সাহিত্যপত্র - বুদ্ধদেব বসু

সাহিত্যপত্র
বুদ্ধদেব বসু




বাংলায় প্রথম লিটল ম্যাগাজিন কি? কেন লিটল ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা? বুদ্ধদেব বসুর অসাধারণ প্রবন্ধটা পড়ে চমকিত হলাম - সাহিত্যপত্র। কোন পত্রিকায় লেখা প্রকাশ বিজ্ঞাপন আর কোন পত্রিকায় তা আত্মপ্রকাশ? রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রমথ চৌধুরী হয়ে বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, 'সবুজপত্র', 'পরিচয়'...সৎ সাহিত্য, সৌখিন সাহিত্য, পড়ে ফেলে দেওয়া সাহিত্য, চেটেপুটে ন্যাপথলিন দিয়ে সংগ্রহে রাখা সাহিত্য ইত্যাদি নানা কথা। অল্প কয়েকটা পাতায়। - সৌরভ ভট্টাচার্য্য

এক রকমের পত্রিকা আছে যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই-যদি না কোনাে সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত এবং বিব্রত করেন আমাদের। আর-এক রকমের পত্রিকা আছে যা রেলস্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাতে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি, চেখে-চেখে আস্তে-আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাজের মধ্যে ন্যাপথলিন-গন্ধী তােরঙ্গে তুলে রাখি-জল, পােকা, আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্য। যে-সব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুত হতে চায়— কৃতিত্ব যেইটুকুই হােক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে : চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।লিটল কেন? আকারে ছােটো বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? না কি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব ক-টাই সত্য, কিন্তু এগুলােই সব কথা নয়; ঐ ‘ছােটো’ বিশেষণটাতে আরাে অনেকখানি অর্থ পােরা আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ : এক জোড়া মলাটের মধ্যে সব-কিছুর আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বােঝা গেলাে যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনাে ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়ােবাজারে বিকোবে না কোনােদিন, কিন্তু হয়তাে—কোনাে-একদিন এর একটি পুরােনাে সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এইজন্যেই যে এটি কখনাে মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিলাে। চেয়েছিলাে নতুন সুরে নতুন কথা বলতে ; কোননা-এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিলাে—নিন্দা, নির্যাতন বা ধনক্ষয়ে প্রতিহত না-হয়ে। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না-করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা—এইটেই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম। আর এটুকু বললেই অন্য সব কথা বলা হয়ে যায়, কেননা এই ধর্ম পালন করতে গেলে চেষ্টা করেও কাটতি বাড়ানাে যাবে না, টিকে থাকা শক্ত হবে, আকারেও মােটাসােটা হবার সম্ভাবনা কম। অবশ্য পরিপুষ্ট লিটল ম্যাগাজিন দেখা গেছে—যদিও সে-সময়ে ঐ শব্দের উদ্ভব হয়নি—যেমন এলিয়টের ‘ক্রাইটেরিয়ন’ বা আদিকালের পরিচয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা ত্রৈমাসিক ছিলাে ; সমসাময়িক গণসেব্য মাসিকপত্রের তুলনায় তারা যে ওজনে কত হালকা তা অল্প একটু পাটিগণিতেই ধরা পড়বে। ভালাে লেখা বেশি জন্মায় না, সত্যিকার নতুন লেখা আরাে বিরল ; আর শুধু দুর্লভের সন্ধানী হলে পৃষ্ঠা এবং পাঠকসংখ্যা স্বতই কমে আসে। অর্থাৎ আমরা যাকে বলি সাহিত্যপত্র, খাঁটি সাহিত্যের পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন তারই আরাে ছিপছিপে এবং ব্যঞ্জনাবহ নতুন নাম।

ছদ্মবেশী রাজকুমার - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


কলকাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উন্মাতাল দিনরাত্রির সঙ্গী ছিলেন বেলাল চৌধুরী। দুজনের মধ্যে ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। আত্মজীবনী অর্ধেক জীবনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন সুনীল। এ লেখায় পাওয়া যাবে সুনীলের চোখে বেলালের অবয়ব।

বন্ধুদের দলে সাবলীলভাবে মিশে থাকা সম্পূর্ণ অচেনা একজনকে দেখলাম, তার নাম বেলাল চৌধুরী। সম্পূর্ণ মেদহীন সুগঠিত শরীর, ফরসা রং, নিষ্পাপ, সুকুমার মুখখানিতে ঈষৎ মঙ্গোলীয় ছাপ। এই নিরীহ যুবকটি সম্পর্কে অনেক রোমহর্ষক কাহিনি (হয়তো পুরোটা সত্যি নয়, সব রোমহর্ষক কাহিনিই তো সত্যি-মিথ্যে-গুজব মিশ্রিত হয়ে থাকে) শোনা গেল। তার বাড়ি পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানে, পেশা কুমির ধরা। একটা কুমির-শিকারি জাহাজে অনেক সাগর-উপসাগর পাড়ি দিতে দিতে সে হঠাৎ খিদিরপুরে এসে জাহাজ থেকে নেমে পড়েছে এবং পাসপোর্টটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে মিশে গেছে কলকাতার জনারণ্যে। এবং সে একজন কবি, তাই জল যেমন জলকে টানে, সেইভাবে সে যুক্ত হয়ে গেছে কফি হাউসের কবির দঙ্গলে। পাকিস্তানের সঙ্গে তখন ভারতের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে দিনকে দিন, কয়েক মাস পরেই শুরু হবে একটি বালখিল্যসুলভ যুদ্ধ, সে রকম আবহাওয়ায় পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও সহায়সম্বলহীন অবস্থায় কলকাতায় বিচরণ করার জন্য প্রচণ্ড মনের জোর ও সাহসের দরকার। অবশ্য বেলালের একটা দারুণ সম্পদ ছিল, সেটা তার মুখের হাসি এবং সহজ আন্তরিকতায় মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা। পরে অনেকবার দেখেছি, যেকোনো বাড়িতে গেলে সে পরিবারের বাচ্চা ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বুড়ো-বুড়িরা পর্যন্ত কিছুক্ষণের মধ্যেই বেলালকে ভালোবেসে ফেলে। এর মধ্যে সে কমলদারও খুব চেলা হয়ে গেছে, দুজন অসমবয়সী মানুষের এমন গাঢ় বন্ধুত্বও দুর্লভ।

বই পেতে তার ওপর চাদর বিছিয়ে শুতাম


বই পেতে তার ওপর চাদর বিছিয়ে শুতাম…” 
বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় সুজিত সরকার।

সুজিত : কৃত্তিবাসএর যে তিন বোহেমিয়ান কবির কথা আমরা শুনেছি আপনি তাঁদের অন্যতম। শক্তি চট্টোপাধ্যায় দীপক মজুমদার অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। আপনার সঙ্গে আমার সেভাবে কখনও যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি, আপনি বাংলাদেশে থাকেন, পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকায় আপনার কিছু কবিতা পড়েছি। উৎপলকুমার বসুর কাছে আপনার সম্পর্কে অনেক মজার মজার কথা শুনেছি, আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী পড়ে আপনার বিষয়ে অনেক কিছু জেনেছি। আপনি কীভাবে এই কৃত্তিবাস, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতা, মধ্যরাত্রির কলকাতা ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হলেন?

রবীন্দ্রনাথের অনুবাদকর্ম - মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান



রবীন্দ্রনাথের অনুবাদকর্ম
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

বহুভাষাবিদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যচর্চায় অনুবাদকর্ম একটি বড় স্থান অধিকার করে আছে। অনুবাদ ছাড়াও তাঁর রূপান্তরকর্ম ছিল বেদ সংহিতা, উপনিষৎ, ধম্মপদ, যুগ্মগাথা, অপ্পমাধবগগো, চিত্তবগগো, পুপফবগগো, মহাভারতের মনুসংহিতার অংশবিশেষ, কালিদাস-ভবভূতি, ভট্টনারায়ণ-বরবুনি প্রমুখের লেখা, পালি-প্রাকৃত কবিতা, মরমী কবি তুকারাম, মধ্যযুগের হিন্দি কবিতা, শিখ ভজন, বিদ্যাপতির মৈথিলী রচনা, সংস্কৃত, গুরুমুখী ও মরাঠি রচনার থেকে।


ইউরোপীয় সাহিত্যে ভিকতর উগো, শেলি, আর্নেসট মায়ার্স, অব্রে দ্য ভের, পি বি মার্স্বন, মুর, মিসেস ব্রাউনিং, ক্রিসিটনা রসেটি সুইন বার্ন, হুড এবং জর্মন ভাষায় হাইনরেখ হাইনে ও গ্যেটের কিছু লেখার তিনি অনুবাদ করেন। একটি জাপানি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ থেকে তিনি বাংলা তর্জমা করেন।

তিস্তার চকোলেট - সোমা মুখোপাধ্যায়


তিস্তার চকোলেট
ডঃ সোমা মুখোপাধ্যায়


তিস্তার জন্মদিন, মা রেঁধেছেন পায়েস, পোলাও, কষা-মাংস ও আরো অনেক কিছু। তিস্তার জন্মদিন ছোট থেকে ভালোমতো ঘটা করেই পালন করা হয়; খুড়তুতো মাসতুতো ভাই-বোন, মা-বাবা-র, ভাই বাপ্পার অনেক বন্ধুবান্ধব - সব মিলিয়ে আয়োজন মন্দ হয় না। এবারে তার ওপরেও আরও যেন একটু বেশি ধুম-ধাম, এরা ছাড়াও আরও অনেকেই নিমন্ত্রিত। তিস্তার জন্মদিনের সঙ্গে আরও আরো একটা বিশেষ সেলিব্রেশনও আছে; তিস্তা একটা ফেলোশিপ নিয়ে ট্রেনিং-এ যাচ্ছে আটলান্টায় সিডিসি বা সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল-এ। এদেশে খাবার দাবার যেভাবে নাড়াচাড়া করে লোকে বাজার- ঘাটে, রেস্তোরাঁয় ভাবলেই কেমন যেন লাগে তিস্তার; স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সাবধানতা বলতে কিছুই যেন নেই। নিজে যে ফুচকা, ঝালমুড়ি একেবারে খায় না তা নয়, কিন্তু ইদানিংকালে একটু যেন পরিবর্তন নিজেই লক্ষ্য করতে পারছে । রাস্তার ওপর আঢাকা খাবার খাওয়া কতটা ঠিক এই ভাবনাটা একটু অস্থিরই করছে । হরদমই শোনা যায় ফুড পয়জেনিং-এ লোকে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে। কাজেই এইরকম নানা ভাবনা নিয়ে কেমিস্ট্রি-তে এম-এস-সি করার পর আপলাই করেছিল সিডিসির ফেলোশিপে, পেয়েও গেলো। উত্তেজনা আছে স্বাভাবিক ভাবেই আর সেই সুবাদেই জন্মদিনের সাথে এই হচ্ছে আর একটা কারণ এই পার্টির। রাস্তার খাবারে আজকাল একটু অনীহা হলেও চকলেটের প্রতি আগ্রহটা ছাড়তে পারে নি তিস্তা। মাসীমণি এসেছে ব্যাঙ্গালোর থেকে, মাসীমণি দারুণ চকলেট কেক, পেস্ট্রি সব বানায়। ওর তৈরী এইসব ডেলিকেসি ব্যাঙ্গালোরের অনেক কর্পোরেট ক্যান্টিনেও চলে গেছে। তিস্তার ধারণা ওর মাসীমণি একদিন প্যারিসে পেস্ট্রি শেফকে শেখাবে কারণ ও কিসব টপিং বার করেছে নলেন গুড়ের। কিন্তু আপাততঃ সব আশায় গুড়ে-বালি মনে হচ্ছে কারণ যে দুজনকে এই সন্ধ্যেয় সবথেকে বেশি চাইছে তিস্তা সে দুজনেরই কোনো পাত্তা নেই সাতটা বেজে গেলেও।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট