প্রতিদ্বন্দ্বী - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রতিদ্বন্দ্বী
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়



সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরোতে যাচ্ছিল, এমন সময় দেখল ওদের বাড়ির সামনে একটা মোটরগাড়ি থেমে আছে। সামনে ড্রাইভার, পেছনের সিটে এক ভদ্রমহিলা। ড্রাইভার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে—এ গলির শেষ বাড়ি সিদ্ধার্থদের। ওকে জিজ্ঞেস করল, পঁচিশের এক? পঁচিশের এক, কালীপ্রসাদ চৌধুরি, কোন বাড়িটা?

সিদ্ধার্থ একটু ভুরু কুঁচকে বলল, এই বাড়ি—

ড্রাইভার নেমে পেছনের দরজা খুলে দিল। ভদ্রমহিলা নামলেন। চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মাঝামাঝি কোথাও বয়স, ফর্সা মুখে সোনার চশমা, বেশ ব্যক্তিত্বময়ী। স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে তিনি বললেন, আমি কালীপ্রসাদ চৌধুরির সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। তিনি বাড়ি আছেন?

ছোটোকাকার সঙ্গে এরকম কোনো মহিলা আগে কোনোদিন দেখা করতে আসেনি। সিদ্ধার্থ কিছুটা অবাক হয়। দরজা খুলে দিয়ে বলে, আসুন, ভেতরে আসুন।

দরজার পরেই বারান্দা, বারান্দার একপাশে টেবিল ও কয়েকটা চেয়ার পাতা, বাইরের কেউ এলে এখানেই বসতে হয়। চেয়ারের ওপর থেকে দোমড়ানো খবরের কাগজ সরিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, আপনি একটু বসুন, আমি ওঁকে ডেকে দিচ্ছি।

সেই মুহূর্তে ছোটোকাকার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না সিদ্ধার্থর। ভেতরে ঢুকে ডাকল, টুনু! টুনু!



সাড়া নেই, টুনু বাড়ি নেই। মা মেঝেতে চাল ছড়িয়ে কাঁকর বাছছেন। এর মধ্যে কোনো-এক ফাঁকে তিনি জানালা দিয়ে ভদ্রমহিলাকে দেখে নিয়েছেন নিশ্চয়ই, কেন-না সিদ্ধার্থকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কে রে? কোত্থেকে এসেছেন?

সিদ্ধার্থ হঠাৎ ঝাঁঝিয়ে উঠল, আমি তা কী করে জানব? আমার কাছে এসেছে নাকি?

নাম জিজ্ঞেস করিসনি?

কোনো ভদ্রমহিলা বাড়িতে ঢুকতে-না-ঢুকতেই তার নাম জিজ্ঞেস করা যায় নাকি? ছোটোকাকা কোথায়?

মা-র মুখে একটা ম্লান ছায়া পড়ল। সিদ্ধার্থ আজকাল প্রায়ই মায়ের সঙ্গে চোটপাট করে কথা বলে। অকারণে। বিমর্ষভাবে বললেন, দ্যাখ, পাশের ঘরে বোধ হয়।

পাশের ঘরেও ছোটোকাকা নেই। এ-দেওয়াল থেকে ও-দেওয়াল জুড়ে একটা কালো শাড়ি শুকোচ্ছে। সুতপার শাড়ি। সুতপা তো দুপুর থেকেই বাড়ি নেই।

বাথরুমের দরজা বন্ধ। সিদ্ধার্থ বাথরুমের সামনে বন্ধ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললে, ছোটোকাকা, আপনাকে একজন ডাকতে এসেছেন। এক ভদ্রমহিলা।

কে? ভেতর থেকে একটা বিস্মিত গলা ভেসে এল।

নাম জানি না। এক ভদ্রমহিলা। গাড়ি করে এসেছেন।

ভদ্রমহিলা? একা এসেছেন?

হ্যাঁ।

বসতে বলো। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।

সিদ্ধার্থ আবার বারান্দায় ফিরে এল। ভদ্রমহিলা চেয়ারে সোজা হয়ে বসে আছেন রাশভারীভাবে। সিদ্ধার্থ বলল, একটু বসুন, উনি এক্ষুনি আসছেন।

মহিলাটি সিদ্ধার্থর দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলেন। কোনো কথা বললেন না। সিদ্ধার্থ অন্য একটা চেয়ারে বসতে গিয়েও ফের দেওয়ালের কাছে সরে গিয়ে আলোর সুইচ টিপল। এখনও ভালো করে সন্ধ্যা হয়নি, কিন্তু ভেতরের বারান্দাটা অন্ধকার-অন্ধকার হয়েছিল। আলো জ্বালার পরও ভদ্রমহিলা আর একবারও তাকালেন সিদ্ধার্থর দিকে। কাউকে একা বসিয়ে রাখা ঠিক শোভন নয় বলেই সিদ্ধার্থ এখানে একটু বসতে যাচ্ছিল। ছোটোকাকা না আসা পর্যন্ত। কিন্তু মহিলার কঠিন ঔদাসীন্যে সে একটু বিরক্তবোধ করল, মনে মনে বলল, দুর ছাই! আর কোনো কথা না-বলে সে দরজা খুলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

গলি পেরিয়ে এল বিবেকানন্দ রোডে। বাস আসতেই উঠে পড়ল। বেশ ভিড় ছিল বাসে, পেছনের হ্যাণ্ডেল ধরে ঝুলতে খুব অসুবিধে হল না, প্যান্টের পকেটের সিগারেটের প্যাকেটটা যাতে চেপটে না-যায়, সেইজন্য মাঝে মাঝে শরীর বাঁকিয়ে নিচ্ছিল। একটা লোক নামার সময় তার পা মাড়িয়ে দিতেই সিদ্ধার্থ চোয়াল শক্ত করল। দু-চার সেকেণ্ড অপেক্ষা করল, লোকটা তার দিকে ফিরে মাফ চায় কি না। ভারী চেহারার লোকটা তখন নেমে যাবার তোড়েই মত্ত, পা-দানি থেকে মাটিতে পা দেবার ঠিক আগেই সিদ্ধার্থ তার সামনে একখানা পা বাড়িয়ে দিল। লোকটা হুমড়ি খেতে খেতে সামলে নিলেও হাতের ব্যাগটা ছিটকে পড়েছে নোংরা জলে। বাস ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে।

শিয়ালদার একটু আগে কণ্ডাক্টর তার কাছে টিকিট চাইল। কণ্ডাক্টরটির খাকি জামা চিটচিটে ময়লা, মুখে সাত দিনের দাড়ি। চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। সিঁড়ি থেকে ঝুঁকে, টিকিটের গোছাটা প্রায় সিদ্ধার্থর নাকের সামনে এনে ফরর-ফরর আওয়াজ করে বলল, টিকিট, গেটের টিকিট!

সিদ্ধার্থ নাকের কাছে ওইরকম আওয়াজ পছন্দ করল না। ভুরু কুঁচকে বলল, দিচ্ছি।

দিচ্ছি কেন আবার! এক্ষুনি দিন না!

সিদ্ধার্থ লোকটির দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বুকপকেটে হাত দিল, হাত পুরোটা ঢুকছে না, বাসের গতি একটু কমে আসতেই হ্যাণ্ডেল থেকে হাত ছেড়ে সিদ্ধার্থ টুক করে নেমে পড়ল। চলন্ত গাড়ি থেকেই কণ্ডাক্টর মুখ ঝুঁকিয়ে বলল, বাপের গাড়ি পেয়েছ, অ্যাঁ? জামাকাপড় পরলেই ভদ্দরলোক হয় না!

সিদ্ধার্থ চোখ রূঢ় করে বলল, ভাগ শালা!

মির্জাপুর ধরে হেঁটে এসে সিদ্ধার্থ একটা বাড়িতে ঢুকল। এটা ডাক্তারি ছাত্রদের হস্টেল। শিবেন থাকে তিনতলায়। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে শোনা গেল, এখন খোলা হবে না। এখন ব্যস্ত আছি।

এই খোল, আমি সিদ্ধার্থ।

কোন সিদ্ধার্থ? দাশগুপ্ত না চৌধুরি?

খোল না! চালাকি করছিস কেন?

দরজা অল্প ফাঁক হল। দরজা খুলেছে আদিনাথ। খালি গা, শুধু একটা আণ্ডারওয়ার পরা। আদিনাথের সারা গা, বুক, ঊরুময় লোম। রহস্যময়ভাবে হেসে বলল, চট করে ঢুকে পড়!

শিবেন নেই?

আছে। ঢুকে পড় না।

সিদ্ধার্থ ঢুকতেই আদিনাথ আবার দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিল। শিবেন নিজের খাটে চিত হয়ে শুয়ে আছে। হাতে বই। রোগা লম্বা চেহারা শিবেনের, ইস্ত্রি-করা জামাপ্যান্ট, এমনকী জুতো পরে শুয়ে; বইয়ের দিকে স্থির দৃষ্টি, মুখখানা ম্লান, সিদ্ধার্থ ঢোকার পরেও চোখ তুলল না। সিদ্ধার্থ কাছে এসে বইখানা কেড়ে নিয়ে বলল, এই, এখনও শুয়ে আছিস কেন? বেরোবি না?

বই সরিয়ে নেবার পরও বুকের ওপর হাত দু-খানি পেতে রইল শিবেন! কথা বলল না। সিদ্ধার্থ হাঁটু দিয়ে শিবেনকে ধাক্কা দিয়ে বললে, কিরে? বেরোবি না? শুয়েই থাকবি?

শিবেন দুঃখিতভাবে তাকিয়ে বলল, ভালো লাগছে না। আদিনাথটার কান্ড দ্যাখ না! কিছুতেই কথা শুনবে না—কোনো মানে হয় না!

টেবিলটা থাকে দেওয়ালের কাছে; দুজনের একটাই টেবিল। আদিনাথ সেটাকে মাঝখানে টেনে এনে এখন নিজেদের খাটটা আড়াল করেছে। বিছানার ওপর ফিরে গেছে আদিনাথ, উবু হয়ে বসেছে, মুখে বেপরোয়া হাসি। সিদ্ধার্থ ওর খাটের দিকে এগিয়ে গেল।

আদিনাথের বিছানার ওপর একখানা খবরের কাগজ পাতা, তাতে অনেকগুলো খুচরো পয়সা। পাশে একটা রেডক্রসের টিনের কৌটো। কৌটোটা তুলে আদিনাথ আবার ঝাঁকাতেই ঝনঝন করে উঠল পয়সার শব্দ, ঝাঁটার কাঠি দিয়ে মুখের কাছটা খোঁচাতেই টপটপ করে পয়সা পড়তে লাগল। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল, এ কী করছিস?

আদিনাথ মুখ তুলে আওয়াজ না করে হাসল। বলে, সিকিগুলো বেশিরভাগই অচল। এত শালা পকেটে অচল সিকি নিয়ে ঘোরে—জানা ছিল না মাইরি!

পয়সা সব বার করে নিচ্ছিস?

সব নেব না—কিছু রাখব।

শিবেন উঠে এসেছে, তিক্ত গলায় বলল, আদিনাথটা শেষপর্যন্ত চুরি করাও শুরু করল!

আদিনাথ ফুঁসে উঠে বলল, চুরি মানে? আমি নিজে শালা সারাদিন রোদে রোদে ঘুরে পয়সা তুললুম।

সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল, কীসের পয়সা এগুলো?

আজ ফ্ল্যাগ-ডে ছিল, আদিনাথ রেডক্রসের বাক্স নিয়ে বেরিয়েছিল—এই কীর্তি করার জন্য। আমি ঘর পালটাব—আমি আর ওর সঙ্গে থাকব না!

যা না! কে তোকে ধরে রেখেছে!

তোর লজ্জা করে না? আবার চেঁচাচ্ছিস? যদি সবাইকে বলে দিই আমি?

যাকে ইচ্ছে বল গে যা! আই কেয়ার এ ড্যাম! আর কেউ আমার মতন বাক্স ভর্তি পয়সা তুলতে পেরেছে? আধ বাক্স পয়সা পেলেই রেডক্রস ধন্য হয়ে যাবে।

সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল, তুই আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলি নাকি রে আদি?

মোটেই না। বাক্স ভর্তি হয়ে যেতেই মাথায় এল। পয়সা বার করা এর থেকে কী সোজা! রেডক্রসের পয়সা তোলা হচ্ছে কী জন্য? মানুষকে সাহায্য করবার জন্য তো—আমার নিজেরও সাহায্য দরকার—আমার অ্যানাটমি বইখানা কোন শালা ঝেড়ে দিয়েছে, ডাক্তার সরকার রোজ খেঁচাচ্ছে, সেটা না কিনলে...

শিবেন বলল, তোর বই চুরি যায়নি, তুই নিজেই বিক্রি করেছিস।

আদিনাথ হঠাৎ অত্যন্ত রেগে গেল। এতক্ষণও সে রাগের সঙ্গে কথা বলছিল—কিন্তু গলার আওয়াজ ভরাট ছিল না—এবার রাগের সঙ্গে খানিকটা অভিমান যোগ দিল, শিবেনের দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে বলল, তুই আমাকে এই কথা বললি? আদিনাথ ঘোষাল আর যাই করুক— সে কখনো বই বিক্রি করে না! একটা ছোটোলোক সে নয়। আমার অ্যানাটমি বইখানা কে নিয়েছে তাও আমি জানি, ওই শালা বরুণ, হাতটান আছে ওর—ওকে আমি বিক্রি করতে দেখেছি—হাতেনাতেও ধরতে পারতুম—আমি নেহাত ভদ্দরলোক বলেই ওকে লজ্জা দিইনি।

ভদ্দরলোক হলে কেউ রেডক্রসের পয়সা চুরি করে না!

ফের চুরি-চুরি করবি না বলে দিচ্ছি। আমি যদি বিকেল পর্যন্ত না-ঘুরে দুপুরেই থেমে যেতুম—তাহলে এত পয়সা উঠত? রেডক্রস পেত বেশি পয়সা? আচ্ছা যা যা, চোর তো চোর—কে তোকে মিশতে বলেছে আমার সঙ্গে! সেবার পিকনিকের পর তুই-ই তো সেধে আমার সঙ্গে কথা বলতে এলি!

সিদ্ধার্থ একটু আলগা হয়ে দূরে দাঁড়িয়েছিল। ব্যাপারটাকে সে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছিল না। আদিনাথ জিনিসটা এইরকম প্রকাশ্যে না-করলেই পারত—তা বলে শিবেনেরও এ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করার কোনো মানে হয় না।

আদিনাথ বি.এস.-সি-তে ফার্স্ট ক্লাস অনার্স পেয়েছিল, ডাক্তারি ক্লাসেও খুব ভালো ছাত্র। বেশ বড়োলোকের ছেলে, কৃষ্ণনগরে ওর বাবা, দুই কাকা সবাই ডাক্তার—কিন্তু আদিনাথের মাথায় যখন যা চাপবে—সেটা করবেই।

আদিনাথ আর শিবেনের ঝগড়ার মাঝখানে এবার সিদ্ধার্থ এগিয়ে এসে বলল, ঠিক আছে, যেতে দে, যেতে দে। চল শিবু, বেরোবি না? ছ-টা বেজে গেছে।

শিবেন বলল, আমি সত্যিই বলছি, আদিনাথের সঙ্গে আর এক ঘরে থাকব না।

ঠিক আছে, থাকিস না। এখন চল।

শিবেন একটু বাথরুমে ঘুরে আসতে গেল। আদিনাথ রেডক্রসের টিনটা আলমারিতে ঢুকিয়ে চাবি বন্ধ করে এসে খুচরোগুলো গুনতে লাগল। গোনা শেষ করে আপন মনেই বলল, তেইশ টাকা ষাট—একদিনের পক্ষে হেভি ইনকাম!

উঠে জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে নিয়ে আদিনাথ বলল, চল, তোদের সঙ্গে আমিও বেরোব।

একজন সাইকেল আরোহী একটি বাচ্চা মেয়েকে ধাক্কা দিয়েছে—সেটা কেন্দ্র করে ছোটোখাটো ভিড় রাস্তায়। লোকটার মুখ কাঁচুমাচু। মেয়েটির বয়স দশ-এগারো, কিন্তু এরই মধ্যে বুক উঁচু হয়েছে। কখন ঝুপ করে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে—রাস্তায় চিটচিটে কাদা। সেইরকমই ময়লা অন্ধকার নিয়ে সন্ধ্যা নামছে।

শিবেন বলল, ওখানে কী হয়েছে, চল তো দেখি!

আদিনাথ বলল, লোকটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে—প্রায়ই এ পাড়ায় ঘুরতে দেখি—শালার যদি কোনো মতলব থাকে—

আদিনাথের কথা শুনে শিবেন থেমে গেল। বলল, থাক, দরকার নেই ওসব ঝামেলার মধ্যে গিয়ে, চল বিনু—

আদিনাথ তবু জোর করল, চল না, গিয়ে দেখি! যদি সত্যিই তেয়েঁটে হয়—তা হলে একটু হাতের সুখ করে নেব।

তোর ইচ্ছে হয় তুই যা, আমরা যাব না।

আদিনাথ সিদ্ধার্থর দিকে চেয়ে বলল, কিরে, যাবি না?

কী দরকার—!

আদিনাথ সঙ্গে সঙ্গে মত বদলে ফেলে বলল, ঠিক আছে,দরকার নেই—সত্যিই তো শালা, আমাদের কী?

হেঁটে ট্রামলাইন পর্যন্ত এসে এবার কোন দিকে যাবে ভাবছে শিবেন, আদিনাথ আবদারের ভঙ্গিতে বলল, ইস, আজ যা মাংস খেতে ইচ্ছে করছে! চল, আমিনিয়ায় গিয়ে দোপিঁয়াজা খাই! আমি খাওয়াব।

শিবেন বিদ্রূপের সুরে বলল, এই যে তুই বললি, তোর অ্যানাটমি বই কিনতে হবে?

আজ তো শনিবার, সোম-মঙ্গলবার কিনলেই হবে।

না, তোর ও-টাকায় আমরা খাব না।

ও-টাকা মানে? আমার আর নিজের টাকা নেই? কী এত রোয়াব দেখাচ্ছিস? তুই যাবি না তো যাবি না, আমি সিদ্ধার্থকে নিয়ে যাব।

না, বিনু আর আমি এক জায়গায় যাব—আমাদের যাবার কথা আছে।

এক জায়গায় মানে, কোথায়?

সে একটা জায়গায়, বললে তুই বুঝতে পারবি না।

সেখানে আমি যেতে পারি না বুঝি?

শিবেন একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, তোর সেখানে ভালো লাগবে না। তুই গিয়ে কী করবি? আমি আর বিনুই যাই—

খুব ভালো লাগবে! আমি এখন একা একা কী করব?

কেন ঝামেলা করছিস! তোর যেখানে খুশি যা না, আমি আর বিনু আলাদা যাব—সোজা কথা!

আদিনাথ আহত মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুঃখ কিংবা অভিমানে ওর ফরসা সুন্দর মুখখানা লাল হয়ে ওঠে। বিড়বিড় করে বলে, তোরা এখন ভবানীপুরে যাবি, জানি জানি, বিনুকে নিয়ে যেতে পারিস...আর আমাকে বাদ! ঠিক আছে, আমি শালা এখন পরেশের হস্টেলেই যাব, সেখানে শালা আমাকে সবাই খাতির করে—কারোর কথা শুনে সেখানে যাওয়া বন্ধ করব কেন?

শিবেন তেতো গলায় বলল, আদি, তুই আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস নাকি? তুই পরেশদের হস্টেলে যাবি—সেখানে জুয়ো খেলবি—তাতে আমার কী? আমি বারণ করেছিলুম—

যা, যা:!

আদিনাথ ছুটে গিয়ে শিয়ালদার দিকের চলন্ত ট্রামে উঠে গেল। সিদ্ধার্থ এবার শিবেনকে জিজ্ঞেস করল, সত্যিই এখন কোথাও যাব নাকি?

ছোটোমাসিদের বাড়িতে। যেতে বলেছিলেন আজ।

আদিকে নিয়ে গেলি না কেন? অত করে বলছিল?

ধ্যাত! কথায়-কথায় শালা-শালা বলে, কোনোদিন গুরুজনের সামনে বলে ফেলবে—আমার একটা প্রেস্টিজ থাকবে না! সেদিন ডাক্তার সরকারের সামনে পর্যন্ত বলে ফেলেছিল—

আদিনাথের কথা ভেবে সিদ্ধার্থ হাসে। পাগলাটে ছেলে, কথায়-কথায় রেগে যাচ্ছে, আবার মিনতি করছে, কোনো ঠিক নেই।

মনোহরপুকুরে শিবেনের ছোটোমাসির বাড়ি। ঝকঝকে নতুন বাড়ি, বছর খানেক মাত্র তৈরি হয়েছে, এখনও নতুন চুনসুরকির সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। দোতলার গোল বারান্দায় বসলে কখনো কখনো মনে হয়—সমস্ত বাড়িটাই এখনই জাহাজের মতন ভাসতে শুরু করবে।

শিবেনের ছোটোমেসোমশাই মিলিটারিতে কর্নেল ছিলেন, চিনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনি লাডাখ রণাঙ্গলে লড়েছেন, সম্প্রতি রিটায়ার করে ডিফেন্স প্রোডাকশনের হোমরা-চোমরা হয়েছেন। কানপুর থেকে বদলি হয়ে এসে তিনি এখানকার গান অ্যাণ্ড শেল ফ্যাক্টরির জয়েন্ট ডাইরেক্টর।

বাস থেকে নেমে মনোহরপুকুর রোড ধরে হেঁটে আসছিল শিবেন আর সিদ্ধার্থ, দূর থেকেই দেখতে পেল দোতলার বারান্দায় স্থির ঋজুভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কর্নেল বিশ্বদেব সুর, মুখে পাইপ। সেইদিকে তাকিয়ে শিবেন বলল, বিনু, মেসোমশাইকে তোর চাকরির জন্য বলব? উনি ইচ্ছে করলেই তোকে অ্যাপ্রেন্টিস করে ঢুকিয়ে দিতে পারেন!

সিদ্ধার্থ তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না, না, ওঁকে বলতে হবে না।

কেন? তুই চাকরি খুঁজছিস তো। কোথাও পেলি-টেলি?

পেয়ে যাব কোথাও!

তোকে এত করে ডাক্তারিতে ভর্তি হতে বললুম! শুধু-শুধু একটা বছর নষ্ট করলি। এ বছর ভর্তি হয়ে যা না!

পাঁচ-ছ-বছর পড়ার খরচ চালাব—আমার তো বাপের জমিদারি নেই!

এম.এস.-সি-তেই বা ভর্তি হলি না কেন?

তোকে আসল কথাটা বলিনি আগে, আমি এম.এস.-সি-তে ভর্তি হবার চান্স পাইনি, লিস্টে আমার নাম ওঠেনি। দ্যাখ, দ্যাখ—

সিদ্ধার্থ শিবেনকে কনুই দিয়ে একটা খোঁচা মারল। পাশ দিয়ে দুটি যুবতী চলে গেল—ওদের চেয়ে দু-এক বছরের বড়োই হবে—দু-জনেই বেশ স্বাস্থ্যবতী, এক হালকা সুগন্ধ বয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। সিদ্ধার্থ বলল, সাউথ ক্যালকাটায় এলে বেশ ভালো ভালো মেয়ে দেখতে পাওয়া যায়। এইজন্যই আসতে ইচ্ছে করে! কী বুক দেখেছিস?

শিবেন বিজ্ঞভাবে জানাল, সব আসল নয়, নকল।

তোকে বলেছে! তুই হাত দিয়ে দেখেছিস?

হাত দিয়ে দেখতে হয় না, একদিন বাসে একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল, লোহার মতন শক্ত কী যে একটা—

ভাগ! আমারও তো প্রায়ই ধাক্কা লাগে, দু-একবার ইচ্ছে করেও একটু, বুঝলি না, চান্স পেলে, কিন্তু আমি তো সব্বারই দেখেছি নরম-নরম—তোর লাকটাই খারাপ।

তুই ইচ্ছে করে ধাক্কা দিস? একদিন একটা ওইরকম লোককে দেখলুম, সবাই মিলে কী মার মারল—

যা যা, আমাকে মারবে—সেরকম লোক এখনও জন্মায়নি!

বাইরের ঘরটা ফাঁকা। সিঁড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন কর্নেল সুরের মা। ওদের দিকে বৃদ্ধা চোখ কুঁচকে চেনার চেষ্টায় তাকিয়ে বললেন, ও কে? ও, আমাদের ডাক্তারসাহেব বুঝি? ডাক্তারসাহেব, কতদিন আসোনি ইদিকে—আমি বাতের ব্যথায় মরছি!

শিবেন নীচু হয়ে বৃদ্ধার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল, দেখাদেখি সিদ্ধার্থও ঝুপ করে প্রণাম সেরে নিল। শিবেন বলল, সে কী দিদিভাই, আমি তো গত শুক্কুরবারেও এসেছিলুম, এক সপ্তাহ মোটে—

ফোকলা মুখে হেসে দিদিভাই বললেন, এক সপ্তাহ তোমার মোটে হল? তুমি যে আমাকে বিয়ে করবে বলেছিলে—একটা গোটা সপ্তাহ তুমি আমায় না দেখে থাকতে পারলে? বুঝেছি বেতো রুগি এই বুড়িকে তোমার আর পছন্দ নয়! আর কাউকে পেয়েছ বুঝি?

না দিদিভাই, এমন সুন্দর বউ আর আমি পাব কোথায়?

ও সব শুধু মুখের কথা! ইটি কে? তোমার বন্ধু? ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, একে তো দেখেছি—যাও ভাই, ওপরে গিয়ে বসো—

শিবেন ওর কর্নেল মেসোমশাইকে একটু ভয়-ভয় করে, পারতপক্ষে সামনে যায় না। তিনি এখন গোল বারান্দায় আছেন, সুতরাং শিবেন এখন সেখানে যাবে না। বাড়িটা একটু ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে। ছোটোমাসি থাকলে গলার আওয়াজ পাওয়া যেত—ছোটোমাসির গলার আওয়াজ খুব জোরালো।

দোতলায় উঠেই সিঁড়ির ডানদিকের ঘরটায় কথাবার্তা শোনা গেল। শিবেন ঢুকল সেই ঘরে। সিদ্ধার্থ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। শিবেন ঢুকে বলল, এই টুলটুল, তুই এখনও বেরোসনি? ছোটোমাসি কোথায়? বিনু, তুই বাইরে দাঁড়িয়ে রইলি কেন, ভেতরে আয়!

টুলটুল ছাড়াও আরও দুটি মেয়ে বসেছিল ঘরে, ওরা টুলটুলের কলেজের বন্ধু। অচেনা দুটি মেয়েকে দেখে সিদ্ধার্থ একটু লজ্জায় জড়সড় হয়ে গেল। শিবেন অতটা লজ্জা পেল না, মেয়ে দুটি অচেনা হলেও বাড়িটা তো তার নিজের বাড়ির মতনই চেনা।

শিবেন টুলটুলকে বলল, তোরা গল্প করছিস, আমরা তাহলে অন্য ঘরে বসি। ছোটোমাসি নেই বুঝি বাড়িতে?

টুলটুল বলল, মা গড়িয়াহাটে মার্কেটিং করতে গেছে। তোমরা বসো না এ-ঘরেই, আলাপ করিয়ে দিচ্ছি, এরা আমার বন্ধু—

মেয়ে দুটির নাম মালবিকা আর কেয়া। মালবিকা তার পায়ের জুতো, শাড়ির রং, আংটির পাথর, হাতব্যাগ, টিপ সব মিলিয়ে পরেছে। চুল বাঁধার ধরন দেখলেই বোঝা যায়, সে এক-একদিন এক-একরকমভাবে চুল বাঁধে। নিজের রূপ সম্পর্কে মেয়েটি সজাগ—মুখে সেই হালকা অহংকারের ছায়া পড়েছে। কেয়া মেয়েটি খানিকটা এলোমেলো স্বভাবের, পোশাকের পরিপাট্য নেই, কিন্তু মুখখানি তার ভারি সুন্দর—বড়ো-বড়ো চোখ দুটিতে সরল সৌন্দর্য। তবে এরা কেউই টুলটুলের সমান সুন্দরী নয়, টুলটুলের প্রতিটি অঙ্গ নিখুঁত পরিমাপের, লাল আঙুলের ডগা কিংবা শুধু একটা কানের লতি দেখেই বলা যায়, টুলটুল তুলনাহীন—কিন্তু টুলটুল নিজের রূপের কথা জানে না। টুলটুলের ভালো নাম অদিতি। সিদ্ধার্থ মেয়ে তিনটির দিকে স্পষ্টভাবে চাইতে পারল না। একটু লাজুকভাবে আড়ষ্ট হয়ে রইল। মেয়ে তিনটির কোনো আড়ষ্টতা নেই।

শিবেন বলল, টুলটুল, তুই আজ বেড়াতে যাসনি?

যেতুম তো। মা বেরিয়ে গেলেন, আমাকে থাকতে বললেন। আসার সময় হয়ে গেছে, আসবেন এক্ষুনি।

তোর বন্ধুদের চা-টা খাইয়েছিস তো?

ওরা সন্ধ্যাবেলা চা খায় না। তোমার বন্ধুকে খাওয়াতে হবে বুঝি?

বা:, হবে না?

সিদ্ধার্থ তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না না, আমার জন্য চা তৈরি করবার দরকার নেই।

টুলটুল হেসে বলল, চা-টা তো আর আমি তৈরি করব না, বাবুর্চি বানাবে—আমি চা-টা বানাতে পারি না। কিংবা এক কাজ করব, শরবত খাবেন? শরবত বানানো খুব সোজা, এক গ্লাস জলে একটা ট্যাবলেট ফেলে দিলেই—

না, না, আমি এখন শরবতও খাব না।

খাবেন না! যাক, তাহলে আর আমার দায়িত্ব নেই।

টুলটুলরা অনেকদিন কানপুর আর দিল্লিতে কাটিয়েছে—ওর বাংলা কথায় একটু পশ্চিমি টান আছে। তৈরিকে বলে তৈয়ার, বন্ধুকে বলে বোন্ধু, সিদ্ধার্থর শুনতে বেশ মজা লাগছিল। মালবিকা সব ক-টা স-কেই তালব্য-শ করে বলে, এইমাত্র সে বলল, মাশিমা কখন আশবেন রে? আমি ভাবছি চলেই যাই—মনে হচ্ছে বৃশটি নামবে! কেয়া মেয়েটির উচ্চারণ খুব স্পষ্ট ও সাবলীল, সে বলল, অদিতি, তুই যে আজ আমাকে কয়েকটা গল্পের বই দিবি বলেছিলি? কোথায় বই?

টুলটুল বলল, সেই মুশকিল হয়েছে রে! বইয়ের আলমারির চাবিটা...

কেয়া খিলখিল করে হেসে উঠল মাঝপথে। হাসির সময় কেয়ার সমস্ত শরীরটা কাঁপে, যেন মনে হয়, বুকের মধ্যে তার সব সময়েই অনেক হাসি জমা আছে—একটুকুতেই সব বেরিয়ে আসতে চায়। টুলটুল অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, হাসলি কেন?

কেয়া হাসি চাপা দেবার চেষ্টা করে বলল, না, কিছু না, এমনিই, হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল। বইয়ের আলমারিতে চাপা দিয়ে রাখিস কেন?

কী করব, বাপি যে চাবি দিয়ে রাখতে বলেন! নইলে বড্ড হারিয়ে যায়—

আমি একটা বইতে পড়েছিলুম—যদি কেউ বলে, বইয়ের আলমারির চাবি হারিয়ে গেছে, তাহলে বুঝতে হবে—তার দেবার ইচ্ছে নেই।

সরল মুখে প্রকৃত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে টুলটুল বলে, যা:, তা আবার হয় নাকি? বই কেন দেব না? বই তো পড়ার জন্যই!

চাবি হারিয়ে ফেলেছিস বুঝি?

টুলটুল এবার লজ্জা পায়। বলে, বইয়ের আলমারির চাবি হারাইনি, সেটা ঠিক আছে জানি, সেটা থাকে আমার ওই সুটকেসে—কিন্তু কাল থেকে সুটকেসের চাবি পাচ্ছি না। সেটা হারিয়েছে ঠিক—

তারপর টুলটুল শিবেনের দিকে ফিরে বলল, ছোড়দা, তুমি এই তালাটা ভেঙে দাও না!

শিবেন বলল, শুধু শুধু তালা ভাঙবি কেন? খুঁজে দ্যাখ, চাবিটা ঠিক পেয়ে যাবি।

না, পাব না। সারা বাড়ি খুঁজেছি। সকাল থেকে কত চেষ্টা করলুম তালা ভাঙার, তুমি দ্যাখোনা!

টুলটুল যেটাকে সুটকেস বলছে সেটা আসলে একটা বিরাট বাক্স। চামড়ার তৈরি সিন্দুক, বলা যায়। কালো রঙের চৌকো বাক্সটা—কোনায়-কোনায় ইস্পাত দিয়ে বাঁধানো—একজন ছোটোখাটো মানুষ তার ওপর অনায়াসে শুয়ে থাকতে পারে। সেটার মাঝখানে একটা বড়ো তালা ঝুলছে। শিবেন এগিয়ে গিয়ে বিশেষজ্ঞের মতন তালাটাকে নেড়েচেড়ে দেখল। বলল, তালাটা ঠিক স্টিলের মনে হচ্ছে না—ভাঙা শক্ত হবে না। একটা লোহার রড-টড আছে?

টুলটুল বলল, রড কোথায় পাব?

তাহলে একটা সাঁড়াশি আছে কিনা দ্যাখ?

সাঁড়াশি? সাঁড়াশি কী জিনিস?

টুলটুলের কথা শুনে ঘরসুদ্ধু সবাই হেসে উঠল। শিবেন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, এ-মেয়েকে আমি কী করে বোঝাব! কী জানি বাবা তোদের হিন্দিতে একে কী বলে, এই যে এইরকম-ভাবে জিনিস ধরে যা দিয়ে!

অপ্রস্তুত ভাব কাটাবার জন্য টুলটুল তাড়াতাড়ি বলে উঠল, একটা প্লাস এনে দেব? প্লাস দিয়ে কী হবে? বাপির টুলবক্সে আছে বোধহয়!

প্লাস দিয়ে শক্ত করে তালাটাকে চেপে ধরে শিবেন জোরে চাপ দিল। ঘরের সবাই উদগ্রীব হয়ে একটা দারুণ প্রত্যাশার ভঙ্গিতে চেয়ে আছে শিবেনের দিকে। টুলটুল পাশে ঝুঁকে রয়েছে। শিবেন সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতটা ঘোরাতে চাইল দাঁতে দাঁত টিপে, ভুরু কুঁচকে এল তার, তবু পারল না।

ছেড়ে দিয়ে বলল, উফ, হবে না। চাবিটা খুঁজে দ্যাখ, পেয়ে যাবি ঠিক।

হতাশভাবে টুলটুল বলল, তুমি পারলে না, তাই বলো!

আমার দ্বারা হবে না। বিনু, তুই একটু দ্যাখ তো!

টুলটুল সিদ্ধার্থর দিকে চেয়ে বলল, আপনি একটু দেখুন না!—

তার কথার সুরেই বোঝা যায়, সে যেন মনে-মনে বিশ্বাস করছে সিদ্ধার্থ পারবে।

কেয়া বলে উঠল, এই অদিতি, তালা ভাঙার কিন্তু দরকার ছিল না। বই আমার আজ না নিলেও চলবে।

সেজন্যে নয়! চাবি আর পাব না। তালাটা ভাঙতে হবে।

কেন, চাবিওয়ালাকে ডেকে খুলিয়ে নিস!

টুলটুলের মুখ দেখলে মনে হয়, চাবিওয়ালার কথাও সে কখনো শোনেনি। কিন্তু ওরা আবার হাসবে ভেবে—সে কথা উচ্চারণ করল না। বলল, ধ্যাততেরিকা, ওসব আবার কে করে! পুরোনো তালা ভেঙে ফেলাই তো ভালো! আপনি দেখুন না, বিনুদা—

শিবেনের চেয়ে সিদ্ধার্থর চেহারা অনেক ভালো। তার মাংসপেশিগুলো অনেক সজাগ। হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষার পর বেশ কিছুদিন সে ব্যায়াম করেছিল। এগিয়ে গিয়ে সে শক্ত হাতে প্লাসটা চেপে ধরল। মোচড় দিল। বেশ শক্ত তালাটা, সিদ্ধার্থের চোয়াল শক্ত হল, হাতের পেশি ফুলে উঠল, কিন্তু সে বুঝতে পারল সে পারবে।

হঠাৎ তার খুব লজ্জা করতে লাগল। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে—নি:শব্দে; টুলটুল তার এত কাছে যে টুলটুলের নিশ্বাস এসে তার গায়ে লাগছে—ইস, এরা সবাই বোধহয় ভাবছে, সে একটা দারুণ শক্তির পরিচয় দিতে চাইছে। মোটেই না, এটা তো কিছুই না! তা ছাড়া তার আরও লজ্জা করতে লাগল, কারণ শিবেন পারেনি—এখন তালাটা ভেঙে সে যেন বাহাদুরি নেবার চেষ্টা করছে—যদি ওরা এ-কথা ভাবে? মোটেই আমি সে-কথা ভাবিনি! কিন্তু এখন আর ফেরাও যায় না, এখন আর সে ছাড়তেও পারবে না, টুলটুলের নিশ্বাস, কেয়ার দৃষ্টি, মালবিকার প্রসাধনের ঘ্রাণ—এবং শিবেনের মুখ দেখলেও মনে হয়— সে-ও চাইছে—এই মেয়েদের সামনে তার বন্ধু অন্তত তালাটা ভাঙতে পারুক! শেষ শক্তিতে সে একটা প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিতেই মট করে তালাটা ভেঙে গেল।

কেউ হাততালি দিল না, কেউ তাকে অভিনন্দন জানাল না, সবাই যেন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সে তালাটা ভাঙতে না পারলে যেন সবারই একটা লজ্জার ব্যাপার হত। প্লাসটা নামিয়ে রেখে সিদ্ধার্থ বাক্সর ডালাটা খুলে উঁচু করল। সঙ্গে সঙ্গে সে আবার লজ্জা পেল। তালাটা ভাঙার পরই তার সরে যাওয়া উচিত ছিল। এর আগে সে আর কোনোদিন কখনো কোনো অনাত্মীয় মেয়ের বাক্সতে উঁকি দিয়ে দেখেনি। টুলটুলের বাক্সটা একেবারে অগোছালো, অত বড়ো বাক্সের মধ্যে নেই এমন জিনিস নেই। নানা রঙের চুলের ফিতে, খালি সেন্টের শিশি, একটা কাশ্মীরি হাতবাক্স, পা-ভাঙা মেম পুতুল, একতাড়া চিঠি, ছবির গুচ্ছ, অনেকগুলো রঙের পেনসিল, ছেঁড়া ব্রেসিয়ার, দু-বাণ্ডিল তুলো, একসেট সালোয়ার কামিজ—অর্থাৎ প্রায় শৈশব থেকে এ পর্যন্ত টুলটুলের জীবনের যাবতীয় সঞ্চয় ওই বাক্সের মধ্যে। বাক্সটা যেন একটা ইতিহাস-বই। অমন সুন্দর মেয়ে টুলটুল, তার নিজস্ব বাক্স যে এমন অগোছালো হবে—সিদ্ধার্থ তা আগে ভাবতেই পারেনি। তার কাছে এ একটা বিস্ময়, সেজন্যই জিনিসগুলো সে খুঁটিয়ে দেখছিল, কিন্তু টুলটুল তাকে কোমল হাতের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলল, এই, কেন আমার বাক্স দেখছেন? না, না, আমি কাউকে দেখতে দিই না—

এই সময় সিঁড়িতে ছোটোমাসির গলার স্বর শোনা গেল। দরজার কাছে এসে ছোটোমাসি দাঁড়িয়ে বললেন, শিবু এসেছিস? এতদিনে আসার সময় হল? তোর মাকে চিঠি লিখিস না কেন? মেজদি লিখেছেন, শিবুটা কোনো চিঠি দেয় না—

শিবেন অবাক হয়ে বলল, সে কী ছোটোমাসি? আমি তো গত সপ্তাহেও এখানে এসেছিলাম! মাকে তো মাসের গোড়াতেই চিঠি লিখেছি!

তোরা আজকালকার ছেলেরা কী হলি রে, অ্যাঁ? মাসের গোড়ায় চিঠি লিখেছিস? আজ মাসের আঠাশ তারিখ! ওখানে কে? সিদ্ধার্থ? কী? তোমার কী খবর? সেই যে একবার এসেছিলে তিন-চার মাস আগে—আর বুঝি মনে পড়েনি আমাকে!

ছোটোমাসি কথা বলতেই ভালোবাসেন, উত্তর শুনতে চান না। দশ বছরের ছেলে ডোডোকে সঙ্গে নিয়ে বাজার করতে গিয়েছিলেন, তাঁর নিজের দু-হাতে এবং ডোডোর দু-হাত ভর্তি জিনিসপত্র, তা সত্ত্বেও তিনি বললেন, শিবু, যা তো, গাড়িতে কয়েকটা প্যাকেট আছে, ওপরে নিয়ে আয়—কেয়া, মালবিকা, তোমরা একটু বোসো, ভালো সন্দেশ এনেছি—খেয়ে যাবে, ডোডো প্যাকেটটা ভালো করে ধর, ফেলবি, ফেলবি, এই টুলটুল, নে না ওটা ওর হাত থেকে! ছোটোমাসি কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সারা বাড়িটাকে মুখরিত করে তুললেন। একমাত্র কর্নেল মেসোমশাইয়েরই গলার আওয়াজ একেবারে পাওয়া যায় না। তিনি তখনও পাইপ মুখে গোল বারান্দায় রেলিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

মালবিকাদের গাড়ির ড্রাইভার ঠায় বসে আছে গাড়িতে। অন্তত ঘণ্টা দুয়েক এসেছে মালবিকা, ড্রাইভার বোধ হয় একবারও নেমে যায়নি। মালবিকাকে বেরোতে দেখে অবনত মস্তকে দরজা খুলে দিল। মালবিকা বলল, আপনাদের কোথায় পৌঁছে দেব?

ওদের সবার সঙ্গে টুলটুলও এসেছিল। সে বলল, কেন, তুই যাবি না? চল, একটু বেড়িয়ে আসি। ছোড়দা, তুমি সিনেমা দেখাও না একটা।

মালবিকা বলল, এখন সাতটা বাজে। এখন কী সিনেমা?

টুলটুল বলল, কেন? নাইট শো? আজ শনিবার, কাল তো কলেজ নেই।

মালবিকা যেন এরকম অসম্ভব কথা কোথাও শোনেনি, এই ভঙ্গিতে কেয়ার দিকে ফিরে বলল, টুলটুলটা একটা কী যেন! নাইট শো-তে সিনেমা দেখব! অদ্ভুত!

কেয়া উত্তর না দিয়ে চাপা হাসি হাসল। শেষ পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে লেকে কয়েকটা চক্কর দিতে রাজি হল মালবিকা।

পিছনের সিটে চারজনের বেশি জায়গা হবে না, একথা বুঝে নিয়েই সিদ্ধার্থ নিজে থেকেই ড্রাইভারের পাশে সামনের সিটে বসল। শিবেন বসল পেছনেই। একটু বাদেই টুলটুল ইংরেজিতে গান ধরল। বেশ সুরেলা গলা তার। সিদ্ধার্থ ইংরেজি গানের কথা একেবারে বুঝতে পারে না—সব ইংরেজি গানই তার মনে হয় বেড়ালডাক। এতক্ষণ টুলটুলকে তার খুব ভালো লাগছিল, হঠাৎ তার মনে হল, এইসব বড়োলোকের মেয়েরা বাঙালি থাকে না—একেবারে ট্যাঁশ হয়ে যায়! না হয় কানপুর-দিল্লিতেই কাটিয়েছে, তা বলে রান্নার ঠাকুরকে বলবে বাবুর্চি! যত সব!

মালবিকার বাড়ি লেকের খুব কাছেই, সাদার্ন অ্যাভিনিউতে। সেখানেই ওরা সবাই নেমে গেল, মালবিকা ঢুকে গেল বাড়িতে। শিবেন তখন বলল, তাহলে তো কেয়াকে আমাদেরই পৌঁছে দিতে হয়! চল, হাঁটতে হাঁটতে ওকে পৌঁছে দিয়ে আসি।

কেয়া রহস্যময়ভাবে হেসে বলল, আমাকে হাঁটতে-হাঁটতে বাড়ি পৌঁছে দেবেন! কী আনন্দ হচ্ছে যে শুনে! বলুন তো, আমার বাড়ি কোথায়?

শিবেন বলল, কোথায় আর হবে! আচ্ছা, আমি শুনে বলে দিচ্ছি, আপনার বাড়ি—হয় নিউ আলিপুর অথবা সি. আই. টি-এর মাঝামাঝি...

কেয়া আবার ফুলে-ফুলে হাসতে লাগল। বলল, পায়ে হেঁটে পৌঁছে দিতে হবে কিন্তু, মনে থাকে যেন? চলুন তাহলে, আমার বাড়ি মানিকতলায়।

সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে বলল, মানিকতলায়? তাহলে তো আমার বাড়ির কাছাকাছি। আমি থাকি বিবেকানন্দ রোডে।

বিবেকানন্দ রোড? কোন জায়গায়?

টুলটুলদের বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে এসে আগে টুলটুলকে পৌঁছে দিল, তারপর দোতলা বাসের ওপরে উঠল ওরা তিনজন। মেয়েদের সিটে কেয়া জায়গা পেয়ে গেল। তার পাশে বসল শিবেন। সিদ্ধার্থকে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। বেশ ভিড়। সিদ্ধার্থর হঠাৎ মনে হল, টিকিট কে কাটবে? পঁচিশ পয়সা করে ভাড়া এক-একজনের, কণ্ডাক্টর নীচে দাঁড়িয়ে আছে—উঠে এসে আগে তো সিদ্ধার্থর কাছেই—কিন্তু শিবু সাত-তাড়াতাড়ি গিয়ে মেয়েটার পাশে বসল কেন, ওরই ভাড়া দেওয়া উচিত! সিদ্ধার্থ উশখুশ করতে লাগল, একেবারে সামনের দিকে একটা জায়গা খালি হতেই অন্যদের ঠেলে সেখানে গিয়ে বসে পড়ল।

হ্যারিসন রোডে নেমে গেল শিবেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেয়ার দিকে হাত নাড়ল, বাস ছেড়ে যাবার পর সিদ্ধার্থকে কী যেন চেঁচিয়ে বলল, ও বুঝতে পারল না। কেয়ার পাশের জায়গাটা তখনও খালি আছে, কেয়া নিজেই সিদ্ধার্থকে ডেকে বলল, এখানে এসে বসুন না!

তখনও জায়গাটা শিবেনের দেহের তাপে গরম হয়ে আছে। সিদ্ধার্থ সন্তর্পণে বসল, কেয়ার বাহুর সঙ্গে ছোঁয়া লাগতেই আর একটু সরে এল। কেয়ার কোলের ওপর দু-খানা ইংরেজি বই পড়ে আছে। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল, আপনি বুঝি খুব বই পড়েন?

কেয়া বলল, খুব। গল্পের বই পড়তেই বেশি ভালো লাগে। আপনি পড়েন না?

আমি তো সায়েন্সের স্টুডেন্ট ছিলাম, ওসব বই-টই পড়া তেমন অভ্যেস নেই। মাঝে মাঝে বাংলা গল্পের বই এক-আধটা পড়ি, কিন্তু ইংরেজি! বাবা:!

কেন, ইংরেজিতে দোষ কী? এই তো এটা এডনা ও’ব্রায়ানের বই, খুব ভালো লেখেন—পড়ে দেখবেন, কী ফ্র্যাংকভাবে সব কথা—

না:, ধৈর্য থাকবে না! ইংরিজি বই দু-চার পাতা পড়লেই হাঁপিয়ে যাই—আপনারা সাহেবি ইস্কুলে পড়েছেন। আপনাদের অভ্যেস আছে।

কী করে জানলেন সাহেবি ইস্কুলে পড়েছি?

চেহারা দেখলেই বোঝা যায়!

ভ্যাট! আমার চেহারা দেখলে কী বোঝা যায়? আপনি তো আমার দিকে এখনও ভালো করে তাকিয়েই দেখেননি।

বোকার মতন সিদ্ধার্থ একবার সত্যিই ভালো করে কেয়ার দিকে তাকিয়ে দেখল। আগে লক্ষ করেনি, এবার নজরে পড়ল কেয়ার ঠিক থুতনির মাঝখানে একটা কাটা দাগ। আর তার ভুরু দুটো খুব কালো আর গভীর। কাজল দিয়ে এঁকেছে নাকি? সিদ্ধার্থ দেখবার চেষ্টা করল।

বিবেকানন্দ রোড ধরে হাঁটতে-হাঁটতে সিদ্ধার্থদের বাড়ির গলি পেরিয়ে গেল। সিদ্ধার্থ সেদিকে হাত দেখিয়ে বলল, আমার বাড়ি এইখানে—একদিন আসবেন, আমার বোনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। আমার বোন সুতপা—আপনার বয়সি হবে।

কোথায় পড়ে আপনার বোন?

পড়ে না, চাকরি করে।

এর মধ্যেই চাকরি করে? বা:, বেশ মজা তো, কোথায় চাকরি করে?

সিদ্ধার্থ একটু গম্ভীর হয়ে যায়। এ সম্পর্কে আর কথা বলতে চায় না। প্রসঙ্গ বদলে বলে, চলুন, আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি—

না, না। আমাকে আর পৌঁছে দিতে হবে না, এই তো কাছে...

চলুন না, আপনাদের বাড়িটা দেখে আসি! নিশ্চয়ই বিরাট বড়ো বাড়ি আপনাদের?

কেন? তা-ও কি আমার চেহারা দেখে মনে হয়?

এ তো খুব সহজ কথা। বড়োলোকের মেয়েরাই তো লরেটো কলেজে পড়ে।

কেয়া হাসতে-হাসতে বলল, হ্যাঁ, একটা বিরাট বড়ো বাড়িতেই আমরা থাকি। কিন্তু তার একটা ফ্ল্যাটই শুধু আমাদের। ওই তো ওই বাড়িটা—

কেয়া বাড়ির মধ্যে ঢুকে যাবার পর সিদ্ধার্থ বুঝতে পারল, এতক্ষণ কেয়া পাশে ছিল বলে সে একটা সুন্দর গন্ধ পাচ্ছিল। এখন আর সে গন্ধটা নেই।







ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে সিদ্ধার্থ বাড়ি ফিরেছিল। সাড়ে আটটা বেজে গেছে। ন-টার মধ্যে বাড়ি না ফিরলে ছোটোকাকা খুব রাগ করেন। কিন্তু টুনু এখনও বাড়ি ফেরেনি। মায়ের ঘর পেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, চোখ পড়ল মায়ের ঘরে খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে আছে সুতপা, মুখখানা কালো, মা আর ছোটোকাকা দুজনেই গম্ভীর। আবার কিছু হয়েছে আজ! একটা না একটা তো লেগেই আছে! তপুটাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিলেই হয়। ভালো লাগে না এসব ঝঞ্ঝাট! ও ঘরে ঢুকল না, সিদ্ধার্থ নিজের ঘরেই চলে এল। মনে পড়ল, আজ এক ভদ্রমহিলা এসেছিলেন ছোটোকাকার সঙ্গে দেখা করতে। অহংকারে তো ভদ্রমহিলা একেবারে মটমট করছিলেন, ভারি তো একখানা পুরোনো ফিয়াট গাড়ি! টুলটুলের মা—শিবেনের ছোটোমাসির তো একটুও অহংকার নেই!

অন্যমনস্কভাবে জামাটা খুলতেই বুকপকেট থেকে খুচরো পয়সাগুলো ছড়িয়ে পড়ে গেল। নীচু হয়ে সেগুলো কুড়োতে যেতেই দেখতে পেল খাটের তলায় একগাদা পোস্টার রাখা। লাল কালিতে বড়ো বড়ো হরফে লেখা। টুনুর কান্ড। টেনে নিয়ে সেগুলো পড়ল—প্রত্যেকটাতে গরম-গরম কথা লেখা, ‘ভোটের তামাশা নয়, সশস্ত্র বিপ্লবই একমাত্র পথ’, ‘মার্কিন দালাল আর পুঁজিপতি সরকারকে চরম শিক্ষা দেবে কে? শ্রমিকের হাতের রাইফেল!’ ‘ভিয়েতনাম লাল সেলাম!’ কাল রাত জেগে-জেগে টুনু ওগুলোই লিখছিল তাহলে! টুনুর হাতের লেখাটা সত্যিই ভালো। তবে, এবার ও বি. এস.-সি. পাশ করতে পারবে না।

খাটের নীচে সিদ্ধার্থের সুটকেসটার মুখ খোলা। টুনুই খুলেছিল নিশ্চয়ই। হঠাৎ সিদ্ধার্থর রাগ হয়ে গেল। টুনু বড্ড বাড়াবাড়ি আরম্ভ করেছে—কত বার বারণ করেছি ওকে—সুটকেসে কত জরুরি কাগজপত্র আছে! তাড়াতাড়ি সুটকেসটা খুলে একেবারে নীচে পাতা খবরের কাগজটা উলটে দেখল। ছবিগুলো ঠিকই আছে। কলেজে পড়ার সময় একটা ছেলে সিদ্ধার্থকে এই ছবিগুলো দেখতে দিয়েছিল; নারী-পুরুষের গোপন ব্যাপারের ছবি—এগুলো আর ফেরত দেওয়া হয়নি। কোনো-কোনোদিন মাঝরাত্রে এ ছবিগুলো সিদ্ধার্থর এখনও কাজে লাগে। কিন্তু কোনোদিন টুনুর চোখে পড়ে যাবে—এবার এগুলো কোথাও সরাতে হবে। আদিনাথকে দিলে লুফে নেবে। কিংবা টুনুটাকে যদি অন্য ঘরে সরানো যেত! টুনু কিছুতেই ছোটোকাকার সঙ্গে শোবে না। আর তো ঘরও নেই!

সিদ্ধার্থর বাবা মারা যাবার পর দেড় বছরের মধ্যেই বাড়ি পার্টিশান হয়ে গেছে! তার কিছুদিন আগে সিদ্ধার্থর মা বিনতাই ছিলেন বাড়ির কর্তি, কবে-কবে মাংস রান্না হবে কিংবা বাড়ির ছেলেরা মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে সার্কাস দেখতে যাবে কি না—সবই তিনি ঠিক করতেন। সিদ্ধার্থর বাবা শিবনাথ ছিলেন ঠাণ্ডা ধরনের মানুষ। তিনি মারা যাবার পর বিনতার জায়েরা আর তাঁর অধীনে থাকতে চাননি। সিদ্ধার্থর দুই কাকাই আলাদা হয়ে গেছেন, মেজোকাকা এ-বাড়িতে তাঁর অংশ বিক্রি করে দিয়ে চলে গেছেন টালিগঞ্জে, বড়োকাকা সে অংশ কিনে নিয়েছেন। বাবা যখন মারা যান, তখন সিদ্ধার্থের বয়স সতেরো, সুতপার ষোলো, টুনুর চৌদ্দ। মা খুব অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন। ছোটোকাকা বিয়ে করেননি, আটচল্লিশ বছর বয়স হয়ে গেছে—আর বিয়ে করবেনও না—তিনি ওদের সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন—তিনি ওদের সঙ্গেই আছেন। সিদ্ধার্থদের ভাগে পড়েছে সাড়ে-তিনখানা ঘর, প্যাসেজের একটা অংশ। সিদ্ধার্থের শুধু দুঃখ হয়, দোতালার দিকের যে-ঘরটায় সিদ্ধার্থ তার সম্পূর্ণ বাল্যকালটা কাটিয়েছে, যে-ঘরে দেওয়ালের প্রতিটি দাগ তার চেনা, সেই ঘরটা ওরা পায়নি। সেই ঘরে বড়োকাকার ছেলে রুনুদা যখন তাঁর বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা জমান, তাঁদের হইহল্লার শব্দে বাড়ি কাঁপে—তখন সিদ্ধার্থের বুকের মধ্যেটা জ্বলে যায়। রুনুদা ওর সঙ্গে কথাও বলে না আজকাল।

প্যান্ট খুলে পাজামা পরে নিল সিদ্ধার্থ। তোয়ালেটা নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। বাথরুমে বড়ো আয়নার সামনে দু-বার ভেংচি কাটল, থুতুনিতে হাত বোলাল, ডান হাতখানা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে মাসল ফুলিয়ে দেখল। শরীরের কোথাও কোনো ব্যথা-বেদনা নেই, প্রতিটি শিরা-উপশিরা সুস্থ কিন্তু কোনো কাজ নেই, সারাদিন কিছুই করার নেই। না: শালা, এবার একটা কিছু করতেই হবে। মার্টিন বার্নের সেই বুড়োটার সঙ্গে দেখা না করার কোনো মানে হয় না। দ্যাখো সিদ্ধার্থ, বেশি চালাকি মেরো না, ওসব আদর্শ-ফাদর্শ ধুয়ে কী জল খাবে? কেয়া মেয়েটা বেশ, ফিগারটা দারুণ, বেশি চালফালও নেই, একদিন যেতে বলেছে ওর বাড়িতে, কিন্তু পাত্তা দেবে কী আমায়—ওরা বড়োলোকের মেয়ে—আরও কতজনের সঙ্গে চেনা আছে—ওসব ইংলিশ নভেল-ফবেল আমার দ্বারা পড়া হবে না। কেমিস্ট্রির ফর্মুলা জিজ্ঞেস করো—দেড় বছর আগে পাশ করেছি, এখনও ঝটপট বলে দিতে পারি। কেন বাবা, আমাদের বাংলাতেও তো কত ভালো ভালো রাইটার আছে! সিদ্ধার্থ ওর গলাটা এগিয়ে এনে আয়নার সঙ্গে ছোঁয়াল। আঃ কী ঠাণ্ডা!

বাথরুম থেকে বেরিয়েই সিদ্ধার্থ বলল, মা, আমাকে খেতে দাও। খিদে পেয়েছে। এই তপু, কী করছিস, খাবার-টাবার দে না!

কেউ কোনো সাড়া দিল না। মায়ের ঘরে তখনও সুতপা খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে। সুতপার চোখে জল, কিন্তু মুখখানা বিষণ্ণ নয়—যেন খানিকটা ক্রোধে জ্বলন্ত। মা ও ছোটোকাকা তেমনই গম্ভীর। ছোটোকাকা ডাকলেন, বিনু, এদিকে শুনে যাও! টুনু এখনও বাড়ি ফেরেনি?

না।

তুমি এদিকে এসো, বোসো ওই খাটে। তোমার সঙ্গে কথা আছে। তোয়ালেটা আলনার দিকে ছুড়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ আঙুল দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নিল। কাল-পরশুই চুল না কাটলে চলবে না। দ্রুত চোখে তিনজনের মুখ দেখে নিয়ে সে পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করল। আজ আবার কোন নাটক? মায়ের চোখও লাল—একটু আগে কেঁদেছেন নিশ্চয়ই—বিধবা হবার পর মা সেই যে কান্না শুরু করেছেন—এই সাড়ে চার বছরে আর থামতেই চান না—আগে মা কীরকম হাসিখুশি ছিলেন।

ছোটোকাকা এই গরমেও খদ্দরের পাঞ্জাবিটা খোলেননি। ছোটোকাকা চাকরি-টাকরি করেন না—যখন এ-বাড়ির অবস্থা জমজমাট ছিল, তখন তিনি বাড়ির আদরের ছোটো ছেলে—ঠাকুরদার চায়ের ব্যাবসা যখন দিন-দিনই বড়ো হচ্ছিল, সেই সময় তিনি ছোটোকাকাকে বিলেত পাঠাবেন ঠিক করেছিলেন, হঠাৎ তিনি মারা গিয়েই সব গন্ডগোল হয়ে গেল। ঠাকুরদার ছেলেরা কেউই চায়ের ব্যাবসা সামলাতে পারলে না। ছোটোকাকা একসময় খুব শৌখিন ছিলেন। সিদ্ধার্থর মনে আছে, হাতে সব সময় দামি সিগারেটের টিন থাকত—এখন অদ্ভুতভাবে বদলে গেছেন, এখন খদ্দর ছাড়া কিছু পরেন না, সমাজকল্যাণ-টল্যাণ নিয়ে মেতেছেন, কিছুদিন ধরে এ-পাড়ায় একটা নাইট স্কুল করার ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন! আজকাল গভর্নমেন্টের কতরকম ডিপার্টমেন্ট রয়েছে—তারই একটাতে চাকরি নিয়ে এ-সব করলেই পারেন, তা না—। ঠাকুরদার চায়ের কোম্পানিটা বিক্রি হয়ে যাবার পর রয়ালটি বাবদ এখনও মাসে-মাসে কিছু পান তিনি।

ছোটোকাকা গম্ভীরভাবে বললেন, টুনু যে এরকম দিনের পর দিন কথার অবাধ্য হচ্ছে সেজন্য কিছু কি করা দরকার মনে হয় না তোমার? কিছুদিন আগেও সিদ্ধার্থ ছোটোকাকাকে খুব ভয় পেত। আজকাল আর পায় না। ওসব ভয়-টয় পাবার কোনো মানে হয় না, সবারই ভেতরের খবর জানা আছে তার। সিদ্ধার্থ বলল, টুনুর কলেজে ইলেকশান চলছে, সেইজন্যই বোধ হয় কয়েকদিন একটু ব্যস্ত।

ইলেকশান বলে রাত দশটা-এগারোটায় বাড়ি ফিরবে? ছাত্র বয়সে রাত ন-টা পর্যন্ত বাইরে থাকাই কী যথেষ্ট নয়? আর ইলেকশানের হুজুগে অত মাতারই বা ওর দরকার কী?

সেটা ও নিজেই বলতে পারবে। তবে আমার মনে হয়, কলেজে পড়ার সময় ভিড়ে মিশে না থেকে একটা কোনো লিডারশিপ নেওয়াই উচিত!

ছাত্রনেতা? তার মানে তো ট্রাম-বাস পোড়ানো আর স্ট্রাইক! পড়াশুনোটাই শুধু বাদ! সে যাই হোক, এত রাত্রে বাড়ি ফেরা আমি পছন্দ করি না। ও-বয়সে আমরা সন্ধ্যা সাতটার পর বাড়ি ফেরার কথা চিন্তাই করতে পারতাম না।

আপনাদের সময় আর এখনকার দিনে অনেক তফাত!

অনেক তফাত! ও, তাই বুঝি? ঠিক আছে, যা ভালো বোঝো তাই করো। তুমি বড়ো হয়েছ, এখন তোমাকে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে। এদিকে সুতপা কী শুরু করেছে, শুনেছ?

পিঠোপিঠি ভাইবোন, সুতপা কোনোদিনই সিদ্ধার্থকে দাদা হিসেবে ভক্তিশ্রদ্ধা করেনি। আগে দুজনে ছিল যেমন বন্ধু, তেমনই কথায়-কথায় মারামারি করত। ভারি সরল আর জেদি মেয়ে সুতপা, ফ্রক ছেড়ে যেদিন শাড়ি পরল—সেদিন থেকেই সমস্ত জগৎ মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তাজা কচি ফুলকপির মতন পরিচ্ছন্ন তার মুখ, সব সময় খুশিতে ঝলমল। ধীরে সুস্থে কোনো কাজ করতে পারে না সুতপা। এ-ঘর থেকে ও-ঘর যাবার সময়েও ছুটে যাবে। কোনোরকম গ্লানি বা অস্পষ্টতা ছিল না তার স্বভাবে। কিন্তু চাকরি নেবার পরেই কেমন বদলে গেছে! এখন সে বাড়ির কারোর সঙ্গেই বেশি কথা বলে না, সকাল ন-টার সময়ই চান করে খেয়ে বেরিয়ে যায়। ফেরে রাত আটটা-সাড়ে আটটায়। সাজপোশাকের দিকে অতিরিক্ত মন দিয়েছে, অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিটের কমে তার প্রসাধন শেষ হয় না। প্রায়ই মায়ের সঙ্গে মুখেমুখে ঝগড়া করে। সিদ্ধার্থকে সে আর কোনো গোপন কথা বলে না।

অথচ চাকরি নেবার সময় সে কেঁদে ভাসিয়েছিল। কিছুতেই নিতে চায়নি। কিন্তু এক কথায় সাড়ে তিনশো টাকার একটা চাকরি—ওইটুকু তো মেয়ে, সুতপা তখন বি.এ. পড়ত, কলেজ ছেড়ে চাকরি করার একটুও ইচ্ছে ছিল না তার। তবু, সাড়ে তিনশো টাকার লোভনীয় প্রস্তাব—তখন মা, ছোটোকাকা সবাই মিলে ওকে বুঝিয়েছিল, সংসার তখন প্রায় অচল, বাবার ইনশিয়োরেন্সের টাকা শেষ হয়ে গেছে, শেয়ারগুলো সব নষ্ট হয়ে গেল, শুধু ওই রয়ালটির সামান্য একশো কুড়ি টাকা মাসে—সিদ্ধার্থর সেবার বি.এস.-সি. ফাইনাল ইয়ার।

সুতপাকে নিয়ে প্রায়ই একটা না একটা গন্ডগোল লেগে আছে। কলেজে পড়ার সময় একজন ছোকরা অধ্যাপক সুতপাকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল, সুতপাও রাজি ছিল—কিন্তু মা কিছুতেই রাজি হননি। জাতের মিল ছিল না, তা ছাড়াও সেই অধ্যাপকটির সম্পর্কে কিছু বদনাম ছিল—মা তাঁর বনেদিয়ানা তখনও ভুলতে পারেননি—তাঁর অমন সুন্দর মেয়েকে সামান্য একটা আড়াইশো টাকা মাইনের মাস্টারের সঙ্গে বিয়ে দিতে কিছুতেই রাজি ছিলেন না। বিয়ে হবে না জেনেও সুতপা সেই অধ্যাপকের সঙ্গে ঘোরাঘুরি বন্ধ করেনি। অনেক কষ্টে সেটা বন্ধ করা হয়েছে। তারপর এই পাড়ারই একটা বখাটে গুণ্ডা ছেলে, বাদল, ফিটফাট সাজপোশাক পরে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকাই যার কাজ—সুতপাকে দেখে মাঝে মাঝে সে খারাপ মন্তব্য করত, ক্রমে ক্রমে সে চিঠি লেখা শুরু করল, বাড়িতে ডাকতে আসার সাহসও পেয়ে গেল—তার অত্যাচার অসহ্য হওয়ায় সিদ্ধার্থ একদিন বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসে বেশ দু-চার ঘা দিল তাকে।—কিন্তু কীসের কী। কয়েকদিন পরই টুনু এসে বলল, সুতপাকে সে বাদলের সঙ্গে এক ট্যাক্সিতে ঘুরতে দেখেছে। সুতপাকে জিজ্ঞেস করায় স্রেফ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু সিদ্ধার্থ নিজের চোখে এর কয়েকদিন পরই দেখল শিয়ালদার এক রেস্টুরেন্ট থেকে বাদল আর সুতপা বেরোচ্ছে। সেদিন টুনুও সঙ্গে ছিল। সেদিন মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল সিদ্ধার্থর, তার ইচ্ছে হয়েছিল বাদলকে সে খুন করে ফেলবে! একটা ইতর বদমাইশ তার বোনের সঙ্গে মিশতে সাহস করে! সুতপাকেও সে কঠিন শাস্তি দেবে ভেবেছিল। কিন্তু টুনু বাধা দেয়। টুনু বলেছিল, দাদা, তুই অত রাগারাগি করছিস কেন? বাদল লেখাপড়া শেখেনি, কিন্তু ওর হয়তো অন্য কোনো গুণ আছে। সিদ্ধার্থ ধমকে বলেছিল, তুই চুপ কর। আজ আমি ওকে দেখে নেব—ও কত বড়ো মস্তান হয়েছে!

কলার উলটে দেয়, হাতে লোহার বালা পরে বাদল। ওদের দেখে দিব্যি দাঁত বার করে হেসেছিল। সুতপাও বেশ সপ্রতিভভাবে বলেছিল, অফিস থেকে ফেরার পথে বাদলদার সঙ্গে দেখা হল—তাই একসঙ্গে এলাম। যা ভিড়, ট্রামে বাসে ওঠাই যায় না—। এর কয়েকদিন পরই একটা গুণ্ডামির অভিযোগে বাদলকে পুলিশে ধরে নিয়ে যায়। ছোটোকাকাই পুলিশে খবর দিয়েছিলেন।

সিদ্ধার্থ বিরক্তভাবে জিজ্ঞেস করল, তপু আবার কী করেছে?

সুতপা মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। মা-র মুখ নীচু।

ছোটোকাকা দুঃখিতভাবে বললেন, আজ অনন্ত সান্যালের বউ এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। উনি যা বললেন, নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারিনি। কী হয়েছে, ওকেই জিজ্ঞেস করো—

এই তপু, কী হয়েছে কী?

সুতপা মুখ ফিরিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল, কী আবার হবে! আমার মাথা আর মুন্ডু! অতই যদি পিটপিটানি, তবে আমাকে চাকরি করতে পাঠিয়েছিলে কেন?

আঃ, আগেই মাথা গরম করছিস কেন? বলবি তো কী হয়েছে!

আমাদের ম্যানেজারের বউ এসে ছোটোকাকার কাছে লাগিয়েছে, আমি তার বরের সঙ্গে প্রায়ই বেড়াতে যাই! তাতে সব দোষ আমার হয়েছে।

ছোটোকাকা মৃদুভাবে বললেন, উনি শুধু এ-কথা বলেননি, উনি আরও অনেক কিছু বলেছেন।

হ্যাঁ, গিয়েছিলাম তো! আজ ওঁর সঙ্গে ওঁদের বেহালার বাগানবাড়িতে গিয়েছিলাম—অফিসের আরও চার-পাঁচজন অফিসার গিয়েছিলেন—উনি ওঁর বাগান দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যেও তোমরা দোষ দ্যাখো?

শুধু আজ নয়—

হ্যাঁ, গিয়েছিলাম তো। আরও অনেকবার গেছি—ওঁর বউয়ের যদি অত গায়ে লাগে—নিজের স্বামীকে আটকে রাখলেই পারে। আমি গেছি, বেশ করেছি!

মা মৃদুভাবে বললেন, তপু, অন্তত একটু আস্তে কথাও বলতে পারবি না? তোর কী ইচ্ছে, আমাদের মান-সম্মান সব ডুবে যাক। তোর বড়োকাকিমা কান খাড়া করে আছে, কিছু একটা দুর্নাম রটাতে পারলেই তার আনন্দ!

সিদ্ধার্থ জানে, সুতপা এমন জেদি—যখন রাগবে তখন সে কাউকেও গ্রাহ্য করবে না। কৈফিয়ত দেবার ধার ধারবে না, কোনো অভিযোগ অস্বীকার করবে না। বারবার শুধু বলবে, বেশ করেছি। বেশ করেছি! বাবাই আদর দিয়ে ওর মাথাটা খেয়ে দিয়ে গেছেন। তা ছাড়া ছোটোকাকা ওকে নিয়ে কম আদিখ্যেতা করেছেন নাকি!

সিদ্ধার্থ নরমভাবে বলল, তপু, তুই বোস তো। তোকে কেউ খারাপ ভাবছে না। ওই বুড়ো অনন্ত সান্যাল তোর ওপর কোনো জোরজুলুম করে? তাহলে বল, আমি ওর নাকটা ভেঙে দিয়ে আসব গিয়ে। আজকাল ইউনিয়ন আছে সব অফিসে—চাকরি ছাড়ানো অত সহজ নয়। জোর করে?

এক বেণী করে চুল বেঁধেছে সুতপা, লম্বা বেণীটা বুকের ওপর এনে হাত দিয়ে প্রান্তটা ধরে আছে। তার ছিপছিপে কচি শরীরটা সোজা হয়ে রইল, বসল না সুতপা, জেদের সঙ্গে বলল, জোর করবে কেন? আমি ইচ্ছে করে যাই, আমার ভালো লাগে। তোকে আর তেজ দেখতে হবে না।

তবু রাগল না সিদ্ধার্থ।

মা সিদ্ধার্থের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন। ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না ছেলের শান্ত ভাবটা। সিদ্ধার্থ হাসল। বেশ বোঝা যায় সুতপার চোখে কান্না টলটল করছে, কিন্তু দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে সে রাগ দেখাচ্ছে। সিদ্ধার্থ আরও শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, বল না, আমরা তো ব্যাপারটা জানতে চাইছি তোর মুখ থেকে। জোর করে?

জোর করবে কেন? রোজ কাকুতি-মিনতি করে! অত বড়ো একটা লোক রোজই বলে, ছুটির পর তার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে চায়। সন্ধ্যাবেলা গঙ্গার হাওয়া খেলে শরীর ভালো থাকে—গাড়ি নিয়ে ওখানে ঘোরা—রোজ-রোজ কেউ না না বলতে পারে? তা ছাড়া গেলেই বা কী হয়েছে?

তোদের অফিসে তো আরও মেয়ে আছে। অন্য কাউকে বলে?

তাদের বললে তো তারা বর্তে যেত! তারা তো মুখিয়ে আছে!

আর কাউকে বলে না, শুধু তোকেই বলে! তুই বুঝতে পারিস না—তোকে ছেলেমানুষ পেয়ে—

আমি মোটেই আর ছেলেমানুষ নই! তা ছাড়া আমার আজকাল ওর সঙ্গে বেড়াতে খারাপ লাগে না।

খারাপ লাগে না?

না, খারাপ লাগে না। বুড়ো হলেই কী সবাই খারাপ হয় নাকি? ছুটির পর ভিড়ের মধ্যে ট্রামে-বাসে ওঠার কী কষ্ট, তুই কী বুঝবি, তুই তো চাকরি করিস না! তার চেয়ে কেউ যদি গাড়ি করে পৌঁছে দেয়—ওঁর কথাবার্তাও বেশ সুন্দর—অনেক কিছু জানেন—আমার ভালো লাগে।

চাকরি না করার ইঙ্গিতটা সিদ্ধার্থ এড়িয়ে যায়। কিন্তু তখনই ও টের পায় ওর বিষম খিদে পেয়েছে। দুপুরের পর থেকে এ-পর্যন্ত সে কিছুই খায়নি—আদিনাথ মাংস খাওয়াতে চেয়েছিল—খিদেতে ওর পেট জ্বলছে। সেই জ্বালা ওর মাথায় উঠে আসে। হঠাৎ প্রচন্ড রাগে ও চিৎকার করে ওঠে, তপু, তোর বড়ো বাড় বেড়েছে। ভালো লাগে? অফিসে চাকরি করিস বলে মান-সম্মান খুইয়ে…ধিঙ্গির মতন…এ বাড়ির একটা…তুই ভেবেছিস কী?

মা এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিলেন। তাড়াতাড়ি উঠে এসে সিদ্ধার্থর বাহু চেপে ধরে ব্যাকুলভাবে বলেন, বিনু, বিনু, আস্তে, তুই তো বুঝিস—

সিদ্ধার্থ ঠাণ্ডা হয় না, সেইরকম চেঁচিয়ে বলে, আমি বলে দিলাম, কাল থেকে আর ওকে চাকরি করতে হবে না। বাড়ি থেকে এক পাও বেরোতে পারবে না!

সুতপা দর্পের সঙ্গে বলে, চাকরি করতে হবে না? তোর কথাতে নাকি! ওভারটাইম মিলিয়ে পাঁচশো পঁচিশ টাকা পাই—তুই আগে রোজগার করে দ্যাখা না।

তপু মুখ সামলে কথা বল বলছি!

কেন, কী করবি কী? তখন তো স্বার্থপরের মতন নিজে কলেজ না ছেড়ে আমাকে চাকরি করতে পাঠিয়েছিলি—

আমি মোটেই তোকে চাকরি করতে বলিনি।

তাহলে কে বলেছিল?

ছোটোকাকা বিমর্ষ অসহায়ভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিলেন। এবার করুণভাবে বললেন, আমার একটা কথা শুনবে? একটা কথা?

সুতপা জ্বলন্ত চোখে ছোটোকাকার দিকে তাকিয়ে বলল, না, আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি আমার যা খুশি করব!

ছোটোকাকা তবু সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে বললেন, চাকরি তো আজকাল অনেক মেয়েই করে। কিন্তু করুণাদেবী আজ যে কথা বলে গেলেন, তা অত্যন্ত গুরুতর। তিনি বললেন, তাঁর সংসার ভাঙতে বসেছে, অনন্ত সান্যালের আর নিজের সংসারের দিকে একদম মন নেই—ওর জন্য পাগল হয়ে উঠেছে একেবারে—এখন তপু যদি নিজের ভালোমন্দ না বোঝে—

আমি যথেষ্ট ভালো বুঝি। আমি কারুর বুদ্ধি চাই না।

সিদ্ধার্থ বলল, অনন্ত সান্যাল তো আপনারই বন্ধু, আপনি তাঁকে বুঝিয়ে বলুন না গিয়ে।

আমি তাকে গিয়ে কী বলব? আমাদের বাড়ির মেয়েকে যদি আমরা সামলাতে না পারি—অনন্ত তো লোক খারাপ ছিলেন না—মেয়েরা যদি—

সিদ্ধার্থর বলতে ইচ্ছে হল, অনন্ত কীরকম ভালো লোক—তা তার ঢের জানা আছে। তপুকে একবার দেখেই যখন লোকটা চাকরি দিতে চেয়েছিল—তখন ব্যাপারটা অস্বাভাবিক মনে হয়নি ছোটোকাকার? বিলিতি কোম্পানি হোক আর যাই হোক, হায়ার সেকেণ্ডারি পাশ একটা আঠারো বছরের অনভিজ্ঞ মেয়েকে সাড়ে তিনশো টাকা মাইনের চাকরি যেচে দেওয়ার কথা কেউ শুনেছে কখনো? কিন্তু সিদ্ধার্থ এ-কথাটা বলল না। কারণ কথাটা শুনে মা খুব দুঃখ পাবেন। মা তখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারেননি। মায়ের দিকে ফিরে সিদ্ধার্থ বলল, মা, তোমাকে তো কতবার বলেছি, আমাদের বাড়ির এই অংশটা বিক্রি করে দাও। বড়োকাকা ন-হাজার টাকা দাম দিতে চেয়েছেন—ফ্ল্যাটবাড়িতেই উঠে যাব—কয়েক মাসের মধ্যেই আমি চাকরি জোগাড় করে নেব—তপুকে চাকরি করতে যেতে হবে না।

মা বললেন, তুই তো শুধু ওই একটাই কথা জানিস। বাড়ি বিক্রি করা! না, আমি এ-বাড়ি ছেড়ে যাব না কিছুতেই! ভাড়া বাড়িতে পাঁচজনের সঙ্গে আমি মরে গেলেও থাকতে পারব না!

ভাড়া বাড়িতে তো কত ভালো ভালো লোক থাকে এখন। তুমি পারবে না কেন?

মা মুখটা ঘাড়ের পাশে সরালেন। প্রথমে শান্তভাবে বললেন, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না, আমি মরে গেলে তোরা তখন তাই থাকিস। আমি এ-বাড়ি ছাড়তে পারব না।—এরপর মায়ের মুখখানা কুঞ্চিত হল, ঠোঁট কাঁপল, সমস্ত মুখখানাই কাঁপতে লাগল, চকচক করে উঠল চোখ, বাষ্প মেশানো গলায় বললেন, ওইটুকু একটা মেয়েকে আমরা সামলাতে পারব না? ওর জন্য আমাদের বাড়ি বিক্রি করতে হবে? ও কারুর কথা শুনবে না? কেন? কেন?

ছোটোকাকা এবং সিদ্ধার্থ দুজনেই সুতপার দিকে তাকাল। সুতপা তখনও খর চোখে বেপরোয়া ভঙ্গিতে তাকিয়ে। সিদ্ধার্থ তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে কঠোর স্বরে বলল, তপু, কাল থেকে যদি আমি শুনি, তুই কোনো লোকের সঙ্গে কোথাও গেছিস—

এবার বাঁধ ভাঙল। মুখের ভঙ্গি একটু বদলাবার আগেই সুতপা সোজা বিছানার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে গেল। সারা শরীরটা ছটফটিয়ে, পাগলের মতন বিছানায় মুখ ঘষতে ঘষতে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল, আমাকে তোমরা মেরে ফ্যালো! মেরে ফ্যালো! আমি আর পারছি না—রাস্তায়, অফিসে সব জায়গায় লোকে আমাকে ওই এক কথা বলবে, সবাই শুধু আমাকে জ্বালাবে, আমি আর পারি না, আমাকে মেরে ফ্যালো, সব আমার দোষ, আমাকে এক্ষুনি মেরে ফ্যালো, তাহলেই তোমাদের শান্তি হবে, আমি...।

এমন অন্তত আধঘণ্টা চলবে। সুতপার রাগের মতো তার কান্নার রূপও ভয়ংকর। রাগের সময় সে আর কাউকে গ্রাহ্য করে না, কান্নার সময় সে নিজের কথা একেবারে ভুলে যায়। মা ওকে জড়িয়ে না ধরলে ও রক্তারক্তি করবে। আজ রাত্রে কেউ ওকে খাওয়াতে পারবে না। ছোটোকাকা আলতোভাবে সুতপার পিঠে হাত রেখে কী বলতে গেলেন—সুতপা ঝটকা মেরে সে হাত সরিয়ে দিল।

ছোটোকাকার ওপর একই সঙ্গে রাগ আর মায়া হল সিদ্ধার্থর। ছোটোকাকা মানুষ খারাপ নন। বাবা মারা যাবার পর ছোটোকাকাই তাদের সংসারটা সামলে রেখেছেন। পাড়ার লোকেরা তাঁকে শ্রদ্ধা করে, তাঁর সমাজসেবা-টেবার ব্যাপার নেহাত ভড়ং নয়, নাইট স্কুলটার জন্য তিনি সত্যিই প্রাণ দিয়ে খাটছেন, কোনোরকম মতলববাজির প্রমাণ এখনও পর্যন্ত সিদ্ধার্থ পায়নি। কিন্তু ছোটোকাকাই একসময় সুতপাকে নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করেছেন। তপুকে দিনরাত ‘মা মণি’, ‘মা মণি’ বলে ডেকে মাথায় করে রাখতেন। তপু যখন ছোটো, ছোটোকাকার হাতে যখন পয়সা ছিল, প্রায় রোজই তপুর জন্য কোনো-না-কোনো উপহার কিনে আনতেন। বাড়িতে ফিরেই ছোটোকাকা ডাক দিতেন, ‘মা মণি, মা মণি কোথায়?’ অমনি তপু ছুটতে ছুটতে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলত, ‘কই, কী এনেছ, কই কী এনেছ, দাও!’ ছোটোকাকা তখন তাকে কোলে তুলে নিতেন। বড়ো হয়েও সে-আদর কমেনি। দুরন্ত ছটফটে তপুকে তিনি খেলাচ্ছলে কতবার জড়িয়ে ধরেছেন, এই সেদিনও শাড়ি পরার পরেও—নিজের অজ্ঞাতেই বোধহয় ছোটোকাকা তপুর মনের ভয়ংকর একটা দিককে জাগিয়ে তুলেছেন। সব সময় আদর পাবার ক্ষুধা। তপুকে নিয়ে আগে প্রায় নিয়মিত বেড়াতে বেরোতেন ছোটোকাকা—তাঁর বন্ধু অনন্ত সান্যালের বাড়িতে তিনিই তপুকে নিয়ে গেছেন কয়েকবার। তপু এখন আর ছোটোকাকাকে একেবারেই গ্রাহ্য করে না। কিন্তু তাঁরই বয়সি অন্য একজন লোকের সঙ্গে যদি এখন বেড়াতে ভালো লাগে তপুর, তাহলে তাকে কী খুব দোষ দেওয়া যায়? ছোটোকাকা কী সেটা বুঝতে পেরেছেন? সেইজন্যই কী গোপন অপরাধীর মতো মলিন মুখ তাঁর?

ও ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল সিদ্ধার্থ, এই সময় সুব্রত বাড়িতে ঢুকল। সিদ্ধার্থ, নিজের বয়সের চেয়েও অনেক বেশি বয়স্ক হয়ে বলল, টুনু, এই তোর বাড়ি ফেরার সময় হল?

সুব্রতর মুখে প্রথম বর্ষার তাজা ঘাসের মতন কচি দাড়ি। বহুদিন চুল ছাঁটেনি। উগ্র লাল কালো রঙের একটা চেক চেক জামা, সরু কালো প্যান্ট, কোমরে বেল্ট, পায়ে চটি, হাতে একগাদা কাগজপত্র। সিদ্ধার্থর গম্ভীর কথা সে গ্রাহ্যই না করে বলল, জানিস দাদা, দালাল পার্টি আজ গুণ্ডা আনিয়েছিল। আজ হয়ে যেত এক চোট।

সিদ্ধার্থ বলল, আবার তুই মারামারি করতে গিয়েছিলি? গত বছর তো হাত ভেঙেছিল—।

সুব্রত মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এনে বলল, হাত-ভাঙার তিন ডবল শোধ নিয়ে নিতুম। আজ আমরাও রেডি ছিলাম, কিন্তু এ-গুন্ডাদলের একজন আবার আমাদের দীপঙ্করের বন্ধু, চোখাচোখি হতে লজ্জা পেল—আমরাও সে বাং—মানে ইয়েকে বলে দিলুম, মানে-মানে কেটে পড়ো, আমাদের এক ডজন পেটো রেডি আছে—

পেটো কী?

তুই পেটো জানিস না?

সুব্রত ক্রিকেট খেলোয়াড়দের বোলিং করার ভঙ্গিতে হাত ঘুরিয়ে বলল, দুম ফটাস! হাতবোমার ডাকনাম—তুই শুনিসনি আগে?

ছোটোভাইয়ের অবজ্ঞায় একটু আহত হয়ে সিদ্ধার্থ বলল, যা, যা, তোদের ওগুলোকে হাতবোমা বলে নাকি? ও তো পটকা! শুধু আওয়াজ! আমরা যেগুলো বানাতুম—

সুব্রত মুখটা এগিয়ে এনে ফিসফিস করে বলল, দাদা, কাল দশটা টাকা দিস তো!

দশ টাকা আমি কোথায় পাব?

তোর ঘড়িটা বেচে দে না। একটা পার্টি আছে, ভালো দাম পাবি। কী হবে ঘড়ি রেখে?

তোর জন্য আমি ঘড়ি বেচব? ভাগ!

ঠিক আছে, দিয়ো না। দিদিকে ভজাতে হবে।

এই সময় টুনুর চোখ পড়ল মায়ের ঘরে। সুতপা তখনও একইভাবে কাঁদছে ছটফটিয়ে। সেদিকে তাকিয়ে অদ্ভুত অবহেলার হাসি হেসে বলল, আবার আজ কান্না? কী যে মেয়েদের এই অকারণ ফ্যাচফ্যাচানি! লেগেই আছে! মা, খেতে দাও! দারুণ খিদে পেয়েছে। এক মিনিটও দেরি না—

ঘরে ঢুকে চটি দুটো ছুড়ে দিল কোথায়, বইপত্রগুলো ধপাস করে রাখল টেবিলে, কোমর থেকে বেল্টটা খুলে টুনু সেটাকে চাবুকের মতন সপাং-সপাং করে ঘোরাতে লাগল হাওয়ার মধ্যে।







ঠিক চিনতে পারলাম না তো?

আমি সুতপার দাদা।

অনন্ত সান্যাল নাকের কাছে চশমাটা একবার টিপে স্থিরভাবে তাকালেন। একটু বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। বললেন, হ্যাঁ, মুখের মিল আছে। তোমাকে আগে দেখেছি মনে হচ্ছে। তুমি তো আগেও এসেছিলে এ-বাড়িতে না?

না, আমি আগে কখনো আসিনি।

তা কী ব্যাপার? সুতপা কোনো খবর পাঠিয়েছে?

সিদ্ধার্থ একটু ইতস্তত করে। ঠিক কীভাবে কথা শুরু করবে ভেবে পায় না—একটু আগেও তার বুকের মধ্যে একটা মরিয়া জেদ ছিল, এখন তার বদলে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্বল ভয় এসে দেখা দিয়েছে। টেবিলের নীচে তার পা দুটো একটু-একটু কাঁপছে—এটা টের পেয়ে সিদ্ধার্থ নিজের ওপর আরও রেগে যায়।

সকালবেলা থেকেই এক ধরনের ভোঁতা দুঃখ তাকে পেয়ে বসেছিল। বাড়িতে থাকতে ভালো লাগেনি, আবার বন্ধুবান্ধবদের খোঁজেও যেতে ইচ্ছে হয়নি। গলির মোড়ের চায়ের দোকানে এসে বসেছিল। রবিবারের সকালে চায়ের দোকানে বেশ ভিড়, কিন্তু সেখানে সিদ্ধার্থর কোনো বন্ধু নেই। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে বেশি মেশে না সিদ্ধার্থ—ইস্কুলে যাদের সঙ্গে পড়ত, তারা এখন সবাই বদলে গেছে মনে হয়।

তার একটু দূরের টেবিলেই বসেছিল রতন, ইস্কুলে পড়ার সময় কী লাজুক ছিল সে, ক্লাসে বসে খাতায় সবসময় হিজিবিজি আঁকত, অবিকল মানুষের মুখ আঁকতেও তার হাত ছিল—কখনো-কখনো রতনকে সে খুব জ্বালাতন করলেও মনে-মনে এই শান্ত নম্র ছেলেটিকে ভালোইবাসত সিদ্ধার্থ। এখন সে যেন অন্য মানুষ। বউবাজারে ওর বাবার গয়নার দোকানে ক্যাশে বসে রতন। ধুতির ওপর হাওয়াই শার্ট পরে বিশ্রিভাবে কোঁচাটা গুঁজেছে বুকপকেটে। গলার আওয়াজ হয়ে গেছে কর্কশ, হাতে একটা চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে অনবরত বকবক করে যাচ্ছে, মাঝে-মাঝে উঠে গিয়ে দোকানের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত কায়দায় দাঁতের ফাঁক দিয়ে চিক করে থুতু ফেলে ফিরে আসছে আবার। বুকপকেট ভর্তি তার খুচরো পয়সা, প্রতিবার যাবার সময় ঝুমঝুম করে ঘুঙুরের মতন শব্দ হচ্ছিল।

বিতৃষ্ণার চোখে রতনকে দেখছিল সিদ্ধার্থ। রতন একবার তাকে দেখতে পেয়ে কাছে এসে ঝুঁকে বলল, কিরে খুব একটা ভালো মাল বাগিয়েছিস তো! কাল রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলি দেখলাম! সব চোখে পড়ে বাওয়া—

সিদ্ধার্থ ওর প্রথম কথাটা ঠিক শুনতে পায়নি। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, কী বললি?

মেয়েটার নাম কেয়া সরকার, না? নতুন এসেছে, মানিকতলার মোড়ের কাছে থাকে। আমাদের সুধীর কিছুদিন ঘুরঘুর করেছিল ওর পেছনে—পাত্তা পায়নি। বাবাটা খুব কড়া—তুই কী করে বাগালি?

সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে যায় যে, রতনের এই কথা শুনেও তখনই উঠে রতনের নাকে একটা ঘুসি কষাবার ইচ্ছে তার কেন হল না! সবাই সিদ্ধার্থকে রগচটা ছেলে বলে জানে। সকাল থেকে চেপে বসা ভোঁতা ধরনের দুঃখবোধটাই তাকে অনেকটা অসাড় করে দিয়েছে। রতনের দিকে ঠাণ্ডাভাবে তাকিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলে, যা যা, নিজের টেবিলে যা—

রতন তবুও কাঁধে হাত রেখে চাপা হাসিতে বলে, চালিয়ে যাও, গুরু! যদি সাহায্য-ফাহায্য লাগে, বলো।

কাঁধের ওপর রতনের হাতখানা ধরে ফ্যালে সিদ্ধার্থ, এক ঝটকায় ওর আঙুলগুলো ভেঙে ফেলার দুরন্ত লোভ জেগেও মিলিয়ে যায়। রতনের দিকে ফিরে ও বলে, এই রতন, পাঁচটা টাকা ধার দে তো!

রতন চমকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, আবার পাঁচ টাকা? তুই লাস্ট মানথে আমার কাছ থেকে দেড়টা টাকা নিয়েছিলি, ফেরত দিসনি, আবার পাঁচ? আমি কী তোর ইয়ে নাকি রে শালা?

সাহায্য করতে চাইছিলি যে?

টাকা দিয়ে কী হবে? এসব তো টাকার কেস নয়!

সিদ্ধার্থ আবার রতনের হাত ধরে ফেলে বেশ দৃঢ়ভাবে বলে, দে, টাকা দে! কোনো কথা শুনতে চাই না!

মুখে ইয়ার্কির হাসি ফুটিয়ে রাখলেও সিদ্ধার্থ রতনের হাতটা বেশ খানিকটা মুচড়ে ধরেছে। যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তটা খেলা করছে রতনের মুখে।

পাঁচ টাকা নেই, মাইরি বলছি, নেই!

যা আছে, দে।

পকেটে গোঁজা কোঁচাটা সরিয়ে রতন আধমুঠো খুচরো বার করে। সেগুলো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে বলে, নে, হাত ছাড়। তোর সঙ্গে কথা বলতে এলেই কিছু-না-কিছু গচ্চা যাবে—

সেটা জানিস যখন—

চায়ের দোকানে আরও দুজনের সঙ্গে দেখা হয় সিদ্ধার্থর। তার ফলেই অসাড়তা কেটে গিয়ে পরবর্তী কাজের কথা মনে পড়ে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে একটা অস্বস্তি বোধ করছিল ও, অনেকটা যেন এক ধরনের ব্যাখ্যার অতীত অস্বস্তি, কোনো এক বিষম জরুরি কাজ করার ছিল—অথচ সেটা কী কাজ তা মনে পড়ছে না—এই ধরনের। কিছু একটা তাকে এখনই করতে হবে—কিন্তু সেটা কী—তাই বুঝতে পারছে না সিদ্ধার্থ। অথচ, যদি কেউ এখন এসে তাকে কোনো কাজ করতে বলেন তাহলে সঙ্গে-সঙ্গে তা অস্বীকার করবে। হলও তাই। নরেশদা এসে সিদ্ধার্থর পাশের চেয়ারে বসে বললেন, বিনু, আর এক কাপ চা খাবে নাকি? অনেক খুচরো পয়সা দেখছি, তুমিই তাহলে আমাকে আজ চা খাওয়াও।

খুশিমনেই সিদ্ধার্থ নরেশদার জন্য চায়ের অর্ডার দেয়। রতনের কাছ থেকে পয়সাগুলো নেওয়া সার্থক বোধ করে। নরেশদা সিদ্ধার্থর চেয়ে দশ-বারো বছরের বড়ো, নরেশদার গলার আওয়াজটা ভারি সুন্দর—আজকাল এমন লোক সিদ্ধার্থ খুব কমই খুঁজে পায়, যাদের কন্ঠস্বর তার শুনতে ভালো লাগে। নরেশদা শান্ত গলায় প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেন। খুব উত্তেজিত তর্কের সময়ও নরেশদাকে সে কখনো চেঁচিয়ে কথা বলতে শোনেনি।

নরেশদা সিদ্ধার্থর দিকে সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, নাও, খাও একটা।

সিদ্ধার্থ সাধারণত পাড়ার মধ্যে সিগারেট খায় না। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থাকলে কখনো দু-একটা টানে। কিন্তু বয়সে অত বড়ো হওয়া সত্ত্বেও নরেশদা তাকে বিনা দ্বিধায় সিগারেট দিচ্ছেন দেখে সে খানিকটা কৃতজ্ঞ হয়ে সেটা নিয়ে ধরায়। নরেশদা জিজ্ঞেস করেন, তারপর, কী করছ আজকাল?

লাজুকভাবে হেসে সিদ্ধার্থ বললে, কিছুই না।

চাকরি-টাকরি পাওনি এখনও?

না, পাচ্ছি না তো!

তুমি তো বি.এস.-সি. পাশ করেছ? তোমার স্বাস্থ্য ভালো, কোনো কারখানায় ঢুকে যাও—যত ছোটো চাকরিই হোক—নিছক শ্রমিক হলেও ক্ষতি নেই—সেটাই বরং ভালো হবে—একেবারে গোড়া থেকে কাজ শিখতে পারবে— তা ছাড়া শ্রমিকদের সঙ্গে আপনভাবে মিশবে—সেটাও একটা বড়ো কাজ।

সিদ্ধার্থ কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে। নরেশদা হঠাৎ হেসে ফেলে বলেন, শুনতে ভালো লাগল না, না? ভাবছ, হঠাৎ বিনা পয়সায় উপদেশ দিচ্ছি। আচ্ছা, ও কথা থাক। তোমাকে এমন মনমরা দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে তোমার?

কিছুই হয়নি তো।

তোমার বয়সি ছেলেদের সঙ্গেই আমি বেশি মিশি। তোমাদের মুখ দেখলেই তোমাদের মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারি। নিশ্চয়ই তুমি কোনো কিছু নিয়ে খুব বেশি ভাবছ!

কী জানি নরেশদা, ঠিক বুঝতে পারছি না তো আমি। এমনিই বসে আছি।

তোমাদের বয়সে ওই তো আরেকটা উপসর্গ। দুঃখের কারণটা বুঝতে পারো না। কিংবা হয়তো দুঃখের কোনো কারণই নেই, তবু একটা মনগড়া দুঃখ নিয়ে সময় কাটাতে ভালো লাগে। এইজন্যই কোনো একটা কাজের মধ্যে ডুবে থাকলে—

সব সময় কাজই বা পাচ্ছি কোথায়?

কাজ অনেক আছে। তুমি আমাদের দলে এসো। যতদিন না কোনো চাকরি পাও, তুমি আমাদের সঙ্গে কিছু কাজ করো, তোমাকে দিয়ে আমাদের অনেক সাহায্য হবে!

ওসব আমার ভালো লাগে না। বাড়িতে এত ঝঞ্ঝাট।

কী ঝঞ্ঝাট?

নরেশদার প্রতি একটা গোপন শ্রদ্ধা ছিল সিদ্ধার্থর। নরেশদা ‘কী ঝঞ্ঝাট’ কথাটা উচ্চারণ করার সময় এমন একটা সহানুভূতি-মেশানো নরম চোখে তাকালেন যে সিদ্ধার্থ হঠাৎ আবেগে বশীভূত হয়ে পড়ে। নরেশদার কাছে সে তার পারিবারিক সংকটের কথা খুলে বলে। কিছুই বাদ রাখে না—রাত্রে মায়ের ঘরে সুতপাকে কেন্দ্র করে যে-আলোচনা হয়েছিল, তাও বলে যায়—ছোটোকাকা সম্পর্কে সবটুকু রাগ প্রকাশ করে না—কিন্তু বসতবাড়ি সম্পর্কে মায়ের অতিরিক্ত টানের প্রসঙ্গে সে বেশ ঝাঁঝ দেখায়।

সব শুনে নরেশদা ম্লানভাবে হাসলেন, বললেন, সত্যিই তুমি খুব মুশকিলে পড়েছ। তোমার বয়স তো একুশ পেরিয়ে গেছে? তার মানে তুমি বড়োদের জগতে ঢুকছ। সত্যি বড়োদের জগৎটা খুব বিশ্রী, অনেক নোংরা ব্যাপারে জড়িয়ে পড়তে হয়। যখন ছোটো ছিলে, স্কুলে পড়তে, তখন যে হালকা জীবন ছিল—সারা জীবনটা যদি সেরকম হত!

আরক্ত মুখে সিদ্ধার্থ বলে, নরেশদা, আপনার কাছ থেকে আরেকটা সিগারেট নিচ্ছি।

নরেশদা বললেন, বিনু, তুমি আমাদের বাড়ির অবস্থার কথা শুনবে?

সিদ্ধার্থ উদগ্রীব হয়ে তাকায়। নরেশদার বাড়ির কথা সিদ্ধার্থ বিশেষ কিছুই জানে না। তার খুড়তুতো দাদা রুণুদার বন্ধু ছিলেন নরেশদা, বাড়ি পার্টিশান হবার আগে রুণুদার কাছে উনি যখন আসতেন—তখন সিদ্ধার্থের সঙ্গে চেনা হয়েছিল।

নরেশদা বললেন, যাক, বলে দরকার নেই। ঘটনাগুলো আলাদা, লোকজন আলাদা—কিন্তু ব্যাপারটা প্রায়ই একরকমই। যাই হোক, তুমি কী করবে ঠিক করেছ?

কিছুই ঠিক করিনি।

শোনো, তুমি একা কিছুই করতে পারবে না। সবগুলো সমস্যা একসঙ্গে জড়ানো—একটা-একটা করে এর মীমাংসা করা যায় না। এই নোংরা পচা সমাজব্যবস্থাকেই বদলে শ্রেণিহীন সমাজ আনতে হবে। বিপ্লবের পথ ছাড়া সেই পরিবর্তন আসবে না। আমাদের সবাইকে মিলে সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। সেই জন্যই তোমাকে বলেছিলাম আমাদের দলে এসে কাজ করতে। তাহলে অন্তত বেঁচে থাকার একটা সার্থকতা বুঝতে পারবে। এইরকম মনমরা হয়ে বসে না থেকে—

খানিকটা স্তম্ভিতের মতন সিদ্ধার্থ নরেশদার দিকে চেয়ে থাকে। নরেশদা কী তাকে ছেলেমানুষ পেয়েছেন! সে কী এ-কথা জানে না? মাত্র দু-বছর আগেও সে কলেজে পড়ত, সে-বার ইউনিয়নে তাদের দলকে জেতাবার জন্য কী আপ্রাণ পরিশ্রম করেনি? এসব কথা আরও সবিস্তারে সেও কী অন্যদের বলেনি? নরেশদা নতুন করে এই কথা বলে তাকে যেন অপমান করলেন, বঞ্চিত করলেন—এই ধরনের আহত অভিমান নিয়ে সিদ্ধার্থ তাকিয়ে থাকে।

কোণের টেবিল থেকে দু-তিনজন লোক অনেকক্ষণ ধরেই নরেশদাকে ডাকাডাকি করছিল, সিদ্ধার্থ শান্তভাবে বলল, নরেশদা, আপনাকে ওঁরা ডাকছেন।

সেদিকে অপেক্ষা করতে বলার ইশারায় হাত তুলে, নরেশদা বললেন, ডাকুক, ওদের চেয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলাই আমার বেশি দরকার। তুমি আজ বিকেলে এসো—

অভিমান থেকে সিদ্ধার্থ আকস্মিকভাবে উগ্র হয়ে উঠল। রুক্ষ গলায় বলল, আমি আমার বোনের রোজগার-করা টাকায় দু-বেলা ভাত খাচ্ছি—আমার বোন আমাকে গ্রাহ্য করে না, মা রোজ কান্নাকাটি করছেন, আমার কাকা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছেন—এ-সময় আমাকে আপনার উপদেশ দেবার কোনো মানে হয় না।

তুমি কি ভাবছ তুমি একটা চাকরি পেলেই সব সমস্যা মিটে যাবে?

কীসে কী মিটবে তা জানি না!… কিন্তু আজ আমার শুধু মিটিং করে আর পোস্টার লিখে সময় কাটাবার ধৈর্য নেই।

কাজ অনেক রকম আছে। যে-কোনো একটা কাজের দায়িত্ব যদি তুমি নিতে পারো—তোমার অন্তত একটু মনে হবে—তুমি তোমারই মতন আরও অনেকের মূল সমস্যা দূর করার জন্য…

নরেশদা, আমি এবার উঠব—

নরেশদা আবার সেইরকম নরমভাবে হাসলেন। বললেন, তোমার মেজাজটা আজ খুব চড়া আছে। ঠিক আছে, তোমাকে কাজ করতে হবে না। তুমি এমনিই আমার সঙ্গে দেখা কোরো—

খুচরো পয়সাগুলো মুঠো করে নিয়ে সিদ্ধার্থ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তার দিকে তাকিয়ে সম্পূর্ণ অন্য সুরে বললেন, সুতপা খুব ভালো মেয়ে। সে কোনো দোষ করেনি। তার ওপর তুমি খামোখা বেশি-বেশি রাগ করছ।

উত্তর না দিয়ে সিদ্ধার্থ টেবিল ছেড়ে যায়। মনে-মনে ভাবে, যে যখন চান্স পায়, অমনি একটা ফালতু লেকচার মেরে যায়! আমি কারখানায় গিয়ে মজুর হব, আর উনি চায়ের দোকানে বসে সিগারেট টানতে-টানতে আমায় বিপ্লব শেখাবেন! দুনিয়াটাই এমনি! কিন্তু কয়েকখানা টেবিল পেরিয়ে চায়ের দোকান থেকে বার হবার আগেই তার এই বিস্বাদ ভাবটা কেটে যায়। মনে হয় নরেশদা ঠিকই বলছিলেন, অন্তত একটা কিছু কাজ করা দরকার। ভেতরটা ছটফট করছে সেইজন্য। কিন্তু কী কাজ? কোনো একটা বিশাল জায়গায় আগুন লাগিয়ে লন্ডভন্ড করার কাজ যদি তাকে কেউ দিত এখন—তাহলে সিদ্ধার্থ সঙ্গে-সঙ্গে ছুটে যেতে রাজি ছিল।

চায়ের দোকানের বাইরে পা দেবার আগেই সিদ্ধার্থ বাদলকে দেখতে পেয়েছিল। বাদলকে অনেকদিন এ-পাড়ায় দেখা যায়নি। থানা থেকে কবে ছাড়া পেয়েছে কে জানে? বাদলের চেহারাটা এখন একেবারে খাঁটি গুণ্ডার মতন—ঠোঁটের ভাঁজে, চিবুকে এসেছে নিষ্ঠুরতা, চোখে সদা সতর্ক ভাব। সুতপার ব্যাপারে একসময় খুব জ্বালিয়েছিল বাদল, এখন হয়তো তার ঘোর কেটেছে। এখন সে নিশ্চয়ই আরও অনেক বড়ো নেশার সন্ধান পেয়েছে। সিদ্ধার্থর দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে বাদল চায়ের দোকানে ঢুকে যায়।

বাদলকে দেখে রাগ হয় না, বরং একটু মায়া হয়। শিয়ালদার কাছে সুতপার সঙ্গে যেদিন ওকে দেখেছিল—সেদিন ও মুখচোখের ভাবে প্রাণপণে বিনীত ও ভদ্র হবার চেষ্টা করেছিল। সে যে সুতপার মতন মেয়ের বন্ধু হবার যোগ্য—এটা প্রমাণ করতে চাচ্ছিল। হয়তো সুতপার সঙ্গে আরও মিশলে সত্যিই একদিন তার যোগ্য হয়ে উঠত। কিন্তু এখন আর তার কোনোরকম দায়িত্ব নেই, এখন সে তার মুখখানি যত খুশি রুক্ষ করতে পারে। বাদলের ওই মুখ দেখেই তার সুতপা সম্পর্কে দুশ্চিন্তাটা ফিরে এল। সুতপার কথা ভাবতে ভাবতেই তার কেয়ার মুখ মনে পড়ল, কেয়ার সারা শরীর-মোচড়ানো হাসি, তার মুখখানি একটু বাঁকিয়ে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকা। কেয়ার কাছ থেকে সে আবার সুতপার কাছে ফিরে এল। হঠাৎ তার মনে হল, সুতপা সম্পর্কে বাদলের হয়তো এখনও একটু দুর্বলতা আছে। তাহলে বাদলকে অনন্ত সান্যালের পিছনে লেলিয়ে দিলে কেমন হয়? বাদলটা তো গুণ্ডা, ওর প্রাণে মায়া দয়া নেই, একবার যদি খেপে ওঠে তাহলে ওই বুড়ো ভামটাকে একেবারে উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়বে।

কিন্তু ক্ষণে-ক্ষণে মত বদলায় সিদ্ধার্থর। বাদলকে এইরকমভাবে কাজে লাগাবার কথা ভেবে সে নিজের ওপরই রেগে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বাদলের সাহায্য চাইতে হবে? কেন, বাদল কী এমন? গুণ্ডা হয়েছে বাদল, ওসব গুণ্ডাদের ঢের মস্তানি সিদ্ধার্থর দেখা আছে। বাদল যদি ফের এ-পাড়ায় কোনোরকম চ্যাংড়ামি করে, তাহলে সিদ্ধার্থ ওর শিরদাঁড়া মচকে দেবে। যত রাগ বাড়তে থাকে, ততই নিজেকে প্রচন্ড ক্ষমতাশালী মনে হয়, আর সেই মুহূর্তেই তার পরবর্তী কাজটা মনে পড়ে—সে একাই গিয়ে অনন্ত সান্যালের সঙ্গে দেখা করবে। সে সোজাসুজি তাকে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করবে, শালা বুড়ো যদি বেশি টুঁ ফুঁ করে—তাহলে সে একাই দেখিয়ে দেবে কী করে ওদের শায়েস্তা করতে হবে। ভাবতে ভাবতে রোঁয়া-ফোলানো সিংহের মতন সিদ্ধার্থর শরীরটা আক্রমণ-উদ্যত হয়ে উঠল, দাঁতে দাঁতে চেপে দাঁড়ায়, শিরা টানটান, নিশ্বাস দ্রুত হয়। তার মসৃণ মুখখানা বেলা এগারোটার রোদ্দুরে জ্বলন্ত মনে হয়। পৃথিবীর সব সমস্যা সে তার শারীরিক শক্তি দিয়েই সমাধান করে দেবার কথা ভাবে। যেন তার কোমরে ঝোলানো রয়েছে তলোয়ার, বাঁ-হাতে ধরে আছে দুরন্ত ঘোড়ার বলগা। নরেশদা বলছিলেন, তুমি একা কিছু পারবে না! সিদ্ধার্থ দেখিয়ে দেবে—সে একা পারে কি না।

অনন্ত সান্যালের বাড়ির কাছাকাছি এসে সিদ্ধার্থ নিজেকে একটু সংযত করে। নিজেকে বোঝায়, প্রথমেই কোনো বাড়াবাড়ি না করে আগে জেনে নিতে হবে ব্যাপারটা, হয়তো অনেকখানিই গুজব। নিউ সি. আই. টি. রোডে বাড়ি—একবার এয়ারপোর্টে যাবার সময় সুতপা তাকে ওই বাড়িটা দেখিয়েছিল। লোহার গেট, সামনে এক চিলতে বাগান, তা পেরিয়ে এসে সিদ্ধার্থ কলিং বেল টিপল। দরজা খুলল চাকর, তাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে বলল, বসুন, বাবু ওপরে আছেন, খবর দিচ্ছি। আপনার নাম কী? সিদ্ধার্থ শুধু নিজের নাম বলেছিল। তারপর শুরু হয়েছিল প্রতীক্ষা। সিদ্ধার্থ খবর দেবার প্রায় আধ ঘণ্টা পরে নীচে নেমেছিলেন অনন্ত সান্যাল। এতক্ষণ সময় একা ঘরে বসে-বসে সিদ্ধার্থ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। নিষ্প্রাণভাবে সাজানো ঘর, একটা বড়ো টেবিল এককোণে, কয়েকটা চেয়ার, একটা লম্বা সোফা, দুই দেওয়ালে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ফোটোগ্রাফ, একপাশে একটা কাঠের আলমারি—তার ভেতরে কী আছে দেখা যায় না, সেটার মাথায় একটা টেবল ক্লক। এই তার যুদ্ধক্ষেত্র।

কিন্তু অপেক্ষা করে-করে সিদ্ধার্থ ক্লান্ত হয়ে গেল। প্রথমে সে চেয়ারে বসেছিল, কিছুক্ষণ পর সোফায় গিয়ে এলিয়ে বসল। মাঝখানে একবার সে যখন উঠে এসে দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ডাকবে কি না ভাবছে—সেই সময় চাকর এসে আবার বলে গেল, বসুন, বাবু এক্ষুনি আসবেন। তারপরেও দশ-পনেরো মিনিট কাটে—বাড়িটা অসম্ভব নিস্তব্ধ—এ বাড়িতে কোনো বাচ্চা ছেলেমেয়ে নেই বোঝা যায়। ঘড়ির একঘেয়ে শব্দ, বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে আরও বিরক্ত লাগে।

হরিণের চামড়ার চটি পায়ে অনন্ত সান্যাল এসে ঢুকলেন বেশ শব্দ করে, দেরি করার জন্য কোনো কৈফিয়ত দিলেন না, টেবিলের ওপাশের ঘোরানো চেয়ারটায় বসলেন। বয়সের তুলনায় সিদ্ধার্থর চেহারাটা অনেক বড়ো দেখায়, আজকাল পথে-ঘাটে সবাই তাকে আপনি সম্বোধন করে, কিন্তু অনন্ত সান্যাল সরাসরি তাকে তুমি বলেই শুরু করলেন।

সিদ্ধার্থ খুব অবাক হয়েছিল ওঁকে দেখে। এরকম সে আশাই করেনি। সে ভেবেছিল একজন কুচক্রী কূট চেহারার বুড়োকে দেখবে। কিন্তু অনন্ত সান্যাল একজন প্রশান্ত চেহারার প্রৌঢ়, বয়স পঞ্চাশ পেরোলেও একটাও চুল পাকেনি, চামড়ায় ভাঁজ পড়েনি, উজ্জ্বল গায়ের রং, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, ভরাট কন্ঠস্বর। এই ধরনের মানুষকে দেখলে প্রথমেই রাগ করা যায় না কিছুতে। রাগের বদলে সিদ্ধার্থর লজ্জা হতে লাগল, কিছুটা ভয়ও।

গ্লানিহীন গলায় অনন্ত সান্যাল বললেন, সুতপা তোমাকে পাঠিয়েছে কোনো খবর দিয়ে? আজ তো বিকেলে আমার সঙ্গে ওর দেখা করার কথা আছে।

সিদ্ধার্থ বলল, না, সুতপা পাঠায়নি। আমি নিজেই একটা দরকারে এসেছি।

নিজের দরকারে? আমার কাছে? কী ব্যাপার?

সিদ্ধার্থর মাথার মধ্যে সমস্ত গোলমাল হয়ে গেল। কী বলবে কীভাবে শুরু করবে কিছুই মনে এল না। কিছুক্ষণ আগেও সে মনে-মনে ভেবে রেখেছিল সুতপার দাদা এবং অভিভাবক হিসেবে কীভাবে সে অনন্ত সান্যালকে জেরা করবে। কিন্তু এতক্ষণ একা ঘরে বসে অপেক্ষা করার পর সব গুলিয়ে গেছে।

হঠাৎ এক মুহূর্ত আগেও সে যা ভাবেনি সেইরকম একটা কথা বিদ্যুতের মতন মাথায় খেলে গেল। হ্যাঁ, এটাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায়, এটাই সবদিক থেকে যুক্তিসংগত—কথাটা মনে পড়তেই সিদ্ধার্থর বুকটা হালকা হয়ে গেল, হাঁটুর কাঁপুনি থেমে গেল। মুখ তুলে সে লাজুকভাবে বলল, আমি আপনার কাছে একটা চাকরির জন্য এসেছি—আমি বি. এস.-সি. পাশ করে—

অনন্ত সান্যাল একটা বড়ো নিশ্বাস ফেলে বললেন, চাকরি? আমার তো আর চাকরি দেবার ক্ষমতা নেই, ভাই।

আপনি সুতপাকে চাকরি দিয়েছিলেন—

তুমি এরই মধ্যে চাকরিতে ঢুকবে কেন? কী-ই বা এমন বয়স? বি. এস.-সি. পাশ করেছ—এবার টেকনিক্যাল লাইনে যাও, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ো—

আমার বায়োলজিক্যাল সায়েন্স ছিল, ইচ্ছে ছিল ডাক্তারি পড়ার—

তাই পড়লে না কেন?

পড়ার খরচ চালাবার কোনো উপায় নেই। আমার বাবা মারা গেছেন—

হুঁ, জানি সে কথা। তোমার ছোটোকাকার সঙ্গে আমি কলেজে পড়তাম—

আপনার অফিসে যদি—

কোনো উপায় থাকলে, তোমাকে আর দ্বিতীয়বার বলতে হত না। আমাদের ওটা বিলিতি কোম্পানি, কলকাতায় ছোটো ব্রাঞ্চ—সাহেবরা কড়া অর্ডার পাঠিয়েছেন—আর একজনও স্টাফ বাড়ানো চলবে না—বরং দু-চারজনকে ছাঁটাই করলে ভালো হয়—ম্যানেজার হয়েও আমার কোনো ক্ষমতা নেই—আর কলকাতায় তো স্ট্রাইক-ফাইক লেগেই আছে—কেউ খুশি নয়—

মা একটা কথা বলছিলেন—সুতপা তো পার্ট-টু পর্যন্ত পড়েছিল, বি.এ. পাশ করেনি—সুতপারও আর চাকরি করতে ভালো লাগছে না, এখন ওর ইচ্ছে আবার কলেজে পড়ে—ওর জায়গায় আমাকে যদি—

সুতপা বলেছে তার চাকরি করার ইচ্ছে নেই?

অনন্ত সান্যাল জোরে হেসে উঠলেন। চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে হাসির রেশ রেখেই বললেন, ছেলেমানুষ! একজনের জায়গায় আরেকজনের চাকরি দেওয়া যায়? সুতপা শর্টহ্যাণ্ড আর টাইপিং শিখে নিয়েছে, কাজকর্মও ভালো বুঝে নিয়েছে—আমার পি. এ.—কনফিডেনশিয়াল কাগজপত্র ডিল করে— তার জায়গায় অন্য কাউকে বসানো এখন অসম্ভব। সুতপা বলেছে তার কাজ করতে ভালো লাগছে না?

হ্যাঁ।

ছেলেমানুষ! মাঝে-মাঝে এক-আধদিন ওরকম সবারই মনে হয়। আমাদেরই কী আর রোজ-রোজ চাকরিতে যেতে ভালো লাগে? বাড়িতে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?

না, ঝগড়া নয়। ও আজকাল কারো কথা শোনে না। মা বলেছেন, অল্পবয়সে মেয়েরা চাকরিতে ঢুকলে অবাধ্য হয়ে যায়—প্রায়ই অনেক দেরি করে বাড়ি ফেরে। আমার ইচ্ছে নয়—সুতপা আর চাকরি করে।

সুতপাকে আমি স্নেহ করি, ও কাজ খুব ভালো শিখেছে, ওকে আমি ছাড়তে পারব না।

একেবারে মুখোমুখি চ্যালেঞ্জের মতন কথাটা এসে সিদ্ধার্থর কানে লাগল। বিস্ফারিতভাবে তাকিয়ে রইল, ওর গলার কাছে আটকে আসছে, এরপর কী বলবে কিছুতেই ঠিকভাবে মনে আসছে না। নিজেকে এমন অসহায় আর দুর্বল ও কখনো মনে করেনি। অনন্ত সান্যাল হাসিমুখে ওর পানে তাকিয়েছিলেন, সিদ্ধার্থ কিছু বলার আগেই তিনি আশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন, সারাদিন অফিসের খাটাখাটুনির পর আবার বাড়িতে বন্দি হয়ে থাকতে কারো ভালো লাগে? তোমার মাকে বোলো, চিন্তার কোনো কারণ নেই, ও অন্য কোথাও যায় না—আমার সঙ্গেই থাকে। আমি মাঝে-মাঝে ওকে একটু বেড়াতে-টেড়াতে নিয়ে যাই।

অনন্ত সান্যাল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, সিদ্ধার্থ নি:শব্দে তাঁর দিকে চেয়ে রইল। টেবিলের এ-পাশে এসে হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে তিনি বললেন, তুমি বাইরে যেতে রাজি আছো?

সিদ্ধার্থ কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, কী বললেন?

তুমি বাইরে গিয়ে চাকরি করতে রাজি আছো?

সুতপার কথা ভুলে গেল, অন্য আর কিছু চিন্তা না-করেই সিদ্ধার্থ বলল, হ্যাঁ! যে-কোনো জায়গায়—

বেশি দূরে নয়, রানাঘাট থেকে তিন মাইল দূরে—আমার এক বন্ধু ওখানে ইস্কুল করেছে একটা, নতুন, এ-বছরই, ওখানে আমি একটা চিঠি লিখে দিলে—

সিদ্ধার্থ হতাশভাবে বলল, ইস্কুল! তারপর ফ্যাকাশেভাবে হেসে বলল, না, আমি ইস্কুলে চাকরি করব না।

যেন অনন্ত সান্যালই সিদ্ধার্থর অভিভাবক, এই ভঙ্গিতে একটু গরম সুরে তিনি বললেন, কেন ইস্কুলে চাকরি করবে না কেন? আপত্তিটা কী শুনি! ওখানে ভালো থাকার জায়গা আছে, খাবারদাবার সস্তা, সপ্তাহে একদিন কলকাতায় আসতে পারবে।

না, ইস্কুলে আমি যাব না।

তোমাকে আমি সারাজীবন ইস্কুলে চাকরি করতে বলেছি? যতদিন না অন্য কিছু পাও, যে-কোনো কাজ পেলেই করা ভালো।

না, ইস্কুলে একবার ঢুকলে আর অন্য কোথাও যাওয়া যায় না।

কেন যাবে না? নিজের চেষ্টা থাকলেই হয়। আমিও তো যুদ্ধের সময় কিছুদিন গাঁয়ে মাস্টারি করেছি।

অনন্ত সান্যাল তীব্র দৃষ্টিতে সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বের কাছে সিদ্ধার্থ ক্রমশ ছোটো হয়ে যেতে লাগল। কোনো কথাই তার মুখে জোগাল না। অনন্ত সান্যাল আগের মতোই ঈষৎ ধমকের সুরে বললেন, শুধু-শুধু বসে থাকা কোনো কাজের কথা নয়—আমি আমার বন্ধুকে চিঠি লিখে দিচ্ছি—তুমি সেটা নিয়ে কাল-পরশু রানাঘাট চলে যাও! দাঁড়াও দেখছি, ঠিকানাটা কোথায় তার—

তিনি টেবিলের এ-ড্রয়ার ও-ড্রয়ার খুললেন। আলমারির পাল্লা টেনে দেখলেন, সেটা চাবি বন্ধ। বললেন, বোসো, আমি ওপর থেকে চাবিটা নিয়ে আসছি।

সিদ্ধার্থ চুপ করে বসে রইল। মফসসলে গিয়ে মাস্টারি করার ইচ্ছে তার একেবারেই নেই। অথচ লোকটা তাকে জোর করে সেই চাকরি দিতে চাইছে। সিদ্ধার্থ ঠিক প্রতিবাদও করতে পারছে না। একবার তার ইচ্ছে হল পালিয়ে যেতে। কিন্তু গেল না, বসেই রইল। আবার এক মিনিট দু-মিনিট করে সময় কাটতে লাগল। প্রতিটি মিনিট বহু দীর্ঘ। ক্রমশ দশ-পনেরো মিনিট। সোফা থেকে উঠে উদভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে রইল সিদ্ধার্থ, কী করবে বুঝতে পারছে না। এই প্রতীক্ষা অসহ্য লাগছে। একবার ভাবল চলে যাবে—দরজার কাছে এসেও সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেয়ে সে চোরের মতন ভয় পেয়ে আবার এসে বসে পড়ল।

পায়ের শব্দ যার সে আর ঘরে ঢুকল না, বারান্দা পেরিয়ে চলে গেল। আবার সময় কাটতে লাগল: এক মিনিট দু-মিনিট, সিদ্ধার্থ আবার উঠে দাঁড়াল—ঘড়িটার টিকটিক আওয়াজ তাকে এমনই বিরক্ত করছিল যে সে ঘড়িটা আলমারির মাথা থেকে নামিয়ে আনল কিছু না ভেবেই। সেই মুহূর্তে ফিরে এল তার সমস্ত রাগ—নিজের ওপর, এই বিশ্বসংসারের ওপর এক বিধ্বংসী রাগ। ভয়ংকর মুখ করে সে ভাবল, ওই হারামির বাচ্চা অনন্ত সান্যালের ওপর প্রতিশোধ নিতে হবে। শুয়ার কা বাচ্চা তাকে জোর করে বাইরে পাঠাতে চায়? মামদোবাজি? টপ করে সে ঘড়িটা পকেটে পুরে ফেলল। ফুলে উঠল প্যান্টের পকেট বেঢপভাবে। পরমুহূর্তেই সে ভাবল, না, সিমলে পাড়ার চৌধুরী বাড়ির ছেলে কখনো চোর হবে না। ঘড়িটা পকেট থেকে বার করেই সে এক আছাড় মারল। কাচ ভেঙে কাঁটা দুটো ছিটকে তুবড়ে গেল ঘড়িটা। সেটাকে সে পায়ের এক শটে ঠেলে দিল আলমারির দিকে। টেবিলের ওপর সাজানো ছিল অনন্ত সান্যালের প্যাড, একটা লাল নীল পেনসিল, একটা ফাউন্টেন পেন। প্যাডটা টেনে পেনসিল দিয়ে লিখতে গিয়ে দেখল সেটার শিস কাটা নেই, ছুড়ে ফেলল পেনসিলটা, কলমটা খুলে প্রথমে লিখল, শ্রদ্ধাস্পদেষু, তারপরই সেটার দিকে তাকিয়ে খ্যাস করে প্যাডের সেই পাতাটা ছিঁড়ে ফেলে পরের পাতায় লিখল ডিয়ার স্যার—তার নীচে খসখস করে লিখল—ওই মাস্টারির চাকরি আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। আমি মফসসলে মাস্টারি করে পচে মরার জন্য জন্মাইনি। আপনার অফারের জন্য ধন্যবাদ। ইতি সিদ্ধার্থ চৌধুরী। চিঠি শেষ করার পর জ্বলন্ত চোখে সেইদিকে তাকিয়ে রইল সিদ্ধার্থ, তারপর প্রাচীনকালের বিচারকরা মৃত্যুদন্ড দেবার পর যা করতেন, সেই ভঙ্গিতে কলমটাকে মুঠো করে ধরে ঘচাং করে মারল টেবিলের ওপর, নিবটা বেঁকে বঁড়শির মতন হয়ে গেল, ঘৃণাভরে সিদ্ধার্থ সেটাকেও ছুড়ে ফেলল মাটিতে।

তবুও তার রাগ কমল না। ধ্বংস করার যোগ্য আরও কিছুর খোঁজে সে এদিক-ওদিক তাকাল। আর কিছু না থাকায় সে জুতোসুদ্ধ পাখানা সোফার ওপর চাপিয়ে দিয়ে দু-তিনটে পায়ের ছাপ আঁকল, তারপর দরজাটা দড়াম করে খুলে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

বাইরে গেটের কাছে কমলালেবুর ঝুড়ি নিয়ে বসেছে এক ফেরিওয়ালা, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন করুণাদেবী। সিদ্ধার্থ এঁকেই কাল দেখেছিল। তাদের বাড়িতে। করুণাদেবী বিস্মিতভাবে তাকালেন সিদ্ধার্থর দিকে, তাকে চেনার চেষ্টা করলেন, চিনতেও পারলেন বোঝা গেল, মুখে শুধু প্রশ্ন করলেন, উনি নেমেছেন ওপর থেকে?

করুণাদেবীকে দেখে সিদ্ধার্থ একটু থতমত খেয়ে গেল, মুখের ভাব যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে বলল, না, আমার পক্ষে আর বসা সম্ভব হচ্ছে না—ওঁকে বলে দেবেন।

না, না, আরেকটু বোসো, আমি চাকরকে দিয়ে খবর পাঠাচ্ছি।

না, আমি আর বসতে চাই না।

ওদের পাশ কাটিয়ে সিদ্ধার্থ বাইরে বেরিয়ে এল। করুণাদেবী অবাকভাবে অনেকক্ষণ ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।







সিদ্ধার্থ ভেবেছিল দু-একদিনের মধ্যেই অনন্ত সান্যাল সুতপার কাছে তার কীর্তির কথা সাতকাহন করে লাগাবে—তাই নিয়ে সুতপা বাড়িতে এসে চেঁচামেচি করবে। কিন্তু সুতপার ব্যবহার দেখে সে অবাক হয়ে যায়। সুতপা সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেছে। কারোর সঙ্গে সে কথা বলে না বাড়িতে। কেউ তাকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করলেও কাটা-কাটা ছোটো উত্তর দেয়।

সুতপার চরিত্রে এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ নতুন। জেদি, অভিমানী ধরনের মেয়ে সুতপা—বেশির ভাগ সময়ই ফুরফুরে হাসিখুশিতে থাকে, হাসতে আরম্ভ করলে সহজে তাকে থামানো যায় না—আবার যখন রাগবে, রাগে গনগন করবে, তারপর ফেটে পড়বে একটু বাদে, কেঁদে-কেটে বাড়ি মাথায় করবে। সেই মেয়ের পক্ষে এমন দিনের পর দিন গম্ভীর হয়ে থাকায় সবাই বিমূঢ় বোধ করে। একটা উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত মেয়ে সব সময় মুখ বুজে আছে—এই ব্যাপারটা এমনই অস্বস্তিকর যে বাড়ির সবার চোখে-চোখে সেটা ফুটে উঠেছে।

কিন্তু করারও তো কিছু নেই, মা সুতপাকে জেরা করার চেষ্টা করেছেন, কাকা স্নেহ দেখাতে গিয়েছিলেন—সুতপা সাড়া দেয়নি, ঝাঁঝের সঙ্গে শুধু বলেছে, কী আবার হবে, কিছুই হয়নি! সিদ্ধার্থ নিজে থেকে সুতপাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যায়নি, সেও একটু এড়িয়ে থাকতে চাইছিল। আর টুনু এখন বিষম ব্যস্ত, বাড়ির এসব ব্যাপার লক্ষ করার সময় নেই তার।

সুতপা এক-দিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছে, সন্ধ্যার পরই সে অফিস থেকে ফিরে নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকে। এমনকী, সোমবার মায়ের একাদশী এটা খেয়াল রেখে সেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় কিছু ফল আর এক বাক্স মিষ্টি কিনে এনেছিল। কিন্তু সেগুলো এনে ও রেখেছিল বাইরের বারান্দায়—মাকে সে খেতে অনুরোধ করেনি, ঠিকে ঝি মানদাকে শুধু সংক্ষিপ্তভাবে বলেছিল, এই ফলগুলো মাকে কেটে দিয়ো।

মা আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে ঝি-কে বলেছেন, না, আমি ওসব খাব না! আমার পেট ভালো নেই। মায়ের গলার আওয়াজে একটা চাপা হাহাকার টের পেয়ে হঠাৎ সিদ্ধার্থর বুকটা মুচড়ে ওঠে। মার মুখখানা অসহায়। অসহায় তো হবেই! কিছুই করার নেই তাঁর। মেয়ে যদি কথা না শোনে, কথার উত্তর না দেয়—তাহলে এত বড়ো মেয়েকে তো আর মারধর করা যায় না।

সন্ধ্যাবেলা সবে গলির মোড় পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় এসে ডানদিকে বেঁকেছে সিদ্ধার্থ, দেখতে পেল একটু দূরে সুতপা আসছে। বিকেল থেকে তিন পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, রাস্তা ছপছপে আছে, সুতপা এক হাত দিয়ে শাড়িটা একটু উঁচু করে পা টিপে-টিপে হাঁটছে। একটা ময়ূরকন্ঠী রঙের ছাপা শাড়ি পরেছে সুতপা, হাতে একটা সাদা রঙের ব্যাগ। হঠাৎ সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করে যে, তার বোন সুতপা, যার ফ্রক-পরা চেহারাই তার চোখে বেশি ভাসে, তাকে এখন একজন পুরোপুরি মহিলা বলা যায়! বয়সের তুলনায় সুতপাকে এখন অনেক বড়ো দেখায়! কে বলবে, ওই মেয়েটার বয়স মাত্র কুড়ি বছর? খানিকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিদ্ধার্থ নজর না করে পারে না যে—সুতপার বুক দুটি ভরাট সুগোল, হাঁটার ভঙ্গিতে খানিকটা মাদকতা মাখানো, ফরসা মুখটাতে একটা অন্যরকম আভা।

বিপরীত দিক থেকে দুটি ছোকরা সুতপার কাছ দিয়ে আসতে আসতে দুজনে দু-পাশে চলে যায় এবং আলতোভাবে ইচ্ছে করে সুতপাকে ধাক্কা দেয়—সিদ্ধার্থ স্পষ্ট দেখতে পায়। এবং ছোকরা দুটি একেবারে সিদ্ধার্থর কাছাকাছি এসে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে সুতপাকে দ্যাখে। একজন ঝোলটানার ভঙ্গিতে বলে, দারুণ জিনিস, মাইরি।

দপ করে সিদ্ধার্থর মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। তার ইচ্ছে হয় ছেলে দুটোর কলার চেপে দমাদম করে মাথা ঠুকে দেয়। শুধু তাই নয়, ওদের মাটিতে ফেলে চাপাকলের জল খাইয়ে দেয়। বেপাড়ার ছেলে তার পাড়ায় এসে তার বোনকে ইনসাল্ট করতে সাহস করে! বেশি বেশি তেল হয়েছে! কিন্তু সেরকম কোনো নাটকীয় ঘটনা ঘটে না, সিদ্ধার্থ শুধু জ্বলন্ত চোখে ওদের দিকে তাকায়। ছেলে দুটি তখন সিদ্ধার্থকে পেরিয়ে গেছে, সিদ্ধার্থর চোখে চোখ পড়ে না—তারা ঘাড় ফিরিয়ে সুতপাকে আবার দেখে নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে-করতে চলে যায়।

সুতপার এসব দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে একই ভঙ্গিতে কাপড়টা উঁচু করে তুলে সাবধানে হাঁটছে। ছেলে দুটো যখন তাকে ধাক্কা দেয়—তখনও সে ফিরে তাকায়নি। যেন সে ধরেই নিয়েছে, রাস্তার ধুলো বালি কাদার মতন এগুলোও থাকবে, শিস, খিস্তি, ধাক্কা—কিন্তু আপাতত তার কাছে ওসবের চেয়ে শাড়িতে কাদা না লাগাটাই বেশি মনোযোগের যোগ্য। সুতপা সিদ্ধার্থর পাশ দিয়ে যাবার সময়—সিদ্ধার্থ পথের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে বলে—চোখ তুলে দাদাকে দেখল, এক পলকের বেশি দেরি করল না, আবার হেঁটে যেতে লাগল। যেন দুজনে পরস্পরের সম্পূর্ণ অচেনা। সিদ্ধার্থই ডাকল, এই তপু, শোন!

সুতপা থমকে দাঁড়াল, সিদ্ধার্থর দিকে আধাআধি তাকিয়ে মুখের ভঙ্গি কঠিন করে ঠাণ্ডা গলায় বলল, কী? চোখ দুটো ছোটো করেছে, ঠোঁট দৃঢ়ভাবে চেপে আছে—যেন সে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত।

তোর কী হয়েছে?

কিছু হয়নি!

সিদ্ধার্থকে অগ্রাহ্য করে সুতপা আবার হাঁটতে উদ্যত হল। যেন এসব বাজে কথা শোনার কিংবা উত্তর দেবার ধৈর্য তার নেই। সিদ্ধার্থ খুব অপমানিত বোধ করল। বছর তিনেকের মধ্যে সে সুতপার গায়ে হাত দেয়নি, কিন্তু আজ এক্ষুনি তার ইচ্ছে হল, পথের মাঝখানেই সে সুতপার গালে ঠাস করে একটা চড় কষায়! কী ভেবেছে কী ও, খুব স্বাধীন হয়ে গেছে? নিষ্ফল আক্রোশের ঝাঁঝালো গলায় সিদ্ধার্থ হুকুম করল, এই দাঁড়া! কথা বলছি, কানে যাচ্ছে না, না?

ঠিক একই রকম ভঙ্গিতে সুতপা আবার বলল, কী?

তোদের ম্যানেজার আমার নামে কিছু বলেছে?

কী আবার বলবে?

এবার দুজনে মুখোমুখি। চাপা রাগে ফুঁসছে সিদ্ধার্থ, সুতপার মুখে ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই। সে সব কিছু অস্বীকার করেছে। মিনিট কয়েক দুজনে তাকিয়ে রইল। সিদ্ধার্থ বুঝতে পারল, তার করার কিছুই নেই। সুতপা যত খুশি অপমান করতে পারে তাকে—কিন্তু সে আগেকার মতন ওর কান মলে দিতে পারবে না; কিংবা বেণী ধরে হ্যাঁচকা টান দিতেও পারবে না। একটা নিশ্বাস ফেলে সিদ্ধার্থ বলল, আচ্ছা যা—।

দুজনে আবার দুদিকে হাঁটতে লাগল। কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের মোড়ে এসে সিদ্ধার্থ একটা সিগারেট ধরিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চাইল। রাগ হলেই শরীরটা নিশপিশ করে। হাত মুঠো হয়ে আসে, লোম খাড়া হয়ে উঠতে চায়। তার সম্বল তার এই নিখুঁত শক্তিশালী শরীর, কিন্তু শারীরিকভাবে একটা ব্যাপারের প্রতিকার করতে না পেরে সে ছটফট করে ওঠে। সিদ্ধার্থ বুঝতে পারে—সুতপা এখন তার জীবনের সবকিছুর দায়িত্বই নিজে নিতে চাইছে—এই তো সেদিনও চুলের জট ছাড়াবার জন্য সে মায়ের কোলের কাছে বসত, রেডিয়ো স্টেশনের ভিতরে গিয়ে দেখবে বলে কিছুদিন আগেও ছোটোকাকাকে জ্বালাতন করেছে, সিদ্ধার্থর কাছে এসে তার সমস্ত বন্ধুবান্ধবীর গল্প বলেছে—আজ আর সে কাউকেই কিছু বলতে চায় না—সবকিছুই নিজের মধ্যে রাখতে চায়। সুতপার এই বদল লক্ষ করে সিদ্ধার্থ দিশেহারা হয়ে পড়ে। রাগের সঙ্গে-সঙ্গে সুতপার জন্য তীব্র দুঃখও বোধ না করে পারে না।

সুতপার থেকে সরে গিয়ে রাগটা আবার গিয়ে অনন্ত সান্যালের ওপর পড়ে। ওই লোকটার বিরুদ্ধে সিদ্ধার্থ কোনো প্রবল অভিযোগ খুঁজে না পেলেও সব কিছুর জন্য সে ওই লোকটাকেই দায়ী করে। ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে সিদ্ধার্থ মনে মনে বলে, দেখে নেব শালাকে আমি, দেখে নেব—ভেবেছে কী ও—ওর বাড়িটাই যদি আমি উড়িয়ে না দিই—

স্পষ্ট করে কিছু না ভেবেই সিদ্ধার্থ মানিকতলা মোড়ের কাছ চলে এসে সেই বিশাল ফ্ল্যাটবাড়ির দোতলার দিকে তাকিয়ে রইল। কেয়া তাকে আসতে বলেছিল, কিন্তু ঠিক কত তাড়াতাড়ি আসা উচিত—সিদ্ধার্থ বুঝতে পারেনি। দু-একদিনের মধ্যেই গেলে যদি কেয়া তাকে হ্যাংলা ভাবে—এই চিন্তায় সে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। তবুও এসেছিল গতকাল। বাড়িটার বিপরীত দিকে দাঁড়াতেই দেখতে পেয়েছিল—কেয়ারা বেরোচ্ছে, একজন প্রৌঢ় সম্ভবত কেয়ার বাবা—কেয়া ওকে দেখতে পায়নি—ট্যাক্সিতে উঠছিল ওরা—দুঃখিত হবার বদলে খুশিই হয়েছিল সিদ্ধার্থ। যাক, আরও একটা দিন কাটানো গেল। এরপর দেখা করলে নিশ্চয়ই—

সিদ্ধার্থ দেখল, কেয়াদের ফ্ল্যাটটা অন্ধকার। আজও ওরা বাড়ি নেই। আজ একটু খারাপ লাগল। এই সন্ধ্যাবেলা আর তো কোথাও যাবার জায়গা নেই। সিদ্ধার্থ রাস্তা পেরিয়ে বাড়িটার সামনে এল। কেয়ারা নেই বলেও আরও নিশ্চিন্তভাবে সে এখন এ-বাড়িতে ঢুকতে পারে। ফ্ল্যাট বাড়ি—কারোর কিছু বলবার নেই। দরজার পাশেই সারি-সারি লেটারবক্স—সিদ্ধার্থ কেয়াদেরটা চিনতে পারবে না—কারণ সে কেয়ার বাবার নাম জানে না। কেয়াদের দরজার তলা দিয়ে একটা চিঠি গলিয়ে দিলে কী খুব খারাপ দেখাবে? কিন্তু চিঠিতে ঠিক কী লেখা যায়? ও নিয়ে ভাবার মানেই হয় না—কেন-না কলম থাকলেও সিদ্ধার্থর পকেটে একটুও সাদা কাগজ নেই। সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়ে, না-না, সেরকম পরিচয় তো হয়নি—একদিনের আলাপ—বাড়িতে আসতে বলেছিল এই যা—

সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে এল কেয়া, সিদ্ধার্থকে একটু ধমকানোর ভঙ্গিতে বলল, আপনি কালা নাকি? জানালা দিয়ে এত ডাকছিলুম, শুনতে পাননি?

সিদ্ধার্থ দারুণ চমকে উঠল। হঠাৎ কেয়াকে দেখে কেন তার বুকের মধ্যে দুপ দুপ করতে লাগল—সে তার কোনো কারণই বুঝতে পারল না। বেশ কাঁপছে তার শরীর। মিয়ানো গলায় বলল, না তো, শুনতে পাইনি। আমাকে ডাকছিলেন! আপনাদের ঘর তো অন্ধকার!

সেই জন্যেই তো আপনাকে ডাকছিলুম। আপনি ফিউজ তার লাগাতে জানেন?

ফিউজ তার?

জানেন না? হিটারের প্লাগ লাগাতে গিয়ে হঠাৎ আমাদের আলো নিভে গেছে!

হ্যাঁ, জানি, এক্ষুনি আমি ঠিক করে দিচ্ছি!

কাজের কথায় সিদ্ধার্থ উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সে কেয়ার জন্য কোনো কাজ করে দিতে পারবে—এত সৌভাগ্য যেন সিদ্ধার্থ আশাই করেনি। ফিউজ তার তো কিছুই না—সিদ্ধার্থ কতবার লাগিয়েছে!

সিদ্ধার্থ এর আগে কোনো বাড়িতে দোতলায় মিটার, মেইন সুইচটা দ্যাখেনি। এ-বাড়িটা অন্যরকম কায়দার। প্রত্যেক ফ্ল্যাটের আলাদা মেইন—তাদের ঘরের মধ্যে। কেয়ার সঙ্গে চটপট সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল। দরজার সামনে মধ্যবয়স্কা মহিলার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে কেয়ার ছোটোভাই—কেয়ার বাবা বাড়িতে নেই। অন্ধকারে টুলের ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ বলল, একটা আলো আনুন। নেই? তাহলে দেশলাই?

অন্ধকারে কেয়া হাসতে হাসতে বলল, আপনার কাছে দেশলাই নেই! আপনি সিগারেট খান না?

এরকম নার্ভাস সিদ্ধার্থ আগে কখনো হয়নি। বোকার মতন বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার পকেটেই তো দেশলাই আছে—। টুলটা শক্ত করে ধরে থাকুন—আমাকে ছোঁবেন না কিন্তু—

ফিউজ তারই পুড়ে গেছে। সামান্য ব্যাপার। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল, ফিউজ তার আছে বাড়িতে?

ছিল বোধহয়, কিন্তু অন্ধকারে কোথায় খুঁজব? দাঁড়ান দেখছি যদি বাপির ড্রয়ারে...

ঠিক আছে আমি নিয়ে আসছি...

হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পাড়ার দোকান থেকে খানিকটা তার কিনে সিদ্ধার্থ আবার ঊর্ধ্বশ্বাসে ফিরে এল। ভাগ্যিস তার পকেটে আজ একটা টাকা ছিল—কেয়ার কাছে যদি পয়সা চাইতে হত—। এত ব্যস্ত হয়ে সিদ্ধার্থ অনেকদিন কোনো কাজ করেনি! হাঁপাতে-হাঁপাতে ফিরে এসে কেয়াকে বলল, আপনি দেশলাই জ্বেলে ধরে থাকুন—!

আনাড়ি হাতে দেশলাই জ্বেলে কেয়া সিদ্ধার্থর কাছে ঝুঁকে এল। কেয়ার শরীরের সেই মিষ্টি গন্ধটা সিদ্ধার্থ আবার টের পেল। চুলে নিশ্চয়ই ভালো তেল মাখে কেয়া। বেশি ব্যস্ততার জন্যই বারবার হাত ফসকে যেতে লাগল সিদ্ধার্থর। কেয়া বলল, তাড়াতাড়ি নিন না, হাত পুড়ে যাচ্ছে যে! কেয়ার মুখের দিকে তাকাতে সিদ্ধার্থর এত ভালো লাগছে—একটা কাঠি নিভে যেতেই ঘরময় অন্ধকার তখন—শুধু কেয়ার সেই গন্ধ। আবার ফস করে একটা কাঠি জ্বালতেই যেন একটা স্বপ্নে-দেখা মুখের মতন কেয়া তার কাছে চলে আসছে।

সুইচ অন করাই ছিল, হঠাৎ আলো জ্বলে উঠতে টুলের ওপর থেকে সিদ্ধার্থ একটু চাপা গর্বের সঙ্গে তাকাল, এত সামান্য একটা কাজ করে এত বেশি আনন্দ সে আর কখনো পায়নি।

কেয়া বলল, ধন্যবাদ মিস্ত্রিমশাই, এবার আসুন!

অন্ধকারে এ-ঘরের কিছুই দেখতে পায়নি সিদ্ধার্থ। এখন আলোতে সে অবাক হয়ে গেল। মেইন সুইচটা দেওয়ালের এককোণে এমনভাবে রাখা আছে যে—দরজা খুললে সবসময় দরজার আড়ালে থাকে। বাকি ঘরটা অপূর্ব সুন্দর। এমন ঝকঝকে সাজানো ঘর সিদ্ধার্থ আগে কখনো দ্যাখেনি। সারা ঘরটার কোথাও একটুও ধুলো বা অপরিচ্ছন্নতা নেই। একপাশে সোফাসেট—তার রেক্সিন যেন আজই লাগানো হয়েছে। একটা লম্বা বুককেস—তার মধ্যে ঠাসা প্রত্যেকটি বই নিখুঁতভাবে সাজানো—একটা বইয়েরও মলাট ছেঁড়া নেই, কাঠের পালিশ ঝকমক করছে। পিতলের জয়পুরী কাজ-করা ফুলদানিটা এত চকচকে যে তাতে মুখ দেখা যায়। রজনীগন্ধা ফুলগুলো যেন এইমাত্র তুলে আনা। দেওয়ালে একটুও দাগ নেই। ঘরটাতে দামি জিনিস এমন কিছু নেই—ঘরটার সতেজ পরিচ্ছন্নতাই মনকে খুশি করে দেয়।

ফিউজ তার সংক্রান্ত ব্যাপারটাতে সিদ্ধার্থর আড়ষ্টতা কেটে গেল। কথা বলতে কোনো অসুবিধা হল না। কেয়ার কোনো রকম আড়ষ্টতা নেই। কেয়া জিজ্ঞেস করল, এত কাছাকাছি থাকেন—এর আগে আসেননি কেন? আমি রোজই ভাবতাম আপনি বুঝি আসবেন—

কাল যে সিদ্ধার্থ এসেছিল, সেটা চেপে গিয়ে বলল, এই আসব আসব ভাবছিলুম—

খুব কাজে ব্যস্ত থাকেন বুঝি আপনি? তাহলে আসতে হবে না অবশ্য—

না, না, সেজন্যে নয়, এমনিই।

এমনি আবার কী? আসতে বলেছি আসবেন, ব্যস!

সিদ্ধার্থর অসম্ভব ভালো লাগছিল কেয়ার এই কথা শুনতে। এর আগে কোনো মেয়ে তার সঙ্গে এমন সহজভাবে কথা বলেনি, এমনভাবে তাকে আসতে বলেনি। তার অভিজ্ঞতায় সে দেখেছে, মেয়েদের সঙ্গে ছেলেরা কথা বলতে গেলেই মেয়েরা অহংকারী হয়ে ওঠে, পাত্তাই দিতে চায় না—নেহাত দয়া করেই যেন দু-একটা কথার উত্তর দেয়। কেয়ার সেরকম কোনো বালাই নেই! কেয়া নিজে থেকেই তাকে কত আসতে বলছে। সিদ্ধার্থর ইচ্ছে হল, কেয়া আরও বলুক।

কেয়া বলল, আমার কলেজের বন্ধুরা সবাই প্রায় সাউথ ক্যালকাটায় থাকে—রোজ-রোজ তো আর ও-পাড়ায় বেড়াতে যাওয়া যায় না। এদিকে কেউ চেনা নেই—নতুন এসেছি।

আপনারা নতুন এসেছেন বুঝি?

এই তো মোটে সাড়ে চার মাস।

আগে আপনারা কোন পাড়ায় থাকতেন?

দিল্লিতে, নিউ রাজেন্দ্রনগর—বাবা এখানে ট্রান্সফার হয়ে এসেছেন এক বছরের জন্য।

সিদ্ধার্থ মনে মনে ভাবল, ও তাই বলো, দিল্লির মেয়ে—সেইজন্যই, কলকাতার মেয়ে হলে এত সহজে মোটেই বাড়িতে আসতে বলত না। মা-বাবারাই অ্যালাউ করত না! বাইরের ছেলেমেয়েদের উচ্চারণে একটা টান থাকে। কিন্তু কেয়ার উচ্চারণ সব সময়ই স্পষ্ট। প্রৌঢ়া মহিলাটি ও কেয়ার ভাই পাশের ঘরে ছিল। অন্ধকারে সিদ্ধার্থ লক্ষ করেনি, এখন তিনি খাবার নিয়ে এ-ঘরে ঢুকতেই সিদ্ধার্থ দেখল, তিনি বাঙালি নন। সম্ভবত কোনো পাহাড়ি জাতের। ইনিই কী কেয়ার মা?

ট্রেতে সাজানো টোস্ট, ডিম ভাজা আর পটে চা। সিদ্ধার্থ বলে উঠল, এ কী, এসব আবার কী!

আপনার জন্য তৈরি হয়নি। আমাদের জন্যই তৈরি হচ্ছিল, মাঝখানে ব্যস ফট, অন্ধকার! নিন খেয়ে নিন।

সিদ্ধার্থ প্লেটটা টেনে নিয়ে খেতে যেতেই কেয়া বলল, ও কী, আপনি হাত না ধুয়েই খাচ্ছেন! কী ছেলে বাবা! তার-ফার ঘেঁটে—যান, ওই যে বাথরুম।

সিদ্ধার্থ অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। কেয়ার সামনে সে কিছুতেই স্মার্ট হতে পারছে না। বাথরুমে ঢুকে পড়ল। বাথরুমটা এত পরিষ্কার যে সেখানে শুয়ে থাকাও যায়। সাদা টালি বসানো ধপধপে ঝকঝকে মানিকতলাতেও যে এরকম ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে, সে জানতই না। ঘরের সঙ্গে লাগানো বাথরুম তার এত ভালো লাগে—কিন্তু কোনোদিন কী সে এরকম বাড়িতে থাকতে পারবে? তাদের বাড়িটা আশি-নব্বই বছরের পুরোনো—দেওয়াল রীতিমতো ড্যাম্প। এই বাথরুমে চান করে, এই আয়নায় সে মুখ দেখে। সেই আয়নার সামনে সিদ্ধার্থ দাঁড়াল। হঠাৎ স্নানসিক্ত অবস্থায় কেয়ার চেহারাটা কল্পনা করে তার রোমাঞ্চ হল, দু-তিন সেকেণ্ড সেই কল্পনাটা নিয়ে খেলা করার পর—নিজেকে কিছুটা অপরাধীও মনে হল তার!

কেয়ার ভাইয়ের বয়স বছর ছয়েক, ভারি সুন্দর দেখতে, মুখখানা দুষ্টু-দুষ্টু, কিন্তু সারাক্ষণ সে চুপ করেই আছে। চোখ দেখে মনে হয় তার খুব ঘুম পেয়েছে। কেয়া সেই মহিলাটিকে দুর্বোধ্য হিন্দিতে কী বলার পর মহিলাটি ছেলেটিকে নিয়ে চলে গেল।

সিদ্ধার্থ বলল, আপনি চমৎকার হিন্দি বলেন তো! দিল্লিতে কতদিন ছিলেন—

আমার ছ-বছর বয়স থেকে। কিছুদিন আমেদাবাদেও ছিলাম। আপনারা কলকাতায় কত দিন আছেন?

প্রায় তিন পুরুষ। কিন্তু আপনি বাংলাও এত ভালো শিখলেন কী করে?

আমার মা শান্তিনিকেতনের ছাত্রী ছিলেন। মা-র কাছে বাংলা শিখেছি—আমার বই পড়ার শখ—অনেক বাংলা বইও পড়েছি।

এখানে তো সব দেখছি ইংরেজি বই।

মোটেই না! আমার ঘরে অনেক বাংলা বইও আছে। দেখবেন? আসুন!

পাশে আরেকখানা ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। কেয়া সেটাকে ঠেলা দিয়ে খুলল। পরিচ্ছন্নতায় এ-ঘরখানাও কম যায় না। পাশাপাশি দু-খানা খাট দুই ভাইবোনের। একটা আলমারি, একটা আলনা—আর বই, বই, শুধু বই। সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে বলল, এত বই আপনি পড়েন?

তা ছাড়া আর কী করব? এখানে তো বেড়াবার কিংবা খেলাধুলো করার কোনো জায়গা নেই। যা বিচ্ছিরি শহর আপনাদের। শুধু বই পড়ি আর চিঠি লিখি—

কাকে?

আমার দিল্লির বন্ধুদের। আবার তো আটমাস বাদেই ফিরে যাব। ওখানেই আমার বন্ধু বেশি।

সিদ্ধার্থ মনে মনে চট করে ভেবে নিল, কেয়া দিল্লি ফিরে গিয়ে তাকেও কী চিঠি লিখবে? বেশ মোটা একটা খাম—রাত্তিরে বাড়ি ফেরার পর মা অবাক হয়ে তার হাতে তুলে দেবেন, সিদ্ধার্থ আরও অবাক হয়ে সেটা নেবে।

বই দেখছিল সিদ্ধার্থ, র‌্যাকের ওপর থুতনি রেখে দাঁড়িয়েছিল কেয়া। আচমকা সে বলল, আমাকে আপনি তুমি বলতে পারেন। আমরা বন্ধুবান্ধবরা সবাই সবাইকে তুমি বলি।

স্মার্ট হবার খানিকটা সুযোগ পেয়ে সিদ্ধার্থ তাড়াতাড়ি বলল, আমিও ওই কথাটা বলব ভাবছিলাম। অবশ্য, দিল্লির নিয়ম তো জানি না। আমরা কলেজে সব ছেলেমেয়েই প্রথমদিন থেকেই তুমি করে কথা বলি। এমনকী অনেক মেয়েকে তুইও বলতাম।

আপনি কোন কলেজে পড়েছেন?

ঈষৎ অহংকারের সঙ্গে সিদ্ধার্থ বলল, প্রেসিডেন্সি।

বি. এস.-সি. পাশ করার পর আর পড়লেন না কেন?

সিদ্ধার্থ আবার একটু থতমত খেয়ে গেল। নিজের দারিদ্র্যের কথা সে কখনো বলতে লজ্জা পায় না। কিন্তু কেয়ার সামনে কিছুতেই বলতে পারল না। একবার সে ভাবল, কাঁধ ঝাঁকিয়ে অবহেলার ভঙ্গি দেখিয়ে বলবে, কী হবে আর পড়াশুনো করে, আজকাল এসবের কোনো দাম নেই। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই একটা মিথ্যা কথা বানিয়ে বলার বদলে বলল, আমি ডাক্তারিতে ভর্তি হব, সব ঠিকঠাক ছিল, হঠাৎ একটা চাকরির অফার পেয়ে গেলাম।

কেয়া খিলখিল করে হেসে বলল, এইটুকু ছেলে...চাকরি?

এইটুকু ছেলে মানে?

কী চাকরি করেন আপনি?

সে চাকরিটা অবশ্য নেওয়া হয়নি, মাদ্রাজে ট্রেনিং-এ পাঠাতে চেয়েছিল, মা রাজি হলেন না কিছুতেই—

বা:, এই তো বাংলাদেশের ছেলে—

সিদ্ধার্থ তাকিয়ে রইল কেয়ার দিকে, মিথ্যে কথা বলতে শুরু করার পর তার বুকটা আবার দুপদুপ করতে শুরু করেছে—সিঁড়ির মুখটায় কেয়ার সঙ্গে দেখা হবার পর যেমন হয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে এখন আর ফেরা যায় না। সিদ্ধার্থ আবার বলল, ভাবছি সামনের টার্মে ডাক্তারিতেই ভর্তি হয়ে যাব। আমার ছেলেবেলা থেকেই শখ ডাক্তার হওয়া।

ও-ঘর থকে আবার ওরা ফিরে এল বসবার ঘরে। কেয়া জিজ্ঞেস করল, গান শুনবেন? উত্তরের অপেক্ষা না করেই কেয়া রেকর্ড-প্লেয়ারে একটা সেতারের রেকর্ড চালিয়ে দিল। খুব মৃদু আওয়াজে ঘর ভরে গেল। ফিরে এসে কেয়া বলল, কার সেতার বলুন তো? চিনতে পারলেন না? আপনি বুঝি গান-বাজনা ভালোবাসেন না? রবিশঙ্কর—দিল্লিতে রবিশঙ্কর একদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, জানেন, এমন চমৎকার লোক—সঙ্গে দুটি আমেরিকান মেয়ে এসেছিল, ভারি সুইট দেখতে—

কেয়া অনর্গলভাবে দিল্লির গল্প বলে যেতে লাগল। সিদ্ধার্থ একবার আড়চোখে দেখে নিল নিজের হাতঘড়ি: সওয়া আটটা বাজে। ঠিক কখন ওঠা উচিত? কেয়া তো নিজের থেকে কিছু বলবে না—তারই তো একসময় বলা উচিত, এবার চলি! কিন্তু ঠিক কখন বলতে হবে? গল্পের মাঝখানে হঠাৎ কী উঠে পড়া যায়! সিদ্ধার্থর একেবারেই যেতে ইচ্ছা করছে না। ভদ্রতার সীমায় শেষ পর্যন্ত সে বসে থাকতে চায়। তার অসম্ভব ভালো লাগছে। সামনের সোফায় বসে আছে কেয়া—একটা হাত ছড়িয়ে দিয়েছে হাতলে। পায়ের ওপর পা দিয়ে ঈষৎ বেঁকে বসেছে—কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরা তার তন্বী শরীরখানাকে মনে হচ্ছে উড়ন্ত প্রজাপতির মতন—কোনোরকম জড়তা, আড়ষ্টতা নেই তার ব্যবহারে। এমন সুন্দর পরিষ্কার সাজানো ঘর, মৃদু সংগীতের ঝংকার—সব মিলিয়ে যেন একটা ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া লাগছে সিদ্ধার্থের বুকে। ভাগ্যিস সেদিন ও শিবেনের সঙ্গে ছোটোমাসির বাড়িতে গিয়েছিল, আদিনাথের সঙ্গে মাংস খেতে যায়নি—তাই তো কেয়ার সঙ্গে আলাপ হল। এত কাছে!

কেয়ার পাশ-ফেরানো মুখের একটা ভঙ্গির দিকে চেয়ে সিদ্ধার্থ দারুণ চমকে উঠল। অনেকক্ষণ থেকেই তার মনে হচ্ছিল—কেয়ার মুখে কী যেন একটা চেনা-চেনা ব্যাপার আছে। ঠিক বুঝতে পারেনি। এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। কেয়ার মুখের সঙ্গে সুতপার খানিকটা মিল আছে। আলাদাভাবে নাক কিংবা চোখের কোনো মিল নেই, কিন্তু সব মিলিয়ে কোথাও একটু একরকম ভাব আছে। হঠাৎ বিনা নোটিশে সিদ্ধার্থর দু-চোখের কোণ জ্বালা করে উঠল, এখনই যেন জল এসে পড়বে। গলার কাছে খানিকটা বাষ্প এসে জমা হল। সুতপাও কী এইরকম হতে পারত না! কিছুদিন আগেও তো সে ছিল ভারি সরল সুন্দর মেয়ে, লেখাপড়াতেও মাথা ছিল—সেও কী এরকম কোনো সাজানো সুন্দর ঘরে বসে সাবলীলভাবে কারোর সঙ্গে গল্প করার অধিকার পেতে পারত না? তার বদলে রাগ, অভিমান, গঞ্জনা, লোভ আর নোংরামির মধ্যে থেকে অকালেই সে বয়স্ক হয়ে যাচ্ছে—সব সময়ে তার মুখ বিষণ্ণ আর থমথমে। না, এবার থেকে সে তপুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে, তপুকে এই সুন্দর সহজ জীবন ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা করবে।

কেয়া অনেক বলে যাচ্ছিল! তার বাবা ইনকাম ট্যাক্সের অফিসার—বেশির ভাগ সময় দিল্লিতেই থাকেন, কখনো দু-এক বছরের জন্য অন্য কোথাও ট্রান্সফার হলেও সপরিবারে যান না। এবারে কলকাতায় এসেছেন একটা বিশেষ কারণে। কেয়াকেও সেজন্য এখানকার কলেজে ট্রান্সফার নিতে হয়েছে—বরাবর সে ইংরেজি স্কুল-কলেজে পড়েছে—এখানে তাই ভর্তি হয়েছে লোরেটোতে—কিন্তু সেখানকার পরিবেশ ওর পছন্দ হচ্ছে না—বাঙালি মেয়েরা পর্যন্ত বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু জানে না, জানতেও চায় না—সবাই সাজপোশাক নিয়ে ব্যস্ত! তবে অদিতি খুব ভালো মেয়ে। আর কী সুন্দর! বলুন, অদিতির মতন এত সুন্দর মেয়ে সহজে দেখা যায় না। বলুন? টুলটুলকে দেখতে সত্যিই খুব সুন্দর, সিদ্ধার্থ ভাবল, কিন্তু এই সুযোগে সে টুপ করে বলে ফেলল, কিন্তু আপনিও খুব সুন্দর! আমার চোখে আপনিই বেশি, মানে, ইয়ে, আপনাকেই বেশি সুন্দর মনে হয়—

কথাটা বলেই সিদ্ধার্থ লজ্জায় মুখ লুকোল। কেয়া অকপট বিস্ময়ে বলল, ভ্যাট, আপনার চোখ নেই নাকি? অদিতির সঙ্গে আমার তুলনা? অদিতির কী চমৎকার ফিগার—আর কী গ্রেসফুল মুখ—সাজপোশাক ছাড়াই—

কেয়া ছেলেমানুষের মতন তর্ক করে বোঝাতে চাইল যে টুলটুল তার চেয়ে কত বেশি সুন্দরী। নিজের সম্পর্কে কেয়ার একটুও অহংকার নেই দেখে সিদ্ধার্থর আরও ভালো লাগল। কেয়ার কথার মধ্যে কী যেন একটা বাদ থেকে যাচ্ছে মনে হচ্ছিল সিদ্ধার্থর! সে-কথাটা মনে হতেই সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল, আপনার মা কোথায়?

কেয়া এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। একটা হালকা ছায়া খেলা করে গেল তার মুখে। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমার মা বেঁচে নেই। ওই যে আম্মা, অনেক দিন ধরে কাজ করছে আমাদের বাড়ি থেকে, ও-ই সব দেখাশুনো করে।

সিদ্ধার্থ মনের মধ্যে আবার আঘাত পেল। এত ভালো মেয়ে কেয়া—কিন্তু এই দুর্ভাগ্য তার প্রাপ্য ছিল না। তার মা থাকলেই সর্বাঙ্গসুন্দর হত। মা নেই শুনেই কেয়াকে তার দারুণ নি:সঙ্গ মনে হল।

কেয়া কিন্তু আবার হঠাৎ খুশিতে ঝলমল হয়ে বলল, তবে, জানেন, শিগগিরই আমার নতুন মা আসছেন। বাবা আমার অপর্ণা মাসিকে বিয়ে করছেন! কী মজা, যাকে আগে অপর্ণা মাসি বলতুম, এরপর তাকে মা বলব! আমার চেয়ে মোটে দশ বছরের বড়ো, মোটেই মা-মা মনে হয় না!

সিদ্ধার্থর কাছে এসব কথা নতুন। বাবা আবার বিয়ে করবেন, তাঁর মেয়ে খুশির সঙ্গে একথা জানাচ্ছে—এসব সিদ্ধার্থর জগতের বাইরে। মাসিকে মা বলে ডাকার কথা ভাবতেই তার গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল। তারও তো বাবা নেই। ছোটোকাকাকে যদি বাবা বলে ডাকতে হত? ধুত! যত সব বাজে! এদের ব্যাপারই আলাদা।

সিদ্ধার্থর হঠাৎ মনে হল, কেয়ার বাবার সঙ্গে তার আজ দেখা না-হলেই ভালো হয়। তাড়াতাড়ি সে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল।

আজ চলি। একদিন আপনিও আমাদের বাড়িতে আসবেন।

হ্যাঁ, কবে নিয়ে যাবেন? আপনার বোনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন বলেছিলেন। কী নাম আপনার বোনের?

সুতপার প্রসঙ্গে সিদ্ধার্থ আবার একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আর কথা না বলে চলে এল দরজার দিকে। কেয়াও এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। কেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধার্থ হেসে বলল, মাঝখানে একবার কথা হয়েছিল আমরা দুজনে দুজনকে তুমি বলব। বলিনি কিন্তু—

কেয়াও হেসে বলল, ঠিক আছে, এরপর থেকে—

হ্যাঁ, এরপর যখন দেখা হবে—সেদিন তোমাকে আমি তুমি বলব!

কবে আসবেন? কাল? না, কাল সন্ধ্যাবেলা থাকব না, পরশু?

সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় কোথা থেকে একটা অবাঞ্ছিত চিন্তা এসে সিদ্ধার্থর মাথায় ঢুকল। কিছুতেই তাড়াতে পারল না। কেয়ার বাবা ইনকাম ট্যাক্স অফিসার। সিদ্ধার্থ শুনেছে, অধিকাংশ ইনকাম ট্যাক্স অফিসারই নাকি ঘুষখোর। কেয়ার বাবাও কী তাই? না, না, তা হয় না। কেয়াদের অমন সুন্দর সংসার, কীরকম যেন একটা পবিত্র-পবিত্র ভাব—সেখানে কেয়ার বাবা যদি একটা ঘুষখোর পাজি লোক হন—সিদ্ধার্থ সেটা মোটেই সহ্য করবে না। কিন্তু যদি হয় তাহলে কী করবে সে? নরেশদারা যেমন বলেন, সেইরকম সত্যিই যদি কোনো বিপ্লব শুরু হয়ে যায়—তাহলে এইসব ঘুষখোর অফিসারদের প্রথমেই খতম করে দেওয়া হবে—কেয়ার বাবাকেও কী?

সিঁড়ির শেষ ধাপে পা দেবার আগেই সিদ্ধার্থ কল্পনায় দেখল, কলকাতার পথে-পথে দারুণ হইহই আর উত্তেজনা, ছুটে পালাচ্ছে মানুষজন, গটগট করে বুটের শব্দ করে কারা যেন তেড়ে এল—দূরে জ্বলছে দাউ-দাউ আগুন, ভেসে আসছে হল্লা আর পচা কাঠপোড়া গন্ধ, সিদ্ধার্থ একটা নীল রঙের কোট গায়ে দিয়ে ছুটছে, তার হাতে রাইফেল, তার চোখ জ্বলছে—সে একাই সবকিছুর শোধ নেবে, একাই—দেওয়ালের সামনে লাইন করে দাঁড় করিয়েছে যত রাজ্যের কালোবাজারি আর ঘুষখোরদের—তাদের মারার জন্য সিদ্ধার্থ রাইফেল তুলেছে—যদি দ্যাখে তাদের মধ্যে কেয়ার বাবাও মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে? সিদ্ধার্থ দাঁতে দাঁত চেপে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভাবল, হোক কেয়ার বাবা! তখন সে কাউকে রেয়াত করবে না! সোজা রাইফেলের একটা গুলিতে—কিন্তু যদি কেয়া এসে মিনতি করে? যদি কেয়া তার হাত জড়িয়ে ধরে কাতরভাবে বলে, সিদ্ধার্থদা, আপনি…না, আপনি নয়, সিদ্ধার্থদা, তুমি আমার বাবাকে—তখন? দূর ছাই, কোথাও কিছুর দেখা নেই, এখনই যত সব আজেবাজে ভাবনা! দৃশ্যটা কিন্তু সিদ্ধার্থর মাথা থেকে তখনও মোছেনি। কল্পনার সামান্য কারচুপিতে সে অপরাধীদের লাইন থেকে কেয়ার বাবাকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে অনন্ত সান্যালের ছবি বসিয়ে রাইফেল চালাল, গুড়ুম! গুড়ুম!







বাবা তখন বেঁচে, সিদ্ধার্থরা বাড়িসুদ্ধু সবাই দেওঘর বেড়াতে গিয়েছিল একবার, পুজোর ছুটিতে। বম্পাস টাউনে বাড়ি ভাড়া করে ছিল দেড় মাস। মাত্র ছ-বছর আগের কথা, কিন্তু এর মধ্যেই জীবন কত বদলে গেছে মনে হয়। টুনু তখন একেবারেই ছেলেমানুষ, খুব ভীতু ছিল, রাস্তায় কোনো ষাঁড় দেখলেই ভয়ে-ভয়ে দাদার গা ঘেঁষে দাঁড়াত, কোনো গভীর কুয়োর ধারে উঁকি দিতেও পারত না—তাতে টুনুর মাথা ঘুরে যেত। অদ্ভুত সারল্য মাখানো সুন্দর মুখ ছিল টুনুর, যে-কোনো নতুন লোকই ওদের বাড়িতে এলে টুনুকে দেখে বলত, বা:, ভারি সুন্দর দেখতে তো ছেলেটিকে! একবার তো এক সিনেমা কোম্পানির কয়েকটা লোক রাস্তায় টুনুকে দেখে এত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, বাড়িতে এসে দেখা করে, ওরা টুনুকে একটা সিনেমায় নামাবার প্রস্তাব করেছিল। বাবা অবশ্য এক কথাতেই সে-প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিলেন। সেই টুনু এখন হাতবোমা বানায়।

সুতপা তখন ফ্রক পরে। কী ভীষণ দুরন্ত আর ছটফটে ছিল। অফুরন্ত প্রাণশক্তি, এক মিনিটও চুপ করে বসে থাকতে পারত না। দেওঘরেই তো, আতাগাছে উঠে দুপুরবেলা বাঁদর দেখে ভয় পেয়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছিল সুতপা। সুতপার পায়ের ব্যথা কিছুতেই কমছিল না বলেই ওদের তাড়াতাড়ি কলকাতায় ফিরে আসতে হল। তখন বেশ রোগা ছিল সুতপা, এক মাথা ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল, হরিণীর মতন জোরে ছুটতে পারত—বাবা বলতেন, আমার এই মেয়েটা ছেলে হতে-হতে শেষ মুহূর্তে মেয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে মুরগি কাটার সময় টুনু সেখানে থাকত না, আড়ালে গিয়ে কাঁদত, কিন্তু সুতপা সারাক্ষণই দাঁড়িয়ে থাকত। একবার একটা পলাতক মুরগিকে সিদ্ধার্থ আর সুতপা অনেক ছুটোছুটি করে ধরে এনেছিল।

মায়ের চেহারা ছিল তখন একেবারে অন্যরকম। মাকে এখন যেন চেনাই যায় না। বড়ো করে সিঁদুরের টিপ পরতেন মা, চওড়া পাড়ের গরদ-রঙা শাড়ির আঁচল কোমরে জড়িয়ে তিনি একা-একাই দেওঘরের বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে আনতেন। বাবা ছিলেন একটু ঠাণ্ডা ধরনের মানুষ, মায়ের ধারণা ছিল দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ বাবাকে ঠকাবার জন্য ওত পেতে আছে। বাবা নিজে থেকে কোনো কিছু কিনে আনলেই মা হাঁ-হাঁ করে উঠে বলতেন, আবার তুমি সর্দারি করে নিজে কিনতে গেছ; কত দাম নিয়েছে চাদরটার? সাতাশো টাকা? গলা কেটেছে একেবারে! কাটবে না কেন! পেয়েছে তো একটা সরেশ গলা! মা নিজে যখন কোনো কিছু কেনার পর বুঝতে পারতেন যে ঠকেছেন, বাবা কিন্তু তখন কিছু বলতেন না, শুধু মিটিমিটি হাসতেন!

সিদ্ধার্থ প্রত্যেক দিন সকালবেলা তপু আর টুনুকে নিয়ে নন্দন পাহাড়ে বেড়াতে যেত। অল্প অল্প শীতের মিষ্টি হাওয়া, চারদিকে এমন একটা টাটকা ভাব যেন মনে হত, পৃথিবীর হাওয়ায় আর একটুও ধুলোবালি নেই, প্রত্যেকটি নিশ্বাসের পরিষ্কার বাতাস বুকের ভেতরটা পর্যন্ত ধুয়ে মুছে দিয়ে আসছে। গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে পড়ছে শিশিরের জল, পায়ের তলার ঘাস চুপচুপে ভিজে, তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ায় এক ধরনের মাদকতা ছিল। সিদ্ধার্থর এখন মনে হয়, তখন, সেই ছ-বছর আগেকার দেওঘরে সে যেন দেখেছিল ঘাস ও গাছপালার রং অনেক বেশি গাঢ় সবুজ, ভোরবেলায় আকাশ টকটকে নীল, লালচে রঙের রাস্তাটাও ছিল ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন—যেন তার উপর শুয়ে থাকা যায়, কোথাও কোনো মলিনতা ছিল না। একটা কালো রঙের কুকুর রোজ ওদের সঙ্গে ছুটতে-ছুটতে যেত—সেই কুকুরটার শরীরেও কোনো খুঁত ছিল না—সিদ্ধার্থর মনে আছে। সিদ্ধার্থর এখন মাঝে-মাঝে মনে হয়, ওই রকম গাঢ় সবুজ রঙের গাছপালা ও টকটকে নীল আকাশ—সে বোধহয় আর ইহজীবনে দেখতেই পাবে না।

তখন সিদ্ধার্থর বয়স ষোলো, হায়ার সেকেণ্ডারি পাশ করে সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে, সবল তেজি শরীর; সিদ্ধার্থ নিজেকে সে-সময় টুনু আর তপুর চেয়ে অনেক বড়ো বলে ভাবতে আরম্ভ করেছে। ছেলেবেলা থেকে সিদ্ধার্থ একটু গোঁয়ার ধরনের, কোথাও বেড়াতে যাবার আগে মা প্রতিবার সাবধান করে দিতেন, দেখিস যেন কারোর সঙ্গে মারামারি-টারি করিস না! কী শুনলি তো? মনে থাকবে? এমনিতেই লাজুক ধরনের, কিন্তু হঠাৎ রাগ হলে কিংবা অপমানিত বোধ করলে সিদ্ধার্থর আর জ্ঞান থাকে না। সমবয়সি ছেলেদের সঙ্গে তো সিদ্ধার্থ অনেকবারই মারামারি করেছে, এমনকী একবার ট্যাক্সিতে বিশালকায় পাঞ্জাবি ড্রাইভার তার বাবার সঙ্গে অপমানজনকভাবে কথা বলেছিল বলে সিদ্ধার্থ রাগের মাথায় হঠাৎ তার দাড়ি মুঠো করে চেপে ধরেছিল। পাঞ্জাবি ড্রাইভারটির চেহারা সিদ্ধার্থর অন্তত দ্বিগুণ, হাতে বালা ও কোমরে ছুরি ছিল, তবু সিদ্ধার্থ তার দাড়ি চেপে ধরেছে দেখে বাবা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ড্রাইভারটি হিংস্র হয়ে উঠে সিদ্ধার্থর টুঁটি টিপে ধরেছিল, কিন্তু রাস্তায় ভিড় জমে যাবার ফলে সিদ্ধার্থ প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। ছেলের সাহসিকতায় খুশি না-হয়ে বাবা সে-বার খুব বকেছিলেন সিদ্ধার্থকে।

দেওঘরে সেই ভোরবেলা তপু আর টুনুকে দু-পাশে নিয়ে সিদ্ধার্থ নন্দন পাহাড়ের দিকে বেড়াতে যেত। না, দেওঘরে কোনোদিন কোনো মারামারি হয়নি, কোথাও কোনো অশান্তি ছিল না। কী হালকা ছিল জীবনটা! নন্দন পাহাড়ে ওঠার জন্য সিঁড়ির ধাপ কাটা আছে, কিন্তু ওরা সেই সিঁড়ি দিয়ে না-উঠে পাথর ভেঙে উঠত। তরতর করে ছুটত ওরা তিনজনে; ধারালো পাথরে পা দিয়ে লাফিয়ে-লাফিয়ে কে আগে ওপরে পৌঁছোয় এই প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিত। চূড়ায় উঠে চোখে পড়ত নীচের হলুদ-নীল চৌকোকাটা ধানখেত, ব্রিজের নীচে নদীর তিরতিরে জল, খেলনার মতন রেললাইন। পিছনে ডিগরিয়া আর সামনে ত্রিকূট পাহাড়ের গম্ভীর কালো মেঘের মতন বিস্তার। হালকা জীবন, পাহাড়ের চূড়ায় উঠে এই পৃথিবীকে পায়ের তলায় রাখার আনন্দ।

নন্দন পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়েই সিদ্ধার্থ প্রথম সিগারেট খেয়েছিল। কলেজের বন্ধুর সঙ্গে দু-এক টান দিয়েছে আগে, কিন্তু ভাইবোনের সামনে সেই প্রথম। টুনু তখন হাফপ্যান্ট পরে, সুতপা ফ্রক, কিন্তু সিদ্ধার্থ কলেজে ঢোকার সময়েই এক জোড়া ট্রাউজার্স পেয়েছে। পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, প্যান্টের পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সিদ্ধার্থ এমন মুখের ভাব করেছিল, যেন এই পৃথিবীতে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। সুতপা চেঁচিয়ে উঠেছিল, দাদা, শিগগির সিগারেট ফেলে দে, শিগগির, ওই যে বাবা আসছে! সিদ্ধার্থ তাড়াতাড়ি সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিতেই সুতপা খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়েছিল।—কেমন ঠকিয়েছি! কীরকম! দাদা, তোর মুখখানা ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছিল! সিদ্ধার্থ তখন সুতপার মাথায় একটা গাঁট্টা মারার জন্য ছোটাছুটি করেছিল তার পেছনে।

দেওঘরের সেই দিনগুলোর কথা সিদ্ধার্থর আজ মনে পড়ছিল। শরীরটা তার আর সেরকম হালকা লাগে না, কাঁধের কাছে যেন সব সময় একটা ভার চাপানো, একা থাকলেই তার মুখখানা হঠাৎ কুঁচকে আসে। মা, সুতপা, টুনু, ছোটোকাকা—এদের কারোর না কারোর সমস্যা সব সময় তার মন জুড়ে থাকবেই, যেন সবকিছুরই প্রতিকারের দায়িত্ব তার। অথচ সে তো কিছুই করে না, চাকরিবাকরি নেই, একটা পয়সা রোজগার নেই, নিজের হাতখরচই চলে না। মায়ের কাছে হাত পেতে হাতখরচের টাকা নিতে হয়! বাবার রয়ালটি বাবদ প্রতি মাসে কিছু টাকা এলেও, সিদ্ধার্থ জানে সংসারের আসল খরচ সুতপাই চালাচ্ছে। সিদ্ধার্থ একটা নিষ্কর্মা বেকার ছাড়া আর কিছুই নয়, তবু সব সময় কাঁধের ওপর এরকম গুরুভার দায়িত্ব বোধ করে কেন? আজ সকালেই, একটু আগে, টুনুর সঙ্গে সুতপার খুব একচোট ঝগড়া হয়ে গেল। পার্টির কনফারেন্স হচ্ছে সোনারপুরে, টুনু সেখানে যেতে চায়, ট্রেন ভাড়া আর খাওয়ার খরচের জন্য তার কুড়িটা টাকা দরকার। মায়ের কাছে চেয়েছিল, মা বললেন, তাঁর হাতে আর টাকা নেই। ছোটোকাকার কাছে টুনু প্রাণ গেলেও কিছু চাইবে না, ওর মতে ছোটোকাকা প্রতিক্রিয়াশীলদের পাক্কা দালাল। সিদ্ধার্থর অবস্থা টুনু জানে, নিজেই সিদ্ধার্থর বাক্স-টাক্স ঘেঁটে দ্যাখে মাঝে মাঝে। সুতপার কাছে চাইতেই সুতপা সংক্ষেপে স্রেফ না বলে দিয়েছে। টুনুও ছেড়ে কথা বলার ছেলে নয়। সেও সুতপার শাড়ি, লিপস্টিক আর সেন্টের শিশির কথা তুলে খোঁটা দিয়ে বলল, ওইসব বাজে জিনিস কিনে পয়সা নষ্ট করতে পারিস, আর আমার একটা জরুরি কাজ…। সুতপা ঝংকার দিয়ে উঠল, তোর জরুরি কাজ তো আমার তাতে কী! ব্যস, লেগে গেল খটাখটি!

সিদ্ধার্থ বিরস মুখে পাশের ঘরে বসে সব শুনছিল। উঠে গিয়ে তাদের ঝগড়া থামাতে তার একটুও ইচ্ছে করেনি। যদি সে এখনই, ঝনাৎ করে কুড়িটা টাকা ফেলে দিতে পারত টুনুর সামনে…। কিংবা সুতপাকে একটা ধমক দেবার মতন মনের জোরও যদি তার থাকত। কীরকম একটা বিশ্রী ভাষায় টুনু আর তপু ঝগড়া করছে, সিদ্ধার্থর মনে হয় এজন্য যেন সেই দায়ী! তার দোষেই এ-বাড়ির আবহাওয়াটা নষ্ট হয়ে গেল।

তার দোষেই? বাবাই তো সিদ্ধার্থকে এরকম বিপদে ফেলে গেলেন! বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, সিদ্ধার্থ কখনো কল্পনাই করেনি তাকে এই বাড়ির কথা ভাবতে হবে। যেমন রোজ সূর্য ওঠে, যেমন পৃথিবী রোজ ঘোরে, সেইরকমই সিদ্ধার্থ বাবা-মার বেঁচে-থাকা না-থাকা বিষয়ে কোনো চিন্তাই করেনি। সে ভেবেছিল স্বাভাবিকভাবেই সে একদিন ডাক্তার হবে, বিলেত থেকে ডিগ্রি আনবে, কিন্তু বিলেতে থেকে যাবে না। সে কখনো এক জায়গায় বেশিদিন থাকবে না, সারা ভারতবর্ষ ঘুরে-ঘুরে চিকিৎসা করবে। যখন সে যে-শহরে যাবে, তখনই সারা শহরের লোক জানতে পারবে, ডা. সিদ্ধার্থ রায়চৌধুরী এসেছেন, যার যত কঠিন অসুখ…গরিব লোকদের বিনা পয়সায় দেখলেও বড়োলোকদের কাছে সে একটা পয়সাও ছাড়বে না, বরং ডবল ফি আদায় করবে! তখন তপু কিংবা টুনু কী করবে, কিংবা বাবা-মা কোথায় থাকবে, সে-কথা সে কিছুই ভাবেনি। সে ভেবেছিল প্রত্যেকের জীবন আলাদা, সিদ্ধার্থ তার আলাদা জীবনটা খুঁজে নেবে। পাহাড়ের ওপর একটা হাসপাতাল, সাদা ধপধপে রং, বড়ো লোহার গেটটা হাট করে খোলা, লাইন বেঁধে পাহাড়ি নারী-পুরুষেরা আসছে, সিদ্ধার্থ নিজেই তাদের প্রত্যেকের রোগ পরীক্ষা করছে, নিজের হাতে কোনো আহত পায়ে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে—এই দৃশ্যটা সিদ্ধার্থ প্রায়ই কল্পনা করতে ভালোবাসত—সে তখন প্রৌঢ়, মাথার চুল কাঁচাপাকা, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা—সেই সময়, কল্পনায় সিদ্ধার্থর পাশে কেউ নেই, টুনু না, তপু না, বাবা না, মা না—ওদের কথা সিদ্ধার্থ কিছুই জানে না, সে একা, এমনকী...! না, সিদ্ধার্থ কখনো সেরকমভাবে মেয়েদের কথাও ভাবেনি। কখনো বিয়ে করবে কি না, কিংবা তার বউ কীরকম হবে—এসব ব্যাপার নিয়ে সে মোটেই মাথা ঘামায়নি। সমবয়সি ছেলেদের মধ্যে মেয়েদের নিয়ে রগরগে আলোচনায় সে-ও যোগ দিয়েছে, অনেক সুন্দরী মেয়েকে কল্পনায় সে নগ্ন করে দেখেছে, প্রবল ইচ্ছে হয়েছে কোনো মেয়ের শরীর ছুঁতে, কিন্তু কাউকে অধিকার করতে চায়নি, কাউকে তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নেবার কথা তার মনেই পড়েনি।

কিন্তু কেয়ার সঙ্গে পরিচয় হবার পর সিদ্ধার্থ একটা নতুন ব্যাপার অনুভব করছে। যখন কেয়ার সঙ্গে দেখা হয়, যখনই কেয়ার কাছে থাকে, তখনই সে যেন বদলে যায়, সেই দেওঘরের দিনগুলোর মতন শরীরটা আবার হালকা হয়ে আসে, তখন মনে হয়, তার জীবনটা আলাদা, সে স্বাধীন, কোথাও আর কোনো চাপ নেই। সে তখন যা খুশি করতে পারে। কেয়ার কাছে গেলে তার আরেকটা কথাও মনে হয়। সে যেন কেয়ার একটুও যোগ্য নয়। কেয়ার ব্যবহার খুবই সরল আর আন্তরিক, তবু ক্ষীণভাবে সিদ্ধার্থর মনে হয়, এই যে কেয়া তার সঙ্গে কথা বলছে, তাকে মুখোমুখি বসার অধিকার দিয়েছে, হাসছে ওর কথা শুনে, এ যেন সবটাই দয়া। যেন সিদ্ধার্থকে দয়া করা হচ্ছে। কেউ যদি হঠাৎ কোনোদিন তাকে বলে, তুমি কেন এখানে আসো? কেন বসে আছো! যাও, এখনই চলে যাও!—তাহলে সিদ্ধার্থ কোনো জবাব দিতে পারবে না—সে কোনো অধিকার প্রমাণ করতে পারবে না, মাথা নীচু করে তাকে বেরিয়ে আসতেই হবে। এমনিতে সিদ্ধার্থ পৃথিবীতে কাউকে ভয় পায় না, যে-কোনো শক্তির বিরুদ্ধে সে রুখে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, যাও, যাও, ঢের দেখা আছে! অথচ একমাত্র কেয়ার সামনে গেলেই তার মনে হয়, সে এসব কিছুরই অযোগ্য! সে অসহায়! কেন এরকম হয়? সিদ্ধার্থ কোনো উত্তর খুঁজে পায় না।

রাত্তিরবেলা দেওঘরের আকাশে কত অসংখ্য তারা দেখেছিল সিদ্ধার্থ। মেঘহীন পরিষ্কার নীল আকাশ, তাতে হাজার-হাজার, কোটি-কোটি তারা জট পাকিয়ে আছে। কলকাতার আকাশে অত তারা কোনোদিন সে দ্যাখেনি। সিদ্ধার্থর হঠাৎ মনে হল, দেওঘরে গিয়ে সে অত গাঢ় সবুজ আর উজ্জ্বল নীল রং দেখেছিল—এখনও কি দেওঘরে গেলে তা আবার দেখতে পাবে? নাকি ষোলো বছর বয়সেই শুধু ওরকম দেখা যায়, তারপর জীবন আস্তে-আস্তে ফ্যাকাশে হয়ে আসে? ভাবতে-ভাবতে, কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে, সিদ্ধার্থ এক সময় বলে ওঠে, ধ্যাত! যত সব বাজে—







সিদ্ধার্থর নামে একটা খাকি রঙের খাম এসেছে। জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগে ফিল্ড অ্যাসিসটেন্টের একটা পদের জন্য সিদ্ধার্থ একটা দরখাস্ত করেছিল মাস চারেক আগে, তার ইন্টারভিউ। মাস চারেক আগে যে-দরখাস্ত পাঠিয়েছে, তার উত্তর যেদিন পেল তার পরদিনই ইন্টারভিউ-এ যেতে হবে। ইস, চিঠিটা যদি আর একদিন দেরি করে আসত! ভাবতেই সিদ্ধার্থর গা হিম হয়ে যায়।

সিদ্ধার্থর স্বভাবই এই যে, যে-কোনো জায়গা থেকে ইন্টারভিউ-এর চিঠি পেলেই সে সঙ্গে-সঙ্গে কল্পনা করে নেয় যে চাকরিটা পেয়ে গেছে। দার্জিলিং-এর বটানিক্যাল গার্ডেনের সরকারি সুপারিন্টেডেন্ট-এর পদের জন্য দরখাস্ত করার পর থেকেই সে কল্পনা করে নিয়েছিল, তার কোয়ার্টারটা কেমন হবে। ইন্টারভিউ-এর চিঠি পেয়েই সে শীতের জামাকাপড় জোগাড় করার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। সেবার ইন্টারভিউও দিতে হয়নি, ওরাই পরের দিন আরেকটা চিঠিতে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেটা ক্যানসেল করে দিয়েছিল। এইরকমভাবেই সিদ্ধার্থ মনে মনে পুরুলিয়ায় গিয়ে অফিসার হয়েছে, ব্যারাকপুর, ডালহৌসি, নিউ আলিপুরে অফিস করেছে। কিন্তু একটা জায়গা থেকেও সে নিয়োগপত্র পায়নি। অথচ কী যে তার দোষ, কেউ তাকে বলে দেয়নি। তার স্বাস্থ্য ভালো, হায়ার সেকেণ্ডারিতে অঙ্কে লেটার পেয়েছিল, বি. এস.-সি-তে হাই সেকেণ্ড ক্লাস অনার্স পেয়েছে। কেউ এসব গ্রাহ্য করেনি! ইন্টারভিউতে তাকে মামুলি দুটো-একটা কথা ছাড়া আর কিছুই জিজ্ঞেসও করেনি।

এ-চিঠিটা পেয়ে কেন যেন সিদ্ধার্থর দৃঢ় বিশ্বাস হল, এই চাকরিটা সে পেয়ে যাবেই! অনেক দিন সে অপেক্ষা করেছে, প্রায় দেড় বছর, এখনও কোনো চাকরি না-পাবার কোনো মানে হয় না। এই ঠিক সময়। এখন চাকরিটা পেলে অনেক ঝঞ্ঝাট চুকে যায়। এটা নির্ঘাত হবে। সিদ্ধার্থ স্পষ্ট দেখতে পেল গায়ে রেনকোট চাপিয়ে আর পায়ে গামবুট পরে জলকাদা ভেঙে সে বাংলাদেশের মাঠে-মাঠে ঘুরছে। দুশো দশ টাকা স্টার্টিং—তা হোক!

সাড়ে ন-টা থেকে ইন্টারভিউ শুরু। বাড়ি থেকে সাড়ে-আটটা পৌনে ন-টার মধ্যে বেরোতেই হবে। ভাত খেয়ে যাবার সময় নেই, মা লুচি ভেজে দিলেন ওর জন্য। সিদ্ধার্থর ভালো কোনো শার্ট কাচা নেই—টুনুর একটা জামা নিতে হল। টুনুর জামাকাপড়ের ব্যাপারে কোনো বাছবিচার নেই—একটা লাল-কালোর চৌকো ছাপ জামা পরেই সে সাতদিন কাটিয়ে দিতে পারে। ধপধপে সাদা জামা সে পরতেই চায় না। সেইরকম একটা জামা কাচানো পড়ে ছিল অনেকদিন থেকে। টুনু খানিকটা ঠাট্টার সুরে বলল, কিরে দাদা, তোকে যে আজ খুশি-খুশি দেখছি। ভারি তো একটা ছ্যাঁচড়া টাইপের চাকরি!

যা-যা, তাই বা আজকাল পায় কে?

আমি হলে কিছুতেই এক প্রতিক্রিয়াশীল গভর্নমেন্টের আণ্ডারে কোনো চাকরি করতে যেতাম না।

কী করতিস তাহলে? খাওয়া-পরাটা জুটবে কোত্থেকে?

না জোটে না জুটবে।

ঠিক আছে, পাশটা কর না। তারপর দেখব।

পাশ করলেও আমি তোর মতন অমন ম্যাদামারা হয়ে যাব না!

টুনু, তোর সাহস আজকাল খুব বেড়েছে দেখছি। দেব থাপ্পড়—

টুনু একটুও ভয় না পেয়ে হেসে ফ্যালে। হাসতে-হাসতেই বলে, আরে, রাগ করছিস কেন? আমার কলেজের বন্ধুরা বলে, তাই বললুম। ওরা বলে তোর দাদা একসময় এত ভালো পার্টি ওয়ার্ক করত, এখন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে একেবারে কেটে পড়েছে।

বেশ করেছি! বেশ করেছি! নিজের পড়ার খরচটা জোগাড় করারও মুরোদ নেই তোর, আবার কথা বলতে আসিস। বাড়ির কী অবস্থা সেদিকে গ্রাহ্য নেই—

আরে, আরে, তুই সকালবেলা এত রেগে গেলে যে তোরই ইন্টারভিউ খারাপ হয়ে যাবে! সাড়ে আটটা বাজে, যা—

মা জোর করে ঠাকুরের পায়ে ছড়ানো কয়েকটা শুকনো ফুল আর বেলপাতা ওর পকেটে গুঁজে দিলেন। সিদ্ধার্থ এসব বিশ্বাস করে না—কিন্তু মায়ের সঙ্গে তর্ক করার সময় নেই, লাভও নেই। ঠিক আছে, পরে রাস্তায় গিয়ে ফেলে দিলেই হবে। মাকে একটু খুশি করার জন্য সিদ্ধার্থ টপ করে মাকে প্রণাম করে নিল। ছোটোকাকা বাইরে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন, সুতরাং তাঁকে আর প্রণাম করল না।

সাড়ে ন-টার মিনিট দশেক আগে পৌঁছে গেল সিদ্ধার্থ। গিয়ে দেখল সেই অফিসের সামনে লোকে লোকারণ্য। অন্তত পৌনে তিনশো জন ফিটফাট পোশাক-পরা যুবক সেখানে ঘোরাঘুরি করছে। অফিসের ভেতরের টানা বারান্দায় তিনটে বেঞ্চ পাতা—তাতে ঠেসাঠেসি করে আঠারো-উনিশ জন বসে আছে, বাকি সবাই দাঁড়িয়ে—অনেকে গজল্লা করছে সামনের ছোটো মাঠটায়। কাল শেষ রাতে বৃষ্টির জন্য মাঠটায় এখানে-সেখানে জল জমে আছে—সেখানেও বসার উপায় নেই। এরা সবাই চাকরির জন্য এসেছে, কিন্তু কেউ বিমর্ষ নয়, সবাই হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে—যেন সেজেগুজে এসেছে কোনো নেমন্তন্ন বাড়িতে।

সাড়ে দশটা নাগাদ একজন কেরানি এসে নাম ধরে ডেকে-ডেকে জেনে নিল—ক-জন উপস্থিত আছে। দুশো একানব্বই জনের মধ্যে মাত্র সতেরো জন ইন্টারভিউ দিতে আসেনি। সিদ্ধার্থর দুর্ভাগ্য ওর সিরিয়াল নাম্বার হল একশো তিয়াত্তর—তার মানে ওকে বহুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কয়েকজন কেরানি ভদ্রলোককে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ও দাদা, লোক নেওয়া হবে মোটে চার জন—তা আপনারা এত লোক ডেকেছেন কেন?

কেরানিটি একগাল হেসে বললেন, সে-কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন ভাই? আমরা তো চুনোপুটি। যা হুকুম হয়েছে—

আরেকজন জিজ্ঞেস করল, দাদা, একটা ভেতরের খবর দিন তো! লোকফোক আগে থেকেই নেওয়া হয়ে গেছে নাকি? তাহলে আর টাইম নষ্ট না-করে কেটে পড়ি।

লোকটি শিবনেত্র হয়ে খানিকক্ষণ কী চিন্তা করলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, যতদূর জানি, না। বুঝলেন। আমাদের বড়োসাহেব খুব কড়া লোক—আমার নিজেরই একজন ক্যাণ্ডিডেট ছিল, বলতে সাহস পাইনি।

ভিড়ের হট্টগোল ছাপিয়ে একজনের হাস্যমুখর গলা শোনা গেল, ওসব ঢের দেখা আছে, মাইরি! এবার খেলাটা শুরু করলেই তো হয়—

সেই অফিসের কর্মচারীরা একজন দু-জন করে আসতে শুরু করেছে, সমবেত প্রার্থীদের দিকে তারা করুণার চোখে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে গূঢ় গল্প করতে করতে ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। নতমুখী মহিলাও এল কয়েকজন। ইন্টারভিউও শুরু এগারোটার সময়।

সকালবেলায় সূর্য দারুণ নির্দয়, নটা থেকেই রোদের তাতে টেঁকা দায়। অনেকে খবরের কাগজ এনেছে, তাই দিয়ে ছাতার মতন মাথা আড়াল করে রয়েছে, সিদ্ধার্থ কিছুই আনেনি। গরম লাগুক, কিন্তু সিদ্ধার্থের ভয়—ঘামে তার জামা ভিজে যাচ্ছে, কাঁধের কাছটা ভিজে যাচ্ছে—এতে ইন্টারভিউয়ের সময় তাকে আর স্মার্ট দেখাবে না। এ চাকরিটা তাকে পেতে হবেই। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা ব্যথা করছে বলে সে ঘন ঘন পা বদল করে একবার এপায়ে আরেকবার ওপায়ে দাঁড়াচ্ছে।

এক-একজনের সময় লাগছে তিন-চার মিনিট। সিদ্ধার্থ ভেবেই পেল না, তা হলে আজ সকলের ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ হবে কী করে। এটাও সে বুঝে উঠতে পারল না—এতজনের মধ্যে থেকে ঠিক চারজনকে বাছাই করা হবে কী হিসেবে। সবাই বি. এসসি. পাস। সবাই সুস্থ ফিটফাট ছেলে। টুকরোটুকরো কথা শুনে বুঝছে, এদের মধ্যে কয়েকজন এম. এসসি-ও আছে। সিদ্ধার্থর নিজের স্বাস্থ্য ভলো বলে একটু গর্ব আছে—কিন্তু এর মধ্যে অন্তত এক ডজনের স্বাস্থ্য যে তার চেয়েও অনেক ভালো—এ-কথা সে স্বীকার করতে বাধ্য। তা হলে তার চান্স কোথায়?—তা হোক, সিদ্ধার্থকে এ-চাকরিটা পেতেই হবে—সে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইল!

ইন্টারভিউ শেষ করে এক-একজন বেরিয়ে আসছে উদভ্রান্ত মুখে। ভিতরে-ভিতরে একটা নৈরাশ্য থাকলেও মুখে সেটা বোঝাতে চাচ্ছে না, বরং এমন একটা হাসি যে—চটপট উত্তর দিয়ে সে ইন্টারভিউ বোর্ডকে ঘায়েল করে দিয়ে এসেছে, তাকে চাকরি না দিয়ে যায় কোথায়? প্রথম প্রথম এক-একজন বেরোনো মাত্র অনেকে তাকে ঘিরে ধরেছে।—কী জিজ্ঞেস করল, কী জিজ্ঞেস করল দাদা? পড়ার কথা? জেনারেল নলেজ? আজকের খবরের কাগজের—

সেই মুহূর্তে অনেকের মনোযোগ যার দিকে, সেই ক্যাণ্ডিডেটটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, যত সব আজেবাজে কোশ্চেন! ওর মধ্যে একজন ম্যাড্রাসি আছে, সেই বেশি ফটফট করছে—ওদের ইংরিজিও শালা ভালো করে বোঝা যায় না, খালি অ্যাণ্ডাই-ম্যাণ্ডাই—

কী জিজ্ঞেস করল, বলুন না।

জিজ্ঞেস করল, বন কোথাকার রাজধানী। বলে দিলুম, জার্মানির।

শুধু জার্মানি বললেন? পশ্চিম জার্মানি হবে তো!

শেখাবেন না, আমাকে শেখাবেন না! তাও, বলিছি, ঠিকই বলিছি।

আর? আর? আর?

তারপর জিজ্ঞেস করল, রায়গঞ্জ কোথায়? বাংলাদেশের কোন জেলায়? আমি একটু ভাবছি, অমনি ম্যাড্রাসিটা ক্যাটক্যাট করে উঠল, জার্মানির খবর রাখো—আর বাংলাদেশের কথা জানো না? আমিও ওর মুখের ওপর ঝেড়ে দিলুম। রায়গঞ্জ নামে বাংলাদেশে তিনটে জায়গা আছে—আপনি কোনটার কথা জিজ্ঞেস করছেন? ডু ইউ নো, হুগলি জেলাতেও একটা রায়গঞ্জ আছে?

সব কথা ইংরেজিতে বলতে হচ্ছে? বাংলাদেশের গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হবে—তো ইংরেজি দিয়ে কি ধুয়ে খাব?

সিদ্ধার্থর হাত-পা প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে এল। ইংরিজির জন্য নয়, মোটামুটি সে ইংরিজিতে কথাবার্তা চালিয়ে দিতে পারে। কিন্তু রায়গঞ্জ কোথায়? নামটা শুনেছে ঠিকই, কিন্তু কোথায় যেন? বাঁকুড়ায়, না পশ্চিম দিনাজপুরে? মালদায় নয় তো? সে কি কারওর কাছে জিজ্ঞেস করে নেবে? কিন্তু তাকেও যে রায়গঞ্জের কথাই জিজ্ঞেস করবে, তার ঠিক কী? আঃ কী ঝঞ্ঝাট! ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ভূগোলে এসব পড়েছিল, তারপর আর, কিন্তু দরকারটাই বা কী এত? চাকরির পক্ষে এসব দরকার হলে—তখন তো সে অনায়াসেই ম্যাপ দেখে জেনে নিতে পারে।

ক্রমশ সময় কমতে লাগল, এক-একজন ইন্টারভিউতে ঢুকে এক মিনিট আধ মিনিট পরেই এসে হনহন করে চলে যাচ্ছে। সিলেশন কি হয়ে গেছে? না, তা হতেই পারে না। সিদ্ধার্থ ভেতরে গিয়ে ওদের বুঝিয়ে বলবে, তার এই চাকরিটা বিশেষ দরকার। না পেলে চলবেই না! তার সব রকম যোগ্যতা আছে, সে মন দিয়ে কাজ করবে। অন্য অনেকেরই এই যোগ্যতা থাকলেও তার দরকারটা সব চেয়ে বেশি। রোদ্দুর ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। এতগুলো ছেলেকে ডেকেছে, তাদের একটু বসার জায়গা দেবার কথাও ভাবেনি। বাড়ির বাইরে বেশিক্ষণ থাকলে সিদ্ধার্থর খিদে পায়। অন্যদের দেখাদেখি অনবরত সিগারেট টেনে টেনে ভেতরটা কীরকম হালকা হালকা হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে পেটের মধ্যে আর কোনো যন্ত্রপাতি নেই—শুধু একটু ফাঁকা গহ্বর।

একটার সময় আধঘণ্টা বিরতি ঘোষণা করা হল : ইন্টারভিউ বোর্ডের মেম্বাররা খেতে যাবেন। সিদ্ধার্থ রাস্তার ওপারে আলুকাবলিওয়ালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একবার সে ভেবেছিল, ঘণ্টাদুয়েকের জন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসবে, তার ডাক পড়তে অনেক দেরি আছে। কিন্তু ঠিক সাহসও পেল না। ক্ষীণভাবে একথাও তার মনে হচ্ছিল, হঠাৎ অন্যদের টপকে আলাদাভাবে বিশেষ করে তাকেই ডাকা হবে। তার অ্যাপ্লিকেশনটা দেখে ওঁরা বলবেন, তোমার যা কোয়ালিফিকেশন দেখছি—তোমার আর অপেক্ষা করতে হবে না, তোমার তো চাকরি হয়েই গেছে।

একটা ছেলে সিদ্ধার্থর পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ থেকে গল্প করছিল, সেও তার সঙ্গে এসেছে আলুকাবলি খেতে। ছেলেটি তোতলা। সিদ্ধার্থ হাসি চেপে তার সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল, এবং ধরেই নিয়েছিল—এছেলেটার চাকরি হবে না। এত ছেলে থাকতে এই তোতলার চাকরি পাবার কোনও চান্স নেই।

কিন্তু ছেলেটির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর সিদ্ধার্থর মায়া হয়েছিল। ছেলেটি ভারী সরল, আর কী দুঃখী দুঃখী মুখ! সিদ্ধার্থ তখন ভেবেছিল, কেন তোতলা বলে কি আর মানুষ নয়? সে কেন চাকরি পাবে না? ছেলেটির বাড়ির অবস্থা শুনে সিদ্ধার্থর মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটি এম. এসসি-তে ভরতিও হয়েছিল—খরচ চালাতে পারেনি, সাত ভাইবোন, বাবার অসুখ, দিদি বিধবা—তার দুটো বাচ্চা, পাঁচ মাসের বাড়িভাড়া বাকি—টিউশানি করে সে কিছু আয় করার চেষ্টা করে, কিন্তু টিউশানিও টেকে না—ছেলেরা হাসে—স্কুল মাস্টারির চেষ্টা করেছিল—সিদ্ধার্থর মনে হল, তার চেয়েও এই ছেলেটির চাকরি পাওয়া বেশি দরকার—তাদের তো তবু বাড়িভাড়া দিতে হয় না এবং সুতপার চাকরি ছাড়াও বাবার কোম্পানির রয়্যালটি বাবদ মাসে মাসে কিছু অন্তত টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু এই ছেলেটি!

এইরকম অবস্থা সত্ত্বেও তার আলুকাবলির দাম যখন ওই ছেলেটি দিতে গেল, তখন সিদ্ধার্থ একেবারে অভিভূত হয়ে পড়ল। সে তার হাত চেপে ধরে নিজেই দু-জনের দাম দিল। তার মনে হল সে নিজেও যদি চাকরি পায়—তা হলেও তার উচিত নিজে না নিয়ে—এ ছেলেটির জন্য ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়! সিদ্ধার্থ বলল, আপনি আগে এরকম ইন্টারভিউ দিয়েছেন।

ছেলেটি একগাল হেসে বলল, অনেক! অনেক! কত দ-দ-দ-দরখাস্ত করেছি, তার ঠিক নেই! এক বো-বো-বো-বন্ধু কী বলে, জানেন? সে বলে কত আর দরখাস্ত টা-টা-টা-টাইপ করবি তার চেয়ে বরং তিনশোখানা ছা-ছা-ছাপিয়ে নে, কিছু জায়গা ফাঁ-ফাঁ-ফাঁ-ফাঁ, ইয়ে, মানে ফাঁকা রেখে সেখানে।

ইন্টারভিউর সময় কী বলে আপনাকে?

কী আর বলবে! তো-তো-তো-তোতলাকে কি আর কেউ মুখের ওপর তো-তোতলা বলে? তবে সবই লা-লা-লাক! বুঝলেন লাক ছাড়া চা-চা-চা...

হুস করে একটা মোটর গাড়ি চলে গেল আর সিদ্ধার্থর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। টুলটুল না? টুলটুলই তো, আরও দু-একটি মেয়ে, ছোটোমাসি, কেয়াও তো রয়েছে—টুলটুল দেখতে পেয়েছে তাকে, হাত নাড়ল, গাড়ি থামল না, টুলটুল কেয়ার দিকে ঝুঁকে কী যেন বলল, এবারে কেয়াও পিছন ফিরে তাকাল, অতদূর থেকে কি কেয়া ওকে দেখতে পাচ্ছে? সিদ্ধার্থ এমন ভাব করে দাঁড়াল, যেন ও বাসের জন্য অপেক্ষা করছে!

তিনটে নাগাদ অসন্তোষের গুঞ্জরণ উঠল। তখন মোটে শ-খানেকের ইন্টারভিউ শেষ হয়েছে এখনও শ-দেড়েকের বাকি—এইভাবে চললে তো রাত্তির আটটা-নটার আগে শেষ হবে না। সেই সকাল নটার থেকে সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, একটুও বসতে পায়নি। সকালের দিকে যে মুখগুলো ছিল উজ্জ্বল প্রাণবন্ত, সারাদিনের গরমে ঘামে ক্লান্তিতে সেগুলো এখন বদলে গেছে। মাঠে দাঁড়ানো এখন অসম্ভব, সবাই এসে ভিড় করেছে ভেতরের টানা বারান্দায়, সেখানেও কোনো পাখা নেই।

একসঙ্গে অতগুলো সমবয়েসি ছেলে, কেউ নি:শব্দ নয়—গুনগুন আওয়াজ চলছেই—মাঝে মাঝে হল্লা একটু বেশি হলেই চ্যাঁ চ্যাঁ করে বেজে উঠছে কলিং বেল—দু-জন ভোজপুরী দারোয়ান এগিয়ে এসে বললে, আপলোগ এইসান চিল্লানেসে—সাহাব হ্যায় কি সব বন্দ হো জায়েগা! একদম চুপ কিজিয়ে, মু মাৎ খোলনা!

যে ঘরে ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে, প্রায় তার দরজার কাছে গিয়ে ভিড় করছে একদল দারোয়ান, দুজন মাঝে মাঝে তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। অসহিষ্ণু হয়ে ছটফট করছে এতগুলি যুবক—মাত্র চারজন চাকরি পাবে—এই কথাটা এখন বড়ো বেশি মাথায় ঘুরছে সকলের।

সিদ্ধার্থ প্রাণপণে ধৈর্য ধরেই ছিল, তার মুখখানা দেখাচ্ছিল তীব্রভাবে অপমানিত মানুষের মতন। পাশের কয়েকজন উত্তেজিত চাপা গলায় বলল, একী মামদোবাজি পেয়েছে নাকি শালারা? পাঁচ টাকা করে পোস্টাল অর্ডার সবার কাছ থেকে—কাউকে টি. এ. দেবে না, দুপুরে খেতে হবে নিজের খরচায়, একটু বসার জায়গাও দেবে না?

নিজেরা দিব্যি আরাম করে পাখার তলায় বসেছে, আর আমরা যে গরমে হালুয়া হয়ে যাচ্ছি।

আর কতক্ষণ চালাবে বাপ?

এদের টেকনিক আমি জানি দাদা—পাঁচটার পর বলবে আমাদের আবার কাল আসতে।

আবার কাল? উলুবেড়ে থেকে পয়সা খরচ করে কতদিন আসব? গাড়িভাড়াও দেবে না শালারা, ইয়ার্কি নাকি।

লোক ঠিক হয়ে থাকলে বলে দিলেই পারে—

এখন তো এক একজন ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। কী ইন্টারভিউ হচ্ছে এতে?

মুখ দেখছে? আলুর দোষ আছে বোধ হয়!

এর চেয়ে লটারি করলেই পারত। চুকে যেত ঝামেলা—

বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া উচিত সব শালাদের—

সিদ্ধার্থ এই আলোচনায় যোগ দেয়নি, পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল আর ক্রমশ উত্তেজিত হচ্ছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার শরীরে সেই সব লক্ষণগুলো ফুটে উঠল—নিশ্বাস হয়ে এল দ্রুত—রোমগুলো সজাগ, চোখের পাশ জ্বালা করে উঠল—এই শরীরটাই তার কাছে একমাত্র অস্ত্র হয়ে ওঠে—যে অস্ত্র সবকিছুকে আঘাত করতে চায়। মনে মনে তার ইচ্ছে হল, লাথি মেরে ওই ভেজানো দরজাটা খুলে ফেলে, ঢুকে দড়াম করে একটা চেয়ার আছড়ে ভেঙে, তার হাতলটা নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। কিন্তু এই চিন্তায় কষ্টও পেতে লাগল সে, এই চাকরিটা তার বিশেষ দরকার—কিন্তু ক্রমশই সে সম্ভাবনা দূরে সরে যাচ্ছে।

আরেকবার ইন্টারভিউ বন্ধ হতেই উত্তেজনা চরমে উঠল। ট্রেতে করে বেয়ারা চা নিয়ে ঢুকল সাহেবদের জন্য—এখন কিছুক্ষণ বিরতি। বাইরে গরম এত প্রচন্ড যে আর টেঁকা যাচ্ছে না। যত্ন করে কাচানো ইস্ত্রি করা শার্ট পরে এসেছে সবাই—এখন সেগুলো ভিজে চুপচুপে—অনেকেই শার্টের সবকটা বোতাম খুলে দিয়ে মুখের সামনে রুমাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে।

প্রথম বিদ্রোহ শুরু হল বেঞ্চগুলোতে বসার অধিকার নিয়ে। মাত্র তিনখানা বেঞ্চে আঠারো উনিশজন ঠেসাঠেসি করে বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে—একদল তাদের সামনে গিয়ে বলল, এবার আপনারা উঠুন দাদা, আমরা একটু বসি! হুড়মুড় করে তিরিশ চল্লিশজন ছুটে এল সেদিকে। যারা বসেছিল—তারাও জায়গা ছাড়বে না। তর্কাতর্কি, ধাক্কাধাক্কি শেষ সীমায় পৌঁছোবার আগেই একজন চেঁচিয়ে বলল, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে কী হবে? তিনটে তো মোটে বেঞ্চ। আসুন, আমরা সবাই মিলে একটু বসবার জায়গা দিতে বলি। ইয়ার্কি পেয়েছে নাকি! একদল পেছিয়ে গেল, একদল এগিয়ে গেল—সিদ্ধার্থ ওদের সঙ্গে মিশে এসে দাঁড়াল সেই বন্ধ দরজার সামনে—দরজাটা খুলে নম্র গলায় বলল, মে উই কাম ইন, স্যার?

তিনজন সুট-টাই পরা প্রৌঢ় লোক একটা বিরাট গোলটেবিলের তিনদিকে বসে চা খেতে খেতে মৃদু হাস্যে গল্প করছিলেন। টেবিলে একরাশ কাগজপত্র ছড়ানো—তিনজনেই অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালেন। একজন বললেন, এখন নয়, একটু পরে, একটু পরে—আবার ডাকব।

সিদ্ধার্থ বলল, আমরা অন্য-একটা কথা বলতে এসেছিলাম, স্যার।

এখন নয়, পরে, পরে।

তিনজনের কেউই টেবিলের ওপর থেকে হাত তুললেন না, বোধহয় পা দিয়ে সুইচ টিপলেন। কলিং-বেল বেজে উঠল, চ্যাঁ, চ্যাঁ, চ্যাঁ—। সঙ্গে-সঙ্গেই দরোয়ান দু-জন এসে ধাক্কা দিতে দিতে বলল, ভিড় হঠাইয়ে, ভিড় হঠাইয়ে—। প্রথমটা ওরা সবাই সরে এল! তারপর একজন লম্বা মতন ছেলে উত্তেজিতভাবে বলল, কী ব্যাপার আমরা কি সব কুকুর-বেড়াল নাকি? দরোয়ান এসে ধাক্কা দেবে? চলুন আবার গিয়ে বলি। আর একজন মোটা মতন যুবক বলল, আলবাত! বসার জায়গা দিয়ে বাধ্য! টাকা দিয়ে অ্যাপলাই করেছি—এবার দরোয়ান শালাদের পেটে একখানা ঝাড়ব!

আবার ওরা এগিয়ে গেল। দরোয়ানদের জোর করে সরিয়ে দিয়ে দরজা খুলে ফেলে বলল, স্যার, আমরা পাঁচ-ছ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি—আমাদের একটা বসার জায়গা—

এবার সেই তিনজনের মধ্যে থেকে একজন উঠে এগিয়ে এলেন দরজার দিকে। সিদ্ধার্থ সেই লোকটির চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে রইল। ভদ্রলোকটি এসে জিজ্ঞেস করলেন, কী বলছ?

স্যার, আমরা এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, একটুও বসার জায়গা নেই—ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে বললেন, এ-চাকরিতে এর চেয়ে আরও অনেক বেশি কষ্ট সহ্য করতে হবে—এটুকুও যদি না পারো—তা হলে তুমি...আমরা ইচ্ছে করেই...

স্যার, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করা যায়, কিন্তু শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থাকা এতক্ষণ...

বললাম তো, যদি তোমার কষ্ট হয়—তা হলে তুমি—

স্যার, আমি সবার হয়ে বলছি...

সেই মুহূর্তে সিদ্ধার্থ বুঝতে পারল, সে আসলে একা। তার পেছনের দলটা ওই ভদ্রলোককে উঠে আসতে দেখে সরে পড়েছে। সে একাই শুধু বিদ্রোহী। ভদ্রলোকটি আবার হাসলেন। বললেন, ঠিক আছে, তোমার নাম কী, সিরিয়াল নাম্বার কত? তোমার যদি খুব অসুবিধে হয়—তোমারটা আমরা আগে সেরে নিচ্ছি!

সিদ্ধার্থ ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়ে গেল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, তার সুযোগ ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। তবু ভয় থেকেই একটা বেপরোয়া ভাব জাগল, সে বলল, না, স্যার, আমি আমার একার জন্য বলছি না। আমি কোনো আলাদা সুযোগ চাই না—

ভদ্রলোক হঠাৎ কড়া হয়ে ধমকে উঠলেন, তা হলে যাও, ওখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো—গোলমাল কোরো না।

ঝপাৎ করে দরজা বন্ধ করে তিনি আবার ফিরে গেলেন। সিদ্ধার্থ ব্যর্থ ক্রোধে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল! বুকের ভেতরটা ব্যথা ব্যথা করতে লাগল।

যুবকদের দলটা এই সময়টুকু সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়েছিল, এবার গুঞ্জরণ শুরু হল। সেই তোতলা ছেলেটি এগিয়ে এসে সিদ্ধার্থের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে আন্তরিক সমবেদনার সুরে বলল, আপনি একা বো-বো-বো বোলতে গেলেন কেন? আপনার মু-খ চিনে রাখল! আরও কয়েকজন সমবেদনা জানাতে এল, দাদা, আপনি আপনার চান্সটা নষ্ট করলেন!—আর ইন্টারভিউ দিয়ে কী করবেন? চাকরি পাবার আগেই মুখে মুখে কথা বলতে গেছেন—ওরা ধরে নেবে আপনি ঢুকেই ইউনিয়ান-ফিউনিয়ান করবেন!—আপনি ঠিকই করতে গিয়েছিলেন দাদা, কিন্তু বুঝলেন তো, চাকরি করতে গেলে ব্যাটাদের পায়ে তেল না দিলে—

সিদ্ধার্থ উদভ্রান্তবাবে এদিক ওদিক তাকাল। সেই মোটা আর লম্বা ছেলে দুটো ধারে-কাছে কোথাও নেই। অস্বাভাবিক গলায় সিদ্ধার্থ চেঁচিয়ে উঠল, আমি পেচ্ছাব করে দিই এই চাকরির মুখে! এ-চাকরি না পেলে কি আমি খেতে পাব না ভেবেছ?

সিদ্ধার্থ আবার ছুটে গিয়ে দড়াম করে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলে দৃপ্তভাবে দাঁড়িয়ে বলল, এ-সব গ্যাঁড়াবাজি আর কতদিন চলবে, অ্যাঁ? ভদ্দলোকের ছেলেদের ডেকে এনে দাঁড় করিয়ে রেখে—নিজেরা পেটমোটা হয়ে—এসব দিন শেষ হয়ে এসেছে—শালা, বান—, বোকাচো—

চ্যাঁ-চ্যাঁ-চ্যাঁ—কলিং-বেলে আর্তশব্দ। দরোয়ান দু-জন ওর গায়ে হাত ছোঁয়াবার আগেই সিদ্ধার্থ তাদের একজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ছুটতে শুরু করেছে। ভিড় ঠেলে সে উন্মাদের মতন ছুটল, তাকে তখন ধরে কারওর সাধ্য নেই। বারান্দা পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে, রাস্তা পেরিয়ে উলটো দিকে এসে সিদ্ধার্থ একবার থামল। কেউ তাকে তাড়া করে আসেনি। হাঁপাতে হাঁপাতে আগুন জ্বলা চোখে সে অফিস-বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, আমি আবার একদিন এখানে ফিরে আসব। নিশ্চয়ই আসব—ঝাড়ে-বংশে তোমাদের বারোটা বাজাব দেখে নিস শালারা—যদি না আসি তা হলে আমার নাম নেই, সব কটাকে শেষ করব সেদিন—

দুপুরবেলার চৌরঙ্গি, অনবরত ছুটে যাচ্ছে ট্রাম, বাস, গাড়ি। কিছু লোক অলসভাবে রাস্তা পারাপার করছে। সিদ্ধার্থর দিকে কেউ চেয়েও দেখছে না। নিষ্ফল আক্রোশ নিয়ে সিদ্ধার্থও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তার আঙুলের ডগা জ্বালা করছে, চোখের কোণ জ্বালা করছে, মুখ দিয়ে যেন রক্ত ফেটে বেরোবে—নিশ্বাসে আগুনের হলকা। সিদ্ধার্থ ভেবে পেল না—এখন সে কী করবে! একটা মেশিনগান, একটা মেশিনগান পেলেই সিদ্ধার্থ এখানে হাঁটু গেড়ে বসে গুলি চালাত, ক্যাট ক্যাট ক্যাট ক্যাট—ধ্বংস করে দিত সব কিছু, ওই বাড়িটাকে গুঁড়িয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দিত, কুকুরের মতন সবকটাকে...কিন্তু সিদ্ধার্থ এখন কিছুই করতে পারবে না, সে শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল বাড়িটার দিকে। রাস্তায় এত মানুষ, কিন্তু সিদ্ধার্থর বুকের মধ্যে কী রকম তোলপাড় হচ্ছে, কেউ জানতেও চায় না।

বাড়ি ফিরে সিদ্ধার্থ জামা-প্যান্ট খুলল না, শুধু জুতো আর মোজা খুলে বিছানায় শুয়ে রইল। সবেমাত্র বিকেল শেষ হতে চলেছে, ঘরের কোণগুলো শুধু অন্ধকার, জানলা দিয়ে ভেসে আসছে ঘুড়ি ওড়ানো ছেলেদের খুশির হল্লা, আর শেষ রোদ্দুরের লালচে আলো। বালিশে মুখ চেপে উপুড় হয়ে শুয়ে রইল সিদ্ধার্থ, তার কান্না পাচ্ছিল, বুক চাপা ব্যথা, ইচ্ছে করছিল ফুলে ফুলে কাঁদতে—কিন্তু অনেকদিন কাঁদেনি বলেই চোখ দিয়ে জল এল না, বরং সারাদিনের ক্লান্তিতে সে কখন ঘুমিয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ বাদেই মা এসে ধাক্কা দিয়ে ওকে জাগিয়ে দিলেন, এই বিনু, বিনু, আসময়ে ঘুমোচ্ছিস কেন? কী হল আজ? কেমন দিলি ইন্টারভিউ?

সিদ্ধার্থ ঘুমচোখে খানিকক্ষণ মায়ের মুখের দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ খুব দুঃখ হল মায়ের জন্য। অনেকদিন পর আবার এই মুহূর্তে মনে হল, এ পৃথিবীতে মা-ই তার সবচেয়ে আপন! মা-র গলায় এত ব্যগ্রতা, মাকে সে কী করে দুঃখ দেবে? তারপর সঙ্গে সঙ্গে মনস্থির করে তড়াক করে উঠে বসে হাসি মুখে বলল, খুব ভালো দিয়েছি, মা। শিয়োর চান্স, প্রায় একরকম কথাই দিয়েছে আমাকে—সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার এসে যাবে—সিদ্ধার্থ জানালা দিয়ে বারান্দায় সুতপার শাড়ির আঁচল দেখতে পেল। তখন সে গলা চড়িয়ে বলল, জানো মা, সব মিলিয়ে চারশো দশ টাকা হবে, তা ছাড়া বাইরে টুরে গেলে ফার্স্ট ক্লাস টি. এ. দেবে—খুব ভালো পোস্ট—মা আরও কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সিদ্ধার্থ তাড়াতাড়ি বলল, আমি এখন একটু ঘুরে আসছি।

পায়ে চটি গলিয়ে সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরল রাস্তায় রাস্তায়। কেয়াদের বাড়ির সামনে দিয়েও একবার ঘুরে গেল—কেয়া বলেছিল, আজ বাড়িতে থাকবে না—কেয়াদের ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে—তা হোক, সিদ্ধার্থ সেখানে আজ যাবে না।

ঘুরতে ঘুরতে সিদ্ধার্থ শিবেনদের হস্টেলে চলে এল। শিবেন ঘরে নেই, ছোটোমাসির বাড়িতে গেছে। সিদ্ধার্থ একবার ভাবল, সেও ওখানে চলে যায়—ছোটোমাসি তো ওকে যেতে বলেছিলেনই। নিজের কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে সিদ্ধার্থ কখনো যায় না। কিন্তু শিবেনের ছোটো মাসির বাড়িতে যেতে তার ভালো লাগে। যাই হোক, যাওয়া অবশ্য হল না। খালি গায়, শুধু আণ্ডারওয়্যার পরা আদিনাথ খাটের ওপর এক গাদা বই আর খাতাপত্র ছড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করছিল। সিদ্ধার্থকে দেখেই উদ্ভাসিত মুখে বলল, ভাগ্যিস তুই এলি মাইরি, দুপুর থেকে এক নাগাড়ে পড়ে যাচ্ছি শুধু, চোখ-ফোক জ্বালা করছিল শালা! আয়, এখন একটু ফুর্তি করব!

আচমকা লাফিয়ে উঠে আদিনাথ সিদ্ধার্থকে জড়িয়ে ধরে তার দু-গালে ফটাফট দুটো চুমু খেয়ে নাচতে শুরু করার চেষ্টায় মুখ দিয়ে আওয়াজ করতে লাগল, পম পম পম পপম পপম পম পম পম—সিদ্ধার্থ হাসতে হাসতে বলল, ছাড়, ছাড়—পাগল হয়ে গেছিস নাকি?

আদিনাথের খুশি আর ধরে না। সে বলল, শুধু শুধু একঘেয়ে পড়তে কারোর ভালো লাগে? শালা ভগবান তোকে পাঠিয়েছে—চ, একটু ফুর্তি করে আসি, বাড়ি থেকে টাকা এসেছে আজ! শিবুটাকে বললুম—

আদিনাথ, আমার ঘড়িটা বেচব, তুই কিনবি?

ঘড়ি বেচবি? বা-বা-বা-বা-বা! এই তো চাই! বাড়িতে কী বলবি?

সে আমি যা হয় বলব! তুই কিনবি কিনা বল?

আমি ঘড়ি দিয়ে কী করব? একটা আছে, বিয়ের সময় আরেকটা পাব—আমার চেনা দোকান আছে, তোকে ভালো দাম পাইয়ে দেব, চল।

আদিনাথ বিশেষ যত্ন নিয়ে সাজ-পোশাক করল। আলমারি খুলে বার করল কাচানো জামা-প্যান্ট, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে একটু স্নো ঘষতে-ঘষতে দু-পাক নেচে নিল। সিদ্ধার্থ হাসতেই আদিনাথ বলল, আজকাল আমি শীর্ষাসন করতে শিখেছি, দেখবি? বলতে বলতেই আদিনাথ ঝুপ করে ঝাঁপিয়ে বিছানায়, মাথাটা নীচে দিয়ে পা দুটো উঁচু করে তুলে ধরল—সেই অবস্থাতেই বলল, দ্যাখ, দেখে নে পা সোজা হয়েছে কিনা, এই রকম পনেরো মিনিট থাকতে পারি! তারপর শূন্যে কিছুক্ষণ পা দুটো ছুড়ে, ঝুপ করে ফেলল সিদ্ধার্থর কাঁধে।

হস্টেল থেকে বেরিয়ে আদিনাথ বলল, বিনু, তুই আমার একটা উপকার করবি? আমার দু-জন জ্যাঠতুতো ভাইয়ের জন্য একজন মাস্টার খুঁজে দিতে বলেছে আমাকে—তুই যদি...

তোর আবার জ্যাঠতুতো ভাই এল কোত্থেকে? কলকাতায়?

আদিনাথ মুখ খিঁচিয়ে বলল, কী ভেবেছিস শালা, শুধু শিবেনেরই ছোটোমাসির বাড়ি আছে আর আমার কিছু নেই! আমারও আপন জ্যাঠা থাকেন ফার্ন রোডে, সে বাড়িতেও ডবকা মেয়ে আছে, আরও অনেক মেয়ে আসে—কিন্তু আমি তো আর শিবুর মতন মেনিমুখো নই, আমি আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেশি যাওয়া লাইক করি না!

তোর ভালো লাগে না বলেই আর কারোর ভালো লাগবে না? শিবুর যদি—

আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। তুই আমার এ উপকারটা করে দে মাইরি! আমি এখন কোথায় মাস্টার খুঁজব—তুই তো অঙ্কে লেটার পেয়েছিলি, তুই যদি, বেশি না, সপ্তাহে তিন দিন, আশি টাকা দেবে।

আশি টাকা?

হ্যাঁ, ওর বেশি দিতে পারবে না। তোর অবশ্য অসুবিধে হবে, সন্ধ্যাবেলাটা নষ্ট করতে হবে।

এক কথায় আশিটা টাকা উপার্জনের একটা প্রস্তাব পেয়ে সিদ্ধার্থ আদিনাথের উপর অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে। বিশেষত আদিনাথ যে তাকে এই ব্যাপারে সম্মান করে কথা বলছে, এতে তার আরও ভালো লাগে। সে তখনই রাজি হয়ে যায় আগামি সপ্তাহ থেকে কাজটা শুরু করতে।

বাস স্টপে পৌঁছোবার আগেই আদিনাথ বলল, তোর ঘড়িটা আজ থাক। আজ সময় নষ্ট করা যাবে না। আমার কাছে বহুত টাকা—ইচ্ছে করলে তুই কিছু ধারও নিতে পারিস।

চৌরঙ্গি এলাকায় এক চিনে হোটেলে এসে ঢুকল আদিনাথ, যেন বহুদিন এখানে যাতায়াত করছে এমন ভঙ্গিতে কথা বলল বেয়ারাদের সঙ্গে। কেবিন খালি নেই, কিন্তু আদিনাথ কেবিন ছাড়া বসবে না, বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল। একটু বাদে, একটা কেবিন খালি হলে আদিনাথ ভেতরে ঢুকেই জামার বোতামগুলো খুলে ফেলল, বেয়ারাকে ডেকে বলল পাখার স্পিড বাড়িয়ে দিতে। তারপর সিদ্ধার্থর দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বলল, বল, কী খাবি?

তুই-ই যা হোক ঠিক কর।

তোর কোনটা ভালো লাগে, বল? হুইস্কি, ব্রাণ্ডি, রাম!

সিদ্ধার্থ সচকিত হয়ে বলল, মদ?

আদিনাথ হো হো করে হেসে উঠে বলল, সে কী রে? তুইও কি মোরারজির চেলা নাকি? ন্যাকামি করিস না—কোনটা খাবি বল।

না ভাই, আমি ও-সব খাব না। আমার খুব খিদে পেয়েছে, খাবার খাব।

খাবার তো খাবিই। তার সঙ্গে একটু...কোনোদিন খাসনি আগে?

না।

গ্র্যাণ্ড, গ্র্যাণ্ড, গ্র্যাণ্ড! আজ তা হলে একজনকে দীক্ষা দেব—শিবুটাকে তো এত বলে-বলেও—

না রে খুব গন্ধ বেরোয় শুনেছি, বাড়িতে মা টের পেলে—

কেউ টের পাবে না! আমি সব ব্যবস্থা করে দেব—বেয়ারা, বেয়ারা—

প্রথম চুমুক দিয়েই ভালো লাগল না। ঝাঁঝালো তেতো তেতো স্বাদ, গলার কাছে গিয়ে যেন আর নামতে চায় না, আবার উঠে আসতে চায়। কিন্তু আদিনাথ এমন সাড়ম্বরে সেই পানীয়ের গুণাগুণ বর্ণনা করতে লাগল যে সিদ্ধার্থ আর প্রত্যাখ্যান করতে লজ্জা পেল। মুরগির মাংস খাবার ফাঁকে ফাঁকে ছোটো-ছোটো চুমুক দিচ্ছিল দম বন্ধ করে, আদিনাথ একবার উঠে পেচ্ছাপ করতে যেতেই সিদ্ধার্থ নিজের গেলাস থেকে বেশ খানিকটা ঢেলে দিল আদিনাথের গেলাসে, তারপর সোডা মিশিয়ে নিজেরটা সমান করে নিল। একটু পরে, আদিনাথ আবার অর্ডার দিতে যেতেই সিদ্ধার্থ বেশ জোর দিয়ে বলল, সে আর খাবে না। আদিনাথ অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, তোদের মুখ দিয়ে এখনও অন্নপ্রাশনের গন্ধ গেল না শালা! কবে অ্যাডালট হবি?

আদিনাথ বেশ বকবক শুরু করে দিল খেতে খেতে। ডাক্তারি পাশ করেই সে বিলেত চলে যাবে—সেই পরিকল্পনা। এ ছাই জোচ্চোরের দেশে কোনো স্কোপ নেই, বিলেতে গিয়ে সেটেল করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তার এক মাসতুতো দাদা আট-ন বছর ধরে ক্যানাডায় মহাসুখে আছে, বিয়ে-ফিয়ে করেনি, কিন্তু ও-দেশে বিয়ে না-করেও...তবে হ্যাঁ এ-দেশে যদি কখনো বিপ্লব শুরু হয়—তবে আমি কথা দিলুম, তুই লিখে রাখ, আমি ঠিক ফিরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ব। রক্তারক্তি বিপ্লব ছাড়া কিছু হবে না এ-দেশের, বুঝলি, খানিকটা পচা রক্ত বেরিয়ে না গেলে—

সিদ্ধার্থ সব শুনছিল না। মাঝে মাঝে হুঁ-হাঁ দিচ্ছিল, আদিনাথ আপন মনেই বকে যাচ্ছিল অনেক কিছু! সিদ্ধার্থর খুব ক্লান্ত লাগছিল, দুপুরবেলার অপমানটা ফিরে এসেছিল স্মৃতিতে, তার ইচ্ছে হচ্ছিল আদিনাথকে সব ঘটনাটা খুলে বলে বুক হালকা করবে—কিন্তু আদিনাথের কোনো-কিছু শোনার মন নেই। বিলেত কিংবা বিপ্লব থেকে আদিনাথ ততক্ষণে চলে গেছে বিষয়ান্তরে—ওদের ক্লাসের পাঁচটি মেয়ে কে কবে আদিনথের দিকে কীরকম ভাবে তাকিয়েছে এবং কী কথা বলেছে, কোন দু-জনের দিকে আদিনাথ যদি আরেকটু এগোয় তা হলেই, কুলসম নামে একটি মুসলমান মেয়ে আছে—তার শরীরের বর্ণনা ডাক্তারি ভাষায় দিতে দিতে আদিনাথ হঠাৎ বলে, জানিস মাইরি, আজ শিবেনের ছোটোমাসি ওকে ডাকতে এসেছিল গাড়ি নিয়ে—

সিদ্ধার্থ এই জায়গায় উৎকর্ণ হয়ে আদিনাথের দিকে তাকাল। আদিনাথের মুখের চেহারা বদলে গেছে, তার সুন্দর মুখ খানাতে যেন খানিকটা চাপা বিষাদ, চোখ দুটো লাল আর ছলছলে, মাথার চুলে ঘনঘন চিরুনির মতন আঙুল চালাচ্ছে—

আদিনাথ দুঃখের সুরে বলল, শিবু শালা কোনোদিন আমাকে ওর ছোটোমাসির বাড়িতে নিয়ে যায় না—অথচ সেই ক্লাস সেভেন থেকে একসঙ্গে পড়ছি, তোকে নিয়ে যায়, তোর সঙ্গে বেশি পিরিত—আজ গাড়িতে ওর মাসতুতো বোনকেও—দেখলুম—কী নাম ওর? অদিতি না? ক্লাস দেখতে—মেম-ফেমরা লজ্জা পাবে—এমন গায়ের রং—ওসব মেয়ের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলেও ভালো লাগে—যদি একটু তাকিয়ে হাসে—কিন্তু শিবু শালা কিছুতেই আলাপ করিয়ে দেবে না এমন খচ্চর ছেলে—আমি গাড়ির পাশেই দাঁড়িয়েছিলুম, আরেকটা মেয়েও ছিল গাড়িতে, কোঁকড়া কোঁকড়া চুল—মুখখানা হাসি হাসি, হাসিটা কীরকম জানিস, তুই অন্ধকার রাত্তিরে কোনোদিন রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ গন্ধরাজ ফুল দেখেছিস? যদি দেখে থাকিস—

সিদ্ধার্থ গন্ধরাজ ফুল কীরকম দেখতে ঠিক মনে করতে পারল না, তবু তার রুদ্ধশ্বাস গলা থেকে বেরিয়ে এল, কেয়া?

গন্ধরাজ নয়, কেয়া? হ্যাঁ, তাও হতে পারে—কিন্তু কেয়াফুল একটু ডেঞ্জারাস—সাপের উৎপাত থাকে। তুই চিনিস মেয়েটাকে?

হ্যাঁ।

মাইরি আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিবি? তুই যা খেতে চাস তাই খাওয়াব—শুধু একবার আলাপ করিয়ে দে।

অত উথলে উঠছিস কেন? কী হবে তোর আলাপ করে?

আর কিছু না, শুধু একবার চুমু খাব। এত ইচ্ছে করে—

আদিনাথ, তুই ভদ্রভাবে কথা বল! সবার সম্বন্ধে যা তা বলবি।

আরে, আরে, আরে, তুই অত রেগে যাচ্ছিস কেন? আর তো কিছু বলিনি, শুধু একটা চুমু, আমার—

তোর জিভটা টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি! চিনিস না তুই আমাকে—

কচু, খেলে যা! তুই অত ফায়ার হচ্ছিস কেন? তোর উইকনেস আছে বুঝি? ওঃ হো—বলবি তো আগে? তাই বল শালা। এই আদিনাথের আর যত দোষই থাকুক বন্ধুর ইয়ের দিকে কখনো কু-দৃষ্টি দেয় না। বন্ধুর জন্য আমি জান দিতে পারি! ঠিক আছে, কেয়া যখন তোর মাল—

আবার?

এ কী রে বাওয়া? মেয়েছেলেকে মালও বলতে পারব না? ঠিক আছে, এবার থেকে সব সমসকৃত ভাষায় কথা বলব! কেয়া তোর বান্ধবী, তার সম্বন্ধে আমি কোনো খারাপ কথা বলতে পারব না, এই তো? নে, এখন ওঠ, তোর আছে কেয়া আমারও আছে খেয়ানৌকো, এখন সেখানে যাব—

দাম চুকিয়ে আদিনাথ সিদ্ধার্থকে নিয়ে বেরিয়ে এল। তার পদক্ষেপ অসংলগ্ন। সাড়ে আটটা বেজে গেছে, সিদ্ধার্থ এবার বাড়ি ফিরতে চায়, কিন্তু আদিনাথ তাকে কিছুতেই যেতে দেবে না, সে কী রে শালা, এখন বাড়ি ফিরবি কী? এখনও তো আসল জায়গাটাই বাকি আছে। আদিনাথ হাত ধরে এমন টানাটানি করে যে ভিড় জমে যাবার ভয়ে সিদ্ধার্থ ওর সঙ্গে যেতে বাধ্য হয়। চৌরঙ্গি ধরে কিছুদূর এগিয়ে সিদ্ধার্থ আদিনাথকে জিজ্ঞেস করল, তুই কবে থেকে মদ খেতে শুরু করেছিস রে?

বহুদিন আগে। কবে থেকে মনে নেই!

কে তোকে শিখিয়েছে?

আমার বাবা।

অ্যাঁ?

আমার বাবার কথা জানিস না? রিনাউণ্ড মাতাল, তুই কেষ্টনগরে যে-কোনো লোককে জিজ্ঞেস করবি—যেমন বড়ো ডাক্তার তেমনি বড়ো মাতাল। আমার ঠাকুরদাও শুনেছি মদ খেয়েই লিভার ফেটে—

তোর বাবা তোকে শিখিয়েছেন?

নিজের হাতে ধরে কি আর আমার মুখে তুলে দিয়েছেন? অতটা হয়নি। রোজ সন্ধ্যাবেলায় বাবাকে দেখতুম একটু অন্যরকম, মা বলতেন, তোমার বাপি একটু সিরাপ খান পেট ব্যথার জন্য! কী চমৎকার দেখতে সে বোতলগুলো—এখনও আমার বাবা বিলিতি ছাড়া কিছু টাচ করেন না—তা আমিও, একদিন গোপনে সেই সিরাপ দেখে দেখলুম! র টেনেছিলুম, বুঝলি, গলা জ্বলে গেল, কিন্তু যে স্বাদটা পেলুম...তোরাও তো কলকাতার বনেদি লোক, তোর বাবা খেতেন না?

না, কোনোদিন না।

যা যা, অত তেজ দেখাসনি। মদ না-খাওয়াটা এমন কিছু বীরত্বের ব্যাপার নয়।

লিণ্ডসে স্ট্রিটে ঢুকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আদিনাথ ঘড়ি দেখল, বললে, ঠিক আছে। আয় আমার সঙ্গে।

সোজা উঠে এল দোতলায়।

সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে আদিনাথকে অনুসরণ করছিল। আদিনাথের এরকম ব্যবহার সে আগে কখনো দেখেনি। সিদ্ধার্থর অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক বেশি বয়স্ক ব্যবহার করছে আদিনাথ, তবুও ওর ভাবভঙ্গির মধ্যে এমন একটা ছেলেমানুষি আছে যে ওর ওপর ঠিক রাগ করা যায় না। একদিন শিবেন আদিনাথকে খুব বকুনি লাগাচ্ছিল—সমবয়সি হলেও শিবেন প্রায়ই নানা কারণে আদিনাথকে ধমকায়—আদিনাথ অপরাধীর মতন মিনমিনে গলায় বলছিল ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর করব না বলছি তো, আর না, এবার চুপ কর—শিবেন তখনও থামেনি। তখন আদিনাথ একটা অবিশ্বাস্য কান্ড করেছিল। টেবিলের ওপর একটা আলপিন পড়েছিল—আদিনাথ হঠাৎ সেটা তুলে নিয়ে প্যাঁট করে ফুটিয়ে দিয়েছিল নিজের হাতে, বেশ অনেকখানি, দরদর করে রক্ত বেরিয়ে এসেছিল। তাই দেখে শিবেন আর সিদ্ধার্থ আঁতকে উঠতেই আদিনাথ হাসতে-হাসতে বলেছিল, কী এবার চুপ করবি তো! সেই থেকে সিদ্ধার্থর সবসময়ই মনে হয়, নেহাত খেলাচ্ছলেই আদিনাথ আগুনে ঝাঁপ দিতে কিংবা চলন্ত গাড়ির সামনে লাফিয়ে চাপা পড়তে পারে।

দোতলায় একটা বন্ধ দরজার সামনে এসে আদিনাথ সাংকেতিক ভাবে টোকা দিল, দরজা খুলল একটি মেয়ে—ওদের চেয়ে অন্তত দশ বছরের বড়ো, নার্সের পোশাক পরা। একগাল হেসে মেয়েটি আদিনাথকে বলল, কী, আজ আবার এসেছ? সঙ্গে এটি কে? আগে তো দেখিনি।

আদিনাথ বলল না, এ আর. জি. কর-এ পড়ে, এর নাম পরিতোষ। আয়, ভেতরে আয়। এই আমার খেয়ানৌকো! আদিনাথ চোখ টিপল সিদ্ধার্থর দিকে।

মেয়েটি সিদ্ধার্থর হাত ধরে বহুকালের আত্মীয়তার সুরে বলল, এসো ভাই, এসো, গরিবের ঘর, কোথায় আর বসতে দেব, ওই খাটের ওপরে বোসো, পা তুলে আরাম করে বোসো!

আদিনাথ দুটো দশ টাকার নোট বার করে খুব সাধারণভাবে ভাঙা ড্রেসিং টেবিল-এর ড্রয়ার খুলে তার মধ্যে রাখল, তারপর সিদ্ধার্থকে বলল, আরাম করে বোস সিদ—পরিতোষ। এর নাম লতিকা, আমার অনেকদিনের চেনা।

ব্যাপারটা কী ঘটছে, সিদ্ধার্থ অস্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু ঠিক বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না। সত্যিই কি তাই, সত্যিই কি সে একটা খারাপ মেয়ের ঘরে? এক ধরনের ভয় ও আচ্ছন্নতা তাকে পেয়ে বসেছিল। বিস্ফারিত চোখে সিদ্ধার্থ খুঁটিতে দেখছিল লতিকাকে। মেয়েটিকে দেখে অস্বাভাবিক কিছুই মনে হয় না—অনায়াসেই সে সিদ্ধার্থর দিদি কিংবা কাকিমা হতে পারত। লতিকা মাথার পেছনে দুটো হাত নিয়ে আড়মোড়া ভেঙে বলল, এইমাত্র ডিউটি থেকে ফিরলুম—সারাদিন বড্ড খাটিয়েছে, আশি বছরের একটা বুড়ো, মরবেও না—দাও, একটা সিগারেট দাও।

সিদ্ধার্থর পকেটেই সিগারেটের প্যাকেট ছিল, যন্ত্রচালিতের মতন সেটা বার করে তাকিয়ে থাকে। লতিকা তার কাছে এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে বলে, হাঁ করে তাকিয়ে রইলে যে, ধরিয়ে দেবে না?—বেশ বন্ধুটি তোমার, একেবারে কাঁচা বুঝি?

সিগারেট ধরিয়ে লতিকা দীর্ঘ একটি টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো নিয়ে খেলা করে। তার সিগারেট ঠোঁটে চেপে রেখে সে খুব যত্ন করে নিজের কড়া ইস্ত্রি করা ধপধপে সাদা পোশাক খুলতে শুরু করে—ভাঁজ নষ্ট না করে সেগুলো পাট করে রাখে আলনায়—শুধু শায়া আর ব্রেসিয়ার পরে সে লঘু পায়ে ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে।

এত কম পোশাক পরা কোনো নারীকে সিদ্ধার্থ এত কাছে থেকে আগে কখনো দ্যাখেনি। নগ্ন স্ত্রীলোকের ছবি সে দেখেছে বটে, কিন্তু এ যে জ্যান্ত, তার থেকে মাত্র দু-তিন হাত দূরত্বে ঘুরছে। সিদ্ধার্থর সমস্ত শরীরটা ঝাঁ ঝাঁ করতে থাকে, কেমন অদ্ভুত লাগে তার নিজের মধ্যেটায়, চোখ ফেরাতে চেয়েও ফেরাতে পারে না।

বেশ হৃষ্টপুষ্ট চেহারা লতিকার, একটু মোটার দিকে, নগ্ন পেটে দুটো ভাঁজ পড়েছে, পাতলা শায়ার মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় তার মাংসল উরুর গঠন, বগল দু-টি পরিস্কার করে কামানো—লতিকার শরীরে ও মুখে-চোখে এমন একটা তৃপ্তির ভাব যে তার জীবন সম্পর্কে কোনো প্রশ্নই জাগে না। লতিকা আদিনাথের কাছে এসে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, দাও গো ব্রেসিয়ারটা খুলে দাও, একটু মুখ-হাত ধুয়ে আসি, সেদ্ধ হয়ে গেছি একেবারে!

আদিনাথ ব্রেসিয়ারের হুকটা খুলে দিয়েই দু-হাতে লতিকাকে নিজের কোলের ওপর টেনে এনে জড়াজড়ি শুরু করে দেয়। ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠে সিদ্ধার্থ মুখ ফিরিয়ে নেয়—তার বুকের মধ্যে এমন দুপ দুপ শব্দ হতে থাকে যে মনে হয় বাইরের সবাই বুঝি সেটা শুনতে পাবে। লতিকা ময়ূরীর মতন তীক্ষ্ণ গলায় হেসে উঠে বলে, এই ছাড়ো ছাড়ো, বললুম তো আগে গা ধুয়ে আসি—এই ঘেমো শরীরটা ধরতে ভালো লাগে তোমাদের?

আদিনাথ কোনো কথা শোনে না, উন্মত্তের মতন ছটফট করে, লতিকার বুকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে উম—ম-ম-ম শব্দ করে ওঠে—তারপর তাকে সিদ্ধার্থর দিকে ঠেলে বলে, নাও আমার বন্ধুকে একটু আদর করো! ঠেলার চোটে লতিকা একেবারে সিদ্ধার্থর গায়ে এসে পড়ে, সিদ্ধার্থ খাঁটি ভয় পেয়ে বলে ওঠে—না, না, না—। সরে গিয়ে সিদ্ধার্থ লতিকার দিকে তাকায়। লতিকার দুটি বিশাল স্তন সার্চ লাইটের মতন সিদ্ধার্থর দিকে ফেরানো, মন্ত্রমুগ্ধ সাপের মতন সেদিকে তাকিয়ে থেকে সিদ্ধার্থ অস্ফুটভাবে বলে, না, আমি না, আমি না—তারপর, ঠিক যে-মুহূর্তে সিদ্ধার্থ সবকিছু ভুলে গিয়ে সেদিকে হাত বাড়াবার কথা ভাবে—সেই সময় লতিকা ধড়মড় করে উঠে পড়ে, সিদ্ধার্থর থুতনিতে একটা আঙুল ছুঁইয়ে বলে আ—হা—হা!

লতিকা যে-রকম গলায় আ-হা-হা বলল কোনো স্ত্রীলোকের ওইরকম অদ্ভুত কন্ঠস্বর সিদ্ধার্থ আগে আর কখনো শোনেনি। লতিকা বাথরুমে চলে যায়।

সিদ্ধার্থর আঙুলের ডগাগুলো এমন চিন চিন করে যে মনে হয় এখনই ফেটে পড়বে। সিদ্ধার্থর হঠাৎ মনে হয় যে সে খুব অন্যায় করেছে, সে পাপী হয়ে গেছে, সে কেয়ার কাছে প্রতিজ্ঞা রাখেনি। অথচ কেয়ার কাছে সে কোনো প্রতিজ্ঞা তো করেনি! কেয়ার সঙ্গে নিবিড় কোনো কথাই হয়নি তার। সাধারণ আলাপ। কিন্তু কেয়াদের সুন্দর সাজানো ঘর, কেয়ার অপরূপ মুখশ্রী, তার ঝরনার জলের মতন স্বচ্ছ অনাবিল ব্যবহার—এই সব মিলিয়ে যে মাধুর্য—সে মাধুর্যের কাছে যেন সিদ্ধার্থ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল, সে কোনোদিন খারাপ হবে না! কিন্তু এ কোথায় এসেছে সে?

অথচ সিদ্ধার্থর চলে যাওয়ারও ক্ষমতা নেই। আদিনাথকে সে জিজ্ঞেস করল, একে তুই চিনিস কী করে?

একটু আগে উন্মত্তের মতো ছটফট করেছিল আদিনাথ, এখন সে চিত হয়ে শুয়ে আছে, তার মুখখানা ফ্যাকাশে। সিদ্ধার্থর কথার উত্তর না-দিয়ে ম্লানভাবে বলল, কিচ্ছু ভালো লাগে না, মাইরি। কিচ্ছু ভাল্লাগে না!

ভালো লাগে না তো এলি কেন?

কী জানি! দেখলি তো, চুমু খাইনি, এদের চুমু খেতে আমার ঘেন্না করে! জীবনে আজ পর্যন্ত কাউকে চুমু খাইনি শালা, আমাকেও কেউ—

তোর মাথার ঠিক নেই।

তাই হবে বোধহয়। আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না—

আমার যদি বাবা বেঁচে থাকতেন, আর পয়সা খরচ করে আমাকে পড়াতেন—তা হলে আমি তোর মতন মোটেই বখে যেতুম না।

বখে গেছি? আমি বখে গেছি? আদিনাথ হুংকার দিয়ে উঠল, কোন শালা বলবে? কোন শালা? অ্যাঁ?

আদিনাথের চোখ দুটো যেন ফেটে বেরিয়ে আসছে। গলার আওয়াজ বিকৃত করে বলল, বখে গেছি! আমি? জানিস শালা, আমাদের ক্লাসে আমার চেয়ে পড়াশুনোয় ভালো আর একজনও নেই—আমিই ফার্স্ট হব, তুই লিখে রাখ! কাগজে আমার ছবি বেরোবে! বিলেতে গিয়ে এফ. আর. সি. এস. হব—আর কী চাস তুই?

আদিনাথের কথাগুলো যে নেহাত ফাঁকা চিৎকার নয়, সিদ্ধার্থ তা জানে, তবু সে কেন যেন আদিনাথকে ঠিক মেনে নিতে পারে না। কোথায় যেন কী একটা ভুল হয়ে যাচ্ছে। আড়চোখে ঘড়ির দিকে তাকিয়েও সিদ্ধার্থ সেই ভুলটা খুঁজে পায় না!

গা ধোওয়া সেরে ঘরে এসে ঢুকল লতিকা! এবার সে গায়ে একটা শাড়ি জড়িয়েছে। ভেজা পিঠখানা তার পুরুষের মতন চওড়া। আয়নার সামনে এসে চুলে চিরুনি চালিয়ে লতিকা শান্তভাবে বলল, কী গো, তোমরা চুপচাপ বসে কেন? কিছু খাবে-টাবে? বোতল আনাব?

আদিনাথ অসহিষ্ণু গলায় বলল, না, না, আর-কিছু খাব না! রাত হয়ে যাচ্ছে, তুমি এদিকে এসো তো!

মুখ ফিরিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে লতিকা বলল, তোমাদের ডা. দে সরকার তার নার্সিং হোমে আবার আমায় ডেকেছেন।

আদিনাথ বলল, তবে আর কী! এবার থেকে তোমার তা হলে হেভি ইনকাম! কিন্তু ডা. দে সরকারের বউ তো পাগলি, একদিন এসে মারবে তোমার মাথায়—

ভারী মধুরভাবে হেসে লতিকা বলল, ইস! অত সোজা না!

পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে ও মুখে স্নো ঘষে—লতিকা খাটের ওপর এসে পা মুড়ে বসল, কোলের ওপর হাত দু-খানি রেখে বলল, বলো, এবার যেন সে একটা গোপন গল্প শুনতে চায়।

ট্রেনে যেতে যেতে মেচেদার কাছে এক গ্রামের মাটির ঘরের পাশে দাঁড়ানো একটি গেঁয়ো বউকে দেখেছিল সিদ্ধার্থ। মাটি লেপা ঘরের মতনই তার মুখখানিকে ঠাণ্ডা সুশ্রী লেগেছিল—লতিকাকে দেখে হঠাৎ তার কথা মনে পড়ে যায়।

আদিনাথ লতিকার দিকে হাত বাড়ায়নি, তারিফ করা চোখে ওকে দেখতে দেখতে আপন মনে বলল, পিটুইটারি গ্ল্যাণ্ডের সিক্রিশান খুব ভালো, দেখলেই বোঝা যায়! নাও, আমার বন্ধুকে একটু খাতির-যত্ন করো, ও বেচারির মাথাটা গরম হয়ে আছে—

না, না, আমি বরং...

লতিকা মুচকি হেসে বলল, কী করব, তোমার বন্ধুর পছন্দ হয়নি আমাকে।

পছন্দ হয়নি কথাটা শুনে সিদ্ধার্থ লজ্জা পেল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না, না, আমি—ঠিক তা নয়, মানে—

লজ্জা পাচ্ছিস কেন, বিনু! এ তো আর কেয়া নয়! বললুম তো, এ হচ্ছে খেয়ার নৌকো, যে ইচ্ছে চাপতে পারে!

নিজের রসিকতায় আদিনাথ হো-হো করে হেসে ওঠে। কেয়ার নাম শুনেই সিদ্ধার্থর বুক মাথা জুড়ে একটা ঝনঝন শব্দ ওঠে। এই ঘরে কেয়ার নাম উচ্চারিত হবার কোনো অধিকার নেই। সিদ্ধার্থই কেয়ার এই অপমানের জন্য দায়ী। আদিনাথের মুখে কেয়ার নাম মানায় না। ঝট করে খাট থেকে নেমে পড়ে সিদ্ধার্থ বলে, আমি চললুম।

আদিনাথ হাত বাড়িয়ে সিদ্ধার্থকে ধরে ফেলে বলে, আরে, দাঁড়া, দাঁড়া—

সিদ্ধার্থর গায়ে তখন অসুরের শক্তি, আদিনাথের হাতটা ছাড়িয়ে খুব জোরে খাটের ওপর আছড়ে দেয়। আদিনাথ চেঁচিয়ে উঠে বলল, এ কী রে, তোর ভালোর জন্যই—

চুপ কর, তুই কোনোদিন আর আমার সঙ্গে কথা বলবি না!

কী হল, কী? আমি কিছু খারাপ বলেছি! তোর কেয়া তোরই রইল, আমার বাবা ওসব কিচ্ছুই নেই! বন্ধুর লাভারের দিকে আমি কখনো—

সিদ্ধার্থ ফিরে তাকিয়েছে। তার ইচ্ছে হল আদিনাথের টুটি চেপে ধরে চিরকালের মতন ওর কথা বলা থামিয়ে দেয়। আর ওই যে বোকা-হাবার মতন মেয়েটা বসে আছে—ওকেও ঘাড় ধরে তুলে সিঁড়ি দিয়ে নীচে ছুড়ে ফেলে দেয়। সিদ্ধার্থ এখন সব পারে। তার পরে দ্রুত দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়ে সিদ্ধার্থ অনাবশ্যকভাবে দরজার গায়ে খুব জোরে একটা ধাক্কা খায়। তার কপালটা ফুলে ওঠে। সেই রাগে সিদ্ধার্থ দরজাটা এত জোরে টেনে খোলে যে সারা বাড়ি কেঁপে ওঠার আওয়াজ হয়। কোলের ওপর হাত দু-খানি নিয়ে লতিকা তেমনই শান্তভাবে বসে থেকে হাসিমুখে সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে থাকে।

হনহন করে হেঁটে, প্রায় ছুটতে ছুটতেই সিদ্ধার্থ এসে চৌরঙ্গিতে পৌঁছোয়। তখন সে নিশ্চিন্ত হয়। না, কেউ তাকে তাড়া করে আসেনি।

সারা বিকেল ও সন্ধ্যা গুমোট গরমের পর এখন ঝিরঝিরে হাওয়া দিয়েছে। রাস্তায় সিনেমাভাঙা ভিড়, এপাড়ায় যারা সিনেমা দেখতে আসে তাদের সবারই সুদৃশ্য পোশাক, হাস্যময় মুখ—একসঙ্গে এতগুলো নিরুদ্বিগ্ন নারী-পুরুষ দেখে সিদ্ধার্থর খুব ভালো লাগে। রাস্তা পেরিয়েও বাসে না উঠে সিদ্ধার্থ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ তার মনে হয়, আজ থেকে পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে পৃথিবীর সবাই যদি এরকম সচ্ছল খুশি হয়ে যায়, তা হলে মন্দ হয় না। ভালো লাগে না এত ঝঞ্ঝাট। সিদ্ধার্থ স্পষ্ট কল্পনায় দেখতে পেল, পাঁচ-সাত বছর বাদে, তখন সে আরেকটু লম্বা হয়েছে, রোজ দাড়ি কামায় বলে গালে একটা পুরুষালি কড়া ভাব, একটি সুন্দরী সঙ্গিনীকে নিয়ে এই সময় সিনেমাহল থেকে বেরোচ্ছে। মেয়েটি কে? মুখটা ঠিক চেনা যায় না—মাথার চুলগুলো কোঁকড়া—তার সঙ্গে হাসি-গল্প করতে করতে সিদ্ধার্থ মানিব্যাগ থেকে পয়সা দিচ্ছে ভিখারিকে। তখনও কি ভিখারি থাকবে? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

সিদ্ধার্থ, তুমি এখানে?

দারুণ চমকে সিদ্ধার্থ ঘুরে তাকাল। যেন সে হঠাৎ বিদ্যুতের একটা সজীব নগ্ন তার ছুঁয়ে ফেলেছে, এমনভাবে কেঁপে উঠল তার ভেতরটা। নরেশদা ওর পিঠে হাত দিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এত রাত্রে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

নরেশদার শান্ত মুখ ও নম্র কন্ঠস্বর, কিন্তু সিদ্ধার্থ এ-সময় অন্য আর কাউকে দেখলেও ভয় পেত না। সেদিন সকালবেলা চায়ের দোকানে নরেশদার সঙ্গে কথা হওয়ার পর সিদ্ধার্থ মনে মনে নরেশদার সঙ্গে একা একা একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল। কী চ্যালেঞ্জ সে নিজেই স্পষ্টভাবে জানে না, কিন্তু অস্ফুটভাবে সে বার বার বলেছে, আমি দেখিয়ে দেব সব্বাইকে দেখিয়ে দেব একদিন! আজ তার একটা চরম দুর্বল মুহূর্তে নরেশদা যেন তাকে ধরে ফেলেছে। সিদ্ধার্থ খুবই সংকুচিত হয়ে পড়ল; কোনো মিথ্যে কথা বানাতে পারল না।

সিদ্ধার্থ আমতা-আমতা করে বলল, না, মানে এই দিকে—খুব বেশি রাত হয়নি তো। নরেশদার হাতে ঘড়ি নেই, তিনি সিদ্ধার্থরই হাতের ঘড়ি দেখে বললেন, সাড়ে ন-টা, সিনেমা দেখতে এসেছিলে বুঝি?

হ্যাঁ, মানে, এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ওই যে মেট্রোতে—

আদিনাথের সঙ্গে সিদ্ধার্থ মদ খেয়েছিল, নরেশদা কি সেই গন্ধ পাবে? লতিকার ঘরে কীরকম যেন পাউডার আর ঘামে মেশানো গন্ধ ছিল, সেই গন্ধ কি এখনও তার গায়ে লেগে আছে? নরেশদা জানতে পারলে—কিন্তু নরেশদা তার কে? কেউ না! তার খুড়তুতো দাদা রুনুদার বন্ধু। রুনুদাই এখন তার সঙ্গে কথা বলে না, তো তার বন্ধু! জানলে তো বয়ে গেল! কিন্তু কিছুতেই সিদ্ধার্থ অস্বস্তি কাটাতে পারে না, তার মুখখানা অপরাধীর মতন হয়ে থাকে—

নরেশদা একদৃষ্টে সিদ্ধার্থর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, তুমি তো আমাদের পার্টি অফিসে এলে না? তোমাকে দিয়ে অনেক কাজ করানো যেত, তুমি নিজেও বেঁচে থাকার একটা উদ্দেশ্য পেয়ে যেতে।

সিদ্ধার্থ ঝপ করে বলে ফেলল, হ্যাঁ, যাব কালই যাব! আজ চলি।

আসবে? ঠিক এসো কিন্তু! একী, তোমার চোখ লাল কেন?

এমনিই, আজ চলি নরেশদা—

সিদ্ধার্থ প্রায় ছুটেই রাস্তা পেরিয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে একটা বাস এলে কত ভালো হত! কিন্তু ধু-ধু করছে রাস্তা, বাসের দেখা নেই, নরেশদা ওপার থেকে এখনও চেয়ে আছে, সিদ্ধার্থ একটা থামের আড়ালে লুকোল। নরেশদাটা ছিনে জোঁকের মতো কেন পেছনে লেগে আছে? তার জীবনের উদ্দেশ্য! নরেশদার নিজের জীবনের উদ্দেশ্য কী? চেনা লোক দেখলেই লেকচার মারা! পড়ত সিদ্ধার্থর মতন অবস্থায়।

বাস যখন এল, সিদ্ধার্থ তখনও উঠল না, দাঁড়িয়েই রইল। এখনও যদি তার গায়ে গন্ধ থাকে?

অনেকক্ষণ থেকেই পাশে একটা লোক কী যেন গুনগুন করছিল, এবার সিদ্ধার্থ মনোযোগ দিল একজন দরিদ্র চেহারার হিন্দুস্থানি, হাতে একটা লাঠি, আপন মনে বলছে, সুরদাসকো জ্যরা রাস্তা পার কর দিজিয়ে—সুরদাসকো কৃপা কিজিয়ে। লোকটা অন্ধ। সিদ্ধার্থ বুঝতে পারল, লোকটা রাস্তার ওপারে যেতে চায়। সিদ্ধার্থ তাকিয়ে দেখল, নরেশদা আর দাঁড়িয়ে নেই এখন। সিদ্ধার্থ এপার থেকেই বাস ধরবে—তা হোক, তবু সে লোকটার হাত ধরে আস্তে আস্তে ওপারে পৌঁছে দিল।

এই সামান্য কাজটুকুতেই সে বেশ আত্মপ্রসাদ বোধ করল। রাস্তায় আরও তো অনেক লোক ছিল, কই, আর কেউ তো অন্ধকে পার করে দেয়নি। শুধু এই জন্যই কেয়া নিশ্চয়ই তাকে ক্ষমা করে দেবে। নিশ্চয়ই। কেয়ার মন খুব নরম।...সব অন্ধের নামই সুরদাস, এটা কিন্তু ভারী চমৎকার।







কেয়ার বাবাকে সিদ্ধার্থ ঠিক বুঝতে পারল না। পর-পর দু-দিন দেখা হল তার সঙ্গে, বেশ ভালোভাবেই তিনি কথা বললেন সিদ্ধার্থর সঙ্গে, কলকাতা শহরের সঙ্গে দিল্লির তুলনা করলেন, খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সিদ্ধার্থর বাড়ির কথা। কিন্তুর কথার মাঝখানে তিনি হঠাৎ এক সময় থেমে গিয়ে চুপ করে চেয়ে থাকেন একদৃষ্টে সিদ্ধার্থর দিকে, তখন তার কীরকম যেন ভয়-ভয় করে। যদিও সিদ্ধার্থ বুঝতে পারে, তিনি তখন নিশ্চয় অন্য কথা ভাবছেন, কিন্তু ওরকম একদৃষ্টে চেয়ে থাকা দেখলে অস্বস্তি না হয়ে যায় না। কালো ফ্রেমের মোটা কাচের চশমা পরেন কেয়ার বাবা, এইরকম চশমার যে ভিতর দিয়ে মানুষের চোখ দুটো কীরকম দুর্বোধ্য দেখায়। সিদ্ধার্থর স্বভাব, কোনো একজন নতুন লোক দেখলেই সে প্রথমেই একটা ধারণা করে নেয়, লোকটা ভালো না খারাপ। কিন্তু কেয়ার বাবা সম্পর্কে সে কিছুতেই মনস্থির করতে পারল না।

একদিন রাস্তাতেই দেখা হয়েছিল কেয়ার সঙ্গে। সিদ্ধার্থ আগে দেখেছে, চেনা মেয়েদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলে তারা সাধারণত কথা বলতে চায় না। বড়ো জোর একবার তাকায় বা শুকনোভাবে একটু হাসে। ডেকে কথা বললেও না-থেমে চলতে-চলতেই উত্তর দেয়। কেয়া কিন্তু অন্যরকম, সিদ্ধার্থকে দেখেই তার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, বলল, এই, এ-কদিন আপনি আসেননি কেন?

কেয়ার বাবার সঙ্গে সেদিনই প্রথম আলাপ হয়েছিল। সিদ্ধার্থর মনে মনে ভয় ছিল, কেয়ার বাবা তাকে পছন্দ করবেন কিনা। তাদের পাড়ায় ছেলেমেয়েরা সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে বাইরে দেখা করে, কোনো মেয়ের সঙ্গে কোনো ছেলে দেখা করার জন্য বাড়িতে আসবে—মা-বাবার সামনে কথা বলবে—এরকম সে দ্যাখেনি।

কেয়ার কোনো আড়ষ্টতা নেই। বাবার সঙ্গে সে সিদ্ধার্থর পরিচয় করিয়ে দিল। কেয়ার বাবা বেশ হাসিমুখেই সিদ্ধার্থর সঙ্গে, তারিখ করা গলায় বললেন, বা:, বেশ সুন্দর স্বাস্থ্য তো তোমার? আজকালকার ছেলেদের বেশির ভাগেরই যা চেহারা—! কী পড়ো তুমি? কিছু পড়ো এখন? ডাক্তারি পড়বে? খুব ভালো কথা, ডাক্তারি পাশ করে গ্রামে চলে যেয়ো, বুঝলে? শহরে থেকো না; আমাদের দেশের পক্ষে এখন দরকার...তারপর হঠাৎ তিনি চুপ করে গিয়েছিলেন। মাঝে-মাঝেই কী নিয়ে অত ভাবেন উনি?

সেদিন কেয়া তার ছোটো ভাই পিন্টুকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিল সিদ্ধার্থর সঙ্গে। কলকাতা শহরটা কেয়া ভালো চেনে না—সে অনেক কিছু দেখতে চায়, বিশেষত উত্তর কলকাতার কিছুই তো তার দেখা হয়নি। সিদ্ধার্থ খুব উৎসাহের সঙ্গে উত্তর কলকাতার গুণাগুণ বর্ণনা করতে শুরু করেছিল। লোকের ভিড় একটু বেশি, রাস্তাগুলো ভাঙা—কিন্তু এটাই কলকাতার সবচেয়ে পুরনো জায়গা—আদি কলকাতা যাকে বলে। কেয়া কি রাজেন মল্লিকের মার্বল প্যালেস দেখেছে? ওরকম বাড়ি একটাও আছে দক্ষিণ কলকাতায়? কিংবা দিল্লিতে? দুটো পরেশনাথের মন্দির—পুকুরে কত বড়ো বড়ো মাছ সেখানে। শোভাবাজারে একটা বাড়িতে সিদ্ধার্থরা ছেলেবেলায় খেলতে যেত—সে-বাড়ির সামনে দুটো বড়ো বড়ো সিংহের মূর্তি।

সিদ্ধার্থর কথায় কেয়া একটু একটু মুখ টিপে হাসছিল, এসময় বলল, যাই বলুন, আমার কিন্তু দক্ষিণ কলকাতাই বেশি ভালো লাগে! এদিকটা বড্ড নোংরা!

আমাদের ‘তুমি’ বলার কথা ছিল না?

আপনিই তো বলছেন না।

ইয়ে, মানে, আমি মনে মনে তোমাকে আগে থেকেই তুমি বলা শুরু করেছি।

মনে মনে?

হ্যাঁ, আমি মনে মনে তোমাকে অনেক কথা বলেছি এর মধ্যে।

কী মজার লোক! কী বলেছেন, বলুন না! কী বলেছেন?

হঠাৎ লজ্জায় সিদ্ধার্থ লাল হয়ে উঠল। খানিকটা তোতলামি করে বলল, না, মানে, সে কিছু নয়—মানে, মনে মনে যা বলা যায়, মুখে তা কিছুই বলা যায় না।

কেয়া খিলখিল করে হেসে উঠল। খানিকটা আহত হয়ে সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল, এতে হাসির কী আছে? মোটেই কোনো হাসির কথা বলিনি!

উত্তর দিল না কেয়া—হাসিও থামল না।

পিন্টুর হাত শক্ত করে চেপে ধরে বেশ দায়িত্বশীল ভঙ্গিতে সিদ্ধার্থ কেয়াকে নিয়ে ঘুরল অনেকক্ষণ! মাঝে মাঝেই তার মনে হচ্ছিল, রাস্তার সব লোক তার দিকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। যেন তার একটা বিরাট পরিবর্তন হয়ে গেছে, এই তো ক-দিন আগেও, বিকেলবেলা তার কোনো যাবার জায়গা ছিল না—শিবেনদের হস্টেল ছাড়া—সে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত—আর আজ কিনা কেয়ার মতন একটা চমৎকার মেয়ের সঙ্গে সে হাসতে হাসতে যাচ্ছে। সিদ্ধার্থকে সবাই হিংসে করছে নিশ্চয়ই। কিন্তু কেয়ারা কয়েক মাস বাদেই আবার দিল্লি চলে যাবে—এই ভেবে এখন থেকেই তার একটু একটু মন খারাপ লাগতে লাগল।

পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে প্রথমেই তার কেয়ার কথা মনে পড়ল। সেই বিকেলের আগে দেখা হবার উপায় নেই। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই কেয়া কলেজে যাবার জন্য তৈরি হয়। সিদ্ধার্থদের কলেজে ক্লাস এক-একদিন আরম্ভ হত এগারোটা চল্লিশ কিংবা সাড়ে-বারোটায়—কিন্তু কেয়াদের মিশনারি কলেজ, ওদের ব্যাপারই আলাদা। কেয়ার বাবা কি ওকে কলেজ পর্যন্ত পৌঁছে দেন? না কেয়া নিজেই বাসে চেপে যায়? সিদ্ধার্থর অদম্য ইচ্ছে হল, মানিকতলার মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে একবার শুধু কেয়াকে সে দেখে আসে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সে ব্যাপারটা তার কাছে খুব ছেলেমানুষি মনে হল। তবু চা খেয়ে, খবরের কাগজ তন্নতন্ন করে পড়া শেষ করার পর সে আর কোনো কাজ খুঁজে পেল না, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে মানিকতলার মোড়ে এসেই দাঁড়িয়ে রইল। বহুক্ষণ। অবশ্য কেয়াকে সে দেখতে পেল না।

সেদিন দুপুরে সিদ্ধার্থ আবার দু-জায়গায় চাকরির জন্য চেষ্টা করতে গেল। সিদ্ধার্থ ঠিক করেছিল, এবার চেনা-শুনো সব লোকের কাছে গিয়ে চাকরি চাইবে। কে কীরকম ব্যবহার করে—সেই অনুযায়ী সে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করবে। শিবেন বলেছিল, ওর মেশোমশাই কর্নেল সুর ইচ্ছে করলেই চাকরি করে দিতে পারেন। সিদ্ধার্থ এতকাল রাজি হয়নি, টুলটুলের বাবার কাছ থেকে কোনো অনুগ্রহ নেবার ইচ্ছে তার ছিল না, ছোটোমাসি তাকে কত যত্ন করেন, অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে ওবাড়িতে গেলে কি আর তাকে কেউ গ্রাহ্য করবে? না করুক, এভাবে আর কতদিন চলবে? ওসব খাতির-ফাতির কি সে ধুয়ে খাবে? না-হয়, কর্নেল সুর তাকে চাকরি দিলে সে আর ছোটোমাসিদের বাড়িতে কোনোদিন যাবে না। ওবাড়িতেই কেয়ার সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। একটা কথা ভেবে সিদ্ধার্থ আলতোভাবে শিউরে ওঠে। কেয়াদের বাড়ি যদি মানিকতলা না হয়ে বালিগঞ্জেই কোথাও হত? তা হলে সে মালবিকার সঙ্গে ফিরত, সিদ্ধার্থ তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারত না। তা হলে কি আর কেয়ার সঙ্গে দেখা হত কখনো? কেয়ার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়নি, এই অবস্থাটা সিদ্ধার্থ এখন কল্পনাই করতে পারে না।

সেদিন দুপুরেই সিদ্ধার্থ বেশ একটা ভরসা পেয়ে গেল। তার বন্ধু সঞ্জয়ের দাদা একদিন তাকে দেখা করতে বলেছিলেন অনেকদিন আগে। তিনি সিদ্ধার্থর জন্য চেষ্টা করবেন বলেছিলেন। সিদ্ধার্থ কোনো প্রত্যাশা না নিয়েই গেল তাঁর কাছে। অজয়দা কিন্তু বেশ আগ্রহের সঙ্গেই দেখা করলেন তার সঙ্গে! একটা বড়ো ওষুধ কোম্পানিতে ভালো চাকরি করেন তিনি। সিদ্ধার্থকে একটু ধমক দিয়ে বললেন, তুমি আগে আসোনি কেন? আমাদের অফিসে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টটেটিভের জন্য কয়েকজন অ্যাপ্রেন্টিস নেবে সামনের মাসে—তুমি এক্ষুনি একটা দরখাস্ত করে দাও! চেহারা ভালো আছে, বায়োলজি নিয়ে বি.এসসি পাশ করেছ তো? হয়ে যাবে!

সিদ্ধার্থ নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারেনি! এত সহজে! মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টটিভের চাকরি তো বেশ ভালোই, ভাগ্যিস ঘড়িটা বিক্রি করেনি, ঘড়িটা অনেক দরকারি। অবশ্য আমি নিজে ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, তার বদলে এখন ডাক্তারদের কাছে আমাকে গিয়ে ওষুধ বিক্রির জন্য ধরনা দিতে হবে! তা হোক, মাইনে তো খারাপ নয়! বোনাসও আছে।

দরখাস্ত লিখে অজয়দার কাছে চা খেয়ে সেই অফিস থেকে বেরোবার পর সিদ্ধার্থর বুকটা একেবারের জন্য একটু ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল সন্দেহে। সত্যিই হবে তো চাকরিটা? না আঁচালে বিশ্বাস নেই বাবা! অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আগে হাতে আসুক! অবশ্য, অজয়দা তাকে মিথ্যা আশ্বাসই বা দেবেন কেন? তিনি অনায়াসেই তাকে শুকনো মিষ্টি কথা বলে ফিরিয়ে দিতে পারতেন, অন্যদের মতন। অজয়দাকে সে একদিন ক্যারাম খেলায় হারিয়ে দিয়েছিল। না:, পৃথিবীতে এখনও ভালো লোক নিশ্চয়ই দু-একটা আছে!

আবার আনন্দে সিদ্ধার্থর শরীরটা হালকা হয়ে গেল। রাস্তায় একটা খালি সিগারেটের প্যাকেট দেখে এক শট কষাল সে, নোংরা জলভরা একটা গর্ত লাফিয়ে পার হয়ে গেল, আর একটা ফুলস্পিডের চলন্ত ট্রামে সে দারুণ ঝুঁকি নিয়ে ছুটতে ছুটতে উঠে পড়ল।

বিকেল থেকেই ছটফট করছিল সিদ্ধার্থ, কিন্তু কেয়া পাঁচটার আগে কলেজ থেকে ফেরে না। তারপর টুলটুলের সঙ্গে যদি আবার ওদের বাড়ি যায়—কেয়া কি একবারও ভাববে সিদ্ধার্থ তার সঙ্গে দেখা করতে এসে ফিরে যাবে? কেয়া কলেজ থেকে ফিরলেও অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই যাওয়া যায় না। বিকেলটা সিদ্ধার্থ খুব সাবধানে ঘুরল, যাতে কোনো বন্ধুর সঙ্গে তার দেখা না হয়ে যায়। শিবেন যদি তাকে ডাকতে আসে, তা হলে শিবেনকে ফেলে কি আর সে কেয়ার কাছে যেতে পারবে? অথচ, আজ কেয়ার সঙ্গে তার দেখা করতেই হবে। কেন? তা ঠিক জানে না সে।

একটু সন্ধ্যা হতেই সিদ্ধার্থ কেয়াদের বাড়ির সামনে দিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে এল। রাস্তা পেরোতে যাবে, এই সময় সিদ্ধার্থ দেখতে পেল কেয়ার বাবা একটা ট্যাক্সি থেকে নামছেন, সঙ্গে একজন মহিলা। এই মহিলাকে সিদ্ধার্থ আগেও একদিন দেখেছিল। এই কি কেয়ার মাসি, যাকে কেয়ার বাবা বিয়ে করবেন? কেন উনি আবার বিয়ে করছেন? সিদ্ধার্থর কিছুতেই ব্যাপারটা পছন্দ হয় না। অবশ্য তার পছন্দ অপছন্দ কী এসে যায়! ওঁদের দু-জনকে দেখে সিদ্ধার্থের আর যেতে ইচ্ছে হল না। কেয়ার বাবার সামনে এমনিতে তার অস্বস্তি লাগে, তা ছাড়া এই সময় ওদের মাঝখানে বোধহয় তার গিয়ে উপস্থিত হওয়া উচিতও না!

সিদ্ধার্থ কেয়াদের বাড়ি গেল না, কিন্তু ওই জায়গাটা ছেড়ে নড়তেও পারল না, ওইখানেই ঘুরতে লাগল। সিগারেটের স্বাদ ভালো লাগছে না, বুকের মধ্যে কী যেন একটা চাপ বেঁধে আছে, অসহিষ্ণু ঘোড়ার মতো ছটফট করছে সিদ্ধার্থ। সে এখনই, এই মুহূর্তেই কেয়ার সঙ্গে দেখা করতে চায়, কিন্তু তার কোনো উপায় নেই—কেন নেই? কেন? সিদ্ধার্থ এখন আর কিচ্ছু বুঝতে চায় না—তার মনে হল, সবাই মিলে যেন তার সঙ্গে শত্রুতা শুরু করেছে। চালাকি পেয়েছে সবাই? একটা ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সিদ্ধার্থ, তার ইচ্ছে হল সেই ল্যাম্পপোস্টটাকে উপড়ে ফেলে রাস্তার ওপর আছড়ে ফেলে। রাস্তার সব কটা আলো এখন ভেঙে দিলে কী হয়? সিদ্ধার্থ দেখতে পেল, কেয়াদের ফ্ল্যাটে সব কটা ঘরের আলো জ্বলছে। হলুদ পরদার মাঝে ছায়া পড়ছে মানুষের। কোনটা কেয়ার ছায়া, চেনা যায় না।

ওখানে ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরির পর, রতনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সেই রকমই ধুতির সঙ্গে হাওয়াই শার্ট, রতনের বুকপকেট ভরতি খুচরো পয়সা, হাঁটার সময় ঝনঝন শব্দ হয়। ছেলেবেলায় যত লাজুক ছিল রতন, এখন সে অনবরত বকবক করে তার শোধ তুলে নিতে চায়। দেখা হলে আর ছেড়ে যায় না সিদ্ধার্থ। নীরসভাবে জিজ্ঞেস করল, কী রে, আজ দোকান থেকে এত তাড়াতাড়ি ফিরলি যে।

শরীর ভালো লাগছে না মাইরি।

শরীর ভালো লাগছে না বলে দোকান থেকে ছুটি নিয়ে এসেছে, কিন্তু সিদ্ধার্থর সঙ্গে গল্প করার ব্যাপারে তার আলস্য নেই। দুজন মহিলা আজ তাদের দোকানে সোনার গহনা বিক্রি করতে এসেছিল—তাই নিয়ে রতন এক অন্তহীন গল্প ফেঁদে বসে, কথার মধ্যে মধ্যে রতন এমন এক বড়োবাজারি শব্দ ব্যবহার করে যে সিদ্ধার্থ রীতিমতো অবাক হয়ে যায় : ‘নয়নসুখ মেয়েছেলে’ কথাটা সিদ্ধার্থ আগে কখনো শোনেনি।

রতনের দিকে কান, কিন্তু সিদ্ধার্থ ঘনঘন চেয়ে দেখছে কেয়াদের ফ্ল্যাটের দিকে। হঠাৎ একসময় তার হৃদপিন্ড লাফিয়ে উঠল। কেয়ার বাবা আর সেই ভদ্রমহিলা বেরিয়ে আসছেন। কেয়াও আছে কি? না, শুধু ওঁরা দু-জন। সিদ্ধার্থ আর রতনকে সহ্য করতে পারছে না। পৃথিবীর কোনো মানুষের গল্পের প্রতি তার আর কোনো আকর্ষণ নেই। চলি রে, শিয়ালদা যাব, বলে সিদ্ধার্থ আচমকা একটা ট্রামে উঠে পড়ে। এক স্টপ বাদেই নেমে পড়ে আবার সতর্কভাবে ফিরে আসে। সিদ্ধার্থ খুব আস্তে আস্তে কেয়াদের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে ওঠে। বন্ধ দরজার সামনে সিদ্ধার্থ একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর খুব মৃদুভাবে টোকা দেয়। দরজা খুলল কেয়াই! কেয়াকে দেখে সিদ্ধার্থ বিষমভাবে চমকে উঠল। কেয়ার চোখ দুটো ফুলোফুলো আর লাল; কোনো সন্দেহ নেই, কেয়া এইমাত্র কাঁদছিল। সিদ্ধার্থ দিশেহারা হয়ে পড়ে। কী করবে বুঝতে পারে না। একটু সামলে নিয়ে কেয়া বলে, আসুন, ভেতরে আসুন!

কেয়া, তোমার কী হয়েছে?

আপনি আসুন...

না, মানে, আমি তা হলে আজ চলে যাই...

কেন? ওরকম করছেন কেন, আসুন না—

তুমি কাঁদছিলে?

কেয়া মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছে নেবার চেষ্টা করে বলে, না, কাঁদিনি তো! সিদ্ধার্থ ঘরের মধ্যে ঢুকে বেখাপ্পাভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, হাত দুটো শরীরের দু-পাশে ঝোলানো, ঘাড়টা নীচু করা। কেয়ার কান্নাভরা চোখের কথা সে একবারও ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি। যতবার তার কেয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছে, দেখেছে কেয়া বরং একটু বেশি হাসে। হাসি শুরু করলে আর থামতেই চায় না। কেয়াদের বাড়ি এবং কেয়ার ব্যবহার দেখে তার মনে হয়েছিল, এখানে শুধু আনন্দই আছে। সেইজন্যই সে বারে বারে এত ব্যগ্র হয়ে ছুটে আসতে চায় এখানে। কিন্তু হঠাৎ সব বদলে গেল দেখে সিদ্ধার্থ কিছুতেই মেলাতে পারে না। সিদ্ধার্থর ইচ্ছে হয়, তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কেয়ার দুঃখ মুছে দেবে। যে-কোনো দুঃখ। কিন্তু তার কী উপায় সিদ্ধার্থর হাতে আছে, তা সে কিছুতেই ভেবে পায় না।

কেয়া চেষ্টা করেও কান্না থামাতে পারছে না। হাসির মতনই কান্নাও তার নিজের বাগ মানে না। সিদ্ধার্থ একটু কাছে এগিয়ে এসে অচেনা গলায় জিজ্ঞেস করে, তোমার কী হয়েছে, আমাকে বলবে না?

বাপি আজ আমাকে মাসিমার সামনে বকুনি দিয়েছে! বাপি আমাকে—

কেয়ার চোখ আবার জলে ভরে আসে। তার বালিকার মতন সুন্দর হাতের উলটোপিঠ দিয়ে সে চোখের জল মুছে নেয়। কেয়াকে সত্যিই তার বয়সের থেকে অনেক ছোটো দেখায় এখন। পাঁচ বছর আগে তার মা মারা যাবার সময়ে যেন সে ফিরে গিয়েছে। সিদ্ধার্থ এক পলক কেয়ার বাবার দুর্বোধ্য মুখখানি কল্পনা করে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেন?

থাক, ও-কথা থাক, আপনি বসুন।

বলবে না?

না। আপনি বসুন না!

সিদ্ধার্থ সোফায় বসে, কেয়াও অন্যটাতে বসে মুখ ফিরিয়ে থাকে। তার মুখ কেঁপে-কেঁপে উঠছে। সিদ্ধার্থ ঠিক বুঝতে পারে না, তার এখন চলে যাওয়া উচিত কিনা। চুপ করে বসে থাকে—অনেকক্ষণ দু-জনে আর কোনো কথা হয় না। সিদ্ধার্থ সারা ঘরের দেয়াল দেখা শেষ করে নিয়েও কেয়ার দিকে স্পষ্টভাবে চোখ ফেরাতে পারে না। তারও বুকের মধ্যে যে অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে—সে কথা সে কাউকে বোঝাতে পারবে না। সিদ্ধার্থর হঠাৎ মনে হয়—এই পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের কোনোই মূল্য নেই, এক কানাকড়িও দাম নেই তার জীবনের। সে কোনো কিছুই বদলাতে পারে না—পৃথিবীর সমস্ত নিয়মের কাছে সে অসহায়। এই ঘরে এই মুহূর্তে যে সে বসে আছে—তাতে কার কী এসে যায়! সে একটা অপদার্থ! পৃথিবীর আর যে-কোনো লোকের জীবনই তার চেয়ে মূল্যবান। কেয়ার সঙ্গে তার আলাপ না-হলেই ভালো হত, তার কিছুই প্রাপ্য ছিল না, এইটুকুও না। আর কোনো কিচ্ছু না ভেবেই আমচকা সিদ্ধার্থ কেয়ার বাহু ছুঁয়ে সম্মোহিত মানুষের মতন ফিসফিস করে বলল, কেয়া, আমি তোমাকে, মানে, তোমার আমার...

কেয়া চোখ তুলে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইল সিদ্ধার্থর দিকে। সিদ্ধার্থর মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কেয়ার চোখে এখন আর জল নেই। সে খুব নরমভাবে বলল, আমি জানি—







সুতপা যে রাত্রে বাড়ি ফিরল না, সেদিন সন্ধ্যা থেকেই দারুণ ঝড়-বৃষ্টি। সিদ্ধার্থ বাড়ি ফিরেছিল, বৃষ্টি ভিজে টুনু ফিরেছিল আরও অনেক পরে—প্রায় সাঁতার কেটে। তাদের গলিতে খুব জল জমে। ছোটোকাকার ক-দিন ধরেই খুব জ্বর, তবু তিনি জানলা খুলে রেখেছেন, এবং মাঝে মাঝেই খাট থেকে উঠে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছেন।

সুতপা অফিস থেকে প্রায়ই রাত নটা সাড়ে-নটার পর ফিরেছে। ইদানীং সে একটু তাড়াতাড়ি ফিরছিল বটে কিন্তু বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছিল। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বাড়ির সবাই সুতপার ফেরার প্রতীক্ষা করছিল, কিন্তু মুখে কেউ কিছু বলেনি। মা প্রায়ই উঠে উঠে সদর দরজার কাছটা ঘুরে আসছিলেন। দশটার সময় টুনু আর সিদ্ধার্থকে খেতে দিয়ে সুতপার খাবার তিনি ঢেকে রাখলেন। খাওয়ার পর টুনু শুতে চলে গেল, সিদ্ধার্থকে ডেকে মা বললেন, হ্যাঁরে তপু ফিরবে কী করে? বৃষ্টি তো কেবল বেড়েই চলেছে—

সিদ্ধার্থ ঝাঁঝের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল, বৃষ্টি তো সেই সন্ধ্যা থেকেই পড়ছে, ইচ্ছে করলে তোমার মেয়ে বুঝি আগে ফিরতে পারত না? এখন কি আর ট্রাম-বাস চলছে!

তা হলে কি অলকাদের বাড়ি—

অলকাপিসিদের বাড়ি ভবানীপুরে। অফিস ফেরত মাঝে মাঝে সেখানে সুতপা বেড়াতে যেত। দু-একদিন রাত্রেও সেখানে থেকেছে—অবশ্য আগে থেকে বাড়িতে বলে। মা যেন প্রাণপণে বিশ্বাস করতে চাইছেন, সুতপা সেখানেই আছে। সিদ্ধার্থরও ক্ষীণভাবে বিশ্বাস হল, এই দারুণ ঝড়-জলের মধ্যে সুতপা আটকে গেছে, ফিরতে পারেনি, অলকাপিসিদের বাড়িতেই থেকে গেছে। খবরই বা দেবে কী করে?

ছোটোকাকা জ্বর গায়েই উঠে এসেছেন মায়ের ঘরে। তিনি বললেন, অলকাদের তো ফোন আছে—যদি একটা খবর নেওয়া যায়—

ওপরতলায় সেজকাকাদের ফোন আছে। কিন্তু আজ দু-বছর প্রায় ওদের সঙ্গে সিদ্ধার্থদের কথা বন্ধ। তাই বলে আপদে-বিপদে ওসব ধরলে চলে না। সিদ্ধার্থ বলল, ওদের রুনুদাকে ডেকে একটা ফোন করে আসব?

কিছু একটা চাপা আশঙ্কায় মা বললেন, ওদের কিছু বলতে হবে না। জানি তো এদের, সাহায্য করবে না একচুল, শুধু যা-তা রটিয়ে বেড়াবে।

সুতপা সম্পর্কে বাড়ির সবারই বিশ্বাস শিথিল হয়ে গেছে, সেটাই সবচেয়ে মুশকিল। নইলে, বোকা কিংবা দুর্বল মেয়ে নয় সুতপা, বৃষ্টির জন্য ফেরার খুব বেশি অসুবিধে হলে—সে অন্য কোথাও থেকে যাবে—তা-ই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক। হঠাৎ কোনো বিপদে পড়ার মেয়ে সে নয়। কিন্তু কেউ কিছু না বললেও, তিনজনের মুখে আশঙ্কার ছায়া। সুতপা এখন তাদের অনুমানের বাইরে চলে গেছে।

কিন্তু আর কোথা থেকে টেলিফোন করা যায়? মোড়ের ইলেকট্রিকের দোকানে একটা টেলিফোন আছে, একটা লোক শোয় সেখানে রাত্তিরবেলা, তাকে যদি জাগিয়ে তোলা যায়!

পাজামা হাঁটুর ওপর গুটিয়ে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সিদ্ধার্থ। বৃষ্টির তেজ একটুও কমেনি, রাস্তার জল হাঁটু ছাড়িয়ে গেছে। জল ঠেলে গিয়ে অতি কষ্টে দোকান থেকে সেই লোকটাকে সে ডেকে তুলল।

টেলিফোন করতে গিয়ে সিদ্ধার্থর একটা খটকা লাগল। অলকাপিসির ওখানে ফোন করা কি ঠিক হবে? যদি সুতপা ওখানে না থাকে—ওঁরা শুধু শুধু ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবেন। সুতপা হয়তো ওর কোনো বান্ধবীর বাড়িতেও থাকতে পারে। বাড়ির কাউকে তো গ্রাহ্যই করে না সুতপা—খবর দেবার কথা হয়তো সে চিন্তাও করেনি।

সুতপার দু-জন বান্ধবীকে সিদ্ধার্থ চেনে, একজন তো সুতপাদের অফিসের পাশের অফিসেই কাজ করে—আগে সুতপা ওদের নিয়ে কত গল্প করেছে বাড়িতে। কিন্তু ওদেরও কাউকে ফোন করতে সাহস হল না সিদ্ধার্থর। একটা নাম অনেকক্ষণ থেকেই তার মাথায় ঘুরছিল। অনন্ত সান্যাল। কিন্তু হঠাৎ সিদ্ধার্থর গা-টা ছমছম করে উঠল। যদি সত্যিই তাই হয়? না, না, তা হতে পারে না! তবু অনেক ভেবে-চিন্তে সিদ্ধার্থ টেলিফোন গাইড থেকে অনন্ত সান্যালের নম্বরটাই খুঁজে বার করে ডায়াল ঘোরাল। হাত কাঁপছিল তার। একঘেঁয়ে কোঁ কোঁ শব্দ। এনগেজড। একটু অপেক্ষা করে সিদ্ধার্থ আবার ডায়াল করল—এবারও সেই একই! এত রাত্রে লোকটা কার সঙ্গে এতক্ষণ ধরে কথা বলছে? তৃতীয় বারের চেষ্টাতেও লাইন না পেয়ে সিদ্ধার্থ এনকোয়ারির নম্বর ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করল। বিরক্ত গলায় উত্তর এল, লাইন খারাপ। ওই এক্সচেঞ্জের পুরোটাই আউট অফ অর্ডার হয়ে গেছে।

তা হলে এখন সে কী করবে? সিদ্ধার্থ ইতস্তত করতে লাগল। অনন্ত সান্যালের লাইন না পেয়ে কেন কে জানে সে খানিকটা স্বস্তিও বোধ করল। দোকানের লোকটা বিরক্ত মুখে চেয়ে আছে, এবার জিজ্ঞেস করল, আপনার হয়ে গেছে দাদা? সিদ্ধার্থর হাতে তখন রিসিভারটা ধরা। এখন সে আর একা মনস্থির করতে পারছে না। আর কেউ যদি তার সঙ্গে থাকত। টুনুটাকেও নিয়ে এলে হত—সিদ্ধার্থ দোকানের লোকটিকেই বলল, মানে, ব্যাপারটা কী হয়েছে জানেন, ইয়ে, আমার ছোটো ভাই বাড়িতে ফেরেনি—মা খুব চিন্তা করছেন।

লোকটিই হাই তুলে বলল, যা বৃষ্টি, আটকে গিয়ে কোনো বন্ধু-টন্ধুর বাড়িতে আছে নিশ্চয়ই। এখন আর কী করবেন? এখন পুলিশকে খবর দিলেও তারা থানা থেকে বেরোবে না মশাই—

সিদ্ধার্থ অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। সত্যিই তো, সব রাস্তা জলে ভাসছে—এখন কিছু করবার উপায় নেই। আবার জলের মধ্যে ছপ ছপ করতে করতে সিদ্ধার্থ বাড়ি এল।

খাটের উপর প্রায় মূর্ছিতার মতন মা শুয়ে আছেন। বোঝা যায় তাঁর শরীরটা কান্নায় ফুলে ফুলে উঠছে। চার দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে ছোটোকাকার মুখখানা করুণ, সামান্য নীচু হয়ে ছোটোকাকা মায়ের হাত ছুঁয়ে নীচু গলায় বলছেন, বউদি, বউদি, আগে থেকেই ভেঙে পড়বেন না—হয়তো কিছুই হয়নি—নিরাপদ জায়গাতেই আছে নিশ্চয়ই!

সিদ্ধার্থকে দেখেই ছোটোকাকা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাকুলভাবে বললেন, কী?

সিদ্ধার্থ এগিয়ে এসে বলল, মা, ওঠো, কিচ্ছু হয়নি, তপু অলকাপিসিদের বাড়িতেই আছে।

মা চোখ ফিরিয়ে সিদ্ধার্থকে তীব্রভাবে চেয়ে দেখলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, তপু নিজে এসে টেলিফোনে তোর সঙ্গে কথা বলছে?

হ্যাঁ। ওঠো, এবার খেয়ে নাও।

আমার গা ছুঁয়ে বল!

আরে, আমি কি মিথ্যে কথা বলব নাকি? এই তো গা ছুঁয়ে বলছি। নাও এবার ওঠো, ভালোই তো করেছে ওখানে থেকে গিয়ে—ও আশা করেছিল আমরা আরও আগে টেলিফোন করে খবর নেব—

বই পড়তে পড়তে টুনু অনেক আগেই আলো জ্বেলে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। আলো নিভিয়ে সিদ্ধার্থ তার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম এল না, বহুক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে চোখ মেলে রইল চুপচাপ। সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এখনও তার তেজ কমেনি, একঘেয়ে আওয়াজ, কোথাও ছাদের পাইপ থেকে জল পড়ছে ছড়ছড় করে, মাঝে মাঝে হাওয়ার শোঁ-শোঁ গর্জন, কোনো বাড়ির একটা খোলা জানলা বার বার আছড়াচ্ছে দেয়ালে। বঙ্গোপসাগরের কোনো এক সুদূর কেন্দ্রে হাওয়ায় তৈরি হয়েছে নিম্নচাপ—ছোটাছুটি শুরু হয়েছে হাওয়া আর মেঘের—তাদের মিলন হয়েছে শুধু এই কলকাতায়—ঝড়ের হুল্লোড় আর একগুঁয়ে বৃষ্টিপাতে কলকাতা নিথর হয়ে আছে। ঘুম আসে না, অন্ধকারে চেয়ে থেকে থেকে সিদ্ধার্থ নিজেকে বিষম নি:সঙ্গ বোধ করে—এতখানি দায়িত্ব সে আর একা বইতে পারবে না।

প্রচন্ড শব্দে একটা বাজ পড়ে দূরে, বিদ্যুতের আলোয় ঝলসে ওঠে ঘর, সিদ্ধার্থ ধড়মড় করে উঠে বসে বিছানায়। হাত দিয়ে ঠেলে ডাকল, টুনু, টুনু! টুনু জাগে না, পাশ ফিরে শোয়। আরও ডাকাডাকির পর সে হঠাৎ উঠে পড়ে বলে, কী? কী রে দাদা?

সিদ্ধার্থ শূন্য গলায় বলে, তপু আজ রাত্রে বাড়ি ফেরেনি!

ঘুমের ঘোরে টুনু ঠিক বুঝতে পারে না, কী কী হয়েছে?

তপু আজ বাড়ি ফেরেনি, জানিস। কোনো খবর দেয়নি!

দিদি?

টুনু একটু বসে ভাবে। তারপর অন্ধকারেই খাট থেকে নেমে আলো জ্বালে। দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে। দাদার এ-রকম পরাজিত অসহায় মুখ টুনু আগে কখনো দ্যাখেনি। আলনা থেকে জামা তুলে নিয়ে টুনু বলল, চল বেরোই।

এখন কোথায় যাবি? কোথায় খুঁজবি?

হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়েছিস?

হাসপাতালে?

আমার তা মনে হয় না অবশ্য! কারওর বাড়ি-টাড়িতে থেকে যায়নি তো?

কী করে জানব?

টুনু একটুখানি চিন্তা করল। বাড়ির খবর সে বিশেষ কিছুই রাখে না। এই ধরনের ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করতেও সে বিশেষ অভ্যস্ত নয়। সিদ্ধার্থর বিবর্ণ মুখখানাই তাকে অনেক বেশি চিন্তিত করেছিল। আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে দাদার কাঁধে হাত রেখে নিজেই বড়ো ভাইয়ের মতন সান্ত্বনার গলায় বলল, তুই অত ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেন? বৃষ্টিতে কোথাও আটকে গেছে—দিদি তো রাস্তাঘাটে হারিয়ে যাওয়ার মেয়ে নয়, একটা রাত যদি কোথাও থাকে—উই শুড নট মাইণ্ড।

তা নয়, তপু ছেলেমানুষ, আর জেদি। ও কি নিজের ভালো-মন্দ বোঝে?

ছেলেমানুষ? দিদি ছেলেমানুষ? আজকাল কেউই ছেলেমানুষ নয়। কুড়ি বছর বয়স, অফিসে চাকরি করছে, শি ইজ ম্যাচিওরড এনাফ। আমার মনে হয়...কথা বলতে বলতে টুনু উৎকর্ণ হয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করে। তারপর বলে, মা কী করছে?

মাকে আমি মিছেমিছি বলেছি তপু অলকাপিসিদের বাড়িতে আছে।...অন্তত আজ রাতটা।

সঙ্গে সঙ্গে টুনুর মুখখানা আলোকিত হয়ে ওঠে। সব দুশ্চিন্তা যেন কেটে যায়—বা:, খুব ভালো করেছিস। ওয়াণ্ডারফুল, তা হলে তো আর ঝামেলাই নেই—

কিন্তু তপু যদি সেখানে না থাকে?

না থাকলেই বা। মা না জানতে পারলেই হল। মনে কর, দিদি যদি আজ রাতটা তার কোনো বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গেই কাটায়, তাতে কি সত্যিই কিছু এসে যায়?

তুই বড্ড বাজে কথা বলিস! কোনো কাজ হয় না তোকে দিয়ে—

কথার কথা বলছি! হয়তো অলকাপিসিদের বাড়িতেই আছে। যদি বাইচান্স তা নাও হয়, তা হলেও এমন-কিছু রামায়ণ-মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না! মাকে বোঝাতে পারলেই হল! নে শুয়ে পড়!

সকালবেলা ছোটোকাকার জ্বর অনেক বেড়েছে। চোখ দুটো টকটকে লাল, নিশ্বাস ফেলতে যেন কষ্ট হচ্ছে। বার বার জিজ্ঞেস করছেন, তপু ফিরেছে? অ্যাঁ! তপু এখনও ফেরেনি?

সিদ্ধার্থ ছোটোকাকার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে বলল, তপু বলেছে, আজও যদি রাস্তায় জল জমে থাকে, তবে ও অলকাপিসিদের বাড়ি থেকেই অফিস যাবে। সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরবে।

তপুকে টেলিফোন করে দে, আজ আর অফিসে যেতে হবে না। অসুখ শুনলে ও ছুটে আসবে। আগে আমার কত মাথা টিপে দিত—

মা সব সময় সিদ্ধার্থকে চোখে চোখে রাখেন। তীক্ষ্ণভাবে সিদ্ধার্থর মুখের রেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করছেন। সিদ্ধার্থ যথেষ্ট নিরুদ্বিগ্ন ভঙ্গিতেই কথা বলতে লাগল, এমনকী বাথরুমে মুখ ধুতে গিয়ে শিস দিয়ে উঠল পর্যন্ত। কিন্তু তার জিভটা বিস্বাদ। হাতে-পায়ে কোনো জোর নেই।

সিদ্ধার্থ টুনুকে চুপি-চুপি ডেকে বলল, একবার অলকাপিসিদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে। কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না, তপু সেখানে থাকলে তো বুঝতে পারবেই, আর যদি না থাকে তা হলে অন্য কিছু বলে যেন ম্যানেজ করে আসে। ওদের কিছু জানাবার দরকার নেই।

বৃষ্টি একেবারে থামেনি, ঝিরঝির করে পড়ছে। রাস্তাঘাট জলে উত্তাল। ট্রাম-বাস চলছে কিনা ঠিক নেই! তবে সারকুলার রোডে জল জমে না, আর যতই জল থাক, টুনু ওসব গ্রাহ্য করে না। প্যান্ট গুটিয়ে টুনু সাতটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল।

টুনু ফিরে এল নটা আন্দাজ। তার মুখ একটু অন্যমনস্ক। সিদ্ধার্থ ওকে দেখেই বুঝেছিল। টুনু ইশারা করে জানাল, সে খুঁজে পায়নি। তারপর মা কাছাকাছি নেই দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, বাড়িতে দিদি ঝগড়া করেছিল নাকি? আমার মনে হয় দিদির আর এখানে থাকতে ভালো লাগছিল না—অন্য কোথাও চলে গেছে। চিঠি-ফিঠি কিছু লিখে রেখে গেছে কিনা দেখবি? আমি মেডিক্যাল কলেজেও ঘুরে এসেছি—

সিদ্ধার্থ দ্রুত জামাটা গায়ে দিয়ে বলল, তুই আজ বাড়িতে থাকিস, টুনু। দরকার হলে মাকে মিথ্যে কথা বলে ম্যানেজ করিস। আমি ঘুরে আসছি।

মাত্র কয়েকটা বাস চলছে। প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যেও মরিয়ার মতন ঝুলতে লাগল সিদ্ধার্থ। কাদা ছিটকে তার পোশাক কদাকার হয়ে গেল। বাস থেকে নেমে ছুটতে ছুটতে গিয়ে সে অনন্ত সান্যালের বাড়ির দরজায় বেল টিপল।

ওপরের বারান্দা থেকে ঝুঁকে দেখলেন করুণাদেবী। সিদ্ধার্থর দিকে একটুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ব্যগ্রভাবে বললেন, দাঁড়াও, আমি আসছি।

অসম্ভব তাড়াতাড়ি তিনি নীচে নেমে এসে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?

আমি সুতপা সম্বন্ধে একটা খবর নিতে এসেছি।

সুতপা তোমার বোন? কী হয়েছে তার?

সুতপা কাল রাত্রে বাড়ি ফেরেনি।

সারা রাত বাড়ি ফেরেনি?

করুণাদেবী একটুক্ষণ মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর সৌম্য রাশভারী মুখখানা মুহূর্তে সম্পূর্ণ বদলে গেল। হঠাৎ তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, বলিনি? আমি আগেই তোমার কাকাকে বলিনি? আমি নিজে গিয়ে সাবধান করে আসিনি? তবু তোমরা সামলাতে পারলে না? জানতুম, ও মেয়ে নিজেরও সর্বনাশ করবে, আমারও সংসারটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাবে!

সুতপা কোথায়? আপনি জানেন?

দাঁড়াও ডাকছি আরেকজনকে—

করুণাদেবী আবার দুদ্দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলেন। একজন চাকর দূর থেকে উঁকি মেরে আবার সরে গেল। লম্বা টানা দরজায় একা দাঁড়িয়ে রইল সিদ্ধার্থ। তার শরীরটাতে সতর্ক ভঙ্গি। যেন সে শত্রুর দূর্গে একা খালি হাতে ঢুকেছে। হাজার শত্রু তাকে ঘিরে এগিয়ে আসছে, তাকে একা লড়তে হবে।

ওপরতলায় বিশৃঙ্খল শব্দ এবং দুজনের গলার ক্রুদ্ধ চিৎকার। অনন্ত সান্যাল তা হলে বাড়িতেই আছে? সিদ্ধার্থর আবার সব কিছু গুলিয়ে যেতে লাগল। একটু বাদেই সিঁড়ি দিয়ে দুপদাপ আওয়াজ, অনন্ত সান্যাল নেমে আসছেন, তাঁর পেছনে উন্মাদিনীর মতন করুণাদেবী। অনন্ত সান্যাল একবার স্ত্রীর হাত ছাড়াবার চেষ্টা করে বললেন, আঃ, করুণা, কী পাগলামি করছ। তুমি কোথায় যাবে? মেয়েটাকে খুঁজতে হবে এখন—

করুণাদেবী হিংস্রভাবে চেঁচিয়ে উঠলেন, খুঁজবে আবার কোথায়? তুমিই তো তাকে লুকিয়ে রেখেছ। তোমার বাগানবাড়িতে—

কী যা-তা বলছ! সারা বাড়ি শুনিয়ে চিৎকার করে—কাল আমি সন্ধ্যা সাড়ে-ছটার মধ্যে বাড়ি ফিরিনি? কতবার বলব তোমাকে—

ওসব তোমার কারসাজি! তুমিই মাথা খেয়েছ মেয়েটার—বুড়ো বয়সে যাদের মাথা বিগড়োয়—

ওসব কথা এখন না বললে চলত না?

না, বলবই তো! কেন আমি চুপ করব? তুমি যা-খুশি তা-ই করবে—তুমি মেয়েটাকে কোলের ওপর নিয়ে বসেছিলে, আমি দেখিনি?

ইস ছি, ছি, ছি—করুণা, তুমি এসব কথা...সুতপা আমার মেয়ের বয়সি, আমি তাকে নিজের মেয়ের মতন—

মেয়ের মতন! ন্যাকামি! আমার চোখ নেই? কেন তুমি আমার এই সর্বনাশ করলে? কেন তুমি ওই কচি মেয়েটার সর্বনাশ করলে?

অনন্ত সান্যালের মুখখানা দেখলে মনে হয়, তিনি অত্যন্ত দুঃখিত এবং আহত হয়েছেন। স্ত্রীর দিকে ফিরে একবার অনুচ্চ গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার যা-খুশি আজেবাজে কথা বলে চ্যাঁচাতে পারো। আমার কিচ্ছু এসে যায় না। সুতপাকে আমি—

সিদ্ধার্থর এক হাত খপ করে চেপে ধরে তিনি প্রবল ব্যক্তিত্বময় হুকুমের সুরে বললেন, শিগগির এসো! যেতে যেতে গাড়িতে সব ব্যাপার শুনব।

সিদ্ধার্থ আপত্তি করার সুযোগ পেল না, তিনি তাকে প্রায় একরকম টানতে টানতেই বাইরে নিয়ে এসে গাড়িতে বসালেন। তারপর গেট থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, বলো, কী ব্যাপার?

ও কাল বাড়ি ফেরেনি।

তা তো শুনছিই। কোথায় যেতে পারে? কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি—

জানি না।

সুতপা কাল অফিস থেকে এক ঘণ্টা আগে ছুটি নিয়ে গেছে। কোথায় যাবে, কিছুতেই আমাকে বলেনি। ইন ফ্যাক্ট, কাল আমি ওর ওপর রাগই করেছিলাম...বাড়িতে রাগারাগি হয়েছিল?

না—

আমার স্ত্রী যে-সব নোংরা কথা বললেন, আশা করি তুমি সেগুলো বিশ্বাস করোনি। সুতপাকে আমি স্নেহ করি, কিন্তু তা বলে তাকে কোথাও আমি লুকিয়ে রাখব—এ-ধরনের কুৎসিত চিন্তা ওঁর মাথায় এল কী করে, আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি! আসলে ওঁর কোনো ছেলেপুলে তো হয়নি! যাক গে, বেহালায় আমার একটা বাড়ি আছে, এখন আমরা সেদিকে যাচ্ছি।

গাড়ি বেহালার দিকে ছুটছিল। বেহালার বেশ ভেতর দিকে, একটা ছিমছাম সাজানো ছোটো বাড়ির সামনে এসে অনন্ত সান্যাল গাড়ি থামালেন। তারপর শান্তভাবে বললেন, যাও, ওই বাড়ির মধ্যে ঘুরে, দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে তোমার সন্দেহ মিটিয়ে এসো—সুতপা এখানে আছে কিনা!

সিদ্ধার্থ ইতস্তত করছিল। অনন্ত সান্যালের প্রবল ব্যক্তিত্বের সামনে সে কোনো কথাই বলতে পারছিল না। কিন্তু তাকে নামতে হল না। গাড়ির আওয়াজ শুনেই দরোয়ান বেরিয়ে এসেছিল, অনন্ত সান্যাল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, দেবল, কাল সন্ধ্যেবেলা কোনো মাইজি এসেছিল?

দরোয়ান হতচকিত হয়ে বলল, নেহি বাবু!

সুতপা মাইজিকো তুম কব দেখা?

ওহি তো এতোয়ারমে—

সিদ্ধার্থর গা রি-রি করে উঠল। তার মানে সুতপা এখানে অনেকবার এসেছে—ছোটোকাকা ঠিকই বলেছিলেন। যাক, এখন রাগের সময় নয়, এখন আগে সুতপাকে খুঁজে পাওয়া দরকার।

অনন্ত সান্যাল গাড়ি ঘুরিয়ে বললেন, এবার আমরা লালবাজার যাব। তোমাদের বাড়িতে—

বাড়িতে এখনও কেউ কিছু জানে না। আমি বলেছি, সুতপা আমার এক পিসির বাড়িতে আছে, আমাকে জানিয়ে গেছে—ছোটোকাকার অসুখ।

বেশ।

লালবাজারের ভেতরে গিয়ে গাড়ি ঢোকালেন অনন্ত সান্যাল। একজন পদস্থ পুলিশ অফিসারের সঙ্গে অনন্ত সান্যালের পরিচয় ছিল, সিদ্ধার্থকে নিয়ে তিনি সোজা তাঁর ঘরে এলেন। তারপর শুরু হল এক ক্লান্তিকর পরিচ্ছেদ। সেখান থেকে মিসিংস্কোয়াড, জেরার পর জেরা—যেন সিদ্ধার্থই আসামি। হাসিখুশি একজন পুলিশ অফিসার—দাঁত দিয়ে ওপরের ঠোঁটটা আচড়ানো তাঁর স্বভাব—বার বার বলতে লাগলেন, কত বয়স? কুড়ি পেরিয়ে একুশে পা দিয়েছে? তা হলে তো স্বাধীন! কী বললেন? দু-তিন বছর ধরে চাকরি করছে? তা হলে তো রাস্তায় হারিয়ে যাওয়া কিংবা মেয়ে চোরদের পাল্লায় পড়া আনলাইকলি! ভেরি আনলাইকলি! অন্য জাতের কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেম-ট্রেম ছিল নাকি। এই কাস্ট সিস্টেম আমাদের দেশে—

অনন্ত সান্যাল তাড়াতাড়ি বললেন, না, না, সেরকম কোনো ব্যাপার ছিল না। হঠাৎ কারওর সঙ্গে চলে যাওয়ার মেয়ে সে নয়। খুব ভালো মেয়ে—

ভালো মেয়ে? আমি কি বলেছি খারাপ? এ লাইনে থাকলে বুঝতেন কত রকমের অভিজ্ঞতা হয়।

এরপর শুরু হল ঘোরাঘোরি, পুলিশের গাড়ির পেছনে পেছনে। অনন্ত সান্যাল সিদ্ধার্থকে নিজের গাড়িতে বসিয়ে রাখলেন। চিৎপুর আর সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর মাঝখানে একটা পাড়া—এই পাড়াটার কথা সিদ্ধার্থ আবছাভাবে আগে শুনেছিল—সেখানে গাড়ি ঢুকিয়ে টপাটপ কয়েকজন পুলিশ ঢুকে পড়ল কয়েকটা বাড়িতে। দিনের বেলা ঘুম চোখে কতকগুলো মেয়ে উঠে এসে দাঁড়াল দরজার কাছে, তাদের কেউ কেউ শুধু শায়া আর বডিস পরা—সিদ্ধার্থকে ঘুরে-ঘুরে সবার মুখ দেখতে হল—এদের মধ্যে সুতপা আছে কিনা।

সিদ্ধার্থ প্রতিবাদ করেছিল পুলিশ অফিসারের কাছে—না, না, সুতপা এসব জায়গায় থাকতেই পারে না—অসম্ভব, অকল্পনীয়। অফিসার শোনেননি। তাঁকে ডিউটি করতেই হবে। তা ছাড়া, সিদ্ধার্থর সঙ্গী অনন্ত সান্যাল আবার অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের বন্ধু!

ওপাড়া থেকে বেরিয়ে সিদ্ধার্থ এক ফাঁকে গোপনে বাড়িতে দেখে এল সুতপা ফিরেছে কিনা। তারপর তাকে আবার নিয়ে যাওয়া হল বউবাজারে।

সিদ্ধার্থর চেতনা যেন অবশ হয়ে গেছে। তার আর প্রতিবাদ করার সামর্থ্য নেই। জড়মূর্তির মতন সে পুলিশের সঙ্গে একের পর এক ঘরের সামনে দাঁড়াচ্ছে—দেখছে নানা বয়সের নানান স্ত্রীলোকের মুখ। নারীশরীরের দিকে তাকাবার যে একটা স্বাভাবিক লোভ ছিল তার—সেটাও এখন আর নেই, মেয়েগুলোর দিকে ভালো করে দেখছেও না—শুধু বলে যাচ্ছে, না, না, না—। বউবাজার থেকে আবার ধর্মতলা। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে গাড়ি এগোতে দেখে সিদ্ধার্থর বুক ঢিপ ঢিপ করে উঠল। এখানেই এক বাড়িতে সে আদিনাথের সঙ্গে লতিকার কাছে এসেছিল। লতিকা নিশ্চয় তাকে চিনতে পারবে। এত লোকজনের সামনে, পুলিশের সামনে লতিকা যদি—সিদ্ধার্থর মাথা ঝিমঝিম করে উঠল, ভয়ে ঘাম বেরিয়ে এল তার।

যে বাড়িটাতে আদিনাথের সঙ্গে সে এসেছিল, সৌভাগ্যবশত, লতিকাদের বাড়িটাতে পুলিশ নজর দিল না। হানা দিল অন্য তিনটে বাড়িতে।

পুলিশ ক-জন নিজেরাও যেন বিশ্বাস করে না, যাকে তারা খুঁজছে তাকে এখানে পাবে। যেন খোঁজার জন্যই খোঁজা। যেসব বাড়িতে তল্লাশি হচ্ছে—সে বাড়ির অধিবাসীনীরাও যেন এতে অভ্যস্ত। বিরক্ত মুখে দরজার কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে, তারাও জানে, যাকে খুঁজতে পুলিশ আসে—তাকে ওখানে কোনোদিন পাওয়া যায় না। ওখানে যারা আছে—তাদের কেউ কোনোদিন এমনিভাবে খোঁজে না।

দাঁত দিয়ে ওপরের ঠোঁট আঁচড়ানো অফিসারটি বললেন, প্রায় তো সব দেখা হল—এবার শিয়ালদার কাছে দুটো হোটেল আছে—সেরে নিই চলুন—তারপর আর কী, কাগজে বিজ্ঞাপন দেবেন! আমার তো মনে হচ্ছে—

অনন্ত সান্যাল বললেন, চলুন, হোটেল দুটো আগে দেখা যাক।

আবার গাড়িতে যেতে যেতে সিদ্ধার্থর জড়তা কেটে এল। অনন্ত সান্যালের দিকে চেয়ে দেখল সে। ভদ্রলোকের ঠোঁট দুটো টেপা, চোখ দূরে তাকিয়ে, স্টিয়ারিং-এ হাত দিয়ে একটু ঝুঁকে আছেন—ভেতরে ভেতরে তাঁর উত্তেজনা চলছে, মুখ দেখলে বোঝা যায়। সুতপাকে খুঁজে বার করতে তিনি বদ্ধপরিকর। এজন্য পৃথিবীর শেষ প্রান্ত অবধি যেতেও তিনি রাজি। তাঁর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম।

সিদ্ধার্থর হঠাৎ মনে হল সে কেন অনন্ত সান্যালের সঙ্গে এক গাড়িতে বসে আছে এতক্ষণ? ওই লোকটার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? ওই লোকটার বাড়িতে গিয়ে সে ঘড়ি ভেঙে দিয়ে এসেছিল, তা নিয়ে লোকটা একটাও কথা বলেনি। এই লোকটাই সুতপাকে নষ্ট করেছে—কয়েক বছর আগেও সুতপা কী সরল-সুন্দর মেয়ে ছিল, এই লোকটাই সুতপাকে নিয়ে আদিখ্যেতা করেছে, সুতপার গায়ে হাত দিয়ে আদর করেছে। সুতপাকে বাগানবাড়িতে নিয়ে যাবার মানে কী? সিদ্ধার্থর কোনো সন্দেহই নেই—সুতপা যদি সত্যিই নষ্ট হয়ে থাকে, তবে এই হারামির বাচ্চাই সে জন্য দায়ী।

গাড়ি থামান, আমি নেমে যাব!

নেমে যাবে? এখানে কী? শেয়ালদায়—

আমি শেয়ালদায় আর যাব না, আমার খোঁজার দরকার নেই।

সে কী? তুমি না গেলে চলবে কেন? তুমি হচ্ছ ওর আত্মীয়—একজন আত্মীয় সঙ্গে না থাকলে সার্চ হয় না।

বলছি গাড়ি থামান, আমি যাব না।

অনন্ত সান্যাল এবার রীতিমতো ধমক দিয়ে বললেন, পাগলামি কোরো না! চুপ করে বসে থাকো!

ধমক শুনেই সিদ্ধার্থর রাগ আরও চড়াৎ করে বেড়ে গেলে। চলন্ত গাড়িতেই সে দরজা খুলে অনন্ত সান্যালের দিকে কটমট করে তাকাল। তারপর ট্র্যাফিকের লাল আলো পড়তেই সে ঝট করে নেমে পড়ল। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অনন্ত সান্যালের অভিজাত গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখখানাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সিদ্ধার্থ দাঁত খিঁচিয়ে বলল, শুয়োরের বাচ্চা, তোমাকেও আমি একদিন দেখে নেব। ভেবেছ কী? বুড়ো ভাম শালা, তোমার চোখ যদি আমি উপড়ে না দিই, তো আমার নাম নেই! চেনো না আমাকে...।

অনন্ত সান্যাল উদভ্রান্তের মতন তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে।

পুলিশের গাড়ির দিকে হাত নেড়ে সিদ্ধার্থ বলে দিল, সে আর যাবে না।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর আড়াইটে হয়ে গেল সিদ্ধার্থর। টুনু কত রকম মিথ্যে যে বলেছে কে জানে, মায়ের মুখখানা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ছোটোকাকা ঘুমিয়েছেন, টুনু একটু আগে বেরিয়েছে। ভাত খেয়ে সিদ্ধার্থ খাটের ওপর চিত হয়ে শুয়ে রইল। দুপুরটা খাঁ-খাঁ করছে। সিদ্ধার্থর সারা শরীরের ক্লান্তি। সে আর পারছে না। কেউ যদি তাকে এই সব কিছু থেকে মুক্তি দিত! অজয়দা যদি তাকে চাকরিটা পাইয়ে দেন—তা হলে সে দিল্লিতে ট্রান্সফার নেবার চেষ্টা করবে। কোয়ারাও তো দিল্লিতে থাকবে!

সিদ্ধার্থ কখন একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল, মা তাকে ডেকে তুললেন। কেন যেন তাকে ডাকছে বাইরে। সিদ্ধার্থ ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এসেই রতনকে দেখে বিরক্ত হয়ে গেল। আর যা-ই হোক এই সময় রতনের সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছে একটুও নেই তার। রতন আজকাল মেয়েদের সম্পর্কে খারাপ গল্প ছাড়া আর কিছুই যেন বলতে জানে না। রতনের মুখ-চোখ দেখে মনে হল, সেই রকমই একটা কোনো রসালো গল্প সম্প্রতি সে জেনেছে। সিদ্ধার্থ রুক্ষভাবে বলল, কী রে, কী ব্যাপার? আমি এক্ষুনি বেরোব।

রতন ফিসফিস করে বলল, তোর সঙ্গে খুব একটা দরকারি কথা আছে। একবার বাইরে আয়।

বাইরে কেন এখানে বল না!

না, এখানে হবে না। তুই পাড়ার মোড়ে আয়, আমি দাঁড়াচ্ছি। ভীষণ আর্জেন্ট, এক্ষুনি চলে আয়।

সিদ্ধার্থ ভেতরে এসে জামা-প্যান্ট বদলে নিল। খাটের তলা থেকে বাক্সটা টেনে দেখল, সর্বসমেত তার আর সাত টাকা আছে। সব কটা টাকাই পকেটে নিয়ে নিল। সামনে একটা ভয়ংকর লম্বা বিকেল সন্ধ্যা এবং রাত পড়ে আছে। মাকে কী বোঝাবে সে জানে না।

রতন ব্যস্তভাবে গলিতে পায়চারি করছিল। সিদ্ধার্থ কাছে যেতেই চারদিক দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, হ্যাঁরে, তোর বোন সুতপা কোথায়?

সিদ্ধার্থ সঙ্গে সঙ্গে পেছিয়ে এসে মুখ কঠিন করে বলল, কেন? তা দিয়ে তোর কী দরকার?

বল না! আমি একটা কথা শুনলাম কিনা—

কী কথা?

সুতপা কাল রাত্রে বাড়ি ফেরেনি?

দ্যাটস নান অফ ইয়োর বিজনেস! রতন, তোকে বলে দিচ্ছি—

তুই রেগে যাচ্ছিস কেন? আমি তোর ফ্রেণ্ড, তোকে হেলপ করতে চাই; মানে, একটা দারুণ কথা শুনে দোকান থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলুম—বাদল নাকি সুতপাকে ধরে নিয়ে গেছে?

বাদল?

ওই যে রবি দাঁড়িয়ে আছে, ওকে জিজ্ঞেস কর না!

মোড়ের মাথায় আরেকটি ছেলে দাঁড়িয়ে ঘনঘন এদিকে তাকাচ্ছিল। সিদ্ধার্থ দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল। বাদল? একদিন শেয়ালদার কাছে বাদলকে সুতপার সঙ্গে দেখেছিল—দু-জনে হাসতে হাসতে একটা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসছে। তারপর বাদল কিছুদিন জেল খেটে এল। এই রবি, একেও সিদ্ধার্থ অল্প অল্প চেনে—বাদলেরই বন্ধু। সিদ্ধার্থ এগিয়ে গিয়ে সোজাসুজি রবির কলার চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, কোথায়? ওরা কোথায়?

রবি বলল, আরে ছাড়ুন, ছাড়ুন! আমার কিছু দোষ নেই, আমি দুপুরবেলা বাইচান্স এক ফ্রেণ্ডের বাড়িতে গিয়েছিলুম, সেখানে দেখলুম, মানে, মনে হল আর কী, আপনার বোন যেন, নাও হতে পারে, বাদলও রয়েছে, তাই ভাবলুম—

সিদ্ধার্থ তার কলারে মোচড় দিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, কোথায়?

পার্ক সার্কাসে—

চলো! এক্ষুনি চলো—

আমি বাড়িটা দেখিয়ে দেব, ভেতরে যাব না কিন্তু—

সিদ্ধার্থ তক্ষুনি একটা ট্যাক্সি ডেকে রবিকে নিয়ে উঠল। রতনকে বলে দিল, ব্যাপারটা নিয়ে যেন সে আর একজনের কাছেও মুখ না খোলে। তা হলে তার বিপদ হবে। পার্ক সার্কাসে একটা বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থামিয়ে ওরা নামল।

রবি তাকে আঙুল দিয়ে বাড়িটা দেখিয়ে বলল, ওই বাড়িটার তেতলায়—ডানদিরে ফ্ল্যাট, আমি কিন্তু ভেতরে যাব না—বাদলের সঙ্গে আমার ঝগড়া—আমাকে তা হলে মেরে ফেলবে!

রবিকে ছেড়ে দিতেই সে সুট করে ট্রামে উঠে পড়ল।

বাড়িটার দিকে তাকাল সিদ্ধার্থ! একাই যাবে? টুনুটা সঙ্গে থাকলে ভালো হত। যাক, সে একাই যাবে। কে কী করবে! বাদল? হা:!

সিঁড়ি দিয়ে উঠে তাকে ঘর খুঁজতে হল না। স্পষ্ট সুতপার গলার হাসির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। অনেকদিন সুতপাকে এমন সহজভাবে হাসতে শোনেনি সে।

ঘরের দরজা খোলাই ছিল।

ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে সুতপা। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, এইমাত্র উঁচু গলায় হাসছিল, সিদ্ধার্থকে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠল না, মুখখানা সামান্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আস্তে আস্তে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দিল। ওপাশের একটা টেবিল ঘিরে বসে আছে তিনজন, তার মধ্যে একজন বাদল।

হঠাৎ বুক মুচড়ে কান্না এল সিদ্ধার্থর। এই সুতপা! সুতপাকে কেউ জোর করে ধরে আনেনি, সে এখনই আনন্দে হাসছিল! সুতপার জন্য কাল সে সারারাত ঘুমোয়নি, আজ সারাদিন ছুটোছুটি করে মরেছে, বুকের মধ্যে কী কষ্ট নিয়ে কাটিয়েছে কাল সন্ধ্যা থেকে এই পর্যন্ত—সুতপা সেসব কিছু গ্রাহ্যই করে না! সে গুমরে মরেছে, সুতপা তাও ভেবে দ্যাখেনি! সুতপা সব মায়ামমতা কাটিয়ে ফেলেছে! কিন্তু সে তো পারে না!

তপু?

কী?

তুই এখানে কী করছিস?

এই বসে আছি। গল্প করছি এদের সঙ্গে।

তুই কাল রাত্রে বাড়ি ফিরিসনি—

কী করব, ফেরা হল না। গাড়ি খারাপ হয়ে গেল।

গাড়ি?

হ্যাঁ, কাল বাদলদাদের সঙ্গে ডায়মণ্ডহারবার বেড়াতে গিয়েছিলাম, তারপর ওই বৃষ্টি, গড়িয়াহাটার কাছে এসে গাড়ি খারাপ হয়ে গেল—আজ একটু বাদে বাড়ি ফিরব ভাবছিলাম।

সিদ্ধার্থ চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। স্তম্ভিত হয়ে দেখছে সুতপাকে। একদিনেই সুতপা যেন অনেক পালটে গেছে। গলার আওয়াজে তার কোনো রকম দ্বিধা কিংবা জড়তা নেই—এ যেন তার এতদিনকার চেনা সুতপা নয়, এ যেন একজন সম্পূর্ণ অচেনা মহিলা।

একটু আগেই পান খেয়েছে সুতপা, ঠোঁট দুটো তার টুকটুকে লাল—বেণী-না-বাঁধা খোলা চুল পিঠের ওপর ছড়ানো, ইজিচেয়ারে পা মুড়ে এমনভাবে বসে আছে, যেন এঘর তার অনেকদিনের চেনা। সিদ্ধার্থর চোখ থেকে সে চোখ সরিয়ে নেয়নি।

তপু, তুই কি আমাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে চাস?

তোমরা যদি না-চাও, আমিও চাই না।

তা হলে তোর ইচ্ছেটা কী? এখানে এ-রকমভাবে কেন এসেছিস?

আমার ভালো লাগে না। রোজ রোজ ওই বুড়োর সঙ্গে ঘুরতে আমার ভালো লাগে না। তোমরা ভেবেছ কী? বাড়িতে বাসন মাজব, ঘর ঝাঁট দেব, অফিসে কলম পিষব, আর সন্ধ্যাবেলা এক বুড়োর সঙ্গে ন্যাকামি করব? মোটেই না, আমার যা ভালো লাগে, তাই আমি করব। আমি তোমাদের জন্য অনেক করেছি, এবার আমাকে ছুটি দাও।

তোর এইসব ভালো লাগে?

কী সব?

সোজাসুজি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে সুতপা। বাঘিনীর মতো তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে। সিদ্ধার্থ কী বলতে চায় বলুক!

টেবিলের ওপাশের তিনজন এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি, ওরা তিনজনই এমনকী বাদলও—দামি সাজপোশাক পরে আছে। মিটিমিটি হাসছে বাদল। এই বাদলকেই ধরে সিদ্ধার্থ একদিন বেদম মার দিয়েছিল। বাদল কি সেসব ভুলে গিয়েছে? বাদল এবার রীতিমতো ইয়ার্কির সুরে হেসে বলল, আরে বিনুদা, ভেতরে এসে বোসো না। বসে কথা বলো, অত রাগারাগি করছ কেন?

সিদ্ধার্থ সে কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে প্রচন্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠল, তপু উঠে আয়! উঠে আয় বলছি! তোকে এক্ষুনি বাড়ি যেতে হবে—নইলে আমি—আমি...

অত জোরে চেঁচিয়েও সিদ্ধার্থ খুব দুর্বল বোধ করল। তার জীবন-মরণ যেন একটা মুহূর্তের উপর নির্ভর করছে। সুতপা যদি তার কথা না-শোনে, এবারেও যদি তাকে অগ্রাহ্য করে—তবে তার বাইশ বছরের জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা—এসব কোনোকিছুরই কোনো মূল্য আর থাকবে না। তার সমস্ত প্রাণশক্তিকে সে চোখের দৃষ্টিতে নিয়ে এসে সুতপার দিকে তাকিয়ে রইল।

সুতপা আস্তে আস্তে আড়মোড়া ভেঙে উঠল, চটি দুটো পায়ে গলাতে সময় লাগিয়ে দিল কিছুক্ষণ, নিজের হাতব্যাগটা এদিক-ওদিকে খুঁজল। খুঁজে পেয়ে আলতোভাবে বলল, যাচ্ছিলামই তো একটু বাদে। ওদের তিনজনের দিকের তাকিয়ে বলল, চলি! তারপর দরজার কাছে এসে আবার থমকে দাঁড়িয়ে বলল, কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে যাব না। আমি আলাদা যাব।

তার মানে?

তার মানে, তুমি আমার হাত ধরে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, আমি কি কচি খুকি নাকি! আমি এখন অ্যাডালট, আমার ইচ্ছেমতন যা-খুশি করার অধিকার আছে।

সিদ্ধার্থ আর নিজেকে সামলাতে পারছিল না। প্রচন্ড ইচ্ছে হচ্ছিল, ঠাস করে সুতপার গালে একটা চড় কষিয়ে দেয়। তার বদলে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ঠিক আছে, তুই আগে যা। আমি দেখব, তারপর যাব।

সিদ্ধার্থর গায়ে যেন ছোঁয়া না লাগে এইভাবে পাশ কাটিয়ে সুতপা বেরিয়ে এল। তার যাওয়ার সময় সিদ্ধার্থ নীচু গলায় বললে, মাকে বলেছি তুই অলকাপিসিদের বাড়িতে আছিস। ছোটোকাকার খুব অসুখ।

সুতপা সে কথা শুনতে পেয়েছে কিনা এমন কোনো ভাব দেখাল না। আর একবারও পিছন না ফিরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল চটির শব্দ তুলে। তাকে যতক্ষণ দেখা যায়, সিদ্ধার্থ চেয়ে রইল। তারপর ঘরের দিকে ফিরে, সেই তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলল, তোদের সব কটাকে আমি পুলিশে ধরাব!

বাদল অসভ্যভাবে হেসে বললে, মাইরি আর কী! আমরা কি জোর করে ধরে এনেছি! শুনলে তো, তোমার বোন বলে গেল, সে এখন অ্যাডালট।

চুপ কর ইতর কোথাকার!

যাও-যাও, বেশি মস্তানি কোরো না!

সিদ্ধার্থ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তিন লাফে ছুটে গিয়ে বাদলের টুঁটিটা টিপে ধরল। ধাক্কার চোটে বাদল পড়ে গেল মাটিতে। সিদ্ধার্থ তার বুকে চেপে বসতেই, বাকি দুজন বিনা বাক্যব্যয়ে দুদিক থেকে সিদ্ধার্থকে দুটো লাথি কষাল। বাদলকে ছেড়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ তেড়ে এবার এল ওদের দিকে।

মারামারিটা হতে লাগল নি:শব্দে। কিন্তু একটুক্ষণের মধ্যেই সিদ্ধার্থ বুঝতে পারল, তার গায়ে অসুরের শক্তি থাকলেও আজ সে তিনজনের সঙ্গে একা লড়তে পারবে না। সে আজ বড়ই ক্লান্ত। বিধ্বস্ত। তার মন ভেঙে গেছে। ওদের একজনের ঘুষিতে তার কষ বেয়ে গড়িয়ে আসছে রক্ত, সারা ঘরে সে হালকাভাবে ছুটে ছুটে অন্ধ আক্রোশে ওদের আঘাত করছে ক্রমান্বয়ে, কিন্তু আর পারবে না, ওরা তিনদিক দিয়ে ঘিরে একসঙ্গে এগিয়ে আসছে তার দিকে। সিদ্ধার্থ প্রাণের ভয় টের পেল। তাকে বাঁচতে হবে, তাকে পালাতে হবে। এবার সে দরজার দিকে দৌড়োবার চেষ্টা করল ওদের ঠেলে, এলোপাথাড়ি হাত-পা ছুড়তে লাগল, একটা চোখ ফুলে গেছে, দরজার কাছে এসেও—ওদের একজন তার পায়ে পা গলিয়ে দিতেই সে দড়াম করে পড়ে গেল। পড়ে যাবার পর, একমুহূর্ত তার মনে হল, আর উঠে লাভ নেই, এখানেই শুয়ে থাকি, শুয়ে থাকাতেই আরাম। ওরা তাকে মারুক, মারতে মারতে শেষ করে দিক, আমি আর কিচ্ছু করব না। আমি আর পারছি না আমি বড়ো ক্লান্ত। আমাকে তোরা খুন করে ফ্যাল! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে তড়াক করে উঠে পড়ে ছুটল সিঁড়ি দিয়ে। বাদল তবুও পেছন ছাড়েনি, এসে তার হাত চেপে ধরতেই সে প্রাণপণে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছাড়িয়ে নিল। হোঁচট খেতে খেতে, প্রায় গড়িয়ে নীচে নেমে এল। ওপরের রেলিং-এ ঠেস দিয়ে ওরা তিনজন হাসছে। ওদের একজন টিপ করে থুথু ফেলল সিদ্ধার্থর গায়ে।

বাইরে এসে সিদ্ধার্থ রুমাল দিয়ে মুখ মুছল। রুমালটা রক্তে লাল—সারা মুখে জ্বালা। ওদের সেই বিদ্রূপের হাসিটা এখনও তার গায়ে ফুটছে। সে পালিয়ে যাচ্ছে? সব জায়গায় সে হেরে যাচ্ছে? এর থেকে বরং প্রাণ যাক, সেও ভি আচ্ছা, তবু সে পালাবে না, প্রাণপণে লড়ে যাবে। তীব্র রাগে সিদ্ধার্থ আবার সেই বাড়িতে ঢোকার জন্য ফিরল।

কিন্তু তারপরই মনে হল, শুধু শুধু এখনই প্রাণটা দিয়ে কী হবে? ঠিক আছে, আমি আবার ফিরে আসব। আমি হেরে গিয়ে পালাব না। ফিরে এসে তোমাদের সবকটাকে দেখে নেব। এই বাড়ি আমি ধুলোয় গুঁড়িয়ে ফেলব। শুধু তোরা না, আরও যে-কটা যেখানে আছে, অনন্ত সান্যাল, ইন্টারভিউ-এর সেই লোকগুলো পর্যন্ত—সব কটাকে আমি শেষ করব একদিন! কাউকে ছাড়ব না, কাউকে আস্ত রাখব না! সবকিছুর শোধ তুলব একদিন! তুলবই!







হোটেলের ঘরখানা খুবই ছোটো, দিনের বেলাতেও অন্ধকার হয়ে থাকে। চুল আঁচড়াবার জন্য আয়না হাতে নিয়ে সিদ্ধার্থকে দরজা খুলে বারান্দায় আসতে হয়। একটা জানালা আছে বটে, কিন্তু সেটা খুললেই নীচের রান্নাঘর থেকে এত ধোঁয়া আর ঝাল ঝাল রান্নার গন্ধ আসে যে পারতপক্ষে সিদ্ধার্থ সেটা খোলে না। এই ঘরেরই ভাড়া আড়াই টাকা। সিদ্ধার্থর একটু বেশি খরচ পড়ে যাচ্ছে। দু-টাকার কমে সে কিছুতেই দু-বেলার খাওয়া সারতে পারে না।

সকালবেলা প্রত্যেকদিনই সিদ্ধার্থকে দাড়ি কামাতে হয়। সিদ্ধার্থর তেমন দাড়ি হয়নি এখনও, থুতনির কাছেই যা একটুখানি, তবু সিদ্ধার্থ রোজ সকালবেলা আয়নার সামনে সেফটি রেজার নিয়ে বসে। শীতের সকালে জল ছুঁতেই শরীর শিউরে ওঠে, এ-অঞ্চলে একেবারে হাড়-কাঁপানো শীত, সিদ্ধার্থ তা সত্ত্বেও দাড়ি কামিয়ে স্নান সেরে নেয়, তারপর টেরিলিনের প্যান্ট-শার্ট পরে গলায় টাই বেঁধে নেয়। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে, ফিটফাট সেজে হাতে বড়ো কালো ব্যাগটা নিয়ে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে পড়ে।

মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরিটা সিদ্ধার্থ পায়নি। কিন্তু অজয়দা খানিকটা কথা রেখেছেন, আপাতত ওঁদের অফিসেই ওষুধের সেলসম্যানের একটা চাকরি জুটিয়ে দিয়েছেন। অজয়দা ভরসা দিয়ে সিদ্ধার্থর পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, মন খারাপ কোরো না—একেবারে বসে থাকার চেয়ে যে-কোনো কাজই ভালো বুঝলে, আমিও সেলসম্যান হিসেবে এ-অফিসে ঢুকেছিলুম—উন্নতির অনেক স্কোপ আছে, যদি লেগে থাকতে পারো...। মাইনে সব মিলিয়ে দুশো বারো টাকা, কিন্তু ওষুধ বিক্রির ওপর কমিশন আছে। অজয়দা আশ্বাস দিয়েছিলেন, যদি তেমন খাটতে পার, মাসে দেড়শো-দুশো টাকা কমিশন উঠে যেতে পারে। সিদ্ধার্থ তাই প্রাণপণে খাটছে।

মা ছোটোকাকা সিদ্ধার্থর এই চাকরিতে খুশি হননি। অত দূরে, পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাটে, সিদ্ধার্থ একা একা থাকবে—ছেলেটা কোনোদিন বাড়ি ছেড়ে একা থাকেনি—মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না, কিন্তু সিদ্ধার্থ কারওর কথা শোনেনি, সে জোর করে চলে এসেছে। কলকাতায় তার কোনো আকর্ষণ নেই।

সিদ্ধার্থ দু-জোড়া নতুন পোশাক কিনেছে। মা কিনে দিয়েছেন। সিদ্ধার্থ চলে আসার জন্য বদ্ধপরিকর, মা তখন চোখ মুছে তাঁর তোরঙ্গের তলা থেকে বার করেছিলেন দুটো মোহর। সিদ্ধার্থর জন্মের পর ঠাকুরদা আর ঠাকুমা ওই মোহর দুটো দিয়ে নাতির মুখ দেখেছিলেন। ও দুটো তো সিদ্ধার্থরই প্রাপ্য। ডুবন্ত চায়ের ব্যবসাটা সামলাবার জন্য বাবা যখন শেষ চেষ্টা করেছিলেন, সেই সময় মায়ের অনেক অলংকার নষ্ট হয়েছে, কিন্তু মা এই মোহর দুটো বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। দূর দেশে সিদ্ধার্থ যাবে—তার ভালো পোশাক নেই, মা সেটা সহ্য করতে পারছিলেন না—চাকরি যত সামান্যই হোক, রায়চৌধুরীদের বাড়ির ছেলে ছেঁড়া জামা পরে চাকরি করবে না। মায়ের পীড়াপীড়িতেই মোহর দুটো বিক্রি করে সিদ্ধার্থর নতুন পোশাক কেনা হয়েছিল।

সকালবেলা সেজেগুজে সিদ্ধার্থ বেরোয়, দোকান থেকে এককাপ চা ও দু-খানা নোনতা বিস্কুট খেয়ে নেয়, তারপর শুরু হয় সারাদিনের জন্য ঘোরাঘুরি। অন্ধের মতন পরিশ্রম করে সিদ্ধার্থ। তার আর কোনো চিন্তা নেই আর-কোনো উদ্দেশ্য নেই, সারাদিন যে-কটা ওষুধের দোকান আর হাসপাতালের লিস্ট নিয়ে বেরোয় তার প্রত্যেকটিতে হাজির হওয়াই যেন তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। বালুরঘাটকে কেন্দ্র করে এদিকে মালদা ওদিকে রায়গঞ্জ, পূর্ণিয়া, সাহেবগঞ্জ—এই হচ্ছে সিদ্ধার্থর এলাকা। বাসে করে চার ঘণ্টা-পাঁচ ঘণ্টার দূরত্বে সিদ্ধার্থ চলে যায়, আর ফিরে আসে।

সারাদিন ধরেই সিদ্ধার্থর খিদে-খিদে থাকে। এই খিদের জন্যই তার শরীরটা সবসময় টনকো আর উত্তেজিত মনে হয়, এতে সে আরও পরিশ্রম করার প্রেরণা পায়। খুব বেশি খিদে পেলে সিদ্ধার্থ দশ পয়সা খরচ করে এক কাপ চা খেয়ে নেয়, তাতে খিদেটা আবার বেশ কিছুক্ষণ চাপা থাকে। এই দু-মাসেই সিদ্ধার্থ জেনে নিয়েছে, শহরের কোথায় সস্তার হোটেল আছে। গুনে-গুনে টিপে-টিপে পয়সা খরচ করে এখন। দুপুরবেলা কোনো সস্তার হোটেলে ঢুকে আট আনার ভাত নেয়, ডাল আর একটা তরকারিতে মোট এক টাকার মধ্যে খাওয়া সেরে নেয়। একদিন অন্তর মাছ না-খেয়ে পারে না। কিন্তু যেদিন মাছের জন্য দেড়টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়, সেদিন রাত্রে সিদ্ধার্থ শুধু একটা পাঁউরুটি খেয়ে শুয়ে থাকে। কিছুতেই দু-টাকার বেশি সে খাওয়ার জন্য খরচ করবে না। প্রথম মাসে সিদ্ধার্থ বাড়িতে আশি টাকার বেশি পাঠাতে পারেনি, কিন্তু দ্বিতীয় মাসে পাঠিয়েছে একশো কুড়ি টাকা এবং তারপরেও নিজের কাছে তিরিশ টাকা রেখে দিয়েছে। টাকা! টাকার জন্যই তো সব। সিদ্ধার্থ অনেক টাকা না-জমিয়ে কলকাতায় ফিরবে না।

এই দু-মাসে সিদ্ধার্থর চেহারার অনেক বদল হয়েছে। এখন তাকে আর ছেলেমানুষ বলে মনে হয় না, একজন পুরোপুরি লোক হয়ে উঠেছে যেন সে। হালকা নীল টেরিলিনের নতুন জামাটা ওকে খুব মানায়, ওর চওড়া কাঁধটা আরও চওড়া দেখায়। সারাদিন রোদ্দুরে ঘোরার জন্য ওর মুখখানা তামাটে হয়ে গেছে, বাসের ধুলো লেগে চুলগুলো রুক্ষ, চোয়ালে একটা দৃঢ়তার ছাপ। কোম্পানির নাম লেখা ভারী কালো ব্যাগটা নিয়ে সিদ্ধার্থ সিধে হয়ে হাঁটে, ওকে কোনো সময়ই বিষণ্ণ বা ক্লান্ত দেখায় না।

শহরের মধ্যে ঘোরার সময় কখনো সাইকেলরিকশা নেয় না, পায়ে হেঁটে ঘোরে। মফসসল শহরের ঘিঞ্জি কাদা আর ধুলো, সাইকেলরিকশা আর মানুষ বোঝাই ট্যাক্সির ভিড়, সব সময় একটা আঁশটে গন্ধ, এইসব পাশ কাটিয়ে যতদূর সম্ভব জুতোর পালিশ বাঁচিয়ে সিদ্ধার্থ হেঁটে যায়। এক-একটা ওষুধের দোকানে গিয়ে হাসি মুখে দাঁড়ায়, দোকানের মালিকদের নাম সে একবার শুনেই মনে রাখে, খুব দায়িত্বশীল মানুষের মতন ভারী গলায় বলে, চাকলাদারবাবু আবার এলাম, আপনি বলেছিলেন আপনাদের মালটি ভিটামিনের স্টকটা মঙ্গলবার দেখবেন...

সিদ্ধার্থকে ওষুধ সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হয় না। তাদের কোম্পানির মাল-পত্র এসে জমা হয় মালদায়। সিদ্ধার্থ মালদা, পশ্চিম দিনাজপুর আর পূর্ণিয়ার ছোটো-ছোটো শহরের দোকানগুলোতে কখন কী ওষুধ লাগবে—সেই খবর আনে, তারপর তাদের কোম্পানির লোক এসে মাল পৌঁছে দিয়ে যায়। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর সিদ্ধার্থর হোটেলে ফিরতে ফিরতে আটটা-নটা বেজে যায়। মুখ-হাত ধুয়ে খাবার খেয়ে নিয়ে আবার সে কাজের রিপোর্ট লিখতে বসে, গাড়িভাড়ার বিল তৈরি করে। তার কোনো বন্ধু হয়নি, কাজের কথা ছাড়া একটা লোকের সঙ্গেও তার কথা হয় না, সারাদিনে তার একটুও ফাঁক নেই, ওসবের সময়ই বা তার কোথায়?

কোথাও কোনো ছোকরা ডাক্তার দেখলে সিদ্ধার্থ মাঝে মাঝে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আদিনাথ শিবেনদের কথা মনে পড়ে। ওরাও দু-এক বছর বাদে এ-রকম ডাক্তার হয়ে উঠবে। সিদ্ধার্থ নিজেও ডাক্তার হতে চেয়েছিল। তার বাবারও ইচ্ছে ছিল সিদ্ধার্থ ডাক্তারিই পড়বে। কিন্তু বি. এস. সি. পরীক্ষার অনেক আগেই বাবা মারা গেলেন। এখন সিদ্ধার্থ ডাক্তারদের কাছে ওষুধ বিক্রি করতে যায়, অনেক তার সঙ্গে ভালো করে কথাই বলে না, বসতে বলে না, কেউ কেউ বলে, এখন ব্যস্ত আছি, কথা বলার সময় নেই, যদি কিছু স্যাম্পল থাকে তো রেখে যান। সিদ্ধার্থ রাগ করে না, ধৈর্য হারায় না, স্থিরভাবে প্রতীক্ষা করে। তাকে কাজ শেষ করতেই হবে।

একেক দিন রাত্তিরে ঘুম আসতে চায় না, শুধু একটা পাউরুটি খেয়ে থাকার জন্য পেটে খিদে খিদে বোধ করে, তখন সিদ্ধার্থ আলোয়ান মুড়ি দিয়ে বাইরে পায়চারি করতে বেরোয়। একটা সিগারেট ধরিয়ে বালুরঘাটের লাল ধুলোভরা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আত্রাই নদী পর্যন্ত চলে যায়। মফসসল শহর অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছে, লম্বা লম্বা ইউক্যালিপটাসের পাশ দিয়ে যাবার সময় একটা হালকা সুগন্ধ ভেসে আসে। সিদ্ধার্থর বুকের মধ্যে একটু টনটন করে ওঠে। একটুক্ষণের জন্য তার মনে হয়, কলকাতার সবাই যেন ষড়যন্ত্র করে তাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। তাকে কেউ চায় না, সবার কাছেই সে একটা বোঝা। তার মনটা মেঘলা হয়ে আসে। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে এই চিন্তাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। কেউ তাকে পাঠায়নি, সে নিজেই জোর করে এসেছে। নির্বাসন নয়, এ তো তার ছদ্মবেশ। সে ছদ্মবেশ ধরে লুকিয়ে থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে। অজয়দা বলেছেন, এক বছরের মধ্যই তাকে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের পোস্ট দেওয়া হবে, তখন তাকে ছ-মাসের জন্য ট্রেনিং-এ পাঠানো হবে বোম্বোতে, তারপর কানপুর কিংবা শিলং-এ পোস্টেড হবে। তার আগে সিদ্ধার্থ কিছুতেই ধৈর্য হারাবে না।

কলকাতায় সিদ্ধার্থর জীবন সত্যিই অসহ্য হয়ে উঠেছিল। সুতপার ব্যাপারটা বেশি জানাজানি হয়নি, মা খানিকটা সন্দেহ করলেও মুখ ফুটে কিছু বলেননি। সমস্ত ব্যাপারটা নিজের মধ্যে চেপে রেখে সিদ্ধার্থ হাঁপিয়ে উঠেছিল। সুতপার সঙ্গে তার কথা বলা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তারপর থেকে, সুতপা বেপরোয়াভাবে ঠিক আগের মতোই ভাবভঙ্গি বজায় রেখেছিল। সিদ্ধার্থ মাঝে মাঝে সুতপাকে ক্ষমা করতে চেয়েছে, মনে মনে ভাবতে চেয়েছে যে সুতপাকে যতখানি খারাপ সে ভাবছে, সত্যিই হয়তো অতখানি খারাপ সে নয়, জেদি মেয়ে—ওর ওপর চাপ দিলে তার উলটো ব্যবহার করবেই। কিন্তু কিছুতেই সিদ্ধার্থ সেই দৃশ্যটা ভুলতে পারে না—পার্ক সার্কাসের সেই বাড়িতে বাদল আর দুটো লোক, সুতপা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সিগারেট টানছে, সিদ্ধার্থকে দেখেও সুতপা চমকে ওঠেনি—দৃশ্যটা ভাবলেই তার বুকের মধ্যে এমন মুচড়ে ওঠে যে সুতপাকে সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না—আর সবকিছুই সিদ্ধার্থ মেনে নিতে পারত, কিন্তু ওই যে চমকে না-ওঠা—যেন তাতেই সুতপা তার সারা জীবনের স্নেহ ও বিশ্বাস ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। কিন্তু সিদ্ধার্থ এ-কথা কাউকে বলতে পারেনি। টুনুকেও কিছু বলেনি—টুনু অবশ্য কোনো আগ্রহও দেখায়নি শোনার জন্য।

অনন্ত সান্যালের সঙ্গে সুতপার কী বোঝাপোড়া হয়েছিল সে জানে না, কিন্তু তিনিও ব্যাপারটা বেশ মেনে নিয়েছিলেন। সুতপা আগের মতনই অফিস যেতে লাগল। একদিন সিদ্ধার্থ বাড়ি ফিরে দেখেছিল অনন্ত সান্যাল তার মা আর ছোটোকাকার সঙ্গে বসে দিব্যি গল্প করছেন। সিদ্ধার্থ আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। সবাই যদি সবকিছু মেনে নেয় শেষ পর্যন্ত, তা হলে সিদ্ধার্থকে এর মধ্যে জড়ানো হয়েছিল কেন! মা আর ছোটোকাকার ওপরেও তার দারুণ ঘৃণা হয়েছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে সমস্ত রাগ পড়েছিল অনন্ত সান্যালের ওপর। লোকটাকে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ কুৎসিত গালাগালি দিয়েছিল, তা সত্ত্বেও লোকটা আবার তাদের বাড়িতে এসেছে, হেসে কথা বলছে—এ ব্যাপারটা সিদ্ধার্থর অসহ্য মনে হয়। অনন্ত সান্যালের কাছে সে দীন হয়ে চাকরি চাইতে গিয়েছিল—এ গ্লানিও সে ভুলতে পারে না। সিদ্ধার্থ চেয়েছিল ঘাড় ধরে অনন্ত সান্যালকে বাড়ি থেকে বার করে দিতে। বাঘের মতন সিদ্ধার্থ ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়েছিল, মা আর ছোটোকাকা তাকে ধরে রাখে, ছটফটিয়ে একবার মাত্র সে ওই লোকটার ঘাড়ের কাছে নখ বসিয়ে দিতে পেরেছিল। সেদিন একটুর জন্য কোনো বড়ো কেলেঙ্কারি হয়নি। মা আর ছোটোকাকা অনন্ত সান্যালের সামনেই তাকে বকতে শুরু করে। সেদিনই সিদ্ধার্থ বুঝেছিল, এ বাড়ি তাকে ছাড়তে হবে। সব দিক মানিয়ে মুখ বুজে শান্ত হয়ে সে কিছুতেই থাকতে পারবে না।

সিদ্ধার্থ আরেকটা আঘাত পেয়েছিল কেয়াদের বাড়ি থেকে। একমাত্র কেয়ার কাছে গিয়েই সে সান্ত্বনা পেত। কেয়ার সামনে বসে অনুভব করত, তার জীবনের একটা দাম আছে। আর সবার থেকে সে আলাদা। সে ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকলেও কেয়া জানে সিদ্ধার্থ ওই ভিড়ের মতোই উদ্দেশ্যহীন জীবন কাটায় না। একেকটা জায়গা থেকে সিদ্ধার্থ অপমানিত, লাঞ্ছিত ও পরাজিত হয়ে ফিরে এলেও কেয়া যখন তার হাত ধরে, সিদ্ধার্থ আবার বুকের মধ্যে মত্ত হস্তীর বল ফিরে পায়।

হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল। কেয়ার অপর্ণামাসির সঙ্গে কেয়ার বাবার কবে বিয়ে হয়ে গেল সিদ্ধার্থ জানতেও পারেনি, হঠাৎ একদিন গিয়ে দেখল কেয়াদের ফ্ল্যাট লোকের ভিড়ে গমগম করছে। অপর্ণা দেবীকে দেখতে নতুন বউ বলে মনেই হয় না, সিদ্ধার্থ এ-রকম বউ আগে কখনো দ্যাখেইনি, লজ্জা নেই, আড়ষ্টতা নেই, সহজভাবে সবার সঙ্গে কথা বলছেন, চা পরিবেশন করছেন, যেন তিনি ওই বাড়িতে অনেকদিন ধরেই আছেন। সিদ্ধার্থ হঠাৎ উপস্থিত হয়ে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কেয়ার বাবাই তাকে দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে যান। ভিতরে অনেক লোকজনের মধ্যে সিদ্ধার্থ এক কোণে চুপ করে বসে রইল বোকার মতন, কেয়ার সঙ্গে দু-একটার বেশি কথাই হল না। তার দিকে কেউ মনোযোগই দেয়নি। সিদ্ধার্থ বুঝতে পেরেছিল, সে এখানে অবাঞ্ছিত, একফাঁকে কাউকে কিছু না-বলেই সে উঠে এসেছিল।

এরপর সাত-আটদিন বাদ দিয়ে সিদ্ধার্থ আবার গিয়েছিল। সেদিনও ঘরে অনেক লোকজন। অপর্ণা দেবী লোকজন হই-হল্লা বেশ ভালোবাসেন মনে হল। সেদিনও চোরের মতন পালিয়ে এসেছিল সিদ্ধার্থ। কেয়ার সঙ্গে বাইরে দেখা করার কোনো উপায় নেই। আগে সে কথা সিদ্ধার্থ ভাবেওনি। বাইরের এই বিশ্রী পৃথিবীর তুলনায় কেয়াদের ফ্ল্যাটটাকে তার মনে হত অন্য জগৎ। পরিচ্ছন্ন সুশ্রী ঘর, কোনো শব্দ নেই, পাহাড়ি আয়াটা প্রায় কথাই বলে না, কেয়ার বাবা সন্ধ্যার সময় বাড়ি থাকতেন না, ছোটো ভাইটা ঘুমিয়ে পড়লে সিদ্ধার্থ আর কেয়া মুখোমুখি বসে কত অজস্র কথা বলত নিরালায়—সে-সব কথা শুধু ওদের দু-জনের কাছেই পরম মূল্যবান। কেউ সেখানে কোনোদিন ব্যাঘ্যাত ঘটায়নি, সিদ্ধার্থর সেই প্রিয় সন্ধ্যাগুলো হঠাৎ হারিয়ে গেল। বিয়ের পর কেয়ার বাবা প্রতি সন্ধ্যাবেলাই বাড়ি থাকেন অথবা বাড়িসুদ্ধ সবাই মিলে কোথাও চলে যান। বাড়িতে থাকলে অনেক লোক বেড়াতে আসে। সিদ্ধার্থ বুঝতে পারে, ওর মধ্যে তার কোনো স্থান নেই। ওখানে সবারই জিজ্ঞাসু চোখের সামনে অস্বস্তি নিয়ে বসে থাকার কোনো মানে হয় না। কেয়ার বাবা আর নতুন মা কোনোদিনই সিদ্ধার্থকে সহজভাবে নেননি, আপত্তিও করেননি, সমাদরও করেনিনি। একটা ব্যর্থতাবোধ আর রাগ সিদ্ধার্থর বুকের মধ্যে জমা হচ্ছিল। জলে ডোবা মানুষ যেভাবে বাতাস চায়, সেইরকম ভাবেই সে নিরালায় কেয়ার একটু সান্নিধ্যের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার কোনো উপায় নেই। এখন আর কেয়াদের বাড়িতে তার যাওয়া উচিত নয়, তবু সিদ্ধার্থ না-গিয়ে পারে না, সারাদিন সে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, জিভের মধ্য যেন একটা নিমপাতা আটকে থাকে—একবার কেয়াকে অন্তত চোখের দেখাও না দেখলে সে ঘুমোতে পারে না।

তারপর একদিন কেয়ার বাবা তাকে সেই আঘাতটা দিলেন। মনে মনে সিদ্ধার্থ এর জন্য হয়তো খানিকটা তৈরি হয়েই ছিল। সেদিনও কেয়াদের বাড়িতে অনেক লোকজন, সেদিন সিদ্ধার্থ দরজায় টোকা দিতে কেয়াই এসে দরজা খুলেছিল, একমাথা কোঁকড়া চুলের মধ্যে কেয়ার গন্ধরাজ ফুলের মতন মুখ, কালো সিল্কের শাড়ি পরেছে কেয়া, ফরসা সুডোল হাতখানি তুলে দরজা ধরে দাঁড়িয়েছে, সিদ্ধার্থর বুকের মধ্যে বাষ্প জমা হয়েছিল, একটা অসহ্য সুখে সে কথা বলতে পারছিল না, এরকম সুখের সময় তার বুক ব্যথা করে। একটা কথাও বলা হয়নি, কটা মুহূর্ত বা কেটেছে, এর মধ্যেই কেয়ার বাবা এসে উঁকি দিয়ে বললেন, কে রে খুকি? মি. সেনগুপ্তরা...সিদ্ধার্থকে দেখেই তিনি থমকে গেলেন, মুখের চেহারা বদলে গেল, ভদ্র অথচ গম্ভীর গলায় বললেন, আজ আমরা একটু বিশেষ ব্যস্ত আছি, তুমি আরেকদিন এসো, কেমন? অন্য একদিন! কেয়ার বাবাই দরজা বন্ধ করে দিলেন। সে রাত্রে সিদ্ধার্থ কত রাত পর্যন্ত একা একা ঘুরেছিল, কত অচেনা অচেনা রাস্তায় দিশেহারার মতন ঘুরে বেড়িয়েছে তার ঠিক নেই।

সিদ্ধার্থর অভিমান কম নয়। কেয়ার সঙ্গে দেখা করা তো দূরে থাক, কেয়ার নামও সে আর মনে আনবে না ঠিক করেছিল। কেয়ার কথা মনে পড়লেই তখনই সে অন্যলোকের সঙ্গে গিয়ে কথা বলত। একা থাকলেই কেয়ার কথা মনে পড়বে বলে সে সবসময় টো টো করে ঘুরেছে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। এমনকী যে রতনকে সে সহ্য করতে পারত না, তার সঙ্গেও যেচে যেচে আড্ডা দিতে গেছে। সেই সময়েই সিদ্ধার্থ প্রাণপণ চেষ্টা করে চাকরিটা জোগাড় করেছে। পাঁচদিনের মাথায় কেয়ার চিঠি পেয়ে তবে তার বুক জুড়িয়েছিল।

কেয়া এখানেও একটা চিঠি দিয়েছে পরশু দিন। কেয়ার চিঠিতে কোনো উচ্ছ্বাস থাকে না। কেয়ার চিঠিতে কোনো রাগ নেই, কোনো অভিমান নেই, কোনো হতাশা নেই। অপর্ণা দেবী কেয়ার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না—সিদ্ধার্থ জানে, কেয়ার বাবাও অনেকটা বদলে গেছেন—কিন্তু কেয়া কারওর নিন্দে করেনি, দু-পাতা জোড়া চিঠিতে বাড়ির খুঁটিনাটি বর্ণনা দিয়েছে, নিজের কথা প্রায় কিছুই না লিখে অন্যান্য কথা লিখেছে, একেবারে শেষে শুধু লিখেছে, তোমাকে আবার কবে দেখব? তুমি আর ফিরে আসবে না?

কেয়ার চিঠিটা সিদ্ধার্থর প্রায় মুখস্থ। র‌্যাপার মুড়ি দিয়ে বালুরঘাটের নির্জন রাস্তা দিয়ে মধ্যরাতে হাঁটতে হাঁটতে সিদ্ধার্থ পুরো চিঠিখানা যেন চোখের সামনে দেখতে পায়। শেষ লাইন দুটো বার বার বিড়বিড় করে, তোমাকে আবার কবে দেখব? তুমি আর ফিরে আসবে না?

শীত কাটাবার জন্য সিদ্ধার্থ হাত দুটো ছড়ায়। শরীরটাকে এ-পাশ ও-পাশ মুচড়ে ঠিক করে। শরীরটা তার আগের চেয়েও ভালো হয়েছে। হাতের মাসলগুলো জীবন্ত, শরীরের প্রতিটি অংশ হালকা কিন্তু মজবুত। রোঁয়াফোলানো শিকারি পশুর মতন সিদ্ধার্থ শরীরটা সজাগ করে ফ্যালে, চোখ দুটো তীব্র হয়ে আসে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে শক্ত করে চুলের মুঠি ধরে সিদ্ধার্থ মনে মনে বলে, হ্যাঁ, আমি ফিরে আসব! আমি তো এখন ছদ্মবেশে আছি। শুধু কেয়ার কাছেই ফিরে যাব না, তার আগে, সব প্রতিশোধ নিতেও ফিরে যাব। ইন্টারভিউয়ের সেই লোকগুলো, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলেছিল—আমি ওদের সবসুদ্ধু ধ্বংস করে দেব, ওই বাড়িটা পর্যন্ত ধুলোয় গুঁড়ো করে ফেলব, বাদল আর তার দুই সঙ্গী, ওরা আমার সারা মুখ রক্তে মাখামাখি করে দিয়েছিল। আমি যদি ওদের মুখ মাটিতে ঘষে না দিই...অনন্ত সান্যাল—ওর চোখ দুটো আমি উপড়ে নেব, চেনে না আমাকে, সেই পুলিশ অফিসারটা, এমনকী কেয়ার বাবাও যদি ঘুষখোর হয়—সব্বাইকে দেয়ালে দাঁড় করিয়ে দিয়ে রাইফেল হাতে নিয়ে...দেখে নিয়ো, ঠিক আমি ফিরে আসব!

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট