বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ
সৌরীন ভট্টাচার্য
শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর আলোচনা উঠে আসে এর মধ্যে নিশ্চয়ই খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী ও সেই টানে শ্রীনিকেতন প্রসঙ্গও যখন চলে আসে তখন এই প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশে স্বাভাবিকভাবেই আমরা মেতে উঠি৷ ঠিক এই মুহূর্তে এরকম অনেকগুলো নজির আমাদের চোখের সামনে রয়েছে৷ বিশ্বভারতী প্রকল্প যে মূলত ব্যর্থ সে-বিষয়েও যেন প্রায় একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷ এখন শুধু এই মীমাংসা বাকি, এই ব্যর্থতার দায় কতটা কার৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি এর জন্য মূলত দায়ী নন? নাকি তাঁর জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সম্পদ’ বহন করে নিয়ে চলেছে যে সোনার তরী তার দিশাহারা নাবিকেরাই এর জন্য দায়ী? নাকি সমগ্র বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকেই বহন করতে হবে এর দায়ভার? নাকি সরকারি ঔদাসীন্য? নাকি রাজনীতির কুটিল আবর্ত? আধুনিক যুগটা নাকি প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার৷ কাজেই যুগোপযোগী হতে গেলে প্রযুক্তিবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনাবিদ্যা শিক্ষার আয়োজন থাকা চাই৷ খুব সম্প্রতি এরকম আয়োজনের সূত্রপাতও হয়েছে৷ কিন্তু তাতেও কি হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে? নাকি কালের ইশারায় নিজের স্বভাবের খোঁজখবর তেমন করে না নিয়ে আমরা যতই বদলাবার চেষ্টা করছি ততই আরও জটিল জালে জড়িয়ে পড়ছি?
সাফল্য-ব্যর্থতার কথা যখন আমরা বলি, তখন ঠিক কী ভাবি আমরা? কোনো ব্যক্তির জীবনেও যখন এ-প্রশ্ন ওঠে, তখন ঠিক কী থাকে আমাদের চিন্তায়? কে কী হতে চায়, কে কেমনভাবে কাটাতে চায় তার জীবন, সেসব কথা বাদ দিয়ে সাফল্য-ব্যর্থতার অঙ্ক কষার কোনো মানে হয় না৷ গড়পড়তা আর-পাঁচ জন যেমন হবে প্রত্যেককেই যদি সেই মাপে ছাঁটাই করার চেষ্টা হয়, তা হলে সবই তো এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যাবে৷ বৈচিত্র্যের কী দশা হবে তবে? সৃষ্টির জগতে বৈচিত্র্যের দাম আছে৷ শুধু ভিন্নতার খাতিরেই নয়, প্রয়োজনীয়তার খাতিরেও বৈচিত্র্য জরুরি৷ তাই সবই লেপে পুঁছে বেমালুম একাকার করে দিতে না চাইলে বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হয়, তাকে সম্মান জানাতে হয়৷ আর তখন সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশ আর অত সোজাসাপটাভাবে করলে চলে না৷ কথাটা যেমন ব্যক্তির স্তরে সত্য, তেমনই প্রতিষ্ঠানের স্তরেও তা সত্য৷ সব প্রতিষ্ঠান এক উদ্দেশ্যে তৈরি হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এক হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের পিছনের আবেগ ও কল্পনাও যে এক থাকে তা নয়৷ তা হলে এসব প্রশ্ন একেবারে ছেঁটে ফেলে বাদ দিয়ে একমাত্র এই মুহূর্তের প্রয়োজন, লক্ষ্য কিংবা চালু ধরনকে সম্বল করে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিচার করতে বলা কি খুব সমীচীন? অনেক স্বপ্ন কল্পনা আদর্শ এই মুহূর্তের নিরিখে যদি মনে হয় ভাবালুতা, তা হলে ঢাকিসুদ্ধ সেই ভাবালুতা বিসর্জন দেওয়ার আগে নিরিখটাকেই কি একবার মেপে নেওয়া উচিত না? নইলে ক্ষণমুহূর্তই একমাত্র ধ্রুবসত্য, এ-কথা মেনে নিতে হয়৷ কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা ইতিহাসের দিকে তাকালে বারবার দেখা যায়৷ মুহূর্তের নিরিখ যে কতটাই ভঙ্গুর তা যদি বারবার এমনভাবে প্রতীয়মান না হত তা হলে তো পরিবর্তনের জন্য কোনো ফাঁক বের করে নেওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য হত৷ কিন্তু ইতিহাসে পরিবর্তন তো অবশ্যই আছে৷ ক্ষণমুহূর্তের কত কত মানদণ্ড একেবারে জলস্রোতের মতো ভেসে গেছে৷ সমস্ত মূল্যমান ও বিচারের নিরিখ ইতিহাসে নিতান্ত অচিরস্থায়ী৷ কাজেই প্রতিষ্ঠানের বিচারের সময়ে মানদণ্ডের বিপর্যয়-সম্ভাবনা বিষয়ে সজাগ থাকা চাই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী-শ্রীনিকেতনের বিচারে নজর কি শুধুই ডিগ্রি, পাঠক্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ঘেরে আটকে থাকবে? একটা প্রতিষ্ঠানের আবহ ও রণন কি কেবলমাত্র ওইসব জিনিসে ধরা পড়ে? তার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করে নানাদিকে তাকাতে হয়৷ সেই আবহ অনেকসময়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ দৈনন্দিনের মধ্যেও টের পাওয়া যায়৷ দোকান-বাজারের মানুষ, রিক্সাচালক, রাজমিস্ত্রি––এই-যে স্তর, যে-স্তরে সাধারণ জীবনের মানটা ধরা থাকে, সেখানে যদি চকিতে চোখে পড়ে এমন কোনো সরলতা বা সজীবতা যা মুহূর্তের জন্য প্রাত্যহিকের কলুষ থেকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়, তা হলে কি ভাবতে ইচ্ছে করে না যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সবটাই ডিগ্রির গণ্ডিতে আটকে থাকে না হয়তো৷ আর রণন? যেসব বিচারে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ বলে রায় ঘোষণা হয়েই গেছে, যদি দেখা যায় যে, সেইসব বিচারেই অনুজ কোনো প্রতিষ্ঠান দারুণ সফল, আর সে-প্রতিষ্ঠানও ভাবনার আদলে অগ্রজ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণী, তা হলে?
সৌরীন ভট্টাচার্য

সাফল্য-ব্যর্থতার কথা যখন আমরা বলি, তখন ঠিক কী ভাবি আমরা? কোনো ব্যক্তির জীবনেও যখন এ-প্রশ্ন ওঠে, তখন ঠিক কী থাকে আমাদের চিন্তায়? কে কী হতে চায়, কে কেমনভাবে কাটাতে চায় তার জীবন, সেসব কথা বাদ দিয়ে সাফল্য-ব্যর্থতার অঙ্ক কষার কোনো মানে হয় না৷ গড়পড়তা আর-পাঁচ জন যেমন হবে প্রত্যেককেই যদি সেই মাপে ছাঁটাই করার চেষ্টা হয়, তা হলে সবই তো এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যাবে৷ বৈচিত্র্যের কী দশা হবে তবে? সৃষ্টির জগতে বৈচিত্র্যের দাম আছে৷ শুধু ভিন্নতার খাতিরেই নয়, প্রয়োজনীয়তার খাতিরেও বৈচিত্র্য জরুরি৷ তাই সবই লেপে পুঁছে বেমালুম একাকার করে দিতে না চাইলে বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হয়, তাকে সম্মান জানাতে হয়৷ আর তখন সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশ আর অত সোজাসাপটাভাবে করলে চলে না৷ কথাটা যেমন ব্যক্তির স্তরে সত্য, তেমনই প্রতিষ্ঠানের স্তরেও তা সত্য৷ সব প্রতিষ্ঠান এক উদ্দেশ্যে তৈরি হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এক হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের পিছনের আবেগ ও কল্পনাও যে এক থাকে তা নয়৷ তা হলে এসব প্রশ্ন একেবারে ছেঁটে ফেলে বাদ দিয়ে একমাত্র এই মুহূর্তের প্রয়োজন, লক্ষ্য কিংবা চালু ধরনকে সম্বল করে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিচার করতে বলা কি খুব সমীচীন? অনেক স্বপ্ন কল্পনা আদর্শ এই মুহূর্তের নিরিখে যদি মনে হয় ভাবালুতা, তা হলে ঢাকিসুদ্ধ সেই ভাবালুতা বিসর্জন দেওয়ার আগে নিরিখটাকেই কি একবার মেপে নেওয়া উচিত না? নইলে ক্ষণমুহূর্তই একমাত্র ধ্রুবসত্য, এ-কথা মেনে নিতে হয়৷ কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা ইতিহাসের দিকে তাকালে বারবার দেখা যায়৷ মুহূর্তের নিরিখ যে কতটাই ভঙ্গুর তা যদি বারবার এমনভাবে প্রতীয়মান না হত তা হলে তো পরিবর্তনের জন্য কোনো ফাঁক বের করে নেওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য হত৷ কিন্তু ইতিহাসে পরিবর্তন তো অবশ্যই আছে৷ ক্ষণমুহূর্তের কত কত মানদণ্ড একেবারে জলস্রোতের মতো ভেসে গেছে৷ সমস্ত মূল্যমান ও বিচারের নিরিখ ইতিহাসে নিতান্ত অচিরস্থায়ী৷ কাজেই প্রতিষ্ঠানের বিচারের সময়ে মানদণ্ডের বিপর্যয়-সম্ভাবনা বিষয়ে সজাগ থাকা চাই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী-শ্রীনিকেতনের বিচারে নজর কি শুধুই ডিগ্রি, পাঠক্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ঘেরে আটকে থাকবে? একটা প্রতিষ্ঠানের আবহ ও রণন কি কেবলমাত্র ওইসব জিনিসে ধরা পড়ে? তার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করে নানাদিকে তাকাতে হয়৷ সেই আবহ অনেকসময়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ দৈনন্দিনের মধ্যেও টের পাওয়া যায়৷ দোকান-বাজারের মানুষ, রিক্সাচালক, রাজমিস্ত্রি––এই-যে স্তর, যে-স্তরে সাধারণ জীবনের মানটা ধরা থাকে, সেখানে যদি চকিতে চোখে পড়ে এমন কোনো সরলতা বা সজীবতা যা মুহূর্তের জন্য প্রাত্যহিকের কলুষ থেকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়, তা হলে কি ভাবতে ইচ্ছে করে না যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সবটাই ডিগ্রির গণ্ডিতে আটকে থাকে না হয়তো৷ আর রণন? যেসব বিচারে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ বলে রায় ঘোষণা হয়েই গেছে, যদি দেখা যায় যে, সেইসব বিচারেই অনুজ কোনো প্রতিষ্ঠান দারুণ সফল, আর সে-প্রতিষ্ঠানও ভাবনার আদলে অগ্রজ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণী, তা হলে?