গ্রন্থসংবেদী রবীন্দ্রনাথ | সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় | রবিবারের প্রবন্ধ ৪

গ্রন্থসংবেদী রবীন্দ্রনাথ
সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়

আর চাই রেশমে বাঁধাই-করা
অ্যান্টিক কাগজে ছাপা কবিতার বই, ...

‘ছুটির আয়োজন’-এর উপকরণগুলির মধ্যে বইয়ের প্রতি রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই একটু বেশি সংবেদনশীল। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন সাত-আট বছর। বয়সে বেশ খানিকটা বড় ভাগিনেয় জ্যোতিঃপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়ের উৎসাহে, একটি নীল কাগজের খাতায় ‘কতকগুলি অসমান লাইন’ কেটে রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখার সূচনা হল পেনসিলে। পুরানো দিনের সেসব কথার অনুষঙ্গে রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি-তে লিখেছিলেন, ‘নিজেই তখন লেখক, মুদ্রাকর, প্রকাশক, এই তিনে-এক একে-তিন হইয়া ছিলাম।’ আর বইপড়ার সূচনালগ্নের অভিজ্ঞতার কথা শেষ জীবনে ছেলেবেলা (১৯৪০)-তে বলেছেন এইভাবে: ‘যা মনে পড়ে সে ষণ্ডামার্ক মুনির পাঠশালার বিষম ব্যাপার নিয়ে, আর হিরণ্যকশিপুর পেট চিরছে নৃসিংহ অবতার— বোধ করি সীসের-ফলকে-খোদাই-করা তার একখানা ছবিও দেখেছি সেই বইয়ে।’ বিগতদিনের ছবি ছাপার অনুন্নত পদ্ধতি সম্পর্কে এখানে যেমন রবীন্দ্রনাথ মার্জিত পরিহাস করেছেন, তেমনি আবার ছেলেবেলা –র ওই একই পৃষ্ঠায় ছাপা হরফের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরে বলেছেন, ‘রূপকথা আজকাল ছেলেরা মেয়েদের মুখ থেকে শুনতে পায় না, নিজে নিজে পড়ে ছাপানো বই থেকে।’ মুদ্রণের প্রযুক্তির ব্যাপারে এটাই তাঁর একমাত্র মত নয়। মুদ্রণের প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সম্পর্কে কোনও অনুযোগ ছাড়াই বাংলাভাষা-পরিচয় (১৯৩৮) বইয়ের একাদশ পর্বে রবীন্দ্রনাথ লেখেন: ‘একদা ছিল না ছাপাখানা, অক্ষরের ব্যবহার হয় ছিল না, নয় ছিল অল্প। অথচ মানুষ যে-সব কথা সকলকে জানাবার যোগ্য মনে করেছে দলের প্রতি শ্রদ্ধায়, তাকে বেঁধে রাখতে চেয়েছে এবং চালিয়ে দিতে চেয়েছে পরস্পরের কাছে। ... সাহিত্যের প্রথম পর্বে ছন্দ মানুষের শুধু খেয়ালের নয়, প্রয়োজনের একটা বড়ো সৃষ্টি; আধুনিক কালে যেমন সৃষ্টি তার ছাপাখানা।’ তবে মুদ্রণ কিংবা ছাপা বই সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে কবির দ্বন্দ্বময় মনোভাব কোন অভিমুখে ধাবিত সেই আলোচনায় না-গিয়ে, বরং নিজের লেখা বইগুলি ‘আঙ্গিক ও ভাবিক দিক থেকে’ নির্মাণের নানা পর্যায়ে, তাঁর গ্রন্থসংবেদী মন কতটা সক্রিয় থেকেছে সেটুকুই আমাদের আলোচ্য হোক।

১৯০১-এ বঙ্গদর্শন নব পর্যায়ের সম্পাদনার ভার নেন রবীন্দ্রনাথ এবং বৈষয়িক ভার নেন শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের ছোট ভাই, মজুমদার লাইব্রেরির শৈলেশচন্দ্র মজুমদার। এই যোগসূত্রেই চল্লিশ-উত্তীর্ণ রবীন্দ্রনাথ ধারাবাহিকভাবে বই প্রকাশের (১৯০৩) প্রথম একজন প্রকাশক হিসাবে পান শৈলেশচন্দ্রকে। প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে প্রভাতকুমার রবীন্দ্রজীবনী-র দ্বিতীয় খণ্ডে জানিয়েছেন: ‘এই মজুমদার এজেন্সির (পরে মজুমদার লাইব্রেরি) সহিত প্রায় সাত বৎসর রবীন্দ্রনাথ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ইহার অন্তর্গত “আলোচনা সভা” বিলাতি সাহিত্যিক ক্লাবের অনুকরণে গড়া হয়; রবীন্দ্রনাথের বহু প্রবন্ধ এখানে পঠিত হয় ... ।’ যে কারণে প্রথম দিকের অনেকগুলো বই-ই রবীন্দ্রনাথ নিজ ব্যয়ে ছেপেছেন আদি ব্রাহ্মসমাজের মুদ্রণযন্ত্রে। ফলে ছাপাখানার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। তা ছাড়া তিনি নিজে একজন মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ কিংবা পেশাদার গ্রন্থ-সম্পাদক না-হলেও গ্রন্থনির্মাণের নানান দিক অর্থাৎ হরফ বিন্যাস, বানান শোধন, মুদ্রণ, অলংকরণ ও বাঁধাই সম্পর্কে অত্যন্ত মনোযোগী এবং সহজে সন্তুষ্ট হওয়ার পাত্র ছিলেন না।

হৃদয়ে কবির জীবন শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ আলোচনা লিখেছেন প্রচেত গুপ্ত

হৃদয়ে কবির জীবন

শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ আলোচনা লিখেছেন প্রচেত গুপ্ত

নীচের উদ্ধৃতিটি একটু দীর্ঘ হলেও এড়াতে পারছি না। বইটি নিয়ে কিছু কথা বলতে গেলে এটির প্রয়ােজন। উদ্ধৃতিটি নেওয়া হল একেবারে প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম বাক্য থেকে। যাতে গােড়াতেই বই সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়।

“পুরােনাে শতাব্দীর ধুলােমাখা একটা সরীসৃপের মতাে কলকাতা বালিগঞ্জ ডাউন ট্রাম ঘন ঘন ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসছে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের দিকে। চারদিকে তখন শেষ বিকেলের রােদ। ‘জলখাবার’ দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে বসে চুনীলাল দেখলেন একজন লােক হেঁটে যাচ্ছেন ওই ট্রামের দিকেই। ট্রাম এগিয়ে আসছে, সেই লােকও এগিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম লাইনের দিকে। ট্রামের ড্রাইভার জোরে জোরে ঘণ্টা বাজালেন, চিৎকার করে ডাকলেন, তবু সে লােক উঠে গেলেন ট্রাম লাইনের ওপরে এবং আটকে গেলেন ট্রামের ক্যাচারে। সশব্দে ব্রেক কষল ট্রাম। চুনীলাল দৌড়ে গিয়ে ট্রামের ক্যাচারের ভেতর থেকে টেনে বের করে আনলেন মানুষটাকে। লােকজনে ভিড় জমে গেল, তারা জানতে চাইল, ‘কী নাম আপনার, কোথায় থাকেন?’ তারা কেউ জানে না যে এই লােক একদিন লিখেছেন:

কলকাতার ফুটপাত থেকে ফুটপাতে— ফুটপাত থেকে ফুটপাতে—/ কয়েকটি আদিম সপিনী সহােদরার মতাে এই যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে... (কবিতাটির আরও বেশ কয়েকটি লাইন রয়েছে। এখানে দেওয়া হল না।)

রক্তাক্ত সেই লােক বললেন, “আমার নাম জীবনানন্দ দাশ, ওই ল্যান্সডাউন রােডে থাকি, ১৮৩ নম্বর বাড়ি। এইটুকু বলে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না, এলিয়ে পড়লেন রাস্তায়। লােকজন তাঁকে ধরাধরি করে একটা ট্যাক্সিতে উঠিয়ে নিয়ে গেল কাছের শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে।” পরিচ্ছেদটি ধরে এবার শেষের দিকে এগােই:

“কয়েকটি দিন আশা-নিরাশার দোলাচলে থাকবার পর ওই ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের নানা রকম রােগীর গােঙানাের প্রেক্ষাপটে, ওই রং ওঠা লােহার খাটে মৃত্যুবরণ করেন জীবনানন্দ। ট্রামের মতাে এমন একটা স্লো মুভিং লােকোমােটিভকে এড়িয়ে যাবার টনক মানুষের থাকার কথা। ট্রামের ক্যাচার তৈরি হয়েছিল লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পশু তাড়াবার জন্য। কিন্তু জীবনানন্দ সম্ভবত ট্রামের ক্যাচারে আটকে যাওয়া প্রথম এবং শেষ মানুষ। ফলে আদিম সাপের মতাে ছড়িয়ে থাকা ট্রামের চাকার নিচে তাঁর মৃত্যু নিয়ে জট থেকে যায়। প্রশ্ন জাগে, এটা কি একটা দুর্ঘটনা?

নাকি তিনি ট্রামের চাকার নিচে আত্মহত্যা করেছেন?

অথবা এটা কি আসলে একটা হত্যাকাণ্ড, যার পেছনে রয়েছে আরও অনেকের অদৃশ্য। হাত?”

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে এইভাবে যে লেখা শুরু হয় তাকে কি এড়ানাে যায়? হয়তাে যায়, আমি পারিনি। বইটি আমার হাতে হাত রেখেছে কি না জানি না, তবে আমি রেখেছি। রেখে কখনও উৎফুল্ল হয়েছি, কখনও বিষন্ন। কখনও রেগে গিয়েছি, কখনও লেগেছে ঘাের। একই পাঠে আনন্দ ও বেদনা অনুভব করেছি। কোনও ঘটনা পড়ে মনখারাপ হয়েছে, আবার পরক্ষণেই বুঝতে পেরেছি, এই মনখারাপ আসলে জীবনের কোনও অমােঘ রূপ-রং মেশানাে সৃষ্টির প্রেরণা। এই মনখারাপ এমন সব কবিতার জন্ম দিয়েছে, যাদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিতাদের সঙ্গে বসানাে গেছে এক পঙক্তিতে। তখনই আবার মন ভাল হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মন ভাল এবং মনখারাপ এক বিরল আনন্দ অভিজ্ঞতা। খুব কম লেখা পড়েই এই আনন্দ পাওয়া যায়। ‘একজন কমলালেবু' বইটি সেই আনন্দ আমাকে দিয়েছে।

হ্যাঁ, এই বইয়ের নাম ‘একজন কমলালেবু'। লেখকের নাম শাহাদুজ্জামান। প্রকাশক বাংলাদেশের প্রথমা প্রকাশন। প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে। জীবনানন্দের নিজের এবং তাঁকে নিয়ে পণ্ডিতদের লেখা আরও কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের পাশে এই বইকে আমি যত্নে এবং আদরে স্থান দিয়েছি।

বইটির কথা আমি বেশ কিছুদিন আগেই শুনেছিলাম। শুনেছিলাম, বাংলাদেশের বিশিষ্ট গদ্যকার শাহাদুজ্জামান জীবনানন্দকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। তবে এই বঙ্গের কবি, গবেষক, সাহিত্য আলােচকদের মুখে বা লেখালিখিতে বইটির উল্লেখ দেখিনি, থাকলেও চোখে পড়ার মতাে উচ্চকিতভাবে কিছু নয়। বইটি প্রচার পায় মূলত এ বঙ্গের সাধারণ পাঠকের মুখে মুখে এবং ওপার বঙ্গের সােশ্যাল মিডিয়ার আলােচনায়। একেই জীবনানন্দের জীবন নিয়ে উপন্যাস, তার ওপর ওরকম চমৎকার নাম! আমার মনােযােগ কাড়ে। ‘কমলালেবু’ নামে জীবনানন্দের একটি কবিতা

আছে। ‘একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাবে। আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে / আবার যেন ফিরে আসি / কোনাে এক শীতের রাতে / একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস / নিয়ে কোনাে এক মুমূর্ষর বিছানার কিনারে।’ কবিতাটি সকলের জানা। কিন্তু ‘কমলালেবু'-র আগে ‘একজন’ শব্দটি বসিয়ে তাতে যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা যায়, তা জানা ছিল কি? অন্তত আমার তাে নয়ই। যেন আড়মােড়া ভেঙে কবি জেগে উঠলেন কবিতার ভিতর থেকে। যতই শুনে থাকি, কবিরে পাবে না ‘তাহার জীবনচরিতে’, এই বইটির নামে কবি এবং কবিতা এক হয়ে গেছে। কৌতূহল বেড়েছে। বইয়ের লেখক সম্পর্কেও আমার বিশেষ ধারণা ছিল না। আমি আগে তাঁর কোনও বই পড়িনি। জানলাম, উনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানুষ। আমেরিকার গ্লাসগাে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। একজন ‘জীবনানন্দ উন্মাদ’। কিশাের বয়স থেকেই জীবনানন্দে ‘ভূতগ্রস্ত’। ভদ্রলােক একটু ঘুরিয়ে বলেছেন, তিনি নাকি ঘাড় থেকে সেই ‘ভূত’টিকে নামানাের জন্যই বইটি লিখেছেন। জীবনানন্দের ‘ভূত’ লেখকের ঘাড় থেকে নেমেছে কি না জানি না, তবে এই বই পড়ার পর বহু পাঠকের ঘাড়ে যে ‘ভূত’টি চেপে বসেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

লেখার আগে লেখক দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এই ধরনের কাজে দীর্ঘ প্রস্তুতি স্বাভাবিক। দেখার কথা, সেই প্রস্তুতি, পরিশ্রম কাজে লাগল কি না। পণ্ডশ্রমের বহু উদাহরণই তাে রয়েছে। লেখক যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ, মনে প্রশ্ন জেগেছিল, উনি কি তবে কবির বরিশাল জীবনের অংশটিই বড় করে দেখিয়েছেন? এই উপন্যাসের নায়ক কি মূলত রূপসী বাংলার কবি? যাঁর জীবন সরল শান্ত স্নিগ্ধ প্রকৃতির মতাে। পুকুরের জলে লাল সরের মতাে পড়ে থাকা করবীর কচি ডাল হয়ে শুধু ঝুঁকে পড়ে চুমু খেতে চায় মাছরাঙার পায়ে? নাকি কলকাতার জীর্ণ, ক্লিষ্ট, অভাব, অনটন ও অপমানের কথাও এতে থাকবে?

বইটির সন্ধান করি। ভ্রাতৃপ্রতিম একজন সংগ্রহ করে দেয়। এই সুযােগে তাকেও আর-একবার কৃতজ্ঞতা নয়, ভালবাসা জানিয়ে রাখি। যে একটা ভাল বই পড়ায়, বইটির মধ্যে সেও থেকে যায়। আমরা তাকে ভুলে গিয়ে অন্যায় করি। যাই হােক, একজন কমলালেবু পড়তে পড়তে যাবতীয় ভুল ধারণার অবসান ঘটে। ‘একজন কমলালেবু’-তে জীবনানন্দ দুই বাংলার। বরিশালের মায়াভরা প্রকৃতি, পরিবার, লেখাপড়া, অসমাপ্ত কর্মজীবন, সুখদুঃখ যেমন আছে, আছে কলকাতার কাঠিন্য, উদাসীনতা, যন্ত্রণা এবং বন্ধুদের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কাহিনিও। আছে তাঁকে আগলে রাখার কথা। কবি হিসেবে তাঁকে পরিচিত করার গল্প। এটি বইটির মস্ত গুণ। ‘একজন কমলালেবু'-কে কোনও একটা দিক থেকে, একপেশে চোখে দেখা হয়নি। তাঁকে দেখা হয়েছে সবদিক থেকে। কবির শৈশব, বাল্য থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘপথ। হতাশা, যন্ত্রণা, স্ত্রী, প্রেমিকা, ভালবাসা, অবজ্ঞা, চাকরি ও বেকার সময়ের কথা রয়েছে। আছে প্রকৃতিতে ডুবে থাকা এক মানুষের গল্প, অর্থাভাবে দীর্ণ হয়ে থাকার কাহিনি। আছে কবিতা লেখা, সেই কবিতা নিয়েই তীব্র উপেক্ষা, তীক্ষ সমালােচনা, গল্প উপন্যাস লিখে ট্রাঙ্কে লুকিয়ে ফেলা। আছে কর্মজীবন থেকে পালানাে, চারপাশ থেকে পালানাে, নিজের কাছ থেকে পালানাে। বটগাছের মতাে ছায়া নিয়ে আছেন বন্ধু বুদ্ধদেব বসু, ভূমেন্দ্র গুহ। বিশুদ্ধ, সিরিয়াস এক কবির টলমল, অনিশ্চিত, অন্ধকার জীবনের কথা প্রায় সবই রয়েছে এই বইয়ে। যে-জীবনের আদ্যোপান্ত, আদি-অন্ত শুধুই কবিতা আর কবিতা।

সব মিলিয়ে ২৪০ পৃষ্ঠার বই। হিসেবে এক-দু’পাতা কমবেশি হতে পারে। এই ২৪০ পাতা পড়া শেষ হলে বােঝা যায়, শাহাদুজ্জামান একটি বিস্ময়কর এবং প্রয়ােজনীয় কাজ করেছেন। কেন, সে প্রসঙ্গে আসছি, তবে গােড়ায় বলে রাখি, এ আমার নিতান্তই ব্যক্তিগত মত। আমারই ভাল লাগা, আমারই মনে হওয়া। এই বিষয়ে কারও ভিন্নমত থাকতে পারে, নিশ্চয়ই আছে, সে বির্তক বা আলােচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। বইটির সঙ্গে অন্য কোনও বইয়ের তুলনা অর্থহীন। জীবনানন্দকে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই লেখা হয়েছে। হয়েছে বিস্তর আলােচনা। এর পরেও আরও হবে। এই ধরনের মানুষকে নিয়ে চর্চা কখনও থেমে থাকে না। নানা ফর্মে হতেই থাকে। একজন কমলালেবু উপন্যাসটিও সেরকম। লেখক উপন্যাস শেষে ৫৬টি বই এবং পত্রপত্রিকার তালিকা দিয়েছেন। সেখানে জীবনানন্দের কবিতা, উপন্যাস, গল্প, ডায়েরি তাে আছেই, দুই বাংলার বিশিষ্ট প্রবন্ধকার, গবেষকরাও আছেন। লেখকের এক সাক্ষাৎকারে পড়লাম, বইটি লেখার আগে তিনি ঘুরে দেখেছেন কলকাতা এবং বরিশালের সেই সব জায়গা, যেসব জায়গায় কবি থাকতেন। গেছেন হাসপাতালেও। এতদিন পরে এসব জায়গা থেকে কী নতুন তথ্য পাবেন? বইটি পড়ে বুঝেছি, না তথ্য নয়, শাহাদুজ্জামান তাঁর উপন্যাসের নায়কের জীবনকে হৃদয়ের মধ্যে নিয়ে এগােতে চেষ্টা করছেন। হ্যাঁ, এই বইয়ে তথ্য অনেক, যা হয়তাে আগেই জানা, বহুচর্চিত, তারপরেও বলব, বইটির হৃদয় কোনও কোনও সময়ে বাইরের তথ্যকে ছাপিয়ে এগিয়ে গেছে অনেকদূর। বড় বড় চরিত্র নিয়ে বিশ্বে অজস্র গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। হয়ে চলেছে। বাংলাতেও সেই তালিকা দীর্ঘ। তালিকায় পৌরাণিক, ঐতিহাসিক চরিত্ররা যেমন আছেন, আছেন বিপ্লবী, শিল্পী, সাহিত্যিক। এমনকী, জীবনানন্দকে নিয়েও এই বঙ্গে উপন্যাস লেখা হয়েছে। দু’টির কথা এখনই মনে করতে পারছি। একটি সুরঞ্জন প্রামাণিকের লেখা ‘সােনালি ডানার চিল’, অন্যটি প্রদীপ দাশশর্মার ‘নীল হাওয়ার সমুদ্রে’। স্বাভাবিক ভাবেই শাহাদুজ্জামানের উপন্যাসটি পড়ার আগে একধরনের মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু পড়তে গিয়ে সেই প্রস্তুতি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তার বদলে এমন অনেক কিছু পেয়েছি, যা ছিল কল্পনার বাইরে। এখানে উপন্যাসের ফর্মকে উলটেপালটে দেওয়া হয়েছে। কখনও মনে হয়েছে এ উপন্যাস কোথায়! এ তাে জীবনী। যেখানে মূল চরিত্র শুধু নিজে নন, তাঁর মা বাবা স্ত্রী প্রেমিকা সকলেই স্বনামে উপস্থিত। কোনও আড়াল-আবডাল নেই। জীবনানন্দকে ‘জীবনানন্দ’ নামে লিখতে দ্বিধা করেননি লেখক। ৫৬টি বই এবং পত্রপত্রিকা থেকে তথ্যের পর তথ্য সাজিয়ে লেখা। যেমনটি জীবনীকাররা করে থাকেন। আবার পাতা উলটেই ধারণা বদলেছে। পাতা জোড়া কবিতা। ‘বােধ’, ‘আট বছর আগের একদিন’, ‘ক্যাম্পে।

তবে কবিতারই বই হল নাকি? আরও এগিয়ে বুঝেছি, না, তাও নয়। এ এক বিচ্ছিন্ন, বিধ্বস্ত, প্রতিভাবান একাকী মানুষের আপনকথা। ডায়েরির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা ব্যর্থতা, গ্লানি, অপমানের কথাই লেখা হয়েছে সাজিয়ে, পরম্পরা ধরে। তবে কি এটিও ভঙ্গি বদলে আত্মকথাই? ভুল ভেঙেছে আবার। যখন নানা মাত্রায় ব্যাখ্যা পেয়েছি। পেয়েছি হিসেবনিকেশ। ঘনভাবে পেয়েছি কবির জীবন নিয়ে আলােচনা।

যে-জীবন প্রীতির স্পর্শ ছুঁয়ে দ্রুত ফিরে গেছে বিষন্নতায়। যে-জীবন অন্তর্গত রক্তের ভিতর বিপন্নতায় খুঁজেছে তার হিসেব। জীবনানন্দের কবিতা গল্প উপন্যাসের নির্মাণ, বিবিধ প্রসঙ্গ এই উপন্যাসে ঘুরেফিরে এসেছে। তখন আবার ভুল করে মনে হয়েছে, শাহাদুজ্জামান আসলে একটি প্রবন্ধের বই-ই লিখে ফেলেছেন। তাও সব মতামত যে নিজের, এমন নয়। বেশিটাই, বলা ভাল অনেকটাই, অন্য কবি, প্রাবন্ধিক, সমালােচক, সম্পাদকের ‘তাঁদের কথা’। তাঁদের ভালবাসা আর অবজ্ঞা। তা হলে কেন এটি। উপন্যাস? লেখক নিজেও তাই আখ্যা দিয়েছেন। বইয়ের মলাটে লেখাও রয়েছে। শুনেছি, বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কেউ কেউ নাকি বলেছেন, জীবনানন্দকে নিয়ে যে বিপুল চর্চা রয়েছে, এই বই তারই বাছাই অংশের কোলাজ। সত্যি কথা বলতে কী, যত ভালই লাগুক, পড়তে গিয়ে আমিও মাঝে মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। ভ্রম কাটে শেষ হলে। বুঝি, যে যা বলুক, সাহিত্যের চিরাচরিত নিয়মে উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ যাই থাকুক না কেন, ‘একজন কমলালেবু’ অবশ্যই উপন্যাস, যা আঙ্গিকে, গঠনে, মাত্রায় অন্যরকম। নিভৃত, এলােমেলাে এক জীবনের চারপাশে ঘিরে থাকা কুয়াশার মতাে ভালবাসা, উপেক্ষা, যন্ত্রণা সরিয়ে হাঁটা এক কাহিনি। হ্যাঁ, কাহিনিই তাে। কোনও জীবন কি অবিশ্বাস্য মনে হয় না? মনে হয় না এ জীবন বাস্তব নয়, শুধুই কল্পনার? রং-তুলিতে আঁকা, যার ওপর কখনও কালি, কখনও জল পড়েছে, কখনও মুছে গেছে, কখনও হয়েছে আবছা। কখনও নষ্ট হয়ে আবার নতুন। কোনও ছবি তৈরি করেছে। মনে কি হয় না সে জীবনের কথাও রুদ্ধশ্বাসে পড়ারই মতাে? শাহাদুজ্জামান ‘একজন কমলালেবু’-তে জীবনানন্দকে সেভাবে পাঠকের কাছে এনেছেন। পাশে এনেছেন। যে-জীবনানন্দ মায়া, নিষ্ঠুরতাকে নিংড়ে নির্মাণ করেন কবিতা। প্রতিটি শব্দ, বাক্যবন্ধন, যতিচিহ্নে নিজেকে রেখে যান একই সঙ্গে রক্তের ফোঁটা ও চুম্বনে। উপন্যাসের মূল চরিত্র জীবনানন্দ না হয়ে যদি অন্য কেউ হত, তাতেও এই লেখার মান একবিন্দু খাটো হত না।

আমি জীবনানন্দের নাম না জেনেও এই বই পড়ে ফেলতাম এবং এমন কোনও পাঠকের হাতে যদি এই বইটি তুলে দেওয়া হয়, যে কবিতা বা কবির থেকে শত যােজন দূরে থাকে, সেও বইটি পড়তে শুরু করলে ছাড়তে পারবে না। শেষ হলে জলে ভেজা উজ্জ্বল চোখে বলতে বাধ্য হবে, ‘আমার ভাষার এই কবির জন্য আমি গর্বিত। আমি তাঁর কবিতা পড়ব। তাঁর জীবন পড়ব। তাঁকে নিয়ে আলােচনা শুনব।'

একটি লেখা এর বেশি কী করতে পারে?

শাহাদুজ্জামান কোনও আড়াল রাখেননি। পাঠককে ঠকাননি। উপন্যাসে মূল চরিত্রের লেখা কবিতা লেখা যাবে না, ডায়েরির পাতা নেওয়া যাবে না, প্রাবন্ধিকের বিশ্লেষণ নেওয়া যাবে না। নিলেই তাকে চলে যেতে হবে ননফিকশন বা ডকুফিকশনের আলমারিতে— সাহিত্যের পায়ে এমন শিকল কে পরিয়েছে? বিশ্বজুড়ে এই শিকল ঘেঁড়া হয়েছে, হচ্ছে। বাংলাতেও হয়েছে বারবার। শাহাদুজ্জামান যেমন শিকল ভেঙেছেন, মানুষের মন জয়ও করেছেন। ‘আমি ফর্ম ভেঙেছি, ফর্ম ভেঙেছি’ বলে নিজেকেই ঢক্কানিনাদ করতে হয়নি। ফর্ম নিয়ে আলাদা করে মাথাই ঘামাতে হয়নি যেন। সে এসেছে নিজের খুশিতে।

বইটির শুরু যতই রহস্যময়, কৌতুহলােদ্দীপক, আকর্ষণীয় হােক না কেন, পড়তে হয়েছে ধীরে। সময় নিয়ে। রস অনুভব করতে করতে এগােতে হয়েছে। বলার ভঙ্গিটি অতি স্বাদু। একজন বাহ্যিকভাবে নরম এবং অন্তরে অতি কঠিন ও জটিল মানুষকে নিয়ে লিখতে বসলে যে-ভাষা ও ভঙ্গির কথা মনে আসা স্বাভাবিক এবং ব্যবহারের লােভ জাগে, শাহাদুজ্জামান তাকে এড়িয়েছেন। শব্দ, অলংকার, বাক্যবিন্যাসের মারপ্যাঁচে লেখাকে ভারাক্রান্ত করেননি। অকারণ পাণ্ডিত্য জাহিরের চেষ্টা নেই। সহজ গদ্য, কিন্তু মিয়নাে নয়। তাজা এবং শক্তপােক্ত। পড়তে গিয়ে বারবার থমকে ভাবতে হয়, কিন্তু অযথা হোঁচট খেতে হয় না।

আবার লেখার মধ্যে নেই অতিরিক্ত সরলীকরণ। যেখানে যেমন মনে করেছেন, বােধ, বিশ্বাস,

জীবনদর্শনের কথা বলতে দ্বিধা করেননি। বইজুড়ে জীবনানন্দ দাশ নিজেই থেকেছেন। লেখকের হয়ে যাননি। শুধু লেখক আঁচলের মতাে তাঁর হৃদয়খানি পেতে রেখেছেন।

বইটির এটি অন্যতম গুণ। অতি সাধারণ পাঠকও একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে জানবে অতি উৎসাহে। পরম বিস্ময়ে, মমতায় সে চিনবে গহন সঞ্চারী, নির্জন, একাকী এক প্রতিভাকে। চরিত্রগতভাবে মূলত ধূসর, ছায়া আর কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে থাকা কোনও জীবন মনােগ্রাহী। করে উপস্থাপনা সহজ কথা নয়। আবার বলছি, পড়তে শুরু করলে থামার সুযােগ দেননি। সেখানে ঠিক-বেঠিকের নিক্তি মাপা অর্থহীন। মনের মাধুরী যদি কোথাও মেশানােও হয়, সে অধিকার লেখাটি নিজেই তৈরি করে নিয়েছে।

অনেকে বলে, বইপাঠে (যে-কোনও লেখার ক্ষেত্রেও সম্ভবত সমানভাবে প্রযােজ্য) নৈর্ব্যক্তিক থাকাটাই সমীচীন। প্রতিক্রিয়া শুরু হবে পাঠশেষে। বিষয়, ভাবনাকে মনের ভিতরে জারিত হতে হবে। আমিও চেষ্টা করি এই পথে হাঁটতে, বেশির ভাগ সময়েই পারি না। এই বইয়ের বেলাতেও তাই হয়েছে। পড়তে পড়তেই মনের ভিতর প্রতিক্রিয়া হয়েছে। আমাকে প্রভাবিতও করেছে। এখানে বলে রাখা প্রয়ােজন, আমি কোনও সাহিত্য গবেষক, শিক্ষাজগতের মানুষ অথবা মননে, দর্শনে শুধু আচ্ছন্ন গুরুগম্ভীর পাঠক নই। নিছকই পাঁচজনের মতাে সাধারণ মেধার একজন পড়ুয়া। পড়ার আনন্দেও পড়ি। তবে বহুজনের মতাে একজন জীবনানন্দ ভক্ত। আবার একই ভাবে বহুজনের মতােই বেশি ভক্ত। তবে সেখানেও ঘাটতি রয়েছে। এই তীব্র, স্নিগ্ধ এবং অপ্রতিরােধ্য মানুষটির কাজ ও জীবন নিয়ে যে-বিপুল চর্চা হয়েছে, তার খুব সামান্য অংশই আমি জানি। কে জানে, বিস্তৃত পড়া থাকলে হয়তাে খুঁতখুতানি হত। ভাবতাম, এই বইয়ে নতুন কী রয়েছে? ভাবতাম, কেন আবার লেখা? নিজেকেই হয়তাে বলতাম, যিনি কবিতা নিয়ে বেঁচে থেকেছেন, মরেও গেছেন কবিতা নিয়ে, তাঁকে জানতে বইয়ের পাহাড় সাজিয়ে বসতে হয়। না হলে এই মানুষকে জানার, চেনার অধিকারী নও তুমি। একজন কমলালেবু আমাকে সেই হীনমন্যতা থেকে মুক্ত করেছে। আমি জীবনানন্দ দাশকে জানার জন্য আরও আগ্রহী হয়েছি। শেষে একটা কথা বলে নিই। কাহিনি, প্রথম অধ্যায়ের মতাে শেষ অধ্যায়টিতেও ফিরে এসেছে হাসপাতালে। ফিরে এসেছে কবির মৃত্যু। মাঝখানে ক্লান্ত জীবনের পথে পড়ে থেকেছে উজ্জ্বল এক কমলালেবু। না, একজন কমলালেবু।

একজন কমলালেবু

শাহাদুজ্জামান।

প্রথমা প্রকাশন।

আলোচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয় দেশ ২রা ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সংখ্যায়।

‘বাংলা ভাষার সূর্য অস্ত যায় না’ | সেলিনা হোসেন | রবিবারের প্রবন্ধ ৩

‘বাংলা ভাষার সূর্য অস্ত যায় না’
সেলিনা হোসেন

আমার এই লেখার শিরোনামটি আমার নয়। আমার শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় মানুষ তাঁর একটি বক্তৃতার এই শিরোনামটি ব্যবহার করেছেন। বাংলা একাডেমীতে চাকরি করার সময় তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, এখন থেকে কুড়ি বছর আগে, বাংলা একাডেমী থেকে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। তাঁর অনুসন্ধিৎসার বিচিত্র বিষয় আমাকে আকৃষ্ট করে। তিনি বিচারপতি মুহাহম্মদ হাবিবুর রহমান।

এই শিরোনামটি আমাকে ভাবায়। আমার মনে হয়েছে শিরোনামটির নানা দিক আছে। ভাষার সূর্য অবশ্যই অস্ত যাবে না—অস্ত গেলে বাঙালি হারাবে তার গৌরব এবং অহংকারের ইতিহাস। কিন্তু ভাষার নানা অনুষঙ্গ থাকে—সে অনুষঙ্গ আধিপত্য বিস্তার করে অন্যের ওপর। ব্যক্তি ভাষার সেইসব অনুষঙ্গ, বুঝে অথবা না বুঝে, তাকে স্থায়ী করে ফেলে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর্থ-সামাজিক পটভূমিতে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। সেজন্য আমরা চাই ভাষার আধিপত্য বিস্তারকারী অনুষঙ্গের যে সূর্য তাকে অবশ্যই অস্ত যেতে হবে। অস্ত যাওয়ার প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। এ প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে বাংলা ভাষার প্রতিরোধের দিকটির দু-একটা অনুষঙ্গ তুলে ধরে দেখাতে চাই কিভাবে ভাষার সূর্যটি টিকে থাকল।



বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’। ভুসুকু চর্যাপদের কবিদের মধ্যে অন্যতম একজন। তাঁর একটি পঙ্ক্তি এমন : ‘আজই ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী।’ অর্থাৎ আজ ভুসুকু বাঙালি হলো। একজন কবি নিজ জাতিসত্তার পরিচয় ধরে রাখার জন্য উচ্চারণ করেছিলেন এমন অবিনাশী পঙ্ক্তি। একই সঙ্গে মনে হয়েছে এই পঙ্ক্তির ভেতরে দ্রোহ এবং প্রতিরোধের ভাষাও আছে। নিজের জাতিসত্তার অস্তিত্ব সমুন্নত রাখার জন্য কবি তার ভাষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এমন প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করতে হলো তাঁকে? নিশ্চয়ই সেই সময়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল যার জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কবি। আঘাত এসেছিল এবং প্রতিরোধের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এসবই গবেষণার বিষয়। আজ আর জানার উপায় নেই। কিন্তু সে সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা এই যে কবি ভুসুকুরা লড়াইয়ে জিতেছিলেন সেই অষ্টম শতাব্দীতে, তাই তাদের ভাষার সূর্য অস্তমিত হয়নি। একবিংশ শতাব্দীতে এসে তাই আমাদের একজন মনীষী সগৌরবে বলতে পারছেন যে ‘বাংলা ভাষার সূর্য অস্ত যায় না’।

লড়াই আরো আছে।

সপ্তদশ শতকে ধর্মীয় গ্রন্থ বাংলা ভাষায় লেখা হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল। একশ্রেণীর লোক ধর্মগ্রন্থ বাংলা ভাষায় লেখার ঘোর বিরুদ্ধাচারণ করেন। বিরোধিতাকারীরা বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সুতরাং হিন্দুর ভাষা দিয়ে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ রচিত হতে পারে। সে সময়ের কবি সৈয়দ সুলতান, কবি আবদুল হাকিম এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং যুক্তি দিয়ে তা খণ্ডন করেন। সৈয়দ সুলতান বিরুদ্ধকারীদের ‘মুনাফিক’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন :

যে সবে আপনা বোল না পারে বুজিতে।

পাঁচালি রচিলাম করি আছ এ দুসিতে॥

মুনাফিক বলে আমি কিতাবেতে কাড়ি।

কিতাবেত কাড়ি দিলুম হিন্দুয়ানী করি॥

আল্লা এ বোলিছে মুঞি যে দেশে যে ভাষ

সে দেশে সে ভাষে কৈলুম রছুল প্রকাশ॥

অতএব নিজের ভাষায় রসুলের উপর বই লিখতে তিনি ভয় পাননি। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘ওফাতে রসুল।’ ধর্মগ্রন্থ বাংলায় লেখা যাবে না এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন কবি আবদুল হাকিম। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের মতে আবদুল হাকিমের বাড়ি ছিল নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত সন্দ্বীপের সুধারামে। তাঁরা মনে করেন তাঁর সময়কাল ১৬২০-১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ। আবদুল হাকিম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বিভিন্ন ভাষায় যখন বিভিন্ন পয়গাম্বরদিগের নিকট তাঁহাদের কিতাব অবতীর্ণ হইয়াছে, আমাদের বাংলা ভাষায় ধর্মগ্রন্থ লিখিলে কেন দোষ হইবে? আল্লাহতালা তো সকল ভাষা বুঝেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘গ্রন্থপাঠের প্রথম উদ্দেশ্য হইতেছে আল্লাহর আদেশ পালন করা। আরবী পড়িয়া যদি কোন ব্যক্তি ধর্মভাবে প্রণোদিত না হয় বা ধর্মাদেশ পালন না করে তবে এই আরবী কিতাব পাঠের সার্থকতা কোথায়?’ বাংলা ভাষায় ধর্মীয় গ্রন্থ কম বলে তিনি আক্ষেপ করেছেন। শেষ পর্যন্ত যারা বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করতে দ্বিধা করেননি। লিখেছেন :

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥

দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়া এ।

নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে না জাত্র॥

মাতা পিতাসহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মন হিত অতি॥

না বুঝি আরবী বাক্য না চিনি অক্ষর।

তে কাজে আশ্বাস মনে ভাবি বহুতর॥

নিজ দেশী ভাষা করি গৃহতে সকল।

আমি সব আগে কর সঙ্কট কুশল॥

আবদুল হাকিমের এই বইটির নাম ‘নূরনামা’। এই বইয়ে তিনি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর নূর সৃষ্টির বর্ণনা দিয়েছেন। যাঁরা ধর্মের পবিত্র বাণীকে বিদেশী ভাষা থেকে ছাড়িয়ে এনে নিজের ভাষায় রূপায়িত করেছে তারাই তো সত্যিকারের সৈনিক। নিজ ভাষার সূর্যকে অস্তমিত হতে দেয়নি। ভাষার বিরোধিতাকারীদের যাঁতাকলে স্তব্ধ হয়ে থাকতে দেয়নি নিজেদের সৃজনশীলতাকে। তাঁদের অবিনাশী পঙ্ক্তিমালা আমাদের সামনে সূর্যরশ্মির মতো জ্বলজ্বল করে। তবে বিরোধিতাকারীরা টিকে আছে ভিন্ন খোলসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন আবাসিক এলাকার দেয়ালে লেখা আছে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ একবিংশ শতাব্দীতে এখনো এসব কথা বলতে হচ্ছে। কেননা মৌলবাদের থাবা ক্রমাগত গ্রাস করতে চাইছে এই দেশ। কারণ ধর্মের নামে নিপীড়িত, নিগৃহীত হচ্ছে এ দেশের মানুষ। নিপীড়িত হচ্ছে নারীসমাজ। মৌলবাদীরা ধর্ম যার যার এটা মানতে রাজি নয়। একতরফাভাবে নিপীড়ন করছে আহমদিয়াদের, নিপীড়ন করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদের। এর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এই ভাষার সূর্যকে ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো কিভাবে? রাষ্ট্রের ক্ষমতাধররা যে এই ভাষা বুঝতে চায় না। ভাষার সূর্য মাথার ওপর থাকলেই হবে না, সেই ভাষার শক্তিকে বাস্তবে রূপায়িত করার মানুষ চাই।



এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে ‘বাংলা ভাই’ নামে সম্বোধন করে দেশবাসী। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ এই শব্দ দুটি অবলীলায় ব্যবহার করে। প্রবল মর্মযাতনা পীড়িত করে আমাকে। ‘বাংলা’ কোনো সাধারণ শব্দ নয় আমাদের জীবনে। এর অন্তরালে প্রবল শক্তি নানা অভিধা নিয়ে হাজির হয় আমাদের সামনে। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় সমুন্নত করার জন্য রাজপথে জীবন দিয়েছিল আমাদের তরুণরা। এই গৌরবের ইতিহাস বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা সূচিত করেছিল। এত যার গৌরব সে শব্দ কেন একটি সন্ত্রাসীর নাম হবে? আমরাই বা কেন অহরহ উচ্চারণ করে যাচ্ছি? কেন প্রতিবাদ করছি না? ‘ভাই’ একটি গভীর অর্থব্যঞ্জক শব্দ। এটি শুধুই মায়ের পেটের ভাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ভাই দিয়ে তৈরি হয় নারী-পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক। শব্দটি স্নেহের ভালোবাসার, শ্রদ্ধার শব্দ। এটিও সন্ত্রাসীর দখলে চলে গেছে। ভাষার সূর্যকে এভাবে কালিমালিপ্ত করা হলে কুঁকড়ে আসে অস্তিত্ব। মুছে যেতে চায় ভাষার ইতিহাস। কত প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মুখে ভাষা তার আপন সত্তা উজ্জ্বল রাখে সে ইতিহাস তো সবার জানা। তাই বলছিলাম গণমাধ্যমের দায়িত্বে কথা। বিশেষ করে মুদ্রণ গণমাধ্যম পারে ভাষার যথাযথ ব্যবহার পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে। বদলাতে পারে ভাষার ওজন।

ভাষার আধিপত্য সবচেয়ে বেশি দমন করেছে নারীকে। এমন অনেক শব্দ আছে যার কোনো পুংলিঙ্গ নেই। যেমন ‘সতী’। এমন অনেক শব্দ আছে যেটি পুংলিঙ্গে একরকম অর্থ বহন করে, স্ত্রীলিঙ্গে অন্যরকম। যেমন ‘একেশ্বর’। ভাষা পুরুষের ক্ষমতা, দম্ভ, গৌরব, অহংকারকে যত দৃঢ়ভাবে প্রচার করেছে নারীর বেলায় তার একভাগও করেনি। নারীর প্রতি প্রযোজ্য ভালো অর্থের শব্দ গালিতে রূপান্তরিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। যেমন ‘মাগী’। মা অর্থ জননী, মাতা। ‘গী’ অর্থ বাক্য, বচন, জ্ঞান, বেদ, সরস্বতী। কিন্তু এখন প্রবল উচ্চারণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই শব্দটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভাষার সূর্যকে অস্ত যেতে দেয়নি সেই ভাষার মানুষ। আবহমানকাল ধরে নারীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে নিজের রচিত গান, গল্প, ছড়া, প্রবাদ, প্রবচন ইত্যাদি। যা সমৃদ্ধ করেছে ভাষাকে। কিন্তু নারীর ওই অবদান অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য করেছে পুরুষ। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে নিজের পক্ষে।

‘সম্প্রতি দাতাগোষ্ঠীর সহযোগিতায় বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডসের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে তোলা কর্মসূচি চলছে। এই বিষয়ে একটি গানের কয়েকটি পঙ্ক্তি শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। আমি গানটি স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত করছি। দু-একটা শব্দ ভুলও হতে পারে আগেই স্বীকার করছি। গানটি এমন :

ওরে সরল ছেলেটারে

ঢাকায় আইসা এইচআইভি বাঘে খাইলরে

কামিনী ছলনায় ভুলিয়া

এইচআইভির বাঘে খাইলরে...

কিন্তু অদ্ভুত ভাষার ব্যবহার। ছেলেটা সরল, মেয়েটা ছলনাময়ী। তাই তাকে এইচআইভির বাঘে খায়। ঢাকায় এসেই ছেলেটি পতিতালয়ে যাওয়ার রাস্তা চিনে ফেলে। পতিতালয়ে তৈরি হয় প্রথমত পুরুষের প্রয়োজনে, দ্বিতীয়ত উপায়হীন নারী বেঁচে থাকার তাগাদায় সেখানে আশ্রয় খোঁজে। বিক্রি করে শরীর। গানের সরল ছেলেটি এতই সরল যে তাতে কামিনীর ছলনা বাঘের মুখে তুলে দেয়, কিন্তু সে কনডম ব্যবহার করতে শেখে না। এভাবে ভাষা ব্যবহার করে এইচআইভি সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা যদি হয় তাহলে সচেতনতার কর্মসূচি যে লাটে উঠবে তাতে সন্দেহ নেই। এভাবে যে কোনো অসুস্থ ধারণাকে অনবরত বলার মধ্য দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় নেতিবাচক শক্তি। ভাষার যে ক্ষুদ্র অংশ জীবনের পক্ষে কাজ করে না তার অস্ত যাওয়াই উচিত। জীবন নারীর একার নয়, নারীর সঙ্গে পুরুষের—যারা সৃষ্টি করে আগামী প্রজন্ম। এই প্রজন্মকে ভাষা বিষয়ে তৈরি করার জন্য ‘প্রথম আলো’ একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

কত হাজার বছর আগে জানি না, মহীয়সী খনা তাঁর একটি বচনে বলেছিলেন : ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।’ অর্থাৎ মাঘ মাসের শেষে বৃষ্টি হলে ফসল ভালো হয়। সেই রাজাই পুণ্যবান এবং সেই দেশই ধন্য যারা তার প্রজাদের পেটভরা ভাত দিতে পারে। ভাষার এমন অবিনাশী পঙ্ক্তির সূর্য কোনোদিন যেন অস্তমিত না হয় এই প্রার্থনা, আজকের বাংলাদেশের মানুষের।

০৬-০৯-১৯৯৪

প্রবাহিত মনুষ্যত্ব - শঙ্খ ঘোষ | রবিবারের প্রবন্ধ ২

রবিবারের প্রবন্ধ ২
প্রবাহিত মনুষ্যত্ব
শঙ্খ ঘোষ
আর অন্যদিকে, একজন বর্ষীয়সী মহিলাকে জানি, মানুষখেকো বাঘেরা বড়ো লাফায় বইটি পড়ে এর কবিকে যিনি একটি চিঠি লিখবার জন্য ব্যাকুল হচ্ছিলেন৷ এর তাপ আর বিক্ষোভ, এর প্রাত্যহিকতা আর পথচারিতায় খুব সহজেই নিজের মন মিলিয়ে নিতে পেরেছিলেন সেই মহিলা৷ বাংলা কবিতার প্রেমিক একজন বিদেশী মানুষকেও জানি, কলকাতায় এসে যিনি কবিতার মধ্যে খুঁজছিলেন এদেশের সাময়িকতার চাপ, এর প্রতিদিনের রক্তক্ষরণ৷ আমাদের মতো দেশে কিংবা লাতিন আমেরিকায় বা আফ্রিকায় যে-ধরণের প্রতিবাদের কবিতা বিদীর্ণ হয়ে উঠবার কথা এখন, তিনি খুঁজছিলেন সেইটে৷ আর এই কাজে প্রচুর সন্ধানের পর তিনি নির্বাচন করে নিয়েছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা––সমস্তরকম লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে আর্তনাদ যেমন লাভাস্রোতে বেরিয়ে আসে ওঁর রচনায়, সেটা মুগ্ধ করেছিল তাঁকে৷ প্রতিবাদের এই প্রত্যক্ষতাতেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষতম কবিতার পরিচয়, এইখানেই তাঁর কবিতার সঙ্গে একাত্মবোধ করেন তাঁর আজকের দিনের পাঠক৷

কিন্তু আমরা, যাঁরা অনেকদিন ধরে তাঁর কবিতা পড়ছি, আমাদের তখন অন্য একটা ভাবনাও এসে পড়ে মনে৷ অনেকদিন আগে যখন তিনি জেগে উঠেছিলেন যেন জীবনানন্দের ভূমি থেকে, তার চেয়ে এখনকার জগৎ কি তবে সরে এসেছে একেবারে? পূর্বাশা-র পৃষ্ঠায় যখন তিনি লিখছিলেন “ক্লান্তি ক্লান্তি”র মতো কবিতা, ‘এমন ঘুমের মতো নেশা’ কিংবা ‘এমন মৃত্যুর মতো মিতা’কে এড়িয়ে জীবন চান না বলে জানাচ্ছিলেন যখন, একাধিক কবিতায় যিনি দেখছিলেন ‘শরবতের মতো সেই স্তন’ তাঁর কবিতায় তখন সদর্থেই একটা প্রচ্ছন্ন আবহ ছিল জীবনানন্দের৷ এটা হতেই পারে যে আজ দীর্ঘ পঁচিশ বছরের অভ্যাসে তিনি অল্পে অল্পে––কিংবা হঠাৎই একদিন––একেবারে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন সেই আবহ থেকে, মৃত্যুর থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন ক্ষুধার্ত জীবনের দিকে৷ এটা হতেই পারে যে তাঁর কবিতা এখন আর আলোছায়ার কোনো প্রদোষ রাখবে না কবিতায়, হয়ে উঠবে স্পষ্ট এবং রূঢ়, সাময়িকতার প্রয়োজনে অত্যন্ত নির্মমরূপে বাস্তবিক ––ঘোষিত এবং দলীয়৷

তবু, এইটেই কি তাঁর সব পরিচয়? বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা লক্ষ করে পড়লে দেখা যাবে যে তাঁর এই মুহূর্তের রচনায় বিষাক্ত ধিককারের সঙ্গে সঙ্গে রয়ে গেছে এক প্রগাঢ় কোমলতা৷ এই অর্থে, মনে হয়, তাঁর অতীত তাঁকে ছেড়ে যায়নি পুরো, বরং কবিতার ভিতরকার পর্দায় সেটা এক মস্ত সামর্থ্য এনে দিচ্ছে৷ প্রথম যৌবনে যে স্বপ্নমদির জগৎ তিনি দেখছিলেন তা আর প্রত্যক্ষে এখন কথা বলে না সত্যি, কিন্তু দেশে দেশে কালে কালে ‘প্রবাহিত মনুষ্যত্ব’র প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসা একটা মমতাময় ধমনী রেখে দেয় তাঁর কবিতার অন্তরালে৷ তখন, এ-রকমই অভিমান আর ক্রোধে মিশে গিয়ে তৈরি হয়ে ওঠে তাঁর ছোটো এক-একটি কবিতা

নাচো হার্লেমের কন্যা, নরকের উর্বশী আমার

বিস্ফারিত স্তনচূড়া, নগ্ন উরু, …লিতবসনা

মাতলামোর সভা আনো, চারদিকের নিরানন্দ হতাশায়,

হীন অপমানে

নাচো ঘৃণ্য নিগ্রো নাম মুছে দিতে মাতলামোর জাত নেই,

পৃথিবীর সব বেশ্যা সমান রূপসী৷

নাচো রে রঙ্গিলা, রক্তে এক করতে স্বর্গ ও হার্লেম৷

যেমন আমাদের অভিজ্ঞতারও আছে দিন আর রাত্রি, যেমন দিনের অনেক রৌরব আমরা মুছে নিই রাত্রিবেলার নির্জন আত্মক্ষালনে, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিণত কবিতাতেও তেমনি আমরা দেখতে পাব সেই দুই ছায়াপাত৷ সামাজিক যে-কোনো ঢেউয়ের আঘাতে কেঁপে ওঠেন এই কবি, বিবেচনার কোনো সময় পাবার আগেই ঝাঁপ দিয়ে পড়েন স্রোতে, ভেঙে ফেলতে চান সব ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান––কারোই মুক্তি নেই তাঁর সর্বনাশা রোষ থেকে৷ কিন্তু এইসব ভয়ংকর মুহূর্তেও তিনি হঠাৎ এক-একবার এসে দাঁড়াতে পারেন সেই ঘুমন্ত সীমায়

ভুবনেশ্বরী যখন শরীর থেকে

একে একে তার রূপের অলংকার

খুলে ফেলে, আর গভীর রাত্রি নামে

তিন ভুবনকে ঢেকে

এই হলো তাঁর কবিতার রাত্রি, এইটেই তাঁর কবিতার আত্মস্থ অবকাশ, এইখানে তাঁর কবিতার পলিমাটি৷ এই পলি আছে বলেই তার উপর জেগে ওঠা সমস্ত দিনের শস্য একটা স্বতন্ত্র আলো পেয়ে যায়, হয়ে ওঠে সমকালীন অন্যান্য চিৎকৃত বিক্ষোভের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্র৷ তাঁরও আছে চিৎকার, কিন্তু অনায়াস সত্য থেকে উঠে আসে বলে তাঁর সেই চিৎকারে প্রায়ই লিপ্ত থাকে একটা মন্ত্রের স্বাদ

অন্ন বাক্য অন্ন প্রাণ অন্নই চেতনা

অন্ন ধ্বনি অন্ন মন্ত্র অন্ন আরাধনা৷

অন্ন চিন্তা অন্ন গান অন্নই কবিতা,

অন্ন অগ্নি বায়ু জল নক্ষত্র সবিতা৷

অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্বধর্মসার

অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওংকার

সে অন্নে যে বিষ দেয়, কিংবা তাকে কাড়ে

ধ্বংস করো, ধ্বংস করো, ধ্বংস করো তারে৷

এই কবিতা একটা সমগ্র ক্ষুৎকাতর যুগের জাতীয় স্লোগান হয়ে উঠবার যোগ্য৷

এটা ঠিক যে এই কবিতাটিতে, কিংবা এ-পর্যন্ত উদ্ধৃত তিনটি রচনাতেই তাঁর শিল্পসুমিতির যে ধরণ, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ পর্যায়ের কবিতার সেইটেই সাধারণ লক্ষণ নয়৷ তাঁর কবিতা অসমান, অনেকসময়েই তাঁর কবিতা বরং তুলে নিয়ে আসে ঈষৎ ভাঙা চলন, যার ছন্দে ছবিতে শব্দের ব্যবহারে হঠাৎ কখনো মনে হতে পারে যে অশুদ্ধ হলো সুর৷ কিন্তু সেইটেই যেন তাঁর আনন্দ, যেন কিউবার কবি নিকোলাস গ্যিয়েন-এর মতো তিনিও আজ বলে উঠতে পারেন নিজেকে অশুচি বলেই ঘোষণা করছি আমি৷ এই কবিও একদিন ‘নিজের মধ্যে নিহিত থেকে অর্কেস্ট্রা বাজানো’র ভঙ্গি জানছিলেন, যুক্ত ছিলেন তাঁর ভাষার মডার্নিজম-এর আন্দোলনে আর তার থেকে আজ বেরিয়ে এসে এখন তিনি চার পাশে দেখতে পান এক বিশাল চিড়িয়াখানা৷ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও আজ তাঁর ছোটো ছোটো বইগুলির মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন আমাদের আক্রমণকারী সমকালীন ভণ্ড পৃথিবী, আর তাই মুণ্ডহীন ধড়্গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে বা বাহবা সময় তোর সার্কাসের খেলা এইসব হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা-বইয়ের নাম৷ এর অন্তর্গত কবিতাগুলি পড়তে পড়তে কোনো পাঠকের মনে হতে পারে যেন তিনি হেঁটে চলেছেন ধান-কেটে-নেওয়া কোনো জমির ওপর দিয়ে, থেকে-থেকে কাঁটা বেঁধে পায়ে, পিঠে এসে লাগে রোদ্দুরের ফলা সেখানে নেই কোনো সমতল মসৃণতা বা শিল্পসুষমার কোনো সচেতন আয়োজন৷ এর অন্তর্গত কবিতাগুলি পড়তে পড়তে পাঠক কেবলই ঘূর্ণির মতো ঘুরতে থাকবেন এই পাঁচ-দশ বছরের কলকাতার গ্লানিময় ইতিবৃত্তে, সমস্ত ভারতবর্ষের নিরন্তন পচন-লাঞ্ছনায়৷ আর সেই পটভূমি মনে রাখলে এই অসমান ঊষর আঘাতময় শিল্পধরণকে মনে হয় অনিবার্য, অনিবার্য মনে হয় এর আপাতশিল্পহীনতা৷ আপাত, কিন্তু সম্পূর্ণত নয় কেননা অনেকদিনের কাব্যময়তাকে যিনি রেখে দিয়েছেন তাঁর ভিতরে, আজ এই স্পষ্ট ভর্ৎসনার উচ্চারণের সময়েও তাঁর ভাষা হয়ে ওঠে এ-রকম ‘আকাশের দিকে আমি উলটো করে ছুঁড়ে দিই কাঁচের গেলাস’ অথবা ‘ব্রাহ্মমুহূর্তে কারা ছায়ার মতো ছেড়ে গেছে ঘর’ কিংবা ‘কলকাতার ফুটপাথে রাত কাটায় এক লক্ষ উন্মাদ হ্যামলেট/তাদের জননী জন্মভূমি এক উলঙ্গ পশুর সঙ্গে করে সহবাস’ আর ‘আমাদের সন্তানের মুণ্ডহীন ধড়গুলি তোমার কল্যাণে ঘোর লোহিত পাহাড়৷’ তখন বুঝতে পারি কবির যোগ্য সমস্ত ইন্দ্রিয় তাঁর ভিতরে কাজ করে যায় কীরকম সন্তর্পণে, বুঝতে পারি কোথায় আছে পুরোনো সেই কবির সঙ্গে আজকের কবির নিবিড় কোনো যোগ৷

বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ - সৌরীন ভট্টাচার্য | রবিবারের প্রবন্ধ ১

বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ
সৌরীন ভট্টাচার্য

শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর আলোচনা উঠে আসে এর মধ্যে নিশ্চয়ই খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী ও সেই টানে শ্রীনিকেতন প্রসঙ্গও যখন চলে আসে তখন এই প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশে স্বাভাবিকভাবেই আমরা মেতে উঠি৷ ঠিক এই মুহূর্তে এরকম অনেকগুলো নজির আমাদের চোখের সামনে রয়েছে৷ বিশ্বভারতী প্রকল্প যে মূলত ব্যর্থ সে-বিষয়েও যেন প্রায় একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷ এখন শুধু এই মীমাংসা বাকি, এই ব্যর্থতার দায় কতটা কার৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি এর জন্য মূলত দায়ী নন? নাকি তাঁর জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সম্পদ’ বহন করে নিয়ে চলেছে যে সোনার তরী তার দিশাহারা নাবিকেরাই এর জন্য দায়ী? নাকি সমগ্র বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকেই বহন করতে হবে এর দায়ভার? নাকি সরকারি ঔদাসীন্য? নাকি রাজনীতির কুটিল আবর্ত? আধুনিক যুগটা নাকি প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার৷ কাজেই যুগোপযোগী হতে গেলে প্রযুক্তিবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনাবিদ্যা শিক্ষার আয়োজন থাকা চাই৷ খুব সম্প্রতি এরকম আয়োজনের সূত্রপাতও হয়েছে৷ কিন্তু তাতেও কি হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে? নাকি কালের ইশারায় নিজের স্বভাবের খোঁজখবর তেমন করে না নিয়ে আমরা যতই বদলাবার চেষ্টা করছি ততই আরও জটিল জালে জড়িয়ে পড়ছি?

সাফল্য-ব্যর্থতার কথা যখন আমরা বলি, তখন ঠিক কী ভাবি আমরা? কোনো ব্যক্তির জীবনেও যখন এ-প্রশ্ন ওঠে, তখন ঠিক কী থাকে আমাদের চিন্তায়? কে কী হতে চায়, কে কেমনভাবে কাটাতে চায় তার জীবন, সেসব কথা বাদ দিয়ে সাফল্য-ব্যর্থতার অঙ্ক কষার কোনো মানে হয় না৷ গড়পড়তা আর-পাঁচ জন যেমন হবে প্রত্যেককেই যদি সেই মাপে ছাঁটাই করার চেষ্টা হয়, তা হলে সবই তো এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যাবে৷ বৈচিত্র্যের কী দশা হবে তবে? সৃষ্টির জগতে বৈচিত্র্যের দাম আছে৷ শুধু ভিন্নতার খাতিরেই নয়, প্রয়োজনীয়তার খাতিরেও বৈচিত্র্য জরুরি৷ তাই সবই লেপে পুঁছে বেমালুম একাকার করে দিতে না চাইলে বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হয়, তাকে সম্মান জানাতে হয়৷ আর তখন সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশ আর অত সোজাসাপটাভাবে করলে চলে না৷ কথাটা যেমন ব্যক্তির স্তরে সত্য, তেমনই প্রতিষ্ঠানের স্তরেও তা সত্য৷ সব প্রতিষ্ঠান এক উদ্দেশ্যে তৈরি হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এক হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের পিছনের আবেগ ও কল্পনাও যে এক থাকে তা নয়৷ তা হলে এসব প্রশ্ন একেবারে ছেঁটে ফেলে বাদ দিয়ে একমাত্র এই মুহূর্তের প্রয়োজন, লক্ষ্য কিংবা চালু ধরনকে সম্বল করে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিচার করতে বলা কি খুব সমীচীন? অনেক স্বপ্ন কল্পনা আদর্শ এই মুহূর্তের নিরিখে যদি মনে হয় ভাবালুতা, তা হলে ঢাকিসুদ্ধ সেই ভাবালুতা বিসর্জন দেওয়ার আগে নিরিখটাকেই কি একবার মেপে নেওয়া উচিত না? নইলে ক্ষণমুহূর্তই একমাত্র ধ্রুবসত্য, এ-কথা মেনে নিতে হয়৷ কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা ইতিহাসের দিকে তাকালে বারবার দেখা যায়৷ মুহূর্তের নিরিখ যে কতটাই ভঙ্গুর তা যদি বারবার এমনভাবে প্রতীয়মান না হত তা হলে তো পরিবর্তনের জন্য কোনো ফাঁক বের করে নেওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য হত৷ কিন্তু ইতিহাসে পরিবর্তন তো অবশ্যই আছে৷ ক্ষণমুহূর্তের কত কত মানদণ্ড একেবারে জলস্রোতের মতো ভেসে গেছে৷ সমস্ত মূল্যমান ও বিচারের নিরিখ ইতিহাসে নিতান্ত অচিরস্থায়ী৷ কাজেই প্রতিষ্ঠানের বিচারের সময়ে মানদণ্ডের বিপর্যয়-সম্ভাবনা বিষয়ে সজাগ থাকা চাই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী-শ্রীনিকেতনের বিচারে নজর কি শুধুই ডিগ্রি, পাঠক্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ঘেরে আটকে থাকবে? একটা প্রতিষ্ঠানের আবহ ও রণন কি কেবলমাত্র ওইসব জিনিসে ধরা পড়ে? তার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করে নানাদিকে তাকাতে হয়৷ সেই আবহ অনেকসময়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ দৈনন্দিনের মধ্যেও টের পাওয়া যায়৷ দোকান-বাজারের মানুষ, রিক্সাচালক, রাজমিস্ত্রি––এই-যে স্তর, যে-স্তরে সাধারণ জীবনের মানটা ধরা থাকে, সেখানে যদি চকিতে চোখে পড়ে এমন কোনো সরলতা বা সজীবতা যা মুহূর্তের জন্য প্রাত্যহিকের কলুষ থেকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়, তা হলে কি ভাবতে ইচ্ছে করে না যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সবটাই ডিগ্রির গণ্ডিতে আটকে থাকে না হয়তো৷ আর রণন? যেসব বিচারে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ বলে রায় ঘোষণা হয়েই গেছে, যদি দেখা যায় যে, সেইসব বিচারেই অনুজ কোনো প্রতিষ্ঠান দারুণ সফল, আর সে-প্রতিষ্ঠানও ভাবনার আদলে অগ্রজ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণী, তা হলে?


প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট