সাহিত্যপত্র
বুদ্ধদেব বসু

এক রকমের পত্রিকা আছে যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই-যদি না কোনাে সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত এবং বিব্রত করেন আমাদের। আর-এক রকমের পত্রিকা আছে যা রেলস্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাতে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি, চেখে-চেখে আস্তে-আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাজের মধ্যে ন্যাপথলিন-গন্ধী তােরঙ্গে তুলে রাখি-জল, পােকা, আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্য। যে-সব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুত হতে চায়— কৃতিত্ব যেইটুকুই হােক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে : চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।লিটল কেন? আকারে ছােটো বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? না কি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব ক-টাই সত্য, কিন্তু এগুলােই সব কথা নয়; ঐ ‘ছােটো’ বিশেষণটাতে আরাে অনেকখানি অর্থ পােরা আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ : এক জোড়া মলাটের মধ্যে সব-কিছুর আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বােঝা গেলাে যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনাে ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়ােবাজারে বিকোবে না কোনােদিন, কিন্তু হয়তাে—কোনাে-একদিন এর একটি পুরােনাে সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এইজন্যেই যে এটি কখনাে মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিলাে। চেয়েছিলাে নতুন সুরে নতুন কথা বলতে ; কোননা-এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিলাে—নিন্দা, নির্যাতন বা ধনক্ষয়ে প্রতিহত না-হয়ে। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না-করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা—এইটেই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম। আর এটুকু বললেই অন্য সব কথা বলা হয়ে যায়, কেননা এই ধর্ম পালন করতে গেলে চেষ্টা করেও কাটতি বাড়ানাে যাবে না, টিকে থাকা শক্ত হবে, আকারেও মােটাসােটা হবার সম্ভাবনা কম। অবশ্য পরিপুষ্ট লিটল ম্যাগাজিন দেখা গেছে—যদিও সে-সময়ে ঐ শব্দের উদ্ভব হয়নি—যেমন এলিয়টের ‘ক্রাইটেরিয়ন’ বা আদিকালের পরিচয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা ত্রৈমাসিক ছিলাে ; সমসাময়িক গণসেব্য মাসিকপত্রের তুলনায় তারা যে ওজনে কত হালকা তা অল্প একটু পাটিগণিতেই ধরা পড়বে। ভালাে লেখা বেশি জন্মায় না, সত্যিকার নতুন লেখা আরাে বিরল ; আর শুধু দুর্লভের সন্ধানী হলে পৃষ্ঠা এবং পাঠকসংখ্যা স্বতই কমে আসে। অর্থাৎ আমরা যাকে বলি সাহিত্যপত্র, খাঁটি সাহিত্যের পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন তারই আরাে ছিপছিপে এবং ব্যঞ্জনাবহ নতুন নাম।
বুদ্ধদেব বসু

বাংলায় প্রথম লিটল ম্যাগাজিন কি? কেন লিটল ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা? বুদ্ধদেব বসুর অসাধারণ প্রবন্ধটা পড়ে চমকিত হলাম - সাহিত্যপত্র। কোন পত্রিকায় লেখা প্রকাশ বিজ্ঞাপন আর কোন পত্রিকায় তা আত্মপ্রকাশ? রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রমথ চৌধুরী হয়ে বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, 'সবুজপত্র', 'পরিচয়'...সৎ সাহিত্য, সৌখিন সাহিত্য, পড়ে ফেলে দেওয়া সাহিত্য, চেটেপুটে ন্যাপথলিন দিয়ে সংগ্রহে রাখা সাহিত্য ইত্যাদি নানা কথা। অল্প কয়েকটা পাতায়। - সৌরভ ভট্টাচার্য্য
এক রকমের পত্রিকা আছে যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই-যদি না কোনাে সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত এবং বিব্রত করেন আমাদের। আর-এক রকমের পত্রিকা আছে যা রেলস্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাতে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি, চেখে-চেখে আস্তে-আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাজের মধ্যে ন্যাপথলিন-গন্ধী তােরঙ্গে তুলে রাখি-জল, পােকা, আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্য। যে-সব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুত হতে চায়— কৃতিত্ব যেইটুকুই হােক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে : চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।লিটল কেন? আকারে ছােটো বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? না কি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব ক-টাই সত্য, কিন্তু এগুলােই সব কথা নয়; ঐ ‘ছােটো’ বিশেষণটাতে আরাে অনেকখানি অর্থ পােরা আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ : এক জোড়া মলাটের মধ্যে সব-কিছুর আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বােঝা গেলাে যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনাে ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়ােবাজারে বিকোবে না কোনােদিন, কিন্তু হয়তাে—কোনাে-একদিন এর একটি পুরােনাে সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এইজন্যেই যে এটি কখনাে মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিলাে। চেয়েছিলাে নতুন সুরে নতুন কথা বলতে ; কোননা-এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিলাে—নিন্দা, নির্যাতন বা ধনক্ষয়ে প্রতিহত না-হয়ে। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না-করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা—এইটেই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম। আর এটুকু বললেই অন্য সব কথা বলা হয়ে যায়, কেননা এই ধর্ম পালন করতে গেলে চেষ্টা করেও কাটতি বাড়ানাে যাবে না, টিকে থাকা শক্ত হবে, আকারেও মােটাসােটা হবার সম্ভাবনা কম। অবশ্য পরিপুষ্ট লিটল ম্যাগাজিন দেখা গেছে—যদিও সে-সময়ে ঐ শব্দের উদ্ভব হয়নি—যেমন এলিয়টের ‘ক্রাইটেরিয়ন’ বা আদিকালের পরিচয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা ত্রৈমাসিক ছিলাে ; সমসাময়িক গণসেব্য মাসিকপত্রের তুলনায় তারা যে ওজনে কত হালকা তা অল্প একটু পাটিগণিতেই ধরা পড়বে। ভালাে লেখা বেশি জন্মায় না, সত্যিকার নতুন লেখা আরাে বিরল ; আর শুধু দুর্লভের সন্ধানী হলে পৃষ্ঠা এবং পাঠকসংখ্যা স্বতই কমে আসে। অর্থাৎ আমরা যাকে বলি সাহিত্যপত্র, খাঁটি সাহিত্যের পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন তারই আরাে ছিপছিপে এবং ব্যঞ্জনাবহ নতুন নাম।