তিরতিরে নদী আর শাল জঙ্গলের দেশে - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

ভ্রমণ কাহিনী
তিরতিরে নদী আর শাল জঙ্গলের দেশে
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী


আমরা যখন কলকাতা থেকে কোথাও যাই, তখন আসলে কলকাতার দিকেই আবার যাত্রা করি-ঘুরে তো সেই কলকাতাতেই আসতে হয় ৷ একটু ঘুরপথে আবার সেই কলকাতায় ফিরি ৷ বললাম বটে এটা ঘুরপথ, কিন্তু এই পথে ঘোরার মধ্যে একটু আনন্দ রয়েছে ৷ কলকাতা থেকে যে কারণে আমরা পথ ধরে বেরিয়ে পড়ি, তার তো একটা উদ্দেশ্য আছে ৷ সেই উদ্দেশ্যটা খুব একটা সিদ্ধ হয় না, যখন আমরা আবার কোনও বড় রকমের শহর-টহরে যাই ৷

আমার নিজের বেড়াতে খুব ভালো লাগে, ছোটখাটো মফস্বল শহরে ৷ খুব ছেলেবেলায় বাবা আমাদের প্রত্যেক বছর বাইরে নিয়ে যেতেন ৷ আমাদের তো দেশের বাড়ি ছিল ৷ দেশ বলতে পুববাংলার গ্রামের বাড়ি ৷ সে-ও ছিল খুব চমৎকার ব্যাপার ৷ দেশের বাড়িতে গিয়ে মাসখানেক কাটিয়ে তারপর কলকাতায় ফেরা-সেটা খুব মজার ব্যাপার ছিল আমাদের কাছে ৷

একটি নীল বোতাম - হুমায়ূন আহমেদ | ছোটগল্প

ছোটগল্প
একটি নীল বোতাম

হুমায়ূন আহমেদ

বারান্দায় এশার বাবা বসেছিলেন।

হাঁটু পর্যন্ত তোলা লুঙ্গি, গায়ে নীল রঙের গেঞ্জি। এই জিনিস কোথায়

পাওয়া যায় কে জানে? কী সুন্দর মানিয়েছে তাকে! ভদ্রলোকের গায়ের রঙ ধবধবে শাদা। আকাশি রঙের গেঞ্জিতে তাঁর গায়ের রঙ ফুটে বেরুচ্ছে। সব মিলিয়ে সুখী-সুখী একটা ছবি। নীল রঙটাই বোধহয় সুখের। কিংবা কে জানে ভদ্রলোকের চেহারাটাই বোধহয় সুখী-সুখী। কালো রঙের গেঞ্জিতেও তাকে হয়তো সুখী দেখাবে।

তিনি আমাকে দেখতে পাননি। আমি ইচ্ছা করেই গেটে একটু শব্দ করলাম। তিনি আমাকে দেখলেন। সুন্দর করে হাসলেন। ভরাট গলায় বললেন, “আরে রঞ্জুু, তুমি? কী খবর? ভালো আছ?”

'জি ভালো ।' ‘গরম কি রকম পড়ছে বল দেখি?” ‘খুব গরম।” “আমার তো ইচ্ছা করছে। চৌবাচ্চায় গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকি।”

মুখে বললেন, “বসো। তোমার কাছ থেকে দেশের খবরা-খবর কিছু শুনি।”

জনৈক অপদার্থ পিতা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ছোটগল্প
জনৈক অপদার্থ পিতা 
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বাসের মানুষজন শঙ্কিত মুখে বসে আছে। বাসটির এখানে থামার কথা নয়, কালো কাপড় পরা মিলিশিয়া ধরনের একজন এটিকে থামিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়েছে। রাস্তাঘাটে বাস থামিয়ে চেক করা কোন ব্যাপার নয়, তবু ব্যাপারটিতে কেউ অভ্যস্ত হতে পারছে না। মিলিটারির কেউ একজন ভেতরে ঢুকে বাসটি পরীক্ষা করে যেতে দেবে, যতক্ষণ সেটা না হচ্ছে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।

আজাদ কাজলকে বুকে চেপে ধরে বাসের অন্য সবার সাথে চুপ করে বসে থাকে। কাজলের বয়স চার, যদিও তাকে দেখে আরো কম মনে হয়। গত কয়েক মাস দৌড়াদৌড়িতে তার চেহারার মাঝে আতঙ্কের একটা ছাপ পাকাপাকিভাবে পড়ে গেছে। ছেলেটার শরীর ভাল নয়। গত কয়েকদিন থেকে কেঁপে কেঁপে জ্বর উঠছে। রোগ শোক সম্পর্কে আজাদের ভাল ধারণা নেই, কিন্তু দেখেশুনে মনে হয় ম্যালেরিয়া। যে গ্রামে গত কয়েক মাস থেকে লুকিয়ে আছে সেখানে কোন ডাক্তার নেই। ডাক্তারের খোঁজে সে ময়মনসিংহ শহরে যাচ্ছে।

আত্মজা ও একটি করবী গাছ - হাসান আজিজুল হক

ছোটগল্প
আত্মজা ও একটি করবী গাছ
হাসান আজিজুল হক



এখন নির্দয় শীতকাল, ঠাণ্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়। অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায়। ওদিকে বড় গঞ্জের রাস্তার মোড়ে রাহাত খানের বাড়ির টিনের চাল হিম ঝক ঝক করে। একসময় কানুর মায়ের কুঁড়েঘরের পৈঠায় সামনের পা তুলে দিয়ে শিয়াল ডেকে ওঠে। হঠাৎ তখন স্কুলের খোয়ার রাস্তার দুপাশের বনবাদাড় আর ভাঙা বাড়ির ইটের স্তূপ থেকে হু-উ-উ চিৎকার ওঠে। ঈশেন কোণ থেকে ধর ধর লে লে শব্দ আসে, অন্ধকারে—ভূত অন্ধকার কেঁপে কেঁপে ওঠে, চাঁদের আলো আবার ঝিলিক দেয় টিনের চালে। গঞ্জের রাস্তার ওপর উঠে আসে ডাকু শিয়ালটা মুখে মুরগি নিয়ে। ডানা ঝামরে মুমূর্ষু মুরগি ছায়া ফেলে পথে, নেকড়ের মতো ছায়া পড়ে শিয়ালটারও, চাঁদের দিকে মুখ তুলে চায় সে, রাস্তা পেরোয় ভেবেচিন্তে, তারপর স্কুলের রাস্তার বাদাড়ে ঢোকে। হাতে লাঠি চাঁদমণির বাড়ির লোক ঠ্যাঙাড়ের দলের মতো হল্লা করে রাস্তায় পড়ে, কোনদিকি গেল শালার শিয়েল, কোনদিকি ক দিনি।

বুড়ি - হুমায়ূন আহমেদ । ছোটগল্প

ছোটগল্প
বুড়ি
হুমায়ূন আহমেদ


রাত দুপুরে কুঁ-কু পো-পো শব্দ।
সবে শুয়েছি, ঘুমে চোখ জড়িয়ে এসেছে- বিচিত্র শব্দে উঠে বসলাম,
ব্যাপারটা কী? আমেরিকায় নতুন এসেছি। এদের কাণ্ডকারখানার সঙ্গে এখনো
তেমন পরিচয় হয়নি। ক্ষণে-ক্ষণে চমকে উঠতে হয় ।
এখন যেখানে আছি তার আমেরিকান নাম রুমিং হাউস। পায়রার খোপের মতো ছোট্ট একটা ঘর। সেই ঘরে সোফা কাম বেড, পড়ার টেবিল। টেবিলের একপাশে একটা এফ.এম. রেডিও । এই হলো আমার ঘরের সাজসজা। ভাড়া পঞ্চাশ ডলার--- জলের দাম বলা চলে । আমেরিকান এক দম্পতি তাদের বসতবাড়ির দোতলার সব ক’টা ঘর ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। দরিদ্র বিদেশী ছাত্ররা এইসব ঘরে থাকে। কমন বাথরুম। রান্নাঘর নেই। খেতে হয় বাইরে। সিগারেট খাওয়া যায় না, ল্যান্ড লেডি ঘর ভাড়া দেয়ার সময় কঠিন গলায় এই তথ্য জানিয়ে দিয়েছেন। উচু ভল্যুমে স্টেরিও শোনা নিষিদ্ধ। নানান বায়নাক্কা। তবুও এখানে উঠে এসেছি। কারণ- সস্তা ঘর ভাড়া, তা ছাড়া জায়গাটা ইউনিভার্সিটির খুব কাছে। ওয়াকিং ডিসটেন্স। নর্থ ডেকোটার এই প্রচণ্ড শীতে দূর থেকে ক্লাস করতে আসা সম্ভব নয়। একটা গাড়ি কিনে নেব সেও দুরাশা। দুপুরে ইউনিভার্সিটি মেমোরিয়াল ইউনিয়নে খেয়ে নেই। সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফিরি সঙ্গে থাকে একটা হ্যামবার্গার। ঐ খেয়ে রাত পার করি ।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট