যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পুস্তক পুরস্কার বিজয়ী "হলুদ বাড়ি" | NPR থেকে আলোচনাটি অনুবাদ করেছেন আশফাক স্বপন



'The Yellow House'-বইটির জন্য লেখিকা স্যারা এম. ব্রুম ২০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পুস্তক পুরস্কার লাভ করেন। ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও-তে প্রকাশিত বইটির সমালোচনা এখানে নিবেদন করা হলো।

‘হলুদ বাড়ি’ স্থান, স্মৃতি এবং আত্মোপলব্ধির যোগসূত্র স্থাপন করে

মার্থা এ্যান টোল
১৩ আগস্ট ২০১৯
ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনা
The Yellow House' Connects Place, Memory And Self-Knowledge

Martha Anne Toll
August 13, 2019
National Public Radio

আলোচিত বই
The Yellow House
By Sarah M. Broom
Hardcover, 376 pages
Buy here


বইটির আরেকটি সমালোচনা (ইংরেজি)
Katrina Destroyed 'The Yellow House' — But Inequality Eroded Its Foundation

Maureen Corrigan
September 4, 2019
Fresh Air
National Public Radio
পড়ুন । শুনুন

লেখিকার সাক্ষাৎকার (ইংরেজি)
Sarah M. Broom On 'The Yellow House'

August 10, 2019
Weekend Edition
National Public Radio
পড়ুন । শুনুন

স্যারা এম. ব্রুমের দুর্দান্ত অভিষেক ঘটল ‘The Yellow House’ (হলুদ বাড়ি) বইটি দিয়ে। বইটিতে প্রার্থনার আর্তি রয়েছে, মৃতব্যক্তির সম্মানে রচিত শোকগাঁথার গাম্ভীর্য রয়েছে।

শিরোনামে উল্লেখিত বাড়িটি ব্রুমের বিস্তৃত ও বহুবিচিত্র পরিবার নিয়ে স্মৃতিচারণের কেন্দ্রবিন্দু। আরো যেটা উল্লেখযোগ্য, সেটা হল আমেরিকা কীভাবে আফ্রিকান আমেরিকানদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, এবং আজও ব্যর্থ, এই বাড়িটি যেন সেটার একটি প্রতীক।
মা আইভরি মে-এর ১২টি সন্তানের মধ্যে ব্রুম সবচাইতে ছোট। ১৯ বছর বয়সে বিধবা হবার পর আইভরি মে তার জীবনের সঞ্চয় দিয়ে পূর্ব নিউ অরলিন্সে একটি ছোট্ট সাদামাটা বাড়ি ক্রয় করেন। টেক্সাসের ক্রোড়পতিরা তাদের বিশাল বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প এবং তার চাইতেও বিশাল আস্ফালন নিয়ে এই জায়গাটাতে আসবার আগে এই এলাকাটাকে যে ঠিক কী নামে ডাকা হয় সেটা কেউ জানতো না। তবে লেখকের ভাষায়, ‘নাম না দেওয়াটাও একধরনের নামকরণ।’

বাড়ি ক্রয় করতে না করতেই বাড়ি্টা পেছন দিকে মাটিতে ডুবে যেতে আরম্ভ করে। কারণ জায়গাটা আগে সাইপ্রেস গাছের ডোবা ছিল। লেখকের ভাষায় ‘গাছ অথবা তিনজন মানুষের ওজন বহন করার জন্য জমিটা বড়ই দুর্বল।’

কয়েক বছরের মধ্যে আইভরি মে সাইমন ব্রুম নামে তার চাইতে বয়সে ১৯ বছরের বড় এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। বিয়ের আগে তাদের যার যার নিজেদের সন্তান ছিল, বিয়ের পর তাদের আরো সন্তান হয়। বিয়ের পরপর ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ে জলাশয় রক্ষাকারী বাঁধ ভেঙে যায়। প্রায় ৭০,০০০ মানুষ গৃহহীন হয়, শত শত মানুষ বাড়ির ছাদে জলবন্দী হয়। এটিই ঘুর্ণিঝড় বেটসি – কাটরিনা ঘুর্ণিঝড়ের ৪০ বছর আগে এই ঘুর্ণিঝড় নিউ অরলিন্সে একই রকম প্রলয়ঙ্কারী আঘাত হানে।

সাইমন পরিশ্রমী ছিলেন। হলুদ বাড়ির নানান সংস্কারে নিবেদিত ছিলেন, তবে কাজ শেষ করতে পারেন নি। লেখিকা ব্রুম যখন শিশু, তিনি অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করেন। ফলে লেখিকার পিতৃস্মৃতির ভাণ্ডারে কিছুই জমা নেই। আইভরি মে দ্বিতীয়বার বিধবা হলেন। এবার একা ১২টি সন্তান লালনের দায়িত্ব তাঁর। সেই সাথে হলুদ বাড়ি, যাকে তাঁর ১৩শ সন্তান বলা চলে।

ব্রুমের গদ্য স্মৃতির বিরহে কাতর। লেখিকা তার জন্মের আগে বাবা-মায়ের জীবনের চিত্র তুলে ধরেন। আর তুলে ধরেন কাটরিনা ঘুর্ণিঝড়ে জলের উত্থান ও পতন - যাকে তিনি ‘জল’ বলে অভিহিত করেন। কাটরিনা সবকিছু কেড়ে নেয়। ব্রুমকে অনেক আদর ও যত্নে মানুষ করেন তার মা, সঙ্গে খুনশুটি আর মমতায় ভরা বড় ভাইবোন, এবং নানী। হলুদ বাড়িটি তাঁর স্বরূপ নির্ণয় করেছে, আবার হলুদ বাড়িটি সেই পরিচয়কে সীমায়িত করেছে। তার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বাড়িটি ক্রমশ ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে, যদিও আইভরি মে একসাথে একাধিক জায়গায় কাজ করে সংসার সামাল দেবার পরও বাড়ি ঝকঝকে পরিষ্কার রাখতেন। শত চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি বাড়ির নানান স্থানে অবক্ষয়, ইঁদুর, পোকামাকড়, ও বৃষ্টির সাথে যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারেননি। আইভরি মে একটা কথা বলতেন যারসত্যতা চিরকালীন: ‘জানোতো এই বাড়িটা অন্য লোকের জন্য খুব একটা আরামদায়ক না।’ লেখকের ভাষায়: ‘মর্মবিদারক বাস্তব হল এই - হয়ত আমরা এই সত্যটি আবিষ্কার করেছি – যে মানুষকে বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ না জানিয়ে আমরা আমাদের নিজেতের স্বভাবের বিরুদ্ধাচরণ করছি। এর কারণ হল লজ্জা, গ্লানি।’

ব্রুমের সাধ জাগে এইসব কিছু পেছনে ফেলে চলে যাবার – তাকে বড় নগরীর বড় রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষা হাতছানি দেয়। তিনি নিউ ইয়র্কের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যূষিত হারলেম-এ আসেন ‘ও ম্যাগাজিন’-এ চাকরি নিয়ে। আফ্রিকার বুরুন্ডিতে যান। সেখানে বিপদসঙ্কুল পরিবেশে সেই স্থানের মানুষের সামনে আয়না তুলে ধরেন। সেটা তাকে আবার নিউ অরলিন্সের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য করে।

যখন কাটরিনা ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানে, ব্রুম তখন বাইরে। তাঁর ভাষায়: ‘আমার অনুপস্থিতি, আমি যে শারীরিকভাবে সেখানে উপস্থিত ছিলাম না - এই বিষয়টি খুব সুক্ষ্ম অনুভূতির মধ্য দিয়ে আমার মনে হানা দিতে লাগল। আজ বুঝতে পারি সেই অনুভূতিটা ব্যর্থতার।’ তার পরিবারের মর্মন্তুদ ক্ষতি করে ঘুর্ণিঝড় – পরিবারের বিভিন্ন সদস্য ও তাদের ছেলেমেয়েরা ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও অন্যান্য জায়গায় ছিটকে পড়ে, সেখানে ছাদের থেকে পরিত্রাণের রোমহর্ষক কাহিনিও রয়েছে - লেখিকা সেসব বৃত্তান্ত দিয়েছেন।
কাটরিনার মরণছোবলের পর কোনরকম আগাম বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জঞ্জাল পরিষ্কারের ট্রাক এসে হলুদ বাড়িটি সমূলে তুলে নিয়ে যায়। লেখকের ভাষায়:
‘এই বাড়িটির ভেতর আমার বাবা ছিলেন, তার সত্তা এখানে রক্ষিত ছিল। এই বাড়িটিতে তার নানান চিহ্ন রয়েছে। যতদিন বাড়িটি ছিল, এই চিহ্নগুলো ছিল, বাবা পুরোপুরি চলে যাননি। এবার, হঠাৎ করে, তিনি চলে গেলেন।’
ব্রুম নিউ অরলিন্স ফিরে আসেন। তিনি নিউ অরলিন্সের মেয়র রে নেগিনের দফতরে গণযোগাযোগের একটি চাকরি নেন। তিনি তার আদরের ভাই কার্লের সাথে সময় কাটান। কার্ল NASA-এর বাগানে কাজ করেন। প্রতি রাতে ফিরে এসে যেই স্থানে হলুদ বাড়িটি ছিল, সেই খালি জমিটি পাহারা দেয়। আজ প্রায় পুরো পাড়াই পরিত্যক্ত। কিন্তু কার্ল জমির ঘাস নিয়মিত ছেঁটে পরিষ্কার রাখে। কারণ, লেখিকার ভাষায়: ‘আমাদের থেকে এই জমি কেড়ে নিতে পারে – যে কোন কারণে বা কোন কারণ ছাড়াই – এই হল আমেরিকার ইতিহাসের একেবারে মৌলিক সত্য।’

সবকিছুতেই গোলমাল। উচ্চ মহলে তার নানা যোগাযোগ সত্ত্বেও উধাও হওয়া বাড়িটির জন্য ব্রুম মায়ের ক্ষতিপূরণ যোগাড় করতে পারেনা। (পর্যায়ক্রমে একেক উকিলের দল নথি ‘হারিয়ে’ ফেলে, ফলে সাত বছর লেগে যায়।) তাঁর নিজ শহরের প্রতি লেখিকা অসহায় অনুভব করেন, তার শিকড়ের সাথে দূরত্ব অনুভব করেন। তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে এই বইটির গবেষণার কাজ শুরু করেন। অর্থাৎ তার পারিবারিক ইতিহাস, এবং নিউ অর্লিন্স-এর ইতিহাসের নানান অলিগলি যেখানে যেখানে এসে যুক্ত হয়েছে, সেইসব বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাটি আরম্ভ করেন। শহরের নানান জায়গায় আবাসনের নথি, নগর পরিকল্পনার নথি, সবই তার নাগালের মধ্যে, কিন্তু বাড়ি পৌঁছুবার পথ আর খুঁজে পান না। কোথায় বাড়ি? তার পরিবারের সদস্যরা দিকে দিকে ছড়িয়ে রয়েছে, এবং জেসমিন ওয়ার্ডের Men We Reaped (যেই পুরুষ আমরা পেয়েছি) বইয়ের মত তারঁ বেলাতেও তার সব বন্ধুরা হয় মৃত, নয়তো কারাগারে, নয়তোবা কে জানে কোথায় চলে গিয়েছে।

পরিবার, মাটি আর হারানোর মাঝে যে বেদনাবিধুর বন্ধন, সেটার উন্মোচনে ‘হলুদ বাড়ি’ মনে করিয়ে দেয় লরেট সাভয়-এর কাব্যময় স্মৃতিকথা ‘Trace’ (ছায়াপাত)-এর কথা। সেই বইয়ে সাভয় তাঁর মিশ্র-বর্ণের পূর্বসূরীদের হারানো স্থান-এর সাথে বিস্তৃত, বহুবিচিত্র আমেরিকার যোগসূত্র স্থাপন করেন। ‘হলুদ বাড়ি’-এর সাথে একইভাবে মিল পাই জে. ড্রু ল্যানহামের ‘The Home Place’ (বাড়ির জায়গা) বইটির।

স্যারা এম. ব্রুম লেখিকা হিসেবে যেমন বিদূষী তেমন তার চিন্তার বিস্তার। বিশাল বিশাল বিষয় তিনি আত্মস্থ করেন। ‘হলুদ বাড়ি’ আফ্রিকান আমেরিকান পরিবারের থেকে নিরবিচ্ছিন্ন আর্থিক বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কাহিনি, সে তারা যতই পরিশ্রম করুন না কেন। পরিবেশের যে ভয়াবহ সঙ্কট সহজে অনুমেয় ছিল সেই সঙ্কট ও তার মর্মবিদারক পরিণতি থেকে আমাদের সবচাইতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে আমাদের দরিদ্র পাড়াগুলোর প্রতি আমাদের চুড়ান্ত অবহেলা। তুলে ধরা হয়েছে অঙ্গীকারের ধাপ্পাবাজি – যার ফলে অঙ্গীকার হয় বাস্তবায়িত হয় না, নতুবা বড্ড সহজে ভঙ্গ করা হয়। তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে অবকাঠামোর গভীর সমস্যা রাজনীতিকরা এবং আমরা সবাই এড়িয়ে যাই।

সেই সাথে ‘হলুদ বাড়ি’ ভালোবাসা এবং শত প্রতিকুলতায় হার না মানার কাহিনি। একজন মাতা কিছুতেই হার মানেন না, তার সন্তানদের সাহায্যের হাত বাড়াতে কখনোই দ্বিধা করেন না। লেখিকার ভাষায়: ‘আমার মা তার ক্রোধ ও হতাশা মনের গভীরে লুকিয়ে রাখতেন, তার বাহ্যিক শিষ্টতার অনেক, অনেক নীচে।’ আর রয়েছে একটি তরুণীর কাহিনি যার জীবনের আঁকাবাঁকা পথ তাকে প্রথমে তার পরিবার থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে আবার কাছে ফিরিয়ে আনে। তাঁর নিজের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করার জন্য তাঁকে সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে হয়। তার একটা গভীর উপলব্ধি ঘটে যে চেতনার কিছু কিছু ফাঁক পূরণ হবার নয়।

ব্রুম যেন সমগ্র পৃথিবীকে বুঝবার দায়িত্ব আপন স্কন্ধে তুলে নিয়ে বেসামাল হয়ে গেছেন। আমাদের আশা রইল তিনি ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো নিয়েও ‘হলুদ বাড়ি’-এর মত দরদ ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুসন্ধান করবেন। তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেন যে তিনি যেসব প্রশ্ন তোলেন, তার ভাষায় ‘তার উত্তর পাওয়া অসম্ভব।’

তিনি লেখেন: ‘এই স্মৃতিচারণ, এই মনে করা ব্যাপারটা একেবারেই সহজ নয়।’ তথাপি আমরা অধীর আগ্রহে তার নতুন অনুসন্ধানের অপেক্ষায় রইলাম।

বিদেশে একবার জেলে যাবার উপক্রম হয়েছিল - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

এ যেন বাড়িতে কারুকে খাবার নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে হঠাৎ একসময় তাকে ঠেলে নবার করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া। অনেকটা সেরকমই অভিজ্ঞতা হয়েছিল চেকোশ্লোভাকিয়ায়। অনেক দেশে সরকারি আমন্ত্রণে ঘুরেছি, কখনাে এমন নাটকীয় অবস্থার মধ্যে পড়িনি।

চেকোশ্লোভাকিয়া নামে এখন আর কোনাে দেশ নেই পৃথিবীর মানচিত্রে। চেক রিপাবলিক এবং শ্লোভাকিয়া নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে গেছে। ভাগ হয়ে যাবার মাত্র কিছুদিন আগেই আমরা গিয়েছিলাম সেখানে। ছ’জন ভারতীয় লেখক-লেখিকার একটি প্রতিনিধি দল।

ভারত সরকার আমাদের বিমান ভাড়া দেয়, ওদেশে পৌঁছােবার পর আতিথেয়তার সব ভার নেয় ওদেশের সরকার। তখনাে চেকোশ্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়নি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে চাপা উত্তেজনার ভাব রয়েছে, তা আমরা বুঝতে পারিনি প্রথমে। কিন্তু আতিথেয়তার মধ্যে যে আন্তরিকতা বা উষ্ণতার অভাব, তা আমরা অনুভব করেছিলাম। সরকারি কর্মচারিরা তাদের কর্তব্য সারে, আন্তরিক হতে যাবেই বা কেন, তবু একটা লােক-দেখানাে আন্তরিকতা তাে থাকেই, সেটারও যেন অভাব ছিল।

পৌঁছােলাম প্রাগ শহরে, যথারীতি আমাদের একটা মস্ত বড় হােটেলে তােলা হলাে। সব কমিউনিস্ট দেশের একই নিয়ম, পাসপাের্ট জমা রাখতে হয় হােটেলের কাউন্টারে। এসব দেশের ভিসাও অন্যরকম, পাসপাের্টে ছাপ দেয় না, অন্য একটি আলাদা ভিসা ফর্ম থাকে, তাতে ছবি সাঁটা থাকে, সেটা পাসপাের্টের মধ্যে রেখে দিতে হয়। আমি পােল্যাণ্ড, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, চীন, রাশিয়া ঘুরেছি, এসব নিয়ম আগে থেকেই জানি। কোনাে বিদেশির পক্ষে একা যেখানে সেখানে ঘােরাঘুরির নিয়ম নেই, সঙ্গে সব সময় একজন গাইড থাকে। সে দোভাষীর কাজও করে, আবার অতিথিদের গতিবিধির ওপর নজরও রাখে।

আমাদের গাইডের নাম আন্না। একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা। খুবই শুকনাে পাকানাে চেহারা, স্তন আছে কিনা বােঝাই যায় না, দশ বারাে দিন তার মুখে কখনাে একটুও হাসির রেখা দেখিনি। তবে সে ইংরিজিটা জানে খুবই ভালাে। অন্য অনেক দেশে দোভাষীদের ইংরিজি নিয়ে মাঝে মাঝে থতােমতে খেতে দেখে মজা পেয়েছি। আন্নার সময়জ্ঞানও নিখুঁত, কোথাও বেরুবার জন্য আমাদের দু'এক মিনিট দেরি হলেই সে খুব তাড়া দেয়। তারপরেও দেরি হলে বিরক্ত হয়।

প্রত্যেকবারই লেখকের দলটিতে একজনকে নেতা বা নেত্রী হিসেবে ঠিক করা হয়। সেবার আমাদের দলে ছিলেন মালায়লম ভাষায় প্রখ্যাত লেখিকা সুগথা কুমারী। তিনি সমাজসেবীও বটে, বলা যেতে পারে তিনি কেরালার মহাশ্বেতা দেবী। তাঁকেই নেত্রী করা হলাে। সব ব্যাপারেই তার খুব কৌতুহল, তিনি অনেক প্রশ্ন করেন, তাঁর সেইসব প্রশ্ন ও উত্তর শুনে আমরা লাভবান হই ।

এই প্রাগ শহর (স্থানীয় নাম প্রাহা) এক সময় ছিল বােহেমিয়ার অন্তগর্ত। তবে বােহেমিয়ান শব্দটি এখনাে চালু থাকলেও সেই শব্দে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তার সঙ্গে এখানকার বর্তমান অধিবাসীদের কোনাে মিল নেই। সব কিছুই নিয়ম কানুনে বাঁধা, মানুষজনের চলাফেরাও যেন যান্ত্রিক। আমাদের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঠাসা প্রােগ্রাম, কারখানা দেখতে যাওয়া, যৌথ খামার, বিশ্ববিদ্যালয়, লেখক সমিতি, প্রকাশক-সমিতি, শান্তি সমিতি ইত্যাদি নানান সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলােচনা, সে সব আলােচনাও নিছক দায়সারা। আসলে বেশির ভাগ সরকারি কর্মচারিই তখন সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ফুসছে, পার্টির খবরদারি সহ্য করতে পারছে না। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেটাই প্রাণপণে গােপন করার চেষ্টা।

সবগুলাে জায়গায় আমাদের যাবার ইচ্ছে থাক বা না থাক, যেতেই হবে। সেটাই আন্নার দায়িত্ব। আমার অবশ্য পরপর দৃশ্য বদল পছন্দ হয় না, অনবরত নতুন নতুন গােষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলতেও ভালাে লাগে না। মাঝে মাঝেই আমি বলি, যাও। তােমরা কারখানা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় দেখে এসাে, আমি নদীর ধারে অপেক্ষা করছি।

প্রাগ শহরটির দুটি ভাগ। নতুন অংশটির বিশেষত্ব নেই, শুধু লম্বা লম্বা বাড়ি আর অফিস-আদালত, কিন্তু প্রাচীন অংশটি বড়ই দৃষ্টিনন্দন। পুরােনাে আমলের পাথরের বাড়ি, দূরে দেখা যায় যােড়শ শতাব্দীর রাজপ্রাসাদ। শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী, সে নদীর নামটা উচ্চারণ করা শক্ত, স্লটাভা বলা যেতে পারে (Vlatava River) খুব চওড়া নয়। দু'পাশে সবুজ ঘাস, গালিচার মতন, সেখানে নানা রঙের পােশাক পরা ছেলেমেয়েরা রােদ পােহাচ্ছে শুয়েশুয়ে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে, একটু একটু আদর, খুব বেশি লজ্জাহীন নয়। অনেকে আবার পাশাপাশি শুয়ে একই বই পড়ছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে কৌতুহলী হয়ে লক্ষ করলাম, অনেকেই যেটা পড়ছে, তা ছাপা বই নয়, কোনাে বইয়ের জেরক্স কপি। ইংরিজি জানা ছেলেমেয়ে খুঁজে পাওয়া শক্ত, তবু বেশ কয়েকজনকে প্রশ্ন করার পর একজন বুঝতে পেরে বললাে, তারা পড়ছে ফ্রানৎস কাফকার বই!

এ বই কিনতে পাওয় যায় না?

-না।

-কেন?

-হারামজাদারা ফ্রানৎস কাফকার বই নিষিদ্ধ করেছে।

সে হারামজাদারই সমতুল্য একটা গালাগাল ব্যবহার করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে।

এটা একটা মজার ব্যাপার। ফ্রানৎস কাফকার জন্ম-কর্ম এই শহরে। তার বাড়িটি এখনাে আছে, অনেকেই দেখতে যায়। এ দেশের শ্রেষ্ঠ লেখক, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকের রচনা তার জন্মভূমিতে নিষিদ্ধ কেন? তার লেখায় তাে রাজনীতি নেই। তিনি কমিউনিজমের বিরুদ্ধেও কিছু লেখেননি। তার লেখা অ্যাবস্ট্রাক্ট সমাজ বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে, শুধু সেই জন্য ?

প্রকাশক সমিতির সভাপতিকে আমি পরে জিগ্যেস করেছিলাম, আপনারা কাকার বাড়ি সাজিয়ে রেখেছেন অথচ তার রচনা নিষিদ্ধ করেছেন কেন?

- নিষিদ্ধ তাে নয়।

-তাঁর বই পাওয়া যায় ?

-হ্যাঁ, পাওয়া যাবে না কেন?

—আমি যে কয়েকজনের কাছে শুনলাম, তাঁর বই জোগাড় করা সম্ভব নয়।

-তাহলে বােধহয় এখন আউট অফ প্রিন্ট হয়ে আছে।

-সৰ বই আউট অফ প্রিন্ট? কতদিন ধরে আউট অফ প্রিন্ট বলতে পারেন? তিনি খানিকটা ইতস্তত করে, কাগজপত্র দেখে বললেন, কুড়ি বছর!

একজন বিশ্ববিখ্যাত লেখকের বই কুড়ি বছর ছাপা হয়নি, অথচ নিষিদ্ধ নয়, এর চেয়ে মিথ্যে কথা আর কী হতে পারে?

যারা পড়বার তারা কিন্তু ঠিকই পড়ছে। বই যে কখনাে নিষিদ্ধ করে রাখা যায় না, তা শাসক শ্রেণির গাড়লরা কোনাে দেশেই বােঝে না।

ভ্লাটাভা নদীর ওপর যে সেতু, সেটির কিন্তু ইংরিজি নাম চার্লস ব্রিজ। বারবার সেই সেতু পারাপার করতে করতে নদীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়। এক-একবার আমি ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে গিয়ে বসি, নদীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলি। নদী বেশ বুঝতেও পারে মনে হয়।

চালর্স ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে একজন লােককে সেই নদীর বুকে পয়সা ছুঁড়ে দিতে দেখে আমার বেশ মজা লেগেছিল। আমাদের দেশে এরকম অনেক দেখেছি। গঙ্গানদী যে কত পয়সা খেয়েছে তার ঠিক নেই। এদেশেও সেরকম সংস্কার আছে নাকি? রােম শহরে একটা ঝর্ণায় পয়সা ফেলে অনেক লােককে মানত করতে দেখেছি বটে।

ভ্লাটাভা নদী তেমন গভীর নয় এখন। জলও খুব স্বচ্ছ। তলায় পয়সা পড়ে আছে, দেখা যায়।

কয়েকদিন পর আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলাে স্লোভাকিয়ার দিকে। এখানকার রাজধানীর নাম বাতিশ্লাভা। যাবার আগে আন্নার কাছ থেকে বিদায় নিতে হলে প্রচুর ধন্যবাদ জানিয়ে। যদিও মনে মনে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তার ব্যবহার ছিল কড়া হেডমাস্টারনীর মতন!

বাতিশ্লাভায় এসে বােঝা গেল, দু'অঞ্চলে অবস্থার তফাত কত প্রকট। একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থা। এখানে চাপা দেবার চেষ্টাও নেই, সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যেই অভিযােগ জানায়, এমনকি আমাদের মতন বিদেশিদের কাছেও। এদের অভিযােগ দুরকম। স্থানীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং চেকদের দাদাগিরির বিরুদ্ধে। সেই জন্যই শ্লোভাকিয়া পরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, সে খবর শুনে আশ্চর্য হইনি! যেমন মুসলমান ধর্ম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাখতে পারেনি। সেইরকম কমিউনিজমও চেক ও শ্লোভাকিয়ার মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি।

এক জায়গায় আমরা কনসার্ট শুনতে গেছি। হঠাৎ বাজনা থামিয়ে তরুণ বেহালাবাদকটি বলতে শুরু করলাে, জানেন, সরকার আমাদের পয়সা দেয়? তাতে খাওয়া জোটে না। আমি বিদেশে যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছি, তাও যেতে দেবে না শুয়ােরের বাচ্চারা !

এরকম আমি আর কোনাে দেশে শুনিনি।

বাতিশ্লাভার এক বৃদ্ধের মুখে একটা ব্যাপার শুনেও মজা লেগেছিল। শহরটির একপাশে পাহাড়। তার ওপাশেই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর। বৃদ্ধটি বললেন, আগে (অর্থাৎ সােভিয়েত ব্লকে যাবার আগে) আমরা যখন ইচ্ছে ঐ পাহাড় পেরিয়ে ভিয়েনার কোনাে রেস্তোরাঁয় চা খেতে যেতাম। এখন ওখানে যাওয়া নিষিদ্ধ। যদি বা যাওয়ার অনুমতি মেলে, তাহলেও পূর্ব জার্মানির মধ্য দিয়ে দেড় হাজার মাইল ঘুরে যেতে হয়। অথচ ঐ পাহাড়ে উঠলেই শহরটা দেখা যায়।

এটা মজার ঘটনা নয়, করুণ। বৃদ্ধাটি অবশ্য বলছিলেন হাসতে হাসতে।

একজন বৃদ্ধ বললেন, আমি এখনও কমিউনিষ্ট, এই আদর্শের জন্য লড়েছি। কিন্তু নেতাদের লােভ আর ক্ষমতা দখলের জেদাজেদি আর সাধারণ মানুষের ওপর অনর্থক কড়াকড়ির জন্য সে আদর্শ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অল্প বয়েসী ছেলেমেয়েরা যে এই আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তার জন্য আমার মতন বুড়ােরাই দায়ী।

এবারে আসল ঘটনায় আসি।

বাতিশ্লাভায় আমাদের অন্য গাইড ছিল। সে আমাদের বিমানে তুলে দিল। প্ৰাগে এসে বিমান বদল করে আমাদের যেতে হবে দিল্লিতে।

প্ৰাগে পৌঁছে আমরা শুনলাম, আমাদের পরবর্তী বিমান ১৫ ঘণ্টা পরে আসবে কোনাে কারণে।

বিমান বন্দরে একজন সরকারি অফিসার উপস্থিত। সে আমাদের এই খবর জানিয়ে, করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললাে, আমি তা হলে চলি ?

আমরা এই পনেরাে ঘন্টা থাকবাে কোথায় ? অফিসারটি কঁধ ঝাকিয়ে বললাে, সে তাে আমি জানি না!

-আপনি জানেন না মানে?

--আজ রাত্রি আটটা পর্যন্ত আপনারা আমাদের অতিথি। তারপর তাে আমাদের আর কোনাে দায়িত্ব নেই।

–বিমান লেট হলে আমরা কী করতে পারি?

-তা তাে আমি জানি না!

—আমরা রাতটা কি তাহলে এয়ারপাের্টে কাটাবাে ?

-তা সম্ভব নয়। রাত এগারােটার পর কারুকেই এয়ারপাের্টে থাকতে দেওয়া হয় না।

-তাহলে কি আমাদের হােটেলে থাকতে হবে? সে খরচ দেবে কে?

--তা তাে আমি জানি না।

ভদ্রলােক বারবার তাতাে আমি জানি না, তাতাে আমি জানি না বলে সত্যি সত্যি বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমরা যাকে বলে, অগাধ জলে ! কারুর কাছেই বিশেষ টাকাকড়ি নেই। কোন হােটেলে থাকবাে, কে পৌঁছে দেবে, কিছুরই ঠিক নেই। আগে যে-হােটেলে ছিলাম, সেটা বিরাট হােটেল, অনেক খরচ!

ভারতীয় দূতাবাসে ফোন করে যে সাহায্য চাইবাে, তারও উপায় নেই। কারণ সেটা শনিবারের রাত। শনিবার-রবিবার কারুকেই পাওয়া যাবে না।

এসব দেশের সব এয়ারপাের্টেই আর্মির লােক থাকে। সেরকম একজন জবরদস্ত পােশাক পরা লােককে আমাদের অবস্থা খুলে বললাম। যদি তিনি আমাদের এয়ারপাের্ট রাত কাটাবার অনুমতি অন্তত দেন।

আর্মি অফিসারটি সমবেদনার ভাব নিয়ে আমাদের কথা শুনলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন যে খুবই দুঃখের কথা। কিন্তু তার করণীয় কিছু নেই। এয়ারপাের্টে থাকতে দেবার অনুমতি তিনি দিতে পারেন না। আরও উঁচু জায়গা থেকে আদেশ আনতে হবে, সেটাও শনিবার রাতে সম্ভব নয়।

তিনি কাছাকাছি কয়েকটা শস্তা হােটেলের ঠিকানা বাৎলে দিলেন।

ছ’জন মিলে এক ট্যাক্সিতে যাওয়া যাবে না। এসব দেশে চারজনের বেশি কিছুতেই নেয় না। প্যারিসে দেখেছি, তিনজনের বেশি নেবে না। সামনের সিটে বসতে দেয় না কোনাে যাত্রীকে।

এখন সুগতকুমারীর অনুরােধে আমাকেই হােটেল খোঁজার দায়িত্ব নিতে হলাে।

সঙ্গে গাইড নেই, ট্যাক্সি ড্রাইভাররা ঘােরাপথে নিয়ে যাচ্ছে কিনা, কী করে বুঝবাে? অনেক দূরে দূরে এক একটা হােটেল, কোনাে হােটেলেই একসঙ্গে দু’জনের জায়গা নেই।

এই অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে কেউ রাজি নয়। সবাই ভয় পাচ্ছে। এখানকার সরকারের ব্যবহারে আমাদের হতভম্ব অবস্থা। | হােটেল খুঁজতে গিয়ে ট্যাক্সি ভাড়ায় আমার নিজের অনেক পয়সা খরচ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আমি প্রস্তাব দিলাম, আমরা প্রথমবার এসে যে ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে ছিলাম, সেখানেই যাওয়া যাক। সেটা তবু আমাদের চেনা। অতবড় হােটেলে, সেখানে একসঙ্গে দু’জনের ঘর পাওয়াও সম্ভব। | তাই হলাে। ইন্টারন্যাশনাল হােটেলে এসে আমরা আমাদের দুরাবস্থার কথা বুঝিয়ে বললাম। আগে ছিলাম সরকারি অতিথি, প্রত্যেকের আলাদা ঘর। যা খুশি খাবারের অর্ডার দিয়ে সই করে দিয়েছি। এখন থাকতে হবে নিজেদের পয়সায়। আমাদের খুব শস্তার ঘর চাই। | এসব কথা বুঝিয়ে বলতেও আমাদের কম ঝঞ্জাট হয়নি। প্রায় কেউই ইংরিজি বােঝে না। এ ওকে ডাকে, সে তাকে ডাকে। শেষ পর্যন্ত যে বুঝলাে, সেও কাঁধ ঝাকিয়ে বললাে, এ ব্যাপারে তার কিছু করার নেই। আমাদের পয়সা দিয়েই থাকতে হবে, খেতে হবে। তবে, একটা খুব বড় ঘর আছে। সেই এক ঘরে চারটি খাট, আর মেঝেতে বিছানা পেতেও শুতে পারে দু’জন। তাতে খরচ কম পড়বে।

অগত্যা আর উপায় কী! নারী-পুরুষ মিলে ছ’জন এক ঘরে। কেউ জোরে নাক ডাকে, কারুর পাতলা ঘুম। কারুর খালি গায়ে শােওয়া অভ্যেস, অথচ মহিলাদের সামনে জামা খােলা যায় না।

সব খাবারেরই বেশ দাম, তাই আমরা খেলাম শুধু সুপ আর পাঁউরুটি।

ঘর ভাড়া ছ’জন সমান ভাগ করে দেবে। আর কিছু বখশিস। আমার টাকাটা আমি রাত্রেই সুগতকুমারীর হাতে তুলে দিলাম, কারণ আমার সঙ্গে অন্য পাঁচজনের একটা তফাৎ আছে।

এই সব সরকারি প্রতিনিধি দলে যারা যায়, তারা সবাই রুটিন মতন ঘােরে ফেরে এবং নির্দিষ্ট দিনে দেশে ফিরে আসে। আমার মাথায় পােকা আছে, অত সহজে ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেই জন্যই সরকারি খরচে কোনাে দেশে গেলেও, তার কাছাকাছি কোনাে দেশ আমার নিজের খরচে দেখে আসতে ইচ্ছে করে।

এবারেও ঠিক করেই এসেছিলাম, আমি দলের সঙ্গে ফিরবাে না। ইস্তানবুল শহরটি দেখে যাবাে। ইস্তানবুলের নাম এককালে ছিল কনস্টান্টিনোেপােল, ইতিহাসের দিক থেকে এরকম রােমঞ্চকর শহর আর দ্বিতীয় আছে কিনা সন্দেহ। এই শহরের অর্ধেকটা এশিয়ায়, অর্ধেকটা ইওরােপে। তুরস্ক থেকে আমন্ত্রণ পাবার আশা খুব কম। সেই জন্য আমি দিল্লি থেকে ভিসা নিয়েই এসেছি।

অন্য সকলের দেশে ফেরার প্লেন বেলা এগারােটায়, কিন্তু আমার ইস্তানবুলের ফ্লাইট ভােরবেলা। সুতরাং, অন্যদের ঘুম না ভাঙিয়েও আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে।

কী করে ভাের চারটেয় উঠবাে, সেই চিন্তায় আমার সারারাত ঘুমই এলাে না।

যথাসময়ে আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। হােটেলের কাউন্টারে যে লােকটির ডিউটি ছিল, তারও চোখ ভরা ঘুম। আমার পাসপাের্ট ফেরৎ চাইতে সে একগাদা পাসপাের্টের মধ্য থেকে সেটা বার করে দিল। আমার ছবি-সমেত ভিসা ফর্মটি অর্ধেক বেরিয়ে আছে। | হােটেলের দারােয়ানদের ট্যাক্সি ধরে দিতে বললাম। ট্যাক্সি আর আসেই না। দেরি করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। নিজেই সুটকেস হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে ডেকে নিলাম একটা ট্যাক্সি।

এয়ারপাের্টে পৌঁছে একটা খবর জেনে খুব স্বস্তি হলাে, আমার ফ্লাইট ঠিক সময়ে আছে। আর কোনাে দেশে আমন্ত্রিত হয়ে এরকম নিজে ট্যাক্সি ডেকে একা একা এয়ারপাের্টে আসতে হয়নি। এখানে গতকাল রাত আটটায় আমাদের আতিথ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে, তারপর অতিথিরা গােল্লায় যাক বা না যাক, তাতে এদেশের সরকারের কিছু আসে যায় না।

সুটকেস চেক-ইন করে, একটা সিগারেট ধরাবার পর খানিকটা সময় নিয়ে তারপর দাঁড়ালাম ইমিগ্রেশান কাউন্টারে। তেমন ভিড় নেই। একজন মহিলা পাসপাের্ট পরীক্ষা করছেন।

আমার পাসপাের্ট ও ভিসার কাগজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা করলেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল একটু পরে পাসপাের্টটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললেন, এটা কি তােমার পাসপাের্ট ?

আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লাে। জীবনে কখনাে একসঙ্গে এমন বিস্ময় ও ভয় অনুভব করিনি।

বােমা ফাটার মতন শব্দ করে আমি বললাম, না !

পাসপাের্টের ছবিটা আমার নয়। ভিসার কাগজটা আমার। হােটেলের লােকটি অন্যলােকের পাসপাের্টে আমার ভিসার কাগজটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমিও ভিসার কাগজে আমার ছবিটা দেখেই নিয়ে চলে এসেছি। তাছাড়া, সেই সময় লােকটি আমি কেন পয়সা না দিয়ে চলে যাচ্ছি, আমার পয়সা কে দেবে, এই নিয়ে ঝামেলা বাধাবার তাল করে আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়েছিল।

ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে একজন আর্মি অফিসারকে ডেকে আনলেন।। সেই লােকটি শুনলেন সব কথা। তারপর ঠাণ্ডা ভাবে বললেন, ভদ্র মহােদয়। নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে এখনই আমার গ্রেফতার করা উচিত। কারণ আপনি অন্যের পাসপাের্ট নিয়ে এ দেশ ছেড়ে বেরুবার চেষ্টা করছিলেন। সেটা শাস্তিযােগ্য অপরাধ। তাতে আপনার কারাদণ্ড হতে পারে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটা একটা ভুলেরই ব্যাপার। আপনাকে গ্রেফতার করলাম না। এখন আপনি কী করবেন?

আমার এমনই হতভম্ভ অবস্থা যে মাথায় কিছু এলাে না।

এক ঘণ্টার মধ্যে ইস্তানবুলের প্লেন ছেড়ে যাবে। আমি জানি, পরের ফ্লাইট চারদিন পরে। সেই চারদিন আমার পক্ষে এখানে থেকে যাওয়া সম্ভব নয়। চেকোশ্লোভাকিয়ার ভিসা আমার সেদিনই শেষ, তা ছাড়া টাকা পয়সার প্রশ্ন তাে আছেই।

এখন হােটলে ফিরে গিয়ে পাসপাের্ট বদলে আনতে গেলে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাবে। আমার জন্য তাে আর ইস্তানবুলের ফ্লাইট দাঁড়িয়ে থাকবে না।

তা হলে কী উপায়?

ইমিগ্রেশানের ভদ্রমহিলা বেশ সহানুভূতিশীল। তিনি বললেন, এখন আমরা যদি আপনাকে ছেড়েও দিই, আপনি ইস্তানবুলে এই নকল পাসপাের্ট নিয়ে ঢুকতে পারবেন না। এমনকি আপনার নিজের দেশ ইন্ডিয়াতেও তত আপনাকে আটকে দেবে, সেখানে আপনাকে অন্য পাসপাের্ট নিয়ে ঢোকার চেষ্টা করার জন্য অ্যারেস্ট করবেই। তা ছাড়া, আপনি যার পাসপোের্ট নিয়ে চলে এসেছেন, সেও তাে বিপদে পড়বে একই রকম।

এই পাসপাের্টটা দেবরাল নামে একজন হিন্দি লেখকের। সে বেচারি বােধহয় এখনাে। ঘুমােচ্ছে, কিছুই জানে না।।

আর্মি অফিসারটি বললেন, আমরা কোনাে অ্যাকশান নিচ্ছি না। আপনি চেষ্টা করে দেখুন, নিজের পাসপাের্ট নিয়ে আসতে পারেন কিনা।

হােটেল থেকে এয়ারপাের্ট আসতে সময় লেগেছিল পয়তিরিশ মিনিট। ভােরবেলা রাস্তা একেবারে ফঁকা ছিল। এখন যদি আমি ট্যাক্সি নিয়ে হােটেলে যাই, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসা অসম্ভব। ঠিক আছে, ইস্তানবুল না হয় বাদ দিলাম, পরের প্লেনে অন্যদের সঙ্গে দেশে ফিরবােই বা কী করে? সে ফ্লাইটে তাে আমার বুকিং নেই। এদিককার ফ্লাইটে তিন-চার মাস আগে বুক না করলে সিট পাওয়া যায় না।

এদিকে আমার সুটকেস চলে গেছে ইস্তানবুলের বিমানে।

ভাবছি, আর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দলের কারুকে ফোন করে বলবাে, আমার পাসপোের্টটা এনে, অন্যটা নিয়ে যেতে! বুঝিয়ে বলবাে, জামা কাপড় পরে তৈরি হবে। কাউন্টারে এসে কথা বলবে, আমার পাসপাের্ট অন্য কারুকে দেবে কিনা....।

যাই হােক, আমি হােটেলে ফোন করলাম।

এই রে, এখন যে কাউন্টারে রয়েছে, সে একদম ইংরিজি জানে না। সে চেক ভাষায় আমায় কী সব বলে যাচ্ছে, আমিও তা বুঝছি না কিছুই। যত বলি, ইংরিজি জানা একজনকে ডাকো, তাও সে বােঝে না।

হঠাৎ দেখি, কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছে আন্না। এ যেন সমুদ্রে ডুবন্ত লােকের সামনে একটি কাষ্ঠখণ্ড। চোখাচোখি হতে আন্না এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললাে, সুপ্রভাত। সব খবর ভাললা? আমি তােমাদেরই মতন আর একটি দেশের অতিথিদলকে নিতে এসেছি।

আমি তার হাত জড়িয়ে ধরে বললাম, আন্না, আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি।

ঝড়ের বেগে ঘটনাটা বর্ণনা করতে হলাে আমাকে।

আন্নার মুখের রেখায় কোনাে ভাবান্তর হলাে না। নিরস গলায় বললাে, হােটেলের লােকেরা অন্যায় করেছে ঠিকই। অন্য পাসপাের্ট তােমার ভিসার ফর্ম ঢুকিয়ে দিয়েছে। তােমারও ত্রুটি হয়েছে। হােটেল ছাড়ার সময় নিজের পাসপাের্ট খুব ভালােভাবে দেখে নেওয়া উচিত। দেখা যাক, এখন কী করা যায়।

আমি বললাম, সময়টাই যে আসল। আর মাত্র পঞ্চাশ মিনিট, এদিকে আমার সুটকেস— | এসব কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সে টেলিফোন করলাে হােটেলে। ওদের ভাষায় কী বলতে লাগলাে, তা তাে আমার বােঝার উপায় নেই। কিন্তু আন্না রীতিমতন গলা চড়িয়ে ধমকাচ্ছে। মনে হলাে, সে তাহলে সাধারণ গাইড নয়, তার অন্য কোনাে সরকারি পরিচয় থাকতে পারে।

ফোন ছেড়ে দিয়ে আন্না বললাে, হােটেলের ওপর সব দোষ চাপিয়েছি। ওদের নামে নালিশ করার ভয় দেখিয়েছি। ওদের বলেছি, এক্ষুনি একটা ট্যাক্সি ড্রাইভারের হাত দিয়ে তােমার পাসপাের্ট পাঠিয়ে দিতে। অন্যটা সে-ই নিয়ে যাবে।

এরপর অধীর অপেক্ষা। ঘন ঘন সিগারেট টানা। এয়ারপাের্টে অনবরত ট্যাক্সি ঢুকছে। কোন ট্যাক্সিতে আমার পাসপাের্ট আসবে, বুঝবাে কী করে?

ঠিক পঁয়তিরিশের মাথায় দেখি, একজন ট্যাক্সি চালক একটা হাত জানলা দিয়ে বাইরে উচিয়ে রেখেছে। সেই হাতে একটা পাসপাের্ট।

এখনও বারাে মিনিট সময় আছে। দৌড়ে গেলে আমাকে ইস্তানবুলের ফ্লাইটে উঠতে দেবে। আন্নার অতিথিরা পৌঁছে গেছে। আফ্রিকার কোনাে দেশের, মালপত্রের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাকালাম আন্নার দিকে। এই মুহুর্তে তাকে কী সুন্দরী মনে হলাে। আন্নার সাহায্য না পেলে, এভাবে, এই সময়ের মধ্যে পাসপাের্ট উদ্ধার করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতাে না। আন্নাকে নিয়ে আড়ালে অনেক মস্করা করেছি, কিন্তু এদেশে সে-ই আমার সবচেয়ে উপকারি বন্ধু।

আমি তার কাছে গিয়ে বেশ আবেগের সঙ্গে বললাম, আন্না, তুমি আমার জন্য যা করলে—

আন্না বললাে, যাও। আর ভদ্রতা করতে হবে না। এরপর ফ্লাইট মিস করবে?

সে আমার গালে ঠোট ছোঁয়ালাে।

আমার মনে হলাে, এমন মধুর আদর জীবনে খুব কমই পেয়েছি।

ছুটে গিয়ে উঠে পড়লাম প্লেনে।

তারপর ইস্তানবুলে কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছি সম্পূর্ণ একা একা। কিন্তু সে তাে অন্য গল্প।

টা-নেহেসি কোট্‌স্‌-এর প্রথম উপন্যাসে ইতিহাসের সাথে অতিবাস্তব কল্পনা মিশেছে - এসি এডুগিয়ান - নিউ ইয়র্ক টাইমস - অনুবাদ আশফাক স্বপন


(নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পুস্তক সমালোচক মিচিকো কাকুতানি টা-নেহিসি কোট্‌স্‌-এর প্রবন্ধ সঙ্কলন ‘Between the World and Me’ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বইটি বর্তমান আমেরিকায় কালো মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে ধীর, মর্মবিদারক বিশ্লেষণ।‘ কাকুতানির সমালোচনার লিঙ্ক এখানে)
(https://riton.in/2NnCjl8)


টা-নেহেসি কোট্‌স্‌-এর প্রথম উপন্যাসে ইতিহাসের সাথে অতিবাস্তব কল্পনা মিশেছে
এসি এডুগিয়ান


নিউ ইয়র্ক টাইমস
২৪ সেপ্টেমবর ২০১৯

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনা
(https://riton.in/32rwW93)

Ta-Nehisi Coates’s Debut Novel Mingles History and Fantasy
By Esi Edugyan
New York Times, Sept. 24, 2019

The Water Dancer
By Ta-Nehisi Coates

কথাসাহিত্যে টা-নেহেসি কোট্‌স্‌ এর অভিষেক ঘটল The Water Dancer (জলনর্তকী) শীর্ষক বহুমেজাজি উপন্যাসের মাধ্যমে। এর আগে কোট্‌স্‌-এর নানান অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ত প্রবন্ধ আমেরিকায় বর্নবৈষম্য নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে। উপন্যাসের কাহিনি হিরাম ওয়াকার (ডাক নাম ‘হাই’) নামের এক ১২ বছর বয়স্ক ক্রীতদাসকে অনুসরণ করে। সে ভার্জিনিয়ার এক ক্রীতদাস শ্রমনির্ভর বড় খামারে কাজ করে। খামারের নামটি যেন বাস্তবতাকে ব্যঙ্গ করে - Lockless (তালাবিহীন)। হাই বুদ্ধিমান, তার নানান গুণের মধ্যে একটি হল নিখুঁত স্মৃতিক্ষমতা।

হাই খামার মালিকের ঔরসজাত পুত্র। দাসপ্রথার নির্মমতা যে কেমন স্বেচ্ছাচারী আর বিকৃত, সেটা একটি ঘটনায় প্রকাশ পেল। ঘটনাচক্রে তাকে মালিকবাড়িতে ডাকা হল তার আপন ভাইয়ের ভৃত্যের দায়িত্বপালনের জন্য। কিন্তু এক সন্ধ্যায় দুই ভাই বাড়ি ফেরার পথে একট সেতু পার হবার সময় সেতুটি ধ্বসে পড়ে। হাই-এর ভাইয়ের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু সে নিজে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। সে যে বাঁচল, সেটা শ্রেফ ভাগ্যক্রমে নয়। সে স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ করে যে তার একটা বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে সেটা সে ভালো করে বোঝে না, এমনকি চায়ও না।

মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে সে নিজের জীবনের মূল্য কী, সেটা সম্বন্ধে নতুন করেউপলব্ধি করে। সে ঠিক করে, তার প্রেয়সী সোফিয়াকে নিয়ে লকলেস খামার থেকে পালিয়ে যাবে। কিন্তু সব গণ্ডগোল হয়ে যায়, এবং অবশেষে হাই আন্ডারগ্রাউন্ড নামের একটি গোপন সংগঠনের সদস্যদের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এই সংগঠন ক্রীতদাসদের পালিয়ে উত্তরে মুক্তজীবন লাভ করায় সাহায্য করে।

আন্ডারগ্রাউন্ড হাই-এর অলৌকিক ক্ষমতা অত্যন্ত মূল্যবান সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করল। আবার হাইয়ের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ডের সাহায্যের প্রস্তাব একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে হল। এই সুযোগ শুধু সোফিয়াকে উদ্ধার করা নয়। যেই বিষময় ব্যবস্থা তার আপনজনকে বন্দী করেছে, এবার তার ক্ষতি করা, এবং অবশেষে ধ্বংস করার সুযোগ এল। তাই মাঠের ক্রীতদাসের স্বরূপ বদলে গেল, সে হয়ে উঠল মাঠপর্যায়ের কর্মী। এই বদল হাইকে রোমাঞ্চিত করে, আবার গভীরভাবে ভাবায়। হাই পরিবর্তন আনায় তার নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়।

কোলসন হোয়াইটহেডের-এর (Colson Whitehead) The Underground Railroad (পাতাল রেল) উপন্যাসে আমরা যেমনটা দেখেছি, এখানেও কোট্‌স্‌ দাসপ্রথার ভয়াবহতার সাথে অতিবাস্তব কল্পনার একটা ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। যারা ক্ষমতাহীন, লেখক তাদের গুণের চৌহদ্দি প্রসারিত করেছেন, সেখানে অতিবাস্তব ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে ‘জলনর্তকী’ একেবারেই নিজস্ব সৃষ্টি, এর অতিবাস্তবের ইঙ্গিত বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রোথিত। মোদ্দা কথা হল, উপন্যাসটির আগ্রহ ক্রীতদাসপ্রথার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া আবিষ্কারে। এই মর্মান্তিক বেদনার স্বরূপের নানান দিক উদ্ধারে কোট্‌স্‌-এর মুনসীয়ানা উল্লেখ্য।

মালিক ও ক্রীতদাস উভয়ের জীবনে যে বৈপরীত্য বিদ্যমান, সেটা বিশেষ দক্ষতার সাথে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন, একই সাথে ক্রীতদাস ও তাদের ভাবী মালিকদের লালন-পালন করার যে প্রথা চালু ছিল, যার ফলে লেখকের ভাষায় ‘একজন বড় হয়ে রাণী হবে, আরেকজন, পা-দানি,’ তার প্রতি বিশদভাবে নজর দেওয়া হয়। ঠিক একইভাবে গভীর দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে ক্রীতদাস নিলামের সভায় অসম্মানজনক শারীরিক পরীক্ষার প্রতি, যেখানে লেখকের ভাষায় ‘মানুষ আরেকটি মানুষকে সম্পূর্ণ মাংসপিণ্ড হিসেবে যাচাই করবার ক্ষমতা নিয়ে আত্মপ্রসাদ পায়।’ কোট্‌স্‌ দাসপ্রথায় আবদ্ধ মানুষের মধ্যেও যে দ্বন্দ্ব সংঘাত রয়েছে সেটা তলিয়ে দেখেন। কোন ক্রীতদাস হয়েতো অন্য ক্রীতদাসের ওপর গোয়েন্দাগিরি করে, বা কখনো কোন ক্রীতদাস নিজের উন্নতির জন্য অন্য কারো সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।

হাই নিজের অবস্থানকে আত্মস্থ করে যেভাবে সেই সম্বন্ধে আত্মসচেতনতা লাভ করে, সেটা পাঠককে সবচাইতে বিচলিত করে। ক্রীতদাস হিসেবে তার সামাজিক অবস্থান এমন গভীরভাবে তার চেতনায় গেঁথে গেছে, যে ভাল উদ্দেশ্য নিয়েও একজন শ্বেতাঙ্গ - সম্পত্তি হিসেবে নয় - একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে যখন তাকে অভিবাদন জানায়, সে আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়। কোট্‌স্‌-এর সৃষ্ট জগতে যে কোন একটা আলিঙ্গনে একটি দুর্লক্ষ্য বিস্ময়কর নতুন উপলব্ধি ঘটতে পারে।

উপন্যাসে কিছু হৃদয়বিদারক দৃশ্য আছে। উপন্যাসের এক জায়গায় এক বয়োজ্যেষ্ঠ ক্রীতদাস কী করে নাশকতার জন্য কঠোর শাস্তিভোগ করে সেই কাহিনি বলে। কাজটি সে অপরাধবোধের কারণে করেছিল। তার পুত্রের অনুপস্থিতিতে সে পুত্রের প্রেমিকাকে নিজের প্রণয়িনী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু পুত্র ফিরে আসে। সেই গ্লানি দুঃসহ। আরেকটি মর্মান্তিক দৃশ্যে এক মুক্তিপ্রাপ্ত মা ১২ বছর বয়স্ক ক্রীতদাস পুত্রকে প্রতিদিন দেখতে আসে। হঠাৎ বালকটি বিক্রি হয়ে যায়। মা পরস্পর-দড়িতে বাঁধা ক্রীতদাসের সারিতে চলমান পুত্রের পাশে হাঁটে আর অঝোর নয়নে কাঁদে।

কোট্‌স্‌ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন কীভাবে সচেতনভাবে অজ্ঞতার সাহায্যে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়। কালো মানুষের প্রতি ইচ্ছাকৃত নিস্পৃহতা দ্বারা ওদের মানবিকতা অস্বীকার করা হয়। বিষয়টি বোঝা মানেই কালো মানুষের প্রতি কিছুটা সহমর্মিতা অনুভব করা, এবং মালিকের মনে এমন অনুভূতির অনুপ্রবেশ পুরো ব্যবস্থাটির পতন ঘটাতে পারে। লেখকের ভাষায় ‘কোন মায়ের সামনে একটা ছোট বাচ্চাকে বিক্রি করতে হলে প্রয়োজন সেই মাকে যতটা সম্ভব কম চেনা। একটা পুরুষকে নগ্ন করে, তাকে প্রহারের আদেশ দিয়ে, তাকে চাবুকে চাবুকে ক্ষত বিক্ষত করে তাতে লবণপানি ছিটাতে গেলে কোনভাবেই তার প্রতি নিজের আপনজনের মতো অনুভব করা চলবে না। ওর মধ্যে নিজেকে দেখা চলবে না, পাছে হাত আটকে যায়।’

তবে একথা সত্যি যে এতে প্রথম উপন্যাসের কিছু অসংলগ্নতা রয়েছে। রোমাঞ্চকর ঘটনা সত্ত্বেও লেখায় কখনো কখনো গতিশীলতার অভাব রয়েছে। সংলাপ বড্ড বেশি বর্ণনামুখর। প্রায় প্রতিবারই হাই কোন নতুন চরিত্রের সাক্ষাত পেলেই সে বিশদভাবে হাইকে তার নিজের ইতিহাস শোনায়। যদিও কাহিনির শুরুতে আমাদের বলা হয়েছে যে মানুষ হাই-কে একজন মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তাই তারা তাকে নিজের মনের কথা না বলে থাকতে পারে না, তবুও এইসব আত্মকথন বড্ড কষ্টকল্পিত আর অস্বাভাবিক মনে হয়।

তবে উপন্যাসের অঙ্গুলিমেয় কিছু দুর্বলতায় তুলনায় এর বিশাল গুণের পাল্লাই ভারী। যখন হাই নিজে ভিটায় ফিরে আসে, নিজের জন্মস্থানের সাথে সে একধরনের দূরত্ব অনুভব করে। লেখকের ভাষায় ‘এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, নতুন দৃষ্টিতে এই স্থানটিকে দেখা। যেই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমি দৌড়েছি, কঠোর প্রশিক্ষণের সময়ে এই সম্পূর্ণ এলাকাটির পরিচয় আমি জেনেছি। এই তো লতাপাতার বাহারে সুশোভিত গাছ গাছালি দেখছি। একটু পড়েই পাহাড়। সেখানে খোলা একটুখানি জায়গা আছে, পাথরের ছাদ আছে। সেখানে দৃষ্টির কাছে বিশ্ব নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এই আঁধারী সময়ের সম্পদ মাইলের পর মাইল জুড়ে পরিষ্কার দেখা যায়। কিন্তু মনের গভীরে আমার ভয় হয়, এই বুঝি আমি ক্রীতদাসের দেশে ফিরে এসেছি, এবং এবার এই দেশের আমার ওপর নজর পড়েছে।’

হাই এর জন্য বাড়ি এখন আর একটা স্থান নয়, এটা এখন একটা মনের অবস্থা,যার অবস্থান তার প্রিয়জনের মাঝে যারা তাকে ভালোবাসে। যখন হাই ভাবে, ‘আমি জীবনে কদাচিত কাউকে বিদায় জানাবার অধিকার লাভ করেছি,’ তখন সে যেন ক্রীতদাসপ্রথায় বন্দী মানুষের মানবিক সম্পর্কের বেদনাবিদ্ধ বাস্তবতার সারকথাটি বলে। এখানে ভালোবাসা যায়, কিন্তু অধিকার লাভ করা যায় না। হাই-এর মতে সেই ভালো। কারণ মানুষের কখনো একে অপরের অধিকার লাভ করে সমীচীন নয়, এমনকি উদ্দেশ্য নিঃস্বার্থও হলেও নয়।

অবশেষে হাই আবিষ্কার করে যে মুক্তি সম্বন্ধে তার নিজের মত যাই হোক না কেন, অন্যে কীভাবে তার স্বরূপ নির্ণয় করবে সেটা হাই-এর ওপর নির্ভর করে না। এমনকি কেউ যদি খাঁচায় বন্দী থাকার পথও বেঁছে নেয়, সে তাঁদের ওপর তার নিজের মুক্তির ধারণা চাপিয়ে দিতে পারেনা। প্রতিটি মানুষকে তার নিজ নিজ মুক্তির স্বপ্ন অনুযায়ী এগোতে হবে। উপন্যাসের একটি চরিত্রের ভাষায়, ‘এই নরক থেকে সবাই বের হয়ে আসতে চায়। কীভাবে বের হবে, সেটাই আসল কথা।’

হাই যদিও কিছুটা শান্তি লাভ করে, তবুও কোথায় একটা ছায়া রয়ে যায়। এখনো যেই অনাচার চলতে থাকবে, সেটা নিয়ে তার মনে তিক্ততা রয়ে যায়। অতিবাস্তব ক্ষমতাও এই মর্ত্যে তার জীবনের নিশানা নির্ধারণ করার শক্তি দিতে পারে না। বহু শতাব্দীর অবিচার খণ্ডন বা সংশোধন করা সেই ক্ষমতার সাধ্যের অতীত। তার ক্ষমতা নেই চিরস্থায়ী সুবিচার সৃষ্টি করবার।

LISTEN TO A SAMPLE FROM THE WATER DANCER (OPRAH’S BOOK CLUB)


আশফাক স্বপন ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী উপমহাদেশীয় সংবাদ মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে ঢাকার Daily Star ও কালি ও কলম পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। তার লেখা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো ছাড়াও পাকিস্তানের Dawn, ভারতের Times of India ও Statesman পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আটলান্টায় থাকেন।

ও, এবার বুঝি আমি বাংলাদেশি? জিয়া হায়দার রহমান অনুবাদ : আশফাক স্বপন

ও, এবার বুঝি আমি বাংলাদেশি?

লেখক: জিয়া হায়দার রহমান

অনুবাদ : আশফাক স্বপন


প্রথম প্রকাশ কালি ও কলম আগস্ট ২০১৯

[যে-জনগোষ্ঠী অন্যরকম, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ থেকে ভিন্ন, তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার সারাবিশ্বে রাজনৈতিক পরিম-লকে ভয়াবহ সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। এই হিংস্র ভেদবুদ্ধিতে ভর করে মার্কিন দেশে ট্রাম্প, বিলেতে ব্রেক্সিটপন্থিরা, পূর্ব ইউরোপে নানান দেশের ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী ডানপন্থীরা এবং পশ্চিম ইউরোপে বর্ণবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভিন্ন বর্ণের অভিবাসীর জ্বালা যে কী বিষময়, সেটা নিয়ে ২০১৬ সালে লেখা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক জিয়া হায়দার রহমানের এই ক্রুদ্ধ প্রবন্ধটি এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জিয়া হায়দার রহমানের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস In the Light of What We Know সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। – অনুবাদক]

কুড়ি বছর আগে নিউইয়র্কের লোকে যখন আমায় জিজ্ঞেস করত, আমি কোথাকার লোক, আমি স্রেফ বলতাম, আমি বিলেতে বড় হয়েছি। বাংলাদেশে জন্ম হয়েছে বললে আরো একগাদা প্রশ্ন আসবে, তাছাড়া নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, আমার সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা অর্থাৎ আমার বিলেতি উচ্চারণ – সেটার উৎস সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া।

এই খাস বিলেতি উচ্চারণ সেকালের ক্যাসেট রেকর্ডারে ধারণকৃত বিবিসি সংবাদ-পাঠকদের অনুকরণ করে শেখা। ছোটবেলায় লাখ লাখ ইহুদি নিধনের কাহিনি পড়ার পর আতঙ্কিত হয়েছি; শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়রা যদি নিজেদের এত কাছাকাছি একটা জনগোষ্ঠীর

এ-অবস্থা করে, না জানি আমার কী দশা করবে।

তাই আমি খাপ খাইয়ে, তাল মিলিয়ে চলতে শিখেছি। উদ্দেশ্য এসব মানুষ, যারা জাতিগত বিভিন্নতায় এত অসোয়াস্তিতে ভোগে, তাদের কাছে যেন আরেকটু কম বিজাতীয় বলে প্রতীয়মান হই। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, আমি এমন একটা ব্রিটেনে বড় হয়েছি, যে ব্রিটেন অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি অবজ্ঞায় ঘৃণায় থুথু মেরেছে, আমাদের ঠেঙিয়েছে, দেয়ালে নাৎসি স্বস্তিকা চিহ্ন এঁকেছে।

ব্রিটেন স্বজাতীয়দের ঘরের শত্রম্ন বিভীষণের ভয় দেখায়। অভিবাসীদের বলে, মূলস্রোতে মিলেমিশে যাও, বিলেতি মূল্যবোধ আত্মস্থ করো। এই কাজটি করো, তোমার সম্মান বাড়বে। কিন্তু এই প্রতিশ্রম্নতির পুরোটাই ফাঁকি, কারণ প্রতিশ্রম্নতি পূরণের কোনো ইচ্ছাই ব্রিটেনের নেই।

সম্প্রতি আমাকে PEN Pinter Prize পাওয়া নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের সম্মানে নামাঙ্কিত বিলেতের PEN পুরস্কারের বিচারকম-লীতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই পুরস্কার এমন একজন লেখককে দেওয়া হবে, যিনি বিশ্বকে ‘নিঃসংকোচ, অবিচল দৃষ্টিতে’ দেখেন, ‘তীব্র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বুদ্ধিবৃত্তি’ দিয়ে ‘আমাদের সমাজ ও জীবনের আসল সত্যকে’ শনাক্ত করেন। সালমান রুশদি ও নাট্যকার টম স্টপার্ড আগে এ-পুরস্কার পেয়েছেন।

বিচারকম-লীর ঘোষণায় Times Literary Supplement-এর সম্পাদক পিটার স্টোথার্ডের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঘোষণায় আমার পরিচিতি এরকম : ‘জিয়া হায়দার রহমানের জন্ম বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে, লেখাপড়া করেন অক্সফোর্ডের বেলিয়ল কলেজে‌, এবং আরো শিক্ষালাভ করেন ক্যামব্রিজ, মিউনিখ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিনিয়োগ ব্যাংকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন।’

ম্যান বুকার পুরস্কার কর্তৃপক্ষ স্টোথার্ডকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বিবৃতি দিলো। তিনি একসময় বুকার পুরস্কারের বিচারক ছিলেন। বিবৃতিতে আরো দুজনের কথা উল্লেলখ করা হয় : ‘রয়াল কোর্ট থিয়েটারের সামগ্রিক শিল্পকলা-পরিচালক ভিকি ফেদারস্টোন, এবং বাংলাদেশি ব্যাংকার ঔপন্যাসিক জিয়া হায়দার রহমান।’

আমার সঙ্গে বিচারকম-লীতে আর যাঁরা সদস্য, তাঁদের নাগরিকত্ব কী সে-বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। ম্যান বুকার সে-বিষয়ে কোনো তথ্য সরবরাহ করেনি। তবে আমি যে বাংলাদেশি, সে-কথা জেনে বিস্মিত হলাম। আমার বাংলাদেশি কোনো পাসপোর্ট নেই, তবে ব্রিটিশ পাসপোর্ট রয়েছে বটে। একটা নয়, দু-দুটো, সম্পূর্ণ আইনসংগতভাবে (অহিনকুল সম্পর্ক এমন দুটি দেশ যেমন ইসরায়েল ও জর্ডানে ভ্রমণের জন্য)।

বোঝা গেল, দুটো পাসপোর্ট থাকায় আমি দ্বিগুণ ব্রিটিশ হতে পারিনি। তবে ব্রিটিশ সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার একটা প্রভাবশালী অংশ আমাকে যদি বাংলাদেশি বলে, আমি যে সত্যিই তাই তার যথেষ্ট কারণ থাকবে তো? তা না হলে এই ভুলের কারণ কী? আমরা কি ধরে নেব লাখ লাখ ব্রিটিশ নাগরিক যে উপনিবেশোত্তর নানান দেশে জন্ম নিয়েছে, বা তাদের উত্তরসূরি, সে-বিষয়ে এরা অজ্ঞ? অবশ্য আমাকে বাংলাদেশি বলার একটা সুবিধা হলো কিছু লোক এবার আমাকে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ধমকাতে পারে।

আমি নিজেকে কী বলে অভিহিত করতে চাই সেটা বড় কথা নয়, আসল কথা হলো এদেশের আপাত শিক্ষিত ব্রিটিশ মানুষ অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকদের কী বলে অভিহিত করতে চায়। মানুষের ভিন্নতা নিয়েই ব্রিটেনের সমস্যা।

এই সমস্যা এককভাবে ব্রিটেনের নয়, ইউরোপীয় সংঘ থেকে বের হওয়ার জন্য গণভোট নিয়ে ব্রেক্সিট আন্দোলন আজ ব্রিটেনে ইউরোপীয়দের প্রতি জঘন্য বিদ্বেষের চোরাস্রোত সবার কাছে উন্মোচিত করে দিয়েছে বটে; কিন্তু ইউরোপীয় মূল মহাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের একটা মিলও রয়েছে।

সম্প্রতি ওলন্দাজ টেলিভিশনে Buitenhof নামে একটি রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠানে আমি বলেছি, ইউরোপের ঔপনিবেশিক ইতিহাস তার অমত্মঃকরণে একটা কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, সেটা হলো বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ। অনুষ্ঠানের পর গতানুগতিক বর্ণবাদী চিঠিপত্র ছাড়াও অশ্বেতাঙ্গ ওলন্দাজ মানুষের কাছ থেকেও বার্তা এসেছে, যার মোদ্দা কথা একটাই। অনুষ্ঠানে যে আমি বলেছি ব্রিটেনের অবস্থা আরো খারাপ সেটা নাকি বলা প্রয়োজন ছিল না। নেদারল্যান্ডসেও অবস্থা একই রকম খারাপ। ইউরোপে অভিবাসীদের জন্য জীবন মানে প্রতিদিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আক্রমণ, তারা যে বহিরাগত সেটার নানান প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত, এসব মোকাবেলা করা।

গত কয়েক মাস আমাকে অ্যামস্টারডামে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা হয়েছে। এখানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি আবাসিক লেখক। আমার উপন্যাসের কাটতি এখানে খুব ভালো। গত মাসে আমি Boekenbale বলে ওলন্দাজ প্রকাশনা শিল্পের একটা বার্ষিক উৎসবে গিয়েছি। শুনলাম এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো উৎসবে কে কে প্রবেশাধিকার পাওয়ার যোগ্য সেই সম্বন্ধে গুজব উৎপাদন করা। অর্থাৎ একটা বিশিষ্ট, বাছাই গোষ্ঠী তৈরি করা।

আমার প্রকাশক অনুষ্ঠানের আগে এক রেসেত্মারাঁয় নৈশভোজের নিমন্ত্রণ করলেন। মাঝপথে আমার কোটের কথা মনে পড়ল – আসার পর কোথাও কোটটা রেখে আমি তার কথা ভুলে গেছি। একজন কর্মচারী আর আমি মিলে সেটা উদ্ধার করলাম। তার মধ্যে মূল্যবান জিনিসপত্র সব ঠিকঠাক ছিল। আমি ধন্যবাদ জানালাম।

‘আপনাকে এখানে পাওয়া আমাদের আনন্দ।’ উত্তরে তিনি জানালেন। কথাটা একটু কানে বাজল। ভাবলাম অনুবাদের কারণেই হয়তোবা।

‘না স্যার’, এবার স্বর নিচু। ‘বলতে চাইছি আপনাকে এখানে পাওয়া আমাদের জন্য সম্মানের ব্যাপার।’ লোকটার দিকে আবার তাকালাম। ‘আমি আপনাকে গত সপ্তাহে ‘Buitenhof’ অনুষ্ঠানে দেখেছি। আপনার কথা একদম ঠিক। তবে ওলন্দাজরা কিছু বোঝে না, কারণ তারা দেখেও দেখতে চায় না।’

‘আপনার নাম কী?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘এমিল’, আমার সঙ্গে করমর্দন করতে করতে বললেন। ‘কাজের সময় আমি এই নাম ব্যবহার করি। আমার বাবা-মা মিসরের। আমার জন্ম নেদারল্যান্ডসে। আমি এখানে সুরা বিশেষজ্ঞ। সুরা সম্বন্ধে যা কিছু জানার আছে সব আমার নখদর্পণে।’

‘আমি খুব ভালো ডাচ ভাষা বলি,’ তিনি ইংরেজিতে বলতে লাগলেন। ‘ওলন্দাজ সংস্কৃতি সম্বন্ধে বেশিরভাগ ওলন্দাজ লোকের চেয়ে আমার জ্ঞান বেশি। আমি ডাচ, কিন্তু আমাকে কিছুতেই এরা ডাচ হিসেবে গ্রহণ করবে না।’

এই কথোপকথন আমার মনে গভীরভাবে দাগ কাটল। আমি অ্যামস্টারডামের ঠান্ডা নিশীথে বেরিয়ে পড়লাম মনকে শান্ত করার জন্য।

আজকাল নিউইয়র্কের লোকে যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কোথাকার লোক, মাঝে মাঝে আমার কী খেয়াল হয়, আমি বলি ‘আমার বাংলাদেশে জন্ম।’ প্রায় কোনোবারই এই উত্তরে মানুষ নিবৃত্ত হয় না। আমার বাচনভঙ্গি শুনে বলে, ‘বুঝলাম, কিন্তু আসলে তো আপনি ব্রিটিশ, তাই না?’ নিউইয়র্কের লোকের জয় হোক! এই কথাটা শুনতে আমাকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে হয়।

আমি মানিয়ে চলতে শিখেছি। কিন্তু যখন আমার শৈশবের পাড়ার মতো হতদরিদ্র পাড়া অথবা ইস্ট লন্ডনের বঞ্চিত অঞ্চলের যে-স্কুলের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ছিলাম সেই স্কুল – এসব এলাকার শিশুদের কথা ভাবি, তখন উপলব্ধি করি যে, ঔপন্যাসিকের মতো জনসমাজের অন্তরালে আশ্রয়গ্রহণ নীতিভঙ্গের শামিল।

চিন্তাভাবনার প্রতিটি সংঘাত ঘটে ভাষার রণাঙ্গনে। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ লোকের কাছে যুক্ত পরিচয় – বাংলাদেশি-ব্রিটিশ, পাকিস্তানি-ব্রিটিশ – শুধু বিভিন্নতাকে প্রকট করে তোলে। এই নব্য পরিচয়কে একটি বহু-সাংস্কৃতিক রামধনু-সদৃশ রাষ্ট্রের নতুন সংযোজন হিসেবে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে উভয়পক্ষই এই যুক্ত পরিচিতিকে অপরপক্ষের প্রতি সাংস্কৃতিক ছাড় হিসেবেই দেখে।

শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকের জাতীয়তা নিয়ে মুখোমুখি, সরাসরি কথা বলতে আড়ষ্টতা অনুভব করে। ইতসত্মত পা নাড়ানো, গলা খাঁকারি দেওয়া, চোখে চোখ রাখতে সংকোচ – নানান ইঙ্গিতে সেটা ধরা পড়ে যায়। যুক্তচিহ্ন দিয়ে পরিচয় নির্দেশ ব্যাপারটা গোলমেলে, বেখাপ্পা; আবার এমনতরো কাউকে শুধু ব্রিটিশ বলে অভিহিত করা যেন ঠিক যথেষ্ট শাণিত নয়। ব্রিটিশদের রয়েছে ইতিহাস, বাংলাদেশি-ব্রিটিশদের সম্বল যুক্ত পরিচয়ের যতিচিহ্ন।

মানুষের গোষ্ঠীগত ভিন্নতা নিয়ে ব্রিটেনের অমত্মঃস্থ সাংস্কৃতিক জটিলতার কারণেই স্বজাতীয় ব্রিটিশের পক্ষে আমাকে ব্রিটিশ বলে অভিহিত করতে এতো কষ্ট হয়। সরল বিশ্বাসে যাদের সচেতনতা নিয়ে আশাবাদী হয়েছি, কষ্ট হয় তাদেরও।

আমি তো ব্রিটেনেই বড় হয়েছি; আমার পাসপোর্ট ব্রিটিশ, বাংলাদেশি নয়; আমি আদপেই বাংলা বলি না; সৎ নাগরিক হওয়ার সদ্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পড়শির আইকিয়া খাট জুড়তে সাহায্য করি, আরেকজনের পুরনো লাইলাক গাছ উপড়াতে সাহায্য করি; ব্রিটেনে আমার লেখাপড়া, ব্রিটেনই কর্মক্ষেত্র; ‘এই শরীর ইংল্যান্ডের, প্রতি শ্বাসে ইংল্যান্ডের বাতাস/ এর নদীর জলে বিধৌত, এই স্বদেশের সূর্যালোকে ধন্য’*; স্থানীয় গির্জার গৃহহীনদের সাহায্যার্থে চাঁদা তোলার অনুষ্ঠানে বাসনপত্র ধুয়ে দিই (কারণ ধর্মমত যাই হোক, আমরা তো সবাই নিশ্চিতভাবে সামূহিক সামাজিক আত্মীয়তার ধারণায় বিশ্বাসী); এবং আবারো বলি – এই কথা পুনরুচ্চারণের প্রয়োজন রয়েছে – আমার ব্রিটিশ পাসপোর্টে ‘বিনা বাধায়’ কথাটার উল্লেলখ রয়েছে তবু আপনি আমাকে ব্রিটিশ বলে স্বীকার করবেন না? এরপর আমি যদি আপনার সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় পোষণ করি, বাক্সপ্যাঁটরা বেঁধে দেশ থেকে পালাই, আপনি আশ্চর্য হবেন না।

আর কাঁহাতক আমি আপনাদের সঙ্গে মিলেমিশে যাব? আর কী চান আমাদের কাছে? শ্বেতাঙ্গ হতে হবে? ঠিক হুবহু আপনি হয়ে যাব?

নিউইয়র্ক টাইমস; এপ্রিল ৮, ২০১৬

মূল ইংরেজি প্রবন্ধে উলিস্নলখিত পঙ্ক্তি :

‘a body of England’s, breathing English air/ Washed by the rivers, blest by suns of home’

সম্পূর্ণ কবিতা এখানে : https://www.bartleby.com/103/149.html

মূল ইংরেজি নিবন্ধ

https://www.nytimes.com/2016/04/10/opinion/oh-so-now-im-bangladeshi.html?searchResultPosition = 9জিয়া হায়দার রহমান সম্বন্ধে New Yorker সাময়িকীতে মূল্যায়ন

https://www.newyorker.com/magazine/2014/05/19/the-world-as-we-know-itThe New York Times-এ তাঁর উপন্যাসের সমালোচনা

https://www.nytimes.com/2014/04/13/books/review/in-the-light-of-what-we-know-by-zia-haider-rahman.html?_r = 0

সাঁকো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছোটগল্প

সাঁকো

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ওরা আমার হাত দুটো পেছনদিকে মুড়ে বাঁধল নাইলনের দড়ি দিয়ে। চোখে বেঁধে দিল নিরেট কালো কাপড়। মুখের মধ্যে একটা বেশ বড় তুলোর গোল্লা ভরে দিয়ে ঠোঁটে আটকে দিল স্টিকিং প্লাস্টার। তারপর বুঝতে পারলুম, দু-তিনজন লোক আমাকে উঁচু করে তুলে বেশ খানিকটা বয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল একটা কাঠের তক্তার ওপরে।

একজন খুব ঝকঝকে পালিশ করা গলায় বলল, এবারে তুমি হাঁটো সামনের দিকে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, এক-পা এক-পা করে হাঁটো।

আমি এক-পা বুলিয়ে দেখলুম, কাঠের তক্তাটা মাত্র বিঘতখানেক চওড়া, তলার দিকে শূন্যতা।

এটা একটা সাঁকো? নীচে কোনও পাহাড়ি নদী? জ্যোৎস্নাহীন রাতে আমরা আসছিলুম একটা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, গাড়ি থেমেছিল একটা জঙ্গলের মধ্যে। এমন নিস্তব্ধতা যে বাতাসেরও কোনও শব্দ নেই।

যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই আততায়ীদের একজন হেসে বলল, হ্যাঁ, এটা তিস্তা নদীর ওপর একটা অস্থায়ী সাঁকো। জল প্রায় পাঁচ-ছ'শো ফুট নীচে। যদি পা পিছলে পড়ে যাও সঙ্গে-সঙ্গে ছাতু হয়ে যাবে। তোমাকে আর খুঁজেও পাওয়া যাবে না।

আমি বুঁবুঁ শব্দ করে বলতে চাইলুম, আমাকে এই সেতুটা পার হতে বলছ কেন?

সে ঠিক বুঝতে পেরে বলল, এটা একটা খেলা।

আমি ওইভাবেই আবার বললুম, এ-খেলা যদি আমি খেলতে না চাই?

সকৌতুক উত্তর এল, তাহলে তোমাকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হবে। তুমি গড়াতে-গড়াতে পড়বে, আমরা সেটা টর্চ ফেলে দেখব।

এরপর আমি নিজেই জিগ্যেস করলুম, আর যদি ওপারে পৌঁছোতে পারি?

আবার হাসির সঙ্গে উত্তর এল, তখন দেখবে কী হয়। নিশ্চয়ই একটা কিছু খুব মজার ব্যাপার হবে। নাউ স্টার্ট। আমরা ঠিক দশ গুনব, তার মধ্যে এগোতে শুরু না করলে...এক, দুই, তিন...

প্রথম পা ফেললুম সামনের দিকে। খুব একটা শক্ত কিছু মনে হল না। কাঠের পাটাতনটা বেশ মজবুত। এক পা সামনে দিয়ে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে তারপর দ্বিতীয় পা এগিয়ে ঠিক মতোন বুঝে নিয়ে সেটা ফেলতে হবে। এইরকম ভাবে প্রত্যেকবার। একটুও অন্যমনস্ক হলে চলবে না। অসম্ভব কিছু নয়। এর থেকেও অনেক শক্ত খেলা আছে পৃথিবীতে।

ওদের গোনা শেষ হওয়ার আগেই আমি তিন পা এগিয়ে এসেছি। কী ভাবে ওরা আমাকে? ওরা গায়ের জোরে আমাকে ধরে এনেছে বলেই আমি ওদের কাছে হার স্বীকার করব? ওরা কি ভেবেছিল, আমি কেঁদে কেটে, প্রথমেই ভয় পেয়ে গিয়ে দয়া চাইব ওদের কাছে? আমাকে এখনও চেনে না।

এই সাঁকোটা কতখানি লম্বা? তিস্তা নদী তো কম চওড়া নয়। জুবিলি ব্রিজ পার হয়েছি অনেকবার। উঁচু পাহাড়ের ওপরে হয়তো কিছুটা সরু। এ জায়গাটা কোথায়?

এ কী, আমার পা কাঁপছে কেন? মাথা ঠিক আছে, তবু পা কাঁপছে? সামনের দিকে এগোবার জন্য একটা পা তুলতেই অন্য পা-টা যেন শরীরের ভর রাখতে পারছে না। মানুষ তো এক পায়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সামনের দিকে পা বাড়ানোই দারুণ শক্ত। পাশের দিকে নয়, শুধু সামনের দিকে। একেবারে সোজা হাঁটতে মানুষ জন্ম থেকেই শেখে না।

ওদের একজন চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, কী হল, থামলি কেন? গুঁতো খাবি কিন্তু।

আমার মুখ বন্ধ, আমি উত্তর দেব কী করে? ওরা তা জানে না? অবশ্য ওদের ওই প্রশ্নের কোনও উত্তরও হয় না।

আবার ওরা বলল, হয় গুঁতো খাবি, নইলে গুলি করা হবে। থেমে থাকা চলবে না। আবার দশ গুনছি, এক-দুই-তিন...

একটা যদি লাঠি দিত ব্যালান্স রাখার জন্য! হাঃ, লাঠি, হাত দুটোই খোলা রাখেনি। ছেলেবেলায় যখন কোনও পাঁচিলের ওপর দিয়ে কিংবা রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটেছি, হাত দুটো এমনিতেই দুপাশে সোজা হয়ে গেছে, হাত দুটো তখন ডানা হয়ে যায়।

অন্ধকার রাত্তিরে চোখ খোলা থাকলেও এরকম একটু সরু সাঁকো পার হওয়া কথার কথা নয়। তবু ওরা চোখ বাঁধতে গেল কেন? তেমন প্রয়োজন হলে মানুষ নাকি অন্ধকারেও দেখতে পায়। চোখ খোলা থাকলে, আর কিছু না হোক শুধু অন্ধকারও তো দেখা যেত। অন্ধকার কি দেখার জিনিস নয়। অন্ধকার কতরকম। পৃথিবীতে কোথাও খাঁটি কালো অন্ধকার নেই।

না, অসম্ভব পা কাঁপছে। আমি পারব না। এরই মধ্যে একবার টলে পড়ে যাচ্ছিলুম আর একটু হলে। এটা অন্যায় খেলা।

ওরা আর লাঠি-ফাঠি নিয়ে গুঁতো মারতে পারবে না। তার থেকে দূরে চলে এসেছি নিশ্চয়ই! গুলি করতে পারে। কিন্তু ওদের গুলি খেয়ে আমি কিছুতেই মরব না। ওরা গুনতে শুরু করলে নয় পর্যন্ত গোনার পরই আমি ঝাঁপ দেব।

—নীলু! নীলু!

বাবার গলায় আওয়াজ। বাবা মারা গেছেন অনেকদিন আগে। বাবা এখানে এই নদীর ওপর এসে আমায় ডাকতে পারেন না। মানুষের আত্মা বলে কিছু যদি থেকেও থাকে, কিন্তু সেই আত্মা কি পাখি যে অন্ধকার নদীর ওপর এসে উড়বে? এটা আমার কল্পনা, গল্প-উপন্যাসে এরকম থাকে। অবচেতনে আমি কি শিশু হয়ে গিয়ে বাবার সাহায্য চাইছি?

—নীলু, নীলু, তুই পারছিস না? আমি তোর হাত ধরব?

—বাবা, আমার হাত বাঁধা। তোমারও কি হাত আছে?

—না, আমার হাত নেই। কিন্তু তোকে থামলে চলবে না। তুই এগিয়ে আয়, আস্তে-আস্তে, মনে কর, একটু সামনেই তোর মা বসে আছে।

—মা কি সামনে থাকে, না পেছনে?

একটা দমকা হাওয়া দিল। এতক্ষণ বাতাসের অস্তিত্বও টের পাওয়া যাচ্ছিল না। বেশ গরম, কিন্তু বেশি জোর হাওয়া ভালো নয়। একটা পা তুললেই আমার শরীরটা যেন একটা শুকনো ফুলের পাপড়ির মতন পলকা হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের ধাক্কাতেও পড়ে যেতে পারি।

আমি আর এগোতে পারছি না। না, পারব না।

পেছন থেকে ওরা গুনছে, এক দুই তিন...সাত আট...

—নীলু, নীলু, ঝাঁপ দিও না।

মায়ের গলা? না তো, অন্যরকম, অথচ খুব চেনা-চেনা। কে, তুমি কে?

—নীলু, ঝাঁপ দিও না। এসো সামনে এসো। তুমি আমায় চিনতে পারছ না নীলু?

—রিনি! সত্যি প্রথমটা চিনতে পারিনি। অথচ ভেবেছিলুম, সারা জীবনে তোমাকে ভুলব না। আশ্চর্য।

—সত্যিই তুমি আমায় ভুলে গিয়েছিলে, নীলু?

—না, রিনি, ভুলে যাইনি, আবার অনেকদিন মনেও পড়েনি তোমার কথা। এতদিন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?

—আমি তো হারিয়ে যাইনি, তুমিই অনেক দূরে চলে গেলে।

—রিনি আমার চোখ বাঁধা, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি কি আগের মতোই আছ? ঘুঘু পাখির চোখের মতন অবাক-অবাক ভাব, একটা উড়ন্ত পালকের মতন তোমার শরীর।

—কথা বলো না, নীলু, এগিয়ে এসে আমার হাত ধরো।

—আমি পারছি না রিনি, আমি আর পারব না, এই দ্যাখো, একটা পা তুলতে কতক্ষণ সময় লেগে যাচ্ছে।

—তুমি একসময় তোমার সবকিছু ছেড়ে আমার দিকে ছুটে এসেছিলে।

—আমি ছুটে গিয়েছিলুম না তুমি আমাকে চুম্বকের মতন টেনেছিলে? এখন আবার সেই রকমভাবে টানতে পারো না?

—মাঝখানে কতগুলো বছর...নীলু, তুমি সামনাসামনি না এগিয়ে পাশ ফিরে হাঁটো। দ্যাখো, তাহলে পা তুলতে হবে না। একটা পা ঘষে-ঘষে এগোবে। পা কাঁপবে না। আমি হাত বাড়িয়ে আছি তোমার দিকে।

—তাই তো, পাশ ফিরে হাঁটা কিছুটা সহজ লাগছে। রিনি তুমি কী করে জানলে? তোমাকে কি এরকম সাঁকো পার হতে হয়েছে কখনও?

আর কোনও উত্তর নেই। রিনি আসেনি। আবার অবচেতন? পাশ ফিরে হাঁটার বুদ্ধিটা রিনি দিয়ে গেল, না আমি নিজেই উদ্ভাবন করলুম? বহুদিন রিনির কথা মনে পড়েনি, রিনি হারিয়ে গেছে, না আমি দূরে চলে গেছি? একসময় রিনির খুব কাছে পৌঁছনোর জন্য সাংঘাতিক ব্যাকুলতা ছিল। কত আছে? রোদ্দুর যেমন বহু লক্ষ মাইল দূর থেকে ছুটে এসে মানুষের শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে ভেতরে চলে যায়, অন্ধকার মজ্জা-মাংস শিরা-রক্তে আলো জ্বালিয়ে দেয়, সেইরকম? না, আমি আলো জ্বালিনি, রিনিই জ্বালিয়েছিল, এক চিল-ডাকা দুপুরে ওদের বাড়ির একতলায় বসবার ঘরে রিনি আমার চোখের সামনে ওর একটা হাত তুলে বলেছিল, এই আঙুলের ডগায় কী আছে বলো তো? আমার মনে হয়েছিল, সেখানে থেমে আছে অনন্ত মুহূর্ত।

তবু আমরা পরস্পরকে হারিয়ে ফেললুম কী করে? আর রিনিকে ছাড়ব না, এবার রিনিকে পেতেই হবে। মনে করা যাক এখান থেকে ঠিক দশ পা দূরে দাঁড়িয়ে আছে রিনি, সেই আঙুলটা তুলে, আমার ওই পর্যন্ত যেতেই হবে।

—নীলু, আমি কিন্তু ঠিক দশ পা দূরেই দাঁড়িয়ে আছি। তুমি গুনে-গুনে পা ফেলে এসো।

—রিনি তোমার কাছে পৌঁছোলে তুমি আমার চোখের বাঁধনটা অন্তত খুলে দেবে? তোমাকে একবার দেখব।

—তোমার চোখ বাঁধা আছে, তাতে এক হিসেবে ভালোই হয়েছে। নীচের দিকে তাকালে তোমার মাথা ঘুরে যেত। নদীর জলে একটু আলো চিকচিক করছে। অনেক নীচে।

—নীচের দিকে তাকাব না, শুধু তোমার আঙুলের ডগাটা আর-একবার ভালো করে দেখব।

এই দশ পা যেতে আমার পা কাঁপল না। রিনি সেখানে নেই। কীসের শব্দ, অনেক নীচের নদীর জলস্রোতের? ওহে অবচেতন, তুমি আরও শক্তিশালী হয়ে রিনিকে রক্তমাংসে তৈরি করতে পারলে না? কী গাধা আমি, মাত্র দশ পা দূরে রিনি থাকবে, কেন একথা ভাবতে গেলুম? যদি ভাবতুম পঞ্চাশ পা দূরে, কিংবা সাঁকোর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে রিনি, আকাশে কালপুরুষের দিকে তার কোমল আঙুলখানি তুলে, তাহলে সেই টানে হয়তো পৌঁছে যাওয়া যেত।

কৃপণের মতন আমি মাত্র দশ পা উচ্চারণ করে রিনিকে খরচ করে ফেলেছি। এখন অবচেতন তোলপাড় করলেও আর রিনি ফিরে আসবে না।

পেছন থেকে কর্কশ হুংকার ভেসে এল—এই হারামজাদা, দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? আমরা কি এখানে সারারাত কাটাতে এসেছি? গুলি চালাব?

ওরা কি টর্চ ফেলে দেখছে আমাকে? ওরা সব মিলিয়ে ছ'জন, আমি গুনেছি। ওদের বাধা দেওয়ার কোনও উপায় ছিল না। ওরা কি অপেক্ষা করে আছে, কখন আমি পড়ে যাব? কিংবা ওরা নিজেদের মধ্যে বাজি ফেলেছে? সিনেমায় এরকম দৃশ্যে থাকে, হঠাৎ একবার পা ফসকে পড়ে যায় নায়ক। দর্শকদের বুক ধড়াস করে ওঠে। নায়ক কিন্তু সত্যি-সত্যি পড়ে যায় না, শেষ মুহূর্তে ধরে ফেলে এক হাতে। ঝুলতে থাকে। তলায় হাঁ করে আছে কুমির। নায়ক সেই অবস্থাতেও উঠে আসে কায়দা করে।

আমি পড়ে গেলেও ধরতে পারব না, আমার হাত বাঁধা। মুখ দিয়ে কাঠটাকে কামড়ে ধরারও উপায় নেই। আমার এক চুলও ভুল করলে চলবে না। তা ছাড়া আমি নায়কও নই। এটা সিনেমা নয়, এটা বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা।

বাঁচতেই যে হবে, তার কী মানে আছে! একটা কুঁড়েঘরের চাল থেকে ঝুঁকে পড়া রোমশ, হালকা সবুজ লাউডগায় বসে আছে একটা লালচে রঙের ফড়িং, তিরতির করে কাঁপছে তার ডানা, কী নিশ্চিন্ত ও আনন্দময় তার বসে থাকার ভঙ্গি, যদিও যে-কোনও মুহূর্তে একটা শালিক তাকে ঠোঁটে চেপে নিয়ে যেতে পারে। কেন এই দৃশ্যটা মনে আসছে!

আর কত দূর যেতে হবে? অর্ধেক এসেছি কি? একটা মুহূর্ত, যদি লাফ দিয়ে পড়ি, তাহলে আর কোনও যাতনা সহ্য করতে হবে না। অনেক উঁচু থেকে পড়লে বাতাসের চাপেই নাকি নিশ্বাস শেষ হয়ে যায়। অন্য যে-কোনও মৃত্যুর চেয়ে নদীর বুকে হারিয়ে যাওয়া অনেক ভালো।

দুলছে, দুলছে সেতুটা, দুলছে। ওপার থেকে কি ওরা ইচ্ছে করে দোলাচ্ছে? তাহলে ওদের খেলাটা এই, আমাকে কিছুতেই পার হতে দেবে না। মাঝ নদীতে ফেলে দেবে।

কিংবা এত লম্বা কাঠের সেতু, নীচে যদি কোনও সাপোর্ট না থাকে, তাহলে মাঝখানটা বেঁকে যেতে তো পারেই। এইখানটা চালু হয়ে গেছে, দুলছে। মানুষ নয়, এই কাঠের তক্তার দুর্বলতাই ফেলে দেবে আমাকে।

—নীলু, নীলু তুমিও তোমার শরীরটা দোলাও। নইলে ভারসাম্য রাখতে পারবে না।

—কে, গগনদা? আপনি কোথা থেকে এলেন?

—কথা বলার সময় নেই নীলু। নিজের শরীরটা দোলাও, তারই সঙ্গে একটু-একটু করে এগিয়ে এসো।

—আমি আর পারছি না, গগনদা। জল আমাকে টানছে। আর, গেলাম...

—না-না, তুমি পারবে, তোমাকে পারতেই হবে, নীলু। কাঠের তক্তার দুলুনির সঙ্গে শরীরটা দোলাও সেইসঙ্গে একটা পা বাড়িয়ে দাও, মনের জোর আন, শরীরে জোর আন, নীলু—তুমি ঠিক জয়ী হবে।

আঃ এসব কী হচ্ছে, অবচেতন! গগনদাকে কোথা থেকে এনে হাজির করলে? একইসঙ্গে শরীর দোলাব, পা বাড়াব, মনের জোর আনব, আমি কি ভেল্কিবাজি জানি? কলেজ জীবনে গগনদা আমাকে যত রাজ্যের ভুল জিনিস শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে গ্রামের ভাষায় কথা বলতে শেখ। বলেছিলেন, বিপ্লবের জন্য অস্ত্র তুল নাও। বলেছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম-ভালোবাসা বিসর্জন দাও। বলেছিলেন আদর্শের জন্য বন্ধুর বুকেও ছুরি মারবার জন্য তৈরি হও। সবগুলো এক সঙ্গে, আমার মাথা গুলিয়ে গিয়েছিল, আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলুম। যখন আমি চোখ মেললুম, তখন দেখলুম গগনদা নিজে এসব কিছু মানেননি, নিজে দিব্যি ফুরফুরে জীবন কাটাচ্ছেন। আমাকে চোখ মেলতে দেখেই তিনি বললেন, তুমি কে, আমি তোমাকে চিনি না।

বাবা, রিনি, গগনদার কথা অবচেতন থেকে উঠে আসছে কেন? এটা কি রূপক নাকি? অন্ধকার রাত্তিরে একটা খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর ওপরের বিপজ্জনক সাঁকো দিয়ে আমি একলা পার হচ্ছি, এটা কোনও প্রতীকের ব্যাপার। ক্ষুরস্য ধারা নিশিতয়া...ধারালো ক্ষুরের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার নামই জীবন, উপনিষদ-ফুপনিষদে এরকম কিছু গালভরা কথা আছে না? ষাঁড়ের পেচ্ছাপ। রূপক-টুপক কিছু না হলে বাঁচা যেত। ছ'খানা উৎকট আততায়ী জোর করে আমাকে ধরে নিয়ে এল, কেন আমার ওপর তাদের রাগ তা জানি না, আমাকে এক গুলিতে খতম না করে তারা আমাকে এই বীভৎস তামাসায় নামিয়ে দিয়েছে, সামান্য পদলন হলেই সোজা মৃত্যু, এটাই কঠোর বাস্তব। আমার জীবনে আজকের এই রাতটা শেষ হবে না বোধহয়।

—এই দুই-তিন-চার-পাঁচ...

—যাচ্ছিরে বাবা, যাচ্ছি। বাঁচতে কার না সাধ হয়? যে-কোনও উপায়ে, দাঁতে দাঁত কামড়ে সবাই বেঁচে থাকতে চায়। যাচ্ছি-যাচ্ছি।

—কাঠের তক্তার দুলুনিটা থেমে গেছে হঠাৎ। তাহলে সম্ভবত পেরিয়ে এসেছি মধ্যপথ। খুব গরম লাগছে। জামাটা খুলে ফেলতে পারলে ভালো হত। এই অন্ধকারে প্যান্টটা খুলে ফেললেই বা ক্ষতি কী ছিল, শরীরটা আরও হালকা হত। ওরা একটা ভালো কাজ করেছে, হয়তো ভুল করেই, আমাকে খালি পায়ে আসতে দিয়েছে। পায়ের আঙুলগুলো আমার বহুকাল আগের পূর্বপুরুষের মতন আঁকড়ে ধরেছে তলার অবলম্বনটা।

—নীলু তুই ভয় পাসনি, আমি সবসময় তোর সঙ্গে আছি।

—বাবা, তুমি আবার এসেছ? বাবা, তুমি যখন সঙ্গে থাকতে, তখনও কি আমি অনেক অচেনা রাস্তায় হারিয়ে যাইনি? আমি নিজেই তো শেষপর্যন্ত পথ খুঁজে পেয়েছি।

—নীলু সেইসব সময়েও বাবা-মায়ের স্নেহ ঘিরে থাকে সন্তানকে। সন্তানেরা বোঝে না, স্নেহ নিম্নগামী বলেই তারা বোঝে না, তারা বাবা-মায়ের কথা ভুলে গিয়ে নিজের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে থাকে...

ভাই অবচেতন, কেন বাবাকে ফিরিয়ে আনলে? এতে যে আমি আরও দুর্বল হয়ে পড়ব। বাবার মৃত্যুশয্যার পাশে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি, বাবার অনেক সঠিক নির্দেশ আমি মানিনি, বন্ধুবান্ধব সান্নিধ্যে, একটা অদ্ভুত ছটফটানির মধ্যে মত্ত হয়ে ছিলুম। কিন্তু এই কি সেইসব ব্যাপার নিয়ে অনুশোচনার সময়? যদি কারুকে আনতেই হয়, রিনিকে নিয়ে এসো। আর কিছু না হোক, রিনির কণ্ঠস্বরই আমাকে সঞ্জীবনী শক্তি এনে দেবে।

ওঃ হো আমার নিজেরই অবচেতন, অথচ আমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। চাইলুম রিনিকে, নিয়ে এল গগনদাকে। ওগো প্রিয় অবচেতন, তুমিও কি ওই ছ'জন অপরাধ কর্মীর মতন মজা মারছ আমাকে নিয়ে? নইলে এখন গগনদাকে নিয়ে আসার কী মানে হয়? গগনদার মতন মানুষেরা চিরকালই এইরকম বড়-বড় গালভরা বাণী দিয়ে যাবে। তা শুনে হয়তো দু-চারজন শেষ পর্যন্ত পৌঁছোবে মুক্তির দরজায়, আর বাকি যে কয়েকশো বা কয়েক হাজার টুপটাপ করে খসে পড়ে যাবে অতলে, তাদের হিসেব কে রাখবে? আমি ওই খসে পড়ার দলে। অথচ আমার বাঁচতে ইচ্ছে করে। সত্যি বলছি, মা কালীর দিব্যি, আমার ভীষণ বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। যারা নেমন্তন্ন বাড়ির বাইরে বসে এঁটো পাতা চাটে, আমি তাদের একজন হয়েও বেঁচে থাকতে চাই। আমি নদীতে আছড়ে পড়ে টুকরো-টুকরো হতে চাই না।

ডান পা, বাঁ-পা, ডান পা, বাঁ-পা, ডান পা, বাঁ-পা। আমার অবচেতন নেই। এখন সমস্ত মন শুধু আমার পায়ে। আমার চোখ বাঁধা, মুখ বাঁধা, আমার হাত বাঁধা। শুধু পা দুটো খোলা। এই পা নিয়েই আমাকে বাঁচতে হবে। আমি পিছিয়ে যেতে পারব না। আমি থেমে থাকতে পারব না। ওরা রাইফেল উঁচিয়ে টর্চ ফেলে কি এখনও দেখছে আমাকে? আর কত দূর, কত দূর, কত দূর, আমি কতক্ষণ ধরে হাঁটছি!

কাছেই যেন গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সত্যি-সত্যি মানুষের গলা, অবচেতন নয়, পিওর অ্যান্ড সিম্পল বাস্তব। আমি কি তাহলে পৌঁছে গেছি, বেঁচে গেছি। ব্রিজের এপারেও মানুষ আছে, তারা কথা বলছে। ভাগ্যিস ওরা আমার কানও বেঁধে দেয়নি। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।

একজন বলল, বাক আপ! বাক আপ! এসে গেছে! এসে গেছে! আর কয়েক পা!

আর-একজন বলল, মাই গড, সত্যি হারামজাটা পৌঁছে গেল?

আরও একজন বলল, ওনাট ইজ টু ফোর। আমি বলেছিলুম না, প্রাণের টান বড় টান। এ শালা ঠিক পার হয়ে যাবে। আমার বাজির টাকা দিতে হবে কিন্তু।

আমি থমকে গেলুম। কণ্ঠস্বরগুলো আমার চেনা। এরাই ওপারে ছিল, এরাই আমাকে জোর করে ধরে এনেছে।

কাছাকাছি আর কোনও সুবিধেজনক, নিরাপদ, সংক্ষিপ্ত সেতু আছে নিশ্চয়ই, তা দিয়ে ওরা পেরিয়ে এসেছে। সেইসব সেতুর সন্ধান, এমনকী এই অন্ধকার রাত্তিরেও ওরাই শুধু জেনে যায়। ওরা সবকিছু সহজে পায়।

ওদের একজন বলল, থামলি কেন রে। এবার জোর কদমে চলে আয়, আর কোনও ভয় নেই।

অন্য একজন বলল, এই লোকটা যে কামাল করবে, ভাবতেই পারিনি। একে একটা কিছু পুরস্কার-টুরস্কার দেওয়া উচিত।

আর-একজন বলল, নিশ্চয়ই, আমরা স্পোর্টসম্যান স্পিরিট দেখাতে জানি। ও এপাশের মাটিতে পা দিলেই ওকে উইনার বলে ডিক্লেয়ার করব। ওরে, তুই কী চাস, দেড় বিঘে জমির ওপর বাড়ি, ফরেন ট্রিপ, ওষুধের এজেন্সি, রাস্তা তৈরির কন্ট্রাকটরি—কী চাস বল?

আমার পা দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। ছেলেবেলায় একটা কথা শুনেছিলুম, খেজুর গাছের তিন হাত। সাধারণ লোকের পক্ষে খেজুর গাছ বেয়ে ওঠাই শক্ত, সবচেয়ে শক্ত শেষ তিন হাত ওঠা। তীরে এসে যেমন তরী ডোবে। আমি আর এগুতে পারছি না। না, আর-এক পা-ও বাড়ানো যাবে না।

আমার অবচেতন বলল, যাঃ, এ কী করছ মাইরি। এখানে সাঁকোর তলায় জল নেই, মাটি, তুমি এখন এক দৌড়ে পার হয়ে যেতে পারো।

আমি হেসে পেছন ফিরলুম।

ওপারে পৌঁছলেই লোকগুলো আমাকে কিছু পুরস্কার দেবে বলছে। এটা ওদের খেলা। সবাই বাঁচতে চায়, অমিও বাঁচতে চাই। কিন্তু বেঁচে থাকার মধ্যে একটা আত্মগরিমা থাকবে না? তা না হলে শুধু পোকামাকড়ের মতন...। শুধু একটা বাস্তব জীবন? কেউ সামনে একটা গাজরের টুকরো ঝুলিয়ে রাখবে, তাই দেখে ছুটে যাওয়া? আমাদের ওদের নিয়মে খেলতে হবে!

আমি উলটো দিকে ফিরে পা বাড়াতেই এপারের লোকজন হইহই করে বলে উঠল আরে-আরে লোকটা পাগল হয়ে গেছে নাকি? ওরে গাধা, কোন দিকে যাচ্ছিস? এদিকে আয়, দৌড়ে আয়, তুই বেঁচে গেছিস...

আমার মুখ বন্ধ, তবু আমি বললুম, এবার শুরু হবে আমার নিজস্ব খেলা।

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট