নিশিন্দা নারী - আল মাহমুদ

নিশিন্দা নারী
আল মাহমুদ

রাত আড়াইটার দিকে এক অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে নিশিন্দার শরীরটা একটু মুচড়ে উঠলেও সে স্বপ্নটার মধ্যে সারাদিন না খেতে পাওয়ার জ্বালা খানিকটা জুড়িয়ে নেয়ার জন্যই যেন পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। প্রথমে একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ভেঙে বেরিয়ে এলেও এখন ছোট ছোট নিঃশ্বাসের দোলায় তার নরম দু’টি উচু স্তন কাঁপছে। ক্ষুধা ও ঘুম একসাথে থাকলে মানুষের স্বপ্ন চটে যায় না। নিশিন্দা দেখছে এই জনমানবহীন চারণভূমির যতদূর চোখ যায় কোথাও ঘাস আর সবুজ নেই। সর্বত্র যেন শুকিয়ে হুলুদ প্রান্তরের মতো ধু-ধু করছে। খলার মধ্যে যে কয়টা গরুর বাথান বা খলাঘর আছে এর সবগুলো গরুর শিংয়ের মধ্যে মানুষের রক্ত। যেন গরুর পাল খলাঘরগুলোর রক্ষক রাখালদের গুঁতিয়ে মেরে দলে দলে ছুটে আসছে নিশিন্দাদের উঠোনের দিকে। স্বপ্নের মধ্যেই যেন নিশিন্দা দিশেহারা হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে গরুর পাল এসে নিশিন্দার উঠোনে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। নিশিন্দার মনে হল ঘাসের অভাবে ক্ষিপ্ত ক্ষুধার্তের পাল যেন তাকে তাদের নেত্রী ভেবে একটা কিছু প্রতিকারের জন্য তার কাছে ভিড় জমিয়েছে। যেমন সে নিজেও আবদুল্লাহ মাঝির গত পনেরো দিন যাবৎ উধাও হয়ে যাওয়ার একটা বিহিত ব্যবস্থা খুঁজছে। গরুর পালের মধ্যে গাই আর দামড়ির সংখ্যাই বেশি। পালের পেছনে কয়েকটা মিনমিনে চেহারার ষাঁড়ও আছে। তবে ষাঁড়গুলোকে গাভীগুলোর মত ক্রুদ্ধ মনে হল না। ষাঁড়গুলো ঘাড় নুইয়ে শিং লুকোতে চায় যেন। যেন বলতে চায়—অত বড় ধারালো বাঁকা সিং গজানোর জন্য তো আমরা নিজেরা দায়ী নই। এগুলো নিয়ে এখন আমরা আর কি করব? যখন সারা বিল এলাকা তিতাসের এপারের দত্তখোলা থেকে শুরু করে বাঁ দিকের আখাউড়া সিঙ্গারবিল আর ডানদিকের শাহবাজপুর সরাইল মৌজা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ। গরু আর মানুষের এখন সত্যিকার খাওয়ার কিছু থাকলে তা আছে তিতাসের শেওলা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বাসিন্দাদের রাঁধা ভাত আর ফেনপানি। গরুগুলো যেন বলতে চায় এরাও এখন আবদুল্লাহ মাঝির ডাকাত দলে নাম লেখাতে এসেছে। স্বপ্নের মধ্যেই নিশিন্দার মনটা নরম হয়ে এল। সে এক ঝটকায় শাড়িটা কোমরে পেঁচিয়ে বারান্দা থেকে দ্রুত উঠোনে নেমে জিজ্ঞেস করল, এই গাইয়ের পাল আমার উঠোনে দল বেঁধে কেন ঢুকেছিস? মতলব কি তোদের?’


নিশিন্দা জানে, গাইগরু অবলা জানোয়ার মাত্র। জবাব দেয়ার ক্ষমতা নেই। সে ভাবছিল ঘরের ভেতর থেকে আবদুল্লাহর তেল মাখানো বরাক বাঁশের লাঠিটা এনে গরুর পালকে এক্ষুনি মেরে মেরে তাড়াবে কি-না! কিন্তু নিশিন্দা জানে, স্বপ্নটা হল একটা দৈব ব্যাপার। স্বপ্নের মধ্যে কে কি করবে, আগে থেকে কেউ তা আন্দাজ করতে পারে না। যদিও ষাঁড়গুলোর মধ্য থেকে এর মাঝেই দুয়েকটা গোবর ছেড়ে তার নিকানো উঠোন নোংরা করছে। আর কারো মুতে ভিজে কাদা হয়ে যাচ্ছে উঠোনের মাটি। তবুও নিশিন্দা তার প্রশ্নের একটা জবাবই যেন আশা করে। সে ক্ষুধার্ত গাইগুলোর শিংয়ের কাছাকাছি চলে এল—‘এই জাবরকাটা মাগীর দল, আমার উঠোন নোংরা করবি না বলে দিচ্ছি। আর আমার ঐ তুলসীগাছের দিকে মুখ বাড়ালে পাটকাটার ছেনি দিয়ে জিব কেটে ফেলব।’

নিশিন্দা দত্তখোলার চামারের মেয়ে। আবদুল্লাহ মাঝির সাথে মুসলমানের মত ঘর বাঁধলেও বাপের বাড়ি অর্থাৎ ঋষিপাড়া থেকে একটি তুলসীগাছ এনে সযত্নে দাওয়ার সামনে মাটি উঁচু করে পুঁতে দিয়েছে। সকাল-সন্ধ্যেয় গাছের সামনে আগে বাতি জ্বেলে মাথা নোয়াতো। কিন্তু একদিন মাঝির ধমক খেল, ‘এই চামারণী, তুই না মুসলমান হয়েছিস? তুই না আমার বৌ? খবদ্দার গাছেরে পীর মানলে আমি তোরে দুই টুকরো করে কেটে তিতাসের মাখনা খেতে পুঁতে রাখব। মনে রাখিস, তোকে আমি আমার পীরের সামনে নিয়ে গিয়ে হুজুর কেবলাকে সাক্ষী রেখে শাদি করেছি। আর তুই মাগী এখনো গাছ-পাথরের তলে মাথা ঠেকাস? তওবা পড় হারামজাদি, নিজের ভালাই চাইলে আওয়াল কলেমা পড়ে ছতরে ফু দে।’

স্বপ্নের মধ্যে তুলসীগাছটা সবকিছু ছাড়িয়ে নিশিন্দার নজরে পড়ল। পনেরো দিন আগে হঠাৎ সন্ধ্যারাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানার পুলিশ নদী পেরিয়ে এসে বাড়ি তছনছ করে গেছে। তারা বাড়ি ঘেরাও করে ঘন ঘন হুইসেল বাজিয়ে দুয়ারে এসে লাথি মারতে লেগেছিল। নিশিন্দা নিঃশব্দে দুয়ার খুলে বাইরে এসে দাঁড়াতেই হাওয়ালদার তার ঠিক বুকের মাঝখানে টর্চের আলো রেখে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল—‘এই মাগী, আবদুল্লাহ কই?’

‘আগে ছতর থেকে বাতি নামান দারোগা সাব। আবদুল্লাহ কি আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে না-কি? বাত্তি নামান।’

আপনা থেকেই যেন টর্চটা হঠাৎ নিভে গেল। হাওয়ালদার জানে আবদুল্লাহকে ডাকাতির মামলায় ফেলবার মত কোনো প্রমাণই এখন পর্যন্ত পুলিশের লোকের হাতে নেই। আর দত্তখোলা হল সাংঘাতিক ধরনের মানুষের গ্রাম। এরা করতে পারে না এমন কোন কাজ নেই। খলায় এখন যারা ইটের ভাটা বসিয়েছে তারা আবদুল্লাহকে তোয়াজ না করে পারে না। এ গাঁয়ের শ্রমিক ছাড়া আবদুল্লাহ শহর থেকে মাটি ও ইটকাটার কারিগর আনতে দেয় না। এসব কাজে দত্তখোলার মানুষেরাই বহুকাল ধরে ওস্তাদ। আবদুল্লাহর বক্তব্য হল, আমাদের বাপ-দাদারা চরের জমিজমাকে লাখেরাজ সম্পত্তির মত ব্যবহার করে ধান লাগিয়েছে। তাদের গরুবাছুরের ঘাসের জোগান দিয়েছে। এখন সরকার এসব খাসজমি ইটখোলার জন্য শহরের লোকদের কাছে ইটকাটার মওসুমে ইজারা দিতে চান, দিন। কিন্তু স্থানীয় গরিব চাষাভুষোদের পেটের জোগাড় ইটখোলার মালিকদেরই করে দিতে হবে। তারা শহর থেকে মজুর এনে ইট ও মাটি কাটাতে পারবে না। স্থানীয় রাখাল, চাষী, চামার, কামাররা যারা আগে ঐসব খাসের জমিতে বোরো ধান করতো ক্ষেতে তাদেরকেই কাজে লাগাতে হবে। নইলে কি দত্তখোলার মানুষেরা খলার ঘাস খেয়ে বাঁচবে? ঘাসের জমিও তো শহরের জোতদারদেরই দখলে। তারা সেখানেও তাদের গাইগরুর জন্য চারণভূমি ডেকে নিয়ে তাদের বিরাট বিরাট বাথান বানিয়েছে। তাহলে নদীর এপারের মানুষ কি তিতাসের শেওলা খাবে? আবদুল্লাহর প্রতিবাদে যেন গাঁয়ের চাষী ও নিরীহ চামারের দল নিজেদের ভাষা খুঁজে পেয়ে দেয়ালের মত শক্ত হয়ে দাঁড়াল। সবার মুখে এক কথা, আবদুল্লাহ মাঝি আমাগো মাতবর। আপনাদের কিছু বলার থাকলে তার সাথে বলুন।

ইটখোলার ইজারাদাররা জানে আবদুল্লাহর কথার বাইরে গিয়ে কোন কাজ হবে না। টাকা পয়সা দিয়ে তাকে ভজানোও সম্ভব নয়। কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বামপন্থী দলগুলোর সাথে তার গোপন যোগাযোগ আছে। যদিও লোকটা মাত্র ক্লাস সেভেন পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া এম-ই স্কুলে পড়াশোনা করেছে। তবুও গুপ্ত রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে মেলামেশার ফলে তার কথাবার্তার মধ্যে এক ধরনের বুদ্ধির দীপ্তি ইজারাদার ও থানার লোকেরা বুঝতে পারে।

আবদুল্লাহ কোনদিন তার পারিবারিক বৃত্তি অর্থাৎ মাঝিগিরি করেছে—এমন দেখা যায়নি। এক সময় তার বাপ সফরুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছবাজার ঘাট থেকে দত্তখোলা পর্যন্ত পারানীর কাজ করত। সবাই পারাপারের মাঝিকে চিনতো। লোকটার ব্যবহার অমায়িকই ছিল। ঘাট পারাপারের মাঝিরা যেমন সচরাচর বদমেজাজী থাকে—সফর মাঝি তেমন মানুষ ছিল না। অনেকে ঘাটে নেমে পয়সা দিতে না পারলে সফর মাঝির কাছে একটু এগিয়ে চাচা বলে সম্বোধন করলেই হত। সফর মাঝি আর তার দিকে পয়সার জন্য হাত বাড়াত না।

স্বপ্নের মধ্যেই নিশিন্দা ক্ষুদার্ত পালটাকে আরেকটা ধমক লাগালো, ‘এ্যাই গরুর দল, তোদের শিংয়ে রক্ত লেগে আছে কেন? কাদের গুঁতিয়েছিস?’

এই প্রশ্নে গাইগরুগুলো পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। সামনের গাইটা, যেটা নিশিন্দার প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়ানো। সে প্রথম জিব বের করে নাকটা মুছল, তারপর হঠাৎ তার গলার ভেতর থেকে একটা হাম্বা রব মেশানো মানুষের কথার মত কথা বেরিয়ে আসতে লাগল, ‘আমরা খলার সবগুলো রাখালকেই শিংয়ের গুঁতোয় শেষ করে এসেছি। আমরা আবদুল্লার দলে নাম লেখাব।’

গাইটা মানুষের মতো কথা বলছে দেখে নিশিন্দা ভয় পেয়ে গেল। এসব কি বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড, জানোয়ারগুলো মানুষের মতো কথা বলবে কেন? অথচ একটু আগে নিশিন্দা জানোয়ারগুলো অবলা জেনেও নিজেই এগুলোকে ধমক দিয়ে নানা প্রশ্ন করছিল। তখন ভাবেনি। সামনের গাইটা হাম্বা ডাক দিয়েই মানুষের মত বলতে শুরু করবে যে এরাই খলার রাখালদের সিংয়ের গুঁতোয় সাবাড় করে এসেছে।

ভয়ের চোটেই যেন নিশিন্দার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘আবদুল্লাহ এখানে কোথায়? এই উপোসী জানোয়ারের দল, জানিস না পুলিশের ভয়ে আবদুল্লাহ গায়েব হয়ে গেছে? পনেরো দিন মানুষটার কোন খোঁজ নেই। পুলিশও আর আসে না। কে জানে ধরা পড়ল কি-না? বল, এই পনেরো দিন আমি কি খেয়ে বাঁচি? গত দু’দিন ধরে আমি মরা নদীটার শাপলা পাতা সেদ্ধ করে খাচ্ছি। এখন এপারে আর শাপলা পাতাও নেই। তোরা নিজেরাই সব জিব বাড়িয়ে তোদের জাবরে ঢুকিয়েছিস। এখন আবদুল্লাহ হারামজাদাকে আমি কোথায় পাই?’ নিশিন্দা একটু থেমে পালটার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করল, ‘ইস ইনারা ডাকাতি করতে বেরিয়েছেন! আবদুল্লার দলে নাম লেখাবেন। যা ভাগ সব। আমার উঠোন নোংরা করবি না। খুনির দল কোথাকার।’

নিশিন্দা গরুগুলোর ওপর বিরক্ত হয়ে দাওয়ায় উঠে দাঁড়াতে গেলে সামনের গাইটা তার আঁচল কামড়ে থামিয়ে দিল, ‘আমরা আর বাথানে ফিরবো না।’

আঁচলে টান পড়ায় নিশিন্দা ফিরে দাঁড়াল। তার বুক উদোম হয়ে উদ্যত স্তন দু’টি বেরিয়ে পড়েছে। গরুগুলো অবাক হয়ে যেন নিশিন্দার চাঁদের মতো গোল দু’টি স্তন দেখছে। দু’সপ্তাহ আগে থানার বড় পুলিশটা টর্চ জ্বেলে যে রকম অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, গাইগরুগুলোর অবস্থাও তেমনি। যেন এই মুহূর্তে জিব বের করে চাটতে শুরু করবে।

‘বাথানে না গেলে জাহান্নামে যা। আমি কি করব? আমি তোদের ঘাস-পানি এনে দেব কোত্থেকে? রাখালদের গুঁতিয়ে মেরেছিস, এখন নদী সাঁতরে সোজা চলে যা শহরে। গিয়ে লুট করে খেয়ে ফ্যাল চালের বাজার, মাছের আড়ত আর মুগ-মসুর যা পাস। আমার কাছে কী আছে? আমি কি খলায় সবুজ ঘাস গজিয়ে দিতে পারব?’

নিশিন্দার কথায় সামনের গাইটা আবার জিব বের করে নাকের গর্ত দু’টি চাটল। এখন গাভীটার গলার স্বর আরও স্পষ্ট, ‘আমরা যাব। তুমি আমাদের শহরে নিয়ে যাবে। তুমি আবদুল্লাহর বৌ, আমাদের নেত্রী। আমরা তার দলে থাকব। আর নদী পেরিয়ে সব কিছু চেটেপুটে খেয়ে নেব। তুমি আবদুল্লাহর রামদাটা নিয়ে আমাদের আগে আগে চল এক্ষুনি!’

‘এ্যাই হারামজাদী, আমাকে ধমক দিচ্ছিস?’

‘আমরা ক্ষুধার্ত।’

‘আমি না গেলে কি করবি?’

‘আমরা সবাই মিলে শিংয়ের গুঁতোয় তোমাকে থেঁতলে মারবো। তুমি আবদুল্লাহর বৌ কেন? আবদুল্লাহ আমাদের সর্দার। শহরে নিয়ে চলো আমাদের। আমরা সবাইকে শিংয়ে বিঁধে ফালা ফালা করে রক্ত চাটব।’

গাইগুলোর উদ্যত শিংয়ে মানুষের রক্ত শুকিয়ে আছে। একটু আগেও তাজা রক্ত দেখেছে নিশিন্দা। এখন শুকিয়ে জমাট কালো আস্তরণের মত চিকচিক করছে ভয় পেলো নিশিন্দা। এখন শুকিয়ে জমাট কালো আস্তরণের মত চিকচিক করছে। ভয় পেলো নিশিন্দা। বাঁচতে হলে এই মুহূর্তে দুয়ার বন্ধ করে শক্ত হাতে খিল এঁটে দিতে হবে। ক্ষুধার্ত পালটা আবদুল্লাহর রামদাঁর খবর পর্যন্ত রাখে। নিশ্চয়ই আবদুল্লাহর গোপন অস্ত্রের ভাণ্ডার যা নদীর পাড়ে একটা পরিত্যক্ত উল্টে রাখা নায়ের ভিতর ইট বিছিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছে—যা নিশিন্দা ছাড়া খলার আর কেউ জানে না, গরুর পালটা সে খবরও নিশ্চয়ই রাখে। খুব ভয় পেয়ে গেল নিশিন্দা। শত চেষ্টা করেও যেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানার লোকেরা খুঁজে বের করতে পারেনি, এই জানোয়ারগুলো সে খবরও জানে নাকি? না জানলে আবদুল্লাহর রামদাটার কথা তুললো কোত্থেকে? নিশিন্দার উদোম নাভির গর্তে একটা অজানা ভয়ের শিরশিরানি লাগল। সে এক দৌড়ে দাওয়া থেকে ঘরের ভেতর ঢুকেই খিল এঁটে দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল—‘ও আল্লাহ্ ও ভগবান—এই বেশামাল পশুদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।’

কে শোনে কার কথা। একপাল ক্ষুধার্ত গাইগরু মুহূর্তের মধ্যে হাম্বা রব তুলে যেন দশটা হাতির জোর নিয়ে নিশিন্দার দুয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়ে খিল ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল। কোথায় পালাবে নিশিন্দা এখন? নিশিন্দা দেখল, অসংখ্য বাঁকা শিংয়ের চুড়োয় মানুষের রক্ত শুকিয়ে আছে আর শিংগুলো ছুরির ফলার মতো এলোমেলোভাবে নেমে আসছে তার দু’দিনের উপোসে শুকিয়ে থাকা নাভির ওপর।

‘আব্দুল্লাহ বাঁচাও।’

বলে একটা আর্তচিৎকার করে নিশিন্দা বিছানায় ছিটকে উঠে বসেই বুঝতে পারল সে এতক্ষণ একটা উদ্ভট স্বপ্ন দেখছিল। ছতরে কাপড় নেই। সারা গা ঘামে ভেজা। উরতের ফাঁক দিয়ে বইছে জোয়ারের সময়কার তিতাসের স্রোতের মতো ঝিরঝিরে ঘামের নদী। নিশিন্দা শরীর থেকে শাড়িটা আলগা করে এনে মুখ, বুক ও পিঠ মুছলো। হাত বাড়িয়ে জানালা খুলতেই চোখে পড়ল আকাশে পূর্ণিমার গোল চাঁদ। জ্যোছনা ঠাণ্ডা রোদের মত বিছিয়ে আছে খলার সীমাহীন চারণভূমিতে। যদিও এই চারণভূমি গত দু’মাস যাবৎ খরায় জ্বলে হলুদ প্রান্তরের মত ধু-ধু করছে তবুও এই রাতের জ্যোছনার মায়ায় মাঠটাকে যেন ভেজা মনে হচ্ছে। নিশিন্দা শাড়িটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিছানায় দাঁড়িয়েই আড়মোড়া ভাঙলো। আড়মোড়া ভেঙে হাই তোলার এক ফাঁকে তার হাত এসে পড়ল তার নিজেরই তলপেটে। হঠাৎ যেন খিদেটা আবার মোচড় দিয়ে তাকে জানিয়ে দিল অদ্ভুত স্বপ্নের তাড়নার মধ্যেও খিদের জ্বালা তাকে ছেড়ে যায়নি।

নিশিন্দা আন্দাজ করতে পারল এখন রাত তিনটের কম হবে না। সে শরীরে শাড়িটা না জড়িয়েই দুয়ার মেলে বাইরে এসে দাঁড়াল। জ্যোছনায় ভাসছে উঠোন। বাড়ির সীমানার চালতে গাছ থেকে ডাকছে একটা জ্যোছনাভোলা কাক। কাকের আর দোষ কি? এমন দিনের মত দিলখোলা চাঁদনীতে কাকের তো ভুল হওয়ার কথাই। নিশিন্দার মনে হচ্ছে পৃথিবীটা হয়ে উঠেছে সকালবেলার আকাশের মত।

জ্যোছনা ধোয়া উঠোনের মাঝখানে নিশিন্দা কতক্ষণ। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ক্ষুধার্ত তলপেটের ওপর হাত বোলালো। নাভির গর্তে তর্জনি ঢুকিয়ে নখ দিয়ে ভেতরকার ময়লা তুলে শুঁকলো। ঘামের টক গন্ধে খিদেটা বুঝি তার দ্বিগুণ চাড়া দিয়ে উঠেছে। হঠাৎ আবার স্বপ্নের হিংস্র গাইগরুগুলোর কথা তার মনে পড়তেই মনে হল, আসলে ঐ নিরীহ গাইগরুগুলো তো খলার বাথানগুলোতেই এখন হয়ত জাবরকেটে চলেছে। একটু পরেই গাইগুলোকে খলার রাখালরা দুইতে শুরু করবে। সকালে নদী পারাপার শুরু হলে দুধ নিয়ে চলে যাবে বাজারে। এর আগেই একটা গাইকে দুইয়ে দুধ নিয়ে এলে কেমন হয়? কথাটা মনে হতেই নিশিন্দার খিদেটা কেমন যেন চনমন করে উঠল। গরুগুলোই তো নিশিন্দাকে ডাকাতির পরামর্শ দিয়েছিল। হায় আল্লাহ! কেন নিশিন্দা গত কয়েক দিন দুধের কথা ভাবেনি? তবে কি ভগবান তার জন্য একটু আগে গাইগরুগুলোকে ডাকাত সাজিয়ে ঘুমের মধ্যে তার সাহস যুগিয়ে গেলেন?

নিশিন্দা দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে শাড়িটা তুলে এনে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক লহমায় পেঁচিয়ে কোমর ও বুক ঢেকে আঁচল মাথার ওপর তুলে দিয়ে দাওয়ায় উঠে শিকল বাঁধল। এখন তার চোখের সামনে খলার বাথানের গাভীগুলোর ওলান যেন মোটা বাট সমেত ফলের মত ঝুলছে। নিশিন্দার পেট মোচর দিতে দিতে যেন তার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে দ্রুত পায়ে চারণভূমির জ্যোছনা ধোয়া শুকনো ঘাসের ওপর দাঁড়াতেই তার মনে পড়ল, আসলে সে যা করতে যাচ্ছে তা মোটেই সোজা কাজ নয়। যদি বাথানের রাখালের কারো হাতে ধরা পড়ে যায় তাহলে সহজে ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। দল বেঁধে ঐ পশুর দল তার শরীরের ওপর মজা লুটবে। আর গাইয়ের মতো মুখ বেঁধে ফেলে রাখবে বাথানের শুকনো খড়ের ভেতর। তারপর হয়ত চুরির অপরাধে তুলে দেবে থানার মানুষদের হাতে। একথা মনে হতেই নিশিন্দার ভেতরটা কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেল। ঐ বাথানগুলোর রাখালেরা নদীর এপারের লোক নয়। তারা শহরের জোতদারদের নিজস্ব লোক। হারামজাদারা আবদুল্লার মাতব্বরি মানে না। চারণভূমি হলুদ হয়ে গেলেও ওরা পশুগুলোকে এখনো বাথানেই রেখেছে। ঘাস না থাকলেও শহর থেকে পানি আর খইল-ভুসি এনে গরুগুলোকে তাজা রাখার চেষ্টা করছে। সবাই জানে, একটু বৃষ্টি হলেই খলায় দিগন্তবিস্তৃত চারণভূমি এক রাতেই সবুজ হয়ে উঠবে। বাথানের রাখালরা আবদুল্লাহকে ভয় পায়। কারণ লোকটার মর্জি মেজাজের কোনো ঠিক নেই। ইটখোলার মালিকদের জিদ শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহর মাঝির কথার ওপর টক্কর খেয়ে এখন ভেঙে পড়েছে। তারা আবদুল্লাহর কথামতই দত্তখোলার মানুষদের ইট ও মাটি কাটার কাজে লাগতে বাধ্য হয়েছে। মঞ্জুরির ব্যাপারেও আবদুল্লাহর ফয়সালাই মেনে নিয়েছে ইটখোলার মালিক পক্ষ। বাকি আছে বাথানের মালিকরা। যদিও আবদুল্লাহ বাথানের দুধের ব্যাপারে এখনও কোনো কথা বলেনি বা রাখালদের বাথান ছেড়ে যেতেও ধমক লাগায়নি তবুও মালিকরা ভয়ে দিশেহারা। নিশিন্দা শুনেছে, অচিরেই আবদুল্লাহর সাথে জোতদারদের বাঁধবে। কারণ আবদুল্লাহ বাথানের দুধ পাইকারী দামে দত্তখোলার মানুষের কাছে বিক্রির প্রস্তাব না-কি এর মধ্যেই মালিকদের দিয়েছে। এর ফলেই এখন শহরের আশেপাশের জোতজমির মালিকদের মাথা গরম হয়ে আছে। তারাই পনেরো দিন আগে কোথায় কোন দোকানে ডাকাতির মামলায় আবদুল্লাহকেও জড়িয়ে দিয়েছে। আর আবদুল্লাহ পনেরো দিন ধরে ফেরার।

চারণভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিশিন্দা বাথানগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে একবার তিতাসের উঁচু পাড়ের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজল। হ্যাঁ, অই তো উল্টানো নাওটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নিশিন্দা নাওটার দিকে হাটা শুরু করল।

নাওয়ের কাছে গিয়ে নিশিন্দা একবার চারদিকটা দেখার জন্য মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল। না, কেউ তাকে লক্ষ্য করছে না। শুধু দক্ষিণ দিকে ইটের ভাটার বিশাল বিশাল চিমনি থেকে ধুঁয়োর কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। নিশিন্দা উবু হয়ে নৌকার ভেতর ঢুকে গেল। ভেতরটায় আবদুল্লাহ যত্ন করে ইট বিছিয়ে মাটি ঢেকে রেখেছে। নিশিন্দা জানে, এর ভেতরেই আছে আবদুল্লাহর পার্টির জোগাড় করা অস্ত্রের আড়ত। নিশিন্দা এক পাশের কয়েকটা ইট সরাতেই বেরিয়ে পড়ল রামদাটা। পাশেই পড়ে আছে কাটা রাইফেল, পিস্তল আর বুলেটের বাক্স। নিশিন্দা শুধু চকচকে রামদা’টাই তুলে এনে পাশে রাখল। তারপর আগের মতই সমান করে ইট বিছিয়ে দিয়ে রামদা’টা তুলে নিয়ে জ্যোছনার ঠাণ্ডা রোদে চারণভূমিতে বেরিয়ে এল।

এ সময় হঠাৎ চাঁদটাও যেন সুযোগ বুজে একখণ্ড শাদা মেঘের ভিতরে গিয়ে মুখ ঢেকে ফেলায় চারণভূমিটাও সহসা ঘোলাটে মেঘের মত আবছা অন্ধকারে ছেয়ে গেল। নিশিন্দা রামদা হাতে দ্রুত ছুটতে ছুটতে আধো অন্ধকারের মধ্যেই বাথানের প্রথম খোয়াড়ের গেটে এসে থমকে দাঁড়াল। গেটটা গরুর দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। নিশিন্দা দড়িতে হাত দিয়েই বুঝল, বাঁধনটা ভেতরের দিকে হওয়ায় হাত ঢুকিয়ে খোলা মুশকিল। তাছাড়া ভেতরে মোটা তারের বন্ধনীতে তালা থাকাও বিচিত্র নয়। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে লাগল নিশিন্দার। সে জানে গাইগরুর খোয়াড়ে ঢোকার আগে তাকে অন্তত একটা রাখালের মাচানের নিচ দিয়ে যেতে হবে। রাখালদের কেউ পাকড়াও করতে এলে রামদা’র কোপ না বসিয়ে পালাবার উপায় নেই।

নিশিন্দা একবার ভাবল, এ কাজ অর্থাৎ বাথানের গাই দুইয়ে দুধ চুরি করে পালানো তার কাজ নয়। কিন্তু তখনই খিদেটা চনমন করে উঠল। আর চাঁদটাও বেরিয়ে এল মেঘের ভেতর থেকে, দৈব দূরত্বে ভেসে নিশিন্দাকে সাহস যোগানোর জন্য। রামদাটা মোটা দড়ির বাঁধনের এ পাশটায় যেন আপনা থেকেই নেমে এল। খুব সাবধানে ঘষে ঘষে দড়িটা আলগা করে গেটটা যথাসম্ভব ফাঁক করে ভেতরে শরীর ঢুকিয়ে দিন নিশিন্দা। চাঁদের আলোয় দেখল, দুধের খালি মাটির ভাণ্ডগুলো সার করে বাঁশের দরজার পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নিশিন্দা নিঃশব্দে একটা ভাণ্ড তুলে নিয়ে বাঁশের দুয়ার ঠেলে রাখালদের মাচানের তলায় ঢুকে কতক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। বেচারাদের নাকের শব্দে খোয়াড়টা গম গম করছে। নিশিন্দা যথাসম্ভব নিঃশ্বাস চেপে আছে।

নিশিন্দা খোয়াড়ের ভেতরকার গোয়ালের বাঁধা গাইগরুগুলোর জাবরকাটার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। শব্দটা এমন যেন, গরুগুলো পানি চিবুচ্ছে। একটু একটু করে মাচানের তলা থেকে মাথা বের করে উঁচু হয়ে সে গোয়ালটা খুঁজল। সামনেই গাইগরুগুলো বাঁধা। এর মধ্যে দুয়েকটা শুয়ে থেকে আরামে জাবর কেটে চলেছে।

নিশিন্দার আর দেরি সইল না। সে গুড়ি মেরে এক হাতে দার আর অন্য হাতে মাটির খালি ভাণ্ডসহ গাইগরুদের ভেতরে ঢুকে পড়তেই একটা গাই অনধিকার প্রবেশের বিষয়টি যেন টের পেয়েই একটা হাম্বা ডাক দিয়ে ভয়ে থেমে গেল। এটুকু শব্দেই মাচানের ওপর নাকের শব্দটাও হঠাৎ থেমে গেল। কিন্তু কেউ উঠল না বা নেমে আসছে না বুঝে নিশিন্দা রামদায়ের গোড়ায় হাতের মুঠো একটু শিথিল করে শেষে দা’টাকে আধো অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে একটা শূন্য গামলার পাশে যেখানে একটা দুধাল গাই শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছে, তার গুটানো পায়ের কাছে ইট বাঁধানো মেঝের ওপর রাখল। নিশিন্দার নড়াচড়া ও হাতড়ে হাতড়ে গাইটার ওলান স্পর্শ করা মাত্রই প্রাণীটা ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। এ সুযোগটাই খুঁজছিল নিশিন্দা। ছোটো বয়েস থেকেই নিশিন্দা তার বাপের গাইগরু চড়িয়ে, দুইয়ে অভ্যস্ত। গাইটার ওলানে হাত দিয়েই বুঝেছে, দুধে টইটুম্বুর। আর ঘণ্টাখানেক পরেই রাখালেরা গাই দুইবার জন্য জেগে উঠবে। এর আগেই নিশিন্দাকে দুধ যতটা দুইয়ে নেয়া যায়—নিয়ে পালাতে হবে। ধরা পড়ার কথা মনে হতেই নিশিন্দার বুক দু’টি টিপ টিপ করে কাঁপল। সে সোজা উঠে দাঁড়িয়ে গাইটাকে তার আগমনে অভ্যস্ত করার জন্য পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। আগন্তুকের আদর পেয়ে গাইটা বেশ শান্ত হয়েই জাবরকেটে চলেছে। মনে হল প্রাণীটার বিস্মিত ভাব একটু স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই নিশিন্দা একবার গাইটার নিচে হাত দিয়ে ওলান স্পর্শ করল। বেশ উষ্ণ আর নরম। মনে হচ্ছে টানলেই ফিনকি দিয়ে দুধের সূক্ষ্ম স্রোত নেমে আসবে।

নিশিন্দা গাই দুইবার কায়দার অন্ধকারের মধ্যেই গাইটার নিচে উরত ফাঁক করে দুধের শূন্য ভাণ্ডাটা দুই হাঁটুতে চেপে আস্তে করে বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে গাভীর পেছনের বাট দুটো ধরে আস্তে টানতেই দুধ নেমে এল ফিনকি দিয়ে। মাটির পাত্র হলেও দুধের শব্দ উঠছে দেখে নিশিন্দা ধীরে বাটগুলো টেনে চলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশিন্দা বুঝল পাত্রটা অর্ধেক ভরে উঠছে। সে এখন ওলানের ওপর হাতের কয়েকটা ঠোনা মেরে দুধের স্রোত বাড়াতে চাইল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অদৃশ্য একটা হাত এসে সোজা তার উন্মুক্ত স্তন দু’টিকে স্পর্শ করে যেন স্তম্ভিত হয়ে বুকের মাঝখানে এসে থেমে গেল।

‘কে তুই হারামজাদী, অত্যবড় সাহস, আমার গাই দুইয়ে দুধ লুটে নিতে আমার বাথানে ঢুকেছিস?’

নিশিন্দার হাত দ্রুত গাইয়ের ওলান থেকে নিচে নেমে এসে মেঝেয় রাখা রামদায়ের বাটের উপর পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে দাটা এসে অদৃশ্য ব্যক্তির তলপেটে স্পর্শ করল।

‘আমার বুকের ওপর থেকে হাত সরা রাখালের বাচ্চা। আর আগে বাড়লে এক পোচে দু’টুকরো করে ফেলব।’

হাতটা বুকের উপর থেকে সরে গেল।

নিশিন্দা দুধের পাত্রটা উরতের ফাঁক থেকে সরিয়ে মেঝের ওপর নামিয়ে রাখল, ‘আমাকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে দে।’

এখন সে প্রায় অদৃশ্য ছায়ার মত আবছা রাখালটার মুখোমুখি, ‘দু’দিন ধরে উপোস। নিরুপায় হয়ে তোর গাই দুইয়ে নিলাম। একটু দুধের জন্য আর তোর মালিকের ক্ষতি হবে না। আমাকে যেতে দে, পথ ছাড়।’

অদৃশ্য ছায়াটা কিন্তু পথ ছাড়ল না।

‘এমনিতেই আমি তোকে দুইতে দিতাম। তোর বুক দু’টি খুব নরম।’

‘পথ ছাড় হারামজাদা। নইলে রামদা’র এক কোপে তোর লালা ঝরানো থামিয়ে দেব।’

‘কে তুই?’

‘তোর ঠাকুমা।’

‘দত্তখোলা থেকে এসেছিস? কার বেটি ঠিকানা দে, প্রতি রাতে দুধ পাবি।’

‘আরে আমার পিরিতের বন্ধুরে, উনি আমারে দুধে ভাসাবেন। পথ ছাড়বি কি-না? না রামদা’র কোপ খাবি?’

বেশ জোরে চেঁচিয়ে উঠল নিশিন্দা। সামনের ছায়া মূর্তিটাকে মনে হয় যেন নিঃশব্দে হাসল।

‘জোরে চেঁচাবি না। এখন রাখালরা জাগবে। গাই দুইবার প্রহর হয়েছে। তখন রাম দা’ দেখিয়েও পার পাবি না। আমি আজ তোকে আটকাবো না। তোর মাই দুটো আমার সব রাগ কেড়ে নিয়েছে। ও-দুটো ছুঁতে বড় ভালো লেগেছে। আর একদিন ও দুটো ছোঁয়ার আশায় তোকে আজ ছেড়ে দিচ্ছি। যা দুধ নিয়ে পালিয়ে যা।’

ছায়ামূর্তিটা নিশিন্দার সামনে থেকে সরে যেতেই সে দুধের ভাণ্ড ও রাম দা’ তুলে বাথান থেকে বেরিয়ে এল। চাঁদ মেঘের আড়ালে আবার বোধহয় লুকিয়ে পড়েছে। চারণভূমিটা এখন অসংখ্য জোনাক পোকায় ভরে গেছে। নিশিন্দা আন্দাজে দত্তখোলা গাঁ থেকে একটু নদী ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তার ঢেউটিনের ঘরটা লক্ষ্য করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল।





সকালে ঘুম থেকে জেগেই নিশিন্দা নদীর ঘাটের দিকে একটা কলরব শুনে বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসল। দা’টা এখনও তার বিছানার পাশেই চক চক করছে। রাতটাও কেটেছে নিঃস্বপ্ন। দুইয়ে আনা দুধ রাতেই জ্বাল দিয়ে সে সেরখানেক খেয়ে নিয়েছিল। দু’দিনের না খাওয়া পেটে উপচানো গরম দুধ ঢুকে যেতেই নিশিন্দার শরীর ভেঙে ঘুম নেমে আসায় সে রামদা’টা বিছানায় রেখেই শুয়ে পড়েছিল। এখন ঘাটপাড়ের কোলাহলে জেগে উঠেই তার মনে হল অস্ত্রটা এক্ষুনি লুকানো দরকার।

এর মধ্যে নদীর দিকের কোলাহল বাড়ছে। নিশিন্দার মনে হল নিশ্চয়ই পুলিশের লোক আবার এসেছে। আবদুল্লাহকে পাকড়াও করতে শহরের জোতদাররা আর ইটখোলার মালিকেরা নতুন কি চাল চেলেছে কে জানে? আর আবদুল্লাও কেমন, আজ পনেরো দিন পার হয়ে ষোল দিন হল একবারও নিশিন্দা কি খেয়ে বেঁচে আছে খোঁজ নিচ্ছে না। এমন তো কোনদিন হয়নি? এর আগেও আবদুল্লাহ পুলিশের ভয়ে কতবার উধাও হয়েছে। কিন্তু কোন না কোনভাবে নিশিন্দার খোঁজ নিয়েছে। এবার কি হল?

নিশিন্দা বিছানায় দাঁড়িয়ে শাড়ি ঠিক করতে করতে শুনলো দত্তখোলার দিক থেকে দলে দলে মানুষ ঘাটপাড়ের দিকে ছুটে যাওয়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আসলে সেখানে হয়েছেটা কি? গরু মরেছে নাকি যে চামার পাড়ার মরদ মাগীরা ঊর্ধ্বশ্বাসে মরা গরুর চামড়া ধরার জন্য ছুট লাগাচ্ছে?

নিশিন্দা শাড়ি আঁট করে পরেই দা’টা নিয়ে ভাবল। দা’টা এখন সে কোথায় লুকাবে? উল্টানো নৌকার দিকে অস্ত্র নিয়ে রওয়ানা হলে সবাই তাকে দেখবে। আর ঘাটে পুলিশ এসে থাকলে তারা এক্ষুনি এসে পড়বে এখানে। আর এসেই দা’টা তার হাতে দেখলে আবদুল্লাহকে ডাকাতির মামলায় আটকাবার সুবিধা পাবে। হয়ত হাতেনাতে ধরা পড়লে নিশিন্দাকেও থানায় টেনে নিয়ে বেইজ্জত করার একটা মওকা পাবে। ওরা যে কোনভাবে আবদুল্লাহকে হাতের মুঠোয় চেপে ধরার ফুরসত খুঁজছে।

দা’টা নিয়ে এক দৌড়ে নিশিন্দা বাড়ির বেড়ার কাছের ছাইয়ের গাদার দিকে চলে গেল। এই একটা জায়গা যেখানে দা’টা গুজে রাখলে পুলিশের সাধ্য নেই খুঁজে পায়। নিশিন্দা সোজাসুজি বিশাল ধারালো অস্ত্রটির সেগুন কাঠের বাটসহ ছাইয়ের গাদার ভেতর ঢুকিয়ে দিল। আর তখনই কে যেন বাড়ির উঠোনে এসে ঢুকেছে বলে মনে হওয়ায় নিশিন্দা তাড়াতাড়ি কুয়োর পাড়ে বালতি নামাচ্ছিল এমন একটা ভাব করে বালতির দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে উঠোনের দিকে মুখ করে ফিরতেই পুলিশের একটা লোক এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই আয়, দারোগা সাহেব উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে।’

নিশিন্দা এ সময় চোখে কোন ভাবান্তর দেখালো না। সে বালতিটা কুয়োর ভেতর ফেরে আবার স্বাভাবিকভাবেই টেনে তুলে পায়ের কাছে নামিয়ে আজলাভরা পানি নিয়ে কুলি করল। তারপর পানি ছিটালো মুখে। উবুড় হওয়াতে নিশিন্দার বুক দুটি ফলের মতো নিচের দিকে ঝুলে আছে। তার পিঠও উদোম। পুলিশটা হাভাতের মতো নিশিন্দার যৌবন দেখছে। নিশিন্দার গায়ের রং একটু ময়লা হলেও সে বিশ-বাইশ বছরের যুবতী। সবল নগ্ন বাহুমুল লালচে কেশে ভরা। গলায় ভাদুগড়ের বান্নি থেকে কেনা নতুন কাইতনে বাঁধা একটা মাদুলি। বাচ্চা হওয়ার জন্য আবদুল্লাহ তার পীর হুজুরের কাছ থেকে এনে গলায় বেঁধে দিয়েছে। নিশিন্দা উবুড় হয়ে থাকায় তার লম্বা গর্দান ও ভরাট নিতম্বের দিকে হাঁ করে দেখছে পুলিশটা।

‘এই মাগী, আমার কথা তোর কানে যায়নি? বললাম যে দারোগা সাব উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে? ভাতারকে খুন করে নদীতে ফেলে রেখে এখানে ঢং করছিস? পাছায় লাগাব লাথি একটা?’

চমকে গেল নিশিন্দা। লোকটা কি বলতে চাইছে? ভাতারকে খুন মানে কি?

এ সময় নদীপাড়ের কোলাহলটা হঠাৎ যেন তার নিজের উঠোনে এসে হট্টগোল বাঁধিয়েছে বলে মনে হল।

‘কি বললেন আপনি?’

‘ঢং করবি না মাগী। ভান করে খুনের মামলা থেকে পার পাবি না। তোর ভাতারের লাশ ষাটপাড়ের সামনে কলমি দামের পাশে ভেসে আছে। আমরা লাশ তুলে এখনই থানায় নিয়ে যাব। তারপর সুরতহাল। এখন গায়ে হাত দেবার আগে উঠোনে আয়। দারোগা সাহেব তোকে দেখবেন। এমন জোয়ান স্বামীটারে গুলীতে মারলি? আর কারা ছিল তোর সাথে আমরা সব বের করব।’

নিশিন্দা বুঝল যে তার সর্বনাশ হয়ে গেছে। সে আর পুলিশটার দিকে চোখ তুলে না তাকিয়ে কুয়োর পার থেকে বাড়ির পেছনটা পেরিয়ে উঠোনে দারোগার সামনে এসে দাঁড়াল, ‘কি হয়েছে আবদুল্লাহর? আপনার লোকটা গিয়ে কি কথা বলছে দারোগা সাব?’

আরও তিনজন পুলিশ নিয়ে দারোগা রমিজউদ্দিন উঠোনে দাঁড়িয়ে। তার পেছনে সারা দত্তখোলার লোক জমা হয়েছে। সবার চোখে মুখে আতঙ্ক। কয়েকদিন আগে আবদুল্লাকে ধরতে পুলিশ এ বাড়িতে হানা দিয়েছিল। রাতে একজন হাওয়ালদার এসে নিশিন্দাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছে। দারোগা রমিজউদ্দিনের এসব অজানা থাকার কথা না। রমিজ মধ্য বয়ষ্ক অফিসার। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করার অভিজ্ঞতায় তার দাড়িতে পাক ধরেছে। সে সহসা নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে কোন অশালীন আচরণ করতে পারল না। সে স্থির দৃষ্টিতে নিশিন্দাকে দেখল। ততক্ষণে একটি সেপাই ঘরের দাওয়া থেকে একটা টুল তুলে এনে দারোগাকে উঠোনের মাঝখানে বসতে দিয়েছে। রমিজউদ্দিন কতক্ষণ নিশিন্দার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চোখ মাটির দিকে ফিরিয়ে এনে অনুত্তেজিত গলায় নিশিন্দাকে প্রশ্ন করল, ‘তুই আবদুল্লার বৌ?’

নিশিন্দা বলল, ‘আমার স্বামীর কি হয়েছে সেটা আগে বলুন। আবদুল্লাহ কোথায়?’

‘নিজের ভালো চাস তো মাগী আগে আমার কথার জবাব দিয়ে যা। আগে বল আবদুল্লার সাথে তোর কতদিন হল বিয়ে হয়েছে?’

এবার রমিজ দারোগার গলা থেকে পুলিশের স্বভাবসুলভ কর্কষতা ছিটকে পড়ল। নিশিন্দা অনেকটা দিশেহারার মতো এদিক ওদিক তাকিয়ে এক ধরনের নিরুপায় গলায় জবাব দিল ‘এক বছর আগে। আমার শ্বশুর বেঁচে থাকতে।’

‘তুইতো চামারের মেয়ে।’

‘আমরা জাতে ঋষি।’

‘আবদুল্লার সাথে তোর পিরিতি হলো কি করে? মুসলমান মাঝির ছেলে তোকে কাবিন করে বিয়ে করেছিল?’

‘পীরের সামনে আমার বিয়ে হয়েছিল। সুহিলপুরের জেলেরা আর দত্তখোলার ঋষিরা সাক্ষী।’

‘অর্থাৎ বিয়েটিয়ে একটা বাজে কথা। তুই ডাকাত আবদুল্লার সাথে থাকতি। থানায় রেকর্ডে আছে তোর বাপ কার্তিক ঋষিও ডাকাতি করতে গিয়ে মেঘনায় পুলিশের গুলী খেয়ে মরেছিল। ঠিক কি-না?’

নিশিন্দা এ কথার জবাব দিল না।

‘আমার কথার ঠিক ঠিক জবাব দে। এটা খুনের মামলা।’

‘কে কাকে খুন করেছে, কে খুন হয়েছে তা না জেনে আমি আর একটি কথারও জবাব দেব না।’

এবার নিশিন্দারও ঋষিপাড়ার মেয়েদের মত নির্ভীক শঙ্খচিলের মত তীক্ষ্ন গলা বেরিয়ে এল।

রমিজ দারোগার মুঠি একবার তার বেটনের ওপর শক্ত হয়ে এলও দারোগা জানে যে কাজের জন্য সে মেয়েটাকে বাধ্য করতে চায় তা এপথে সম্ভব হবে না। মুহূর্তের মধ্যে সে ভঙ্গি বদলে ফেলতে চাইল।

‘আবদুল্লাহ গত রাতে খুন হয়েছে। তার লাশ নদীর কলমি ঝোপে পড়ে আছে।’

কথাটা শুনেই নিশিন্দা উঠোনের মাটিতে বসে পড়ল। তারপর গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করতে শুরু করল। দারোগা এই ফাঁকে একটা সিগ্রেট ধরিয়ে নিয়ে একটা সুখ টান দিয়ে ভিড়টার দিকে ফিরে বলল, ‘এই হারামজাদারা পালা জলদি। নইলে তোদেরও থানায় ধরে নিয়ে যাব।’

ভিড়টা এই ধমকে এক ইঞ্চিও নড়ল না। বরং একটা বেশ জোয়ান ছেলে এগিয়ে এসে বলল, ‘আবদুল্লাহ ভাইকে কে মেরে ফেলার চেষ্টা এতদিন করে এসেছে তা খলার আর দত্তখোলার মানুষেরা সকলেই জানে, পুলিশও জানে।’

দারোগা ছেলেটার দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সিগ্রেটে একটা সুখটান মেরে বুঝল গাঁয়ের লোকের চোখে আগুন জ্বলছে।

রমিজ দারোগা বুদ্ধিমান। সে নিজেকে সম্বরণ করে নিল।

‘আমি তোর সাথে সোয়াল করছি না। খুনি কে তা আমরা ঠিকই বের করব।’

‘যারা নিজেরাই খুন করে তারা খুনি বের করে না।’

আবার ছেলেটা ঘাড় কাত করে কথা বলছে। আর ভিড়টাও নিবিড় হয়ে উঠোনটিকে ঘিরে ধরেছে। কে যেন ভেতর থেকে-চিৎকার ক’রে বলে উঠল, ‘ইটখোলার মালিক আর খরার গাইগরুর জোতদারদের জেরা না করে নিশিকে থানায় নিয়ে গেলে আমরা খলায় কাউকে আস্ত রাখবো না। নদী পার হয়ে চরে কাউকে ঢুকতে দেব না। ইটের ভাটায় তিতাসের পানি ঢুকিয়ে সব নিভিয়ে ঠাণ্ডা করে দেব। আমাদের কতজনকে পুলিশ ধরবে?’

এবার রমিজ দারোগার টনক নড়ল। সে একবার ভিড়টার দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় হাজার খানেক নরনারী। প্রত্যেকের চোখ ভাটার মতো জ্বলে উঠেছে। সে সিগ্রেটটা ক্রন্দনরত নিশিন্দার লুটিয়ে পড়া দেহের খানিক দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দিতে বলল, আমি এই খুনের জন্য তোকে আসামী করব না। আমি জানি এই খুন কোনো মেয়েছেলের কাজ নয়। আবদুল্লাহর শরীরে বুলেটের চিহ্ন রয়েছে। এটা নিশ্চয়ই কোনো দলের কাজ। আবদুল্লাহ যাদের সাথে অর্থাৎ রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের সাথে জড়িত ছিল এটা তাদের কাজও হতে পারে। আবার শহরের জোতদার আর ইটভাটার মালিকদের লোকও এ খুন করতে পারে। আমরা তদন্তের জন্য এক্ষুনি লাশ তুলে শহরে নিয়ে যাব। যাওয়ার আগে নিয়মমাফিক আমি আবদুল্লাহর ঘরের মানুষকে গতরাতে সে বাড়িতে ছিল কি-না জিজ্ঞেস করতে চাই। গাঁয়ের লোকেরা যদি পুলিশের কাজে বাধা দেয় তবে আমি বাধ্য হব শহর থেকে আরও পুলিশ ফোর্স ডেকে আনতে।’

দারোগার কথায় ভিড়ের ভেতর গুঞ্জন উঠল।

ততক্ষণে নিশিন্দা মাটি থেকে মাথা তুলে উঠোনে বসেছে। তার বসন অসম্বৃত। শাড়িটা কোমরে খানিকটা জড়ানো থাকলেও ছতর থেকে মাটিতে লুটিয়ে থাকায় নাভি থেকে ওপর দিকটা উদোম। এ অবস্থায় নিশিন্দাকে মনে হচ্ছে ছবিতে দেখা মৎস্যকন্যার মত কিংবা কুমোরপাড়ার পূজোর আগে সাজিয়ে রাখা রংহীন মাটির দেবীমূর্তির মতো।

‘গতরাতে আবদুল্লাহ বাড়ি এসেছিল?’

দারোগার সোজাসুজি প্রশ্নে নিশিন্দা এবার একটু হকচকিয়ে গেল। তবে কি সে যখন খলায় গাই দুইয়ে আনতে গিয়েছিল তখন লোকটা তার খোঁজ নিতে বাড়িতে এসেছিল? ফেরার সময় কিংবা নদী পার হওয়ার সময় কেউ গুলী করে মেরেছে?

‘জবাব দে। আমি তোর জবানবন্দী নোট করছি।’

নিশিন্দা দেখল দারোগা বুক পকেট থেকে একটা নোট বই বের করে লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

‘না, সে গতরাতে বাড়ি ফেরেনি।’

‘কতদিন যাবৎ তোর সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ নেই?’

‘পনেরো দিন।’

‘পনেরো দিন আগে সে যখন নিয়মিত বাড়ি আসত তখন সে কি কেউ তার ওপর হামলা করতে পারে বলে তোকে জানিয়েছিল?’

‘না।’

‘তবে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল কেন?’

‘শহরের একটা ডাকাতি মামলায় পুলিশ তাকে জড়াতে চাচ্ছে বলে সে আমাকে জানিয়েছিল। পরশু রাতে থানার লোক তার জন্য এ বাড়ি তল্লাশি করে গেছে।’

‘তোর কাউকে সন্দেহ হয়?’

এ প্রশ্নে যেন নিশিন্দা সম্বিৎ ফিরে পেল। সে শাড়িটা টেনে বুক ঢাকলো। উদাসীনভাবে দেখলো এলাকার ভিড়টা তাকে দেখছে। চামার মেয়েটার সম্ভ্রমবোধ দেখে দারোগা হঠাৎ তার সিগ্রেটের প্যাকেট খুলে সামনের এগিয়ে দিয়ে বলল, তোর কথার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সকলের সামনে নাম বলতে না চাইলে ঘরের ভেতরে চল। সে একটা সিগ্রেট খা।’

নিশিন্দা কি ভেবে যেন দারোগার প্যাকেট থেকে একটা সিগ্রেট ও তার হাতের দেশলাই নিয়ে ধরালো।

‘কারা কারা আবদুল্লাহকে খুন করতে পারে বলে তুই সন্দেহ করিস?’

নিশিন্দা ধোঁয়া ছেড়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল।

‘জবাব দে।’

‘আমার সবাইকে সন্দেহ হয়। পুলিশ, শহরের গাইগরুর মালিক আর আবদুল্লাহর সঙ্গী সবাইকে।’

দারোগা মাথা নুইয়ে কথাগুলো টুকে নিলো।

‘এবার তোর নাম, বাপের নাম বল।’

‘নিশিন্দা ঋষি। বাপ কার্তিক ঋষি। সাকিন দত্তখোলা, থানা ও জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।’

‘তোর আর আবদুল্লাহর পেশা কি ছিল? অর্থাৎ তোরা স্বামী-স্ত্রীর রুজিরোজগারের কথা বল। কি ধান্ধা করতি?’

‘আমার স্বামীর পৈতৃক পেশা ছিল মাঝিগিরি। সে নিজে ইজারঘাটগুলোর টোল আদায় করতো। আর আমি কিছু করি না।’

নিশিন্দা বুঝতে পেরেছে দারোগা একটু একটু করে এত মানুষের সামনে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে নিতে চাইছে। সে খুব সাবধানে জবাব দিল।

‘গতরাতে নদীর মধ্যে কোনো গুলির শব্দ শুনেছিলি? তুইতো গতরাতে ঘরেই ছিলি। শুনেছিস?’

‘না।’

জবাব দিল নিশিন্দা। যদিও রাতে ঘরে থাকার প্রশ্ন শুনে বুকটা ধুক করে উঠল। জেরা শেষ হলে দারোগা বলল, ‘সন্ধ্যার দিকে থানায় গিয়ে মামলার কাগজপত্র তুই সই করে আসবি। আর সুরতহাল শেষ হতে একটু সময় নেবে। আগামীকাল সকালে গিয়ে গাঁয়ের লোক লাশ নিয়ে আসতে পারে।’

দারোগা লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় নিশিন্দা ও গাঁয়ের লোকজন ঘাটে গিয়ে চটে ঢাকা আবদুল্লাহর লাশ দেখল। পুলিশ লাশ নৌকোয় তুলে নদী পার হয়ে গেলে নিশিন্দা ঘরে ফিরে এসে গুম হয়ে দাওয়ায় বসে থাকল।





চাঁদ উঁঠেছে আকাশে। পূর্ণিমার পরের দিনের ঈষৎ ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ। থানায় নিজের জবানবন্দি ও অভিযোগ স্বাক্ষর করে মামলা দায়ের করেছে নিশিন্দা। আবদুল্লার লাশ গাঁয়ের লোকেরা যথারীতি ব্যবস্থা করে কবর দিয়েছে তিতাসের এপারের বড় বটগাছটার নিচে। গাঁয়ের লোকেরা যথারীতি সহানুভূতি জানিয়ে কিছু চিড়ামুড়ি আর গুড় ঘরের দাওয়ায় রেখে গেলেও নিশিন্দার ভুখ পিয়াস মেটেনি। এও দু’দিন আগের কথা। এখন আবার ক্ষিদের পেটটা মোচড় দিচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে নিশিন্দা দাওয়ায় এসে মাদুর পেতে শুয়ে পড়ল। খিদেয়, গরমে আর জ্যোছনায় নিশিন্দা বুক থেকে কাপড় সরিয়ে চাঁদের দিকে তাকাতেই তার মনে হল কারা যেন তার সারা গায়ে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। কে যেন কানের কাছে মুখ এনে বলছে, ‘সব দুধ দুইয়ে নিয়ে যা। আজ আটকাবো না তোকে। তোর বুক দুটি খুব নরম। আহ তোর মুখখানি যদি দেখতে পেতাম। কার মেয়ে তুই ঠিকানা দিলে প্রতিদিন দুধ দুইয়ে দিয়ে আসব...।’

লাফ দিয়ে দাওয়ায় উঠে বসল নিশিন্দা। মনে পড়ল দা’টা এখনও ছাইয়ের গাদায় গোঁজা। কিন্তু হাতটা যেন হঠাৎ জ্যোছনায় মিলিয়ে গেল। নিশিন্দা চারদিকে তাকিয়ে বুঝল এখানে কেউ এসে তার গায়ে হাত দেয়নি। মনের ভুল। দুধ চুরির ঘটনাটা খিদের জ্বালায় আবার তাকে বাথানের দিকে ঠেলতে চাইছে। কেবলই কি দুধ? না আর কিছু? লোকটার গলা কি আশ্চর্যজনক ভাবেই না তার স্তন ছুঁয়ে নরম হয়ে উঠেছিল। কে রাখালটা? তার মুখ, গতর, হাত কিছু দেখেনি নিশিন্দা। কত বয়েস হবে রাখালটার? সে কি যুবা পুরুষ আবদুল্লাহর মতো? নাকি বুড়ো হাবড়া? বুড়ো হলে গলার আওয়াজ অতটা কোমল হয়ে উঠতে পারত না। না এটা তার মনেরই ভুল। খিদের জ্বালা নিশিন্দাকে রাম দা নিয়ে বাথানের দিকে ছুটে যেতে ডাকছে।

নিশিন্দা আবার শুয়ে পড়ল।

পেটের ভেতরে খিদের নখ আঁচড়ানো ঠেকাবার জন্য আবদুল্লাহর মরা মুখ মনে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু কল্পনায় ভাসতে লাগল আবদুল্লার সাথে তার সুখস্মৃতি।

চিত্রালয়ে সিনেমা দেখে সে রাত সাড়ে এগারোটায় খেয়াঘাটে এসে দেখে কে একজন লোক নাও নিয়ে প্রায় নদীর মাঝামাঝি চলে গেছে। অথচ এটা শেষ খেয়া। ছাড়ার কথা রাত বারোটায়। সম্ভবত আজ পারানির মাঝি না থাকাতে ওপারের ঐ লোকটার তর সয়নি। ঠিক সময়ের আগেই নাও ভাসিয়ে নিজে পার হয়ে যাচ্ছে। কি স্বার্থপর লোকটা, একবারও ভাবল না শহরে সিনেমা দেখে যারা ফিরবে তাদের নাও না পেলে সাঁতরে তিতাস পার হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। তিতাস অবশ্য ছোট নদী। নাও না পেলে অনেকে সাঁতরেই পার হয়ে যায়। কিন্তু নিশিন্দার মত মেয়েছেলে কি করে এতরাতে নদী পেরুবার সাহস পাবে? শহরে নিশিন্দা সাধারণত যে ধরনের কাজ করে, যেমন মহাজনদের দোকান ঝাড় দেয়া থেকে শুরু করে কলসী ভরে পানি তুলে দেওয়া। দশ বারোটা দোকানের কাজ শেষ করতে তার সন্ধ্যাবাতির আগেই সব শেষ হয়ে যায়। কাজ শেষ হলেই সে আর অন্যান্য ঋষি মেয়েদের মতো ঘোরাফেরা করতে চায় না। সেদিন আটকে গিয়েছিল অন্য কারণে। ভাদুগড়ের ঋষিপাড়ার মেয়ে তার সই সুনীতি তাকে এক রকম জোর করে ধরেই সিনেমায় নিয়ে গিয়েছিল। তাও সেকেন্ড শো। সুনীতির কি, তার তো নদী পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় না। কে জানে সেদিন নিশিন্দাকে কিসে পেয়েছিল? সেও সুনীতির কথামত সেদিন রাতের শো দেখতেই হলে ঢুকে পড়েছিল। শো শেষ হলে ছুটতে ছুটতে সে নদীর ঘাটে এসে দেখে খেয়া নাও এখন মাঝ নদীতে।

নিশিন্দা দুহাত মুখে চোঙের মতো গোল করে প্রাণপণে নাওয়ের লোকটাকে ডাকল, ‘ও মাঝি আমাকে নিয়ে যাও।’

নদীতে বাতাস না থাকাতে এক ডাকেই কাজ হল। মনে হল নাওয়ের বাতাটা মাথাসহ ঘুরে যাচ্ছে। সে রাতটাও ছিল এমনি চাঁদনী রাত।

নাও এসে ভিড়তে নিশিন্দা কিনারের পানি ভেঙে এক লাফে নৌকায় উঠে গেল।

‘মেয়েমানুষ এত রাত করে কোত্থেকে এলি? চেনা মনে হচ্ছে?’

‘আমি দত্তখোলার কার্তিক ঋষির মেয়ে।’

‘ও কার্তিক কাকার মেয়ে। বাজারের কাজ শেষ করতে অত রাত হয় নাকি আজকাল? না অন্য ধান্ধায় ঘুরিস?’

‘কি ধান্ধা আবার? সইয়ের সাথে একটু সিনেমা দেখে ফিরলাম। ভাদুগড়ের সই। কোন ধান্ধায় ঋষি মেয়েরা থাকে না। আমরা খেটে খাই।’

মুখের ওপর জবাব দিল নিশিন্দা। ঘাড় ঘুরিয়ে নদীর দিকে তাকিয়েই বলল, ‘তুমি আবার কে? নাও নিয়ে বারোটার আগেই শেষ পাড়ি দিচ্ছ? আরও তো মানুষ থাকতে পারে?’

‘আরে আজ তুই আর আমিই শেষযাত্রী। আমার পরিচয় জেনে কি হবে? চেয়ে দ্যাখ আকাশে কাসার থালার মত চাঁদ উঠেছে। এমন রাতে মানুষ কি কূলে ভিড়তে চায়? শেষযাত্রী বলে তোর জন্য নাও ভিড়ালাম।’

লোকটা কেমন রহস্যময় হাসি হাসল। নাও ততক্ষণে আবার নদীর মাঝামাঝি এসে যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে। লোকটা বৈঠা নাওয়ের ভেতর তুলে এনে চুপচাপ বসে আছে। বাইছে না।

‘এই মানুষ, বৈঠা তুলে রেখেছো কেন? নাও যে বেঘাটে যাচ্ছে দেখতে পাও না?’

লোকটার খাসলত সুবিধের নয় বলে মনে হল নিশিন্দার।

‘তোরে নিয়ে আজ আঘাটায়ই পাড়ি দিয়েছি,’ বলেই লোকটা অদ্ভুত শব্দ করে হাসল। কিন্তু অসভ্য মানুষটার কাছ থেকে সে রাতে যে আচরণ পাবে বলে নিশিন্দা ভয়ে কাঁপছিল, লোকটা তেমন কিছুই করল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে নিজেই বৈঠাটা তুলে নিয়ে বাইতে লাগল। নাও ঘাটে ভিড়ালে নিশিন্দা নেমে পড়ল। লোকটা নাওয়ের মাথা ডাঙার ওপর একটু টেনে উঠিয়ে লগি ঢুকিয়ে বাঁধল। নিশিন্দা ইচ্ছে করলে লোকটাকে ঘাটে রেখে চলে যেতে পারত। কিন্তু কি ভেবে যেন নিশিন্দা গেল না। পাড়ের উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে থাকল।

লোকটা ওপরে উঠে রহস্য করে হাসল, ‘কি, এখন চাঁদনীরাতে একা ঘরে ফিরতে তোর বুঝি মন চায় না?’

‘আমি যে একা একথা কে বলল?’

এবার নিশিন্দাও হাসল।

‘কার্তিক কাকার তুই ছাড়া আরও কেউ আছে নাকি? কই আমি তো জানি না? কার্তিক কাকার মৃত্যুর পর ওদিকে আর যাইনি। আমাকে তোর বাপ খুব ভালবাসতো। তোকে মাঝেমধ্যে নদী পার হয়ে শহরে যেতে দেখি বটে, কিন্তু আলাপ করা হয়নি। তুই তো খুব খুবসুরত হয়েছিস। পাত্তা দিলে একদিন তোর দাওয়ায় গিয়ে উঠব। দিবি নাকি পাত্তা?’

‘না চিনেই পাত্তা দেয় নাকি মানুষ? আগে তো তোমার সাতকাহন শুনব। তারপর মন চাইলে পাত্তাও খানিকটা দিতে পারি।’

এবার নিশিন্দাও রহস্যময়ী হাসি হেসে উঠল। লোকটাকেতো মজার মানুষ বলেই মনে হচ্ছে।

‘আমি চরের দক্ষিণ পারের সফর মাঝির ছেলে আবদুল্লাহ। আমার বাপের সাথে তোর বাপের দোস্তি ছিল। এখন চিনেছিস?’

‘আর চেনার দরকার হবে না। পাত্তা দিলাম। একদিন এসো। চামারের মেয়ে বলে আবার গায়ে ফুসকুড়ি উঠবে নাতো?’

এভাবেই আবদুল্লাহকে নিশিন্দা আহ্বান করে নিজের দাওয়ায় উঠিয়ে এনেছিল। আর আবদুল্লাহও তার পীরের কাছে নিয়ে গিয়ে অনেক মানুষকে সাক্ষী সাবুদ রেখে নিশিন্দাকে বিয়ে করেছিল।

নিশিন্দা শাড়ি শরীরে বিছিয়ে মুখ ঢেকে ঘুমুতে চাইল। কিন্তু ছাইয়ের গাদায় লুকিয়ে রাখা রামদাটা যেন এখন তার চোখের সামনে নাচছে। দায়ের মাথায় একটা চোখ আঁকা। চোখটা খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। নিশিন্দাকে ইশারা করছে রামদা’টা। যেন বলছে, কেন শুয়ে আছিস? আয়, বাথানের সবগুলো গাই দুইয়ে আনি। আমি থাকতে তুই মাগী কেন উপোসে হাঁসফাঁস করবি? ওখানে তোকে আটকাবার কে আছে? যে আছে সেতো তোর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতেই চায়। উঠে আয় মাগী।

নিশিন্দা এপাশ-ওপাশ করে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কিন্তু হারামজাদা দা’টা বারবার ছাইয়ের গাদা থেকে উঠে এসে এমনভাবে নাচ জুড়ে দিল যে, নিশিন্দা আর শুয়ে থাকতে পারল না। ভাবল, দা’টা ছাইয়ের গাদা থেকে তুলে এনে মাদুরের নিচে রেখে দিলে সে হয়তো তাকে আর উস্কাবে না।

নিশিন্দা দাওয়া থেকে উঠে সোজা ছাইয়ের গাদার কাছে গিয়ে ভেতরে হাত ঢুকালো। দা’টা গরম হয়ে আছে। নিশিন্দা দা টেনে বের করে দাওয়ায় মাদুরের নিচে রেখে বালিশ টেনে শুয়ে পড়তেই উঠোনে কার যেন পায়ের আওয়াজ পেয়ে আবার উঠে বসল। উঠোনের এ প্রান্তেই নিশিন্দার গা ঘেঁষে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে।

‘কে?’

‘চেঁচাবি না, আমি খলিল।’

লোকটা নিশিন্দার গা ঘেঁষে বসল। একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে। খলিল আবদুল্লার পার্টির লোক। দু-একবার গভীর রাতে আবদুল্লার সাথে দেখা করতে মাঝেমধ্যেই এ বাড়িতে এসেছে। কিন্তু আবদুল্লার মৃত্যুর পর এই প্রথম পার্টির কেউ নিশিন্দার খোঁজ নিতে এসেছে।

‘পুলিশের জন্য এদিকে আসতে পারি না। তোর সাথে পুলিশ নিশ্চয়ই খুব খারাপ ব্যবহার করছে? আমাদের কারো নাম জিজ্ঞেস করেছিল?’

লোকটা ঝুঁকে ফিসফিস করে নিশিন্দাকে প্রশ্ন করল। নিশিন্দা শাড়িটা শরীরে ঠিকমত জড়িয়ে মাদুরের নিচ থেকে রামদা’টা বের করে আনল।

‘তার আগে বল আবদুল্লাহকে কারা মেরেছে।’

‘আমি, বিশ্বাস কর নিশি কিছুই জানি না। আমি শহরে ছিলাম না।’

‘তাহলে এত রাতে আমার কাছে কেন এসেছিস?’

‘আমি তোর কোনো ক্ষতি করতে আসিনি নিশি। আমি শুধু হাতিয়ারগুলো নিয়ে যেতে এসেছি। ওগুলো তোর কাছে থাকলে খুব বিপদ হবে। পুলিশ আর পার্টির লোক বারবার ওগুলোর জন্য হানা দেবে। তোকে শেষ করেও দিতে পারে, যেমন আবদুল্লাহকে দিয়েছে।’

‘আবুদল্লাহকে তোরা মেরেছিস। তোদের পার্টির কাজ।’

‘বিশ্বাস কর আমি কিছুই জানি না। আমি এসবের মধ্যে ছিলাম না। ইটভাটার মালিক, পুলিশ আর পার্টি আবদুল্লার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল বুঝতে পেরে আমি পালিয়ে যাই। যাওয়ার আগে আমি আবদুল্লাকে আমার সন্দেহের কথা বলেছিলাম। আবদুল্লাহ পাত্তা দ্যায়নি। ইটখোলার মালিকরা আর বাথানের মালিকরা তোকে আর আবদুল্লাকে এখান থেকে উচ্ছেদের জন্য লাখ লাখ টাকা ঢেলেছে। আমি জানতাম। আবদুল্লাহকে বলেছিলাম। সে শুনলো না।’ লোকটা গলা আরও নামিয়ে কথা বলছে।

‘আমি দু’দিন ধরে না খেয়ে আছি। তোর ধানাইপানাই ভালো লাগছে না। কি বলতে এসেছিস তুই?’

‘আবদুল্লাহর হাতিয়ারগুলো আমাকে দিয়ে দে। তোকে আমি পাঁচ হাজার টাকা দেব নিশি। টাকা নিয়ে এখান থেকে তুই পালিয়ে যা, নইলে পার্টির লোকই তোকে একদিন ওগুলোর জন্য মেরে ফেলবে। আমি টাকা নিয়ে এসেছি।’

‘ওগুলো দিয়ে তুই কি করবি? তুই তো আর ওদের সাথে থাকছিস না মনে হচ্ছে। তোকে ওরা মালগুলোর জন্য ধাওয়া করে বেড়াবে না?’

লোকটার আসল মতলব যাচাই করতে চাইছে নিশিন্দা।

‘আমি তেলিয়াপাড়া সীমান্তের কাছে নতুন দল গড়েছি। আবদুল্লাহ নেই আমি এখানে থাকব না, তুই মালগুলো দিয়ে দে নিশি, আর তুই আমার সাথে যেতে চাইলে, চল আমরা এক সাথে থাকব।’

‘আমাকেও নিবি?’ খিল খিল করে হাসল নিশিন্দা, ‘আমাকেও নিবি মানে কি? তোর ওস্তাদের বিবিকে বিয়ে করবি? তোর হুকুম শুনবো, তোর সাথে শোবো এই তো?’

আবার শব্দ করে হাসল নিশিন্দা।

‘আমাদের কাজের ভাগও পাবি। তোকে রানীর হালে রাখব।’

‘আর আমি যদি বলি মালগুলো কোথায় আছে আমি জানি না। আবদুল্লাহ আমাকে ওসব সম্বন্ধে কিছু বলে যায়নি?’

‘মিথ্যে কথা। আমি জানি তুই সব জানিস।’ এবার খলিল লোকটার কণ্ঠ কর্কশ হয়ে উঠল।

‘আমি জানি না।’

‘তুই সব জানিস। এই রামদা’টা যখন তোর হাতে দেখছি, তুই বাকি মালগুলোর কথাও জানিস। মনে রাখিস আবদুল্লাহ ওগুলোর জন্যই মারা পড়ল। তুইও খতম হবি। ভালোয় ভালোয় আমাকে ওগুলো দিয়ে দে নিশি। আমি মারতে চাই না, পাঁচে না পোষায় তোকে দশ হাজার দিচ্ছি।’

খলিল মনে হল টাকার জন্য কোমরে হাত দিল।

‘আবদুল্লাহকে কে মেরেছে না জানা পর্যন্ত মালের সন্ধান কেউ পাবে না। ভাগ আমার উঠোন থেকে।’

নিশিন্দা উঠে দাঁড়াতে গেলে লোকটা হঠাৎ তার কোমর থেকে পিস্তল টেনে বের করে চিৎকার করে উঠল, হারামজাদি, আমিই তোকে শেষ করব।’ লোকটা গুলি করার আগেই নিশিন্দা ঝাটকা মেরে ঘুরে দাঁড়িয়েই রামদা’টা তার কবজি লক্ষ্য করে বসিয়ে দিল।

‘মাগো’ বলে লোকটা ঝুঁকে পড়ার আগেই নিশিন্দার মাদুরের ওপর অস্ত্রটা পড়ে গেল। নিশিন্দা দ্রুত হাতে পিস্তলটা তুলে ছুঁড়ে ঘরের ভেতরে ফেলে দিয়ে বলল, ‘পালা হারামজাদা। প্রাণের মায়া থাকলে খলা ছেড়ে পালা।’

তার হাতে উদ্যত রামদার ওপর চাঁদের আলো পড়ে চকচক করে উঠেছে। লোকটা দৌড়ে উঠোনটা পার হয়ে নদীর দিকে ছুটতে ছুটতে বলতে লাগল, ‘তুই আমার একটা আঙুল কেটেছিস। আমি তোকে একদিন দশ টুকরো করে কাটবো, মনে রাখিস।’

নিশিন্দা লোকটার পেছন পেছন উঠোন পেরিয়ে এসে জবাব দিল, ‘ইটভাটার দালাল, আবদুল্লাহর খুনির দল আমিও তোদের ফাঁসিতে না ঝুলিয়ে ছাড়ব না।’





সকালের সূর্য দিগন্তরেখার বেশ একটু ওপরে উঠে এসেছে। আবদুল্লাহর ঘরের দাওয়াটা খালি। গত রাতের ঘটনার পর নিশিন্দা ভেতরে গিয়ে খিল এঁটে শুয়ে পড়েছিল। তার একপাশে রামদা আর বালিশের নিচে খলিলের ফেলে যাওয়া পিস্তল। জানালার ফাঁক গলিয়ে রোদ এসে নিশিন্দার মুখে পড়তেই সে লাফ দিয়ে উঠে বসল। উঠেই মনে হল উঠোনে কে যেন হাঁটছে। নিশিন্দা দ্রুত হাতে রামদা’টা চাটাইয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে বালিশের ওপর কাঁথা চেপে দুয়ার মেলে দিয়ে বাইরে এল। খাকি শার্ট আর লুঙ্গি পরা একটা লোক নিশিন্দাকে সামনে দেখেই জিজ্ঞেস করল, ‘তুই আবদুল্লাহর বৌ?’

নিশিন্দা কোন জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে লোকটার দিকে চেয়ে থাকল।

‘আমি ইটখোলা থেকে এসেছি। তোকে খোলার ম্যানেজার ডেকেছে।’

‘ওখানে আমার কোন কাজ নেই। আমি ইটখোলায় যাই না।’

জবাব শুনে মধ্যবয়স্ক বেয়ারাটা থতমত খেয়ে নিশিন্দার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সম্ভবত লোকটা এতদঞ্চলে নতুন কাজ নিয়েছে। ইটখোলার সাহেবের ডাক শুনেও এ গাঁয়ের কোন মানুষ, তাও আবার মেয়েমানুষ এ ধরনের একটা জবাব দিতে পারে তা তার ধারণায় ছিল না।’

‘আমাকে পাঠিয়েছে আমি বলে গেলাম। যাওয়া না যাওয়া তোর ইচ্ছে।’

‘আমার ইচ্ছেটাতো আমি তোকে বলেই দিলাম। যা গিয়ে তোর বাপকে বল, তার দরকার থাকলে সে-ই যেন আসে। বলিস আবদুল্লাহর বৌ বলেছে।’

এ-কথায় মনে হল লোকটা পড়িমরি করে উঠোন পেরিয়ে ছুটে পালাল।

এখন সারা পেটজুড়ে একটা ভুখের ব্যথা যেন ছড়িয়ে পড়েছে। নিশিন্দার মনে হল সে একটা ক্ষুধার্ত বাঘিনী। যে করেই হোক তার বেঁচে থেকে দুনিয়ার ওপর প্রতিশোধ নিতে হবে। প্রতিশোধ হত্যা এবং নিজের ক্ষুধার্ত পেটের। বেড়ায় ঝোলানো কনুই জালটার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। এইতো এখনও বেঁচে থাকার কিছু উপকরণ তার ঘরে আছে। জালটা আধমরা তিতাসের স্রোতে কয়েকবার ছুড়ে মারলে মাছ না উঠুক, কয়েকটা গুগলি শামুকও কি রিজিক দেনেঅলা জুটিয়ে দিতে পারে না? না পারলে কাল থেকে সে পিস্তল নিয়ে শহরের পথে রাহাজানি করে বেড়াবে। তবুও হার মানবে না। সে হার মানবে না আবদুল্লাহর খুনি শহরের জোতদার, ইটভাটার মালিক আর গুপ্তপার্টির ছদ্মবেশধারী রাজনৈতিক ডাকাতদের কাছে।

সারাদিন জাল মেরে কিছু কুঁচো মাছ আর শাপলা তুলে এনে চুলোয় চাপিয়ে দিল নিশিন্দা। রান্না সেরে খেতে বসতে যাবে এমন সময় রমিজ দারোগা এসে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল, ‘তোকে দু’টো ভাল পরামর্শ দিতে এলাম। ইচ্ছে হলে আমার কথা কানে তুলবি কিংবা তোর যা খুশি তাই করবি।’

লোকটার কথায় একটা হামদর্দি ভাব টের পেয়ে নিশিন্দা টুলটা এগিয়ে দিল।

‘কিছু খেয়েছিস?’

‘পুলিশের লোক আজকাল মানুষের পেটের খোঁজও নেয় দেখছি!’ হাসল নিশিন্দা।

‘শোন্ ঋষির মেয়ে, আমি তো তোর বাপের বয়েসী। সবাই জানে তুই না খেয়ে আছিস। উপোস দিয়ে মানুষের দিন কাটে না। আমার কথা কানে নিলে আখেরে তোর মঙ্গলই হবে।’

বাপের বয়েসী কথাটা নিশিন্দার কানে বাজল। সে তার বিছানায় বালিশ দিয়ে ঢাকা পিস্তলের ওপরই বসে পড়ল। টেরবেটের হলে যাতে অস্ত্রটা চকিতে তুলে আনতে পারে।

‘বলুন কি বলতে চান?’

‘আমি তোকে এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে বলছি।’ সোজাসুজি প্রস্তাব দিলেন দারোগা।

নিশিন্দা কোন জবাব না দিয়ে দারোগার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।

‘তুই অত শত্রুর সাথে একা কি করে লড়বি? পারবি না। আবদুল্লাহর মতো তোকেও ওরা মেরে ফেলবে। তার চেয়ে পালিয়ে যা।’

‘কোথায় পালাব?’

‘যে দিকে দু’চোখ যায়।’

‘আবদুল্লাহর খুনের বিচার?’

‘পাবি না। আবদুল্লাহ খুন হয়েছে তার নিজেরই দলবলের হাতে। ইটভাটার ম্যানেজার, শহরের জোতদার আর আবদুল্লাহর পার্টির লোকেরা এ কাজ করেছে। মালিকরা পার্টিকে মোটা টাকা দিয়ে তোর স্বামীকে খুন করিয়েছে। কিন্তু কোন সাক্ষী নেই। তুই বিচার পাবি না। কে সাক্ষী দেবে? উল্টো বরং তোকেই ওরা জড়িয়ে দেবে। এবার আমার জন্য পারেনি।’

বেশ আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলছে দারোগা। প্যাকেট থেকেই একটা সিগ্রেট ধরিয়ে প্যাকেটটা নিশিন্দার দিকে এগিয়ে দিল।

নিশিও একটা সিগ্রেট ধরিয়ে ধুঁয়া ছাড়ল, আমার ওপর এত দয়া?’

‘কোন দয়ামায়া নয়। আমি তোর ওপর দয়া দেখতেও আসিনি। এসেছি বেঘোরে মারা পড়ার আগে প্রকৃত অবস্থাটা তোকে সমঝে দিতে। আজ যখন ভাটার ম্যানেজারের কাছে যাসনি তখুনি বুঝেছি তোর দিন ফুরিয়ে এসেছে। তাই সাবধান করতে এলাম।’

‘যাইনি কেন জানেন না? আপনি তো আমার বাপের বয়েসী বলে দোহাই দিয়ে মন নরম করে দিলেন। ম্যানেজারটা গেলেই তার বিছানায় শোয়ার প্রস্তাব দিত। আর আমিও ছাড়তাম না, গুলি করে মেরে ফেলতাম।’

‘জানি তোর কাছে হাতিয়ার আছে। তোর সাহসও আছে।’

‘হ্যাঁ মেরে ফেলতাম হারামজাদাকে। সে কারণে যাইনি, বলবেন ওকে।’

‘ঠিক আছে বলব। এর আগে আমার একটা কথা শোন।’

‘বলুন।’

‘এ বাড়িটা ছেড়ে দে। ভাটার ম্যানেজার এখানে ভাটা বসাবে।’

‘এটা আমার শ্বশুরের ভিটে। আবদুল্লাহর ভিটে।’

‘তোকে ভাটার মালিক উপযক্ত দাম দিচ্ছে। এক লাখ পাবি। টাকাটা চাস তো কাল রাতেই তোর কাছে পৌঁছে যাবে। ওরা চায় আবদুল্লাহর কোনো চিহ্ন খলায় না থাকুক।’

দারোগার কথায় নিশিন্দা জ্বলন্ত সিগ্রেটে একটা সুখটান দিল। ‘টাকাটা তাহলে এখানে বসেই পেয়ে যাব, কি বলেন বাপের বয়েসী মুরুব্বি?’

‘হ্যাঁ, ঘরে বসেই পাবি। ম্যানেজার নিজে এসে দলিলে তোর সই নিয়ে টাকা গুনে দিয়ে যাবে। কেউ জানবে না। ঐ টাকায় তুই শহরে গিয়ে থাকতে পারবি।’

খুব আগ্রহভরে কথা বলছেন রমিজ দারোগা। মুখটা আরো এগিয়ে নিশিন্দার কানের কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘এর চেয়ে ভালো তুই আর কি চাস? আবদুল্লাহর কথা ভুলে যা।’

‘ভুলে যাব?’

‘ভুলে যা।’

‘আবদুল্লাহর নামগন্ধও খলায় থাকবে না?’

‘না, থাকবে না।’

‘বেশ আমি রাজি।’

‘নিশিন্দা সিগ্রেটটা দরজা ডিঙিয়ে বারান্দায় ছুঁড়ে ফেলল।

দারোগার মনে হল একটা আনন্দময় বাজ পড়ল তার বুকের ভেতর।

‘আমি জানতাম তুই রাজি হবি। তুই খুব ভালো মেয়ে, আমি জানতাম নিশি।’

‘আপনি জানতেন আমি ভালো মেয়ে? তাহলে বলুন টাকাটা কখন পাবো? ম্যানেজার কখন পৌঁছে দেবে?’

নিশিন্দা যেন ব্যাকুলতা প্রকাশ করল।

‘কাল রাতে। রাত বারোটার পর। দত্তখোলা আর বাথানের মানুষ ঘুমিয়ে গেলে তুই টাকা পাবি। ম্যানেজার একা এসে দিয়ে যাবে, কেউ জানবে না। তুই ঘরে বসে থাকবি। আর সকালে কেউ জাগবার আগে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি। তোর যেখানে ইচ্ছে।’

‘আমার যেখানে ইচ্ছে চলে যাব যেখানে আবদুল্লাহর নামগন্ধও না থাকে? বেশ আমি রাজি।’

নিশিন্দার কথায় দারোগা উঠে দাঁড়ালো।





দারোগা রমিজকে বিদেয় করে নিশিন্দা জাল দিয়ে ধরা কুঁচো মাছ আর শাপলা ডাটার ঘ্যাঁট পেট ভরে খেয়ে দাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাত ন’টায় তার ঘুম ভাঙলো। চোখ কচলে সে আকাশের দিকে তাকিয়েই বুঝল আজ চাঁদটা ঘর মেঘের আড়ালে ঢাকা। বেশ ক’দিন খরা আর দারুণ গরমের পর এখন আকাশে সহসা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাস ছুটেছে হা হা করে। চারণভূমির দিশেহারা বায়ুর বেগ সোজাসুজি এসে ধাক্কা মারছে ঘরের দরজায়। ঝড়ের দাপট কেঁপে কেঁপে শব্দ তুলছে তার টিনের চালাঘরটা। দাওয়া থেকে মাদুর গুটিয়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে খিল এঁটে দিল নিশিন্দা। ঘরে বাতিটা জ্বেলেই সে হাতড়ে হাতড়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। আর সাথে সাথেই শুরু হল প্রবল বাতাসের সাথে প্রচণ্ড বৃষ্টির শব্দ।

নিশিন্দা হাত বাড়িয়ে রামদা’টা পরখ করল। দা’টা যেন মানুষের রক্তের জন্য হা হা করে কাঁদছে।

নিশির মনে হল অদৃশ্য হাতটা আবার তার বুকের ওপর নেমে এসে কি যেন হাতড়ে বেড়াচ্ছে। আর একটা অদ্ভুত নরম কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে নেমে এসে বলছে, ‘তোর বুক দু’টি এমন নরম? তোকে আজ আটকাবো না। সব দুধ দুইয়ে নিয়ে যা আরেকদিন তোর ও দুটোতে ছোঁয়ার আশায় আজ ছেড়ে দিচ্ছি...।’

বৃষ্টির আওয়াজ এখন যেন আরও দ্বিগুণ শব্দে চালার ওপর ঝরে পড়ছে। নিশিন্দা বিছানায় উঠে বসল। একবার দা’টা হাতে তুলে নিয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে দিয়ে বিছানা থেকে নামল। বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও দ্বিগুণ শক্তিতে উঠোনে ঝাঁপিয়ে নেমেছে। নিশিন্দা দুয়ার খুলে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বাইরে মাঠে এসে দাঁড়িয়েই বুঝল তার শরীরের ওপর ভিজে শাড়িটা লেপ্টে বসে গেছে। আর পানির স্রোত বইছে তার দু’টি উদ্যত বুকের ফাঁক দিয়ে। তবে নাভীর ওপর বৃষ্টির নাচানাচি নিশির ভালোই লাগলো। আধপেটা খাওয়া ক্ষুধার জ্বালার ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন সান্ত্বনার প্রলেপ বুলিয়ে চলেছে।

নিশিন্দা চারণভূমির দিকে তাকিয়েই বুঝল মিশমিশে অন্ধকারে ছেয়ে আছে সামনের দিগন্তবিস্তৃত চিরচেনা মাঠটা। এমনকি খলার বাথান বা গোয়ালগুলোর কোন চিহ্ন পর্যন্ত তার চির অভ্যস্ত নজরে আসছে না। তবুও নিশি পা বাড়াল সামনের দিকে। নিরস্ত্র, নিরূপায় এবং ক্ষুধার্ত এক নারী দেহ যেন সিক্ত শরীরকে অদৃষ্টের একটি নিক্ষিপ্ত অব্যর্থ তীর ভেবে নিয়ে অন্ধকারকে ভেদ করে সামনের দিকে ছুটতে লাগল।

আন্দাজে এগিয়ে গেলেও নিশিন্দা বুঝতে পারছে সে খোঁয়াড়গুলোর কাছে এসে পড়েছে এবং সম্ভবত তার সেই বাথানটা কয়েক হাত দূরত্বের মধ্যেই আছে। হাতড়ে এগোতে গিয়ে হঠাৎ সে পা পিছলে মাটিতে পড়ে যেতেই তার পা গিয়ে খোঁয়াড়ের বেড়ায় ধাক্কা খেল। নিশিন্দা বুঝল সে ভুল করেনি। এখন গেট খুঁজে বের করে দড়িটা খুলতে পারলেই হল। কে জানে গেটটা সেদিনের মত খুলতে পারবে কিনা? সেদিন তো হাতে রামদা আর আকাশে চাঁদ থাকায় তার কোন অসুবিধেই হয়নি। আজ কি ঘটে কে জানে?

নিশিন্দা হাতড়ে হাতড়ে শেষ পর্যন্ত গেটের মোটা খুঁটি পেয়েই বুঝল গেটটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা নয়। সম্ভবত এই কয়দিনে রাখালটা গেটের জন্য জাহাজের কাছির মত মোটা কাছি জোগাড় এখনও করে উঠতে পারেনি। কিংবা ইচ্ছে করেই গেটটা খোলা রাখা হয়েছে নরম বুকওয়ালা কোন দুধ চোরনীর আশায়।

নিশিন্দা গেটটা আলগা করে কতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে অনুভব করতে চেষ্টা করল সে ঠিক জায়গায় এসেছে কিনা। এদিকে বৃষ্টির বেগ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে তার দেহটাকে ধুয়েমুছে আজকের অভিসারের জন্য উপযুক্ত করে দিচ্ছে। সারা এলাকায় বিশেষ করে খলার খোঁয়াড়গুলোতে কোন বাতির চিহ্নও নেই। কেউ কিছু জ্বালতে চাইলেও যে বাতাসে থাকার কথা নয় তা নিশিন্দা জানে।

নিশিন্দা ভেতরে ঢুকে সোজা মাচানের নিচে চলে এল। সামনেই সেদিনের সেই গাইটা বোধ হয় জাবর কাটছে। নিশিন্দা পানি চিবানোর মত শব্দ শুনতে পেয়ে গাইটার গায়ে হাত দিয়ে আদর করতে হাত বাড়াতেই গাইটা ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। তারপরই অযাচিতভাবে শিং ঘুরিয়ে অন্ধকারে গুঁতো মারল নিশিন্দার বাম বাহুতে। আর তক্ষুনি মাচানের ওপর থেকে কে যেন লাফিয়ে নেমে প্রশ্ন করল, ‘কে ওখানে?’

নিশিন্দা বুঝল যে রাখালটা আগন্তুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য হাতের কাছে কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে।

‘আমি এসেছি।’

নিশিন্দার শরীর বৃষ্টি ও বাতাসের ঝাপটা পেরিয়ে আসায় এখন রীতিমত কাঁপছে। কথা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে গেল। রাখালটা, বোঝা যাচ্ছে এ কথায় মাচানের নিচে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল।

‘এমন দুর্যোগের রাতে কেউ চুরি করে দুইতে আসে? তুই আসলে কে? মানুষ না জিন?’

মনে হল রাখালটা ভয় পেয়ে উপর্যুপরি প্রশ্ন করে নিশ্চিত হতে চাইল।

‘তুমি সেদিন ছেড়ে দিয়েছিলে বলে এলাম। আমি মানুষ বলেই এলাম। আজ দুধ নিতে আসিনি।’

সাথে সাথেই একটা উষ্ণ হাত যেন সাপের মত এগিয়ে এসে নিশিন্দার কাঁধ স্পর্শ করল। তারপর বুক।

নিশিন্দা নড়ল না। বাধাও দিল না।

‘ভিজে একদম নেয়ে এসেছিস। তোর দা’টা কোথায়?’

‘আনিনি।’

‘বাতি জ্বালাবো?’

‘না।’

জবাব শুনেই বাহু দুটো দিয়ে কে যেন নিশিন্দাকে এক বিশাল বুকের ওপর চেপে ধরল। নিশিন্দা বাধা দিল না। হাত দু’টি তার সারাদেহের ওপর সাপের মত হাতড়ে বেড়িয়ে নাভীর কাছে শাড়ির গিটের ওপর এসে থেমে গেল; ‘কি ব্যাপার তোর নাভী বসে গেছে? ক’দিন ধরে উপোস দিচ্ছিস?’

লোকটা ডানহাতের বাঁধন আলগা করে নিশিন্দাকে ঠেলে দিল।

‘ওসব সোয়াল করে কি লাভ? একরাতে তোমার গোয়াল থেকে দুধ দুইয়ে নিয়েছিলাম। আজ দাম দিতে এসেছি। তোমার যেভাবে খুশি উসুল করে নাও।’

নিশিন্দার কথা কেঁপে যাচ্ছে। কারণ তার দেহ দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টির দাপট সহ্য করে এখন মাঘের শীতের ভিখিরির মত কাঁপছে।

‘কার মেয়ে তুই? কোথাকার মেয়ে?’

‘এ গাঁয়েরই মেয়ে। এর বেশি জানতে চেয়ো না।’

‘ভাতার নেই?’

‘বললাম তো জবাব পাবে না।’

‘তাহলে তোর মুখখানি একটু দেখা, আমি বাতি জ্বালি।’

‘মুখ দেখে কি হবে? তোমার পছন্দের যে জিনিস এতক্ষণ ছুঁয়ে দেখলে সবি নাও। আমিতো দিতেই এসেছি। তবে মুখ দেখতে বা পরিচয় জানতে চেয়ো না। সেটা আমি দেব না।’

নিশিন্দার কথায় অন্ধকারে চায়ামূর্তিটা কি করবে যেন ঠিক বুঝতে না পেরে নিশিন্দার মুখের ওপর হাত বাড়িয়ে অন্ধের মতো হাতড়াতে লাগল। কে জানে হাতে ছুঁয়ে যদি বোঝা যায় মাগীটা তার পরিচিত কেউ কিনা?

‘বললাম তো আমি তোমার চেনাজানা কেউ নই। আর কোনদিন আসবোও না এখানে। কে জানে এটাই এ দুনিয়ায় আমার শেষ রাত কিনা! তোমার দুধের দাম শোধ করে নাও। আমার বুক দু’টিতে হাত দিয়ে দেখো সে রাতের মতোই আছে।’

নিশিন্দার কথা ঠাণ্ডায় কেঁপে যাচ্ছে।

রাখালটা নিশির মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে দু’টি নারী-পুরুষ এ এক অবলা গাভী। জাবরের শব্দ আবার শোনা যাচ্ছে। সম্ভবত এতক্ষণে গাইটার জানা হয়ে গেছে আসলে তার পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছে এরা প্রকৃতপক্ষে মানুষই বটে। ভয় পাবার মত অন্যকিছু নয়।

‘না, আমার কিছু চাই না। তুই চলে যা বাথান থেকে। আমি উপোসী একটা দেহের ওপর বলৎকার করে আমার পাপ আর বাড়াতে চাই না। যা বেরিয়ে যা।’

লোকটার কথায় নিশিন্দা তেমন অবাক হল না। সে জানে জানোয়ারের পাল চড়ালেও সে মুখহীন একটা হৃদয়বান পুরুষের কাছেই এসেছে।

‘চলে যাব?’

‘হ্যাঁ ভাগ!’

‘আমি কিন্তু এসেছিলাম!’

‘এলে কি হবে? এখন আমার কিছু চাইবার নেই। তুই ভাবিস খলার রাখালরা সব জানোয়ার?’

‘তাহলে আসি। সেদিনের খারাপ ব্যবহারের জন্য মাফ চেয়ে যাচ্ছি।’

‘দাঁড়া।’

নিশিন্দা অন্ধকারেই ফিরে দাঁড়াল।

‘আমার পাতিলে সেরখানেক জ্বাল দেয়া সর পড়া দুধ আছে, নিয়ে যা।’

নিশিন্দা অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে থাকল। না করল না।

লোকটা কোথায় যেন কিছুক্ষণের জন্য ডুব দিল।

একটু পরেই মাটির পাতিলের পেট এসে লাগল নিশিন্দার বুকে। ‘আয় তোকে গেট পার করে মাঠে পৌঁছে দিয়ে আসি।’

নিশিন্দা পাতিলটা ধরল। মনে হল গভীর ভালোবাসার দান যেন তার হাতে। যেন কোন অমৃতের ভাণ্ড তুলে দিয়েছে কোন অদৃশ্য ফেরেস্তা যার অস্তিত্ব হতে বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।

‘না এগিয়ে দিতে হবে না। আমি যেতে পারব।’

‘খিদে পেলে আবার আসিস।’

‘আর কোনদিন অমন করে ক্ষিদে পাবে না বোধহয়।’

নিশিন্দা আর পেছনে তাকালো না। বাইরে পা দিয়েই দেখল প্রবল বৃষ্টির পর এখন আকাশে চাঁদ উঠেছে। আর পৃথিবী ভিজে কাদা হয়ে আছে তার ভেজা শাড়ির মতোই।





পরের দিন নিশিন্দা সারাদিন পড়ে ঘুমালো। আজ তার মধ্যে কোনো খিদে তৃষ্ণার জ্বালা ছিল না। বেলা তিনটের দিকে জেগে সে কুয়োর পাড়ে গিয়ে গোছল করল। ভিজে শাড়ি পাল্টে ঘরে তুলে রাখা একটা লাল টাঙ্গাইলের শাড়ি পরল। সাথে টকটকে লাল রঙের ব্লাউজ। এগুলো নিশিন্দার তুলে রাখা বিয়ের দিনের পোশাক। ট্রাঙ্ক খুলে নিশিন্দা একটা মাদুলি ছড়া বের করে গলায় পরল চোখে কাজল পরে আয়নার সামনে গিয়ে চিরুনি দিয়ে টান করে আঁচড়িয়ে সিঁথি ঠিক করে খোঁপা বাঁধল। বাকি দিনটা অর্থাৎ সন্ধ্যার আঁধার নামার পূর্ব পর্যন্ত নিশিন্দা সাজগোজ করে দুয়ার খোলা রেখে বিছানায় এসে কাত হল।

ঘরে এখন একটা কোরোসিনের বাতি জ্বলছে। চৌকির ওপর এখন যে কেউ নিশিন্দাকে দেখলেই ভাববে সে কোন পুরুষের অপেক্ষায় বসে আছে। যেন আবদুল্লাহ আসবে বলে আগের মত নিশিন্দা অপেক্ষায় আছে। আজ তার দেহমনে কোন খিদের নখ আঁচড়ানো নেই। চেহারায় একটা নিরুত্তেজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছায়া ঝলকে উঠতে চাইছে। সে একবার রাম দা’টা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। দায়ের ধারালো কিনার ছুঁয়ে তার মুখে একটা রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে গেল। তারপর হাত বালিশের নিচে ঢুকিয়ে গুলিভরা পিস্তলটা পরখ করে সে নিশ্চিন্তে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে থাকল।

রাত বারোটা নাগাদ নিশিন্দা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে লাগল। আবদুল্লাহ এসে যেন নিশিকে ঘুমের মধ্যে পেয়ে দুষ্টুমি করে তার ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু খেয়েই তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছে। আচমকা ঘুমের মধ্যে মানুষের ছোঁয়া পেয়ে নিশি লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসতে গেল। কিন্তু পারল না। কে যেন তাকে সজোরে বিছানার সাথে চেপে ধরার জন্য দু’বাহু দিয়ে শক্ত করে এঁটে কাবু করার চেষ্টা করছে। নিশি প্রাণপণে লোকটাকে ঠেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি? ছাড়ুন আমাকে। ছেড়ে দিন। নইলে চেঁচিয়ে গাঁয়ের লোক জড়ো করব।’

একটা ফ্যাসফেসে হাসির সাথে লোকটা নিশিন্দাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘আমি এসেছি নিশি। টাকা আর কাগজ নিয়ে এসেছি।’

‘ও ম্যানেজার সাব? তাই বলুন! আমি ভাবলাম কে না কে ঘরে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আসুন চৌকির ওপর বসে লেনদেনটা আগে হয়ে যাক। ঠিক আছে আমি বাড়ি ছেড়ে দেব। আগে টাকার বান্ডিলটা খুলুন। তারপর যা চান তাও দেব।’

‘আরে আমিতো সেকথাই বলতে এসে দেখি তুই পরীর মত ডানা মেলে শুয়ে আছিস। আমি তোর দু’টি উঁচু অই জিনিস দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি।’

‘তাই বুঝি এভাবে ঘুমের ভেতর কাউকে চেপে ধরতে হয়? আগে লেনদেন শেষ হোক। এ দুটো নিজের হাতে খুলে দেব।’

নিশিন্দা বুকের ওপর হাত রেখে ইঙ্গিতে লোকটার লোকে উসকে দিল।

‘শোন চামারসুন্দরী, আমার কথা শুনে চললে তোকে বাড়ি বিক্রি করেও থাকা খাওয়ার কষ্ট পেতে হবে না। আমি ইটখোলার কাছে তোকে ঘর বানিয়ে দেব। ইলেকট্রিক পাখা আর আলোর ব্যবস্থা করে দেব। আমিই তোর খাইখরচের ব্যবস্থা করব। আবদুল্লাহ বদমাশটার হাতে পড়ে তোর খুব ভোগান্তি হয়েছে। এখন থেকে রানীর হালে থাকবি।’

‘আগে বাড়ির দাম দিন।’

নিশিন্দার এসব কথায় কোন ভাবান্তর হলো না।

লোকটার চেহারার দিকে তার চোখ। তার বয়েস পঞ্চাশ বা ষাটের মতো হবে। তবে দশাসই শরীর। উত্তেজনায় মানুষটা যেন কাঁপছে। নিশির পরিষ্কার কথায় সে প্যান্টের পেছনের পকেটে হাত দিল।

এই নে তিরিশ হাজার। রেজিস্ট্রির সময় বাকিটা বুঝিয়ে দেব। এখন বায়নাপত্র সই করে দে।’

একটা কাগজ বুক পকেট থেকে বের করে নিশিন্দার সামনে তুলে ধরতেই নিশি চিলের মত ছোঁ মেরে কাগজটা ও টাকার প্যাকেটটা নিজের হাতে নিয়ে নিল।

‘সব বুঝে পেয়ে পরে এটা সই করে দেব। এখন টাকা আর কাগজ আমার কাছে থাক। আর বাঁচতে চাইলে এক্ষুনি এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।’

লোকটা নিশির আচরণে হঠাৎ যেন চমকে গেল, ‘জানিস এর পরিণাম কি?’

‘জানি। এ টাকায় আবদুল্লার খুনীদের আমি খুঁজে বের করব। আর কাগজ পাঠাবো জজ সাহেবের কাছে। আমি নিজে গিয়ে বলব বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য ইটখোলার মালিকেরা আমার স্বামীকে খুন করেছে।’

অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে বিছানার এক পাশে ছিটকে সরে যেতে চাইল নিশি।

লোকটা আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে নিশির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে বিছানায় কাত করে ফেলতেই নিশিন্দার হাত চলে গেল রাম দা’টার ওপর। সে দা’টা টেনে এনেই মুখ ও মাথা বরাবর একটা কোপ বসিয়ে দিল। লোকটা হাত দিয়ে তা ঠেকাতে গেলে হাতের পাতার একটা দিক আঙুলসহ আলাদা হয়ে গেল। লোকটা ‘মাগো’ বলে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে চারণভূমির দিকে দৌড়াতে লাগল।

নিশিন্দা ধীরে সুস্থে খাট থেকে নেমে দেখল ঘরটা মানুষের রক্তে ভেসে গেছে। সে একটা ন্যাকড়া নিয়ে মানুষের তিনটি কাটা আঙুল আলতো করে তুলে ছাইয়ের গাদার কাছে এসে এর মধ্যে সেঁধিয়ে দিল। তারপর বালতির পানিতে দা’টা ধুয়ে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দিল। আর নিজের মনেই গুন গুন করে বলল, দেখি আবদুল্লার ভিটে থেকে কে আমাকে তাড়ায়? আমি যতদিন বেঁচে আছি এ ঘরেই থাকব।

এমন ঘুম নিশিন্দা আর কোনদিন ঘুমোয়নি। বিছানায়, বালিশে, মেঝেয় চাপ চাপ রক্তের আঁঠা আর একটা উঠকো গন্ধের মধ্যে নিশিন্দা খোঁপা খুলে চুল ছড়িয়ে শুয়ে পড়েছিল। তার মনে হয়েছিল সে সামনের চারণভূমির মতো বিশাল একটা মাঠ এক্ষুনি পার হয়ে এসেছে। শোয়ার আগে কেবল একবার রামদা’টা একটু পরখ করে নিয়েছিল। দায়ের ধারটা তার মনে হয়েছিল এক ধরনের সান্ত্বনার মত। দা’টা স্পর্শ করলেই তার আব্দুল্লার গরম ঠোঁট দুটোর কথা মনে হয়। তারপর লুটিয়ে পড়েছিল। ঘুমের আগে মুহূর্তমাত্র সে খতিয়ে দেখলো আগামীকাল সকালের সূর্য উঠলেই কি কি ঘটবে। থানার দারোগা এসে বাড়িটা ঘেরাও করে তাকে চুল ধরে টেনে থানায় নিয়ে যাবে। কিন্তু নিশিন্দা মনে মনে ভাবল কেন ওরা ওকে থানায় নিয়ে যাবে? তার বিরুদ্ধে নালিশটা কি? সে মৃত আবদুল্লার বৌ। তার স্বামী এই দত্তখোলাবাসীর মঙ্গলের জন্য আজ পর্যন্ত যা করেছে তা এলাকাবাসীর মর্মে গেঁথে আছে। আবদুল্লার কারণেই দত্তখোলার লোকেরা জমিজমা খুইয়েও দুটো পেটের ভাত যোগাড় করতে পারছে। আবদুল্লাহ না থাকলে দত্তখোলার চামার, মাঝি ও কামারের দল বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হতো। আবদুল্লাহ মালিকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বলেই এরা এখনও নদী পেরিয়ে যায়নি। নইলে শহরের পথে পথে এরা ভিক্ষে করতো। ওদের বৌঝিরা গতর বিকিয়ে খেত। আবদুল্লাহই ওদের বাঁচিয়ে ছিল। মালিকরা কেবল আবদুল্লাহর জন্যই গাঁটা উচ্ছেদ করতে পারেনি। আর গাঁয়ের মানুষগুলোও এখন রুখে দাঁড়াতে শিখেছে। সেদিন দারোগার মুখের কথা কেটে কথা বলতে ভয় পায়নি চামারের ছেলেরা। আজ একটু আগে ইটভাটার ম্যানেজারের লোভী আঙুল ক’টি রামদা দিয়ে আলগা করে ফেলেও সে নিশি বাড়ি ছেড়ে পালায়নি, এতে সে নিজেই অবাক। ভেতরে গুমরে উঠছে একটা মাত্র যুক্তি, আমি আবদুল্লাহর বৌ, আমার ইজ্জত বাঁচাতে আমি যা করেছি সেটাই এক অসহায় নারীর বাঁচার পথ। কি করবে আইন? আইন যদি ম্যানেজার, দারোগা আর জোতদারদের পক্ষে থেকে তার গায়ে হাত দিতে চায় তাহলে মানুষের চোখ আঁকা ঐ রামদা’টা দেশের কামারেরা কেন বানিয়েছে? আইন তার ইজ্জতের ওপর হামলা করতে চাইলে নিশিন্দা সবকিছুর ওপর দায়ের কোপ মারবে। এখন দা’টাই আবদুল্লাহ। কাল সকালের ভয়ে সে আজকের ঘুমটা মাটি করবে?

না তা করবে না নিশিন্দা। আসুক সকালে দারোগা। সেও ডেকে আনবে দত্তখোলার অসংখ্য চামার আর মাঝিদের। সবাই জানে ঋষিরা সবই সহ্য করতে জানে কিন্তু নিজেদের জাতের মেয়েদের গায়ে শহরের ভদ্রলোকদের হাত বাড়ানো সহ্য করে না।

আর নিশিন্দা আব্দুল্লাহর বৌ হলে কি হবে সেও চামারদের মেয়ে। নিশির বাপ ছিল দত্তখোলার সর্দার। কি করবে ম্যানেজার আর রমিজ দারোগা? গায়ে হাত দিলে দায়ের কোপ। এর চেয়ে বেশি কোন আইন বোঝে না নিশিন্দা চামারণী। আসুক দারোগা।

একবার ভাবলো সে এখনই রামদা হাতে দত্তখোলার ঘরে ঘরে গিয়ে পুরুষদের জাগিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমি নিশিন্দা নারী, খলার ম্যানেজার আমার ইজ্জতের ওপর হামলা করেছিল বলে আমি তার পাপী আঙুলগুলো কেটে ছাইয়ের গাদায় পুঁতে রেখেছি। তোমরা সাক্ষী থেকো। রমিজ দারোগা ফোর্স নিয়ে এলে তোমরাও হাজার হাজার চামার নর-নারী তোমাদের যার ঘরে যা আছে দা, কুড়াল, ঝাঁটা, লাঠি নিয়ে আমার পক্ষে থেকো। ওরা আবদুল্লার নাম নদীর এপার থেকে মুছে দিতে চায়, আমি এ নাম মুছতে দেব না।’

ভাবতে ভাবতেই নিশির দু’চোখে আবার সেই হারিয়ে যাওয়া উদ্ভট স্বপ্নটা ফিরে এল যেন। সেই রক্তমাখা শিংঅলা গরুর পাল। কিন্তু এখন আর স্বপ্নের মধ্যে গাভীগুলোকে প্রথম সারিতে দেখা গেল না। বরং মনে হল এক পাল ষাঁড় যেন তার দিকে মুখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওলানের বদলে প্রতিটি গরুর নাভীর পেছনে ঝুলছে বিশাল বিশাল আতাফলের মতো হলুদ অণ্ডকোষ। কোনটার পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে লাল টকটকে পুরুষাঙ্গ। কোনটার অগ্রভাগ চুঁইয়ে নামছে ফোঁটা ফোঁটা মুত।

নিশিন্দা সামনে এগিয়ে গেল।

‘এই ষাঁড়ের দল তোদের কে এখানে আসতে বলেছে?’

সামনের বিরাট গজওয়ালা ষাঁড়টা সহসা যেন মুখ নামিয়ে দিয়ে জিব দিয়ে নিজের তলদেশ ও নাভী চাটল আর মুখটা ফিরিয়ে আনতেই মুখটা হয়ে গেল মানুষের মুখ। কেমন যেন আবদুল্লাহর মতো লাগছে। গরুটা বিকট শব্দে হাম্বা রব তুলে সেদিনের গাভীটার মতো কথা বলে উঠল, ‘আমাদের আবদুল্লাহ পাঠিয়ে দিয়েছে।’

‘এ্যাই হারামজাদা, মিছে কথা বললে ছেনি দিয়ে আমি তোর জিব কেটে ফেলব। জানিস না যে আবদুল্লাহ খুন হয়েছে?’

নিশিন্দা পালটাকে ধমকে উঠল।

কিন্তু গরুগুলো একটুও নড়ল না। বরং ঘাড় নাড়িয়ে, লেজ দুলিয়ে মাছি তাড়াবার মতো ভঙ্গি করল মাত্র।

‘আমাকে ফাঁকি দিয়ে কি লাভ? আমি তোদের কি ক্ষতি করেছি? আর আমি কি আমার বাড়িতে বাথান খুলেছি যে তোরা যখন তখন এসে উঠোনে গোবর আর মুত ঝরাবি? নিজের জ্বালায়ই নিজে বাঁচি না। আবদুল্লাহকে মেরে ওরা এখন আমার ইজ্জতের ওপর হামলা করতে চায়।’

‘আবদুল্লাহ মরেনি।’

ষাঁড়টা বিপুল শব্দে হাম্বা রব তুলে কথা বলছে।

‘আবদুল্লাহ মরেনি তো খুন হল কে?’

নিশিন্দার গলা কেঁপে গেল। আশা এবং হতাশায় তার বুক দুটোকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়ে হৃৎপিণ্ড দুলে দুলে ধড়ফড় করতে লাগল। নিশিন্দা যেন এক্ষুনি ষাঁড়টার বাঁকা শিং দুটোকে দু’হাতে চেপে ধরবে।

‘আবদুল্লাহ খুন হয়েছে। তবে মরেনি। আবদুল্লাহ চিরকাল আমাদের মধ্যে থাকবে। শহীদরা যে মরে না তা আমাদের মতো গরুও জানে। আর তুই আবদুল্লাহর বৌ কিছুই জানিস না?’

ষাঁড়টার কথার মধ্যে এক ধরনের টিটকারীর চটচটে ভাব আছে।

‘জানব না কেন? জানি বলেই তো এবাড়ি ছেড়ে যাইনি। যাবো না কোনদিন। আজ রাতে নোংরা বুড়োটা গায়ে হাত দিতে এসেছিল। বাড়ি কিনতে এসেছিল। আমি আঙুল কেটে রেখে দিয়েছি। আমি আবদুল্লাহর বৌ...।’

ঘুমটা ছুটে গেলে নিশিন্দা শুনতে পেল বাড়ির বাইরে হট্টগোল চলছে। সে লাফ দিয়ে উঠে রাম দা’টা হাতে নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল।

উঠোনে তখন দত্তখোলার চামার পাড়ার ঋষি নরনারী, ছেলেবুড়ো, বৌ-বাচ্চার একটি বিরাট জমায়েত। সকলেই হাতে দা-খোন্তা আর পাট কাটার ছেনি, হাতে দাঁড়িয়ে আছে। নিশিন্দাকে দেখেই একটি চামার ছেলে এগিয়ে এসে বলল, ‘পুলিশ তোকে ধরতে এলে আমরা সবাই থানায় যাব। মিছিল করে যাব। তুই ম্যানেজারটার হাত কেটে দিয়েছিস বেশ করেছিস। তুই আব্দুল্লাহর মতো আমাদের জন্য দাঁড়িয়েছিস। আমরা তোর পক্ষে।’

‘আমাকে খেতে দেবে কে? আমি যে ক্ষুধার্ত।’

‘আমরা দেব। দত্তখোলা দেবে।’

‘আমরা দেব। আমাদের গাঁ দেবে।’

‘আমাকে আব্রু দেবে কে? আমার ছতর যে উদোম! আমার ইজ্জত?’

‘আমরা বাঁচাব। তুই রাম দা নিয়ে জেগে থাক। আবদুল্লাহর মতো।’

সমস্বরে জবাব দিয়ে উঠল দত্তখোলার নারী-পুরুষরা।

নিশিন্দা দলটির দিকে তাকাল। যেন স্বপ্নে দেখা পালটা সূর্যের আলোয় সত্য হয়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে একটু একটু করে উঠোনের মধ্যে এসে দাঁড়াল। গ্রামবাসীর ভিড়ের মধ্যে দা’টা উঁচু করে জোরে জোরে বলতে লাগল, ‘আমি জানি আজ আমাকে রমিজ দারোগা ধরতে আসবে না। যারা ইজ্জতের ওপর হামলা চালায় তারা এখন নিজের আঙুল কাটার বেইজ্জতী লুকোতে চাইবে। কোন মামলা হবে না। এ বাড়িতে পুলিশও আসবে না। যদি আজকের মতো তোরা আমার পাশে থাকিস। আমি আবদুল্লার ভিটের ওপর এই খড়গটা হাতে নিয়ে জেগে থাকব।’

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট