বই-বাই - নবনীতা দেব সেন


বই-বাই
নবনীতা দেব সেন

মাঝে মাঝে আমাকে প্রশ্ন করা হয়, “কেমন করে আপনি এই বই লেখার পথে এলেন?”

(যেন এটা বিপথগমন!) উত্তর খুব সোজা, অন্য কোনও পথও যে হয়, সেটাই জানা ছিল না ছোটবেলাতে।” বাড়িটা ছিল বই-বাড়ি। বাবার পাঠশালা সম্পাদনা আমার খুব ছোটবেলায় বেশ জমজমাট ছিল—সারাদিন বাড়িতে অল্পবয়সি লেখক-লেখিকাদের আনাগোনা। বাণ্ডিল বাণ্ডিল গল্প-কবিতা আসত হাতে, ডাকে—সকলেরই একমাত্র আশা ও উদ্দেশ্য লেখক হওয়া। এ তো ছোটরা। আর বড়রা? বড়দের রোজ রোজ বই বেরুত। আর সেসব বই তারা এনে বাবা-মা-র হাতে তুলে দিতেন, আর বাড়িতে উৎসব পড়ে যেত। আমাদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল যাদের তারা প্রত্যেকেই বই লেখেন। যারা বাস করেন, অর্থাৎ মা এবং বাবা, তারা প্রত্যেকেই বই লেখেন। আমি তো ভাবতাম বড়রা সকলেই বই লেখেন। যারা ট্রাম-কন্ডাকটর, বা রিকশাওলা হতে পারেন না, তারা হয় ইশকুলের মিস্ হন, নইলে লেখক। নিজে দুটোই হয়েছি, মাস্টার এবং লিখিয়ে। এবং বই-বাতিকটা বাবা-মা দুজনেরই ছিল। রক্ত বেয়ে এসে গেছে আমার মধ্যেও। কী করা!

বাড়িতে যারা আসতেন তাদেরও যে বই-বাতিক। পুলিনবিহারী সেন, অমল হোম, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন রায়, প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত, প্রত্যেকেই বইবায়ুগ্রস্ত। কেউ কেউ বই লেখেন, কেউ কেউ বই জমান। কেউ দুটোই। আর একটু বড় হয়ে যেখানে খেলতে যেতুম আর তার পরে পড়তে যেতুম সেই কবিতা-ভবন আর এক বই-বাড়ি। বুব.র বই কেনা বাতিক ছিল। আর এক বন্ধুর বাবা, বিষ্ণু দে-রও বই এবং রেকর্ড কেনা বাতিক ছিল। পুলিনকাকু তো বই তুলে নিতেও পারতেন নিষ্পাপ হৃদয়ে। বাড়িতে কোনও বই খুঁজে না পেলে মা বলতেন—একটু পুলিনবাবুর বাড়িতে খোঁজ নাও।” লজ্জা লজ্জা হেসে পুলিনকাকু অধিকাংশ সময়েই ফেরত এনে দিতেন। যে বার ফেরত দিতে পারতেন না, সেবার রেগে যেতেন, অতি-দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ ছিল। আমাদের কপিটা উধাও হয়ে গিয়েছিল অনেক দিন। মা শেষে ভয়ে ভয়েই একদিন পুলিনকাকুর কাছে প্রসঙ্গটি পাড়লেন। লাজুক লাজুক হেসে পরদিন বই-বগলে পুলিনকাকু এসে উপস্থিত। মা-র সে কী আহ্লাদ! দেবরপ্রীতি উপচে পড়ল।

বই আমার বাল্যকালে, আমাদের ছোট সংসারে, সবচেয়ে মূল্যবান, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। বইয়ের চেয়ে জরুরি কিছুই ছিল বলে মনে পড়ে না। বাবা নিয়মিত বই গুছোতেন, বই বাধাতেন, বই ঝাড়তেন, বই রোদে দিতেন, বই খুঁজে বের করতেন, বইয়ের হিসেব রাখতেন। কোথায় কোন বই আছে অত হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে বাবা মুহূর্তে বলে দিতে পারতেন। মাসিকপত্র থেকে ভালো ভালো প্রবন্ধ, গল্প কেটে কেটে বাবা-মা আলাদা আলাদা বই বাঁধাই করে রাখতেন। প্রচুর ছবিও মাসিকপত্র থেকে কেটে কেটে গুছিয়ে রেখেছিলেন, অ্যালবাম বাধানো হয়ে ওঠেনি। দুই ড্রয়ার ভর্তি ছিল অমূল্য সব ছবি। শতীশ সিংহ, হেমেন মজুমদার, পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, নন্দলাল, অবনীন্দ্রনাথ। জানি না সেসব কী হয়েছে। আমি বড় হয়ে সেসবের যথার্থ মূল্য বোঝার আগে বিশ বছরের বিদেশ চলে গেছি—বাবা-মার বয়স বেড়েছে, ক্ষমতা কমেছে, কমেছে হয়তো টানও, অত যত্নের ধন এলোমেলো হয়ে উড়ে-পুড়ে গিয়েছে। এখন কেদেও পাবে না তাকে...।

বাবার সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল না। মা ছিলেন আমার বন্ধু। বাবা ছিলেন বিশ্বের বন্ধু। সংসারে অতিথিমাত্র। বাবার সংসার ছিল তাঁর বই। বিয়ের অনেক আগে থেকে তার প্রথম প্রেম—বই। মায়ের নিজস্ব প্রিয় বস্তু ছিল অতি সুদৃশ্য রঙিন লাল বাদামি সবুজ চামড়ায় বাঁধাই, সোনার জলে নামে লেখা এক কাঠের আলমারি রবীন্দ্রনাথের বই। প্রথম সংস্করণ— অধিকাংশই মাকে বাবার উপহার—যেদিনই বেরুত, সেদিনই বাবা মাকে বইটি সযত্নে উপহার পাঠিয়ে দিতেন। বিয়ের আগের এই মধুর আচারটি বাবা বিয়ের পরেও নাকি চালু রেখেছিলেন।

প্রচুর ইংরিজি, ফরাসি, জার্মান সাহিত্য, ফোটোগ্রাফি ও ফিল্মবিষয়ক বাধানো জার্নাল ছিল বাবার। বাবাকে আজকাল আমি অনেকটা চিনতে পারি, যখন বইগুলো নাড়ি-চাড়ি। বাবার আধুনিক মন, উদার বিশ্ববীক্ষা, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা—সবই এখন আমার পরিণত চোখে ধরা দেয়, খুব মন কেমন করে। আমার বাবার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। কলকাতায় যত জনেরই বা ছিল? বাবা সুপুরুষ, বাবা বৈঠকী মেজাজের, উদার, পরোপকারী, কৌতুকপ্রবণ, অজাতশত্রু, সফল, সৎ, নির্লোভ শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন—সকলের মুখে তাই শুনেছি। জীবনে তাই দেখেছি। কিন্তু আর যা-কিছু দেখিনি তা এখন দেখতে পাচ্ছি, বইয়ের চয়নে। বইয়ের ধারে ধারে মার্জিনে মন্তব্য করা তার স্বভাব ছিল না। (মা করতেন মাঝে মাঝে—রেগে গেলে!) দাগ দিয়ে বই পড়তেন না বাবা—পেজমার্ক দিয়ে রাখতেন। শীতের কাপড় রোদে দেওয়া, বড়ি দেওয়া, আচার দেওয়া এসব যেমন মা-র ডিউটি ছিল, বাবার ডিউটি ছিল বই রোদে দেওয়া, বইতে গ্যামাক্সিন পাউডার দেওয়া। মা-র তো ঠিক আমারই মতন বইয়ের ধুলোতে অ্যালার্জি ছিল। মা বই ঘাটতে পারতেন না। আমিও পারি না—তবু ঘাটি। কেননা বই না ঘেটে উপার্জন হবে না আমার। অ্যান্টিহিস্টামিন খেয়ে লাইব্রেরির স্ট্যাকে যেতে হয় নাকে রুমাল বেঁধে। তবুও হাঁচি, তবুও প্রাণান্ত রুদ্ধশ্বাস।

বাবার বই-প্রীতি আমাকে প্রথম চমক লাগাল লন্ডনে। নেহাত বালিকা-বয়েসে, ১৯৫০-এ। বাবার সঙ্গে মা আর আমি লণ্ডনের 'ফয়েলস্‌'-এ গেলাম। Fpyles তখন ওখানে সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান। কোনো বইয়ের দোকান যে এত বড় হতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। বাবা তো সেখানে গিয়ে ক্ষেপে গেলেন। একটা অংশে গিয়ে দেখা গেল রবীন্দ্রনাথের বইয়ের ম্যাকমিলানের প্রথম সংস্করণ পড়ে আছে কিছু কিছু। যা যা দোকানে ছিল, বাবা সবই কিনে ফেললেন, মনে আছে দু-একটি বই ছিল সেকেন্ডহ্যান্ড। সেগুলিও ওই একসঙ্গেই রাখা। যৎসামান্য মূল্যে সেই অমূল্য সম্পত্তি সংগ্রহ করে বাবা-মা দুজনেরই সে কী উত্তেজনা। রাস্তার ওপারেও আরও একটা Foyles-এর দোকান ছিল। একটা বইয়ের দোকান যে দুটো বিশাল বাড়ি জুড়ে রাজত্ব করতে পারে, তা কলকাতার বালিকাটি কেন, সম্ভবত তার বাবা-মায়েরও ধারণা ছিল না।

তারপর অবশ্য বিশাল বিশাল বই সাম্রাজ্য দেখেছি আমেরিকাতে। আমেরিকাতে পড়তে গিয়ে শুনলাম ম্যাকগ্র হিল-এর বইবিপণি নাকি বিশ্বের বৃহত্তম। সত্যিমিথ্যে জানি না, গিনেস রেকর্ডস-এর বইই জানে। তবে হ্যা, বিপুল কাণ্ডকারখানা—তাতে সন্দেহ নেই। আমার অবশ্য বার্নস অ্যান্ড নোবল-এর বহুতল মোহিনী বইয়ের দোকানে নিউ ইয়র্ক ভ্রমণের অনেকটা সময় কেটে যেত এককালে। ঈর্ষায়, বিস্ময়ে, আনন্দে আর আর্থিক অক্ষমতার জন্য কী শোক উথলে ওঠে এইসব বইয়ের দোকানে গেলেই! এখন তো কিছু নিজের ঘরে, আর কিছু খুঁজলে পাবেন আপনার ঘরেই হয়তো। (মন, না মতি। বই দেখলেই কুমতি!) আজকাল সবারই র্কাধে ঝোলা-ব্যাগ, পুলিনকাকুর মতো। তবে সবাই সংগৃহীত বইগুলি নিজের ঘরেই নিয়ে জমিয়ে রাখেন না, কেউ কেউ ফুটপাথে বেচে দিয়ে ফুচকা খান।

আমি তখন বছর দশেকের, পুলিনকাকু একদিন এসে ভীষণ গোলমাল শুরু করে দিলেন। বউদি, দেখুন আপনার গুণবতী কন্যার কীর্তি। এখন থেকেই কলেজ স্ট্রিটে বই বেচে চানাচুর খাচ্ছে!” আমি তখন জানিও না কলেজ স্ট্রিট কী বস্তু! মা ছুটে এলেন। এত অপমানে আমি কাদব কি কাদব না মনস্থির করতে পারছি না—স্বভাব-ছিচকাদুনে হলে কি হবে। এটা যে বড়ই বিস্ময়কর বিস্ফোরণ! পুলিনকাকুর ঝোলা থেকে বেরুল ছোটদের গল্প সঞ্চয়ন—উপহার-পৃষ্ঠায় লেখা কল্যাণীয়া নবনীতার চতুর্থ বার্ষিক জন্মদিনে আশীর্বাদ। মা বাবলা। বইটি আমার কাছে অবশ্য এখনও আছে। (অন্তত আমার আজ পর্যন্ত তাই ধারণা।) কিছু দিন আগে আমার এক প্রাক্তন ছাত্র আমায় তিন খণ্ড বার্ষিক শিশুসাথী উপহার দিয়ে গেছেন। প্রত্যেকটাই যত্নে বাঁধানো। সোনার জলে নিবনীতা দেব” লেখা। ভিতরে বাবা-মা-র অশীর্বাদী স্বাক্ষর। সেগুলি গোলপার্কে বিক্রি হচ্ছিল।

বই চুরির প্রসঙ্গে বলি, আমার বাবার একটা লােহার লম্বাটে সরু সিন্দুকমতন বাক্স ছিল, যেটা দেখলেই আমার মনে হতো একটি শিশুর কফিন। বাবা সেটি যক্ষের ধনের মতো আগলে চারতলার ঘরে তুলে রাখতেন। বিয়ের সময়ে, বাবা সেটি আমাকে উপহার দিলেন। দুরুদুরু চিত্তে খুলে দেখি লম্বা বাক্স ভর্তি এক সেট বই। অমর্ত্য খুলে লাফিয়ে উঠলেন—(১৯১১-এর এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা! যেটি যে-কোনো বইপ্রিয় মানুষের স্বপ্ন। এখনও পর্যন্ত যতগুলি এডিশন বেরিয়ে ছিল—লেখকতালিকার বৈশিষ্ট্যে ওইটি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ! সম্ভবত এখনও। অনেক দিনই বিশ্বের দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের বই-বাজারের তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে। জামাইকে দেওয়া হীরের আংটিতে জামাইয়ের কোনও উৎসাহ ছিল না। কিন্তু এই কিভূত লোহার বাক্সটি পেয়ে তার আহ্লাদ ধরে না। এটি অবশ্য বাবার বাড়িতেই রইল। আমরা চলে যাচ্ছি কেমব্রিজ। বাবার চেয়ে ভালো জিন্মাদার আর পাব কোথায়?

কথাটা কত সত্যি, জানা গেল আমি যখন ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে এলুম, বরের কাছে হ্যাটা খেয়ে। কিছুকাল আগেই বাবা আর শ্বশুরমশাই হাত ধরাধরি করে তিন হপ্তার মধ্যেই স্বর্গে রওনা দিয়েছেন। তারা আর খুকুরানির প্রত্যাবর্তনটি দেখে যেতে পারেননি। ফিরে এসে তো প্রথম চাকরি-বাকরি শুরু করেছি, এনসাইক্লোপিডিয়া প্রায়ই কাজে লাগে। মাঝে মাঝে বের করতে হয়। আবার বাক্সতে ভরে রাখি। সেই সময়ে আমাদের বাড়িতে প্রফুল্ল নামক অতি প্রফুল্লবদন এক রাধুনী ছিল। তার ভাই নাকি রান্না করে আলিপুরে। আলিপুরে, কোথায়? —সেন্ট্রাল জেলে। শুনে তো আমাদের মাথায় হাত। তখন বাচ্চারা ছোট, মা-ও হঠাৎ খুব ভেঙে পড়েছেন, আমিও ব্যস্ত নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে। নিশ্চিত কিছু গর্হিত অবহেলা ঘটেছিল। ওপরে গিয়ে একদিন দেখি চারতলার ঘরের সিলিং-ছোওয়া বইয়ের তাকগুলি প্রায় শূন্য। আর লোহার কফিন বাক্সটা অদৃশ্য। এখন বুঝি, প্রফুল্ল পরচাবি করিয়ে নিয়েছিল। ওপরের ঘরে শরৎচন্দ্রের সব সই করা রাধুকে বড়দা বইগুলি, বাবাকে-মাকে উপহার দেওয়া তাদের অন্যান্য লেখক বন্ধুদের স্বাক্ষরিত যত বই সযত্নে রক্ষিত ছিল চাবিতালার মধ্যে, যাতে কেউ বেড়াতে এসে হঠাৎ অতিরিক্ত ঐশ্বর্যে মণ্ডিত হয়ে ফিরে যেতে না পারেন। কিন্তু এমন কথা কেউ ভাবিনি!

আমার ছোটবেলাতে সর্বক্ষণই বাড়িতে নতুন নতুন বই আসত। লেখকরা স্বহস্তে আনতেন। মা-বাবার সঙ্গে আনন্দ করে সেসব বই আমিও নাড়াচাড়া করেছি। নতুন বইয়ের ভিতরে কী আছে তা সর্বদা জানার অধিকার ছিল না আমার, বড়দের বই পড়া বারণ ছিল। কিন্তু ছোয়া তো বারণ ছিল না? নতুন বইয়ের ঝক্ঝকে মলাট, ভিতরে ছবি আছে কিনা খুঁজে দেখা, বইয়ের গন্ধ, নতুন কাগজের ফরফরানি—সবই মুগ্ধ করত। লেখকদের স্বাক্ষর যে বইতে থাকবেই, এটাই যেন স্বভাবসিদ্ধ বলে ধরে নিয়েছিলুম বাল্য-কৈশােরের কাঁচা অভিজ্ঞতায়। আমার বিয়েতে তারাশংকর তাঁর সমস্ত বইয়ের পুরাে সেট সই করে উপহার দিয়েছিলেন। আমার মেয়ের বিয়েতে সেই মূল্যবান আশীর্বাদ দিয়ে গেছেন গজেনকাকাবাবু। লেখকরা শুধু নাম সই করা বইই তো দেবেন। সেটাই তো সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। সময় গেলে তার দামটা হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

এই নাম সই করা বইয়ের কিছু গল্প আছে। আগে প্রফুল্লরটা সেরে নিই। আমি তো আছড়ে পড়লুম কবি-বন্ধু আয়ান রশিদ খানের কাছে। তখন তিনি ডি.সি.ডি.ডি। রসিদ দু-দিন সময় চাইলেন। তারপর উনত্রিশ খণ্ড বই উদ্ধার করে এনে দিলেন বিজয়গর্বে—স্থানে স্থানে ক্ষতি হয়েছে, নষ্ট হয়েছে, মরক্কো চামড়ার মলাটগুলি ছিড়ে নেওয়া হয়েছে কয়েকটি বই থেকে, সঙ্গে উড়ে গেছে কিছু পৃষ্ঠাও। এবং পাওয়া যায়নি লোহার বাক্সটা। যেন ধর্ষিত হয়ে নিরাবরণ হয়ে মেয়ে ঘরে ফিরল ক্ষতবিক্ষত শরীরে। বাবার অত সাধের সম্পত্তির যথাযথ যত্ন আমি করতে পারিনি, রশিদের কল্যাণে ফেরত পেয়েছি এই যথেষ্ট।

সই করা বইয়ের গল্প বলব বলছিলুম। ১৯৯৩-তে টুম্পার কাছে গেছি কেমব্রিজে—ম্যাসা চুসেটুসে তখন বসন্তকাল। হঠাৎ অফিস থেকে মেয়ে বাড়িতে ফোন করে বললে—মা, শিগগির চলে এসো Waterstone-এ, বিকেল ৫টার মধ্যে। Isabella Allende আসবেন, তার নতুন বই সই করবেন, আর পাঠ করবেন। দুটো টিকিট জোগাড় করছি।` গিয়ে হাজির হলুম—কী আশ্চর্য ভিড়,—কত মানুষ যে টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন!—(টিকিট কিনতে হয়নি, সংগ্রহ করতে হয়েছে সময়মতো।) খুব নাটকীয় প্রবেশ হল, মহিলার এক্কেবারে কাটায় কাটায় সাড়ে পাঁচটায়। চমৎকার মানুষ—সুন্দরী আর খুব সুন্দর করে কথা বললেন। বই থেকে অংশ পড়ে শোনালেন। আমাদের মন মুহূর্তে জয় করে নিলেন। বই বিক্রি হতে থাকল ঝালমুড়ির ঠোঙার মতন। তিনি সই করলেন আবার কথা বলছেন হাসিমুখে। আমরা তিনজনের নামে (অন্তরা, নন্দনা, নবনীতা) তিনটি বই সই করালুম। তাতে বিন্দুমাত্র অধীর না হয়ে সযত্নে প্রত্যেকটি নামের বানান জেনে এবং কে কী করি, কোথায় বাসা—প্রশ্ন করলেন। দীর্ঘ ক্রেতার কিউ, তাই আটকে না রেখে আমরা সরে গেলাম। ইসাবেলা বললেন—তুমিও লেখিকা, অথচ তোমার সঙ্গে আমার কথা বলাই হল না! তোমার বই কই?'—আমার আবার বই কোথায়, ইংরিজিতে? ইসাবেলার বই-সই যে দোকানে হয়েছিল, বস্টন শহরে এখন সেইটে সবচেয়ে বড় বই-বাজার। Waterstone নতুন খুলেছে, প্রাসাদোপম বাড়ি জুড়ে শুধু বই। ইংলন্ডের WH. Smith শুনেছি এর মূল মালিক।

আমেরিকাতে বইয়ের দোকান একটা আলাদা কালচার। তার আলাদা চরিত্র। অনেক বইয়ের দোকানের মধ্যেই কাফে থাকে। সেই কাফেতে মাঝে মাঝে সাহিত্যিকরা তাদের লেখা পাঠ করে শোনান। কখনও তা টিকিট কেটে, কখনও বা ফ্রি। ১৯৯১-তে সিয়াটুল শহরের বিখ্যাত বইয়ের দোকান 'এলিয়ট বে বুকস্টোরে আমার কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেটা হয়েছিল টিকিট কেটে। আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলুম ভিড় দেখে। কে বা আমাকে চেনে, সামান্য কজন বঙ্গসন্তান—বাকি সকলেই কৌতুহলী বিদেশি। আমার কবিতার অনুবাদ করেছেন ক্যারোলিন রাইট, তিনিই এর ব্যবস্থাপনা করেছিলেন। আমি বাংলা পড়ব, ক্যারোলিন সঙ্গে পড়বেন তার করা ইংরিজি অনুবাদ। এত যে প্রচুর শ্রোতা হবে আমি বা ক্যারোলিন কেউই ভাবতে পারিনি। আমার বস্টন থেকে সিয়াটুল দীর্ঘ পথ যাতায়াতের প্লেন-ভাড়া তারা দিতে পেরেছিলেন, এবং ক্যারোলিন স্থানীয় মানুষ, তাঁকে কিছু দক্ষিণাও। অথচ কোনও আর্থিক লাভ দোকানের হয়নি। আমার তো কোনও বইই নেই, যা তারা বিক্রি করতে পারেন। শুধুই একটি multicultural experience মাত্র। ভালো বইয়ের দোকানি হিসেবে মালিক যুবকটি মনে করেন এতে তার উৎসাহ দেওয়া কর্তব্য। আমাদের দেশে এখনও এভাবে চিন্তা করা হয় না। Ellient Bay Bookstore আমাকে একটি শক্তপোক্ত থলি উপহার দিয়েছিলেন, বই বহনের পক্ষে আদর্শ। ওদেশে বহু বইয়ের দোকান এবং প্রকাশকের এরকম শক্তপোক্ত সুদৃশ্য ক্যানভাসের থলে প্রস্তুত করেন, বিজ্ঞাপন হিসেবে। বই-প্রিয়দের নামমাত্র দামে বিক্রি করেন। বার্নস অ্যান্ড নোবেলস-এর থলি কী সুন্দর দেখতে। নন্দনার হোটন মিফলিন কোম্পানির থলিও ভারি সুন্দর।

১৯৯৪ গ্রীষ্মে আর একবার। এবার নন্দনা, অন্তরা, ক্যারােলিন তিনজনকেই নিয়ে শহরের একটি ছোট বইয়ের দোকান Discount Books-এ গেলুম। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখেছি Erica Jong ওখানে তার নবতম বই Fear of Fifty সই করবেন ও বক্তৃতা দেবেন। এরিকা য়ঙের সম্পর্কে যা ধারণা ছিল, দেখে তা কিন্তু একটু বদলাল। Fear of Flying-এ যে অসামান্য কৌতুকপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত আচরণে তার মধ্যে সেটা দেখিনি। বইটি থেকে যেসব অংশ পড়লেন, খুবই ভালো লাগল অবশ্য। কিন্তু সই করানোর সময়ে (যদিও এটা আমেরিকায় তার নতুন বইয়ের Promotional tour-এর এই প্রথম দিন, উদ্বোধনী সভা—অথচ বিশেষ ভিড় হয়নি।) তাকে খুব মিশুক বলে মনে হল না।

আমেরিকাতে এই Promonotional tour ব্যাপারটি চমৎকার। প্রকাশক লেখককে নিয়ে ঝটিকা-সফরে বেরোন এক শহর থেকে আর এক শহরে। দোকান থেকে দোকানে। নতুন বইটি থেকে পাঠ, প্রশ্ন-উত্তর, বই-সই, বই-বেচা। বইয়ের দোকানগুলি ব্যবসার খাতিরেই সংস্কৃতিচর্চার একটা জরুরি দিকের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে, লেখক ও পাঠককে মুখোমুখি আনা। আজকাল আমাদের কলকাতার বইমেলায় এ ধরনের দু-একটি সভা-সমিতি হয়। বই-উদ্বোধন ইত্যাদি ঘটে। এখনও অবশ্য বাংলা বই উদ্বোধনের Publishers Party হয় বলে শুনিনি।

ভারতীয় লেখকদের মধ্যে Promotional tour-এ বেরুতে দেখেছি কেবল স্যুটেবল বয়’কে। অমিভাতও গিয়েছেন কিনা, জানা নেই। কিন্তু বিক্রমের বেলায় আমি বিদেশে ছিলাম, ইংলন্ড, ইতালি ফ্রান্সের কাগজে তার ছবি, ট্যুরের বর্ণনা ও সাক্ষাৎকার পড়েছি। দিল্লিতে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে তার একটি পাঠ-সভাতেও যাবার সুযোগ হয়েছিল, যেটা হয়তো বই-বিক্রি সম্পর্কিত না হলেও নতুন বই-প্রকাশ সম্পর্কিত সভা। বাংলা বইয়ের বেলায় এ ধরনের কিছু হয় কি? বইমেলাতে মাঝে মাঝে বই-সইয়ের ঘটা অবশ্য দেখেছি এ-দোকানে সে-দোকানে। কিন্তু মেলার প্রাঙ্গণের বাইরে বই প্রকাশের উপলক্ষে উৎসবের বা সভার বিশেষ চল নেই এদেশে। এমনি এমনি কবি সম্মেলন হয়, কত গল্পপাঠের আসর বসে। কিন্তু কোনও নতুন বই প্রকাশের উপলক্ষে শুধু সেই লেখককে নিয়েই একটি সভা—এ ট্রাডিশন এখনও এদেশে শেকড় গাড়েনি। বইয়ের প্রচারের জন্যই এই সভা জরুরি, পাঠক-লেখক মুখোমুখি পরিচিতির এই সুযোগ দুজনের পক্ষেই লাভ ও আনন্দজনক (আর প্রকাশকের পক্ষেও বটে)।

বই-সইয়ের ব্যাপারে আর একটা ঘটনা মনে পড়ল। অনেক বছর আগে আমার দুজন বন্ধুর সঙ্গে নিউ ইয়র্কের পথে হেটে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি দীর্ঘ সর্পিল এক লাইন দিয়ে মানুষেরা দাড়িয়ে আছেন। লাইনের মুণ্ডু একটি ছোট বইয়ের দোকানের ভিতরে। লেজ রাস্তার মোড় ঘুরে গেছে। কী ব্যাপার? লিভ উলম্যান তার আত্মজীবনী সই করছেন। ইঙ্গমার বার্গম্যানের প্রাক্তনী প্রেয়সী এবং নায়িকা—কে না তাকে দেখতে চায়—আমরাও দাড়িয়ে পড়ি। কিন্তু বেলা বাড়তে থাকে। খিদে পেতে থাকে। সাধারণত এসব কিউয়ের আশপাশে ম্যাজিকের মতো হটডগ-কোকাকোলার স্ট্যান্ড নিয়ে বিধাতা পুরুষ চলে আসেন। কিন্তু সেবারে এলেন না। আমাদের শেষ পর্যন্ত পেটের দায়ে লাইন ত্যাগ করতে হল। তাড়াহুড়োয় অল্প কিছু খেয়ে ফিরে এসে দেখি সব শুনশান। কী হলো? এত শিগগির লাইন খতম? না, লাইন ফুরোয়নি, আগেই সই খতম। তার সময় ছিল বাধা, দু-ঘন্টা। সেই দু-ঘন্টা ফুরিয়েছে, পাখিও উড়ে গেছেন। তিনি আসার অনেক আগে থেকেই লাইন বাধা শুরু হয়েছিল। দোকানের জানলায় লিভ উলম্যানের ছবি, বইয়ের জ্যাকেট, সময়, বিজ্ঞাপন। সেই দেখেই পথচারী বই ক্রেতার ওই ভিড় হয়েছিল।

বস্টনে নিউবেরি রোডে হার্ভার্ড কাফে বুক স্টোর বলে এক দোকানে বইও বিক্রি হয়। সাহিত্যের পত্রপত্রিকাও থাকে, ভালো চা-কফিও। গত বছর আমি আর আমার এক বন্ধু বসে কফি খাচ্ছি। বন্ধু কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিন-স্ট্যান্ডে পত্রিকা ঘাটছে। হঠাৎ এসে হাজির—আরে। এ যে তোমার ছবি। দেখি শুধু আমারই নয়, কবিতা সিংহ, আমি, অনুরাধা মহাপাত্র—সহাস্যে American Poetry Review-তে শোভা পাচ্ছি। গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা সহ। সবই ক্যারোলিনের কীর্তি। হঠাৎ তিন বঙ্গকন্যাকে বস্টনের বইয়ের দোকানের তাকে দেখে যে আনন্দ হয়েছিল, বলাই বাহুল্য। বছর কুড়ি-বাইশ হবে, লন্ডনের Dillons বলে মস্ত বইয়ের দোকান হয়েছে। সেখানে বই কিনে ওজন করে Postge-এর দাম দিয়ে দিলে তারাই Stamp মেরে প্যাক করে পোস্ট করে দেয়। ১৯৭৪-এ এক বাক্স বই ওভাবে পাঠিয়েছিলাম। দিব্যি চলে এসেছিল ঠিক। ১৯৭৭-এ আরও বেশি বই কিনে পাঠালুম। হাওয়া হয়ে গেল। অতএব সাধু সাবধান! নিউ ইয়র্কের Barnes & Nobles থেকেও ১৯৮১-তে আমার প্রেরিত তিন প্যাকেট বইয়ের দুটি প্যাকেট এসেছিল মাত্র। জানি না বাণিজ্যটা কে করেছেন। বিদেশি বইয়ের দোকান, না দেশি পোস্ট অফিস। নাকি সে প্যাকেট এখন লেকের জলে অথবা ভিখিরিদের বালিশ ?

বিয়ে হয়ে কেমব্রিজ ইংল্যান্ডে গিয়ে দুটি বইয়ের দোকানের প্রেমে পড়েছিলুম। Heffers আর Bowes & Bowes; প্রথমটি বড় উজ্জ্বল, আধুনিক বহু পেপারব্যাক রাখে—বিষয়বস্তু অনুসারে সুসজ্জিত। দ্বিতীয়টি ছোট, মলিন, সেকেলে, অনেক পুরনো সেকেন্ডহ্যান্ড বইও আছে। পেপারব্যাক-ট্যাক, ক্লাসিকস ছাড়া বিশেষ রাখে না। এখনও Heffers টিকে আছে, Bowes & Bowes শুনেছি উঠে গেছে। কিন্তু ওখানে আমাদের অ্যাকাউন্ট ছিল। মাসকাবারিতে বই কেনা চলত। এখন অনেক দোকানেই তা সম্ভব। কেমব্রিজে যেমন হেফার্স, অক্সফোর্ডে তেমনি ব্ল্যাকওয়েলস্। দু-দিনের জন্যেও যদি অক্সফোর্ডে যান, Blackwells-এ টু মারলেই অনেক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা হয়ে যাবে এক যাত্রায়—শপথ করে বলতে পারি। ব্ল্যাকওয়েলস্ ডিলনস, হেপার্সের চরিত্র অনেকটা এক ধরনের।

বইয়ের দোকান যে কত জ্বালা হতে পারে, তার গল্প বলি। কেমব্রিজে (USA) আমাদের বাড়িতে কিছু বন্ধুকে চা খেতে বলেছি। হঠাৎ দেখি ঘরে দুধ নেই। নন্দনার এক বন্ধুকে পাঠালুম, যা তো, দৌড়ে দুধ নিয়ে আয়।” সে দৌড়ে চলে গেল বটে, কিন্তু আর ফিরে এল না। অগত্যা লেবু-চা দিয়ে আপ্যায়ন করার পর দেখি বাবু ফিরেছেন, গলদধর্ম হয়ে। দু-হাতে দুই বোঝা বই। দুধ-টুধ নেই। ব্যাপার কী? দুধ কই?

—“ওই য্যাঃ। একটা দোকানে Hardcover বইয়ের ওপরে 25% discount দিচ্ছিল, সবই নতুন বই’—কী উত্তেজনা তার উজ্জ্বল চোখে-মুখে। “অত বই যে কিনেছ, টাকা ছিল সঙ্গে?

—মাস্টারকার্ড ছিল!” ইতিমধ্যে মেয়ে এসে ঠোট উল্টে বলল—“ওঃ! পথের দোকানটা “Barillari” তো? ওরা সারা বছরই 25% discount দেয়।” সত্যি, Discount না পেলে ব্যক্তিগত ক্রেতা আর ক'জনে নতুন হার্ডকভার বই কিনতে পারেন?

বিদেশে আবার প্রায় নতুন বেরুনো বইয়েরও 'সেল' দেওয়া হয় প্রকাশকের পাত-কুড়োনো বলে। যেহেতু গুদামে প্রচণ্ড স্থানাভাব, নতুনতর বই জমে উঠলে একটু পুরনো বই নামমাত্র দামে ছেড়ে দেওয়া হয়। তা পুরস্কৃত বইও হতে পারে। বইয়ের গুণের ওপর অনেক সময়েই সেল নির্ভর করে না । (বইয়ের গুণের ওপরে বইয়ের বিক্রি যে অনেক সময়েই নির্ভর করে না, তা অবশ্য আমরাও খুব জানি। বই লেখা ও বই বেচায়, বই কেনা ও বই পড়াতে যে অসামঞ্জস্য আছে তা কে না জানি ?) ওইভাবে আমি প্রকাশের অবশিষ্ট সেলে দু-এক ডলারে অনেক ভালো বই কিনেছি। এই কেমব্রিজ, ম্যাসাচুয়েটসে ব্যারিলারি ছাড়া আরও অনেক দোকানে ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। বস্টনে, কেমব্রিজে, ওয়টারটাউনে, আর্লিংটনে—ওই অঞ্চলটাই বইয়ের দোকান ভর্তি। হাতে সময় এবং পকেটে ডলার থাকলে এত আনন্দ আহরণের যোগ্য শহর আর আমি দেখিনি। বইয়ের দোকান তো সর্বত্রই আছে। কিন্তু ডিসকাউন্টের বইয়ের দোকান তো সর্বত্র নেই।

Wordsworth বলে অতি উপাদেয় এক বইয়ের দোকান আছে ব্যাটল স্কোয়ারে, হার্ভার্ড স্কোয়ারের গায়েই। সেটা রাত বারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর ভিড়ে জমজম করে। সেখানে সব বইয়েরই দাম দু-তিন ডলার করে কম। বইগুলি কত সুন্দর সুন্দর বিভাগে সাজানো বিষয় অনুযায়ী—ভ্রমণ, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি, শিশুসাহিত্য, কবিতা, উপন্যাস, চিত্রকলা, সমালোচনা, স্থাপত্য, প্রত্নতত্ত্ব—কী নেই? আবার ভাষা হিসেবেও ভাগ। আছে নারীবাদী সাহিত্য, কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্য, সমকামী সাহিত্য—নানান বিভাগ। লাইব্রেরিতে পড়তে গেলে কথা বলা চলে না। সেখানে মন আকুল করা আবহসঙ্গীত বাজে না। সঙ্গীতের গুণে শুনেছি নাকি গাভীও বেশি দুধ দেয়। খরিদ্দার বেশি কেনাকাটা করবেন, এটাও বিজ্ঞানসম্মত। লাইব্রেরিতে ধুলো ভর্তি। এখানে সব ঝকঝকে পরিষ্কার নতুন বই। শীততাপনিয়ন্ত্রিত আলো-ঝলমলে। রিল্যাক্সড় মানুষে ভরা। সময় পেলেই গিয়ে পছন্দসই তাক খুঁজে নিয়ে আমি থেবড়ে বসে পড়ি মেঝেয়, আর যত ইচ্ছে বই নিয়ে যেমন ইচ্ছে পড়ে যাই। চক্ষুলজ্জার ধার ধারি না। কেউ তুলে দেয় না। কেউ বলে না বিনীত হেসে আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি—” (অর্থাৎ কী, হচ্ছেটা কী হে?”) ওইভাবেই বসে বসে এক দুপুরে আমি পড়ে ফেলেছিলুম Misreading বইটি। কিন্তু মুশকিল হয়েছিল তার আগের এক বছরে। ওইভাবেই থেবড়ে বসে Foucault's Pendulum পড়তে পড়তে তিন দিনের সিটিং-এও শেষ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে কিনেই নিয়ে আসতে হয়েছিল দেশে hardcover বইটা।

হার্ভার্ড স্কোয়ার ভর্তি অগুনতি অত্যাকর্ষক বইয়ের দোকান আছে, আছে হার্ভার্ড কুপ' (কোঅপ)—আমার কিন্তু একটা দোকানে অনেকক্ষণ সময় যায়—হার্ভার্ড বুক স্টোর। তার বেসমেন্টে শুধুই পুরোনো বইয়ের স্তুপ আর প্রকাশকের অরুচি বই। এখানে মিলিলে মিলিতে পারে পরশরতন। তা ছাড়া এরা বই কিনলে কুপন দেয়। সেই কুপন জমিয়ে পরে ফ্রি বই কেনা যায়। আমরা কেন এমন করি না।

ভালো ভালো বইয়ের দোকান উঠে গেলে মনের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। কেমব্রিজে রিডিং ইন্টারন্যাশনাল' বলে একটি দোকান ছিল, প্রচুর বিদেশি সাহিত্য পত্রপত্রিকা রাখত—অনেক কবিতার বই। নানা দেশের নানা ভাষার চলতি সাহিত্যের খবর পাওয়া যেত সেখানে বই ঘেটে ঘুরে বেড়ালে। বই ছাড়া সঙ্গীতের ক্যাসেটও বিক্রি হত, মাঝে মাঝেই ক্যাসেটের সেল দিত। আর একটি দীর্ঘ টেবিলই ছিল—ডিসকাউন্ট টেবিল। তাতে সব বইই হেভি ডিসকাউন্ট 25% থেকে 50% কখনও 75% পর্যন্ত পেয়েছি। এ বছর গিয়ে দেখি সেখানে অন্য কার ঝকঝকে নতুন দোকান বসেছে। শৌখিন বোতলে রূপচর্চার সাজ-সবঞ্জাম বিক্রি হচ্ছে। এরই মালিকের হার্ভার্ড স্কোয়ারে ঠিক মাঝখানের দ্বীপে এটি অদ্বিতীয় পত্রিকা বিক্রির দোকান আছে, তার নাম ‘আউট অফ টাউন নিউজ। রােজ তাতে আমেরিকার চল্লিশটা শহরের পাটভাঙা খবরের কাগজ মজুত থাকে। এবং ইওরোপের পাঁচটা দেশের কাগজ আমিই স্ট্যান্ডে দেখেছি—চাইলে হয়তো আরও পাওয়া যায়। সেখানে অনেক নোবেল লরিয়েটকে ঘুরতে দেখা যায়—পত্রিকা ঘাঁটছেন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে, লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে। আমাদের কলকাতাতে এমনধারা একটি পত্রিকার দোকান হয় না। (পাতিরাম কী বলেন?)

আজকাল একজাতের বইয়ের খুব বিক্রি। লোকে কেনে, পড়ে, জ্ঞানলাভের পরে ফের বেচে দেয়। সেগুলো থাকে যেসব তাকে, তার শিরোনাম Self-help; এই বন্ধুদেরও চিনে নিন”। কে কে সাইকোপ্যাথ, কে কে নিউরটিক! ডেল কার্নেগির কল্যাণে—কী করে বন্ধুত্ব করতে হয়, কী করে সফল হতে হয়” ইত্যাদি বই প্রথম দেখি কলকাতাতে। পড়বার ইচ্ছেও হয়নি কখনও। বিদেশে এখন দেখি 'হাউ-টু' বইতে বাজার ছেয়ে গেছে। কী করে কৃপণ স্বামীর সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে, কী করে অবাধ্য সন্তানের সঙ্গে সংসার করতে হবে, বাবা-কাকা ধর্ষণ করলে, কীভাবে আবার আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে, কীভাবে বিবাহ-বিচ্ছেদের পর বাচতে হবে, মদ ছাড়বেন কীভাবে, মনঃসংযোগ করবেন কীভাবে,—আমি তো এসব বই দেখতুম, আর নাক উলটে চলে যেতুম। কিন্তু সেদিন এক বন্ধুর বাড়িতে একটি বই দেখলুম—Time management বিষয়ে। কীভাবে সময়কে দীর্ঘতর করা যায়। দীর্ঘসূত্রিতা ভেঙে, সুশৃঙ্খলভাবে কাজ শেষ করা যায়। কি বলব, মিনমিন করে বইটা চেয়ে আনলুম। আমার বড্ড শেখা দরকার। কীভাবে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হয়। এই তো দেখুন না, আপনাদের সময় কত নষ্ট করে দিলুম।

এটা কি প্যারিস? এ কি বুলভার সাঁ জারম্যা? দু-ধারে বই আর ছবির দোকান, আপনি হাটছেন, দেখছেন, ঘাটছেন, মাঝে মাঝে কাফেতে বসে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছেন, হয় এক পাত্র সুরা, নইলে এক পেয়ালা কফি নিয়ে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, মানুষের ভিড় বাড়ছে বই কমছে না, আর প্রত্যেককে দেখে মনে হচ্ছে তাদের হাতে অনন্ত সময়। তারা যেন এই বইয়ের দোকানে বেড়াবে বলেহ জন্ম নিয়েছে।

অবশ্য জগতের সর্বত্র বইয়ের দোকানে এই একই দৃশ্য। গয়ংগচ্ছ ভাব। ঢুকলে আর বেরুতে চায় না কেউই। যারা বইয়ের দোকানে ঢোকেন, তাঁরা সবাই ওই একই চরিত্রের লোক যে। একই বাকের পক্ষী।

এবার বর্ষার গল্পটা বলি। এখন তো দিকে দিকে Women's Book Store হয়েছে। কিন্তু আমি প্রথম Women's Book Store দেখি কানাডার ছোট্ট একটা ইউনিভার্সিটি শহরে। শহরের নাম Guelph (সেই দান্তের মতন) যেখানে বর্ষা পড়াত। ১৯৪৮-র কথা। বর্ষা বললে, একটা নতুন জিনিস দেখবি? খুব অবাক হয়ে যাবি। খুব ভালো লাগবে তোর।` যত বলি—কী জিনিস? বর্ষা তত রহস্যময়ী হয়ে বলে চল না, দেখতেই পাবি!” আমাকে নিয়ে তো বর্ষা গেল একটা ঘুপচিমতন কুঠুরিতে। ঢুকে দেখি বইয়ের দোকান। অতীব ক্ষুদ্র। যিনি বিক্রি করছেন সেই মহিলা, আমি ও বর্ষা ছাড়া আর চতুর্থ ব্যক্তির ঠাই হবে না সেখানে। বর্ষা বললে—ভালো করে দেখ।” আমার মুখ দেখেই সে বুঝেছিল। আমি কী ভাবছি। আমি ভাবছি, "আহাহা! কী জিনিসই দেখাতে এনেছিস্। ভারি তো একটা অতি ক্ষুদ্র বইয়ের দোকান, কোনও রকমে দাঁড় করানো।” বর্ষা তাড়া দিল, “দেখলি?'—তারপর দেখলুম। এই প্রথম দেখলুম প্রত্যেকটি বইয়ের বিষয়বস্তু নারী। প্রধানত প্রতিবাদী সাহিত্য, নারীবাদী প্রবন্ধ, সমাজতত্ত্ব, কবিতা, অর্থনীতি, নাটক, লেসবিয়ান সাহিত্য—সব বইই মেয়েদের নিয়ে। ক্যালেন্ডার, ডায়েরি, যা যা বিক্রি হচ্ছে, তাতে মেয়েদের আঁকা ছবি। তা ছাড়াও নারীশিল্পীদের আঁকা ছবির প্রিন্ট বিক্রি হচ্ছে, মেয়েদের তৈরি ফিল্মের বিষয়ে বই। শুধু ইংরিজি নয়। ফরাসিতেও। গানের ক্যাসেট এবং রেকর্ডও রয়েছে। একসঙ্গে এত মেয়েদের লেখা বই এবং মেয়েদের বিষয়ে এই আগে কোনো দিন দেখিনি। আমার মুগ্ধতা দেখে ভুরু নাচিয়ে বর্ষা বলল—“দেখলি তো? বলেছিলুম কি না? চমৎকার একটি জিনিস দেখাবো?'—সেদিন *Women, Race & Class” বইটি ওখানেই কিনেছিলুম।

বর্ষা আর নেই। কনিষ্ক' উড়োজাহাজ তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে আরও চমৎকার, আরও অবাক করা এক জায়গায়। সেখানে সারি সারি ডিসকাউন্ট বুক সেন্টারে 90% discount ডিসকাউন্টে সদ্যপ্রকাশিত হার্ডকভার বিক্রি হচ্ছে, মৃদু আবহসঙ্গীত বাজছে স্বপ্নমেদুর, আর যার যতক্ষণ খুশি বসে বসে যা-খুশি বই ঘাটার অনুমতি আছে সেখানে, সঙ্গে ফ্রি কফি কিংবা ওয়াইন, এবং ঢুকতে-বেরুতে কেউ থলি-টলি কক্ষনো পরীক্ষা করে না। বর্ষা মনের আনন্দে সেই অনিঃশেষ বই-বীথিকায় হেটে বেড়াচ্ছে।

ভাবতে পারেন একদিন বই থাকবে না? একদিন তো বই ছিল না। ছিল বড় বড় পাথরের চাইতে খোদাই করা বাক্য, ছিল হাড়ের ওপর খোদাই করা ঈশ্বরের বাণী, ছিল বল্কলে, প্যাপিরাসে, ভূর্জপত্রে লেখা স্ট্রোল, ছিল তালপাতার পুঁথি। বই সভ্যতার ইতিহাসের কদিনের জন্যই বা এসেছে! মাইক্রোফিল্ম এসেছে, মাইক্রোফিস এসেছে, এখন তো সবই ডিস্কে তোলা থাকছে, (আছে ক্যাসেট-করা শ্রাব্য বইও) এর পরে হয়ে যাবে ডক্ট। একটি বিন্দুতে বিধৃত হবে জ্ঞানের সিন্ধু। বইয়ের যে ইন্দ্রিয়বাহ অবয়ব—বইকে দেখতে, ছুতে, ঘাঁটতে, তার গন্ধ শুকতে যে আনন্দ, বইয়ের দোকানে কিংবা তাতে ফেলা-ছড়ার উপরিপাওনা কই?

ছোটবেলায় বন্ধুরা সবাই ছিল পড়ুয়া। আর বই পড়া ছিল মানসন্ত্রমের প্রশ্ন। যেই শুনতুম কেউ কোনো নতুন বই পড়ে ফেলেছে, অমনি হিংসে। তক্ষুনি বইটা জোগাড় করে (কই? দেখি তো বইটা?”) ধার করে পড়ে ফেলে তবে নিশ্চিন্দি। বয়েস বাড়বার একটা লক্ষণ, ঈর্ষার লক্ষ্যগুলো পালটে যায়। আর একটা লক্ষণ, অমন গোগ্রাসে বই পড়াটা কমে আসে। অল্প বয়েসে বই দিয়েই তো জগতের সঙ্গে পরিচয় হয়, জীবনটা কীরকম তা গোড়ায় গোড়ায় চিনিয়ে দেয় বইই। ক্রমশ জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় বাড়তে থাকে, বইয়ের পাঠ পার হয়ে এগিয়ে যায় বেঁচে থাকার পাঠ। সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে সংসারের ভার আর কমে আসে নিজস্ব সময়। তখন এসে কান ধরে চয়নের প্রশ্ন। তােমার সময় বাঁধাধরা ঠিক করে নাও—কী পড়বে? কী পড়বে না?

এতৎসত্ত্বেও যখন ঢুকি লাইব্রেরিতে কিংবা বইয়ের দোকানে, যে বইয়ের উদ্দেশ্যে সেখানে গমন, তা বাদে আশপাশের আরও দু-দশটা বই নেড়ে-চেড়ে পরকীয়ের আহ্বাদটা তো পাই! ডটু-বইয়ের যুগে সেটি আর থাকবে না। তখন কেবলই স্পেশালইজড় রিডিং—শুধুই প্রয়োজনসম্মত, সকারণ, বিশুদ্ধ পঠনপাঠন। কী বোরিং—ভেবে দেখুন? এই যে অল্প অল্প করে পাতা উলটোচ্ছি, বই চাখছি, বই দেখছি, এভাবে বই পছন্দ করা, আর মনিটরের পর্দায় বই পড়লে কি সেই স্বাদ পাব? বই পড়াটা আমাদের অনেকের কাছেই একটা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আনন্দ—পড়া তো পরে। নতুন বই হোক, পুরোনো বই হোক, দুয়ের আকর্ষণ দুই ধরনের। বই তো আগে নাড়ব-চাড়ব, উল্টেপাল্টে দেখব, ফোর-প্লে যাকে বলে। পড়লুম, তো ফুরিয়েই গেল। ও ডটু-বই কী প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে পড়া যাবে? কি জানি! হয়তো যাবে!

আমার অবিশ্যি দুঃখের কারণ নেই। এমনই একটা বাড়িতে বাস করি যেখানে প্রচুর হারিয়ে-চুরিয়েও যথেষ্ট বই মজুত। তিন প্রজন্মের পাঁচজন মানুষের বই-বাতিক (বাপ-মা আছেন, আমি আছি, আছেন আমার দুই মেয়ে—) এত যে বইয়ের সঙ্গে ঘর করি, এর বেশ মোটা অংশ এখনও আমার না-পড়া। আর্থা কিটু-এর সেই যে গানের কলিটা—থিংক অফ অল দ্য মেন ইউ হ্যাভেনটু কিস্ড?” ঠিক তেমনি। চারিদিকে প্রতীক্ষমাণ অপঠিত রহস্যময় বইয়েরা আমাকে ঘিরে আছে—এর আলাদা আনন্দ। এখনও সংসারের টানটা আছে, সময় সামলে উঠতে পারি না। তবু লোভে পড়ে কিনে ফেলি বই। তুলে রাখি পরে পড়ব বলে। বই তিন রকমের—চাওয়া বই, পাওয়া বই আর কেনা বই। চাওয়া বই সবার আগে পড়া হয়ে যায়। কেননা ফেরত দিতে হয়। উপহার পাওয়া বই তার পরেই পড়া হয়। কেননা বিবেকদংশন হয়। (আবার অনেক সময়ে পড়াটা শেষ হয় না, বইয়েরই দংশনে) বিবেক হার মেনে যায়। এখন তো লেখাপড়া জানলেই লেখক। তাই বইও বড্ড বেশি বেরোয়।) সবচেয়ে দুর্গতি এই কেনা বইয়ের। ঘরে আছে, পড়া হবে। কবে?

—হবে। একদিন সময় হবে। যখন পৃথিবী নিজেকে গুটিয়ে নেবে, যখন একা হয়ে যাব, তখন শীতের দুপুরে রোদে পিঠ দিয়ে বসতে হবে এই সব না-পড়া বই হাতে করেই। মুশকিলটা এইখানে—সেই অনাগত দিনটি কি কাছেই? নাকি তা যত দূরে থাকে ততই ভালো? ভালোই তো সেই অপঠিত, রহস্যময় পৃষ্ঠাগুলির জন্যে এই নিশ্চিত, নিশ্চিন্ত প্রতীক্ষায় থাকা।

দেশ, ভালোবাসা বই' ২৮ জানুয়ারি ১৯৯৫

বিদ্যানন্দ ও আমাদের বিবেকের লড়াই - আশফাক স্বপন

বিদ্যানন্দ ও আমাদের বিবেকের লড়াই
ধর্মান্ধরা যেন আমাদের পরিচয় নির্ধারণ না করে

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী, বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’
- কাজী নজরুল ইসলাম

মানুষের সদিচ্ছা থাকলে অর্জন কী অভাবনীয় হতে পারে, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ তার একটা বিস্ময়কর উদাহরণ। সঙ্গত কারণে পেরু-প্রবাসী তরুণ প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাসের লক্ষ লক্ষ ভক্ত।
কিশোরবাবুর ওপর সাম্প্রতিক জঘন্য সাম্প্রদায়িক আক্রমণ দেখে তাই এত অবাক হলাম। বাংলাদেশে সংখায়গরিষ্ঠতান্ত্রিক মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কী জঘন্য হতে পারে এই আক্রমণ সেটা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিয়েছে। এই ঘটনা একপ্রকার নৈতিক যুদ্ধের আহবান।

এরকম মুহূর্তে আমাদের জাতীয় পরিচয়, আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে আমরা এক মর্মান্তিক প্রশ্নের সম্মুখীন হই।

আসলেই আমরা কে? আমাদের পরিচয় কী?

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে যাবার কথা। সেই সময়কার বাংলাদেশ সরকারের একটা পোস্টারে মোদ্দা কথাটা বলা হয়েছে। পোস্টারের পটভূমিতে মন্দির, মসজিদ, গীর্জার ছায়া, তার ওপর দ্বার্থহীন উচ্চারণ: ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান – আমরা সবাই বাঙালী।‘

মনে হয় কিশোরবাবুর নিন্দুকদের কাছে সেই বার্তা এখনো পৌঁছেনি।

আসলে বাস্তব অনেক ঘোলাটে, গোলমেলে।

বাঙালি মুসলমানের নিজের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি আছে, নিজেদের মধ্যে মতভেদ আছে। বাঙালি মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের ফলশ্রুতি ১৯৪৭ সালের পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টি। অথচ এক দশক পার না হতেই পাকিস্তানের ধাত্রী যে মুসলিম লীগ, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে তার ভরাডুবি হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম পালটে আওয়ামী লীগ হয়। ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন দেশ ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। রবীন্দ্রনথের ‘আমার সোনার বাংলা’ হয় দেশটির জাতীয় সঙ্গীত।

এই তো আমাদের ইতিহাসের চুড়ান্ত রায়, তাই না?

নির্মম সত্য হলো এরপর আমাদের জাতীয় পর্যায়ে পদস্খলন ঘটেছে। স্বাধীনতার পর গোঁড়া, ধর্মান্ধ ইসলামের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। আরব দেশের টাকা আর জাতীয় পর্যায়ের কিছু রাজনৈতিক শক্তির ধর্মীয় ভেদবুদ্ধির প্রশ্রয় এই ভয়ঙ্কর প্রবণতা বৃদ্ধিতে ইন্ধন জুগিয়েছে।

কিশোরবাবুর ওপর আক্রমণ এই জঘন্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। এর আগেও আরো আক্রমণের নজির রয়েছে।

বাংলাদেশের এক দুর্দান্ত ক্রিকেটার লিটন দাস। তিনি ফেসবুক পাতায় সবাইকে পূজার শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। ব্যস, আর যায় কোথায়? তার বিরুদ্ধে এমন অশ্রাব্য সাম্প্রদায়িক গালাগাল করা হলো, দেখে আমার রাগ আর ক্ষোভের সীমা ছিলনা।

আসলে বাংলাদেশি মুসলমানের সামাজিক পরিচয়কে একটি কাঙ্খিত দিকে ঠেলে দেবার জন্য এই সব আক্রমণ। মুসলমান হিসেবে আপনার সামাজিক পরিচয় দু’রকম হতে পারে। আমার প্রয়াত মা ও বোন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন/পড়ে, আবার দুজনেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভীষণ ভক্ত। আরেক রকম মুসলমান আছে যাদের চেতনাকে অসহিষ্ণুতা ও গোঁড়ামি এতখানি অধিকার করেছে যে বাংলা সংস্কৃতি, এমনকি ভাষার প্রতিও তাদের বিরাগ, অমুসলমানও তাদের গভীর অপছন্দ।

ধর্ম পালন থেকেই যে সবসময় এই ভেদবুদ্ধির জন্ম, তা নয়। মোহম্মদ আলি জিন্নাহ শুয়োরের মাংস খেতেন, মদ্যপান করতেন, আবার মনে করতেন হিন্দু আর মুসলমান আলাদা জাতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইসলাম ধর্ম পালন করতেন, কিন্তু যে উদার জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ছিলেন সেখানে সকল ধর্মের বাঙালিদের সাদর আমন্ত্রণ ছিল।

ধর্মভীরু মানুষ – তাদের ধর্ম যাই হোক না কেন –দাবি করে যে তাদের সামাজিক মূল্যবোধের উৎস ধর্মীয় গ্রন্থ – কোরান, হাদিস, বাইবেল বা মনুস্মৃতি। কথাটা একদম ভুল। একই ধর্মের অনুসারী জনগোষ্ঠীর প্রবণতাভেদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন রূপ হতে পারে। সমাজটি কূপমণ্ডুক, অসহিষ্ণু, হিংস্র হতে পারে, আবার মানবিক, উদার, পরমতসহিষ্ণু হতে পারে।

মাইমোনিডিসের (Maimonides) অভিজ্ঞতা থেকে কথাটি স্পষ্ট হবে। ইনি ১২শ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ ইহুদী দার্শনিক ও চিকিৎসক। যখন স্পেনের কর্ডোবায় বেড়ে ওঠেন, তখন মুসলমান মূরীয় শাসনের রমরমা। তিনিও বড় হুন একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, সুসংস্কৃত ইহুদীসমাজে। এরপর আলমোহাদ নামে উত্তর আফ্রিকা থেকে বারবার (Berber) মুসলমানের শাসকগোষ্ঠী মূরদের গদিচ্যুত করে। রাতারাতি ইহুদীদের অবস্থা পালটে যায়। পথ রইল তিনটি – ধর্মান্তর, নির্বাসন অথবা মৃত্যু। মাইমোনিডিস নির্বাসন বেছে নিলেন। জীবনের শেষের দিকে তিনি ক্রুসেড যুদ্ধের মুসলমান বীর সম্রাট সালাদিনের রাজসভার চিকিৎসক ছিলেন।
মুসলমান সমাজের পক্ষে কি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা পরিত্যাগ করে মানবিক, উদার মূল্যবোধে উত্তরণ সম্ভব?

নিজের হিংস্র অসহিষ্ণুতার কলঙ্কময় ইতিহাস সত্ত্বেও পাশ্চাত্য কিন্তু তা পেরেছে। ২০০১ সালে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় অমর্ত্য সেন মন্তব্য করেন: ‘১৫৯০-এর দশকে আকবর বাদশাহ যখন আগ্রায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সপক্ষে মত ঘোষণা করছেন, তখন খ্রীষ্টানদের পরধর্মবিরোধী ইনকিউজিশন চলছে। ১৬০০ সালে জরদানো ব্রুনোকে (Giordano Bruno) ধর্মধ্রোহিতার অপরাধে রোমের কাম্পো দি ফেওরে-তে (Campo di Fiore) জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।‘

বাংলাদেশে কিশোরবাবুর ওপর মুসলিম ধর্মান্ধ আক্রমণের ফলে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, তাতে বহু ক্ষুব্ধ মুসলমান সামিল আছেন। এর ইতিবাচক ফল এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে মনে হয়।
এর আগেও ব্যাপক গণধিক্কার কার্যকর হয়েছে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল মুসলমান চরমপন্থীরা বাংলা নববর্ষে রমনায় ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠনে বোমা হামলা করে। (এবিষয়ে আমার ক্ষোভ গভীর ও ব্যক্তিগত । আমার বোন ও ভগ্নীপতি সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।)

হামলাকারীদের উদ্দেশ্য যদি ত্রাস সৃষ্টি হয়ে থাকে, সেটা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

পরের বছরগুলোতে ছায়ানটের অন্তুষ্ঠানে বাঁধভাঙা মানুষের ঢল নেমেছে। এরা অধিকাংশ মুসলমান। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে যে অপূর্ব মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, তার বিরুদ্ধে কিছু কাঠমোল্লা তীব্র ভাষায় অভিসম্পাত করে। আর প্রতিবছর মানুষ তার তোয়াক্কা না করে শোভাযাত্রায় যোগ দেয়।

ধর্মান্ধ মুসলমানদের স্থায়ীভাবে পরাস্ত করতে হলে যেটার প্রয়োজন, মার্কিন সমাজতত্ত্ববিদ হারবার্ট মারকুজ তাকে বলেছেন immanent critique - একেবারে জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা সমালোচনা।
ধর্মভীরু মুসলমানরা প্রায়ই উগ্র ধর্মান্ধ মুসলমানদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাদের বলতে শুনেছি, এদের বর্বরতার কারণে ইসলামের সম্মানহানি হচ্ছে। কিন্তু একথা শুধু মুখে বললেই তো চলবে না। কাজের মাধ্যমে এই সদুদ্দেশ্যের প্রমাণ রাখতে হবে।

যদি মনে করেন অসহিষ্ণু ধর্মান্ধ মুসলমানদের ইসলামের সামাজিক পরিচয় নির্ধারণ করতে দেওয়া যাবে না, তাহলে আসুন, আপনার ধর্মের সম্মান রক্ষায় ময়দানে নামুন।

যেদিন ধর্মভীরু মুসলমান এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সেদিন তারা যে ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা এত অপছন্দ করেন, তার বদলে যে পরমতসহিষ্ণু, মানবিক মুসলমান সমাজ কামনা করেন, সেটা অর্জনের পথ সুগম করবে।

এই কাজ করতে পাশ্চাত্যের কয়েক শতক লেগে গিয়েছে, কিন্তু পাশ্চাত্য তা পেরেছে। খোদ বাংলাদেশেও এটা সম্ভব। তবে বিনাযুদ্ধে সেটা হবে না।

আমরা বাঙালি না মুসলমান, এটাও আরেকটা অসার প্রশ্ন। বহু বাঙালি মুসলমান সগর্বে এবং সানন্দে দুই-ই। (আপনার ধর্মীয় মূল্যবোধে যদি সঙ্গীত গ্রহণযোগ্য না হয়, আপনার সেই মতে চলার অধিকার আমি মান্য করি। তবে অন্যের ওপরে এব্যাপারে জবরদস্তি করবেন না। আর জাতীয় পরিচয় ভৌগলিক, ধর্মীয় নয় – এই কথাটা মান্য করতে শিখুন।) এর ফলে আমাদের সমাজ আরেকটু মানবিক, সহনশীল হবে।
‘আমাদের পরিচয়ের কোন কষ্টকল্পিত একমাত্রিক সাদৃশ্য নয়, সৌহার্দ্যের জন্য সবচাইতে বড় সহায়ক বরং আমাদের পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা। আমাদের পরিচয়ের নানান মাত্রা একে অপরকে অতিক্রম করে, তাতে কঠোর বিভাজনের মাধ্যমে দুইটি বিবদমান গোষ্ঠী সৃষ্টি ব্যাহত হয়।‘ অমর্ত্য সেনের উক্তি, প্রাগুক্ত ‘বিশ্ব সুপষ্ঠভাবে বিভাজিত নয়’ শীর্ষক নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর নিবন্ধে।

https://www.thedailystar.net/opinion/news/bidyanondo-and-the-battle-our-soul-1900726

বিশ্বমহামারি: নবতর বিশ্বের প্রবেশদ্বার - অরুন্ধতী রায়


বিশ্বমহামারি: নবতর বিশ্বের প্রবেশদ্বার

অরুন্ধতী রায়
ফাইনানশ্যাল টাইমস
৩ এপ্রিল, ২০২০


অনুবাদ: আশফাক স্বপন

মূল রচনা
Arundhati Roy: ‘The pandemic is a portal’
Financial Times
April 3, 2020


লিঙ্ক
https://www.ft.com/content/10d8f5e8-74eb-11ea-95fe-fcd274e920ca

কোথায় চলেছে আমার দেশ? হায়রে আমার সমৃদ্ধ অথচ দরিদ্র দেশ, সামন্ততন্ত্র আর ধর্মীয় মৌলবাদের মাঝামাঝি, জাতপাত আর পুঁজিবাদের মাঝামাঝি কোনো এক স্থানে ঝুলে থাকা দেশ, চরম ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী শাসিত দেশ!

গত ডিসেম্বরে যখন চীন উহানে ভাইরাস আবির্ভাবের মোকাবেলায় ব্যস্ত, ভারত সরকার তখন অধুনা সংসদে পাশ করা মুসলমান-বিরোধী নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের গণজাগরণ মোকেবেলা করছে।

ভারতে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের প্রথম ঘটনা ৩০ জানুয়ারি। তার কয়েক দিন আগে দিল্লী থেকে বিদায় নেন আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবসের মহামান্য প্রধান অতিথি, ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জায়ির বোলসোনারো (Jair Bolsonaro), যিনি আমাজন জঙ্গল ধ্বংসে নিরলস ও কোভিড ভাইরাসকে গ্রাহ্যই করেন না। তবে কিনা ফেব্রুয়ারি মাসে এতই কাজের ভীড় ছিল যে শাসকদলের দিনপঞ্জিতে ভাইরাসের ঠাঁই হয়ে উঠল না। মাসের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সফর। তাঁকে গুজরাতের ক্রীড়া স্টেডিয়ামে ১০ লক্ষ লোকের জনসমাগমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টোপ ফেলা হয়েছে। অত বড় আয়োজনে অর্থ, সময় দুই-ই লাগে।

তার ওপর আবার দিল্লীর প্রাদেশিক নির্বাচন। ভারতীয় জনতা পার্টি রাজনৈতিকভাবে তৎপর না হলে সেখানে ভরাডুবির সম্ভাবনা। তা দল তৎপর হয়ে উঠল ঠিকই। নির্বাচনী অভিযানে দলটি নগ্ন হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রচারণায় মত্ত হল – সেখানে শারীরিক সহিংসতা, ও ‘দেশদ্রোহীদের’ গুলি করার হুমকি কিছুই বাদ যায়নি।

কিন্তু শেষরক্ষা হলনা, নির্বাচনে পরাজয় হল। দোষ দেওয়া হল দিল্লীর মুসলমানদের, এবং তাদের যথাযোগ্য শাস্তি দেবার বন্দোবস্ত করা হল। পুলিশের ছত্রছায়ায় সশস্ত্র হিন্দু গুণ্ডার দল উত্তর পূর্ব দিল্লির শ্রমিক মহল্লায় মুসলমানদের আক্রমণ করল। ঘর-বাড়ি, দোকান, মসজিদ, স্কুল পোড়ান হল। মুসলমানরা এমন আক্রমণের আশঙ্কা করেছিল, তারাও প্রত্যুত্তরে লড়াই করল। পঞ্চাশের অধিক মানুষ, মুসলমান ও কয়েকজন হিন্দু, মারা গেল। হাজার হাজার মানুষ স্থানীয় গোরস্থানের শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই নিল। সরকারী কর্মকর্তারা যখন কোভিড-১৯ নিয়ে প্রথম সভায় মিলিত হয়, আর বেশির ভাগ ভারতীয়রা যখন প্রথমবারের মত hand sanitizer (হাত পরিষ্কারক)-এর অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়, তখনও দুর্গন্ধময় নর্দমা থেকে ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে।

মার্চও কর্মব্যস্ত মাস। প্রথম দু’সপ্তাহ কাটল ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে কংগ্রেস-শাসিত সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আনতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ কোভিড-১৯ বিশ্বময় মহামারি বলে ঘোষণা করল। তার ঠিক দুই দিন পর ১৩ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানাল কোরোনা ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ নয়।

অবশেষে ১৯ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তার বিশেষ পূর্বপ্রস্তুতি ছিলনা। তিনি ফ্রান্স আর ইতালির পথ ধরলেন। তিনি আমাদের ‘সামাজিক দূরত্বের’ প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বললেন। (জাতপাত যে সমাজে মজ্জাগত, সেখানে বিষয়টা বুঝতে বেগ পেতে হলনা।) তিনি ২২ মার্চ ‘জনতার সান্ধ্য আইন’-এর আহবান জানালেন। এই সঙ্কট নিরসনে সরকার কী করছে, সে সম্বন্ধে তিনি কিছু বললেন না, কিন্তু জনগণকে বললেন তারা যেন যার যার বারান্দায় এসে ঘণ্টি বাজিয়ে, হাড়ি বা কড়াই পিটিয়ে স্বাস্থ্য কর্মীদের অভিনন্দন জানায়।

ভারত যে নিজের দেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সংরক্ষণ করার পরিবর্তে প্রতিরোধক সরঞ্জাম ও শ্বাসরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি ঠিক সেই মুহূর্ত পর্যন্ত বিদেশে রফতানি করছিল, এই কথাটি আর তিনি উল্লেখ করলেন না।

নরেন্দ্র মোদির আহবানে মানুষ প্রচণ্ড সাড়া দিল। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। হাড়ি-পেটানো মিছিল, পাড়ার লোকের মিলিত নৃত্য, কিছুই বাদ রইল না। সামাজিক দূরত্ব তেমন দেখা গেল না। পরবর্তী দিনগুলোতে মানুষ পবিত্র গোবরভর্তি পিপেতে ঝাপ দিল, বিজেপি সমর্থকরা গোমূত্র পানের আসর আয়োজন করল। মুসলমানরাও পেছনে পড়ে থাকার পাত্র নয়। বহু মুসলমান সংগঠন ঘোষণা করল যে ঈশ্বরই ভাইরাস ঠেকানোর একমাত্র উপায়, এবং দলে দলে মুসল্লিদের মসজিদে একত্র হতে আহবান জানাল।

২৪ মার্চ সন্ধ্যে ৮টায় মোদি আবার টিভির পর্দায় হাজির হলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে মধ্যরাত্রির পর থেকে সারা ভারত ‘লক ডাউন’-এ যাবে। বাজার বন্ধ। সকল যানবাহন চলাচল বন্ধ।

তিনি বললেন এই সিদ্ধান্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, পারিবারিক প্রবীণ হিসেবে নিয়েছেন। আর কার পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব? বিন্দুমাত্র কোন আগাম ব্যবস্থা না নিয়ে, মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে ১৩৮ কোটি মানুষের একটা দেশে এত বড় একটা আদেশ। সব দায় আর ঝামেলা যেই রাজ্য সরকারগুলোর ওপর পড়বে, তাদের সাথে কোনরকম আলোচনা করা হল না। তার কর্মপদ্ধতি দেখে মনে হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করেন। এদের ওপর হঠাৎ করে চড়াও হতে হয়, চমকে দিতে হয়, কিন্তু কখনো বিশ্বাস করা যায় না।

আমাদের লকডাউন হল। বহু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানবিদরা এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের কথা ঠিক হতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনা আর প্রস্তুতির ভয়াবহ অভাবে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও কঠোর লকডাউন-এর ফলে হিতে বিপরীত হল, এটা নিশ্চয়ই তাঁদের কেউই সমর্থন করতে পারেন না।

যে মানুষটা তামাশা পছন্দ করেন, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তামাশা সৃষ্টি করলেন।

অবাক, স্তম্ভিত পৃথিবী দেখল, কীভাবে ভারত নগ্নভাবে নিজের গ্লানিময় স্বরূপ প্রকাশ করল – তার নির্মম, কাঠামোগত সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানুষের দুঃখে-কষ্টে তার নিষ্ঠুর নিস্পৃহতা।

যেন এক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মত লকডাউন অনেক গোপন জিনিস আলোকিত করে তুলল। দোকান, রেস্তোরা, কারখানা, গৃহনির্মাণ কাজ বন্ধ হবার সাথে সাথে ধনী ও মধ্যবিত্ত মানুষ নিজেদের সংরক্ষিত আবাসনে রয়ে গেল, আর আমাদের শহর আর সুবিশাল মহানগরগুলো যেন আবর্জনার মত খেটে খাওয়া মানুষ – অভিবাসী শ্রমিক – এদের পরিত্যাগ করতে লাগল।

বাড়িওয়ালা বা কাজের মালিক এদের বহুজনকে বিতাড়িতে করেছে। কোটি কোটি দরিদ্র, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত মানুষ, তরুণ ও বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, শিশু, অসুস্থ মানুষ, অন্ধ মানুষ, প্রতিবন্ধী মানুষ, এদের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই, ত্রিসীমানায় কোন জনপরিবহন নেই – বাড়ি ফেরার জন্য নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করল। দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে চলল। বাদাউন, আগ্রা, আজমগঢ়, আলীগঢ়, লখনৌ, গোরখপুর – শত শত কিলোমিটার দূরে। কেউ কেউ পথেই মারা গেল।

এরা জানে বাড়িতে পৌঁছুলে মোটামূটি মন্থরগতির দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। হয়ত জানে, শরীরে ভাইরাস বাসা বেঁধেছে, বাড়িতে তাদের পরিবার, বাবা-মা, পিতামহ-মাতামহকে আক্রমণ করতে পারে, কিন্তু তারা যে ভীষণ কাঙাল একটুখানি পরিচিত পরিবেশের, একটু আশ্রয়ের, একটু আত্মসম্মানের, একটু খাবারের, হয়তোবা একটু ভালোবাসারও।

হাঁটতে হাঁটতে কেউ কেউ নির্মমভাবে পুলিশের হাতে লাঠিপেটা হল, অপমানিত হল। পুলিশের দায়িত্ব কঠোরভাবে সান্ধ্যআইন জারি রাখা। তরুণদের জোর করে হাঁটু গেড়ে বসান হল, অথবা রাস্তার ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে বাধ্য করা হল। বারেলি শহরের কাছাকাছি একদল লোককে একত্র করে কেমিকাল স্প্রে দিয়ে ধোলাই করা হল।

বিতাড়িত মানুষ গ্রামে ভাইরাস ছড়াবে এই আশঙ্কায় কয়েকদিন পর সরকার এমনকি পদব্রজে আগত মানুষের জন্যও রাজ্যের সীমানা বন্ধ করে দিল। দিনের পর দিন যেসব মানুষ হেঁটে এসেছে, তাদের থামিয়ে জোর করে যেই শহরগুলো থেকে তাদের জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানকার শিবিরে ফেরত পাঠান হল।

যাদের বয়স হয়েছে, তাদের ১৯৪৭ সালে দেশভাগে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় জনসংখ্যা বদলাবদলির কথা মনে পড়ল। তফাত হল এবার এই জনস্রোতের গৃহত্যাগের ভিত্তি শ্রেণি, ধর্ম নয়। তারপরও এরা ভারতের সবচাইতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী নয়। এদের তো তবুও (অন্তত এখন পর্যন্ত) শহরে কাজ ছিল, আশ্রয় নেবার মতো গ্রামের বাড়ি ছিল। যারা বেকার, গৃহহীন, আশাহত, তারা যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেল – শহরে আর গ্রামে। এই সর্বনাশ আসার আগে থেকেই গ্রামে গভীর কষ্ট ক্রমবর্ধমান ছিল। এই যে এতগুলো ভয়াবহ দিন গেল, এই পুরো সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জনসাধারণের আড়ালেই রয়ে গেলেন।

দিল্লীতে যখন পদযাত্রা শুরু হল, আমি তখন একটা সাময়িকীর (এখানে আমি মাঝে মাঝে লিখি) প্রেস পাস ব্যবহার করে দিল্লী আর উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সীমানায় অবস্থিত গাজীপুরে গাড়ি চালিয়ে গেলাম।

চিত্রটি যেন বাইবেল থেকে তোলা। নাহ, কথাটা ঠিক নয়। বাইবেলেও এত লোকের উল্লেখ নেই। শারীরিক দূরত্ব তৈরির জন্য যে লকডাউন, তার ফল হয়েছে উলটো – মানুষ গাদাগাদির ফলে অভাবনীয় শারীরিক নৈকট্য। ভারতের সব শহর আর উপশহরের বেলায় এই কথা খাটে। বড় বড় রাস্তা জনশূন্য হতে পারে, কিন্তু গরীব মানুষ বস্তিতে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়েছে।

হেঁটে চলা মানুষের সাথে আমি কথা বলে দেখেছি, ওরা প্রত্যেকে ভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে এটি কিন্তু তাদের জীবনে তুলনামূলকভাবে অতটা বড় চিন্তা নয়। আগামী দিনের বেকারত্ব, দুর্ভিক্ষ, পুলিশের সহিংসতা – এসবই কঠিন বাস্তবতা। সেদিন অনেকের সাথে কথা বলেছি। তার মধ্যে একদল মুসলমান দর্জিও ছিল, যারা সবেমাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মুসলমানবিরোধী আক্রমণের ধকল সামলে উঠেছে। এদের মধ্যে একজনের কথা আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁর নাম রামজিত, পেশায় কাঠমিস্ত্রি। হেঁটে হেঁটে সেই নেপাল সীমান্তবর্তী গোরখপুরের দিকে চলেছে।

‘হয়ত যখন মোদিজী এই কাজের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন কেউ তাঁকে আমাদের কথা বলেনি; হয়ত তিনি আমাদের কথা জানেন না,’ রামজিত বলল।

‘আমাদের’ মানে প্রায় ৪৬ কোটি মানুষ।

মার্কিন দেশের মত ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোও এই সঙ্কট মোকাবেলায় আরো সুবিবেচনা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন, সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী খাবার ও জরুরি জিনিসপত্র সরবরাহ করছে। এরা অর্থের জন্য মরিয়া আবেদন করেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সাড়া আশাব্যঞ্জক নয়। দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিলে টাকা নেই। তার পরিবর্তে শুভানুধ্যায়ীদের টাকা যাচ্ছে নতুন PM-CARES তহবিলে, যেটির অস্তিত্ব খানিকটা রহস্যময়। মোদির চেহারা সম্বলিত তৈরি খাবারের প্যাকেট নানান জায়গায় দেখা দিচ্ছে।

এর সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী তার যোগনিদ্রা ভিডিও জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করছেন। এই ভিডিয়োগুলোতে এ্যানিমেশনের মাধ্যমে সুঠাম দেহের চিত্রাঙ্কিত মোদি নানা যোগাসনের মাধ্যমে মানুষের একাকী থাকার মানসিক চাপ সামলানোর উপায় প্রদর্শন করেন।

এই ধরনের আত্মমগ্নতা গভীর উদ্বেগজনক। আচ্ছা, একটা আর্তি-আসন থাকলে কেমন হয়? এই আর্তি আসনের মাধ্যমে মোদি ফরাসী প্রধানমন্ত্রীকে বলবেন আমাদের ৭৮০ কোটি ইউরোর রাফাল ফাইটার বিমান ক্রয়ের প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তিটি মূলতবি রাখার অনুমতি দিন যাতে আমরা লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ফরাসীরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝবেন।
লকডাউনের দ্বিতীয় সপ্তাহে পণ্যপ্রস্তুতির যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ওষুধপত্র, জরুরি জিনিসের সরবারহ কম। মহাসড়কে হাজার হাজার ট্রাক অন্তরীণ, খাবার বা পানি প্রায় নিঃশেষ। যে ফসল ঘরে তোলার সময় এসেছে, সেসব ক্ষেতেই পচতে শুরু করেছে।

অর্থনৈতিক সঙ্কট একেবারে দ্বারপ্রান্তে। রাজনৈতিক সঙ্কট চলমান। মূলধারার সংবাদ মাধ্যম কোভিড-এর গল্প তাদের সার্বক্ষণিক বিষাক্ত মুসলমানবিরোধী প্রচারণার সাথে সম্পৃক্ত করেছে। তবলিগী জামাত নামে এক সংগঠন লকডাউন ঘোষণার আগে দিল্লীতে এক সমাবেশের আয়োজন করে। এই সমাবেশ সংক্রমণের একটা বড় কেন্দ্রবিন্দু বলে চিহ্নিত হয়। ব্যস, এই খবরটি মুসলমানদের হেয় প্রতিপন্ন করা, তাদের বজ্জাত হিসেবে চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহার করা হল। ভাবখানা যেন মুসলমানরাই এই ভাইরাস আবিষ্কার করেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে একধরনের জেহাদ হিসেবে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে।

কোভিড সঙ্কট আসা এখনো বাকি। বা হয়ত আসবে না। আমরা জানিনা। যদি বা যখন এই সঙ্কট আসে, আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে ধর্ম, জাতপাত আর শ্রেণী নিয়ে আমাদের সকল বিরাজমান ভেদবুদ্ধি অক্ষুণ্ণ রেখেই আমরা এই সঙ্কটের মোকাবেলা করব।

আজ (২ এপ্রিল) ভারতে প্রায় ২,০০০ নিশ্চিত সংক্রমণ ও ৫৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে। অত্যন্ত অল্পসংখ্যক পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এইসব সংখ্যা প্রাপ্ত, তাই এইসব সংখ্যা নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মাঝে মতভেদ আছে। কেউ বলছে লক্ষ লক্ষ লোকের মাঝে সংক্রমণ ঘটবে। কেউ বলছে অত বেশি মানুষ আক্রান্ত হবে না। যখন সঙ্কট আসবে, তখন তার চৌহদ্দীটা যে কী, সেটা হয়ত আমরা কোনদিনই জানতে পারব না। এখন এইটুকু মাত্র আমরা জানি যে হাসপাতালের সেবা নিয়ে কাড়াকাড়ি এখনও শুরু হয়নি।

বছরে প্রায় ১০ লক্ষ শিশু পেটের অসুখ, অপুষ্টি আর অন্যান্য অসুস্থতায় মারা যায়, লক্ষ লক্ষ যক্ষ্মা রোগী (ভারতে পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ যক্ষ্মা রোগী), জনসংখ্যার একটা বড় অংশ রক্তের স্বল্পতা ও অপুষ্টিতে ভোগে, ফলে অজস্র সামান্য ব্যাধিতেই এদের মৃত্যু হয় – এদেরই ভারতের সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা সদনগুলো সামাল দিতে পারে না। ইউরোপ আর মার্কিন দেশ আজ যেই সঙ্কটের মোকাবেলা করছে, ভা্রতের হাসপাতালগুলো সেই সঙ্কট সামাল দেবে কী করে?

ভাইরাসের সেবায় হাসপাতালগুলোতে আর সকল স্বাস্থ্যসেবা একরকম মূলতবী রাখা হয়েছে। দিল্লীর সুবিখ্যাত অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল সাইন্সেস-এর জরুরি বিভাগ বন্ধ, এই বিশাল হাসপাতালের আশে পাসে রাস্তায় বসবাসকারী শত শত ক্যান্সার রোগী – যাদের ক্যান্সার শরণার্থী বলে অভিহিত করা হয় – তাদের গরু-ভেড়ার মত তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মানুষ বাড়িতে অসুস্থ হবে, বাড়িতেই মারা যাবে। ওদের কথা হয়ত আমরা কোনদিন জানব না। এমনকি তাদের হিসেব পরিসংখ্যানও রাখবে না। আমাদের একটাই আশা, কয়েকটি গবেষণায় জানা গেছে ভাইরাস শীত পছন্দ করে - সেকথা যেন সঠিক হয়। (যদিও অন্যান্য গবেষকরা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।) অগ্নিঝরা, কঠোর গ্রীষ্মের জন্য এমন ব্যাকুলভাবে কোন জাতি অপেক্ষা করেনি।

আচ্ছা, আমাদের মধ্যে কী ঘটছে? এটা ভাইরাস, সে কথা ঠিক। ভাইরাসের নিজের তো কোন নৈতিক নিশানা নেই। তবে এটা ভাইরাসের অতীত আরো কিছু, সেটা নিশ্চিত। কারো বিশ্বাস, এর মাধ্যমে ঈশ্বর আমাদের সুমতি দেবার চেষ্টা করছেন। অন্যরা ভাবেন এটা চীনের চক্রান্ত, এর মাধ্যমে তারা সারা পৃথিবীর কর্তৃত্ব দখল করতে চায়।

করোনাভাইরাস যাই হোক, সে যেভাবে মহাশক্তিমানকে ধরাশায়ী করেছে, পৃথিবী থমকে দাড়িয়েছে, এমনটা আর কেউ করতে পারেনি। আমাদের মনের মধ্যে এখন ভীষণ উথাল-পাথাল, কবে আবার ‘স্বাভাবিকতা’-তে ফিরব তার আকুতি। আমরা অতীতের সাথে ভবিষ্যত জোড়ার মরিয়া চেষ্টা করছি, অতীত আর ভবিষ্যতের বিচ্ছেদকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এই বিচ্ছেদ অনস্বীকার্য। এই ভয়ঙ্কর হতাশার সময়ে আমরা নিজেদের জন্য পৃথিবী চালু রাখার যে সর্বনাশা যন্ত্র গড়ে তুলেছি, সেটা সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে এই বিচ্ছেদ আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে। পুরনো স্বাভাবিকতাতে প্রত্যাবর্তন সবচাইতে নিকৃষ্ট পথ।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় যে একেকটা বিশ্বমহামারি মানুষকে অতীতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে পৃথিবী সম্বন্ধে নতুনভাবে কল্পনা করতে বাধ্য করে। এবারও তার অন্যথা হবে না। এটি একটি পৃথিবী থেকে নবতর পৃথিবীতে পদার্পণের প্রবেশদ্বার।

সেই প্রবেশদ্বারে দিয়ে দুই ভাবে ঢোকা যায়। আমরা আমাদের পিছু পিছু আমাদের ভেদবুদ্ধি আর ঘৃণা, অর্থের লোভ, তথ্যের পাহাড় আর বস্তাপচা ভাবনা, আমাদের মৃত নদী আর ধূসর আকাশের গলিত মৃতদেহগুলো টানতে টানতে প্রবেশ করতে পারি। অথবা আমরা প্রবেশ করতে পারি হাল্কা পায়ে, যৎসামান্য মানসিক ভার সাথে নিয়ে, নতুন একটা পৃথিবীকে কল্পনা করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে। আর হ্যা, সেই নতুন পৃথিবীর জন্য লড়াই করবার প্রস্তুতিও থাকা চাই।

বইয়ের হাট গল্প প্রতিযোগিতার ফলাফল

বইয়ের হাট গল্প প্রতিযোগিতার ফলাফল।
বিজয়ী এবং অংশগ্রহণকারী সকলকে আমাদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন

৩য়ঃ মাহমুদুল করিম জিসান
গল্পঃ খোকা মিসড দ্য প্লেন
পুরস্কারঃ ১০০০ টাকার সমপরিমান বই

খোকাটা দেখতে দেখতে কেমন বড় হয়ে গেল! সেদিন তো সবাই অবাক, ওর বাবা একটা বাঁশি কিনে এনে পুঁউউউ করতেই সেটা নেয়ার জন্য হামা দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ কি ভেবে যেন টেবিলের পা ধরে ধুম করে দাঁড়িয়ে পড়ল! তিন-চার সেকেন্ডের বেশি যদিও দাঁড়াতে পারেনি, ধপাস করে পড়ে গেছে। তাতে কি, 'হাঁটিতে শিখে না কেহ না খেয়ে আছাড়' হুম!

তবে ঐ এক সমস্যা- এক্কেবারে খেতে চায় না। টিভি দেখিয়ে, গান শুনিয়ে, মোবাইল দিয়ে কত কিছু করে যে খাওয়াতে হয়! সেদিন সকালে বারান্দায় খোকার মা খোকাকে খাওয়াচ্ছিল। এমন সময় ওদের মাথার উপর দিয়ে বিকট শব্দে উড়ে গেল একটা ফাইটার প্লেন। খোকার মা বলল, ঐ যে দেখ প্লেন যাচ্ছে। তুমি এখন না খেলে প্লেন তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। এমন সময় গেল আরেকটা ফাইটার। ভয় পেয়ে হোক বা না হোক, খোকা কপকপ করে এক বাটি খিচুড়ি খেয়ে ফেলল!

রাতে যখন আবার খোকার মা ওকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, তখন খোকা বলল- পে-ন। ওর মা প্রথমে না বুঝলেও পরে বুঝল ওকে এখন প্লেন দেখাতে হবে, নইলে খাবে না।

বাড়ির পাশে রাস্তা দিয়ে জোরে শব্দ করে কোনো কিছু গেলেই এখন খোকা বলে ওঠে পে-ন পে-ন। আর হামা দিয়ে বারান্দায় যেতে চায়, যেন গেলেই দেখতে পাবে।

ওর মায়ের জন্য ভালোই হল। প্লেনের কথা বলে বলে, প্লেনের ছবি দেখিয়ে, ইউটিউব থেকে ভিডিও দেখিয়ে ওকে এখন খাওয়ানো যায়।

সেদিন দুপুরে খোকা আর ওর মা দুজনেই ঘুমাচ্ছিল। খোকার বাবা পাশের ঘরে টিভি দেখছিল। হঠাৎ খোকার ঘুম ভেঙে গেল। এমন সময় উড়ে গেল একটা প্লেন। শব্দ শুনেই খোকা খুশিতে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল পে-ন পে-ন। তারপর হামা দিতে শুরু করল। উড়ে গেল আরো একটা প্লেন। খোকার খুশি দেখে কে! মা মরণঘুম ঘুমাচ্ছে, বাবা দেখছে টিভি। এদিকে খোকা এগিয়ে যাচ্ছে। খাটটা বেশ উঁচু। খোকা এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে আর বলছে- পে-ন, পে-ন।

লোকে যখন খোকার মাকে বলে, কি গো, ছেলের মাথার পেছনে এমন কেটে গেল কীভাবে, খোকার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, খাট থেকে পড়ে গিয়ে।

খোকার মা জানে না খোকা যে প্লেন ধরতে গিয়েছিল, ধরতে পারেনি!


২য়ঃ নাহার তৃনা
গল্পঃ ফসকা গেরো
পুরস্কারঃ ৩০০০ টাকার সমপরিমান বই

সারারাত ঘুম হয়নি। পরদিন কোথাও যাবার থাকলে এমন হয়। সকালে চায়ের কাপে চুমুকটা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যেতে যেতে ভাবছি প্রথমে দুবাই, দুবাই থেকে নিউইয়র্ক, নিউইয়র্ক থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কানাডা। রুটপ্ল্যান পাকা। জায়গামত লোক আছে। এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমিরাতের কাউন্টার খোলার আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। মালামাল বুকিং দিয়ে ঝাড়া হাত পা নিয়ে ইমিগ্রেশানের মুখোমুখি। একটু টেনশান এখানে। কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাবেন, আগে গেছেন কিনা, দুনিয়ার আজাইরা প্রশ্ন। ধুকপুক করতে করতে এই অংশটাও পার হয়ে গেলাম। ফ্লাইটের আরো দেড় ঘন্টা বাকী। এখন আর কোন টেনশান নাই। নিজেকে মুক্ত মানব মনে হলো। এমেক্স লাউঞ্জে গিয়ে ফ্রি নাস্তাটা সেরে নেয়া যাক। নাস্তা সেরে গরম কফিতে চুমুক দিয়ে সামনের পত্রিকায় চোখ দিলাম। পত্রিকায় আজকে সব যেন সুখবর।

বোর্ডিং করার ঘোষণা ভেসে এলো স্পীকারে 'ফ্লাইট ইকে-০৯৮৭......' দ্রুত গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। সামনে বিশ পঁচিশ জনের মতো আছে। এগিয়ে যেতে শেষ পাঁচজনের মধ্যে চলে এলাম। এমন সময় পেছন থেকে লাইন ভেঙ্গে কেউ এগিয়ে আসতে থাকলে বিরক্ত হয়ে তাকালাম।

কালো চশমা পরা একজন এসে হাত চেপে আমাকে লাইন থেকে বাইরে নিয়ে এলো।
'জাহাঙ্গীর সাহেব, আরেকটু হলেই তো ফসকে গেছিলেন......'

চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে ভাবতে লাগলাম, কানাডায় পাচার করা দেড়শো কোটি টাকা এখন কার ভোগে যাবে?


১মঃ সৌরভ ভট্টাচার্য
গল্পঃ মোড়
পুরস্কারঃ ৫০০০ টাকার সমপরিমান বই

রণেন্দু ছিটকে সিটে শুয়ে পড়ল প্রায়। পাখিটা এমন আচমকা লাগল কাঁচে। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। ফ্লাইট সাড়ে পাঁচটায়। রণেন্দু আড়চোখে দেখল, উবেরের ড্রাইভার আয়নায় তাকে দেখেই চোখ ফেরাল। লজ্জা করছে, এতটা রিয়্যাক্ট করার কি ছিল? একটু আগেই গানটা বন্ধ করতে বলেছে, রূঢ়ভাবেই বলেছে। কিন্তু এমন কেন হচ্ছে? আর্লি ফরটিতে এত বড় প্রোমোশন মার্কেটিং-এর লাইনে ক'টা হয়?

“আপনি অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন বড় ধরণের কখনও?" অবান্তর প্রশ্ন। তবু করল।

ড্রাইভার মাথা নাড়ল।

ওয়াটস অ্যাপে একটা ফ্লাইট ক্রাশের ভিডিও এসেছে গ্রুপে। আজ সকালেই হয়েছে, নাইরোবিতে। পাখির ধাক্কায় নাকি ফ্লাইটটা ভেঙে পড়েছে।

ড্রাইভারের দৃষ্টিটা অস্বচ্ছ, সন্দেহ করছে?

সুদীপ্তকে বিট্রে করেছে? সুদীপ্ত'র মা অসুস্থ থাকত, ও অনিয়মিত ছিল, হতে পারে সে মোর capable, কিন্তু consistency-র কোনো দাম নেই?

গাড়িটা লিক হল। প্রচণ্ড বৃষ্টি। ধারেকাছে কোনো দোকান নেই। ফোন লাগছে না। ড্রাইভার নেমে গেল, মেকানিক আনতে গেছে। রণেন্দু একা। ঘাম হচ্ছে। এসি অফ্। কাঁচ নামাল। প্লেন যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। বিকট শব্দ। সুদীপ্ত'র মাকে রণেন্দু দেখেনি। নিজের মাকেও না।

ফ্লাইটটা মিস হবে বুঝতেই পেরেছিল। এয়ারপোর্টের দু'নম্বর গেটের মুখে কাকেদের তাণ্ডব, একটা কাক তারে শক খেয়ে মরে পড়ে। সুদীপ্ত'র মেসেজ ঢুকল, congratulations.
রাস্তায় দাঁড়াল। মাথার উপর কাকের জটলা।

ফাইজারে একটা অফার আছে। ছেড়ে দিলে হয় না? একটা কুকুর কাকটাকে মুখে করে দৌড়াচ্ছে।

“Sudipta, I quit."

বাস স্টপে দাঁড়াল রণেন্দু।

‘আবার অলিভ’ এলিজাবেথ স্ট্রাউটের বই সমালোচনা NPR থেকে অনুবাদ করেছেন আশফাক স্বপন



বই সমালোচনা
‘আবার অলিভ’ উপন্যাসে এলিজাবেথ স্ট্রাউট পুরনো বান্ধবীর সাথে আবার মিলিত হয়
হেলার ম্যাকআল্পিন
১৭ অক্টোবর, ২০১৯

অনুবাদ আশফাক স্বপন

মূল রচনা
In 'Olive, Again,' Elizabeth Strout Revisits An Old Friend
By Heller Mcalpin
October 16, 20197:00 AM ET

আলোচিত বই:
Olive, Again
By Elizabeth Strout
Hardcover, 289 pages

লেখিকার সাক্ষাৎকার (ইংরেজি)


অলিভ কিটরিজ বিদ্যালয়ে অঙ্কের শিক্ষয়িত্রী। স্বভাবে খিটখিটে কিন্তু প্রথম পরিচয়েই তার প্রতি মায়া পড়ে যায়। এখন অবসরপ্রাপ্ত, কিন্তু জীবন থেকে অবসর নেন নি মোটেও। এই অলিভকে নিয়ে রচিত গল্পসঙ্কলনের জন্য এলিজাবেথ স্ট্রাউট মার্কিন দেশের সবচাইতে নামজাদা সাহিত্য পুরস্কার পুলিৎজার প্রাইজে সম্মানিত হন। তার ১০ বছর পর লেখিকা আরো সাম্প্রতিক ঘটনার সংবাদ নিয়ে মেইন অঙ্গরাজ্যের উপকূল অঞ্চলে দৃষ্টি ফেরালেন তার নতুন গল্পের ঝাঁপি, প্রথমবারের মতই, অপূর্ব।

Olive, Again (আবার অলিভ) উপন্যাসটি রসাস্বাদনের জন্য প্রথম সঙ্কলন Olive Kitteridge (অলিভ কিটরিজ) পড়ার প্রয়োজন নেই, তবে পড়ার জন্য মন আঁকুপাঁকু করবেঅঙ্কনশিল্পে চিত্রের প্রাথমিক রঙের আস্তরণের মতো গল্পের প্রথম সঙ্কলনটি কাহিনিকে গভীরতা দেয়, তাকে আরো বাঙ্ময় করে তোলে। দ্বিতীয় কিস্তির বইটির সূত্রপাত সম্বন্ধে স্ট্রাউট লিখেছেন: ‘এই যে অলিভ! আমাকে এখনো অবাক করে চলেছে। আমাকে রাগিয়ে দেয়, মনে কষ্ট দেয়, আবার ওকে ভালোও বেসে যাই।’

এই যে এলিজাবেথ স্ট্রাউট! আমাকে এখনো তাক লাগায় (যদিও আর অবাক হই না।) Amy and Isabel’ (‘এমি এবং ইসাবেল’) থেকে শুরু করে  Anything is Possible’ (‘যে কোন কিছুই সম্ভব’) পর্যন্ত বইয়ের পর বইয়ে তিনি তাঁর নানান চরিত্রের মনোকষ্ট আর দুশ্চিন্তার গভীরে চলে গেছেন; অতি স্বচ্ছ দৃষ্টিতে, দরদের সাথে তাদের জীবনের আক্ষেপ, জীবনের রমণীয় মুহূর্ত, তাদের দোষেগুণে ভরা মানবিক পরিচয়কে তার রচনায় ধারণ করেছেন। শেরউড এ্যান্ডারসন তারWinesburg, Ohio’ (‘ওয়াইন্সবার্গ, ওহায়ো’) বইয়ে কাহিনির ঘটনাচক্র বয়ানের একটি কাঠামো সৃষ্টি করেছিলেন। মেইন অঙ্গ্রাজ্যের ক্রসবি উপশহরের মানুষের জীবন সময়ের হাত ধরে তিল তিল করে কী করে এগিয়ে যায়, স্ট্রাউট তার একটা সম্মিলিত চিত্র সৃষ্টি করতে গিয়ে এ্যান্ডারসনকেও টেক্কা দিয়েছেন।    

‘অলিভ কিটরেজ’-এর গল্প যেখানে শেষ হয়েছিলে, তার কিছু পরেই নতুন উপন্যাসের গল্প শুরু হয়। প্রথম গল্পসঙ্কলনে আমরা জেনেছি স্বামী হেনরির মৃত্যুর পর আমাদের কপরিচিত খিটখিটে স্বভাবের মূল চরিত্রটি খুব একা হয়ে গিয়েছেতখন হার্ভার্ড অধ্যাপক জ্যাক কেনিসনের সাথে অলিভের সখ্যতা গড়ে ওঠে। ব্যাপারটা একটু অবাক করার মতো, কারণ স্বামীর জীবদ্দশায় হেনরি আর অলিভ জ্যাককে একজন বহিরাগত, উদ্ধত, দাম্ভিক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভেবে খারিজ করে দিয়েছিল। জ্যাককে নদীর পারের এক পথে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় অলিভ আবিষ্কার করার পর তার ধারণা পালটায়। অলিভ জানতে পারে, তার মতো জ্যাকেরও কিছুদিন আগেই পত্নীবিয়োগ ঘটেছে। তার মতো জ্যাকেরও একমাত্র সন্তানের সাথে সম্পর্কে গভীর দূরত্ব রয়েছে বলে আক্ষেপ হয়।  

‘আবার অলিভ’ উপন্যাসের সূচনায় আমরা দেখি তাদের সেই সম্ভাবনাময় যোগাযোগটি হারিয়ে গিয়েছে। অনেকটা
missed call-এর মতো। নতুন উপন্যাসে জ্যাকের সাথেই আমাদের আবার দেখা হয় প্রথম। গল্প বলার কৌশলটি চমৎকার, এর ফলে আমরা খানিকটা দূর থেকে অলিভ কেমন আছে সেটা জানতে পারি। অলিভের সাথে বিশ্রী ছাড়াছাড়ির তিন সপ্তাহ পর জ্যাক তার চৌকশ লাল টকটকে ছাদখোলা গাড়ি চালিয়ে পোর্টল্যান্ড শহরে যায় একটা পানশালায় গলা ভেজাতে। সে জীবনের নানান হতাশার কারণগুলো সম্বন্ধে আবার ভেবে ভেবে ঠিক করে হয়তো এটাই তার পাওনা। নিজের সমকামী কন্যার প্রতি তার নির্মম দুর্ব্যবহার, তার প্রতি স্ত্রীর বিরাগ (স্ত্রীর পুরনো প্রণয়ীর কাছ থেকে প্রাপ্ত একটি উদ্বেগজনক ইমেল ব্যাপারটি সম্বন্ধে তাকে নতুনভাবে ভাবায়)– এই সব কিছু নিয়ে সে আক্ষেপ করে। আজ ৭৪ বছর বয়েসে সে ভাবে: ‘আচ্ছা, জীবনে সৎভাবে কী করে চলা যায়?’ সে যখন এসব বেদনাদায়ক স্মৃতিতে আচ্ছন্ন, তখন এক ঝটকায় তাকে বাস্তবে নিয়ে আসে এক ট্রাফিক পুলিশ। পুলিশ তাকে দ্রুতিসীমা লঙ্ঘনের জন্য থামায়। তর্কাতর্কি খানিকটা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের রূপ নেয়, তাতে শ্রেণিবিভাজনের ছায়া পড়ে।

একাকীত্বের পাশাপাশি শ্রেণিবিভাজন, উন্নাসিকতা – এসব স্ট্রাউটকে বিশেষভাবে ভাবায়। এবার দৃষ্টি চলে যায় খিটখিটে স্বভাবের অলিভের ওপর। আমরা জানতে পারি যে সে ‘ঐ অসহ্য, বড়লোক বুড়োটার’ ওপরে মহা খাপ্পা। সন্তান্সম্ভবা এক মায়ের অভিষেক অনুষ্ঠানে গিয়ে তার মনে হয়ে খুবই বালখিল্য অনুষ্ঠান, কিন্তু এক অতিথির জরুরি সন্তান প্রসবে অলিভ ঠাণ্ডা মাথায় সাহায্য করে সবার সমীহ আদায় করে। সেই কথা কাউকে বলার জন্য সে অধীর হয়ে ওঠে। ছেলে ক্রিস্টোফারের সাথে তার সম্পর্ক অতি শীতল, তবু সে তাকে ফোন করে। ছেলে পাত্তাই দেয় না। অলিভ জানে, জ্যাকের প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হতো।

আগ বাড়িয়ে সবখানে নাকগলানো অলিভের স্বভাবে মজ্জাগত, পরচর্চাতেও সে আনন্দ পায়, কিন্তু তার মনে মায়া-দয়াও রয়েছে। মানুষ পরস্পরকে সাহায্য করলে উভয়ে যে সুফল ভোগ করে, এইসব নানান গল্পে সেটা ফুটে ওঠে। মৃত্যুপথযাত্রী এক অল্পবয়স্কা মহিলার মনে হয় তার সব বন্ধুরা তাকে ত্যাগ করেছে। অলিভ তার সাথে দেখা করতে যায় বলে সে কৃতজ্ঞ বোধ করে। কিন্তু অলিভ যখন তার কাছে জ্যাকের সাথে তার ঝগড়ার কথা বলে তখন মহিলার খটকা লাগে। তার মৃত্যু সমাসন্ন বলেই কি অলিভ তাকে এসব কথা বলছে? অলিভ উত্তরে বলে না, মোটেই সেজন্য নয়। তার সাথে এসব কথা বলতে সে কোন সঙ্কোচ অনুভব করে না, তাই সে বলেছে।

যখন লারকিন পরিবারের কাছে আমরা আবার ফিরে আসি তখন এক হৃদয়বিদারক কাহিনির ভেতর স্ট্রাউট একটি হৃদয়স্পর্শী সত্য আবিষ্কার করেন। ‘অলিভ কিটরিজ’-এ আমরা পড়েছি লারকিন বাড়ির পুত্র এক মহিলাকে ২৯ বার ছুরিকাহত করার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড লাভ করে। লারকিন বাড়ির মেয়ে সুজ্যান বড় হয়ে বাবার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ক্রসবি ফিরে আসে পারিবারিক উকিলের সাথে সাক্ষাত করতে। আমরা তার পারিবারিক ইতিহাসের আরো কিছু মর্মান্তিক ঘটনা সম্বন্ধে জানতে পারি। কিন্তু ওদের দুজনের কথোপকথনের পর আমাদের মন আবার অনেকটা শান্ত হয়ে যায় – যেমনটা সুজান ও তার উকিলও হয়। সেই কথোপকথন উভয়ের মনকে উজ্জীবিত করে, তাতে উভয়ের মন বেশ হাল্কা হয়।

‘আবার অলিভ’ বারবার সহনশীলতার সীমানা চিহ্নিত করে, মানবচরিত্রের বহুবিচিত্র প্রকাশের ওপর দৃষ্টিপাত করে – কখনো বেশ বলিষ্ঠভাবে। The End of the Civil War’ (‘গৃহযুদ্ধের দিনগুলোর শেষে’ )শীর্ষক একটি অধ্যায়ে এক দম্পতি ৪২ বছরের বিবাহিত জীবনে ৩৫ বছর পরস্পরের সাথে প্রায় বিনা বাক্যালাপে কাটিয়ে দিয়েছে। বাবার শখ গৃহযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রের ঐতিহাসিক অবস্থার পুনর্নিমাণ, আর কন্যার আগ্রহ এক বিশেষ ধরনের যৌন-অভিজ্ঞতায়, যেখানে নারী শক্তিরূপিনী বা dominatrix হয়ে ওঠে। লেখিকা এই দুই ধরনের অভিনয়ে বিস্ময়কর মিলের সন্ধান পান।

Poet’ (‘কবি’) অলিভের নিজেকে আবিষ্কার করবার বেদনাময় প্রক্রিয়া নিয়ে একটি অপূর্ব অধ্যায়। এটি (‘যে কোন কিছু ঘটতে পারে’ অধ্যায়ের মত) নিজের আদি শহরে একজন অধুনা বিখ্যাত লেখকের প্রত্যাবর্তন নিয়ে। এ্যান্ড্রিয়া ল্যরিউ অলিভের এক পুরনো ছাত্রী, বড় হয়ে এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় কবি হয়েছিল। স্থানীয় কফিশালায় ওর সাথে যখন অলিভের দেখা হয়, তখন সে তার পুরনো ছাত্রীর ছেলেবেলার কথা মনে করে। সে একটি ফরাসীভাষী কানাডিয়ান ক্যাথলিক পরিবারের সদস্যা, আট ভাইবোনের একজন। অলিভের মনে পড়ে সে কেমন মনমরা, একাকিনী ছিল, তার মধ্যে অলিভ বিশেষ সম্ভাবনা দেখতে পায়নি। পরে অলিভের সাথে খোলামেলা কথোপকথনের ভিত্তিতে এ্যান্ড্রিয়া তাকে নিয়ে যে কবিতা লেখে, সেটা কে একজন বেনামীতে অলিভকে পাঠায়, তখন এ্যান্ড্রিয়া কি নির্ভুল নিশানায় তাকে, তার একাকীত্বকে শনাক্ত করে সেটা লক্ষ করে অলিভ প্রথম প্রথম গ্লানিতে স্তম্ভিত হয়। তবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অলিভ উপলব্ধি করে যে – লেখিকার ভাষায় - ‘অন্যরকম, পর হয়ে সমাজে থাকার অভিজ্ঞতা কী, সেটা এ্যান্ড্রিয়া তার চাইতে বেশি ভালো বুঝতে পেরেছে।’

স্ট্রাউটের ব্যাপারে এটাই বিশেষ লক্ষণীয়: তার চরিত্রগুলো ভীষণ কষ্টের মধ্য দিয়ে যায় – স্বামী বা স্ত্রীর কাছে অত্যাচার, বাবা-মায়ের অবহেলা, বয়সবৃদ্ধির বিড়ম্বনা (এর মধ্যে স্বাধীনতা খর্ব হওয়া, প্রাপ্ত বয়স্কদের ডায়াপার পরার কথাও রয়েছে), হৃদয়-ছারখার-করা অসহ্য একাকীত্ব। কিন্তু  অদ্ভুত চারিত্রিক ঋজুতা রয়েছে এইসব মানুষের। অলিভ বড্ড কড়া আর একরোখা, কিন্তু সেও যদি বুঝতে পারে যে একটুখানি সহমর্মিতা পুরো চিত্রটি পালটে দিতে পারে, তাহলে আমরা পারব না কেন? ‘তোমার জীবন কেমন চলছে গো, বেটি?’ অলিভ বেটি নামের এক গৃহ স্বাস্থ্য সেবিকাকে জিজ্ঞেস করে। তার গাড়িতে একটা ছোট্ট স্লোগান দেখে সে বিরক্ত হয়েছিল, তবুও সে প্রশ্নটা করল। এই প্রশ্নটাই আসল জিনিস, সহমর্মিতার পথে প্রথম পদক্ষেপ। ‘আবার অলিভ’ আমাদের হৃদয়স্পর্শীভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, সহমর্মিতা ভালোবাসার পূর্বশর্ত। এতে জীবন আর অসুখী থাকে না।


প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট