বোর্হেসের গোলকধাঁধা | অশ্রুকুমার সিকদার


অশ্রুকুমার সিকদার
বোর্হেসের গোলকধাঁধা

কোনও লেখক নোবেল পুরস্কার পেলে তখনই তাঁকে নিয়ে আমাদের কাগজে হইচই করা হয়। ইয়োর্গে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) এখনও নোবেল পুরস্কার পাননি, তাছাড়া তিনি এমন এক দেশের মানুষ যার কথা খবরের কাগজের চূড়ায় সচরাচর জায়গা পায় না, তাই তাঁর সম্বন্ধে পত্রপত্রিকার এমন নীরবতা। আমাদের দেশেরই বা দোষ কী, বস্তুত ১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে ফেরমেন্টর পুরস্কার পাবার আগে দক্ষিণ আমেরিকার অন্তর্গত আর্জেন্টিনার এই লেখক সম্বন্ধে ইয়োরোপও সাধারণভাবে অজ্ঞ ছিল। অথচ এই বহুপাঠী চিন্তাশীল লেখক যে অন্ধকারময় গোলকধাঁধার জগৎ রচনা করেছেন তা বিশেষভাবে আধুনিক মানুষের উপযোগী। ১৮৯৯ সালের ২৪ অগস্ট বুয়েনোস এয়ার্সে বোর্হেসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বুদ্ধিজীবী লেখক মানুষ। তাঁরই বিশাল গ্রন্থাগারে শৈশব থেকে বোর্হেসের ইচ্ছামতো মানসিক ভ্রমণ আরম্ভ হয়। তাঁর মা এখনও জীবিত, এই অকৃতদার লেখকের ব্যক্তিগত জীবনে তিনিই কেন্দ্রস্বরূপ। বোর্হেসের ধমনীতে হিস্পানি, ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ইহুদি পূর্বপুরুষের রক্ত প্রবহমান। তাঁর একজন পূর্বপুরুষ এসেছিলেন ইংল্যান্ডের অন্তঃপাতী নর্থাম্বারল্যান্ড থেকে। আর একজন ছিলেন পর্তুগিজ জাহাজের ক্যাপ্টেন। অন্য একজন পূর্বপুরুষ আর্জেন্টিনার গৃহযুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেছিলেন। শিক্ষাসংস্কৃতির দিক থেকেও তিনি মিশ্র ঐতিহ্যের মানুষ। কিছুদিন সুইটজারল্যান্ডের জেনিভায়, কিছুদিন স্পেনে তিনি অধ্যয়ন করেন। স্পেনে তিন বছর অধ্যয়নকালে তিনি Ultraista কবিগোষ্ঠীর সংস্রবে আসেন এবং ১৯২১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি আর্জেন্টিনার Ultraismo কবিতার প্রবর্তক ও নেতা হন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত কবিতা-লেখক। তাঁর মুক্তছন্দে লেখা কবিতায় বুয়েনোস এয়ার্সের দৃশ্য ও পরিমণ্ডল মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই সময়ের কবিতায় তাঁর পরবর্তী গদ্যের নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, তাঁর প্রথম যুগের কবিতা অনেক বেশি হার্দ্যগুণে মণ্ডিত। সময়স্রোত ও মৃত্যুচেতনা সেই কবিতাবলিতে প্রমূর্ত ও প্রতিধ্বনিত, এক চরম তাড়নায় যেন তারা পরস্পর একাকার হয়ে গেছে। কবিতা ছাড়া তিনি এই সময় লিখতেন সাহিত্যবিষয়ে প্রবন্ধ।

১৯৩০-এর পর তাঁর রচনায় এক মৌলিক পরিবর্তন এল। তাঁর গদ্যে গল্প লেখার বাইরের ইতিহাস বড় বিচিত্র। একবার পড়ে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান এবং অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী ছিলেন। কয়েক মাস একটি অক্ষরও লেখেননি, কবিতা লেখায় হাত দিতে সাহসই পাননি। তাঁর ভয় হয়েছিল হয়তো লেখার শক্তি চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। অবশেষে তিনি এই ভেবে গল্প লেখায় সন্তর্পণে হাত দেন যে তাঁর গল্প একটা নতুন ব্যাপার হবে এবং পাঠকেরা পুরোনো লেখার সঙ্গে নতুন লেখাকে তুলনা করে খারাপ বলার সুযোগ পাবে না, যেহেতু দুই ধরনের লেখার ধর্ম একেবারে আলাদা। এইভাবে গল্পের উৎস খুলে গেল। তাঁর গদ্যরচনায় হাত দেওয়ার ব্যাপারে এই ঘটনা থেকে যতটা আকস্মিক মনে হয় ততটা আকস্মিক নয়, তার পিছনে আন্তরিক প্রবর্তনাও ছিল। এই মাধ্যম পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। তাঁর কবিতার ইন্দ্রিয়জ জগৎ হয়ে উঠেছিল অবাস্তব, হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। ইন্দ্রিয়জ জগৎ অবাস্তব হয়ে উঠেছিল, কারণ তাঁর বাবা, তাঁর শিল্পী বোন নোরা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের মতো তিনিও দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছিলেন। ইন্দ্রিয়জ জগৎ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনায় পেরোনের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায়। যে আর্জেন্টিনাকে তিনি 'this dismantled republic' বলেছিলেন তার রাজনীতিতে যোগ দেবার উৎসাহ তাঁর ছিল না। রাজনীতিতে নিরুৎসাহ হলেও কিন্তু পেরোনের একনায়কত্বে তাঁকে কম বিব্রত হতে হয় না। প্রথমে মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে সামান্য চাকরি নিয়ে তিনি প্রচুর এলোমেলো অধ্যয়নের যে সুযোগ পেয়েছিলেন তা থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। পেরোন তাঁকে বরখাস্ত করে নিযুক্ত করে হাঁসমুরগির খামারের ইন্সপেকটর পদে। এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে বন্ধুদের উদ্যোগে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন। তাঁদের চেষ্টায় তিনি ইংরেজিমার্কিন সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন, যে বিষয়ে তাঁর সন্দেহাতীত যোগ্যতা ছিল। এইসব অভিজ্ঞতার বশেই হয়তো একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রের চিন্তা তাঁকে কম ভারাক্রান্ত করেনি। Deutsches Requiem গল্পে তাই সহজেই তিনি বক্তার মুখ দিয়ে নাজি-মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে পারেন। The secret Miracle গল্পের চেক নায়ক একদিনভোরে শোনে


A rhythmic, unanimous noise, punctuated by shouts of command, arose from the Zeltnergasse. It was dawn, and the armoured vanguard of the Third Reich was entering Prague.

এমনিভাবে, যিনি একদিন লিটল ম্যাগাজিনসমূহের সম্পাদনায় ব্যস্ত থাকতেন, তিনি এইসব আন্তরিক ও বহির্ঘটনার প্রবর্তনায় হয়ে উঠলেন স্থবির গৃহবাসী বহুপাঠী পণ্ডিত এবং লেখক। নির্জন ঘণ্টাগুলি বিচিত্র সাহিত্য ও দর্শন পাঠে এবং নিজের পাণ্ডুলিপি পরিমার্জনার কাজে এখন তিনি ব্যয় করতে লাগলেন। প্রায়-দৃষ্টিহীন এবং হীনস্বাস্থ্য এই লেখকের অক্ষম অকর্মণ্য শরীরে এক অসামান্য মণীষা দীপ্যমান হয়ে উঠল এবং সেই মনীষার দ্যুতি প্রকাশ পেল তাঁর আকারে-ছোট ঠাসবুনানি দার্শনিক উপাখ্যানগুলিতে । সমস্ত আলোড়ন উত্তেজনার মধ্যে ধ্যানস্থ লেখক রচনা ক'রে চললেন গল্পগুলিতে এক সুশৃঙ্খল নৈর্ব্যক্তিক মনীষার জগৎ। আগে তাঁর প্রবন্ধে থাকত বিশ্লেষণ, কবিতায় থাকত কল্পনা, সেই কল্পনা আর বিশ্লেষণ একাকার হয়ে গেল এই উপাখ্যানগুলিতে-যার মধ্যে বোর্হেসের পরিণত মননের সমস্ত জটিলতা ও আর্তি বর্তমান। তাৎক্ষণিক বাস্তব জগতের পরিবর্তনশীলতা ও উন্মার্গ বিশৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে তাঁর এই রচনাগুলি যেন প্রতিক্রিয়াস্বরূপ। ভালেরির লেখায় যে মনীষার স্বচ্ছ আনন্দ ও শৃঙ্খলার জন্য গূঢ় অভিযান আছে, তা বোর্হেসেরও অভিপ্রেত। পশ্চিমি সভ্যতার প্রত্যন্ত প্রদেশে জন্মে, সেই সভ্যতার সংকট প্রত্যক্ষ ক'রে, তাঁর অনূদিত Labyrinths গ্রন্থের অন্যতম সম্পাদক জেমস ইরবির ভাষায়, বোর্হেস ইয়েটসের মতো 'monuments of unageing intellect' গড়ে তুলেছেন।

১৯৫৩ সালের পর যখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি একেবারে লোপ পেতে বসে তখন তিনি গল্প লেখা ছেড়ে আরও ছোট আকারের প্যারাবল লেখায় হাত দেন। এই প্যারাবগুলো তাঁর El hacedor নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, ইংরেজিতে বইটির নাম Dreamtigers। এতদিন গদ্যচর্চার পর শেষপর্যায়ে আবার তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেছেন, কিন্তু এই শেষপর্যায়ের কবিতা আগের আমলের কবিতার মতো আঙ্গিকে বা বিষয়ে বিদ্রোহী নয়। এই নতুন কবিতা আইন অমান্য করে না, শান্ত তাদের চিত্রকল্প, স্মৃতিতে বিধৃত এই কবিতার স্বর ধীর। এই নিয়মিত সুষম কবিতাগুলি সবদিক থেকেই ঐতিহ্যপরায়ণ, এমন কি প্রথানুগত। আসলে তিনটি গ্রন্থে সংকলিত যে পঁচিশ-ত্রিশটি গল্পের উপর তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতির প্রতিষ্ঠা, সেইসব দার্শনিক উপাখ্যানে বিদ্রোহী বোর্হেসের সত্যস্বরূপ রয়ে গেছে; তাই বোধহয় কবিতায় তাঁর বিদ্রোহের প্রয়োজন এখন ফুরিয়েছে।
নিজের উদ্দেশে যে এলিজি বোর্হেস লিখেছেন তাতে তাঁর ব্যক্তিজীবনের ইতিহাস আছে। কবিতার শেষে বলেছেন বোর্হেসের নিয়তি অন্য সব মানুষের নিয়তি থেকে অভিন্ন। তেমনভাবে বলা যায়, বোর্হেসের উপখ্যানসমূহও সব মানুষের নিয়তির কাহিনি। কবিতাটি তর্জমা ক'রে দিলাম।

এলিজি
হায় বোর্হেসের নিয়তি
এই ভুবনের অনেক সমুদ্রে ভেসে বেড়াল
অথবা সেই একমাত্র একলা সাগরে, নানান যার নাম,
ছিল এডিনবরায়, জুরিখে, দুই করডোবায়,
কলাম্বিয়া এবং টেকসাসে,
পরিবর্তমান প্রজনীর অন্তিমে পৌঁছাল
পূর্বপুরুষের প্রাচীন ভূমিতে,
আনদালুসিয়ায়, পোর্তুগালে, সেইসব দেশে
যেখানে স্যাকসনেরা ডেনদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, ঘটিয়েছে
রক্তে-রক্তে সংমিশ্রণ।
ঘুরে বেড়াল লন্ডনের প্রশান্ত লাল গোলকধাঁধায়,
কত আয়নায় বুড়িয়ে গেল,
মূর্তির চোখে বৃথাই খুঁজল মর্মর চাহনি,
জিজ্ঞাসাবাদ করল প্রস্তরলিপিকে, কোষগ্রন্থকে, মানচিত্রকে,
দেখল অন্য মানুষেরাও যা-যা দ্যাখে,
মৃত্যু, মন্থর উষা, সমতলভূমি,
কমনীয় নক্ষত্রনিচয়,
আসলে দেখলে না কিছুই, কিছুই না,
বুয়েনোস এয়ার্সের এক কন্যার মুখশ্রী ছাড়া,
যে মুখ চায় না তুমি তাকে মনে রাখো।
হায় বোর্হেসের নিয়তি
হয়তো তোমার নিয়তি থেকে কিছু আলাদা নয়।।

স্বদেশি লক্ষণ সাহিত্যে থাকতেই হবে, বা স্বদেশি বিষয় নিয়ে লিখতেই হবে-তা না হলে রচনা জাতীয় ঐতিহ্য থেকে ভ্রষ্ট হবে বোর্হেস একথা মনে করেন না। ঐতিহ্যের নামে তিনি সাহিত্যে জাতীয়তাবাদের বিরোধী। তিনি আর্জেন্টিনার লেখকের ঐতিহ্য সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, নাট্যকার রাসিনকে যদি বলা যেত তিনি গ্রিকপুরাণ অবলম্বনে লিখছেন সেই জন্যে তাঁকে যথার্থ ফরাসি লেখক বলা যায় না তাহলে তিনি হতবাক হতেন। একমাত্র ইংরেজ বিষয় নিয়ে লিখতে হবে বললে শেকসপিয়রও কম আশ্চর্য হতেন না। তাঁর মতের সমর্থন পেয়েছেন বোর্হেস গীবনের রোমক সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ও পতন বিষয়ক ইতিহাসে। সেই বইয়ে গীবন বলেছেন, কোরানে উটের উল্লেখ নেই। বোর্হেসের মতে কোরানের অকৃত্রিমতার চরম প্রমাণ এই উটের অনুল্লেখ। আরবদেশীয় মোহম্মদ জানতেন না উট বিশেষ করে আরবদেশীয় প্রাণী, উট তাঁর কাছে ছিল বাস্তবের অকিঞ্চিৎকর অঙ্গ। তাই উটের উল্লেখের প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি। কিন্তু মেকি লেখক, ট্যুরিস্ট বা আরব জাতীয়তাবাদী হলে কী করত? - প্রত্যেক পৃষ্ঠা উটের মিছিলে সে সাজিয়ে দিত। ‘Mohammed, as an Arab, was unconcerned he knew he could be an Arab without camels’ বোর্হেস মোহম্মদের এই আচরণ অনুকরণীয় মনে করেন। যে দেশে তাঁর জন্ম, যে ভাষার তিনি লেখক সেই দেশও ভাষার প্রতি তাঁর আনুগত্য শুধু নয়; তাঁর আনুগত্য সমগ্র পশ্চিম সভ্যতার উত্তরাধিকারের প্রতি। তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার ঐতিহ্যে বদ্ধমূল।

প্লেটো, স্পিনোজা, পাসকাল, বার্কলে ও হিউমের মতো দার্শনিকের চিন্তা ও তত্ব তাঁকে প্রভাবিত করেছে। জার্মান দার্শনিক নীৎশে ও শোপেনহাউয়ারের ভাবনাও তাঁর রচনায় প্রতিফলিত। বিশেষ ক'রে ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর অধ্যয়ন গভীর। সেই অধ্যয়ন তাঁর রচনাকে পুষ্ট করেছে। তিনি শেকসপিয়রের রচনাবলি, মোরের গ্রন্থ, সুইফটের গ্যালিভারের ভ্রমণকথা, পোপের ইলিয়াডের অনুবাদ, মার্ক টোয়েন, শ', কিপলিঙের রচনা ও ইয়েটসের কবিতার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। হিস্পানি সাহিত্যের প্রধান পুরুষ সের্ভেন্টিসের সঙ্গে তাঁর রচনার সম্পর্ক নিবিড়। এ ছাড়া দান্তের দিব্যমিলন, ক্রোচের কাব্যতত্ব, সুইডেনবোর্গের প্রতীকী রচনা ও কাফকার অন্ধকার থেকেও তিনি প্রেরণা পেয়েছেন। তবে সাহিত্যে প্রভাব সম্বন্ধে তাঁর একটি মত স্মরণীয়, তিনি মনে করেন প্রত্যেক সৎ লেখকই তাঁর পূর্বসূরী তৈরি করে নেন। বোর্হেসের লেখা পড়ার পরও মনে হবে পূর্ববর্তী অনেক লেখকের মধ্যে যেন এই ধরনটি আছে। বিশেষ ক'রে মনে হবে কাফকার মধ্যে আছে বোর্হেসের গোলকধাঁধার পূর্বাভাস। বাস্তবিক তিনি কাফকার অনুরাগী, হিস্পানি ভাষায় যাঁরা কাফকার প্রথম অনুবাদ করেন বোর্হেস তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু পার্থক্য ভুললে চলে না-কাফকা উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু দশ পৃষ্ঠার বড়ো রচনা বোর্হেসের বিরল। বোর্হেস কোনওদিন উপন্যাস লিখবেন একথা বিশ্বাসই হয় না।

এক জাতের লোক আছেন যাঁরা পরিচিত জগৎ সম্বন্ধে আমাদের আস্থাশীল করে তোলেন। অন্য এক দল আছেন, যাঁদের কাজ পরিচিত পৃথিবী সম্বন্ধে পাঠককে সন্দিহান করে তোলা চেনা জগতের ভিত তাঁরা নাড়িয়ে দেন, চেনা জগৎকে হঠাৎ বড় বেশি অচেনা মনে হয়। কাফকার মতো বোর্হেসও এই শ্রেণীর একজন। তাঁর আকারে-ছোট উপাখ্যানগুলিতে যে আর্ন্তজাতিক বাতাবরণ পাই তা লেখকের মিশ্ররসের ও মিশ্র সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ফল। আধুনিক মানুষের দেশকালজনিত, অনন্ত সম্বন্ধীয় যন্ত্রণা এইসব উপাখ্যানে বিগ্রহ পেয়েছে। এই গল্পগুলি যদিও অদ্ভুত-কল্পনা ও অতিশয়তায় ভরপুর, তবু তা নিতান্ত ইচ্ছাপুরণের ব্যাপার নয়। এখানে অপ্রত্যাশিত এসে নিয়মিত-কে বিভ্রান্ত করে, অন্তর্লীন বাস্তবতা আপাত-বাস্তবতাকে হার মানায়। বোর্হেস একটি রচনায় এক কল্পজগতের কথা বলেছেন। সেই কল্পবিশ্বের সাহিত্য উদ্ভট-কল্পনাময়, তার মহাকাব্য ও উপকথায় কোথাও বস্তুজগতের কথা আদৌ নেই। তাকে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয় নিতান্ত নৈরাজ্যময়, কল্পনার এক দায়িত্বহীন স্বেচ্ছাচার; পরে অবশ্য তার অন্তগূর্ঢ় সুষমা ও সামঞ্জস্য আবিষ্কৃত হয়, তার উদ্ভাবনা নির্দিষ্ট নিয়মের শাসন মান্য করে। বোর্হেসের কল্পবিশ্বের সাহিত্য সম্বন্ধে এইসব কথা তাঁর নিজের সাহিত্য সম্বন্ধেও খাটে।

বোর্হেস একবার বলেছিলেন উদ্ভট-কল্পনাময় সাহিত্যের মৌলিক কৌশল চারটি-গল্পের মধ্যে গল্প (যেমন আরব্যরজনীতে বা মহাকাব্যে মেলে), স্বপ্ন ও বাস্তবের একাকার (যেমন কাফকায়), অতীত বা ভবিষ্যতে প্রয়াণ (পরশুরামের উলটপুরাণ, অরওয়েলের ১৯৮৪) এবং দ্বৈতসত্তা (ডক্টর জেকিল ও মিস্টার হাইডের গল্প)। উদ্ভট-কল্পনায় ভরা তাঁর রচনায়ও বোর্হেস এইসব কৌশল ব্যবহার করেছেন। গল্পের মধ্যে গল্পের উদাহরণ তিনি এইভাবে দিয়েছেন। ধরা যাক, ইংল্যান্ডের মাঝখানে এক সমতলে সর্বাংশে নিখুঁত এক বিরাট ম্যাপ আঁকা হল। তাহলে সেই ম্যাপের মধ্যে আবার তুলনীয় আকারের ম্যাপ থাকতে বাধ্য, আবার সেই ম্যাপেও ম্যাপ থাকবে, এমনি করে অনন্ত পর্যন্ত। Tlon, Uqbar, Orbis Tertius গল্পে পাই কাল্পনিক কোষগ্রন্থে খুঁজে পাওয়া কল্পনা-নির্মিত এক নতুন জগতের কথা। The Lottery in Babylon- এ বাস্তব স্বপ্নের দ্বারা আক্রান্ত কাফকার 'দুর্গ' বা 'আদালতে'র মতো-এখানে বস্তুজগৎ দাঁড়িয়ে আছে লটারির ভিত্তির উপর। গণতান্ত্রিক নির্বাচনই কি এই লটারি? কোম্পানি কে বা কারা? পার্টির সর্বোচ্চ নেতারা, না স্বয়ং ঈশ্বর? Theme of the Traitor and Hero গল্পে দ্বৈতসত্তার কৌশল ব্যবহার করেছেন বোর্হেস-এখানে বীর ও বিশ্বাসঘাতক একই লোক। The House of Asterion গল্পের নায়ক আস্টেরিয়ন আর একজন আস্টেরিয়নকে নিজের বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখায়।

বোর্হেসের গল্পগুলোয় আছে খেলার ধরন। খেলার যেমন সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকে, এই খেলারও তেমনি আরেক নিয়ম আছে, সেও তার নিজেস্ব। নবোকফ ধাঁধা তৈরি করে মজা পান, এই দিক থেকে নবোকফের সঙ্গে বোর্হেসের মিল। Real Life of Sebastian Knight-এ, Pale Fire-এ দ্বৈতসত্তার কৌশল ব্যবহার করেছেন নবোকফ। Pale Fire- এ দীর্ঘ কবিতা ও তার টিকাটিপ্পনী উপন্যাসের অঙ্গ, বোর্হেসের গল্পের সব পাদটিকা এমনকি যেগুলো সম্পাদকের টীকা বলে চিহ্নিত সে সমস্তই লেখকের টীকা এবং সে সবই মূল রচনার অংশ। দু'জনেই গম্ভীর পণ্ডিতি ধরন এই মজার বাক্যের খেলায় ব্যবহার করেন। অবশ্য নবোকফ ও বোর্হেস তুল্য লেখক নন, বোর্হেসের মহিমা নবোকফে নেই। নবোকফের খেলা খেলাতেই শেষ, তাঁর রচনায় একটি নান্দনিক ব্যসন আছে; বোর্হেস সেই খেলাকে মেটাফিজিকাল স্তরে উন্নীত করেন। কোথায়ও খেলা, কোথায়ও ধাঁধা, কোথায়ও ভাষায় চাতুরি, কোথায়ও বা রচনাশৈলীর-তার মধ্য দিয়ে তাঁর হাতে গড়ে ওঠে স্বপ্নের জগৎ, দুঃস্বপ্নের জগৎ। সাকার হয়ে ওঠে আতঙ্ক, সেই আতঙ্ক-বোর্হেসের, আমাদেরও।

Labyrinths গ্রন্থের ভূমিকায় মরোয়া বোর্হেসের রচনাশৈলীকে বলেছেন, ‘mathematical style’ । অঙ্কের নিয়মও খেলার নিয়মের মতো, শুধু আরো অনেক কঠিন, আরও অনেক জটিল। কতকগুলো পস্টুলেট স্বীকার করে নিলে তার পরিণাম কী হয়?-এই যেন তাঁর জিজ্ঞাসা। কোনো অদ্ভুত পস্টুলেটকে তার চূড়ান্ত লজিকাল পরিণামে নিলে কী দাঁড়ায়? -তারই সন্ধানে গল্পগুলি তৎপর। তর্কের নিয়ম মেনে নিয়ে কুতর্ক করেন বোর্হেস। তিনি বলেছেন ‘There is a concept which corrupts and upsets all others’. । সেই ধারণা হল ইনফিনিট বা অন্তরের ধারণা জ্ঞাত সান্ত পরিধির মধ্যে অনন্ত সম্ভাবনা সন্ধান করে, অসীম সম্ভাবনার চূড়ান্ত খুঁজতে গিয়ে সব উল্টে াপাল্ট া এবং উদ্ভট ও অপরিচিত হয়ে যায়। এবং এমনভাবে এক স্বয়ংবর নিটোল অন্য-নিরপেক্ষ জগৎ গড়ে ওঠে অঙ্কেরই মতো। The Wall and the Books প্রবন্ধে তিনি চীন সম্রাট শি হুয়াং তি-র কথা বলেছেন, যিনি বিখ্যাত চীনের প্রাচীর নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং সমস্ত বই আগুনে পোড়ানোর আদেশ দিয়েছিলেন। বোর্হেস তাঁর সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন, সম্রাট হয়তো বিশ্বাস করতেন ‘decay cannot enter a closed orb’ । বোর্হেসও তেমনি বাক্যের এক নিশ্ছিদ্র স্বয়ংসম্পূর্ণ জগৎ নির্মাণ করেছেন, যা কতকগুলো অপরিবর্তনীয়, পচনহীন উপলব্ধির ধারক হয়ে উঠেছে। বিচিত্র পদ্ধতিতে ও নানা পরিমাণে শিল্প ও দর্শনের যোগসাজস ঘটিয়ে তিনি যে জগৎ রচনা করেছেন তার নাম দিয়েছেন ‘hieroglyphic world’ । তিনি মনে করেন দৃশ্যমান অবাস্তবতা ছাড়া শিল্প হয় না-অবাস্তব হবে দৃশ্যমান, দৃশ্যমান হয়ে উঠবে অবাস্তব। তিনি তাই নোভালিসের এই উক্তিটি সানন্দে উদ্ধৃত করেন

The greatest magician would be the one who would cast over himself a spell so complete that he would take his own phantasmagorias as autonomous apparitions’.

বোর্হেস তেমনি একজন জাদুকর, প্রতিভার মন্ত্র বলে তিনি তাঁর রচনাগত কল্পনাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন।

এক প্রবন্ধে পাসকালের ব্যবহৃত একটি উপমার সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, সম্ভবত বিশ্ব ইতিহাস এক মুঠো উপমার ইতিহাস। এই প্রত্যয়ের বশবর্তী হয়েই কি বোর্হেস রূপকের মধ্য দিয়ে বিশ্বসত্যকে ধরতে চেয়েছিলেন? অন্তত গ্রিকপুরাণের ল্যাবেরিনথ বা গোলকঁধাধার উপমা তিনি বারবার ব্যবহার করেছেন। কাল্পনিক কোষগ্রন্থে তিনি Tlon নামে এক অপরিচিত গ্রহের ইতিহাস পেলেন, পরে জানা গেল কোষগ্রন্থ এবং ওই গ্রহ এক গুহ্যসম্প্রদায়ের রচনা। সেই কল্পলোক সম্বন্ধে লেখকের মন্তব্য, Tlon বস্তুত এক গোলকধাঁধা, কিন্তু মানুষের হাতে তৈরি গোলকধাঁধা বলে মানুষই তার মর্মোদ্ধার করতে পারে। The Garden of Forking Paths-এর বক্তা বলে গোলকধাঁধা সম্বন্ধে অনেক কিছুই সে জানে, কারণ সে সেই ৎসুই পেন-এর বংশধর যিনি তেরো বছর ধরে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন এবং এক গোলকধাঁধা নির্মাণ করেছিলেন যার মধ্যে মানুষ পথ হারিয়ে ফেলে। সেই আকারহীন উপন্যাসের ‘diaphanous mystery’ যখন উদঘাটিত হল তখন দেখা গেল সময় বিষয়ে লেখা ওই উপন্যাস এবং ওই গোলকধাঁধা বাস্তবিক সমার্থক, অভিন্ন বস্তু। অন্য সব উপন্যাসে অনেকগুলো বিকল্পের সম্মুখীন হলে অন্যগুলো বাদ দিয়ে একটি বেছে নেওয়া হয়, কিন্তু ৎসুই পেন-এর উপন্যাস সব কয়টি বিকল্পকে লেখক একই সঙ্গে গ্রহণ করে দেখেন কোন কোন বিকল্প পথ কোথায় নিয়ে যায়। এমনিভাবে সময়ের গোলকধাঁধাকে উপন্যাসে সাকার করা হয়েছে। গ্রন্থাগারিক বোর্হেস বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে লাইব্রেরির সঙ্গে তুলনা করেছেন, সেই অসীম বৃত্তাকার লাইব্রেরি আবার বস্তুত গোলকধাঁধার তুল্য হয়ে উঠেছে। চেস্টারটনের ফাদার ব্রাউন গল্পগুলির অনুরাগী বোর্হেস ডিটেকটিভ গল্পের ধরনে যে Death and the Compass গল্পটি লিখেছেন তার মধ্যেও আততায়ী অনুভব করেছিল এই জগৎ সংসার এক গোলকধাঁধা যার থেকে পলায়ন সাধ্যাতীত। The House of Asterion গল্পে সেই ক্রেটান গোলকধাঁধার ইশারা পাই, যার মধ্যে ঢুকে থিসিউস মিনোটরকে বধ করেছিল। আস্টেরিয়নের বাড়ি আর বিশ্বের মাপ সমান, বোঝাই যায় বাড়িটা বিশ্বের উপমান। এই বাড়ির এক অংশের পুনরাবৃত্তি অন্য অংশে, এবং তালা নেই, তালা-দেওয়া দরজা নেই, তবুও সে বন্দী। এই বাড়ি বা বিশ্ব তাই গোলকধাঁধা ছাড়া কিছু নয়। এই গোলকধাঁধা দুঃস্বপ্নময় পরাবাস্তব জগতের, সময়ের, নিয়তির। দেশকাল-বিজড়িত এই নিয়তিবাদী গোলকধাঁধার কথা বোর্হেস লিখেছেন Conjectural Poem নামে একটি কবিতায়, তার ইংরেজি অনুবাদের অংশ উদ্ধৃতি করছি। শক্রর মর্মান্তিক আঘাতে আহত ডক্টর ফ্রান্সিসকো লাপ্রিদা মৃত্যুর পূর্বাহ্নে চিন্তা করছেন।

I see at last that I am face to face
with my South American destiny,
I was carried to this ruinous hour
by the intricate labyrinth of steps
woven by my days from a day that goes
back to my birth. At last I’ve discovered
the mysterious key to all my years,
the fate of Francisco de Laprida,
the missing letter, the perfect pattern,
that was known to God from the beginning.
In this night’s mirror I can comprehend
my unsuspected true face. The circle’s
about to close. I wait to let it come.

তাঁর গল্পগুলোকে মনে হতে পারে আঙ্গিকের খেলা, তার মধ্যে কোনও মানবিক দায়িত্ব বা অনুভূতি নেই, মনে হতে পারে লেখকের জীবনের সঙ্গে এই রচনাবলির কোনও যোগ নেই। কিন্তু উলটোটাই সত্যি। মানবিক দায়িত্ব তাঁর লেখায় অস্বীকৃত নয়, কিন্তু তার প্রকাশ পরোক্ষ এবং তির্যক। তা ছাড়া তাঁর গল্পের ঘটনা ও চরিত্রের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল আছে, তাদের ভিত আত্মজৈবনিক। তাঁরই মতো তাঁর চরিত্রগুলো উদ্ভটবিষয়, গুহ্যবিষয়ে জ্ঞান-আহরণে প্রায়-ইন্দ্রিয়জ আনন্দ পায়। ধাঁধার রহস্যে তিনি সত্য খোঁজেন, তাই- একিলিস ও কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতার বিখ্যাত জেনোর প্যারাডক্স বা জার্মান কার্ডিনাল নিকোলাসের কথা - বৃত্ত অনন্ত বাহুবিশিষ্ট একটি ক্ষেত্র বা পলিগন তাঁকে আকৃষ্ট করে। পুরোনো বই, ছেঁড়া পাণ্ডুলিপি, পুরোনো মানচিত্র, কোষগ্রন্থ বা অভিধান তাঁকে আকর্ষণ করে; এই জাতীয় বাক্য শোনামাত্র তাঁর কৌতূহল চরমে ওঠে - 'আয়না এবং যৌনসঙ্গম খারাপ ব্যাপার, কেননা তাতে জনসংখ্যা বাড়ে।' জাদু সংখ্যা, প্রতিষ্ঠিত ধর্মমতের বিপরীত মত, যেমন বোর্হেসের তেমনি চরিত্রগুলোর কৌতূহল জাগায়। গ্রন্থাগারিক লেখকের রচনায় অনেক ঘটনা ঘটে গ্রন্থগারে এবং তাঁর অধিকাংশ গল্পের পটভূমি বুয়েনোস এয়ার্স শহর, যদিও গল্প থেকে চট করে তাকে চিনে নেওয়া যায় না। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি দেখেছেন যখন তিনি স্থানচিত্র খোঁজেন না, যখন বুয়েনোস এয়ার্সের নগরচিত্র দুঃস্বপ্নের আতঙ্কে বিকলাঙ্গ হয়ে যায়, তখনই সেই শহরের স্বভাব তাঁর রচনায় ধরা পড়ে।

তাই তাঁর লেখায় যে বার বার সের্ভেন্টিসের কথা আসে তা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। শুধু হিম্পানি ভাষার মহত্তম লেখকের প্রতি বোর্হেসের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য নয়, সের্ভেন্টিসের ডন কুইকসোট যেমন জীবন ও সাহিত্যের মিশ্র রসায়ণে রচিত, বোর্হেসের রচনাবলিও তাই। সাহিত্য ও জীবনের এই সংযোগ আসলে সত্য ও অধ্যাসের সমস্যাকেই প্রতিবিম্বিত করে। আমরা প্রত্যেকেই এক চিরন্তন আখ্যানের লেখক পাঠক ও চরিত্র, আমরাই অধ্যাসের নির্মাতা, তার প্রতীকের পাঠোদ্ধারের চেষ্টা আমরাই করি, পরিণামে দেখি সেই চেষ্টা কোনো এক সর্বোত্তম লেখকের সৃষ্টির কাছে পরাজিত হয়। বার্কলের তত্ব থেকে এক পা এগিয়ে বোর্হেস শুধু দেশকে নয়, কালকেও অস্বীকারের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর গোলকধাঁধাগুলিকে দেশাতীত কালাতীত করতে চাইলেও তারা হয়ে গেছে দেশে কালে বিজড়িত, -কারণ বোর্হেস জানতেন, ‘The world, unfortunately, is real I unfortunately, am Borges’ । তাঁর রচনাবলির সঙ্গে তাঁর জীবনের যোগের কথা চমৎকারভাবে নিজেই বলেছেন তিনি Borges and I নামের প্যারাবলটিতে। সেটির সম্পূর্ণ বাংলা তর্জমা উদ্ধৃত করছি।

বোর্হেস ও আমি

যার নাম বোর্হেস, সেই অন্য জনের জীবনেই সব ঘটে। আমি বুয়েনোস এয়ার্সের পথ দিয়ে চলতে এক লহমার জন্য দাঁড়াই, যান্ত্রিকভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি প্রবেশপথের খিলান ও দরজার জাফরির কাজ; আমি বোর্হেসকে জানি ডাকে আসা চিঠিপত্রে, অধ্যাপকদের নামের তালিকায় ও জীবনী-অভিধানে তার নাম দেখে। আমি ভালোবাসি সময়-মাপা গেলাস, মানচিত্র, আঠারো শতকের ছাপাখানার অক্ষর, কফির স্বাদ, স্টিভেনসনের গদ্য; সেও এসব পছন্দ করে, কিন্তু গরিমার বশবর্তী হয়ে সে এই সমস্তকে পর্যবসিত করে যেন অভিনেতার গুণে। আমাদের পরস্পরের সম্পর্ক বিদ্বেষের এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে; আমি বেঁচে আছি, আমি জীবন-যাপন করে চলেছি, যাতে বোর্হেস সাহিত্য রচনা করতে পারে, এবং সেই সাহিত্যেই আমার সার্থকতা। বাড়িয়ে না বলেও এ কথা বলা যায়, কয়েক পৃষ্ঠা অকৃত্রিম রচনা সে লিখেছে। কিন্তু সেই কয় পৃষ্ঠাও আমাকে অমরত্ব দিতে পারবে না। কারণ যা ভাল তার মালিক কেউ নয়, এমনকি সেও নয়, ভাষা এবং ঐতিহ্যই তার যথার্থ স্বত্বাধিকারী। তাছাড়া বিনাশই আমার নিশ্চিত নিয়তি, শুধু আমার কয়েকটি মুহূর্ত তার মধ্যে বেঁচে থাকবে। অল্প অল্প ক'রে আমি সব কিছুই তার হাতে তুলে দিচ্ছি, যদিও আমি জানি অস্বাভাবিক অভ্যাসে সে অতিশয়োক্তির দিকে ঝোঁকে এবং সব কিছুকেই কৃত্রিম করে তোলে। স্পিনোজা জানতেন সব জিনিসই আপন সত্তা রক্ষায় উৎসুক, পাথর চিরন্তনভাবে পাথর হতে চায়, বাঘ হতে চায় বাঘ। আমি বেঁচে থাকব বোর্হেসের মধ্যে, নিজের মধ্যে নয় (অবশ্য আমি একজন কেউ, একথা যদি সত্যি হয়), কিন্তু তার বইতে আমি নিজেকে খুঁজে পাইনে বললেও চলে; বেশি খুঁজে পাই বরং অন্য বইতে, গিটারের শ্রমসাধ্য ঝংকারে। অনেক বছর আগে আমি তার থেকে স্বাধীনতা পেতে চেয়েছিলাম এবং শহরতলীর পুরাণ রচনা ছেড়ে শুরু করেছিলাম কাল ও অনন্তকে নিয়ে খেলা করতে, কিন্তু সেই সব খেলারও মালিক এখন বোর্হেস এবং আমাকে এখন তাই অন্য কিছু কল্পনা করতে হবে। আমার জীবন শুধু উড়ে যাওয়া, আমার সব কিছুই আমি হারিয়ে ফেলি এবং আমার সব কিছুর অধিকারী হয়-হয় বিস্মরণ অথবা সে।
আমি জানি না আমাদের দুজনের মধ্যে কে এই পৃষ্ঠার লেখক।

বোর্হেসের উপাখ্যানগুলি যতই বিচিত্র বা উদ্ভট হোক তার মধ্যে কতকগুলো সাধারণ লক্ষণ মেলে। তিনি এমনভাবে লেখেন যেন পুঞ্জীভূত ইতিহাসস্তূপের কোনও অস্তিত্ব নেই, অথবা যদি তার অস্তিত্ব থেকেও থাকে তাকে মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করা উচিত। প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে তাই চ্যালেঞ্জ করে উলটো মত প্রতিষ্ঠায় তিনি আনন্দ পান-জুডাস যে ত্রিশটি মুদ্রার বিনিময়ে যীশুকে ধরিয়ে দেয়নি, তার উদ্দেশ্য যে মহত্তর ছিল তা প্রমাণে বোর্হেস প্রয়াস পেয়েছেন। ইতিহাসের সব কিছুই তাঁর কাছে হয় আনকোরা নতুন, নইলে বহু পুরোনো। অনেক উপাখ্যানে পাঠককে নিয়ে যায় আদিম সময়ে বা একেবারে ইতিহাসের বাইরে। কালস্রোতে এখানে একাকার -অতীত ও বর্তমান অনুষঙ্গের যোগে হয়ে ওঠে সমসাময়িক। হাতের মুঠোয় একটি মুদ্রার কথা মনে পড়িয়ে দেয় কারোনের পারানির কড়ির কথা, জুডাসের ত্রিশ মুদ্রা, বেশ্যা লাইসের দ্রামা, এক হাজার এক রাত্রির জাদুকরের উজ্জ্বল মুদ্রার কথা, শাহনামার ষাট হাজার চরণের জন্য সেই ষাট হাজার রৌপ্যমুদ্রার কথা যা সম্রাটকে ফিরদৌসি সুবর্ণমুদ্রা নয় বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, আহাবের মাস্তুলে-লাগানো বা লিওপোল্ড ব্লুমের ফ্লোরিনের কথা।

এই রচনাবলির মুখ্য আবেগ ভয় এবং ভয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হিসাবেই এই উপাখ্যানগুলি রচিত। বিশৃঙ্খলার নৈরাজ্যের শক্তির এইসব রচনায় বোর্হেস বুদ্ধির শৃঙ্খলাকে আবাহন করেছেন। এক ক্লাসিকাল শাসনে অস্তিত্বের খিল খুলে দেওয়া ভয় এখানে যৎপরোনাস্তি শাসিত। তাঁর কল্পনাজগতের মূর্ত ভয়কে প্রথমে মনে হতে পারে অস্বাভাবিক অবাস্তব, কিন্তু পরে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে যায় সেই ভয় সম্ভাবনারূপে বাস্তবজগতের পাকে-পাকে জড়িয়ে আছে। সেই জন্যেই তাঁর রচনা আমাদের এতটা ভাবিয়ে তোলে। এই ভয়কে সাকার করতে এবং তাকে শাসন করতে বোর্হেস মৃত্যু বা হত্যার ঘটনা বেছে নিয়েছেন, কারণ জনসন যখন বলেছিলেন কয়েক দণ্ড পরে ফাঁসি হবে জানলে মাথা খুব পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন তিনি খুব একটা খাঁটি কথা বলেছিলেন। The Garden of Forking Paths-এ খুনের ঘটনা আছে, Death and the Compass-এ অনেকগুলো খুনের কথা আছে। The Secret Miracle-এর নায়ক তখনই অসমাপ্ত নাটক শেষ করতে পারল যখন বধ্যভূমিতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হল। যেখানে খুনের গল্প নেই, সেখানেও এক অপ্রতিরোধ্য আতঙ্কের গুরুতর ভার যেন সত্তার উপর চেপে বসে।

কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তাঁর রচনা কারুণ্য বা ভাবাবেগ, কোনও মানবীয় উপাদানই নেই। তাঁরা বলেন, এই উপাখ্যানগুলো সাহিত্যের বিশেষজ্ঞের, দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীর জন্য লেখা। যাঁরা বোর্হেসের নিঃসঙ্গ জীবনকে জানেন, যাঁরা জানেন অ্যালকেমির কোন অলৌকিক রসায়নে তিনি আত্মজৈবনিক উপলব্ধিকে বাকবিভূতিতে রূপান্তরিত করেছেন, তাঁরা এই অভিযোগ মেনে নেবেন না। সে যাই হোক, এই আকারে-ছোট রচনাগুলো অসহ্য তীব্রতা ধারণা ক'রে থাকলেও সেগুলো পড়া কঠিন নয়। তাঁর গদ্যে কোনও শব্দই অতিরিক্ত নয়, গদ্য ঠাসবুনানি কিন্তু স্বচ্ছ। বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক গদ্যের মতো এই গদ্যে অর্থই মুখ্য। বক্তব্যপ্রধান, সংজ্ঞার্থপ্রধান এই গদ্যর সংক্ষিপ্ত, ষ্পষ্ট, ঘন-প্রায় আইনের ভাষার মতো। সুষ্পষ্টতার দায়ে কঠিন দার্শনিক শব্দের পাশে তিনি চলিত লৌকিক শব্দ বসাতে দ্বিধা করেন না। ভাষা সুষ্পষ্ট, কিন্তু ভাবে বা বক্তব্যে দ্ব্যর্থতার অভাব নেই, তিনি মনে করেন ambiguity is richness ।

কখনও পরিহাস করার জন্য, কখনও উদ্ভট-কল্পনাকে সাকার করার জন্য তিনি গবেষক পন্ডিতের গম্ভীর মন্থর ভাষাবিন্যাস অনুসরণ করেন। তাঁর Tlon, Uqbar, Orbis Tertius এমন রচনাভঙ্গির চমৎকার উদাহরণ। Pierre Menard, Author of the Quixote গল্পে, যেখানে নায়ক সের্ভেন্টিসের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হওয়ায় অক্ষরে-অক্ষরে এক আর-একখানি 'ডন কুইকসোট' লিখে ফেলেছিল, সেখানেও এই গবেষকের ভঙ্গি মেলে। সেই কাল্পনিক লেখকের রচনাবলির তালিকা ও তাদের প্রকাশকাল দিয়ে এই গল্পের সূত্রপাত হয়েছে। সাহিত্যিক মনীষীদের সম্বন্ধে স্মরণগ্রন্থে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির রচনার আলোচনা বা স্মৃতিকথা থাকে; ঠিক সেই ভঙ্গি অনুকরণ করে Funes the Memorious গল্পে লেখক স্মারকসংকলনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যেন Funes - এর স্মৃতিকথা লিখেছেন। এলিয়টের মতো তিনি অন্যের রচনার অংশ নিজের সামিল করে নেন-উদ্ধৃতি হয়ে যায় মূল রচনার অংশ। The Immortal গল্পে তিনি হোমারের ইলিয়াডের উদ্ধৃতি গেঁথে-গেঁথে এক অলৌকিক জগতকে বাস্তব করে তুলেছেন। কখনও-কখনও মজা করার জন্য নিজের রচনার উদ্ধৃতিও নিজের অন্য রচনায় জুড়ে দেন তিনি। এই রচনাবলিতে মজা ও সিরিয়াস-ভাব এমন আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে গেছে যে তাদের আলাদা করা যায় না।

এমনি করে মনীষার ব্যবহারে, ভাষার নিজস্ব শৈলীর সাহায্যে, বিচিত্র অপ্রচলিত বিষয়ে প্রচুর অধ্যয়নের উপকরণ ব্যবহার করে, প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে অব্যবস্থিত বিপরীতকে আবিষ্কার করার বিদ্রোহী কৌতুকের সাহায্যে, অন্ধত্বের ফলে ইন্দ্রিয়জ জগৎ থেকে সরে এসে অন্তরস্থ অন্ধকার গোলকধাঁধার মধ্যে বিশ্বের গোলকধাঁধাকে প্রতিবিম্বিত করে, বোর্হেস তাঁর সেই মুষ্টিমেয় রচনাবলি লিখেছেন - যে রচনাবলিতে সংকীর্ণ আয়তনের মধ্যে ধরা পড়েছে ঝঞ্ঝার উম্মত্ত তীব্রতা। নিজের রচনার সেই চরিত্র বোর্হেস নিজেই কবিতায় লিখেছেন, বাংলা তর্জমায় কবিতাটি উদ্ধৃত করছি-

কী দিয়ে তোমাকে ধরে রাখব?
আমি তোমাকে দিই সংকীর্ণ গলিপথ
আমি তোমাকে দিই একলা চাঁদের দিকে যে মানুষ
বড় দীর্ঘ দিন তাকিয়ে থেকেছে তার তিক্ততা।
আমি তোমাকে দিই আমার পূর্বপুরুষদের।
আমি দিতে পারি আমার একাকিত্ব, আমার অন্ধকার,
হৃদয়ের ক্ষুধা; আমি তোমাকে ঘুষ দিতে চাইছি
সংশয়ের, বিপদের,
হেরে যাওয়ার।।

এক্ষণ
৬ষ্ঠ বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা
(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৭৫)

No comments:

Post a Comment

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2018. All rights reserved by বইয়ের হাট