Showing posts with label সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়. Show all posts

বিদেশে একবার জেলে যাবার উপক্রম হয়েছিল - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

এ যেন বাড়িতে কারুকে খাবার নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে হঠাৎ একসময় তাকে ঠেলে নবার করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া। অনেকটা সেরকমই অভিজ্ঞতা হয়েছিল চেকোশ্লোভাকিয়ায়। অনেক দেশে সরকারি আমন্ত্রণে ঘুরেছি, কখনাে এমন নাটকীয় অবস্থার মধ্যে পড়িনি।

চেকোশ্লোভাকিয়া নামে এখন আর কোনাে দেশ নেই পৃথিবীর মানচিত্রে। চেক রিপাবলিক এবং শ্লোভাকিয়া নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে গেছে। ভাগ হয়ে যাবার মাত্র কিছুদিন আগেই আমরা গিয়েছিলাম সেখানে। ছ’জন ভারতীয় লেখক-লেখিকার একটি প্রতিনিধি দল।

ভারত সরকার আমাদের বিমান ভাড়া দেয়, ওদেশে পৌঁছােবার পর আতিথেয়তার সব ভার নেয় ওদেশের সরকার। তখনাে চেকোশ্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়নি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে চাপা উত্তেজনার ভাব রয়েছে, তা আমরা বুঝতে পারিনি প্রথমে। কিন্তু আতিথেয়তার মধ্যে যে আন্তরিকতা বা উষ্ণতার অভাব, তা আমরা অনুভব করেছিলাম। সরকারি কর্মচারিরা তাদের কর্তব্য সারে, আন্তরিক হতে যাবেই বা কেন, তবু একটা লােক-দেখানাে আন্তরিকতা তাে থাকেই, সেটারও যেন অভাব ছিল।

পৌঁছােলাম প্রাগ শহরে, যথারীতি আমাদের একটা মস্ত বড় হােটেলে তােলা হলাে। সব কমিউনিস্ট দেশের একই নিয়ম, পাসপাের্ট জমা রাখতে হয় হােটেলের কাউন্টারে। এসব দেশের ভিসাও অন্যরকম, পাসপাের্টে ছাপ দেয় না, অন্য একটি আলাদা ভিসা ফর্ম থাকে, তাতে ছবি সাঁটা থাকে, সেটা পাসপাের্টের মধ্যে রেখে দিতে হয়। আমি পােল্যাণ্ড, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, চীন, রাশিয়া ঘুরেছি, এসব নিয়ম আগে থেকেই জানি। কোনাে বিদেশির পক্ষে একা যেখানে সেখানে ঘােরাঘুরির নিয়ম নেই, সঙ্গে সব সময় একজন গাইড থাকে। সে দোভাষীর কাজও করে, আবার অতিথিদের গতিবিধির ওপর নজরও রাখে।

আমাদের গাইডের নাম আন্না। একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা। খুবই শুকনাে পাকানাে চেহারা, স্তন আছে কিনা বােঝাই যায় না, দশ বারাে দিন তার মুখে কখনাে একটুও হাসির রেখা দেখিনি। তবে সে ইংরিজিটা জানে খুবই ভালাে। অন্য অনেক দেশে দোভাষীদের ইংরিজি নিয়ে মাঝে মাঝে থতােমতে খেতে দেখে মজা পেয়েছি। আন্নার সময়জ্ঞানও নিখুঁত, কোথাও বেরুবার জন্য আমাদের দু'এক মিনিট দেরি হলেই সে খুব তাড়া দেয়। তারপরেও দেরি হলে বিরক্ত হয়।

প্রত্যেকবারই লেখকের দলটিতে একজনকে নেতা বা নেত্রী হিসেবে ঠিক করা হয়। সেবার আমাদের দলে ছিলেন মালায়লম ভাষায় প্রখ্যাত লেখিকা সুগথা কুমারী। তিনি সমাজসেবীও বটে, বলা যেতে পারে তিনি কেরালার মহাশ্বেতা দেবী। তাঁকেই নেত্রী করা হলাে। সব ব্যাপারেই তার খুব কৌতুহল, তিনি অনেক প্রশ্ন করেন, তাঁর সেইসব প্রশ্ন ও উত্তর শুনে আমরা লাভবান হই ।

এই প্রাগ শহর (স্থানীয় নাম প্রাহা) এক সময় ছিল বােহেমিয়ার অন্তগর্ত। তবে বােহেমিয়ান শব্দটি এখনাে চালু থাকলেও সেই শব্দে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তার সঙ্গে এখানকার বর্তমান অধিবাসীদের কোনাে মিল নেই। সব কিছুই নিয়ম কানুনে বাঁধা, মানুষজনের চলাফেরাও যেন যান্ত্রিক। আমাদের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঠাসা প্রােগ্রাম, কারখানা দেখতে যাওয়া, যৌথ খামার, বিশ্ববিদ্যালয়, লেখক সমিতি, প্রকাশক-সমিতি, শান্তি সমিতি ইত্যাদি নানান সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলােচনা, সে সব আলােচনাও নিছক দায়সারা। আসলে বেশির ভাগ সরকারি কর্মচারিই তখন সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ফুসছে, পার্টির খবরদারি সহ্য করতে পারছে না। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেটাই প্রাণপণে গােপন করার চেষ্টা।

সবগুলাে জায়গায় আমাদের যাবার ইচ্ছে থাক বা না থাক, যেতেই হবে। সেটাই আন্নার দায়িত্ব। আমার অবশ্য পরপর দৃশ্য বদল পছন্দ হয় না, অনবরত নতুন নতুন গােষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলতেও ভালাে লাগে না। মাঝে মাঝেই আমি বলি, যাও। তােমরা কারখানা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় দেখে এসাে, আমি নদীর ধারে অপেক্ষা করছি।

প্রাগ শহরটির দুটি ভাগ। নতুন অংশটির বিশেষত্ব নেই, শুধু লম্বা লম্বা বাড়ি আর অফিস-আদালত, কিন্তু প্রাচীন অংশটি বড়ই দৃষ্টিনন্দন। পুরােনাে আমলের পাথরের বাড়ি, দূরে দেখা যায় যােড়শ শতাব্দীর রাজপ্রাসাদ। শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী, সে নদীর নামটা উচ্চারণ করা শক্ত, স্লটাভা বলা যেতে পারে (Vlatava River) খুব চওড়া নয়। দু'পাশে সবুজ ঘাস, গালিচার মতন, সেখানে নানা রঙের পােশাক পরা ছেলেমেয়েরা রােদ পােহাচ্ছে শুয়েশুয়ে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে, একটু একটু আদর, খুব বেশি লজ্জাহীন নয়। অনেকে আবার পাশাপাশি শুয়ে একই বই পড়ছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে কৌতুহলী হয়ে লক্ষ করলাম, অনেকেই যেটা পড়ছে, তা ছাপা বই নয়, কোনাে বইয়ের জেরক্স কপি। ইংরিজি জানা ছেলেমেয়ে খুঁজে পাওয়া শক্ত, তবু বেশ কয়েকজনকে প্রশ্ন করার পর একজন বুঝতে পেরে বললাে, তারা পড়ছে ফ্রানৎস কাফকার বই!

এ বই কিনতে পাওয় যায় না?

-না।

-কেন?

-হারামজাদারা ফ্রানৎস কাফকার বই নিষিদ্ধ করেছে।

সে হারামজাদারই সমতুল্য একটা গালাগাল ব্যবহার করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে।

এটা একটা মজার ব্যাপার। ফ্রানৎস কাফকার জন্ম-কর্ম এই শহরে। তার বাড়িটি এখনাে আছে, অনেকেই দেখতে যায়। এ দেশের শ্রেষ্ঠ লেখক, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকের রচনা তার জন্মভূমিতে নিষিদ্ধ কেন? তার লেখায় তাে রাজনীতি নেই। তিনি কমিউনিজমের বিরুদ্ধেও কিছু লেখেননি। তার লেখা অ্যাবস্ট্রাক্ট সমাজ বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে, শুধু সেই জন্য ?

প্রকাশক সমিতির সভাপতিকে আমি পরে জিগ্যেস করেছিলাম, আপনারা কাকার বাড়ি সাজিয়ে রেখেছেন অথচ তার রচনা নিষিদ্ধ করেছেন কেন?

- নিষিদ্ধ তাে নয়।

-তাঁর বই পাওয়া যায় ?

-হ্যাঁ, পাওয়া যাবে না কেন?

—আমি যে কয়েকজনের কাছে শুনলাম, তাঁর বই জোগাড় করা সম্ভব নয়।

-তাহলে বােধহয় এখন আউট অফ প্রিন্ট হয়ে আছে।

-সৰ বই আউট অফ প্রিন্ট? কতদিন ধরে আউট অফ প্রিন্ট বলতে পারেন? তিনি খানিকটা ইতস্তত করে, কাগজপত্র দেখে বললেন, কুড়ি বছর!

একজন বিশ্ববিখ্যাত লেখকের বই কুড়ি বছর ছাপা হয়নি, অথচ নিষিদ্ধ নয়, এর চেয়ে মিথ্যে কথা আর কী হতে পারে?

যারা পড়বার তারা কিন্তু ঠিকই পড়ছে। বই যে কখনাে নিষিদ্ধ করে রাখা যায় না, তা শাসক শ্রেণির গাড়লরা কোনাে দেশেই বােঝে না।

ভ্লাটাভা নদীর ওপর যে সেতু, সেটির কিন্তু ইংরিজি নাম চার্লস ব্রিজ। বারবার সেই সেতু পারাপার করতে করতে নদীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়। এক-একবার আমি ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে গিয়ে বসি, নদীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলি। নদী বেশ বুঝতেও পারে মনে হয়।

চালর্স ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে একজন লােককে সেই নদীর বুকে পয়সা ছুঁড়ে দিতে দেখে আমার বেশ মজা লেগেছিল। আমাদের দেশে এরকম অনেক দেখেছি। গঙ্গানদী যে কত পয়সা খেয়েছে তার ঠিক নেই। এদেশেও সেরকম সংস্কার আছে নাকি? রােম শহরে একটা ঝর্ণায় পয়সা ফেলে অনেক লােককে মানত করতে দেখেছি বটে।

ভ্লাটাভা নদী তেমন গভীর নয় এখন। জলও খুব স্বচ্ছ। তলায় পয়সা পড়ে আছে, দেখা যায়।

কয়েকদিন পর আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলাে স্লোভাকিয়ার দিকে। এখানকার রাজধানীর নাম বাতিশ্লাভা। যাবার আগে আন্নার কাছ থেকে বিদায় নিতে হলে প্রচুর ধন্যবাদ জানিয়ে। যদিও মনে মনে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তার ব্যবহার ছিল কড়া হেডমাস্টারনীর মতন!

বাতিশ্লাভায় এসে বােঝা গেল, দু'অঞ্চলে অবস্থার তফাত কত প্রকট। একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থা। এখানে চাপা দেবার চেষ্টাও নেই, সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যেই অভিযােগ জানায়, এমনকি আমাদের মতন বিদেশিদের কাছেও। এদের অভিযােগ দুরকম। স্থানীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং চেকদের দাদাগিরির বিরুদ্ধে। সেই জন্যই শ্লোভাকিয়া পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, সে খবর শুনে আশ্চর্য হইনি! যেমন মুসলমান ধর্ম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাখতে পারেনি। সেইরকম কমিউনিজমও চেক ও শ্লোভাকিয়ার মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি।

এক জায়গায় আমরা কনসার্ট শুনতে গেছি। হঠাৎ বাজনা থামিয়ে তরুণ বেহালাবাদকটি বলতে শুরু করলাে, জানেন, সরকার আমাদের পয়সা দেয়? তাতে খাওয়া জোটে না। আমি বিদেশে যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছি, তাও যেতে দেবে না শুয়ােরের বাচ্চারা !

এরকম আমি আর কোনাে দেশে শুনিনি।

বাতিশ্লাভার এক বৃদ্ধের মুখে একটা ব্যাপার শুনেও মজা লেগেছিল। শহরটির একপাশে পাহাড়। তার ওপাশেই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর। বৃদ্ধটি বললেন, আগে (অর্থাৎ সােভিয়েত ব্লকে যাবার আগে) আমরা যখন ইচ্ছে ঐ পাহাড় পেরিয়ে ভিয়েনার কোনাে রেস্তোরাঁয় চা খেতে যেতাম। এখন ওখানে যাওয়া নিষিদ্ধ। যদি বা যাওয়ার অনুমতি মেলে, তাহলেও পূর্ব জার্মানির মধ্য দিয়ে দেড় হাজার মাইল ঘুরে যেতে হয়। অথচ ঐ পাহাড়ে উঠলেই শহরটা দেখা যায়।

এটা মজার ঘটনা নয়, করুণ। বৃদ্ধাটি অবশ্য বলছিলেন হাসতে হাসতে।

একজন বৃদ্ধ বললেন, আমি এখনও কমিউনিষ্ট, এই আদর্শের জন্য লড়েছি। কিন্তু নেতাদের লােভ আর ক্ষমতা দখলের জেদাজেদি আর সাধারণ মানুষের ওপর অনর্থক কড়াকড়ির জন্য সে আদর্শ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অল্প বয়েসী ছেলেমেয়েরা যে এই আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তার জন্য আমার মতন বুড়ােরাই দায়ী।

এবারে আসল ঘটনায় আসি।

বাতিশ্লাভায় আমাদের অন্য গাইড ছিল। সে আমাদের বিমানে তুলে দিল। প্ৰাগে এসে বিমান বদল করে আমাদের যেতে হবে দিল্লিতে।

প্ৰাগে পৌঁছে আমরা শুনলাম, আমাদের পরবর্তী বিমান ১৫ ঘণ্টা পরে আসবে কোনাে কারণে।

বিমান বন্দরে একজন সরকারি অফিসার উপস্থিত। সে আমাদের এই খবর জানিয়ে, করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললাে, আমি তা হলে চলি ?

আমরা এই পনেরাে ঘন্টা থাকবাে কোথায় ? অফিসারটি কঁধ ঝাকিয়ে বললাে, সে তাে আমি জানি না!

-আপনি জানেন না মানে?

--আজ রাত্রি আটটা পর্যন্ত আপনারা আমাদের অতিথি। তারপর তাে আমাদের আর কোনাে দায়িত্ব নেই।

–বিমান লেট হলে আমরা কী করতে পারি?

-তা তাে আমি জানি না!

—আমরা রাতটা কি তাহলে এয়ারপাের্টে কাটাবাে ?

-তা সম্ভব নয়। রাত এগারােটার পর কারুকেই এয়ারপাের্টে থাকতে দেওয়া হয় না।

-তাহলে কি আমাদের হােটেলে থাকতে হবে? সে খরচ দেবে কে?

--তা তাে আমি জানি না।

ভদ্রলােক বারবার তাতাে আমি জানি না, তাতাে আমি জানি না বলে সত্যি সত্যি বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমরা যাকে বলে, অগাধ জলে ! কারুর কাছেই বিশেষ টাকাকড়ি নেই। কোন হােটেলে থাকবাে, কে পৌঁছে দেবে, কিছুরই ঠিক নেই। আগে যে-হােটেলে ছিলাম, সেটা বিরাট হােটেল, অনেক খরচ!

ভারতীয় দূতাবাসে ফোন করে যে সাহায্য চাইবাে, তারও উপায় নেই। কারণ সেটা শনিবারের রাত। শনিবার-রবিবার কারুকেই পাওয়া যাবে না।

এসব দেশের সব এয়ারপাের্টেই আর্মির লােক থাকে। সেরকম একজন জবরদস্ত পােশাক পরা লােককে আমাদের অবস্থা খুলে বললাম। যদি তিনি আমাদের এয়ারপাের্ট রাত কাটাবার অনুমতি অন্তত দেন।

আর্মি অফিসারটি সমবেদনার ভাব নিয়ে আমাদের কথা শুনলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন যে খুবই দুঃখের কথা। কিন্তু তার করণীয় কিছু নেই। এয়ারপাের্টে থাকতে দেবার অনুমতি তিনি দিতে পারেন না। আরও উঁচু জায়গা থেকে আদেশ আনতে হবে, সেটাও শনিবার রাতে সম্ভব নয়।

তিনি কাছাকাছি কয়েকটা শস্তা হােটেলের ঠিকানা বাৎলে দিলেন।

ছ’জন মিলে এক ট্যাক্সিতে যাওয়া যাবে না। এসব দেশে চারজনের বেশি কিছুতেই নেয় না। প্যারিসে দেখেছি, তিনজনের বেশি নেবে না। সামনের সিটে বসতে দেয় না কোনাে যাত্রীকে।

এখন সুগতকুমারীর অনুরােধে আমাকেই হােটেল খোঁজার দায়িত্ব নিতে হলাে।

সঙ্গে গাইড নেই, ট্যাক্সি ড্রাইভাররা ঘােরাপথে নিয়ে যাচ্ছে কিনা, কী করে বুঝবাে? অনেক দূরে দূরে এক একটা হােটেল, কোনাে হােটেলেই একসঙ্গে দু’জনের জায়গা নেই।

এই অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে কেউ রাজি নয়। সবাই ভয় পাচ্ছে। এখানকার সরকারের ব্যবহারে আমাদের হতভম্ব অবস্থা। | হােটেল খুঁজতে গিয়ে ট্যাক্সি ভাড়ায় আমার নিজের অনেক পয়সা খরচ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আমি প্রস্তাব দিলাম, আমরা প্রথমবার এসে যে ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে ছিলাম, সেখানেই যাওয়া যাক। সেটা তবু আমাদের চেনা। অতবড় হােটেলে, সেখানে একসঙ্গে দু’জনের ঘর পাওয়াও সম্ভব। | তাই হলাে। ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে এসে আমরা আমাদের দুরাবস্থার কথা বুঝিয়ে বললাম। আগে ছিলাম সরকারি অতিথি, প্রত্যেকের আলাদা ঘর। যা খুশি খাবারের অর্ডার দিয়ে সই করে দিয়েছি। এখন থাকতে হবে নিজেদের পয়সায়। আমাদের খুব শস্তার ঘর চাই। | এসব কথা বুঝিয়ে বলতেও আমাদের কম ঝঞ্জাট হয়নি। প্রায় কেউই ইংরিজি বােঝে না। এ ওকে ডাকে, সে তাকে ডাকে। শেষ পর্যন্ত যে বুঝলাে, সেও কাঁধ ঝাকিয়ে বললাে, এ ব্যাপারে তার কিছু করার নেই। আমাদের পয়সা দিয়েই থাকতে হবে, খেতে হবে। তবে, একটা খুব বড় ঘর আছে। সেই এক ঘরে চারটি খাট, আর মেঝেতে বিছানা পেতেও শুতে পারে দু’জন। তাতে খরচ কম পড়বে।

অগত্যা আর উপায় কী! নারী-পুরুষ মিলে ছ’জন এক ঘরে। কেউ জোরে নাক ডাকে, কারুর পাতলা ঘুম। কারুর খালি গায়ে শােওয়া অভ্যেস, অথচ মহিলাদের সামনে জামা খােলা যায় না।

সব খাবারেরই বেশ দাম, তাই আমরা খেলাম শুধু সুপ আর পাঁউরুটি।

ঘর ভাড়া ছ’জন সমান ভাগ করে দেবে। আর কিছু বখশিস। আমার টাকাটা আমি রাত্রেই সুগতকুমারীর হাতে তুলে দিলাম, কারণ আমার সঙ্গে অন্য পাঁচজনের একটা তফাৎ আছে।

এই সব সরকারি প্রতিনিধি দলে যারা যায়, তারা সবাই রুটিন মতন ঘােরে ফেরে এবং নির্দিষ্ট দিনে দেশে ফিরে আসে। আমার মাথায় পােকা আছে, অত সহজে ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেই জন্যই সরকারি খরচে কোনাে দেশে গেলেও, তার কাছাকাছি কোনাে দেশ আমার নিজের খরচে দেখে আসতে ইচ্ছে করে।

এবারেও ঠিক করেই এসেছিলাম, আমি দলের সঙ্গে ফিরবাে না। ইস্তানবুল শহরটি দেখে যাবাে। ইস্তানবুলের নাম এককালে ছিল কনস্টান্টিনোেপােল, ইতিহাসের দিক থেকে এরকম রােমঞ্চকর শহর আর দ্বিতীয় আছে কিনা সন্দেহ। এই শহরের অর্ধেকটা এশিয়ায়, অর্ধেকটা ইওরােপে। তুরস্ক থেকে আমন্ত্রণ পাবার আশা খুব কম। সেই জন্য আমি দিল্লি থেকে ভিসা নিয়েই এসেছি।

অন্য সকলের দেশে ফেরার প্লেন বেলা এগারােটায়, কিন্তু আমার ইস্তানবুলের ফ্লাইট ভােরবেলা। সুতরাং, অন্যদের ঘুম না ভাঙিয়েও আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে।

কী করে ভাের চারটেয় উঠবাে, সেই চিন্তায় আমার সারারাত ঘুমই এলাে না।

যথাসময়ে আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। হােটেলের কাউন্টারে যে লােকটির ডিউটি ছিল, তারও চোখ ভরা ঘুম। আমার পাসপাের্ট ফেরৎ চাইতে সে একগাদা পাসপাের্টের মধ্য থেকে সেটা বার করে দিল। আমার ছবি-সমেত ভিসা ফর্মটি অর্ধেক বেরিয়ে আছে। | হােটেলের দারােয়ানদের ট্যাক্সি ধরে দিতে বললাম। ট্যাক্সি আর আসেই না। দেরি করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। নিজেই সুটকেস হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে ডেকে নিলাম একটা ট্যাক্সি।

এয়ারপাের্টে পৌঁছে একটা খবর জেনে খুব স্বস্তি হলাে, আমার ফ্লাইট ঠিক সময়ে আছে। আর কোনাে দেশে আমন্ত্রিত হয়ে এরকম নিজে ট্যাক্সি ডেকে একা একা এয়ারপাের্টে আসতে হয়নি। এখানে গতকাল রাত আটটায় আমাদের আতিথ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে, তারপর অতিথিরা গােল্লায় যাক বা না যাক, তাতে এদেশের সরকারের কিছু আসে যায় না।

সুটকেস চেক-ইন করে, একটা সিগারেট ধরাবার পর খানিকটা সময় নিয়ে তারপর দাঁড়ালাম ইমিগ্রেশান কাউন্টারে। তেমন ভিড় নেই। একজন মহিলা পাসপাের্ট পরীক্ষা করছেন।

আমার পাসপাের্ট ও ভিসার কাগজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করলেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল একটু পরে পাসপাের্টটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললেন, এটা কি তােমার পাসপাের্ট ?

আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লাে। জীবনে কখনাে একসঙ্গে এমন বিস্ময় ও ভয় অনুভব করিনি।

বােমা ফাটার মতন শব্দ করে আমি বললাম, না !

পাসপাের্টের ছবিটা আমার নয়। ভিসার কাগজটা আমার। হােটেলের লােকটি অন্যলােকের পাসপাের্টে আমার ভিসার কাগজটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমিও ভিসার কাগজে আমার ছবিটা দেখেই নিয়ে চলে এসেছি। তাছাড়া, সেই সময় লােকটি আমি কেন পয়সা না দিয়ে চলে যাচ্ছি, আমার পয়সা কে দেবে, এই নিয়ে ঝামেলা বাধাবার তাল করে আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়েছিল।

ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে একজন আর্মি অফিসারকে ডেকে আনলেন।। সেই লােকটি শুনলেন সব কথা। তারপর ঠাণ্ডা ভাবে বললেন, ভদ্র মহােদয়। নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে এখনই আমার গ্রেফতার করা উচিত। কারণ আপনি অন্যের পাসপাের্ট নিয়ে এ দেশ ছেড়ে বেরুবার চেষ্টা করছিলেন। সেটা শাস্তিযােগ্য অপরাধ। তাতে আপনার কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটা একটা ভুলেরই ব্যাপার। আপনাকে গ্রেফতার করলাম না। এখন আপনি কী করবেন?

আমার এমনই হতভম্ভ অবস্থা যে মাথায় কিছু এলাে না।

এক ঘণ্টার মধ্যে ইস্তানবুলের প্লেন ছেড়ে যাবে। আমি জানি, পরের ফ্লাইট চারদিন পরে। সেই চারদিন আমার পক্ষে এখানে থেকে যাওয়া সম্ভব নয়। চেকোশ্লোভাকিয়ার ভিসা আমার সেদিনই শেষ, তা ছাড়া টাকা পয়সার প্রশ্ন তাে আছেই।

এখন হােটলে ফিরে গিয়ে পাসপাের্ট বদলে আনতে গেলে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাবে। আমার জন্য তাে আর ইস্তানবুলের ফ্লাইট দাঁড়িয়ে থাকবে না।

তা হলে কী উপায়?

ইমিগ্রেশানের ভদ্রমহিলা বেশ সহানুভূতিশীল। তিনি বললেন, এখন আমরা যদি আপনাকে ছেড়েও দিই, আপনি ইস্তানবুলে এই নকল পাসপাের্ট নিয়ে ঢুকতে পারবেন না। এমনকি আপনার নিজের দেশ ইন্ডিয়াতেও তত আপনাকে আটকে দেবে, সেখানে আপনাকে অন্য পাসপাের্ট নিয়ে ঢোকার চেষ্টা করার জন্য অ্যারেস্ট করবেই। তা ছাড়া, আপনি যার পাসপোের্ট নিয়ে চলে এসেছেন, সেও তাে বিপদে পড়বে একই রকম।

এই পাসপাের্টটা দেবরাল নামে একজন হিন্দি লেখকের। সে বেচারি বােধহয় এখনাে। ঘুমােচ্ছে, কিছুই জানে না।।

আর্মি অফিসারটি বললেন, আমরা কোনাে অ্যাকশান নিচ্ছি না। আপনি চেষ্টা করে দেখুন, নিজের পাসপাের্ট নিয়ে আসতে পারেন কিনা।

হােটেল থেকে এয়ারপাের্ট আসতে সময় লেগেছিল পয়তিরিশ মিনিট। ভােরবেলা রাস্তা একেবারে ফঁকা ছিল। এখন যদি আমি ট্যাক্সি নিয়ে হােটেলে যাই, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসা অসম্ভব। ঠিক আছে, ইস্তানবুল না হয় বাদ দিলাম, পরের প্লেনে অন্যদের সঙ্গে দেশে ফিরবােই বা কী করে? সে ফ্লাইটে তাে আমার বুকিং নেই। এদিককার ফ্লাইটে তিন-চার মাস আগে বুক না করলে সিট পাওয়া যায় না।

এদিকে আমার সুটকেস চলে গেছে ইস্তানবুলের বিমানে।

ভাবছি, আর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দলের কারুকে ফোন করে বলবাে, আমার পাসপোের্টটা এনে, অন্যটা নিয়ে যেতে! বুঝিয়ে বলবাে, জামা কাপড় পরে তৈরি হবে। কাউন্টারে এসে কথা বলবে, আমার পাসপাের্ট অন্য কারুকে দেবে কিনা....।

যাই হােক, আমি হােটেলে ফোন করলাম।

এই রে, এখন যে কাউন্টারে রয়েছে, সে একদম ইংরিজি জানে না। সে চেক ভাষায় আমায় কী সব বলে যাচ্ছে, আমিও তা বুঝছি না কিছুই। যত বলি, ইংরিজি জানা একজনকে ডাকো, তাও সে বােঝে না।

হঠাৎ দেখি, কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছে আন্না। এ যেন সমুদ্রে ডুবন্ত লােকের সামনে একটি কাষ্ঠখণ্ড। চোখাচোখি হতে আন্না এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললাে, সুপ্রভাত। সব খবর ভাললা? আমি তােমাদেরই মতন আর একটি দেশের অতিথিদলকে নিতে এসেছি।

আমি তার হাত জড়িয়ে ধরে বললাম, আন্না, আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি।

ঝড়ের বেগে ঘটনাটা বর্ণনা করতে হলাে আমাকে।

আন্নার মুখের রেখায় কোনাে ভাবান্তর হলাে না। নিরস গলায় বললাে, হােটেলের লােকেরা অন্যায় করেছে ঠিকই। অন্য পাসপাের্ট তােমার ভিসার ফর্ম ঢুকিয়ে দিয়েছে। তােমারও ত্রুটি হয়েছে। হােটেল ছাড়ার সময় নিজের পাসপাের্ট খুব ভালােভাবে দেখে নেওয়া উচিত। দেখা যাক, এখন কী করা যায়।

আমি বললাম, সময়টাই যে আসল। আর মাত্র পঞ্চাশ মিনিট, এদিকে আমার সুটকেস— | এসব কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সে টেলিফোন করলাে হােটেলে। ওদের ভাষায় কী বলতে লাগলাে, তা তাে আমার বােঝার উপায় নেই। কিন্তু আন্না রীতিমতন গলা চড়িয়ে ধমকাচ্ছে। মনে হলাে, সে তাহলে সাধারণ গাইড নয়, তার অন্য কোনাে সরকারি পরিচয় থাকতে পারে।

ফোন ছেড়ে দিয়ে আন্না বললাে, হােটেলের ওপর সব দোষ চাপিয়েছি। ওদের নামে নালিশ করার ভয় দেখিয়েছি। ওদের বলেছি, এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি ড্রাইভারের হাত দিয়ে তােমার পাসপাের্ট পাঠিয়ে দিতে। অন্যটা সে-ই নিয়ে যাবে।

এরপর অধীর অপেক্ষা। ঘন ঘন সিগারেট টানা। এয়ারপাের্টে অনবরত ট্যাক্সি ঢুকছে। কোন ট্যাক্সিতে আমার পাসপাের্ট আসবে, বুঝবাে কী করে?

ঠিক পঁয়তিরিশের মাথায় দেখি, একজন ট্যাক্সি চালক একটা হাত জানলা দিয়ে বাইরে উচিয়ে রেখেছে। সেই হাতে একটা পাসপাের্ট।

এখনও বারাে মিনিট সময় আছে। দৌড়ে গেলে আমাকে ইস্তানবুলের ফ্লাইটে উঠতে দেবে। আন্নার অতিথিরা পৌঁছে গেছে। আফ্রিকার কোনাে দেশের, মালপত্রের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাকালাম আন্নার দিকে। এই মুহুর্তে তাকে কী সুন্দরী মনে হলাে। আন্নার সাহায্য না পেলে, এভাবে, এই সময়ের মধ্যে পাসপাের্ট উদ্ধার করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতাে না। আন্নাকে নিয়ে আড়ালে অনেক মস্করা করেছি, কিন্তু এদেশে সে-ই আমার সবচেয়ে উপকারি বন্ধু।

আমি তার কাছে গিয়ে বেশ আবেগের সঙ্গে বললাম, আন্না, তুমি আমার জন্য যা করলে—

আন্না বললাে, যাও। আর ভদ্রতা করতে হবে না। এরপর ফ্লাইট মিস করবে?

সে আমার গালে ঠোট ছোঁয়ালাে।

আমার মনে হলাে, এমন মধুর আদর জীবনে খুব কমই পেয়েছি।

ছুটে গিয়ে উঠে পড়লাম প্লেনে।

তারপর ইস্তানবুলে কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছি সম্পূর্ণ একা একা। কিন্তু সে তাে অন্য গল্প।

সাঁকো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছোটগল্প

সাঁকো

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ওরা আমার হাত দুটো পেছনদিকে মুড়ে বাঁধল নাইলনের দড়ি দিয়ে। চোখে বেঁধে দিল নিরেট কালো কাপড়। মুখের মধ্যে একটা বেশ বড় তুলোর গোল্লা ভরে দিয়ে ঠোঁটে আটকে দিল স্টিকিং প্লাস্টার। তারপর বুঝতে পারলুম, দু-তিনজন লোক আমাকে উঁচু করে তুলে বেশ খানিকটা বয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল একটা কাঠের তক্তার ওপরে।

একজন খুব ঝকঝকে পালিশ করা গলায় বলল, এবারে তুমি হাঁটো সামনের দিকে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, এক-পা এক-পা করে হাঁটো।

আমি এক-পা বুলিয়ে দেখলুম, কাঠের তক্তাটা মাত্র বিঘতখানেক চওড়া, তলার দিকে শূন্যতা।

এটা একটা সাঁকো? নীচে কোনও পাহাড়ি নদী? জ্যোৎস্নাহীন রাতে আমরা আসছিলুম একটা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, গাড়ি থেমেছিল একটা জঙ্গলের মধ্যে। এমন নিস্তব্ধতা যে বাতাসেরও কোনও শব্দ নেই।

যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই আততায়ীদের একজন হেসে বলল, হ্যাঁ, এটা তিস্তা নদীর ওপর একটা অস্থায়ী সাঁকো। জল প্রায় পাঁচ-ছ'শো ফুট নীচে। যদি পা পিছলে পড়ে যাও সঙ্গে-সঙ্গে ছাতু হয়ে যাবে। তোমাকে আর খুঁজেও পাওয়া যাবে না।

আমি বুঁবুঁ শব্দ করে বলতে চাইলুম, আমাকে এই সেতুটা পার হতে বলছ কেন?

সে ঠিক বুঝতে পেরে বলল, এটা একটা খেলা।

আমি ওইভাবেই আবার বললুম, এ-খেলা যদি আমি খেলতে না চাই?

সকৌতুক উত্তর এল, তাহলে তোমাকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হবে। তুমি গড়াতে-গড়াতে পড়বে, আমরা সেটা টর্চ ফেলে দেখব।

এরপর আমি নিজেই জিগ্যেস করলুম, আর যদি ওপারে পৌঁছোতে পারি?

আবার হাসির সঙ্গে উত্তর এল, তখন দেখবে কী হয়। নিশ্চয়ই একটা কিছু খুব মজার ব্যাপার হবে। নাউ স্টার্ট। আমরা ঠিক দশ গুনব, তার মধ্যে এগোতে শুরু না করলে...এক, দুই, তিন...

প্রথম পা ফেললুম সামনের দিকে। খুব একটা শক্ত কিছু মনে হল না। কাঠের পাটাতনটা বেশ মজবুত। এক পা সামনে দিয়ে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে তারপর দ্বিতীয় পা এগিয়ে ঠিক মতোন বুঝে নিয়ে সেটা ফেলতে হবে। এইরকম ভাবে প্রত্যেকবার। একটুও অন্যমনস্ক হলে চলবে না। অসম্ভব কিছু নয়। এর থেকেও অনেক শক্ত খেলা আছে পৃথিবীতে।

ওদের গোনা শেষ হওয়ার আগেই আমি তিন পা এগিয়ে এসেছি। কী ভাবে ওরা আমাকে? ওরা গায়ের জোরে আমাকে ধরে এনেছে বলেই আমি ওদের কাছে হার স্বীকার করব? ওরা কি ভেবেছিল, আমি কেঁদে কেটে, প্রথমেই ভয় পেয়ে গিয়ে দয়া চাইব ওদের কাছে? আমাকে এখনও চেনে না।

এই সাঁকোটা কতখানি লম্বা? তিস্তা নদী তো কম চওড়া নয়। জুবিলি ব্রিজ পার হয়েছি অনেকবার। উঁচু পাহাড়ের ওপরে হয়তো কিছুটা সরু। এ জায়গাটা কোথায়?

এ কী, আমার পা কাঁপছে কেন? মাথা ঠিক আছে, তবু পা কাঁপছে? সামনের দিকে এগোবার জন্য একটা পা তুলতেই অন্য পা-টা যেন শরীরের ভর রাখতে পারছে না। মানুষ তো এক পায়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সামনের দিকে পা বাড়ানোই দারুণ শক্ত। পাশের দিকে নয়, শুধু সামনের দিকে। একেবারে সোজা হাঁটতে মানুষ জন্ম থেকেই শেখে না।

ওদের একজন চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, কী হল, থামলি কেন? গুঁতো খাবি কিন্তু।

আমার মুখ বন্ধ, আমি উত্তর দেব কী করে? ওরা তা জানে না? অবশ্য ওদের ওই প্রশ্নের কোনও উত্তরও হয় না।

আবার ওরা বলল, হয় গুঁতো খাবি, নইলে গুলি করা হবে। থেমে থাকা চলবে না। আবার দশ গুনছি, এক-দুই-তিন...

একটা যদি লাঠি দিত ব্যালান্স রাখার জন্য! হাঃ, লাঠি, হাত দুটোই খোলা রাখেনি। ছেলেবেলায় যখন কোনও পাঁচিলের ওপর দিয়ে কিংবা রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটেছি, হাত দুটো এমনিতেই দুপাশে সোজা হয়ে গেছে, হাত দুটো তখন ডানা হয়ে যায়।

অন্ধকার রাত্তিরে চোখ খোলা থাকলেও এরকম একটু সরু সাঁকো পার হওয়া কথার কথা নয়। তবু ওরা চোখ বাঁধতে গেল কেন? তেমন প্রয়োজন হলে মানুষ নাকি অন্ধকারেও দেখতে পায়। চোখ খোলা থাকলে, আর কিছু না হোক শুধু অন্ধকারও তো দেখা যেত। অন্ধকার কি দেখার জিনিস নয়। অন্ধকার কতরকম। পৃথিবীতে কোথাও খাঁটি কালো অন্ধকার নেই।

না, অসম্ভব পা কাঁপছে। আমি পারব না। এরই মধ্যে একবার টলে পড়ে যাচ্ছিলুম আর একটু হলে। এটা অন্যায় খেলা।

ওরা আর লাঠি-ফাঠি নিয়ে গুঁতো মারতে পারবে না। তার থেকে দূরে চলে এসেছি নিশ্চয়ই! গুলি করতে পারে। কিন্তু ওদের গুলি খেয়ে আমি কিছুতেই মরব না। ওরা গুনতে শুরু করলে নয় পর্যন্ত গোনার পরই আমি ঝাঁপ দেব।

—নীলু! নীলু!

বাবার গলায় আওয়াজ। বাবা মারা গেছেন অনেকদিন আগে। বাবা এখানে এই নদীর ওপর এসে আমায় ডাকতে পারেন না। মানুষের আত্মা বলে কিছু যদি থেকেও থাকে, কিন্তু সেই আত্মা কি পাখি যে অন্ধকার নদীর ওপর এসে উড়বে? এটা আমার কল্পনা, গল্প-উপন্যাসে এরকম থাকে। অবচেতনে আমি কি শিশু হয়ে গিয়ে বাবার সাহায্য চাইছি?

—নীলু, নীলু, তুই পারছিস না? আমি তোর হাত ধরব?

—বাবা, আমার হাত বাঁধা। তোমারও কি হাত আছে?

—না, আমার হাত নেই। কিন্তু তোকে থামলে চলবে না। তুই এগিয়ে আয়, আস্তে-আস্তে, মনে কর, একটু সামনেই তোর মা বসে আছে।

—মা কি সামনে থাকে, না পেছনে?

একটা দমকা হাওয়া দিল। এতক্ষণ বাতাসের অস্তিত্বও টের পাওয়া যাচ্ছিল না। বেশ গরম, কিন্তু বেশি জোর হাওয়া ভালো নয়। একটা পা তুললেই আমার শরীরটা যেন একটা শুকনো ফুলের পাপড়ির মতন পলকা হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের ধাক্কাতেও পড়ে যেতে পারি।

আমি আর এগোতে পারছি না। না, পারব না।

পেছন থেকে ওরা গুনছে, এক দুই তিন...সাত আট...

—নীলু, নীলু, ঝাঁপ দিও না।

মায়ের গলা? না তো, অন্যরকম, অথচ খুব চেনা-চেনা। কে, তুমি কে?

—নীলু, ঝাঁপ দিও না। এসো সামনে এসো। তুমি আমায় চিনতে পারছ না নীলু?

—রিনি! সত্যি প্রথমটা চিনতে পারিনি। অথচ ভেবেছিলুম, সারা জীবনে তোমাকে ভুলব না। আশ্চর্য।

—সত্যিই তুমি আমায় ভুলে গিয়েছিলে, নীলু?

—না, রিনি, ভুলে যাইনি, আবার অনেকদিন মনেও পড়েনি তোমার কথা। এতদিন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?

—আমি তো হারিয়ে যাইনি, তুমিই অনেক দূরে চলে গেলে।

—রিনি আমার চোখ বাঁধা, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি কি আগের মতোই আছ? ঘুঘু পাখির চোখের মতন অবাক-অবাক ভাব, একটা উড়ন্ত পালকের মতন তোমার শরীর।

—কথা বলো না, নীলু, এগিয়ে এসে আমার হাত ধরো।

—আমি পারছি না রিনি, আমি আর পারব না, এই দ্যাখো, একটা পা তুলতে কতক্ষণ সময় লেগে যাচ্ছে।

—তুমি একসময় তোমার সবকিছু ছেড়ে আমার দিকে ছুটে এসেছিলে।

—আমি ছুটে গিয়েছিলুম না তুমি আমাকে চুম্বকের মতন টেনেছিলে? এখন আবার সেই রকমভাবে টানতে পারো না?

—মাঝখানে কতগুলো বছর...নীলু, তুমি সামনাসামনি না এগিয়ে পাশ ফিরে হাঁটো। দ্যাখো, তাহলে পা তুলতে হবে না। একটা পা ঘষে-ঘষে এগোবে। পা কাঁপবে না। আমি হাত বাড়িয়ে আছি তোমার দিকে।

—তাই তো, পাশ ফিরে হাঁটা কিছুটা সহজ লাগছে। রিনি তুমি কী করে জানলে? তোমাকে কি এরকম সাঁকো পার হতে হয়েছে কখনও?

আর কোনও উত্তর নেই। রিনি আসেনি। আবার অবচেতন? পাশ ফিরে হাঁটার বুদ্ধিটা রিনি দিয়ে গেল, না আমি নিজেই উদ্ভাবন করলুম? বহুদিন রিনির কথা মনে পড়েনি, রিনি হারিয়ে গেছে, না আমি দূরে চলে গেছি? একসময় রিনির খুব কাছে পৌঁছনোর জন্য সাংঘাতিক ব্যাকুলতা ছিল। কত আছে? রোদ্দুর যেমন বহু লক্ষ মাইল দূর থেকে ছুটে এসে মানুষের শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে ভেতরে চলে যায়, অন্ধকার মজ্জা-মাংস শিরা-রক্তে আলো জ্বালিয়ে দেয়, সেইরকম? না, আমি আলো জ্বালিনি, রিনিই জ্বালিয়েছিল, এক চিল-ডাকা দুপুরে ওদের বাড়ির একতলায় বসবার ঘরে রিনি আমার চোখের সামনে ওর একটা হাত তুলে বলেছিল, এই আঙুলের ডগায় কী আছে বলো তো? আমার মনে হয়েছিল, সেখানে থেমে আছে অনন্ত মুহূর্ত।

তবু আমরা পরস্পরকে হারিয়ে ফেললুম কী করে? আর রিনিকে ছাড়ব না, এবার রিনিকে পেতেই হবে। মনে করা যাক এখান থেকে ঠিক দশ পা দূরে দাঁড়িয়ে আছে রিনি, সেই আঙুলটা তুলে, আমার ওই পর্যন্ত যেতেই হবে।

—নীলু, আমি কিন্তু ঠিক দশ পা দূরেই দাঁড়িয়ে আছি। তুমি গুনে-গুনে পা ফেলে এসো।

—রিনি তোমার কাছে পৌঁছোলে তুমি আমার চোখের বাঁধনটা অন্তত খুলে দেবে? তোমাকে একবার দেখব।

—তোমার চোখ বাঁধা আছে, তাতে এক হিসেবে ভালোই হয়েছে। নীচের দিকে তাকালে তোমার মাথা ঘুরে যেত। নদীর জলে একটু আলো চিকচিক করছে। অনেক নীচে।

—নীচের দিকে তাকাব না, শুধু তোমার আঙুলের ডগাটা আর-একবার ভালো করে দেখব।

এই দশ পা যেতে আমার পা কাঁপল না। রিনি সেখানে নেই। কীসের শব্দ, অনেক নীচের নদীর জলস্রোতের? ওহে অবচেতন, তুমি আরও শক্তিশালী হয়ে রিনিকে রক্তমাংসে তৈরি করতে পারলে না? কী গাধা আমি, মাত্র দশ পা দূরে রিনি থাকবে, কেন একথা ভাবতে গেলুম? যদি ভাবতুম পঞ্চাশ পা দূরে, কিংবা সাঁকোর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে রিনি, আকাশে কালপুরুষের দিকে তার কোমল আঙুলখানি তুলে, তাহলে সেই টানে হয়তো পৌঁছে যাওয়া যেত।

কৃপণের মতন আমি মাত্র দশ পা উচ্চারণ করে রিনিকে খরচ করে ফেলেছি। এখন অবচেতন তোলপাড় করলেও আর রিনি ফিরে আসবে না।

পেছন থেকে কর্কশ হুংকার ভেসে এল—এই হারামজাদা, দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? আমরা কি এখানে সারারাত কাটাতে এসেছি? গুলি চালাব?

ওরা কি টর্চ ফেলে দেখছে আমাকে? ওরা সব মিলিয়ে ছ'জন, আমি গুনেছি। ওদের বাধা দেওয়ার কোনও উপায় ছিল না। ওরা কি অপেক্ষা করে আছে, কখন আমি পড়ে যাব? কিংবা ওরা নিজেদের মধ্যে বাজি ফেলেছে? সিনেমায় এরকম দৃশ্যে থাকে, হঠাৎ একবার পা ফসকে পড়ে যায় নায়ক। দর্শকদের বুক ধড়াস করে ওঠে। নায়ক কিন্তু সত্যি-সত্যি পড়ে যায় না, শেষ মুহূর্তে ধরে ফেলে এক হাতে। ঝুলতে থাকে। তলায় হাঁ করে আছে কুমির। নায়ক সেই অবস্থাতেও উঠে আসে কায়দা করে।

আমি পড়ে গেলেও ধরতে পারব না, আমার হাত বাঁধা। মুখ দিয়ে কাঠটাকে কামড়ে ধরারও উপায় নেই। আমার এক চুলও ভুল করলে চলবে না। তা ছাড়া আমি নায়কও নই। এটা সিনেমা নয়, এটা বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা।

বাঁচতেই যে হবে, তার কী মানে আছে! একটা কুঁড়েঘরের চাল থেকে ঝুঁকে পড়া রোমশ, হালকা সবুজ লাউডগায় বসে আছে একটা লালচে রঙের ফড়িং, তিরতির করে কাঁপছে তার ডানা, কী নিশ্চিন্ত ও আনন্দময় তার বসে থাকার ভঙ্গি, যদিও যে-কোনও মুহূর্তে একটা শালিক তাকে ঠোঁটে চেপে নিয়ে যেতে পারে। কেন এই দৃশ্যটা মনে আসছে!

আর কত দূর যেতে হবে? অর্ধেক এসেছি কি? একটা মুহূর্ত, যদি লাফ দিয়ে পড়ি, তাহলে আর কোনও যাতনা সহ্য করতে হবে না। অনেক উঁচু থেকে পড়লে বাতাসের চাপেই নাকি নিশ্বাস শেষ হয়ে যায়। অন্য যে-কোনও মৃত্যুর চেয়ে নদীর বুকে হারিয়ে যাওয়া অনেক ভালো।

দুলছে, দুলছে সেতুটা, দুলছে। ওপার থেকে কি ওরা ইচ্ছে করে দোলাচ্ছে? তাহলে ওদের খেলাটা এই, আমাকে কিছুতেই পার হতে দেবে না। মাঝ নদীতে ফেলে দেবে।

কিংবা এত লম্বা কাঠের সেতু, নীচে যদি কোনও সাপোর্ট না থাকে, তাহলে মাঝখানটা বেঁকে যেতে তো পারেই। এইখানটা চালু হয়ে গেছে, দুলছে। মানুষ নয়, এই কাঠের তক্তার দুর্বলতাই ফেলে দেবে আমাকে।

—নীলু, নীলু তুমিও তোমার শরীরটা দোলাও। নইলে ভারসাম্য রাখতে পারবে না।

—কে, গগনদা? আপনি কোথা থেকে এলেন?

—কথা বলার সময় নেই নীলু। নিজের শরীরটা দোলাও, তারই সঙ্গে একটু-একটু করে এগিয়ে এসো।

—আমি আর পারছি না, গগনদা। জল আমাকে টানছে। আর, গেলাম...

—না-না, তুমি পারবে, তোমাকে পারতেই হবে, নীলু। কাঠের তক্তার দুলুনির সঙ্গে শরীরটা দোলাও সেইসঙ্গে একটা পা বাড়িয়ে দাও, মনের জোর আন, শরীরে জোর আন, নীলু—তুমি ঠিক জয়ী হবে।

আঃ এসব কী হচ্ছে, অবচেতন! গগনদাকে কোথা থেকে এনে হাজির করলে? একইসঙ্গে শরীর দোলাব, পা বাড়াব, মনের জোর আনব, আমি কি ভেল্কিবাজি জানি? কলেজ জীবনে গগনদা আমাকে যত রাজ্যের ভুল জিনিস শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে গ্রামের ভাষায় কথা বলতে শেখ। বলেছিলেন, বিপ্লবের জন্য অস্ত্র তুল নাও। বলেছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম-ভালোবাসা বিসর্জন দাও। বলেছিলেন আদর্শের জন্য বন্ধুর বুকেও ছুরি মারবার জন্য তৈরি হও। সবগুলো এক সঙ্গে, আমার মাথা গুলিয়ে গিয়েছিল, আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলুম। যখন আমি চোখ মেললুম, তখন দেখলুম গগনদা নিজে এসব কিছু মানেননি, নিজে দিব্যি ফুরফুরে জীবন কাটাচ্ছেন। আমাকে চোখ মেলতে দেখেই তিনি বললেন, তুমি কে, আমি তোমাকে চিনি না।

বাবা, রিনি, গগনদার কথা অবচেতন থেকে উঠে আসছে কেন? এটা কি রূপক নাকি? অন্ধকার রাত্তিরে একটা খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর ওপরের বিপজ্জনক সাঁকো দিয়ে আমি একলা পার হচ্ছি, এটা কোনও প্রতীকের ব্যাপার। ক্ষুরস্য ধারা নিশিতয়া...ধারালো ক্ষুরের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার নামই জীবন, উপনিষদ-ফুপনিষদে এরকম কিছু গালভরা কথা আছে না? ষাঁড়ের পেচ্ছাপ। রূপক-টুপক কিছু না হলে বাঁচা যেত। ছ'খানা উৎকট আততায়ী জোর করে আমাকে ধরে নিয়ে এল, কেন আমার ওপর তাদের রাগ তা জানি না, আমাকে এক গুলিতে খতম না করে তারা আমাকে এই বীভৎস তামাসায় নামিয়ে দিয়েছে, সামান্য পদলন হলেই সোজা মৃত্যু, এটাই কঠোর বাস্তব। আমার জীবনে আজকের এই রাতটা শেষ হবে না বোধহয়।

—এই দুই-তিন-চার-পাঁচ...

—যাচ্ছিরে বাবা, যাচ্ছি। বাঁচতে কার না সাধ হয়? যে-কোনও উপায়ে, দাঁতে দাঁত কামড়ে সবাই বেঁচে থাকতে চায়। যাচ্ছি-যাচ্ছি।

—কাঠের তক্তার দুলুনিটা থেমে গেছে হঠাৎ। তাহলে সম্ভবত পেরিয়ে এসেছি মধ্যপথ। খুব গরম লাগছে। জামাটা খুলে ফেলতে পারলে ভালো হত। এই অন্ধকারে প্যান্টটা খুলে ফেললেই বা ক্ষতি কী ছিল, শরীরটা আরও হালকা হত। ওরা একটা ভালো কাজ করেছে, হয়তো ভুল করেই, আমাকে খালি পায়ে আসতে দিয়েছে। পায়ের আঙুলগুলো আমার বহুকাল আগের পূর্বপুরুষের মতন আঁকড়ে ধরেছে তলার অবলম্বনটা।

—নীলু তুই ভয় পাসনি, আমি সবসময় তোর সঙ্গে আছি।

—বাবা, তুমি আবার এসেছ? বাবা, তুমি যখন সঙ্গে থাকতে, তখনও কি আমি অনেক অচেনা রাস্তায় হারিয়ে যাইনি? আমি নিজেই তো শেষপর্যন্ত পথ খুঁজে পেয়েছি।

—নীলু সেইসব সময়েও বাবা-মায়ের স্নেহ ঘিরে থাকে সন্তানকে। সন্তানেরা বোঝে না, স্নেহ নিম্নগামী বলেই তারা বোঝে না, তারা বাবা-মায়ের কথা ভুলে গিয়ে নিজের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে থাকে...

ভাই অবচেতন, কেন বাবাকে ফিরিয়ে আনলে? এতে যে আমি আরও দুর্বল হয়ে পড়ব। বাবার মৃত্যুশয্যার পাশে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি, বাবার অনেক সঠিক নির্দেশ আমি মানিনি, বন্ধুবান্ধব সান্নিধ্যে, একটা অদ্ভুত ছটফটানির মধ্যে মত্ত হয়ে ছিলুম। কিন্তু এই কি সেইসব ব্যাপার নিয়ে অনুশোচনার সময়? যদি কারুকে আনতেই হয়, রিনিকে নিয়ে এসো। আর কিছু না হোক, রিনির কণ্ঠস্বরই আমাকে সঞ্জীবনী শক্তি এনে দেবে।

ওঃ হো আমার নিজেরই অবচেতন, অথচ আমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। চাইলুম রিনিকে, নিয়ে এল গগনদাকে। ওগো প্রিয় অবচেতন, তুমিও কি ওই ছ'জন অপরাধ কর্মীর মতন মজা মারছ আমাকে নিয়ে? নইলে এখন গগনদাকে নিয়ে আসার কী মানে হয়? গগনদার মতন মানুষেরা চিরকালই এইরকম বড়-বড় গালভরা বাণী দিয়ে যাবে। তা শুনে হয়তো দু-চারজন শেষ পর্যন্ত পৌঁছোবে মুক্তির দরজায়, আর বাকি যে কয়েকশো বা কয়েক হাজার টুপটাপ করে খসে পড়ে যাবে অতলে, তাদের হিসেব কে রাখবে? আমি ওই খসে পড়ার দলে। অথচ আমার বাঁচতে ইচ্ছে করে। সত্যি বলছি, মা কালীর দিব্যি, আমার ভীষণ বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। যারা নেমন্তন্ন বাড়ির বাইরে বসে এঁটো পাতা চাটে, আমি তাদের একজন হয়েও বেঁচে থাকতে চাই। আমি নদীতে আছড়ে পড়ে টুকরো-টুকরো হতে চাই না।

ডান পা, বাঁ-পা, ডান পা, বাঁ-পা, ডান পা, বাঁ-পা। আমার অবচেতন নেই। এখন সমস্ত মন শুধু আমার পায়ে। আমার চোখ বাঁধা, মুখ বাঁধা, আমার হাত বাঁধা। শুধু পা দুটো খোলা। এই পা নিয়েই আমাকে বাঁচতে হবে। আমি পিছিয়ে যেতে পারব না। আমি থেমে থাকতে পারব না। ওরা রাইফেল উঁচিয়ে টর্চ ফেলে কি এখনও দেখছে আমাকে? আর কত দূর, কত দূর, কত দূর, আমি কতক্ষণ ধরে হাঁটছি!

কাছেই যেন গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সত্যি-সত্যি মানুষের গলা, অবচেতন নয়, পিওর অ্যান্ড সিম্পল বাস্তব। আমি কি তাহলে পৌঁছে গেছি, বেঁচে গেছি। ব্রিজের এপারেও মানুষ আছে, তারা কথা বলছে। ভাগ্যিস ওরা আমার কানও বেঁধে দেয়নি। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।

একজন বলল, বাক আপ! বাক আপ! এসে গেছে! এসে গেছে! আর কয়েক পা!

আর-একজন বলল, মাই গড, সত্যি হারামজাটা পৌঁছে গেল?

আরও একজন বলল, ওনাট ইজ টু ফোর। আমি বলেছিলুম না, প্রাণের টান বড় টান। এ শালা ঠিক পার হয়ে যাবে। আমার বাজির টাকা দিতে হবে কিন্তু।

আমি থমকে গেলুম। কণ্ঠস্বরগুলো আমার চেনা। এরাই ওপারে ছিল, এরাই আমাকে জোর করে ধরে এনেছে।

কাছাকাছি আর কোনও সুবিধেজনক, নিরাপদ, সংক্ষিপ্ত সেতু আছে নিশ্চয়ই, তা দিয়ে ওরা পেরিয়ে এসেছে। সেইসব সেতুর সন্ধান, এমনকী এই অন্ধকার রাত্তিরেও ওরাই শুধু জেনে যায়। ওরা সবকিছু সহজে পায়।

ওদের একজন বলল, থামলি কেন রে। এবার জোর কদমে চলে আয়, আর কোনও ভয় নেই।

অন্য একজন বলল, এই লোকটা যে কামাল করবে, ভাবতেই পারিনি। একে একটা কিছু পুরস্কার-টুরস্কার দেওয়া উচিত।

আর-একজন বলল, নিশ্চয়ই, আমরা স্পোর্টসম্যান স্পিরিট দেখাতে জানি। ও এপাশের মাটিতে পা দিলেই ওকে উইনার বলে ডিক্লেয়ার করব। ওরে, তুই কী চাস, দেড় বিঘে জমির ওপর বাড়ি, ফরেন ট্রিপ, ওষুধের এজেন্সি, রাস্তা তৈরির কন্ট্রাকটরি—কী চাস বল?

আমার পা দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। ছেলেবেলায় একটা কথা শুনেছিলুম, খেজুর গাছের তিন হাত। সাধারণ লোকের পক্ষে খেজুর গাছ বেয়ে ওঠাই শক্ত, সবচেয়ে শক্ত শেষ তিন হাত ওঠা। তীরে এসে যেমন তরী ডোবে। আমি আর এগুতে পারছি না। না, আর-এক পা-ও বাড়ানো যাবে না।

আমার অবচেতন বলল, যাঃ, এ কী করছ মাইরি। এখানে সাঁকোর তলায় জল নেই, মাটি, তুমি এখন এক দৌড়ে পার হয়ে যেতে পারো।

আমি হেসে পেছন ফিরলুম।

ওপারে পৌঁছলেই লোকগুলো আমাকে কিছু পুরস্কার দেবে বলছে। এটা ওদের খেলা। সবাই বাঁচতে চায়, অমিও বাঁচতে চাই। কিন্তু বেঁচে থাকার মধ্যে একটা আত্মগরিমা থাকবে না? তা না হলে শুধু পোকামাকড়ের মতন...। শুধু একটা বাস্তব জীবন? কেউ সামনে একটা গাজরের টুকরো ঝুলিয়ে রাখবে, তাই দেখে ছুটে যাওয়া? আমাদের ওদের নিয়মে খেলতে হবে!

আমি উলটো দিকে ফিরে পা বাড়াতেই এপারের লোকজন হইহই করে বলে উঠল আরে-আরে লোকটা পাগল হয়ে গেছে নাকি? ওরে গাধা, কোন দিকে যাচ্ছিস? এদিকে আয়, দৌড়ে আয়, তুই বেঁচে গেছিস...

আমার মুখ বন্ধ, তবু আমি বললুম, এবার শুরু হবে আমার নিজস্ব খেলা।

ছবির দেশে কবিতার দেশে (পর্ব ০২) - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়




''কুসুমের মাস রূপান্তরের মাস

মে মেঘহীন জুনের পৃষ্ঠে ছুরি

ভুলবো না আমি লিলির গুচ্ছ গোলাপের নিঃশ্বাস

বসন্তে আরও লুকানো যে মঞ্জরী...''

—লুই আরাগঁ

আমি যখন প্রথম বিদেশে যাই, তখনও জাহাজের যুগ পুরোপুরি শেষ হয়নি, বিমানের যুগ শুরু হয়ে গেছে। আগেকার দিনে আমরা কত ভ্রমণকাহিনিতে জাহাজযাত্রার বর্ণনা পড়েছি। সমুদ্রপৃষ্ঠে তৈরি হয়েছে কত রোমান্স, গল্প-উপন্যাস। স্বদেশ ছেড়ে বিদেশযাত্রার সময় জাহাজের আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও অন্যান্যদের সঙ্গে বেশ কয়েক দিনের মেলামেশায় মনকে অনেকটা প্রস্তুত করে তোলে, হঠাৎ একটা কালচার শক হয় না। সেই তুলনায় বিমানভ্রমণের কয়েকটি ঘণ্টা নিতান্তই বর্ণহীন।

সেই সময় আমার পরিচিত নামকরা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই, যেমন অমর্ত্য সেন, নবনীতা দেবসেন, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত প্রমুখ, সমুদ্রপথেই প্রবাসে গিয়েছিলেন। আমারও বাল্যকাল থেকেই জাহাজভ্রমণের স্বপ্ন ছিল। বাচ্চা বয়েসে যখনই কেউ আমাকে জিগ্যেস করত, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও, আমি বিনা দ্বিধায় উত্তর দিতাম, নাবিক! অথচ প্রাপ্ত বয়েসে আমাকে প্রথম সমুদ্র ডিঙোতে হল, হনুমানের মতন, আকাশপথে।

ছবির দেশে কবিতার দেশে (পর্ব ০১) - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছবির দেশে কবিতার দেশে - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছবির দেশে কবিতার দেশে

ভ্র ম ণ কা হি নী

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়




''আমি খুলে ফেলি পোশাক ও টুপি সেই মুহূর্তে

বালির ওপর উলঙ্গ দেহে চিৎ হয়ে শুই

বন্য রৌদ্রে শরীর পুড়িয়ে প্রতীক্ষা করি, বেরুবে কখন

আমাদের এই চামড়ার নীচে লুকিয়ে যে আছে, সেই ভারতীয়।''

—জাঁ ককতো

আমি দেশের বাইরে গিয়ে জীবনে প্রথম যে-বিদেশের মাটিতে পা রাখি, সেটা ফরাসিদেশ। সে অনেককাল আগেকার কথা।

আমার তখন অল্প বয়েস, বেশ গড়া-পেটা শরীর স্বাস্থ্য, ঝুঁকিবহুল জীবন কাটাতে ভালোবাসি। হঠাৎ হঠাৎ বন্ধুদের সঙ্গে বনে-পাহাড়ে চলে যাই, কিংবা সিমলা-হায়দ্রাবাদের মতন বড় শহর দর্শন করতে গিয়ে পয়সার অভাবে এক-আধদিন না খেয়ে কাটিয়ে দিই। কিংবা মধ্যরাত্রে কলকাতা শহরে অকারণে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে মারামারি বাঁধিয়ে পুলিশের গুঁতো খাই, গারদে চোর-পকেটমারদের সঙ্গে রাত কাটাই। তবু কিছুই গায়ে লাগে না, সবই যেন মজা। স্বেচ্ছাচারী জীবনযাপনের মধ্যে জীবনকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখার চেষ্টা।

কিন্তু আমার বিদেশ যাওয়ার, বিশেষত সাহেবদের দেশে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। সে বড় দামি, দুর্লভ ব্যাপার।

যদিও অল্প বয়স থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল বিশ্ব ভ্রমণের। বলা যেতে পারে, কাটা মুণ্ডের দিবাস্বপ্ন। কিংবা অন্ধের অভ্র-পুষ্প চয়ন। আমি পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু ও অতি গরিব পরিবারের সন্তান, কলেজ জীবনের শুরু থেকেই একাধিক টিউশনি ও নানারকম খুচখাচ পার্ট টাইম কাজ করে পড়াশুনো চালিয়েছি, তাই পড়াশুনোয় খুব মন দিতে পারিনি। তেমন একটা মেধাবী ছাত্রও ছিলাম না। তা ছাড়া সেই সময় থেকেই মাথায় কবিতা লেখার পোকা ঢোকে, লিটল ম্যাগাজিন বার করা ও কলেজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে আড্ডা মারাটাই পরমার্থের মতন মনে হত। খুব ভালো ছাত্র ছাড়া অন্য কারুর সে সময়ে বিদেশে যাওয়া দুঃসাধ্য ছিল। ধনী ব্যক্তিরা যে নিজ ব্যয়ে বিদেশ ভ্রমণে যেতেন আগে, তাও পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে ফরেন এক্সচেঞ্জ কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য ভারত সরকার বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

মনসা মথুরা ব্রজ। বিভিন্ন লেখকের ভ্রমণ কাহিনি পড়ে এবং গ্লোব ও ম্যাপ সামনে রেখে আমি পৃথিবী পরিক্রমা করেছি বহু অলস দুপুরে। ম্যাপ দেখা ছিল আমার প্রিয় নেশা। স্নানের সময় বাথরুমের নিভৃতিতে কখনও আমি স্পেনের জলদস্যু, কখনও আলাস্কার অভিযাত্রী। কাল্পনিক তলোয়ার এতবার চালিয়েছি যে আমার ধারণা হয়েছিল আমি ডগলাস ফেয়ার ব্যাঙ্কসের সঙ্গে লড়ে যেতে পারব।

যাই হোক, দারিদ্র্য, বাউণ্ডুলেপনা ও কবিতা নিয়ে হইহই করে দিন-টিন বেশ ভালোই কাটছিল, এমন সময় অকস্মাৎ আমার জীবনে একটা পরিবর্তন এসে গেল।

উপন্যাস | অন্দরমহল | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

উপন্যাস
অন্দরমহল
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


শৈবালের ফিরতে রোজই বেশি রাত হয়। অফিস থেকে সোজাসুজি বাড়ি ফেরার ধাত নেই। বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি কিংবা দু-একটা ক্লাব ঘুরে আসে। যেদিন তাসের আড্ডায় জমে যায়, সেদিন এগারোটা বেজে যায়।

এজন্য তার প্রত্যেক দিনেরই একটা বকুনির কোটা আছে। প্রমিতা তার জন্য জেগে বসে থাকে। ঝি-চাকরদের বেশি খাটাবার পক্ষপাতী নয় প্রমিতা। রান্নার লোকটিকে সে রোজ রাত দশটার সময় ছুটি দিয়ে দেয়। শৈবাল তারও পরে ফিরলে প্রমিতা নিজেই তার খাবার গরম করে দেবে, পরিবেশন করবে আর সেইসঙ্গে চলতে থাকবে বকুনি।

শৈবাল তখন দুষ্টু ছেলের মতন মুখ করে শোনে।

প্রত্যেক দিনই সে প্রতিজ্ঞা করে যে, কাল আর কিছুতেই দেরি হবে না। এক-একদিন মেজাজ খারাপ থাকলে সে অবশ্য উলটে কিছু কড়াকথা শুনিয়ে দেয় প্রমিতাকে। সাধারণত তাসে হারলেই তার এ-রকম মেজাজ খারাপ হয়।

ওদের দু-টি ছেলে-মেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে দশটার মধ্যে। সুতরাং, বাবা-মায়ের ঝগড়া তাদের শুনতে হয় না। শৈবাল প্রমিতাও প্রাণ খুলে চোখাচোখা বাক্য বিনিময় করে যেতে পারে।

সেদিন রাত্রে শৈবাল খাবার টেবিলে বসে মাছের ঝোল পর্যন্ত পৌঁচেছে, ঝগড়াও বেশ জমে উঠেছে, এইসময় সে দেখল, সতেরো-আঠেরো বছরের একটি সম্পূর্ণ অচেনা মেয়ে তাদের রান্নাঘরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে, লাজুক ভঙ্গিতে মুখ নীচু করে হেঁটে বারান্দার দিকে চলে গেল।

বিস্ময়ে ভুরু উঁচু হয়ে গেল শৈবালের।

ছদ্মবেশী রাজকুমার - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


কলকাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উন্মাতাল দিনরাত্রির সঙ্গী ছিলেন বেলাল চৌধুরী। দুজনের মধ্যে ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। আত্মজীবনী অর্ধেক জীবনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন সুনীল। এ লেখায় পাওয়া যাবে সুনীলের চোখে বেলালের অবয়ব।

বন্ধুদের দলে সাবলীলভাবে মিশে থাকা সম্পূর্ণ অচেনা একজনকে দেখলাম, তার নাম বেলাল চৌধুরী। সম্পূর্ণ মেদহীন সুগঠিত শরীর, ফরসা রং, নিষ্পাপ, সুকুমার মুখখানিতে ঈষৎ মঙ্গোলীয় ছাপ। এই নিরীহ যুবকটি সম্পর্কে অনেক রোমহর্ষক কাহিনি (হয়তো পুরোটা সত্যি নয়, সব রোমহর্ষক কাহিনিই তো সত্যি-মিথ্যে-গুজব মিশ্রিত হয়ে থাকে) শোনা গেল। তার বাড়ি পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানে, পেশা কুমির ধরা। একটা কুমির-শিকারি জাহাজে অনেক সাগর-উপসাগর পাড়ি দিতে দিতে সে হঠাৎ খিদিরপুরে এসে জাহাজ থেকে নেমে পড়েছে এবং পাসপোর্টটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে মিশে গেছে কলকাতার জনারণ্যে। এবং সে একজন কবি, তাই জল যেমন জলকে টানে, সেইভাবে সে যুক্ত হয়ে গেছে কফি হাউসের কবির দঙ্গলে। পাকিস্তানের সঙ্গে তখন ভারতের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে দিনকে দিন, কয়েক মাস পরেই শুরু হবে একটি বালখিল্যসুলভ যুদ্ধ, সে রকম আবহাওয়ায় পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও সহায়সম্বলহীন অবস্থায় কলকাতায় বিচরণ করার জন্য প্রচণ্ড মনের জোর ও সাহসের দরকার। অবশ্য বেলালের একটা দারুণ সম্পদ ছিল, সেটা তার মুখের হাসি এবং সহজ আন্তরিকতায় মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা। পরে অনেকবার দেখেছি, যেকোনো বাড়িতে গেলে সে পরিবারের বাচ্চা ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বুড়ো-বুড়িরা পর্যন্ত কিছুক্ষণের মধ্যেই বেলালকে ভালোবেসে ফেলে। এর মধ্যে সে কমলদারও খুব চেলা হয়ে গেছে, দুজন অসমবয়সী মানুষের এমন গাঢ় বন্ধুত্বও দুর্লভ।

ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ - পর্ব ০২ (শেষ) - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়



ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ - পর্ব ০২ (শেষ) - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়



ঠিক সাড়ে সাত বছর পর আমি আবার পা দিলাম মস্কো শহরে। এর মধ্যে কী চমকপ্রদ পালাবদল ঘটে গেছে এই পৃথিবীতে! ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এক মহা শক্তিশালী বিশাল সাম্রাজ্য। বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে এমন এক সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার মতন ঘটনা মানুষের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি।

সাড়ে সাত বছর আগে এরকম পট পরিবর্তনের সামান্যতম সম্ভাবনাও ছিল না কারুর সুদূর কল্পনায়। মস্কো তখন সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার রাজধানী। অন্যান্য অনেক দরিদ্র দেশের বহু মানুষ, যারা সমাজ ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চায়, তারা প্রেরণার জন্য তাকিয়ে থাকে মস্কোর দিকে। আমেরিকা পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা নিয়ে যেতে চাইছে মহাকাশে, সেখান থেকে পেশি আস্ফালন করবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আমেরিকা এক হাতে দান-খয়রাত করে, অন্য হাতটা যে-কোনও সময় থাপ্পড় মারার জন্য উদ্যত রাখে। মাও-এর পরবর্তী চিন অবশ্য ততদিনে আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলেছে। মার্কিন দেশের বড়-বড় ব্যবসায়ীরা ভারতের প্রতি নাক কুঁচকে চিনে গিয়ে কারখানা স্থাপনের উপযুক্ত স্থান খুঁজছে। চিনের বড়-বড় হোটেলের পরিচারকরা পর্যন্ত থ্যাংক ইউ-এর বদলে ইউ আর ওয়েলকাম বলতে শিখে গেছে।

আমেরিকান ইগলকে তখন বাধা দিতে পারে শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল পতাকা। ওয়াশিংটন থেকে কোনও হুঙ্কার উঠলে মস্কো থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি যায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নতুন এক শব্দ তৈরি হয়েছে, কোলড ওয়র, ঠান্ডা যুদ্ধ। এক অদৃশ্য দাঁড়িপাল্লায় দু-দিকেই দু-পক্ষ নিযুত অর্বুদ টাকা দামের অস্ত্র বাড়িয়ে চলেছে। ঠান্ডা যুদ্ধ যে-কোনও সময়ে পরিণত হতে পারে সর্ব-বিধ্বংসী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে। সেরকম কোনও যুদ্ধ শুরু হলে আমি এবং আমার মতন অজস্র মানুষ নিশ্চয়ই সোভিয়েত পক্ষকেই সমর্থন করত। কারণ তখন পর্যন্ত আমাদের মনে হত, আমেরিকা নামের দেশটা চালায় বড়-বড় ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রিত এক স্বার্থপর সরকার আর সোভিয়েত ইউনিয়ান তথা সমাজতান্ত্রিক জোট এক বৃহৎ আদর্শের প্রতিভু। ধনতান্ত্রিক দেশগুলি অস্ত্র বিক্রেতা, তাই তারা যুদ্ধের উস্কানিদাতা, আর সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া শান্তিবাদী।

ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ - পর্ব ০১ - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ - পর্ব ০১



বার্লিনের ভাঙা দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আমার বারবার একটাই প্রশ্ন মনে হচ্ছিল, এত কষ্ট করে যে দেওয়াল ভাঙা হচ্ছে, সেই কঠিন, হিংস্র দেওয়াল আদৌ কেন গাঁথা হয়েছিল? লোহা ও কংক্রিট মিশিয়ে এমনই সুদৃঢ়ভাবে গড়া হয়েছিল এই প্রাচীর, যেন তা শত-শত বৎসর দুর্ভেদ্য হয়ে থাকবে। সেই দেওয়ালের অদূরে পরপর গম্বুজ, তার ওপরে চব্বিশ ঘণ্টা মারাত্মক অস্ত্র হাতে প্রহরীরা। দুই দেশের সীমান্তের দেওয়াল নয়, একটা শহরের মাঝখান দিয়ে মাইলের পর মাইল দেওয়াল, যার দু-দিকে একই জাতির মানুষ, এক ভাষা, এক খাদ্যরুচি, এক রকম পরিচ্ছদ, একই শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী, তবু দেওয়াল গেঁথে তাদের পৃথক রাখার চেষ্টা। যারা দেওয়াল গেঁথেছিল, তারা কি জানত না, কঠোর নিষেধ মানুষ বেশি করে ভাঙতে চায়, যে-কোনও বাধা উল্লঙ্ঘন করার প্রবৃত্তি মানুষের জন্মগত।

দেওয়াল দিয়ে ভাগ করা হল দুই জার্মানিকে। একদিকে সমাজতন্ত্র, অন্যদিকে ধনতন্ত্র। সমাজতন্ত্রী নেতাদের কাছে ধনতন্ত্র অতি কুৎসিত, দুর্গন্ধময়। নিছক ভোগ্যপণ্যের আড়ম্বর দেখিয়ে চোখ ধাঁধানো। ইতিহাসের ভবিষ্যৎ গতি সমাজতন্ত্রের দিকে, মানুষের সুখ, স্বপ্ন, শান্তি সেই ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। বেশ তো, মানুষকে তা বোঝালে মানুষ নিজের ভালো নিশ্চয়ই বুঝবে। কিন্তু কেউ যদি না বুঝতে চায়, তা হলে কি তার ঘাড় ধরে, হাত-পায়ে শিকল বেঁধে কিংবা বুকের সামনে বন্দুক উঁচিয়ে বোঝাতে হবে? কেউ যদি পূর্ব ছেড়ে পশ্চিমে যেতে চায়, তাকে গুলি মেরে ঝাঁঝরা করে দিতে হবে? নিজের বাসস্থান নির্বাচনের স্বাধীনতাও মানুষের থাকবে না।

সুনীলের গল্প । পর্ব ০২ । প্রবাসী


প্রবাসী

ট্যাক্সিতে হেলান দিয়ে বসে সুরঞ্জন একটা বই পড়ছিল বইটা এতই আকর্ষণীয় যে সারাদিন সে সেটাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে, একটু সময় পেলেই পড়ে নিচ্ছে কয়েক পাতা এবং পড়তে শুরু করলেই গভীর মনোযোগ এসে যায়
এখনও সে বেশ মনোযোগ দিয়েই পড়ছিল, তবু যে কেন হঠাৎ চোখ তুলে জানলার বাইরে তাকাল—সে নিজেই জানে না সম্ভবত পুলিশের হাতের সামনে ট্যাক্সিটা অনেকক্ষণ থেমে থাকায় একটু অস্বস্তি বোধ করছিল, কিংবা এমনিই মানুষের চোখ মাঝে-মাঝে রাস্তার দিকে যায়
কাছেই বাস-স্টপে যে মেয়েটি পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে মনে হয় টুলটুলের সঙ্গে বেশ মিল আছে, সেই রকমই লম্বা, মুখের পাশটাও একরকম
এমনসময় পুলিশের হাত নামল, ট্যাক্সিটা এগিয়ে গেল সামনের দিকে
সুরঞ্জন যে-বইটা পড়ছিল, সেটার কথা মাথার মধ্যে ঘুরছে, টুলটুলের মতন চেহারার মেয়েটিকে দেখে টুলটুলের কথাও মনে পড়ল—এই দুরকম ব্যাপার একসঙ্গে জট পাকিয়ে যাওয়ায় তার চিন্তা স্বচ্ছ হতে একটু দেরি লাগল

প্রতিদ্বন্দ্বী - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রতিদ্বন্দ্বী
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়



সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরোতে যাচ্ছিল, এমন সময় দেখল ওদের বাড়ির সামনে একটা মোটরগাড়ি থেমে আছে। সামনে ড্রাইভার, পেছনের সিটে এক ভদ্রমহিলা। ড্রাইভার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে—এ গলির শেষ বাড়ি সিদ্ধার্থদের। ওকে জিজ্ঞেস করল, পঁচিশের এক? পঁচিশের এক, কালীপ্রসাদ চৌধুরি, কোন বাড়িটা?

সিদ্ধার্থ একটু ভুরু কুঁচকে বলল, এই বাড়ি—

ড্রাইভার নেমে পেছনের দরজা খুলে দিল। ভদ্রমহিলা নামলেন। চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মাঝামাঝি কোথাও বয়স, ফর্সা মুখে সোনার চশমা, বেশ ব্যক্তিত্বময়ী। স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে তিনি বললেন, আমি কালীপ্রসাদ চৌধুরির সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। তিনি বাড়ি আছেন?

ছোটোকাকার সঙ্গে এরকম কোনো মহিলা আগে কোনোদিন দেখা করতে আসেনি। সিদ্ধার্থ কিছুটা অবাক হয়। দরজা খুলে দিয়ে বলে, আসুন, ভেতরে আসুন।

দরজার পরেই বারান্দা, বারান্দার একপাশে টেবিল ও কয়েকটা চেয়ার পাতা, বাইরের কেউ এলে এখানেই বসতে হয়। চেয়ারের ওপর থেকে দোমড়ানো খবরের কাগজ সরিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, আপনি একটু বসুন, আমি ওঁকে ডেকে দিচ্ছি।

সেই মুহূর্তে ছোটোকাকার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না সিদ্ধার্থর। ভেতরে ঢুকে ডাকল, টুনু! টুনু!

রাশিয়া ভ্রমণ - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

রাশিয়া ভ্রমণ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মস্কো বিমানবন্দরে পা দিলুম খুব ভোরবেলায়। সারা রাত প্রায় জেগেই কাটাতে হয়েছে। কলকাতা থেকে এরোফ্লোট বিমানে চেপেছিলুম বিকেলবেলা, তারপর বোম্বে, করাচি আর তাসকেন্টে বিমানটি মাটি ছুঁয়েছিল, আমাদেরও নামতে হয়েছিল দুবার। তার মধ্যে শেষ রাতে তাসকেন্টে নেমে আমি ঝোলা থেকে একটা সোয়েটার বার করে পরে নিয়েছিলুম। রাশিয়ার ঠান্ডা সম্পর্কে অনেকেই ভয় দেখিয়েছিল আগে থেকে, কিন্তু আমি খুব একটা শীত-কাতুরে নই, তা ছাড়া কিছুদিন আগেই ডিসেম্বর-জানুয়ারির ক্যানাডার তুষারের রাজ্য ঘুরে এসেছি, সুতরাং মে মাসের রাশিয়াকে ডরাব কেন? অবশ্য সঙ্গে একটা পাতলা ওভারকোটও এনেছি।

বিমানে রাত্তিরটা বেশ গল্প-গুজবেই কেটে গেছে। সহযাত্রী পেয়েছিলুম দুই বাঙালি তরুণকে। একজনের নাম সুবোধ রায়, সে মস্কোতে আছে প্রায় সাত-আট বছর, উচ্চশিক্ষার্থে। কিছুদিনের জন্য কলকাতায় ছুটি কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছে আবার। সুবোধ খুব দিলদরিয়া ধরনের, উচ্ছ্বাসপ্রবণ এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। অন্যজনের নাম অসিতবরণ দে, সে প্রায় চোদ্দো বছর বাদে চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে কলকাতা-দর্শনে এসেছিল। সে একটু চাপা ও লাজুক স্বভাবের। আমরা তিনজনে মিলে মস্কো-প্রাহা-কলকাতার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছিলুম। সন্ধে থেকে মাঝেমধ্যেই আমাদের খাদ্য-পানীয় পরিবেশন করা হচ্ছিল, বিমানযাত্রার একঘেয়েমি কাটাবার জন্যই বোধহয় ওরা অত ঘন ঘন খাবার দেয়, কিন্তু অত কি খাওয়া যায়? শেষবারের খাবার আমি প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছিলুম।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট