued calling her 'Sister Sara,' and she kept calling me by my name).

'Yes, very much; but I do not like to tread on the tender and sweet flowers.'

'Never mind, dear Sultana; your treading will not harm them; they are street flowers.'

'The whole place looks like a garden,' said I admiringly. 'You have arranged every plant so skillfully.'

'Your Calcutta could become a nicer garden than this if only your countrymen wanted to make it so.'

'They would think it useless to give so much attention to horticulture, while they have so many other things to do.'

'They could not find a better excuse,' said she with smile.

I became very curious to know where the men were. I met more than a hundred women while walking there, but not a single man.

'Where are the men?' I asked her.

'In their proper places, where they ought to be.'

'Pray let me know what you mean by "their proper places".'

'O, I see my mistake, you cannot know our customs, as you were never here before. We shut our men indoors.'

'Just as we are kept in the zenana?'

'Exactly so.'

'How funny,' I burst into a laugh. Sister Sara laughed too.

'But dear Sultana, how unfair it is to shut in the harmless women and let loose the men.'

'Why? It is not safe for us to come out of the zenana, as we are naturally weak.'

'Yes, it is not safe so long as there are men about the streets, nor is it so when a wild animal enters a marketplace.'

'Of course not.'

'Suppose, some lunatics escape from the asylum and begin to do all sorts of mischief to men, horses and other creatures; in that case what will your countrymen do?'

'They will try to capture them and put them back into their asylum.'

'Thank you! And you do not think it wise to keep sane people inside an asylum and let loose the insane?'

'Of course not!' said I laughing lightly.

'As a matter of fact, in your country this very thing is done! Men, who do or at least are capable of doing no end of mischief, are let loose and the innocent women, shut up in the zenana! How can you trust those untrained men out of doors?'

'We have no hand or voice in the management of our social affairs. In India man is lord and master, he has taken to himself all powers and privileges and shut up the women in the zenana.'

'Why do you allow yourselves to be shut up?'

'Because it cannot be helped as they are stronger than women.'

'A lion is stronger than a man, but it does not enable him to dominate the human race. You have neglected the duty you owe to yourselves and you have lost your natural rights by shutting your eyes to your own interests.'

'But my dear Sister Sara, if we do everything by ourselves, what will the men do then?'

'They should not do anything, excuse me; they are fit for nothing. Only catch them and put them into the zenana.'

'But would it be very easy to catch and put them inside the four walls?' said I. 'And even if this were done, would all their business – political and commercial – also go with them into the zenana?'

Sister Sara made no reply. She only smiled sweetly. Perhaps she thought it useless to argue with one who was no better than a frog in a well.

By this time we reached Sister Sara's house. It was situated in a beautiful heart-shaped garden. It was a bungalow with a corrugated iron roof. It was cooler and nicer than any of our rich buildings. I cannot describe how neat and how nicely furnished and how tastefully decorated it was.

We sat side by side. She brought out of the parlour a piece of embroidery work and began putting on a fresh design.

'Do you know knitting and needle work?'

'Yes; we have nothing else to do in our zenana.'

'But we do not trust our zenana members with embroidery!' she said laughing, 'as a man has not patience enough to pass thread through a needlehole even!'

'Have you done all this work yourself?' I asked her pointing to the various pieces of embroidered teapoy cloths.

'Yes.'

'How can you find time to do all these? You have to do the office work as well? Have you not?'

'Yes. I do not stick to the laboratory all day long. I finish my work in two hours.'

'In two hours! How do you manage? In our land the officers, – magistrates, for instance – work seven hours daily.'

'I have seen some of them doing their work. Do you think they work all the seven hours?'

'Certainly they do!'

' No, dear Sultana, they do not. They dawdle away their time in smoking. Some smoke two or three choroots during the office time. They talk much about their work, but do little. Suppose one choroot takes half an hour to burn off, and a man smokes twelve choroots daily; then you see, he wastes six hours every day in sheer smoking.'

We talked on various subjects, and I learned that they were not subject to any kind of epidemic disease, nor did they suffer from mosquito bites as we do. I was very much astonished to hear that in Ladyland no one died in youth except by rare accident.

'Will you care to see our kitchen?' she asked me.

'With pleasure,' said I, and we went to see it. Of course the men had been asked to clear off when I was going there. The kitchen was situated in a beautiful vegetable garden. Every creeper, every tomato plant was itself an ornament. I found no smoke, nor any chimney either in the kitchen -- it was clean and bright; the windows were decorated with flower gardens. There was no sign of coal or fire.

'How do you cook?' I asked.

'With solar heat,' she said, at the same time showing me the pipe, through which passed the concentrated sunlight and heat. And she cooked something then and there to show me the process.

'How did you manage to gather and store up the sun-heat?' I asked her in amazement.

'Let me tell you a little of our past history then. Thirty years ago, when our present Queen was thirteen years old, she inherited the throne. She was Queen in name only, the Prime Minister really ruling the country.

'Our good Queen liked science very much. She circulated an order that all the women in her country should be educated. Accordingly a number of girls' schools were founded and supported by the government. Education was spread far and wide among women. And early marriage also was stopped. No woman was to be allowed to marry before she was twenty-one. I must tell you that, before this change we had been kept in strict purdah.'

'How the tables are turned,' I interposed with a laugh.

'But the seclusion is the same,' she said. 'In a few years we had separate universities, where no men were admitted.'

'In the capital, where our Queen lives, there are two universities. One of these invented a wonderful balloon, to which they attached a number of pipes. By means of this captive balloon which they managed to keep afloat above the cloud-land, they could draw as much water from the atmosphere as they pleased. As the water was incessantly being drawn by the university people no cloud gathered and the ingenious Lady Principal stopped rain and storms thereby.'

'Really! Now I understand why there is no mud here!' said I. But I could not understand how it was possible to accumulate water in the pipes. She explained to me how it was done, but I was unable to understand her, as my scientific knowledge was very limited. However, she went on, 'When the other university came to know of this, they became exceedingly jealous and tried to do something more extraordinary still. They invented an instrument by which they could collect as much sun-heat as they wanted. And they kept the heat stored up to be distributed among others as required.

'While the women were engaged in scientific research, the men of this country were busy increasing their military power. When they came to know that the female universities were able to draw water from the atmosphere and collect heat from the sun, they only laughed at the members of the universities and called the whole thing "a sentimental nightmare"!'

'Your achievements are very wonderful indeed! But tell me, how you managed to put the men of your country into the zenana. Did you entrap them first?'

'No.'

'It is not likely that they would surrender their free and open air life of their own accord and confine themselves within the four walls of the zenana! They must have been overpowered.'

'Yes, they have been!'

'By whom? By some lady-warriors, I suppose?'

'No, not by arms.'

'Yes, it cannot be so. Men's arms are stronger than women's. Then?'

'By brain.'

'Even their brains are bigger and heavier than women's. Are they not?'

'Yes, but what of that? An elephant also has got a bigger and heavier brain than a man has. Yet man can enchain elephants and employ them, according to their own wishes.'

'Well said, but tell me please, how it all actually happened. I am dying to know it!'

'Women's brains are somewhat quicker than men's. Ten years ago, when the military officers called our scientific discoveries "a sentimental nightmare," some of the young ladies wanted to say something in reply to those remarks. But both the Lady Principals restrained them and said, they should reply not by word, but by deed, if ever they got the opportunity. And they had not long to wait for that opportunity.'

'How marvelous!' I heartily clapped my hands. 'And now the proud gentlemen are dreaming sentimental dreams themselves.'

'Soon afterwards certain persons came from a neighbouring country and took shelter in ours. They were in trouble having committed some political offense. The king who cared more for power than for good government asked our kind-hearted Queen to hand them over to his officers. She refused, as it was against her principle to turn out refugees. For this refusal the king declared war against our country.

'Our military officers sprang to their feet at once and marched out to meet the enemy. The enemy however, was too strong for them. Our soldiers fought bravely, no doubt. But in spite of all their bravery the foreign army advanced step by step to invade our country.

'Nearly all the men had gone out to fight; even a boy of sixteen was not left home. Most of our warriors were killed, the rest driven back and the enemy came within twenty-five miles of the capital.

'A meeting of a number of wise ladies was held at the Queen's palace to advise as to what should be done to save the land. Some proposed to fight like soldiers; others objected and said that women were not trained to fight with swords and guns, nor were they accustomed to fighting with any weapons. A third party regretfully remarked that they were hopelessly weak of body.

'"If you cannot save your country for lack of physical strength," said the Queen, "try to do so by brain power."

'There was a dead silence for a few minutes. Her Royal Highness said again, "I must commit suicide if the land and my honour are lost."

'Then the Lady Principal of the second university (who had collected sun-heat), who had been silently thinking during the consultation, remarked that they were all but lost, and there was little hope left for them. There was, however, one plan which she would like to try, and this would be her first and last efforts; if she failed in this, there would be nothing left but to commit suicide. All present solemnly vowed that they would never allow themselves to be enslaved, no matter what happened.

'The Queen thanked them heartily, and asked the Lady Principal to try her plan. The Lady Principal rose again and said, "before we go out the men must enter the zenanas. I make this prayer for the sake of purdah." "Yes, of course," replied Her Royal Highness.

'On the following day the Queen called upon all men to retire into zenanas for the sake of honour and liberty. Wounded and tired as they were, they took that order rather for a boon! They bowed low and entered the zenanas without uttering a single word of protest. They were sure that there was no hope for this country at all.

'Then the Lady Principal with her two thousand students marched to the battle field, and arriving there directed all the rays of the concentrated sunlight and heat towards the enemy.

'The heat and light were too much for them to bear. They all ran away panic-stricken, not knowing in their bewilderment how to counteract that scorching heat. When they fled away leaving their guns and other ammunitions of war, they were burnt down by means of the same sun-heat. Since then no one has tried to invade our country any more.'

'And since then your countrymen never tried to come out of the zenana?'

'Yes, they wanted to be free. Some of the police commissioners and district magistrates sent word to the Queen to the effect that the military officers certainly deserved to be imprisoned for their failure; but they never neglected their duty and therefore they should not be punished and they prayed to be restored to their respective offices.

'Her Royal Highness sent them a circular letter intimating to them that if their services should ever be needed they would be sent for, and that in the meanwhile they should remain where they were. Now that they are accustomed to the purdah system and have ceased to grumble at their seclusion, we call the system "Mardana" instead of "zenana".'

'But how do you manage,' I asked Sister Sara, 'to do without the police or magistrates in case of theft or murder?'

'Since the "Mardana" system has been established, there has been no more crime or sin; therefore we do not require a policeman to find out a culprit, nor do we want a magistrate to try a criminal case.'

'That is very good, indeed. I suppose if there was any dishonest person, you could very easily chastise her. As you gained a decisive victory without shedding a single drop of blood, you could drive off crime and criminals too without much difficulty!'

'Now, dear Sultana, will you sit here or come to my parlour?' she asked me.

'Your kitchen is not inferior to a queen's boudoir!' I replied with a pleasant smile, 'but we must leave it now; for the gentlemen may be cursing me for keeping them away from their duties in the kitchen so long.' We both laughed heartily.

'How my friends at home will be amused and amazed, when I go back and tell them that in the far-off Ladyland, ladies rule over the country and control all social matters, while gentlemen are kept in the Mardanas to mind babies, to cook and to do all sorts of domestic work; and that cooking is so easy a thing that it is simply a pleasure to cook!'

'Yes, tell them about all that you see here.'

'Please let me know, how you carry on land cultivation and how you plough the land and do other hard manual work.'

'Our fields are tilled by means of electricity, which supplies motive power for other hard work as well, and we employ it for our aerial conveyances too. We have no rail road nor any paved streets here.'

'Therefore neither street nor railway accidents occur here,' said I. 'Do not you ever suffer from want of rainwater?' I asked.

'Never since the "water balloon" has been set up. You see the big balloon and pipes attached thereto. By their aid we can draw as much rainwater as we require. Nor do we ever suffer from flood or thunderstorms. We are all very busy making nature yield as much as she can. We do not find time to quarrel with one another as we never sit idle. Our noble Queen is exceedingly fond of botany; it is her ambition to convert the whole country into one grand garden.'

'The idea is excellent. What is your chief food?'

'Fruits.'

'How do you keep your country cool in hot weather? We regard the rainfall in summer as a blessing from heaven.'

'When the heat becomes unbearable, we sprinkle the ground with plentiful showers drawn from the artificial fountains. And in cold weather we keep our room warm with sun-heat.'

She showed me her bathroom, the roof of which was removable. She could enjoy a shower bath whenever she liked, by simply removing the roof (which was like the lid of a box) and turning on the tap of the shower pipe.

'You are a lucky people!' ejaculated I. 'You know no want. What is your religion, may I ask?'

'Our religion is based on Love and Truth. It is our religious duty to love one another and to be absolutely truthful. If any person lies, she or he is....'

'Punished with death?'

'No, not with death. We do not take pleasure in killing a creature of God, especially a human being. The liar is asked to leave this land for good and never to come to it again.'

'Is an offender never forgiven?'

'Yes, if that person repents sincerely.'

'Are you not allowed to see any man, except your own relations?'

'No one except sacred relations.'

'Our circle of sacred relations is very limited; even first cousins are not sacred.'

'But ours is very large; a distant cousin is as sacred as a brother.'

'That is very good. I see purity itself reigns over your land. I should like to see the good Queen, who is so sagacious and far-sighted and who has made all these rules.'

'All right,' said Sister Sara.

Then she screwed a couple of seats onto a square piece of plank. To this plank she attached two smooth and well-polished balls. When I asked her what the balls were for, she said they were hydrogen balls and they were used to overcome the force of gravity. The balls were of different capacities to be used according to the different weights desired to be overcome. She then fastened to the air-car two wing-like blades, which, she said, were worked by electricity. After we were comfortably seated she touched a knob and the blades began to whirl, moving faster and faster every moment. At first we were raised to the height of about six or seven feet and then off we flew. And before I could realize that we had commenced moving, we reached the garden of the Queen.

My friend lowered the air-car by reversing the action of the machine, and when the car touched the ground the machine was stopped and we got out.

I had seen from the air-car the Queen walking on a garden path with her little daughter (who was four years old) and her maids of honour.

'Halloo! You here!' cried the Queen addressing Sister Sara. I was introduced to Her Royal Highness and was received by her cordially without any ceremony.

I was very much delighted to make her acquaintance. In the course of the conversation I had with her, the Queen told me that she had no objection to permitting her subjects to trade with other countries. 'But,' she continued, 'no trade was possible with countries where the women were kept in the zenanas and so unable to come and trade with us. Men, we find, are rather of lower morals and so we do not like dealing with them. We do not covet other people's land, we do not fight for a piece of diamond though it may be a thousand-fold brighter than the Koh-i-Noor, nor do we grudge a ruler his Peacock Throne. We dive deep into the ocean of knowledge and try to find out the precious gems, which nature has kept in store for us. We enjoy nature's gifts as much as we can.'

After taking leave of the Queen, I visited the famous universities, and was shown some of their manufactories, laboratories and observatories.

After visiting the above places of interest we got again into the air-car, but as soon as it began moving, I somehow slipped down and the fall startled me out of my dream. And on opening my eyes, I found myself in my own bedroom still lounging in the easy-chair!

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পুস্তক পুরস্কার বিজয়ী "হলুদ বাড়ি" | NPR থেকে আলোচনাটি অনুবাদ করেছেন আশফাক স্বপন



'The Yellow House'-বইটির জন্য লেখিকা স্যারা এম. ব্রুম ২০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পুস্তক পুরস্কার লাভ করেন। ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও-তে প্রকাশিত বইটির সমালোচনা এখানে নিবেদন করা হলো।

‘হলুদ বাড়ি’ স্থান, স্মৃতি এবং আত্মোপলব্ধির যোগসূত্র স্থাপন করে

মার্থা এ্যান টোল
১৩ আগস্ট ২০১৯
ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনা
The Yellow House' Connects Place, Memory And Self-Knowledge

Martha Anne Toll
August 13, 2019
National Public Radio

আলোচিত বই
The Yellow House
By Sarah M. Broom
Hardcover, 376 pages
Buy here


বইটির আরেকটি সমালোচনা (ইংরেজি)
Katrina Destroyed 'The Yellow House' — But Inequality Eroded Its Foundation

Maureen Corrigan
September 4, 2019
Fresh Air
National Public Radio
পড়ুন । শুনুন

লেখিকার সাক্ষাৎকার (ইংরেজি)
Sarah M. Broom On 'The Yellow House'

August 10, 2019
Weekend Edition
National Public Radio
পড়ুন । শুনুন

স্যারা এম. ব্রুমের দুর্দান্ত অভিষেক ঘটল ‘The Yellow House’ (হলুদ বাড়ি) বইটি দিয়ে। বইটিতে প্রার্থনার আর্তি রয়েছে, মৃতব্যক্তির সম্মানে রচিত শোকগাঁথার গাম্ভীর্য রয়েছে।

শিরোনামে উল্লেখিত বাড়িটি ব্রুমের বিস্তৃত ও বহুবিচিত্র পরিবার নিয়ে স্মৃতিচারণের কেন্দ্রবিন্দু। আরো যেটা উল্লেখযোগ্য, সেটা হল আমেরিকা কীভাবে আফ্রিকান আমেরিকানদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, এবং আজও ব্যর্থ, এই বাড়িটি যেন সেটার একটি প্রতীক।
মা আইভরি মে-এর ১২টি সন্তানের মধ্যে ব্রুম সবচাইতে ছোট। ১৯ বছর বয়সে বিধবা হবার পর আইভরি মে তার জীবনের সঞ্চয় দিয়ে পূর্ব নিউ অরলিন্সে একটি ছোট্ট সাদামাটা বাড়ি ক্রয় করেন। টেক্সাসের ক্রোড়পতিরা তাদের বিশাল বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প এবং তার চাইতেও বিশাল আস্ফালন নিয়ে এই জায়গাটাতে আসবার আগে এই এলাকাটাকে যে ঠিক কী নামে ডাকা হয় সেটা কেউ জানতো না। তবে লেখকের ভাষায়, ‘নাম না দেওয়াটাও একধরনের নামকরণ।’

বাড়ি ক্রয় করতে না করতেই বাড়ি্টা পেছন দিকে মাটিতে ডুবে যেতে আরম্ভ করে। কারণ জায়গাটা আগে সাইপ্রেস গাছের ডোবা ছিল। লেখকের ভাষায় ‘গাছ অথবা তিনজন মানুষের ওজন বহন করার জন্য জমিটা বড়ই দুর্বল।’

কয়েক বছরের মধ্যে আইভরি মে সাইমন ব্রুম নামে তার চাইতে বয়সে ১৯ বছরের বড় এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। বিয়ের আগে তাদের যার যার নিজেদের সন্তান ছিল, বিয়ের পর তাদের আরো সন্তান হয়। বিয়ের পরপর ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ে জলাশয় রক্ষাকারী বাঁধ ভেঙে যায়। প্রায় ৭০,০০০ মানুষ গৃহহীন হয়, শত শত মানুষ বাড়ির ছাদে জলবন্দী হয়। এটিই ঘুর্ণিঝড় বেটসি – কাটরিনা ঘুর্ণিঝড়ের ৪০ বছর আগে এই ঘুর্ণিঝড় নিউ অরলিন্সে একই রকম প্রলয়ঙ্কারী আঘাত হানে।

সাইমন পরিশ্রমী ছিলেন। হলুদ বাড়ির নানান সংস্কারে নিবেদিত ছিলেন, তবে কাজ শেষ করতে পারেন নি। লেখিকা ব্রুম যখন শিশু, তিনি অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করেন। ফলে লেখিকার পিতৃস্মৃতির ভাণ্ডারে কিছুই জমা নেই। আইভরি মে দ্বিতীয়বার বিধবা হলেন। এবার একা ১২টি সন্তান লালনের দায়িত্ব তাঁর। সেই সাথে হলুদ বাড়ি, যাকে তাঁর ১৩শ সন্তান বলা চলে।

ব্রুমের গদ্য স্মৃতির বিরহে কাতর। লেখিকা তার জন্মের আগে বাবা-মায়ের জীবনের চিত্র তুলে ধরেন। আর তুলে ধরেন কাটরিনা ঘুর্ণিঝড়ে জলের উত্থান ও পতন - যাকে তিনি ‘জল’ বলে অভিহিত করেন। কাটরিনা সবকিছু কেড়ে নেয়। ব্রুমকে অনেক আদর ও যত্নে মানুষ করেন তার মা, সঙ্গে খুনশুটি আর মমতায় ভরা বড় ভাইবোন, এবং নানী। হলুদ বাড়িটি তাঁর স্বরূপ নির্ণয় করেছে, আবার হলুদ বাড়িটি সেই পরিচয়কে সীমায়িত করেছে। তার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বাড়িটি ক্রমশ ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে, যদিও আইভরি মে একসাথে একাধিক জায়গায় কাজ করে সংসার সামাল দেবার পরও বাড়ি ঝকঝকে পরিষ্কার রাখতেন। শত চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি বাড়ির নানান স্থানে অবক্ষয়, ইঁদুর, পোকামাকড়, ও বৃষ্টির সাথে যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারেননি। আইভরি মে একটা কথা বলতেন যারসত্যতা চিরকালীন: ‘জানোতো এই বাড়িটা অন্য লোকের জন্য খুব একটা আরামদায়ক না।’ লেখকের ভাষায়: ‘মর্মবিদারক বাস্তব হল এই - হয়ত আমরা এই সত্যটি আবিষ্কার করেছি – যে মানুষকে বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ না জানিয়ে আমরা আমাদের নিজেতের স্বভাবের বিরুদ্ধাচরণ করছি। এর কারণ হল লজ্জা, গ্লানি।’

ব্রুমের সাধ জাগে এইসব কিছু পেছনে ফেলে চলে যাবার – তাকে বড় নগরীর বড় রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষা হাতছানি দেয়। তিনি নিউ ইয়র্কের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যূষিত হারলেম-এ আসেন ‘ও ম্যাগাজিন’-এ চাকরি নিয়ে। আফ্রিকার বুরুন্ডিতে যান। সেখানে বিপদসঙ্কুল পরিবেশে সেই স্থানের মানুষের সামনে আয়না তুলে ধরেন। সেটা তাকে আবার নিউ অরলিন্সের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য করে।

যখন কাটরিনা ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানে, ব্রুম তখন বাইরে। তাঁর ভাষায়: ‘আমার অনুপস্থিতি, আমি যে শারীরিকভাবে সেখানে উপস্থিত ছিলাম না - এই বিষয়টি খুব সুক্ষ্ম অনুভূতির মধ্য দিয়ে আমার মনে হানা দিতে লাগল। আজ বুঝতে পারি সেই অনুভূতিটা ব্যর্থতার।’ তার পরিবারের মর্মন্তুদ ক্ষতি করে ঘুর্ণিঝড় – পরিবারের বিভিন্ন সদস্য ও তাদের ছেলেমেয়েরা ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও অন্যান্য জায়গায় ছিটকে পড়ে, সেখানে ছাদের থেকে পরিত্রাণের রোমহর্ষক কাহিনিও রয়েছে - লেখিকা সেসব বৃত্তান্ত দিয়েছেন।
কাটরিনার মরণছোবলের পর কোনরকম আগাম বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জঞ্জাল পরিষ্কারের ট্রাক এসে হলুদ বাড়িটি সমূলে তুলে নিয়ে যায়। লেখকের ভাষায়:
‘এই বাড়িটির ভেতর আমার বাবা ছিলেন, তার সত্তা এখানে রক্ষিত ছিল। এই বাড়িটিতে তার নানান চিহ্ন রয়েছে। যতদিন বাড়িটি ছিল, এই চিহ্নগুলো ছিল, বাবা পুরোপুরি চলে যাননি। এবার, হঠাৎ করে, তিনি চলে গেলেন।’
ব্রুম নিউ অরলিন্স ফিরে আসেন। তিনি নিউ অরলিন্সের মেয়র রে নেগিনের দফতরে গণযোগাযোগের একটি চাকরি নেন। তিনি তার আদরের ভাই কার্লের সাথে সময় কাটান। কার্ল NASA-এর বাগানে কাজ করেন। প্রতি রাতে ফিরে এসে যেই স্থানে হলুদ বাড়িটি ছিল, সেই খালি জমিটি পাহারা দেয়। আজ প্রায় পুরো পাড়াই পরিত্যক্ত। কিন্তু কার্ল জমির ঘাস নিয়মিত ছেঁটে পরিষ্কার রাখে। কারণ, লেখিকার ভাষায়: ‘আমাদের থেকে এই জমি কেড়ে নিতে পারে – যে কোন কারণে বা কোন কারণ ছাড়াই – এই হল আমেরিকার ইতিহাসের একেবারে মৌলিক সত্য।’

সবকিছুতেই গোলমাল। উচ্চ মহলে তার নানা যোগাযোগ সত্ত্বেও উধাও হওয়া বাড়িটির জন্য ব্রুম মায়ের ক্ষতিপূরণ যোগাড় করতে পারেনা। (পর্যায়ক্রমে একেক উকিলের দল নথি ‘হারিয়ে’ ফেলে, ফলে সাত বছর লেগে যায়।) তাঁর নিজ শহরের প্রতি লেখিকা অসহায় অনুভব করেন, তার শিকড়ের সাথে দূরত্ব অনুভব করেন। তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে এই বইটির গবেষণার কাজ শুরু করেন। অর্থাৎ তার পারিবারিক ইতিহাস, এবং নিউ অর্লিন্স-এর ইতিহাসের নানান অলিগলি যেখানে যেখানে এসে যুক্ত হয়েছে, সেইসব বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাটি আরম্ভ করেন। শহরের নানান জায়গায় আবাসনের নথি, নগর পরিকল্পনার নথি, সবই তার নাগালের মধ্যে, কিন্তু বাড়ি পৌঁছুবার পথ আর খুঁজে পান না। কোথায় বাড়ি? তার পরিবারের সদস্যরা দিকে দিকে ছড়িয়ে রয়েছে, এবং জেসমিন ওয়ার্ডের Men We Reaped (যেই পুরুষ আমরা পেয়েছি) বইয়ের মত তারঁ বেলাতেও তার সব বন্ধুরা হয় মৃত, নয়তো কারাগারে, নয়তোবা কে জানে কোথায় চলে গিয়েছে।

পরিবার, মাটি আর হারানোর মাঝে যে বেদনাবিধুর বন্ধন, সেটার উন্মোচনে ‘হলুদ বাড়ি’ মনে করিয়ে দেয় লরেট সাভয়-এর কাব্যময় স্মৃতিকথা ‘Trace’ (ছায়াপাত)-এর কথা। সেই বইয়ে সাভয় তাঁর মিশ্র-বর্ণের পূর্বসূরীদের হারানো স্থান-এর সাথে বিস্তৃত, বহুবিচিত্র আমেরিকার যোগসূত্র স্থাপন করেন। ‘হলুদ বাড়ি’-এর সাথে একইভাবে মিল পাই জে. ড্রু ল্যানহামের ‘The Home Place’ (বাড়ির জায়গা) বইটির।

স্যারা এম. ব্রুম লেখিকা হিসেবে যেমন বিদূষী তেমন তার চিন্তার বিস্তার। বিশাল বিশাল বিষয় তিনি আত্মস্থ করেন। ‘হলুদ বাড়ি’ আফ্রিকান আমেরিকান পরিবারের থেকে নিরবিচ্ছিন্ন আর্থিক বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কাহিনি, সে তারা যতই পরিশ্রম করুন না কেন। পরিবেশের যে ভয়াবহ সঙ্কট সহজে অনুমেয় ছিল সেই সঙ্কট ও তার মর্মবিদারক পরিণতি থেকে আমাদের সবচাইতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে আমাদের দরিদ্র পাড়াগুলোর প্রতি আমাদের চুড়ান্ত অবহেলা। তুলে ধরা হয়েছে অঙ্গীকারের ধাপ্পাবাজি – যার ফলে অঙ্গীকার হয় বাস্তবায়িত হয় না, নতুবা বড্ড সহজে ভঙ্গ করা হয়। তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে অবকাঠামোর গভীর সমস্যা রাজনীতিকরা এবং আমরা সবাই এড়িয়ে যাই।

সেই সাথে ‘হলুদ বাড়ি’ ভালোবাসা এবং শত প্রতিকুলতায় হার না মানার কাহিনি। একজন মাতা কিছুতেই হার মানেন না, তার সন্তানদের সাহায্যের হাত বাড়াতে কখনোই দ্বিধা করেন না। লেখিকার ভাষায়: ‘আমার মা তার ক্রোধ ও হতাশা মনের গভীরে লুকিয়ে রাখতেন, তার বাহ্যিক শিষ্টতার অনেক, অনেক নীচে।’ আর রয়েছে একটি তরুণীর কাহিনি যার জীবনের আঁকাবাঁকা পথ তাকে প্রথমে তার পরিবার থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে আবার কাছে ফিরিয়ে আনে। তাঁর নিজের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করার জন্য তাঁকে সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে হয়। তার একটা গভীর উপলব্ধি ঘটে যে চেতনার কিছু কিছু ফাঁক পূরণ হবার নয়।

ব্রুম যেন সমগ্র পৃথিবীকে বুঝবার দায়িত্ব আপন স্কন্ধে তুলে নিয়ে বেসামাল হয়ে গেছেন। আমাদের আশা রইল তিনি ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো নিয়েও ‘হলুদ বাড়ি’-এর মত দরদ ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুসন্ধান করবেন। তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেন যে তিনি যেসব প্রশ্ন তোলেন, তার ভাষায় ‘তার উত্তর পাওয়া অসম্ভব।’

তিনি লেখেন: ‘এই স্মৃতিচারণ, এই মনে করা ব্যাপারটা একেবারেই সহজ নয়।’ তথাপি আমরা অধীর আগ্রহে তার নতুন অনুসন্ধানের অপেক্ষায় রইলাম।

বিদেশে একবার জেলে যাবার উপক্রম হয়েছিল - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

এ যেন বাড়িতে কারুকে খাবার নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে হঠাৎ একসময় তাকে ঠেলে নবার করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া। অনেকটা সেরকমই অভিজ্ঞতা হয়েছিল চেকোশ্লোভাকিয়ায়। অনেক দেশে সরকারি আমন্ত্রণে ঘুরেছি, কখনাে এমন নাটকীয় অবস্থার মধ্যে পড়িনি।

চেকোশ্লোভাকিয়া নামে এখন আর কোনাে দেশ নেই পৃথিবীর মানচিত্রে। চেক রিপাবলিক এবং শ্লোভাকিয়া নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে গেছে। ভাগ হয়ে যাবার মাত্র কিছুদিন আগেই আমরা গিয়েছিলাম সেখানে। ছ’জন ভারতীয় লেখক-লেখিকার একটি প্রতিনিধি দল।

ভারত সরকার আমাদের বিমান ভাড়া দেয়, ওদেশে পৌঁছােবার পর আতিথেয়তার সব ভার নেয় ওদেশের সরকার। তখনাে চেকোশ্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়নি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে চাপা উত্তেজনার ভাব রয়েছে, তা আমরা বুঝতে পারিনি প্রথমে। কিন্তু আতিথেয়তার মধ্যে যে আন্তরিকতা বা উষ্ণতার অভাব, তা আমরা অনুভব করেছিলাম। সরকারি কর্মচারিরা তাদের কর্তব্য সারে, আন্তরিক হতে যাবেই বা কেন, তবু একটা লােক-দেখানাে আন্তরিকতা তাে থাকেই, সেটারও যেন অভাব ছিল।

পৌঁছােলাম প্রাগ শহরে, যথারীতি আমাদের একটা মস্ত বড় হােটেলে তােলা হলাে। সব কমিউনিস্ট দেশের একই নিয়ম, পাসপাের্ট জমা রাখতে হয় হােটেলের কাউন্টারে। এসব দেশের ভিসাও অন্যরকম, পাসপাের্টে ছাপ দেয় না, অন্য একটি আলাদা ভিসা ফর্ম থাকে, তাতে ছবি সাঁটা থাকে, সেটা পাসপাের্টের মধ্যে রেখে দিতে হয়। আমি পােল্যাণ্ড, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, চীন, রাশিয়া ঘুরেছি, এসব নিয়ম আগে থেকেই জানি। কোনাে বিদেশির পক্ষে একা যেখানে সেখানে ঘােরাঘুরির নিয়ম নেই, সঙ্গে সব সময় একজন গাইড থাকে। সে দোভাষীর কাজও করে, আবার অতিথিদের গতিবিধির ওপর নজরও রাখে।

আমাদের গাইডের নাম আন্না। একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা। খুবই শুকনাে পাকানাে চেহারা, স্তন আছে কিনা বােঝাই যায় না, দশ বারাে দিন তার মুখে কখনাে একটুও হাসির রেখা দেখিনি। তবে সে ইংরিজিটা জানে খুবই ভালাে। অন্য অনেক দেশে দোভাষীদের ইংরিজি নিয়ে মাঝে মাঝে থতােমতে খেতে দেখে মজা পেয়েছি। আন্নার সময়জ্ঞানও নিখুঁত, কোথাও বেরুবার জন্য আমাদের দু'এক মিনিট দেরি হলেই সে খুব তাড়া দেয়। তারপরেও দেরি হলে বিরক্ত হয়।

প্রত্যেকবারই লেখকের দলটিতে একজনকে নেতা বা নেত্রী হিসেবে ঠিক করা হয়। সেবার আমাদের দলে ছিলেন মালায়লম ভাষায় প্রখ্যাত লেখিকা সুগথা কুমারী। তিনি সমাজসেবীও বটে, বলা যেতে পারে তিনি কেরালার মহাশ্বেতা দেবী। তাঁকেই নেত্রী করা হলাে। সব ব্যাপারেই তার খুব কৌতুহল, তিনি অনেক প্রশ্ন করেন, তাঁর সেইসব প্রশ্ন ও উত্তর শুনে আমরা লাভবান হই ।

এই প্রাগ শহর (স্থানীয় নাম প্রাহা) এক সময় ছিল বােহেমিয়ার অন্তগর্ত। তবে বােহেমিয়ান শব্দটি এখনাে চালু থাকলেও সেই শব্দে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তার সঙ্গে এখানকার বর্তমান অধিবাসীদের কোনাে মিল নেই। সব কিছুই নিয়ম কানুনে বাঁধা, মানুষজনের চলাফেরাও যেন যান্ত্রিক। আমাদের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঠাসা প্রােগ্রাম, কারখানা দেখতে যাওয়া, যৌথ খামার, বিশ্ববিদ্যালয়, লেখক সমিতি, প্রকাশক-সমিতি, শান্তি সমিতি ইত্যাদি নানান সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলােচনা, সে সব আলােচনাও নিছক দায়সারা। আসলে বেশির ভাগ সরকারি কর্মচারিই তখন সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ফুসছে, পার্টির খবরদারি সহ্য করতে পারছে না। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেটাই প্রাণপণে গােপন করার চেষ্টা।

সবগুলাে জায়গায় আমাদের যাবার ইচ্ছে থাক বা না থাক, যেতেই হবে। সেটাই আন্নার দায়িত্ব। আমার অবশ্য পরপর দৃশ্য বদল পছন্দ হয় না, অনবরত নতুন নতুন গােষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলতেও ভালাে লাগে না। মাঝে মাঝেই আমি বলি, যাও। তােমরা কারখানা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় দেখে এসাে, আমি নদীর ধারে অপেক্ষা করছি।

প্রাগ শহরটির দুটি ভাগ। নতুন অংশটির বিশেষত্ব নেই, শুধু লম্বা লম্বা বাড়ি আর অফিস-আদালত, কিন্তু প্রাচীন অংশটি বড়ই দৃষ্টিনন্দন। পুরােনাে আমলের পাথরের বাড়ি, দূরে দেখা যায় যােড়শ শতাব্দীর রাজপ্রাসাদ। শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী, সে নদীর নামটা উচ্চারণ করা শক্ত, স্লটাভা বলা যেতে পারে (Vlatava River) খুব চওড়া নয়। দু'পাশে সবুজ ঘাস, গালিচার মতন, সেখানে নানা রঙের পােশাক পরা ছেলেমেয়েরা রােদ পােহাচ্ছে শুয়েশুয়ে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে, একটু একটু আদর, খুব বেশি লজ্জাহীন নয়। অনেকে আবার পাশাপাশি শুয়ে একই বই পড়ছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে কৌতুহলী হয়ে লক্ষ করলাম, অনেকেই যেটা পড়ছে, তা ছাপা বই নয়, কোনাে বইয়ের জেরক্স কপি। ইংরিজি জানা ছেলেমেয়ে খুঁজে পাওয়া শক্ত, তবু বেশ কয়েকজনকে প্রশ্ন করার পর একজন বুঝতে পেরে বললাে, তারা পড়ছে ফ্রানৎস কাফকার বই!

এ বই কিনতে পাওয় যায় না?

-না।

-কেন?

-হারামজাদারা ফ্রানৎস কাফকার বই নিষিদ্ধ করেছে।

সে হারামজাদারই সমতুল্য একটা গালাগাল ব্যবহার করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে।

এটা একটা মজার ব্যাপার। ফ্রানৎস কাফকার জন্ম-কর্ম এই শহরে। তার বাড়িটি এখনাে আছে, অনেকেই দেখতে যায়। এ দেশের শ্রেষ্ঠ লেখক, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকের রচনা তার জন্মভূমিতে নিষিদ্ধ কেন? তার লেখায় তাে রাজনীতি নেই। তিনি কমিউনিজমের বিরুদ্ধেও কিছু লেখেননি। তার লেখা অ্যাবস্ট্রাক্ট সমাজ বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে, শুধু সেই জন্য ?

প্রকাশক সমিতির সভাপতিকে আমি পরে জিগ্যেস করেছিলাম, আপনারা কাকার বাড়ি সাজিয়ে রেখেছেন অথচ তার রচনা নিষিদ্ধ করেছেন কেন?

- নিষিদ্ধ তাে নয়।

-তাঁর বই পাওয়া যায় ?

-হ্যাঁ, পাওয়া যাবে না কেন?

—আমি যে কয়েকজনের কাছে শুনলাম, তাঁর বই জোগাড় করা সম্ভব নয়।

-তাহলে বােধহয় এখন আউট অফ প্রিন্ট হয়ে আছে।

-সৰ বই আউট অফ প্রিন্ট? কতদিন ধরে আউট অফ প্রিন্ট বলতে পারেন? তিনি খানিকটা ইতস্তত করে, কাগজপত্র দেখে বললেন, কুড়ি বছর!

একজন বিশ্ববিখ্যাত লেখকের বই কুড়ি বছর ছাপা হয়নি, অথচ নিষিদ্ধ নয়, এর চেয়ে মিথ্যে কথা আর কী হতে পারে?

যারা পড়বার তারা কিন্তু ঠিকই পড়ছে। বই যে কখনাে নিষিদ্ধ করে রাখা যায় না, তা শাসক শ্রেণির গাড়লরা কোনাে দেশেই বােঝে না।

ভ্লাটাভা নদীর ওপর যে সেতু, সেটির কিন্তু ইংরিজি নাম চার্লস ব্রিজ। বারবার সেই সেতু পারাপার করতে করতে নদীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়। এক-একবার আমি ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে গিয়ে বসি, নদীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলি। নদী বেশ বুঝতেও পারে মনে হয়।

চালর্স ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে একজন লােককে সেই নদীর বুকে পয়সা ছুঁড়ে দিতে দেখে আমার বেশ মজা লেগেছিল। আমাদের দেশে এরকম অনেক দেখেছি। গঙ্গানদী যে কত পয়সা খেয়েছে তার ঠিক নেই। এদেশেও সেরকম সংস্কার আছে নাকি? রােম শহরে একটা ঝর্ণায় পয়সা ফেলে অনেক লােককে মানত করতে দেখেছি বটে।

ভ্লাটাভা নদী তেমন গভীর নয় এখন। জলও খুব স্বচ্ছ। তলায় পয়সা পড়ে আছে, দেখা যায়।

কয়েকদিন পর আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলাে স্লোভাকিয়ার দিকে। এখানকার রাজধানীর নাম বাতিশ্লাভা। যাবার আগে আন্নার কাছ থেকে বিদায় নিতে হলে প্রচুর ধন্যবাদ জানিয়ে। যদিও মনে মনে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তার ব্যবহার ছিল কড়া হেডমাস্টারনীর মতন!

বাতিশ্লাভায় এসে বােঝা গেল, দু'অঞ্চলে অবস্থার তফাত কত প্রকট। একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থা। এখানে চাপা দেবার চেষ্টাও নেই, সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যেই অভিযােগ জানায়, এমনকি আমাদের মতন বিদেশিদের কাছেও। এদের অভিযােগ দুরকম। স্থানীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং চেকদের দাদাগিরির বিরুদ্ধে। সেই জন্যই শ্লোভাকিয়া পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, সে খবর শুনে আশ্চর্য হইনি! যেমন মুসলমান ধর্ম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাখতে পারেনি। সেইরকম কমিউনিজমও চেক ও শ্লোভাকিয়ার মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি।

এক জায়গায় আমরা কনসার্ট শুনতে গেছি। হঠাৎ বাজনা থামিয়ে তরুণ বেহালাবাদকটি বলতে শুরু করলাে, জানেন, সরকার আমাদের পয়সা দেয়? তাতে খাওয়া জোটে না। আমি বিদেশে যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছি, তাও যেতে দেবে না শুয়ােরের বাচ্চারা !

এরকম আমি আর কোনাে দেশে শুনিনি।

বাতিশ্লাভার এক বৃদ্ধের মুখে একটা ব্যাপার শুনেও মজা লেগেছিল। শহরটির একপাশে পাহাড়। তার ওপাশেই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর। বৃদ্ধটি বললেন, আগে (অর্থাৎ সােভিয়েত ব্লকে যাবার আগে) আমরা যখন ইচ্ছে ঐ পাহাড় পেরিয়ে ভিয়েনার কোনাে রেস্তোরাঁয় চা খেতে যেতাম। এখন ওখানে যাওয়া নিষিদ্ধ। যদি বা যাওয়ার অনুমতি মেলে, তাহলেও পূর্ব জার্মানির মধ্য দিয়ে দেড় হাজার মাইল ঘুরে যেতে হয়। অথচ ঐ পাহাড়ে উঠলেই শহরটা দেখা যায়।

এটা মজার ঘটনা নয়, করুণ। বৃদ্ধাটি অবশ্য বলছিলেন হাসতে হাসতে।

একজন বৃদ্ধ বললেন, আমি এখনও কমিউনিষ্ট, এই আদর্শের জন্য লড়েছি। কিন্তু নেতাদের লােভ আর ক্ষমতা দখলের জেদাজেদি আর সাধারণ মানুষের ওপর অনর্থক কড়াকড়ির জন্য সে আদর্শ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অল্প বয়েসী ছেলেমেয়েরা যে এই আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তার জন্য আমার মতন বুড়ােরাই দায়ী।

এবারে আসল ঘটনায় আসি।

বাতিশ্লাভায় আমাদের অন্য গাইড ছিল। সে আমাদের বিমানে তুলে দিল। প্ৰাগে এসে বিমান বদল করে আমাদের যেতে হবে দিল্লিতে।

প্ৰাগে পৌঁছে আমরা শুনলাম, আমাদের পরবর্তী বিমান ১৫ ঘণ্টা পরে আসবে কোনাে কারণে।

বিমান বন্দরে একজন সরকারি অফিসার উপস্থিত। সে আমাদের এই খবর জানিয়ে, করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললাে, আমি তা হলে চলি ?

আমরা এই পনেরাে ঘন্টা থাকবাে কোথায় ? অফিসারটি কঁধ ঝাকিয়ে বললাে, সে তাে আমি জানি না!

-আপনি জানেন না মানে?

--আজ রাত্রি আটটা পর্যন্ত আপনারা আমাদের অতিথি। তারপর তাে আমাদের আর কোনাে দায়িত্ব নেই।

–বিমান লেট হলে আমরা কী করতে পারি?

-তা তাে আমি জানি না!

—আমরা রাতটা কি তাহলে এয়ারপাের্টে কাটাবাে ?

-তা সম্ভব নয়। রাত এগারােটার পর কারুকেই এয়ারপাের্টে থাকতে দেওয়া হয় না।

-তাহলে কি আমাদের হােটেলে থাকতে হবে? সে খরচ দেবে কে?

--তা তাে আমি জানি না।

ভদ্রলােক বারবার তাতাে আমি জানি না, তাতাে আমি জানি না বলে সত্যি সত্যি বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমরা যাকে বলে, অগাধ জলে ! কারুর কাছেই বিশেষ টাকাকড়ি নেই। কোন হােটেলে থাকবাে, কে পৌঁছে দেবে, কিছুরই ঠিক নেই। আগে যে-হােটেলে ছিলাম, সেটা বিরাট হােটেল, অনেক খরচ!

ভারতীয় দূতাবাসে ফোন করে যে সাহায্য চাইবাে, তারও উপায় নেই। কারণ সেটা শনিবারের রাত। শনিবার-রবিবার কারুকেই পাওয়া যাবে না।

এসব দেশের সব এয়ারপাের্টেই আর্মির লােক থাকে। সেরকম একজন জবরদস্ত পােশাক পরা লােককে আমাদের অবস্থা খুলে বললাম। যদি তিনি আমাদের এয়ারপাের্ট রাত কাটাবার অনুমতি অন্তত দেন।

আর্মি অফিসারটি সমবেদনার ভাব নিয়ে আমাদের কথা শুনলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন যে খুবই দুঃখের কথা। কিন্তু তার করণীয় কিছু নেই। এয়ারপাের্টে থাকতে দেবার অনুমতি তিনি দিতে পারেন না। আরও উঁচু জায়গা থেকে আদেশ আনতে হবে, সেটাও শনিবার রাতে সম্ভব নয়।

তিনি কাছাকাছি কয়েকটা শস্তা হােটেলের ঠিকানা বাৎলে দিলেন।

ছ’জন মিলে এক ট্যাক্সিতে যাওয়া যাবে না। এসব দেশে চারজনের বেশি কিছুতেই নেয় না। প্যারিসে দেখেছি, তিনজনের বেশি নেবে না। সামনের সিটে বসতে দেয় না কোনাে যাত্রীকে।

এখন সুগতকুমারীর অনুরােধে আমাকেই হােটেল খোঁজার দায়িত্ব নিতে হলাে।

সঙ্গে গাইড নেই, ট্যাক্সি ড্রাইভাররা ঘােরাপথে নিয়ে যাচ্ছে কিনা, কী করে বুঝবাে? অনেক দূরে দূরে এক একটা হােটেল, কোনাে হােটেলেই একসঙ্গে দু’জনের জায়গা নেই।

এই অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে কেউ রাজি নয়। সবাই ভয় পাচ্ছে। এখানকার সরকারের ব্যবহারে আমাদের হতভম্ব অবস্থা। | হােটেল খুঁজতে গিয়ে ট্যাক্সি ভাড়ায় আমার নিজের অনেক পয়সা খরচ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আমি প্রস্তাব দিলাম, আমরা প্রথমবার এসে যে ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে ছিলাম, সেখানেই যাওয়া যাক। সেটা তবু আমাদের চেনা। অতবড় হােটেলে, সেখানে একসঙ্গে দু’জনের ঘর পাওয়াও সম্ভব। | তাই হলাে। ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে এসে আমরা আমাদের দুরাবস্থার কথা বুঝিয়ে বললাম। আগে ছিলাম সরকারি অতিথি, প্রত্যেকের আলাদা ঘর। যা খুশি খাবারের অর্ডার দিয়ে সই করে দিয়েছি। এখন থাকতে হবে নিজেদের পয়সায়। আমাদের খুব শস্তার ঘর চাই। | এসব কথা বুঝিয়ে বলতেও আমাদের কম ঝঞ্জাট হয়নি। প্রায় কেউই ইংরিজি বােঝে না। এ ওকে ডাকে, সে তাকে ডাকে। শেষ পর্যন্ত যে বুঝলাে, সেও কাঁধ ঝাকিয়ে বললাে, এ ব্যাপারে তার কিছু করার নেই। আমাদের পয়সা দিয়েই থাকতে হবে, খেতে হবে। তবে, একটা খুব বড় ঘর আছে। সেই এক ঘরে চারটি খাট, আর মেঝেতে বিছানা পেতেও শুতে পারে দু’জন। তাতে খরচ কম পড়বে।

অগত্যা আর উপায় কী! নারী-পুরুষ মিলে ছ’জন এক ঘরে। কেউ জোরে নাক ডাকে, কারুর পাতলা ঘুম। কারুর খালি গায়ে শােওয়া অভ্যেস, অথচ মহিলাদের সামনে জামা খােলা যায় না।

সব খাবারেরই বেশ দাম, তাই আমরা খেলাম শুধু সুপ আর পাঁউরুটি।

ঘর ভাড়া ছ’জন সমান ভাগ করে দেবে। আর কিছু বখশিস। আমার টাকাটা আমি রাত্রেই সুগতকুমারীর হাতে তুলে দিলাম, কারণ আমার সঙ্গে অন্য পাঁচজনের একটা তফাৎ আছে।

এই সব সরকারি প্রতিনিধি দলে যারা যায়, তারা সবাই রুটিন মতন ঘােরে ফেরে এবং নির্দিষ্ট দিনে দেশে ফিরে আসে। আমার মাথায় পােকা আছে, অত সহজে ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেই জন্যই সরকারি খরচে কোনাে দেশে গেলেও, তার কাছাকাছি কোনাে দেশ আমার নিজের খরচে দেখে আসতে ইচ্ছে করে।

এবারেও ঠিক করেই এসেছিলাম, আমি দলের সঙ্গে ফিরবাে না। ইস্তানবুল শহরটি দেখে যাবাে। ইস্তানবুলের নাম এককালে ছিল কনস্টান্টিনোেপােল, ইতিহাসের দিক থেকে এরকম রােমঞ্চকর শহর আর দ্বিতীয় আছে কিনা সন্দেহ। এই শহরের অর্ধেকটা এশিয়ায়, অর্ধেকটা ইওরােপে। তুরস্ক থেকে আমন্ত্রণ পাবার আশা খুব কম। সেই জন্য আমি দিল্লি থেকে ভিসা নিয়েই এসেছি।

অন্য সকলের দেশে ফেরার প্লেন বেলা এগারােটায়, কিন্তু আমার ইস্তানবুলের ফ্লাইট ভােরবেলা। সুতরাং, অন্যদের ঘুম না ভাঙিয়েও আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে।

কী করে ভাের চারটেয় উঠবাে, সেই চিন্তায় আমার সারারাত ঘুমই এলাে না।

যথাসময়ে আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। হােটেলের কাউন্টারে যে লােকটির ডিউটি ছিল, তারও চোখ ভরা ঘুম। আমার পাসপাের্ট ফেরৎ চাইতে সে একগাদা পাসপাের্টের মধ্য থেকে সেটা বার করে দিল। আমার ছবি-সমেত ভিসা ফর্মটি অর্ধেক বেরিয়ে আছে। | হােটেলের দারােয়ানদের ট্যাক্সি ধরে দিতে বললাম। ট্যাক্সি আর আসেই না। দেরি করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। নিজেই সুটকেস হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে ডেকে নিলাম একটা ট্যাক্সি।

এয়ারপাের্টে পৌঁছে একটা খবর জেনে খুব স্বস্তি হলাে, আমার ফ্লাইট ঠিক সময়ে আছে। আর কোনাে দেশে আমন্ত্রিত হয়ে এরকম নিজে ট্যাক্সি ডেকে একা একা এয়ারপাের্টে আসতে হয়নি। এখানে গতকাল রাত আটটায় আমাদের আতিথ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে, তারপর অতিথিরা গােল্লায় যাক বা না যাক, তাতে এদেশের সরকারের কিছু আসে যায় না।

সুটকেস চেক-ইন করে, একটা সিগারেট ধরাবার পর খানিকটা সময় নিয়ে তারপর দাঁড়ালাম ইমিগ্রেশান কাউন্টারে। তেমন ভিড় নেই। একজন মহিলা পাসপাের্ট পরীক্ষা করছেন।

আমার পাসপাের্ট ও ভিসার কাগজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করলেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল একটু পরে পাসপাের্টটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললেন, এটা কি তােমার পাসপাের্ট ?

আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লাে। জীবনে কখনাে একসঙ্গে এমন বিস্ময় ও ভয় অনুভব করিনি।

বােমা ফাটার মতন শব্দ করে আমি বললাম, না !

পাসপাের্টের ছবিটা আমার নয়। ভিসার কাগজটা আমার। হােটেলের লােকটি অন্যলােকের পাসপাের্টে আমার ভিসার কাগজটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমিও ভিসার কাগজে আমার ছবিটা দেখেই নিয়ে চলে এসেছি। তাছাড়া, সেই সময় লােকটি আমি কেন পয়সা না দিয়ে চলে যাচ্ছি, আমার পয়সা কে দেবে, এই নিয়ে ঝামেলা বাধাবার তাল করে আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়েছিল।

ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে একজন আর্মি অফিসারকে ডেকে আনলেন।। সেই লােকটি শুনলেন সব কথা। তারপর ঠাণ্ডা ভাবে বললেন, ভদ্র মহােদয়। নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে এখনই আমার গ্রেফতার করা উচিত। কারণ আপনি অন্যের পাসপাের্ট নিয়ে এ দেশ ছেড়ে বেরুবার চেষ্টা করছিলেন। সেটা শাস্তিযােগ্য অপরাধ। তাতে আপনার কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটা একটা ভুলেরই ব্যাপার। আপনাকে গ্রেফতার করলাম না। এখন আপনি কী করবেন?

আমার এমনই হতভম্ভ অবস্থা যে মাথায় কিছু এলাে না।

এক ঘণ্টার মধ্যে ইস্তানবুলের প্লেন ছেড়ে যাবে। আমি জানি, পরের ফ্লাইট চারদিন পরে। সেই চারদিন আমার পক্ষে এখানে থেকে যাওয়া সম্ভব নয়। চেকোশ্লোভাকিয়ার ভিসা আমার সেদিনই শেষ, তা ছাড়া টাকা পয়সার প্রশ্ন তাে আছেই।

এখন হােটলে ফিরে গিয়ে পাসপাের্ট বদলে আনতে গেলে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাবে। আমার জন্য তাে আর ইস্তানবুলের ফ্লাইট দাঁড়িয়ে থাকবে না।

তা হলে কী উপায়?

ইমিগ্রেশানের ভদ্রমহিলা বেশ সহানুভূতিশীল। তিনি বললেন, এখন আমরা যদি আপনাকে ছেড়েও দিই, আপনি ইস্তানবুলে এই নকল পাসপাের্ট নিয়ে ঢুকতে পারবেন না। এমনকি আপনার নিজের দেশ ইন্ডিয়াতেও তত আপনাকে আটকে দেবে, সেখানে আপনাকে অন্য পাসপাের্ট নিয়ে ঢোকার চেষ্টা করার জন্য অ্যারেস্ট করবেই। তা ছাড়া, আপনি যার পাসপোের্ট নিয়ে চলে এসেছেন, সেও তাে বিপদে পড়বে একই রকম।

এই পাসপাের্টটা দেবরাল নামে একজন হিন্দি লেখকের। সে বেচারি বােধহয় এখনাে। ঘুমােচ্ছে, কিছুই জানে না।।

আর্মি অফিসারটি বললেন, আমরা কোনাে অ্যাকশান নিচ্ছি না। আপনি চেষ্টা করে দেখুন, নিজের পাসপাের্ট নিয়ে আসতে পারেন কিনা।

হােটেল থেকে এয়ারপাের্ট আসতে সময় লেগেছিল পয়তিরিশ মিনিট। ভােরবেলা রাস্তা একেবারে ফঁকা ছিল। এখন যদি আমি ট্যাক্সি নিয়ে হােটেলে যাই, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসা অসম্ভব। ঠিক আছে, ইস্তানবুল না হয় বাদ দিলাম, পরের প্লেনে অন্যদের সঙ্গে দেশে ফিরবােই বা কী করে? সে ফ্লাইটে তাে আমার বুকিং নেই। এদিককার ফ্লাইটে তিন-চার মাস আগে বুক না করলে সিট পাওয়া যায় না।

এদিকে আমার সুটকেস চলে গেছে ইস্তানবুলের বিমানে।

ভাবছি, আর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দলের কারুকে ফোন করে বলবাে, আমার পাসপোের্টটা এনে, অন্যটা নিয়ে যেতে! বুঝিয়ে বলবাে, জামা কাপড় পরে তৈরি হবে। কাউন্টারে এসে কথা বলবে, আমার পাসপাের্ট অন্য কারুকে দেবে কিনা....।

যাই হােক, আমি হােটেলে ফোন করলাম।

এই রে, এখন যে কাউন্টারে রয়েছে, সে একদম ইংরিজি জানে না। সে চেক ভাষায় আমায় কী সব বলে যাচ্ছে, আমিও তা বুঝছি না কিছুই। যত বলি, ইংরিজি জানা একজনকে ডাকো, তাও সে বােঝে না।

হঠাৎ দেখি, কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছে আন্না। এ যেন সমুদ্রে ডুবন্ত লােকের সামনে একটি কাষ্ঠখণ্ড। চোখাচোখি হতে আন্না এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললাে, সুপ্রভাত। সব খবর ভাললা? আমি তােমাদেরই মতন আর একটি দেশের অতিথিদলকে নিতে এসেছি।

আমি তার হাত জড়িয়ে ধরে বললাম, আন্না, আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি।

ঝড়ের বেগে ঘটনাটা বর্ণনা করতে হলাে আমাকে।

আন্নার মুখের রেখায় কোনাে ভাবান্তর হলাে না। নিরস গলায় বললাে, হােটেলের লােকেরা অন্যায় করেছে ঠিকই। অন্য পাসপাের্ট তােমার ভিসার ফর্ম ঢুকিয়ে দিয়েছে। তােমারও ত্রুটি হয়েছে। হােটেল ছাড়ার সময় নিজের পাসপাের্ট খুব ভালােভাবে দেখে নেওয়া উচিত। দেখা যাক, এখন কী করা যায়।

আমি বললাম, সময়টাই যে আসল। আর মাত্র পঞ্চাশ মিনিট, এদিকে আমার সুটকেস— | এসব কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সে টেলিফোন করলাে হােটেলে। ওদের ভাষায় কী বলতে লাগলাে, তা তাে আমার বােঝার উপায় নেই। কিন্তু আন্না রীতিমতন গলা চড়িয়ে ধমকাচ্ছে। মনে হলাে, সে তাহলে সাধারণ গাইড নয়, তার অন্য কোনাে সরকারি পরিচয় থাকতে পারে।

ফোন ছেড়ে দিয়ে আন্না বললাে, হােটেলের ওপর সব দোষ চাপিয়েছি। ওদের নামে নালিশ করার ভয় দেখিয়েছি। ওদের বলেছি, এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি ড্রাইভারের হাত দিয়ে তােমার পাসপাের্ট পাঠিয়ে দিতে। অন্যটা সে-ই নিয়ে যাবে।

এরপর অধীর অপেক্ষা। ঘন ঘন সিগারেট টানা। এয়ারপাের্টে অনবরত ট্যাক্সি ঢুকছে। কোন ট্যাক্সিতে আমার পাসপাের্ট আসবে, বুঝবাে কী করে?

ঠিক পঁয়তিরিশের মাথায় দেখি, একজন ট্যাক্সি চালক একটা হাত জানলা দিয়ে বাইরে উচিয়ে রেখেছে। সেই হাতে একটা পাসপাের্ট।

এখনও বারাে মিনিট সময় আছে। দৌড়ে গেলে আমাকে ইস্তানবুলের ফ্লাইটে উঠতে দেবে। আন্নার অতিথিরা পৌঁছে গেছে। আফ্রিকার কোনাে দেশের, মালপত্রের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাকালাম আন্নার দিকে। এই মুহুর্তে তাকে কী সুন্দরী মনে হলাে। আন্নার সাহায্য না পেলে, এভাবে, এই সময়ের মধ্যে পাসপাের্ট উদ্ধার করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতাে না। আন্নাকে নিয়ে আড়ালে অনেক মস্করা করেছি, কিন্তু এদেশে সে-ই আমার সবচেয়ে উপকারি বন্ধু।

আমি তার কাছে গিয়ে বেশ আবেগের সঙ্গে বললাম, আন্না, তুমি আমার জন্য যা করলে—

আন্না বললাে, যাও। আর ভদ্রতা করতে হবে না। এরপর ফ্লাইট মিস করবে?

সে আমার গালে ঠোট ছোঁয়ালাে।

আমার মনে হলাে, এমন মধুর আদর জীবনে খুব কমই পেয়েছি।

ছুটে গিয়ে উঠে পড়লাম প্লেনে।

তারপর ইস্তানবুলে কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছি সম্পূর্ণ একা একা। কিন্তু সে তাে অন্য গল্প।

টা-নেহেসি কোট্‌স্‌-এর প্রথম উপন্যাসে ইতিহাসের সাথে অতিবাস্তব কল্পনা মিশেছে - এসি এডুগিয়ান - নিউ ইয়র্ক টাইমস - অনুবাদ আশফাক স্বপন


(নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পুস্তক সমালোচক মিচিকো কাকুতানি টা-নেহিসি কোট্‌স্‌-এর প্রবন্ধ সঙ্কলন ‘Between the World and Me’ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বইটি বর্তমান আমেরিকায় কালো মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে ধীর, মর্মবিদারক বিশ্লেষণ।‘ কাকুতানির সমালোচনার লিঙ্ক এখানে)
(https://riton.in/2NnCjl8)


টা-নেহেসি কোট্‌স্‌-এর প্রথম উপন্যাসে ইতিহাসের সাথে অতিবাস্তব কল্পনা মিশেছে
এসি এডুগিয়ান


নিউ ইয়র্ক টাইমস
২৪ সেপ্টেমবর ২০১৯

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনা
(https://riton.in/32rwW93)

Ta-Nehisi Coates’s Debut Novel Mingles History and Fantasy
By Esi Edugyan
New York Times, Sept. 24, 2019

The Water Dancer
By Ta-Nehisi Coates

কথাসাহিত্যে টা-নেহেসি কোট্‌স্‌ এর অভিষেক ঘটল The Water Dancer (জলনর্তকী) শীর্ষক বহুমেজাজি উপন্যাসের মাধ্যমে। এর আগে কোট্‌স্‌-এর নানান অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ত প্রবন্ধ আমেরিকায় বর্নবৈষম্য নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে। উপন্যাসের কাহিনি হিরাম ওয়াকার (ডাক নাম ‘হাই’) নামের এক ১২ বছর বয়স্ক ক্রীতদাসকে অনুসরণ করে। সে ভার্জিনিয়ার এক ক্রীতদাস শ্রমনির্ভর বড় খামারে কাজ করে। খামারের নামটি যেন বাস্তবতাকে ব্যঙ্গ করে - Lockless (তালাবিহীন)। হাই বুদ্ধিমান, তার নানান গুণের মধ্যে একটি হল নিখুঁত স্মৃতিক্ষমতা।

হাই খামার মালিকের ঔরসজাত পুত্র। দাসপ্রথার নির্মমতা যে কেমন স্বেচ্ছাচারী আর বিকৃত, সেটা একটি ঘটনায় প্রকাশ পেল। ঘটনাচক্রে তাকে মালিকবাড়িতে ডাকা হল তার আপন ভাইয়ের ভৃত্যের দায়িত্বপালনের জন্য। কিন্তু এক সন্ধ্যায় দুই ভাই বাড়ি ফেরার পথে একট সেতু পার হবার সময় সেতুটি ধ্বসে পড়ে। হাই-এর ভাইয়ের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু সে নিজে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। সে যে বাঁচল, সেটা শ্রেফ ভাগ্যক্রমে নয়। সে স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ করে যে তার একটা বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে সেটা সে ভালো করে বোঝে না, এমনকি চায়ও না।

মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে সে নিজের জীবনের মূল্য কী, সেটা সম্বন্ধে নতুন করেউপলব্ধি করে। সে ঠিক করে, তার প্রেয়সী সোফিয়াকে নিয়ে লকলেস খামার থেকে পালিয়ে যাবে। কিন্তু সব গণ্ডগোল হয়ে যায়, এবং অবশেষে হাই আন্ডারগ্রাউন্ড নামের একটি গোপন সংগঠনের সদস্যদের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এই সংগঠন ক্রীতদাসদের পালিয়ে উত্তরে মুক্তজীবন লাভ করায় সাহায্য করে।

আন্ডারগ্রাউন্ড হাই-এর অলৌকিক ক্ষমতা অত্যন্ত মূল্যবান সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করল। আবার হাইয়ের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ডের সাহায্যের প্রস্তাব একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে হল। এই সুযোগ শুধু সোফিয়াকে উদ্ধার করা নয়। যেই বিষময় ব্যবস্থা তার আপনজনকে বন্দী করেছে, এবার তার ক্ষতি করা, এবং অবশেষে ধ্বংস করার সুযোগ এল। তাই মাঠের ক্রীতদাসের স্বরূপ বদলে গেল, সে হয়ে উঠল মাঠপর্যায়ের কর্মী। এই বদল হাইকে রোমাঞ্চিত করে, আবার গভীরভাবে ভাবায়। হাই পরিবর্তন আনায় তার নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়।

কোলসন হোয়াইটহেডের-এর (Colson Whitehead) The Underground Railroad (পাতাল রেল) উপন্যাসে আমরা যেমনটা দেখেছি, এখানেও কোট্‌স্‌ দাসপ্রথার ভয়াবহতার সাথে অতিবাস্তব কল্পনার একটা ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। যারা ক্ষমতাহীন, লেখক তাদের গুণের চৌহদ্দি প্রসারিত করেছেন, সেখানে অতিবাস্তব ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে ‘জলনর্তকী’ একেবারেই নিজস্ব সৃষ্টি, এর অতিবাস্তবের ইঙ্গিত বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত। মোদ্দা কথা হল, উপন্যাসটির আগ্রহ ক্রীতদাসপ্রথার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া আবিষ্কারে। এই মর্মান্তিক বেদনার স্বরূপের নানান দিক উদ্ধারে কোট্‌স্‌-এর মুনসীয়ানা উল্লেখ্য।

মালিক ও ক্রীতদাস উভয়ের জীবনে যে বৈপরীত্য বিদ্যমান, সেটা বিশেষ দক্ষতার সাথে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন, একই সাথে ক্রীতদাস ও তাদের ভাবী মালিকদের লালন-পালন করার যে প্রথা চালু ছিল, যার ফলে লেখকের ভাষায় ‘একজন বড় হয়ে রাণী হবে, আরেকজন, পা-দানি,’ তার প্রতি বিশদভাবে নজর দেওয়া হয়। ঠিক একইভাবে গভীর দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে ক্রীতদাস নিলামের সভায় অসম্মানজনক শারীরিক পরীক্ষার প্রতি, যেখানে লেখকের ভাষায় ‘মানুষ আরেকটি মানুষকে সম্পূর্ণ মাংসপিণ্ড হিসেবে যাচাই করবার ক্ষমতা নিয়ে আত্মপ্রসাদ পায়।’ কোট্‌স্‌ দাসপ্রথায় আবদ্ধ মানুষের মধ্যেও যে দ্বন্দ্ব সংঘাত রয়েছে সেটা তলিয়ে দেখেন। কোন ক্রীতদাস হয়েতো অন্য ক্রীতদাসের ওপর গোয়েন্দাগিরি করে, বা কখনো কোন ক্রীতদাস নিজের উন্নতির জন্য অন্য কারো সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।

হাই নিজের অবস্থানকে আত্মস্থ করে যেভাবে সেই সম্বন্ধে আত্মসচেতনতা লাভ করে, সেটা পাঠককে সবচাইতে বিচলিত করে। ক্রীতদাস হিসেবে তার সামাজিক অবস্থান এমন গভীরভাবে তার চেতনায় গেঁথে গেছে, যে ভাল উদ্দেশ্য নিয়েও একজন শ্বেতাঙ্গ - সম্পত্তি হিসেবে নয় - একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে যখন তাকে অভিবাদন জানায়, সে আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়। কোট্‌স্‌-এর সৃষ্ট জগতে যে কোন একটা আলিঙ্গনে একটি দুর্লক্ষ্য বিস্ময়কর নতুন উপলব্ধি ঘটতে পারে।

উপন্যাসে কিছু হৃদয়বিদারক দৃশ্য আছে। উপন্যাসের এক জায়গায় এক বয়োজ্যেষ্ঠ ক্রীতদাস কী করে নাশকতার জন্য কঠোর শাস্তিভোগ করে সেই কাহিনি বলে। কাজটি সে অপরাধবোধের কারণে করেছিল। তার পুত্রের অনুপস্থিতিতে সে পুত্রের প্রেমিকাকে নিজের প্রণয়িনী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু পুত্র ফিরে আসে। সেই গ্লানি দুঃসহ। আরেকটি মর্মান্তিক দৃশ্যে এক মুক্তিপ্রাপ্ত মা ১২ বছর বয়স্ক ক্রীতদাস পুত্রকে প্রতিদিন দেখতে আসে। হঠাৎ বালকটি বিক্রি হয়ে যায়। মা পরস্পর-দড়িতে বাঁধা ক্রীতদাসের সারিতে চলমান পুত্রের পাশে হাঁটে আর অঝোর নয়নে কাঁদে।

কোট্‌স্‌ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন কীভাবে সচেতনভাবে অজ্ঞতার সাহায্যে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়। কালো মানুষের প্রতি ইচ্ছাকৃত নিস্পৃহতা দ্বারা ওদের মানবিকতা অস্বীকার করা হয়। বিষয়টি বোঝা মানেই কালো মানুষের প্রতি কিছুটা সহমর্মিতা অনুভব করা, এবং মালিকের মনে এমন অনুভূতির অনুপ্রবেশ পুরো ব্যবস্থাটির পতন ঘটাতে পারে। লেখকের ভাষায় ‘কোন মায়ের সামনে একটা ছোট বাচ্চাকে বিক্রি করতে হলে প্রয়োজন সেই মাকে যতটা সম্ভব কম চেনা। একটা পুরুষকে নগ্ন করে, তাকে প্রহারের আদেশ দিয়ে, তাকে চাবুকে চাবুকে ক্ষত বিক্ষত করে তাতে লবণপানি ছিটাতে গেলে কোনভাবেই তার প্রতি নিজের আপনজনের মতো অনুভব করা চলবে না। ওর মধ্যে নিজেকে দেখা চলবে না, পাছে হাত আটকে যায়।’

তবে একথা সত্যি যে এতে প্রথম উপন্যাসের কিছু অসংলগ্নতা রয়েছে। রোমাঞ্চকর ঘটনা সত্ত্বেও লেখায় কখনো কখনো গতিশীলতার অভাব রয়েছে। সংলাপ বড্ড বেশি বর্ণনামুখর। প্রায় প্রতিবারই হাই কোন নতুন চরিত্রের সাক্ষাত পেলেই সে বিশদভাবে হাইকে তার নিজের ইতিহাস শোনায়। যদিও কাহিনির শুরুতে আমাদের বলা হয়েছে যে মানুষ হাই-কে একজন মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাই তারা তাকে নিজের মনের কথা না বলে থাকতে পারে না, তবুও এইসব আত্মকথন বড্ড কষ্টকল্পিত আর অস্বাভাবিক মনে হয়।

তবে উপন্যাসের অঙ্গুলিমেয় কিছু দুর্বলতায় তুলনায় এর বিশাল গুণের পাল্লাই ভারী। যখন হাই নিজে ভিটায় ফিরে আসে, নিজের জন্মস্থানের সাথে সে একধরনের দূরত্ব অনুভব করে। লেখকের ভাষায় ‘এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, নতুন দৃষ্টিতে এই স্থানটিকে দেখা। যেই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমি দৌড়েছি, কঠোর প্রশিক্ষণের সময়ে এই সম্পূর্ণ এলাকাটির পরিচয় আমি জেনেছি। এই তো লতাপাতার বাহারে সুশোভিত গাছ গাছালি দেখছি। একটু পড়েই পাহাড়। সেখানে খোলা একটুখানি জায়গা আছে, পাথরের ছাদ আছে। সেখানে দৃষ্টির কাছে বিশ্ব নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এই আঁধারী সময়ের সম্পদ মাইলের পর মাইল জুড়ে পরিষ্কার দেখা যায়। কিন্তু মনের গভীরে আমার ভয় হয়, এই বুঝি আমি ক্রীতদাসের দেশে ফিরে এসেছি, এবং এবার এই দেশের আমার ওপর নজর পড়েছে।’

হাই এর জন্য বাড়ি এখন আর একটা স্থান নয়, এটা এখন একটা মনের অবস্থা,যার অবস্থান তার প্রিয়জনের মাঝে যারা তাকে ভালোবাসে। যখন হাই ভাবে, ‘আমি জীবনে কদাচিত কাউকে বিদায় জানাবার অধিকার লাভ করেছি,’ তখন সে যেন ক্রীতদাসপ্রথায় বন্দী মানুষের মানবিক সম্পর্কের বেদনাবিদ্ধ বাস্তবতার সারকথাটি বলে। এখানে ভালোবাসা যায়, কিন্তু অধিকার লাভ করা যায় না। হাই-এর মতে সেই ভালো। কারণ মানুষের কখনো একে অপরের অধিকার লাভ করে সমীচীন নয়, এমনকি উদ্দেশ্য নিঃস্বার্থও হলেও নয়।

অবশেষে হাই আবিষ্কার করে যে মুক্তি সম্বন্ধে তার নিজের মত যাই হোক না কেন, অন্যে কীভাবে তার স্বরূপ নির্ণয় করবে সেটা হাই-এর ওপর নির্ভর করে না। এমনকি কেউ যদি খাঁচায় বন্দী থাকার পথও বেঁছে নেয়, সে তাঁদের ওপর তার নিজের মুক্তির ধারণা চাপিয়ে দিতে পারেনা। প্রতিটি মানুষকে তার নিজ নিজ মুক্তির স্বপ্ন অনুযায়ী এগোতে হবে। উপন্যাসের একটি চরিত্রের ভাষায়, ‘এই নরক থেকে সবাই বের হয়ে আসতে চায়। কীভাবে বের হবে, সেটাই আসল কথা।’

হাই যদিও কিছুটা শান্তি লাভ করে, তবুও কোথায় একটা ছায়া রয়ে যায়। এখনো যেই অনাচার চলতে থাকবে, সেটা নিয়ে তার মনে তিক্ততা রয়ে যায়। অতিবাস্তব ক্ষমতাও এই মর্ত্যে তার জীবনের নিশানা নির্ধারণ করার শক্তি দিতে পারে না। বহু শতাব্দীর অবিচার খণ্ডন বা সংশোধন করা সেই ক্ষমতার সাধ্যের অতীত। তার ক্ষমতা নেই চিরস্থায়ী সুবিচার সৃষ্টি করবার।

LISTEN TO A SAMPLE FROM THE WATER DANCER (OPRAH’S BOOK CLUB)


আশফাক স্বপন ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী উপমহাদেশীয় সংবাদ মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে ঢাকার Daily Star ও কালি ও কলম পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। তার লেখা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো ছাড়াও পাকিস্তানের Dawn, ভারতের Times of India ও Statesman পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আটলান্টায় থাকেন।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট