বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ - সৌরীন ভট্টাচার্য | রবিবারের প্রবন্ধ ১

বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ
সৌরীন ভট্টাচার্য

শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর আলোচনা উঠে আসে এর মধ্যে নিশ্চয়ই খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী ও সেই টানে শ্রীনিকেতন প্রসঙ্গও যখন চলে আসে তখন এই প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশে স্বাভাবিকভাবেই আমরা মেতে উঠি৷ ঠিক এই মুহূর্তে এরকম অনেকগুলো নজির আমাদের চোখের সামনে রয়েছে৷ বিশ্বভারতী প্রকল্প যে মূলত ব্যর্থ সে-বিষয়েও যেন প্রায় একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷ এখন শুধু এই মীমাংসা বাকি, এই ব্যর্থতার দায় কতটা কার৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি এর জন্য মূলত দায়ী নন? নাকি তাঁর জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সম্পদ’ বহন করে নিয়ে চলেছে যে সোনার তরী তার দিশাহারা নাবিকেরাই এর জন্য দায়ী? নাকি সমগ্র বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকেই বহন করতে হবে এর দায়ভার? নাকি সরকারি ঔদাসীন্য? নাকি রাজনীতির কুটিল আবর্ত? আধুনিক যুগটা নাকি প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার৷ কাজেই যুগোপযোগী হতে গেলে প্রযুক্তিবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনাবিদ্যা শিক্ষার আয়োজন থাকা চাই৷ খুব সম্প্রতি এরকম আয়োজনের সূত্রপাতও হয়েছে৷ কিন্তু তাতেও কি হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে? নাকি কালের ইশারায় নিজের স্বভাবের খোঁজখবর তেমন করে না নিয়ে আমরা যতই বদলাবার চেষ্টা করছি ততই আরও জটিল জালে জড়িয়ে পড়ছি?

সাফল্য-ব্যর্থতার কথা যখন আমরা বলি, তখন ঠিক কী ভাবি আমরা? কোনো ব্যক্তির জীবনেও যখন এ-প্রশ্ন ওঠে, তখন ঠিক কী থাকে আমাদের চিন্তায়? কে কী হতে চায়, কে কেমনভাবে কাটাতে চায় তার জীবন, সেসব কথা বাদ দিয়ে সাফল্য-ব্যর্থতার অঙ্ক কষার কোনো মানে হয় না৷ গড়পড়তা আর-পাঁচ জন যেমন হবে প্রত্যেককেই যদি সেই মাপে ছাঁটাই করার চেষ্টা হয়, তা হলে সবই তো এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যাবে৷ বৈচিত্র্যের কী দশা হবে তবে? সৃষ্টির জগতে বৈচিত্র্যের দাম আছে৷ শুধু ভিন্নতার খাতিরেই নয়, প্রয়োজনীয়তার খাতিরেও বৈচিত্র্য জরুরি৷ তাই সবই লেপে পুঁছে বেমালুম একাকার করে দিতে না চাইলে বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হয়, তাকে সম্মান জানাতে হয়৷ আর তখন সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশ আর অত সোজাসাপটাভাবে করলে চলে না৷ কথাটা যেমন ব্যক্তির স্তরে সত্য, তেমনই প্রতিষ্ঠানের স্তরেও তা সত্য৷ সব প্রতিষ্ঠান এক উদ্দেশ্যে তৈরি হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এক হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের পিছনের আবেগ ও কল্পনাও যে এক থাকে তা নয়৷ তা হলে এসব প্রশ্ন একেবারে ছেঁটে ফেলে বাদ দিয়ে একমাত্র এই মুহূর্তের প্রয়োজন, লক্ষ্য কিংবা চালু ধরনকে সম্বল করে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিচার করতে বলা কি খুব সমীচীন? অনেক স্বপ্ন কল্পনা আদর্শ এই মুহূর্তের নিরিখে যদি মনে হয় ভাবালুতা, তা হলে ঢাকিসুদ্ধ সেই ভাবালুতা বিসর্জন দেওয়ার আগে নিরিখটাকেই কি একবার মেপে নেওয়া উচিত না? নইলে ক্ষণমুহূর্তই একমাত্র ধ্রুবসত্য, এ-কথা মেনে নিতে হয়৷ কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা ইতিহাসের দিকে তাকালে বারবার দেখা যায়৷ মুহূর্তের নিরিখ যে কতটাই ভঙ্গুর তা যদি বারবার এমনভাবে প্রতীয়মান না হত তা হলে তো পরিবর্তনের জন্য কোনো ফাঁক বের করে নেওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য হত৷ কিন্তু ইতিহাসে পরিবর্তন তো অবশ্যই আছে৷ ক্ষণমুহূর্তের কত কত মানদণ্ড একেবারে জলস্রোতের মতো ভেসে গেছে৷ সমস্ত মূল্যমান ও বিচারের নিরিখ ইতিহাসে নিতান্ত অচিরস্থায়ী৷ কাজেই প্রতিষ্ঠানের বিচারের সময়ে মানদণ্ডের বিপর্যয়-সম্ভাবনা বিষয়ে সজাগ থাকা চাই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী-শ্রীনিকেতনের বিচারে নজর কি শুধুই ডিগ্রি, পাঠক্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ঘেরে আটকে থাকবে? একটা প্রতিষ্ঠানের আবহ ও রণন কি কেবলমাত্র ওইসব জিনিসে ধরা পড়ে? তার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করে নানাদিকে তাকাতে হয়৷ সেই আবহ অনেকসময়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ দৈনন্দিনের মধ্যেও টের পাওয়া যায়৷ দোকান-বাজারের মানুষ, রিক্সাচালক, রাজমিস্ত্রি––এই-যে স্তর, যে-স্তরে সাধারণ জীবনের মানটা ধরা থাকে, সেখানে যদি চকিতে চোখে পড়ে এমন কোনো সরলতা বা সজীবতা যা মুহূর্তের জন্য প্রাত্যহিকের কলুষ থেকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়, তা হলে কি ভাবতে ইচ্ছে করে না যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সবটাই ডিগ্রির গণ্ডিতে আটকে থাকে না হয়তো৷ আর রণন? যেসব বিচারে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ বলে রায় ঘোষণা হয়েই গেছে, যদি দেখা যায় যে, সেইসব বিচারেই অনুজ কোনো প্রতিষ্ঠান দারুণ সফল, আর সে-প্রতিষ্ঠানও ভাবনার আদলে অগ্রজ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণী, তা হলে?



শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী-শ্রীনিকেতনের প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাস অবশ্য বর্তমানে আদৌ আমার আলোচ্য নয়৷ আমি খেয়াল করতে চাই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার দু-একটি প্রস্থানবিন্দু৷ প্রশ্ন উঠতেই পারে ওই প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে তাও কি সম্ভব? সংগত প্রশ্ন৷ এক অর্থে এরকম হওয়া উচিত নয়৷ তত্ব ও তার প্রয়োগ, এই চিন্তাকাঠামোর মধ্যে এরকম একটা ভাবনার সঙ্গে কমবেশি আমরা সবাই পরিচিত যে, ও-দুইয়ের নিতান্ত বিচ্ছেদকল্পনা দুটি স্তরকেই বোঝার পক্ষে অন্তরায় হয়ে ওঠে৷ ঠিক এই প্রসঙ্গেই সেই জন্য কর্মতত্বৈক্যের একটা ধারণা বেশ জরুরি মনে হয়৷


এই ধারণা নিয়েও আবার নানারকম প্রশ্ন উঠতে পারে৷ তত্বটা আছে, অর্থাৎ অন্য কারও হাত-ফেরতা আগে থেকেই আছে, কিংবা নিজেরা এইমাত্র তত্বটা নির্মাণ করে নিলাম, তার পর তার প্রয়োগের দিকে মন ফেরালাম৷ এই দুটো ধাঁচই সম্ভব৷ এখানে প্রশ্ন উঠবে, একটা তত্ব প্রয়োগ করা মানে কী? এর একটা উত্তর হতে পারে, বাস্তবটাকে তত্বের আদলে সাজাবার চেষ্টা৷ এরকম চেষ্টা করতে গেলে বাস্তবের নানা জায়গায় হাত পড়ে, তাতে বাস্তবের বিন্যাসে নানা রকমের অদলবদল ঘটে বা ঘটতে পারে৷ যে-তত্ব প্রয়োগের জন্য আমরা হাতে নিয়ে বেরিয়েছিলাম, আর যাই: হোক সে তো কেবলমাত্র একটা সীমাবদ্ধ কাঠামো৷ তত্বটা বানাবার সময়ে তার যত অনুপুঙ্খে যত নিবিড় মনোযোগই দেওয়া হোক না কেন, প্রয়োগকালীন বাস্তবের সবটুকু অদলবদল ও নাড়াচাড়ার নকশা তার মধ্যে ধরা থাকবে এতটা মনে করা একটু বাড়াবাড়ি৷ তাই দেখা যায় যে প্রয়োগপর্বে বাস্তবটা কেবলই তত্বকাঠামোর আদল থেকে বেরিয়ে আসতে চায়৷ ওই বাঁধুনির মধ্যে বাস্তবের সব রকমফেরের জায়গা হয় না৷ এরকম অবস্থায় আমরা ধন্দে পড়ে যাই৷ মনে হয় তত্বটাই বুঝি ঠকিয়ে দিল৷ তত্ব, তত্বের সীমা ও তার প্রয়োগ পরিধি নিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করে এগোতে না চাইলে এরকম হতাশা অস্বাভাবিক নয়৷ প্রয়োগসার্থকতাই তত্ববিচারের একমাত্র মাপকাঠি, এরকম ভাবনার মধ্যেই এ-বিপদ নিহিত৷ প্রয়োগের ব্যাপারে আমরা যদি খুব বেশি গ্রস্ত হয়ে না পড়ি, তা হলে এমনকি ভাঙাচোরা তত্বের আদল থেকেও আমাদের কত কী পাওয়ার থাকে৷ লক্ষ্য, আদর্শ, কল্পনা, সম্ভাব্য বাস্তব বিষয়ে এক নতুন দৃষ্টি, বস্তুময় বিশ্বজগৎ নিয়ে নতুন কোনো ভাবনা, সে জগৎ-পেরোনো কোনো অলৌকিক আভাস, এরকম কত কী পাওয়ার থাকে তত্বের কাছে৷ আর বাস্তবকে নতুন ছাঁদে সাজিয়ে তোলার কর্মকাণ্ডেও তা অনেকসময়ে দিব্যি উপকারে আসে৷ এসব তো গেল তৈরি তত্ব প্রয়োগের কথা৷ আবার তত্বনির্মাণের সময়েই তার প্রয়োগের কথা মাথায় রেখে তত্বশরীরেই প্রয়োগের কিছু অবকাশ রাখা যেতে পারে৷ কোনো একটা তত্ব যদি আমাদের চারপাশের জগৎকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করতে চায়, তা হলে এরকম অবকাশের খুবই প্রয়োজন আছে৷ তত্ব ও তার প্রয়োগ নিয়ে নানা তাত্বিক প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে৷ সেসব কথা বাদ দিয়েও এ-দুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে আর-একটা আদলের কথা ভাবা জরুরি৷ প্রয়োগ আর তত্ব হাত-ধরাধরি বা মুখ-চাওয়াচাওয়ি করে চলতেই পারে৷ অর্থাৎ বাস্তব পরিস্থিতি কিংবা প্রয়োগের ক্ষেত্র থেকে এক এক রকমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তত্বভাবনায় নতুন নতুন রং লাগতে পারে৷


কিন্তু এই প্রয়োগক্ষেত্র বা তত্বভাবনার বিভিন্ন উপাদান দুই-ই আরও এক গভীরতর স্তর থেকে উৎসারিত হতে পারে৷ তার নাম দেওয়া যাক অধিস্তর৷ সেই স্তরটাকে ছুঁতে পারলে তত্ব ও প্রয়োগ দুই ক্ষেত্রেই আমাদের দৃষ্টি স্বচ্ছতর হবে৷ এতে করে একদিকে কর্মতত্বৈক্যের আদল যেমন আরও স্পষ্ট হবে, তেমনই অন্য দিকে শিক্ষাভাবনা ও তার প্রয়োগবিচ্যুতি খানিকটা আলাদা করে চিনে নেওয়া সম্ভব হবে৷ এ-কাজটা জরুরি, কেননা একক কোনো ব্যর্থতা থেকেই বীজময় কোনো সম্ভাবনার চূড়ান্ত সমাধিরচনা সমীচীন কাজ না৷ শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী পরীক্ষা নিতান্ত ব্যর্থ বলে মেনে নিলেও এমন তো হতে পারে যে অন্য কোথাও অন্য কোনো হাতে সে বীজে নতুন কোনো ফসল দেখা দিল৷ আর অঞ্চলের আবহাওয়ায়, সেখানকার মানুষজনের মধ্যে জীবাশ্মের রেশের মতো কোনো কিছু যদি ভরাডুবির মধ্যেও অবশিষ্ট থেকে যায়, তা হলেও কি বলব যে তত্বভাবনা নেহাতই অসার ছিল? সে-ভাবনা থেকে আমাদের কিচ্ছু পাওয়ার থাকে না? আর ওই তত্বভাবনা যদি সেই ‘ব্যর্থ’ প্রয়োগ কিংবা কর্মক্ষেত্র থেকে পুষ্ট হয়ে থাকে, তা হলে কর্মতত্বৈক্যের এই নতুন আদলের মধ্য দিয়ে তত্বভাবনাকেই আমরা কি আর একটু অন্যভাবে চিনে নিতে পারি না? কর্মতত্বৈক্যের এই আদলে ‘প্রয়োগ’ কথাটা প্রায় অবান্তর হয়ে যায়৷ প্রয়োগ প্রসঙ্গে তত্ব-আদল তো আগে থেকে আছেই, এমনটাই ভাবতে হয়৷ অন্তত সেটাই সাধারণ ধরন হওয়ার সম্ভাবনা৷ ওই ধরনটাই আমাদের চিন্তার ভাঁজে ভাঁজে বেশ সুবিধেমতো মিলে যায়৷ ১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনের কাজে যোগ দিয়ে ক্ষিতিমোহন সেনও সম্ভবত এরকমই এক মনোভঙ্গি থেকে আশ্রম স্থাপনের আদর্শ ও তার পরিচালনা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ধারণা নিয়ে তাঁর কাছেই সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন৷ ক্ষিতিমোহন লিখছেন যে, এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ‘আগাগোড়া নিজের হাতে লেখা’ ‘কুড়ি পৃষ্ঠাব্যাপী’ একখানা পত্র তাঁর হাতে তুলে দেন৷ ১৩০৯ বঙ্গাব্দের ২৭ কার্তিক (১৩ নভেম্বর ১৯০২)-এর এই চিঠিটি কুঞ্জলাল ঘোষকে লেখা৷ শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ইতিহাসের জন্য এ-চিঠির গুরুত্ব অবশ্যস্বীকার্য৷ ক্ষিতিমোহনের অত্যন্ত সংগত প্রশ্নের উত্তরে রবীন্দ্রনাথও তো এই চিঠিই তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন৷ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের অনুমানে ‘ইহাই শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের প্রথম constitution বা বিধি৷’ ক্ষিতিমোহনের মনে হয়েছিল ‘তখনই যে তাঁহার অন্তরে শিক্ষাজীবনের পরিপূর্ণ মূর্তিটি দেখা দিয়েছিল এই পত্রে তাহার পরিচয় পাওয়া যায়৷’ (চিঠিপত্র ১৩, গ্রন্থপরিচয়, পৃ ৩৪৫)৷ সত্যিই ওই দীর্ঘপত্রে কার্যপ্রণালীর কথা কুঞ্জলালকে বিশদভাবে বলতে গিয়ে খুঁটিনাটির দিকে যে-মনোযোগের পরিচয় দিয়েছেন তিনি তাতে মনে হতেই পারে যে ‘পরিপূর্ণ মূর্তিটি’ তখনই তাঁর মনে ধরা দিয়েছিল৷


কর্মতত্বৈক্যের যে-আদলের কথা আমরা এখানে ভাবছি তাতে পরিপূর্ণ মূর্তি ওরকম একেবারে ধরা দেওয়ার কথা নয়৷ তাঁর ‘বিদ্যালয় রচনা’র বেলায় রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও তা ঠিক একবারে ধরা দেয়নি৷ পরবর্তীকালের সারা জীবনের কাজকর্ম ও লেখাপত্রের মধ্যে টের পাওয়া যায় কীভাবে বিদ্যালয়ের রূপ ও বিকাশ ভাবনা তাঁর কাছে একটু একটু করে ধরা দিচ্ছে৷ কুঞ্জলাল ঘোষকে যে-নির্দেশনামা পাঠাচ্ছিলেন তা ছিল আদিপর্বের নেহাতই প্রাথমিক ভাবনা৷ তখনই সে-কথা তাঁর নিজের কাছেও পরিষ্কার ছিল৷ ওইসব নির্দেশ লেখার পরে চিঠির উপসংহারে তিনি লিখছেন, ‘উপস্থিতমত এই নিয়মগুলি লিখিয়া দিলাম৷ ক্রমশ আবশ্যকমত ইহার অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্দ্ধন হইবে৷’ এইরকমই তো হওয়ার কথা৷ বিদ্যালয় গড়ার কাজটা তাঁর দিক থেকে সৃষ্টিশীল কাজই ছিল, এ-কথাটা যদি মেনে নিই তা হলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, ছিমছাম নির্মাণকর্মের মতো এ-কাজের ব্লুপ্রিন্ট ওরকম আগে থেকে পুরো সাজিয়ে নেওয়া যায় না৷ এরকম নানা কথার জন্য কুঞ্জলালকে লেখা এই চিঠির দিকে আমাদের মন দেওয়ার দরকার আছে৷ ওই প্রাথমিক পর্বেই রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারছিলেন যে, যে-কাজে তিনি হাত দিতে যাচ্ছেন তার জন্য যাঁদের সহযোগিতা তাঁর প্রয়োজন তাঁদের তরফে সে-কাজের মর্মগ্রহণ একান্ত জরুরি৷ তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন, ‘বিদ্যালয়ের কর্ম্ম যেমন আমার, তেমনি তাঁহাদেরও কর্ম্ম––এ যদি না হয় তবে এ বিদ্যালয়ের বৃথা প্রতিষ্ঠা৷’ কিন্তু সেইসঙ্গে তিনি এটাও বুঝতে পারছিলেন যে এই বিদ্যালয়-ব্যাপারে সহযোগীদের অবস্থান আর তাঁর নিজের অবস্থান বেমালুম এক হতে পারে না৷ এখানেই আমরা খুঁজে নিতে পারি সেই নিয়ত পরিবর্তমান সৃষ্টিশীলতার ইঙ্গিত, এ কোনো স্থাণু রূপরেখার কথা নয়৷ ওই চিঠির উপসংহার অংশেই তিনি লিখছেন আমি যে ভাবোৎসাহের প্রেরণায় সাহিত্যিক ও আর্থিক ক্ষতি এবং শারীরিক মানসিক নানা কষ্ট স্বীকার করিয়া এই বিদ্যালয়ের কর্ম্মে আত্মোৎসর্গ করিয়াছি সেই ভাবাবেগ আমি সকলের কাছে আশা করি না৷ অনতিকালপূর্ব্বে এমন সময় ছিল যখন আমি নিজের কাছ হইতেও ইহা আশা করিতে পারিতাম না৷ 
(চিঠিপত্র ১৩, পৃ ১৭৫)

এটাই সেই সৃষ্টিশীলভাবে হয়ে ওঠবার কথা৷ ওই ভাবপ্রেরণা তখন তাঁর নিজের মধ্যে জাগছে৷ তাই তা তাঁর কাছে সত্য৷ সহযোগীদের জন্য তো সে-কথা ওই একইভাবে সত্য হতে পারে না৷ তাঁদেরকে তিনি বড়োজোর উদবুদ্ধ করতে পারেন, তাঁদের উন্মোচনে যে তিনি জোর খাটাতে পারেন না, এ তিনি জানতেন৷ এ তো বেশ বাস্তবসম্মত কথাই৷ আমরা যখন অনবরত ভাবালুতার অভিযোগ তুলি, তখন এসব কথার দিকে ঠিক তেমন করে মন দিই না৷ কুঞ্জলালকে লেখা চিঠি থেকে আমাদের অবশ্য আরও পাওয়ার আছে৷ নিয়মকানুনের খসড়া ওই চিঠির মাত্র চার-সাড়ে চার পৃষ্ঠা জায়গা জুড়ে আছে৷ দীর্ঘ চিঠির বাকি অংশে তত্ব-আদলের আভাস৷

সেদিনের এই তত্ব-আদলের কথায় এমন কথা প্রায়ই উঠে আসে যা আজ হয়তো আমাদের মনকে কিছুটা প্রতিহত করে৷ মনে হতেই পারে যে তখন তিনি বড়ো বেশি প্রাচীন ভারতের গৌরবমোহে আচ্ছন্ন, এমনকি ‘হিন্দুসমাজের সমস্ত আচার’-বিষয়ে খানিকটা প্রশ্রয়প্রবণ৷ কিন্তু খেয়াল করে দেখতে শিখলে আমরা দেখব যে, স্ফুটনোন্মুখ এই আদলের মধ্য থেকে একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে ব্রতপালনের কথা৷ এই প্রাথমিক পর্বেই শিক্ষা তাঁর কাছে শুধু দক্ষতা অর্জন নয়৷ তা ধর্মব্রতের কথা, মঙ্গলব্রতের কথা৷ তপোবন, আশ্রম এইসব অনুষঙ্গে উঠে আসছে ব্রহ্মচর্যব্রতের কাঠিন্য, পরিচ্ছন্নতা ও শুচিতার কথা৷ শিক্ষার সঙ্গে জীবনের বড়ো কোনো আদর্শের যোগস্থাপন ঘটছে তাঁর চিন্তায়৷ প্রায় আচার-অনুষ্ঠানের মতো আহ্নিকের কথা বলছেন৷ ছাত্রদের কাছে নিজে যেভাবে গায়ত্রী মন্ত্র ব্যাখ্যা করেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিচ্ছেন৷ ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ––এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় শুরুতেই বলছেন, ‘এই অংশ গায়ত্রীর ব্যাহৃতি নামে খ্যাত৷ চারিদিক হইতে আহরণ করিয়া আনার নাম ব্যাহৃতি৷ প্রথম ধ্যানকালে ভূলোক ভুবর্লোক ও স্বর্লোক অর্থাৎ সমস্ত বিশ্বজগৎকে মনের মধ্যে আহরণ করিয়া আনিতে হইবে––তখনকার মত মনে করিতে হইবে আমি সমস্ত বিশ্বজগতের মধ্যে দাঁড়াইয়াছি––আমি এখন কেবলমাত্র কোনো বিশেষ দেশবাসী নহি৷’ (চিঠিপত্র ১৩, পৃ ১৬৭)৷ এইসব ভাবনাই হয়তো একদিন বিশ্বভারতীতে গিয়ে রূপ নেবে৷ হয়ে-ওঠার ব্যাপারটা খেয়াল করতে পারলে সজীব জায়মান চেহারাটা ধরতে সুবিধা হয়৷ আর তা হলে বোঝা যায় বিদ্যালয়ের কাজ কেনই বা তাঁর কাছে রচনার কাজ৷ সে-রচনাকে আমরা কীভাবে পড়ব তারও কিছু শর্ত আমরা এসব ভাবনা থেকে পেতে পারি৷ সেদিকে যাওয়ার পথে ব্যাহৃতির এই রবীন্দ্রব্যাখ্যা লক্ষ করার বিষয়৷ সবিতা মন্ত্রের এই উচ্চারণের সঙ্গে আহরণের ধারণাটি জুড়ে দেওয়ার চিন্তা নাকি বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের কল্পনাপ্রসূত৷ এ-কল্পনার পিছনে পূর্বাচার্যদের তেমন অনুমোদন হয়তো নেই৷ তা না থাক৷ কী ভেবে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে তাঁর ব্যাখ্যা সাজিয়েছিলেন সে-কথা জোর করে বলা মুশকিল৷ শুধুই ‘হ্ব’-ধাতুর সুবাদে ব্যাখ্যার এই ভারটা তিনি চাপাতে চেয়েছিলেন কি না তাই বা কে বলবে৷ কিন্তু কল্পনার কথাই যখন উঠছে, তখন এত সব পণ্ডিতি বিচার বাদ দিয়ে সৃষ্টিজীবনের একটা মুহূর্তের দিক থেকে এই বিন্দুর দিকে কি তাকানো সম্ভব? ১৩০৯-এর কার্তিকে যখন উনি এসব কথা লিখছেন অন্তত তার কিছুটা আগে থেকেই, ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রতিষ্ঠা সময় থেকেই ব্যাহৃতি প্রসঙ্গে আহরণের এই ধারণা তাঁর মাথায় কাজ করছে৷ হঠাৎ যদি আমরা খেয়াল করি যে ১৩০৮-এর আষাঢ়েই নৈবেদ্য বইটি প্রকাশিত হয়ে গেছে এবং তারও কয়েক মাস আগে ১৩০৭-এর অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুনের মধ্যে নানা কাজের ব্যস্ততার মধ্যে একটু করে অবসর বের করে নিয়ে দিনে দিনে একটা একটা করে এ-বইয়ের সনেটগুলি লেখা হয়ে গেছে, তা হলে কি অন্য একটা ভাবনার পথ একটু খুলে যায় না? নৈবেদ্য-র মতো অত ব্যক্তিগত বই পারে পৌঁছে যাওয়ার আগে তিনিও কি খুব বেশি লিখতে পেরেছিলেন? গানগুলি ছাড়া নৈবেদ্য-র কবিতা অংশে সাড়া দিতে অনেকেরই হয়তো একটু অসুবিধা হয়৷ এ বই নাকি একটু বেশি আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন, কবিতার তীব্রতায় এ-বই নাকি কিছুটা খাটো, এমনকি এর কবিতাগুলি নাকি শব্দভারে হয়তো-বা আড়ষ্ট৷ কবিতার গুণাগুণ নিয়ে তর্ক করে তো বিশেষ লাভ হয় না৷ তবে আমরা এটুকু তো খেয়াল করতেই পারি, এ বইটাকে এতটাই নিজের বলে তিনি ভাবতে পারছিলেন যে এর নিন্দা-সমালোচনাতেও বেশি কষ্ট পাবেন না বলে ভেবেছিলেন৷ এ-বইয়ের কবিতাগুলিকে পূজার স্তব বলে কেউ দেখুন বা না দেখুন, এ-যে নিজেকে ভিতর থেকে গুছিয়ে তোলবার বই তা নিয়ে কি খুব সন্দেহ থাকে৷ বড়ো কোনো একটা উজ্জীবনের জন্য যেন নিজেকে একটা জায়গায় সংহত করে তৈরি করার চেষ্টা৷ অপচয়ের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার এই রক্তাক্ত চেষ্টায় নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখতে চাইলে ব্যাহৃতির মধ্যে কেন তিনি আহরণের আশ্রয় খুঁজেছিলেন তার কিছুটা হদিশ আমরা পেতে পারি৷ বৈদিক মন্ত্রকে এভাবেই তিনি তখন রূপান্তরিত করে নিচ্ছিলেন নিজের উচ্চারণে৷ এ তো সৃষ্টির কথা, পূর্বস্মৃতির অনুবৃত্তিমাত্র নয়৷ এই সৃষ্টির পথে তিনি ভাবলোক থেকে কর্মলোকে সহজ যাতায়াতের জন্য নিজের মতো করে প্রায় যেন একটা সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে নিচ্ছিলেন৷ এ-পথের সন্ধান পেলে আমরা বুঝব কেন বিদ্যালয়ের কাজ তাঁর কাছে রচনাকর্ম, কেন তা রবীন্দ্ররচনাবলিরও অঙ্গ৷


এ-রচনা নিয়ে আমাদের দায়দায়িত্বের প্রসঙ্গে উঠে আসে উত্তরাধিকারের কথা৷ ১৯৪১-এর ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে গান্ধি এক শোকবার্তায় লিখেছিলেন ‘In Santiniketan and Sriniketan, he has left a legacy to the whole nation, indeed, to the world. May the noble soul rest in peace and may those in charge at Santiniketan prove worthy of the responsibility resting on their shoulders.’৷ শান্তিনিকেতনের ভার যাঁদের হাতে পড়েছিল তাঁরা সত্যিই সে-দায়িত্বের যোগ্য ছিলেন কি না, কিংবা সেই ‘মহান আত্মা’ সত্যিই চিরশান্তিতে শয়ান থাকতে পেরেছেন কি না সেসব অন্য বিচার৷ সে-বিচার আপাতত আমার লক্ষ্যও নয়৷ কিন্তু ওই যে জাতি এবং সমস্ত বিশ্বের কাছে এক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন তুলেছিলেন গান্ধি, কী সেই উত্তরাধিকার? গান্ধি শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের কথা বলেই এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন৷ কিন্তু তাঁর উত্তর ঠিকমতো পাওয়ার জন্যই শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ একটু সরিয়ে রেখেই আমাদের এগোতে হবে৷ উত্তরাধিকার তো এমন কোনো নির্দিষ্ট বস্তু নয় যা পথ চলতে অন্যমনস্কভাবে কুড়িয়ে নেওয়া চলে৷ উত্তরাধিকারের সঙ্গে সৃষ্টির প্রশ্ন জড়িত, তা অর্জন করে নেওয়ার জিনিস৷ উত্তরাধিকারীর ভাবলোক ও কর্মলোকের সমস্ত জটিলতা ও দ্বন্দ্ব, আবেগ ও উদবেগের থেকে নির্ধারিত হয় উত্তরাধিকারের স্বরূপ৷ তাই উত্তরাধিকারের চেহারা সজীব ও গতিময়৷ কালে কালে বা যুগে যুগে তা গড়ে উঠতে পারে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে৷ কারণ যুগবদলের সঙ্গে সঙ্গে ওই দ্বন্দ্ব আবেগ ও উদবেগের স্বরূপ যায় বদলে৷ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, চিত্রকলা, নাট্যকলা ও নৃত্যকলার সঙ্গে শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনকে মিশিয়ে নিয়ে তাঁর সমগ্র সৃষ্টিভুবনের উত্তরাধিকার কীভাবে কখন কতটুকু আমরা জীবন্ত করে তুলতে পারব সে আমাদের কালের প্রশ্ন, আমাদের সময়ের সঙ্গে, আমাদের ইতিহাস-পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের মোকাবিলার প্রশ্ন৷ এই-যে এই মুহূর্তে আমাদের হাতের নাগালের মধ্যেই অথচ ঈষৎ প্রচ্ছন্নভাবে নানা পথে অন্য ভাবনার দিকে তাকাবার একটা রেওয়াজ কিছুটা তৈরি হচ্ছে সেখানে রবীন্দ্রভাবনার জগতের সমূহ উপস্থিতি অবশ্যলক্ষণীয়৷ নদী-বাঁধ-বন্যা-জলোচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে শিক্ষা-স্বভাব-সমন্বয়ের যে-সন্ধান আজ আমরা হাতড়ে মরছি সেখানে আরও অনেকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দিকে আমাদের হাত বাড়াতে হচ্ছেই৷ এমনকি এই সন্ত্রাস-আহত পৃথিবীর শুশ্রূষার জন্য ঘরোয়া বৈঠকেও আজ উঠে আসছে তাঁর নাম৷ হয়তো সদর মঞ্চে তেমন নয়, প্রচ্ছন্ন সন্ধানেই যে উঠছে তাঁর নাম সে-কথাটাও সম্ভবত বেশ ইঙ্গিতবহ৷ এখান থেকে বিচারের সেই শর্তের কথায় পৌঁছোতে পারি আমরা৷ উত্তরাধিকার আমাদেরই দায়, এ-কথাটা মেনে নিলে তাঁর সাহিত্য-শিল্পের রচনাকর্মকে যে-মেজাজে পড়বার দেখবার চেষ্টা করতে হবে সে-মেজাজ কেন আমরা তাঁর বিদ্যালয়-রচনাকর্মের বেলায় সঞ্চারিত করে নিতে পারব না? তা করতে পারলে রবীন্দ্রশিক্ষাবিচার শুধু কেবল তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিচারে আটকে থাকতে পারে না৷ অনিবার্যভাবে তখন পৌঁছে যেতে হবে তাঁর শিক্ষাভাবনার কথায়৷ শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের দৈনন্দিনের মোকাবিলাই হবে তার পরিপ্রেক্ষিত৷ শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী প্রকল্প কতদূর পর্যন্ত সজীব ঐতিহ্য হিসেবে দেখা দিতে পারে সে-প্রশ্নের উত্তর একান্তই আমাদের হাতে৷ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্বভারতীর গুণাগুণের প্রশ্ন সেখানে সম্পূর্ণ অবান্তর৷ রবীন্দ্ররচনাও যদি আজ আর আমাদের তেমন কোনো কাজে না লাগে, তা হলে ওই রচনাবলি নিতান্ত এক গ্রন্থমালার নাম৷ তেমনই বিশ্বভারতীও হবে একটি অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম৷ সেটাই প্রকৃত বিফলতা৷


রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা ও শান্তিনিকেতনে এক বিদ্যালয় গড়ে তোলার কথা আলোচনা করতে গেলেই তাঁর নিজের ছেলেবেলার দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা অনিবার্যভাবে আমাদের মনে আসে৷ ইশকুলজীবনের বন্দিদশা আর তার ইট-কাঠ-পাথরের একটা ছক এ-প্রসঙ্গে আমাদের সবার খুব চেনা৷ তাঁর শিক্ষাকাণ্ডের প্রাথমিক কোনো প্রেরণা হিসেবে ওইসব দিনের স্মৃতি কাজ করে থাকতেই পারে৷ কিন্তু ওই তিক্ত স্মৃতির প্রতিক্রিয়ার গল্পটাকে আমরা যদি খুব বেশিদূর টেনে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে নিজেদের পাওনা আদায়ে বেশ টান পড়বে৷ বাইরের দিককার অনেক ঘটনাই অনেকসময়ে এক-একটা দিকে আমাদের নজর ফেরাতে সাহায্য করে৷ কিন্তু কোনটা কতটা ফলবতী হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করে নিজের প্রবণতা ও প্রস্তুতির উপর৷ রবীন্দ্রনাথের নিজের বিদ্যালয়-স্মৃতি যে-অর্থে কিছুটা প্রাথমিক প্রেরণাবিন্দু হয়ে থাকতে পারে সেই অর্থে নিজের পুত্রদের শিক্ষাদীক্ষার ভাবনাও একটা ব্যবহারিক প্রয়োজনসাধনের আকর্ষণ হিসেবে দেখা দিয়ে থাকতে পারে৷ কিন্তু বাইরের দিকে খুব বেশি জোর দিতে গেলে মনে হবেই, তা হলে অত-যে সব লেখালেখি তার কি কোনো অন্তরবিন্দু নেই তবে? বাহ্যিক ব্যাপারে খুব বেশি ভর চাপাতে গেলে সারা জীবনের অত বড়ো একটা কর্মকাণ্ডকে তেমন কোনো প্রসারিত আদলে আর দেখতে পাওয়া যায় না৷ রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাকর্মকাণ্ডে শান্তিনিকেতন-ব্রহ্মচর্যাশ্রম-বিশ্বভারতী, এসব তো একটা দিক৷ আর আছে অতগুলি নিবিষ্ট মননের প্রবন্ধ, যা ‘শিক্ষা’, ‘প্রাক্তনী’, ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’, ‘বিশ্বভারতী’, ‘শান্তিনিকেতন’, ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ ইত্যাদি নানা সংকলনে নিবদ্ধ৷ এই একই টানে প্রত্যক্ষত ধর্মবিষয়গত বলে পরিচিত প্রবন্ধগুলিও হয়তো পড়ে নেওয়া যায়৷ তাতে আমাদের উপকারই হবে৷ এ ছাড়াও আছে সহজ পাঠ, আর সংস্কৃত শিক্ষা, আর ইংরেজি পাঠ, সোপান, শ্রুতিশিক্ষা, সহজশিক্ষা ইত্যাদি রচনা এবং অনুবাদচর্চা৷ এসব মিলিয়েই বুঝতে হবে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাতত্ব ভাবনা ও কর্মকাণ্ডের প্রকল্পটাকে৷ এর কোনো কিছু বাদ গেলেই সে হবে এক খণ্ডচিত্র৷ এই খণ্ডচিত্রের বিপদ-বিষয়ে সাবধান করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন

তর্কের আরম্ভেই যখন মূল কথা ছাড়িয়া আনুষঙ্গিক কথা লইয়া আন্দোলন উপস্থিত হয় এবং প্রতিপক্ষকে সমগ্রভাবে বুঝিবার চেষ্টা না করিয়া তাহার কথাগুলিকে খণ্ড খণ্ড ভাবে আক্রমণ করিবার আয়োজন হয়, তখন সেই নিষ্ফল বাকযুদ্ধে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করাই সুবুদ্ধিসংগত৷
(শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধের অনুবৃত্তি, রচনাবলী, প.ব. সরকার, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ ৪৪১)

তাই বলছিলাম ছেলেবেলায় ইশকুলবাড়ির আনুষঙ্গিকে অত জোর দিয়ে বিশেষ লাভ নেই৷ ও-কথা মিথ্যে বলে নয়, ও-কথায় সত্যের বড়ো অংশ হয়তো ধরা পড়ে না তাই৷ ঠিক যেমন, ওঁর ছবির কথা ভাবতে গিয়ে সেই যেন খেলাচ্ছলে পাণ্ডুলিপি কাটাকুটির গল্পটা সাজানো হয়৷ সেই কাটাকুটি সত্য, অবশ্যই সত্য, তার কত কত নিদর্শন আজ আমাদের এত চেনা যে তা দিয়ে আজ হামেশাই আমরা বই ও পত্রপত্রিকা ও কার্ড ক্যালেণ্ডারের অলংকরণের কাজ সেরে নিই৷ কিন্তু কাটাকুটির গল্পে সমস্ত ভরটা চাপালে রূপ ও আকৃতির জগতে তাঁর ধীরে ধীরে প্রবেশ ও সেখানে অত বড়ো অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজকাহিনী থেকে কি কিছুটা বঞ্চিত হব না? রবীন্দ্রনাথের নিজের কথায় মোটরগাড়ির স্টার্টের মতো প্রথম ঠেলার জন্য ওইসব প্রাথমিক গল্পগুলোর একটা ভূমিকা থাকতেই পারে৷ কিন্তু সেটুকুই সব ভেবে বসে থাকলে ঠকে যাব৷ আর রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনায় শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সেই অর্থে একেবারে ঠিক প্রাথমিক গল্পও নয়৷ আর কিছু না হোক অন্তত ‘শিক্ষার হেরফের’ যে ১৮৯২-এর প্রবন্ধ এ-কথা তো লক্ষ করতেই হয়৷ তাই বলছিলাম যে খণ্ডচিত্র ছেড়ে অবচ্ছিন্নতা এড়িয়ে নিরবচ্ছিন্ন এক সমগ্রতার প্রবাহের দিকে আমাদের নজর ফেরানো উচিত৷ বলা উচিত এই নজর ফেরাবার শিক্ষা গ্রহণ করা চাই৷ কেননা এরই মধ্যে আমাদের ভবনের কাহিনী নিহিত, আর নিজেদের ভবন-ইতিবৃত্তের পথ ঠিক ঠিক চিনে নিয়ে চলতে পারলে রবীন্দ্রনাথের ভবনকাহিনীও স্পর্শ করা সম্ভব৷ নিয়ত হয়ে ওঠাই যাঁর সত্তাস্বরূপ তাঁকে চিনে নেওয়ার পথে নিজেদের পুষ্টি আহরণে এ-পথের আর বিকল্প কী৷


এসবেরই জন্য সংহতির এক বিন্দু চাই৷ মিছরি যেমন সুতোর সংহতিতে দানা বাঁধতে পায়, তেমনই চিন্তাভাবনার জগতেও চাই অমনই এক সংহতিবিন্দু৷ বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের মতো কোনো চিন্তাভাবুকের ক্ষেত্রে এ-কথা আরও জোরালোভাবে প্রযোজ্য৷ তিনি তো তাঁর তত্বভাবনা সাজিয়েগুছিয়ে পেশ করবার জন্য কোনো ট্রিটিজ রচনা করেননি৷ বস্তুত সেই অর্থে তিনি কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি৷ অগুনতি রচনাকর্ম ছিল তাঁর যদিও৷ সেসব রচনা বিভিন্ন সময়ে রচিত, বিভিন্ন প্রসঙ্গে এবং উপলক্ষে সে রচনাকর্ম প্রণোদিত৷ সেসব রচনা থেকে বই তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই অর্থে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তেমন করে তিনি গ্রন্থ প্রণয়ন করেননি৷ কাজেই এই সংহতিবিন্দুটাকে আমাদেরই খুঁজে নিতে হবে৷ ওটা আমাদেরই জরিপকাজের অন্তর্গত৷ সেই বিন্দুটা ওই অর্থে কিন্তু আমাদের রচনা হবে, কারণ রবীন্দ্রচিন্তার তত্ব-আদল নির্মাণ আমাদের দায়িত্ব৷ সে দায়িত্ব পালনে আমরা যদি একেবারে দায়িত্বজ্ঞানহীন না হই, তা হলে রবীন্দ্র-কর্ম ও চিন্তায় ভর দিয়ে দিয়ে আমরা সে-বিন্দু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করব এবং তারই গায়ে গায়ে কীভাবে দানা জমে উঠছে তার কাহিনীটা বুঝে নিতে চাইব৷


আমার প্রস্তাব, আত্মতা হোক সেই সংহতিবিন্দু৷ কথাটা তেমন নতুন নয় নিশ্চয়, আর রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে আমাদের কানে খুব-একটা আচমকা লাগারও কিছু নেই এতে৷ তা সত্বেও কথাটা যে আবার ঘটা করে বলছি এখানে তার কারণ হল এই বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করলে আমরা ক্রমে ক্রমে হয়তো অনেক দূর পৌঁছে যেতে পারব৷ আর তা পারলেই তবে এই আত্মতাকে এক সংহতিবিন্দু বলে দাবি করা চলে৷ রবীন্দ্রনাথ যে কোথা থেকে পেয়েছিলেন এই আত্মতার ধারণা সেই সন্ধানে আমরা একেবারে উপনিষদ পর্যন্ত পৌঁছে যেতেই পারি৷ কিন্তু এই প্রসঙ্গে মানে রাখা ভালো যে রবীন্দ্রনাথের মাপের কোনো সৃষ্টিশীল মনের পক্ষে কোন ধারণা কখন ঠিক কোথা থেকে আহরণ করা যে সম্ভব তার নিশ্চিত ঠিকানা পাওয়া খুব সহজ কাজ নয়৷ যেমন, এই আত্মতার খোঁজে এনলাইটেনমেন্টের সমাজ-সংস্কৃতির বিন্যাস-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়ার খবর নেওয়া কি খুব গর্হিত কাজ হবে? একটা জিনিস তো ভাবতেই হয় যে ইউরোপেও ওই আলোকোদ্ভাস পর্বের সমসাময়িক কাল থেকেই তার নানা সমালোচনও কিছু দুর্লক্ষ্য ছিল না৷ এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ পাই রোমান্টিক প্রতিক্রিয়ায়৷ অনেকসময়ে হয়তো একটু আলগাভাবেই রবীন্দ্রনাথকেও যে আমরা রোমান্টিক বর্গের অন্তর্ভুক্ত করে ভাবতে অভ্যস্ত তার মধ্যে একটা বিপদের অবকাশ আছে৷ য়োহান গটফ্রিড হেরডের (১৭৪৪-১৮০৩)-এর মতো রোমান্টিক বর্গের অনেক ভাবুক আছেন যাঁদের ভাবনার আদলের মধ্যে আপেক্ষিকতার যে-প্রবণতা লক্ষ করা যায় সে-বিষয়ে, আমাদের সাবধান হতে হয়৷ কেননা এককাট্টা আপেক্ষিকতার পথে এগোতে থাকলে সমাজ-সংস্কৃতির সব বিন্যাসই কোনো-না-কোনো আদলে মান্য ও সিদ্ধ বলে মনে হতে পারে৷ তাতে করে বাছবিচার সবই লোপ পেয়ে যাবে৷ তাই রোমান্টিক বলে ওরকম কোনো একটা বর্গের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে যদি আমরা নির্বিচারে পুরে দিই, তাহলে তাঁকেও হয়তো অন্যমনস্কভাবেই আমরা আপেক্ষিকতাবাদীর কোঠায় ফেলে দেখতে চাইব৷ আলোকোদ্ভাস পর্বের সমালোচনার পথে এগোলেই যে নির্বিচার আপেক্ষিকতাবাদে শামিল হতে হবে তার কোনো মানে নেই৷ রোমান্টিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তির একাধিপত্য-বিষয়ে নিশ্চয়ই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, নিশ্চয়ই প্রকৃতিকে আবার তার স্বাধিকারে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল৷ এসব আদলের কিছু কিছু পরিচয় রবীন্দ্রনাথেও আমরা নিশ্চয়ই পাব৷ কিন্তু এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকোদ্ভাস পর্বের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক শুধু এইটুকু তা ভাবলে সেটা হবে এক ধরণের অতিসরলীকরণ৷ প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যে ও সাম্যে নিশ্চয়ই তিনিও মিলিত হতে চেয়েছিলেন, তাই বলে কোনো স্যাভেজ আদিমতায় তিনি প্রত্যাবর্তন করতে চাননি৷ তেমনই যুক্তির হাত ধরেই সব পথপরিক্রমা যে নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে, এ তিনি জানতেন, তাই বলে অযুক্তির হাতে সমর্পণ তাঁর প্রকল্পের অন্তর্গত কোনো লক্ষ্য ছিল না৷ আলোকোদ্ভাস পর্বের ‘যুক্তিনিষ্ঠ’ সমাজ-সংস্কৃতির বিন্যাস যে এক অন্তরঙ্গ অর্থে বিচ্ছেদের জন্ম দেয় বা দিতে পারে, এ-ব্যাপারে তাঁর মনে ছিল রীতিমতো এক ব্যাকুল উদবেগ৷ ‘শিক্ষার মিলন’ (১৩২৮) প্রবন্ধে তিনি লিখছেন

পূর্বদেশে আমরা যে সময়ে রোগ হলে ভূতের ওঝাকে ডাকছি, দৈন্য হলে গ্রহশান্তির জন্যে দৈবজ্ঞের দ্বারে দৌড়চ্ছি, বসন্তমারীকে ঠেকিয়ে রাখবার ভার দিচ্ছি শীতলা দেবীর ’পরে, আর শত্রুকে মারবার জন্যে মরণ উচাটন মন্ত্র আওড়াতে বসেছি, ঠিক সেই সময়ে পশ্চিম মহাদেশে ভলটেয়ারকে একজন মেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘শুনেছি নাকি মন্ত্রগুণে পালকে পাল ভেড়া মেরে ফেলা যায়, সে কি সত্য?’ ভলটেয়ার জবাব দিয়েছিলেন, ‘নিশ্চয়ই মেরে ফেলা যায়, কিন্তু তার সঙ্গে যথোচিত পরিমাণে সেঁকো বিষ থাকা চাই৷’
(রচনাবলী, প.ব. সরকার, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ ৩৮৯)

যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানমননের জোর তাঁর নজর এড়ায়নি৷ তাই বলে ওই আলোকোদ্ভাস পর্বের সামাজিক সীমাবদ্ধতার দিকেও নজর না দিলে কি চলে? ১৯৩৩-এর সেই আশ্চর্য ভাষণ ‘শিক্ষার বিকিরণ’-এ আমরা পাই

শহরবাসী একদল মানুষ এই সুযোগে শিক্ষা পেলে, মান পেলে, অর্থ পেলে তারাই হল এনলাইটেণ্ড, আলোকিত৷ সেই আলোর পিছনে বাকি দেশটাতে লাগল পূর্ণ গ্রহণ৷ ইস্কুলের বেঞ্চিতে বসে যাঁরা ইংরেজি পড়া মুখস্থ করলেন শিক্ষাদীপ্ত দৃষ্টির অন্ধতায় তাঁরা দেশ বলতে বুঝলেন শিক্ষিত সমাজ, ময়ূর বলতে বুঝলেন তার পেখমটা, হাতি বলতে তার গজদন্ত৷ সেই দিন থেকে জলকষ্ট বল, পথকষ্ট বল, রোগ বল, অজ্ঞান বল, জমে উঠল কাংস্যবাদ্যমন্দ্রিত নাট্যমঞ্চের নেপথ্যে নিরানন্দ নিরালোক গ্রামে গ্রামে৷
(রচনাবলী, প.ব. সরকার, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ ৪১০)

আলোকোদ্ভাসের টানে আত্মতার গরজে যে ভাঁটা পড়তে পারে সে-বিপদ সম্বন্ধে সজাগ থাকতে হয়৷ আত্মতার সংহতি অর্জন করবার চেষ্টা করতে হয়৷ সেই সংহতিবিন্দুতে পৌঁছোতে পারলে, এমনকি তেমনভাবে পৌঁছোবার চেষ্টার মধ্যেও দেখা দিতে পারে আপাত-বিষম সব বস্তু ও ভাবনা ও বিষয়ের ঐক্য৷ স্রোতের মধ্যে কোথাও ঘূর্ণিবিন্দু তৈরি হলে যেমন নানা জিনিস কোনো এক চোরা টানে এক জায়গায় এসে জড়াজড়ি করে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এও তেমনই৷ ওই সংহতিবিন্দুর ভরকেন্দ্রের টানে তখন শিক্ষাভাবনার সঙ্গে, অজ্ঞানতার প্রশ্নের সঙ্গে অক্লেশে মিলে যেতে পারে জলকষ্ট, পথকষ্ট, রোগভোগ৷ রবীন্দ্রমননে তাই কূপখনন আর ম্যালেরিয়া প্রতিকার, পাঠশালা গড়া আর খামার বানানো, আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা সবই একসঙ্গে মিলে যায়৷ বিদ্যালয়ের কাজ আর পল্লিসংগঠনের কাজ চলে হাত-ধরাধরি করে৷ এই ঐক্যবোধ তাঁর ভাবনার জগতের কথা, আবার তাঁর কর্মকাণ্ডের কথাও৷ এই অর্জিত আত্মতার বোধ কীভাবে তাঁর কাজে লেগেছিল? আত্মতা অন্যকে অপরতায় নির্বাসন দেয় না৷ আত্মতা বৈচিত্র্যকে মান্য করে, বহুত্বকে সে সহজভাবে সম্মান জানাতে পারে৷ কারণ, আত্মতা মিলতে চায় আর তার মেলবার ক্ষেত্রও কিন্তু প্রকৃত অর্থে অসীম৷ এই মেলবার গরজের মধ্যেই আছে এককাট্টা আপেক্ষিকতাবাদ থেকে তার পরিত্রাণ৷ এই আত্মতা যতটাই অন্যের সঙ্গে মিলতে পারবে, ততটাই সে নিজেকে ফিরে পাবে৷ এই মেলাতেই আত্মতার সমৃদ্ধি৷ সমস্ত রবীন্দ্রসাহিত্যে গানে কবিতায় এত যে মেলবার আর মেলাবার কথা পাই সে কি আর এমনি৷ এইরকম কোনো সংহতিবিন্দু থেকে তা উৎসারিত, এমন করে ভাবতে শিখলে আমরা হয়তো বড়ো কোনো মানেতে পৌঁছোতে পারি৷ অন্যকে যদি শুধু অপর হিসেবে দেখতে শিখি, তা হলে মিলতে পারি না, বড়োজোর দখল নিতে পারি, অধিকার করতে পারি৷ সে তো সাম্রাজ্যলিপ্সার কথা৷ সাম্রাজ্যের দখলদারির জন্য অপর লাগে, সে-অপর শুধুমাত্র অন্য না, আত্মতার সঙ্গে তার বৈরিতার সম্পর্ক, আর তাই আত্মতার রূপ সেখানে শুধু খণ্ডিত নয়, ক্ষুণ্ণ৷


আত্মতা যে অন্যের সঙ্গে মিলতে চায় সেখানেই আছে তার প্রকাশের দায়৷ ওই মেলাতেই তার হয়ে-ওঠা, ওখানেই তার ভবনকাহিনী, পূর্ণতার পথে যাত্রাও তার ওই পথে, ওইভাবেই সে সত্য হতে চায়, আর এই তার প্রকাশ৷ এই প্রকাশ কোনো তৈরি হওয়া, সমাপ্ত হয়ে-যাওয়া বস্তু বা ভাবনার বর্ণনামাত্র নয়৷ একটু একটু করে হয়ে-ওঠারই নাম প্রকাশ৷ শিক্ষাপ্রসঙ্গে আত্মতার পথে হয়ে-ওঠা ও প্রকাশের কথায় তাঁর দু একটা বিচ্ছিন্ন উচ্চারণ আমরা দেখে নিতে পারি৷
১. All educational development must proceed from within outwards. It is really a spiritual process, not merely an intellectual or a mechanical one. The spirit being greater than the body and even the individual mind, education is a process covering the widest area. Education is, in a real sense, the breaking of the shackles of individual narrowness.
[On Some Educational Questions, 1919, The English Writings of Rabindranath Tagore, Vol. III (ed. Sisir Kumar Das), Sahitya Akademi, p. 748]
(শিক্ষাবিকাশের সব প্রক্রিয়াই ভিতর থেকে বাইরের দিকে এগিয়ে চলে৷ প্রকৃতপক্ষে এ এক আত্মিক প্রক্রিয়া, শুধুই বৌদ্ধিক কিংবা যান্ত্রিক নয়৷ আত্মা যেহেতু শরীরের চেয়ে বড়ো, এমনকি ব্যক্তিমনের চেয়েও, তাই শিক্ষাপ্রক্রিয়ার প্রসার একেবারে ব্যাপক এক ক্ষেত্র জুড়ে৷ ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার শৃঙ্খল ভাঙাই শিক্ষার প্রকৃত তাৎপর্য৷)
২৷ Not being tied down by cut and dried doctrines of education, I had to find my own experience through experiment and failure.
[The Schoolmaster, 1924; পূর্বোক্ত, p. 504]
(একেবারে তৈরি অবস্থায় পাওয়া কোনো শিক্ষাতত্বে বদ্ধ না থেকে পরীক্ষানিরীক্ষা ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে আমাকে আমার নিজের অভিজ্ঞতায় খুঁজে নিতে হয়েছিল৷)
৩৷ With it my own mind has grown, and my own ideal of education found freedom to reach its fulness through a vital process so elusive that the picture of its unity cannot be analysed.
[The Educational Mission of the Visva-Bharati, 1930; পূর্বোক্ত, p. 626]
(এর সঙ্গে আমার নিজের মনেরও বিকাশ ঘটেছে, এবং আমার শিক্ষাদর্শ স্বাধীনভাবে এমন এক সজীব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার পূর্ণতায় পৌঁছোতে চেয়েছে যে সেই সংহত ঐক্যের ছবিটাকে বিশ্লেষণ করাই যায় না৷)


প্রকাশের এই চরিতার্থতার জন্য সত্য হতে হয়, নইলে সব কেমন বিস্রস্ত হয়ে যায়৷ এইসব শব্দ ব্যবহার করার সময়ে একটু সাবধান থাকতে হয়৷ একে এসব শব্দ ‘আধুনিক’ মনের কাছে অনেকসময়ে কিছু সমস্যা তৈরি করে, তার উপরে কে না জানে যে ভাষা অসম্পূর্ণ৷ কাজেই শব্দের অভাবে এই চেনা শব্দগুলোকে দিয়েই কাজ চালাচ্ছি৷ কী আর করা যাবে৷ প্রকাশের দায় যেখানে সত্য, সেখানে অপরের মঙ্গলচিন্তাও আর তেমন জরুরি নয়৷ আবারও বলছি অসম্পূর্ণ ভাষায় শব্দের অনটনে যেভাবে এসব কথা বলতে হচ্ছে তাতে ভুল বোঝার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে৷ কাজেই ‘চিন্তা বিক্ষিপ্ত’ যাতে না হয় এমনইভাবে একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা ছাড়া গত্যন্তর নেই৷ আর সত্যিই তো, বুঝে নিতে না চাইলে কিছুতেই যে বোঝা যাবে না, এ আর এমন বেশি কথা কী৷
১৩৪৩-এ আশ্রমের প্রাক্তনীদের কাছে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন

তবে এ কথা বলে রাখা ভালো যে, আমি এই বিদ্যালয় রচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম কোনো লোকহিতৈষণার বশবর্তী হয়ে নয়৷ প্রকাশের ইচ্ছাই আমার জীবনের একমাত্র ইচ্ছা, অন্তরের মধ্যে যে চিত্র আছে সেটাকে বাইরে কর্মে গানে চিত্ররূপ দেওয়ার কাজই আমার––আমার উপর এই ভার, উপরওয়ালার এই ফরমাশ৷ আমার চরিত্র প্রকাশধর্মী, তপোবন-বিদ্যালয় সম্বন্ধে আমার মনে যে-একটি ছবি ছিল তাকেই আমি শান্তিনিকেতন-বিদ্যালয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম, এর মধ্যে বিশ্বমানবের উপকার করবার কোনো আগ্রহ ছিল না৷
(রচনাবলী, প.ব. সরকার, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ ৪৬৩)

এ-প্রসঙ্গে মনে রাখা উচিত যে এসব কথার বিপরীতধর্মী কোনো উচ্চারণ রবীন্দ্ররচনায় আমরা কখনও পাব না তা মোটেই নয়৷ বিভিন্ন সুরের কথা বিভিন্ন প্রসঙ্গে নিশ্চয়ই পাব৷ সেইজন্যই সংহতিবিন্দুর দৃষ্টিতে দেখা এত জরুরি৷
এই প্রকাশের কথা মাথায় ছিল বলেই শিক্ষার্থীর বেলাতেও তার প্রকাশ নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা ছিল৷ শিক্ষার্থীর শিক্ষাও শুধু বাইরে থেকে হওয়ার নয়৷ তাকে শিখতেও হবে, আবার নিজের হয়ে ওঠাকে পূর্ণ রূপও দিতে হবে, তাতেই সে তার আত্মতায় বিকশিত হবে৷ আলোকোদ্ভাস ধারণায় শিক্ষিতের দায়িত্ব বর্তায় শিক্ষাবিস্তারে, এই ধারণায় একজন অপরজনকে শিক্ষিত করে তুলবে৷ সমাজের একটা অংশ হাত ধরে অপর অংশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে৷ এমনিভাবে শিক্ষার আলো অশিক্ষার অন্ধকার দূর করবে৷ এই প্রত্যয়ের ভাঁজে ভাঁজে যে কত সমস্যার জট-জটিলতা লুকিয়ে থাকতে পারে তা নিজের বোধে গ্রহণ করতে পারলে তবে নিজেকে অনেক অনেকখানি ভেঙে নেওয়ার জন্য তৈরি হওয়া যায়৷ রবীন্দ্রনাথের এই প্রস্তুতিপর্বের সব কাহিনী হয়তো আমাদের জানা নেই, সব কাহিনী হয়তো কোনোদিনই জানা যাবে না, কেননা এ-নাটকের সবটুকু তো মঞ্চে নেই, অনেকটাই নেপথ্যে৷ কিন্তু সে-নেপথ্যনাটক সম্বন্ধে আমরা অন্তত সজাগ থাকার চেষ্টা করতে পারি৷ তাহলে শুধু ছেলেবেলায় দুঃসহ অভিজ্ঞতা, কিংবা আলোকিত যুক্তিবিজ্ঞান, কিংবা ঔপনিষদিক আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি কোনো-না-কোনো একটা খোপে পুরে দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার বদলে আমরা পরিপ্রশ্নেণ তাকাতে পারি তাঁর সমস্ত অভিজ্ঞতার বৃত্তটার দিকে৷ তা হলে সেই দুঃসহ দিনের নির্বাসন থেকে শিলাইদহ পেরিয়ে, বঙ্গভঙ্গ স্বাদেশিকতা পেরিয়ে জীবৎকালের সমস্ত ঘট্মান ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বড়ো আদল ও ছোটো খণ্ড টুকরোর তুচ্ছতা সব মিলিয়ে একটা পরিণতির সন্ধান নিতে পারি৷ আর নিজেকে ভেঙে ভেঙে সাজাবার এই নাটকটা খানিকটা বুঝতে শিখলে আমরা বুঝব কেন শিশুশিক্ষার্থীর জন্য তাঁকে বলতে হয়

শিশু যে অ্যালজেব্রা না কষিয়াই, ইতিহাসের তারিখ না মুখস্থ করিয়াই মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াছে, সেজন্য সে কি অপরাধী? তাই সে হতভাগ্যদের নিকট হইতে তাহাদের আকাশ বাতাস, তাহাদের আনন্দ অবকাশ, সমস্ত কাড়িয়া লইয়া শিক্ষাকে সর্বপ্রকারেই তাহাদের পক্ষে শাস্তি করিয়া তুলিতে হইবে? না জানা হইতে ক্রমে ক্রমে জানিবার আনন্দ পাইবে বলিয়াই কি শিশুরা অশিক্ষিত হইয়া জন্মগ্রহণ করে না৷ আমাদের অক্ষমতা ও বর্বরতা-বশত জ্ঞানশিক্ষাকে যদি আমরা আনন্দজনক করিয়া না তুলিতে পারি, তবু চেষ্টা করিয়া, ইচ্ছা করিয়া, নিতান্ত নিষ্ঠুরতাপূর্বক নিরপরাধ শিশুদের বিদ্যাগারকে কেন আমরা কারাগারের আকৃতি দিই৷
(‘শিক্ষাসমস্যা’, ১৩১৩, পূর্বোক্ত, পৃ ৩২৮)

এই যে আনন্দের কথা, কতভাবে কত জায়গায় কত জনের মুখ দিয়ে এ-কথা তিনি শুনিয়েছেন আমাদের৷ এ-আনন্দের কথা পাই নন্দিনীর কাছে, বিশু পাগলের কাছে, ধনঞ্জয় বৈরাগী, ঠাকুরদা, চন্দ্রহাস ও আরও কত কত জনের কাছে৷ আর আছে অনন্ত বিষাদের পটভূমিতে অমলেরও কথা৷


জাতীয় শিক্ষা পরিষদের গঠনপত্রিকা তৈরি করার মুহূর্তে যে রবীন্দ্রনাথকে এত সব আনন্দের কথা বলতে হয়েছিল তার ইঙ্গিত আমাদের কাছে যেন হারিয়ে না যায়৷ সেদিনের মত্ত মুহূর্তে বাইরের উন্মাদনার একটা দিক ছিল৷ জোয়ার সরে গেলেই দ্রুত যদি চড়া জেগে ওঠে, তাই কি তিনি ভয় পাচ্ছিলেন? এইসব ইঙ্গিত অবহেলা না করতে চাইলে বুঝব কেন তিনি বইয়ের দৌরাত্ম্য আর পুঁথির আক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন৷ বইয়ের কথাই যে ধ্রুবসত্য নয়, বইও যে কোনো-না কোনো মানুষের কীর্তি, এইসব সাদামাঠা কথা খেয়াল রাখি না বলে কত না বিড়ম্বনায় পড়তে হয় আমাদের৷ তাই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাপ্রকল্পে বইয়ে যা লেখা আছে শুধু তা শিখিয়ে দেওয়াই একমাত্র কাজ নয়, বইটা কীভাবে লেখা হয়েছিল এটা যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেরা হৃদয়ংগম করতে পারে সেদিকে নজর দেওয়াই প্রকৃত কাজ৷ ১৩১৩-র আর-একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন

‘আর্যরা মধ্য এশিয়া হইতে ভারতে আসিয়াছেন’, ‘খৃস্টজন্মের দুই হাজার বৎসর পূর্বে বেদরচনা হইয়াছে’, এ-সকল কথা আমরা বই হইতে পড়িয়াছি৷ বইয়ের অক্ষরগুলো কাটকুট-হীন নির্বিকার, তাহারা শিশুবয়সে আমাদের উপরে সম্মোহন প্রয়োগ করে; তাই আমাদের কাছে আজ এ-সমস্ত কথা একেবারে দৈববাণীর মতো৷ ছেলেদের প্রথম হইতেই জানিতে হইবে, এই-সকল আনুমানিক কথা কতকগুলা যুক্তির উপর নির্ভর করিতেছে৷ সেই-সকল যুক্তির মূল উপকরণগুলি যথাসম্ভব তাহাদের সম্মুখে ধরিয়া তাহাদের নিজেদের অনুমানশক্তির উদ্রেক করিতে হইবে৷ বইগুলা যে কী করিয়া তৈরি হইতে থাকে তাহা প্রথম হইতেই অল্পে-অল্পে ক্রমে-ক্রমে তাহারা নিজেদের মনের মধ্যে অনুভব করিতে থাকুক তাহা হইলেই বইয়ের যথার্থ ফল তাহারা পাইবে, অথচ তাহারা অন্ধ শাসন হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিবে এবং নিজের স্বাধীন উদ্যমের দ্বারা জ্ঞানলাভ করিবার যে স্বাভাবিক মানসিক শক্তি তাহা ঘাড়ের-উপরে-বাহির-হইতে-বোঝা-চাপানো বিদ্যার দ্বারা আচ্ছন্ন ও অভিভূত হইবে না,বইগুলোর উপরে মনের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ থাকিবে৷
(‘আবরণ’, ১৩১৩, পূর্বোক্ত, পৃ ৩৪৭)

আর্যরা ভারতেরই আদি বাসিন্দা, না আগন্তুক, এই নিয়ে এই মুহূর্তে প্রচুর বাদবিতণ্ডা চলছে এখানে৷ এ আর মোটেই নিরীহ প্রশ্ন নেই, রীতিমতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এ এখন এক তুখোড় রাজনৈতিক প্রশ্ন৷ অত দিন আগে উদাহরণচ্ছলে কথাটা তুলেছিলেন তিনি, এসব কথার দিগবিদিক চিনে নেওয়া চাই৷


শিক্ষা প্রশ্ন থেকে অনায়াসে গড়িয়ে যেতে হয় ইতিহাস রাজনীতি ও সমাজের অন্য নানা প্রশ্নে৷ সবই বাঁধা আছে একটানে, মিলেমিশে দলা পাকিয়ে নয়, গায়ে গায়ে লেগে লেগে, সংলগ্ন বুনোটের অন্তর্গত হয়ে৷ আত্মতার গরজেই সব মিলিয়ে নিতে হয়, আবার আলাদা করে ছাড়িয়েও বুঝে নিতে হয়৷ আর আত্মতা তো কেবল ব্যক্তির স্তরের ধারণাই নয়, সামাজিক স্তরে তাকে প্রসারিত করা যেতেই পারে৷ শিক্ষার্থীর ব্যক্তির স্তরে রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মচর্যের কথা তোলেন৷ ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতাকে এ-ধারণার সঙ্গে মোকাবিলা করতেই হবে৷ এ-কথাটা শুনে রাখা ভালো, কেননা এসব ধারণা নিয়ে আধুনিকের মনে স্বভাবত বড়ো সংশয় দেখা দেয়৷ ‘ব্রহ্মচর্যপালন বলিতে যে কৃচ্ছ্রসাধন বুঝায় তাহা নহে৷ সংসারের মাঝখানে যাহারা থাকে তাহারা ঠিক স্বভাবের পথে চলিতে পারে না৷ নানা লোকের সংঘাতে নানা দিক হইতে নানা ঢেউ আসিয়া অনেক সময়ে অনাবশ্যকরূপে তাহাদিগকে চঞ্চল করিয়া থাকে––’ (‘শিক্ষাসমস্যা’, পূর্বোক্ত, পৃ ৩২৬)৷ এই স্বভাবকে ফিরে পাওয়াতেই তো আত্মতার গরজ৷ কিন্তু এ-পথ শুধু ব্যক্তির একলা চলার পথ নয়৷ ব্যক্তিমহিমায় নিশ্চয়ই কিছুদূর পর্যন্ত পথ চলা সম্ভব৷ কিন্তু পরিণামের প্রশ্নে চারপাশের মানসিক আবহের প্রশ্ন একান্ত জরুরি৷ ১৯৩৬-এ কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিউ এডুকেশন ফেলোশিপের সভায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘Another necessary factor of education is the environment of national mind.’৷ এই ‘environment of national mind’ পাঁচ জনের হাতের ব্যাপার, প্রায় সর্বশক্তিমান কোনো প্রতিভাবানের একক হাতে জাতির এই মানসিক আবহ ঠিক গড়ে তোলা যায় না৷ সবার তরফে গ্রহণের প্রশ্নটা এখানেই জরুরি৷ উত্তরাধিকারের দায়ও এখানে৷ সবার মিলিত জীবনেও স্বভাবের পথ খুঁজে নেওয়ার প্রশ্ন তাই অবহেলা করা চলে না৷ ‘সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ’, স্পষ্টত আধ্যাত্মিকতায় রণিত এইসব পঙক্তির অন্তর্নিহিত বার্তায় পৌঁছোবার জন্য তাই অনাবশ্যক চিত্তবিক্ষেপ থেকে আড়াল করতে হয় নিজেকে, আর তা করতে পারলে সেইসব দুর্লভ মুহূর্তে টের পাওয়া যায় কতটা আধুনিকতায় বেজে উঠতে পারে এসব লাইন৷ আধুনিক মানুষকে কিন্তু একা হতেই হয়, একা হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়, তেমন করে একা হতে জানলেই তবে নিজেকে মেলানো যায়৷ আর সমাজসত্তায় আত্মনিষ্ঠ স্বভাবের গরজে ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারলে তবেই মিলতে পারে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় পুষ্টি৷ যত বড়ো প্রতিভাসম্পন্নই হন না কেন, কোনো নায়কের উজ্জ্বল মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বাঁচে না৷ সমাজশিকড় থেকে রস সংগ্রহ করা চাই, তাই সমাজের মাটিতে সে-রসের সঞ্চয় চাই৷ এ-কথা রবীন্দ্রনাথ জানতেন, ভালোই জানতেন, ওই জাতীয় শিক্ষা পরিষদের নায়কদের কাছেও তিনি সে-সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন৷ আত্মতার গরজে স্বভাবকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে হয় কি সাধে, ব্যক্তিতেও, সমাজেও৷ আত্মচ্যুতির বিভ্রম থেকে পার পাওয়ার জন্য রবীন্দ্রশিক্ষাদর্শনেও আমরা ফিরে যেতে পারি৷


২০০৩

প্রবন্ধটি লেখকের বই "কেন আমরা রবীন্দ্রনাথকে চাই এবং কীভাবে" এর অন্তর্ভুক্ত।

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট