প্রবাহিত মনুষ্যত্ব - শঙ্খ ঘোষ | রবিবারের প্রবন্ধ ২

রবিবারের প্রবন্ধ ২
প্রবাহিত মনুষ্যত্ব
শঙ্খ ঘোষ
আর অন্যদিকে, একজন বর্ষীয়সী মহিলাকে জানি, মানুষখেকো বাঘেরা বড়ো লাফায় বইটি পড়ে এর কবিকে যিনি একটি চিঠি লিখবার জন্য ব্যাকুল হচ্ছিলেন৷ এর তাপ আর বিক্ষোভ, এর প্রাত্যহিকতা আর পথচারিতায় খুব সহজেই নিজের মন মিলিয়ে নিতে পেরেছিলেন সেই মহিলা৷ বাংলা কবিতার প্রেমিক একজন বিদেশী মানুষকেও জানি, কলকাতায় এসে যিনি কবিতার মধ্যে খুঁজছিলেন এদেশের সাময়িকতার চাপ, এর প্রতিদিনের রক্তক্ষরণ৷ আমাদের মতো দেশে কিংবা লাতিন আমেরিকায় বা আফ্রিকায় যে-ধরণের প্রতিবাদের কবিতা বিদীর্ণ হয়ে উঠবার কথা এখন, তিনি খুঁজছিলেন সেইটে৷ আর এই কাজে প্রচুর সন্ধানের পর তিনি নির্বাচন করে নিয়েছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা––সমস্তরকম লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে আর্তনাদ যেমন লাভাস্রোতে বেরিয়ে আসে ওঁর রচনায়, সেটা মুগ্ধ করেছিল তাঁকে৷ প্রতিবাদের এই প্রত্যক্ষতাতেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষতম কবিতার পরিচয়, এইখানেই তাঁর কবিতার সঙ্গে একাত্মবোধ করেন তাঁর আজকের দিনের পাঠক৷

কিন্তু আমরা, যাঁরা অনেকদিন ধরে তাঁর কবিতা পড়ছি, আমাদের তখন অন্য একটা ভাবনাও এসে পড়ে মনে৷ অনেকদিন আগে যখন তিনি জেগে উঠেছিলেন যেন জীবনানন্দের ভূমি থেকে, তার চেয়ে এখনকার জগৎ কি তবে সরে এসেছে একেবারে? পূর্বাশা-র পৃষ্ঠায় যখন তিনি লিখছিলেন “ক্লান্তি ক্লান্তি”র মতো কবিতা, ‘এমন ঘুমের মতো নেশা’ কিংবা ‘এমন মৃত্যুর মতো মিতা’কে এড়িয়ে জীবন চান না বলে জানাচ্ছিলেন যখন, একাধিক কবিতায় যিনি দেখছিলেন ‘শরবতের মতো সেই স্তন’ তাঁর কবিতায় তখন সদর্থেই একটা প্রচ্ছন্ন আবহ ছিল জীবনানন্দের৷ এটা হতেই পারে যে আজ দীর্ঘ পঁচিশ বছরের অভ্যাসে তিনি অল্পে অল্পে––কিংবা হঠাৎই একদিন––একেবারে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন সেই আবহ থেকে, মৃত্যুর থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন ক্ষুধার্ত জীবনের দিকে৷ এটা হতেই পারে যে তাঁর কবিতা এখন আর আলোছায়ার কোনো প্রদোষ রাখবে না কবিতায়, হয়ে উঠবে স্পষ্ট এবং রূঢ়, সাময়িকতার প্রয়োজনে অত্যন্ত নির্মমরূপে বাস্তবিক ––ঘোষিত এবং দলীয়৷

তবু, এইটেই কি তাঁর সব পরিচয়? বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা লক্ষ করে পড়লে দেখা যাবে যে তাঁর এই মুহূর্তের রচনায় বিষাক্ত ধিককারের সঙ্গে সঙ্গে রয়ে গেছে এক প্রগাঢ় কোমলতা৷ এই অর্থে, মনে হয়, তাঁর অতীত তাঁকে ছেড়ে যায়নি পুরো, বরং কবিতার ভিতরকার পর্দায় সেটা এক মস্ত সামর্থ্য এনে দিচ্ছে৷ প্রথম যৌবনে যে স্বপ্নমদির জগৎ তিনি দেখছিলেন তা আর প্রত্যক্ষে এখন কথা বলে না সত্যি, কিন্তু দেশে দেশে কালে কালে ‘প্রবাহিত মনুষ্যত্ব’র প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসা একটা মমতাময় ধমনী রেখে দেয় তাঁর কবিতার অন্তরালে৷ তখন, এ-রকমই অভিমান আর ক্রোধে মিশে গিয়ে তৈরি হয়ে ওঠে তাঁর ছোটো এক-একটি কবিতা

নাচো হার্লেমের কন্যা, নরকের উর্বশী আমার

বিস্ফারিত স্তনচূড়া, নগ্ন উরু, …লিতবসনা

মাতলামোর সভা আনো, চারদিকের নিরানন্দ হতাশায়,

হীন অপমানে

নাচো ঘৃণ্য নিগ্রো নাম মুছে দিতে মাতলামোর জাত নেই,

পৃথিবীর সব বেশ্যা সমান রূপসী৷

নাচো রে রঙ্গিলা, রক্তে এক করতে স্বর্গ ও হার্লেম৷

যেমন আমাদের অভিজ্ঞতারও আছে দিন আর রাত্রি, যেমন দিনের অনেক রৌরব আমরা মুছে নিই রাত্রিবেলার নির্জন আত্মক্ষালনে, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিণত কবিতাতেও তেমনি আমরা দেখতে পাব সেই দুই ছায়াপাত৷ সামাজিক যে-কোনো ঢেউয়ের আঘাতে কেঁপে ওঠেন এই কবি, বিবেচনার কোনো সময় পাবার আগেই ঝাঁপ দিয়ে পড়েন স্রোতে, ভেঙে ফেলতে চান সব ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান––কারোই মুক্তি নেই তাঁর সর্বনাশা রোষ থেকে৷ কিন্তু এইসব ভয়ংকর মুহূর্তেও তিনি হঠাৎ এক-একবার এসে দাঁড়াতে পারেন সেই ঘুমন্ত সীমায়

ভুবনেশ্বরী যখন শরীর থেকে

একে একে তার রূপের অলংকার

খুলে ফেলে, আর গভীর রাত্রি নামে

তিন ভুবনকে ঢেকে

এই হলো তাঁর কবিতার রাত্রি, এইটেই তাঁর কবিতার আত্মস্থ অবকাশ, এইখানে তাঁর কবিতার পলিমাটি৷ এই পলি আছে বলেই তার উপর জেগে ওঠা সমস্ত দিনের শস্য একটা স্বতন্ত্র আলো পেয়ে যায়, হয়ে ওঠে সমকালীন অন্যান্য চিৎকৃত বিক্ষোভের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্র৷ তাঁরও আছে চিৎকার, কিন্তু অনায়াস সত্য থেকে উঠে আসে বলে তাঁর সেই চিৎকারে প্রায়ই লিপ্ত থাকে একটা মন্ত্রের স্বাদ

অন্ন বাক্য অন্ন প্রাণ অন্নই চেতনা

অন্ন ধ্বনি অন্ন মন্ত্র অন্ন আরাধনা৷

অন্ন চিন্তা অন্ন গান অন্নই কবিতা,

অন্ন অগ্নি বায়ু জল নক্ষত্র সবিতা৷

অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্বধর্মসার

অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওংকার

সে অন্নে যে বিষ দেয়, কিংবা তাকে কাড়ে

ধ্বংস করো, ধ্বংস করো, ধ্বংস করো তারে৷

এই কবিতা একটা সমগ্র ক্ষুৎকাতর যুগের জাতীয় স্লোগান হয়ে উঠবার যোগ্য৷

এটা ঠিক যে এই কবিতাটিতে, কিংবা এ-পর্যন্ত উদ্ধৃত তিনটি রচনাতেই তাঁর শিল্পসুমিতির যে ধরণ, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ পর্যায়ের কবিতার সেইটেই সাধারণ লক্ষণ নয়৷ তাঁর কবিতা অসমান, অনেকসময়েই তাঁর কবিতা বরং তুলে নিয়ে আসে ঈষৎ ভাঙা চলন, যার ছন্দে ছবিতে শব্দের ব্যবহারে হঠাৎ কখনো মনে হতে পারে যে অশুদ্ধ হলো সুর৷ কিন্তু সেইটেই যেন তাঁর আনন্দ, যেন কিউবার কবি নিকোলাস গ্যিয়েন-এর মতো তিনিও আজ বলে উঠতে পারেন নিজেকে অশুচি বলেই ঘোষণা করছি আমি৷ এই কবিও একদিন ‘নিজের মধ্যে নিহিত থেকে অর্কেস্ট্রা বাজানো’র ভঙ্গি জানছিলেন, যুক্ত ছিলেন তাঁর ভাষার মডার্নিজম-এর আন্দোলনে আর তার থেকে আজ বেরিয়ে এসে এখন তিনি চার পাশে দেখতে পান এক বিশাল চিড়িয়াখানা৷ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও আজ তাঁর ছোটো ছোটো বইগুলির মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন আমাদের আক্রমণকারী সমকালীন ভণ্ড পৃথিবী, আর তাই মুণ্ডহীন ধড়্গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে বা বাহবা সময় তোর সার্কাসের খেলা এইসব হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা-বইয়ের নাম৷ এর অন্তর্গত কবিতাগুলি পড়তে পড়তে কোনো পাঠকের মনে হতে পারে যেন তিনি হেঁটে চলেছেন ধান-কেটে-নেওয়া কোনো জমির ওপর দিয়ে, থেকে-থেকে কাঁটা বেঁধে পায়ে, পিঠে এসে লাগে রোদ্দুরের ফলা সেখানে নেই কোনো সমতল মসৃণতা বা শিল্পসুষমার কোনো সচেতন আয়োজন৷ এর অন্তর্গত কবিতাগুলি পড়তে পড়তে পাঠক কেবলই ঘূর্ণির মতো ঘুরতে থাকবেন এই পাঁচ-দশ বছরের কলকাতার গ্লানিময় ইতিবৃত্তে, সমস্ত ভারতবর্ষের নিরন্তন পচন-লাঞ্ছনায়৷ আর সেই পটভূমি মনে রাখলে এই অসমান ঊষর আঘাতময় শিল্পধরণকে মনে হয় অনিবার্য, অনিবার্য মনে হয় এর আপাতশিল্পহীনতা৷ আপাত, কিন্তু সম্পূর্ণত নয় কেননা অনেকদিনের কাব্যময়তাকে যিনি রেখে দিয়েছেন তাঁর ভিতরে, আজ এই স্পষ্ট ভর্ৎসনার উচ্চারণের সময়েও তাঁর ভাষা হয়ে ওঠে এ-রকম ‘আকাশের দিকে আমি উলটো করে ছুঁড়ে দিই কাঁচের গেলাস’ অথবা ‘ব্রাহ্মমুহূর্তে কারা ছায়ার মতো ছেড়ে গেছে ঘর’ কিংবা ‘কলকাতার ফুটপাথে রাত কাটায় এক লক্ষ উন্মাদ হ্যামলেট/তাদের জননী জন্মভূমি এক উলঙ্গ পশুর সঙ্গে করে সহবাস’ আর ‘আমাদের সন্তানের মুণ্ডহীন ধড়গুলি তোমার কল্যাণে ঘোর লোহিত পাহাড়৷’ তখন বুঝতে পারি কবির যোগ্য সমস্ত ইন্দ্রিয় তাঁর ভিতরে কাজ করে যায় কীরকম সন্তর্পণে, বুঝতে পারি কোথায় আছে পুরোনো সেই কবির সঙ্গে আজকের কবির নিবিড় কোনো যোগ৷

বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ - সৌরীন ভট্টাচার্য | রবিবারের প্রবন্ধ ১

বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ
সৌরীন ভট্টাচার্য

শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর আলোচনা উঠে আসে এর মধ্যে নিশ্চয়ই খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী ও সেই টানে শ্রীনিকেতন প্রসঙ্গও যখন চলে আসে তখন এই প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশে স্বাভাবিকভাবেই আমরা মেতে উঠি৷ ঠিক এই মুহূর্তে এরকম অনেকগুলো নজির আমাদের চোখের সামনে রয়েছে৷ বিশ্বভারতী প্রকল্প যে মূলত ব্যর্থ সে-বিষয়েও যেন প্রায় একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷ এখন শুধু এই মীমাংসা বাকি, এই ব্যর্থতার দায় কতটা কার৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি এর জন্য মূলত দায়ী নন? নাকি তাঁর জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সম্পদ’ বহন করে নিয়ে চলেছে যে সোনার তরী তার দিশাহারা নাবিকেরাই এর জন্য দায়ী? নাকি সমগ্র বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকেই বহন করতে হবে এর দায়ভার? নাকি সরকারি ঔদাসীন্য? নাকি রাজনীতির কুটিল আবর্ত? আধুনিক যুগটা নাকি প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার৷ কাজেই যুগোপযোগী হতে গেলে প্রযুক্তিবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনাবিদ্যা শিক্ষার আয়োজন থাকা চাই৷ খুব সম্প্রতি এরকম আয়োজনের সূত্রপাতও হয়েছে৷ কিন্তু তাতেও কি হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে? নাকি কালের ইশারায় নিজের স্বভাবের খোঁজখবর তেমন করে না নিয়ে আমরা যতই বদলাবার চেষ্টা করছি ততই আরও জটিল জালে জড়িয়ে পড়ছি?

সাফল্য-ব্যর্থতার কথা যখন আমরা বলি, তখন ঠিক কী ভাবি আমরা? কোনো ব্যক্তির জীবনেও যখন এ-প্রশ্ন ওঠে, তখন ঠিক কী থাকে আমাদের চিন্তায়? কে কী হতে চায়, কে কেমনভাবে কাটাতে চায় তার জীবন, সেসব কথা বাদ দিয়ে সাফল্য-ব্যর্থতার অঙ্ক কষার কোনো মানে হয় না৷ গড়পড়তা আর-পাঁচ জন যেমন হবে প্রত্যেককেই যদি সেই মাপে ছাঁটাই করার চেষ্টা হয়, তা হলে সবই তো এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যাবে৷ বৈচিত্র্যের কী দশা হবে তবে? সৃষ্টির জগতে বৈচিত্র্যের দাম আছে৷ শুধু ভিন্নতার খাতিরেই নয়, প্রয়োজনীয়তার খাতিরেও বৈচিত্র্য জরুরি৷ তাই সবই লেপে পুঁছে বেমালুম একাকার করে দিতে না চাইলে বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হয়, তাকে সম্মান জানাতে হয়৷ আর তখন সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশ আর অত সোজাসাপটাভাবে করলে চলে না৷ কথাটা যেমন ব্যক্তির স্তরে সত্য, তেমনই প্রতিষ্ঠানের স্তরেও তা সত্য৷ সব প্রতিষ্ঠান এক উদ্দেশ্যে তৈরি হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এক হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের পিছনের আবেগ ও কল্পনাও যে এক থাকে তা নয়৷ তা হলে এসব প্রশ্ন একেবারে ছেঁটে ফেলে বাদ দিয়ে একমাত্র এই মুহূর্তের প্রয়োজন, লক্ষ্য কিংবা চালু ধরনকে সম্বল করে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিচার করতে বলা কি খুব সমীচীন? অনেক স্বপ্ন কল্পনা আদর্শ এই মুহূর্তের নিরিখে যদি মনে হয় ভাবালুতা, তা হলে ঢাকিসুদ্ধ সেই ভাবালুতা বিসর্জন দেওয়ার আগে নিরিখটাকেই কি একবার মেপে নেওয়া উচিত না? নইলে ক্ষণমুহূর্তই একমাত্র ধ্রুবসত্য, এ-কথা মেনে নিতে হয়৷ কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা ইতিহাসের দিকে তাকালে বারবার দেখা যায়৷ মুহূর্তের নিরিখ যে কতটাই ভঙ্গুর তা যদি বারবার এমনভাবে প্রতীয়মান না হত তা হলে তো পরিবর্তনের জন্য কোনো ফাঁক বের করে নেওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য হত৷ কিন্তু ইতিহাসে পরিবর্তন তো অবশ্যই আছে৷ ক্ষণমুহূর্তের কত কত মানদণ্ড একেবারে জলস্রোতের মতো ভেসে গেছে৷ সমস্ত মূল্যমান ও বিচারের নিরিখ ইতিহাসে নিতান্ত অচিরস্থায়ী৷ কাজেই প্রতিষ্ঠানের বিচারের সময়ে মানদণ্ডের বিপর্যয়-সম্ভাবনা বিষয়ে সজাগ থাকা চাই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী-শ্রীনিকেতনের বিচারে নজর কি শুধুই ডিগ্রি, পাঠক্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ঘেরে আটকে থাকবে? একটা প্রতিষ্ঠানের আবহ ও রণন কি কেবলমাত্র ওইসব জিনিসে ধরা পড়ে? তার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করে নানাদিকে তাকাতে হয়৷ সেই আবহ অনেকসময়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ দৈনন্দিনের মধ্যেও টের পাওয়া যায়৷ দোকান-বাজারের মানুষ, রিক্সাচালক, রাজমিস্ত্রি––এই-যে স্তর, যে-স্তরে সাধারণ জীবনের মানটা ধরা থাকে, সেখানে যদি চকিতে চোখে পড়ে এমন কোনো সরলতা বা সজীবতা যা মুহূর্তের জন্য প্রাত্যহিকের কলুষ থেকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়, তা হলে কি ভাবতে ইচ্ছে করে না যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সবটাই ডিগ্রির গণ্ডিতে আটকে থাকে না হয়তো৷ আর রণন? যেসব বিচারে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ বলে রায় ঘোষণা হয়েই গেছে, যদি দেখা যায় যে, সেইসব বিচারেই অনুজ কোনো প্রতিষ্ঠান দারুণ সফল, আর সে-প্রতিষ্ঠানও ভাবনার আদলে অগ্রজ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণী, তা হলে?


ছোটগল্প | উত্তরপুরুষ দেবদ্যুতি রায়

উত্তরপুরুষ
দেবদ্যুতি রায়



এক
এবার এই ‘আগন’ মাসেই কেমন মাঘের মতো শীত পড়েছে। চার পাঁচদিন থেকে সূর্যের দেখা মিলছে না একেবারে। গায়ের ভারি সোয়েটারের ওপর আলোয়ানটা ভালো করে জড়ায় রতন। আজকাল শরীরটা শীত, গরম কিছুই সহ্য করতে পারে না একদম। কে জানে, শীতের এই ক’টা মাস কী করে কাটবে এবার। ওদের এই এলাকায় শীতের তীব্রতা এমনিতেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি।

মণ্ডলপাড়ার একেবারে মাঝ বরাবর রতনদের এই ছন্নছাড়া বাড়িটা। এ বাড়ির খাপছাড়া মাপের দুটি ঘরের মাঝখান জুড়ে ছোটমোট বারান্দাটাই আজকাল রতনের সারাদিনের থাকার জায়গা। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ভাঙ্গাচোরা শরীরটা টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এখানেই বসে সে। খাওয়ার লম্বা টেবিলটার মাপে বানানো বেঞ্চটায় বসে থাকে। যখন আর পারে না, শুয়ে পড়ে ওখানেই। খুব মন চাইলে বাড়ির মানুষদের একটু উঠানে নামার কথা জানায়। নড়বড়ে কাঠের চেয়ারটায় উঠানে তখন খানিক সময় বসা হয় ওর। গত বছর পর্যন্ত তবু কলপাড় বা ল্যাট্রিনে যাওয়া আসা করতে পারত একা একা, এবার সেটাও প্রায় অসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। মা, আবার কখনও সখনও সুমিও ওকে ধরে ধরে সব জায়গায় নিয়ে যায় আজকাল।

ছোটগল্প | বিবর্ণ রেখায় বিপন্ন সুখ | নাসরীন নঈম

বিবর্ণ রেখায় বিপন্ন সুখ
নাসরীন নঈম



জুম্মনের কঙ্কালসার দেহটাকে গোর দিয়ে এসে দাওয়ায় বসে হাত পা ছুঁড়ে বিলাপরতা গোলাপীকে লক্ষ্য করে লাল মিয়া সান্তনার বাণী বর্ষণ করলো— ‘আর কাইন্দা কি করবা। খসম কি আর মাইনসের জিন্দেগানি বইরা বাইচা থাকে’!
ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে উঠোনের এক পাশে ধপ্ করে বসে পড়লো লাল মিয়া। তারপর দৃষ্টিটা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে আবার বললো— মাইয়াটার দিগে চায়আ কোনরহমে কষ্ট-মষ্ট কইরা খসমের এই ভাঙ্গা ঘরটায় ইজ্জত বাচাআ চইলা যাও। খোদায় চাইলে দিন ফিরবারও পারে।
করিমের বউ তখন ভাত খেয়ে এঁটো বাসনটার পানি ফেলতে ফেলতে মুখটা বিকৃত করলো- বেওয়া বেকসের দিগে খোদা ব্যাটাও চায় না।

জুম্মনের সদ্য বিধাব বউ গোলাপী কারও কথায় কর্ণপাত না করে আলু থালু বেশে আপন মনে মর্সিয়ার মতো করে বিলাপ করছে- হায়রে খোদারে। আমারে... ফালায়া... থুইয়া...কই...গেলগারে...। অখন আমারে...আর ক্যাঠা দেখবরে...।

ছোটগল্প | জরুরী অবস্থা | শুভেন্দু বিকাশ চৌধুরী

জরুরী অবস্থা
শুভেন্দু বিকাশ চৌধুরী



‘ভোট দিবেন কুনখানে?’ প্রশ্ন করে মিছিলের সামনে চলতে থাকা আট-দশজন।

পেছন থেকে সমস্বরে জবাব আসে, ‘গাই বাছুরের মাজখানে’। আজ কয়েকদিন হল এইরকমই মিছিল চলছে বিভিন্ন দলের। সময়-অসময় নেই, প্রায় সারাদিনই গাঁয়ের রাস্তায়, কোন না কোন দলের মিছিল চলছে। সবাই ওই একই প্রশ্ন করে, কোথায় ভোট দেবেন? শুধু উত্তর আলাদা – গাই-বাছুর না লাঙল-কাঁধে-চাষা। মাটির বাড়ির দেওয়ালগুলো সব ভরে গেছে নির্বাচনী প্রতীক চিহ্নে আর লেখায়। যেমন - আসন্ন ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচনে আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রে ভারতীয় লোকদল প্রার্থী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করুন। দেশ বাঁচান, গণতন্ত্র বাঁচান। স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধীর কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। প্রশ্নও আছে কিছু - ইন্দিরা গান্ধীর মাইলো, কী দিয়ে খাইলো? নিচে ইন্দিরা গান্ধীর বিকৃত মুখচ্ছবি, নাকটা যেন অস্বাভাবিক লম্বা। মনে পড়ে, বছর কয়েক আগের কথা। খাবারের খুব কষ্ট! একফসলি জমি, ঘরে ঘরে চাল বাড়ন্ত। তখন রেশনে গম, মকাই, মটকলাই এসব দেওয়া হত। পাশের দেওয়ালে আবার ইন্দিরা গান্ধীর সুন্দর মুখ, সঙ্গে গাই-বাছুর। উমাশশীর ভারি ভাল লাগে এইসব দেখতে। ঘুঁটে দেওয়া বন্ধ করে হাঁ করে দেখতে থাকে মিছিলের চলে যাওয়া। কেমন সবাই দলবেঁধে লাইন দিয়ে চলেছে – একপাড়া থেকে অন্য পাড়া, এক গাঁ থেকে অন্য গাঁয়ে। মনে হয় সেও বুঝি চলে যায় ওদের সঙ্গে। যেমন অমল চলে যেতে চেয়েছিল দইওলার সঙ্গে!

ছোটগল্প | ছায়ামেঘ | নিবেদিতা আইচ

ছায়ামেঘ
নিবেদিতা আইচ



ইয়্যু গো লেফট দ্যান রাইট...

নীলচোখের মানুষটা বারবার ধন্যবাদ দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ইউক্যালিপটাসের ছায়ায় ঢাকা পথ ধরে হেঁটে চলে গেলো। ইংরেজিটা কখনো এত কাঁচা ছিল না আমার। তবু সাদা চামড়া দেখে কথা বলতে গিয়ে ঠিকই বুক ঢিপঢিপ করছিল।

প্রায় ছ’ফুট উচ্চতার নীল চোখ মানুষটা কথা বলছিল অনেকটা ঝুঁকে। নিজেকে আমার বামন বলে মনে হচ্ছিল। চলে যাবার পরেও কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম আমি। তোতা মিয়ার দোকান থেকে দুটো ছোকরা পিছু নিয়েছে নীল চোখ মানুষের। আমি জানি কুন্দতলি গির্জার ফাদারের কাছে এসেছে লোকটা। এত বছরেও কেউ আসেনি কখনো। আজ হঠাৎ কেন এলো সেও জানি না। নামটা জিজ্ঞেস করতে পারিনি। সেটা আসলে ভদ্রতাজনিত সঙ্কোচের জন্য নয়, হুট করে এমন বেজায়গায় অসময়ে ওকে দেখে ভড়কে গেছি আমি। এখন মনে হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে হয়তো জানাও যেত।

তোতা মিয়ার দোকানে গিয়ে বসলে একটু পর পুরো খবরটাই হয়তো জানা যাবে। কিন্তু বরাবরের মতো নির্লিপ্ততা ধরে রেখে সেদিকে না গিয়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।

ছোটগল্প | কবন্ধ সময় | নাহার তৃণা

কবন্ধ সময়
নাহার তৃণা



১.
বিয়ে বাড়ির সুবাসিত রান্নার সুগন্ধে গোটা মনেশ্বর রোড এলাকাটা ম ম করছে। গন্ধ, তা সেটা ভালো কিংবা মন্দ যাইহোক না কেন, গণ্ডী কেটে রুখে দেবার সুযোগ তেমন একটা নেই। তাই দাওয়াত বঞ্চিত ভাড়াটে পরিবারগুলোর নাসারন্ধ্রে বাতাস স্বপ্রণোদিত হয়ে সে সুগন্ধ পৌঁছে দেয়। এ পাড়ায় অলিখিত একটা নিয়ম চালু রয়েছে, বাড়িওয়ালা পক্ষ ভাড়াটেপক্ষকে তাদের কোনো আনন্দ অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া থেকে বিরত থাকেন। অবশ্য শোকাবহ অনুষ্ঠান যেমন মৃতের জন্য দোয়া, চল্লিশা ইত্যাদিতে ভাড়াটিয়াদের সামিলের মহত্ত্ব দেখাতে কুন্ঠা দেখান না বাড়িওয়ালাগণ। আনন্দ আর শোক বন্টনে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার মধ্যে এই অদ্ভূত সীমারেখা কাকলিরা আর কোথাও দেখেনি।

ভাড়া বাড়ির অভিজ্ঞতা ওদের পরিবারের কম নেই। সেরকম অনেক বাড়িওয়ালার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক পর্যন্ত গড়িয়েছে, ভাড়ার বাড়ি ছেড়ে এলেও অনেকের সাথে এখনও যোগাযোগ বর্তমান। কাকলির এক নানা, যিনি আদতে মা-বাবার বিয়ের পর পর নতুন ভাড়াটে হিসেবে ওঠা বাড়ির বাড়িওয়ালা ছিলেন, তিনি মা কে মেয়ে বানিয়েছিলেন। সে সূত্রে কাকলিরা তাঁকে নানা ডাকতো, অবশ্য কাকলি তাঁকে বেশিদিন দেখেনি। কয়েক বছর আগে সেই নানা মারা গেছেন।

শাহাব আহমেদের আলোচনায় হুমায়ূন কবিরের “তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক” ও "পারস্য পরবাসে"

হুমায়ূন কবিরের
“তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক”
ও পারস্য পরবাসে
শাহাব আহমেদ
পারস্যের সাথে, আরো অনেকের মতই, আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ওমর খৈয়ামের কবিতার মাধ্যমে। তারপরে আস্তে আস্তে জানতে পাই ফেরদৌসী, হাফিজ, মৌলানা রুমী, সাদী ও কবি নিজামীর কথা।কয়েক বছর আগে আমি “স্বেদসিক্ত দু:স্বপ্ন সমূহ” নামের একটি লেখা লিখছিলাম। তার কারণে পারস্যের ইতিহাস, সাহিত্য ও মিথ্ নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে হয়েছিল। সেখানেই পরিচিত হই মিথিকাল পাখী সিমোর্গ বা সিমুর্গের সাথে।

সেই সিমুর্গের ঠিকুজী খুঁজতে খুঁজতে আবিস্কার করি “পাখীদের সম্মেলন” নামে একটি বই। লেখক ফরিদউদ্দিন আত্তার। একটি স্বচ্ছ পাহাড়ী হ্রদের উপর দিয়ে উড়তে উড়তে ত্রিশটি পাখী দেখতে পায় তাদের নিজেদের প্রতিবিম্ব, এবং দেখতে পায় তাদের রাজা সিমুর্গকে। এবং আশ্চর্য হয় যখন উপলব্ধি করে যে, রাজা সিমুর্গ আসলে অন্য কেউ নয়, তাঁরা নিজেরাই প্রত্যেকে এবং নিজেরাই সমষ্ঠিতে ।

আত্তারের বইয়ে উল্লেখিত সব ধরণের বাঁধা বিপত্তি মৃত্যু অতিক্রম করে অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার দর্শনের সাথে “মানবতা মুক্তির” লক্ষ্যে নিপীড়ন, নির্যাতন, জেল, মৃত্যুকে অতিক্রম করার দর্শনের সমান্তরাল আমাকে আকৃষ্ট করে।

প্রকৃতির নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। আমরা তার কিছুটা জানি, কিছুটা আন্দাজ করি, কিছুটা জানার ভান করি, কিছু জানি না মোটেই। সেই অজানা নিয়ম মেনেই মোটামুটি এই সময়ে আমার পরিচয় হয় লেখক, কবি ও ডাক্তার হুমায়ূন কবিরের সাথে । তাঁর “তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক” বইটি সাথে সাথে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে। তার এই বইতে আমি খুঁজে পাই এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর যা আমাকে বিগত কয়েক বছর খুব ভাবিয়েছে। শুধু মন্দের সাথে মন্দেরই নয়, “ভালোর সাথে ভালোর সংঘাতেই মানবতার আসল পরাজয়।”
হুমায়ূন কবির বলেন।
খুব অপরিণত বয়েস থেকে যে আদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম এবং যে আদর্শে নেতা-কর্মিরা ছিলেন সৎ, অসম্ভব ত্যাগী এবং কর্মঠ অথচ যুগের পর যুগ জীবন দিয়ে লড়াই করেও , কত শত জানা অজানা খাপড়াওয়ার্ড বেতিয়ারার নরক অতিক্রম করেও, তারা আমাদের দেশের মানুষের জন্য অবদান রেখেছেন নুন্যতমের চেয়েও ঊণ। অথচ ভেঙে গিয়েছেন বার বার । তাদের প্রগতির, মানে সামনে এগিয়ে যাবার বিশ্বাস, অতি দ্রুত বাস্তবায়ন লাভ করেছে শুধু ভাঙ্গনের প্রশ্নে।জাতির সর্বনাশ যারা করে, সেই মন্দেরা মন্দেরা একজোট থাকে অথচ ভালোরা ভেঙ্গে ভেঙ্গে দুর্বল হয়ে সেই সর্বনাশের চুল্লীতে জ্বালানি জোগায়।

“ভালোর সাথে ভালোর সংঘাত হবে কেন?”
“সবচেয়ে বড় কারণটা হল কে কত ভালো সেই নিয়ে দৌড়।”

হুমায়ূন কবিরের এই বই পড়ে বিষয়টা স্বচ্ছ হয়।কেন ফরাসি বিপ্লবে বিপ্লবীরা একে অন্যকে গ্রাস করেছে, কেন রাশিয়ায়, চীনে, মঙোলিয়ায়, ইরানে বিপ্লবী বিপ্লবীকে হত্যা করেছে হাজারে হাজারে ,লাখে লাখে, কোটিতে কোটিতে।
যতই রোমান্টিক হই না কেন, এ তো সত্য , যেখানেই বিপ্লব হয়েছে সেখানেই হয়েছে অহেতুক অজস্র রক্তপাত, একই আহাজারীর পুনরাবৃত্তি । শত্রুর রক্তের সাথে মিত্রের রক্ত এক হয়ে গিয়ে বিপ্লব বিপথে চলে গেছে এবং যে স্বপ্ন নিয়ে বিপ্লব সাধন করা হয়েছে তা রয়ে গেছে অধরা।

সত্তুরের দশকের শেষ দিকে ইরানে বিপ্লব হয়। আমরা অতি উৎসাহীরা রাজপথে মিছিল করেছি “ইরান দেশের বীর জনতা, আমরা আছি তোমার সাথে।” শ্লোগান দিয়ে।
বামে মুক্তি, ডানে ভয়।
না , খোমেনীর ইসলামী বিপ্লব নয়, এর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্রকে অভিনন্দন জানিয়েছি। যেহেতু মোজাহিদিন -ই-খালক এবং তুদেহ পার্টি ছিল সেই বিপ্লবের সক্রিয় অংশীদার , আমরা এর মধ্যে প্রগতির হাতছানি দেখতে পেয়েছি। শাহের “সাভাক” বাহিনীর বর্বরতার ফিরিস্তি তখন পত্র পত্রিকায় প্লাবনের ঢেউ তুলেছে। তারপরে সেই ঢেউ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে পত্র পত্রিকা সয়লাব হয়েছে মোজাহিদিন -ই-খালকের বিদ্রোহ , সন্ত্রাস ,বোমাবাজি, বিপ্লবের নেতাদের মৃত্যু , কারো কারো দেশ ছেড়ে পলায়নের খবরে।
ইরানী বিপ্লবের ফল ও বিষফল আমি নিজ চোখে দেখি নি, দেখেছেন হুমায়ূন কবির । দেখেছেন, অনুভব করেছেন এবং সেই অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন “পারস্য পরবাসে”।
এ পর্যন্ত আমি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, সিমুর্গ এবং “তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক” , তা আলোচ্য বইয়ের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। কিন্তু বইটি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ।

“পারস্য পরবাসে” না ভ্রমণ কাহিনী, না পূর্ণাঙ্গ কোন উপন্যাস। ভ্রমণোপন্যাস সম্ভবত। বিপ্লবের রক্তস্নাত জনপদে একটি পরাজিত প্রেমের গল্পের বুননে শাশ্বত মানবতার গল্প।
পরাজিত প্রেম?
কথাটি ভুল কিন্তু বহুল ব্যবহৃত। “ব্যর্থ প্রেম” আমরা বলি। কিন্তু আমরা জানি প্রেম কখনও পরাজিত বা ব্যর্থ হয় না।
যদি হয় তবে তা প্রেম নয়।
তবে এখানে পরাজয় আছে কি?
আছে ।
মানবতা।
আমরা আস্তে আস্তে বিষয়টির উপরে আলোকপাত করবো।

হুমায়ূন কবির প্রাচীন ইতিহাস স্পর্শ করেছেন খুব সংক্ষেপে।
প্রায় সরাসরি বেছে নিয়েছেন আয়াতুল্লা খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত বিপ্লব- পরবর্তী পারস্য।
উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ৮০র দশকের সেই সময়টা, যখন সেখানে চলছে সামাজিক স্ট্রাকচারগুলোর ভাঙ্গন ও পুনর্নির্মাণ, সামাজিক সম্পর্কগুলোর পুনর্বিন্যাস আর সর্বগ্রাসী পশ্চিমা হাঙর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জেহাদ ও জাতীয় সংস্কৃতির পূনর্জীবনের প্রচেষ্টা।
চলছে ইরাকের সাথে যুদ্ধ।
মৃত্যুর বিশাল হা করা মুখের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে কিশোর থেকে শুরু করে সক্ষম পুরুষেরা, আর নারীরা কাঁদছে বুক চাপড়ে।
“ মাঠ জুড়ে শত শত কবর। শত শত ছবি। মনে হয় নার্সারির ফুলের চারার মত সাজিয়ে রাখা।” ( পৃষ্ঠা -৫৬ )

“মোজাহেদিন ই খালক” এবং বিপ্লবী সরকার এতদিন যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা প্রায় সমাপ্ত হয়ে এসেছে। শুরু হয়েছে তুদেহ পার্টি নির্মূলের আয়োজন। টিভি পর্দায় দেখানো হচ্ছে কমরেড নুরুদ্দিন কিয়ানুরির বিধ্বস্থ চেহারা, তাঁর হাতের কাগজ কাঁপছে , চোখ ঝাপসা , তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে জানাচ্ছেন যে , “সোভিয়েত সহায়তায় সরকার উচ্ছেদের পরিকল্পনা ছিল তাদের। এখন বুঝতে পারছেন সেটা ছিল ভুল। বিদেশীরা ইরানের প্রকৃত বিপ্লব চায় না, চায় অনুগত বিপ্লব । “ পৃষ্ঠা ১০৭
আমরা এই স্বীকারোক্তি দেখেছি স্ট্যালিনের রাশিয়ায় জিনোভিয়েভ- কামেনেভ- বুখারিন- বেবেল- মেয়েরহোল্ড ইত্যাদিদের মেধ যজ্ঞের সময়, দেখেছি হিটলারের জার্মানীতে।
সকল বিপ্লবেরই কিছু ইউনিভার্সাল টুল আছে মিথ্যাকে সত্য , সত্যকে মিথ্যা এবং জীবিতকে মৃত বানানোর। সকল বিপ্লবেই ক্ষমতাসীনরা দেশপ্রেমকে জাতীয়করণ করে নেয়। শুধু ক্ষমতাসীনরাই হয় দেশপ্রেমিক এবং অন্যেরা শত্রু।
ইরানের বিপ্লব যে তার ব্যতিক্রম ছিল না-এ বইতে তা স্পষ্ট।
তবে সচেতন লেখক সরাসরি কোন মন্তব্য করেন নি।
ভালোই করেছেন।
সাহিত্য শ্লোগানের মত নাঙ্গা হয়ে গেলে তার মান ক্ষুণ্ণ হয় ।

খুব উজ্জ্বল একটি বিপ্লবী চরিত্র ইউসুফ জাদেহ্। তুদেহ পার্টির সদস্য।
কিন্তু খুব সংক্ষিপ্ত।এই চরিত্রটি আরো একটি বেশি উন্মোচিত করা যেত। কিন্তু এও সত্য, সে সময়কার বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এদের সম্পর্কে জানাও সম্ভব ছিল না।এরা ছিল ছায়ার মত কিন্তু ছায়া শিকারের পদ্ধতিগুলো ক্ষমতাসীন বিপ্লবীরা ততদিনে জেনে গেছে। এবং জেনেছে সম্ভবত তুদেহ পার্টির মাধ্যমেই, যারা ২০-৩০-৪০ দশকের সোভিয়েত ইউনিয়নের perceived শত্রু নিধনের শিল্প কলার সাথে ছিল খুব ভালোভাবে পরিচিত। বিপ্লবীরা সমষ্ঠির
কল্যাণ নিয়ে এত বেশী ব্যপৃত থাকে যে ব্যস্টির নিধন তাদের কাছে চড়ুই শিকারে চেয়েও সহজ হয়ে যায়। তাই হয়েছে ইউসুফ জাদেহ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে।

এই বইয়ের মূল নারী চরিত্র, আনুশেহ্ এক আবহমান নারী , সুন্দর ও কোমল । পর্দা ঢাকা মুখ তার পরিশিলীত মনকে নিরুদ্ধ করে নি।
“পর্দা ঢাকা নারীর শরীরের বাঁক নেই, সকল সৌন্দর্য জড়ো হয় তার চেহারায়।
আনুশেহর চেহারায় এখন আলো-ছায়ার দোলা। বিকেলের হলুদ আলো পাহাড় ঘেঁষে তেরছা হয়ে এসে পড়েছে মুখে। পাহাড়ি পাইনগুলো দুলছে হাল্কা বাতাসে। ছলকে ছলকে দুদোল বৃক্ষের ছায়া এসে নাচে আনুশেহর মুখে।”
ক্ষীণ ধারার বরফ গলা কারুন নদীর তীরে দেখা এই হল আনুশেহ্। বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের
প্রকাশ এক নারী।
এখানে তন্ময় মাসউদ গায় হাফিজের গান আর আনুশেহ্ তার তর্জমা করে শোনায় গল্পের কথককে।মাসুদের “সুরেলা কন্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে চলে যায় পাহাড়ে”, আর আনমনা আনুশেহ্ গভীর দৃষ্টি দিয়ে থাকে তার দিকে।
অনুশেহ্ ভালোবাসে মাসুদকে কিন্তু তাও অনুক্ত থেকে গেছে সারা গল্পে । ফলে সারা গল্পেই একটা রহস্যের আবহ। অনুশেহ্ কাকে ভালোবাসে বোঝা যায় না।
সে কোমল ও অনুভূতি প্রবণ। তার যত্ন যেমন গল্পের কথকের জন্য ( বাংলাদেশী ডাক্তার)
আবার মাসউদের জন্যও।কার জন্য বেশী বোঝা যায় না।
মাসউদ হল ১০০% বিপ্লবে নিবেদিত মানব-পতঙ্গ যে আত্মত্যাগের আগুনে ঝাঁপ দেবেই।

“How can a moth flee fire
When fire contains it’s ultimate desire?”

আত্তারের কাছে এই আল্টিমেট ডিজায়ার হচ্ছে ঈশ্বর ।
একজন বিপ্লবীর?
সুন্দর আগামী কাল।
শোষন মুক্ত ভবিষ্যত ।

মাসউদেরা সব বিপ্লবে, সব মুক্তিযুদ্ধের মূল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত শক্তি ।
তারা রুশ বিপ্লবের দিবেন্কো সম্প্রদায় যারা বিপ্লবী যুদ্ধে নিহত না হলে হয় ফায়ারিং স্কোয়াডের বলি।এরা ন্যায়ের প্রতি নিবেদিত, অথচ ন্যায়ের কোন নিজস্ব অবয়ব নেই।
ন্যায় অন্যায় মাপা হয় ক্ষমতার নিক্তি দিয়ে।
বিপ্লবের ক্ষমতাসীনরা যখন বিপথে যেতে শুরু করে তখন তাদের কর্মকান্ড কোন না কোন পর্যায়ে এসে এই রোমান্টিক মানুষগুলোর ন্যায়বোধের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
ফলে তারা চিহ্নিত হয় প্রতিবিপ্লবী বা শত্রু হিসাবে ।
ইউসুফ জাদেহ এমনি একটি চরিত্র, দেশের জন্য নিবেদিত বিপ্লবী কিন্তু পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে শত্রু ।মাসউদ হচ্ছে সে সৌভাগ্যবান বিপ্লবী, যারা মৃত্যুবরণ করে দেশ শত্রু হবার আগেই, এবং যাদের জন্য সর্বোত্তম স্থান হচ্ছে অজানা শহীদের শিখা অনির্বাণের নীচের ঈষৎ অন্ধকারের উষ্ণতা।
ইউসুফ জাদেহদের বধ্যভূমি তুষারাবৃত।
কিন্তু মাসউদের মৃতদেহ সামনে রেখে আনুশেহের মুখ দিয়ে লেখক উচ্চারণ করেছেন শক্তিশালী, সম্ভবত এই বইয়ের মূল বক্তব্য :
“যুদ্ধকে ঘৃণা করি, ন্যায় যুদ্ধ হলেও আমি একে ঘৃণা করি। ঘৃণা করি।”

মোশ্তারী আর একটি চরিত্র , সংক্ষিপ্ত কিন্তু উজ্জ্বল । মনে রাখার মত। তার পরিবারে অনেকগুলো মৃত্যু ও আনুসাঙ্গিক ডিপ্রেশন ও ইসিটির মাধ্যমে তার চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় স্মৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মনে দাগ কাটে।
টিউলিপের ফুলে ফুলে ঢাকা প্রান্তরে স্রোতস্বীনি তীরে কাটানো একটি দিন এই বইয়ের এক অপূর্ব অংশ।এতই উজ্জ্বল যে মনে গেঁথে থাকে। পাঠকের মনে হবে সে নিজেই সেখানে উপস্থিত। আনুশেহ্, মোশ্তারী, অন্ধ গীতিকার , মাসউদ প্রত্যেকেই প্রকৃতির সেই পরিবেশে অপূর্ব হয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে।
আর টিউলিপের প্রান্তর বর্ণনা করতে গিয়ে দিয়েছেন সুন্দরও সংক্ষিপ্ত ভাবে পরিচিত করেছেন ইওরোপের টিউলিপের বানিজ্য ও তার লোভের ইতিহাসের সাথে, যা কাহিনীর সাথে হয়েছে সামন্জস্যপূর্ণ।

এই বইয়ের একটি সুন্দর অংশ হল ইরানে নওরোজ উদযাপন।
বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিরুদ্ধে মোল্লারা ভীষনভাবে তৎপর । অথচ তার বিপরীতে পারস্যের প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে চলে আসা “নওরোজের” প্রতি ইরানি মোল্লাদের মনোভাব লক্ষ্যণীয়। তারা তাদের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও কৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে। তাই নওরোজের উৎসব সবার উৎসব, সেখানে কোন উটকো ফতোয়াবাজি নেই।
আমাদের জন্য খুবই সময়োপযোগী এই প্রসঙ্গ।
পারস্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর বর্ণনা একই বইয়ের একটি অনবদ্য দিক যা প্রাচীন ইতিহাসের এই দেশটির প্রতি প্রতিটা পাঠককে ধাবিত করবে আর বেশী তীব্রতায়।

পারস্যের ক্লাসিক কবিদের সম্পর্কেও সুন্দর তথ্য এসেছে।
হাফিজের গল্প মুগ্ধ করার মত।
মাসউদের মুখে হাফিজের গান, ভাষা ও ভাবের মুগ্ধতা তন্ময় করেছে আমাকেও।

আবার ফিরে আসি “পাখীদের সম্মেলন” বইতে । হুমায়ূন কবির তার বইতে খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে বর্ণনা পরিচয় দিয়েছেন কিভাবে সারা পৃথিবীর পাখীরা রওনা দিয়েছিল সীমুর্গের সন্ধানে এবং শন্কা, প্রলোভন, পরাজয়, মৃত্যুসহ কাঠিন্যের ৭ টি উপত্যকা পার হয় মাত্র ৩০ টি পাখী পৌঁছেছিল “কাফ” পাহাড়ের পাদদেশে।পাহাড় তাদের পথরোধ করে বলেছিল, ফিরে যাও, সীমুর্গের দেখা তোমরা পাবে না।

“How can a moth flee fire
When fire contains it’s ultimate desire?
And if we do not join Him, yet we’ll burn
And it is this for which our spirits yarn.
It is not union for which we hope;
We know that goal remains beyond our scope”

এই কাহিনীর শেষটুকু লেখক আমাদের জানান নি। ধারণা করি স্বেচ্ছায়। কারণ, পাখীদের প্রতিটি উপত্যকা অতিক্রম করার সময়
যে ত্যাগ, যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা অনুধাবন না করে শেষের বক্তব্যটি পাঠকের কাছে এর বিশালত্ব নিয়ে ধরা পড়বে না।
শেষটুকু আমি উপরে উল্লেখ করেছি।

ভাষার সজীবতা, প্রবাহ, কারুকার্য, চিত্রকল্প, উপমায় এমন এক সম্মোহনী শক্তি আছে যা পাঠককে বই শেষ না করে উঠতে দেয় না।একটি সুন্দর সাহিত্য কর্ম।

“পারস্য পরবাসে” বইটি প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশনী।
প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ
মূল্য : ৩৪০ টাকা

আমি হুমায়ূন কবিরের বই সমূহের ব্যাপক পাঠক পরিচিতি কামনা করছি।

জুন ১৯,২০১৮
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট