আপনি তুমি রইলে দূরে | রফিক কায়সার | রবিবারের প্রবন্ধ ৬

আপনি তুমি রইলে দূরে
রফিক কায়সার

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে কবি-প্রয়াণের পর থেকেই। তাঁকে নিয়ে কবির জীবৎকালেও ব্যক্তিবিশেষের নেতিবাচক মতামত বা মন্তব্যকে কবি যথেষ্ট গুরুতব দিয়ে খন্ডন করেছেন বা জবাব দিয়েছেন। ব্যক্তিবিশেষের মন্তব্য বা মতামত কবির জীবৎকালে সামাজিক পরিবাদ বা শান্তিনিকেতনে রথীন্দ্রনাথবিরোধী জনমত তীব্রতা পায়নি। কবি-প্রয়াণের পর থেকেই রথীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন নিয়ে শান্তিনিকেতনের বাসিন্দাদের জনরব তৈরি হতে থাকে। তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মী নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। যৌক্তিক কারণেই রবীন্দ্রনাথের পরিবারের পক্ষ থেকে এই সম্পর্ক নিয়ে কথা ওঠে, তাঁর গোচরে আনা হয় সামাজিক লোকনিন্দার প্রসঙ্গ। এ-প্রসঙ্গে রথীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল নেতিবাচক – তিনি মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে অস্বীকার না করে শান্তিনিকেতন থেকে প্রস্থানকে বিবেচনায় আনেন। ইন্দিরা চৌধুরী সরাসরি রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। বিশ্বভারতীর আচার্য ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কানেও খবরটি পৌঁছে যায়। রথীন্দ্রনাথের ছোট বোন মীরা ঠাকুর প্রথম থেকেই এই সম্পর্ক নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অগ্রজের প্রতি, আবার লুপ্ত করেননি অগ্রজের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধাবোধ। ভ্রাতৃবধূর প্রতি অব্যাহতভাবে জ্ঞাপন করেছে সহমর্মিতা এবং সহানুভূতি। রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি কটাক্ষ করেছেন রথীন্দ্রনাথের ভাগ্নি নন্দিতা।

রথীন্দ্রনাথের সম্পর্ক-বহির্ভূত আচরণ যেমন শান্তিনিকেতনে নিন্দার ঝড় তুলেছিল, তেমনি উপাচার্য হিসেবে তাঁর কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জড়িয়ে পড়েন তহবিল তছরুপের মামলায়। একপর্যায়ে মামলায় হাজিরা দিতেও অনাগ্রহী হয়ে পড়েন রথীন্দ্রনাথ। এই পর্যায়ে সবকিছু ছাপিয়ে মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাজারীবাগে ‘হাওয়া বদল’ করতে যাওয়ার ঘটনা তাঁর পদমর্যাদা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। বিশ্বভারতীর স্থানীয় এবং দিল্লির প্রধানমন্ত্রীর দফতর ঘটনাটিকে সহজভাবে নিতে পারেনি। রবীন্দ্রানুরাগী নেহেরু নিজেও রথীন্দ্রনাথের বিষয়ে বিব্রত হন। প্রশান্ত মহালনবীশকে দিয়ে তাঁর কাছে খবর পাঠানো হলো যে, ‘বার্তা’র সারমর্ম হলো, চট্টোপাধ্যায় দম্পতিকে শান্তিনিকেতন থেকে হটাও। রথীন্দ্রনাথ উল্লিখিত ‘বার্তা’র মর্মার্থ গ্রহণ না করে বেছে নিলেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত। অভিমান করে ছেড়ে এলেন শান্তিনিকেতন। সঙ্গে এলেন মীরা চট্টোপাধ্যায়। জীবনের শেষ আট বছর অতিবাহিত করেছেন এই নারীর সান্নিধ্যে – দেরাদুনে। এই ঘটনাক্রম বিশ্বভারতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে কমবেশি জানা।

বোর্হেসের গোলকধাঁধা | অশ্রুকুমার সিকদার


অশ্রুকুমার সিকদার
বোর্হেসের গোলকধাঁধা

কোনও লেখক নোবেল পুরস্কার পেলে তখনই তাঁকে নিয়ে আমাদের কাগজে হইচই করা হয়। ইয়োর্গে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) এখনও নোবেল পুরস্কার পাননি, তাছাড়া তিনি এমন এক দেশের মানুষ যার কথা খবরের কাগজের চূড়ায় সচরাচর জায়গা পায় না, তাই তাঁর সম্বন্ধে পত্রপত্রিকার এমন নীরবতা। আমাদের দেশেরই বা দোষ কী, বস্তুত ১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে ফেরমেন্টর পুরস্কার পাবার আগে দক্ষিণ আমেরিকার অন্তর্গত আর্জেন্টিনার এই লেখক সম্বন্ধে ইয়োরোপও সাধারণভাবে অজ্ঞ ছিল। অথচ এই বহুপাঠী চিন্তাশীল লেখক যে অন্ধকারময় গোলকধাঁধার জগৎ রচনা করেছেন তা বিশেষভাবে আধুনিক মানুষের উপযোগী। ১৮৯৯ সালের ২৪ অগস্ট বুয়েনোস এয়ার্সে বোর্হেসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বুদ্ধিজীবী লেখক মানুষ। তাঁরই বিশাল গ্রন্থাগারে শৈশব থেকে বোর্হেসের ইচ্ছামতো মানসিক ভ্রমণ আরম্ভ হয়। তাঁর মা এখনও জীবিত, এই অকৃতদার লেখকের ব্যক্তিগত জীবনে তিনিই কেন্দ্রস্বরূপ। বোর্হেসের ধমনীতে হিস্পানি, ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ইহুদি পূর্বপুরুষের রক্ত প্রবহমান। তাঁর একজন পূর্বপুরুষ এসেছিলেন ইংল্যান্ডের অন্তঃপাতী নর্থাম্বারল্যান্ড থেকে। আর একজন ছিলেন পর্তুগিজ জাহাজের ক্যাপ্টেন। অন্য একজন পূর্বপুরুষ আর্জেন্টিনার গৃহযুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেছিলেন। শিক্ষাসংস্কৃতির দিক থেকেও তিনি মিশ্র ঐতিহ্যের মানুষ। কিছুদিন সুইটজারল্যান্ডের জেনিভায়, কিছুদিন স্পেনে তিনি অধ্যয়ন করেন। স্পেনে তিন বছর অধ্যয়নকালে তিনি Ultraista কবিগোষ্ঠীর সংস্রবে আসেন এবং ১৯২১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি আর্জেন্টিনার Ultraismo কবিতার প্রবর্তক ও নেতা হন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত কবিতা-লেখক। তাঁর মুক্তছন্দে লেখা কবিতায় বুয়েনোস এয়ার্সের দৃশ্য ও পরিমণ্ডল মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই সময়ের কবিতায় তাঁর পরবর্তী গদ্যের নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, তাঁর প্রথম যুগের কবিতা অনেক বেশি হার্দ্যগুণে মণ্ডিত। সময়স্রোত ও মৃত্যুচেতনা সেই কবিতাবলিতে প্রমূর্ত ও প্রতিধ্বনিত, এক চরম তাড়নায় যেন তারা পরস্পর একাকার হয়ে গেছে। কবিতা ছাড়া তিনি এই সময় লিখতেন সাহিত্যবিষয়ে প্রবন্ধ।

১৯৩০-এর পর তাঁর রচনায় এক মৌলিক পরিবর্তন এল। তাঁর গদ্যে গল্প লেখার বাইরের ইতিহাস বড় বিচিত্র। একবার পড়ে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান এবং অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী ছিলেন। কয়েক মাস একটি অক্ষরও লেখেননি, কবিতা লেখায় হাত দিতে সাহসই পাননি। তাঁর ভয় হয়েছিল হয়তো লেখার শক্তি চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। অবশেষে তিনি এই ভেবে গল্প লেখায় সন্তর্পণে হাত দেন যে তাঁর গল্প একটা নতুন ব্যাপার হবে এবং পাঠকেরা পুরোনো লেখার সঙ্গে নতুন লেখাকে তুলনা করে খারাপ বলার সুযোগ পাবে না, যেহেতু দুই ধরনের লেখার ধর্ম একেবারে আলাদা। এইভাবে গল্পের উৎস খুলে গেল। তাঁর গদ্যরচনায় হাত দেওয়ার ব্যাপারে এই ঘটনা থেকে যতটা আকস্মিক মনে হয় ততটা আকস্মিক নয়, তার পিছনে আন্তরিক প্রবর্তনাও ছিল। এই মাধ্যম পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। তাঁর কবিতার ইন্দ্রিয়জ জগৎ হয়ে উঠেছিল অবাস্তব, হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। ইন্দ্রিয়জ জগৎ অবাস্তব হয়ে উঠেছিল, কারণ তাঁর বাবা, তাঁর শিল্পী বোন নোরা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের মতো তিনিও দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছিলেন। ইন্দ্রিয়জ জগৎ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনায় পেরোনের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায়। যে আর্জেন্টিনাকে তিনি 'this dismantled republic' বলেছিলেন তার রাজনীতিতে যোগ দেবার উৎসাহ তাঁর ছিল না। রাজনীতিতে নিরুৎসাহ হলেও কিন্তু পেরোনের একনায়কত্বে তাঁকে কম বিব্রত হতে হয় না। প্রথমে মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে সামান্য চাকরি নিয়ে তিনি প্রচুর এলোমেলো অধ্যয়নের যে সুযোগ পেয়েছিলেন তা থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। পেরোন তাঁকে বরখাস্ত করে নিযুক্ত করে হাঁসমুরগির খামারের ইন্সপেকটর পদে। এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে বন্ধুদের উদ্যোগে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন। তাঁদের চেষ্টায় তিনি ইংরেজিমার্কিন সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন, যে বিষয়ে তাঁর সন্দেহাতীত যোগ্যতা ছিল। এইসব অভিজ্ঞতার বশেই হয়তো একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রের চিন্তা তাঁকে কম ভারাক্রান্ত করেনি। Deutsches Requiem গল্পে তাই সহজেই তিনি বক্তার মুখ দিয়ে নাজি-মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে পারেন। The secret Miracle গল্পের চেক নায়ক একদিনভোরে শোনে

নজরুলের কবিতা - জীবনানন্দ দাশ

নজরুলের কবিতা
জীবনানন্দ দাশ

মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়।
নজরুল ইসলাম অনেক দিন থেকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর দৈহিক ওজন আমাদেব জানা আছে, আত্মিক, ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।

জনগণ, ভদ্র সাধারণ এখনও মরে বেঁচে আছে, আসছে সার্বিক নিপাট মৃত্যু এদের জন্যে এবং তার ভিতর থেকেই আরো এবার বেঁচে ওঠবার অধ্যায় - জীবনকে নতুন করে প্রতিপালন করবার প্রয়োজনে।

কিন্তু আমাদের সামাজিক জীবনে এই মৃত্যু ও জীবন যে যার কাছে দুরতিক্রম্য নয়। যতদূর ধারণা করতে পারি, এই মানুষের পৃথিবীতে অনেকদিন থেকে এইরকমই চলেছে, একটা সময় - বৈশিষ্ট্য ক্ষয়িত হয়ে নতুন সাময়িকতাকে নিয়ে আসে। এতে সমাজ কাজে উন্নত না হোক (বা হোক), মূল্যচেতনায় স্থিরতর হবার অবকাশ পায় বলেই তো মনে হয়। প্রবীণ বিরস মনীষীরা যাই ভাবুন না কেন, সাধারণের মানব-মন মনে করে যে ভোর আসছে। একেই কখনো বুদ্ধের, ধর্মাশোকের বা ফরাসী বিপ্লবোত্তর মানবীয় প্রাতঃকাল বলে মনে হয়েছে। সে সব প্রাতঃকাল উন্মেষেই মিলিয়ে গিয়েছে বার বার। ইতিহাসে দীর্ঘ সুদিন কোথায় পেলাম আমরা - এবং সুদীর্ঘ সুরাত্রি? কিন্তু তবুও আবারও ভোর আসছে।

এর থেকে নিরাশার মতামতে উপস্থিত হওয়া যায়, কিংবা জীববিজ্ঞানীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে এই মর্মে উপস্থিত হওয়া যায় যে মানুষ এখনও শিশু – তার সভ্যতার অন্তিমক্ষণ এত দূরে যে আমাদের পক্ষে তা নেই, আমরা এসেছি কেবলমাত্র ভূমিকার ভাঙা গড়ার ভিতর।

আমরাও তাই ভাবি। একটা যুগ ভেঙে যাচ্ছে দেখে আমাদের কারো কারো সাহিত্য স্বভাব ভাঙনের লিপিরচনায় উদ্বেলিত হয়েও যা আজও পাওয়া যায়নি, এমন কোনো নতুন সময়ে আভাসে প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু স্থিরতা পায় কি, অর্থসফলতা লাভ করে ? ফলে আমাদের আগামী যুগের কবিতা হয় অত্যন্ত স্থূল হয়ে দাঁড়ায়, যে সব নিয়মের প্রভাবে আগামীকাল ক্রমে ক্রমে এসে পড়ছে তাদের ভিতর থেকে কয়েকটি প্রতীক বা প্রবর্তয়িতার মত চালিয়ে দিয়ে আমাদের কবিতা কি নবীন হয়ে ওঠে কিংবা কবিতা হয়? আর তা নয় তো, বস্তুশক্তির দুরন্ত ক্রিয়াকৌশলের পরিহাসের দিকে লক্ষ্য রেখেও একান্তভাবে ভাবনানিষ্ঠ হতে গিয়ে আধুনিক ও আগামীকালের কবিতা কারো কারো হাতে এত বেশী তনু সূক্ষ্ম হয়ে দাঁড়ায় যে আজকের কর্তব্যাসক্ত মানসের বিচারে সে কবিতার শব্দ, ভাষা, ইঙ্গিত সমস্তই অসঙ্গত, আচ্ছন্ন বলে মনে হয়। এখনকার বাংলা কবিতায় এই দুটি স্বভাবই লক্ষিত হয়। প্রথমটি নিশান হাতে নিয়ে অগ্রসর হয়েছে নিজের বা অপরের মুখে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত দিব্য দিনের কিছু না কিছু স্বাদ পেয়েছে বলে। কিন্তু এই দুই প্রকৃতির মিশ্রণে ভালো কবিতা পেয়েছি --- নিতান্ত কম নয়।

এ কালের বাংলা কবিতার এই সব অভিব্যক্তির আগে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন। (তখন তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হত)। আমাদের দেশে যে বিশেষ সময়রূপ অনেক দিন থেকে কাজ করে যাচ্ছিল, তেরোশো পঁচিশ আটাশ তিরিশে এক দিক থেকে যেমন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছিল অন্যদিকে কয়েকটি ইতিহাসোত্থিত কারণে এবং অঙ্গাঙ্গী নতুন সময় পর্ব তাকে উদ্বুদ্ধ করছিল বলে তা একটা আশ্চর্য রক্তচ্ছটা রঞ্জিত হয়ে উঠেছিল। যাকে মৃত্যুর বা অরুণের জীবনেরও বলে মনে করতে পারা যেত। নজরুলের অনেক কবিতাই সেই সময় লেখা হয়। মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়। জনগণ তখন আজকের মত ঈষৎ উন্নীত নয় কিংবা রূপান্তরিত? - ছিল না, চমৎকার কবিতা চাচ্ছিল, (আজো জনমানস রকম ফেরে, তাই ই চায় যদিও), নজরুল সেই মন স্পর্শ করতে পেরেছিলেন এমনভাবে যে আজকের কারো কোনো জনসাধারনের জন্য তৈরি কবিতা বা গদ্য কবিতা ফলত পদ্যের স্তরে নেমে ও তা পেয়েছে কিনা বলা কঠিন। তখনকার দিনে বাংলা লোকোত্তর পুরুষ কম ছিলেন না। -- শ্মশানের পথে সন্তানোৎসব জমেছিল বেশ খানিকটা উদ্যোক্তা। নজরুল ইসলামের আগ্রহ পুষ্ট হয়েছিল, তিনি অনেক সফল কবিতা উৎসারিত করতে পেরেছিলেন। কোনো কোনো কবিতায় এত বেশি সফলতা যে কঠিন সমালোচকও বলতে পারেন যে নজরুলী সাধনা এইখানে --- এইখানে সার্থক হয়েছে - কিন্তু তবুও মহৎ মান এড়িয়ে গিয়েছে। কোনো এক যুগে মহৎ কবিতা বেশি লেখা হয় না। কিন্তু যে বিশেষ সময় ধর্ম, ব্যক্তিক আগ্রহ ও একান্ততার জন্যে নজরুলের অনেক কবিতা সফল ও কোনো কোনো কবিতা সার্থক হযেছিল -- জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতার মূল্য ও মাত্রা চেতনায় খানিকটা সুস্থির হয়েও আজকের দিনের অনেক কবিতাই যে সে তুলনায় ব্যাহত হয়ে যাচ্ছে তা শুধু আধুনিক বিমুখ সময়রূপের জন্যেই নয় -- আমাদেব হৃদয়ও আমাদের দিরূপাচার করে, অনেক সময়ই আমাদের মনও আমাদের নিজেদের নয়, এই সাময়িকতার নিয়মই হয়ত তাই।

কিন্তু নজরুলের ব্যক্তিকতা ও সময় এই বুদ্ধি সর্বস্বতার হাত থেকে তাঁকে নিস্তার দিয়েছিল। আধুনিক অনেক কবিতা থেকে তাঁর কোনো কোনো কবিতার অঙ্গীকার তাই বেশী, ধ্বনিময়তাও উৎকর্ণ না করে এমন নয়। কিন্তু নিজেকে বিশোধিত করে নেবার প্রতিভা এই এ সব কবিতা বিধানে, শেষ রক্ষার কোনো সন্ধান নেই।

পরার্থপরতার চেয়ে স্বার্থসন্ধান ঢের হেয় জিনিষ, স্বার্থসাধন কিছুই নয়, কিন্তু কবি মানসের আত্মোপকার প্রতিভাই তাকে নির্মাতার ওপরের ভূমিকায় ওঠাতে সাহায্য করে, কবিতাকে তার অন্তিম সঙ্গতির পথে নিয়ে যায়। এরই স্বভাবে সৃষ্ট কবিতা যতদূর ব্যাপ্ত ও গভীর হয়ে উঠতে পারে নজরুল ইসলামের প্রথম ও শেষ কবিতা এরই অভাবে একই সূচনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ততদূর স্থান হারিয়ে ফেলছে।

কবি আহসান হাবীব শেষ দেখা | হুমায়ূন আহমেদ

একজন মমতাময়ী লেখকের তাঁর প্রিয় কবিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ।

কবি আহসান হাবীব শেষ দেখা
হুমায়ূন আহমেদ

অসুস্থ কবিকে দেখতে গেলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তারিখ ৯ই জুলাই-তার মৃত্যুর আগের দিন। আমি, নির্মলেন্দু গুণ এবং সালেহ চৌধুরী। ঢুকবার মুখেই বাধা। একজন রুগী মারা গেছে। তার মেয়ে কিংবা তার স্ত্রী আকাশ ফাটিয়ে কাঁদছে। মনটাই খারাপ হয়ে গেলাে।

ওয়ার্ডে ঢুকে দেখি সারি সারি রুগীর মাঝখানে হাবীব ভাই। গেঞ্জি গায়ে বিছানায় পড়ে আছেন। শিশুর মত লাগছে তাকে। মাথার কাছে তাঁর ছেলে মইনুল আহসান মুখ কালাে করে দাঁড়িয়ে আছে। সমস্ত পরিবেশটিই মনের উপর চাপ তৈরি করে। দেশের একজন সেরা কবির জন্যে এমন দীন ব্যবস্থা কেন? মইনুল আহসান বললাে-“এটাই ভাল ব্যবস্থা। চোখের সামনে একজন ডাক্তার সব সময় থাকেন। হবে হয়তাে। আমি অবশ্যি আশা করেছিলাম অসুস্থ কবির শয্যাটি হবে অন্য রকম। একটু আলাদা।

হাবীব ভাইয়ের মাথার কাছে একটা চার্ট ঝুলছে। সেখানে ইংরেজিতে লেখা-পােয়েট আহসান হাবীব। তার জন্যে মিকশ্চারের একটি বােতল এলাে; সেখানেও লেখা-পােয়েট আহসান হাবীব। দেখতে ভালই লাগলাে। হাসপাতাল মনে রেখেছে এই রুগী একজন কবি।

মইনুল আহসান বললাে-“আব্বার তেমন কোন অসুবিধা নেই। তার জন্যে আগামীকাল মেডিক্যাল বাের্ড বসবে।” বুঝতে পারছি সে নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দিচ্ছে। সে কি বুঝতে পারছে সময় ফুরিয়ে আসছে?

সালেহ চৌধুরী এবং নির্মলেন্দু গুণ কবির পায়ে পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ছােটখাটো কথাবার্তা হতে থাকলাে।

তিনি জানালেন, তাঁর শরীর ভালই আছে। কিন্তু কিছু খেতে পারছেন না। কিছুই হজম হয় না। এছাড়া, আর অন্য কোন অসুবিধা নেই। তিনি গেঞ্জি টেনে পেট অনেকখানি উদাম করে ফেললেন। নির্মলেন্দু গুণ পেটে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। এক সময় বললেন-‘হাবীব ভাই, টিভিতে আপনার ইন্টারভুটা দেখলাম, খুব ভাল হয়েছে।' হাবীব ভাই হাসলেন। আমার মনে হলাে, হাবীব ভাই তাে ভালই আছেন। কথাবার্তা অবশ্যি বলছেন নিচু স্বরে। এবং বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করলাম ফিসফিস করে নিজের মনে কি যেন বলছেন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলছেন, তখন (কণ্ঠ কিছুটা জড়ানাে হলেও) চিন্তার কোন অসংলগ্নতা নেই। এক পর্যায়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-‘তােমার বইয়ের সংখ্যা কত?' একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষ, যার সেই মুহূর্তে নিজেকে নিয়েই চিন্তা করার কথা, তিনি অন্যের প্রসঙ্গে কীভাবে এতটা আগ্রহ রাখেন কে জানে?

একটি ছেলে তার জন্যে লাল মিকশ্চারের একটি বােতল নিয়ে এলাে। হাবীব ভাইকে পেছনে বালিশ দিয়ে বসানাে হলাে। তিনি বললেন, তাঁর ক্ষিধে পেয়েছে। সােয়াপ্রােটিন বিসকিট সম্পর্কে দুই একটা কথা বললেন। লক্ষ্য করলাম তিনি আমরা কি কথাবার্তা বলছি সেগুলি খুব মন দিয়ে শুনতে চেষ্টা করছেন। মাঝে মাঝে ধরতে পারছেন না। তখন জিজ্ঞেস করছেন-‘সালেহ কী বললাে? নির্মলেন্দু কী বললাে?'

হাবীব ভাইয়ের সহকারী তরুণ কবি নাসির আহমেদকে দেখলাম সারাক্ষণই কবির সেবা করবার সুযােগ খুঁজছেন। কখনাে পায়ে হাত বুলাচ্ছেন, কখনাে গায়ে হাত বুলচ্ছেন। কি গভীর ভালবাসা তার চোখেমুখে। তাতাে হবেই হাত ধরে এদের কবিতার অলিগলি চিনিয়েছেন, এসেছেন ঋণ শােধ করতে।

একটি মেয়ে এলাে কবিকে দেখতে। হাবীব ভাই ক্ষীণকণ্ঠে তার খোঁজ-খবর করলেন। মেয়েটিকে মনে হলাে সে কেঁদে ফেলবে। গল্পকার ভাস্কর চৌধুরী এলেন। তাঁর গায়ে ইউএসএ ছাপ মারা ঝলমলে টি-শার্ট, কিন্তু মুখটি বিষন্ন।

আমরা সবাই তাকে ঘিরে বসে রইলাম। ছােটখাটো কথা বলতে লাগলাম নিজেদের মধ্যে। হাবীব ভাই বসে আছেন বালিশে হেলান দিয়ে। তার মাথা ভর্তি শরতের মেঘের মত ধবধবে সাদা চুল। হাবীব ভাইকে লাগছে প্রাচীন কালের ঋষিদের মত। একটু দূরে বসে থাকা নার্স বার বার কৌতুহলী হয়ে তাকাচ্ছে আমাদের দিকে।

আমরা প্রায় দেড় ঘন্টার মত থাকলাম তাঁর সঙ্গে। আমার খুব ইচ্ছা করছিলাে তার পা ছুয়ে সালাম করি। কিন্তু তিনি যদি মনে করেন। আমি তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছি, সেই ভয়েই ওদিকে গেলাম না। বললাম-হাবীব ভাই, হাসপাতালের পরিবেশটা আমার ভাল লাগছে না। আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন বাড়ি চলে যান।'

হাবীব ভাই মৃদুস্বরে বললেন-“হ্যা, ফিরে যাব। আমার বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে।”
কবির বাড়ি ফেরা হয়নি। কিংবা কে জানে হয়তাে ফিরেছেন। আঁধার বাড়ির কোন রহস্যইতাে আমাদের জানা নেই।

প্রাপ্তি:
কিছু হুমায়ূন (হুমায়ূন আহমেদের অগ্রন্থিত গদ্য ও পত্রগুচ্ছ) (হার্ডকভার) - পিয়াস মজিদ
প্রকাশকাল: ২০১৯
প্রকাশক: অন্বেষা

নিশিন্দা নারী - আল মাহমুদ

নিশিন্দা নারী
আল মাহমুদ

রাত আড়াইটার দিকে এক অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে নিশিন্দার শরীরটা একটু মুচড়ে উঠলেও সে স্বপ্নটার মধ্যে সারাদিন না খেতে পাওয়ার জ্বালা খানিকটা জুড়িয়ে নেয়ার জন্যই যেন পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। প্রথমে একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ভেঙে বেরিয়ে এলেও এখন ছোট ছোট নিঃশ্বাসের দোলায় তার নরম দু’টি উচু স্তন কাঁপছে। ক্ষুধা ও ঘুম একসাথে থাকলে মানুষের স্বপ্ন চটে যায় না। নিশিন্দা দেখছে এই জনমানবহীন চারণভূমির যতদূর চোখ যায় কোথাও ঘাস আর সবুজ নেই। সর্বত্র যেন শুকিয়ে হুলুদ প্রান্তরের মতো ধু-ধু করছে। খলার মধ্যে যে কয়টা গরুর বাথান বা খলাঘর আছে এর সবগুলো গরুর শিংয়ের মধ্যে মানুষের রক্ত। যেন গরুর পাল খলাঘরগুলোর রক্ষক রাখালদের গুঁতিয়ে মেরে দলে দলে ছুটে আসছে নিশিন্দাদের উঠোনের দিকে। স্বপ্নের মধ্যেই যেন নিশিন্দা দিশেহারা হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে গরুর পাল এসে নিশিন্দার উঠোনে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। নিশিন্দার মনে হল ঘাসের অভাবে ক্ষিপ্ত ক্ষুধার্তের পাল যেন তাকে তাদের নেত্রী ভেবে একটা কিছু প্রতিকারের জন্য তার কাছে ভিড় জমিয়েছে। যেমন সে নিজেও আবদুল্লাহ মাঝির গত পনেরো দিন যাবৎ উধাও হয়ে যাওয়ার একটা বিহিত ব্যবস্থা খুঁজছে। গরুর পালের মধ্যে গাই আর দামড়ির সংখ্যাই বেশি। পালের পেছনে কয়েকটা মিনমিনে চেহারার ষাঁড়ও আছে। তবে ষাঁড়গুলোকে গাভীগুলোর মত ক্রুদ্ধ মনে হল না। ষাঁড়গুলো ঘাড় নুইয়ে শিং লুকোতে চায় যেন। যেন বলতে চায়—অত বড় ধারালো বাঁকা সিং গজানোর জন্য তো আমরা নিজেরা দায়ী নই। এগুলো নিয়ে এখন আমরা আর কি করব? যখন সারা বিল এলাকা তিতাসের এপারের দত্তখোলা থেকে শুরু করে বাঁ দিকের আখাউড়া সিঙ্গারবিল আর ডানদিকের শাহবাজপুর সরাইল মৌজা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ। গরু আর মানুষের এখন সত্যিকার খাওয়ার কিছু থাকলে তা আছে তিতাসের শেওলা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বাসিন্দাদের রাঁধা ভাত আর ফেনপানি। গরুগুলো যেন বলতে চায় এরাও এখন আবদুল্লাহ মাঝির ডাকাত দলে নাম লেখাতে এসেছে। স্বপ্নের মধ্যেই নিশিন্দার মনটা নরম হয়ে এল। সে এক ঝটকায় শাড়িটা কোমরে পেঁচিয়ে বারান্দা থেকে দ্রুত উঠোনে নেমে জিজ্ঞেস করল, এই গাইয়ের পাল আমার উঠোনে দল বেঁধে কেন ঢুকেছিস? মতলব কি তোদের?’

সময়গ্রন্থির কবি জীবনানন্দ | সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় | রবিবারের প্রবন্ধ ৫


সময়গ্রন্থির কবি জীবনানন্দ
সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়

ধূসর পাণ্ডুলিপি-র হেমন্তের জগতে স্বভাবতই ফুলের প্রসঙ্গ প্রায় অনুচ্চারিত। ইয়েটস যে অর্থে ডরোথি ওয়েলেসলিকে বলেছিলেন, Why can’t you English poets keep flowers out of your peotry? - কবি জীবনানন্দের এই ফুল-বিমুখতার সঙ্গে সে অর্থের কোনও সংযোগ নেই। এই অনুচ্চারণ একটা অস্তিবাচক সত্য। আমরা যখন রবীন্দ্রনাথ সত্যেন্দ্রনাথ নজরুলের রৌদ্ররাগ এবং পুষ্পরাগের পরিমণ্ডল পেরিয়ে সেই ধূসর ম্লানতায় প্রথম প্রবেশ করলাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। যে সন্ধ্যায় মনে হয়, সূর্যাস্তের ওপারের সূর্যের কথা, এ সন্ধ্যা সে সন্ধ্যা নয়। এ হেমন্তের সন্ধ্যায় যেন কোনও দুর্মর অন্ধকারের বার্তা পাওয়া গেল। তাই ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে কবিসত্তার স্বনিয়মী স্বাভাবিকতায় ফুলের ব্যবহার ঘটেনি বললেই হয়। ক্বচিৎ এক আধটি শসাফুল, বিনষ্ট শসার পাশে অথবা বাসি বা ছেঁড়া করবীর এক আধটি পাপড়ি ফুলের বিস্মৃতিকে রোধ করার জন্য প্রয়াসী। নতুবা ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ফুল নেই। ফুল নেই সে সন্ধ্যায়-সে অভবিষ্য অস্পষ্ট অনালোকে মৃত প্রেমিকাদের মুখের মতো বিমর্ষ নক্ষত্রেরা ফুটে উঠেছে। জীবনানন্দের সমগ্র কবিজীবনে অতঃপর নক্ষত্র স্থায়ী কাব্যপ্রসঙ্গ। ধূসর পাণ্ডুলিপিতে এবং কমবেশি তারপরেও জীবনানন্দ শুধু হেমন্তের কবি নন-হেমন্তের সন্ধ্যার কবি। কেবলমাত্র হেমন্তের অনুষঙ্গ, অন্তত বাংলাদেশে কিছুতেই বিষণ্ণতাবাচক নয়। হেমন্তের অনুষঙ্গে ফসল তোলার আশা আনন্দই বাঙালি কৃষকের মনে জড়িত। কিন্তু হেমন্তর সন্ধ্যার নিরুদ্যমতাকে জীবনানন্দ অন্যতর অর্থে নিযুক্ত করতে পেরেছেন। বিশ্বব্যাপী যে স্লাম্প বাঙালি যুবকেরও উত্তাপ ও উৎসাহকে জুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল জীবনানন্দের হেমন্ত-সন্ধ্যা কতকাংশে সেই নিরুদ্যমতার প্রতীক। আর গভীরতর অর্থে ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ক্রমশই একটা কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে জীবনানন্দ মানুষের বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের কবি। আক্ষরিকভাবে বাস্তববাদিতাকে যদি বেশি প্রশ্রয় দেওয়া যায় তাহলে আবারও বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যার জন্য প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর জীবনের মন্দস্রোতের কথা ওঠে। কিন্তু এ সৌন্দর্যবোধের বিপন্নতারও ইতিহাস আছে। হয়তো তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রোমান্টিকতার ভাবসংকটের জের, জড়িয়ে আছে শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী ব্যক্তির আত্মচ্যুতির অভিজ্ঞতা; জড়িয়ে আছে ক্রমবর্ধমান আত্মসম্বিতের ফলে সঞ্জাত ব্যক্তির নৈঃসঙ্গের চেতনা। হয়তো শেষ পর্যন্ত এই সবকিছুরই ফলে কবিচেতনার তরঙ্গ এক উপলব্ধির তটে প্রহত হয়েছে-মৎস্যকন্যাদের গান আমাকে উদ্দেশ্য করে নয়। কবি জীবনানন্দের মধ্যে মানুষের সেই বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের চেতনা নক্ষত্রের প্রতীকে রূপস্থ হয়ে উঠেছে। 'বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল', আর নারকেল নাড়ু বিতরণকারিণী বাসমতী চাল ধোয়া হাতে বিনুনি বাঁধা মেয়ে সেই চেতনারই ইঙ্গিত নিয়ে পরে দেখা দিয়েছে।

গ্রন্থসংবেদী রবীন্দ্রনাথ | সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় | রবিবারের প্রবন্ধ ৪

গ্রন্থসংবেদী রবীন্দ্রনাথ
সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়

আর চাই রেশমে বাঁধাই-করা
অ্যান্টিক কাগজে ছাপা কবিতার বই, ...

‘ছুটির আয়োজন’-এর উপকরণগুলির মধ্যে বইয়ের প্রতি রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই একটু বেশি সংবেদনশীল। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন সাত-আট বছর। বয়সে বেশ খানিকটা বড় ভাগিনেয় জ্যোতিঃপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়ের উৎসাহে, একটি নীল কাগজের খাতায় ‘কতকগুলি অসমান লাইন’ কেটে রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখার সূচনা হল পেনসিলে। পুরানো দিনের সেসব কথার অনুষঙ্গে রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি-তে লিখেছিলেন, ‘নিজেই তখন লেখক, মুদ্রাকর, প্রকাশক, এই তিনে-এক একে-তিন হইয়া ছিলাম।’ আর বইপড়ার সূচনালগ্নের অভিজ্ঞতার কথা শেষ জীবনে ছেলেবেলা (১৯৪০)-তে বলেছেন এইভাবে: ‘যা মনে পড়ে সে ষণ্ডামার্ক মুনির পাঠশালার বিষম ব্যাপার নিয়ে, আর হিরণ্যকশিপুর পেট চিরছে নৃসিংহ অবতার— বোধ করি সীসের-ফলকে-খোদাই-করা তার একখানা ছবিও দেখেছি সেই বইয়ে।’ বিগতদিনের ছবি ছাপার অনুন্নত পদ্ধতি সম্পর্কে এখানে যেমন রবীন্দ্রনাথ মার্জিত পরিহাস করেছেন, তেমনি আবার ছেলেবেলা –র ওই একই পৃষ্ঠায় ছাপা হরফের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরে বলেছেন, ‘রূপকথা আজকাল ছেলেরা মেয়েদের মুখ থেকে শুনতে পায় না, নিজে নিজে পড়ে ছাপানো বই থেকে।’ মুদ্রণের প্রযুক্তির ব্যাপারে এটাই তাঁর একমাত্র মত নয়। মুদ্রণের প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সম্পর্কে কোনও অনুযোগ ছাড়াই বাংলাভাষা-পরিচয় (১৯৩৮) বইয়ের একাদশ পর্বে রবীন্দ্রনাথ লেখেন: ‘একদা ছিল না ছাপাখানা, অক্ষরের ব্যবহার হয় ছিল না, নয় ছিল অল্প। অথচ মানুষ যে-সব কথা সকলকে জানাবার যোগ্য মনে করেছে দলের প্রতি শ্রদ্ধায়, তাকে বেঁধে রাখতে চেয়েছে এবং চালিয়ে দিতে চেয়েছে পরস্পরের কাছে। ... সাহিত্যের প্রথম পর্বে ছন্দ মানুষের শুধু খেয়ালের নয়, প্রয়োজনের একটা বড়ো সৃষ্টি; আধুনিক কালে যেমন সৃষ্টি তার ছাপাখানা।’ তবে মুদ্রণ কিংবা ছাপা বই সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে কবির দ্বন্দ্বময় মনোভাব কোন অভিমুখে ধাবিত সেই আলোচনায় না-গিয়ে, বরং নিজের লেখা বইগুলি ‘আঙ্গিক ও ভাবিক দিক থেকে’ নির্মাণের নানা পর্যায়ে, তাঁর গ্রন্থসংবেদী মন কতটা সক্রিয় থেকেছে সেটুকুই আমাদের আলোচ্য হোক।

১৯০১-এ বঙ্গদর্শন নব পর্যায়ের সম্পাদনার ভার নেন রবীন্দ্রনাথ এবং বৈষয়িক ভার নেন শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের ছোট ভাই, মজুমদার লাইব্রেরির শৈলেশচন্দ্র মজুমদার। এই যোগসূত্রেই চল্লিশ-উত্তীর্ণ রবীন্দ্রনাথ ধারাবাহিকভাবে বই প্রকাশের (১৯০৩) প্রথম একজন প্রকাশক হিসাবে পান শৈলেশচন্দ্রকে। প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে প্রভাতকুমার রবীন্দ্রজীবনী-র দ্বিতীয় খণ্ডে জানিয়েছেন: ‘এই মজুমদার এজেন্সির (পরে মজুমদার লাইব্রেরি) সহিত প্রায় সাত বৎসর রবীন্দ্রনাথ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ইহার অন্তর্গত “আলোচনা সভা” বিলাতি সাহিত্যিক ক্লাবের অনুকরণে গড়া হয়; রবীন্দ্রনাথের বহু প্রবন্ধ এখানে পঠিত হয় ... ।’ যে কারণে প্রথম দিকের অনেকগুলো বই-ই রবীন্দ্রনাথ নিজ ব্যয়ে ছেপেছেন আদি ব্রাহ্মসমাজের মুদ্রণযন্ত্রে। ফলে ছাপাখানার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। তা ছাড়া তিনি নিজে একজন মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ কিংবা পেশাদার গ্রন্থ-সম্পাদক না-হলেও গ্রন্থনির্মাণের নানান দিক অর্থাৎ হরফ বিন্যাস, বানান শোধন, মুদ্রণ, অলংকরণ ও বাঁধাই সম্পর্কে অত্যন্ত মনোযোগী এবং সহজে সন্তুষ্ট হওয়ার পাত্র ছিলেন না।

হৃদয়ে কবির জীবন শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ আলোচনা লিখেছেন প্রচেত গুপ্ত

হৃদয়ে কবির জীবন

শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ আলোচনা লিখেছেন প্রচেত গুপ্ত

নীচের উদ্ধৃতিটি একটু দীর্ঘ হলেও এড়াতে পারছি না। বইটি নিয়ে কিছু কথা বলতে গেলে এটির প্রয়ােজন। উদ্ধৃতিটি নেওয়া হল একেবারে প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম বাক্য থেকে। যাতে গােড়াতেই বই সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়।

“পুরােনাে শতাব্দীর ধুলােমাখা একটা সরীসৃপের মতাে কলকাতা বালিগঞ্জ ডাউন ট্রাম ঘন ঘন ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসছে রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের দিকে। চারদিকে তখন শেষ বিকেলের রােদ। ‘জলখাবার’ দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে বসে চুনীলাল দেখলেন একজন লােক হেঁটে যাচ্ছেন ওই ট্রামের দিকেই। ট্রাম এগিয়ে আসছে, সেই লােকও এগিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম লাইনের দিকে। ট্রামের ড্রাইভার জোরে জোরে ঘণ্টা বাজালেন, চিৎকার করে ডাকলেন, তবু সে লােক উঠে গেলেন ট্রাম লাইনের ওপরে এবং আটকে গেলেন ট্রামের ক্যাচারে। সশব্দে ব্রেক কষল ট্রাম। চুনীলাল দৌড়ে গিয়ে ট্রামের ক্যাচারের ভেতর থেকে টেনে বের করে আনলেন মানুষটাকে। লােকজনে ভিড় জমে গেল, তারা জানতে চাইল, ‘কী নাম আপনার, কোথায় থাকেন?’ তারা কেউ জানে না যে এই লােক একদিন লিখেছেন:

কলকাতার ফুটপাত থেকে ফুটপাতে— ফুটপাত থেকে ফুটপাতে—/ কয়েকটি আদিম সপিনী সহােদরার মতাে এই যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে... (কবিতাটির আরও বেশ কয়েকটি লাইন রয়েছে। এখানে দেওয়া হল না।)

রক্তাক্ত সেই লােক বললেন, “আমার নাম জীবনানন্দ দাশ, ওই ল্যান্সডাউন রােডে থাকি, ১৮৩ নম্বর বাড়ি। এইটুকু বলে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না, এলিয়ে পড়লেন রাস্তায়। লােকজন তাঁকে ধরাধরি করে একটা ট্যাক্সিতে উঠিয়ে নিয়ে গেল কাছের শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে।” পরিচ্ছেদটি ধরে এবার শেষের দিকে এগােই:

“কয়েকটি দিন আশা-নিরাশার দোলাচলে থাকবার পর ওই ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের নানা রকম রােগীর গােঙানাের প্রেক্ষাপটে, ওই রং ওঠা লােহার খাটে মৃত্যুবরণ করেন জীবনানন্দ। ট্রামের মতাে এমন একটা স্লো মুভিং লােকোমােটিভকে এড়িয়ে যাবার টনক মানুষের থাকার কথা। ট্রামের ক্যাচার তৈরি হয়েছিল লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পশু তাড়াবার জন্য। কিন্তু জীবনানন্দ সম্ভবত ট্রামের ক্যাচারে আটকে যাওয়া প্রথম এবং শেষ মানুষ। ফলে আদিম সাপের মতাে ছড়িয়ে থাকা ট্রামের চাকার নিচে তাঁর মৃত্যু নিয়ে জট থেকে যায়। প্রশ্ন জাগে, এটা কি একটা দুর্ঘটনা?

নাকি তিনি ট্রামের চাকার নিচে আত্মহত্যা করেছেন?

অথবা এটা কি আসলে একটা হত্যাকাণ্ড, যার পেছনে রয়েছে আরও অনেকের অদৃশ্য। হাত?”

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে এইভাবে যে লেখা শুরু হয় তাকে কি এড়ানাে যায়? হয়তাে যায়, আমি পারিনি। বইটি আমার হাতে হাত রেখেছে কি না জানি না, তবে আমি রেখেছি। রেখে কখনও উৎফুল্ল হয়েছি, কখনও বিষন্ন। কখনও রেগে গিয়েছি, কখনও লেগেছে ঘাের। একই পাঠে আনন্দ ও বেদনা অনুভব করেছি। কোনও ঘটনা পড়ে মনখারাপ হয়েছে, আবার পরক্ষণেই বুঝতে পেরেছি, এই মনখারাপ আসলে জীবনের কোনও অমােঘ রূপ-রং মেশানাে সৃষ্টির প্রেরণা। এই মনখারাপ এমন সব কবিতার জন্ম দিয়েছে, যাদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিতাদের সঙ্গে বসানাে গেছে এক পঙক্তিতে। তখনই আবার মন ভাল হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মন ভাল এবং মনখারাপ এক বিরল আনন্দ অভিজ্ঞতা। খুব কম লেখা পড়েই এই আনন্দ পাওয়া যায়। ‘একজন কমলালেবু' বইটি সেই আনন্দ আমাকে দিয়েছে।

হ্যাঁ, এই বইয়ের নাম ‘একজন কমলালেবু'। লেখকের নাম শাহাদুজ্জামান। প্রকাশক বাংলাদেশের প্রথমা প্রকাশন। প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে। জীবনানন্দের নিজের এবং তাঁকে নিয়ে পণ্ডিতদের লেখা আরও কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের পাশে এই বইকে আমি যত্নে এবং আদরে স্থান দিয়েছি।

বইটির কথা আমি বেশ কিছুদিন আগেই শুনেছিলাম। শুনেছিলাম, বাংলাদেশের বিশিষ্ট গদ্যকার শাহাদুজ্জামান জীবনানন্দকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। তবে এই বঙ্গের কবি, গবেষক, সাহিত্য আলােচকদের মুখে বা লেখালিখিতে বইটির উল্লেখ দেখিনি, থাকলেও চোখে পড়ার মতাে উচ্চকিতভাবে কিছু নয়। বইটি প্রচার পায় মূলত এ বঙ্গের সাধারণ পাঠকের মুখে মুখে এবং ওপার বঙ্গের সােশ্যাল মিডিয়ার আলােচনায়। একেই জীবনানন্দের জীবন নিয়ে উপন্যাস, তার ওপর ওরকম চমৎকার নাম! আমার মনােযােগ কাড়ে। ‘কমলালেবু’ নামে জীবনানন্দের একটি কবিতা

আছে। ‘একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাবে। আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে / আবার যেন ফিরে আসি / কোনাে এক শীতের রাতে / একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস / নিয়ে কোনাে এক মুমূর্ষর বিছানার কিনারে।’ কবিতাটি সকলের জানা। কিন্তু ‘কমলালেবু'-র আগে ‘একজন’ শব্দটি বসিয়ে তাতে যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা যায়, তা জানা ছিল কি? অন্তত আমার তাে নয়ই। যেন আড়মােড়া ভেঙে কবি জেগে উঠলেন কবিতার ভিতর থেকে। যতই শুনে থাকি, কবিরে পাবে না ‘তাহার জীবনচরিতে’, এই বইটির নামে কবি এবং কবিতা এক হয়ে গেছে। কৌতূহল বেড়েছে। বইয়ের লেখক সম্পর্কেও আমার বিশেষ ধারণা ছিল না। আমি আগে তাঁর কোনও বই পড়িনি। জানলাম, উনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানুষ। আমেরিকার গ্লাসগাে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। একজন ‘জীবনানন্দ উন্মাদ’। কিশাের বয়স থেকেই জীবনানন্দে ‘ভূতগ্রস্ত’। ভদ্রলােক একটু ঘুরিয়ে বলেছেন, তিনি নাকি ঘাড় থেকে সেই ‘ভূত’টিকে নামানাের জন্যই বইটি লিখেছেন। জীবনানন্দের ‘ভূত’ লেখকের ঘাড় থেকে নেমেছে কি না জানি না, তবে এই বই পড়ার পর বহু পাঠকের ঘাড়ে যে ‘ভূত’টি চেপে বসেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

লেখার আগে লেখক দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এই ধরনের কাজে দীর্ঘ প্রস্তুতি স্বাভাবিক। দেখার কথা, সেই প্রস্তুতি, পরিশ্রম কাজে লাগল কি না। পণ্ডশ্রমের বহু উদাহরণই তাে রয়েছে। লেখক যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ, মনে প্রশ্ন জেগেছিল, উনি কি তবে কবির বরিশাল জীবনের অংশটিই বড় করে দেখিয়েছেন? এই উপন্যাসের নায়ক কি মূলত রূপসী বাংলার কবি? যাঁর জীবন সরল শান্ত স্নিগ্ধ প্রকৃতির মতাে। পুকুরের জলে লাল সরের মতাে পড়ে থাকা করবীর কচি ডাল হয়ে শুধু ঝুঁকে পড়ে চুমু খেতে চায় মাছরাঙার পায়ে? নাকি কলকাতার জীর্ণ, ক্লিষ্ট, অভাব, অনটন ও অপমানের কথাও এতে থাকবে?

বইটির সন্ধান করি। ভ্রাতৃপ্রতিম একজন সংগ্রহ করে দেয়। এই সুযােগে তাকেও আর-একবার কৃতজ্ঞতা নয়, ভালবাসা জানিয়ে রাখি। যে একটা ভাল বই পড়ায়, বইটির মধ্যে সেও থেকে যায়। আমরা তাকে ভুলে গিয়ে অন্যায় করি। যাই হােক, একজন কমলালেবু পড়তে পড়তে যাবতীয় ভুল ধারণার অবসান ঘটে। ‘একজন কমলালেবু’-তে জীবনানন্দ দুই বাংলার। বরিশালের মায়াভরা প্রকৃতি, পরিবার, লেখাপড়া, অসমাপ্ত কর্মজীবন, সুখদুঃখ যেমন আছে, আছে কলকাতার কাঠিন্য, উদাসীনতা, যন্ত্রণা এবং বন্ধুদের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কাহিনিও। আছে তাঁকে আগলে রাখার কথা। কবি হিসেবে তাঁকে পরিচিত করার গল্প। এটি বইটির মস্ত গুণ। ‘একজন কমলালেবু'-কে কোনও একটা দিক থেকে, একপেশে চোখে দেখা হয়নি। তাঁকে দেখা হয়েছে সবদিক থেকে। কবির শৈশব, বাল্য থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘপথ। হতাশা, যন্ত্রণা, স্ত্রী, প্রেমিকা, ভালবাসা, অবজ্ঞা, চাকরি ও বেকার সময়ের কথা রয়েছে। আছে প্রকৃতিতে ডুবে থাকা এক মানুষের গল্প, অর্থাভাবে দীর্ণ হয়ে থাকার কাহিনি। আছে কবিতা লেখা, সেই কবিতা নিয়েই তীব্র উপেক্ষা, তীক্ষ সমালােচনা, গল্প উপন্যাস লিখে ট্রাঙ্কে লুকিয়ে ফেলা। আছে কর্মজীবন থেকে পালানাে, চারপাশ থেকে পালানাে, নিজের কাছ থেকে পালানাে। বটগাছের মতাে ছায়া নিয়ে আছেন বন্ধু বুদ্ধদেব বসু, ভূমেন্দ্র গুহ। বিশুদ্ধ, সিরিয়াস এক কবির টলমল, অনিশ্চিত, অন্ধকার জীবনের কথা প্রায় সবই রয়েছে এই বইয়ে। যে-জীবনের আদ্যোপান্ত, আদি-অন্ত শুধুই কবিতা আর কবিতা।

সব মিলিয়ে ২৪০ পৃষ্ঠার বই। হিসেবে এক-দু’পাতা কমবেশি হতে পারে। এই ২৪০ পাতা পড়া শেষ হলে বােঝা যায়, শাহাদুজ্জামান একটি বিস্ময়কর এবং প্রয়ােজনীয় কাজ করেছেন। কেন, সে প্রসঙ্গে আসছি, তবে গােড়ায় বলে রাখি, এ আমার নিতান্তই ব্যক্তিগত মত। আমারই ভাল লাগা, আমারই মনে হওয়া। এই বিষয়ে কারও ভিন্নমত থাকতে পারে, নিশ্চয়ই আছে, সে বির্তক বা আলােচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। বইটির সঙ্গে অন্য কোনও বইয়ের তুলনা অর্থহীন। জীবনানন্দকে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই লেখা হয়েছে। হয়েছে বিস্তর আলােচনা। এর পরেও আরও হবে। এই ধরনের মানুষকে নিয়ে চর্চা কখনও থেমে থাকে না। নানা ফর্মে হতেই থাকে। একজন কমলালেবু উপন্যাসটিও সেরকম। লেখক উপন্যাস শেষে ৫৬টি বই এবং পত্রপত্রিকার তালিকা দিয়েছেন। সেখানে জীবনানন্দের কবিতা, উপন্যাস, গল্প, ডায়েরি তাে আছেই, দুই বাংলার বিশিষ্ট প্রবন্ধকার, গবেষকরাও আছেন। লেখকের এক সাক্ষাৎকারে পড়লাম, বইটি লেখার আগে তিনি ঘুরে দেখেছেন কলকাতা এবং বরিশালের সেই সব জায়গা, যেসব জায়গায় কবি থাকতেন। গেছেন হাসপাতালেও। এতদিন পরে এসব জায়গা থেকে কী নতুন তথ্য পাবেন? বইটি পড়ে বুঝেছি, না তথ্য নয়, শাহাদুজ্জামান তাঁর উপন্যাসের নায়কের জীবনকে হৃদয়ের মধ্যে নিয়ে এগােতে চেষ্টা করছেন। হ্যাঁ, এই বইয়ে তথ্য অনেক, যা হয়তাে আগেই জানা, বহুচর্চিত, তারপরেও বলব, বইটির হৃদয় কোনও কোনও সময়ে বাইরের তথ্যকে ছাপিয়ে এগিয়ে গেছে অনেকদূর। বড় বড় চরিত্র নিয়ে বিশ্বে অজস্র গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। হয়ে চলেছে। বাংলাতেও সেই তালিকা দীর্ঘ। তালিকায় পৌরাণিক, ঐতিহাসিক চরিত্ররা যেমন আছেন, আছেন বিপ্লবী, শিল্পী, সাহিত্যিক। এমনকী, জীবনানন্দকে নিয়েও এই বঙ্গে উপন্যাস লেখা হয়েছে। দু’টির কথা এখনই মনে করতে পারছি। একটি সুরঞ্জন প্রামাণিকের লেখা ‘সােনালি ডানার চিল’, অন্যটি প্রদীপ দাশশর্মার ‘নীল হাওয়ার সমুদ্রে’। স্বাভাবিক ভাবেই শাহাদুজ্জামানের উপন্যাসটি পড়ার আগে একধরনের মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু পড়তে গিয়ে সেই প্রস্তুতি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তার বদলে এমন অনেক কিছু পেয়েছি, যা ছিল কল্পনার বাইরে। এখানে উপন্যাসের ফর্মকে উলটেপালটে দেওয়া হয়েছে। কখনও মনে হয়েছে এ উপন্যাস কোথায়! এ তাে জীবনী। যেখানে মূল চরিত্র শুধু নিজে নন, তাঁর মা বাবা স্ত্রী প্রেমিকা সকলেই স্বনামে উপস্থিত। কোনও আড়াল-আবডাল নেই। জীবনানন্দকে ‘জীবনানন্দ’ নামে লিখতে দ্বিধা করেননি লেখক। ৫৬টি বই এবং পত্রপত্রিকা থেকে তথ্যের পর তথ্য সাজিয়ে লেখা। যেমনটি জীবনীকাররা করে থাকেন। আবার পাতা উলটেই ধারণা বদলেছে। পাতা জোড়া কবিতা। ‘বােধ’, ‘আট বছর আগের একদিন’, ‘ক্যাম্পে।

তবে কবিতারই বই হল নাকি? আরও এগিয়ে বুঝেছি, না, তাও নয়। এ এক বিচ্ছিন্ন, বিধ্বস্ত, প্রতিভাবান একাকী মানুষের আপনকথা। ডায়েরির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা ব্যর্থতা, গ্লানি, অপমানের কথাই লেখা হয়েছে সাজিয়ে, পরম্পরা ধরে। তবে কি এটিও ভঙ্গি বদলে আত্মকথাই? ভুল ভেঙেছে আবার। যখন নানা মাত্রায় ব্যাখ্যা পেয়েছি। পেয়েছি হিসেবনিকেশ। ঘনভাবে পেয়েছি কবির জীবন নিয়ে আলােচনা।

যে-জীবন প্রীতির স্পর্শ ছুঁয়ে দ্রুত ফিরে গেছে বিষন্নতায়। যে-জীবন অন্তর্গত রক্তের ভিতর বিপন্নতায় খুঁজেছে তার হিসেব। জীবনানন্দের কবিতা গল্প উপন্যাসের নির্মাণ, বিবিধ প্রসঙ্গ এই উপন্যাসে ঘুরেফিরে এসেছে। তখন আবার ভুল করে মনে হয়েছে, শাহাদুজ্জামান আসলে একটি প্রবন্ধের বই-ই লিখে ফেলেছেন। তাও সব মতামত যে নিজের, এমন নয়। বেশিটাই, বলা ভাল অনেকটাই, অন্য কবি, প্রাবন্ধিক, সমালােচক, সম্পাদকের ‘তাঁদের কথা’। তাঁদের ভালবাসা আর অবজ্ঞা। তা হলে কেন এটি। উপন্যাস? লেখক নিজেও তাই আখ্যা দিয়েছেন। বইয়ের মলাটে লেখাও রয়েছে। শুনেছি, বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কেউ কেউ নাকি বলেছেন, জীবনানন্দকে নিয়ে যে বিপুল চর্চা রয়েছে, এই বই তারই বাছাই অংশের কোলাজ। সত্যি কথা বলতে কী, যত ভালই লাগুক, পড়তে গিয়ে আমিও মাঝে মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। ভ্রম কাটে শেষ হলে। বুঝি, যে যা বলুক, সাহিত্যের চিরাচরিত নিয়মে উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ যাই থাকুক না কেন, ‘একজন কমলালেবু’ অবশ্যই উপন্যাস, যা আঙ্গিকে, গঠনে, মাত্রায় অন্যরকম। নিভৃত, এলােমেলাে এক জীবনের চারপাশে ঘিরে থাকা কুয়াশার মতাে ভালবাসা, উপেক্ষা, যন্ত্রণা সরিয়ে হাঁটা এক কাহিনি। হ্যাঁ, কাহিনিই তাে। কোনও জীবন কি অবিশ্বাস্য মনে হয় না? মনে হয় না এ জীবন বাস্তব নয়, শুধুই কল্পনার? রং-তুলিতে আঁকা, যার ওপর কখনও কালি, কখনও জল পড়েছে, কখনও মুছে গেছে, কখনও হয়েছে আবছা। কখনও নষ্ট হয়ে আবার নতুন। কোনও ছবি তৈরি করেছে। মনে কি হয় না সে জীবনের কথাও রুদ্ধশ্বাসে পড়ারই মতাে? শাহাদুজ্জামান ‘একজন কমলালেবু’-তে জীবনানন্দকে সেভাবে পাঠকের কাছে এনেছেন। পাশে এনেছেন। যে-জীবনানন্দ মায়া, নিষ্ঠুরতাকে নিংড়ে নির্মাণ করেন কবিতা। প্রতিটি শব্দ, বাক্যবন্ধন, যতিচিহ্নে নিজেকে রেখে যান একই সঙ্গে রক্তের ফোঁটা ও চুম্বনে। উপন্যাসের মূল চরিত্র জীবনানন্দ না হয়ে যদি অন্য কেউ হত, তাতেও এই লেখার মান একবিন্দু খাটো হত না।

আমি জীবনানন্দের নাম না জেনেও এই বই পড়ে ফেলতাম এবং এমন কোনও পাঠকের হাতে যদি এই বইটি তুলে দেওয়া হয়, যে কবিতা বা কবির থেকে শত যােজন দূরে থাকে, সেও বইটি পড়তে শুরু করলে ছাড়তে পারবে না। শেষ হলে জলে ভেজা উজ্জ্বল চোখে বলতে বাধ্য হবে, ‘আমার ভাষার এই কবির জন্য আমি গর্বিত। আমি তাঁর কবিতা পড়ব। তাঁর জীবন পড়ব। তাঁকে নিয়ে আলােচনা শুনব।'

একটি লেখা এর বেশি কী করতে পারে?

শাহাদুজ্জামান কোনও আড়াল রাখেননি। পাঠককে ঠকাননি। উপন্যাসে মূল চরিত্রের লেখা কবিতা লেখা যাবে না, ডায়েরির পাতা নেওয়া যাবে না, প্রাবন্ধিকের বিশ্লেষণ নেওয়া যাবে না। নিলেই তাকে চলে যেতে হবে ননফিকশন বা ডকুফিকশনের আলমারিতে— সাহিত্যের পায়ে এমন শিকল কে পরিয়েছে? বিশ্বজুড়ে এই শিকল ঘেঁড়া হয়েছে, হচ্ছে। বাংলাতেও হয়েছে বারবার। শাহাদুজ্জামান যেমন শিকল ভেঙেছেন, মানুষের মন জয়ও করেছেন। ‘আমি ফর্ম ভেঙেছি, ফর্ম ভেঙেছি’ বলে নিজেকেই ঢক্কানিনাদ করতে হয়নি। ফর্ম নিয়ে আলাদা করে মাথাই ঘামাতে হয়নি যেন। সে এসেছে নিজের খুশিতে।

বইটির শুরু যতই রহস্যময়, কৌতুহলােদ্দীপক, আকর্ষণীয় হােক না কেন, পড়তে হয়েছে ধীরে। সময় নিয়ে। রস অনুভব করতে করতে এগােতে হয়েছে। বলার ভঙ্গিটি অতি স্বাদু। একজন বাহ্যিকভাবে নরম এবং অন্তরে অতি কঠিন ও জটিল মানুষকে নিয়ে লিখতে বসলে যে-ভাষা ও ভঙ্গির কথা মনে আসা স্বাভাবিক এবং ব্যবহারের লােভ জাগে, শাহাদুজ্জামান তাকে এড়িয়েছেন। শব্দ, অলংকার, বাক্যবিন্যাসের মারপ্যাঁচে লেখাকে ভারাক্রান্ত করেননি। অকারণ পাণ্ডিত্য জাহিরের চেষ্টা নেই। সহজ গদ্য, কিন্তু মিয়নাে নয়। তাজা এবং শক্তপােক্ত। পড়তে গিয়ে বারবার থমকে ভাবতে হয়, কিন্তু অযথা হোঁচট খেতে হয় না।

আবার লেখার মধ্যে নেই অতিরিক্ত সরলীকরণ। যেখানে যেমন মনে করেছেন, বােধ, বিশ্বাস,

জীবনদর্শনের কথা বলতে দ্বিধা করেননি। বইজুড়ে জীবনানন্দ দাশ নিজেই থেকেছেন। লেখকের হয়ে যাননি। শুধু লেখক আঁচলের মতাে তাঁর হৃদয়খানি পেতে রেখেছেন।

বইটির এটি অন্যতম গুণ। অতি সাধারণ পাঠকও একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে জানবে অতি উৎসাহে। পরম বিস্ময়ে, মমতায় সে চিনবে গহন সঞ্চারী, নির্জন, একাকী এক প্রতিভাকে। চরিত্রগতভাবে মূলত ধূসর, ছায়া আর কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে থাকা কোনও জীবন মনােগ্রাহী। করে উপস্থাপনা সহজ কথা নয়। আবার বলছি, পড়তে শুরু করলে থামার সুযােগ দেননি। সেখানে ঠিক-বেঠিকের নিক্তি মাপা অর্থহীন। মনের মাধুরী যদি কোথাও মেশানােও হয়, সে অধিকার লেখাটি নিজেই তৈরি করে নিয়েছে।

অনেকে বলে, বইপাঠে (যে-কোনও লেখার ক্ষেত্রেও সম্ভবত সমানভাবে প্রযােজ্য) নৈর্ব্যক্তিক থাকাটাই সমীচীন। প্রতিক্রিয়া শুরু হবে পাঠশেষে। বিষয়, ভাবনাকে মনের ভিতরে জারিত হতে হবে। আমিও চেষ্টা করি এই পথে হাঁটতে, বেশির ভাগ সময়েই পারি না। এই বইয়ের বেলাতেও তাই হয়েছে। পড়তে পড়তেই মনের ভিতর প্রতিক্রিয়া হয়েছে। আমাকে প্রভাবিতও করেছে। এখানে বলে রাখা প্রয়ােজন, আমি কোনও সাহিত্য গবেষক, শিক্ষাজগতের মানুষ অথবা মননে, দর্শনে শুধু আচ্ছন্ন গুরুগম্ভীর পাঠক নই। নিছকই পাঁচজনের মতাে সাধারণ মেধার একজন পড়ুয়া। পড়ার আনন্দেও পড়ি। তবে বহুজনের মতাে একজন জীবনানন্দ ভক্ত। আবার একই ভাবে বহুজনের মতােই বেশি ভক্ত। তবে সেখানেও ঘাটতি রয়েছে। এই তীব্র, স্নিগ্ধ এবং অপ্রতিরােধ্য মানুষটির কাজ ও জীবন নিয়ে যে-বিপুল চর্চা হয়েছে, তার খুব সামান্য অংশই আমি জানি। কে জানে, বিস্তৃত পড়া থাকলে হয়তাে খুঁতখুতানি হত। ভাবতাম, এই বইয়ে নতুন কী রয়েছে? ভাবতাম, কেন আবার লেখা? নিজেকেই হয়তাে বলতাম, যিনি কবিতা নিয়ে বেঁচে থেকেছেন, মরেও গেছেন কবিতা নিয়ে, তাঁকে জানতে বইয়ের পাহাড় সাজিয়ে বসতে হয়। না হলে এই মানুষকে জানার, চেনার অধিকারী নও তুমি। একজন কমলালেবু আমাকে সেই হীনমন্যতা থেকে মুক্ত করেছে। আমি জীবনানন্দ দাশকে জানার জন্য আরও আগ্রহী হয়েছি। শেষে একটা কথা বলে নিই। কাহিনি, প্রথম অধ্যায়ের মতাে শেষ অধ্যায়টিতেও ফিরে এসেছে হাসপাতালে। ফিরে এসেছে কবির মৃত্যু। মাঝখানে ক্লান্ত জীবনের পথে পড়ে থেকেছে উজ্জ্বল এক কমলালেবু। না, একজন কমলালেবু।

একজন কমলালেবু

শাহাদুজ্জামান।

প্রথমা প্রকাশন।

আলোচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয় দেশ ২রা ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সংখ্যায়।

‘বাংলা ভাষার সূর্য অস্ত যায় না’ | সেলিনা হোসেন | রবিবারের প্রবন্ধ ৩

‘বাংলা ভাষার সূর্য অস্ত যায় না’
সেলিনা হোসেন

আমার এই লেখার শিরোনামটি আমার নয়। আমার শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় মানুষ তাঁর একটি বক্তৃতার এই শিরোনামটি ব্যবহার করেছেন। বাংলা একাডেমীতে চাকরি করার সময় তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, এখন থেকে কুড়ি বছর আগে, বাংলা একাডেমী থেকে তাঁর গ্রন্থ প্রকাশের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। তাঁর অনুসন্ধিৎসার বিচিত্র বিষয় আমাকে আকৃষ্ট করে। তিনি বিচারপতি মুহাহম্মদ হাবিবুর রহমান।

এই শিরোনামটি আমাকে ভাবায়। আমার মনে হয়েছে শিরোনামটির নানা দিক আছে। ভাষার সূর্য অবশ্যই অস্ত যাবে না—অস্ত গেলে বাঙালি হারাবে তার গৌরব এবং অহংকারের ইতিহাস। কিন্তু ভাষার নানা অনুষঙ্গ থাকে—সে অনুষঙ্গ আধিপত্য বিস্তার করে অন্যের ওপর। ব্যক্তি ভাষার সেইসব অনুষঙ্গ, বুঝে অথবা না বুঝে, তাকে স্থায়ী করে ফেলে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর্থ-সামাজিক পটভূমিতে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। সেজন্য আমরা চাই ভাষার আধিপত্য বিস্তারকারী অনুষঙ্গের যে সূর্য তাকে অবশ্যই অস্ত যেতে হবে। অস্ত যাওয়ার প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। এ প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে বাংলা ভাষার প্রতিরোধের দিকটির দু-একটা অনুষঙ্গ তুলে ধরে দেখাতে চাই কিভাবে ভাষার সূর্যটি টিকে থাকল।



বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’। ভুসুকু চর্যাপদের কবিদের মধ্যে অন্যতম একজন। তাঁর একটি পঙ্ক্তি এমন : ‘আজই ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী।’ অর্থাৎ আজ ভুসুকু বাঙালি হলো। একজন কবি নিজ জাতিসত্তার পরিচয় ধরে রাখার জন্য উচ্চারণ করেছিলেন এমন অবিনাশী পঙ্ক্তি। একই সঙ্গে মনে হয়েছে এই পঙ্ক্তির ভেতরে দ্রোহ এবং প্রতিরোধের ভাষাও আছে। নিজের জাতিসত্তার অস্তিত্ব সমুন্নত রাখার জন্য কবি তার ভাষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এমন প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করতে হলো তাঁকে? নিশ্চয়ই সেই সময়ে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল যার জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কবি। আঘাত এসেছিল এবং প্রতিরোধের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এসবই গবেষণার বিষয়। আজ আর জানার উপায় নেই। কিন্তু সে সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা এই যে কবি ভুসুকুরা লড়াইয়ে জিতেছিলেন সেই অষ্টম শতাব্দীতে, তাই তাদের ভাষার সূর্য অস্তমিত হয়নি। একবিংশ শতাব্দীতে এসে তাই আমাদের একজন মনীষী সগৌরবে বলতে পারছেন যে ‘বাংলা ভাষার সূর্য অস্ত যায় না’।

লড়াই আরো আছে।

সপ্তদশ শতকে ধর্মীয় গ্রন্থ বাংলা ভাষায় লেখা হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল। একশ্রেণীর লোক ধর্মগ্রন্থ বাংলা ভাষায় লেখার ঘোর বিরুদ্ধাচারণ করেন। বিরোধিতাকারীরা বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সুতরাং হিন্দুর ভাষা দিয়ে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ রচিত হতে পারে। সে সময়ের কবি সৈয়দ সুলতান, কবি আবদুল হাকিম এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং যুক্তি দিয়ে তা খণ্ডন করেন। সৈয়দ সুলতান বিরুদ্ধকারীদের ‘মুনাফিক’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন :

যে সবে আপনা বোল না পারে বুজিতে।

পাঁচালি রচিলাম করি আছ এ দুসিতে॥

মুনাফিক বলে আমি কিতাবেতে কাড়ি।

কিতাবেত কাড়ি দিলুম হিন্দুয়ানী করি॥

আল্লা এ বোলিছে মুঞি যে দেশে যে ভাষ

সে দেশে সে ভাষে কৈলুম রছুল প্রকাশ॥

অতএব নিজের ভাষায় রসুলের উপর বই লিখতে তিনি ভয় পাননি। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘ওফাতে রসুল।’ ধর্মগ্রন্থ বাংলায় লেখা যাবে না এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন কবি আবদুল হাকিম। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের মতে আবদুল হাকিমের বাড়ি ছিল নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত সন্দ্বীপের সুধারামে। তাঁরা মনে করেন তাঁর সময়কাল ১৬২০-১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ। আবদুল হাকিম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বিভিন্ন ভাষায় যখন বিভিন্ন পয়গাম্বরদিগের নিকট তাঁহাদের কিতাব অবতীর্ণ হইয়াছে, আমাদের বাংলা ভাষায় ধর্মগ্রন্থ লিখিলে কেন দোষ হইবে? আল্লাহতালা তো সকল ভাষা বুঝেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘গ্রন্থপাঠের প্রথম উদ্দেশ্য হইতেছে আল্লাহর আদেশ পালন করা। আরবী পড়িয়া যদি কোন ব্যক্তি ধর্মভাবে প্রণোদিত না হয় বা ধর্মাদেশ পালন না করে তবে এই আরবী কিতাব পাঠের সার্থকতা কোথায়?’ বাংলা ভাষায় ধর্মীয় গ্রন্থ কম বলে তিনি আক্ষেপ করেছেন। শেষ পর্যন্ত যারা বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করতে দ্বিধা করেননি। লিখেছেন :

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥

দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়া এ।

নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে না জাত্র॥

মাতা পিতাসহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মন হিত অতি॥

না বুঝি আরবী বাক্য না চিনি অক্ষর।

তে কাজে আশ্বাস মনে ভাবি বহুতর॥

নিজ দেশী ভাষা করি গৃহতে সকল।

আমি সব আগে কর সঙ্কট কুশল॥

আবদুল হাকিমের এই বইটির নাম ‘নূরনামা’। এই বইয়ে তিনি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর নূর সৃষ্টির বর্ণনা দিয়েছেন। যাঁরা ধর্মের পবিত্র বাণীকে বিদেশী ভাষা থেকে ছাড়িয়ে এনে নিজের ভাষায় রূপায়িত করেছে তারাই তো সত্যিকারের সৈনিক। নিজ ভাষার সূর্যকে অস্তমিত হতে দেয়নি। ভাষার বিরোধিতাকারীদের যাঁতাকলে স্তব্ধ হয়ে থাকতে দেয়নি নিজেদের সৃজনশীলতাকে। তাঁদের অবিনাশী পঙ্ক্তিমালা আমাদের সামনে সূর্যরশ্মির মতো জ্বলজ্বল করে। তবে বিরোধিতাকারীরা টিকে আছে ভিন্ন খোলসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন আবাসিক এলাকার দেয়ালে লেখা আছে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ একবিংশ শতাব্দীতে এখনো এসব কথা বলতে হচ্ছে। কেননা মৌলবাদের থাবা ক্রমাগত গ্রাস করতে চাইছে এই দেশ। কারণ ধর্মের নামে নিপীড়িত, নিগৃহীত হচ্ছে এ দেশের মানুষ। নিপীড়িত হচ্ছে নারীসমাজ। মৌলবাদীরা ধর্ম যার যার এটা মানতে রাজি নয়। একতরফাভাবে নিপীড়ন করছে আহমদিয়াদের, নিপীড়ন করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদের। এর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এই ভাষার সূর্যকে ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো কিভাবে? রাষ্ট্রের ক্ষমতাধররা যে এই ভাষা বুঝতে চায় না। ভাষার সূর্য মাথার ওপর থাকলেই হবে না, সেই ভাষার শক্তিকে বাস্তবে রূপায়িত করার মানুষ চাই।



এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে ‘বাংলা ভাই’ নামে সম্বোধন করে দেশবাসী। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ এই শব্দ দুটি অবলীলায় ব্যবহার করে। প্রবল মর্মযাতনা পীড়িত করে আমাকে। ‘বাংলা’ কোনো সাধারণ শব্দ নয় আমাদের জীবনে। এর অন্তরালে প্রবল শক্তি নানা অভিধা নিয়ে হাজির হয় আমাদের সামনে। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় সমুন্নত করার জন্য রাজপথে জীবন দিয়েছিল আমাদের তরুণরা। এই গৌরবের ইতিহাস বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা সূচিত করেছিল। এত যার গৌরব সে শব্দ কেন একটি সন্ত্রাসীর নাম হবে? আমরাই বা কেন অহরহ উচ্চারণ করে যাচ্ছি? কেন প্রতিবাদ করছি না? ‘ভাই’ একটি গভীর অর্থব্যঞ্জক শব্দ। এটি শুধুই মায়ের পেটের ভাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ভাই দিয়ে তৈরি হয় নারী-পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক। শব্দটি স্নেহের ভালোবাসার, শ্রদ্ধার শব্দ। এটিও সন্ত্রাসীর দখলে চলে গেছে। ভাষার সূর্যকে এভাবে কালিমালিপ্ত করা হলে কুঁকড়ে আসে অস্তিত্ব। মুছে যেতে চায় ভাষার ইতিহাস। কত প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মুখে ভাষা তার আপন সত্তা উজ্জ্বল রাখে সে ইতিহাস তো সবার জানা। তাই বলছিলাম গণমাধ্যমের দায়িত্বে কথা। বিশেষ করে মুদ্রণ গণমাধ্যম পারে ভাষার যথাযথ ব্যবহার পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে। বদলাতে পারে ভাষার ওজন।

ভাষার আধিপত্য সবচেয়ে বেশি দমন করেছে নারীকে। এমন অনেক শব্দ আছে যার কোনো পুংলিঙ্গ নেই। যেমন ‘সতী’। এমন অনেক শব্দ আছে যেটি পুংলিঙ্গে একরকম অর্থ বহন করে, স্ত্রীলিঙ্গে অন্যরকম। যেমন ‘একেশ্বর’। ভাষা পুরুষের ক্ষমতা, দম্ভ, গৌরব, অহংকারকে যত দৃঢ়ভাবে প্রচার করেছে নারীর বেলায় তার একভাগও করেনি। নারীর প্রতি প্রযোজ্য ভালো অর্থের শব্দ গালিতে রূপান্তরিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। যেমন ‘মাগী’। মা অর্থ জননী, মাতা। ‘গী’ অর্থ বাক্য, বচন, জ্ঞান, বেদ, সরস্বতী। কিন্তু এখন প্রবল উচ্চারণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই শব্দটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভাষার সূর্যকে অস্ত যেতে দেয়নি সেই ভাষার মানুষ। আবহমানকাল ধরে নারীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে নিজের রচিত গান, গল্প, ছড়া, প্রবাদ, প্রবচন ইত্যাদি। যা সমৃদ্ধ করেছে ভাষাকে। কিন্তু নারীর ওই অবদান অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য করেছে পুরুষ। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে নিজের পক্ষে।

‘সম্প্রতি দাতাগোষ্ঠীর সহযোগিতায় বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডসের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে তোলা কর্মসূচি চলছে। এই বিষয়ে একটি গানের কয়েকটি পঙ্ক্তি শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। আমি গানটি স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত করছি। দু-একটা শব্দ ভুলও হতে পারে আগেই স্বীকার করছি। গানটি এমন :

ওরে সরল ছেলেটারে

ঢাকায় আইসা এইচআইভি বাঘে খাইলরে

কামিনী ছলনায় ভুলিয়া

এইচআইভির বাঘে খাইলরে...

কিন্তু অদ্ভুত ভাষার ব্যবহার। ছেলেটা সরল, মেয়েটা ছলনাময়ী। তাই তাকে এইচআইভির বাঘে খায়। ঢাকায় এসেই ছেলেটি পতিতালয়ে যাওয়ার রাস্তা চিনে ফেলে। পতিতালয়ে তৈরি হয় প্রথমত পুরুষের প্রয়োজনে, দ্বিতীয়ত উপায়হীন নারী বেঁচে থাকার তাগাদায় সেখানে আশ্রয় খোঁজে। বিক্রি করে শরীর। গানের সরল ছেলেটি এতই সরল যে তাতে কামিনীর ছলনা বাঘের মুখে তুলে দেয়, কিন্তু সে কনডম ব্যবহার করতে শেখে না। এভাবে ভাষা ব্যবহার করে এইচআইভি সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা যদি হয় তাহলে সচেতনতার কর্মসূচি যে লাটে উঠবে তাতে সন্দেহ নেই। এভাবে যে কোনো অসুস্থ ধারণাকে অনবরত বলার মধ্য দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় নেতিবাচক শক্তি। ভাষার যে ক্ষুদ্র অংশ জীবনের পক্ষে কাজ করে না তার অস্ত যাওয়াই উচিত। জীবন নারীর একার নয়, নারীর সঙ্গে পুরুষের—যারা সৃষ্টি করে আগামী প্রজন্ম। এই প্রজন্মকে ভাষা বিষয়ে তৈরি করার জন্য ‘প্রথম আলো’ একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

কত হাজার বছর আগে জানি না, মহীয়সী খনা তাঁর একটি বচনে বলেছিলেন : ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।’ অর্থাৎ মাঘ মাসের শেষে বৃষ্টি হলে ফসল ভালো হয়। সেই রাজাই পুণ্যবান এবং সেই দেশই ধন্য যারা তার প্রজাদের পেটভরা ভাত দিতে পারে। ভাষার এমন অবিনাশী পঙ্ক্তির সূর্য কোনোদিন যেন অস্তমিত না হয় এই প্রার্থনা, আজকের বাংলাদেশের মানুষের।

০৬-০৯-১৯৯৪
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট