কল্পনার কাউবয় নয়, বাস্তবের রূপকার ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি

কল্পনার কাউবয় নয়, বাস্তবের রূপকার ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি


মার্কিনদেশ সম্বন্ধে সারা বিশ্বের যে ধারণা তাতে Western ছবির গভীর প্রভাব।  মাথায় টুপি, কোমরে পিস্তল, ঘোড়ায় চড়ে ঝড়ের বেগে বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর ছুটে বেড়ানো কাউবয়দের রোমাঞ্চকর দৃশ্য অজস্র মানুষের মানসপটে পাকাপাকিভাবে গেঁথে রয়েছে। সদ্যপ্রয়াত লেখক ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি আমেরিকার কিংবদন্তী লেখক, যেমন পাঠক সমাদর পেয়েছেন, তেমনি সমালোচকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছেন।  তার অজস্র দরদী বাস্তবধর্মী রচনায় তিনি সেই অলীক Western কাল্পনিক জগত ভেঙে খান খান করে দিয়েছেন।  বইয়ের হাটের পাঠকে আরেকটা বিষয় শুনে আকৃষ্ট হবেন, তা হলো লেখালেখির পাশাপাশি তিনি পুরনো বই বিক্রির ব্যবসা করতেন।  এক সময়ে ছয়টি দালান নিয়ে তার বইয়ের দোকান ছিল, সেখানে চার লক্ষাধিক বই ছিল।  তার নিজের সংগ্রহেই ৩০,০০০ বই ছিল।
তাঁকে নিয়ে New York Times-এর প্রবন্ধ।   (মূল ইংরেজি রচনার লিঙ্ক একবারে নীচে। তাঁর মৃত্যুর পর মার্কিন রেডিওতে তার একটি চমৎকার সাক্ষাৎকার পুনপ্রচারিত হয়।  একেবারে নীচে তার লিঙ্কও রয়েছে।)
ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি, মার্কিন ওয়েস্টার্ন ঔপন্যাসিক, ৮৪ বছর বয়সে দেহত্যাগ করলেন 
ডোয়াইট গার্নার 
নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৬ মার্চ ২০২১
অনুবাদ আশফাক স্বপন
Larry McMurtry, Novelist of the American West, Dies at 84
By Dwight Garner
The New York Times March 26, 2021
ওয়েস্টার্ন’ অভিধায় অভিহিত আমেরিকার পশ্চিম অঞ্চল নিয়ে যে কাল্পনিক মোহময় জগত সৃষ্টি হয়েছে, ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি (Larry McMurtry) তারঁ অজস্র উপন্যাস ও চিত্রনাট্যে ঊনিশ শতকের সীমান্ত অঞ্চল আর বর্তমান টেক্সাসের মফস্বল শহরের বাস্তব প্রতিচ্ছবি এঁকে সেই অলীক জগত ভেঙে খানখান করে দেন।  তিনি ২৫ মার্চ টেক্সাসের আর্চার সিটিতে মারা যান।  তার ৮৪ বছর বয়স হয়েছিল। 
তার লেখালেখির সহযোগী ও বান্ধবী ডায়ানা ওসানা (Diana Ossana) জানান মৃত্যুর কারণ congestive heart failure । 
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ম্যাকমার্ট্রি ৩০টির বেশি উপন্যাস লেখেন।  সেই সাথে প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ ও ইতিহাসের বইও লিখেছেন।  তিনি ৩০টির বেশি চিত্রনাট্যও লেখেন।  এর মধ্যে একটি  Brokeback Mountain-এর চিত্রনাট্যের জন্য তিনি ২০০৬ সালে অস্কার পুরস্কার লাভ করেন।  এ্যানি প্রু-এর (Annie Proulx)  ছোট গল্প অবলম্বনে ওসানার সাথে মিলে তিনি চিত্রনাট্যটি লেখেন।
তবে সমালোচক ও পাঠকদের কাছে সবচাইতে জনপ্রিয়তা লাভ করে তাঁর Lonesome Dove (নিঃসঙ্গ কপোত) উপন্যাসটি।  এই ৮৪৩-পাতার বিস্তৃত উপন্যাসে দুইজন অবসরপ্রাপ্ত টেক্সাস রেঞ্জার নিরাপত্তা রক্ষী ১৮৭০-এর দশকে রিও গ্র্যান্ডে নদী থেকে মনটানা অঙ্গরাজ্যে কী করে চোরাই গরুর দল নিয়ে যায় সেই গল্প বলা হয়েছে।  বইটি ১৯৮৬ সালে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করে এবং পরে বইটি থেকে একটি জনপ্রিয় টিভি মিনি সিরিজ তৈরি হয়। 
ম্যাকমার্ট্রি Lonesome Dove উপন্যাসটিতে প্রচলিত ওয়েস্টার্ন ধ্যানধারণা খণ্ডন করেন।  ভাবখানা এমন যেন সেই উপন্যাস চটুল ওয়েস্টার্ন উপন্যাসের মোহাচ্ছন্ন কাল্পনিক জগৎকে ভর্ৎসনা করছে বা লুই লামুর (Louis L’Amour)-এর মতো লেখকদের সৃষ্টিতে বিরাজমান মিছে অলীক কল্পনার ভূত তাড়াতে উদগ্রীব।  ১৯৮৮ সালের এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন – ‘আমি এই কাউবয়-এর অলীক কাল্পনিক ধারণার সমালোচক।  আমার মনে হয় না এই ধারণা সত্যি, এবং যেহেতু এটা আমার নিজের ঐতিহ্যের অংশ, আমি মনে করি এই বিষয়ে আমার সমালোচনা করবার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ’
পাঠকরা অবশ্য Lonesome Dove-এর একগুচ্ছ বাঙ্ময় চরিত্রের প্রেমে পড়ে যান।  ম্যাকমার্ট্রি নিজেও শেষপর্যন্ত উপন্যাসটিকে ওয়েস্টার্ন জীবন নিয়ে কাহিনীবিস্তারে Gone with the Wind (মার্কিন গৃহযুদ্ধ নিয়ে  Margaret Mitchell-এর জনপ্রিয়, বিশাল উপন্যাস) সমতুল্য বলে অভিহিত করেন।
ম্যাকমার্ট্রি ছিলেন র‍্যাঞ্চারের সন্তান।  র‍্যাঞ্চ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে গবাদিপশুর খামার।  তার উপন্যাসের বাস্তবতার অনেকটাই তরুণ বয়সে স্বচক্ষে দেখা টেক্সাসের অভিজ্ঞতা থেকে আহৃত।  তার প্রথম উপন্যাস Horseman, Pass By (১৯৬১, যেতে থাকো, অশ্বারোহী)।  এই উপন্যাসে আধুনিক জমানার সাথে যে পুরনো পশ্চিমাঞ্চলের মূল্যবোধের সংঘাত ঘটে, সেই মূল্যবোধকে তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।  টেক্সাসের ঐতিহাসিক ওয়েইন গার্ড (Wayne Gard) The New York Times Book Review-এ উপন্যাসটির সমালোচনায় লেখেন – ‘যারা গরু চড়ায়, তারা যত না ঘোড়ায় চড়ে, তার চাইতে ঢের বেশি পিকআপ ট্রাক বা ক্যাডিল্যাক গাড়ি চালায়।  সন্ধ্যাবেলায় খরকুটো একত্র করে আগুন জ্বেলে তাকে ঘিরে বসে গিটার বাজিয়ে লোকজ গান আর তারা গায় না, বরঞ্চ পাড়ার শুঁড়িখানা সংলগ্ন ঘরে বিলিয়ার্ড খেলে বা বিয়ার পান করে, আর সাএই সাথে কাছাকাছি লভ্য কোন নারীর মনোরঞ্জনে সচেষ্ট হয়। ’
সমালোচক আরো বলেন যে ম্যাকমার্ট্রির  ‘শুধু যে বাস্তবানুগ সংলাপ শ্রবণের সুতীক্ষ্ণ শক্তি আছে তাই নয়, তার প্রকাশভঙ্গীর প্রতিভাও এত উজ্জ্বল যে খুব সহজেই সেটা ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যসৃষ্টির সহায় হতে পারে। ’
গোড়া থেকেই চলচ্চিত্রনির্মাতারা ম্যাকমার্ট্রির উপন্যাসের প্রতি আকৃষ্ট হন।   Horseman, Pass By থেকে Hud চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়।  ছবিটি মার্টির রিট (Martin Ritt) পরিচালনা করেন, মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন পল নিউম্যান (Paul Newman)।   The Last Picture Show (১৯৬৬, চলচ্চিত্রের শেষ শো) বয়ঃসন্ধি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হবার অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত একটি পরিহাসতরল,  গীতিকাব্যময় উপন্যাস।  উপন্যাসে যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা রয়েছে।  ঐ একই নামে পিটার বগডানোভিচ (Peter Bogdanovich)-এর নির্দেশনায় শ্রেষ্ঠাংশে জেফ ব্রিজেস (Jeff Bridges) ও সিবিল সেপার্ড (Cybill Shepherd)-এর অভিনয়ে ছবিটি নির্মিত হয়।  তাঁর ১৯৭৫ সালের উপন্যাস Terms of Endearment (ভালোবাসার শর্ত) থেকে  জেমস ব্রুক্স-এর (James Brooks) নির্দেশনায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।  শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেন শার্লি ম্যাকলেন (Shirley MacLaine), ডেব্রা উইঙ্গার (Debra Winger) আর জ্যাক নিকলসন।(Jack Nicholson।  ছবিটি ১৯৮৩ সালে সেরা ছবির অস্কার লাভ করে। 
সাংস্কৃতিক মহলে তিনি একরকম বহিরাগত ছিলেন, তাতে ম্যাকমার্ট্রিকে বেশ মজা পেতেন।  তার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন টেক্সাসে আর্চার সিটিতে।  ডালাস থেকে গাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টা উত্তর পশ্চিমে এই শহরটি অবস্থিত, এই শহরেই তার বেড়ে ওঠা।  প্রায় ৭০ বছর ধরে তার একই ডাকবাক্স ছিল।  Brokeback Mountain চলচ্চিত্রে সেরা চিত্রনাট্যের জন্য অস্কার পুরষ্কার গ্রহণের জন্য যখন তিনি মঞ্চে ওঠেন, তখন ডিনার জ্যাকেটের সাথে তার পরনে ছিল নীল জিন্স আর কাউবয় বুট।  দর্শকদের তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে চিত্রনাট্যট এ্যানি প্রু-এর ছোট গল্প অনুসরণে লেখা হয়।
তবে হাবেভাবে বহিরাগত ভাব দেখালেও আমেরিকান সাহিত্যাঙ্গনের গভীরে তার আনাগোনা ছিল।  ১৯৯০-এর দশকে দুই বছর তিনি সাহিত্য ও মানবাধিকারের বনেদি সংস্থা PEN-এর আমেরিকান সভাপতি ছিলেন।  তিনি The New York Review of Books-এ নিয়মিত লিখতেন।  আলোচনার প্রসঙ্গ প্রায়ই আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল।  তার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সুসান সন্টাগ (Susan Sontag), যাকে তিনি একবার দক্ষিণের জনপ্রিয় স্টক গাড়ির রেস দেখতে নিয়ে গিয়েছিলেন। 
ছয়টি দালান, একটি বইয়ের দোকান
পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে লেখালেখির পাশাপাশি ম্যাকমার্ট্রি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের বিক্রেতা ছিলেন।  আর্চার সিটিতে অবস্থিত তার বইয়ের দোকানের নাম ছিল Booked Up ।  সারা আমেরিকায় এটি অন্যতম বৃহত্তম বইয়ের দোকান ছিল।  এক সময়ে দোকানটি ছয়টি দালানে বিস্তৃত ছিল।  বইয়ের সংখ্যা ৪০০,০০০।  ২০১২ সালে ম্যাকমার্ট্রি দুই তৃতীয়াংশ বই নীলামে বিক্রি করে ব্যবসা গুটিয়ে আনার পরিকল্পনা করেন।  উত্তরাধিকারীদের হাতে ব্যবসা দিয়ে যাবার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন – ‘একটা দোকান তবু সামাল দেওয়া যায়।  চার-চারটা দোকান একেবারে জুলুম। ’
ম্যাকমার্ট্রির ব্যক্তিগত পাঠাগারেই প্রায় ৩০,০০০ বই ছিল।  সেই বই তিনটি বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা।  সেই বইয়ের গোছগাছকে তিনি সারা জীবনের কাজ বলতেন।  ‘এই অর্জন আমার লেখার চাইতে কম মূল্যবান নয়, হয়তো বেশিই,’ তিনি একবার বলেছিলেন। 
ল্যারি জেফ ম্যাকমার্ট্রির জন্ম ১৯৩৬ সালের ৩ জুন টেক্সাস-এর উইচিটা ফলস শহরে।  মা হেজেল রুথ আর বাবা উইলিয়াম জেফারসন ম্যাকমার্ট্রি।  বাবা ছিলেন র‍্যাঞ্চার, অর্থাৎ তিনি গবাদিপশুর খামার চালাতেন।  ওদের পরিবার আর্চার সিটির বাইরে ম্যাকমার্ট্রির ভাষায় ‘একটি বইপত্রহীন র‍্যাঞ্চার খামার বাড়ি’-তে থাকত।  পরে তারা শহরে চলে আসে।  আর্চার সিটি পরবর্তীতে লেখককল্পিত থালিয়া শহরের ভিত্তি।  তার গল্পে থালিয়া শহরের বারবার আবির্ভাব ঘটেছে। 
গোড়া থেকেই তিনি গভীর মনোযোগী পাঠক ছিলেন।  খুব শিগগির বুঝে ফেলেন র‍্যাঞ্চের খামার জীবন তার পোষাবে না।  তাঁর ২০০৮ সালের স্মৃতিচারণ Books (বই)-এ লেখেন – ‘ঘোড়ায় আমি মোটামুটি চড়তে পারতাম, কিন্তু অন্যান্য হাতের কাজে একেবারে অপদার্থ ছিলাম। ’ 
১৯৫৮ সালে তিনি নর্থ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেন।  এক বছর পর জো ব্যালার্ড স্কটকে বিয়ে করেন।  দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদের পূর্বে একটি পুত্র সন্তান হয়।  তার নাম জেমস, বর্তমানে গায়ক ও গীতিকার হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। 
১৯৬০ সালে হিউস্টনের রাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম এ ডিগ্রি লাভের পর ম্যাকমার্ট্রি পশ্চিমমুখো হন।  তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টেগ্নার ফেলো হিসেবে যোগ দেন।  তার সহপাঠীদের মধ্যে ভবিষ্যত ঔপন্যাসিক কেন কিসী (Ken Kesey) ছিলেন।  কেন কিসীর সাথে বন্ধুত্বের সুবাদে তিনি একটি স্মরণীয় খণ্ডচরিত্র হিসেবে টম উলফ-এর (Tom Wolfe) নব্য সাংবাদিকতার মাইলফলক বই The Electric Kool-Aid Acid Test (1968)-এ জায়গা করে নেন।  বইটি আমেরিকা জুড়ে কেন কিসীর মাদকনেশাময় ভ্রমণের গল্প।  সেই ভ্রমণে সঙ্গী Merry Prankster (রঙ্গপ্রিয় দুষ্টুর দল) নামে কিসীর একদল সাঙ্গপাঙ্গ আর বাহন রংচঙে পুরনো এক স্কুলের বাস।  
যেই খণ্ডচিত্রে ম্যাকমার্ট্রির ক্ষণিকের আবির্ভাব, তাতে নিল ক্যাসেডি কিসীর বাসের চালক।  বাসটি ম্যাকমার্ট্রির হিউসটনের শহরতলীর বাড়ির কাছে থামার পর এক পরচুলা পরিহিত উলঙ্গ নারী বাস থেকে নেমে তার ছেলেকে আকড়ে ধরে।  উলফ-এর বর্ণনায় ম্যাকমার্ট্রি ‘ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ইতস্ততভাবে ভদ্রমহিলার উদোম পিঠের দিকে এগিয়ে আমতা আমতা করে বলতে থাকেন – “এই যে ম্যাডাম, এক মিনিট!”’
টেক্সার ক্রিস্টিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, রাইস বিশ্ববিদ্যালয়, জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয় আর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়-এ ইংরেজি সাহিত্যে শিক্ষকতার সময় ম্যাকমার্ট্রি তার প্রথম দিককার উপন্যাসগুলো লেখেন।  তবে শিক্ষকতার প্রতি তার খুব আগ্রহ ছিল না, তাই লেখালেখিতে উন্নতির পর তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। 
রাজধানী ওয়াশিংটন অঞ্চলে একজন অংশীদার নিয়ে.১৯৭১ সালে তাঁর প্রথম Booked Up বইয়ের দোকান খোলেন।  দোকানের কারবার দুষ্প্রাপ্য বই নিয়ে ।  পরে ১৯৮৮ সালে আর্চার সিটিতে আরো অনেক সুপ্রশস্ত কলেবরে Booked Up খোলেন   মৃত্যু পর্যন্ত সেই দোকানের মালিক ছিলেন, দোকানটি পরিচালনা করতেন। 
১৯৭৬ সালে The New Yorker সাময়িকীতে ক্যালভিন ট্রিলিন (Calvin Trillin) ম্যাকমার্ট্রিকে নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধে তার বই কেনার মুন্সিয়ানা লক্ষ করেন।  ট্রিলিন লেখেন -  ‘Native Son-বইয়ের প্রচ্ছদের নীল রঙ কেমন, সেটা দেখে ল্যারি বুঝতে পারে কোনটা প্রথম মুদ্রণ আর কোনটা নয়।  কোন একটা কবিতার বই রবার্ট লোওয়েল (Robert Lowell) আদৌ লিখেছেন কিনা আজ হয়ত লোওয়েল ভুলেই গেছেন, কিন্তু সেই বইয়ের দাম কী সেটা ঠিক ল্যারি জানে। ’
নারীচরিত্র চিত্রণে মুন্সিয়ানা
ম্যাকমার্ট্রির বেশির ভাগ লেখালেখি পশ্চিমাঞ্চল বা তার টেক্সাসের ঐতিহ্য নিয়ে হলেও অন্য বিষয় নিয়ে তিনি উপন্যাস লিখেছেন– এর মধ্যে ওয়াশিংটন (Cadillac Jack), হলিউড (Somebody’s Darling), লাস ভেগাস (The Desert Rose) অন্যতম।  তার সেরা উপন্যাসগুলোতে একট টগবগে রসবোধ রয়েছে, আবার তার পাশাপাশি একটা বিষণ্ণতার সুরও রয়েছে।  তিনি স্মরণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য নারীচরিত্র সৃষ্টির জন্য প্রশংসিত হয়েছেন।  যেমন Terms of Endearment উপন্যাসে অরোরা গ্রিনওয়ে (Aurora Greenway)।  চলচ্চিত্রে শার্লি ম্যাকলেইন এই ভূমিকায় অভিনয় করেন।  উপন্যাসে অরোরা তার নিজের চাহিদার ব্যাপারে নিঃসঙ্কোচ।  ‘আমার সাথে শুধু দেবতুল্য মানুষ থাকতে পারবে, কিন্তু আমি বাবা দেবতুল্য মানুষের সাথে থাকতে পারবনা।  বয়স্ক লোকে আমার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনা, আর অল্পবয়সীরা আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। ’ 
ম্যাকমার্ট্রি একবার লিখেছিলেন – ‘আমার বিশ্বাস একটা গুণই আমাকে গল্প উপন্যাস লেখার পেশার দিকে নিয়ে এসেছে – সে হলো আমার এমন সব চরিত্র সৃষ্টি করবার ক্ষমতা ছিল যার সাথে পাঠক একটা আত্মার যোগ অনুভব করে।  আমার চরিত্রগুলো তাদের মনকে নাড়া দেয়, সেজন্য সেই একই চরিত্রগুলো চলচ্চিত্রের পর্দায়ও তাদের মনকে ছুঁয়ে যায়। ’
সাধারণভাবে তাঁর প্রথম দিককার উপন্যাসগুলো সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।  তবে টমাস লাস্ক The New York Times Book Review-এ The Last Picture Show উপন্যাস সম্বন্ধে লেখেন – ‘ম্যাকমার্ট্রির লেখনীতে যে খুব একটা মুন্সিয়ানা আছে সেটা বলা চলে না। ’ অন্য সমালোচকদের থেকে একই ধরনের নালিশ এসেছে।  ম্যাকমার্ট্রি বড্ড বেশি লেখেন, লেখার পরিমাণে লেখার গুণ উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে।  Books-এ একবার ম্যাকমার্ট্রি বড়াই করে বলেছিলেন – ‘আমি দিনে খসখস করে দশ পাতা লিখতে পারি। ’ 
কারো কারো মতে ম্যাকমার্ট্রি The Last Picture Show, Lonesome Dove, Terms of Endearment-এর মতো তার অন্যতম সেরা বইগুলোর জাত নষ্ট করেছিলেন।  এই সব উপন্যাসের কাহিনী অনুসরণ করে তিনি এক, দুই এমনকি চারটি উপন্যাস লিখেছেন।  তার Berrybender Narratives  (বেরিবেন্ডারের আখ্যান) নামের চার-টি বইয়ের সিরিজে আমেরিকার সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে রগরগে চটুল কাহিনি পড়ার সময় এই কথা বিশ্বাস করতে সত্যি কষ্ট হয় যে এই লেখকের কলম দিয়েই Lonesome Dove বেরিয়েছে।
মাঝে মাঝে সমালোচকদের অবহেলা ম্যাকমার্ট্রিকে বিদ্ধ করতো।  ‘সাহিত্যমহলের দীর্ঘ অনাগ্রহ নিয়ে কি আমার কোন তিক্ততা থাকা উচিত?’ ২০০৯ সালে Literary Life শীর্ষক এক স্মৃতিচারণে তিনি লেখেন।  ‘সেটা উচিত নয়, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমার তিক্ততা নেইও, তবে মাঝে মাঝে যে একটু বিরক্ত হই, সেটা স্বীকার করি। ’ ১৯৬০-এর দশক আর ১৯৭০-এর গোড়ার দিকে তিনি তার সমালোচকদের একটা টি-শার্ট পরে খোঁচা দিতেন।  সেই টি-শার্টে লেখা ছিল – ‘ছোটখাটো, আঞ্চলিক ঔপন্যাসিক। ’
তার জীবন আর লেখালেখির ওপর কখনো কখনো যে ঘন কালো ছায়া নেমে এসেছিল, সেটা তিনি খোলাখুলি স্বীকার করেছেন।
Terms of Endearment লেখা সমাপ্ত করবার পর তার এমন একট সময় গিয়েছিল যখন তিনি ‘এক সাহিত্যিক আঁধারের সময়ে প্রবেশ করেন যার ১৯৭৫-এ শুরু আর ১৯৮৩ সালে শেষ। ’ এই সময় নিজের গদ্যের ওপর তার বিরক্তি জন্মে।  ১৯৯১ সালে তার হার্ট এ্যাটাক হয়, তারপর কোয়াড্রুপল বাইপাস সার্জারি।  সেই সার্জারি থেকে সেরে ওঠার সময় তিনি দীর্ঘ মানসিক বিষণ্ণতার শিকার হন।  এক সাংবাদিককে তিনি জানান, প্রায় এক বছর সময় ধরে তিনি একটা সোফায় শুয়ে থাকা ছাড়া আর প্রায় কোন কিছুই করেননি। 
সেই সোফার মালিক ছিলেন ওসানা।  তার সাথে ম্যাকমার্ট্রির দেখা হয় ১৯৮০-এর দশকে এ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের টুসান শহরে এক যত-খুশি-খাও ক্যাটফিশ-এর রেস্তোরায়।  দুজনে একসাথে থাকা শুরু করেন, এবং কিছুকাল পরে একসাথে লেখালেখির কাজও আরম্ভ করেন।  ম্যাকমার্ট্রি টাইপরাইটারে লেখেন, ওসানা সেটা কম্পিউটারে টাইপ করেন, অনেক সময় সেটা সম্পাদনা ও গোছগাছও করেন। 
‘যখন আমার ল্যারির সাথে প্রথম দেখা হয়, ওর তখন পাঁচ কি ছয় জন নারীর সাথে সম্পর্ক,’ ওসানা ২০১৪ সালে Grantland.com কে এক সাক্ষাতকারে বলেন।  ‘কী বলবো, একেবারে কলির কৃষ্ণ।  আমার তো ব্যাপারটা একটা ধাঁধার মত লাগতো।  এক দিন আমি ওকে বললাম, “এই সব মেয়েরা তোমার প্রেমিকা?” ও বললো, “হ্যাঁ। ” আমি বললাম – “ওরা একজন অন্যজনের কথা জানে?” ও বললো –“না-তো। ”’
শোনা যায়, ম্যাকমার্ট্রি 62 Women (৬২ নারী) নামে একটি স্মৃতিকথার খসড়া সমাপ্ত করেছিলেন।  সেখানে জীবনে যেসব নারীদের জানতেন, সমীহ করতেন, তাদের কথা রয়েছে।  তার জীবনের শেষ কয়েকটি বছরের জীবনযাপন প্রচলিত সামাজিক প্রথা থেকে বেশ আলাদা ছিল।  
২০০১ সালে তিনি নর্মা ফে কিসীকে (Norma Faye Kesey) বিয়ে করেন।  ইনি লেখক কেন কিসীর বিধবা স্ত্রী।  নর্মা ফে ম্যাকমার্ট্রি ও ওসানার সাথে এক বাড়িতে ওঠেন।  ম্যাকমার্ট্রি Grantland.com কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন – ‘সেই অরেগন গিয়ে আমি ফে-কে উদ্ধার করি।  গত ৫১ বছরে ওর সাথে মাত্র চারবার দেখা হয়েছে।  তারপর ওকে বিয়ে করলাম।  এর আগে আমরা কখনো ডেট করিনি, এমনকি ভালোভাবে আড্ডাও দিইনি।  ওর স্বামী কিছুতেই আমাকে ওর সাথে গপ্পো করতে দিতনা। ’
স্ত্রী ও পুত্রসন্তান ছাড়াও ম্যাকমার্ট্রির দুই বোন – সু ডীন ও জুডি ম্যাকলেমোর - জীবিত।  তিনি এক ভাই চার্লি ও একটি নাতিও রেখে গেছেন।
ম্যাকমার্ট্রির বহু বইয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত তিনটি স্মৃতিকথা এবং তিনটি প্রবন্ধ সঙ্কলন।  Walter Benjamin at the Dairy Queen (ডেরি কুইন আইসক্রিমের দোকানে ওয়াল্টার বেনজামিন) শীর্ষক প্রবন্ধ সঙ্কলনটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে।  ‘আমার একেক দিন মনে হয় আমার প্রবন্ধ আমার উপন্যাসের চাইতে বেশিদিন টিকবে,’ ম্যাকমার্ট্রি একবার লিখেছিলেন। 
শুধু পুরনো বই-ই নয়, লেখালেখিতেও ম্যাকমার্ট্রির পুরনো রীতির প্রতি আসক্তি ছিল।  সারাজীবন লেখালেখির কাজ তিনি টাইপরাইটারে সেরেছেন।  তার নিজের কোন কম্পিউটার ছিলনা।  তিন দশকের বেশি সময় তার লেখালেখির সম্পাদনা করেছেন সাইমন এণ্ড শুস্টার প্রকাশনার মাইকেল কর্ডা (Michael Korda)।  তারপর তিনি ২০১৪ সালে W.W. Norton সংস্থার Liveright প্রকাশনীর জন্য লেখালেখি করেন।
একবার বলেছিলেন – ‘যেখানে যখন বড় হয়েছিলাম - বিশাল সমতল Great Plains অঞ্চলে – সেখানে সেই সময়ে গবাদিপশু চড়ানোর পেশা  তার শ্রী আর প্রাণশক্তি হারাতে শুরু করেছে।  তাই বুঝি যেসব জিনিস বিলুপ্তির পথে, সারাজীবন তার প্রতি কেমন একটা  টান অনুভব করেছি। ’

মূল ইংরেজি রচনার লিঙ্ক

ল্যারি ম্যাকমার্ট্রির সাথে National Public Radio-এর Fresh Air অনুষ্ঠানের একটি সাক্ষাৎকারের পুনপ্রচারের লিঙ্ক (ইংরেজি)

কোবানীর বীর কন্যা তোমাদের লাল সালাম! - আশফাক স্বপন

কোবানীর বীর কন্যা তোমাদের লাল সালাম!




(মা,খালা, খালাত বোন, আদরের দুই বোন, বান্ধবী, বন্ধুপত্নী – এত অজস্র নারীর ভালোবাসায় আমি ধন্য, যে নারী নির্যাতন আমাকে বিশেষভাবে পীড়িত করে।  ভাবতে অবাক লাগে, মানবসমাজের এত উন্নতির পরও পুরুষতান্ত্রিকতার সিন্দাবাদের ভূত আজো দূর হলো না।  দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনা, লাঞ্ছনার অজস্র গল্প আছে সেকথা সত্যি, তবে আজ শুনব এক নারীগোষ্ঠীর বীরগাঁথা – তবে সেটা বহুদিন আগেকার গল্প নয়, আমাদের সাম্প্রতিক কালের ঘটনা।  মার্কিন দেশের National Public Radio-এর একটা  প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদ নিবেদন করছি।  মূল ইংরেজির অনুলিখন ও অডিও লিঙ্ক একেবারে নীচে।
আন্তর্জাতিক নারীদিবসে বিশ্বের সব নারীর স্বাধীকার আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করি, তাঁদের প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।)
সিরিয়ার খবর মানেই যুদ্ধ, হানাহানি, হিংস্রতার মর্মান্তিক সব সংবাদ।  অথচ একটি নতুন বইয়ের মূল কাহিনি সিরিয়া আর যুদ্ধ নিয়ে হলেও নারীর শৌর্য আর বীরত্বের এমন একটা গল্প যা আমাদের মনকে চাঙ্গা করে, মনে আশা জাগায়।
নতুন বইটির নাম The Daughters of Kobani:`A Story of Rebellion, Courage and Justice (কোবানিকন্যা: বিদ্রোহ, সাহস আর ইনসাফ-এর গল্প)।  বইটি ISIS-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্পূর্ণ নারীগঠিত এক মিলিশিয়া নিয়ে।  এক দল নারী কি করে ঠিক করল যে তারা এমন এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়বে যারা নারীধর্ষণ করে, নারীদের ওপর দাসত্ব আরোপ করে – এটা সেই কাহিনি।
লেখিকা গেইল জেমাখ লেমন (Gayle Tzemach Lemmon)  Council on Foreign Relations-এর  adjunct senior fellow এবং Ashley’s War (এ্যাশলির যুদ্ধ) বইয়ের এর লেখিকা।  নারীর সমানাধিকারের লড়াইয়ের গল্প নিয়ে তার সাম্প্রতিকতম বইটি নিয়ে তিনি -NPR-এর সাথে কথা বলেন।
প্রশ্ন: কী করে এই কাহিনির প্রতি আকৃষ্ট হলেন?
লেখিকা: ফোন বেজে ওঠার পর দেখি সেনাবাহিনীর এক সদস্যা আমাকে ফোন করেছে।  আমার এর আগের বইটি সম্পূর্ণ নারীসদস্যে গঠিত একটি বিশেষ তৎপরতার দল বা special-operations team ।নিয়ে।  এই সদস্যার কথা সেই বইয়ে আছে।  সে আমায় বলল – ‘গেইল, তোমাকে সিরিয়াতে আসতেই হবে।  এসে দেখ কী সব কাণ্ড হচ্ছে এখানে।  এখানে মেয়েরা ISIS-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছে।  এরা যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুষের নেতৃত্ব দিচ্ছে।  মার্কিন সেনারা এদের প্রচণ্ড সমীহ করে।  যেসব পুরুষ মেয়ে কেনা-বেচা করেছে তাদের ঠেকাবার লড়াইয়ে তারা নেতৃত্ব দিচ্ছে।  আর তারা যে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অবদান রাখছে তাই নয় – তারা মেয়েদের সমান অধিকারের জন্যও লড়ছে।
বইটির শিরোনামের অর্থ কি?
সিরিয়ার উত্তরপূর্বে ছোট্ট এক শহর কোবানি।  সিরিয়ার বাইরে কেউ এর নাম কখনো শুনেছে কিনা সন্দেহ।  ইসলামিক রাষ্ট্রের পুরুষেরা যখন ভাবল তারা অতি সহজে এই  শহরকে পদানত করে যুদ্ধক্ষেত্রে আরেকটি বিজয় সূচিত করবে, তখন শহরটা আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল।  কারণ বছরটি ২০১৪ আর আইসিস এর আগে একটিবারের জন্যও পরাজিত হয়নি।  এইরকম একটা সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো যাতে মানুষের কল্পনায় এটা বাইবেলের ডেভিড আর গোলায়াথের লড়াইয়ের মতো মনে হলো।  একদিকে মহাপরাক্রান্ত দৈত্য গোলায়াথ, আরেক দিকে সামান্য, সাধারণ ডেভিড।   সিরিয়ার একটি কুর্দী বাহিনী, হয়ত এদিক ওদিক খানিকটা সাহায্য পেয়েছে, এর মধ্যে ইরাকি কুর্দী যোদ্ধারাও মদদ দিচ্ছে – এরা সবাই ঠিক করেছে ইসলামিক রাষ্ট্রকে ঠেকাতে আমরণ লড়াই করবে – আর এই যুদ্ধে কেন্দ্রীয় ভূমিকা হচ্ছে নারীদের।  এ যেন ডেভিড আর গোলায়াথের লড়াই।  শুধু ডেভিড এখানে নারী।
একটি অন্যতম প্রধান চরিত্রের – ইনি একজন তরুণী - আইসিস যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে তার পরিবারের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?
শ্রোতারা অনেকেই জানেন অনেক সময় তরুণীরা পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হয়।  তার বেলায় পরিবারের গুরুতর বাধা ছিল।  তার শখ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে, তার চাচা দিলেন সেটা নাকচ করে।  মেয়েটা একজনকে ভালোবেসেছিল, তাকে বিয়ে করতে  চেয়েছিল, কিন্তু সেটা করতে দেওয়া হলো না।  আস্তে আস্তে সে এমন একটা সামাজিক জগতে প্রবেশ করে যেখানে মেয়েরা নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করছে।  সেই যুদ্ধের সাথে ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।  আমরা পাঠক হিসেবে দেখি আমাদের চোখের সামনে সে কি করে বদলে যায়।  সে ছিল একজন সহকারী, গাড়িতে করে যখন পাওয়া যেত তখন গোলাবারুদ সরবরাহ করত।  তাও খুব ঘন ঘন নয়।  সেখান থেকে পরে সে আইসিস-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নারী পুরুষের নেতৃত্ব দিয়েছে।  আমার মনে হয় বহু নারীকে এই পথটুকু পেরোতে হয়েছে – যাত্রার শুরুতে মানুষ তাদের না করেছে, পরে নিজ চেষ্টায় সেই না তারা কে হ্যাঁ-তে পরিণত করেছে।  আমার তো মনে হয় মেয়েটাও ঠিক তাই করেছে।
তারা আইসিস-এর বিরুদ্ধে লড়াই করবার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিল?
নারী কেনা-বেচা আইসিস-এর পুরুষেদের কর্মকাণ্ড ও চরিত্রের একটি মূল অংশ ছিল।  তো ধরুন এরা এসে আপনার পাড়ায় হাজির  আসলে আইসিস সৃষ্টির বহু আগেই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অরাজকতার তাণ্ডবের মধ্যে এই সব নারী মাঠে নেমেছে তাদের নিজ নিজ শহর, গৃহকোণ, পাড়াকে রক্ষা করতে।  সেখান থেকেই ব্যাপারটা ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের রূপ নেয়।  অনেকের জন্য দুটো পথ মাত্র খোলা ছিল – হয় কারো সম্পত্তি হয়ে যাও, বা জবরদস্তি বিয়েতে রাজি হও, নয়তো পুরুষকে সরাসরি প্রতিহত করো।  এটা এমন একটা সময় যখন বহু নারী যেই সব নিয়ম তাদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলো ঢেলে সাজাচ্ছে, এই সব নারী ঠিক এই কাজটিই করেছে। 
এই সব নারী কী তাদের গল্প বলতে আগ্রহী ছিল?
এদের কেউই কিন্তু মনে করেনা তারা এমন আহামরি কিছু করেছে।  ওরা আমার সাথে ঠাট্টা করে বলত, ‘আরে গেইল, তোমার কবে কাজ শেষ হবে? আর কতবার আমাদের সাথে এসে দেখা করবে? এই বইটা সত্যি সত্যি কবে বেরুবে বলতো?’  একবার একটা ঘটনায় বুঝলাম এই বিষয়টি নিয়ে একটা বই লিখতে হবে।  রোজদা বলে এক নেত্রীকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, তোমরা নারী রক্ষী দলের ইউনিট গড়লে কেন?’ ও আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা আইসিসকে কিছুতেই দাঁড়াতে দেবনা – জানোতো ওরা মেয়েদের কী দশা করেছে।  আর পুরুষমানুষ আমাদের কাজের জন্য বাহবা কুড়াবে, সেটাও আমরা চাইনি।‘ শুনে আমি ভেবেছিলাম – এইতো সারা বিশ্বের একটা চিরন্তন গল্প।।
আইসিস-কে পরাস্তকারী বীর নারী যোদ্ধা হবার ফলে তাদের মনে কি গভীর সন্তোষ ছিল?
একটা মুহূর্ত এসেছিল যখন প্রথমবারের মতো আইসিস পরাজয়ের সম্মুখীন।  মেয়েরা তখন কোবানিতে প্রাণপণ যুদ্ধ করছে।  যুদ্ধের রসদ বাড়ন্ত, লোকবল কম।  খাবারের অভাব।  যেটার অভাব নেই সেটা হলো তেজ আর মনোবল।  এক নারী নেত্রী যোদ্ধাদের বলছিলেন, ‘ওরা তোমাদের কী মনে করে সেটা মনে রেখো। ওদের দেখিয়ে দাও তোমাদের কী ক্ষমতা, বুঝিয়ে দাও মেয়েদের দাম আছে, মেয়েদের দাসী করা যায় না, এই অন্যায় চলবে না। ’ ওরা আমার কাছে যত কথা বলেছে, সব কিছুর ভেতর এই চিন্তাটা কাজ করেছে – এটা শুধু তাদের নিজেদের জন্য লড়াই না, সেই অঞ্চল এবন্ত তার বাইরে সব নারীর জন্য এই লড়াই।
ওরা এখন কী করছে?
যেটা সবচাইতে তাজ্জব ব্যাপার, এই যে সব মানুষগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় হয় – কোবানির কন্যারা – তাদের নিজ নিজ পরিবারের ভেতরেও অগ্রযাত্রা ঘটে।  রোসজা বলে এক মেয়ের যখন ছোট্ট বয়স, তখন তার চাচা ভূত সেজে তাকে ভয় দেখিয়েছিল যাতে সে ভাইয়ের সাথে ফুটবল না খেলে, কারণ মেয়েরা ফুটবল খেললে পরিবারের বেইজ্জতি হয়।  আজ সেই চাচাই তাকে ফোন করে নানান বিষয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ চান, পারিবারিক ঝগড়া মীমাংসায় তার সাহায্য চান।  এই যে একটা ধারণা, যেই অর্জন চোখের সামনে দেখা যায়, সেই অর্জন প্রত্যেক মেয়ের নাগালের মধ্যে, মেয়েদের নেতৃত্ব দেবার ধারণাটাই সারা অঞ্চলের মর্মে প্রবেশ করেছে।  একথা মানতে হবে যে কাজ এখনো বাকি, ত্রুটি বিচ্যুতিও রয়েছে, তবে এইখানে যা দেখছি, এমনটি আমি আর কোত্থাও দেখিনি – পৃথিবীর বহু জায়গা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। 

ডিজিটাল যুগে বাংলা: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা - আশফাক স্বপন

ডিজিটাল যুগে বাংলা: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

আশফাক স্বপন

ডেইলি স্টারএকুশে ক্রোড়পত্র, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১






 

প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ১৯৫২-এর ভাষা শহিদদেরকাছে আরেকবার প্রতিজ্ঞা করি যে আমরা আমাদের প্রিয় ভাষা বাংলারবিকাশ সুনিশ্চিত করব।  এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে হলে একটা গুরুত্বপূর্ণকথা আমাদের মনে রাখতে হবে।  একটি ভাষা ভবিষ্যতে টিকে থাকবেকিনা সেটা নির্ভর করে যুগের নবতর প্রযুক্তির সাথে সেই ভাষা কতখানিতাল মিলিয়ে চলে

বাংলা ভাষার ভবিষ্যত কিআমরা কি সুনিশ্চিত হতে পারি যেডিজিটাল যুগে বাংলা শুধু টিকবে নাতার উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে?

ডিজিটাল যুগে যেম অপার সম্ভাবনা রয়েছেতেমন কঠিন চ্যালেঞ্জওরয়েছে।  একটি ভাষার বিকাশে জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণথাকে।  তবে তারপরও এমন কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্ত সে যখন নতুনপ্রযুক্তি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। 

জার্মান মুদ্রণশিল্পী ইয়োহানাস গুটেনবার্গের কথা ধরা যাক।  তিনি১৪৫০ সালে সরণশীল ছাপার হরফ আবিষ্কার করে নতুন যুগের সৃষ্টিকরেন।  মুদ্রিত বইপত্র মানুষের হাতে কীভাবে পৌঁছুতে পারে সেটারাতারাতি পালটে গেল।  বইসাময়িকীএসব এককালে হস্তাক্ষর শিল্পীরকারবার ছিল – তার প্রসার স্বল্পসংখ্যক উঁচুতলার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধছিল  ছাপাখানায় প্রকাশনা শুরু হবার সাথে সাথে মানুষেরচিন্তাভাবনার প্রসার শতগুণ বৃদ্ধি পেল

বাংলা ভাষাকে ছাপার অক্ষরের জন্য সাড়ে তিন শতাব্দী অপেক্ষা করতেহয়।  আঠার শতকে খ্রীষ্টান মিশনারিদের হাতে বাংলা ভাষায় ছাপারসূচনা হয়। ঐ সময়ে ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে আসার ফলে উচ্চবর্ণেরহিন্দু ভদ্রলোক সমাজে গভীর বৌদ্ধিক জাগরণ হয়।  কলকাতায় ফোর্টউইলিয়াম কলেজ-এর পত্তনবই আর পত্রপত্রিকার মাধ্যমেচিন্তাভাবনার আদানপ্রদানের যে নতুন সংস্কৃতি তৈরি হলোএমনপরিবেশেই আধুনিক বাংলার জন্ম।  বাংলা ভাষার নবজন্মে নানানবিষয়ের প্রভাব ছিলতবে মুদ্রণের সূচনা যে তার মৌলিক কারণএবিষয়েসন্দেহ নেই

এবার চলে আসুন বিংশ শতাব্দীর শেষ কয়েকটা দশকে।  ডিজিটাল যুগপ্রযুক্তির আরেকটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে যার ফলে বিশ্বসংস্কৃতিরচেহারাটাই পালটে যায়।  ডিজিটাল প্রযুক্তি আর ইন্টারনেট ভাষা আরযোগাযোগে বিপ্লব সাধন করে।  এর সবচাইতে বড় অবদান হলো এরফলে ছাপার অক্ষর সবার কাছে অবারিত হয়ে যায়।  এককালে শুধু যারাটাইপ করতে পারতছাপার অক্ষর শুধু তাদের নাগালে ছিল।  এখনপ্রথম শ্রেণির একটা স্কুলের ছাত্রীও বাড়িতে ল্যাপটপে বাড়ির কাজ টাইপকরতে পারে

আস্তে আস্তে সারা বিশ্বে ডিজিটাল বিপ্লব ছড়াতে লাগল।  তখন একটাউদ্বেগজনক বিষয় দেখা গেল – ভাষায় ভাষায় বৈষম্য রয়েছে।  ধনীপ্রযুক্তি-প্রাগ্রসর দেশে ভাষা চট করে ডিজিটাল পরিবর্তন আত্মস্থ করেফেললকিন্তু বাংলা (এবং ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষাপেছনে পড়ে যেতে লাগল।  বাংলাকে যদিও ছাপাখানার মতো অতদিনঅপেক্ষা করতে হয়নিতবুও ডিজিটাল যুগে বাংলা একটু দেরিতেই প্রবেশকরে।  গোড়াতেই বাংলা ভাষাকে কিছু কঠিন সমস্যার মোকাবেলা করতেহয়।  প্রথমত কম্পিউটারে টাইপ করবার মত সহজে ব্যবহার্য কোনওয়ার্ড-প্রসেসর সফটওয়্যারের অভাব ছিল।  ফলে বাংলায় টাইপ করাইকঠিন হয়ে উঠল। (এর ফলে এক বিশ্রী প্রবণতা চালু হল – রোমানহরফে বাংলা লেখাঅর্থাৎ banglish)।  গোড়াতে বাংলা সফটওয়্যারতৈরির কয়েকটি উদ্যোগ হয়েছেকিন্তু তাতে কেমন যেন পেশাদারিত্বেরঅভাব ছিল। 

ইন্টার্নেটে ওয়েব-এর আগমনে নতুন সমস্যা দেখা দিল।  বাংলা হরফেরকোন প্রমিত ডিজিটাল রীতি না থাকায় একেক ওয়েব পেজ-এ একেকভাবে বাংলা লেখা প্রদর্শিত হলো – ফলে সেটা আরেক কম্পিউটারেহিজিবিজি হরফ হয়ে দেখা দিতে লাগল।  মরিয়া হয়ে কোন কোন ওয়েবপাতার ডিজাইনার বাংলা হরফ গ্রাফিক ফাইলে বদলে দিলেন।  ফলেবাংলাভাষায় ওয়েবে অনুসন্ধান অসম্ভব হয়ে উঠল

সেই সব দিন পেছনে ফেলে আজ বাংলা অনেক এগিয়ে এসেছে।  আজকম্পিউটারে বাংলার ব্যবহার সর্বজনীন – সেদিক দিয়ে বাংলার অবস্থানবিশ্বের যে কোন উন্নত দেশের ভাষার সাথে তুলনীয়।  গোড়ার দিনগুলোরপ্রতিকুলতা বিবেচনা করলে এটা একটা বিশাল অর্জন।  এই অর্জনেরপেছনে একটা অদ্ভুত মজার গল্প আছে।  বাংলাদেশে সরকারি অফিসেবাংলা ভাষার ব্যবহার সর্বজনীন বলেই দেশে একটা বাংলা ওয়ার্ড-প্রসেসিং সফটওয়্যারের প্রয়োজনীয়তা সবচাইতে বেশি অনুভূত হয়।  কিছু অসফল উদ্যোগের পর বিজয় সফটওয়্যার বেশ জাঁকিয়ে বসে।   এই সফটওয়্যার বাংলা প্রকাশনায় প্রমিত সফটওয়্যার হয়ে ওঠে এবংআজও এটি সেই অবস্থানে অধিষ্ঠিত।  তবে কম্পিউটারে বাংলারসর্বজনীন ব্যবহার সুদূর পরাহত রয়ে গেল – কারণ বিজয়সফটওয়্যারের একটা সীমাবদ্ধতা ছিল  সেটা হলো বিজয়-এর নিজেরআলাদা বাংলা কীবোর্ড রয়েছে।  এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে বাংলাটাইপ করতে হলে ব্যবহারকারীকে সেই বাংলা কীবোর্ড ব্যবহার আয়ত্তকরতে হয়।  অর্থাৎ কম্পিউটারের রোমান QWERTY রোমান হরফেরকীবোর্ড ছাড়াও সম্পূর্ণ আলাদা আরেকটা কীবোর্ড শিখতে হবে

এর ফলে পরিস্থিতি এমন হলো যে বিজয় সফটওয়্যার বাংলাকেডিজিটাল যুগে নিয়ে এলো ঠিকইকিন্তু এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবহয়ে গেল পশ্চাদমুখী।  সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারী আলাদাবাংলা কীবোর্ড শেখার ঝক্কি পোয়াতে রাজি নয়।  শুধুমাত্র যাদের পেশারদায় রয়েছে – টাইপিস্ট ও মুদ্রণশিল্পের সাথে জড়িত মানুষ – এরাই বিজয়সফটওয়্যার আয়ত্ত করল।  ফলে বাংলা যেন পুরনো জমানাতে রয়ে গেলছাপার অক্ষর শুধু তাদেরই নাগালের মধ্যে রয়ে গেল যারা হয় টাইপকরতে পারে নতুবা টাইপ বসাতে পারে

এই বিশাল ফাঁক পূরণের জন্য কিছুদিনের মধ্যেই এক অপূর্ব নতুন বাংলাসফটওয়্যারের অভ্যুদয় ঘটল।  আজ যে কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহারসর্বজনীন হয়েছেতার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পাওনা এই অভ্র বাংলাসফটওয়্যারের।  অভ্রের বাজিমাতের কারণ এটি চীনাজাপানি বাকোরিয়ান ভাষার ওয়ার্ড-প্রোসেসিং সফটওয়্যারের কৌশল বাংলায়প্রয়োগ করে।  এই সব ভাষার সফটওয়্যার ঊদ্ভাবনায় এক বিরাট সমস্যাদেখা দিয়েছিল।  যেমন চীনা বা জাপানি ভাষায় সহস্রাধিক হরফ।  এতহরফ কী করে কীবোর্ড সামাল দেবেসফটওয়্যার গবেষকরা একটাদারুণ উপায় বের করলেন। আচ্ছাকীবোর্ডের এক একটা বোতাম দিয়েহরফ টাইপ করবার পরিবর্তে QWERTY কীবোর্ড ব্যবহার করে সেইশব্দগুলো বানান করলে কেমন হয়?  অর্থাৎ রোমান কীবোর্ডে ভিনভাষার শব্দের ধ্বনি অনুসরণ করে রোমান হরফে বানান করা – ইংরেজিতে যাকে phonetic কীবোর্ড বলে।  এর ফলে আর কম্পিউটারব্যবহারকারীকে আলাদা করে কীবোর্ড আয়ত্ত করতে হবে না।  কম্পিউটার ব্যবহারকারী মাত্রেই QWERTY কীবোর্ডের সাথে পরিচিত। 

একথা সত্যি যে অভ্র-ই প্রথম phonetic বা ধ্বনি-অনুসারী বাংলাসফটওয়্যার নয়।  তবে অভ্র-এর দুটো গুণ তার সাফল্যের চাবিকাঠি।  গোড়া থেকেই এটি বিনামূল্যে লভ্য এবং এর সফটওয়্যার মুক্ত বা open source। অভ্রের উদ্ভাবক গণস্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে সফটওয়্যারের source code অবারিত করে দিয়েছে।  অন্যান্য সফটওয়্যার উদ্ভাবকরাওগণস্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্রমাগত তার ঘষামাজা করেছেন।  এর ফলে এটিআজ একটি অতি সহজনির্ভরযোগ্য সফটওয়্যার হয়ে উঠেছে।  আজএটা উইন্ডোজম্যাক এবং প্রায় সবখানে ব্যবহার করা যায়

বাংলাদেশি হিসেবে আমার গর্ব হয় যে অভ্র সারা পৃথিবীতে বাংলাব্যবহারের সবচাইতে জনপ্রিয় সফটওয়্যার।  (হাতের কাছে পরিসংখ্যাননেইতবে আমার অনুমান এর নিকটতম – এবং বেশ খানিকটা দূরবর্তীপ্রতিদ্বন্দ্বী Google input tools)।  কম্পিউটারে বাংলার সর্বজনীনব্যবহারের ফলে ওয়েবে বাংলার বিশাল রচনা সম্ভার জমা হয়েছে।  বাংলা ফন্ট ব্যবহারে ইউনিকোড প্রমিত মান গ্রহণের ফলে আজবাংলায় অবলীলায় ওয়েব সার্চ করা যায়।  বাংলা উইকিপিডিয়া পাতারতথ্যসম্ভার ক্রমশ আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে। 

তবে একথা মনে রাখতে হবে কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার সর্বজনীন করাএকটি উপায় মাত্র – আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এই অসাধারণশক্তিশালী ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলা প্রকাশনার শ্রীবৃদ্ধিকরে। একথা মানতেই হবে যে সেই ক্ষেত্রে একটা বিশেষ এলাকায় বাংলাহোঁচট খেয়েছেএবং সেটা হলো ই-বই প্রকাশনা।  ই-বই হলো ছাপা বই-এর এমন একটা রূপ যেটা ল্যাপটপট্যাবলেট বা স্মার্ট ফোনে পড়া যায়।  অথবা এ্যামাজন কোম্পানির কিন্ডল যন্ত্রের মতো এমন একটা যন্ত্রসেটা শুধুমাত্র ই-বই পড়ার জন্য তৈরি করা হয়েছেসেটা দিয়ে সেই বইপড়া যায়

আমেরিকান প্রকাশক সমিতির তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে২৩৪ মিলিয়ন ই-বই বিক্রি হয়।  (সে বছর সব রকম রূপে বিক্রিত বইয়েরসংখ্যা ১.৮ বিলিয়ন – বিক্রিত ই-বই তার ১৩%) বাংলা প্রকাশনারআজ ঘোর দুর্দিন – বাংলাদেশে গড়পড়তায় একটি বইয়ের মুদ্রণ সংখ্যা৩০০ – ই-বই বাংলা প্রকাশনা মুশকিল আসানে একটা সম্ভাবনাময়উদ্যোগ হতে পারে। (পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশনা শিল্প অনেক বেশি শক্তিশালী– তবে শঙ্কা হয় সেখানেও জরা বাসা বাঁধছে।  কয়েক দশক আগেরলেখকরা – যাঁদের কেউ কেউ আজ প্রয়াত – তাদের রচনা এখনোসর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় উপস্থিত দেখে অবাক হই।)

ই-বই প্রকাশনার প্রাথমিক খরচ যৎসামান্যবই গুদামজাত করাপাঠানো বা প্রস্তুতির খরচ নেই বললেই চলেএবং বিশ্বের সর্বত্র সেটাপাঠানো যায়।  একথা ভুললে চলবে না যে বাংলা পাঠক আজসারাবিশ্বে। যুক্তরাষ্ট্রযুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে তার সংখ্যা আজ বেশ বড়োহয়ে উঠেছে।  অথচ বাংলা প্রকাশনায় ই-বইয়ের অবস্থা ভয়ঙ্কর।  গতবছরের আগ পর্যন্ত ঢাকা অথবা কলকাতার কোন শীর্ষস্থানীয় প্রকাশকই-বই প্রকাশ করেনি।  গত বছর দুই বাংলার শীর্ষস্থানীয় প্রকাশককলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স তার নিজস্ব এ্যাপে বাংলা ই-বইপ্রকাশ শুরু করে।  বাংলাদেশে এক বেঙ্গল ই-বই প্রকাশনার উদ্যোগকিছুদিনের জন্য চালু করে বন্ধ করে দিয়েছে।  এখন বাংলাদেশে একমাত্রআদর্শ পাবলিশার্স ই-বই প্রকাশ করে।  ওদের ওয়েব সাইটে ১৫৭ বইয়েরউল্লেখ আছেতবে ঠিক কতগুলো ই-বই হিসেবে লভ্য সেটা পরিষ্কার নয়।  পশ্চিমবঙ্গে পারুল, গুরচণ্ডা৯ আর সৃষ্টিসুখ নামে কিছু ক্ষুদ্র প্রকাশক ই-বই প্রকাশ করে।  এদের প্রকাশিত ই-বই-এর সংখ্যা খুব বেশি নয়

বাংলা ই-বই কেন এভাবে মুখ থুবড়ে পড়লপাঠকের নিস্পৃহতার কারণেকি বাংলা প্রকাশকরা হতোদ্যম হয়েছেনাকি ই-বইয়ের অভাবে বাংলা ই-বই পড়ার অভ্যাসটাই গড়ে উঠতে পারেনিতাই ই-বইয়ের পাঠকই নেইনাকি বাংলা পাঠকরা বড্ড সেকেলেতাই অনলাইনে বই পড়ার নতুনপ্রযুক্তি গ্রহণে তাদের অনীহা?

এই বিষয়ে সকল সংশয়ের অবসান ঘটিয়েছে ফেসবুক গ্রুপ ‘বইয়েরহাট’। ২০১২ সালে আটলান্টা প্রবাসী এক বইপাগল বাংলাদেশি স্থাপিতএই গ্রুপ আজ বিশ্বজোড়া বাংলা বইপ্রেমীদের পরিবার হয়ে উঠেছে।  বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের একদল এডমিন দৈনিক ৫০০ পোস্ট থেকেনির্বাচন করে এই ফেসবুক গ্রুপ দেখাশোনা করেন।  এই গ্রুপেআলোচনার বিষয় একমাত্র বাংলা বই ও বাংলা সাহিত্যআলোচনারভাষাও শুধুমাত্র বাংলা।  গ্রুপটির ১৬৫,০০০ সদস্য পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ এবং বিশ্বের নানান জায়গায় অবস্থিতএরা অনলাইনে৪০,০০০ বই তুলে দিয়েছেন।  এডমিনরা বলেন অজস্র সংখ্যায় বইডাউনলোড হয়তবে বই নামানো হলেই যে পড়া হয় সেকথা অবশ্য বলাযায় না। 

এত বই তুলে দেওয়া কপিরাইটের কারণে উদ্যোগটা যে খানিকটাপ্রশ্নবিদ্ধসেটা বইয়ের হাট-এর সংগঠকরা স্বীকার করেন।  তবে বইয়েরহাট এই উদ্যোগ থেকে একটি পয়সাও গ্রহণ করেনিসুতরাং উদ্যোক্তারাএই কথাটা জোরের সাথে বলতে পারেন যে গোটা উদ্যোগটা পুরোপুরিবাংলা বইয়ের ভালোবাসাপ্রসূতউদ্দেশ্য বাংলা বইয়ের প্রচার বৃদ্ধি।  এইউদ্যোগের ফলে বাংলা বইয়ের প্রতি যে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গিয়েছেমনে হচ্ছে তার ফলে বাংলা বইয়ের প্রকাশকদের সংশয় দূর হয়েছেকারণ দুই বাংলার প্রকাশকদের সাথে বইয়ের হাটের গভীর সুসম্পর্ক।  গতবছর বইয়ের হাট আরেকটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।  বইয়েরহাট আমাজন-এর কিন্ডল-এ বাংলা ই-বই প্রকাশনা শুরু করে।  এরআগে কিছু এলোপাথাড়ি উদ্যোগ চালু হয়েছে বটেকিন্তু বইয়ের হাট এইপ্রথম পেশাদারভাবে এই উদ্যোগ গ্রহণ করে।  যুক্তরাষ্ট্রে রীতিমতোকোম্পানি নিবন্ধিত করে সেই কোম্পানি আমাজন-এর সাথে ই-বইপ্রকাশের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়লেখক ও প্রকাশকের সাথে সম্মানীরপ্রতিশ্রুতি দিয়ে আলাদা চুক্তি হয়। 

ঢাকা আর কলকাতার ৭০টির বেশি ই-বই আজ অবধি বইয়ের হাটপ্রকাশ করেছে।  সামনের পথ অত্যন্ত কঠিন  - ই-বই বিক্রির সংখ্যা বেশিনয় – মাত্র ৪৫০ বই। 

এতে অবশ্য একটা কথা খুব পরিষ্কার হয়ে যায় - বইয়ের হাট-এর উদ্দেশ্যচট করে টাকা বানানো নয়। বরঞ্চ বইয়ের হাট-এর স্বভাবে বাংলাদেশেরছায়ানট বা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন-এর মতো সংগঠনের প্রশংসনীয় প্রবণতালক্ষণীয় – আর্থিক লাভ নয়সংস্কৃতির বিকাশটাই বড়ো কথা।   তবেএখনো সমস্যা আছে।  ভারতে আমাজনে ক্রয় বিক্রয় সম্ভবতবেবাংলাদেশে নয়। সেজন্য বাংলাদেশের আগ্রহীদের অন্য উপায় বেরকরতে হবে।  (এই বইগুলো Google Play-তে লভ্য।) যেটা আরো উষ্মারবিষয়আমাজন গুজরাতি বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করলেও বাংলা গ্রহণকরে নাতাই আমাজনে বাংলা বইয়ের উপস্থিতি কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ

এর ফলে একটা বিষয় পরিষ্কার – বাংলা ই-বইয়ের এখনো অনেক পথবাকি।  তবে পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পা যে একদিনকম্পিউটার যুগের সাথে তাল মিলাতে বাংলাকে হিমসিম খেতে হয়েছেকিন্তু সেসব ধাক্কা বাংলা ভাষা বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে এটাআমাদের জন্য আশার কথা।  আজ সময়ের প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সাথে বাংলা ই-বইকে বাংলা প্রকাশনার একটি শক্তিশালী অঙ্গহিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা। 

সাহিত্যের কোলে আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে বইপত্র ও সাময়িকী প্রকাশনার ফলে চিন্তা-ভাবনার যে প্রাণবন্ত আদান-প্রদান হয়সেটিই সাহিত্যের প্রাণশক্তি।  সাহিত্য আমাদের পরিচয় ধারণ করেতাইতার বিকাশে আত্মনিয়োগের মাধ্যমেই আমরা ১৯৫২ সালের শহিদদেরস্মৃতির প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করব

 

 

https://www.thedailystar.net/supplements/news/the-promise-and-challenge-bangla-the-digital-age-2048261

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট