বিদ্যানন্দ ও আমাদের বিবেকের লড়াই - আশফাক স্বপন

বিদ্যানন্দ ও আমাদের বিবেকের লড়াই
ধর্মান্ধরা যেন আমাদের পরিচয় নির্ধারণ না করে

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী, বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’
- কাজী নজরুল ইসলাম

মানুষের সদিচ্ছা থাকলে অর্জন কী অভাবনীয় হতে পারে, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ তার একটা বিস্ময়কর উদাহরণ। সঙ্গত কারণে পেরু-প্রবাসী তরুণ প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাসের লক্ষ লক্ষ ভক্ত।
কিশোরবাবুর ওপর সাম্প্রতিক জঘন্য সাম্প্রদায়িক আক্রমণ দেখে তাই এত অবাক হলাম। বাংলাদেশে সংখায়গরিষ্ঠতান্ত্রিক মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কী জঘন্য হতে পারে এই আক্রমণ সেটা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিয়েছে। এই ঘটনা একপ্রকার নৈতিক যুদ্ধের আহবান।

এরকম মুহূর্তে আমাদের জাতীয় পরিচয়, আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে আমরা এক মর্মান্তিক প্রশ্নের সম্মুখীন হই।

আসলেই আমরা কে? আমাদের পরিচয় কী?

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে যাবার কথা। সেই সময়কার বাংলাদেশ সরকারের একটা পোস্টারে মোদ্দা কথাটা বলা হয়েছে। পোস্টারের পটভূমিতে মন্দির, মসজিদ, গীর্জার ছায়া, তার ওপর দ্বার্থহীন উচ্চারণ: ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান – আমরা সবাই বাঙালী।‘

মনে হয় কিশোরবাবুর নিন্দুকদের কাছে সেই বার্তা এখনো পৌঁছেনি।

আসলে বাস্তব অনেক ঘোলাটে, গোলমেলে।

বাঙালি মুসলমানের নিজের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি আছে, নিজেদের মধ্যে মতভেদ আছে। বাঙালি মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের ফলশ্রুতি ১৯৪৭ সালের পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টি। অথচ এক দশক পার না হতেই পাকিস্তানের ধাত্রী যে মুসলিম লীগ, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে তার ভরাডুবি হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম পালটে আওয়ামী লীগ হয়। ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন দেশ ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। রবীন্দ্রনথের ‘আমার সোনার বাংলা’ হয় দেশটির জাতীয় সঙ্গীত।

এই তো আমাদের ইতিহাসের চুড়ান্ত রায়, তাই না?

নির্মম সত্য হলো এরপর আমাদের জাতীয় পর্যায়ে পদস্খলন ঘটেছে। স্বাধীনতার পর গোঁড়া, ধর্মান্ধ ইসলামের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। আরব দেশের টাকা আর জাতীয় পর্যায়ের কিছু রাজনৈতিক শক্তির ধর্মীয় ভেদবুদ্ধির প্রশ্রয় এই ভয়ঙ্কর প্রবণতা বৃদ্ধিতে ইন্ধন জুগিয়েছে।

কিশোরবাবুর ওপর আক্রমণ এই জঘন্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। এর আগেও আরো আক্রমণের নজির রয়েছে।

বাংলাদেশের এক দুর্দান্ত ক্রিকেটার লিটন দাস। তিনি ফেসবুক পাতায় সবাইকে পূজার শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। ব্যস, আর যায় কোথায়? তার বিরুদ্ধে এমন অশ্রাব্য সাম্প্রদায়িক গালাগাল করা হলো, দেখে আমার রাগ আর ক্ষোভের সীমা ছিলনা।

আসলে বাংলাদেশি মুসলমানের সামাজিক পরিচয়কে একটি কাঙ্খিত দিকে ঠেলে দেবার জন্য এই সব আক্রমণ। মুসলমান হিসেবে আপনার সামাজিক পরিচয় দু’রকম হতে পারে। আমার প্রয়াত মা ও বোন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন/পড়ে, আবার দুজনেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভীষণ ভক্ত। আরেক রকম মুসলমান আছে যাদের চেতনাকে অসহিষ্ণুতা ও গোঁড়ামি এতখানি অধিকার করেছে যে বাংলা সংস্কৃতি, এমনকি ভাষার প্রতিও তাদের বিরাগ, অমুসলমানও তাদের গভীর অপছন্দ।

ধর্ম পালন থেকেই যে সবসময় এই ভেদবুদ্ধির জন্ম, তা নয়। মোহম্মদ আলি জিন্নাহ শুয়োরের মাংস খেতেন, মদ্যপান করতেন, আবার মনে করতেন হিন্দু আর মুসলমান আলাদা জাতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইসলাম ধর্ম পালন করতেন, কিন্তু যে উদার জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ছিলেন সেখানে সকল ধর্মের বাঙালিদের সাদর আমন্ত্রণ ছিল।

ধর্মভীরু মানুষ – তাদের ধর্ম যাই হোক না কেন –দাবি করে যে তাদের সামাজিক মূল্যবোধের উৎস ধর্মীয় গ্রন্থ – কোরান, হাদিস, বাইবেল বা মনুস্মৃতি। কথাটা একদম ভুল। একই ধর্মের অনুসারী জনগোষ্ঠীর প্রবণতাভেদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন রূপ হতে পারে। সমাজটি কূপমণ্ডুক, অসহিষ্ণু, হিংস্র হতে পারে, আবার মানবিক, উদার, পরমতসহিষ্ণু হতে পারে।

মাইমোনিডিসের (Maimonides) অভিজ্ঞতা থেকে কথাটি স্পষ্ট হবে। ইনি ১২শ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ ইহুদী দার্শনিক ও চিকিৎসক। যখন স্পেনের কর্ডোবায় বেড়ে ওঠেন, তখন মুসলমান মূরীয় শাসনের রমরমা। তিনিও বড় হুন একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, সুসংস্কৃত ইহুদীসমাজে। এরপর আলমোহাদ নামে উত্তর আফ্রিকা থেকে বারবার (Berber) মুসলমানের শাসকগোষ্ঠী মূরদের গদিচ্যুত করে। রাতারাতি ইহুদীদের অবস্থা পালটে যায়। পথ রইল তিনটি – ধর্মান্তর, নির্বাসন অথবা মৃত্যু। মাইমোনিডিস নির্বাসন বেছে নিলেন। জীবনের শেষের দিকে তিনি ক্রুসেড যুদ্ধের মুসলমান বীর সম্রাট সালাদিনের রাজসভার চিকিৎসক ছিলেন।
মুসলমান সমাজের পক্ষে কি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা পরিত্যাগ করে মানবিক, উদার মূল্যবোধে উত্তরণ সম্ভব?

নিজের হিংস্র অসহিষ্ণুতার কলঙ্কময় ইতিহাস সত্ত্বেও পাশ্চাত্য কিন্তু তা পেরেছে। ২০০১ সালে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় অমর্ত্য সেন মন্তব্য করেন: ‘১৫৯০-এর দশকে আকবর বাদশাহ যখন আগ্রায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সপক্ষে মত ঘোষণা করছেন, তখন খ্রীষ্টানদের পরধর্মবিরোধী ইনকিউজিশন চলছে। ১৬০০ সালে জরদানো ব্রুনোকে (Giordano Bruno) ধর্মধ্রোহিতার অপরাধে রোমের কাম্পো দি ফেওরে-তে (Campo di Fiore) জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।‘

বাংলাদেশে কিশোরবাবুর ওপর মুসলিম ধর্মান্ধ আক্রমণের ফলে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, তাতে বহু ক্ষুব্ধ মুসলমান সামিল আছেন। এর ইতিবাচক ফল এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে মনে হয়।
এর আগেও ব্যাপক গণধিক্কার কার্যকর হয়েছে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল মুসলমান চরমপন্থীরা বাংলা নববর্ষে রমনায় ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠনে বোমা হামলা করে। (এবিষয়ে আমার ক্ষোভ গভীর ও ব্যক্তিগত । আমার বোন ও ভগ্নীপতি সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।)

হামলাকারীদের উদ্দেশ্য যদি ত্রাস সৃষ্টি হয়ে থাকে, সেটা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

পরের বছরগুলোতে ছায়ানটের অন্তুষ্ঠানে বাঁধভাঙা মানুষের ঢল নেমেছে। এরা অধিকাংশ মুসলমান। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে যে অপূর্ব মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, তার বিরুদ্ধে কিছু কাঠমোল্লা তীব্র ভাষায় অভিসম্পাত করে। আর প্রতিবছর মানুষ তার তোয়াক্কা না করে শোভাযাত্রায় যোগ দেয়।

ধর্মান্ধ মুসলমানদের স্থায়ীভাবে পরাস্ত করতে হলে যেটার প্রয়োজন, মার্কিন সমাজতত্ত্ববিদ হারবার্ট মারকুজ তাকে বলেছেন immanent critique - একেবারে জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা সমালোচনা।
ধর্মভীরু মুসলমানরা প্রায়ই উগ্র ধর্মান্ধ মুসলমানদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাদের বলতে শুনেছি, এদের বর্বরতার কারণে ইসলামের সম্মানহানি হচ্ছে। কিন্তু একথা শুধু মুখে বললেই তো চলবে না। কাজের মাধ্যমে এই সদুদ্দেশ্যের প্রমাণ রাখতে হবে।

যদি মনে করেন অসহিষ্ণু ধর্মান্ধ মুসলমানদের ইসলামের সামাজিক পরিচয় নির্ধারণ করতে দেওয়া যাবে না, তাহলে আসুন, আপনার ধর্মের সম্মান রক্ষায় ময়দানে নামুন।

যেদিন ধর্মভীরু মুসলমান এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সেদিন তারা যে ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা এত অপছন্দ করেন, তার বদলে যে পরমতসহিষ্ণু, মানবিক মুসলমান সমাজ কামনা করেন, সেটা অর্জনের পথ সুগম করবে।

এই কাজ করতে পাশ্চাত্যের কয়েক শতক লেগে গিয়েছে, কিন্তু পাশ্চাত্য তা পেরেছে। খোদ বাংলাদেশেও এটা সম্ভব। তবে বিনাযুদ্ধে সেটা হবে না।

আমরা বাঙালি না মুসলমান, এটাও আরেকটা অসার প্রশ্ন। বহু বাঙালি মুসলমান সগর্বে এবং সানন্দে দুই-ই। (আপনার ধর্মীয় মূল্যবোধে যদি সঙ্গীত গ্রহণযোগ্য না হয়, আপনার সেই মতে চলার অধিকার আমি মান্য করি। তবে অন্যের ওপরে এব্যাপারে জবরদস্তি করবেন না। আর জাতীয় পরিচয় ভৌগলিক, ধর্মীয় নয় – এই কথাটা মান্য করতে শিখুন।) এর ফলে আমাদের সমাজ আরেকটু মানবিক, সহনশীল হবে।
‘আমাদের পরিচয়ের কোন কষ্টকল্পিত একমাত্রিক সাদৃশ্য নয়, সৌহার্দ্যের জন্য সবচাইতে বড় সহায়ক বরং আমাদের পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা। আমাদের পরিচয়ের নানান মাত্রা একে অপরকে অতিক্রম করে, তাতে কঠোর বিভাজনের মাধ্যমে দুইটি বিবদমান গোষ্ঠী সৃষ্টি ব্যাহত হয়।‘ অমর্ত্য সেনের উক্তি, প্রাগুক্ত ‘বিশ্ব সুপষ্ঠভাবে বিভাজিত নয়’ শীর্ষক নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর নিবন্ধে।

https://www.thedailystar.net/opinion/news/bidyanondo-and-the-battle-our-soul-1900726

বিশ্বমহামারি: নবতর বিশ্বের প্রবেশদ্বার - অরুন্ধতী রায়


বিশ্বমহামারি: নবতর বিশ্বের প্রবেশদ্বার

অরুন্ধতী রায়
ফাইনানশ্যাল টাইমস
৩ এপ্রিল, ২০২০


অনুবাদ: আশফাক স্বপন

মূল রচনা
Arundhati Roy: ‘The pandemic is a portal’
Financial Times
April 3, 2020


লিঙ্ক
https://www.ft.com/content/10d8f5e8-74eb-11ea-95fe-fcd274e920ca

কোথায় চলেছে আমার দেশ? হায়রে আমার সমৃদ্ধ অথচ দরিদ্র দেশ, সামন্ততন্ত্র আর ধর্মীয় মৌলবাদের মাঝামাঝি, জাতপাত আর পুঁজিবাদের মাঝামাঝি কোনো এক স্থানে ঝুলে থাকা দেশ, চরম ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী শাসিত দেশ!

গত ডিসেম্বরে যখন চীন উহানে ভাইরাস আবির্ভাবের মোকাবেলায় ব্যস্ত, ভারত সরকার তখন অধুনা সংসদে পাশ করা মুসলমান-বিরোধী নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের গণজাগরণ মোকেবেলা করছে।

ভারতে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের প্রথম ঘটনা ৩০ জানুয়ারি। তার কয়েক দিন আগে দিল্লী থেকে বিদায় নেন আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবসের মহামান্য প্রধান অতিথি, ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জায়ির বোলসোনারো (Jair Bolsonaro), যিনি আমাজন জঙ্গল ধ্বংসে নিরলস ও কোভিড ভাইরাসকে গ্রাহ্যই করেন না। তবে কিনা ফেব্রুয়ারি মাসে এতই কাজের ভীড় ছিল যে শাসকদলের দিনপঞ্জিতে ভাইরাসের ঠাঁই হয়ে উঠল না। মাসের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সফর। তাঁকে গুজরাতের ক্রীড়া স্টেডিয়ামে ১০ লক্ষ লোকের জনসমাগমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টোপ ফেলা হয়েছে। অত বড় আয়োজনে অর্থ, সময় দুই-ই লাগে।

তার ওপর আবার দিল্লীর প্রাদেশিক নির্বাচন। ভারতীয় জনতা পার্টি রাজনৈতিকভাবে তৎপর না হলে সেখানে ভরাডুবির সম্ভাবনা। তা দল তৎপর হয়ে উঠল ঠিকই। নির্বাচনী অভিযানে দলটি নগ্ন হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রচারণায় মত্ত হল – সেখানে শারীরিক সহিংসতা, ও ‘দেশদ্রোহীদের’ গুলি করার হুমকি কিছুই বাদ যায়নি।

কিন্তু শেষরক্ষা হলনা, নির্বাচনে পরাজয় হল। দোষ দেওয়া হল দিল্লীর মুসলমানদের, এবং তাদের যথাযোগ্য শাস্তি দেবার বন্দোবস্ত করা হল। পুলিশের ছত্রছায়ায় সশস্ত্র হিন্দু গুণ্ডার দল উত্তর পূর্ব দিল্লির শ্রমিক মহল্লায় মুসলমানদের আক্রমণ করল। ঘর-বাড়ি, দোকান, মসজিদ, স্কুল পোড়ান হল। মুসলমানরা এমন আক্রমণের আশঙ্কা করেছিল, তারাও প্রত্যুত্তরে লড়াই করল। পঞ্চাশের অধিক মানুষ, মুসলমান ও কয়েকজন হিন্দু, মারা গেল। হাজার হাজার মানুষ স্থানীয় গোরস্থানের শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই নিল। সরকারী কর্মকর্তারা যখন কোভিড-১৯ নিয়ে প্রথম সভায় মিলিত হয়, আর বেশির ভাগ ভারতীয়রা যখন প্রথমবারের মত hand sanitizer (হাত পরিষ্কারক)-এর অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়, তখনও দুর্গন্ধময় নর্দমা থেকে ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে।

মার্চও কর্মব্যস্ত মাস। প্রথম দু’সপ্তাহ কাটল ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে কংগ্রেস-শাসিত সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আনতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ কোভিড-১৯ বিশ্বময় মহামারি বলে ঘোষণা করল। তার ঠিক দুই দিন পর ১৩ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানাল কোরোনা ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ নয়।

অবশেষে ১৯ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তার বিশেষ পূর্বপ্রস্তুতি ছিলনা। তিনি ফ্রান্স আর ইতালির পথ ধরলেন। তিনি আমাদের ‘সামাজিক দূরত্বের’ প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বললেন। (জাতপাত যে সমাজে মজ্জাগত, সেখানে বিষয়টা বুঝতে বেগ পেতে হলনা।) তিনি ২২ মার্চ ‘জনতার সান্ধ্য আইন’-এর আহবান জানালেন। এই সঙ্কট নিরসনে সরকার কী করছে, সে সম্বন্ধে তিনি কিছু বললেন না, কিন্তু জনগণকে বললেন তারা যেন যার যার বারান্দায় এসে ঘণ্টি বাজিয়ে, হাড়ি বা কড়াই পিটিয়ে স্বাস্থ্য কর্মীদের অভিনন্দন জানায়।

ভারত যে নিজের দেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সংরক্ষণ করার পরিবর্তে প্রতিরোধক সরঞ্জাম ও শ্বাসরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি ঠিক সেই মুহূর্ত পর্যন্ত বিদেশে রফতানি করছিল, এই কথাটি আর তিনি উল্লেখ করলেন না।

নরেন্দ্র মোদির আহবানে মানুষ প্রচণ্ড সাড়া দিল। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। হাড়ি-পেটানো মিছিল, পাড়ার লোকের মিলিত নৃত্য, কিছুই বাদ রইল না। সামাজিক দূরত্ব তেমন দেখা গেল না। পরবর্তী দিনগুলোতে মানুষ পবিত্র গোবরভর্তি পিপেতে ঝাপ দিল, বিজেপি সমর্থকরা গোমূত্র পানের আসর আয়োজন করল। মুসলমানরাও পেছনে পড়ে থাকার পাত্র নয়। বহু মুসলমান সংগঠন ঘোষণা করল যে ঈশ্বরই ভাইরাস ঠেকানোর একমাত্র উপায়, এবং দলে দলে মুসল্লিদের মসজিদে একত্র হতে আহবান জানাল।

২৪ মার্চ সন্ধ্যে ৮টায় মোদি আবার টিভির পর্দায় হাজির হলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে মধ্যরাত্রির পর থেকে সারা ভারত ‘লক ডাউন’-এ যাবে। বাজার বন্ধ। সকল যানবাহন চলাচল বন্ধ।

তিনি বললেন এই সিদ্ধান্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, পারিবারিক প্রবীণ হিসেবে নিয়েছেন। আর কার পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব? বিন্দুমাত্র কোন আগাম ব্যবস্থা না নিয়ে, মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে ১৩৮ কোটি মানুষের একটা দেশে এত বড় একটা আদেশ। সব দায় আর ঝামেলা যেই রাজ্য সরকারগুলোর ওপর পড়বে, তাদের সাথে কোনরকম আলোচনা করা হল না। তার কর্মপদ্ধতি দেখে মনে হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করেন। এদের ওপর হঠাৎ করে চড়াও হতে হয়, চমকে দিতে হয়, কিন্তু কখনো বিশ্বাস করা যায় না।

আমাদের লকডাউন হল। বহু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানবিদরা এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের কথা ঠিক হতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনা আর প্রস্তুতির ভয়াবহ অভাবে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও কঠোর লকডাউন-এর ফলে হিতে বিপরীত হল, এটা নিশ্চয়ই তাঁদের কেউই সমর্থন করতে পারেন না।

যে মানুষটা তামাশা পছন্দ করেন, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তামাশা সৃষ্টি করলেন।

অবাক, স্তম্ভিত পৃথিবী দেখল, কীভাবে ভারত নগ্নভাবে নিজের গ্লানিময় স্বরূপ প্রকাশ করল – তার নির্মম, কাঠামোগত সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানুষের দুঃখে-কষ্টে তার নিষ্ঠুর নিস্পৃহতা।

যেন এক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মত লকডাউন অনেক গোপন জিনিস আলোকিত করে তুলল। দোকান, রেস্তোরা, কারখানা, গৃহনির্মাণ কাজ বন্ধ হবার সাথে সাথে ধনী ও মধ্যবিত্ত মানুষ নিজেদের সংরক্ষিত আবাসনে রয়ে গেল, আর আমাদের শহর আর সুবিশাল মহানগরগুলো যেন আবর্জনার মত খেটে খাওয়া মানুষ – অভিবাসী শ্রমিক – এদের পরিত্যাগ করতে লাগল।

বাড়িওয়ালা বা কাজের মালিক এদের বহুজনকে বিতাড়িতে করেছে। কোটি কোটি দরিদ্র, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত মানুষ, তরুণ ও বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, শিশু, অসুস্থ মানুষ, অন্ধ মানুষ, প্রতিবন্ধী মানুষ, এদের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই, ত্রিসীমানায় কোন জনপরিবহন নেই – বাড়ি ফেরার জন্য নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করল। দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে চলল। বাদাউন, আগ্রা, আজমগঢ়, আলীগঢ়, লখনৌ, গোরখপুর – শত শত কিলোমিটার দূরে। কেউ কেউ পথেই মারা গেল।

এরা জানে বাড়িতে পৌঁছুলে মোটামূটি মন্থরগতির দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। হয়ত জানে, শরীরে ভাইরাস বাসা বেঁধেছে, বাড়িতে তাদের পরিবার, বাবা-মা, পিতামহ-মাতামহকে আক্রমণ করতে পারে, কিন্তু তারা যে ভীষণ কাঙাল একটুখানি পরিচিত পরিবেশের, একটু আশ্রয়ের, একটু আত্মসম্মানের, একটু খাবারের, হয়তোবা একটু ভালোবাসারও।

হাঁটতে হাঁটতে কেউ কেউ নির্মমভাবে পুলিশের হাতে লাঠিপেটা হল, অপমানিত হল। পুলিশের দায়িত্ব কঠোরভাবে সান্ধ্যআইন জারি রাখা। তরুণদের জোর করে হাঁটু গেড়ে বসান হল, অথবা রাস্তার ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে বাধ্য করা হল। বারেলি শহরের কাছাকাছি একদল লোককে একত্র করে কেমিকাল স্প্রে দিয়ে ধোলাই করা হল।

বিতাড়িত মানুষ গ্রামে ভাইরাস ছড়াবে এই আশঙ্কায় কয়েকদিন পর সরকার এমনকি পদব্রজে আগত মানুষের জন্যও রাজ্যের সীমানা বন্ধ করে দিল। দিনের পর দিন যেসব মানুষ হেঁটে এসেছে, তাদের থামিয়ে জোর করে যেই শহরগুলো থেকে তাদের জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানকার শিবিরে ফেরত পাঠান হল।

যাদের বয়স হয়েছে, তাদের ১৯৪৭ সালে দেশভাগে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় জনসংখ্যা বদলাবদলির কথা মনে পড়ল। তফাত হল এবার এই জনস্রোতের গৃহত্যাগের ভিত্তি শ্রেণি, ধর্ম নয়। তারপরও এরা ভারতের সবচাইতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী নয়। এদের তো তবুও (অন্তত এখন পর্যন্ত) শহরে কাজ ছিল, আশ্রয় নেবার মতো গ্রামের বাড়ি ছিল। যারা বেকার, গৃহহীন, আশাহত, তারা যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেল – শহরে আর গ্রামে। এই সর্বনাশ আসার আগে থেকেই গ্রামে গভীর কষ্ট ক্রমবর্ধমান ছিল। এই যে এতগুলো ভয়াবহ দিন গেল, এই পুরো সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জনসাধারণের আড়ালেই রয়ে গেলেন।

দিল্লীতে যখন পদযাত্রা শুরু হল, আমি তখন একটা সাময়িকীর (এখানে আমি মাঝে মাঝে লিখি) প্রেস পাস ব্যবহার করে দিল্লী আর উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সীমানায় অবস্থিত গাজীপুরে গাড়ি চালিয়ে গেলাম।

চিত্রটি যেন বাইবেল থেকে তোলা। নাহ, কথাটা ঠিক নয়। বাইবেলেও এত লোকের উল্লেখ নেই। শারীরিক দূরত্ব তৈরির জন্য যে লকডাউন, তার ফল হয়েছে উলটো – মানুষ গাদাগাদির ফলে অভাবনীয় শারীরিক নৈকট্য। ভারতের সব শহর আর উপশহরের বেলায় এই কথা খাটে। বড় বড় রাস্তা জনশূন্য হতে পারে, কিন্তু গরীব মানুষ বস্তিতে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়েছে।

হেঁটে চলা মানুষের সাথে আমি কথা বলে দেখেছি, ওরা প্রত্যেকে ভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে এটি কিন্তু তাদের জীবনে তুলনামূলকভাবে অতটা বড় চিন্তা নয়। আগামী দিনের বেকারত্ব, দুর্ভিক্ষ, পুলিশের সহিংসতা – এসবই কঠিন বাস্তবতা। সেদিন অনেকের সাথে কথা বলেছি। তার মধ্যে একদল মুসলমান দর্জিও ছিল, যারা সবেমাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মুসলমানবিরোধী আক্রমণের ধকল সামলে উঠেছে। এদের মধ্যে একজনের কথা আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁর নাম রামজিত, পেশায় কাঠমিস্ত্রি। হেঁটে হেঁটে সেই নেপাল সীমান্তবর্তী গোরখপুরের দিকে চলেছে।

‘হয়ত যখন মোদিজী এই কাজের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন কেউ তাঁকে আমাদের কথা বলেনি; হয়ত তিনি আমাদের কথা জানেন না,’ রামজিত বলল।

‘আমাদের’ মানে প্রায় ৪৬ কোটি মানুষ।

মার্কিন দেশের মত ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোও এই সঙ্কট মোকাবেলায় আরো সুবিবেচনা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন, সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী খাবার ও জরুরি জিনিসপত্র সরবরাহ করছে। এরা অর্থের জন্য মরিয়া আবেদন করেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সাড়া আশাব্যঞ্জক নয়। দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিলে টাকা নেই। তার পরিবর্তে শুভানুধ্যায়ীদের টাকা যাচ্ছে নতুন PM-CARES তহবিলে, যেটির অস্তিত্ব খানিকটা রহস্যময়। মোদির চেহারা সম্বলিত তৈরি খাবারের প্যাকেট নানান জায়গায় দেখা দিচ্ছে।

এর সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী তার যোগনিদ্রা ভিডিও জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করছেন। এই ভিডিয়োগুলোতে এ্যানিমেশনের মাধ্যমে সুঠাম দেহের চিত্রাঙ্কিত মোদি নানা যোগাসনের মাধ্যমে মানুষের একাকী থাকার মানসিক চাপ সামলানোর উপায় প্রদর্শন করেন।

এই ধরনের আত্মমগ্নতা গভীর উদ্বেগজনক। আচ্ছা, একটা আর্তি-আসন থাকলে কেমন হয়? এই আর্তি আসনের মাধ্যমে মোদি ফরাসী প্রধানমন্ত্রীকে বলবেন আমাদের ৭৮০ কোটি ইউরোর রাফাল ফাইটার বিমান ক্রয়ের প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তিটি মূলতবি রাখার অনুমতি দিন যাতে আমরা লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ফরাসীরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝবেন।
লকডাউনের দ্বিতীয় সপ্তাহে পণ্যপ্রস্তুতির যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ওষুধপত্র, জরুরি জিনিসের সরবারহ কম। মহাসড়কে হাজার হাজার ট্রাক অন্তরীণ, খাবার বা পানি প্রায় নিঃশেষ। যে ফসল ঘরে তোলার সময় এসেছে, সেসব ক্ষেতেই পচতে শুরু করেছে।

অর্থনৈতিক সঙ্কট একেবারে দ্বারপ্রান্তে। রাজনৈতিক সঙ্কট চলমান। মূলধারার সংবাদ মাধ্যম কোভিড-এর গল্প তাদের সার্বক্ষণিক বিষাক্ত মুসলমানবিরোধী প্রচারণার সাথে সম্পৃক্ত করেছে। তবলিগী জামাত নামে এক সংগঠন লকডাউন ঘোষণার আগে দিল্লীতে এক সমাবেশের আয়োজন করে। এই সমাবেশ সংক্রমণের একটা বড় কেন্দ্রবিন্দু বলে চিহ্নিত হয়। ব্যস, এই খবরটি মুসলমানদের হেয় প্রতিপন্ন করা, তাদের বজ্জাত হিসেবে চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহার করা হল। ভাবখানা যেন মুসলমানরাই এই ভাইরাস আবিষ্কার করেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে একধরনের জেহাদ হিসেবে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে।

কোভিড সঙ্কট আসা এখনো বাকি। বা হয়ত আসবে না। আমরা জানিনা। যদি বা যখন এই সঙ্কট আসে, আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে ধর্ম, জাতপাত আর শ্রেণী নিয়ে আমাদের সকল বিরাজমান ভেদবুদ্ধি অক্ষুণ্ণ রেখেই আমরা এই সঙ্কটের মোকাবেলা করব।

আজ (২ এপ্রিল) ভারতে প্রায় ২,০০০ নিশ্চিত সংক্রমণ ও ৫৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে। অত্যন্ত অল্পসংখ্যক পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এইসব সংখ্যা প্রাপ্ত, তাই এইসব সংখ্যা নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মাঝে মতভেদ আছে। কেউ বলছে লক্ষ লক্ষ লোকের মাঝে সংক্রমণ ঘটবে। কেউ বলছে অত বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে না। যখন সঙ্কট আসবে, তখন তার চৌহদ্দীটা যে কী, সেটা হয়ত আমরা কোনদিনই জানতে পারব না। এখন এইটুকু মাত্র আমরা জানি যে হাসপাতালের সেবা নিয়ে কাড়াকাড়ি এখনও শুরু হয়নি।

বছরে প্রায় ১০ লক্ষ শিশু পেটের অসুখ, অপুষ্টি আর অন্যান্য অসুস্থতায় মারা যায়, লক্ষ লক্ষ যক্ষ্মা রোগী (ভারতে পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ যক্ষ্মা রোগী), জনসংখ্যার একটা বড় অংশ রক্তের স্বল্পতা ও অপুষ্টিতে ভোগে, ফলে অজস্র সামান্য ব্যাধিতেই এদের মৃত্যু হয় – এদেরই ভারতের সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা সদনগুলো সামাল দিতে পারে না। ইউরোপ আর মার্কিন দেশ আজ যেই সঙ্কটের মোকাবেলা করছে, ভা্রতের হাসপাতালগুলো সেই সঙ্কট সামাল দেবে কী করে?

ভাইরাসের সেবায় হাসপাতালগুলোতে আর সকল স্বাস্থ্যসেবা একরকম মূলতবী রাখা হয়েছে। দিল্লীর সুবিখ্যাত অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল সাইন্সেস-এর জরুরি বিভাগ বন্ধ, এই বিশাল হাসপাতালের আশে পাসে রাস্তায় বসবাসকারী শত শত ক্যান্সার রোগী – যাদের ক্যান্সার শরণার্থী বলে অভিহিত করা হয় – তাদের গরু-ভেড়ার মত তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মানুষ বাড়িতে অসুস্থ হবে, বাড়িতেই মারা যাবে। ওদের কথা হয়ত আমরা কোনদিন জানব না। এমনকি তাদের হিসেব পরিসংখ্যানও রাখবে না। আমাদের একটাই আশা, কয়েকটি গবেষণায় জানা গেছে ভাইরাস শীত পছন্দ করে - সেকথা যেন সঠিক হয়। (যদিও অন্যান্য গবেষকরা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।) অগ্নিঝরা, কঠোর গ্রীষ্মের জন্য এমন ব্যাকুলভাবে কোন জাতি অপেক্ষা করেনি।

আচ্ছা, আমাদের মধ্যে কী ঘটছে? এটা ভাইরাস, সে কথা ঠিক। ভাইরাসের নিজের তো কোন নৈতিক নিশানা নেই। তবে এটা ভাইরাসের অতীত আরো কিছু, সেটা নিশ্চিত। কারো বিশ্বাস, এর মাধ্যমে ঈশ্বর আমাদের সুমতি দেবার চেষ্টা করছেন। অন্যরা ভাবেন এটা চীনের চক্রান্ত, এর মাধ্যমে তারা সারা পৃথিবীর কর্তৃত্ব দখল করতে চায়।

করোনাভাইরাস যাই হোক, সে যেভাবে মহাশক্তিমানকে ধরাশায়ী করেছে, পৃথিবী থমকে দাড়িয়েছে, এমনটা আর কেউ করতে পারেনি। আমাদের মনের মধ্যে এখন ভীষণ উথাল-পাথাল, কবে আবার ‘স্বাভাবিকতা’-তে ফিরব তার আকুতি। আমরা অতীতের সাথে ভবিষ্যত জোড়ার মরিয়া চেষ্টা করছি, অতীত আর ভবিষ্যতের বিচ্ছেদকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এই বিচ্ছেদ অনস্বীকার্য। এই ভয়ঙ্কর হতাশার সময়ে আমরা নিজেদের জন্য পৃথিবী চালু রাখার যে সর্বনাশা যন্ত্র গড়ে তুলেছি, সেটা সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে এই বিচ্ছেদ আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে। পুরনো স্বাভাবিকতাতে প্রত্যাবর্তন সবচাইতে নিকৃষ্ট পথ।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় যে একেকটা বিশ্বমহামারি মানুষকে অতীতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে পৃথিবী সম্বন্ধে নতুনভাবে কল্পনা করতে বাধ্য করে। এবারও তার অন্যথা হবে না। এটি একটি পৃথিবী থেকে নবতর পৃথিবীতে পদার্পণের প্রবেশদ্বার।

সেই প্রবেশদ্বারে দিয়ে দুই ভাবে ঢোকা যায়। আমরা আমাদের পিছু পিছু আমাদের ভেদবুদ্ধি আর ঘৃণা, অর্থের লোভ, তথ্যের পাহাড় আর বস্তাপচা ভাবনা, আমাদের মৃত নদী আর ধূসর আকাশের গলিত মৃতদেহগুলো টানতে টানতে প্রবেশ করতে পারি। অথবা আমরা প্রবেশ করতে পারি হাল্কা পায়ে, যৎসামান্য মানসিক ভার সাথে নিয়ে, নতুন একটা পৃথিবীকে কল্পনা করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে। আর হ্যা, সেই নতুন পৃথিবীর জন্য লড়াই করবার প্রস্তুতিও থাকা চাই।

বইয়ের হাট গল্প প্রতিযোগিতার ফলাফল

বইয়ের হাট গল্প প্রতিযোগিতার ফলাফল।
বিজয়ী এবং অংশগ্রহণকারী সকলকে আমাদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন

৩য়ঃ মাহমুদুল করিম জিসান
গল্পঃ খোকা মিসড দ্য প্লেন
পুরস্কারঃ ১০০০ টাকার সমপরিমান বই

খোকাটা দেখতে দেখতে কেমন বড় হয়ে গেল! সেদিন তো সবাই অবাক, ওর বাবা একটা বাঁশি কিনে এনে পুঁউউউ করতেই সেটা নেয়ার জন্য হামা দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ কি ভেবে যেন টেবিলের পা ধরে ধুম করে দাঁড়িয়ে পড়ল! তিন-চার সেকেন্ডের বেশি যদিও দাঁড়াতে পারেনি, ধপাস করে পড়ে গেছে। তাতে কি, 'হাঁটিতে শিখে না কেহ না খেয়ে আছাড়' হুম!

তবে ঐ এক সমস্যা- এক্কেবারে খেতে চায় না। টিভি দেখিয়ে, গান শুনিয়ে, মোবাইল দিয়ে কত কিছু করে যে খাওয়াতে হয়! সেদিন সকালে বারান্দায় খোকার মা খোকাকে খাওয়াচ্ছিল। এমন সময় ওদের মাথার উপর দিয়ে বিকট শব্দে উড়ে গেল একটা ফাইটার প্লেন। খোকার মা বলল, ঐ যে দেখ প্লেন যাচ্ছে। তুমি এখন না খেলে প্লেন তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। এমন সময় গেল আরেকটা ফাইটার। ভয় পেয়ে হোক বা না হোক, খোকা কপকপ করে এক বাটি খিচুড়ি খেয়ে ফেলল!

রাতে যখন আবার খোকার মা ওকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, তখন খোকা বলল- পে-ন। ওর মা প্রথমে না বুঝলেও পরে বুঝল ওকে এখন প্লেন দেখাতে হবে, নইলে খাবে না।

বাড়ির পাশে রাস্তা দিয়ে জোরে শব্দ করে কোনো কিছু গেলেই এখন খোকা বলে ওঠে পে-ন পে-ন। আর হামা দিয়ে বারান্দায় যেতে চায়, যেন গেলেই দেখতে পাবে।

ওর মায়ের জন্য ভালোই হল। প্লেনের কথা বলে বলে, প্লেনের ছবি দেখিয়ে, ইউটিউব থেকে ভিডিও দেখিয়ে ওকে এখন খাওয়ানো যায়।

সেদিন দুপুরে খোকা আর ওর মা দুজনেই ঘুমাচ্ছিল। খোকার বাবা পাশের ঘরে টিভি দেখছিল। হঠাৎ খোকার ঘুম ভেঙে গেল। এমন সময় উড়ে গেল একটা প্লেন। শব্দ শুনেই খোকা খুশিতে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল পে-ন পে-ন। তারপর হামা দিতে শুরু করল। উড়ে গেল আরো একটা প্লেন। খোকার খুশি দেখে কে! মা মরণঘুম ঘুমাচ্ছে, বাবা দেখছে টিভি। এদিকে খোকা এগিয়ে যাচ্ছে। খাটটা বেশ উঁচু। খোকা এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে আর বলছে- পে-ন, পে-ন।

লোকে যখন খোকার মাকে বলে, কি গো, ছেলের মাথার পেছনে এমন কেটে গেল কীভাবে, খোকার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, খাট থেকে পড়ে গিয়ে।

খোকার মা জানে না খোকা যে প্লেন ধরতে গিয়েছিল, ধরতে পারেনি!


২য়ঃ নাহার তৃনা
গল্পঃ ফসকা গেরো
পুরস্কারঃ ৩০০০ টাকার সমপরিমান বই

সারারাত ঘুম হয়নি। পরদিন কোথাও যাবার থাকলে এমন হয়। সকালে চায়ের কাপে চুমুকটা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যেতে যেতে ভাবছি প্রথমে দুবাই, দুবাই থেকে নিউইয়র্ক, নিউইয়র্ক থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কানাডা। রুটপ্ল্যান পাকা। জায়গামত লোক আছে। এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমিরাতের কাউন্টার খোলার আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। মালামাল বুকিং দিয়ে ঝাড়া হাত পা নিয়ে ইমিগ্রেশানের মুখোমুখি। একটু টেনশান এখানে। কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাবেন, আগে গেছেন কিনা, দুনিয়ার আজাইরা প্রশ্ন। ধুকপুক করতে করতে এই অংশটাও পার হয়ে গেলাম। ফ্লাইটের আরো দেড় ঘন্টা বাকী। এখন আর কোন টেনশান নাই। নিজেকে মুক্ত মানব মনে হলো। এমেক্স লাউঞ্জে গিয়ে ফ্রি নাস্তাটা সেরে নেয়া যাক। নাস্তা সেরে গরম কফিতে চুমুক দিয়ে সামনের পত্রিকায় চোখ দিলাম। পত্রিকায় আজকে সব যেন সুখবর।

বোর্ডিং করার ঘোষণা ভেসে এলো স্পীকারে 'ফ্লাইট ইকে-০৯৮৭......' দ্রুত গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। সামনে বিশ পঁচিশ জনের মতো আছে। এগিয়ে যেতে শেষ পাঁচজনের মধ্যে চলে এলাম। এমন সময় পেছন থেকে লাইন ভেঙ্গে কেউ এগিয়ে আসতে থাকলে বিরক্ত হয়ে তাকালাম।

কালো চশমা পরা একজন এসে হাত চেপে আমাকে লাইন থেকে বাইরে নিয়ে এলো।
'জাহাঙ্গীর সাহেব, আরেকটু হলেই তো ফসকে গেছিলেন......'

চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে ভাবতে লাগলাম, কানাডায় পাচার করা দেড়শো কোটি টাকা এখন কার ভোগে যাবে?


১মঃ সৌরভ ভট্টাচার্য
গল্পঃ মোড়
পুরস্কারঃ ৫০০০ টাকার সমপরিমান বই

রণেন্দু ছিটকে সিটে শুয়ে পড়ল প্রায়। পাখিটা এমন আচমকা লাগল কাঁচে। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। ফ্লাইট সাড়ে পাঁচটায়। রণেন্দু আড়চোখে দেখল, উবেরের ড্রাইভার আয়নায় তাকে দেখেই চোখ ফেরাল। লজ্জা করছে, এতটা রিয়্যাক্ট করার কি ছিল? একটু আগেই গানটা বন্ধ করতে বলেছে, রূঢ়ভাবেই বলেছে। কিন্তু এমন কেন হচ্ছে? আর্লি ফরটিতে এত বড় প্রোমোশন মার্কেটিং-এর লাইনে ক'টা হয়?

“আপনি অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন বড় ধরণের কখনও?" অবান্তর প্রশ্ন। তবু করল।

ড্রাইভার মাথা নাড়ল।

ওয়াটস অ্যাপে একটা ফ্লাইট ক্রাশের ভিডিও এসেছে গ্রুপে। আজ সকালেই হয়েছে, নাইরোবিতে। পাখির ধাক্কায় নাকি ফ্লাইটটা ভেঙে পড়েছে।

ড্রাইভারের দৃষ্টিটা অস্বচ্ছ, সন্দেহ করছে?

সুদীপ্তকে বিট্রে করেছে? সুদীপ্ত'র মা অসুস্থ থাকত, ও অনিয়মিত ছিল, হতে পারে সে মোর capable, কিন্তু consistency-র কোনো দাম নেই?

গাড়িটা লিক হল। প্রচণ্ড বৃষ্টি। ধারেকাছে কোনো দোকান নেই। ফোন লাগছে না। ড্রাইভার নেমে গেল, মেকানিক আনতে গেছে। রণেন্দু একা। ঘাম হচ্ছে। এসি অফ্। কাঁচ নামাল। প্লেন যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। বিকট শব্দ। সুদীপ্ত'র মাকে রণেন্দু দেখেনি। নিজের মাকেও না।

ফ্লাইটটা মিস হবে বুঝতেই পেরেছিল। এয়ারপোর্টের দু'নম্বর গেটের মুখে কাকেদের তাণ্ডব, একটা কাক তারে শক খেয়ে মরে পড়ে। সুদীপ্ত'র মেসেজ ঢুকল, congratulations.
রাস্তায় দাঁড়াল। মাথার উপর কাকের জটলা।

ফাইজারে একটা অফার আছে। ছেড়ে দিলে হয় না? একটা কুকুর কাকটাকে মুখে করে দৌড়াচ্ছে।

“Sudipta, I quit."

বাস স্টপে দাঁড়াল রণেন্দু।

‘আবার অলিভ’ এলিজাবেথ স্ট্রাউটের বই সমালোচনা NPR থেকে অনুবাদ করেছেন আশফাক স্বপন



বই সমালোচনা
‘আবার অলিভ’ উপন্যাসে এলিজাবেথ স্ট্রাউট পুরনো বান্ধবীর সাথে আবার মিলিত হয়
হেলার ম্যাকআল্পিন
১৭ অক্টোবর, ২০১৯

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনা
In 'Olive, Again,' Elizabeth Strout Revisits An Old Friend
By Heller Mcalpin
October 16, 20197:00 AM ET

আলোচিত বই:
Olive, Again
By Elizabeth Strout
Hardcover, 289 pages

লেখিকার সাক্ষাৎকার (ইংরেজি)


অলিভ কিটরিজ বিদ্যালয়ে অঙ্কের শিক্ষয়িত্রী। স্বভাবে খিটখিটে কিন্তু প্রথম পরিচয়েই তার প্রতি মায়া পড়ে যায়। এখন অবসরপ্রাপ্ত, কিন্তু জীবন থেকে অবসর নেন নি মোটেও। এই অলিভকে নিয়ে রচিত গল্পসঙ্কলনের জন্য এলিজাবেথ স্ট্রাউট মার্কিন দেশের সবচাইতে নামজাদা সাহিত্য পুরস্কার পুলিৎজার প্রাইজে সম্মানিত হন। তার ১০ বছর পর লেখিকা আরো সাম্প্রতিক ঘটনার সংবাদ নিয়ে মেইন অঙ্গরাজ্যের উপকূল অঞ্চলে দৃষ্টি ফেরালেন তার নতুন গল্পের ঝাঁপি, প্রথমবারের মতই, অপূর্ব।

Olive, Again (আবার অলিভ) উপন্যাসটি রসাস্বাদনের জন্য প্রথম সঙ্কলন Olive Kitteridge (অলিভ কিটরিজ) পড়ার প্রয়োজন নেই, তবে পড়ার জন্য মন আঁকুপাঁকু করবেঅঙ্কনশিল্পে চিত্রের প্রাথমিক রঙের আস্তরণের মতো গল্পের প্রথম সঙ্কলনটি কাহিনিকে গভীরতা দেয়, তাকে আরো বাঙ্ময় করে তোলে। দ্বিতীয় কিস্তির বইটির সূত্রপাত সম্বন্ধে স্ট্রাউট লিখেছেন: ‘এই যে অলিভ! আমাকে এখনো অবাক করে চলেছে। আমাকে রাগিয়ে দেয়, মনে কষ্ট দেয়, আবার ওকে ভালোও বেসে যাই।’

এই যে এলিজাবেথ স্ট্রাউট! আমাকে এখনো তাক লাগায় (যদিও আর অবাক হই না।) Amy and Isabel’ (‘এমি এবং ইসাবেল’) থেকে শুরু করে  Anything is Possible’ (‘যে কোন কিছুই সম্ভব’) পর্যন্ত বইয়ের পর বইয়ে তিনি তাঁর নানান চরিত্রের মনোকষ্ট আর দুশ্চিন্তার গভীরে চলে গেছেন; অতি স্বচ্ছ দৃষ্টিতে, দরদের সাথে তাদের জীবনের আক্ষেপ, জীবনের রমণীয় মুহূর্ত, তাদের দোষেগুণে ভরা মানবিক পরিচয়কে তার রচনায় ধারণ করেছেন। শেরউড এ্যান্ডারসন তারWinesburg, Ohio’ (‘ওয়াইন্সবার্গ, ওহায়ো’) বইয়ে কাহিনির ঘটনাচক্র বয়ানের একটি কাঠামো সৃষ্টি করেছিলেন। মেইন অঙ্গ্রাজ্যের ক্রসবি উপশহরের মানুষের জীবন সময়ের হাত ধরে তিল তিল করে কী করে এগিয়ে যায়, স্ট্রাউট তার একটা সম্মিলিত চিত্র সৃষ্টি করতে গিয়ে এ্যান্ডারসনকেও টেক্কা দিয়েছেন।    

‘অলিভ কিটরেজ’-এর গল্প যেখানে শেষ হয়েছিলে, তার কিছু পরেই নতুন উপন্যাসের গল্প শুরু হয়। প্রথম গল্পসঙ্কলনে আমরা জেনেছি স্বামী হেনরির মৃত্যুর পর আমাদের কপরিচিত খিটখিটে স্বভাবের মূল চরিত্রটি খুব একা হয়ে গিয়েছেতখন হার্ভার্ড অধ্যাপক জ্যাক কেনিসনের সাথে অলিভের সখ্যতা গড়ে ওঠে। ব্যাপারটা একটু অবাক করার মতো, কারণ স্বামীর জীবদ্দশায় হেনরি আর অলিভ জ্যাককে একজন বহিরাগত, উদ্ধত, দাম্ভিক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভেবে খারিজ করে দিয়েছিল। জ্যাককে নদীর পারের এক পথে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় অলিভ আবিষ্কার করার পর তার ধারণা পালটায়। অলিভ জানতে পারে, তার মতো জ্যাকেরও কিছুদিন আগেই পত্নীবিয়োগ ঘটেছে। তার মতো জ্যাকেরও একমাত্র সন্তানের সাথে সম্পর্কে গভীর দূরত্ব রয়েছে বলে আক্ষেপ হয়।  

‘আবার অলিভ’ উপন্যাসের সূচনায় আমরা দেখি তাদের সেই সম্ভাবনাময় যোগাযোগটি হারিয়ে গিয়েছে। অনেকটা
missed call-এর মতো। নতুন উপন্যাসে জ্যাকের সাথেই আমাদের আবার দেখা হয় প্রথম। গল্প বলার কৌশলটি চমৎকার, এর ফলে আমরা খানিকটা দূর থেকে অলিভ কেমন আছে সেটা জানতে পারি। অলিভের সাথে বিশ্রী ছাড়াছাড়ির তিন সপ্তাহ পর জ্যাক তার চৌকশ লাল টকটকে ছাদখোলা গাড়ি চালিয়ে পোর্টল্যান্ড শহরে যায় একটা পানশালায় গলা ভেজাতে। সে জীবনের নানান হতাশার কারণগুলো সম্বন্ধে আবার ভেবে ভেবে ঠিক করে হয়তো এটাই তার পাওনা। নিজের সমকামী কন্যার প্রতি তার নির্মম দুর্ব্যবহার, তার প্রতি স্ত্রীর বিরাগ (স্ত্রীর পুরনো প্রণয়ীর কাছ থেকে প্রাপ্ত একটি উদ্বেগজনক ইমেল ব্যাপারটি সম্বন্ধে তাকে নতুনভাবে ভাবায়)– এই সব কিছু নিয়ে সে আক্ষেপ করে। আজ ৭৪ বছর বয়েসে সে ভাবে: ‘আচ্ছা, জীবনে সৎভাবে কী করে চলা যায়?’ সে যখন এসব বেদনাদায়ক স্মৃতিতে আচ্ছন্ন, তখন এক ঝটকায় তাকে বাস্তবে নিয়ে আসে এক ট্রাফিক পুলিশ। পুলিশ তাকে দ্রুতিসীমা লঙ্ঘনের জন্য থামায়। তর্কাতর্কি খানিকটা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের রূপ নেয়, তাতে শ্রেণিবিভাজনের ছায়া পড়ে।

একাকীত্বের পাশাপাশি শ্রেণিবিভাজন, উন্নাসিকতা – এসব স্ট্রাউটকে বিশেষভাবে ভাবায়। এবার দৃষ্টি চলে যায় খিটখিটে স্বভাবের অলিভের ওপর। আমরা জানতে পারি যে সে ‘ঐ অসহ্য, বড়লোক বুড়োটার’ ওপরে মহা খাপ্পা। সন্তান্সম্ভবা এক মায়ের অভিষেক অনুষ্ঠানে গিয়ে তার মনে হয়ে খুবই বালখিল্য অনুষ্ঠান, কিন্তু এক অতিথির জরুরি সন্তান প্রসবে অলিভ ঠাণ্ডা মাথায় সাহায্য করে সবার সমীহ আদায় করে। সেই কথা কাউকে বলার জন্য সে অধীর হয়ে ওঠে। ছেলে ক্রিস্টোফারের সাথে তার সম্পর্ক অতি শীতল, তবু সে তাকে ফোন করে। ছেলে পাত্তাই দেয় না। অলিভ জানে, জ্যাকের প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হতো।

আগ বাড়িয়ে সবখানে নাকগলানো অলিভের স্বভাবে মজ্জাগত, পরচর্চাতেও সে আনন্দ পায়, কিন্তু তার মনে মায়া-দয়াও রয়েছে। মানুষ পরস্পরকে সাহায্য করলে উভয়ে যে সুফল ভোগ করে, এইসব নানান গল্পে সেটা ফুটে ওঠে। মৃত্যুপথযাত্রী এক অল্পবয়স্কা মহিলার মনে হয় তার সব বন্ধুরা তাকে ত্যাগ করেছে। অলিভ তার সাথে দেখা করতে যায় বলে সে কৃতজ্ঞ বোধ করে। কিন্তু অলিভ যখন তার কাছে জ্যাকের সাথে তার ঝগড়ার কথা বলে তখন মহিলার খটকা লাগে। তার মৃত্যু সমাসন্ন বলেই কি অলিভ তাকে এসব কথা বলছে? অলিভ উত্তরে বলে না, মোটেই সেজন্য নয়। তার সাথে এসব কথা বলতে সে কোন সঙ্কোচ অনুভব করে না, তাই সে বলেছে।

যখন লারকিন পরিবারের কাছে আমরা আবার ফিরে আসি তখন এক হৃদয়বিদারক কাহিনির ভেতর স্ট্রাউট একটি হৃদয়স্পর্শী সত্য আবিষ্কার করেন। ‘অলিভ কিটরিজ’-এ আমরা পড়েছি লারকিন বাড়ির পুত্র এক মহিলাকে ২৯ বার ছুরিকাহত করার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড লাভ করে। লারকিন বাড়ির মেয়ে সুজ্যান বড় হয়ে বাবার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ক্রসবি ফিরে আসে পারিবারিক উকিলের সাথে সাক্ষাত করতে। আমরা তার পারিবারিক ইতিহাসের আরো কিছু মর্মান্তিক ঘটনা সম্বন্ধে জানতে পারি। কিন্তু ওদের দুজনের কথোপকথনের পর আমাদের মন আবার অনেকটা শান্ত হয়ে যায় – যেমনটা সুজান ও তার উকিলও হয়। সেই কথোপকথন উভয়ের মনকে উজ্জীবিত করে, তাতে উভয়ের মন বেশ হাল্কা হয়।

‘আবার অলিভ’ বারবার সহনশীলতার সীমানা চিহ্নিত করে, মানবচরিত্রের বহুবিচিত্র প্রকাশের ওপর দৃষ্টিপাত করে – কখনো বেশ বলিষ্ঠভাবে। The End of the Civil War’ (‘গৃহযুদ্ধের দিনগুলোর শেষে’ )শীর্ষক একটি অধ্যায়ে এক দম্পতি ৪২ বছরের বিবাহিত জীবনে ৩৫ বছর পরস্পরের সাথে প্রায় বিনা বাক্যালাপে কাটিয়ে দিয়েছে। বাবার শখ গৃহযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রের ঐতিহাসিক অবস্থার পুনর্নিমাণ, আর কন্যার আগ্রহ এক বিশেষ ধরনের যৌন-অভিজ্ঞতায়, যেখানে নারী শক্তিরূপিনী বা dominatrix হয়ে ওঠে। লেখিকা এই দুই ধরনের অভিনয়ে বিস্ময়কর মিলের সন্ধান পান।

Poet’ (‘কবি’) অলিভের নিজেকে আবিষ্কার করবার বেদনাময় প্রক্রিয়া নিয়ে একটি অপূর্ব অধ্যায়। এটি (‘যে কোন কিছু ঘটতে পারে’ অধ্যায়ের মত) নিজের আদি শহরে একজন অধুনা বিখ্যাত লেখকের প্রত্যাবর্তন নিয়ে। এ্যান্ড্রিয়া ল্যরিউ অলিভের এক পুরনো ছাত্রী, বড় হয়ে এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় কবি হয়েছিল। স্থানীয় কফিশালায় ওর সাথে যখন অলিভের দেখা হয়, তখন সে তার পুরনো ছাত্রীর ছেলেবেলার কথা মনে করে। সে একটি ফরাসীভাষী কানাডিয়ান ক্যাথলিক পরিবারের সদস্যা, আট ভাইবোনের একজন। অলিভের মনে পড়ে সে কেমন মনমরা, একাকিনী ছিল, তার মধ্যে অলিভ বিশেষ সম্ভাবনা দেখতে পায়নি। পরে অলিভের সাথে খোলামেলা কথোপকথনের ভিত্তিতে এ্যান্ড্রিয়া তাকে নিয়ে যে কবিতা লেখে, সেটা কে একজন বেনামীতে অলিভকে পাঠায়, তখন এ্যান্ড্রিয়া কি নির্ভুল নিশানায় তাকে, তার একাকীত্বকে শনাক্ত করে সেটা লক্ষ করে অলিভ প্রথম প্রথম গ্লানিতে স্তম্ভিত হয়। তবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অলিভ উপলব্ধি করে যে – লেখিকার ভাষায় - ‘অন্যরকম, পর হয়ে সমাজে থাকার অভিজ্ঞতা কী, সেটা এ্যান্ড্রিয়া তার চাইতে বেশি ভালো বুঝতে পেরেছে।’

স্ট্রাউটের ব্যাপারে এটাই বিশেষ লক্ষণীয়: তার চরিত্রগুলো ভীষণ কষ্টের মধ্য দিয়ে যায় – স্বামী বা স্ত্রীর কাছে অত্যাচার, বাবা-মায়ের অবহেলা, বয়সবৃদ্ধির বিড়ম্বনা (এর মধ্যে স্বাধীনতা খর্ব হওয়া, প্রাপ্ত বয়স্কদের ডায়াপার পরার কথাও রয়েছে), হৃদয়-ছারখার-করা অসহ্য একাকীত্ব। কিন্তু  অদ্ভুত চারিত্রিক ঋজুতা রয়েছে এইসব মানুষের। অলিভ বড্ড কড়া আর একরোখা, কিন্তু সেও যদি বুঝতে পারে যে একটুখানি সহমর্মিতা পুরো চিত্রটি পালটে দিতে পারে, তাহলে আমরা পারব না কেন? ‘তোমার জীবন কেমন চলছে গো, বেটি?’ অলিভ বেটি নামের এক গৃহ স্বাস্থ্য সেবিকাকে জিজ্ঞেস করে। তার গাড়িতে একটা ছোট্ট স্লোগান দেখে সে বিরক্ত হয়েছিল, তবুও সে প্রশ্নটা করল। এই প্রশ্নটাই আসল জিনিস, সহমর্মিতার পথে প্রথম পদক্ষেপ। ‘আবার অলিভ’ আমাদের হৃদয়স্পর্শীভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, সহমর্মিতা ভালোবাসার পূর্বশর্ত। এতে জীবন আর অসুখী থাকে না।


একটি ছাগলের গল্প - পেরুমাল মুরুগান | নিউ ইয়র্ক টাইমসের পুস্তক সমালোচনা | আনুবাদঃ আশফাক স্বপন


সাম্প্রতিককালে ভারতে মুক্তবুদ্ধিচর্চা নানাভাবে হিন্দুত্ববাদীদের গণরোষের শিকার হয়েছে, এবং সেটা নিয়ে সেদেশের বুদ্ধিজীবী ও লেখকরাও সোচ্চার হয়েছেন। তামিল লেখক পেরুমাল মুরুগান আক্রান্ত হন কয়েক বছর আগে। তার সাম্প্রতিক উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সেটা নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ পুস্তক সমালোচনা।
ভারতের অন্যতম শীর্ষ মৌলিক ও বিতর্কিত ঔপন্যাসিক ফিরলেন এক শক্তিশালী উপকথা নিয়ে।

পারুল সেহগাল
অনুবাদ: আশফাক স্বপন
মূল রচনা:
One of India’s Most Original and Controversial Novelists Returns with a Powerful Parable
By Parul Sehgal
The New York Times, Dec. 11, 2019

The Story of a Goat
By Perumal Murugan
Translated by N. Kalyan Raman
183 pages. Black Cat. $16, paper.

লিঙ্ক
https://www.nytimes.com/2019/12/11/books/review-story-of-goat-perumal-murugan.html

গত বছর স্টকহোমে নোবেল পুরস্কারের অভিভাষণে পোলিশ লেখিকা ওলগা তোকারচুক সাহিত্যজগতের প্রতি দৃষ্টিপাত করে হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন: সাহিত্যে যে শক্তি ও সম্ভাবনা নিহিত, সেটা আজ কোথায় গেছে? সাহিত্য তার আপন অধিকারবলে আমাদের আটপৌরে জীবন থেকে ঘাড় ধরে টেনে এনে চিরন্তন সত্যের মোকাবেলা করতে বাধ্য করে, আমাদের ইতিহাস ও পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত করে। কী হল সাহিত্যের সেই অধিকারের? তার পরিবর্তে আমরা স্মৃতিচারণ আর আত্মচরিতের কোলাহলে বুঁদ হয়ে গিয়েছি – এ যেন ‘একক শিল্পীদের নিয়ে গঠিত সম্মিলিত সঙ্গীত’। উপন্যাসে উপকথার ব্যবহার আজকাল লোপ পেতে বসেছে বলে তোকারচুক দুঃখ প্রকাশ করেন। সাহিত্য আমাদের এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারে যেখানে সুতীব্র মরমী দরদের সাহায্যে আত্মকেন্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার একটা সুযোগ আসে, তাতে আমাদের চারপাশের জগৎ সম্বন্ধে সংবেদনশীলতার পুনর্জাগরণ ঘটে। তারও আজ বড় ক্ষয়িষ্ণু রূপ দেখে তিনি আক্ষেপ করেন।

স্বীকার করতেই হবে অবস্থা যে এতটা খারাপ আমার ধারণা ছিলনা। তবে হতাশ হবেন না, ওলগা তোকারচুক। আমার হাতের কাছেই রয়েছে অব্যর্থ মহৌষধ। ‘The Story of a Goat’ (একটি ছাগলের গল্প) পেরুমাল মুরুগানের সদ্য অনূদিত উপন্যাস। ২০১৫ সালে তার বহুবিশ্রুত ‘সাহিত্যিক আত্মহত্যা’-এর পর এটি তার প্রথম কাজ। দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী গুণ্ডারা ‘One Part Woman’ (এক ভাগ নারী) বইটি লেখার কারণে তাকে আক্রমণ করে। সেই উপন্যাসে একটি সনাতন মন্দিরের আচারের বর্ণনা রয়েছে। তাতে নিঃসন্তান নারীদের সন্তানলাভের আশায় অপরিচিত পুরুষের সাথে সহবাসের অনুমোদন রয়েছে। মুরুগানকে তার গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হয়, জোরপূর্বক তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। তিনি লেখালেখি ছেড়ে দেন। ফেসবুকে তিনি পোস্ট দেন: ‘লেখক পেরুমাল মুরুগান মৃত। তাকে রেহাই দিন।‘

আদালতের রায়ে তাঁর বাকস্বাধীনতার অধিকার রক্ষিত হয়। মুরুগান আবার কাজে ফেরেন, যদিও বেশ বড় একটা ঝাঁকুনিতে তিনি মানসিকভাবে বেসামাল হন। তিনি বলেন মানুষের সম্বন্ধে লিখতে তার অনীহা জন্মেছে (‘আমার ভেতরে একজন রক্তচক্ষু সেন্সর বসে আছে’)। তার প্রিয় বিষয়গুলো – জাতপাতের রাজনীতি, ক্রোধোন্মাদ জনতার ভয়ঙ্কর শক্তি – সেসব নিয়ে লেখার তো প্রশ্নই ওঠেনা।

ভাগ্যিস ছাগল ছিল!

লেখক পেরুমাল মুরুগান বহাল তবিয়তে আছেন, বরাবরের মতই নির্ভীক। গ্রামীণ জীবনের আরেকটি উপকথা নিয়ে তিনি ফিরেছেন। তারঁ লেখনভঙ্গির আপাতসরলতা স্তম্ভিত করে। তামিল থেকে অনুবাদ করেছেন এন কল্যাণ রমণ। এই উপন্যাসে গাত্রবর্ণ আর জাতপাতের ভিত্তিতে অত্যাচার, সরকারী নজরদারী, নারীর লাঞ্ছনা – এই সব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, তবে সবটাই সুচতুরভাবে লুকানো হয়েছে একটি অসুখী ছোট্ট ছাগলের জীবনবৃত্তান্তের অভ্যন্তরে।
সমগ্র সাহিত্যে পুনাচির মত অভাগা জীব পাওয়া যাবে কিনা বলা ভার। সে তার মায়ের সপ্তম ও সবচেয়ে ছোট্ট সন্তান। মায়ের জরায়ু থেকে বেরিয়ে যখন সে ভূমিষ্ঠ হয়, তখন সে ফুলের মত ভঙ্গুর, বর্ণে নিকষ কালো।

এক বুড়ো চাষী ও তার স্ত্রী তার পালনের দায়িত্ব নেয়। তারা অবাক হয়ে লক্ষ করে, তাদের নিস্তরঙ্গ গৃহকোণ যেন নতুন ঊষ্ণতা আর প্রত্যয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লেখকের ভাষায়: ‘স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বহুদিন এত মধুর গল্পগুজব হয় নি। তাদের জীবনে ছোট্ট ছাগলের আবির্ভাবের ফলে তারা এখন পূরনো দিনের গল্প করে।’ তারা ছাগলটিকে খাইয়ে দাইয়ে নাদুস-নুদুস করে তুলল, তারপর নিজেদের ছাগলের পালের সাথে তাকে ভিড়িয়ে দিল। ছাগলটি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। সে সব কিছু খেয়াল করে, সহজে রাগে না। তার পেটটা নিয়ে সে সঙ্কোচ অনুভব করে। জীবনের শুরুতে ক্ষুধার কারণে তার পেটটা বড়। তার গায়ের লোমের জটা নিয়েও সে বিব্রত। ছোট বাচ্চার মত সে বুড়ো-বুড়িকে আকঁড়ে থাকে।

সাহিত্যে এর কৌলিন্য যাই থাক, জীবজন্তুর গল্পের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার সমালোচনা করবার এই পরম্পরাটি নিয়ে বরাবরই আমার সংশয়। ‘বাচ্চা ছাগল’ কথাটা আমার মগজে যেভাবে আঘাত করে তাতে আমি বেশ বিরক্ত হই। তবে কিনা মুরুগান কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত আপন পরিবারের ছাগলের দেখভাল করেছেন, তাই প্রাণীর জীবন (মৃত্যু, যৌন আকাঙ্ক্ষা, অসুয়া) নিয়ে তার লেখায় বিন্দুমাত্র অতিনাটকীয়তা নেই। তিনি এইসব প্রাণী দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। তিনি জানেন বাচ্চা ছাগল যখন প্রথম মাতৃস্তন্য থেকে দুগ্ধপান করে, তখন তার চোয়াল ব্যথা করে। রাতের অন্ধকারে কেউটে সাপের গা থেকে কী গন্ধ বের হয় সেটাও তিনি জানেন।

এক ধরনের পাঠক আছে যারা এই পুস্তক সমালোচনার এতখানি পড়বার পর খানিকটা অন্যমনস্ক, কিছুটা অস্বস্তিতে পড়বেন। ভাবেন, ঈশ এই ছোট্ট ছাগলের বাচ্চাটিকে কী অনেক কষ্টভোগ করানো হয়েছে? যদি খুব কষ্টভোগ করানো হয়ে থাকে, তাহলে কী দরকার এমন গল্প পড়ার? কেন দুঃখ-কষ্ট দেখার জন্য সাহিত্যের কাছে যাওয়া? এই প্রশ্নের উত্তর ‘একটি ছাগলের গল্প’ এতটা সৌকর্য, রসবোধ আর দরদের সাথে দিয়েছে যার তুলনা আমি নিকট অতীতের কোন বইয়ে পাইনি। আসলে আমরা এসব গল্পের কাছে যাই সততার মধ্য দিয়ে স্বস্তির অণ্বেষণে; যা লুকানো, সেটা আলোয় কীভাবে আসে সেটা দেখার জন্য। আমাদের আশেপাশে কত জীবন, সেসব এতই অকিঞ্চিতকর যে তা মহৎ সাহিত্যের বিষয়বস্তু হতে পারে না। সেইসব জীবন অহরহ বেদনায় জর্জরিত হচ্ছে, সেই সত্যটি – হয়ত শুধু এখানেই – স্বীকার করার জন্য আমরা এসব গল্পের কাছে ছুটে আসি।

ছোট্ট ছাগলটার কী কষ্টটাই না ভোগ করতে হয়! তার সঙ্গীদের যৌনক্ষমতা লাভ করতে না করতেই পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা হয়। সে প্রেমে পড়ে। (মুরুগান ছাগলের রতিক্রিয়ার একটি অস্বস্তিকর রকমের ভাল বর্ণনা দিয়েছেন।) বুড়ি চাষীবৌ কিছুতেই তার পোষা ছোট্ট ছাগলের সঙ্গ ছাড়বেন না, অথচ পুনাচিকে তার প্রিয়তম থেকে আলাদা করা হয়। সে তার মানুষ-মায়ের ওপর রাগে টগবগ করে। তাকে সহিংসভাবে সন্তানসম্ভবা করা হয়। এদিকে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

এই সমাজের নানান অদ্ভত লক্ষণ গল্পে প্রবেশ করতে শুরু করে। মানুষ বা জন্তু – প্রতিটি নতুন সন্তানের হিসেব রাখতে হয়, এবং তার কর্ণ সূচিবিদ্ধ করতে হয়। চাষা ও রাখালদের জন্তুর বাবা-মা কে এই বিষয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে যাদের কালো ছাগল রয়েছে। কালো ছাগলের প্রতি বিশেষ বিরাগ। ২০১৬ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটিতে ভবিষ্যতদ্রষ্টার সুর রয়েছে। ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইন অভিবাসীদের অধিকারদানের ক্ষেত্রে তাঁদের ধর্ম বিবেচনা করে, যা কার্যত দেশটিকে একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী দেশে পরিণত করেছে। এই উপন্যাসটি যেন আগে থেকেই সেটা আঁচ করতে পেরেছে।

চেকভের স্বচ্ছদৃষ্টি নিয়ে মুরুগান তার ছোট্ট ছাগলটির গোটা জীবন অনুসরণ করেন – তার হতাশা, তার ছোট ছোট বীরত্বের ঘটনা, তার আকুতি। রমণের সুষ্ঠু অনুবাদে প্রতিটি বাক্য আতিশয্যমুক্ত, সুগঠিত ও পরিষ্কার। কিন্তু এই আপাতসরল বাক্যগুলোর মধ্যে নিহিত রয়েছে বৃষ্টি, রাজনীতি, মানুষের আচরণ – এই সবকিছুর খামখেয়ালিপনা সম্বন্ধে এক গভীর প্রাজ্ঞ উপলব্ধি, সেটা আমরা কীভাবে যেন বুঝতে পারি। চেকভই তো একবার বলেছিলেন যে সক্রেটিসের জীবনী যে কেউ লিখতে পারে, কিন্তু এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অজ্ঞাতনামা মানুষ, এদের গল্প বলতে গেলে মুনশীয়ানা প্রয়োজন।

‘একবার, একটি গ্রামে, এক যে ছিল ছাগল।’ এভাবে বইটির শুরু। ‘সাধারণ একটি প্রাণির জন্ম কোন চিহ্ন রেখে যায় না, যায় কী?’ মুরুগান আমাদের কাছে এই সত্য প্রকাশ করেন যে আমরা সবাই এই রকম সাধারণ প্রাণী। যদিবা আমাদের কোন পলাতক চিহ্ন রয়েই যায়, সেটা আমরা একে অপরের কাছে সমর্পণ করে যাই।
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট