শাহাব আহমেদের আলোচনায় হুমায়ূন কবিরের “তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক” ও "পারস্য পরবাসে"

হুমায়ূন কবিরের
“তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক”
ও পারস্য পরবাসে
শাহাব আহমেদ
পারস্যের সাথে, আরো অনেকের মতই, আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ওমর খৈয়ামের কবিতার মাধ্যমে। তারপরে আস্তে আস্তে জানতে পাই ফেরদৌসী, হাফিজ, মৌলানা রুমী, সাদী ও কবি নিজামীর কথা।কয়েক বছর আগে আমি “স্বেদসিক্ত দু:স্বপ্ন সমূহ” নামের একটি লেখা লিখছিলাম। তার কারণে পারস্যের ইতিহাস, সাহিত্য ও মিথ্ নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে হয়েছিল। সেখানেই পরিচিত হই মিথিকাল পাখী সিমোর্গ বা সিমুর্গের সাথে।

সেই সিমুর্গের ঠিকুজী খুঁজতে খুঁজতে আবিস্কার করি “পাখীদের সম্মেলন” নামে একটি বই। লেখক ফরিদউদ্দিন আত্তার। একটি স্বচ্ছ পাহাড়ী হ্রদের উপর দিয়ে উড়তে উড়তে ত্রিশটি পাখী দেখতে পায় তাদের নিজেদের প্রতিবিম্ব, এবং দেখতে পায় তাদের রাজা সিমুর্গকে। এবং আশ্চর্য হয় যখন উপলব্ধি করে যে, রাজা সিমুর্গ আসলে অন্য কেউ নয়, তাঁরা নিজেরাই প্রত্যেকে এবং নিজেরাই সমষ্ঠিতে ।

আত্তারের বইয়ে উল্লেখিত সব ধরণের বাঁধা বিপত্তি মৃত্যু অতিক্রম করে অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার দর্শনের সাথে “মানবতা মুক্তির” লক্ষ্যে নিপীড়ন, নির্যাতন, জেল, মৃত্যুকে অতিক্রম করার দর্শনের সমান্তরাল আমাকে আকৃষ্ট করে।

প্রকৃতির নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। আমরা তার কিছুটা জানি, কিছুটা আন্দাজ করি, কিছুটা জানার ভান করি, কিছু জানি না মোটেই। সেই অজানা নিয়ম মেনেই মোটামুটি এই সময়ে আমার পরিচয় হয় লেখক, কবি ও ডাক্তার হুমায়ূন কবিরের সাথে । তাঁর “তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক” বইটি সাথে সাথে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে। তার এই বইতে আমি খুঁজে পাই এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর যা আমাকে বিগত কয়েক বছর খুব ভাবিয়েছে। শুধু মন্দের সাথে মন্দেরই নয়, “ভালোর সাথে ভালোর সংঘাতেই মানবতার আসল পরাজয়।”
হুমায়ূন কবির বলেন।
খুব অপরিণত বয়েস থেকে যে আদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম এবং যে আদর্শে নেতা-কর্মিরা ছিলেন সৎ, অসম্ভব ত্যাগী এবং কর্মঠ অথচ যুগের পর যুগ জীবন দিয়ে লড়াই করেও , কত শত জানা অজানা খাপড়াওয়ার্ড বেতিয়ারার নরক অতিক্রম করেও, তারা আমাদের দেশের মানুষের জন্য অবদান রেখেছেন নুন্যতমের চেয়েও ঊণ। অথচ ভেঙে গিয়েছেন বার বার । তাদের প্রগতির, মানে সামনে এগিয়ে যাবার বিশ্বাস, অতি দ্রুত বাস্তবায়ন লাভ করেছে শুধু ভাঙ্গনের প্রশ্নে।জাতির সর্বনাশ যারা করে, সেই মন্দেরা মন্দেরা একজোট থাকে অথচ ভালোরা ভেঙ্গে ভেঙ্গে দুর্বল হয়ে সেই সর্বনাশের চুল্লীতে জ্বালানি জোগায়।

“ভালোর সাথে ভালোর সংঘাত হবে কেন?”
“সবচেয়ে বড় কারণটা হল কে কত ভালো সেই নিয়ে দৌড়।”

হুমায়ূন কবিরের এই বই পড়ে বিষয়টা স্বচ্ছ হয়।কেন ফরাসি বিপ্লবে বিপ্লবীরা একে অন্যকে গ্রাস করেছে, কেন রাশিয়ায়, চীনে, মঙোলিয়ায়, ইরানে বিপ্লবী বিপ্লবীকে হত্যা করেছে হাজারে হাজারে ,লাখে লাখে, কোটিতে কোটিতে।
যতই রোমান্টিক হই না কেন, এ তো সত্য , যেখানেই বিপ্লব হয়েছে সেখানেই হয়েছে অহেতুক অজস্র রক্তপাত, একই আহাজারীর পুনরাবৃত্তি । শত্রুর রক্তের সাথে মিত্রের রক্ত এক হয়ে গিয়ে বিপ্লব বিপথে চলে গেছে এবং যে স্বপ্ন নিয়ে বিপ্লব সাধন করা হয়েছে তা রয়ে গেছে অধরা।

সত্তুরের দশকের শেষ দিকে ইরানে বিপ্লব হয়। আমরা অতি উৎসাহীরা রাজপথে মিছিল করেছি “ইরান দেশের বীর জনতা, আমরা আছি তোমার সাথে।” শ্লোগান দিয়ে।
বামে মুক্তি, ডানে ভয়।
না , খোমেনীর ইসলামী বিপ্লব নয়, এর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্রকে অভিনন্দন জানিয়েছি। যেহেতু মোজাহিদিন -ই-খালক এবং তুদেহ পার্টি ছিল সেই বিপ্লবের সক্রিয় অংশীদার , আমরা এর মধ্যে প্রগতির হাতছানি দেখতে পেয়েছি। শাহের “সাভাক” বাহিনীর বর্বরতার ফিরিস্তি তখন পত্র পত্রিকায় প্লাবনের ঢেউ তুলেছে। তারপরে সেই ঢেউ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে পত্র পত্রিকা সয়লাব হয়েছে মোজাহিদিন -ই-খালকের বিদ্রোহ , সন্ত্রাস ,বোমাবাজি, বিপ্লবের নেতাদের মৃত্যু , কারো কারো দেশ ছেড়ে পলায়নের খবরে।
ইরানী বিপ্লবের ফল ও বিষফল আমি নিজ চোখে দেখি নি, দেখেছেন হুমায়ূন কবির । দেখেছেন, অনুভব করেছেন এবং সেই অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন “পারস্য পরবাসে”।
এ পর্যন্ত আমি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, সিমুর্গ এবং “তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক” , তা আলোচ্য বইয়ের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। কিন্তু বইটি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ।

“পারস্য পরবাসে” না ভ্রমণ কাহিনী, না পূর্ণাঙ্গ কোন উপন্যাস। ভ্রমণোপন্যাস সম্ভবত। বিপ্লবের রক্তস্নাত জনপদে একটি পরাজিত প্রেমের গল্পের বুননে শাশ্বত মানবতার গল্প।
পরাজিত প্রেম?
কথাটি ভুল কিন্তু বহুল ব্যবহৃত। “ব্যর্থ প্রেম” আমরা বলি। কিন্তু আমরা জানি প্রেম কখনও পরাজিত বা ব্যর্থ হয় না।
যদি হয় তবে তা প্রেম নয়।
তবে এখানে পরাজয় আছে কি?
আছে ।
মানবতা।
আমরা আস্তে আস্তে বিষয়টির উপরে আলোকপাত করবো।

হুমায়ূন কবির প্রাচীন ইতিহাস স্পর্শ করেছেন খুব সংক্ষেপে।
প্রায় সরাসরি বেছে নিয়েছেন আয়াতুল্লা খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত বিপ্লব- পরবর্তী পারস্য।
উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ৮০র দশকের সেই সময়টা, যখন সেখানে চলছে সামাজিক স্ট্রাকচারগুলোর ভাঙ্গন ও পুনর্নির্মাণ, সামাজিক সম্পর্কগুলোর পুনর্বিন্যাস আর সর্বগ্রাসী পশ্চিমা হাঙর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জেহাদ ও জাতীয় সংস্কৃতির পূনর্জীবনের প্রচেষ্টা।
চলছে ইরাকের সাথে যুদ্ধ।
মৃত্যুর বিশাল হা করা মুখের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে কিশোর থেকে শুরু করে সক্ষম পুরুষেরা, আর নারীরা কাঁদছে বুক চাপড়ে।
“ মাঠ জুড়ে শত শত কবর। শত শত ছবি। মনে হয় নার্সারির ফুলের চারার মত সাজিয়ে রাখা।” ( পৃষ্ঠা -৫৬ )

“মোজাহেদিন ই খালক” এবং বিপ্লবী সরকার এতদিন যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা প্রায় সমাপ্ত হয়ে এসেছে। শুরু হয়েছে তুদেহ পার্টি নির্মূলের আয়োজন। টিভি পর্দায় দেখানো হচ্ছে কমরেড নুরুদ্দিন কিয়ানুরির বিধ্বস্থ চেহারা, তাঁর হাতের কাগজ কাঁপছে , চোখ ঝাপসা , তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে জানাচ্ছেন যে , “সোভিয়েত সহায়তায় সরকার উচ্ছেদের পরিকল্পনা ছিল তাদের। এখন বুঝতে পারছেন সেটা ছিল ভুল। বিদেশীরা ইরানের প্রকৃত বিপ্লব চায় না, চায় অনুগত বিপ্লব । “ পৃষ্ঠা ১০৭
আমরা এই স্বীকারোক্তি দেখেছি স্ট্যালিনের রাশিয়ায় জিনোভিয়েভ- কামেনেভ- বুখারিন- বেবেল- মেয়েরহোল্ড ইত্যাদিদের মেধ যজ্ঞের সময়, দেখেছি হিটলারের জার্মানীতে।
সকল বিপ্লবেরই কিছু ইউনিভার্সাল টুল আছে মিথ্যাকে সত্য , সত্যকে মিথ্যা এবং জীবিতকে মৃত বানানোর। সকল বিপ্লবেই ক্ষমতাসীনরা দেশপ্রেমকে জাতীয়করণ করে নেয়। শুধু ক্ষমতাসীনরাই হয় দেশপ্রেমিক এবং অন্যেরা শত্রু।
ইরানের বিপ্লব যে তার ব্যতিক্রম ছিল না-এ বইতে তা স্পষ্ট।
তবে সচেতন লেখক সরাসরি কোন মন্তব্য করেন নি।
ভালোই করেছেন।
সাহিত্য শ্লোগানের মত নাঙ্গা হয়ে গেলে তার মান ক্ষুণ্ণ হয় ।

খুব উজ্জ্বল একটি বিপ্লবী চরিত্র ইউসুফ জাদেহ্। তুদেহ পার্টির সদস্য।
কিন্তু খুব সংক্ষিপ্ত।এই চরিত্রটি আরো একটি বেশি উন্মোচিত করা যেত। কিন্তু এও সত্য, সে সময়কার বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এদের সম্পর্কে জানাও সম্ভব ছিল না।এরা ছিল ছায়ার মত কিন্তু ছায়া শিকারের পদ্ধতিগুলো ক্ষমতাসীন বিপ্লবীরা ততদিনে জেনে গেছে। এবং জেনেছে সম্ভবত তুদেহ পার্টির মাধ্যমেই, যারা ২০-৩০-৪০ দশকের সোভিয়েত ইউনিয়নের perceived শত্রু নিধনের শিল্প কলার সাথে ছিল খুব ভালোভাবে পরিচিত। বিপ্লবীরা সমষ্ঠির
কল্যাণ নিয়ে এত বেশী ব্যপৃত থাকে যে ব্যস্টির নিধন তাদের কাছে চড়ুই শিকারে চেয়েও সহজ হয়ে যায়। তাই হয়েছে ইউসুফ জাদেহ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে।

এই বইয়ের মূল নারী চরিত্র, আনুশেহ্ এক আবহমান নারী , সুন্দর ও কোমল । পর্দা ঢাকা মুখ তার পরিশিলীত মনকে নিরুদ্ধ করে নি।
“পর্দা ঢাকা নারীর শরীরের বাঁক নেই, সকল সৌন্দর্য জড়ো হয় তার চেহারায়।
আনুশেহর চেহারায় এখন আলো-ছায়ার দোলা। বিকেলের হলুদ আলো পাহাড় ঘেঁষে তেরছা হয়ে এসে পড়েছে মুখে। পাহাড়ি পাইনগুলো দুলছে হাল্কা বাতাসে। ছলকে ছলকে দুদোল বৃক্ষের ছায়া এসে নাচে আনুশেহর মুখে।”
ক্ষীণ ধারার বরফ গলা কারুন নদীর তীরে দেখা এই হল আনুশেহ্। বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের
প্রকাশ এক নারী।
এখানে তন্ময় মাসউদ গায় হাফিজের গান আর আনুশেহ্ তার তর্জমা করে শোনায় গল্পের কথককে।মাসুদের “সুরেলা কন্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে চলে যায় পাহাড়ে”, আর আনমনা আনুশেহ্ গভীর দৃষ্টি দিয়ে থাকে তার দিকে।
অনুশেহ্ ভালোবাসে মাসুদকে কিন্তু তাও অনুক্ত থেকে গেছে সারা গল্পে । ফলে সারা গল্পেই একটা রহস্যের আবহ। অনুশেহ্ কাকে ভালোবাসে বোঝা যায় না।
সে কোমল ও অনুভূতি প্রবণ। তার যত্ন যেমন গল্পের কথকের জন্য ( বাংলাদেশী ডাক্তার)
আবার মাসউদের জন্যও।কার জন্য বেশী বোঝা যায় না।
মাসউদ হল ১০০% বিপ্লবে নিবেদিত মানব-পতঙ্গ যে আত্মত্যাগের আগুনে ঝাঁপ দেবেই।

“How can a moth flee fire
When fire contains it’s ultimate desire?”

আত্তারের কাছে এই আল্টিমেট ডিজায়ার হচ্ছে ঈশ্বর ।
একজন বিপ্লবীর?
সুন্দর আগামী কাল।
শোষন মুক্ত ভবিষ্যত ।

মাসউদেরা সব বিপ্লবে, সব মুক্তিযুদ্ধের মূল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত শক্তি ।
তারা রুশ বিপ্লবের দিবেন্কো সম্প্রদায় যারা বিপ্লবী যুদ্ধে নিহত না হলে হয় ফায়ারিং স্কোয়াডের বলি।এরা ন্যায়ের প্রতি নিবেদিত, অথচ ন্যায়ের কোন নিজস্ব অবয়ব নেই।
ন্যায় অন্যায় মাপা হয় ক্ষমতার নিক্তি দিয়ে।
বিপ্লবের ক্ষমতাসীনরা যখন বিপথে যেতে শুরু করে তখন তাদের কর্মকান্ড কোন না কোন পর্যায়ে এসে এই রোমান্টিক মানুষগুলোর ন্যায়বোধের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
ফলে তারা চিহ্নিত হয় প্রতিবিপ্লবী বা শত্রু হিসাবে ।
ইউসুফ জাদেহ এমনি একটি চরিত্র, দেশের জন্য নিবেদিত বিপ্লবী কিন্তু পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে শত্রু ।মাসউদ হচ্ছে সে সৌভাগ্যবান বিপ্লবী, যারা মৃত্যুবরণ করে দেশ শত্রু হবার আগেই, এবং যাদের জন্য সর্বোত্তম স্থান হচ্ছে অজানা শহীদের শিখা অনির্বাণের নীচের ঈষৎ অন্ধকারের উষ্ণতা।
ইউসুফ জাদেহদের বধ্যভূমি তুষারাবৃত।
কিন্তু মাসউদের মৃতদেহ সামনে রেখে আনুশেহের মুখ দিয়ে লেখক উচ্চারণ করেছেন শক্তিশালী, সম্ভবত এই বইয়ের মূল বক্তব্য :
“যুদ্ধকে ঘৃণা করি, ন্যায় যুদ্ধ হলেও আমি একে ঘৃণা করি। ঘৃণা করি।”

মোশ্তারী আর একটি চরিত্র , সংক্ষিপ্ত কিন্তু উজ্জ্বল । মনে রাখার মত। তার পরিবারে অনেকগুলো মৃত্যু ও আনুসাঙ্গিক ডিপ্রেশন ও ইসিটির মাধ্যমে তার চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় স্মৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মনে দাগ কাটে।
টিউলিপের ফুলে ফুলে ঢাকা প্রান্তরে স্রোতস্বীনি তীরে কাটানো একটি দিন এই বইয়ের এক অপূর্ব অংশ।এতই উজ্জ্বল যে মনে গেঁথে থাকে। পাঠকের মনে হবে সে নিজেই সেখানে উপস্থিত। আনুশেহ্, মোশ্তারী, অন্ধ গীতিকার , মাসউদ প্রত্যেকেই প্রকৃতির সেই পরিবেশে অপূর্ব হয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে।
আর টিউলিপের প্রান্তর বর্ণনা করতে গিয়ে দিয়েছেন সুন্দরও সংক্ষিপ্ত ভাবে পরিচিত করেছেন ইওরোপের টিউলিপের বানিজ্য ও তার লোভের ইতিহাসের সাথে, যা কাহিনীর সাথে হয়েছে সামন্জস্যপূর্ণ।

এই বইয়ের একটি সুন্দর অংশ হল ইরানে নওরোজ উদযাপন।
বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিরুদ্ধে মোল্লারা ভীষনভাবে তৎপর । অথচ তার বিপরীতে পারস্যের প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে চলে আসা “নওরোজের” প্রতি ইরানি মোল্লাদের মনোভাব লক্ষ্যণীয়। তারা তাদের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও কৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে। তাই নওরোজের উৎসব সবার উৎসব, সেখানে কোন উটকো ফতোয়াবাজি নেই।
আমাদের জন্য খুবই সময়োপযোগী এই প্রসঙ্গ।
পারস্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর বর্ণনা একই বইয়ের একটি অনবদ্য দিক যা প্রাচীন ইতিহাসের এই দেশটির প্রতি প্রতিটা পাঠককে ধাবিত করবে আর বেশী তীব্রতায়।

পারস্যের ক্লাসিক কবিদের সম্পর্কেও সুন্দর তথ্য এসেছে।
হাফিজের গল্প মুগ্ধ করার মত।
মাসউদের মুখে হাফিজের গান, ভাষা ও ভাবের মুগ্ধতা তন্ময় করেছে আমাকেও।

আবার ফিরে আসি “পাখীদের সম্মেলন” বইতে । হুমায়ূন কবির তার বইতে খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে বর্ণনা পরিচয় দিয়েছেন কিভাবে সারা পৃথিবীর পাখীরা রওনা দিয়েছিল সীমুর্গের সন্ধানে এবং শন্কা, প্রলোভন, পরাজয়, মৃত্যুসহ কাঠিন্যের ৭ টি উপত্যকা পার হয় মাত্র ৩০ টি পাখী পৌঁছেছিল “কাফ” পাহাড়ের পাদদেশে।পাহাড় তাদের পথরোধ করে বলেছিল, ফিরে যাও, সীমুর্গের দেখা তোমরা পাবে না।

“How can a moth flee fire
When fire contains it’s ultimate desire?
And if we do not join Him, yet we’ll burn
And it is this for which our spirits yarn.
It is not union for which we hope;
We know that goal remains beyond our scope”

এই কাহিনীর শেষটুকু লেখক আমাদের জানান নি। ধারণা করি স্বেচ্ছায়। কারণ, পাখীদের প্রতিটি উপত্যকা অতিক্রম করার সময়
যে ত্যাগ, যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা অনুধাবন না করে শেষের বক্তব্যটি পাঠকের কাছে এর বিশালত্ব নিয়ে ধরা পড়বে না।
শেষটুকু আমি উপরে উল্লেখ করেছি।

ভাষার সজীবতা, প্রবাহ, কারুকার্য, চিত্রকল্প, উপমায় এমন এক সম্মোহনী শক্তি আছে যা পাঠককে বই শেষ না করে উঠতে দেয় না।একটি সুন্দর সাহিত্য কর্ম।

“পারস্য পরবাসে” বইটি প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশনী।
প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ
মূল্য : ৩৪০ টাকা

আমি হুমায়ূন কবিরের বই সমূহের ব্যাপক পাঠক পরিচিতি কামনা করছি।

জুন ১৯,২০১৮

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট