কথা সাহিত্য নিয়ে আড্ডায় স্মরণজিৎ চক্রবর্তী এবং প্রচেত গুপ্ত


কথা সাহিত্য নিয়ে আড্ডায় স্মরণজিৎ চক্রবর্তী এবং প্রচেত গুপ্ত

একজনের পছন্দ ছোটগল্প, অন্যজন ভালবাসেন। উপন্যাসের বৃহৎ পরিসর। তবু নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে পাঠকমন স্পর্শ করতে পেরেছেন প্রচেত গুপ্ত এবং স্মরণজিৎ চক্রবর্তী, এই দুই গদ্যকারই। তাঁদের আড্ডায় সূত্র ধরিয়ে দিলেন সুবর্ণ বসু।

দেশ পত্রিকার আয়োজনে মুখোমুখি হলেন এইসময়ের দুই জনপ্রিয় গদ্যলেখক। জনপ্রিয়তার ভাল-মন্দ, লেখালিখির অভিযাত্রা, লেখায় অগ্রজ লেখকদের প্রভাব থেকে শুরু করে বহু বিষয় উঠে এল তাঁদের কথোপকথনে। সমসাময়িক লেখালিখি নিয়ে কোথাও হয়তো একটু সাবধানী, আবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের প্রতি ঈষৎ বিরক্তি... মনের কথা লুকোলেন না কেউই। আবার লেখায় রসবোধ বা পাঠকের প্রতি বিশ্বাসের দিক থেকেও পরস্পরের সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পেলেন এঁরা...
সুবর্ণ বসু: বই বিক্রি হওয়াকে যদি জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ মাপকাঠি ধরি, তা হলে আপনারা এই মুহুর্তের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের অন্যতম। আপনাদের দুজনকেই জিজ্ঞেস করব, জনপ্রিয় লেখকরা কি লেখার সময় পাঠকের প্রতিক্রিয়া মাথায় রেখে লেখেন? নিজস্ব গল্প বলার পাশাপাশি পাঠকের আগ্রহ জিইয়ে রাখার যোগবিয়োগও কি চলতে থাকে?

প্রচেত গুপ্ত: লেখা পাঠক পড়বে কি না, সেটা আবার পরে জনপ্রিয় হবে কি না, তা কিন্তু কোনও ফরমুলা দিয়েই বোঝা যায় না। আমার মনে হয় না সেটা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভাবতেও পারেন। যদি ভাবা যেত, যে অমুক লিখলে পাঠক পড়বে, তা হলে সকলেই কোনও না-কোনও ভাবে চেষ্টা করত। এটা এভাবে করা যায় না, এটা ভেতরে থাকে। পাঠকের সঙ্গে লেখার মাধ্যমে কমিউনিকেট করতে হয়। আমি যখন লিখি, আমার লেখার ফর্ম, কনটেন্ট, আমার লেখার শিরদাঁড়া, মানে যে বিষয়কে কেন্দ্র করে আমি লিখি, তা কোথাও গিয়ে পাঠককে স্পর্শ করে। এক-একজন পাঠককে এক-একরকমভাবে স্পর্শ করে। আর স্পর্শ করে বলেই হয়তো তাঁরা পড়েন। পড়ার কথা অনেক পরে আসে। কেউ যদি নাও পড়তেন, তা-ও তো আমি এই ফর্মেই লিখতাম! কারণ, অন্য কোনও ফর্মে লিখতে আমি পারতাম না। লিখতে বসে জনপ্রিয়তার কথা ভাবার কোনও অবকাশ নেই, তার প্রশ্নও ওঠে না। আমি যদি লিখতে গিয়ে ভাবি, আমার অমুক লেখাটা অনেক পাঠক পড়েছিলেন বা কোনও জনপ্রিয় উপন্যাসের কথা আমাকে অনেকে বলেছেন, তাই আমি লেখার সময় ওটাকে মাথায় রাখব, এটা কখনওই হয় না। আমার মতে, কোন লেখা পাঠককে কীভাবে স্পর্শ করবে, এটা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যাপার।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী: কী করে সফল বা জনপ্রিয় হওয়া যায়, আমি জানি না। আমি শুধু একটা জিনিসই জানি যে, আমি নিজে খুব অস্থির মানুষ। এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকা, একটা কাজ নিয়ে অনেকক্ষণ পড়ে থাকা আমার পক্ষে খুব কষ্টকর। তাই আমি যখন লিখছি, আমি এমনভাবে লেখার চেষ্টা করি, যাতে আমার নিজের লেখাটা সম্বন্ধে টান বা আগ্রহটা জিইয়ে রাখতে পারি! তো সেইভাবে লেখাটা শেষ করতে পারলেই আমি খুশি। এখন আমার কিছু লেখা যদি কয়েকজনের ভাল লেগে থাকে, তা হলে বুঝতে হবে একটা বিশাল শ্রেণিগোষ্ঠীর মধ্যে কোথাও এমন একটা কমন কর্ড আছে, যে তারে হাত পড়লে সকলেই একসঙ্গে ঝনঝন করে বেজে ওঠে। সেই তারে যে-যে হাত দিতে পারেন, তিনিই বহু মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারেন। জনপ্রিয়তাও আসলে একরকমের কমিউনিকেশন যে, কতজন আমার সঙ্গে একাত্ম বোধ করছেন, আমার অভিজ্ঞতাকে তাঁদের নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারছেন... কোনও লেখা জনপ্রিয় হবে কি না, তা তো আমার হাতে নেই।
সুবর্ণ : লেখকদের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা তৈরি হওয়ার পর কি লেখক বেশি সাবধানী হয়ে পড়েন? তাঁদের ফর্ম, ন্যারেটিভ বা নতুনত্ব নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার সাহস কি কমে যায়?
স্মরণজিৎ : এইটা আমার ক্ষেত্রে উলটো হয়েছেআমি প্রথম-প্রথম খুব সাবধান থাকতাম। প্রথমে যেহেতু একটু-আধটু কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি, তাই কিছু সিমিলি, মেটাফর এমনভাবে চলে আসত যে, ওই দিকেই লেখা বাঁক নেওয়ার চেষ্টা করত। আমি তখন সাবধান থাকতাম, সেসব যেন না হয়, গদ্য যেন গদ্যের মতোই হয়। এখন আর সতর্ক থাকি না। আর কোনও ভয় আমার মধ্যে কাজ করে না। ভয় পাবই-বা কেন? আমার প্রথমেও কিছু ছিল না, এখনও কিছু নেই। শূন্য হাতেই এসেছিলাম, শূন্য হাতেই তো যেতে হবেভয় নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে আসে যদি আমার লেখা না পড়ে। কিন্তু এ ব্যাপারটা আমার হাতেই নেই। আমার হাতে আমার লেখাটুকুই আছে, পছন্দটুকু আছে... যে সময়টুকু লিখছি, সে সময়টুকু ওই লেখাটার মধ্যে আমাকে ভাল করে কাটাতে হবে। লেখার সময়টুকু আমি যেন ভাল থাকি। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই ভয় বা সাবধানতা নেই। প্রচেতদার এ ব্যাপারে কী মত?
প্রচেত : আমার নিজের মনে হয়, আমি যখন লিখি, তখন কেন লিখছি, এই প্রশ্নটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। লিখতে বসলাম কেন, বা এরকম একটা গল্প আমি ভাবলাম কেন, অমুক লাইনটা লিখলাম কেন, এটা নিয়ে আমি ভাবি। হয়তো লিখে মনে হল, কমবয়সি পাঠকপাঠিকাদের হয়তো গল্পটা বেশি ভাল লাগবে... কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখলাম একজন আশি বছর বয়সি মানুষ এই গল্পটারই খুব প্রশংসা করলেনএতে আমি যে খুব খুশি হলাম তাও নয়। আমার মনে হতে লাগল, উনি পড়বেন জানলে আমি তো বিষয়ের আরও একটু গভীরে ঢোকার চেষ্টা করতাম। আবার উলটো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার পর সাবধান হয়ে যাওয়া, এরকম ঘটনা একেবারেই ঘটেনি। আমি স্মরণজিতের সঙ্গে একেবারে একমত যে, সাবধান হওয়ার তো কোনও জায়গাই নেই। কারণ, কিছুই আমাদের হাতে নেই...
স্মরণজিৎ : আচ্ছা, আমি প্রচেতদাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি যে, ধরো তুমি প্রথমে যেরকম লিখতে, মানে আজ থেকে পনেরো বছর আগে, তখন যেমন লিখতে আর আজ যেরকম লিখছ... সাবধানতার কথা বলছি না, তোমার পাঠকরাও অনেক বদলে গিয়েছে, এটা মাথায় রাখো?
প্রচেত : আমিও তো বদলে গিয়েছি। এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মধ্যে চলে আসে। পনেরো বছর আগে যখন আমি আমার যা আছে উপন্যাসটি লিখেছিলাম, তখন মোবাইল ফোনের একটা বড় ভূমিকা ছিল, সেখানে ছিল যে, কারও হাতে মোবাইল ফোন দেখে প্রোটাগনিস্ট অবাক হয়ে যাবে। এখন তো আর তেমন কিছু লিখে আমি কোনও রসবোধ তৈরি করতে পারব না। শুধু গ্যাজেটস বলছি না, মানুষের মনের, মানসিকতারও পরিবর্তন হয়েছে। ধরো, তুমি যখন তোমার প্রথম উপন্যাস পাতাঝরার মরশুমে লিখেছ, আর এই সময়ে দাঁড়িয়ে যখন তুমি ফিঙে বা দোয়েল সাঁকো লিখছ, তুমি তো নিজেও এই বদলটার মধ্যে দিয়েই আসছ।
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, আমি নিজে দেখেছি এই বদল। আমার টিন এজ কেটেছে মফসসলে, নব্বইয়ের মফস্সল। তখন দেখেছিলাম, নারী-পুরুষের মেলামেশাটা অনেক বেশি দুর্লভ ছিল, অনেক বেশি মহার্ঘ ছিল। যখন পাতাঝরার মরশুমে লিখেছিলাম, তখন এই অনুভূতিটা কাজ করেছিল। কিন্তু এখন যখন সেই বয়সিদের দিকে তাকাই, দেখতে পাই, একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ের মেলামেশার মধ্যে সেই মহার্ঘ ব্যাপারটা আর নেই! এটা একটা সামাজিক পালাবদল, আর এর মধ্যে যেহেতু আমি নিজেও আছি, তাই অবচেতনে এগুলো আমাকে দিয়ে অন্যরকমভাবে লিখিয়ে নেয়। কিন্তু সচেতন উদ্যোগে বা চেষ্টায় কখনওই মনে হয় না যে, এটা লেখালিখি করার সঠিক রাস্তা হওয়া উচিত। বা এইভাবে লিখলে চেকমেট হবেই।
প্রচেত : কোনও ক্ষেত্রেই এটা হওয়া সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। একটা গল্প লেখার ক্ষেত্রে আমাদের মন-প্রাণটুকুই আমাদের ইনভেস্টমেন্ট। ম্যাজিক ফরমুলা কারও হাতেই নেই, সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত।
স্মরণজিৎ : এখানে আমি একটা লাইন অ্যাড করতে চাই। জনপ্রিয়তার কোনও ফরমুলা হয় না। যখন কেউ জনপ্রিয় হয়ে যান, তখন তাঁকে দেখে বা তাঁর কাজটা দেখে অন্যরা ফর্মুলা তৈরি করার চেষ্টা করেন বা ধরে নেন যে, কোনও ফর্মুলা রয়েছে। কিন্তু সে নিজে কোনও ফরমুলায় চলে না, সেটা তার নিজের ধাঁচ বা ধরন।
সুবর্ণ : তা হলে পরীক্ষানিরীক্ষা একইভাবে চলতে থাকে বলছেন?
প্রচেত : নিশ্চয়ই, আমি যেভাবে লিখতে শুরু করেছিলাম, প্রচুর মানুষ পড়েছেন, কিন্তু আমি তো সেই ফর্মটা ধরে রাখিনি, আমার সাম্প্রতিক সময়ের লেখালিখি পড়লেই বুঝতে পারা যাবে...
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, এই প্রসঙ্গে প্রচেতদাকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই যে, প্রথমদিকে আপনার গল্পে যে সুন্দর স্নিগ্ধ ফ্যামিলি-স্টোরি থাকত, পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই বদলে গিয়েছে, এখনকার প্রচেত গুপ্ত যেন অন্য এক প্রচেত গুপ্ত ...
প্রচেত : হ্যাঁ। ঠিকই। প্রথম দিকে আমার চিন্তাভাবনায় থাকত চরিত্র দু'ধরনের, সাদা আর কালো। তারপর দেখলাম মানুষ শুধু কালো আর সাদা হয় না, তার মাঝখানে অনেক ধূসর মানুষ আছেন।
স্মরণজিৎ : তোমার এবারের উপন্যাস হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে-তে দেখা গিয়েছে অদ্ভুত একটা ডার্কনেস, যেটা তোমার চাঁদের বাড়ি লেখার সঙ্গে একেবারেই মেলে না...
প্রচেত : হ্যাঁ, স্মরণজিৎ, আমি তো বদলে গিয়েছি, আমার ভাবনারও অনেক বদল ঘটেছে...
স্মরণজিৎ : এই বদলটা কীভাবে এল? এটা কি সচেতন বদল? নাকি একদিন হঠাৎ করে লিখতে গিয়ে তুমি দেখলে যে, তুমি সাবকনশাস মাইন্ডে এক গলি থেকে অন্য আর-একটা গলিতে এসে পড়েছ?
প্রচেত : শুধু লিখতে লিখতেই নয়, আমার জীবনযাপন, আমার মানুষকে দেখা, যেভাবে আমি জীবনকে দেখি, আমি তো আবার খানিকটা ম্যাজিক রিয়্যালিজমের মধ্যে ঢুকে যাই...
স্মরণজিৎ : এগজ্যাক্টলি! সেটাই বলছি, এটা কি সচেতন প্রচেষ্টার ফল?
প্রচেত : না, আসলে তখন আমি বুঝে গিয়েছি যে, মানুষ শুধু সাদা-কালো নয়, তাদের মধ্যে আরও নানা জটিলতা আছে,  ঘোরপ্যাঁচ আছে, তার একাকিত্ব, তার জীবনদর্শন... সেগুলো আমাকে আরও বেশি করে ভাবাচ্ছে...
স্মরণজিৎ : আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে কষ্ট পাওয়া, প্রতারিত হওয়া, এগুলোও তো আমাদের মোটিভেট করে...
প্রচেত : ট্রিগার করে...
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, আমাদের পারসেপশনটাকে চেঞ্জ করে দেয়, সেরকম কিছু কি তোমার ক্ষেত্রে...
প্রচেত : সবটাকে আমার ব্যক্তিগত বলব না, আমি চারপাশটা দেখি, আমার চেনা কেউ, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, এই সব কিছুই আমি দেখার চেষ্টা করেছি। তাই তো হওয়া উচিত, যিনি লিখবেন বা আঁকবেন, তাঁরা তো সবসময়ই চাইবেন, মানুষের ভেতরটা দেখতে! তোমার দোয়েল সাঁকো-তে ছেলেটা যখন সাঁকো তৈরি করতে যাচ্ছে, তুমি লিখছ দোয়েল পাখিরা এসে সাঁকো তৈরি করছে, তাদের ঠাকুমার প্রেম, এসব কথাগুলো কি তখন চরিত্রগুলো জানে? জানে না। তুমি তাদের ভিতরে ঢুকে গিয়ে দেখতে পাচ্ছ, তাই তো? একটা রূপকথা, অথচ কঠিন বাস্তবের বুকে গড়ে ওঠা রূপকথা। লেখকের কাজই তো দেখা, না দেখতে পেলে জীবনকে বুঝতেই-বা পারবে কী করে! তুমি তো কারও বুক চিরে তার হৃদয়ে উকি মারতে পারবে না! এই ভাবনা থেকেই আমার লেখায় ডার্কনেস এসেছে, যে ডার্কনেসের মধ্যেও আবার শক্তি আছে, ভালবাসার, মূল্যবোধের, মানবিকতার, সততার, মায়া-মমতার। স্মরণজিতের লেখা সম্বন্ধে অনেকেই বলেন যে, কীসব বাচ্চা ছেলেমেয়েদের প্রেম নিয়েই শুধু লেখে... কথাটা কিন্তু একেবারেই অসম্পূর্ণ! ভুল বলব না, তবে অনেকাংশেই অসম্পূর্ণ। কারণ, ও বড়দের চরিত্রও গভীর ভাবনাচিন্তা করে তৈরি করে, ঠাকুমার অতীতের প্রেম, তার স্মৃতিচারণের স্নিগ্ধতা এত মন ছুঁয়ে যায়, পাঠকরা যেন ঠাকুমাকে মনে-মনে জড়িয়ে ধরে। এটা ওর চরিত্র তৈরির গুণ। এই প্রসঙ্গে স্মরণজিৎকে আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, তোমার উপন্যাস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটা ভায়োলেন্স দিয়ে শুরু হয়, মানে মারপিট, রক্তারক্তির ভায়োলেন্স নয়...
স্মরণজিৎ : ইনার ভায়োলেন্স...
প্রচেত: হ্যাঁ, সেইভাবে শুরু হওয়ার পর যখন শেষ করো, তখন একটা আউটার ভায়োলেন্স থাকতে পারে, কিন্তু শেষ অবধি আশ্চর্য মমতার বোধ নিয়ে শেষ হয়... এটা কি একটা উলটো জার্নি নয়?
স্মরণজিৎ : আসলে আমি আমার নিজের জীবনে দেখে এসেছি যে, রাগ করে থেকে আসলে কিছু হয় না। নিজেও ভাল থাকা যায় না, আশপাশের কাউকে ভাল রাখাও যায় না। কিন্তু আমরা তো ভাল থাকতে চাই! এত পরিশ্রম, এত চেষ্টা তো ভাল থাকার জন্যই। তাই আমার চরিত্রদের মধ্যে একটা কষ্ট থাকে, না-পাওয়া থাকে, রাগ-অভিমান থাকে। আসলে আমরা সবাই শান্তির জায়গাটা পেতে চাই। স্মরণজিৎ তার বাইশ বছর বয়সে অনেক বেশি রাগী ছিল, সে রাস্তায় মারামারিও করেছে অনেকবার, কিন্তু বিয়াল্লিশ বছর বয়সে এসে স্মরণজিৎ তার মেয়েটাকেও বকে না। শুধু মনে হয়, যদি একটু মিষ্টি করে, ভাল করে বলে, বুঝিয়ে ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায়... আমি নিজেও শান্তির জায়গাটাকেই খুঁজি সবসময়। মনে হয় যেন আমার জন্য কারও কোনও ক্ষতি না হয়, যেন পাঁচজনকে ভাল রাখতে পারি। না-পাওয়া তো জীবনে থাকেই, কিন্তু সেটা মেনে নিতে পারাটাও ম্যাচিয়োরিটির পরিচয়। যেমন আমি ফুটবল খেলতাম, একটা সময়ের পর আর পারলাম না, সেটা মেনে নিতে হল। সবাই সব কিছু পারে না। ব্যর্থতা স্বীকার করে নিতে হয়। আমি যাকে ভালবাসতাম, সে আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলল। তাতে কী হয়েছে! বুঝতে হবে, আমি তাকে যতটা ভালবেসেছিলাম, সে আমাকে ততটা ভালবাসেনি! ইগো সরিয়ে রেখে ভাবলেই আমাদের সামনে বাস্তব অনেক পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠে। মাথা ঠান্ডা রেখে মন দিয়ে অনেক বেশি কাজ করা যায়।
সুবর্ণ : স্মরণজিৎদা আপনার প্রিয় লেখক কে? লেখায় তাঁর প্রভাব আসতে চায়? এলে কী করেন?
স্মরণজিৎ : আসলে এটা কোনও একটা ঘটনা তো নয়, এটা একটা প্রসেস। যেমন আমি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের খুব ভক্ত। উনি এমন-এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেন, যেমন ঝুঝকো একটা শব্দ, তারপর লাতন... এগুলো খুব অদ্ভুতভাবে উনি ব্যবহার করেন। আমার লেখায় কয়েকবার ঝুঝকো শব্দটা এসে গিয়েছে, সেটা কিন্তু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় পড়ার অভ্যেস থেকেই আসা, না হলে কিন্তু আমি অন্ধকারটাকে ঝুঝকো বলতাম না। এরকম শব্দ যখন আমার লেখায় এসেছে, আমি আসতে দিয়েছি, আবার যখন আসেনি, আমি জোর করে আনিনি। নিজেকে বোঝা যায় না যে, আমার মধ্যে কার প্রভাব আছে না আছে। আমার কাকে ভাল লাগে সেটুকুই আমি বুঝতে পারি। আমার লেখা যাঁরা পড়বেন, তাঁরা বলবেন আমার লেখায় আর কারও প্রভাব আছে কি না। তবে আমার মনে হয়, কারও লেখায় যদি কারও প্রভাব থেকেও থাকে, তবে একটা সময়ের পর তা কেটেও যায়। খুব সচেতনভাবে এটা করতে গেলে লেখার ক্ষতি হয়। শিল্পী বা সৃজনশীল মানুষ তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে থাকতে থাকতেই এটা কাটিয়ে উঠে নিজস্ব অরবিট খুঁজে পান।
সুবর্ণ : অনেকে বলেন, আপনার সঙ্গে আর-একজন খুব জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যিকের গল্প বলার ধরনে খুব মিল আছে, যেমন প্রথম অধ্যায়ের শেষে একটা সুতো ছেড়ে রাখলেন, সেটা আবার ধরে নিলেন তৃতীয় বা চতুর্থ অধ্যায়ে, মানে প্রতিটি অধ্যায় এমনভাবে শেষ হচ্ছে, এমনভাবে যে, পাঠক পরের অধ্যায়ে না গিয়ে থামতে পারছে না, অবভিয়াস পেজটার্নার যেমন হয় আপনার এই ধরনটা আর-একজনের মতো।
স্মরণজিৎ : কার মতো?
সুবর্ণ : বিমল মিত্র।
স্মরণজিৎ: আচ্ছা, ওঁর কিছু বড় উপন্যাস আমি পড়েছি। খুব বেশি পড়িনি। তবে আমার এই সুতো ধরা-ছাড়ার ব্যাপারটা এসেছে চার্লস ডিকেন্স পড়া থেকে।
সুবর্ণ : বিমল মিত্র নিজেও বহু স্মৃতিচারণে চার্লস ডিকেন্স থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা বলেছেন...
স্মরণজিৎ : চার্লস ডিকেন্স আমার খু--ব প্রিয়, খুব, খুব, খুব প্রিয়। ইংরেজি অনার্সে আমাকে ডিকেন্স পড়তে হয়েছে, সেখান থেকে ডিকেন্সিয়ান ধরা-ছাড়ার খেলাটা আমার মধ্যে অনেকটা এসেছে বলে আমার মনে হয়। আমার সব সময় মনে হয়, আমার সঙ্গে কেউ কথাই বলবে না, যদি সে আমার সঙ্গে কথা বলে ইন্টারেস্ট না পায়। অস্কার ওয়াইল্ড বলতেন, মানুষ দুরকমের হয়, ইন্টারেস্টিং এবং বোরিং। ভাল, খারাপ, গরিব, বড়লোক নয়। শুধু ইন্টারেস্টিং আর বোরিং। তাই আমার মনে হয়, আমি যদি ইন্টারেস্টিং না হই, আমি যদি একটা রহস্য বা একটা টান রেখে দিতে না পারি, তা হলে আমার নিজেরই লিখতে ভাল লাগবে না।
সুবর্ণ ; প্রচেতদা, আপনার কী মতামত এ ব্যাপারে?
প্রচেত ; আমার মতে লেখা একটা ম্যারাথন রেস। একজন লেখক একটা মশাল নিয়ে আসেন, তারপর সেটা অন্য আর-একজন লেখকের হাতে তুলে দেন। অদৃশ্যভাবেই একজন বাহকের হাত থেকে মশাল চলে যায় অন্য আর-একজনের হাতে। যুগে-যুগে শিল্প-সাহিত্যসংস্কৃতি-দর্শন-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এরকমই হয়ে আসে বলে আমি মনে করি। আমার হাতের মশালটা তো আমি নিজে তৈরি করিনি। জীবনবোধ, জটিলতা, সংকট এগুলো তো অনন্তকাল ধরে মানুষের জীবনে চলে এসেছে, সেগুলো যাঁরা প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তাঁরা তাঁদের মশালটা নিয়ে গিয়েছেন। মশালটা কিন্তু একই, শুধু কারও হাতে সেটা বেশি উজ্জ্বল, কারও হাতে আগুনের রং একটু লাল, কারও হাতে আগুন আরও একটু গনগনে, এই যা তফাত। তাই প্রভাব, অনুসরণ, অনুরণন... এগুলো মানুষের চিন্তনের মধ্যে ঢুকে আসে। আমি যে-ধরনের মূল্যবোধে, যে-ধরনের মানবিকতায় বিশ্বাস করি, আমার আগেও বহু মানুষ সেই মূল্যবোধে বিশ্বাস করেছেন, তা নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু সেই মূল্যবোধ থেকে তো আমি বেরোতে পারব না। প্রভাব কি ফর্মে, প্রভাব কি ভাষায়, প্রভাব কি বিষয়ে, তা আর আলাদা করে বলা মুশকিল। স্মরণজিৎ ঠিকই বলেছে, এত লিখলে তার নিজস্বতা তৈরি হয়ে যাবেই, কারও প্রভাব থাকলেও তা স্থায়ী হয় না।
স্মরণজিৎ : এখানে আমাকে আর-একটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে প্রচেতদাকে, তোমার কি মনে হয় না, নিজের একটা ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরি হওয়ারও দরকার আছে?
প্রচেত : অবশ্যই। ফিঙ্গারপ্রিন্ট তো নিজে থেকেই তৈরি হতে-হতে যাবে। এটাই স্বাভাবিক।
স্মরণজিৎ : যে-কোনও নামকরা। লেখক, তাঁর নাম ঢাকা দিয়ে রাখলেও পড়েই বোঝা যাবে, কোনটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কোনটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কোনটা সমরেশ মজুমদার, কোনটা সমরেশ বসু।
প্রচেত: আর যদি প্রভাবের কথা বলা যায়, মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজম আমাকে প্রভাবিত করে, আমি মার্কেজের একটা গল্প পড়েছিলাম, তাতে বাড়িতে অভিভাবকরা নেই, এমন অবস্থায় বাচ্চাদের আলো জ্বালিয়ে খেলার একটা ঘটনা ছিল। সেখানে আলোটা ওদের খেলার সামগ্রী। উনি লিখছেন, আলোটা সোফায় গিয়ে পড়ছে, উপছে যাচ্ছে, চলকে উঠে সিঁড়ি দিয়ে রাস্তায় নামছে, ফুটপাথে গড়িয়ে যাচ্ছে.. সে এক আশ্চর্য বর্ণনা। পড়ে আমি আচ্ছন্নের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। আবার বিমল করের গল্প, সন্দীপনের ভাষা আমাকে প্রভাবিত করেছে। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর সমুদ্র বা টিকটিকি পড়ে কে প্রভাবিত হয়নি বলতে পার! আর প্রভাবিত হলাম মানেই কি বসলাম আর লিখে ফেললাম! এটা কারও পক্ষেই সম্ভব বলে মনে হয় না।
স্মরণজিৎ: আর প্রভাবিত হওয়া মানে কি শুধু লেখকদের নিয়েই প্রভাবিত হতে হবে। আমি তো টিনটিন নিয়ে প্রভাবিত, স্টিভ ওয়া আমাকে প্রভাবিত করে..প্রভাব তো অনেকরকমেরই হতে পারে।
প্রচেত : আর রবীন্দ্রনাথ? তাঁর প্রভাবকে অস্বীকার করব কী করে, আমার বহু লেখায়, গল্পে তাঁর গানের কবিতার লাইন আমি লিখেছি, বহু গল্পের নাম নিয়েছি তাঁর গানের লাইন থেকে। আমি কী করব! আমি তো কখনও বেরোতে পারিনি রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে!
সুবর্ণ : প্রচেতদা, পাঠকরা কিন্তু আপনার গল্প বলার ধরনে আর-এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন। তিনি হুমায়ুন আহমেদ। আপনার লেখা প্রথম উপন্যাস আমার যা আছে-র সাগর অনেকটা হিমুর মতো। তার পরের উপন্যাস জলে আঁকা, সেই পরিবারের সদস্য তাদের দুঃখ-কষ্ট-ক্রাইসিস এর সঙ্গে হুমায়ুন আহমেদের প্রথম দিকের লেখা নন্দিত নরকে বা শঙ্খনীল কারাগার'-এর সাদৃশ্য অনেকে খুঁজে পান। এ সম্বন্ধে আপনার কী মত?
প্রচেত : অবশ্যই আমি মনে করি, আমাদের এখানে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা সমরেশ মজুমদার, ওপার বাংলার হুমায়ুন আহমেদ, এঁরা যেভাবে ভেতরকে স্পর্শ করে যেতে পারেন, যে ভাবনার স্পর্শ, যে মূল্যবোধের স্পর্শ ওঁরা পাঠককে দিতে পারেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীললোহিতও এর মধ্যে আসে... এঁদের গল্প বলার বা ভাষার ধরন লক্ষ করবেন, কোথাও আটকাচ্ছে না, কোথাও থমকাচ্ছে না, কোথাও কোনও বাধা পড়ছে না... এঁরা সত্যিই বিরাট বড় মাপের লেখক। আমি এঁদের ধারেকাছেও নই, নন্দিত নরকে বা শঙ্খনীল কারাগার খুব জটিল উপন্যাস, এরকম উপন্যাস লেখা আমার পক্ষে এখনও সম্ভব নয়, ভবিষ্যতে কখনও পারব কি না বলতে পারি না। কিন্তু এদের বলাটা, আঘাত করার ধরনটা এত শার্প... এদিকের শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং ওদিকের হুমায়ুন আহমেদ... এঁদের বলার ধরন এমনই যে, কখনও মমতা মাখিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন আলোর মতো, আবার নিকষ কালোটাকে নিকষ কালোই বলছেন... এদের বলার ধরন বা চলার পথের ধারেকাছেও আমি কখনও আসতে পেরেছি বলে মনে হয় না, যদি তেমন কারও মনে হয়ে থাকে, সে আমার বিরাট প্রাপ্তি। আর আমার মনে হয়... এঁদের কোনও অনুকরণ হয় না। যদি কারও গল্প বলার ধরনে তাঁদের কথা মনে পড়ে, তা হলে বুঝতে হবে, তিনি সেই মানুষগুলোর আলোকতরঙ্গের স্পর্শ পেয়েছেন। তাঁরা যে মূল্যবোধে বিশ্বাস করেছেন, আমিও সেই মূল্যবোধেই বিশ্বাস রাখার চেষ্টা করে এসেছি, না হলে যতদূর পর্যন্ত এসেছি, ততটুকুও আসতে পারতাম না। তাঁদের বলার ধরন যদি একটুও ছুঁতে পেরে থাকি, তা হলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
সুবর্ণ : হিমু বা নীললোহিতের চেয়ে সাগর কোথায় আলাদা? সাগরকে কি আপনার অল্টার ইগো বলা যেতে পারে?
প্রচেত : না, ঠিক ব্যক্তির অল্টার ইগো নয়, সাগর আমার না-পাওয়া কল্পনা। যদি শ্রীকান্ত থেকে শুরু করি, তিনি দেশবিদেশ ঘুরে পৃথিবী দেখে বেড়াতেন। আবার যদি নীললোহিতের কথায় আসি, তাঁর মধ্যে নারীপ্রেম প্রকৃতিপ্রেমের প্রবণতা বেশি ছিল। হিমুর ক্ষেত্রে বলব, এই চরিত্রটি খুব মিস্টিক, নানা রহস্য করতে-করতে তিনি চলতেন, মাঝরাতে হাঁটছেন, নানা আশ্চর্য কাণ্ড বা ঘটনা ঘটাচ্ছেন বা মুখোমুখি হচ্ছেন। আমার সাগরের কথা যদি বলতে হয়, সে বোহেমিয়ান, তার পকেটে কোনও পয়সা নেই, কিন্তু সে নানাভাবে মানুষের নানা সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করে চলেছে। সে সরাসরি মানুষের সমস্যার মধ্যে ঢুকে পড়ছে এবং বাস্তব। | উপায়ে, কোনও ম্যাজিকাল বা মিস্টিক উপায়ে নয়, সে মানুষকে তার সমাধানের রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। সাগর যেন সবার মধ্যেই আছে, আমার যা আছে, মানে সবার মধ্যেই তো সে আছে।
সুবর্ণ : স্মরণজিৎদা, আপনি বাঙালি রহস্যভেদীর ইমেজ, হুডানইট ফরম্যাট ভেঙে তীব্র গতিশীল থ্রিলারধর্মী অদম্য-কাহিনি এনেছেন। অদম্যর রহস্য আন্তর্জাতিক না হয়ে আরও বেশি বাঙালি হলে কি অসুবিধে হত? বাংলার পরিচিত গোয়েন্দার ছকটা ভাঙা দরকার মনে হল কেন?
স্মরণজিৎ : এখানে একটা মজার ঘটনা আছে। আমি তো আগেই বলেছি, আমি খুব সচেতনভাবে কিছু লিখি না, সাবকনশাস আমাকে দিয়ে অনেকটাই লিখিয়ে নেয়। আমি এমনিতেই থ্রিলারের পোকা। আমাকে যখন থ্রিলার লিখে জমা দিতে বলা হল, আমি। ভাবলাম কী লিখব! আমার পক্ষে তো কখনও ব্যোমকেশ বা ফেলুদার মতো কিছু লেখা সম্ভবই নয়! আমার সে ক্ষমতাই নেই। আবার একই সঙ্গে মনে হচ্ছিল, সবারই অনেক গোয়েন্দা আছে, আমারও একটা কেউ থাকুক। আমি ভিতু মানুষ। আমারই মতো, বেঁটেখাটো সাধারণ কেউ মানুষ, যাকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করা যায় না, সেরকম যদি একটা বেশ উলটোদিকের লোক হয়, মার্সিনারি জাতীয়, কারণ শুধু ভাল একসময় খুব বোরিং লাগে। থ্রিলারে এই ধরনের চরিত্র একটু দুষ্ট হলে মজাটা বেশি হয়। দুষ্টু হলে তার অনেকগুলো রাস্তা খুলে যায়। এইগুলো মনে হয়েছিল, সবার গোয়েন্দা আছে, আমার একজন মার্সিনারি থাকুক। সে খুন করে, পেন্টিং চুরি করে, নানারকম গন্ডগোল করে, কিন্তু শেষপর্যন্ত তার আউটকামটা কোথাও না কোথাও পজিটিভ হয়। এই গ্রে জোনটা এক্সপ্লোর করতে আমার খুব মজা লাগে। তাই অদম্য সেন লেখাটা আমার কাছে খুব মজার একটা জায়গা।
প্রচেতদা : এখানে আমি একটা কথা বলব, এখন বাঙালি অনেক বেশি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস, জঙ্গিহানা, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সব কিছু সম্বন্ধেই সে ওয়াকিবহাল। অনেকটাই বদলে গেছে তার মানসিকতা, চিন্তাভাবনার জগৎ। প্রযুক্তির অগ্রগতির জন্যই সেটা আরও হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে অদম্য আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে লেখা হওয়ায় তার দিগন্ত অনেক বেশি প্রসারিত হয়েছে। সেই কথা মাথায় রেখেই আমার মনে হয়, ও যতই বলুক অবচেতনের প্রভাবের কথা, অদম্যকে সচেতনভাবেই ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছে।
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, সেটা একেবারেই তাই। কারণ, আমার মনে হয়েছিল, ভারতবর্ষের বাইরে বেরোলেই আমি একসঙ্গে অনেক ঘটনা পেয়ে যাব। তার উপর এমন একটা চরিত্র, যার কেউ নেই, অরফানেজে মানুষ... এই ব্যাপারগুলো অনেকটা মিস্ট্রি তৈরি করে, একটা চরিত্রকে ঘিরে একটা রহস্যের জন্ম দেয়। অথচ ছেলেটা বাঙালি, এটাই আমার কাছে মজার। হুডানইট না হলেও থ্রিলার হওয়ায় রহস্য তো একটা আছে। এটা থেকেই আমার ভাল লাগা তৈরি হয়। আসলে আমার মধ্যেকার খারাপ ছেলেটা এসবে খুব মজা পায়।
প্রচেত (হেসে): ঠিক আছে, খারাপ ছেলেটার উপর এবার থেকে আমিও নজর রাখব। (দুজনেরই হাসি)
সুবর্ণ : প্রচেতদার ক্ষেত্রে একটা জিনিস দেখেছি, যেমন শহিদ ভূপতি সেন কলোনি, মুক্ত আবরণে, স্বপ্নের চড়াই এই ধরনের অনেক উপন্যাসে প্রোটাগনিস্টই সব নয়, অনেক সময়ই গোটা ঘটনা, তার পারিপার্শ্বিক, প্রেক্ষাপট, সবটাই যেন গল্পের নায়ক হয়ে উঠছে। আলাদা করে কারও উপর আলো পড়ছে না। সমস্ত বুননটাই যেন প্রোটাগনিস্ট। এরকম কি ভেবেচিন্তেই করা?
প্রচেত : এরকম তো হয়েইছে। কাহিনিতে প্রোটাগনিস্ট থাকে, যাকে কেন্দ্র করে ঘটনা পাক খায়, হয়তো একজন নায়িকাও থাকে। কিন্তু নায়কের সঙ্গে তার চারপাশের ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বের তফাত হয়তো ১০০-র সঙ্গে ৮০-র তফাতের মতো। এটা সবসময় খুব সচেতনভাবে করা নয়, হয়েও যায়। কারণ, আমি মনে করি, চারপাশটা নিয়েই চরিত্র তৈরি হয়। চরিত্রের ভাবনা, সচেতনতা, একাকিত্ব, যন্ত্রণা সবই তৈরি হয় তার পাশের লোকটার কাছ থেকে। রানিপুরের কাপুরুষ উপন্যাসে একটি ছেলে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে, তার যাবজ্জীবনের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু পরে আইনজীবীদের একটি এনজিও সংগঠন কেস ফাইল চেক করতে গিয়ে দেখে এই কেসের অনেকটাই ভুলভাবে সাজানো। ছেলেটিকে ভুল করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। রানিপুরের ছেলেটিকে তারা নিজেরা কেস লড়ে ছাড়িয়ে নেয়। দেখা যায়, ছেলেটিকে সেখানকার স্থানীয় লোকজন, রাজনীতিক, ব্যবসাদার, কিছু আত্মীয় ওর প্রেমিকার বাড়ির লোকজন, সবাই মিলে এইভাবে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল।
স্মরণজিৎ : রাজনীতি কি তুমি সচেতনভাবে নিয়ে আস?
প্রচেত : রাজনীতি আসতে বাধ্য হয়। আমি সচেতনভাবে চাই, না-চাই, গল্পের পটভূমির প্রয়োজনে যেখানে রাজনীতি আসা দরকার, সেখানে রাজনীতি আসতে বাধ্য হয়। স্মরণজিতের লেখাতেও থাকে, ওর সেই লেখাগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, আমি আর স্মরণজিৎ থিমেটিক্যালি কোথাও যেন একইরকম বিশ্বাস নিয়ে চলি। নায়ক একা সব নয়, তার চারপাশটাও গুরুত্বপূর্ণ। কাহিনিটাই আমার। নায়ক, কাহিনিটাই আমার নায়িকা... আমার বলার ধরনটা সেরকমই। আমার চরিত্রদের আমি বিশ্বাস করি, সে খুনি হলেও বিশ্বাস করি, প্রেমিক হলেও বিশ্বাস করি। কী হয়েছিল, কী হলে, তা থেকে ফের কী হবে... এরকমভাবে সাজিয়ে আমি লিখতে পারি না। মানুষের ভয়, আতঙ্কের মতো বিষয় নিয়েও আমার কিছু গল্প আছে যেমন সেলেনোফোবিয়া, ওনাইরোফোবিয়া..
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, আমি দেখেছি, প্রচেতদার চরিত্ররা তাদের ভয় আতঙ্ক বা দুর্বলতা থেকেই একটা শক্তি আহরণ করে, যে শক্তি তাদের সেই সমস্যাটা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে।
প্রচেত : একদম ঠিক। মানুষের সমস্যা থেকেই তাকে বেরিয়ে আসার শক্তি খুঁজতে হয়। ওনাইরোফোবিয়া গল্পে...
স্মরণজিৎ : স্বপ্নের ভয়, লোকটা রাত্তিরে ঘুমোতে পারত না..
প্রচেত : ঠিক, সে লোকটা তার ভয় থেকেই খারাপ লোকটাকে মেরে ফেলার মানসিক জোর বা সাহস সঞ্চয় করল। সেই কারণেই আমি সবসময় গল্পের কোনও একটি চরিত্রের উপর আলো ফেলতে পারি না, আলোটা পুরো গল্পের কাঠামোর উপরেই পড়ে।
সুবর্ণ : চরিত্রের প্রসঙ্গে স্মরণজিৎদাকে জিজ্ঞেস করব, আপনার লেখার নায়করা, ধরুন, পাল্টা হাওয়া-র অন্তরীপ, আলোর গন্ধ-র কিগান, এ ছাড়াও অন্যান্য উপন্যাসের পূর্বায়ন, আদীপ্ত, বিহান এরা প্রত্যেকেই খুব নিঃসঙ্গ, এদের কাছের লোকেও ভুল বুঝেছে, এরা চেনা সকলের চেয়ে দূরে চলে গিয়ে জীবনে একা। বাঁচতে চাইছে... মনে হয় এরা একটাই মানুষ, আলাদা-আলাদা নাম নিয়ে আসছে। এরকম কেউ কি আপনার নিজের মধ্যেও আছে?
স্মরণজিৎ : নিজের মধ্যে আছে বলেই তো লেখার মধ্যেও আসে।
সুবর্ণ : এবং এরা প্রত্যেকেই চেনা জগৎ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে...
স্মরণজিৎ : এখন আমার পক্ষে তো আর দুরে সরে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ, আমার পরিবার আছে, কাজকর্ম আছে, তবে এই চলে যাওয়াটা কিন্তু পালিয়ে যাওয়া বা এসকেপ নয়...
প্রচেত : এখানে স্মরণজিৎ আমি একটু বলি, আমি তোমার যা লেখা পড়েছি, দোয়েল সাঁকো বা আর-একটু সরে এসে মোম কাগজ, যা-ই বলো, তুমি কিন্তু এই দূরে চলে যাওয়া অভিমানী চরিত্রদের আবার ফিরিয়ে আনো...
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, কারণ আমি নিজেও তো ফিরে আসতে চাই। একটা ছোট্ট বাড়িতে অনেকজন মানুষের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা। আমাদের সমস্ত আনন্দের স্মৃতিগুলোই আসলে অনেক মানুষকে ঘিরে। মানুষকে শেষপর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরে আসতে হয়।
সুবর্ণ : উপন্যাস যদি শেষে গিয়ে মিলনান্তক হয় এবং শেষে গিয়ে পাঠকের মন ভাল হয়ে যায়, তা হলে গভীরতার দিক থেকে কোথাও খামতি থেকে যায়... এরকম একটা ধারণা বহু সমালোচক এবং লেখককের কাছ থেকেও শোনা যায়... আপনাদের মতামত কী?
স্মরণজিৎ : আমি আগে বলি... প্রথমত, আমার বহু উপন্যাসের শেষটা তো ডিফাইন্ডই নয়... একেবারে ওপেন এন্ড...দ্বিতীয়ত, আমি কোথায় গল্পটা শেষ করছি, তার উপর নির্ভর করছে, এটা ট্র্যাজেডি না কমেডি। আমার টাইমস্প্যানটা নির্দিষ্ট থাকে, সাধারণত, ১২ মাস, ১৪ মাস বা দুবছর এইরকম। আমি স্পষ্টভাবে চাই যে, যেখানে গল্পটা আমি শেষ করলাম, সেখানে মানুষ একটু পজিটিভ ভাইব পাক, এতে গভীরতা বাড়ল না কমল, তা আমি জানি না। আমার পক্ষে জানা সম্ভবও নয়, আমার কাছে গভীরতা মাপার কোনও স্কেল নেই।
সুবর্ণ : আপনি এমনভাবে ওপেন এন্ড করেন যে, তাতে সমালোচক, পাঠক, সকলেই খুশি হয় ...
স্মরণজিৎ : আমি ঠিক জানি না যে, শেষে কী হবে, আসলে জীবন তো খুব অনিশ্চিত! কয়েক মুহূর্ত পরে কী ঘটবে, তা তো এই মুহূর্তে বসে কেউ বলতে পারে না। তাই আমার মনে হয়েছিল, ছোটগল্প যেভাবে শেষ হয়, উপন্যাসও সেইভাবেই শেষ করলে কেমন হয়! একটা জায়গার পর আমি ছেড়ে দেব...বাকিটা পাঠক নিজে ভেবে নিন তাঁর মতো করে।
প্রচেত : বহু গল্প কিন্তু আছে স্মরণজিতের যেখানে শেষটা একেবারেই পজিটিভ এন্ডিং নয়...
সুবর্ণ : আবার একটা মত শোনা যায়, চোখে জল আনাটা খুব সোজা উপায়, ফেসবুকেও অনেক ভিডি ঘুরে বেড়ায় যাদের উপরে লেখা থাকে, দিস উইল ব্রিং টিয়ারস টু ইয়োর আইজ, কোথাও লেখা থাকে না, দিস উইল ব্রিং স্মাইল টু ইয়োর লিপস... চোখে জল এলে কি মানুষ বেশি খুশি হয়?
প্রচেত : এটা আমি বলতে পারব না, আমার অনেক গল্পের শেষে মিল থাকে, অনেক গল্পের শেষে কান্না থাকে, সবটাই গল্পের প্রয়োজনে। গল্পের প্রয়োজনে আবার কোথাও হাসিও এসে যায়। ভেবে-ভেবে এরকম করা যায় বলে মনে হয় না। একবার-দুবার হতে পারে কিন্তু বারবার এরকম প্র্যাকটিস চালিয়ে সম্ভব নয় বলেই আমার বিশ্বাস। এমন গল্পও আছে, যা পড়ে কোনও কোনও পাঠক ভাববেন, মিলন না হয়েছে, ভালই হয়েছে, আবার কেউ কেউ মিলনান্তক নয় বলে কষ্ট পাবেন। তবে আমি রসবোধ থেকে বেরোতে পারি না। এ স্মরণজিতের সঙ্গে মূল্যবোধ বা বিশ্বাসের দিক থেকেও যেমন আমার মিল আছে, রসবোধের দিক থেকেও আছে বলে আমার মনে হয়। বইমেলায় খুব সাহস করে রমাপদ চৌধুরী মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে পরিচয় দিয়েছিলাম, শুনেছিলাম উনি খুব রাগী, বকাবকি করেন। তখন আমার লেখা দেশ-এ দু-একটা বেরিয়েছে। ভয়ে-ভয়ে নিজের নাম বলতেই উনি বলেছিলেন, ভাল লেখা হচ্ছে, লিখে যান... মন দিয়ে লিখবেন, আর শুনুন, আপনার মধ্যে একটা উইট আছে, এটা দেখবেন যেন নষ্ট না হয়। এখন এটা থাকা না-থাকার কথা আমি বলতে পারব না, তবে এটা ছাড়া আমি লিখতে পারব না। আমার মনে হয়, হয়তো পাঠকও এমনটাই পছন্দ করেন। অযথা পাঠককে বোকা ভেবে লাভ নেই, আমি অথরস পোরশনে টানা ভাষণ দিয়ে গেলাম, আমি এই বুঝি, তাই বুঝি...এতে খুব একটা সুবিধে হয় বলে মনে হয় না। কারণ, স্মরণজিৎ অনেক বেশি উপন্যাস লেখে। আমার প্রথম দিকের উপন্যাসগুলো ছোটগল্পের কোলাজের মতো হয়ে যেত, আমি সেটা পরে বুঝতে পেরেছি, পরে নিজেকে রেক্টিফাই করার চেষ্টা করেছি। উপন্যাসের বিভিন্ন অংশের মধ্যে গিটটা শক্ত করে বাঁধার চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্মরণজিৎ ওর গল্পে, যে-টাইমফ্রেম মেনটেন করে, ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায় আবার বর্তমানে চলে আসে... বিভিন্ন সময়ের মধ্যে গিটটা কিন্তু ও খুব সুন্দর করে বাঁধে। মনে হয় আমরাই যেন গল্পের সঙ্গে সঙ্গে দশবছর এগিয়ে বা পিছিয়ে গেলাম। এই জটিলতা পাঠক গ্রহণ করছে, উপভোগও করছে। তা হলে এই ফরম্যাট তাদের স্ট্রাইক করছে বলেই তারা গ্রহণ করছে। এখন কেউ যদি ভাবে, পাঠক কিস্যু জানে না, তাদের যা দেব, তা-ই পড়বে, সেটা তো খুবই ভুল ভাবা হয়ে যাবে। একটা কথা আমার মনে হয়, লেখার ধরনের উপর তার শেষ নির্ভর করে, তার ইমপ্যাক্টও পাঠকভেদে বদলে যায়। লেখা গান, ছবি আঁকা, নাটক, সবই তাই। আলাদা-আলাদা মানুষকে আলাদা-আলাদা করে ভাবাবে। তবেই সেটা বহুমুখী সৃষ্টি হিসেবে সার্থক।
সুবর্ণ : আবার এমন মতও শোনা যায়, জনপ্রিয় লেখা ঠিক সাহিত্য নয়, সাহিত্য লোকে ঠিক বুঝবে না, কিন্তু কালজয়ী হবে, এরকম একটা ব্যাপার এটা সত্যি?
স্মরণজিৎ : কোনও কিছু কালজয়ী কি না, সে তো কালকে বোঝা যাবে, মানে সেই সময়টা তো তাকে দিতে হবে। এমন যাঁরা বলেন তাঁদের নিশ্চয়ই সেই টাইমমেশিনটা আছে, যাতে করে তাঁরা ষাট-সত্তর বছর এগিয়ে গিয়ে দেখে এসেছেন যে, এখনকার জনপ্রিয়রা তখন আর কেউ নেই, তাই তাঁরা এরকম বলতে পারেন। আমার বিশেষ জানা নেই। আর ধরে নেওয়া হয়, জনপ্রিয় লেখা মানেই কোনও সাবটেক্সট নেই... এটা ঠিক নয় একেবারেই, তবু অনেকে এরকমই ভেবে নেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জনপ্রিয় ছিলেন না? শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কি কিছু কম জনপ্রিয়? এঁদের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এসব থিয়োরি আদৌ দাঁড়ায় না। যাঁরা বলেন, তাঁদের বলতে ভাল লাগে, তাঁরা বলুন... তাঁদের মঙ্গল হোক। সমালোচকদের বাইরেও পাঠক আছে, বহু মননশীল পাঠক আছেন। তাঁরা কিছু পাচ্ছেন বলেই তো পড়ছেন। তাঁরা যদি লেখার ভিতরে শুধু খড় বা ভুসি পেতেন, তা হলে পড়তেন না। আর কোনও বই জনপ্রিয় বলে দেগে না দিয়ে। সমালোচকদের তো দেখা উচিত গল্পে কোনও লেয়ার আছে কি না, সাবটেক্সট আছে কি না...কাফকা জনপ্রিয় ছিলেন না, তিনি তেমন কিছু লেখা প্রকাশই করেননি, তাঁর লেখাতেও সাবটেক্সট আছে, আবার ডিকেন্স তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন, তাঁর লেখাতেও সাবটেক্সট আছে। দর্শন কিন্তু বিরাট একটা দেখানোর জিনিস নয়। যার লেখায় দর্শন স্পষ্ট করে দেখা যায়, তার তো দর্শন আত্মস্থই হয়নি। তার দর্শনটাই দেখা যাচ্ছে, উপন্যাস দেখা যাচ্ছে না। এখানে আর-একটা কথা বলে নিই, যে বেশি জনপ্রিয়, তাকে আঘাতটাও বেশি সহ্য করতে হয়।
প্রচেত : সুবর্ণ ঠিকই বলেছে যে, শিল্প সাহিত্যের সফল হওয়ার পথে জনপ্রিয় হওয়াটাকে অন্তরায় বলে মনে করা হয়। আজও কিছু মানুষ এই মতবাদ পোষণ করেন। আমি প্রথমেই বলব, এই সময়ে দাঁড়িয়ে আধুনিক বাংলা গল্প- উপন্যাস পড়া খুব কমে গেছে, এটা প্রথমেই স্বীকার করছি। নানারকম কারণ দেখানো হয়, মানুষ কম্পিউটার আর স্মার্টফোনে ব্যস্ত, কেরিয়ার তৈরিতে ব্যস্ত, অবসরে শপিং মলে ব্যস্ত, গ্যাজেটস, টিভি... বই না পড়ার হাজারো অপশন চারদিকে সাজানো। এমন হল কেন? সম্পাদক-প্রকাশকরা ভাল লেখা পেলে নিশ্চয়ই ছাপছেন, কিন্তু আমরা কি একবারও ভাবছি, আমাদের লেখায় কোনও খামতি থাকছে কি না, আমরা ঠিকমতো পৌঁছতে পারছি কি না... সব দোষ কি সমাজ পরিবর্তনের? সব দোষ কি পাঠকদের? এরকম হয় না। তাই এরকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যদি বাংলা ভাষার কোনও লেখকের পাঠক দুজন, চারজন, পাঁচজন করে বেড়ে উঠতে থাকে, তা হলে সেটা কিন্তু বাংলা ভাষার লাভ, বাংলা সাহিত্যের লাভ, বাংলায় যাঁরা লেখালিখি করছেন, তাঁদের সকলের লাভ এই কথাটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। পাঠককুল, লেখককুল, প্রকাশককুল, ও সম্পাদককুল এবং বাংলা ভাষাকে যাঁরা ভালবাসেন, তাঁদের সকলের উচিত সেই লেখককে স্বাগত জানানো। তাই জনপ্রিয় মানে সেটা ঠিক সাহিত্য নয়, সেটা ট্র্যাশ, এই কথাটা কিন্তু আমরা কোনও লেখককে বলছি না, সরাসরি বাংলা ভাষাকেই বলছি... যে ভাই, তুমি যাও, তোমার লেখা কারও পড়ার দরকার নেই, তাদের হাতে আরও অনেক কিছু রয়েছে। আমি ধরেই নিচ্ছি, আমার লেখা একজনও পড়েন না। তবু বলব, স্মরণজিৎ আজ বহু বছর পর বাংলা বইবিমুখ তরুণ প্রজন্মের বই পড়ার অভ্যেস ফিরিয়ে দিয়েছে। এই স্বীকৃতি ওকে দেওয়া দরকার, না হলে ক্ষতি সবারই। কেউ কি ইচ্ছে করলেই তাঁর লেখা আর কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নিতে পারবেন? ব্যাপারটা কি এতই সোজা? জনপ্রিয় হলেই যদি উন্নাসিক মন্তব্য করতে হয়, তা হলে চার্লি চ্যাপলিন নিষিদ্ধ করে দাও! রবীন্দ্রনাথ বাতিল করে দাও, শরদিন্দু, মতি নন্দী, সুনীল, শীর্ষেন্দু সব ফেলে দাও! মার্কেজও তো বহু মানুষ ভালবাসেন... ফেলে দাও! মুরাকামি ঘরে-ঘরে পড়া হয়... ফেলে দাও! আমি শুধু বলব, জনপ্রিয় মানে যেমন খারাপ নয়, জনপ্রিয় মানে কিন্তু ভালও নয়! প্রচেত গুপ্তর লেখা অনেকে পড়েন মানে, সে লেখা ভাল, এমন ভেবে নেওয়ারও কোনও যুক্তি নেই। অনেকেই আছেন, যাঁদের লেখা হয়তো সেভাবে সকলের কাছে পৌঁছয়নি, কিন্তু অসাধারণ লেখা, এমনও আছে। তাই কোনও ফিক্সড মেন্টাল সেট আপ বা মার্কিং করে দিলে চলবে না।
স্মরণজিৎ : ঠিকই, কোনও কিছুর কিন্তু বাঁধাধরা কোনও ফর্মুলা নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে জোর করে জেনারালাইজ করার একটা চেষ্টা সবসময় থাকে। সেখান থেকেই কিন্তু সংকীর্ণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রচেত: এই প্রসঙ্গে আমার একটা প্রশ্ন আছে। সিনিয়র বা আগের প্রজন্মের সাহিত্যিকরা কি তাঁদের পরের প্রজন্মকে সেভাবে ওয়েলকাম করছে? তাদের মাথায় হাত রাখছে? ধরি স্মরণজিৎ আমার জুনিয়র। আমি কি মুখ ফুটে বলতে পারছি যে, স্মরণজিৎ বেশ লিখছে, ভাল লিখছে? নাকি চুপ করে থাকছি? কবিতার ক্ষেত্রে বলতে পারি, জয় গোস্বামী তাঁর বইয়ে...
স্মরণজিৎ : গোঁসাইবাগান...
প্রচেত : হ্যাঁ, গোঁসাইবাগানে নতুন প্রজন্মের কবিদের লেখা নিয়ে আলোচনা করছেন, প্রশংসা করছেন, সুবোধ সরকারের মধ্যেও নতুন প্রজন্মকে প্যাট্রনাইজ করার, প্রশ্রয় দেওয়ার প্রচেষ্টা আছে। আমি অন রেকর্ড বলছি, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রকাশ্যে বলেছেন তাঁর প্রচেত গুপ্ত, স্মরণজিৎ চক্রবর্তী, তিলোত্তমা মজুমদারের লেখা ভাল লেগেছে, সমরেশ মজুমদার বলেছেন, অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী আমাকে ফোন করে ভাললাগা জানিয়েছেন। আমরা কি বলছি? নতুনদের লেখা পড়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছি? যদি বলতে পারি, তা হলে কিন্তু সেটা সকলের জন্যই ভাল... এটা আমি মনে করি।
স্মরণজিৎ : ঘটনা হচ্ছে যে, কোনও মিস্টার এক্স বা মিস ওয়াই বা মিসেস ওয়াইয়ের লেখা সকলে পড়ল। তাদের ভাল লাগল। সুবিধেটা কিন্তু সেই লেখকের সমাসময়িক বাকি লেখকদেরও। কীভাবে? না কেউ একটা লিখলেন, দুটো লিখলেন, চারটে লিখলেন, মানুষের ভাল লাগল। তখন তাঁদের মনে হবে, এরটা তো পড়লাম। ভাল লাগল। এবার এই জেনারেশনের বাকিরাও কেমন লিখছে, সেটা পড়ে দেখি। ফলে লাভবান হন সকলেই, লাভবান হয় সেই ভাষার সাহিত্য। এটাই নিয়ম। আসলে একটা সময়ের কিছু ফসল থাকে মানুষ যে-সময়টায় বেঁচে আছে, সেই সময়ের সৃষ্টিকর্মকে উপভোগ করতে ভালবাসে। যা সে সরাসরি দেখছে, তারই একটা অন্যরকম ইন্টারপ্রিটেশনও চায়। তার সঙ্গে সে রিলেট বা কানেক্ট করতে পারে, তখনই সে এই জেনারেশনের বাকিদের কাজের প্রতিও আগ্রহী হয়। দ্বিতীয়ত, ধরা যাক, প্রচেতদার লেখা। কুড়িজন পড়ে, আমার লেখা পাঁচজন পড়ে। এবার আমি ভাবলাম কোনওভাবে প্রচেতদার সব পাঠক ভাঙিয়ে নিয়ে চলে আসব। এই ভাবনাটাই ভুল। পাঠক কোনওদিন কারও থেকে ভাঙিয়ে নেওয়া যায় না, এটা অসম্ভব। পাঠকের খিদে প্রচুর, তার মনে ইনফিনিটি সংখ্যার তাক
আছে। সে একটা ভালর পর আরও ভাল খোঁজে।।
প্রচেত : এমন দৃষ্টান্ত আমরা বহুবার দেখেও এসেছি, গল্পের ক্ষেত্রে কবিতার ক্ষেত্রে এক-এক দশকে, এক-একটা প্রজন্মে একই সঙ্গে পরপর কত ভাল-ভাল গদ্যকার, কবি আমরা পেয়েছি। সংখ্যায় তো তাঁরা অনেকেই ছিলেন। জনপ্রিয় মানে কী? ভোট চাওয়া তো নয়। কয়েকজনের সৃষ্টি বেশি মানুষ পড়েন, এইটুকুই তো।
সুবর্ণ: প্রচেতদা, সমসাময়িকদের লেখা পড়ার সময়-সুযোগ হয়? সমসাময়িকদের মধ্যে কাদের লেখা ভাল লাগে?
প্রচেত: সুযোগ তো অবশ্যই হয়। কিন্তু আমাকে মার্জনা করতে হবে, আমি কারও নাম বলব না...
সুবর্ণ: ভাল লেগেছে এমন কেউ বা কারা...
প্রচেত : যাদের নাম বলব না, তাঁরা ভাববেন তাঁদের লেখা ভাল লাগে না! তাই বলা একটু মুশকিল। ধরো কারও নাম বলতে ভুলে গেলাম, ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিলাম না, সেক্ষেত্রেও তিনি খারাপ ভাববেন। আমি কিন্তু ডিপ্লোম্যাটিক উত্তর দিচ্ছি না, পাঁচ-জন তো খুব ভাল, চাইলেই পরপর বলে যেতে পারি, কিন্তু সেটা ঠিক হবে না। আবার পাঁচ-জন এমন আছেন, যাঁদের লেখা আমার না পড়া হলেও মানুষ ভালবাসেন। এসব বললেই, কেউ চেপে ধরতে পারেন, পাঁচ বললে কেন? পঞ্চাশ বললে না কেন? দুঃখিত! পঞ্চাশ কোনওভাবেই বলতে পারছি না। কারণ, ভাল লেখার সংখ্যা বড় কম কিছু তো একটা লাগবে! কোয়ালিটি, না হয় কোয়ান্টিটি... দুনিয়ায় সবাই বোকা নয়, আমি একটা কালজয়ী লেখা লিখে ফেলেছি, কেউ বুঝল না... শুধু লেখক বুঝলেন আর সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচার হয়ে গেল সে লেখা কালজয়ী কি না, এভাবে হয় না। আমি শুধু আমারটা ভাল, আমারটা ভাল বলে গেলেই হবে? পড়বে পাঠক? এটা কখনও হয়? আমার বা স্মরণজিতের পরে তিন-চারজন লেখক উঠে আসছেন, যাঁরা বেশ ভাল। এটা আনন্দের। আমার সময়ে চার-পাঁচজন আছেন ভাল... আমি তাঁদের কাছে হয়তো কিছুই নই। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে ছবিটি কিন্তু মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।
সুবর্ণ : তার মানে যাঁরা খুব ভাল, তাঁরা সংখ্যায় খুব কম?
স্মরণজিৎ : সে তো চিরকালই!
প্রচেত : আমি একটা ঘটনা বলি। আমার বাড়ি থেকে কিছু দূরে দুই বৃদ্ধা থাকেন, দুই বোন, বয়স পঁচাত্তর থেকে আশির মধ্যে, তাঁরা প্রতিবছর আমার জন্মদিনে ফুলের তোড়া নিয়ে কষ্ট করে আমার তিনতলার ফ্ল্যাটে উঠে আসেন। আমি লজ্জায় তাঁদের বারণ করি, বলি আপনারা কষ্ট করে উঠবেন না, আমি নীচে আসছি। তাঁরা বলেন ওইটুকুই তাঁদের আনন্দ। তাঁরা এখনও বুভুক্ষু পাঠক। ভাল লেখা খোঁজেন সর্বত্র। আমার লেখা তাঁদের ভাল লাগে। আমি বলি, আমার আগে যাঁরা ভাল লিখেছেন, তাঁদের জন্যই বাংলা লেখালিখির প্রতি তাঁদের আগ্রহ বজায় আছে, তাই তাঁরা আমার লেখা পড়েছেন। আমার পূর্বসূরিদের গুণে আমি বেঁচে আছি।
সুবর্ণ : স্মরণজিৎদা, সমসাময়িকদের লেখালিখি সম্বন্ধে আপনার মতামত?
স্মরণজিৎ : এ বিষয়ে আমার খুব একটা বলার কিছু নেই, কারণ, ২০০৫ সালের পর থেকে ফিকশনাল লেখালিখি আমার সেভাবে পড়াই হয়নি। কারণ, আমার কবিতা, খেলা, ইতিহাস নিয়ে পড়তে বেশি ভাল লাগে।
প্রচেত : আমার লেখাগুলো পোড়ো কিন্তু..
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ নিশ্চয়ই, তবে কারও সম্বন্ধে ওপিনিয়ন তৈরি হবে, ততটা তো পড়িনি। তাই এ বিষয়ে কিছু বলাটা ঠিক হবে না।
প্রচেত : পুরো এড়িয়ে গেল কিন্তু, আমি তো তাও কিছু বললাম... (দুজনের হাসি)
সুবর্ণ : অন্য একটা দিক থেকে বলি, এখন অধিকাংশ বাচ্চাই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি, বাংলা বুঝতে পারে, লিখতে পড়তে পারে না। শহরের এই ধরনের বাচ্চা অন্তত সত্তর শতাংশ তো বটেই। সেদিক থেকে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয় কি?
প্রচেত : এখনও শহরে এরকম বাচ্চার সংখ্যা বেশি, শহরের বাইরে যদিও এখনও কম, তবু আর কিছু সময়ের মধ্যে সংখ্যাটা সমানসমান হয়ে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। বাংলা বইয়ের লাইব্রেরিগুলোর অবস্থা খারাপের দিকে, সবই ঠিক। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার কথা হল, আমরা কি সেই বাচ্চাদের বাবা মাকে পড়াতে পারছি? এমন কিছু কি প্রচেত গুপ্ত লিখতে পারছে, যা তাদের বাবা-মাদের ভাল লাগছে? আমার যদি কোনও বই ভাল না লাগে, আমার ছেলের হাতে সে বই আমি দেব কেন? যদি কোনও বই ভাল লাগে, তা হলে তাঁরা ঠিক সেসব বই বাচ্চাদের হাতে তুলে দেবেনই। স্মরণজিতের কোনও বই ভাল লাগলে, সে কি তার সন্তানের হাতে সে বই তুলে দেবে না! আমার বাবা তো আমার হাতে বই তুলে দিতেন। তাঁর নিশ্চয়ই কিছু ভাল লাগত বলেই দিতেন। কবিতায় যদি-বা পারছি, প্রবন্ধেও পারছি, কিন্তু গল্প বা কথাসাহিত্যে পারছি কি না এ নিয়ে আমার খুব সংশয় আছে। আমার মনে হয় না আমরা পারছি।
স্মরণজিৎ : আমার মনে হয়, প্রতি প্রজন্মেই এই প্রশ্নটা উঠে আসে। আগেও এসেছে, এখনও আসছে... ভবিষ্যতের কথা আমরা কেউ জানি না, কিন্তু এটুকু বুঝি যে, বাংলা ভাষাটাকে বাঁচিয়ে রাখা খুব দরকার। বাবা-মাদেরও একটা দায় আছে। ভাল লেখা কিছুই হচ্ছে না তা তো নয়! তা হলে এতগুলো পাবলিশিং হাউস আছে কী করে? কলেজ স্ট্রিট মার্কেটটা চলছে কী করে? তাই আমার ছেলে বা আমার মেয়ে বাংলা বলতে-পড়তে-লিখতে পারে না বলে বাবা মায়েদের দাঁত বের করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু! কারণ এটা কোনও কৃতিত্ব নয়। যেদিন থেকে আমরা ভিতর থেকে বুঝতে পারব যে এটা কৃতিত্ব নয়, সেদিনই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। আসলে এটা মানসিকতার বদল। অন্তত দশটা বইও তো ভাল লেখা হচ্ছে...
প্রচেত : কিন্তু সে বইগুলোও তো তোমাকে ছেলেমেয়েদের সামনে এনে দিতে হবে...
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ সেটাই তো বলছি... যে, আমাদেরও একটা দায়িত্ব আছে। আমার বই পড়ার অভ্যেস শুরু হয়েছে আমার মায়ের হাত থেকে। মা দেশ পত্রিকা পড়ে পাশে রেখে দিতেন। আমি সেখান থেকে নিয়ে পড়তাম। সব
পুজো সংখ্যা নেওয়া হত বাড়িতে, যখন নাইন টেনে উঠলাম, মা বলত, এই উপন্যাসটা পড়, ওই উপন্যাসটা পড়... ওটা পড়ে ফেলেছিস! এইভাবে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হত বাড়িতে, মা আগে পড়বে, না আমি আগে পড়ব! এই যে একটা হেলদি কম্পিটিশন, পড়ার চর্চা... এমনকী স্কুলের বন্ধুদের মধ্যেও পড়ার চর্চাটা ছিল। আমার অনেক বন্ধুরা লিখত। এই চর্চাটা অনেক কমে গিয়েছে। এখন এসেছে মোবাইল... আমি যখন আজ মেট্রো করে তোমাদের অফিসে আসছি, মেট্রো স্টেশনে যারা বসে বা দাঁড়িয়ে আছে, সবারই মোবাইলে হেড ডাউন হয়ে আছে। কেউ বাদ নেই। এটা একটা হেড-ডাউন প্রজন্ম, তাদের হেড বইয়ে ডাউন নয়, মোবাইলে।
প্রচেত : আমি এ বিষয়ে আগে যা বললাম, তার সঙ্গে দুটো কথা সংযোজন করব, সেটা হল বাংলায় যাঁরা লেখালিখি করেছেন, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, তারাশংকর, তারপর শরদিন্দু হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, এখন যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষেন্দুদা, সমরেশদা, বাণীদি এদের সকলের বইয়ের কিন্তু বিরাট বিক্রি। তার মানে পড়ার খিদে কিন্তু আছে, স্মরণজিৎ! পড়ার মানুষ ভাল লেখা, পড়ার জন্য বসে রয়েছেন! তাদের জন্য প্রথমত ভাল লেখা চাই, দ্বিতীয়ত ভাল লেখা নিয়ে বলা চাই।
স্মরণজিৎ : আমি ওটাই বলছিলাম, দায়িত্ব নিতে হবে, শুধু পেছন থেকে টেনে ধরব, ওরটা খারাপ, তারটা ভাল না...
প্রচেত (হেসে) : কে টেনে ধরে তোমায়, সেটা এবার একটু শুনব...
স্মরণজিৎ (হেসে) : সে আমি জানি না... অদৃশ্য হাত আছে কিছু, যারা সারাক্ষণ টানাটানি করে যায়... (হাসতে-হাসতে) কিন্তু তারা দায়িত্ব নেবে না।
প্রচেত : বাংলা বইয়ের বিরাট বিক্রি যাঁদের, তাঁদের সিংহভাগই আগেকার লেখক। মানুষ কি শুধু ঘর সাজানোর জন্যই এঁদের বই কেনেন? একেবারেই নয়। মানুষ ভাল লেখা পড়েন, পড়তে চান।
সুবর্ণ : সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের সঙ্গে কি আপনারা যুক্ত?
প্রচেত ও স্মরণজিৎ : না, আমরা কেউই এর সঙ্গে যুক্ত নই।
সুবর্ণ : এখন এমনই একটা সময় এসেছে, আনুষ্ঠানিক বই প্রকাশ, নিজেই নিজের আসন্নপ্রকাশ বই সম্বন্ধে ছবি পোস্ট, টিজার অ্যাড, অনুরাগীদের সঙ্গে মতামত বিনিময় এককথায় লেখালিখির সঙ্গে-সঙ্গে নিয়ম করে ভারচুয়ালি নিজের জনসংযোগ বজায় রাখাটা আজকের সময়ে কতটা দরকারি? বাংলা বইয়ের তো সেরকম প্রচার নেই, আনুষ্ঠানিকভাবে বুক লঞ্চও প্রচলিত নয়...
প্রচেত : বাংলা বইয়ের প্রচারের জন্য যদি নেটওয়ার্কিং হয়, তা হলে হোক না, ক্ষতি কী! কেউ যদি খবরের কাগজে একপাতার বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁর বইয়ের প্রচার করেন, তাও তিনি করতেই পারেন। কোনও লেখক হয়তো বললেন, না, আমার পয়সার জোর নেই, আমি ফেসবুকেই আমার বই সম্বন্ধে আগ্রহী মানুষদের জানাব, কোনও ক্ষতি নেই! বাংলা বইয়ের সবরকম প্রচারের আমি পক্ষপাতী, আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ককে অস্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না, তা হলে আধুনিক প্রযুক্তিকেই অস্বীকার করা হয়। সেটা আমি করবও না... তবে এর পরও একটা কিন্তু আছে। সেই কিন্তুটা হল, এই প্রচার কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে বা হচ্ছে, সেটা তো জানতে হবে। ধরা যাক স্মরণজিতের ভক্তসংখ্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশহাজার, সে তার লেখালিখির মাধ্যমে বিশ হাজার ভক্ত তৈরি করতে পেরেছে। সে তার বই নিয়ে বিশহাজার মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে। এর পর যদি সে তার ভক্ত সংখ্যার পঞ্চাশ শতাংশও, মানে বইপিছু দশ হাজার কপিও বিক্রি করে ফেলতে পারে, আমি বলব, খুব ভাল! স্মরণজিৎ, তুমি এই নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রেই একটু বেশি করে সময় দাও, মন দাও। কিন্তু যদি তা না হয়? যদি দশ হাজারের ধারে-কাছেও না পৌঁছয়? তখন? কী লাভ হল? তা হলে আমি সেখানে মন দেব কেন? দিলে কতটাই-বা দেব? তবে বাংলা বইয়ের সত্যিকারের প্রচার ও প্রসারের সব পদ্ধতিতে আমার সমর্থন আছে।
সুবর্ণ : এ তো একেবারে নৈর্ব্যক্তিক মতামত... আপনি নিজে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে নেই কেন?
প্রচেত : আমি... মানে ইয়ে, আমি আসলে ভাল টাইপ করতে পারি না বলে ফেসবুকে নেই...
(দুজনেরই হাসি)
প্রচেত (হাসতে-হাসতে) : এটা মজা করে বললাম... আমি আসলে এই পথটা নিতে পারিনি একেবারে। আমার মনে হয়েছে, একজন ব্যক্তি হিসেবে নিজের বইয়ের কথা, নিজের সৃষ্টির কথা নিজমুখে না-ই বা বললাম! আমি তো পুরনো দিনের লোক, তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বইয়ের বিরাট বিক্রি, তারাশংকর রচনাবলি এখনও মানুষ কেনেন... শীর্ষেন্দুদা, সমরেশদার বইয়ের বিক্রি কেমন সকলেই জানেন, এঁরা কেউই ফেসবুকে ছিলেন না, নেই... কোয়ান্টিটি, কোয়ালিটি দুটো দিক থেকেই বলছি, সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোঁড়াই চরিত মানস-এর জন্য কোনও ফেসবুক-প্রচার প্রয়োজন হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস নেই। লোকে বলবেন, তাতে কী হয়েছে, সে সময় আলাদা ছিল, এ সময় আলাদা... আমি এই ঝগড়ার মধ্যে যেতে চাই না, যাঁর যা বিশ্বাস তিনি সেইভাবেই চলুন। শুধু দেখতে হবে ফলপ্রসূ হল কি না! যদি ফলপ্রসূ না হয়, তা হলে অবশ্যই ভাবা দরকার, সেই সময়টা আমার অন্য কিছু করা উচিত কি না! তবে প্রকাশক সব পথে বইয়ের প্রচার করবেন সেটা উচিতও। তাঁর কাছে শুধু বিক্রি নয়, মানুষকে জানানোটাও একটা কাজ।
সুবর্ণ : ফলপ্রসূ হবে না কেন? আপনি জনপ্রিয় লেখক, আপনি ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুললেই অজস্র বন্ধু হয়ে যাবে, আপনি আপনার লেখা নিয়ে তাঁদের কাছে সরাসরি পৌছতে পারবেন...
প্রচেত : চারপাশের যা অভিজ্ঞতা আমি দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, এরকম আমার দরকার নেই। প্রকাশক বিজ্ঞাপন দিন, প্রচার করুন... আমাকে এর মধ্যে না রাখাই ভাল। ভাল বইয়ের প্রচার চিরকাল মুখে-মুখে হয়ে এসেছে, আমার বিশ্বাস এখনও আসলে সেভাবেই হয়। নিজে প্রচার না করায় আমার বই যদি একটু কম মানুষ পড়েন, ও ঠিক আছে, এতেই আমি খুশি। আমি পাঠকের অনেক ভালবাসা পেয়েছি, এত পাওয়ার কথাও আমার ছিল না।
স্মরণজিৎ : আমি শুধু একটা ব্যক্তিগত কথাই বলব। আমি আসলে খুব লাজুক এবং চুপচাপ থাকা একা-একা মানুষ। আমার মা আমাকে ছোটবেলায় শিখিয়েছে, আপনারে বড় বলে, বড় সে-ই নয় । লোকে যারে বড় বলে, বড় সে-ই হয়, এটা একেবারে আমার ভিতরে বুনে দিয়েছেন মা। নিজের সম্বন্ধে আমার যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কনফিউশন, কোয়েশ্চেন মার্ক, সেগুলো নিয়ে আমি কারও সামনে যেতেই সাহস পাই না। কারণ, লোকের কাছে কেন রে। ব্যাটা বারবার আসে বিরক্ত করতে? এমন কথা আমি শুনতে চাই না। নিজের মতো একা থাকতে খুব পছন্দ করি। সভা-সমিতি-অনুষ্ঠান কোথাও যাই না। আমি এতই সিঙ্গুলার নাম্বার যে, আমার আগে বা অ্যান বসে (প্রচেত-র হাসি), দ্য কখনও বসে না... তাই নিজেকে সবার সামনে নিয়ে আসতে আমার বরাবরের অস্বস্তি...
প্রচেত : আচ্ছা, এবার বলো তো, কেউ তোমার কোনও বই নিয়ে ফেসবুকে তীব্রভাবে সমালোচনা করল, তোমার কী প্রতিক্রিয়া হবে?
স্মরণজিৎ : কিছুই না, আমি অফস্টাম্পের বাইরের বলটা দেখব, আর ব্যাট তুলে ছেড়ে দেব। আমি কিছু বলতেই যাব না।
প্রচেত : আর যদি ভীষণ প্রশংসা করে, তখন তুমি কী করবে?
স্মরণজিৎ : সেটাও অফস্টাম্পের বাইরের বল, ছেড়ে দেব।
প্রচেত : খোঁচা দেবে না কোনওভাবে? স্মরণজিৎ (হেসে): না, না...
সুবর্ণ ; তা হলে মিডল স্টাম্পের বল কোনগুলো?
স্মরণজিৎ : কিছু নির্দিষ্ট বোলার আছে, যাদের বল আমি খেলি একমাত্র। আমার খুব ঘনিষ্ঠ কিছু জন আছেন...
প্রচেত : আমাকেও ঢুকিয়ে নিয়ে তাঁদের মধ্যে (হেসে) ...
স্মরণজিৎ : নিশ্চয়ই... শুধু তাঁদের মতামত শুনি। আমি কাউকেই পাত্তা দিই না, তা কিন্তু নয়। তবে কাকে পাত্তা দেব আর কাকে পাত্তা দেব না, সেটা আমি নিজেই ঠিক করি।
প্রচেত : এবার আমি স্মরণজিৎকে একটা প্রশ্ন করব, অর্ডারি লেখা... আমি বলি না শব্দটা, পাঠকরাও বলেন না, শব্দটাই প্রচলিত... ফাইভ পারসেন্ট লোকজন হলেও বলেন...
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি বুঝেছি... যাঁরা বই পড়েন না, কিন্তু সমালোচনা করেন, তাঁরা বলেন...
(দুজনেরই হাসি)
প্রচেত : এখানে বলা হয়, অর্ডারি লেখা মানে যে লেখাটার তুমি অর্ডার পাচ্ছ, সেই অর্ডারি লেখা, মানে খারাপ হবেই... তোমার এ ব্যাপারে কী মত?
স্মরণজিৎ : এখানে একটা মজার কথা বলি। যেই আমাকে অর্ডার দেওয়া হল, অমনি জামাকাপড়ের দোকানের মতো আমি সুচসুতো নামিয়ে বসে গেলাম সেলাই করতে, ব্যাপারটা তো তা নয়। আমার লেখালিখিতে বেশ কিছুদিন তো হয়ে গেল, কোনও কাজ দীর্ঘদিন ধরে করতে করতে একটা রিফ্লেক্স তৈরি হয়। আচমকা কোনও ঘটনা শুনলাম, দেখলাম বা জানলাম, সেটা থেকে ভিতরে একটা গল্প তৈরি হতে থাকে। আমি সেটা তখনই লিখতে বসে পড়ি না। মাথায় রেখে দিই। যদি তারপর আবার লিখতে বলা হয়, তখন সেটা লিখি। বাকি প্লটগুলো হয়তো লেখাই হল না। মনে হয়, না, ঠিক হয়নি, দুর্বল, গল্প দাঁড়াচ্ছে না... আবার পরে হয়তো অন্য কোনও প্লট এল। সুতরাং যেটাকে অর্ডারি বলা হচ্ছে, সেটা কিন্তু আমার মাথায় তৈরি আছে অনেক দিন থেকেই। বলা হয় যে, স্বতঃস্ফূর্ততার উপর সাহিত্য ভাল হয়, ওয়ার্ডসওয়ার্থ যেমন কবিতাকে বলেছেন স্পনটেনিয়াস ওভারফ্লো অফ হিউম্যান ইমোশন। সেভাবেই সাহিত্যকে দেখা হয়। সাহিত্য নিয়ে একটা বড় বিতর্ক আছে, সাহিত্য কি সৃষ্টি? না নির্মাণ? আমার মনে হয় দুটোই। আমি যখন কোনও কিছু সৃষ্টি করি, ধরো একটা ছ'শো পাতার উপন্যাস লিখছি, সেটা আমি এক মিনিটে সৃষ্টি করে ফেলতে পারব না। আমাকে একটা সময় ধরে বুনতে-বুনতে যেতে হবে। তার বেসিক থিমটা, অ্যাম্বিয়েন্সটা আমার মাথার ভিতর থাকবে। সব গল্পেরই একটা নিজস্ব ধাঁচ থাকে। যেটা আমরা জানি, প্রচেতদাও জানে, লিখতে গিয়ে আচমকা ঢুকে পড়ে নতুন-নতুন ক্যারেক্টার। তাই বলব, যাঁরা অর্ডারি লেখা বলে কোনও লেখাকে ছোট করেন, তাঁরা লেখার ডায়নামিক্সটা বোঝেন না, লেখকের রান্নাঘরটা তাঁরা দেখেনইনি কোনওদিন।।
প্রচেত : এখানে আমি একটু যোগ করতে চাই, অর্ডারি লেখা শব্দটাই তো ভুল। লেখা তো আমন্ত্রণ করা হয়। কখনও আমন্ত্রণ করা হয়, কখনও নিজেরা লিখি। কখনও প্রকাশকরা বা সম্পাদকরা লেখা আমন্ত্রণ করেন। আমন্ত্রণের ফলে ভাল লেখা হয়েছে, এমন উদাহরণের সংখ্যা প্রচুর। পুজোসংখ্যা, বিশেষ সংখ্যা, উৎসব সংখ্যায় বহু-বহু ভাল লেখা আমরা পেয়েছি, যেগুলো আমন্ত্রিত। তাই এটা বলা ঠিক নয়। অনেকে তো লিটল ম্যাগাজিনের জন্য লেখা চান, তখন তো কেউ অর্ডারি বলেন না! প্রচেতদা, আমার অমুক ম্যাগাজিনের জন্য একটা লেখা দেবেন?... প্রচেতদা দেখবেন, দশদিনের মধ্যে যেন লেখাটা পাই!... কী ভাল লাগে শুনতে, কই তখন তো অর্ডারি মনে হয় না। অর্ডারি শব্দটাই ঠিক নয়। আর আমি অর্ডারে লিখলাম না। স্বেচ্ছায় লিখলাম, সেটা ভেবে লাভ কী! লেখাটা পাঠককে ছুঁল কি না, তাঁরা পড়লেন কি না, সেটাই আসল।
সুবর্ণ : তিন-চারের দশক থেকে শুরু করেই বাঙালি সাহিত্যিকদের মধ্যে গোষ্ঠীভাগ আছে। পারস্পরিক সমালোচনা আছে। কিন্তু তাতে সাহিত্যই ছিল মুখ্য। বর্তমানে ফেসবুকের যুগে সাহিত্য সরিয়ে রেখে সাহিত্যিককে ব্যক্তি আক্রমণ বা প্রশংসা করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ সম্বন্ধে আপনাদের মতামত? নিজের বা পরিচিত কারও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে কখনও?
প্রচেত : আমি নিজে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে নেই, তবু কাছের মানুষদের থেকে কানে এসেছে। এ ধরনের বিভিন্ন ঘটনা। সত্যি, আগেকার দিনে, মুড়ি-শিঙাড়া খেতে খেতে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, সেখান থেকে ঝগড়া হয়ে হাতাহাতি পর্যন্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের কেচ্ছা নিয়ে কত ভাল ভাল বই লেখা হয়েছে, আমরা ভানুবাবু বা সাগরময়বাবুর বইতে কত সুন্দর করে সেসব দিনের কথা পেয়েছি। সমরেশদা ধারাবাহিক লিখেছিলেন অন্য সাহিত্যিকদের নিয়ে, সাহিত্যিকদের ভ্রমণকাহিনি থেকেও কত কিছু পেয়েছি... সবটাই ছিল সাহিত্যকেন্দ্রিক। কিন্তু আমি এড়িয়ে যাব না বলেই বলছি, ঠিক তুমি যা বললে, যা-যা আমার কানে এসেছে, এখনকার মতপার্থক্য বা আলোচনা খুবই দুঃখজনক জায়গায় গিয়ে পৌছেছে। সাহিত্য নিয়ে মতপার্থক্য এখন আর সাহিত্য-আলোচনা নয়। অন্য কিছু...
স্মরণজিৎ : মতপার্থক্যই নয়।
প্রচেত : হ্যাঁ, মানে সাহিত্য বিষয়টাই ক্রমশ গৌণ, বা বলা ভাল অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে।
স্মরণজিৎ : বিষয়টা এসে দাঁড়িয়েছে, তোর হলুদ জামা আছে, আমার নেই কেন?
প্রচেত : এ তো তাও কম স্মরণজিৎ! বক্তব্য হল, হলুদ জামাটা তুই চুরি করে পরেছিস! তুই চোর একটা!
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, এরকম তো হয়েছে।
প্রচেত : সুবর্ণ আগে আমার ফেসবুকে না থাকা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল, তার জের টেনেই বলি, এটাও একটা কারণ, যার জন্য আমি কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে নেই। কারণ, এগুলো আমি আর নিতে পারব না। আলোচনাটা যদি হয় যে, প্রচেত গুপ্তর গল্পটা ভাল লাগল না, তাঁর ভাষা একদম জলের মতো তরল, তাতে জীবনের জটিলতার প্রতিফলন নেই...' সে আলোচনায় আমি যেতে রাজি, কিন্তু প্রচেত গুপ্ত অমুক, প্রচেত গুপ্ত তমুক... সেখানে অংশ নেওয়ার কোনও প্রয়োজন বোধ করি না। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। মাঝে-মাঝে মনে হয়, এই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ তো হচ্ছে সকলের চোখের সামনে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, যাঁরা দেখছেন, কী ভাবছেন তাঁরা! বাংলা ভাষার সাহিত্যিকদের সম্বন্ধে কী ধারণা হচ্ছে তাঁদের।
স্মরণজিৎ : এই ব্যাপারে আমার আরও একটা কথা মনে হয় প্রচেতদা, আগে আদানপ্রদানটা শুধু সাহিত্যিকদের মধ্যেই ছিল, কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বহু অ-পাঠক মানুষ এর মধ্যে ঢুকে পড়ছেন এবং শুধু ঢুকছেনই না, গন্ডগোলটাও আরও বেশি করে পাকিয়ে তুলছেন।
প্রচেত : একদম ঠিক! মানুষ কেচ্ছার গন্ধ পাচ্ছেন, তাই মজা দেখতে ঢুকে পড়ছেন...
স্মরণজিৎ : কেউ কিছু জানলই না, বুঝলই , আজ বাংলা সাহিত্যের কালো দিন লিখে দিয়ে চলে গেল! আরে, আগে তুই জান, ব্যাপারটা কী, কালো দিন, না সাদা দিন... আগেই কমেন্ট!
প্রচেত : লেখার ফর্ম্যাট কী, কনটেন্ট কী, জীবনবোধ কী, দর্শন কী, লেখা কাকে বলে ... এই আলোচনা সোশ্যাল মিডিয়ায় হয় না তা নয়, কিছু ভাল গ্রুপ আছে বলে জানি, তারা গভীরে আলোচনা করেন, কিন্তু একদলের কেচ্ছাতেই বেশি আগ্রহ।
স্মরণজিৎ : ভালর পাশাপাশি বেনোজলটাও কিন্তু ঢুকছে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্যই। কারণ, এখানে বলার কোনও ছাঁকনি বা ফিল্টার নেই, কোনও সেনসরশিপের ব্যাপার নেই, ফলে বহু হাবিজাবি লোক ঢুকে পড়েছে। একই সঙ্গে আর-একটা জিনিসও হয়েছে। মানুষের স্ট্রেস ভীষণ বেড়ে গিয়েছে। মানুষ আজকাল বড় রেগে থাকে, একটুতেই মারামারি করে বসে, গালাগালি দেয়... আমি তো অনেক গালাগালি খেয়েছি, খাই, ভবিষ্যতেও খাব। আসলে মেঘের আড়াল থেকে গালাগালি করাটা সোজা।
প্রচেত : আসলে কী জানো, সাহিত্যিকে ঈর্ষা চিরকালই ছিল। ও কেন এত ভাল লেখে, আমি কেন ভাল লিখি না, এটা তো থাকবেই। আমি তো মানুষ! আমারও ঈর্ষা আছে। একই অনুষ্ঠানে স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর সঙ্গে একই মঞ্চ থেকে নেমে আমি দেখেছি, ছেলেমেয়েরা স্মরণজিতের দিকেই দৌড়েছে। আমার কি ঈর্ষা হয়নি! কই আমার দিকে তো কেউ ছুটে এল না। আমার দিকে তো মোটে দুজন ছুটে এসেছে, তাও ভুল করে, ভিড়ে স্মরণজিতের কাছে ঢুকতে পারেনি বলে...
স্মরণজিৎ : (হাসতে-হাসতে) একদম বাজে কথা! এই... এগুলো সব বাজে কথা কিন্তু! এটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল... একদমই তা নয়!
প্রচেত : কিন্তু একই সঙ্গে আমার মনে আর-একটা জিনিসও হয়েছে, সেটা হল, দ্যাখো, দ্যাখো... তাকিয়ে দ্যাখো, এই ছেলেটাও বাংলাতেই লেখালিখি করে! লোকে এর জন্য ছুটে যাচ্ছে। ভাবা যায়, সাহিত্য-উৎসব হচ্ছে, সেখানে একজন বাঙালি তরুণ লেখকের জন্য মানুষ ছুটে যাচ্ছে। কত বড় ঘটনা! আমার ঈর্ষার চেয়েও অনেক বড়।
স্মরণজিৎ : আমায় যদি কেউ খারাপ কিছু বলে, আমি শুনি কিন্তু গায়ে মাখি না। মাখবইবা কেন, তাকে চিনি না, জানি না, সে আমার কেউ নয়। কাছের কেউ খারাপ কিছু বললে আমার খারাপ লাগতে পারে। আর তার চেয়েও বড় কথা হল, প্রচেতদার একটা লেখা আমার সেরকম না-ই মনে হতে পারে, আমি হয়তো প্রচেতদাকে বললাম, প্রচেতদা, এই লেখাটা আমার সেরকম ভাল লাগেনি। কিন্তু সেটা বলায় আমার একটা ভদ্রতা, শালীনতা বা ডিগনিটি তো থাকা উচিত। আমি কীভাবে মতামত প্রকাশ করছি, তা কিন্তু আমার পরিবার, আমার কালচার, আমার শিক্ষাকে রিফ্লেক্ট করে। এটা থেকে অনেক কিছু বোঝা যায়। যাঁরা এইভাবে খারাপটা বলছেন, তাঁরা কিন্তু শুধু নিজেদের নয়, তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং ক্লাস সম্বন্ধেও সংশয় তৈরি করে দিচ্ছেন।
প্রচেত : এরকম করে কি আদৌ কিছু হয়, মানুষ একদিন শুনবে, দুদিন শুনবে, তিনদিনের দিন ভুলে যাবে। শেষ অবধি ভাল লেখাটাই তো সব। আচ্ছা, স্মরণজিৎকে আমার একটা প্রশ্ন আছে... তুমি তো প্রথমে কবিতা লিখতে, মূলত তুমি একজন কবি, এখন তুমি কবিতা লেখা অনেক কমিয়ে দিয়েছ, তার বদলে তুমি কবিতাটা অন্য ফর্মে তোমার উপন্যাসে লিখছ, আমি তোমার বইয়ের চ্যাপ্টার ধরে ধরে দেখিয়ে দিতে পারি। কবিতাটা ছেড়ে দিচ্ছ কেন? গদ্য তোমাকে বেশি পরিচিতি দিয়েছে বলে? নাম, খ্যাতি সব পেয়ে গিয়েছো, ব্যস অমনি কবিতা দিলে ছেড়ে... আমাকে দোষ দিতে পারবে না, আমি তো কোনওদিন কবিতা লিখিইনি। (হেসে)... দাও, এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
স্মরণজিৎ (হেসে) : না, না, ঠিক তা নয়। আসলে উত্তরটা খুব সোজা উত্তর। আমি প্রথম গদ্য লিখি ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে। মজার কথা হল, তার জাস্ট পাঁচ-মাস আগে থেকে আমি কবিতা লেখা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০২-এর জুন-জুলাই পর্যন্ত আমি প্রচুর কবিতা লিখেছি। অনেক কবিতা, আট-নটা মোটা-মোটা খাতা, ডায়েরি ভর্তি হয়ে গিয়েছে কবিতায়। আমার মা মারা গেল ২০০২-এর আগস্টে। আমার মা-ই আমার বন্ধু ছিল। ফলে আচমকা একটা বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়। হঠাৎই দেখলাম আমার নিজের লেখা আর আমার ভাল লাগছে না। আমার কোনওদিনও কোনও লক্ষ্য ছিল না। আমার পরিচিতরা, বন্ধুরা আমাকে প্রায়ই বলত যে, তোর কোনও অ্যাম্বিশন নেই, তাই তোর জীবনে কিছু হবে না, তোকে খাতা জমা দিয়ে দিতে হবে তাড়াতাড়ি। ফলে আমার কবিতা নিয়েও আমার তেমন অ্যাম্বিশন ছিল না। আমার মা মারা যাওয়ার ফলে বিরাট একটা শূন্যতা তৈরি হল, আমি কবিতা লেখালিখি ছেড়ে দিলাম। তারপর ২০০২-এর ডিসেম্বরে একটা ছোটগল্প লিখলাম, ২০০৩ সালে সেটা বেরোল। ২০০৩ সালে আর-একটা ছোটগল্প লিখে জমা দিলাম, সেটা রিজেক্টেড হল, তারপর আবার একটা লেখা দিলাম সেটা ছাপা হল... এরকম করে-করে একটা-দুটো করে গল্প লিখছি, আর বুঝতে পারছি, কবিতা আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি কবিতায় আর নতুন কিছু লিখতেই পারছি না! বাংলা কবিতা এত রিচ, তার বৈভব এত বেশি যে আমি সেখানে নতুন কিছু যোগই করতে পারছি না।
প্রচেত : আমি তোমাকে বলছি, কবিতাটা কিন্তু তুমি ছেড়ো না।
স্মরণজিৎ : আরও একটা ব্যাপার আছে। কবিতা লেখার সময় আমার খুব অল্প বয়স ছিল। তখন মনে হত, সবাই আমার কবিতা পড়বে, প্রশংসা করবে, পিঠ চাপড়াবে... কিন্তু সেসব । কখনও হয়নি। তা ছাড়া, নিজেরও আর আনন্দ হচ্ছিল না কবিতা লিখে, ফলে আমি সরে গিয়েছিলাম। তবে খুব সম্প্রতি, বছর খানেক হল
দেখছি, আমার আবার কবিতা লেখার ইচ্ছেটা ফিরে আসতে শুরু করেছে। আমি আবার কবিতা লিখি, লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা ছাপা হয়। বই বেরোয়। আগে আমি খুব ছন্দে কবিতা লিখতাম, অন্ত্যমিল দিয়ে লিখতে ভাল লাগত। কিন্তু এখন আস্তে-আস্তে আবার গদ্যে কবিতা লিখছি। মোটকথা কবিতা লিখতে আবার নতুন করে ভাল লাগছে।
সুবর্ণ : ছোটগল্পের প্রসঙ্গে আসি প্রচেতদা, আপনার ছোটগল্প পাঠকদের ভীষণ পছন্দের। তুলনায় উপন্যাস কি আপনি একটু কম লেখেন? আপনার কোনটা লিখতে বেশি ভাল লাগে?
প্রচেত : অবশ্যই, ছোটগল্প লিখতে বেশি ভাল লাগে। যখন ছোটগল্প লিখি, তখন আমার ঠিক মনে হয়, আমি যেন ছোটগল্পটার সঙ্গে বসে দাবা খেলছি। আমার গল্পের সঙ্গে আমার বুদ্ধির মারপ্যাঁচ হয় এবং ছোটগল্প লেখার সময় আমার স্ট্রেসটাও বেশি হয়। নিজেকে যেন...নিজেকে যেন...
স্মরণজিৎ : ক্ষয় করতে হয়?
প্রচেত : হ্যাঁ, ক্ষয় করতে হয়, অনেক সময়। এমনও হয়েছে, একটা ছোটগল্প আমি দশদিনেও লিখে উঠতে পারিনি। ছোটদের বা বড়দের, যে-কোনও ধরনেরই হোক না কেন, ছোটগল্প আমার প্রিয়।
স্মরণজিৎ : এখানে আমি একটা প্রশ্ন না করে পারছি না, কোনও কোনও ছোটগল্প লিখলে। কি এরকম মনে হয় না যে, একটা উপন্যাসের প্লট চলে গেল?
প্রচেত : না, আমি সেরকম কখনও ভাবিনি। অনেকে বলেছেন, এই প্লটটায় ছোটগল্প লিখলে, আহা, এটায় দারুণ উপন্যাস হতে পারত। আমার সেরকম মনে হয় না এই কারণে যে, প্লটটা চলে যাবে কেন! ছোটগল্পটায় তো দিলাম। তা ছাড়া, ছোটগল্পকে তো আমি উপন্যাসের চেয়ে কম কিছু বলে মনে করি না।
স্মরণজিৎ : না, উপন্যাসে অনেক বেশি শেড আসে, অনেক বেশি জায়গা নিয়ে খেলা করা যায়...
প্রচেত : কিন্তু ছোটগল্পের ম্যাজিকটা হল, ওতে ওইটুকুই করা যাবে, যতটুকু আমি বলেছি, তার চেয়ে বেশি বলা যাবে না। বললে, ওটা ছোটগল্প হবে না। আমার লেখাটাই দাঁড়াবে না। এক-একটা ছোটগল্প যেন আমাকে প্রায় মেরে ফেলে!
স্মরণজিৎ : সেইজন্যই কি তুমি এত ছোটগল্প লিখেছ?
প্রচেত ; যা লিখেছি, ভালবেসে লিখেছি, খুব আনন্দ পেয়েছি। এ প্রসঙ্গে ছোট করে একটু বলি, লেখাটা কিন্তু খুব অদ্ভুতভাবে শুরু হয়েছিল। ২০০০ সালে একটা ছোটগল্প লিখে একটি পুজোসংখ্যায় জমা দিতে গিয়েছিলাম। তিনি গল্পটা হাতে নিয়েও দেখেননি। আমি বলেছিলাম, একবার অন্তত পড়ে দেখুন। তিনি বলেছিলেন, না, না, পুজোসংখ্যায় লেখা অনেক বড় ব্যাপার, তুমি আরও প্র্যাকটিস করো, আরও ভাল লেখো, তারপর না হয়... পুজোসংখ্যার সব লেখাই আমন্ত্রিত। তখন আমি ওটা একটা খামে ভরে আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় দপ্তরে পাঠিয়ে দিলাম। কিছুদিন পর একজন ভদ্রলোক ল্যান্ডলাইনে ফোন করলেন, বললেন, আমি রমাপদ চৌধুরীর দপ্তর থেকে ফোন করছি, আপনার পাঠানো গল্প পেয়ে রমাপদবাবু ভীষণ বকাবকি করছেন, আপনি এতবড় গল্পটা সাময়িক পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলেন! এখানে তিনচার হাজার শব্দের গল্প ধরানো যায়? আপনি কি কিছুই জানেন না? অথচ গল্প লিখছেন? আমি এমন ভয় পেয়ে গেলাম, তাড়াতাড়ি করে বললাম, আমি বুঝতে পারিনি, আমার খুব ভুল হয়ে গিয়েছে। শেষে উনি বললেন, শুনুন, রমাপদবাবু বারণ করে দিয়েছেন, এ গল্পটা আপনি আর কোথাও দেবেন না। এটাই ছিল ওঁর শেষ কথা। তার মানে কি গল্পটা ছাপা হবে? কিছুই বুঝতে পারিনি, তখনই জিজ্ঞেস করার সাহসও হয়নি। সে বছর শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায় গল্পটা ছাপা হয়েছিল।
স্মরণজিৎ : আচ্ছা, আমার মনে আর-একটা প্রশ্ন এল, প্রচেতদা, তুমি গদ্য লিখলে কেন?
প্রচেত : আমি তো বরাবর গদ্যই লিখতাম।
স্মরণজিৎ : না, মানে বলতে চাইছি, লেখালিখি করতে ইচ্ছে হল কেন, মানে শুরুটা কোথায়?
প্রচেত : আমি তো অনেক ছোটবেলা থেকে লেখালিখি করতাম। লিখতাম, লেখা দিতাম, ছাপা হত না। তখন ছোটদের গল্পই লিখতাম।
স্মরণজিৎ : স্কুল ম্যাগাজিনে দিতে?
প্রচেত : স্কুল-ম্যাগাজিনেও দিতাম। তবে নিয়মিত লিখতাম। ক্লাস সেভেন-এইট থেকে এমন কোনওদিন যায়নি, যেদিন কিছু না কিছু মৌলিক গদ্য লিখিনি, কিছু না-কিছু লিখতামই...  সেগুলো ডায়েরি নয় কিন্তু। পরের দিকে সিরিয়াস লেখার চেষ্টা করতাম। আমি সিরিয়াসলি লেখালিখি করছি, এই আঠারো উনিশ বছর হয়েছে। মনে হয়েছিল লেখালিখি করেই জীবন কাটাব। যদি একটি টাকাও রোজগার করি, সেটা যেন লিখেই করি। সেই কারণেই সাংবাদিকতার পেশাও আমার পছন্দ করা। আমি ব্যাঙ্কের বা রেলের বা এই ধরনের আরও সব চাকরির পরীক্ষার ফর্ম লুকিয়ে রাখতাম। আমি ইকনমিক্স নিয়ে পাশ করলাম, পাশ করার পর আমি খবরের কাগজে পরীক্ষা দিলাম আর চাকরি পেয়ে গেলাম। তখন সবে বর্তমান হয়েছে, সেখানেই চাকরি পেলাম। বাড়িতে বলে দিলাম, মাস্টার ডিগ্রিটা আর করব না। কিন্তু বাড়ির জোরাজুরিতে মাস্টার ডিগ্রিতে ভর্তি হতেই হল। ভেবেছিলাম চান্স পাব না, কিন্তু পেয়ে গেলাম! ফলে তারপর থেকে চাকরিও করছি, মাস্টার্সও করছি। এইভাবে পড়লে অন্য কোনও সাবজেক্ট কী হয় জানি না, তবে ইকনমিক্সটা হওয়া একটু কঠিন। তখন দুটো সেমিস্টার পরীক্ষা হত। কোনওরকমে প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষা দিলাম, দিয়ে ভাবলাম ফেল তো করবই। কেউ আমাকে পাশ করাতে পারবে না। তখন অসীম দাশগুপ্ত, বিপ্লব দাশগুপ্তরা আমাদের পড়াতেন। কিছুই পড়িনি, চাকরি করেছি, পাশ করার তো কোনও উপায় নেই। কী আশ্চর্য পাশও করে গেলাম।
স্মরণজিৎ : এটা কোন সাল তখন?
প্রচেত : এটা... ধরো চুরাশি-পঁচাশি সালের কথা বলছি... তা পাশ তো করে গেলাম, এবার। মহাবিপদ! আবার পরের সেমিস্টারের জন্য ভর্তি হতে হবে। কিন্তু তখন তো আবার কলেজে অ্যাটেন্ড্যান্সের পারসেন্টেজ রাখা জরুরি, না হলে পরীক্ষায় বসতে দেবে না। বাড়ির লোক বলল, চাকরি ছেড়ে দাও, আবার কী? আমি মাস্টার্স ডিগ্রি ছেড়ে দিলাম! কারণ, তখন লেখালিখি করব এটা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি। পড়লে হয়তো এমএসসি পাশ করতাম। খুব ভাল ছাত্র কিছু ছিলাম না, তবুও.. পাশ করলে আরও নিশ্চিত কিছু না কিছু চাকরি পেয়ে যেতাম। তবু খুব কঠিনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, লেখালিখিই করব। আমার কিছু করার ছিল না। এবার তোমার প্রশ্নে আসি, কেন লিখি। কারণ, আমি তো ঠিক করেই রেখেছিলাম, যে আমি লিখব।
আমি অনেক কিছু জেনেছি, দেখেছি, আমার মানুষকে অনেক কিছু বলার আছে এবং সেটা করার জন্য অন্য কোনও প্রকাশভঙ্গি আমার জানা নেই। আমার তো মনে হয়, লেখক। মাত্রেরই তাই দেখবে, তোমার আয়নায় দেখার আছে, নিজেকে দেখার আছে, নিজের ভাবনাচিন্তাকে দেখার আছে... লেখক তার নিজের রিফ্লেকশন দেখতে চায় বলেই তো তার। ভাবনাচিন্তাগুলোকে লিখে ফেলে। খুব বড় কথা কিছু নয়, আমি বড় কথা বলতেও পারি না... শুধু এটুকু বলতে পারি, লেখালিখি করব বলে ঠিক করেছিলাম, নিজের সেই সিদ্ধান্ত থেকে কখনও বেরতে পারিনি।
সুবর্ণ : স্মরণজিৎদাকে যদি জিজ্ঞেস করি, আপনি কেন লেখালিখি করলেন?
স্মরণজিৎ : লেখার পোকা তো মাথায় ছিলই, কবিতা লেখা ছাড়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, একটা-দুটো করে ছোটগল্প লিখতে লিখতে গদ্য লেখার যে নিজস্ব মজা আছে, সেটা। উপভোগ করতে শুরু করলাম। এটা প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণ... এটা খুবই ব্যক্তিগত একটা কারণ। আসলে আমার লেখালিখির পুরোটাই খুব ব্যক্তিগত জায়গা থেকে করা। আমার ভাল লাগলে আমি লিখি, ভাল না লাগলে লিখি না। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটাই আমার নিজের, খুব একান্ত... আমি নিজে কী ভাবছি, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি। গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক, সমাজ, বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ এগুলো আমার অতটা মাথায় থাকে না। আমার সঙ্গে একটি মেয়ের ভাব ছিল, সেই মেয়েটি আমাকে ছেড়ে চলে যায়, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়...
সুবর্ণ : লিখবে তো এসব?
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই! আমার তো লুকোছাপার কিছু নেই... মানুষের জীবনে ভাবভালবাসা থাকবে না? এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার! অনেকে হয়তো বলতে চান না, কিন্তু আমার এ নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই। তো, সেই মেয়েটির প্রতি আমার আপ্রাণ প্রেম ছিল। সে যখন হারিয়ে গেল, আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেল, আমার মনে হল আমি তো তাকে খুঁজে পাচ্ছি না... তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, তার একটা অন্য জীবন তৈরি হয়ে গিয়েছে... আমার মনে হল, আমি তাকে কতটা ভালবেসেছিলাম, তা তো বোঝাতে পারলাম না। আমার ইচ্ছে হল সেটা তাকে বোঝাতে। কিন্তু কোটি-কোটি মানুষের ভিড়ে তাকে খুঁজে পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখন আমার মনে হল লেখালিখি করে ভিড়ের মধ্যে আমার মাথাটা যদি একটু উঁচুতে ওঠে, তখন সে যদি আমাকে দেখতে পায়। তারপরই মনে হল, দেখতে পেল তো কী হল! ও আমাকে দেখতে পেলে আমার কোন চতুর্বর্গ লাভ হবে! আমি চতুর্বর্গ লাভ করতেও চাইনি সেভাবে। শুধু মনে হয়েছিল, আমার লেখালিখি দেখে তার যদি মনে হয়, এই ছেলেটার সঙ্গে একদিন আমার সম্পর্ক ছিল... ও লিখেছে, দেখি তো কেমন লিখেছে! ও তো তখনও লিখত... তখন কবিতা লিখত, এখন গদ্য লিখছে, দেখি তো পড়ে... ' এবার সে যখন গদ্যটা পড়ে দেখবে যে আমি তার কথাই লিখে গিয়েছি! দেখবে ছেলেটা যা বলেছিল, তা সে মনে রেখেছে... সে দেখবে ছেলেটা তার ভালবাসায় সৎ ছিল! সে বুঝবে, ছেলেটির সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়তো পরিণতি পায়নি, কিন্তু যে-ছেলেটার সঙ্গে একসময় সে ছিল, সে সভাবে তাকে ভালবেসেছিল। এই যে তার প্রতি আমার ফিলিং, সেটা কিন্তু একটা সময় পর্যন্ত আমার লেখালিখির ক্ষেত্রে আমাকে চার্জ করে এসেছে।
তবে সেটা একটা সময়ের পরে আমার কেটে গিয়েছে। কেটে যাওয়ার পর আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হল, যে লেখাগুলো আমার এত ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে, যে লিখলে আমি ভাল থাকছি। আমার মনের কষ্ট, ডিপ্রেশন কেটে যাচ্ছে লেখার মধ্য দিয়ে। আমি ষোলো জনের যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, সেখান থেকে এই যে আমি ক্রমশ একা থেকে আরও একা হয়ে যাচ্ছি, আমার চারদিকে শূন্যতা বেড়ে যাচ্ছে... সেসময় লেখাই আমার বন্ধুর মতো আমার শুন্যতাগুলোকে পূরণ করতে সাহায্য করেছে। আবার, আমার লেখাগুলো পড়ে বহু মানুষ আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে দেখা করতে আসে। এসে তারা আমার পরিবারের সদস্যর মতোই হয়ে যায়। এরাই আমার এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি হয়ে উঠেছে। লেখাই কিন্তু আমাকে এগুলো দিয়েছে। আরও একটা কথা, লিখতে গেলেই আমি বুঝি যে, লেখা এমন একটা কাজ, যাতে আমি স্বচ্ছন্দ। হচ্ছে, না হচ্ছে না, সে আমি জানি না কিন্তু আমি স্বচ্ছন্দবোধ করছি। এ ব্যাপারে আমি একটু স্বার্থপর বলতে পার, কারণ, অন্য কোনও কিছু এ সময় আমার মাথায় থাকে না। গদ্য লিখলে নিজে ভাল থাকি, তাই লিখি।
সুবর্ণ : আর ছোটগল্প? না উপন্যাস?
স্মরণজিৎ : উপন্যাস। কারণ, ছোটগল্পটা আমি ঠিক যেভাবে লিখতে চাই, সেভাবে পারি না। চেষ্টা করি, কিন্তু আমার লেখা ছোটগল্প নিয়ে আমি খুব একটা খুশি হতে পারি না। নিজেরই কেমন যেন মনে হয়, সেই ফ্লুয়েন্সিটা আমার নেই... পাঠকদের কেমন লাগে জানি না, ডার্করুম লিখে ভাল লেগেছে, আমাদের পাড়ার স্পাইডারম্যান ভাল লেগেছে, কৃশানু... ফুটবলার কৃশানু দে, তাঁর থাকাটা গল্পে খুব একটা নেই, সেটা ভাল লেগেছে, জিলিপি বলে একটা গল্প লিখেছিলাম, ভাল লেগেছে, এরকমই কয়েকটা। তবে উপন্যাস লেখা আমাকে যতটা আনন্দ দিয়েছে, ছোটগল্প ততটা দেয়নি। মনে হয়, এই তো ফুরিয়ে গেল! আসলে আমি যেহেতু একা-একা থাকি, উপন্যাস আমাকে বেশিদিন ধরে সঙ্গে দেয়, ছোটগল্প ততদিন দেয় না, তাই উপন্যাস বেশি ভাল লাগে।
সুবর্ণ : প্রচেতদা, ছোটগল্প লিখতে বেশি ভালবাসেন, উপন্যাস লিখলেন কি আমন্ত্রণ পাওয়ার পর?
প্রচেত : আমার প্রথম উপন্যাস আমন্ত্রণের আগেই লেখা। আমার যা আছে উপন্যাসটি আমার আগেই লেখা ছিল। তখন আমার জীবনের একটা খুব খারাপ সময় চলছিল। কাজ নেই, আর্থিক সঙ্গতি নেই, পরিবার আছে, ছেলে আছে, তার পড়াশোনা, তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব... সব কিছু মিলিয়ে খুবই খারাপ অবস্থা। আমার বাড়ির সদস্যরা, আমার স্ত্রী মিত্রা সব সামলাচ্ছে। আমার নিজের পকেটে কিছু নেই, সেখান থেকে ইনফ্লুয়েন্স পেয়েই সাগর চরিত্রটা তৈরি করি, আমার মতোই তার পকেটও ফাঁকা। লেখাই ছিল, আমন্ত্রণ পাওয়ার পর সেটা নিয়ে একটু ঝাড়াই-বাছাই করে জমা দিই। পরবর্তী। পুজোসংখ্যা আনন্দলোকে সেটি প্রকাশিত হয়। এটা আমার প্রথম উপন্যাস, ২০০৭-এ বই হয়ে বেরোয়। তার একটু আগে ২০০৪-নাগাদ লেখা হয়েছিল। পরের উপন্যাস জলে আঁকারও একটা বড় অংশ আমার আগেই লেখা ছিল। ওটাকে একটু বদল করে পুজোসংখ্যার জন্য জমা দিই। ওটাও পুজোসংখ্যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমন্ত্রণে নয়, নিজের চেষ্টাতেই উপন্যাস লেখার শুরু।
সুবর্ণ : স্মরণজিৎদার কবিতার পর ছোটগল্পের শুরুটা কেমন ছিল?
স্মরণজিৎ : আমার এক দাদা আছেন, স্পোর্টস জার্নালিস্ট, তিনি আমাকে বারবার বলতেন, তোর কবিতাগুলো কিছু হচ্ছে না, তুই গল্প লেখ। বারবারই বলতেন। প্রায় প্রতিদিনই বলতেন। স্নেহবশতই বলতেন। তার ধাক্কা খেতে-খেতেই প্রথম ছোটগল্পটা লিখে ফেলা। ছপাতার গল্প সাতদিন ধরে লিখেই হাতে ব্যথা! সে প্রায় ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধার অবস্থা! মনে হয়েছিল, এত গদ্য কেউ লেখে! আমরা তো কবি, এত গদ্য লিখবই-বা কেন! এ তো প্রায় মাটি কাটার মতো পরিশ্রম! লিখেটিখে আনন্দবাজারে জমা দিলাম। তারপর ১৯ ২০ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় একটা ছোটগল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়। গল্পটা একটু বড় হয়ে গিয়েছিল। সম্পাদক পৌলোমী সেনগুপ্ত আমাকে বলেছিলেন, গল্পটা তো খানিকটা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে, তারপর আবার একটা প্যারাগ্রাফ লিখেছ কেন? এটা ঠিক হচ্ছে না। এডিট করো। আমি এডিট করে দিই। পরে বুঝেছিলাম এই পরামর্শ কতটা সঠিক ছিল। এইভাবে আস্তেআস্তে লেখা শুরু হয়। প্রথমে প্রচণ্ড ভয় হত। টাইট রোপ ওয়াকিংয়ের মতো ভয়। মনে হত যে-কোনও মুহূর্তে পড়ে যাব। ছাপা হবে, কি হবে , তা নয়, মনে হত লিখতেই পারব না...
প্রচেত : একটা কথা না বলে পারছি না...। একটা কথা চালু আছে, দূর! সম্পাদকরা লেখা দেখেনও না, পড়েনও না... আমি নিজেও একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত, তাই এমন কথা কানে আসে, এখনও আসে। অথচ একজন সম্পাদকই স্মরণজিৎকে সুপরামর্শ দিয়েছেন ওর প্রথম গল্পের ক্ষেত্রে। আমার একটা ঘটনার কথা মনে। পড়ে যাচ্ছে, তখন দেশ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন হর্ষ দত্ত, হর্ষদা তখন উপন্যাস নিতেন। আমার প্রথম উপন্যাসটা লিখছি তখন। প্রতিমাসে হর্ষদা ফোন করতেন, ঠিকঠাক লেখা হচ্ছে তো? আমি তো তখন কেউ নই। লেখা হয়ে গিয়েছে, শুনলে উনি বলতেন, ফেলে রেখে দাও, দিন পর আবার দেখো...' আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই বলছি, সম্পাদকরা কিছু দেখেন না, পড়েন না, এ কথা ঠিক নয়।
সুবর্ণ ; সম্পাদনার প্রসঙ্গ যখন উঠল, তখন জিজ্ঞেস করি সাহিত্যে সম্পাদনা জরুরি বলে মনে করেন? বিদেশে এই ব্যাপারটাকে সব লেখকই গুরুত্ব দেন। সব প্রকাশকেরই নিজস্ব সম্পাদক থাকেন। কিন্তু বাংলা লেখালিখির জগতে অনেক নামী কথাকারই কিন্তু নিজের লেখায় সম্পাদকের হস্তক্ষেপ পছন্দ করতেন না, বা এখনও করেন না। আপনারা এই বিষয়টিকে কেমনভাবে দেখেন?
প্রচেত : আমি আগে উত্তরটা দিই। আমি শুরুর গল্প, যখন রমাপদবাবু আমার গল্প ছেপেছিলেন, তখনও আমার গল্পের প্যারাগ্রাফ কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। বাদ দিয়ে আমাকে খবর পাঠিয়েছিলেন যে, এই প্যারাগ্রাফটা বাদ দেওয়া হল, কারণ, প্যারাগ্রাফটা অর্থহীন। আমি দেখেছিলাম, উনি ঠিকই করেছেন। সেদিন থেকে আজও পর্যন্ত আমার গল্প এডিট হয়ে আসছে। কখনও আমাকেই বলা হয়েছে, লেখা অতিরিক্ত হয়ে গিয়েছে, একটু কেটে দিলে ভাল হয়। আমি সেরকমই করেছি। আমি তো মনে করি এটা অবশ্যভাবে জরুরি। সম্পাদনা ছাড়া যদি কাজ হত, তা হলে তো সিনেমা তৈরিতে সম্পাদক বলে কিছু থাকত না। মিউজিকে এডিটিং হত... তা হলে আমি হঠাৎ কী এমন বড় হয়ে গেলাম যে, আমার এডিটিং দরকার হবে না! আমি বলব এমন কোনও মাধ্যম যেন না থাকে যেখানে আমি যা লিখলাম, তাই বেরিয়ে গেল, কোনও এডিটিং হল না। স্মরণজিৎ যা লিখল, সেভাবেই বেরিয়ে গেল, সেটা কি ঠিক হবে? স্মরণজিতের কী মনে হয়?
স্মরণজিৎ : আমার? এডিটিংয়ে আমার কোনও অসুবিধেই হয় না। এমনকী, রিজেক্ট হওয়াটাও তো একরকমের এডিটোরিয়াল ডিসিশন, তাই না?
প্রচেত : ঠিক, ঠিক, আমারও তো লেখা বাতিল হয়...
স্মরণজিৎ : আমার এমনও উপন্যাস আছে, ৪৫ হাজার শব্দ লিখেছিলাম, সেটা কেটে ৩৬ হাজার করা হয়েছে, কিন্তু কাটার পর, অনেস্টলি বলছি, আমি বুঝতে পারিনি কোথায়-কোথায় কাটা হয়েছে। আমার এখনও পর্যন্ত এডিটিং নিয়ে কোনও সমস্যা নেই।
প্রচেত : সম্পাদনায় কেন আপত্তি! আমরা কি পাঠকের কাছেও মনোনীত, অমনোনীত এই দুটো অপশন নিয়ে যাই না? পাঠকদের প্রতিও তো আমাদের জিজ্ঞাসা থাকে, আমার লেখাটা আপনি আপনার মনের মধ্যে মনোনীত করে রাখলেন? নাকি আমার লেখাটা অমনোনীত করে দূরে ফেলে দিলেন? স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, একদম ঠিক, সেটাই তো হয়।
সুবর্ণ : শোনা যায়, বাঙালি সাহিত্যিকরা নিজস্ব চেনা পরিসরের বাইরে বেরোতে পারেন না। স্মরণজিৎদা সম্বন্ধে ও শোনা যায়, আপনার লেখার চরিত্ররা মুদিয়ালি থেকে চারমার্কেটের বাইরে কিছু চেনে না। এ সম্বন্ধে কী বলবেন?
স্মরণজিৎ : কেউ যদি সবটা না দেখে না জেনে মন্তব্য করে, তা হলে তো অন্ধের হস্তিদর্শন হয়ে যায়। বড়দের জন্য লেখা আমার নিরানব্বই শতাংশ ছোটগল্পই কিন্তু গ্রামের পটভূমিকায়। এখন আমি যতদূর জানি, মুদিয়ালি থেকে চারুমার্কেটের মধ্যে কিন্তু কোনও গ্রাম নেই।
প্রচেত : (হেসে) না, পুজোর সময় কিন্তু থিম করে গ্রাম-টাম সাজায়...
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, কিন্তু সে সময়ের আগে বা পরে কিন্তু কোনও গ্রাম নেই। আমার গল্পে উত্তর কলকাতাও এসেছে। পাহাড়ের পটভূমি এসেছে...
প্রচেত ; আমেরিকাও তো এসেছে, সেটা বলো...
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, বিদেশও তো এসেছে... আমার প্রথম উপন্যাসই মফসসল নিয়ে লেখা, আমার অদম্য কাহিনি সারা পৃথিবী জুড়ে। যিনি বলছেন, তাঁর পারসেপশন হয়তো এরকম। বলতে তো আর কোনও সমস্যা নেই। চারটে পড়ে মনে হল শহরকেন্দ্রিক, ব্যস বলে দিলাম, ওই লেখক শহরের বাইরে কিছু চেনেন না। আমার বড় উপন্যাস আলোর গন্ধ-র একটা বড় অংশ রয়ে গিয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনায়। শেষ হয় পাহাড়ে গিয়ে। পাল্টা হাওয়াটা দক্ষিণ কলকাতায়। ওই একটা উপন্যাস পড়ে যদি আমার বাকি উপন্যাসগুলোকেও বিচার করা হয়, তা হলে তো খুবই মুশকিল!
প্রচেত : আমি গ্রামে গিয়েছি, তবে কম। আমার ঝিলডাঙার কন্যা কিন্তু পুরোটাই গ্রামের পটভূমিতে, যে গ্রাম আমার নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করা নয়। আমার চেনা পরিসর নয়, রানিপুরের কাপুরুষ-এর ঘটনাস্থল বহু পুরনো। আমলের একটা গঞ্জ। সময়কাল আমার জন্মেরও বহু-বহু আগের। আমি বই পড়ে-পড়ে নিজের মধ্যে সেই গঞ্জের ধারণাটা তৈরি করে তারপর লেখায় রূপ দিই। আমি কখনও মনে করি না যে, বাঙালি লেখকরা তাদের চেনা গণ্ডির বাইরে স্বচ্ছন্দ নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কতদিন পদ্মানদীতে গিয়েছিলেন? বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো কখনও আফ্রিকাই যাননি!
সুবর্ণ : সাহিত্যে পুরস্কার পাওয়াকে কী চোখে দেখেন? পুরস্কারের স্বীকৃতি কি লেখককে আরও ভাল লেখার আত্মবিশ্বাস জোগায়? নাকি পুরস্কার পাওয়ার আত্মসন্তুষ্টি লেখার ক্ষতি করে?
প্রচেত : সোজাকথায় আমি বলব, পুরস্কার পাওয়া ভাল। যে-কোনও মানুষের কোনও ভাল কৃতিত্ব, যেমন দৌড়, নাচ, গান, আঁকা বা কোনও সৃজনশীল কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়া মানে তাকে, তার কাজটাকে স্বীকৃতি দেওয়া। কিন্তু সেই পুরস্কার কেউ কীভাবে গ্রহণ করবেন, এটা যাকে দেওয়া হচ্ছে, তার চরিত্রের উপর নির্ভর করে। কেউ যদি আত্মসন্তুষ্ট হয়ে থেমে যেতে চান, যেতে পারেন... কেউ যদি প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে আরও উৎসাহিত বোধ করেন, করতে পারেন... সবটাই ব্যক্তিবিশেষের উপর নির্ভরশীল। আমি বলব, সাহিত্যে পুরস্কার মানে একটি সৃজনশীল মনকে স্বীকৃতি দেওয়া। এটা নিঃসন্দেহে ভাল।
সুবর্ণ : আপনার নিজের ক্ষেত্রে পুরস্কার কেমন প্রভাব ফেলে?
প্রচেত : আমি নিজে খুব সামান্য কিছু পুরস্কার পেয়েছি, তাতে আমার লেখালিখির কোনও পরিবর্তন ঘটেনি।
স্মরণজিৎ : আমি দু-একটা পুরস্কার পেয়েছি, তবে নিজেকে যদি বলতে হয় যে কী পুরস্কার পেয়েছি, তা হলে আর পুরস্কার পেয়ে লাভ কী হল! (হেসে)
সুবর্ণ : আজকাল প্রায়ই এই অভিযোগ শোনা যায়, লেখার সময় ছোটপরদা বা বড়পরদা মাথায় থাকে কি? শোনা যায়, আজকাল লেখকরা একটু বেশিই সিনেমা বা সিরিয়ালের স্ক্রিনপ্লে মাথায় রেখে প্লট সাজাচ্ছেন। আপনারা কখনও এভাবে ভেবেছেন বা ভাবেন?
প্রচেত : আমার একটা বইয়ের সমালোচনা বেরিয়েছিল, তাতে লেখা হয়েছিল, টিভি সিরিয়ালের মতো উপন্যাস। কিন্তু সেই বই নিয়ে কখনও সিরিয়াল হয়নি।
সুবর্ণ : সত্যিই কি এমন কিছু মাথায় থাকে?
প্রচেত : পাগল নাকি! থাকবে কী করে? এমনভাবে লেখা যায় নাকি?
স্মরণজিৎ : আর আমি যদি এরকম করতাম, তা হলে আমার অন্তত ১৬টা উপন্যাস নিয়ে সিনেমা হত, সেখানে হয়েছে মাত্র দুটো নিয়ে। পাতাঝরার মরশুমে আর এখন হচ্ছে ক্রিসক্রস'। সিনেমার মতো কারা বলে? কিছু পাঠক বা সমালোচক। কিন্তু ফিল্ম লাইনের লোকরা তো উলটো কথা বলে। তারা বলে, তুমি লেখায় এমন সব ইমেজারি রাখো, যেগুলো ছাড়া গল্পটা দাঁড়ায় না, কিন্তু সেগুলো সিনেমায় দেখানোর উপযুক্ত নয়। কাজেই এটা ঠিক বোঝা নয়। অনেক সময় পাঠক পড়তে-পড়তে যে ছবিটা দেখতে পাচ্ছে, তাতে হয়তো তার খুব সিনেম্যাটিক ফিল হচ্ছে, সেটাই তাকে মিসলিড করছে।
সুবর্ণ: প্রচেতদা, আপনার নিজের লেখা সম্বন্ধে কিছু বলুন। কোনটা সবচেয়ে প্রিয়? কোনটা মনে হয় তেমন ভাল হয়নি? বা কোনওটা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভাল হয়ে গিয়েছে? এরকম কোন কোন লেখার কথা মনে পড়ে?
প্রচেত : আমার জলে আঁকা পড়ে পরের দিকে, এমনকী এখনও আমার মনে হয়েছে যে উপন্যাসের ভাবনা বা বাঁধুনির ক্ষেত্রে আমি অতটা স্পষ্ট ছিলাম না। আবার সে সময়ের পরে অনেকটা এগিয়ে এসে, আমি ভাবতেও পারিনি যে, শীত খুব দূরে নয় উপন্যাসটা আমি এত মনের মতো লিখে ফেলব।
স্মরণজিৎ : মানে তুমি নিজে স্যাটিসফ্যাকশন পেয়েছ...
প্রচেত : হ্যাঁ। আরও পরে আমার মনে হয়েছে যাবজ্জীবন-এর ক্ষেত্রেও আমার একটু স্লিপ হয়েছে, শহিদ ভূপতি সেন কলোনি-র ক্ষেত্রেও আমি স্লিপ করে গিয়েছি...
স্মরণজিৎ ; এটা তোমার নিজের মনে হওয়া?
প্রচেত : হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার নিজেরই মনে হয়েছে। আমাকে যে অনেকে এরকম বলেছেন, তা কিন্তু নয়... শুধু কাহিনির দিক থেকে নয়, কাহিনির ফর্মের দিক থেকেও একটু দুর্বল হয়েছে। যে বোধ, যে বিশ্বাস থেকে আমি গল্প লিখি, শহিদ ভূপতি সেন কলোনি-তেই দেখবে, একটা লোককে ভুল কারণে শহিদ করে ফেলা হল। এর বিরুদ্ধে আমার যে বক্তব্য, তা আমার যতটা তীব্রভাবে বলা উচিত ছিল, ততটা তীব্রভাবে পারিনি। স্ট্রাইকটা ঠিক যেমন হওয়া দরকার ছিল তেমন হয়নি। ছাপার পর সেটা আমার মনে হয়েছে। আবার হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে লিখে আমার মনে হয়েছে, হ্যাঁ, আমি পারলাম। ডার্কনেসটা যেভাবে ধরা দরকার ছিল সেভাবেই ধরতে পেরেছি। সবাই বলেছে, একটা এত সামান্য কারণে ছেলে তার বাবাকে খুন করবে? আমার কাছে সেটা বাইরের কথা। সেটা বুঝতে গেলে ছেলেটার ভিতরের অন্ধকারটা অনুভব করতে হবে। আবার মুক্ত আবরণে পাঠকরা পছন্দ করেছেন, আমার কিন্তু মনে হয়েছে, লেখায় কোথাও একটা ফাঁক থেকে গিয়েছে। ব্ল্যাকটা নিয়ে যতটা ক্লিয়ার হতে পেরেছি, হোয়াইট দিকটা নিয়ে পারিনি।
সুবর্ণ : একই প্রশ্ন স্মরণজিৎদাকেও। নিজের লেখালিখি নিয়ে নিজের ভাল লাগা, খারাপ লাগা...
স্মরণজিৎ : আমার একটা উপন্যাস আছে, পাখিদের শহরে। যেমন, ওটা আমি আমার লেখার প্রকৃতিবিরুদ্ধভাবেই একটু স্লো, গম্ভীর করতে চেয়েছিলাম। দেখতে চেয়েছিলাম, সেরকম পারি কি না... ওটা আমার একেবারে ভাল লাগেনি। ওতে আমার ফোকাসটা ঠিক ছিল। ওটা একটাই উপন্যাস, যেটা আমি এমনভাবে লিখেছি, যেমনভাবে কখনও আমি লিখি না। ওর মধ্যে একটা প্রিটেনশন আছে। আমি যখন উপন্যাস লিখতে যাই, আমার মাথায় শেষটা চলে আসে আগে, একটা ছবি তৈরি হয়ে থাকে, যে ছবিটায় আমি গিয়ে পৌঁছই।
প্রচেত : ছবিটায় পৌছও? পৌঁছতে পার শেষ পর্যন্ত?
স্মরণজিৎ : হ্যাঁ, অধিকাংশই পারি। কিন্তু দুটো লেখা আছে, যে-দুটোয় সেই ছবিটায় পৌছতে পারিনি। একটা জানতাম না শেষে কী হবে, তাই পৌছতে পারিনি, সেটা র্যাগিং নিয়ে লেখা আমাদের সেই শহরে। আর-একটা উপন্যাস আছে। ফুরায় শুধু চোখে বলে, সেটা আমি প্রথমে ভেবেছিলাম মিলনান্তক লেখাই বোধ হয় হবে, কিন্তু হয়নি। আবার ফিঙে লিখে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি। অনেক দিন রোদে  ঘোরার পর একটু ছায়ায় বসলে যেমন আনন্দ হয় তেমন। কম্পাস অনেকে খুব প্রশংসা করেছে, আমার মনে হয়েছে, আমি শেষ লাইনটাই লিখতে পারলাম না। এটা কেউ জানে না, কাউকে বলিনি, আজ প্রথম বলছি, শেষ লাইনটা আমি আজও খুঁজছি। আজও কম্পাস লেখা আমার শেষ হয়নি।
প্রচেত : এখানে আমার একটা প্রশ্ন আছে, স্মরণজিৎ আমি দেখেছি, তুমি তোমার লেখায় শেষে একটা ফিজিক্যাল রান দাও, একটা ফিজিক্যাল এফর্ট, এটা কেন? ধরো দোয়েল সাঁকোর শেষে ছেলেটা যখন আমেরিকা থেকে ফিরে মেয়েটার কাছে পৌঁছবে, তারপর আমাদের সেই শহরে-তে ছেলেটাকে দৌড়েদৌড়ে উপরে উঠতে হচ্ছে র্যাগিংয়ের সময়ে... এই ফোর্সটা তুমি দাও কেন? এটা একটা মানসিক পরিবর্তন, উপলব্ধিগত রূপান্তর হিসেবেও তো আসতে পারত? ট্রেন ধরার মতো ঘামঝরানো দৌড় কেন?
স্মরণজিৎ : আমার কাছে ফিজিক্যাল প্রেজেন্সটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেউ খুব কষ্টে আছে, আমি তার জন্য মনে-মনে ফিল করলাম, সে কি বুঝল? ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, গায়ে মাথায় হাত রাখা এটাই তো দরকার। এইভাবে প্রেম বা অনুভূতিটা কাছে পৌছে দেওয়াটা, সম্পর্ককে জোরালো করার জন্য দরকার। ভালবাসার মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য সেই টানটা তৈরি হয়। কাছে না গেলে বোঝাব কী করে যে, আমি তার জন্য কতটা ফিল করি। তাই স্পর্শটা খুব দরকার। হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি এগুলোও জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাজটাই তো আমাদের প্রকাশ করে, মনে কী ভাবলাম, মুখে কী বড়-বড় কথা বললাম, এগুলোর চেয়ে অনেক বড় হল কিছু করে দেখানোটা। সমস্যা পেরিয়ে, বাধা টপকে পাশে এসে দাঁড়ানোটাই তো আসল। মানুষকে মানুষের পাশে থাকতে হবে, তার জন্য তাকে এফর্টটাও দিতে হবে। প্রচেতদার কাছেও আমার একটা প্রশ্ন আছে। সেটা হল, মধ্যবিত্ত জীবন এবং তারা নানা ধরনের ক্রাইসিস নিয়ে তোমার অনেক ছোটগল্প আছে... মধ্যবিত্ত জীবন বিষয় হিসেবে এত পছন্দের কেন?
প্রচেত : মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে লেখা আমার খুব পছন্দের। তাদের জীবন, ধারণা, বিশ্বাস, ভুল
বোঝাবুঝি এগুলোতে আমি আঘাত করার চেষ্টা করি সবসময়ই। আঘাত করলে তো ভুল ভেঙে বেরনো যাবে না। সেটা করার জন্য আমি আমার গল্পের ফর্ম ধরে এগোই। ধরো, একজন মানুষ, তার পায়ের ছাপটা আগে-আগে পড়ে, গল্পের নামটা বোধ হয় চরণচিহ্ন ধরে, ধরো একটা লোককে দেখে বাকিরা ভয়। পায়, কিন্তু তাকে সত্য ন্যায়ের রাস্তা থেকে কিছুতেই টলানো যায় না। সে সবার সামনে-সামনে যায় বলেই তো তার পায়ের ছাপ সবার আগে পড়ে। মধ্যবিত্ত ধ্যানধারণা, ভাবনাকে আশ্রয় করেই আমি একটা ম্যাজিকাল ফর্মে ঢুকে যাই। আমার নিজের ঘর, সংসার, পরিবার, নিজেরটুকু হলেই হল এই সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আমি কমবেশি আমার সব লেখাতেই করে থাকি। মনের বা সমাজের বা পরিবেশের সমস্ত রকম অন্ধকার পেরিয়ে, নিজেকে আলোয় উন্মুক্ত করার দিকে এগোনোর কথা। বলতে আমার ভাল লাগে। আমি । মনে করি, শিল্পী বা লেখকের কাজ কিন্তু শুধু সমাজে যা ঘটছে, তার । হুবহু প্রতিফলন ঘটানো নয়, সেটা রিপোর্টারের কাজ হতে পারে। তাকে খানিকটা আলো হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে, যে অপার্থিব আলো, যা তার নিজের তৈরি, তা মানুষের দুঃখের উপর পড়ে সেই দুঃখটাকে আলোকিত চেহারায় সকলের। কাছে পৌঁছে দেবে। এই দায়িত্বটা আমি কখনও অস্বীকার করি না। এবার তাকে আমি পুরোপুরি বাস্তবের মতো করব কি না, তার হাতে আমি খানিকটা জাদুবাস্তবিক ক্ষমতা দেব কি না, সেটা তো পরের প্রশ্ন।
স্মরণজিৎ: প্রেম কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
প্রচেত : প্রেমই তো গুরুত্বপূর্ণ। প্রেম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, প্রেম ভাঙাটাও কিন্তু কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি আমার বহু গল্প-উপন্যাসে প্রেম ভাঙা দেখিয়েছি, কারণ, প্রেম ভাঙলে আর-এক ধরনের প্রেমের জন্ম হয়, যা সম্পর্ককে জোরালো করে। আমি তোমার লেখাতেও সেরকম দেখেছি, সেগুলো মানুষ পছন্দও করেন।
প্রেম নিয়ে লেখা যদি মানুষ গ্রহণ করেন, তা হলে কেন লিখবে না? মানুষ কি প্রেমের গল্প পড়তে ভালবাসেন না! বয়স্ক মানুষরাও তো পড়েন! আমি যদি নীতিকথা না লিখে প্রেমের গল্পই লিখি, আর মানুষ যদি সেটা গ্রহণ করেন, তাতে অসুবিধে কী!
স্মরণজিৎ: এবং তারা রিলেটও করছে, তারা মনে-মনে চাইছে যে, এমন প্রেম তাদের জীবনেও থাকুক। তারা অনেকে আমাকে বলেছে, তারাও এভাবে প্রেম করতে চায়, কিন্তু তেমন প্রেম করে ওঠার ধকটা তাদের নেই। প্রেম করতে গেলে যে ত্যাগ করতে হয়, সেটার মধ্যে দিয়ে অনেকসময়ই তারা যেতে চায় না। প্রচেতদার কাছে আমার আরও একটা প্রশ্ন আছে, তোমার প্রায় তিন-চারশো ছোটগল্প লেখা হয়ে গিয়েছে, এত লিখে ফেলার পর মনে হয় না ফুরিয়ে গেল?
সুবর্ণ : এই প্রশ্নটা আমিও করতাম। কেউ বেশি লিখলেই বলা হচ্ছে, বহুপ্রজ সাহিত্যিক প্রচুর লিখে-লিখে লেখার ধার নষ্ট করে ফেলেছেন...
স্মরণজিৎ : বেশি ঘষলে তো লেখার ধার বাড়ার কথা... যাই হোক, প্রচেতদার ফুরিয়ে | যাওয়ার ভয় হয় না?
প্রচেত : ফুরোবে কী? আমি তো কোনও স্টক নিয়ে আসিনি। আমার কোনও গোডাউন বা শো কেসও নেই। আমার ছিলটা কী, যে ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় পাব? আমার তো ক্যালাইডোস্কোপ,  ঘোরাচ্ছি আর একটা করে নকশা আসছে... স্মরণজিতের পক্ষে যদি ফিজিক্যালি সম্ভব হয়, ও রোজ একটা করে উপন্যাস লিখতে পারে। অসুবিধেটা কোথায়? উপন্যাসটা কেমন সেটা না দেখে যদি বলি, এই একটা পুজোর উপন্যাস লিখেছে, আবার একটা জোনাকিদের বাড়ি লিখে ফেলল! এত লিখছে তার মানে নিশ্চয়ই খারাপ! এর তো কোনও যুক্তি নেই। বেশি লিখেছে না কম লিখেছে, এটা তো দেখার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি গল্পই একটা নতুন গল্প। অনেককে জানি জীবনে একটাই উপন্যাস লিখেছে, কিন্তু এতই ভোঁতা, তার নিজেরই হয়তো কোনওদিন মলাটটা খুলে দেখতে ইচ্ছে হয়নি। তা হলে?
সুবর্ণ : প্রচেতদা, এবার শেষের দিকে আসব, তা হলে এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ  নিয়ে আশাবাদী থাকার কারণ আছে বলছেন?
প্রচেত : নিশ্চয়ই। এখন ভাল লেখা হচ্ছে। বাংলা বইয়ের বিক্রিও যথেষ্ট ভাল। বেশ কয়েকজন খুব ভাল লিখছেন। সংখ্যা অনেক নয় এবং আমি নিজেও তাদের মধ্যে পড়ি না। তবু তাঁরা খুবই ভাল লিখছেন। আগামী সময়ে উঠে আসছেন আরও কয়েকজন, তাঁরাও ভাল লেখা নিয়ে আসছেন। আর-একটা কথা না বলে পারছিনা, কবিতা এবং প্রবন্ধ যে কী ভাল লেখা হচ্ছে। ছোট ছোট পত্রিকা, তাদের না পাওয়ার আছে টাকা, না পাওয়ার আছে নাম, কিন্তু তাদের কাজ খুব ভাল হচ্ছে।
স্মরণজিৎ : আমি তো সবসময়েই পজিটিভ চিন্তায় বিশ্বাসী। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সময়ে অনেকে ভাল লিখছেন। আমাদের পরবর্তী সময়েও অনেক ভাল লেখক উঠে আসবেন। সাহিত্য হল বহতা নদীর মতো। সে অনেকখানি বয়ে আজকের জায়গায় এসেছে, আবার আগামী দিনেও এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। আর এই জেনারেশনে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সকলেই লিখতে চাইছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিক, আইনজীবী সকলেই লেখক হতে চাইছেন। এত মানুষ লেখালিখি করতে চাইছেন যখন, তখন নিশ্চয়ই আমরা আরও ভাল-ভাল লেখক পাব।।
প্রচেত : ঠিক। শত লেখক বিকশিত হোক! ..

প্রথম প্রকাশঃ দেশ ১৭ই জুলাই, ২০১৮
Download

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট