ছবির দেশে কবিতার দেশে (পর্ব ০১) - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছবির দেশে কবিতার দেশে - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছবির দেশে কবিতার দেশে

ভ্র ম ণ কা হি নী

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়




''আমি খুলে ফেলি পোশাক ও টুপি সেই মুহূর্তে

বালির ওপর উলঙ্গ দেহে চিৎ হয়ে শুই

বন্য রৌদ্রে শরীর পুড়িয়ে প্রতীক্ষা করি, বেরুবে কখন

আমাদের এই চামড়ার নীচে লুকিয়ে যে আছে, সেই ভারতীয়।''

—জাঁ ককতো

আমি দেশের বাইরে গিয়ে জীবনে প্রথম যে-বিদেশের মাটিতে পা রাখি, সেটা ফরাসিদেশ। সে অনেককাল আগেকার কথা।

আমার তখন অল্প বয়েস, বেশ গড়া-পেটা শরীর স্বাস্থ্য, ঝুঁকিবহুল জীবন কাটাতে ভালোবাসি। হঠাৎ হঠাৎ বন্ধুদের সঙ্গে বনে-পাহাড়ে চলে যাই, কিংবা সিমলা-হায়দ্রাবাদের মতন বড় শহর দর্শন করতে গিয়ে পয়সার অভাবে এক-আধদিন না খেয়ে কাটিয়ে দিই। কিংবা মধ্যরাত্রে কলকাতা শহরে অকারণে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে মারামারি বাঁধিয়ে পুলিশের গুঁতো খাই, গারদে চোর-পকেটমারদের সঙ্গে রাত কাটাই। তবু কিছুই গায়ে লাগে না, সবই যেন মজা। স্বেচ্ছাচারী জীবনযাপনের মধ্যে জীবনকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখার চেষ্টা।

কিন্তু আমার বিদেশ যাওয়ার, বিশেষত সাহেবদের দেশে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। সে বড় দামি, দুর্লভ ব্যাপার।

যদিও অল্প বয়স থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল বিশ্ব ভ্রমণের। বলা যেতে পারে, কাটা মুণ্ডের দিবাস্বপ্ন। কিংবা অন্ধের অভ্র-পুষ্প চয়ন। আমি পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু ও অতি গরিব পরিবারের সন্তান, কলেজ জীবনের শুরু থেকেই একাধিক টিউশনি ও নানারকম খুচখাচ পার্ট টাইম কাজ করে পড়াশুনো চালিয়েছি, তাই পড়াশুনোয় খুব মন দিতে পারিনি। তেমন একটা মেধাবী ছাত্রও ছিলাম না। তা ছাড়া সেই সময় থেকেই মাথায় কবিতা লেখার পোকা ঢোকে, লিটল ম্যাগাজিন বার করা ও কলেজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে আড্ডা মারাটাই পরমার্থের মতন মনে হত। খুব ভালো ছাত্র ছাড়া অন্য কারুর সে সময়ে বিদেশে যাওয়া দুঃসাধ্য ছিল। ধনী ব্যক্তিরা যে নিজ ব্যয়ে বিদেশ ভ্রমণে যেতেন আগে, তাও পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে ফরেন এক্সচেঞ্জ কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য ভারত সরকার বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

মনসা মথুরা ব্রজ। বিভিন্ন লেখকের ভ্রমণ কাহিনি পড়ে এবং গ্লোব ও ম্যাপ সামনে রেখে আমি পৃথিবী পরিক্রমা করেছি বহু অলস দুপুরে। ম্যাপ দেখা ছিল আমার প্রিয় নেশা। স্নানের সময় বাথরুমের নিভৃতিতে কখনও আমি স্পেনের জলদস্যু, কখনও আলাস্কার অভিযাত্রী। কাল্পনিক তলোয়ার এতবার চালিয়েছি যে আমার ধারণা হয়েছিল আমি ডগলাস ফেয়ার ব্যাঙ্কসের সঙ্গে লড়ে যেতে পারব।

যাই হোক, দারিদ্র্য, বাউণ্ডুলেপনা ও কবিতা নিয়ে হইহই করে দিন-টিন বেশ ভালোই কাটছিল, এমন সময় অকস্মাৎ আমার জীবনে একটা পরিবর্তন এসে গেল।


মার্কাস স্কোয়ারে বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলন ছিল তখন কলকাতার একটি বিশিষ্ট উৎসব। বাংলার সবরকমের পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও মার্গসঙ্গীতের এমন মিলিত অনুষ্ঠান এখন আর হয় না। বড় চমৎকার ছিল ব্যাপারটা। আমি এবং আমার বন্ধুরা অল্প বয়েস থেকেই গান পাগল। বড় বড় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠানের বেশি দামের টিকিট কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে আমরা ফুটপাতে খবরের কাগজ পেতে রাতের পর রাত সেই গান শুনতে গিয়ে কাটাতাম। এই বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের প্রাঙ্গণও ছিল তরুণ কবিদের একটি আড্ডাস্থল। কয়েকবার আমরা এখানে কবিতার স্টল দিয়েছি, লোকজনদের জোর করে ধরে এনে কবিতার বই গছিয়েছি, 'যে কবিতা পড়ে না, তার বেঁচে থাকা উচিত না', এই ধরনের চিৎকারে গলা ফাটিয়েছি। একবার এক টুকটুকে ফরসা বৃদ্ধা মহিলাকে ডেকে এনে বলেছিলাম দিদিমা, আমাদের কবিতা কিনুন। তিনি বললেন, দু-চার লাইন পড়ে শোনাও তো! আমাদের কেউ একজন খুব ভাব দিয়ে পড়তে লাগল, কয়েক লাইন শোনার পর সেই বৃদ্ধা ফিক করে মিষ্টি হেসে বললেন, এখন আর আমি এসব বুঝতে পারব না, দাঁত নেই!

এক সন্ধেবেলা সেই বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের মাঠে আমরা জটলা করে বসে আছি। কেউ ঘাস ছিঁড়ে দিচ্ছি দাঁতে, কেউ একটা সিগারেট ধরাতেই অন্য একজন চেয়ে নিচ্ছে। খুব কাছ থেকেই ভেসে আসছে গান। আমরা এক কান দিয়ে গান শুনছি, অন্য কান আড্ডায়। এমন সময় রঙ্গস্থলে একজন সাহেবের প্রবেশ।

কলকাতায় তখনও সাহেব-মেম তেমন কিছু দুর্লভ ছিল না। আমার পরাধীন আমলে জন্ম, রাস্তায়-ঘাটে সাহেব-মেম দেখেছি প্রচুর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও বেশ কিছু ইংরেজ থেকে গিয়েছিল। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছিল চোখে পড়বার মতন। পঞ্চাশের দশকের শেষ পর্যন্ত চৌরঙ্গি-পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলকে বলা হত সাহেবপাড়া। তখনও এক শ্রেণির বাঙালি বা মাড়োয়ারির ছেলেরা এরকম সাহেব হয়নি, যুবকরা প্যান্ট পরা শুরু করলেও ধুতি বর্জন করেনি একবারে। বিদেশ থেকেও অনেক সাহেব-মেম আসত কলকাতায়। বেশ সুন্দর, ঝকঝকে, প্রাণ-চাঞ্চল্যময় এই শহরটিকে সেই সময়ে কেউ 'আবর্জনা নগরী' কিংবা 'মৃত নগরী' আখ্যা দেওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। ভারতের প্রথম ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু একবার কলকাতাকে শুধু 'মিছিল নগরী' বলায় বাঙালিদের কাছ থেকে বেশ ভর্ৎসনা পেয়েছিলেন।

অনেক বিদেশিরা আসতেন কলকাতায়, তাঁদের মধ্যে কিছু কিছু কবি-লেখক-শিল্পীরও দেখা পাওয়া যেত। ষাটের দশকের শেষার্ধে উগ্রপন্থা সারা পৃথিবীকেই কাঁপিয়ে দেয়। তারপর থেকে একটু নামকরা ব্যক্তিরা কেউ আর পৃথিবীর কোনও দেশে সহজ সাবলীলভাবে ঘোরাফেরা করতে পারেন না। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী পালমে-হত্যা মানব-ইতিহাসের একটি অতি কলঙ্কজনক ঘটনা। আমি যখনকার কথা বলছি, ষাটের দশকের শুরু, তখনও বহু রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রদূত, রাজনৈতিক নেতারা শরীর-প্রহরী বিনাই থিয়েটার-সিনেমা দেখতে যেতেন, সন্ধেবেলা রাস্তায় ইচ্ছেমতন একলা বেড়াতে বেরুতেন। পাবলো নেরুদা কিংবা স্টিফেন স্পেন্ডার কলকাতায় ঘুরে গেছেন যথেচ্ছভাবে। আঁদ্রে মালরো যখন ফরাসিদেশের মন্ত্রী, তখনও তিনি দিল্লিতে এসে একা ঘুরে বেড়িয়েছেন। সুতরাং হঠাৎ কোনও বিখ্যাত ব্যক্তিকে দেখলে আমরা চমকে উঠতাম না। বিদেশি পর্যটকদের কাছে তখনও কলকাতা ছিল একটা অবশ্যদ্রষ্টব্য স্থান।

বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের মাঠে সেদিন আমাদেরই কোনও প্রৌঢ়-পরিচিত যে সাহেবটিকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন, তাঁর নাম পল এঙ্গেল, বেশ দীর্ঘকায়, সুঠাম চেহারা, বয়েসে প্রায় ষাটের কাছাকাছি, তিনি একজন অধ্যাপক ও কবি। সেখানে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় ভাস্কর দত্ত, শংকর চট্টোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু, তারাপদ রায়, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখ যাঁদের বলা হত কৃত্তিবাসের দল, তাঁদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। পল এঙ্গেল যোগ দিলেন আমাদের সঙ্গে। তিনি কথা বলেন জোরে জোরে, হাসেন গলা ফাটিয়ে, বেশ একটা সারল্য ফুটে ওঠে তাঁর ব্যবহারে। তিনি আসছেন অর্ধেক পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে, ভারতে এসেও দিল্লি-বোম্বাইতে বহু কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে, কলকাতাতেও প্রবীণ-প্রখ্যাত লেখকদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাঁর, আমাদের সঙ্গেও বেশ আড্ডা জমে গেল।

এর পরের তিন-চারদিন তিনি ঘোরাঘুরি করলেন আমাদের সঙ্গে, কলকাতার কিছু কিছু জায়গা তাঁকে দেখালাম আমরা। নিমতলা শ্মশানঘাটটি ছিল আমাদের একটি প্রিয় জায়গা, রবীন্দ্রনাথকে যেখানে পোড়ানো হয়েছিল, সেই ঘেরা স্থানটিতে দাঁড়িয়ে রাত্রির গঙ্গার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, আঃ কী সুন্দর। তিনি তাঁর কবিতা পড়ে শোনালেন আমাদের, আমরাও আমাদের দুর্বল ইংরিজি অনুবাদে কবিতা পাঠ করলাম, সেই সঙ্গে পানাহার ও হাসিঠাট্টা, শক্তি-শরৎকুমার ও ভাস্কর দত্ত যেখানে উপস্থিত থাকে, সেখানে 'নেভার এ ডাল মোমেন্ট' যাকে বলে।

এরপর পল এঙ্গেল পাড়ি দিলেন ফিলিপিনস হয়ে জাপানের দিকে। আমরাও মন দিলুম যে-যার ভাবনায়। আমি কয়েকদিনের জন্য চলে গেলাম চাইবাসা-হেসাডি'র দিকে। ফিরে এসে দেখি বড় বড় স্ট্যাম্প লাগানো একটি বিদেশি খাম আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। পল এঙ্গেল চিঠি লিখেছেন জাপান থেকে। তিনি জানতে চেয়েছেন, আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রোগ্রামে আমি যোগ দিতে রাজি আছি কি না। আমার প্লেন ভাড়া ও থাকা-খাওয়ার খরচ ওঁরাই দেবেন।

আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমে আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরিজি সাহিত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এই পল এঙ্গেল। তিনি অক্সফোর্ডে পি.এইচ.ডি করেছেন এবং রোডস স্কলার, কিন্তু অধ্যাপনার চেয়েও কবিতার প্রতিই তাঁর বেশি ঝোঁক। তিনি কবিদের বিশ্বভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী, তাঁর ধারণা পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তেই যে যে কবিতা লেখে, তারা সবাই সবাইকার আত্মীয়। মাঝে মাঝে তিনি আত্মীয়-সম্মিলন ঘটাতে চান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরিজি সাহিত্য বিভাগের সঙ্গে তিনি এই ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম খুলেছেন, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে, এমনকী সেই চরম কোলড ওয়ারের যুগে সোভিয়েত ইউনিয়ান, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি থেকেও, কবিদের আমন্ত্রণ করে আনেন। সেখানে পারস্পরিক মেলামেশা, কবিতা পাঠ, আলোচনা, অনুবাদ এই সব হয়। খরচ চালাবার জন্য তিনি আমেরিকার বড়লোক চাষা ও কিছু কিছু কোম্পানির মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা তোলেন, আমেরিকার সরকারের সঙ্গে এ উদ্যোগের কোনও সংস্পর্শ নেই। পৃথিবীতে কোথাও যে কবিদের জন্য এরকম একটি কেন্দ্র আছে, সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। পল এঙ্গেল খাটতে পারেন দৈত্যের মতন, তিনি একার চেষ্টায় যে এরকম একটি কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন, তা অনেকটা অবিশ্বাস্য লাগে, কিন্তু পৃথিবীতে এরকম কিছু কিছু খ্যাপাটে লোক আছে বলেই তো পৃথিবীটা এত বর্ণময়। পরবর্তী কালে অবশ্য এই কেন্দ্রটি অনেক বড় হয়েছে, প্রায় একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, আফ্রিকার কালো দেশ, সোসালিস্ট দেশ, আরব দেশ, আমাদের মতন গরিব দেশ এবং ধনতান্ত্রিক দেশের শত শত কবি ও লেখক ওই আয়ওয়ার মতন ছোট্ট শহরে থেকে এসেছেন পল এঙ্গেলের আমন্ত্রণে। আমার পরে ওখানে গিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ, জ্যোতির্ময় দত্ত, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, কবিতা সিংহ প্রমুখ, ভারতের অন্যান্য ভাষা থেকেও অনন্তমূর্তি, দিলীপ চিত্রের মতন বর্তমানের খ্যাতিমানেরা।

আমার কাছে সেই চিঠি একটা বিরাট লটারি প্রাপ্তির মতন হলেও প্রথমে বেশ কয়েক ঘণ্টা আমার খুবই বিমূঢ় অবস্থায় কেটেছিল। প্রস্তাবটি এমনই অপ্রত্যাশিত যে প্রায় অলীকের পর্যায়ে পড়ে। এত কবি-লেখক থাকতে আমার মতন নগণ্য একজনকে ডাকা হল কেন? আমি অবশ্য নিজেকে নগণ্য মনে করতাম না, তখন সদর্পে কৃত্তিবাস নামে কবিতার পত্রিকা সম্পাদনা করছি, বাংলা কবিতা নিয়ে খুব একটা ভাঙচুর করার স্পর্ধা পোষণ করি মনে মনে, তবু সাংসারিক দারিদ্র্যের জন্য বাইরে একটা হীনমন্যতা বোধ কিছুতে কাটিয়ে উঠতে পারি না। কিছুদিন আগে আমার বাবার মৃত্যু হয়েছে অপরিণত বয়েসে, ভাই-বোনেরা ছোট ছোট, পারিবারিক দায়িত্ব অনেকটা আমার কাঁধে। আমার সাংঘাতিক ভ্রমণের নেশা, তবু চোদ্দো হাজার মাইল দূর থেকে হুট করে ডাক এলেই তো যাওয়া যায় না। দু-চারদিনের ব্যাপার নয়, যেতে হবে বছরখানেকের জন্য।

দোনামনা করে কাটল বেশ কয়েকটা দিন। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কয়েকজনকে জানাতে তারা অবশ্য উৎসাহ দিতে লাগল খুব। আমাদের কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর মধ্যে তখন একমাত্র শরৎকুমারেরই বিদেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ছিল, পড়াশুনো করার জন্য তিনি এর মধ্যেই ক'বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে এসেছেন, তিনি ভরসা দিতে লাগলেন অনবরত। এমনও জানা গেল, আকেরিকায় ওঁরা আমাকে যা হাত খরচ দেবেন, তার থেকে কিছু কিছু বাঁচিয়ে দেশে নিজের পরিবারের জন্য পাঠানো যেতে পারে। ওখানকার এক টাকা, দেশে পাঁচ টাকা। দু-তিন মাস অন্তর দেশে একশো ডলার পাঠালেই পাঁচশো টাকা, ষাটের দশকের গোড়ায় পাঁচশো টাকা মানে যথেষ্ট টাকা, ইস্কুল মাস্টারদের মাইনে দেড়শো টাকার বেশি হত না, পোনা মাছের কিলো ছিল সাড়ে তিন টাকা।

তখনও হিপি-আন্দোলন শুরু হয়নি, হিপি শব্দটাই ছিল অজ্ঞাত। হিপিরা এসে সারা বিশ্বে একটা পোশাক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়ে গেছে। পুরোনো আমলের লোকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, হিপিরা আসবার আগে লন্ডনের রাস্তায় টাই না পরা পুরুষ দেখাই যেত না। প্যান্টের মধ্যে শার্ট না গুঁজে কেউ বাইরে বেরুলে অন্য লোকরা ভুরু কুঁচকে বলত, বাথরুমের পোশাক পরে রাস্তায় এসেছ কেন? বহু হোটেল রেস্তোরাঁয় পোশাকের ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা ছিল। দিনের বেলা নেমন্তন্নে একরকম সাজ, রাত্তিরের নেমন্তন্নে আর একরকম। মোজার সঙ্গে টাইয়ের রঙের সামঞ্জস্য থাকা চাই। হিপিরা এইসব নিয়ম কানুন ভেঙে দেয়। নীল রঙের জিনস যা ছিল কুলি-মজুরদের পরিধেয়, তা জাতে ওঠে। এখন জিনস আর গেঞ্জি পরে পৃথিবীর সর্বত্র ঘোরা যায়। কিন্তু তখনও সেই স্বর্ণযুগ আসেনি। কবি অ্যালেন গিনসবার্গ কলকাতার রাস্তায় পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ঘুরতেন, কিন্তু দেশে ফেরার সময় তাঁকে ওই পোশাকে প্লেনে উঠতে দেওয়া হয়নি, তাঁকেও প্যান্ট-কোট-টাই কিনতে হয়েছিল।

সুতরাং আমারও একটা ওইরকম পোশাক চাই। আমি তখন ওয়াছেল মোল্লার দোকান থেকে কেনা রেডিমেড প্যান্ট পরি, চৌরঙ্গির ফুটপাত থেকে শার্ট কিনি আর পায়ে বাটা কোম্পানির সাত টাকা নিরানব্বই পয়সা দামের চটি। একরঙা প্যান্ট-কোট, যাকে স্যুট বলে, তা আমাদের বংশে কেউ কখনও গায়ে দেয়নি। ওরকম এক প্রস্ত তো কিনতে হবেই। সাহেবদের দেশে যে হেতু বরফ পড়ে, তাই আমাদের ধারণা ছিল, ওসব দেশে সারাবছরই খুব শীত। তখন অগাস্ট মাস, তবু বানানো হল একটা আধো উলের স্যুট, তার খরচ পড়ল পাঁচশো টাকা, শরৎকুমার এবং ভাস্কর দত্ত দুজনে ভাগাভাগি করে সেই টাকাটা দিয়েছিলেন।

এরপর পাসপোর্ট। ওঃ, সে কথা ভাবলে গায়ে এখনও জ্বালা ধরে। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে যে-কোনও নাগরিকেরই পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু তখন পাসপোর্টের জন্য কী হয়রানিই না ছিল। দিনের পর দিন পাসপোর্ট অফিসে ঘোরাঘুরি করি, ধমক খেয়ে ফিরে আসি। এদিকে পয়লা সেপ্টেম্বরের মধ্যে পৌঁছোতে না পারলে আমন্ত্রণটাই নষ্ট হয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল তারকা নই, নামকরা কোনও পরিবারের সন্তান নই, নিতান্তই এক হেঁজিপেজি এবং নিছক বাংলা কবিতা লিখি, তবু আমাকে বিদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয় প্লেন ভাড়া দিয়ে নিয়ে যাবে, এক বছর থাকতে-খেতে দেবে, এটা যেন পাসপোর্ট অফিসারের কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না। প্রত্যেকবার হাজাররকম জেরা এবং প্রত্যাখ্যান। রাগের চোটে এক এক সময় মনে হত ঘুষি মেরে লোকটার দাঁত ভেঙে দিই! রাইটার্স বিল্ডিংসে গিয়ে হোম সেক্রেটারি চিফ সেক্রেটারিকে ধরাধরি করেছি, কোনও কাজ হয়নি, এমনকী দিলীপ দত্ত নামে এক বন্ধুর আত্মীয়তা সূত্রে গিয়েছিলাম মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও। এখন যেমন পশ্চিমবাংলার প্রতি কেন্দ্রের অবিচারের কথা খুব শোনা যায়, কংগ্রেস আমলেও এই সুরই ছিল। 'রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণ', এই বাক্যবন্ধটি খবরের কাগজে আমি তো নিজের চোখেই দেখেছি, মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন আমার পাসপোর্টের জন্য টেলিফোন করলেন, তবু কেন্দ্রীয় সরকারের এক অফিসার তা অগ্রাহ্য করলেন। সেই অফিসারটি আমায় বলেছিলেন, আমি কি প্রফুল্ল সেনের কাছ থেকে মাইনে পাই? এরপর একটা ম্যাজিকের মতন ব্যাপার হল। তারাপদ রায়ের মেসোমশাই দেবী রায় এক জাঁদরেল পুলিশ অফিসার, তখন লালবাজারের ডি সি ডি ডি। তারাপদ রায় আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর মেসোর কাছে, মেসো মুচকি হেসে বললেন, হয়ে যাবে। তখন আর মাত্র একটা দিন বাকি।

কলকাতা বিমানবন্দরটি সেই সময়ে এমন রুগণ হয়ে যায়নি, বহু বিদেশি বিমান এখানে ওঠা-নামা করত। আমার টিকিট ছিল প্যান অ্যামের, রাত দুটোয় যাত্রা। আগের দিন পর্যন্ত ধারণা হয়েছিল যাওয়াই হবে না, শেষ মুহূর্তে পাসপোর্ট সংগ্রহ, ভিসা, রিজার্ভ ব্যাংক ক্লিয়ারেন্স ইত্যাদির জন্য ছোটাছুটি করতে গিয়ে ক্লান্তিতে আমি কুকুরের মতন জিভ বার করে হাঁপাচ্ছিলাম। তবু সব ক্লান্তি মুছে গিয়েছিল বন্ধু-বান্ধবদের ভালোবাসায়। আমাদের দমদমের বাড়িতে প্রচুর বন্ধু এসেছিল আমাকে বিদায় জানাবার জন্য, বেহালা থেকে এসেছিলেন অরবিন্দ গুহ, সে রাতে আর তিনি বাড়ি ফিরতেই পারেননি। অবশ্য সব বন্ধুই যে খুশি হয়েছিল তা নয়, দু-একজন খুবই ত্রুদ্ধ ও ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার মুখ দেখা বন্ধ করেছিলেন। যেন আমাকে নির্বাচন করা আমারই অপরাধ। এ জন্য আমার মনে অবশ্য খানিকটা লজ্জার ভাবও ছিল।

অগাস্ট মাসের গরমে, গরম স্যুট পরে, শু-মোজা পায়ে, গলায় মেরুন টাই বেঁধে, নব কার্তিকের মতন চেহারায় ঘামতে ঘামতে উঠলাম বিমানে। আকাশে ওড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম।

বিমানটি প্রথম থেমেছিল করাচিতে। অস্পষ্ট ঊষালোকে করাচি বিমানবন্দরের বাংলা অক্ষরে নাম লেখা দেখে রোমাঞ্চ হয়েছিল। এখন নিশ্চয়ই সেই বাংলা নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় বিরতি রোমে, তখন আমি ঘুমন্ত। তারপর প্যারিসে পৌঁছে আমাদের বিমান থেকে নামিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল ট্রানজিট লাউঞ্জে। সারারাত ঘুমিয়ে সব অবসাদ দূর হয়ে গেছে, ঠোঁট থেকে মুছে গেছে আগের দিনের হয়রানির বিরক্তি, শরীর বেশ টাটকা, ঝরঝরে। একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে হঠাৎ আমার রোমাঞ্চ হল। গতকাল সকালেও ভেবেছিলাম পাসপোর্ট পাব না, এখন আমি সত্যি বিদেশে এসে গেছি। প্যারিস, এই সেই প্যারিস?

আমাদের চোখে তখন ফ্রান্স ছিল স্বর্গের সমতুল্য। অগণন শিল্পী-সাহিত্যিক-কবিদের লীলাভূমি। কে যেন বলেছিলেন, প্রত্যেক শিল্পীরই দুটি মাতৃভূমি, একটি, যেখানে সে জন্মেছে, অন্যটি হল ফ্রান্স! এখানেই ছিলেন দেগা, মোনে, মানে, গগ্যাঁ, মাতিস, রুয়ো-র মতন মহান শিল্পীরা, এখনও এখানে ছবি আঁকছেন পিকাসো। র্যাঁবো-ভের্লেন-বোদলেয়ার-মালার্মে-ভালেরি-আঁরি মিসোর মতন কবিদের এই দেশে আমি সত্যি সত্যি দাঁড়িয়ে আছি?

সেই সময় আমি আমেরিকার সাহিত্য বিশেষ কিছু পড়িনি। তখনও টিভি আসেনি, মিডিয়ার এমন ব্যাপক প্রসার ছিল না, আমেরিকা ছিল ভূপৃষ্ঠের অন্যদিকের বহুদূরের দেশ। ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আমেরিকার যতটা পরিচিতি ছিল, সেই তুলনায় ওখানকার সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্বন্ধে বিশেষ জানা ছিল না, হলিউডের ফিলম ছাড়া। তখন আমরা অনেকেই ফরাসি সংস্কৃতি ও কাব্যে বিভোর। এলেইন মার্কস সম্পাদিত 'ফ্রেঞ্চ পোয়েট্রি ফ্রম বোদলেয়ার টু দা প্রেজেন্ট' নামে বইখানি ছিল আমার প্রতিদিনের সঙ্গী, সে যাত্রাতেও সুটকেসে নিয়েছি।

শার্ল দ্যগলের নামে এয়ারপোর্ট তখনও তৈরি হয়নি, দ্যগল সে সময়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। ওর্লি বিমানবন্দরের কাচের দেওয়ালে নাক ঠেকিয়ে আমি প্যারিস নামক অমরাবতীকে দেখার চেষ্টা করছি, আর মনে মনে আবৃত্তি করছি ভাঙা ভাঙা কবিতার লাইন। জাঁ ককতোর একটি কবিতাই বেশি মনে পড়েছিল, কারণ সেই কবিতায় একজন ভারতীয়'র উল্লেখ আছে :

'...বন্য রৌদ্রে শরীর পুড়িয়ে প্রতীক্ষা করি, বেরুবে কখন

আমাদের এই চামড়ার নীচে লুকিয়ে যে আছে, সেই ভারতীয়...'

আমিই সেই ভারতীয়। আমার গায়ের চামড়া জলপাই রঙের, আমি এসেছি জাঁ ককতো'র শহরে।

এক সময় বলা হত, প্যারিস শহরের প্রধান দুটি দ্রষ্টব্য হল, ইফেল টাওয়ার আর জাঁ ককতো। তিনিই এখানকার এক নম্বর নাগরিক। একাধারে তিনি কবি ও ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। নিজে ফিলম ও নাটক পরিচালনা করেছেন, নিজে তাতে অভিনয়ও করেছেন। সাহিত্য শিল্পের যে-কোনও শাখায় তিনি স্মরণীয়। বিদগ্ধ নাগরিকতার উজ্জ্বল প্রতিভূ। প্যারিসের অদূরে তাঁর জন্ম, এখানেই তাঁর মৃত্যু। কী অসাধারণ সেই মৃত্যুদৃশ্য। বিশ্ববিখ্যাত গায়িকা এদিথ পিয়াফ ছিলেন ককতোর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। দুজনের জীবনে কী প্রচণ্ড অমিল, আবার কী দারুণ মিল। ককতো ধনী পরিবারের সন্তান, আর এদিথ পিয়াফ ছিলেন পথের ভিখারিনী। চোর-গুণ্ডা-খুনে ও বেশ্যাদের মধ্যে প্রতিপালিত এই গায়িকাটি নিজের প্রতিভার জোরে উঠে এসেছিলেন সমাজের শীর্ষে। এক সময় ককতো আর পিয়াফ দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, দুজনেই মৃত্যু শয্যাশায়ী, ককতো প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোক পাঠাচ্ছেন পিয়াফ কেমন আছে জেনে আসতে। তারপর এক সময় প্রায় একই সঙ্গে শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন দুজনে। অমরলোক যদি কিছু থাকে, তবে সেখানে ওই দুজনের নিশ্চয়ই আবার দেখা হয়েছে।

আমি কবিতা নিয়ে মগ্ন হয়ে আছি, কত সময় কেটে গেছে জানি না, হঠাৎ মাইক্রোফোনে কীরকম যেন একটা উদ্ভট শব্দ শুনতে পেলাম। গ্যাঁগো প্যাডিই-ই-ই...ছুনিল গ্যাঁগো প্যাডি-ই...। আরে এটা আমার নাম নাকি! আমি ছুটে কাউন্টারে যেতেই একজন উত্তেজিতভাবে ফরাসিতে কী যেন বলতে লাগল, আমি যত বলি যে জ্য ন পার্ল পা ফ্রাঁসে, আমি ফরাসি ভাষা জানি না, তবু সে থামে না। শেষ পর্যন্ত একজন ইংরেজি জানা লোক এসে বলল, তুমি এতক্ষণ কী করছিলে? ওই দ্যাখো, তোমার প্লেন ছেড়ে যাচ্ছে।

আমি সেদিকে দৌড় লাগাতে যেতেই সে আমার হাত ধরে বলল, সিঁড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়ে গেছে দেখছ না? তোমার আর ওই প্লেনে যাওয়া হবে না!

আমি আঁতকে উঠলাম। বলে কী? ওই বিমানে আমার সুটকেস রয়েছে। আমার পকেটে মাত্র আট ডলার। আমি এখানে কারুকে চিনি না, এখন কোথায় যাব?

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট