ভি এস নাইপল: গুণী, নানান পরস্পরবিরোধিতায় ভরা এক লেখক - আশফাক স্বপন (অনুবাদ)

অনুবাদ আশফাক স্বপন
আরো কিছু লেখার লিঙ্ক



ভি এস নাইপল: গুণী, নানান পরস্পরবিরোধিতায় ভরা এক লেখক
বোধের ঋজুতা, রসবোধ, অনুপুঙ্খ চিহ্নিত করার সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি লেখক হিসেবে এত গুণ ছিল ভি এস নাইপলের, তিনি যেন যা খুশি তাই করতে পারতেন পরে বোঝা গেল যে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে খুশি করার ব্যাপারে তাঁর খুব একটা মাথাব্যথা ছিলনা সারা পৃথিবীজুড়ে পাঠকরা যে তার নানা উপন্যাস ও বিবরণধর্মী বই পড়তে হুমড়ি খেয়ে পড়ত, তার কারণ, সমালোচক Clive James (ক্লাইভ জেমস)-এর  ভাষায় তাঁর সুচারু, সুতীক্ষ্ণ শ্লেষ, তার হৃদয়ের উদার ঊষ্ণতা নয় গুণে ক্ষণজন্মা এই লেখকের কারবার ছিল কঠোর, বাস্তব সত্য নিয়ে, তাই নাইপল যেমন মুগ্ধ করতেন, তেমনি তীব্র বিরাগ উৎপাদন করতেন

একগুচ্ছ বৈপরীত্য নিয়ে তৈরি ছিল মানুষটা সেদিক থেকে বিংশ শতাব্দীর নিয়ত পরিবর্তনশীল, অভিবাসনের জমানার মেজাজটাকেই ধারণ করেছিলেন যেন তাই এই শতাব্দীর প্রতিভূ লেখক হয়ে উঠেছিলেন তার জীবনটা পুরোনো পৃথিবী থেকে নতুন পৃথিবীতে আসা যাওয়ার কাহিনি দুই মহাদেশের ভাবনার জগতের মাঝে দৌত্য করেছেন ভঙ্গিটি শীতল, কখনো খিটখিটে মেজাজে জন্ম তার ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ত্রিনিদাদে পড়াশোনা বিলেতের অক্সফোর্ডে স্থায়ী বসবাস লণ্ডনে সেখানে কেতাদুরস্ত স্যুট পড়ার অভ্যেস হয়, সেই সাথে সমাজের ঊঁচুতলায় আনাগোনা আমি যখন নিজেকে দেশচ্যুত বা উদ্বাস্তু বলি, সেটা উপমা নয় কথাটা আক্ষরিক অর্থেই বলি,’ নাইপল বলেছিলেন

ক্যারিবিয়ান অঞ্চল নিয়ে তার তিনটি পরিহাসতরল রচনার পর তার যুগান্তকারী বই  A House for Mr Biswas (বিশ্বাস মহাশয়ের জন্য একটি বাড়ি) যখন প্রকাশিত হয়, নাইপলের বয়স তখন ২৯ প্রকাশনার অর্ধশতাব্দী পরও এই অপূর্ব বইটির প্রশস্ত বিস্তার, তীর্যক রসবোধ এতটুকু ম্লান হয়নিবইটির মূল চরিত্র নাইপলের বাবাকে অবলম্বন করে নির্মিত সে ত্রিনিদাদ টোবাগোর এক সাইনবোর্ড আঁকিয়ে, তারপর অভাবিতভাবে এক সময়ে সাংবাদিক হয়ে ওঠে সে যেই সাইনবোর্ডটি প্রথম আঁকে, সেটা যেন পরিশ্রমী নাইপলের চেতনায় প্রোথিত হয়ে ছিল ‘IDLER KEEP OUT BY ORDER’ (অলস ব্যক্তির প্রবেশ নিষেধ আদেশক্রমে)

A House for Mr Biswas-এর পর নাইপলের কথাসাহিত্যের ভাণ্ডারে সবচাইতে সমৃদ্ধ ও পাঠযোগ্য এবং পুনর্পাঠযোগ্য - বইয়ের মধ্যে একটি In a Free State (একটি মুক্ত দেশে) এই বইটির একগুচ্ছ গল্পে পাই উপনিবেশবাদ ও ক্ষমতার অস্থির ,অনিশ্চিত গতিপ্রকৃতির অন্তরঙ্গ পর্যবেক্ষণমিসর, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও বিলেত বইটির প্রেক্ষাপট বইটি ১৯৭১ সালে বুকার প্রাইজ পায় Guerrillas (গেরিলা) বইটি The New York Times Review-এর সম্পাদকমণ্ডলী সম্ভবত ১৯৭৫ সালের সেরা উপন্যাস বলে অভিহিত করে এটি নাইপলের সবচাইতে উত্তেজক বই এই বইটির প্রেক্ষাপট ক্যারিবীয় অঞ্চলের এক অনুচ্চারিত দেশ সেখানে উপনিবেশ-উত্তর ইংরেজ আধিপত্য বেশ জাঁকিয়ে বসে আছে বইটিতে তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লবীদের চরিত্র ও উদ্দেশ্যের একটি গভীর, জটিল চিত্র এঁকেছেন নাইপল অবস্থানচ্যুত হবার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি অত্যন্ত প্রখর ব্যঞ্জনাময় রচনা এটি পাঠক পড়তে পড়তে যেন পথ হারিয়ে ফেলে কাহিনি ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে সেটা নিয়ে ধাঁধায় পড়ে যায় লেখক পরে বলেছিলেন: প্লট হলো যারা পৃথিবীকে চিনে ফেলেছেন তাদের জন্য, কাহিনি (narrative) হলো যার পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে চান তাদের জন্য লেখকের শেষ বড় মাপের উপন্যাস সম্ভবত ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত  ‘A Bend in the River.’ (নদীতে একটি বাঁক)।

যে কোন প্রতিভাধর লেখককে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের খাঁচায় আবদ্ধ করলে ভুল হবে নাইপলের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এত অসামান্য ছিল যে এই কথাটা তার ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রযোজ্য তবে তার রাজনৈতিক চিন্তা তার লেখায় সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়েছিল, সেকথা ঠিক ঔপনিবেশিক আমলে কঠোর বৃত্তাবদ্ধ জীবনে বসবাসকারী পরাধীন মানুষের প্রতি তার সহজাত সহমর্মিতা ছিল কিন্তু পরাধীন সমাজের দীনতা সম্বন্ধে তার যে গভীর বিরাগ ছিল, সেখানে তার সহমর্মিতা একটা বড় ধাক্কা খেত আমূল রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্বন্ধে তার গভীর সংশয় ছিল

তার সমস্ত কথাসাহিত্যে যেন একটা স্পর্শকাতর গ্লানিবোধের ছোঁয়া রয়েছে তিনি একবার আক্ষেপ করেছিলেন: জীবনে যে বড় অন্তরায় আমাকে পার হতে হয়েছে সেটা হল ত্রিনিদাদে জন্ম নেওয়া একটা মাথামুণ্ডুহীন অবকাশ যাপনের স্থান! এমন একটা মাথামুণ্ডুহীন অবকাশ যাপনের স্থান নিয়ে কার সাধ্য সারগর্ভ লেখালেখি করবার?’ ২০০১ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু গ্লানিবোধই যেন তার যথার্থ মুকুট ছিল
ঔপনিবেশিক অঞ্চলের সহবাসিন্দাদের জগতে আনাগোনা ও ভ্রমণ নিয়ে ষাটের দশকে তিনি লেখালেখি আরম্ভ করেন লিখেছেন ভারত নিয়ে (‘An Area of Darkness’ অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি অঞ্চল; ‘India: A Wounded Civilization’ ভারত: জখম সভ্যতা), আর্জেন্টিনা, ত্রিনিদাদ ও কঙ্গো  নিয়ে (‘The Return of Eva Peron’ এভা পেরনের পুনরাগমন); ইন্দোনেশিয়া, ইরান, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া নিয়ে (‘Among the Believers’ বিশ্বাসীদের মাঝে) যুক্তরাষ্ট্রের মেসন-ডিক্সন লাইনের দক্ষিণে, অর্থাৎ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে ভ্রমণ করে একটি তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণসমৃদ্ধ একট বই লেখেন‘A Turn in the South’ (দক্ষিণে মোড়) বইটিতে তিনি মন্তব্য করেন: আমাদের বাল্যকালের পরিপার্শ্বের মতো এমন গভীর বাঙ্ময় পরিবার্শ্ব আর হয় না

তার সাফল্য অন্যের মাঝে ঈর্ষা উদ্রেক করেছে ১৯৬৩ সালে নাইপল আরেকটি সাহিত্য পুরস্কার পাবার পর ইভলিন ওয়া (Evelyn Waugh) বান্ধবী Nancy Mitford-কে (ন্যান্সি মিটফোর্ড) লিখেছিলেন, ঈশ, যদি একটা কালো মুখশ্রী পেতাম! নাইপল এধরনের বর্ণবাদী মনোভাবের ব্যাপারে সজাগ ছিলেন একবার তিনি বর্ণবাদী শ্লোগান ‘Keep Britain White’ (ব্রিটেনকে সাদা রাখুন) কমা চিহ্ন দিয়ে নতুন রূপ দিয়েছিলেন ‘Keep Britain, White’ (ব্রিটেনকে নিজের কব্জায় রাখ, হে শ্বেতাঙ্গ)

ঔপনিবেশিক আমল-উত্তর জীবনযাত্রার ব্যাপারে নাইপলের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তার জীবদ্দশায় তাকে প্রচণ্ড বিতর্কিত লেখক করে তোলে তার মুখ দিয়ে যে সব কড়া কড়া কথা বেরিয়েছে সে কথা কোন পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গের বলার সাধ্য ছিল না তিনি আফ্রিকান সমাজের আদিমতা  বর্বরতানিয়ে লিখেছেন ভারতে পয়োনিষ্কাশনের অভাব নিয়ে চব্যতিব্যস্ত ছিলেন লিখেছিলেন, এরা পাহাড়ে মলত্যাগ করে; এরা নদীর পারে মলত্যাগ করে; এরা রাস্তায় মলত্যাগ করে তার জন্মস্থানকে হেয় করে মন্তব্য করেছেন, হ্যা, আমি ওখানে জন্মেছি সেটাই ভুল হয়েছে তিনি ইসলামের সমালোচনা করেছেন

তিনি তৃতীয় বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের চক্ষুশূল ছিলেন এদের নানান নিন্দাবাক্যের মধ্যে রয়েছে তিনি শ্বেতাঙ্গ জাতির স্বস্তিবর্ধক অলীক কল্পনাবিলাসের পুনরজ্জীবন ঘটিয়েছেন (Chinua Achebe, চিনুওয়া আচেবে), নব্য উপনিবেশবাদের জঘন্য তাঁবেদার (H.B. Singh, এইচ বি সিং), এবং নির্মম,তাচ্ছিল্যপূর্ণ এক প্রচারক’’ (Eric Roach, এরিক রোচ)

চায়ের কাপে চুমুক দেবার মত অতি সহজে, চট করে শত্রু বানাতেন একবার বলেছেন: কোন লেখা আমি খানিকটা পড়েই বুঝি এটা কোন মহিলার লেখা কিনা আমার মতে সে লেখার মান আমার সাথে তুলনীয় নয় বহু বছরের প্রেমিকা মারগারেট মারের ওপর দৈহিক নির্যাতন করেছেনখোলাখুলি বলতেন স্থুলাঙ্গ লোক তার অপছন্দ, বলেছেন পতিতালয়ে গমনের কথা একবার বলেছিলেন কোন মহিলার কপালে টিপ দেবার অর্থ আমার মাথার ভেতর কিছু নেই

তার অনুরাগী সমর্থকও কিছু কম ছিলনা New York Review of Books সম্পাদক Ian Baruma (ইয়ান বারুমা) মনে করেন একথা ভাবা ভুল নাইপল শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের পক্ষপাতমূলক ভাবনা নকল করা কালো চামড়ার মানুষ  বারুমা লেখেন: এমন অভিমত শুধু ওপরভাসা নয়,সম্পূর্ণ ভুল নাইপলের ক্রোধের উৎস ঔপনিবেশিক অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের বেদনা বোঝার অক্ষমতা নয়, নাইপল এই বেদনা খুব গভীরভাবে অনুভব করে বলেই এত ক্রুদ্ধ

তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মে এসব প্রশ্ন অবান্তর তিনি ঔপন্যাসিক Joseph Conrad (জোসেফ কনরাড)-এর উত্তরসূরি হিসেবে নিজের মত করে নিজেকে তৈরি করেছেন, এবং তিনি যথার্থ উত্তরসূরি একবার বলেছিলেন: লেখকের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন, আধুনিক জগত ও জীবনের কতখানি তার লেখায় ধরা পড়েছে?’ নাইপলের লেখায় নানা ধরনের অর্থবোধক ঈঙ্গিত আছে কখনো সেসব সুক্ষ্ম, কখনো একে অপরের ওপর খানিকটা চড়াও হয়েছে, কদাচিৎ সেই ইঙ্গিত খড়্গের মত উদ্ধত যারা নাইপলের কাজ সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য উত্তম সূচনা হতে পারে Patrick French-এর (প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ) একটি চমৎকার জীবনী, The World is What it Is (পৃথিবী এমনই) আর A House for Mr Biswas

নাইপল মানুষটা গোলমেলে ছিলেন তার স্বভাবে যেন একটা উন্নাসিকতার প্রশ্রয় ছিল বিড়াল যেমন ইঁদুরকে নিয়ে খেলে, ঠিক সেইভাবে তিনি সাক্ষাতকারকারীদের সাথে আচরণ করতেন খানিকটা তাচ্ছিল্যমাখা প্রশ্রয়, তারপর যখন ভাবতেন যে খুব অজ্ঞ, বোকা উদ্ভট প্রশ্ন করছে, তখন খুব করে চেপে ধরতেন আবার যারা তাকে চিনত, তারা তার ব্যক্তিগত সহৃদয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন

একটা উদাহরণই যথেষ্ট ইংরেজ জীবনীকার Clair Tomalin (ক্লেয়ার টোমালিন) স্মৃতিচারণমূলক বই A Life of My Own-এ (আমার নিজস্ব জীবন) ৮০-এর দশকের গোড়ার দিকের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন তিনি নাইপলের সাথে দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে গেলেন নাইপল দুজনের খাবারের অর্ডার বাতিল করে চা ও গরম দুধ আনালেন দুজনে সেটা খাবার পর শরীর চাঙ্গা করার জন্য নদীর পারে একসাথে হাঁটার প্রস্তাব দিলেন টোমালিন লিখেছেন, বুঝলাম ভিডিয়া (নাইপলের ডাকনাম) তার প্রজন্মের অন্যতম বড় লেখকই নন, মানুষটা অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ
লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার আগে নাইপলকে অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে বহুবছর তাকে কেউ পাত্তা দেয়নি তবে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, এবং তার নিজ ভবিষ্যত সম্বন্ধে আস্থাবান ছিল লিখেছিলেন, আমি জানতাম কোন দরজাটি দিয়ে প্রবেশ করতে হবে সেই দরজাটিতেই আমি টোকা দিয়েছিলাম

আশফাক স্বপনঃ
আশফাক স্বপন ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী উপমহাদেশীয় সংবাদ মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে ঢাকার Daily Star পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। তার লেখা বাংলাদেশের প্রথম আলো, সমকাল, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, পাকিস্তানের Dawn, ভারতের Times of India Statesman পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আটলান্টায় থাকেন।


No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট