আরও কমলকুমার : দয়াময়ীর কথায়

আরও কমলকুমার 
দয়াময়ীর কথায়


কমলকুমার মজুমদার প্রয়াত হয়েছেন ৩৯ বছরের মত হয়ে গেল। স্মৃতির প্রবল ভার এতদিন ধরে বহন করে তাঁর সহধর্মিণী দয়াময়ী মজুমদার এখন কেমন আছেন এই অশীতিপর বয়সে ৫০ ডি হাজরা রোড-এর ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে? তিনি সত্যিই কি দিন কাটাচ্ছেন একা একা? আর সেসব জানতেই আর একবার আমার তাঁর কাছে যাওয়া। এবং কিছু ট্র্যাডিশনাল প্রশ্ন তাঁর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া। উত্তর দিতে গিয়ে তিনিও সেদিন তাঁর স্মৃতি-বিস্মৃতির বড়ো ঝুলিটি আর একবারে উলটে উপুড় করে দিলেন। হাসলেন কখনো শিশুর সারল্যে। কখনো হলেন চিন্তিত, কিছুটা বা অন্যমনস্ক। তাঁর একদা দামাল, চূড়ান্তভাবে সৃষ্টিশীল একগুঁয়ে স্বামীর বোহেমিয়ান জীবনযাপনের স্মৃতিতে কখনোবা গর্বিত হলেন, কখনো কিছুটা বিষণ্ণ, স্বামীর বিপুল না হলেও ধ্রুপদী সৃষ্টিসম্ভারের দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে। এখন মনে হয়, কমলকুমার কখনো একা নন ওই কৃতিত্বের দাবিদার, বিপুল কৃচ্ছ্রসাধনে তাঁর পত্নীই দেখিয়েছেন তাঁকে সৃষ্টির পথে অনেকটা আলো। গড়পড়তা আর পাঁচজনের মতো সুখী সংসারের গৃহকোণকে দু-জনেই এড়িয়ে গিয়েছেন সযত্নে। আর একবার সেদিন অনুরূপ মনে হল ঘোর বর্ষার বিকেল এবং বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসার গোধূলিবেলায়। কখনো নিজে হাতে চা-মিষ্টি-জল নিয়ে আসছেন ধীর পায়ে, কখনোবা কথা বলতে বলতে উঠে যাচ্ছেন—‘যাই মাধবের ঘরে আলোটা জ্বেলে দিয়ে আসি’ এই বলে। হ্যাঁ পাশের ঘরেই রয়েছেন তাঁর সারাক্ষণের সঙ্গী তাঁরই মাধব। যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ।

আর এ ঘরে, অর্থাৎ যেখানে আমরা কথা বলছি, সেখানে রয়েছে ‘এসো মা আনন্দময়ী’—দেওয়াল জুড়ে, নিরন্তর হাসছে কমলকুমারের জল রং-এর ছবিটি। শ্রী অরবিন্দ বলিয়াছেন—‘আমাদের ভগবান’ হাসেন, ‘ঈশ্বর কোটির রঙ্গ কৌতুক’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনিই তো লিখে গেছেন।

অন্যদিকে কাঠের টুলে রাখা অন্তর্জলী যাত্রা, খেলার প্রতিভা, বা গোলাপ সুন্দরী বা গল্প-উপন্যাসের, প্রবন্ধের সংগ্রহ। আর দয়াময়ীর ধীরে ধীরে দেরিতে শুরু করেও ধর্ম বিষয়ে লেখা এবং প্রকাশিত গ্রন্থগুলিও রয়েছে এ ঘরে পাশাপাশি, গাছের মতো। সব মিলিয়ে এখানে পা ফেললেই শোনা যায় রূপ আর অরূপের টুংটাং যুগলবন্দী। ক্ষীণতর হয়ে আসা গত শতাব্দীর অস্তমিত আলো...। তাঁর লেখায় পাওয়া হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার চিহ্ন প্রতিপদে।

প্র.মা : আপনার শৈশব কোথায় এবং কীভাবে কেটেছে? বাবা, মা, স্কুল, বাল্য..শিক্ষা.. এসব বিষয়ে কিছু বলুন।



দ.ম : আমার শৈশব কেটেছে কলকাতায়। পিত্রালয়ে। আদর যত্ন এবং স্নেহ ভালোবাসায়। বাড়িতে ঠাকুমা ছিলেন আমার ফ্রেণ্ড, ফিলসফার অ্যাণ্ড গাইড। তখনকার দিনে স্বাভাবিকভাবেই যৌথ পরিবারে বিরাট বাড়িতে কাকা, জ্যাঠামশাইরা সকলেই থাকতেন। তাঁদের ভালোবাসা পেয়েছি। আদরযত্নে শৈশবটা বেশ উপভোগ করেছি। শান্ত ছিলাম ছোটো থেকেই, সবাই তাই বেশি ভালোবাসত। ঠাকুমাই আমার প্রথম শিক্ষিকা। ঠাকুমা, বাবা নিয়মিত গল্পের বই উপহার দিতেন। বাবার সঙ্গে নিয়মিতভাবে ফিটনে চড়ে যেতাম নিউমার্কেট। তখন নিউমার্কেট ছিল ছোটোদের কাছে স্বপ্নের দেশ। বাবা কিনে দিতেন প্রসাধন দ্রব্য, নতুন নতুন পোশাক, পাতায় পাতায় ছবিসহ বই...। তারপর বাড়ি ফেরা আর মায়ের কাছে বকুনি...

প্র.মা : আর পড়াশোনা?

দ.ম : ঠাকুমার কথা আগেই বলেছি। ঠাকুমা পড়ে শোনাতেন রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ কাহিনি। এরপর শুরু হল স্কুলে পড়াশোনা। স্কুলে ভর্তি হওয়া। বাবার আবার সহজে কোনো স্কুলই পছন্দ হত না। মেয়ে যদি চঞ্চল, স্মার্ট হয়ে যায়। সেই সময় বাবার গুরুদেব আমার বিদ্যালয়ে ভর্তির পক্ষে সায় দিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। শ্রীশ্রী সারদেশ্বরী আশ্রমের নাম বললেন। একদিন বাবা গুরুদেবকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে গেলেন। গৌরীপুরী মাতাজি উপস্থিত ছিলেন সেদিন। গুরুদেব শুরু করলেন পরমার্থিক আলোচনা। মাতাজি ছিলেন আবাল্য সন্ন্যাসিনী। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের মন্ত্রশিষ্যা। তিনি ভাবস্থ হয়ে পড়লেন। আমার স্কুল ঠিক হয়ে গেল। পরীক্ষাও দিতে হল না। শুনেছি, ঠাকুর একদিন গৌরীমাকে বলেছিলেন ‘গৌরী তুই তোর তপস্যাপূত জীবনটাকে মেয়েদের সেবায় উৎসর্গ কর। এদেশে মেয়েদের মায়েদের বড়ো কষ্ট। তুই এই শহরেই একটা স্কুল কর। মেয়েদের লেখাপড়া শেখা। গৌরী মা তো চমকে ওঠেন। বলে ওঠেন— ‘আমি তা পারব কী করে?’ ঠাকুর বলেছিলেন ‘তুই মাটি চটকা আমি জল ঢালছি।’ এটাই আমার ছোটোবেলার বিদ্যালয় শ্রীশ্রী সারদেশ্বরী আশ্রমের প্রতিষ্ঠার গোড়ার কথা। আমার শিক্ষাদীক্ষার মূল ভিত্তি ওই আশ্রম। আমার আদর্শ।

প্র.মা : কমলবাবুর সঙ্গে প্রথম পরিচয় কোথায়, কীভাবে?

দ.ম : সব কথা এখন আর বিশদ মনে পড়ে না। তবে এটুকু মনে আছে যখন জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলে। হই হই পড়ে গেল। আতঙ্কে কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার হিড়িক পড়ে গেল। বাড়ির বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, শিশুদের সরিয়ে অন্য কোথাও বাইরে পাঠানো শুরু হল। অবশ্যই যাদের পক্ষে সম্ভব হল। আমার বাবাও আমাদের কোথাও একটা পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করলেন। আমাদের এক মাসিমার বাড়ি ছিল বিহারের রিখিয়ায়। দেওঘর থেকে সম্ভবত ৫-৬ মাইল দুরে। বাড়িটার নাম ছিল লালকুঠি। ভারী সুন্দর বাড়ি। ওই বাড়িটায় একসময় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ থাকতেন।

সে-সময় রিখিয়ায় বাঙালিদের যত বাড়ি ছিল সব ভর্তি হয়ে গেল। আমরা রিখিয়া চলে গেলুম। বাবা কলকাতায় একা থাকতেন। আর প্রায়ই গাড়ি নিয়ে সোজা চলে যেতেন রিখিয়া। কিছুদিন থেকে আবার ফিরে আসতেন কলকাতা। বাবা রিখিয়ায় থাকাকালীন অনেকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হত। বাবা সকলকে ডেকে এনে বাড়িতে আড্ডা জমাতেন। সেই সূত্রেই পরিচয় কমলকুমার মজুমদারের সঙ্গে। ওঁদের ওখানে বাড়ি ছিল। যেতেন প্রায়ই। সেখানেই পরিচয়, আলাপ, অল্পবয়সি যুবকরা রিখিয়ায় তখন রাত-পাহারার কাজে যোগ দিত।

প্র.মা : ওখানেই আপনাদের আলাপ এবং তারপর বিবাহ? আপনার ওঁকে পছন্দ হওয়ার কারণ কী ছিল?

দ.ম : প্রথমেই বলি—বিবাহ ব্যাপারটাতো নির্বন্ধ। ভাগ্য। এ বিষয়ে দু-চার কথা বলার আগে ভাগ্যেরই দোহাই দিলাম। আর পছন্দ হওয়ার কারণ ওঁর পড়াশোনা। আমারও পড়াশোনার উপর বিশেষ আগ্রহ ছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম এই ভেবে যে ওইরকম একজনের সঙ্গে বিবাহ হলে আমিও এগিয়ে যেতে পারব। যদিও তাঁর প্রকাশ্যে কোনো গুণের বিকাশ তখনও ছিল না। অধীতবিদ্যা ছিল প্রচুর এবং বহুতর। বিয়ের পর অবশ্য তাড়াতাড়িই বুঝেছিলাম, ওঁকে এগিয়ে দেওয়াই আমার একমাত্র কাজ। আমার নিজের এগিয়ে যাওয়া নয়।

প্র.মা : কমলবাবুর ছন্নছাড়া জীবনের কথা তো প্রথম থেকেই জানতেন? কীভাবে মানিয়ে নিতেন? কখনো অসুবিধা হত না?

দ.ম : আগে, অর্থাৎ আলাপের শুরুতে জানতুম না। অবশ্য পরে জেনেছিলুম। মানিয়ে নিতে পেরেছিলুম এই জন্য যে ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন অসীম ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা। জীবন কাটানো তো একটা হারজিতের খেলা। সুতরাং, চেষ্টা তো করতেই হবে জেতার জন্য। এমন কোনো জীবন আছে কি—যেখানে অসুবিধা প্রবেশ করেনি! কোথাও বেশি, কোথাও কম। তবে তা ধৈর্য, শ্রম আর বিবেচনার সাহয্যে দাবিয়ে রাখাই তো জেতা। আমি তো বরাবর সেই চেষ্টাই চালিয়ে গেছি। ঠাকুর তো বলেছেন—‘বর্ণমালায় তিনটে ‘শ, ষ, স’ আছে। সেখানে কিন্তু সহ্যের কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ সহ্য করো। সহ্য করো। সহ্য করো। তবেই জিতবে। অসুবিধা, বিশৃঙ্খলা আমাদের জীবনে খুবই হত। সেটাকে সবসময় পথ চলার ছন্দ হিসেবেই ধরেছি। আর এখন তো সবশেষে চলে যাওয়ার আশায় রয়েছি।

প্র.মা : শিল্পী কমলবাবুর বিভিন্ন দিকে পারদর্শিতার কথা কীভাবে দেখতেন?

দ.ম : সকলে যেমন দেখে, সেভাবেই। খুব একটা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কখনো দেখিনি। আমার সময় ছিল খুব কম। তা ছাড়া অন্যান্য অনেক দায়িত্ব পালন করতে হত। তবে মনে মনে বেশ ভালোই লাগত—এটা বলতে পারি।

প্র.মা : কমলবাবুর জীবদ্দশায় আপনার কোনো লেখা তো ছাপা অবস্থায় আমাদের চোখে পড়েনি?

দ.ম : আমার লেখালেখির ব্যাপারটা উনি ঠিক চাইতেন না। কারণ হিসেবে আমাকে বলতেন, ‘‘তুমি লিখলে লোকে ভাববে, ব্যাটা নিজে টুইস্ট করে লেখে আর স্ত্রীর নাম দিয়ে সোজাসুজি লেখে।’ এসব শুনে আমি আর লেখার ধারেকাছে যেতুম না।

প্র.মা : তাঁর মৃত্যুর পর আপনি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে বার দুয়েক তাঁর আঁকা ছবি, উডকাট, কিউরিও ইত্যাদির এবং আপনার অপূর্ব সূচিশিল্পের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। আগেও তো করতে পারতেন, করেননি কেন?

দ.ম :আমি ওঁকে প্রায়ই বলতুম ‘এত ছবি আঁকো তা কোথাও প্রদর্শনী কর না কেন?’ উত্তরে বলতেন—করব, করব। শেষপর্যন্ত কিন্তু করতেন না। চলে যাওয়ার আগে আমার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন—তাঁর ভাইয়ের কাছে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, কোনোদিন ছবির প্রদর্শনী করবেন না। তিনি কথা দিয়ে কথা রেখেছিলেন। ব্যাপারটি সত্যিই। কেন-না যখন তাঁর প্রদর্শনী আমি আয়োজন করেছিলুম তখন আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল : কেন এই প্রদর্শনী করা হল? উত্তরে আমি বলেছিলাম—তিনি তো এখন প্রয়াত। তিনি তাঁর কথা রেখেছেন। এ প্রদর্শনী ছাত্রদের সহায়তায় আমার আয়োজন, এতে তো কোনো আপত্তি থাকতে পারে না।

প্র.মা : বাড়িতে নৈমিত্তিক পূজার্চনার তো নিশ্চয়ই প্রচলন ছিল?

দ.ম : প্রথমদিকে কোনো নিয়ম করে হত না। পরে সি.আই.টি রোড-এর বাড়িতে পৃথকভাবে পুজোর জায়গা করা হয়েছিল। কোনো বৈরী ভক্তি নয়, বলা যায় সেবার ব্যাপার। দায়িত্বটা ছিল মূলত আমার। উনি অবশ্য সকালের দিকে রোজ ঠাকুরের কাছে বসতেন একবার। শেষের দিকে সকাল-সন্ধ্যায়, দু-বারই বসতেন।

প্র.মা : উনি তো সারাদিন এবং রাত্তিরেও অনেকটা সময় বাইরে বাইরে কাটাতেন। আপনার সময় কীভাবে কাটত?

দ.ম : এখন আর সব মনে পড়ে না। তবে ওনার বাড়ি ফিরতে ঠিকই কখনো কখনো অনেক রাত হয়ে যেত। কলকাতার বাইরে গেলে, আমার কাছে রাত্রিটা দ্রুত নেমে আসত। রান্নার কাজ শেষ হলে একবারে চুপচাপ। তবে সেলাই বা নানারকম হাতের কাজ করতুম। আর ছিল বই। বই পড়তুম। তবে কলকাতায় এসে আর ততটা একা লাগত না।

প্র.মা : একসঙ্গে কখনো সিনেমা-থিয়েটার দেখেছেন? কোনো রেস্টুরেন্টে খেয়েছেন কখনো দু-জনে?

দ.ম : না, কোনোদিনই কোনো রেস্টুরেন্টে যাইনি। আসলে আমি বারবরই নিরামিষাশী, তবে হ্যাঁ, হঠাৎ মনে পড়ে গেল—বড়বাজারে ‘হিন্দ জলখাবার’ নামে একটা খাবার দোকানে বার দুয়েক ওনার সঙ্গে গিয়েছিলাম। ওখানের খাবার ছিল খুব ভালো। জানি না এখন তার কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা। আর সিনেমা-থিয়েটার—মনে পড়ছে, ওঁনার সঙ্গে মাত্র তিনবার সিনেমা দেখেছি। আর শিশিরবাবুর (ভাদুড়ী) থিয়েটার দেখেছি। আমি নিজে অবশ্য তার আগেও দেখেছি।

প্র.মা : একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে কিছু বলবেন? পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গেছেন কখনো?

দ.ম : পশ্চিমবঙ্গের বাইরে—মনে তো পড়ে না। তবে বীরভূমের দুবরাজপুর ভ্রমণের কথাটা বেশ এখনও মনে পড়ে। ওঁর হাঁপানির অসুখ ছিল। তা থেকে কিছুটা অব্যাহতি পেতে উনি একবার পুজোর ঠিক আগেই আমাকে নিয়ে দুবরাজপুর গিয়েছিলেন। বেশ ভালো লেগেছিল। উনিও লালমাটির দেশে গিয়ে একটু সুস্থ হয়েছিলেন। ওখানে আমরা একটি মন্দিরও দর্শন করি সেবার।

প্র.মা : আপনার সাহিত্যবোধ তৈরিতে ওঁর কতটা ভূমিকা ছিল?

দ.ম : ওঁর তেমন কোনো ভূমিকা ছিল বলে মনে পড়ে না। আগেও লিখতুম। তবে বিয়ের পর বহুদিন আমার লেখা বন্ধ ছিল। তবে লেখার পরিবেশ তো ছিলই বাড়িতে।

প্র.মা : এত বাড়ি বদলাতেন কেন? অসুবিধা নিশ্চয়ই হত। নিজেদের বাড়ি তৈরি নিয়ে কখনো আপনারা ভেবেছিলেন?

দ.ম : বাড়ি বারবার বদলাতে হয়েছে নানা অসুবিধার জন্য। নানারকম অস্বস্তিকর পরিবেশ, দূরত্ব... ইত্যাদি কারণে বাড়ি বদলাতে হয়েছে ঘন ঘন। বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা নানারকম ছিল—কিন্তু তার জন্য যে সময় দিতে হয়, তা তাঁর ছিল না। কাজেই পরিকল্পনাটা কল্পনা হয়েই থেকে গেল।

একবার একটা মজার ব্যাপার হল। উনি তো সবসময়ই নানা ধরনের প্ল্যান-প্রোগ্রাম করতেন। তখন উনি সাউথ পয়েন্টে ঢুকেছেন। ওঁর পরিকল্পনায় উৎসাহিত হয়ে প্রণব বসু রায় সব দায়িত্ব মাথায় নিয়ে বাড়ি তৈরির ব্যাপারে এগিয়ে এলেন। প্রণবেরও বাড়ি হবে। ওনার সঙ্গে। প্রণব খোঁজখবর নিয়ে জায়গা-জমির ব্যবস্থা করল। একটা ছুটির দিন ঠিক হল ওঁরা দু-জনে জমি দেখতে যাবেন। সেইদিন তারপর এগিয়ে এল। কিন্তু ওঁর আর সময় হল না। ‘এখুনি উঠছি’ বলতে বলতে সময় পেরিয়ে গেল। উনি সেই যে লেখার খাতায় ডুবে রইলেন, আর তাঁকে ওঠানো গেল না। এরকম কতবার যে হয়েছে তা আর বলার নয়। বাড়ি হয় আর?

প্র.মা : শুনেছি বা পড়েছি আপনাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা কখনো ছিল না। বিশেষত শেষদিকে। কীভাবে সামলাতেন এসব?

দ.ম : এটা সত্যিই মিরাকেল। আমি ভেবেও এর উত্তর পাইনি। তবে এটা জানি আমার একটি জন্ম-জন্মান্তরের ছেলে সবসময় আমার সঙ্গে আছে, সেই সব ম্যানেজ করে দেয়। আমি মনে-প্রাণে এই বুঝেছি। যেনবা লৌকিক জগতে এক অলৌকিক ঘটনা। মোটেও রটনা নয়। তাঁকে বিশ্বাস করতে হয়। নির্ভর করতে হয়। তাহলে সবই হয়ে যায়।

প্র.মা : আপনারা কোনো গুরুদীক্ষা নিয়েছিলেন? বাড়িতে গোপালকে কীভাবে পেলেন?

দ.ম : আমি মন্ত্রদীক্ষা পেয়েছিলাম স্বপ্নে। সে-কথা ভাবলে আজও রোমাঞ্চ হয়। তবে উনি সেভাবে কিছু নেননি। কিন্তু জপ-ধ্যান করতেন। গোপাল প্রথম আমাদের বাড়িতে আসে ‘কিউরিও’-রূপে। উনি মাঝে মাঝেই ওই কিউরিও সংগ্রহে মেতে উঠতেন। হয়তো মাসের প্রথমে গোটা মাসমাহিনাটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাড়ি ফিরলেন সব মূল্যবান কাঠের, ধাতুর জিনিস সংগ্রহ করে। ওইভাবেই গোপালের ধাতুমূর্তি একদিন বাড়িতে আসে। রয়ে যায়। আমার খুব ভালো লাগত। তাকিয়ে থাকতাম শেষে আমি তাকে বাড়িতেই রেখে দিই। হস্তান্তরও হয় না। সেই থেকেই গোপাল আমাদের সঙ্গে। সারাক্ষণের জন্য।

প্র.মা : কমলবাবুর ঈর্ষণীয় কিউরিও সংগ্রহের কথা অনেক তো শুনেছি, বাড়িতে ছিলও। সেসব কোথায় গেল?

দ.ম : বেশিরভাগই ওঁর মৃত্যুর পর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতে এবং কলকাতার জহরলাল নেহরু মিউজিয়ামে দিয়ে দিয়েছি। শান্তিনিকেতনে গেছে পিতলের ও অন্যান্য ধাতুর সংগ্রহগুলি। কাঁথা আর বিদেশি কিউরিওগুলো গেছে মিউজিয়মে।

প্র.মা : ওঁর তো ফরাসি ভাষায় বুৎপত্তি ছিল। সেসব বইপত্তর নোটসগুলো গেল কোথায়?

দ.ম : ওগুলো সব দিয়েছি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মি: গুঁই নামে এক ভদ্রলোক নিয়ে গেছেন। যতদূর মনে পড়ে। এখন আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই।

প্র.মা : আর আঁকা স্কেচ-ছবিগুলো?

দ.ম : অনেকটাই গেছে সাউথ পয়েন্ট স্কুলে। তখন ওরা দশ হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে। যদিও পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি সেগুলো সযত্নে সেখানে রক্ষিত হয়নি। এটা খুবই দুঃখের। আর বেশ কিছু স্কেচ— যা প্রদর্শনীর সময় ফ্রেমিং করা হয়েছিল, সেগুলো বাড়িতেই পড়ে ছিল। ধুলোয় নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ঠিকভাবে রাখতে পারছিলাম না। বাকিটুকু তোমরাই ভালো জানো। তোমাদেরই উদ্যোগে কলকাতার এক শিল্পপ্রেমিক শ্রীযুক্ত নিতাই ঘোষ আমাকে অবাক করে, উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে নিজে এসে বাড়ি থেকে নিয়ে গেছেন। নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার জন্য। তোমাদেরই কাছেই তো শুনেছি উনি অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে সেগুলি শুধু রক্ষণাবেক্ষণই করছেন না, নতুন করে ছবিগুলি রেস্টোর করিয়ে ওঁর নিজের অফিসে ফ্রেমিং করিয়ে রেখেছেন। কেউ দেখতে চাইলে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। শ্রীযুক্ত ঘোষকে এই সূত্রে আমার পক্ষ থেকে আর একবার ধন্যবাদ জানাই। সেই টাকা থেকে কিছুটা আমি কমলকুমার মজুমদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টেও দিয়েছি। ট্রাস্ট পরিচালনা করার জন্য।

প্র.মা : কমলকুমার মজুমদার মেমোরিয়াল ট্রাস্ট তো আপনারই বিশেষ আগ্রহে ও তাড়ায় গঠিত হয়েছে। সেখান থেকে আপনার বিশেষ কোনো প্রত্যাশা আছে?

দ.ম : প্রত্যাশা, ট্রাস্টটি তাঁর স্মৃতিতে কিছু করুক। যেমন এখন বছরে একবার তাঁর জন্মদিনে স্মারক বক্তৃতার আয়োজন নিয়মিত হচ্ছে, যা এই শহরে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ভবিষ্যতেও আমার অবর্তমানে এটি চলুক আমার প্রত্যাশা শুধু এই।

প্র.মা : ট্রাস্ট থেকে ওঁর একটি নির্বাচিত রচনা সংকলন প্রকাশ করলে কেমন হয়?

দ.ম : খুব ভালো প্রস্তাব। আমার তো ভালোই লাগবে।

প্র.মা : ওঁর লেখা গল্প-উপন্যাসের মধ্যে আপনার প্রিয় কোনগুলি?

দ.ম : অন্তর্জলী যাত্রা আমার সবচেয়ে প্রিয়। গল্পের মধ্যে ‘মতিলাল পাদরী’।

প্র.মা : ওঁর লেখা, ছবি আঁকা, উডকাট, চলচ্চিত্র চিন্তা—এসব নিয়ে কখনো আপনার সঙ্গে আলোচনা হ’ত?

দ.ম : সেরকম কিছু আর মনে পড়ে না। তবে সারাদিন ধরে এসব কাজ করে বা লিখে আমার হাতে দিয়ে কখনো কখনো বলতেন—দেখে রেখো। বলে বেরিয়ে যেতেন।

প্র.মা : ওঁর লেখা ডায়রি, টুকরো লেখা, নোটস ইত্যাদিগুলো সব কি প্রকাশিত হয়েছে?

দ.ম : কিছুটা হয়েছে। তোমরা অনেকটাই করেছ। আবার অনেকটা খোয়া গেছে। কোনো হদিশ পাইনি। এই সূত্রে আমি সকলের কাছে আর একবার অনুরোধ রাখছি, এসব রচনাগুলো কারুর কাছে যদি থাকে বা কেউ সংগ্রহ করলে সেগুলি যেন ট্রাস্টের হাতে দিয়ে দেন। ভবিষ্যতে ট্রাস্ট সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণ করবে। প্রকাশ করবে।

প্র.মা : অনেক কাঠ-খোদাই-এর কাজ প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছিল। সেগুলো?

দ.ম : ওই মূল্যবান কাজগুলো যেভাবে আমার সংগ্রহ থেকে চোখের সামনে চুরি হ’য়ে গেল তা খুবই দুঃখের। ভাবা যায় না।

ওঁর একজন প্রাক্তন ছাত্র—প্রায়ই আসত তাঁর কাছে। তখন আমার সঙ্গে তেমন পরিচয় ছিল না। তারপর ওঁর ছবি, কাঠ খোদাইয়ের কাজগুলো নিয়ে প্রদর্শনী হওয়ার পর সেসব কাজের খুব প্রশংসা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। যেদিন প্রদর্শনী শেষ হল সেদিন প্রদর্শনী কক্ষে ওঁর সেই ছাত্র আমার কাছ থেকে কাঠ খোদাইয়ের কাজগুলো চেয়ে নিয়ে গেল, বলল, দেখা হয়ে গেলে পরে আমাদের বাড়িতে ও সব ঠিকভাবে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আমার মনে তখন বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি। আমি ওকে বলামাত্র দিয়েছিলুম। পরে ও ফেরত দেওয়ার নাম করে আমার অবর্তমানে একটা কাগজের মোড়কে একটা ছোটো গোলাকৃতি কাঠে গাছ আঁকা একটি কাজ আমার মায়ের হাতে ফেরত দিয়ে যায়। পরে আমি তো দেখে অবাক। বাকি কাজগুলো সব গেল কোথায়? আর তার সাড়া কিছুতেই পাই না। অনেক চিঠি দিয়েছি। লোকও পাঠিয়েছি। ফিরিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, পুরোপুরি অস্বীকার করেছে সেই কাজগুলোর প্রাপ্তি বিষয়ে। আমি তার আচরণে স্তম্ভিত হয়ে যাই। এইভাবে শিল্পীর কাজ আত্মসাৎ করা যায়—ভাবতেই পারি না।

প্র.মা : ওঁর যেসব ছাত্র প্রদর্শনীতে আপনাকে সাহায্য করেছিল তারা কে কে?

দ.ম : সবার নাম হয়তো এখন ঠিক বলতে পারব না। যাদের নাম মনে আছে—আশীষ, অরূপ, ভাস্কর...আরো অনেকে। এদের মধ্যে সবার আগে থাকত শুভ। শুভ মুখোপাধ্যায়। এদেরই অক্লান্ত পরিশ্রমে আর আন্তরিক ভালোবাসায় তৎকালীন প্রদর্শনীটি সার্থকভাবে আয়োজিত হয়েছিল। এদের ওই ভালোবাসার স্মৃতি চিরদিন অম্লান থাকবে। সেই সঙ্গে মনে পড়ে শিল্পী নিখিলেশ এবং মি: এস ভট্টাচার্য যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন শিল্প-প্রদর্শনীতে।

প্র.মা : কমলবাবুর বিষয়ে আর মাত্র দুটি জিজ্ঞাসা। ওঁর লেখার দুর্বোধ্যতা আর শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করে রচনা শুরু করা—আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে কখনো এসব আলোচনা হয়েছে?

দ.ম : হ্যাঁ। প্রথমদিকে আমি প্রায়ই ওঁকে বলতাম—তোমার লেখা আমরা, সাধারণ পাঠকরা পড়ব কী করে? কিছুই তো বুঝতে পারি না। হয়তো মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করলাম একটি বাক্য। তা যে কখন কোনদিকে চলে গেল—বোঝা দায়। কোনো খেই পাই না। এরকম ভাষা কেন? উনি কিছু না বলে একবার আমাকে একটি বই পড়তে দেন। পুরোপুরি বইটির নাম মনে নেই, তবে আগেও বলেছি—আবার বলছি... ‘ব্রাহ্মণ্যযুগের...’ বইটির নাম এরকম কিছু। আমি তা পড়ে তো আবাক। তারপর থেকে আর কিছু এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতুম না। তবে হ্যাঁ, একেবারে শুরুর দিকে ওঁর লেখার ভাষা খুবই সহজবোধ্য।

আর লেখার শুরুতে ঠাকুরকে স্মরণ? প্রথমের দিকে এসব থাকত না। একটা সময়ের পর উনি বললেন—ব্যাটারা ঠাকুর মানে না। অন্তত আমার লেখার মাধ্যমে একটু স্মরণ করুক। ছাপতেও সম্পাদকরা বাধ্য হতো। তাঁর নির্দেশ থাকত হুবহু ওসব ছাপতে হবে। যাঁরা ধর্মধ্বজিতায় অনুপ্রাণিত তাদের একটু শিক্ষা দেওয়া—এই কথাই মনে হয়।

প্র.মা : সত্যজিৎ রায় তো ওঁর বন্ধু ছিলেন। কখনো আপনার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে?

দ.ম : হ্যাঁ। একবার সত্যজিৎবাবু আর চঞ্চল চট্টোপাধ্যায় আমাদের হ্যারিসন রোডের বাড়িতে হঠাৎ বহু খুঁজে পেতে এসে হাজির। নমস্কার বিনিময় হয়েছিল তখন। তখন এতো ছোটো ছোটো বাড়িতে থাকতে হয়েছে। উনি কাউকেই তো ঠিকানা জানাতেন না। কেউ আচমকা এলে অসুবিধায় পড়তে হত। সত্যজিৎবাবুর মাকে উনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। তবে সেবার আমাদের বাড়িতে কেন এসেছিলেন—এখন আর মনে পড়ে না।

প্র.মা : শুনেছি ‘দ্য রিভার’ ছবির শুটিং-এ এসে কমলবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল রেনোয়াঁর। কিছু মনে আছে আপনার?

দ.ম : হ্যাঁ উনি সাউথ পয়েন্ট স্কুলে এসেছিলেন। তার আগে উনি রেনোয়াঁ সাহেবের সঙ্গে গ্র্যাণ্ড হোটেলে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তখন থেকেই পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। বাড়িতে ওনাকে আনার অসুবিধা ছিল বলে স্কুলেই আসতে বলেছিলেন। একবার সুনীলও (গঙ্গোপাধ্যায়) অনেক খুঁজে আমাদের বাড়িতে, সম্ভবত পাতিপুকুরের বাড়িতে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আসলে বাড়িটা কোথায় তা জানতেই এসেছিল। ওর বন্ধুদের দূরে রেখে একা আমাদের বাড়িতে ঢোকে, আমাকে প্রণাম করে খোঁজখবর একটু নিয়েই চলে যায়। উনি তখন অবশ্য বাড়িতে ছিলেন না। এত ঘন ঘন বাড়ি বদলানো হত যে কেউ ওনার বাড়ির হদিশ পেতেন না।

প্র.মা : মনে তো হয়—আপনার বাড়ি শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবধারায় তখন থেকেই অনুপ্রাণিত।

দ.ম : না সেরকম কিছু নয়। ওটা আমাদের ব্যক্তিগত ভালোলাগার ব্যাপার থেকেই এসেছে। কোনো দিন তারিখ ধরে আনুষ্ঠানিক কিছু নয়।

প্র.মা : এখন আর বলতে নিশ্চয়ই দ্বিধা নেই। ওঁর রাত্রে মাঝে মাঝে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরার বিষয়টিকে কীভাবে দেখতেন?

দ.ম : প্রথম প্রথম এই ব্যাপারটা জানতুম না। তারপর প্রথম যখন জানতে পারলুম খুবই খারাপ লাগত। অনেক বারণ করেছি। বলেও কিছু লাভ হয়নি। তখন আর কিছু না মনে করে সবটাই মানিয়ে চলতে হত। প্রত্যেকটা পদক্ষেপই তো আমি মানিয়ে চলেছি। তাই অসুবিধা হয়নি। শেষের দিকে উনি বাড়িতেই খেতেন। অসুস্থও হয়ে পড়লেন।

প্র.মা : নি:সন্তান আপনি। এই বয়সেও দীর্ঘদিন—বছর ধরে একা একা বাড়িতে থাকতে হয়। ভয় করে না?

দ.ম : না অভয় পদে প্রাণ সঁপেছি। কিসের ভয়? এখন তো ভাবি ভাগ্যিস সন্তান হয়নি—তাহলে কী যে হত কে জানে?

প্র.মা : আর্থিক দিকটা? সংসার চালানো?

দ.ম : পশ্চিমবঙ্গ সরকার মাসিক একটি গ্রান্ট দেয়। ছ মাস অন্তর পাওয়া যায়। খুব বেশি কিছু না হলেও তা খুব কাজে লাগে। আর এখন আনন্দ পাবলিশার্স ওনার বইগুলোর রয়্যালটি দেয়। মাঝে মাঝে ছোটোখাটো পাবলিশার অল্প হলেও কিছু রয়্যালটি দেয়। এসব মিলে আমার আর মাধবের ঠিকই চলে যায়।

প্র.মা : এসব দেখাশোনা কে করেন আপনার? কোথাও আসা যাওয়া আপনার পক্ষে তো সম্ভব হয় না।

দ.ম : এতদিন ধরে প্রণব বসু রায়ের পরিবার আর ওর স্ত্রী সবিতা। ওরাই এখন আমার সব—সন্তান সন্ততি। এত বছর ধরে এসব হাসিমুখে করে যাচ্ছে। এখন প্রণব নেই। ওর স্ত্রী আসে ওর মেয়ে আসে। ওরা না থাকলে কী অসুবিধা যে হত। তোমরাও তো রয়েছো। উৎপল কেমন আছে? ফোন করব একদিন।

প্র.মা : কমলবাবু চলে গেছেন ৩৯ বছরের বেশি। তাঁর বেশিরভাগ বই প্রকাশিত হল তাঁর মৃত্যুর পর। আপনি না থাকলে এসব কীভাবে প্রকাশিত হত? আপনার এই নিষ্ঠা, ত্যাগ, কৃচ্ছসাধন দেখে মনে হয় আপনিও তাঁর কাজে, সৃষ্টিশীলতায় এতদিন ধরে অনেকটাই সাহায্য করলেন।

দ.ম : এর উত্তর তোমরাই দেবে—যারা আমাকে অনেকদিন ধরে দেখছো। ঠাকুর হয়তো এজন্যই আমাকে রেখেছেন। জানি না আমি সব দায়িত্ব পালন করতে পারলুম কি না। তবে চেষ্টা তো করেছি। নানা অসুবিধার মধ্যেও। জানি না আর কতদিন করে যেতে হবে।

কমলকুমার মজুমদার
সংক্ষিপ্ত জীবন


১৯১৪ সালের ১৭ নভেম্বর কলকাতায় জন্ম। বাবা প্রফুল্লচন্দ্র মজুমদার, মা রেণুকাময়ী। কমলকুমার বাবা-মার জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁরা সাত ভাই বোন। নীরদ মজুমদার, অমিয় মজুমদার, চিত্তরঞ্জন মজুমদার, বাণী মজুমদার, গীতা মজুমদার ও শানু মজুমদার। পরবর্তীকালে তাঁর বাবা বিহারের রিখিয়ায় একটি বাড়ি কেনেন। কলকাতায় ১২৭, রাসবিহারী এভিনিউয়ে একটি ভাড়াবাড়ি ছিল।

বিদ্যালয় শিক্ষা বিষ্টুপুর শিক্ষা সংঘ বিদ্যালয়ে, পরে কলকাতার ক্যাথিড্রাল মিশনারি স্কুল এবং ভবানীপুর টোল।

শৈশবেই তিনি তাঁদের বাড়িতে আসতে দেখেছেন নিরুপমা দেবী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ কুমার রায় প্রমুখকে। এই সূত্রেই তাঁর ফরাসি শিক্ষা, নাট্যচর্চা ও উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু হয়।

চার বন্ধু তাঁদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে তৈরী ‘বনীকন’ নামে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্র স্থাপন করেন। এঁদের উদ্যোগেই ‘উষ্ণীষ’ পত্রিকার প্রকাশ। তাঁদের নেওয়া শরৎচন্দ্রের সাক্ষাৎকারও এখানে প্রকাশিত হয়।

তিনি এবং তাঁর ভাই শিল্পী নীরদ মজুমদারের উদ্যোগে তাঁদের বাড়িতে নাচ, গান, ছবি আঁকার বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বাড়িতে সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতির চর্চা তখন থেকেই।

১৯৪৩ তে জাপানী বোমার ভয়ে অনেকেই যখন কলকাতা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তাঁরাও সপরিবারে রিখিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে পারিবারিক আর্থিক দুরবস্থার জন্য কমলকুমার কলকাতায় ফিরে আসেন এবং নানান স্বনিযুক্তি ব্যবসায় আগ্রহী হয়ে প্রভূত পরিমাণে অর্থ রোজগার শুরু করেন। ব্যয়-বিলাসেও প্রাচুর্য দেখা যায়। ১৯৪৭ সালে শ্রীমতি দয়াময়ী রায়ের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হলে রিখিয়ায় কিছুদিন বসবাস করেন। তারপর কলকাতা ফেরেন এবং আনন্দ পালিত রোডে ভাড়া বাড়িতে দুজনে বসবাস শুরু করেন। কলকাতায় ফরাসি পরিচালক জাঁ রেনোয়া ‘দ্য রিভার’ ছবির শুটিং-এ এলে তাঁর সংস্পর্শে আসেন। এসময় তাঁর স্থায়ী চাকুরি না থাকায় বিজ্ঞাপন লেখা, নক্সা তৈরি, পত্রপত্রিকায় নানা ধরনের লেখা লিখতে শুরু করেন।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় ও সিগনেট প্রেসে যুক্ত হন। গল্প লেখা চলতে থাকে। ‘চলচ্চিত্র’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় কমলকুমার, সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত ও সুভাষ রায়ের সম্পাদনায়। তিনি এখানে লেখেন প্রবন্ধ ‘চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার’। সচিত্র ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে কখনও নামে, কখনও ছদ্মনামে তাঁর গল্প ফিচার ইত্যাদি। চতুরঙ্গ পত্রিকায় গল্প এইসময় লেখেন। অশোক মিত্র-র অনুরোধে জনগণনার কাজে যুক্ত হন এবং গ্রাম বাংলাকে নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ হয়। ঘোরেন গ্রাম বাংলার মাঠে ঘাটে মন্দিরে মসজিদে।

সম্পাদনা শুরু করেন গোয়েন্দা পত্রিকা ‘তদন্ত’। কিছুদিন পর তাও বন্ধ হয়ে যায়। ঘন ঘন বাড়ি বদলাতে থাকেন। গ্রে স্ট্রিট, এস কে দেব রোড ছেড়ে পাতিপুকুর আসেন।

১৯৫৩ সালে ‘সিগনেট’ এর কর্ণধার ডি.কে গুপ্ত-র উদ্যোগে ‘হরবোলা’ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা। কমলকুমার ‘হরবোলা’-র পরিচালক রূপে নাটক প্রযোজনা শুরু করেন। ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ অভিনীত হয়।

১৯৫৪ সালে ‘ঈশ্বর গুপ্ত’ : ছড়া ও ছবি - তাঁর কাঠখোদাই এর সঙ্গে ঈশ্বর গুপ্তর ছড়ার বইটি প্রকাশিত হয়। ‘হরবোলা’ থেকে কিছুটা বিযুক্ত হন। ১৯৫৫ সালে চিত্রকলার শিক্ষক রূপে সাউথ পয়েন্ট স্কুলে যোগদান করেন।

বিখ্যাত গল্পগুলি একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে। মতিলাল পাদরি, তাহাদের কথা। অবশেষে ১৯৫৯ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি চলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নাট্য প্রযোজনা। কয়েকদখানা, নিম অন্নপূর্ণা, ফৌজ-ই-বন্দুক এসব নজর কাড়া গল্প লেখেন। জনসেবক পত্রিকায় রবিবারের পাতায় ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করেন ‘রোজনামা’।

নির্মাল্য আচার্য ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় বড়োগল্প ‘গোলাপ সুন্দরী প্রকাশিত হয়। পুস্তকাকারে ১৯৬৯-তে কথাশিল্প থেকে প্রকাশিত হয় ‘অন্তর্জলী যাত্রা’।

গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন চিত্রনাট্য রচনাও করেন তখন। লোকশিল্প, টেরাকোটায় রামায়ণ, বাংলার মন্দিরে টেরারোটা, বাংলার সাধক এগুলি তার মধ্যে অন্যতম।

১৯৬৩-তে আর একটি উপন্যাস ‘অনিলা স্মরণে’ প্রকাশিত হয় ‘দর্পণ’ পত্রিকায় আর ‘এক্ষণ’ এ ‘শ্যামনৌকা’। আলমগীর, এমপারার জোনস নাটক দুটি মঞ্চস্থ করেন।

১৯৬৫-তে প্রকাশিত হয় ‘সুহাসিনীর পমেটম’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় তাঁরই কাঠ খোদাইয়ের প্রচ্ছদে। সুবর্ণরেখা থেকে প্রকাশিত হয় ছড়া ও তাঁর কাঠখোদাইয়ের সংকলন ‘পানকৌড়ি ’। আনন্দমোহন ঘোষের সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদনায় ‘অঙ্কভাবনা’ পত্রিকার প্রকাশ। দুটি মাত্র সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭-তে তাঁর পরিচালনায় আবার ‘এমপারার জোনস’, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ মঞ্চস্থ হয়। তাঁর পিতার মৃত্যু হয় ১৯৬৮ সালে। ‘এক্ষণ’ শারদ সংখ্যায় ‘রুক্ষিণী কুমার’ প্রকাশিত হয়। ঠিক পরের বছরেই ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’ প্রকাশিত হয় ‘এক্ষণ’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায়।

১৯৬৮ সালে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়।

১৯৭০-১৯৭১ তে লেখেন ‘কালই আততায়ী’ গল্পটি, যা ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায়। এ সময়েই লেখা ‘পূর্ববঙ্গ সংগ্রাম বিষয়ে’ নামে একটি রচনা, প্রকাশিত হয় ‘দর্পণ’ পত্রিকায়। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বর মা রেণুকাময়ী পরলোকগমন করেন। তিনি তখন ৫০ডি হাজরা রোডে বসবাস করছেন। বস্তির ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য নৈশ বিদ্যালয় শুরু করেন। সেপ্টেম্বরে গল্প-কবিতায় শ্যামনকা-র নূতন অংশ প্রকাশিত হয়। ১৯৭২ সালে লেখেন ‘লুপ্ত পূজাবিধি’ এবং কেশবচন্দ্র সেনকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ ‘ফাৎনা মনস্কতা’। প্রকাশিত হয় তাঁর ‘গল্প সংগ্রহ’ সুবর্ণরেখা থেকে। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গীয় গ্রন্থ চিত্রণ’ প্রবন্ধটি এক্ষণ পত্রিকায়। লিটল ম্যাগাজিন ‘আবহ’তে প্রকাশিত হয় ‘অজ্ঞাতনামার নিবাস’ এবং কালিকলমে প্রকাশিত হয় আর একটি প্রবন্ধ ‘ইদানীন্তন শিক্ষা প্রসঙ্গে’।

কৃত্তিবাস-এ (জানুয়ারি-জুন ১৯৭৪) বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে লেখা বড় প্রবন্ধ ‘রেখো মা দাসেরে মনে’ প্রকাশিত হয়। একের পর এক গল্প প্রকাশিত হতে থাকে খ্যাত অখ্যাত ছোটো ছোটো পত্রিকায়—দ্বাদশ মৃত্তিকা, অনিত্যের দায়ভাগ, স্বাতী নক্ষত্রের জল, বাগান লেখা, খেলার দৃশ্যাবলী, আর চোখে জাগে ইত্যাদি।

আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন এই সময়। সুবর্ণরেখা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর নাটক ‘দানসা ফকির’। আনন্দবাজার পত্রিকায় বড়ো নিবন্ধ ‘কলকাতার গঙ্গা’ প্রকাশিত হয়। মঞ্চস্থ করেন ‘দানসা ফকির’, ‘কঙ্কালের টঙ্কার’।

১৯৭৭ সাল থেকে চরম হাঁপানি রোগে তাঁকে ভুগতে হয়। জানুয়ারি মাসে তৎকালীন ময়দানে অনুষ্ঠিত বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে তাঁর পরিচালনায় তিনটি নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা ছিল - ‘দানসা ফকির’, ‘ভীমবধ’, ‘কঙ্কালের টঙ্কার’। মাঝপথে উচ্ছৃঙ্খল দর্শকরা নাটক ভণ্ডুল করে দেয়। এবছরই আশা প্রকাশনী থেকে তাঁর সংকলন গ্রন্থ ‘ঈশ্বর কোটীর রঙ্গকৌতুক’ প্রকাশিত হয়।

পরের বছর তিনি আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ও গল্প লেখেন। তার মধ্যে খেলার বিচার, বাগান কেয়ারি, বাগান পরিধি আর প্রবন্ধের মধ্যে ছাপাখানা আমাদের বাস্তবতা, গঙ্গানারায়ণ ব্রহ্ম, সাক্ষাৎ ভগবৎ দর্শন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছোটো প্রকাশনা তাম্রলিপি থেকে ‘খেলার প্রতিভা’ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।

আর সুবর্ণরেখা থেকে ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’ উপন্যাসটির প্রকাশের প্রস্তুতি শুরু হয়। প্রচণ্ড আর্থিক কষ্ট ও অসুস্থতার মধ্যে তিনি K.K. Mazumdar's Arts and Craft School স্থাপনে উদ্যোগী হন।

১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ৫০ ডি হাজরা রোডের বাড়িতে নি:সন্তান কমলকুমার শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি রেখে যান তাঁর স্ত্রী দয়াময়ী মজুমদার এবং গৃহদেবতা মাধবকে।

‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’ উপন্যাসটি তাঁর মৃত্যুর পর ওই বছরই সুবর্ণরেখা থেকে প্রকাশিত হয়।

সৌজন্যেঃ প্রশান্ত মাজী'র বই কমলকুমার

1 comment:

  1. Durjoy ChakrabartyMarch 3, 2018 at 3:20 PM

    kamal kumar anonyo. suhasinir pometom asadharon.

    ReplyDelete

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট