Showing posts with label কাজী নজরুল ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label কাজী নজরুল ইসলাম. Show all posts

নজরুলের কবিতা - জীবনানন্দ দাশ

নজরুলের কবিতা
জীবনানন্দ দাশ

মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়।
নজরুল ইসলাম অনেক দিন থেকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর দৈহিক ওজন আমাদেব জানা আছে, আত্মিক, ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।

জনগণ, ভদ্র সাধারণ এখনও মরে বেঁচে আছে, আসছে সার্বিক নিপাট মৃত্যু এদের জন্যে এবং তার ভিতর থেকেই আরো এবার বেঁচে ওঠবার অধ্যায় - জীবনকে নতুন করে প্রতিপালন করবার প্রয়োজনে।

কিন্তু আমাদের সামাজিক জীবনে এই মৃত্যু ও জীবন যে যার কাছে দুরতিক্রম্য নয়। যতদূর ধারণা করতে পারি, এই মানুষের পৃথিবীতে অনেকদিন থেকে এইরকমই চলেছে, একটা সময় - বৈশিষ্ট্য ক্ষয়িত হয়ে নতুন সাময়িকতাকে নিয়ে আসে। এতে সমাজ কাজে উন্নত না হোক (বা হোক), মূল্যচেতনায় স্থিরতর হবার অবকাশ পায় বলেই তো মনে হয়। প্রবীণ বিরস মনীষীরা যাই ভাবুন না কেন, সাধারণের মানব-মন মনে করে যে ভোর আসছে। একেই কখনো বুদ্ধের, ধর্মাশোকের বা ফরাসী বিপ্লবোত্তর মানবীয় প্রাতঃকাল বলে মনে হয়েছে। সে সব প্রাতঃকাল উন্মেষেই মিলিয়ে গিয়েছে বার বার। ইতিহাসে দীর্ঘ সুদিন কোথায় পেলাম আমরা - এবং সুদীর্ঘ সুরাত্রি? কিন্তু তবুও আবারও ভোর আসছে।

এর থেকে নিরাশার মতামতে উপস্থিত হওয়া যায়, কিংবা জীববিজ্ঞানীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে এই মর্মে উপস্থিত হওয়া যায় যে মানুষ এখনও শিশু – তার সভ্যতার অন্তিমক্ষণ এত দূরে যে আমাদের পক্ষে তা নেই, আমরা এসেছি কেবলমাত্র ভূমিকার ভাঙা গড়ার ভিতর।

আমরাও তাই ভাবি। একটা যুগ ভেঙে যাচ্ছে দেখে আমাদের কারো কারো সাহিত্য স্বভাব ভাঙনের লিপিরচনায় উদ্বেলিত হয়েও যা আজও পাওয়া যায়নি, এমন কোনো নতুন সময়ে আভাসে প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু স্থিরতা পায় কি, অর্থসফলতা লাভ করে ? ফলে আমাদের আগামী যুগের কবিতা হয় অত্যন্ত স্থূল হয়ে দাঁড়ায়, যে সব নিয়মের প্রভাবে আগামীকাল ক্রমে ক্রমে এসে পড়ছে তাদের ভিতর থেকে কয়েকটি প্রতীক বা প্রবর্তয়িতার মত চালিয়ে দিয়ে আমাদের কবিতা কি নবীন হয়ে ওঠে কিংবা কবিতা হয়? আর তা নয় তো, বস্তুশক্তির দুরন্ত ক্রিয়াকৌশলের পরিহাসের দিকে লক্ষ্য রেখেও একান্তভাবে ভাবনানিষ্ঠ হতে গিয়ে আধুনিক ও আগামীকালের কবিতা কারো কারো হাতে এত বেশী তনু সূক্ষ্ম হয়ে দাঁড়ায় যে আজকের কর্তব্যাসক্ত মানসের বিচারে সে কবিতার শব্দ, ভাষা, ইঙ্গিত সমস্তই অসঙ্গত, আচ্ছন্ন বলে মনে হয়। এখনকার বাংলা কবিতায় এই দুটি স্বভাবই লক্ষিত হয়। প্রথমটি নিশান হাতে নিয়ে অগ্রসর হয়েছে নিজের বা অপরের মুখে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত দিব্য দিনের কিছু না কিছু স্বাদ পেয়েছে বলে। কিন্তু এই দুই প্রকৃতির মিশ্রণে ভালো কবিতা পেয়েছি --- নিতান্ত কম নয়।

এ কালের বাংলা কবিতার এই সব অভিব্যক্তির আগে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন। (তখন তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হত)। আমাদের দেশে যে বিশেষ সময়রূপ অনেক দিন থেকে কাজ করে যাচ্ছিল, তেরোশো পঁচিশ আটাশ তিরিশে এক দিক থেকে যেমন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছিল অন্যদিকে কয়েকটি ইতিহাসোত্থিত কারণে এবং অঙ্গাঙ্গী নতুন সময় পর্ব তাকে উদ্বুদ্ধ করছিল বলে তা একটা আশ্চর্য রক্তচ্ছটা রঞ্জিত হয়ে উঠেছিল। যাকে মৃত্যুর বা অরুণের জীবনেরও বলে মনে করতে পারা যেত। নজরুলের অনেক কবিতাই সেই সময় লেখা হয়। মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়। জনগণ তখন আজকের মত ঈষৎ উন্নীত নয় কিংবা রূপান্তরিত? - ছিল না, চমৎকার কবিতা চাচ্ছিল, (আজো জনমানস রকম ফেরে, তাই ই চায় যদিও), নজরুল সেই মন স্পর্শ করতে পেরেছিলেন এমনভাবে যে আজকের কারো কোনো জনসাধারনের জন্য তৈরি কবিতা বা গদ্য কবিতা ফলত পদ্যের স্তরে নেমে ও তা পেয়েছে কিনা বলা কঠিন। তখনকার দিনে বাংলা লোকোত্তর পুরুষ কম ছিলেন না। -- শ্মশানের পথে সন্তানোৎসব জমেছিল বেশ খানিকটা উদ্যোক্তা। নজরুল ইসলামের আগ্রহ পুষ্ট হয়েছিল, তিনি অনেক সফল কবিতা উৎসারিত করতে পেরেছিলেন। কোনো কোনো কবিতায় এত বেশি সফলতা যে কঠিন সমালোচকও বলতে পারেন যে নজরুলী সাধনা এইখানে --- এইখানে সার্থক হয়েছে - কিন্তু তবুও মহৎ মান এড়িয়ে গিয়েছে। কোনো এক যুগে মহৎ কবিতা বেশি লেখা হয় না। কিন্তু যে বিশেষ সময় ধর্ম, ব্যক্তিক আগ্রহ ও একান্ততার জন্যে নজরুলের অনেক কবিতা সফল ও কোনো কোনো কবিতা সার্থক হযেছিল -- জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতার মূল্য ও মাত্রা চেতনায় খানিকটা সুস্থির হয়েও আজকের দিনের অনেক কবিতাই যে সে তুলনায় ব্যাহত হয়ে যাচ্ছে তা শুধু আধুনিক বিমুখ সময়রূপের জন্যেই নয় -- আমাদেব হৃদয়ও আমাদের দিরূপাচার করে, অনেক সময়ই আমাদের মনও আমাদের নিজেদের নয়, এই সাময়িকতার নিয়মই হয়ত তাই।

কিন্তু নজরুলের ব্যক্তিকতা ও সময় এই বুদ্ধি সর্বস্বতার হাত থেকে তাঁকে নিস্তার দিয়েছিল। আধুনিক অনেক কবিতা থেকে তাঁর কোনো কোনো কবিতার অঙ্গীকার তাই বেশী, ধ্বনিময়তাও উৎকর্ণ না করে এমন নয়। কিন্তু নিজেকে বিশোধিত করে নেবার প্রতিভা এই এ সব কবিতা বিধানে, শেষ রক্ষার কোনো সন্ধান নেই।

পরার্থপরতার চেয়ে স্বার্থসন্ধান ঢের হেয় জিনিষ, স্বার্থসাধন কিছুই নয়, কিন্তু কবি মানসের আত্মোপকার প্রতিভাই তাকে নির্মাতার ওপরের ভূমিকায় ওঠাতে সাহায্য করে, কবিতাকে তার অন্তিম সঙ্গতির পথে নিয়ে যায়। এরই স্বভাবে সৃষ্ট কবিতা যতদূর ব্যাপ্ত ও গভীর হয়ে উঠতে পারে নজরুল ইসলামের প্রথম ও শেষ কবিতা এরই অভাবে একই সূচনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ততদূর স্থান হারিয়ে ফেলছে।

প্রমীলার প্রতীক্ষা - গােলাম মুরশিদ


প্রমীলার প্রতীক্ষা
গােলাম মুরশিদ


পােশাকী নাম আশালতা সেনগুপ্ত। ডাকনাম দোলেনা/দোলন। বড়ােরা আরও সংক্ষেপ করে ডাকেন দুলি। কিন্তু বাঙালি সমাজে তাঁর প্রধান—ভুল বললাম—তাঁর একমাত্র পরিচয় তিনি নজরুল ইসলামের স্ত্রী-প্রমীলা। নিশ্চয় হাসতে জানতেন তিনি, হাসতেনও; কিন্তু তাঁর যে-কটি ছবি দেখা যায়, তার কোনােটিতে তার মুখে হাসি তাে দূরের কথা, হাসির রেখাটি পর্যন্ত দেখা যায় না। ছবি তােলার মুহূর্তে অনেকে আড়ষ্ট হয়ে যান। হয়তাে তিনিও তাই হতেন। তবে তাঁর ছবির সঙ্গে তাঁর জীবনেরও একটা আশ্চর্য মিল রয়েছে। ছবির বিষন্ন প্রমীলা, বাস্তব জীবনেরও আমৃত্যু দুখিনী।

তিনি তাঁর পিতার দ্বিতীয় স্ত্রীর একমাত্র সন্তান। তাঁর কোনাে সৎ ভাইবােন ছিলাে কিনা, জানা যায় না। কিন্তু তার মায়ের তিনি ছিলেন একমাত্র সন্তান। তাঁর পিতাকে তিনি হারান তাঁর বাল্যকালে। কাকার সংসারে আশ্রয় পেয়ে সেই সংসারেই বড়াে হচ্ছিলেন। লেখাপড়ায় ভালাে ছিলেন। বড়াে হয়ে কয়েকটা কবিতা লিখেছিলেন এবং সেগুলাে প্রকাশিত হয়েছিলাে। তা ছাড়া, কুমিল্লায় যখন রাজনৈতিক মিছিল বেরিয়েছে, তখন কিশােরী দুলি তাতেও অংশ নিয়েছেন বলে জানা যায়। গান জানতেন, গান গাইতেন। তবে সর্বজন-সমক্ষে গাইতেন কিনা, তার প্রমাণ মেলে না।

নজরুলের জীবন যেখানে চাঁছাছোলা - পবিত্র সরকার

নজরুলের জীবন যেখানে চাঁছাছোলা

পবিত্র সরকার




চিন্তক, গবেষক, জীবনীকার গোলাম মুরশিদ উভয় বাংলাতেই সুপরিচিত, সম্মানিত। তিরিশটি মূল্যবান গ্রন্থের প্রণেতা। মাইকেল মধুসূদনকে নিয়ে তাঁর ‘‌আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থটি বাংলা জীবনী‌সাহিত্যে একটি মাইলফলক। তাঁর নতুন গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত, নজরুল-জীবনী’ বাংলা জীবনী‌সাহিত্যের মুকুটে আরও একটি উজ্জ্বল পালক। দীর্ঘ গবেষণার ফসল। এই গ্রন্থে নজরুলকে পাওয়া গেল তাঁর সত্যিকারের স্বরূপে। ২৪ মে কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মদিবস উপলক্ষে গ্রন্থটি নিয়ে এবং নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা করলেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার।


বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ গবেষক গোলাম মুরশিদের সম্প্রতি প্রকাশিত নজরুল জীবনী (‘বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত’, প্রথমা, ঢাকা, ৮০০ টাকা) পড়তে পড়তে মনে হল, নজরুল আমাদের প্রিয় কবি, হয়তো রবীন্দ্রনাথের পরেই তাঁর কবিতা আমরা বেশি করে পড়ি, মুখস্থ করি, আবৃত্তি করি, এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরে তাঁরই গান আমরা বেশি করে গাই (এ কথাও অনেকে জানি যে, রবীন্দ্রনাথের গানের চেয়ে তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় হাজারখানেক বেশি), কিন্তু তাঁকে নিয়ে বাঙালির নানারকম সঙ্কট আছে, তিনি আমাদের কাছে অনেকগুলি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে রেখে গেছেন। তাঁর উত্থান ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন, তাঁর জীবন নিয়ে প্রশ্ন, তাঁর আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন, তাঁর সৃষ্টি-অভিমুখের বিবর্তন ও তাঁর সৃষ্টি-উৎস হঠাৎ রুদ্ধ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন। তিনি বাঁচলেন প্রায় সাতাত্তর বছর, কিন্তু শেষ পঁচিশ বছর বেঁচে রইলেন প্রায় উদ্ভিদের মতো, অসহায়, অন্যনির্ভর এক অস্তিত্ব। তিনি দেশকে আর নতুন কিছু দিতে পারলেন না ওই পঁচিশ বছর, যা দিয়েছেন সেই অমূল্য দানের জন্য কৃতজ্ঞতা হিসেবেই উপমহাদেশের বঙ্গভাষী অঞ্চল তাঁকে লালন ও পূজা করল, যেমন করে বিশেষ বিশেষ ধর্মগোষ্ঠীর মানুষ মূর্তিকে পূজা দেয়।

আমাদের নজরুল ও গর্জে-ওঠা ত্রিমহাদেশীয় কাব্যতত্ত্ব - আজফার হোসেন


আমাদের নজরুল ও গর্জে-ওঠা ত্রিমহাদেশীয় কাব্যতত্ত্ব
আজফার হোসেন

তার কবিতা পড়া মানেই উদীপ্ত হওয়া
—নেতাজী সুভাষ বসু
 
যে সময়ে নজরুল ইসলাম লিখছিলেন — অর্থাৎ গত শতকে বিশের দশক থেকে চল্লিশের দশকের গোড়া পর্যন্ত — তখন বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রবিরোধিতা প্রায় অভ্যেসে পরিণত হচ্ছিল। তিরিশের দশকের কবিরা আধুনিকতাবাদের দোহাই পেড়ে ভিনদেশি নন্দনতত্ত্বের উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা ভূতের খপ্পরে পড়ে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই সাহিত্যের একটা নতুন যুগ তৈরি করার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। আমরা তখন লক্ষ্ করলাম বোদলেয়ার-পাউন্ড-এলিয়ট-লরেন্সের নাগরিক ও নান্দনিক জ্ঞানভাষ্যকে বিভিন্ন অনুষঙ্গে ও অভিজ্ঞতায় সরাসরি কবিতায় উপস্থিত করার প্রবণতা। এর একটা ফল দাঁড়ালো এই যে, আমরা এক আরোপিত নগরের বা এক আরোপিত দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে আমাদের অভ্যেস ও অনুশীলনের নতুন অভিমুখ তৈরি করায় ব্যস্ত হলাম। না, আমি পশ্চিমা সাহিত্যের বা জ্ঞানভাষ্যের প্রতি বিদ্বেষ থেকে কথাটা বলছি না মোটেই। তবে আমি যা বোঝাতে চাইছি তা হলো এই যে, উপনিবেশবাদের হাত ধরে আমাদের সাহিত্যে যে আধুনিকতাবাদের উন্মেষ ঘটেছে, তার একটা ফলাফল হচ্ছে যাকে ক্যারিবীয় লড়াকু তাত্ত্বিক ফ্রানৎস ফানোঁ [Franz Fanon] বেশ আগেই বলেছিলেন, ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাস’ (বলা প্রয়োজন, এই বর্গটি উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক গায়ত্রী স্পিভাক [Gayatri Chakravorty Spivak] বারবার ব্যবহার করলেও তা আসলেই নেওয়া হয়েছে ফানোঁর কাছ থেকেই।)
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসের একটা বিশেষ অর্থ এভাবে বলে নেওয়া যায়: যখন ভিনদেশি জ্ঞান চড়াও হয় উপনিবেশায়িত অঞ্চলের জ্ঞানের ওপর এমনি এক মাত্রায় যে, ধরা যাক, একজন আলাওলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পরিচিত হয়ে ওঠে একজন চসার [Geoffrey Chaucer]। আমি মোটেই দুনিয়াব্যাপী জ্ঞানভাষ্যের বা সাহিত্যের লেনদেনের বিরুদ্ধে নই। আমি এমনকি এও মনে করি যে, প্রভাবিত হওয়াও মাঝে মধ্যে জরুরি বটে। কিন্তু লেনদেনের নামে কিংবা প্রভাবিত হওয়ার ভেতর দিয়ে যখন আধিপত্যবাদী বা উপনিবেশবাদী ক্ষমতা-সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে এবং এর ফলে যখন জাতীয় সংস্কৃতি বিপন্ন বা এমনকি বিলুপ্ত হতে থাকে, তখন জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জরুরি হয়ে পড়ে পাল্টা জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াই। এ লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট: লাতিন আমেরিকার হোসে কার্লোস মালিয়াতেগি [José Carlos Mariátegui], ক্যারিবীয় অঞ্চলের কবি এমে সেজেয়ার [Aimé Césaire], ফ্রানৎস ফানোঁ তো আছেনই এবং আফ্রিকার লেপোন্ড সেডার সেংঘর [Léopold Sédar Senghor] ও নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো [Ngũgĩ wa Thiong'o] (যার Decolonizing the Mind [মনের বি-উপনিবেশীকরণ] ওই জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াইয়ের এক ধরনের ইশতেহার, যাকে অবশ্যই ফানোঁর রক্ত-বলকানো The Wretched of the Earth [পৃথিবীর হতভাগ্য] -এর সঙ্গে তুলনা করা চলে)। কিন্তু এদের আগেই এই পাল্টা জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াইকে যিনি নিজের কাজ ও জীবনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি হচ্ছেন আমাদের কবি নজরুল ইসলাম। এমনকি এও বলা যাবে যে, উপনিবেশবাদী জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ শতকের প্রায় গোড়াতেই সারা এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সবচাইতে গর্জে-ওঠা, সবচাইতে টগবগ-করা, সবচাইতে বিস্ফোরক কবিতার নাম ‘বিদ্রোহী’। আমার মনে হয় যে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি সে সময় এবং পরেও এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হলে কবিতাটি থাকতে পারত চে গুয়েভারার [Che Guevara] বুকপকেটে, কিংবা গ্রানাডার বিপ্লবী মরিস বিশপের [Maurice Bishop] হ্যান্ডব্যাগে, কিংবা জেলখানায় ভিয়েতনামের হো চি মিনের [Ho Chi Minh] বালিশের পাশে, কিংবা কেনিয়ার মাউ মাউ আন্দোলনের শেষ নেতা ডেডান কিমাথির [Dedan Kimathi] কণ্ঠস্বরে, যে কিমাথি নজরুলের মতোই গ্রামীণ প্রোলেতারিয়েতকেই ইতিহাসের মঞ্চে হাজির করেছিলেন। এসব প্রসঙ্গে পরে ফিরব। কিন্তু তার আগে এই তিরিশের আধুনিকতাবাদের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রধান কর্তাসত্ত্ব হিসেবে বিষয়টি আরেকটু সামনে আনা দরকার।

চার বাঙালির নজরুল - জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

চার বাঙালির নজরুল
জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত


কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির হৃদয়বাসী। এক নিঃশ্বাসে এই কথা বলার মুহর্তে ভাবতে হয়, কোন বাঙালির? কেননা তাঁর জন্মশতবর্ষপূর্তির পরবর্তীকালে এই রকম মনে হয়, যে বাঙালির হৃদয়ে তিনি আসীন তার চেহারা সর্বদা এক রকম ছিল না, সম্ভবত এখনও নেই। ‘মুক্তি' কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকহৃদয় প্লাবিত না করে থাকলেও এর জন্যে দীর্ঘ সময় তাঁকে ব্যয় করতে হয়নি। তেরােশ’ ছয় থেকে ছাব্বিশ এই ছিল তাঁর অপেক্ষাকাল, তারপর মাত্র বাইশ বছর, এই বাইশ বছর সময়কালেই বাঙালির হৃৎসাম্রাজ্যের যৌবরাজ্যে অভিষেক হয় তাঁর। অথচ আশ্চর্য, তার পরের ত্রিশ বছরের সে কথা সর্বদা সেই বাঙালির মনে থাকে না এবং তারপরের অনধিক ত্রিশ বর্ষে যদিও আবার ফিরে আসেন তিনি কিন্তু একই মানুষের ঘরে নয়, এক চেহারার বাঙালির ঘরে তাে নয়ই।


এই সব কথা স্পষ্ট করা যাক। এক জীবনে কি কেউ বারবার ফিরে আসতে পারেন? নজরুল ইসলাম কিন্তু পেরেছিলেন। এই জীবনে ফিরে এসেছিলেন অন্তত দু’বার। খুব বেশি খুঁটিয়ে দেখলে বােধহয় বলা যায়, তিন বার। আঠারােশ' নিরানব্বই থেকে প্রবাহিত তাঁর সাতাত্তর বছরের জীবনকে এমন স্পষ্ট তিনটি অংশে বিচ্ছিন্ন করা যায় যে, মনে হবে এক একটি জীবনাংশের দাবিদার যেন ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। এমনকি মৃত্যুপরবর্তী এই চল্লিশ বছরেও যে নজরুল চলাচল করেন বাঙালির ঘরে তিনিও ভিন্ন একজন যাওয়া আসা তার ভিন্ন বাঙালির ঘরেই। জন্মপরবর্তী বিয়াল্লিশ বছরকে ধরা যায় তাঁর প্রথম জীবন। শৈশববাল্যপরবর্তীকালে যেমন ঘটে তেমনি ঘটেছিল তার জীবনেও শিক্ষাগ্রহণ, কর্মজীবন, গার্হস্থ্য জীবন- মােটা দাগেই এসব চিহ্নিত করা যায়। যদিও তাঁর জীবনধারণের পদ্ধতি, শিল্পসৃষ্টির অনন্য প্রক্রিয়া, কি গার্হস্থ্য জীবনের অচিরাচরিত উদাহরণ- এসব মােটা দাগের টানে ধরা পড়বার মতাে নয়। তবুও এটুকুই ছিল তার জীবন, সামাজিক মানুষের জীবন। তাঁর প্রথম জীবন। জগৎসভায় সকলের সঙ্গে বসে কাটানাে হাসি-কান্নার জীবন। শিল্পসৃষ্টির কাল। সাফল্য, সমাদর, স্বীকৃতি যেমন জুটেছিল এই সময়ে, তেমনি জুটেছিল অপরের বিদ্বেষ, বিদ্রুপ ও হিংসার হলাহল। ঐ বিয়াল্লিশ বছরের জীবনে এত কিছু ঘটেছিল বলেই হয়ত পরবর্তী ত্রিশ বছরের জীবনে পূর্বজীবন আর কোন ছায়া ফেলেনি।

আটলান্টার জর্জিয়া টেক-এ নজরুলকে নিয়ে সারাদিনব্যাপী সাহিত্য ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত - আশফাক স্বপন


আটলান্টার জর্জিয়া টেক-এ নজরুলকে নিয়ে সারাদিনব্যাপী সাহিত্য ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত
আশফাক স্বপন

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি, কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভার শিল্পকৃতির যথাযথ মূল্যায়ন বা সমাদর যে হয়নি, এই কথাটা স্পষ্ট হয়ে গেল ২৪ মার্চ আটলান্টার জর্জিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সারাদিনব্যাপী সাহিত্য ওয়ার্কশপে।

ওয়ার্কশপের  শিরোনাম: কাজী নজরুল ইসলামের শিল্পসৃষ্টি: বৈচিত্র ও আন্তর্জাতিকতা। বক্তা মিশিগ্যান অঙ্গরাজ্যের গ্র্যাণ্ড ভ্যালি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আজফার হোসেন। আয়োজক অনলাইন বইপ্রেমীর সংগঠন বইয়ের হাট (boierhut.com/group) ও জর্জিয়া টেক বাংলাদেশ স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন।

সকাল ও অপরাহ্ন মোট দুটি দীর্ঘ আলোচনায় আজফারের বক্তব্য রাখেন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আন্তর্জাতিকতা, প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেবার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব, আরবী-ফারসী একাধিক ভাষার ব্যুৎপত্তি ও বাংলা সাহিত্যে তার সূত্র ধরে তার নানান পরীক্ষা নীরিক্ষা – এসব নানান বিষয়ে আলোচনা করলেন আজফার।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট