কল্পনার কাউবয় নয়, বাস্তবের রূপকার ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি

কল্পনার কাউবয় নয়, বাস্তবের রূপকার ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি


মার্কিনদেশ সম্বন্ধে সারা বিশ্বের যে ধারণা তাতে Western ছবির গভীর প্রভাব।  মাথায় টুপি, কোমরে পিস্তল, ঘোড়ায় চড়ে ঝড়ের বেগে বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর ছুটে বেড়ানো কাউবয়দের রোমাঞ্চকর দৃশ্য অজস্র মানুষের মানসপটে পাকাপাকিভাবে গেঁথে রয়েছে। সদ্যপ্রয়াত লেখক ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি আমেরিকার কিংবদন্তী লেখক, যেমন পাঠক সমাদর পেয়েছেন, তেমনি সমালোচকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছেন।  তার অজস্র দরদী বাস্তবধর্মী রচনায় তিনি সেই অলীক Western কাল্পনিক জগত ভেঙে খান খান করে দিয়েছেন।  বইয়ের হাটের পাঠকে আরেকটা বিষয় শুনে আকৃষ্ট হবেন, তা হলো লেখালেখির পাশাপাশি তিনি পুরনো বই বিক্রির ব্যবসা করতেন।  এক সময়ে ছয়টি দালান নিয়ে তার বইয়ের দোকান ছিল, সেখানে চার লক্ষাধিক বই ছিল।  তার নিজের সংগ্রহেই ৩০,০০০ বই ছিল।
তাঁকে নিয়ে New York Times-এর প্রবন্ধ।   (মূল ইংরেজি রচনার লিঙ্ক একবারে নীচে। তাঁর মৃত্যুর পর মার্কিন রেডিওতে তার একটি চমৎকার সাক্ষাৎকার পুনপ্রচারিত হয়।  একেবারে নীচে তার লিঙ্কও রয়েছে।)
ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি, মার্কিন ওয়েস্টার্ন ঔপন্যাসিক, ৮৪ বছর বয়সে দেহত্যাগ করলেন 
ডোয়াইট গার্নার 
নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৬ মার্চ ২০২১
অনুবাদ আশফাক স্বপন
Larry McMurtry, Novelist of the American West, Dies at 84
By Dwight Garner
The New York Times March 26, 2021
ওয়েস্টার্ন’ অভিধায় অভিহিত আমেরিকার পশ্চিম অঞ্চল নিয়ে যে কাল্পনিক মোহময় জগত সৃষ্টি হয়েছে, ল্যারি ম্যাকমার্ট্রি (Larry McMurtry) তারঁ অজস্র উপন্যাস ও চিত্রনাট্যে ঊনিশ শতকের সীমান্ত অঞ্চল আর বর্তমান টেক্সাসের মফস্বল শহরের বাস্তব প্রতিচ্ছবি এঁকে সেই অলীক জগত ভেঙে খানখান করে দেন।  তিনি ২৫ মার্চ টেক্সাসের আর্চার সিটিতে মারা যান।  তার ৮৪ বছর বয়স হয়েছিল। 
তার লেখালেখির সহযোগী ও বান্ধবী ডায়ানা ওসানা (Diana Ossana) জানান মৃত্যুর কারণ congestive heart failure । 
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ম্যাকমার্ট্রি ৩০টির বেশি উপন্যাস লেখেন।  সেই সাথে প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ ও ইতিহাসের বইও লিখেছেন।  তিনি ৩০টির বেশি চিত্রনাট্যও লেখেন।  এর মধ্যে একটি  Brokeback Mountain-এর চিত্রনাট্যের জন্য তিনি ২০০৬ সালে অস্কার পুরস্কার লাভ করেন।  এ্যানি প্রু-এর (Annie Proulx)  ছোট গল্প অবলম্বনে ওসানার সাথে মিলে তিনি চিত্রনাট্যটি লেখেন।
তবে সমালোচক ও পাঠকদের কাছে সবচাইতে জনপ্রিয়তা লাভ করে তাঁর Lonesome Dove (নিঃসঙ্গ কপোত) উপন্যাসটি।  এই ৮৪৩-পাতার বিস্তৃত উপন্যাসে দুইজন অবসরপ্রাপ্ত টেক্সাস রেঞ্জার নিরাপত্তা রক্ষী ১৮৭০-এর দশকে রিও গ্র্যান্ডে নদী থেকে মনটানা অঙ্গরাজ্যে কী করে চোরাই গরুর দল নিয়ে যায় সেই গল্প বলা হয়েছে।  বইটি ১৯৮৬ সালে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করে এবং পরে বইটি থেকে একটি জনপ্রিয় টিভি মিনি সিরিজ তৈরি হয়। 
ম্যাকমার্ট্রি Lonesome Dove উপন্যাসটিতে প্রচলিত ওয়েস্টার্ন ধ্যানধারণা খণ্ডন করেন।  ভাবখানা এমন যেন সেই উপন্যাস চটুল ওয়েস্টার্ন উপন্যাসের মোহাচ্ছন্ন কাল্পনিক জগৎকে ভর্ৎসনা করছে বা লুই লামুর (Louis L’Amour)-এর মতো লেখকদের সৃষ্টিতে বিরাজমান মিছে অলীক কল্পনার ভূত তাড়াতে উদগ্রীব।  ১৯৮৮ সালের এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন – ‘আমি এই কাউবয়-এর অলীক কাল্পনিক ধারণার সমালোচক।  আমার মনে হয় না এই ধারণা সত্যি, এবং যেহেতু এটা আমার নিজের ঐতিহ্যের অংশ, আমি মনে করি এই বিষয়ে আমার সমালোচনা করবার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ’
পাঠকরা অবশ্য Lonesome Dove-এর একগুচ্ছ বাঙ্ময় চরিত্রের প্রেমে পড়ে যান।  ম্যাকমার্ট্রি নিজেও শেষপর্যন্ত উপন্যাসটিকে ওয়েস্টার্ন জীবন নিয়ে কাহিনীবিস্তারে Gone with the Wind (মার্কিন গৃহযুদ্ধ নিয়ে  Margaret Mitchell-এর জনপ্রিয়, বিশাল উপন্যাস) সমতুল্য বলে অভিহিত করেন।
ম্যাকমার্ট্রি ছিলেন র‍্যাঞ্চারের সন্তান।  র‍্যাঞ্চ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে গবাদিপশুর খামার।  তার উপন্যাসের বাস্তবতার অনেকটাই তরুণ বয়সে স্বচক্ষে দেখা টেক্সাসের অভিজ্ঞতা থেকে আহৃত।  তার প্রথম উপন্যাস Horseman, Pass By (১৯৬১, যেতে থাকো, অশ্বারোহী)।  এই উপন্যাসে আধুনিক জমানার সাথে যে পুরনো পশ্চিমাঞ্চলের মূল্যবোধের সংঘাত ঘটে, সেই মূল্যবোধকে তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।  টেক্সাসের ঐতিহাসিক ওয়েইন গার্ড (Wayne Gard) The New York Times Book Review-এ উপন্যাসটির সমালোচনায় লেখেন – ‘যারা গরু চড়ায়, তারা যত না ঘোড়ায় চড়ে, তার চাইতে ঢের বেশি পিকআপ ট্রাক বা ক্যাডিল্যাক গাড়ি চালায়।  সন্ধ্যাবেলায় খরকুটো একত্র করে আগুন জ্বেলে তাকে ঘিরে বসে গিটার বাজিয়ে লোকজ গান আর তারা গায় না, বরঞ্চ পাড়ার শুঁড়িখানা সংলগ্ন ঘরে বিলিয়ার্ড খেলে বা বিয়ার পান করে, আর সাএই সাথে কাছাকাছি লভ্য কোন নারীর মনোরঞ্জনে সচেষ্ট হয়। ’
সমালোচক আরো বলেন যে ম্যাকমার্ট্রির  ‘শুধু যে বাস্তবানুগ সংলাপ শ্রবণের সুতীক্ষ্ণ শক্তি আছে তাই নয়, তার প্রকাশভঙ্গীর প্রতিভাও এত উজ্জ্বল যে খুব সহজেই সেটা ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যসৃষ্টির সহায় হতে পারে। ’
গোড়া থেকেই চলচ্চিত্রনির্মাতারা ম্যাকমার্ট্রির উপন্যাসের প্রতি আকৃষ্ট হন।   Horseman, Pass By থেকে Hud চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়।  ছবিটি মার্টির রিট (Martin Ritt) পরিচালনা করেন, মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন পল নিউম্যান (Paul Newman)।   The Last Picture Show (১৯৬৬, চলচ্চিত্রের শেষ শো) বয়ঃসন্ধি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হবার অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত একটি পরিহাসতরল,  গীতিকাব্যময় উপন্যাস।  উপন্যাসে যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা রয়েছে।  ঐ একই নামে পিটার বগডানোভিচ (Peter Bogdanovich)-এর নির্দেশনায় শ্রেষ্ঠাংশে জেফ ব্রিজেস (Jeff Bridges) ও সিবিল সেপার্ড (Cybill Shepherd)-এর অভিনয়ে ছবিটি নির্মিত হয়।  তাঁর ১৯৭৫ সালের উপন্যাস Terms of Endearment (ভালোবাসার শর্ত) থেকে  জেমস ব্রুক্স-এর (James Brooks) নির্দেশনায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।  শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেন শার্লি ম্যাকলেন (Shirley MacLaine), ডেব্রা উইঙ্গার (Debra Winger) আর জ্যাক নিকলসন।(Jack Nicholson।  ছবিটি ১৯৮৩ সালে সেরা ছবির অস্কার লাভ করে। 
সাংস্কৃতিক মহলে তিনি একরকম বহিরাগত ছিলেন, তাতে ম্যাকমার্ট্রিকে বেশ মজা পেতেন।  তার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন টেক্সাসে আর্চার সিটিতে।  ডালাস থেকে গাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টা উত্তর পশ্চিমে এই শহরটি অবস্থিত, এই শহরেই তার বেড়ে ওঠা।  প্রায় ৭০ বছর ধরে তার একই ডাকবাক্স ছিল।  Brokeback Mountain চলচ্চিত্রে সেরা চিত্রনাট্যের জন্য অস্কার পুরষ্কার গ্রহণের জন্য যখন তিনি মঞ্চে ওঠেন, তখন ডিনার জ্যাকেটের সাথে তার পরনে ছিল নীল জিন্স আর কাউবয় বুট।  দর্শকদের তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে চিত্রনাট্যট এ্যানি প্রু-এর ছোট গল্প অনুসরণে লেখা হয়।
তবে হাবেভাবে বহিরাগত ভাব দেখালেও আমেরিকান সাহিত্যাঙ্গনের গভীরে তার আনাগোনা ছিল।  ১৯৯০-এর দশকে দুই বছর তিনি সাহিত্য ও মানবাধিকারের বনেদি সংস্থা PEN-এর আমেরিকান সভাপতি ছিলেন।  তিনি The New York Review of Books-এ নিয়মিত লিখতেন।  আলোচনার প্রসঙ্গ প্রায়ই আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল।  তার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সুসান সন্টাগ (Susan Sontag), যাকে তিনি একবার দক্ষিণের জনপ্রিয় স্টক গাড়ির রেস দেখতে নিয়ে গিয়েছিলেন। 
ছয়টি দালান, একটি বইয়ের দোকান
পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে লেখালেখির পাশাপাশি ম্যাকমার্ট্রি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের বিক্রেতা ছিলেন।  আর্চার সিটিতে অবস্থিত তার বইয়ের দোকানের নাম ছিল Booked Up ।  সারা আমেরিকায় এটি অন্যতম বৃহত্তম বইয়ের দোকান ছিল।  এক সময়ে দোকানটি ছয়টি দালানে বিস্তৃত ছিল।  বইয়ের সংখ্যা ৪০০,০০০।  ২০১২ সালে ম্যাকমার্ট্রি দুই তৃতীয়াংশ বই নীলামে বিক্রি করে ব্যবসা গুটিয়ে আনার পরিকল্পনা করেন।  উত্তরাধিকারীদের হাতে ব্যবসা দিয়ে যাবার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন – ‘একটা দোকান তবু সামাল দেওয়া যায়।  চার-চারটা দোকান একেবারে জুলুম। ’
ম্যাকমার্ট্রির ব্যক্তিগত পাঠাগারেই প্রায় ৩০,০০০ বই ছিল।  সেই বই তিনটি বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা।  সেই বইয়ের গোছগাছকে তিনি সারা জীবনের কাজ বলতেন।  ‘এই অর্জন আমার লেখার চাইতে কম মূল্যবান নয়, হয়তো বেশিই,’ তিনি একবার বলেছিলেন। 
ল্যারি জেফ ম্যাকমার্ট্রির জন্ম ১৯৩৬ সালের ৩ জুন টেক্সাস-এর উইচিটা ফলস শহরে।  মা হেজেল রুথ আর বাবা উইলিয়াম জেফারসন ম্যাকমার্ট্রি।  বাবা ছিলেন র‍্যাঞ্চার, অর্থাৎ তিনি গবাদিপশুর খামার চালাতেন।  ওদের পরিবার আর্চার সিটির বাইরে ম্যাকমার্ট্রির ভাষায় ‘একটি বইপত্রহীন র‍্যাঞ্চার খামার বাড়ি’-তে থাকত।  পরে তারা শহরে চলে আসে।  আর্চার সিটি পরবর্তীতে লেখককল্পিত থালিয়া শহরের ভিত্তি।  তার গল্পে থালিয়া শহরের বারবার আবির্ভাব ঘটেছে। 
গোড়া থেকেই তিনি গভীর মনোযোগী পাঠক ছিলেন।  খুব শিগগির বুঝে ফেলেন র‍্যাঞ্চের খামার জীবন তার পোষাবে না।  তাঁর ২০০৮ সালের স্মৃতিচারণ Books (বই)-এ লেখেন – ‘ঘোড়ায় আমি মোটামুটি চড়তে পারতাম, কিন্তু অন্যান্য হাতের কাজে একেবারে অপদার্থ ছিলাম। ’ 
১৯৫৮ সালে তিনি নর্থ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেন।  এক বছর পর জো ব্যালার্ড স্কটকে বিয়ে করেন।  দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদের পূর্বে একটি পুত্র সন্তান হয়।  তার নাম জেমস, বর্তমানে গায়ক ও গীতিকার হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। 
১৯৬০ সালে হিউস্টনের রাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম এ ডিগ্রি লাভের পর ম্যাকমার্ট্রি পশ্চিমমুখো হন।  তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টেগ্নার ফেলো হিসেবে যোগ দেন।  তার সহপাঠীদের মধ্যে ভবিষ্যত ঔপন্যাসিক কেন কিসী (Ken Kesey) ছিলেন।  কেন কিসীর সাথে বন্ধুত্বের সুবাদে তিনি একটি স্মরণীয় খণ্ডচরিত্র হিসেবে টম উলফ-এর (Tom Wolfe) নব্য সাংবাদিকতার মাইলফলক বই The Electric Kool-Aid Acid Test (1968)-এ জায়গা করে নেন।  বইটি আমেরিকা জুড়ে কেন কিসীর মাদকনেশাময় ভ্রমণের গল্প।  সেই ভ্রমণে সঙ্গী Merry Prankster (রঙ্গপ্রিয় দুষ্টুর দল) নামে কিসীর একদল সাঙ্গপাঙ্গ আর বাহন রংচঙে পুরনো এক স্কুলের বাস।  
যেই খণ্ডচিত্রে ম্যাকমার্ট্রির ক্ষণিকের আবির্ভাব, তাতে নিল ক্যাসেডি কিসীর বাসের চালক।  বাসটি ম্যাকমার্ট্রির হিউসটনের শহরতলীর বাড়ির কাছে থামার পর এক পরচুলা পরিহিত উলঙ্গ নারী বাস থেকে নেমে তার ছেলেকে আকড়ে ধরে।  উলফ-এর বর্ণনায় ম্যাকমার্ট্রি ‘ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ইতস্ততভাবে ভদ্রমহিলার উদোম পিঠের দিকে এগিয়ে আমতা আমতা করে বলতে থাকেন – “এই যে ম্যাডাম, এক মিনিট!”’
টেক্সার ক্রিস্টিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, রাইস বিশ্ববিদ্যালয়, জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয় আর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়-এ ইংরেজি সাহিত্যে শিক্ষকতার সময় ম্যাকমার্ট্রি তার প্রথম দিককার উপন্যাসগুলো লেখেন।  তবে শিক্ষকতার প্রতি তার খুব আগ্রহ ছিল না, তাই লেখালেখিতে উন্নতির পর তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। 
রাজধানী ওয়াশিংটন অঞ্চলে একজন অংশীদার নিয়ে.১৯৭১ সালে তাঁর প্রথম Booked Up বইয়ের দোকান খোলেন।  দোকানের কারবার দুষ্প্রাপ্য বই নিয়ে ।  পরে ১৯৮৮ সালে আর্চার সিটিতে আরো অনেক সুপ্রশস্ত কলেবরে Booked Up খোলেন   মৃত্যু পর্যন্ত সেই দোকানের মালিক ছিলেন, দোকানটি পরিচালনা করতেন। 
১৯৭৬ সালে The New Yorker সাময়িকীতে ক্যালভিন ট্রিলিন (Calvin Trillin) ম্যাকমার্ট্রিকে নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধে তার বই কেনার মুন্সিয়ানা লক্ষ করেন।  ট্রিলিন লেখেন -  ‘Native Son-বইয়ের প্রচ্ছদের নীল রঙ কেমন, সেটা দেখে ল্যারি বুঝতে পারে কোনটা প্রথম মুদ্রণ আর কোনটা নয়।  কোন একটা কবিতার বই রবার্ট লোওয়েল (Robert Lowell) আদৌ লিখেছেন কিনা আজ হয়ত লোওয়েল ভুলেই গেছেন, কিন্তু সেই বইয়ের দাম কী সেটা ঠিক ল্যারি জানে। ’
নারীচরিত্র চিত্রণে মুন্সিয়ানা
ম্যাকমার্ট্রির বেশির ভাগ লেখালেখি পশ্চিমাঞ্চল বা তার টেক্সাসের ঐতিহ্য নিয়ে হলেও অন্য বিষয় নিয়ে তিনি উপন্যাস লিখেছেন– এর মধ্যে ওয়াশিংটন (Cadillac Jack), হলিউড (Somebody’s Darling), লাস ভেগাস (The Desert Rose) অন্যতম।  তার সেরা উপন্যাসগুলোতে একট টগবগে রসবোধ রয়েছে, আবার তার পাশাপাশি একটা বিষণ্ণতার সুরও রয়েছে।  তিনি স্মরণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য নারীচরিত্র সৃষ্টির জন্য প্রশংসিত হয়েছেন।  যেমন Terms of Endearment উপন্যাসে অরোরা গ্রিনওয়ে (Aurora Greenway)।  চলচ্চিত্রে শার্লি ম্যাকলেইন এই ভূমিকায় অভিনয় করেন।  উপন্যাসে অরোরা তার নিজের চাহিদার ব্যাপারে নিঃসঙ্কোচ।  ‘আমার সাথে শুধু দেবতুল্য মানুষ থাকতে পারবে, কিন্তু আমি বাবা দেবতুল্য মানুষের সাথে থাকতে পারবনা।  বয়স্ক লোকে আমার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনা, আর অল্পবয়সীরা আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। ’ 
ম্যাকমার্ট্রি একবার লিখেছিলেন – ‘আমার বিশ্বাস একটা গুণই আমাকে গল্প উপন্যাস লেখার পেশার দিকে নিয়ে এসেছে – সে হলো আমার এমন সব চরিত্র সৃষ্টি করবার ক্ষমতা ছিল যার সাথে পাঠক একটা আত্মার যোগ অনুভব করে।  আমার চরিত্রগুলো তাদের মনকে নাড়া দেয়, সেজন্য সেই একই চরিত্রগুলো চলচ্চিত্রের পর্দায়ও তাদের মনকে ছুঁয়ে যায়। ’
সাধারণভাবে তাঁর প্রথম দিককার উপন্যাসগুলো সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।  তবে টমাস লাস্ক The New York Times Book Review-এ The Last Picture Show উপন্যাস সম্বন্ধে লেখেন – ‘ম্যাকমার্ট্রির লেখনীতে যে খুব একটা মুন্সিয়ানা আছে সেটা বলা চলে না। ’ অন্য সমালোচকদের থেকে একই ধরনের নালিশ এসেছে।  ম্যাকমার্ট্রি বড্ড বেশি লেখেন, লেখার পরিমাণে লেখার গুণ উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে।  Books-এ একবার ম্যাকমার্ট্রি বড়াই করে বলেছিলেন – ‘আমি দিনে খসখস করে দশ পাতা লিখতে পারি। ’ 
কারো কারো মতে ম্যাকমার্ট্রি The Last Picture Show, Lonesome Dove, Terms of Endearment-এর মতো তার অন্যতম সেরা বইগুলোর জাত নষ্ট করেছিলেন।  এই সব উপন্যাসের কাহিনী অনুসরণ করে তিনি এক, দুই এমনকি চারটি উপন্যাস লিখেছেন।  তার Berrybender Narratives  (বেরিবেন্ডারের আখ্যান) নামের চার-টি বইয়ের সিরিজে আমেরিকার সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে রগরগে চটুল কাহিনি পড়ার সময় এই কথা বিশ্বাস করতে সত্যি কষ্ট হয় যে এই লেখকের কলম দিয়েই Lonesome Dove বেরিয়েছে।
মাঝে মাঝে সমালোচকদের অবহেলা ম্যাকমার্ট্রিকে বিদ্ধ করতো।  ‘সাহিত্যমহলের দীর্ঘ অনাগ্রহ নিয়ে কি আমার কোন তিক্ততা থাকা উচিত?’ ২০০৯ সালে Literary Life শীর্ষক এক স্মৃতিচারণে তিনি লেখেন।  ‘সেটা উচিত নয়, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমার তিক্ততা নেইও, তবে মাঝে মাঝে যে একটু বিরক্ত হই, সেটা স্বীকার করি। ’ ১৯৬০-এর দশক আর ১৯৭০-এর গোড়ার দিকে তিনি তার সমালোচকদের একটা টি-শার্ট পরে খোঁচা দিতেন।  সেই টি-শার্টে লেখা ছিল – ‘ছোটখাটো, আঞ্চলিক ঔপন্যাসিক। ’
তার জীবন আর লেখালেখির ওপর কখনো কখনো যে ঘন কালো ছায়া নেমে এসেছিল, সেটা তিনি খোলাখুলি স্বীকার করেছেন।
Terms of Endearment লেখা সমাপ্ত করবার পর তার এমন একট সময় গিয়েছিল যখন তিনি ‘এক সাহিত্যিক আঁধারের সময়ে প্রবেশ করেন যার ১৯৭৫-এ শুরু আর ১৯৮৩ সালে শেষ। ’ এই সময় নিজের গদ্যের ওপর তার বিরক্তি জন্মে।  ১৯৯১ সালে তার হার্ট এ্যাটাক হয়, তারপর কোয়াড্রুপল বাইপাস সার্জারি।  সেই সার্জারি থেকে সেরে ওঠার সময় তিনি দীর্ঘ মানসিক বিষণ্ণতার শিকার হন।  এক সাংবাদিককে তিনি জানান, প্রায় এক বছর সময় ধরে তিনি একটা সোফায় শুয়ে থাকা ছাড়া আর প্রায় কোন কিছুই করেননি। 
সেই সোফার মালিক ছিলেন ওসানা।  তার সাথে ম্যাকমার্ট্রির দেখা হয় ১৯৮০-এর দশকে এ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের টুসান শহরে এক যত-খুশি-খাও ক্যাটফিশ-এর রেস্তোরায়।  দুজনে একসাথে থাকা শুরু করেন, এবং কিছুকাল পরে একসাথে লেখালেখির কাজও আরম্ভ করেন।  ম্যাকমার্ট্রি টাইপরাইটারে লেখেন, ওসানা সেটা কম্পিউটারে টাইপ করেন, অনেক সময় সেটা সম্পাদনা ও গোছগাছও করেন। 
‘যখন আমার ল্যারির সাথে প্রথম দেখা হয়, ওর তখন পাঁচ কি ছয় জন নারীর সাথে সম্পর্ক,’ ওসানা ২০১৪ সালে Grantland.com কে এক সাক্ষাতকারে বলেন।  ‘কী বলবো, একেবারে কলির কৃষ্ণ।  আমার তো ব্যাপারটা একটা ধাঁধার মত লাগতো।  এক দিন আমি ওকে বললাম, “এই সব মেয়েরা তোমার প্রেমিকা?” ও বললো, “হ্যাঁ। ” আমি বললাম – “ওরা একজন অন্যজনের কথা জানে?” ও বললো –“না-তো। ”’
শোনা যায়, ম্যাকমার্ট্রি 62 Women (৬২ নারী) নামে একটি স্মৃতিকথার খসড়া সমাপ্ত করেছিলেন।  সেখানে জীবনে যেসব নারীদের জানতেন, সমীহ করতেন, তাদের কথা রয়েছে।  তার জীবনের শেষ কয়েকটি বছরের জীবনযাপন প্রচলিত সামাজিক প্রথা থেকে বেশ আলাদা ছিল।  
২০০১ সালে তিনি নর্মা ফে কিসীকে (Norma Faye Kesey) বিয়ে করেন।  ইনি লেখক কেন কিসীর বিধবা স্ত্রী।  নর্মা ফে ম্যাকমার্ট্রি ও ওসানার সাথে এক বাড়িতে ওঠেন।  ম্যাকমার্ট্রি Grantland.com কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন – ‘সেই অরেগন গিয়ে আমি ফে-কে উদ্ধার করি।  গত ৫১ বছরে ওর সাথে মাত্র চারবার দেখা হয়েছে।  তারপর ওকে বিয়ে করলাম।  এর আগে আমরা কখনো ডেট করিনি, এমনকি ভালোভাবে আড্ডাও দিইনি।  ওর স্বামী কিছুতেই আমাকে ওর সাথে গপ্পো করতে দিতনা। ’
স্ত্রী ও পুত্রসন্তান ছাড়াও ম্যাকমার্ট্রির দুই বোন – সু ডীন ও জুডি ম্যাকলেমোর - জীবিত।  তিনি এক ভাই চার্লি ও একটি নাতিও রেখে গেছেন।
ম্যাকমার্ট্রির বহু বইয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত তিনটি স্মৃতিকথা এবং তিনটি প্রবন্ধ সঙ্কলন।  Walter Benjamin at the Dairy Queen (ডেরি কুইন আইসক্রিমের দোকানে ওয়াল্টার বেনজামিন) শীর্ষক প্রবন্ধ সঙ্কলনটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে।  ‘আমার একেক দিন মনে হয় আমার প্রবন্ধ আমার উপন্যাসের চাইতে বেশিদিন টিকবে,’ ম্যাকমার্ট্রি একবার লিখেছিলেন। 
শুধু পুরনো বই-ই নয়, লেখালেখিতেও ম্যাকমার্ট্রির পুরনো রীতির প্রতি আসক্তি ছিল।  সারাজীবন লেখালেখির কাজ তিনি টাইপরাইটারে সেরেছেন।  তার নিজের কোন কম্পিউটার ছিলনা।  তিন দশকের বেশি সময় তার লেখালেখির সম্পাদনা করেছেন সাইমন এণ্ড শুস্টার প্রকাশনার মাইকেল কর্ডা (Michael Korda)।  তারপর তিনি ২০১৪ সালে W.W. Norton সংস্থার Liveright প্রকাশনীর জন্য লেখালেখি করেন।
একবার বলেছিলেন – ‘যেখানে যখন বড় হয়েছিলাম - বিশাল সমতল Great Plains অঞ্চলে – সেখানে সেই সময়ে গবাদিপশু চড়ানোর পেশা  তার শ্রী আর প্রাণশক্তি হারাতে শুরু করেছে।  তাই বুঝি যেসব জিনিস বিলুপ্তির পথে, সারাজীবন তার প্রতি কেমন একটা  টান অনুভব করেছি। ’

মূল ইংরেজি রচনার লিঙ্ক

ল্যারি ম্যাকমার্ট্রির সাথে National Public Radio-এর Fresh Air অনুষ্ঠানের একটি সাক্ষাৎকারের পুনপ্রচারের লিঙ্ক (ইংরেজি)
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট