টোনি মরিসনের সাহিত্যকৃতি ও জীবন | মার্গারেট ফক্স | নিউ ইয়র্ক টাইমস | অনুবাদ আশফাক স্বপন

টোনি মরিসনের সাহিত্যকৃতি ও জীবন – নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে

মার্গারেট ফক্স । নিউ ইয়র্ক টাইমস, ৬ আগস্ট, ২০১৯

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল:

Toni Morrison, Towering Novelist of the Black Experience, Dies at 88

By Margalit Fox

New York Times | Aug. 6, 2019

[প্রায় ২ সপ্তাহ হতে চললো মার্কিন সাহিত্যজগতের সম্রাজ্ঞী টোনি মরিসনের মৃত্যু ঘটেছে। রিটন বললো টোনি মরিসনকে নিয়ে নানা লেখার মধ্যে এইটিই ওর পছন্দ। আমারও। মুশকিল হলো বেশ দীর্ঘ রচনা। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে অনুবাদ করতে দেরি হয়ে গেল। সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি পাঠকদের মধ্যে যারা ইংরেজি অত ভালো জানেন না, তারা নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই দীর্ঘ রচনা থেকে টোনি মরিসন সম্বন্ধে ভালো ধারণা লাভ করবেন। ভালো মন্দ যেমনই লাগুক, জানাবেন সবাই- অনুবাদক।]

টোনি মরিসন গত সোমবার নিউ ইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস-এ মৃত্যুবরণ করেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী এই লেখিকা তার জনপ্রিয়, বহুবিক্রিত সাহিত্যকর্মে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গসমাজের স্বরূপ অন্বেষণ – বিশেষত নিপীড়িত কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অভিজ্ঞতা - এই বিষয়টির মর্মোদ্ধারে নিয়োজিত ছিলেন। এই কাজটি তিনি এমন উজ্জ্বল, মন্ত্রোচ্চারণের গাম্ভীর্যসমৃদ্ধ গদ্যে সম্পন্ন করেছেন, যার সঙ্গে তুলনীয় কোন লেখক ইংরেজি সাহিত্যে নেই। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮।

তার প্রকাশক তার মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করে। তিনি মন্টেফিয়োর মেডিকেল সেন্টারে দেহত্যাগ করেন। প্রকাশকের মুখপাত্র জানান মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা। টোনি মরিসন নিউ ইয়র্কের গ্র্যাণ্ড ভিউ-অন-হাডসন-এ থাকতেন। তিনি প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান নারী, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পুরস্কার তিনি পান ১৯৯৩ সালে। তার সাহিত্যকর্মে ১১টি উপন্যাস ছাড়াও শিশুতোষ বই ও প্রবন্ধ সঙ্কলন রয়েছে। এর মধ্যে বিপুলভাবে সম্বর্ধিত কিছু সৃষ্টি রয়েছে – যেমন ১৯৭৭ সালে আমেরিকার জাতীয় পুস্তক সমালোচক সংঘের পুরস্কার প্রাপ্ত উপন্যাস Song of Solomon (‘সলোমনের গীত’) এবং ১৯৮৮ সালে পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস Beloved (‘প্রিয়তম’)।

টোনি মরিসন ছিলেন সেই অতি দুর্লভ আমেরিকান লেখক যার বই একাধারে সমালোচকের সমাদর ও বিপুল পাঠকানুকূল্য পেয়েছে। তার উপন্যাস নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় নিয়মিতভাবে ঠাঁই পেয়েছে, বহুবার মার্কিন টিভি আড্ডার মক্ষিরাণী ওপরা উইনফ্রের পুস্তক আলোচনায় আলোচিত হয়েছে। আবার তার বই অজস্র গবেষণমূলক রচনার বিষয়বস্তু হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন, বহু স্থানে অভিভাষণ প্রদান করেছেন, এবং ঘন ঘন টেলিভিশনের পর্দায় তাকে দেখা গিয়েছে।

তাকে নোবেল পুরস্কার দেবার সময় সুইডিশ একাডেমি তার ‘দূরদ্রষ্টার শক্তি ও কাব্যিক গুরুত্বে অভিষিক্ত উপন্যাস’-এর কথা উল্লেখ করেছে। একাডেমির অভিমত, এইসব উপন্যাস ‘আমেরিকান বাস্তবতার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রাণসঞ্চার করেছে।‘

এই বাস্তবতাকে টোনি মরিসন এমন এক গদ্যের সাহায্যে জীবন্ত করে তুলেছিলেন, যেই গদ্যে কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের বহুপ্রজন্মের মুখে মুখে গল্প বলার পরম্পরার ছন্দ সুস্পষ্ট। তার কাহিনীর প্লট স্বপ্নময়, সে কোন সরলরৈখিক কাহিনীসূত্রের ধার ধারে না। একবার সে সময়ে এগোয়, তো আবার পেছোয়- চরিত্রগুলোর প্রতিটি কর্মকাণ্ড যেন সমগ্র ইতিহাসের ভার বহন করে চলেছে।

তার গল্পের ধারায় মিশেছে নানান জনের কণ্ঠস্বর – পুরুষ, নারী, শিশু, এমনকি অশরীরী সত্তা। এই সব মিলে এক বহুবিচিত্র, বহুস্তরের মিলিত সূর সৃষ্টি হয়েছে। প্রাত্যহিক বাস্তব সত্যের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিলেমিশে গেছে উপকথা, জাদু ও কুসংস্কার। তার এই লেখনরীতির কারণে তাকে প্রায়ই গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা অনুসারী লেখকদের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

‘সুলা’ উপন্যাসে এক নারী অবলীলায় একটি ট্রেনের নীচে তার পা পিষ্ট হতে দেয় – উদ্দেশ্য পরিবারের জন্য ইন্সুরেন্সের অর্থলাভ। ‘সলোমনের গীত’ উপন্যাসের একটি বাচ্চা মেয়েকে তার বাবা পিলাটি নামে নামকরণ করে। বাবা ‘বাইবেলের পাতা ঘাঁটে, কিন্তু যেহেতু সে এক বর্ণও পড়তে পারেনা, তাই সবল ও সুন্দর মনে হয় এমন একগুচ্ছ অক্ষর বাছাই করলো।‘ ‘প্রিয়তম’ উপন্যাসে এক শিশুকে হত্যা করা হয় – পরে সেই শিশুর আত্মা এসে ভর করে হত্যাকারীর বাড়িতে।

টোনি মরিসনের সাহিত্যকর্মে প্রায়ই এই রকম উপকরণের সাথে যুক্ত হয়েছে দাসপ্রথা ও তার ভয়াবহ উত্তরাধিকার নিয়ে লেখিকার গভীর মর্মপীড়া ও উদ্বেগ। তার কথাসাহিত্যে অতীত বার বার বর্তমানের ভয়ঙ্কর সময়ে আত্মপ্রকাশ করে – মদে-আসক্তি, ধর্ষণ, নিকটাত্মীয়ের সাথে অবৈধ জৈবিক সম্পর্ক, হত্যা – এর সবটাই বিধৃত হয়েছে অসঙ্কোচ, নির্ভীক অনুপুঙ্খে।

‘প্রিয়তম’ উপন্যাসে টোনি মরিসন লিখেছেন (উপন্যাসটি ঊনবিংশ শতাব্দীর পটভূমিতে লেখা, কিন্তু এতে বিংশ শতাব্দীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে), এ এমন জগৎ যেখানে ‘যে কোন শ্বেতাঙ্গ এসে যে কোন খেয়ালবশত তোমার সমগ্র সত্তা, সবকিছু কেড়ে নিতে পারে ।’

‘শুধু যে তোমার শ্রম কেড়ে নেবে, তোমায় খুন করবে, পঙ্গু করবে, তাই নয়। তোমাকে নোংরা করে দেবে। এমনভাবে তোমার সত্তাকে কলুষিত করবে যে তোমার আর নিজেকে ভালো লাগবে না। তোমাকে এমনভাবে নষ্ট করে দেবে যে তুমি ভুলে যাবে তুমি কে ছিলে, আর সেটা আর এখন মনে করতে পারবে না।’

তবে একই সাথে টোনি মরিসনের লেখায় যেটা পরিষ্কার হয়ে যায়, সেটা হলো পরিবার, সমাজ ও গাত্রবর্ণের যে বন্ধন তাতেও অতীত গভীরভাবে উপস্থিত। বংশপরম্পরায় রচিত এই বন্ধনের ফলেই এদের কৃষ্টি, আত্মপরিচয় ও পারস্পরিক নৈকট্য বাবা-মা থেকে সন্তান, সন্তান থেকে তাদের সন্তানে সঞ্চারিত হয়। তার লেখায় এই বিশ্বাসটি জোরালোভাবে উপস্থিত যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের এই সংযোগই এদের মানবিক অভিজ্ঞতার একমাত্র ইতিবাচক দিক।

‘সে আমার মনের বন্ধু,’ ‘প্রিয়তম’ উপন্যাসে এক প্রাক্তন ক্রীতদাস তার প্রিয়তমা নারীর সম্বন্ধে বলে। ‘সে যেন আমাকে একত্র করে, বুঝলে ভাই। আমি যে নানান টুকরোয় খান খান হয়ে আছি, সে সেসব একত্র করে ঠিক ঠিক সাজিয়ে আবার আমায় ফিরিয়ে দেয়। যদি কখনো এমন নারীর সন্ধান পাও যে তোমার মনের বন্ধু, তার মতো ভালো কিছু আর হয় না।’

অভিশপ্ত প্রথম নায়িকা

কাহিনীবিন্যাসে টোনি মরিসনের নিজস্ব ধরনের প্রথম পরিচয় পাই তার প্রথম উপন্যাস ‘নীলতম নয়ন’ (‘The Bluest Eye’)-এ। তখন তিনি দিনে পুস্তক সম্পাদকের কাজ করেন, আর বাকি সময় একা দুটো ছোট ছেলের সংসার সামাল দেন। সেখান থেকে সময় চুরি করে তিনি প্রথম উপন্যাসটি লেখেন। উপন্যাসটি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়। কাহিনী ক্লডিয়া ম্যাকটীর নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের জবানীতে বিধৃত। সে ওহায়ো অঙ্গরাজ্যে তার বোন ফ্রিডাকে নিয়ে একটি কড়া কিন্তু মমতাময় বাড়িতে বড়ো হয়েছে।

উপন্যাসের অভিশপ্ত নায়িকা তাদের বান্ধবী পিকোলা ব্রীডলাভ। পিকোলার বয়স ১১। সে এমন একটা আমেরিকায় বড়ো হচ্ছে, যেখানে ক্ষুদে চলচ্চিত্র তারকা শার্লি টেম্পল (শ্বেতাঙ্গ ও নীল চোখের অধিকারী) নিয়ে জয়জয়াকার। সারা দেশে পাঠ্যবইয়ে ডিক আর জেন-এর ছবি – এরাও শ্বেতাঙ্গ ও নীল চোখের অধিকারী। এসব দেখে পিকোলার ধারণা হয়েছে সে কুশ্রী। সে অহোরাত্র প্রার্থনা করে এমন একটি জিনিসের জন্য যার ফলে সে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবে: এক জোড়া নীল চোখ।

বদ্ধ মাতাল অবস্থায় পিকোলার বাবার ভয়ঙ্কর দুর্মতি হলো, সে পিকোলার কাছে প্রমাণ করবে যে সে আকর্ষণীয়া, এবং এই উদ্দেশ্যে সে তাকে ধর্ষণ করলো। পিকোলা গর্ভবতী হলো। এবার সে সমাজ এবং তার ভগ্ন পরিবার উভয়ের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে গেলো। পিকোলো ক্রমশ পাগল হয়ে গেলো, তার মনে এই বিশ্বাস জন্ম নিলো এতোদিনে, অবশেষে, সে নীল চোখের অধিকারী হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় উপন্যাসটি সমালোচনা করতে গিয়ে জন লেনার্ড লেখিকার প্রশংসা করেন। তিনি লেখেন: ‘তার গদ্য এতো নিখুঁত, কথ্য ভাষার প্রতি এতো বিশ্বস্ত, এবং বিস্ময় ও বেদনায় এতটা ভরপুর যে উপন্যাসটি কাব্য হয়ে উঠেছে।’

এই উপন্যাসে টোনি মরিসনের ভবিষ্যত সাহিত্যকৃতির প্রকৃতি সম্বন্ধে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তার সাহিত্যভাবনায় যেসব বিষয় বড়ো স্থান অধিকার করেছে, এই উপন্যাসে তার লক্ষণ রয়েছে। যেমন, ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে যন্ত্রণাময় ইতিহাস পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন চরিত্রের সংসারে নিজ স্থান নির্ণয়ে– সফল বা বিয়োগান্তক – প্রচেষ্টা, ব্যক্তির বিপদে নিকট সমাজের তাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা; এবং এই সব সমাজ টিকিয়ে রাখায় নারীর ভূমিকা, ইত্যাদি।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সুলা’ তে টোনি মরিসন এইসব বিষয় নিয়ে আরো খোলাখুলিভাবে নাড়াচাড়া করেন। উপন্যাসটি একজন ঘরফেরত নারীকে নিয়ে। সে আমেরিকার রক্ষণশীল মিডওয়েস্ট-এর যে শহরে বড়ো হয়েছে, সেখানে ফিরে এসেছে। সে এখন এক ভ্রষ্টা নারী হিসেবে চিহ্নিত, তাকে বিরূপ সমাজের প্রচণ্ড বিরূপতা মোকাবেলা করতে হয়। এই সব বিষয় আবারো এসেছে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তৃতীয় উপন্যাস ‘সলোমনের গীত’-এ। এই উপন্যাস তার সাহিত্যিক সুনাম সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

এই বইয়ে টোনি মরিসন প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় চরিত্রে পুরুষ ব্যবহার করেন। মেকন ডেড III মিশিগান অঙ্গরাজ্যের এক তরুণ। তার মনোগত ও বাস্তব অভিযাত্রা ঘিরে এই উপন্যাস।

মেকন ‘দুধওয়ালা’ ডাকনামে পরিচিত। এই ডাক নামের একটি তিক্ত ইতিহাস রয়েছে। ‘শহরের সবচাইতে ধনাঢ্য কৃষ্ণাঙ্গ ডাক্তারের কন্যা’ মেকনের মা। তিনি স্নায়ুর বৈকল্যে বিকারগ্রস্ত, শিশুবয়স পার হয়ে যাবার বহুদিন পরেও সন্তানকে স্তন্যদান করেছেন, সেকথা সুবিদিত। সেই থেকে ছেলের ডাক নাম। (‘সুলা’-এর মতো ‘সলোমনের গীত’ উপন্যাসেও টোনি মরিসনের কথাসাহিত্যে কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত জীবনের চিত্র বিবর্ণ, ছিন্নবিচ্ছিন্ন একাকীত্বে ক্লিষ্ট।)

উপন্যাসে পেনসিলভ্যানিয়া অঙ্গরাজ্যে দুধওয়ালার যাত্রার বর্ণনা রয়েছে। যেই যাত্রা উদ্দেশ্য আপাতদৃষ্টিতে পরিবারের সোনাদানা উদ্ধারের জন্য হলেও সেই যাত্রার আসল উদ্দেশ্য নিজের আত্মপরিচয় উদ্ধার। ‘সলোমনের গীত’ এই মাসের বই সংঘের মূল বাছাই হিসেবে সম্মানিত হয়। ১৯৪০ সালে রিচার্ড রাইটের উপন্যাস ‘স্বদেশ সন্তান’ (Native Son)-এর পর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ লেখক এই সম্মান পেলেন।

‘প্রিয়তম’: তার কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি

১৯৮৭ সালে টোনি মরিসনের ‘প্রিয়তম’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। এটি তার কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি হিসেবে ব্যাপক স্বীকৃতিলাভ করেছে। তার উপন্যাসে এই প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত দেখা দিলো। বইটি ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি মর্মান্তিক সত্য ঘটনা ঘিরে। কাহিনী শুরু হয় আমেরিকার গৃহযুদ্ধের এক দশক পর।

যুদ্ধের আগে সেথ নামের এক ক্রীতদাসী কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের একটি বড় ক্রীতদাসশ্রমচালিত খামার থেকে পালায়। সে ওই খামারে কাজ করতো, সেখান থেকে ওহায়ো নদী পার হয়ে সিনসিনাটি শহরে আসে। সঙ্গে লুকিয়ে তার ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আসে, তার বয়স তখনো দু’বছর হয়নি।

লেখিকার কথায়: ‘সেথ মাত্র ২৮ দিন – একটি পূর্ণচন্দ্র পরিক্রমণের সময়কাল – মুক্তজীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। ছোট্ট মেয়েটির মুখ নিঃসৃত স্বচ্ছ লালা থেকে তার তৈলাক্ত রক্ত পর্যন্ত ২৮টি দিন। আত্মিক নিরাময়ের দিন, স্বাচ্ছন্দ ও অন্তরের কথা-বিনিময়ের দিন। সাহচর্যে পূর্ণ দিন – আরো চল্লিশ, পঞ্চাশজন নিগ্রোর নাম জানতে পারা, তাদের অভিমত, স্বভাব চেনা; কোথায় বা তারা ছিলো, কী বা করতো; নিজে আনন্দ ও দুঃখের সাথে সাথে তাদের আনন্দ ও দুঃখের ভাগীদার হওয়া, তাতে ভালোলাগাটা বাড়তো। একজন তাকে বর্ণপরিচয় শেখালো, আর একজন একটুখানি সেলাই শেখালো। আর সবার কাছে সে শিখলো প্রত্যূষে উঠে সারাদিন কী করবে সেটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার আনন্দ।’

কিন্তু এক ক্রীতদাস শিকারী তাকে ধাওয়া করে। কোণঠাসা হয়ে সে নিজ কন্যার গলা কেটে দেয় – যেন তাকে অপমান-হতমান হবার জীবনে ফিরে যেতে না হয়।

আঠারো বছর পার হয়ে যায়। শ্বেতাঙ্গ দাসপ্রথা বিরোধীরা তাকে ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে উদ্ধার করে, পরে তাদের সহায়তায় সে কারাগার থেকে মুক্তি পায়। কেন্টাকি থেকে যে মেয়েকে পেটে নিয়ে পালিয়েছিল, সেই মেয়ের নাম ডেনভার। তাকে নিয়ে সিনসিনাটিতে সে জীবন শুরু করে।

একদিন তার দরজায় এক মেয়ে উপস্থিত। ডেনভারের থেকে বয়স একটু বেশি হবে। স্বল্পবাক, একটু অদ্ভুত প্রকৃতির। শুধু প্রিয়তম হিসেবেই সে পরিচিত। সে তাদের বাড়িতে থাকতে শুরু করে এবং তাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত হয়ে যায়।

বইয়ের একেবারে শেষে, প্রায় প্রলাপের মতো সেথ তার উপলব্ধির কথা বলে ওঠে: ‘প্রিয়তম, ও আমার মেয়ে। দেখো, সে নিজের মর্জিতে আমার কাছে এসেছে, তাকে কোনরকমের কৈফিয়ত দিতে হয়নি। আগে কৈফিয়ত দেবার ফুরসত ছিলনা কারণ কাজটা অত্যন্ত তাড়াতাড়ি করা জরুরি ছিলো। খুবই তাড়াতাড়ি। ও যেন নিরাপদ স্থানে থাকে, সেটা আমার নিশ্চিত করা দরকার ছিলো। তাকে অমন স্থানেই আমি রেখে এসেছি।’

পুস্তক সমালোচকরা বইটির ভূয়সী প্রশংসা করে। ১৯৯৮ সালে জনাথান ডেমের পরিচালনায় ‘প্রিয়তম’ ছবিটি তৈরি হয়। এতে ওপরা উইনফ্রি অভিনয় করেন।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়কার পাঠকদের টোনি মরিসনের কথাসাহিত্যের যে দিকটা ভীষণভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটা হলো তার কাহিনীর জগতটাতে শ্বেতাঙ্গরা প্রায় অনুপস্থিত। সমসাময়িক কথাসাহিত্যে এমন নজির বিরল।

উপরন্তু তার বইয়ে যে পরিপার্শ্ব সেটা মিডওয়েস্ট অঞ্চলের মফস্বল। এতে ‘গতবাঁধা কৃষ্ণাঙ্গ পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে,’ যেমনটা টোনি মরিসন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। ‘এটা শহরের কালো অধ্যুষিত দরিদ্র এলাকা বা ক্রীতদাস অধ্যুষিত বড় খামার কোনটাই নয়।’ (সাক্ষাৎকারটি Conversations with Toni Morrison (‘টোনি মরিসনের সাথে কথোপকথন’) বইটিতে প্রকাশিত। ড্যানিয়েল টেইলর-গাথরি সম্পাদিত বইটি ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত।)

ডাকনামের উৎস

লেখিকা নিজেও এমন পরিবেশে বড়ো হয়েছেন। বাবা জর্জ ওয়োফোর্ড, মা এলা রামা (উইলিস) ওয়োফোর্ড। ওহায়োর ক্লিভল্যাণ্ড শহর থেকে ৩০ মাইল দূরে অবস্থিত লোরেইন শহরে ১৯৩১ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম। নাম রাখা হয় ক্লোই আরডেলিয়া ওয়োফোর্ড। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী মানুষ মিলেমিশে থাকতো এখানে।

জর্জ ওয়োফোর্ড জাহাজ তৈরির কারখানায় ওয়েল্ডারের কাজ করতেন। টোনি মরিসনের জীবনের নানান বিবরণ থেকে জানা যায় তার বাবার নিজের কাজের দক্ষতা নিয়ে এতটা গর্ব ছিলো যে যখন নিখুঁতভাবে কোন জোড় লাগাতেন, তখন তাতে তার নামের আদ্যাক্ষর লিখে দিতেন। সেই নাম লোকচক্ষুর অন্তরালে জাহাজের কাঠামোয় রয়ে যেতো।

ছোট্ট ক্লোই এমন একটা বাড়িতে বড়ো হয় যেটা নানান গল্প ও কুসংস্কারে পূর্ণ। ভূতের গল্প শুনতে তার খুব ভালো লাগতো; তার দাদী ঘটা করে বই দেখে স্বপ্নের অর্থ উদ্ধার করতেন, সেটা থেকে দিনের লটারির নম্বর কী হবে সেটা ঠিক করতেন।

বারো বছর বয়সে ক্লোই রোমান ক্যাথলিক চার্চে যোগ দেয়। ধর্মান্বিত নতুন নাম গ্রহণ করে – এ্যান্থনি। তার নাম এবার ক্লোই এ্যান্থনি ওয়োফোর্ড।

এই নাম থেকেই তার নতুন ডাকনামের উদ্ভব ঘটে কয়েক বছর পর। তখন সে ওয়াশিংটনের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। সে নিজেকে টোনি নামে ডাকা শুরু করলো, কারণ সহপাঠীদের ক্লোই নামটা কেমন যেন ধাঁধায় ফেলছিলো। ১৯৫৩ সালে হাওয়ার্ড থেকে টোনি মরিসন স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। মূল বিষয় ইংরেজি, সঙ্গে ধ্রুপদী সাহিত্য। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে.১৯৫৫ সালে তিনি ইংরেজিতে মাস্টার ডিগ্রী লাভ করেন। দু’বছর হিউস্টন শহরের কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষায়তন টেক্সাস সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, তারপর হাওয়ার্ডে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

হাওয়ার্ডে তিনি একটি কথাসাহিত্যের কর্মশালায় যোগ দেন এবং জোরেসোরে লেখায় মনোনিবেশ করেন। একবার কর্মশালার এক সভায় তার স্বরচিত লেখা আনার কথা। তিনি কাজ শুরু করেন এক কালো মেয়ের গল্প নিয়ে – যে ভীষণভাবে নীল চোখ চায়। এটি তার প্রথম উপন্যাসের মূলসূত্র।

১৯৫৮ সালে তিনি হ্যারোল্‌ড মরিসন নামে এক স্থপতিকে বিয়ে করেন। স্বামী জামাইকার লোক। ১৯৬৪ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে টোনি মরিসন কদাচিৎ বিয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, তবে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে স্বামী চেয়েছিলেন প্রথাগত ১৯৫০-এর সেকেলে গৃহিনী – তার পক্ষে ওই রকম ভূমিকা পালন সাধ্যাতীত ছিলো।

বিবাহ বিচ্ছেদের পর টোনি মরিসন দুই পুত্রসন্তান নিয়ে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিরাকুজে চলে যান। এখানে তিনি নামকরা প্রকাশনা সংস্থা র‍্যান্ডম হাউসের পাঠ্যপুস্তক বিভাগে সম্পাদনার চাকরি গ্রহণ করেন। শহরে নতুন আগন্তুক, একাকীত্বের গভীর পীড়ায় জর্জরিত হতে লাগলেন। কাজ ও সন্তানলালনের ফাঁকে ফাঁজে তিনি তার একটি ছোট গল্প ‘নীলতম নয়ন’ উপন্যাসে রূপদানের কাজ শুরু করেন।

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে টোনি মরিসন নিউ ইয়র্ক শহরে চলে আসেন। চাকরি নেন র‍্যান্ডম হাউসের একটি পুস্তক বিভাগের সম্পাদক হিসেবে। প্রায় দুই দশক এই পদে থাকাকালীন তার পরিচর্যাধীন লেখকদের মধ্যে ছিলেন এ্যাঞ্জেলা ডেভিস, গেয়ল জোন্স, টোনি কেইড বামবারা ও মোহাম্মদ আলি।

সাহিত্যিক জীবনীর অভিধান-এ উল্লেখিত এক সাক্ষাৎকারে টোনি মরিসন বলেছেন: ‘আমি কৃষ্ণাঙ্গ কথাসাহিত্য হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াই, কারণ কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যকৃতির একটি পরম্পরা সৃষ্টিতে আমি অংশগ্রহণ করতে চাই। কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীরা বিনোদনের জগতে একটা বিরাট ঝাপ্টা নিয়ে এলেন। সেখানে শ্বেতাঙ্গদেরজন্য কৃষ্ণাঙ্গরা লিখছেন, এবং তারা নিজেদের নিজেরা আঘাত করছে, তাতে শ্বেতাঙ্গরা প্রশ্রয় দিচ্ছিল। এবার আমাদের রচনাশৈলীর ওপর গুরুত্ব আরোপ করার পালা, এবার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ অন্য কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সাথে কথা বলবে।’

র‍্যাণ্ডম হাউসের তিনি একটি একটি প্রকল্পে কাজ করেন – তার নাম ‘The Black Book’ কালো বই’। বইটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। সংবাদ পত্রের প্রতিবেদনের অনুলিপি, স্থিরচিত্র, বিজ্ঞাপন, নানান কিছু দিয়ে সাজানো বর্ণাঢ্য, সচিত্র এই বইটিতে টোনি মরিসনের গ্রন্থনায় তিন শতাব্দীর আফ্রিকান আমেরিকান ইতিহাস বিধৃত হয়েছে।

বইটির জন্য গবেষণা করতে গিয়ে টোনি মরিসন মারগারেট সামে এক পলাতক ক্রীতদাসী নিয়ে রচিত ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি প্রবন্ধ আবিষ্কার করেন। সিনসিনাটি শহরের কাছে মারগারেটের যখন ধরা পড়ে যাবার উপক্রম হলো, সে তার শিশু কন্যাটিকে হত্যা করে। ‘কালো বই’ প্রকাশিত হবার এক দশকেরও বেশি পরে এই গল্প ‘প্রিয়তম’ উপন্যাসের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

একটি চিঠি ও একটি পুরষ্কার

‘প্রিয়তম’ সমালোচকদের বিপুল প্রশংসালাভ করে, তবে সবাইকে খুশি করতে পারেনি। ‘দ্য নিউ রিপাবলিক’ সাময়িকীতে এক কড়া সমালোচনায় আফ্রিকান আমেরিকান সমালোচক স্ট্যানলি ক্রাউচ উপন্যাসটিকে ‘কৃষ্ণাঙ্গ মোড়কে গণমেধযজ্ঞের উপন্যাস’ বলে অভিহিত করেন। ‘অতিশয়োক্তির ধোঁয়াসা, একগুচ্ছ ভুয়ো কণ্ঠস্বর, কষ্টকল্পিত নীতিকথা নিয়ে যে কল্পনার জগত তৈরি হয়েছে, সেখানে সুক্ষ্ম ভাবনার কোন প্রচেষ্টা দেখা যায় না। টিভিপর্দার মিনি সিরিজের কাহিনী বিন্যাসের কাঠামো ব্যবহার করে এক অতিনাটুকে গল্প দাড় করানো হয়েছে।’

তবে বেশির ভাগ অভিমত ছিল ইতিবাচক। জানুয়ারি ১৯৮৮ সালে উপন্যাস প্রকাশিত হবার কিছু পরে New York Times Book Review (নিউ ইয়র্ক টাইমস পুস্তক সমালোচনার সাপ্তাহিক পত্রিকা) দুই ডজন কৃষ্ণাঙ্গ লেখকের একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করে। চিঠি স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন মায়া এ্যাঞ্জেলু, আমিরি বারাকা, আর্নলড রামপার্সাদ ও এ্যালিস ওয়াকার। এরা টোনি মরিসনের প্রশংসা করেন, এবং ‘এখনো National Book Award (জাতীয় পুস্তক পুরষ্কার) বা পুলিৎজার পুরষ্কারের মত বড় সম্মান পাননি’ বলে প্রতিবাদ জানান।

‘প্রিয়তম’ সেই বছর এপ্রিল মাসে পুলিৎজার পুরষ্কার পায়। ২০০৬ সালে শতাধিক লেখক, সম্পাদক ও সমালোচকদের জরিপ চালাবার পর নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ ঘোষণা করে যে এই উপন্যাসটি গত ২৫ বছরে মার্কিন সাহিত্যের সেরা কথাসাহিত্য।

‘Tar Baby’ (‘কালিমালিপ্ত শিশু’) তার চতুর্থ উপন্যাস, প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের অভ্যন্তরে বর্ণ ও শ্রেণিগত ভেদবুদ্ধির প্রতি এই উপন্যাস আলোকপাত করে। কাহিনীর পটভূমি ক্যারিবীয় একটি দ্বীপে। এক শহুরে সংস্কৃতির অভিজাত, ইউরোপ-শিক্ষিত কৃষ্ণাঙ্গ নারীর সাথে স্থানীয় এক সাধারণ খেটে খাওয়া লোকের প্রেমের গল্প।

তার অন্যান্য উপন্যাসের মধে রয়েছে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘Jazz’ (‘জাজ সঙ্গীত’)। কাহিনী ১৯২০-এর দশকের নিউ ইয়র্ক শহরকে ঘিরে। ‘A Mercy’ (‘দয়া’) প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। কাহিনী সপ্তদশ শতাব্দীর, সেটা এমন একটা সময়কাল যখন শ্রেণিগত অবস্থানই নির্ধারণ করে নিপীড়ন-শোষণের শিকার কে হবে – সে কৃষ্ণাঙ্গ বা শ্বেতাঙ্গ যেই হোক না কেন। ফলে উপন্যাসে ক্রীতদাসপ্রথার ওপর নজর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটা বর্ণবাদের থেকে আলাদা করে। তিনি ২০১২ সালে ‘Home’ (‘বাড়ি’) প্রকাশ করেন। এর কোরীয় যুদ্ধফেরত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ প্রত্যাবর্তন করে প্রচণ্ড বর্ণবাদী নিপীড়ন-দুষ্ট আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চলে। সেখানে তার সংগ্রাম নিয়ে উপন্যস।

টোনি মরিসনের প্রবন্ধসাহিত্যের মধ্যে রয়েছে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘Playing in the Dark: Whiteness and the Literary Imagination’ (‘আঁধারে লুকোচুরি: শ্বেতাঙ্গ চেতনা আর সাহিত্যের কল্পজগৎ’) আর ২০০৮ সালে প্রকাশিত ও ক্যারোলাইন সি. ডেনার্ড সম্পাদিত ‘What Moves at the Margin:` Selected Nonfiction’ (‘প্রান্তে নড়াচড়া: বাছাই প্রবন্ধ’)

রিজার্ড ড্যানিয়েলপুরের অপেরা ‘মার্গারেট গার্নার’-এর জন্য তিনি লিব্রেটো বা সংলাপ রচনা করেন। ২০০৫ সালে ডেট্রয়েট অপেরা হাউজে অপেরার বিশ্ব-অভিষেক হয়। নাম ভূমিকায় ছিলেন মেজো সোপ্রানো অপেরা কণ্ঠশিল্পী ডেনিস গ্রেভস ।

১৯৮৯ সালে টোনি মরিসন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি মানববিদ্যা ও আফ্রিকাম আমেরিকান স্টাডিসে কোর্স পড়াতেন। সৃষ্টিশীল রচনা প্রশিক্ষণের প্রোগ্রামেরও সদস্য ছিলেন। ২০০৬-এ আজীবন শিক্ষকের পদ অলঙ্কৃত করেন।

মৃত্যুকালে রেখে যান পুত্র হ্যারোল্ড ফোর্ড মরিসন ও তিন নাতি-নাতনি। তিনি ও তার আরেক পুত্র স্লেড বহু শিশুতোষ গ্রন্থ নিয়ে একসাথে কাজ করেছেন। স্লেড ২০১০ সালে মারা যায়।

তার অন্যান্য সম্মানের মধ্যে রয়েছে ২০০০ সালে প্রাপ্ত জাতীয় মানববিদ্যা পদক। প্রেসিডেন্ট ব্যারাক ওবামা ২০১২ সালে তাকে ‘Presidential Medal of Freedom’ (রাষ্ট্রপতির পদক)-এ ভূষিত করেন। তার জীবন ও কাজ নিয়ে গবেষণার জন্য ১৯৯৩ সালে Toni Morrison Society (টোনি মরিসন সংঘ) স্থাপিত হয়।

যদি টোনি মরিসনের সারাজীবনের লেখালেখির একটা সামগ্রিক যোগসূত্রের কথা ভাবা যায়, তবে তার সবচাইতে উজ্জ্বল উদাহরণ পাই ‘সলোমনের গীত’ উপন্যাসে। উপন্যাসের শেষের দিকে দুধওয়ালা (মূল চরিত্রের ডাকনাম) অবশেষে তার নিজ অতীতে বিচরণ করার পর নিজের মধ্যে যে উপলব্ধি ঘটে তার ফলে সে নিজ পরিবার, বৃহত্তর সমাজ ও কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকায় নিজের অবস্থান সম্বন্ধে সুস্থিত হয়।

এর সাথে সাথে বইয়ের শেষ পাতায় সে আকাশে লাফ দেয়। এ যেন এক প্রতীকী উড়ান। অবশেষে যেন সে পৃথিবীতে নিজের জায়গাটি খুঁজে পেয়েছে।

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট