
অশ্রুকুমার সিকদার
বোর্হেসের গোলকধাঁধা
কোনও লেখক নোবেল পুরস্কার পেলে তখনই তাঁকে নিয়ে আমাদের কাগজে হইচই করা হয়। ইয়োর্গে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) এখনও নোবেল পুরস্কার পাননি, তাছাড়া তিনি এমন এক দেশের মানুষ যার কথা খবরের কাগজের চূড়ায় সচরাচর জায়গা পায় না, তাই তাঁর সম্বন্ধে পত্রপত্রিকার এমন নীরবতা। আমাদের দেশেরই বা দোষ কী, বস্তুত ১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে ফেরমেন্টর পুরস্কার পাবার আগে দক্ষিণ আমেরিকার অন্তর্গত আর্জেন্টিনার এই লেখক সম্বন্ধে ইয়োরোপও সাধারণভাবে অজ্ঞ ছিল। অথচ এই বহুপাঠী চিন্তাশীল লেখক যে অন্ধকারময় গোলকধাঁধার জগৎ রচনা করেছেন তা বিশেষভাবে আধুনিক মানুষের উপযোগী। ১৮৯৯ সালের ২৪ অগস্ট বুয়েনোস এয়ার্সে বোর্হেসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বুদ্ধিজীবী লেখক মানুষ। তাঁরই বিশাল গ্রন্থাগারে শৈশব থেকে বোর্হেসের ইচ্ছামতো মানসিক ভ্রমণ আরম্ভ হয়। তাঁর মা এখনও জীবিত, এই অকৃতদার লেখকের ব্যক্তিগত জীবনে তিনিই কেন্দ্রস্বরূপ। বোর্হেসের ধমনীতে হিস্পানি, ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ইহুদি পূর্বপুরুষের রক্ত প্রবহমান। তাঁর একজন পূর্বপুরুষ এসেছিলেন ইংল্যান্ডের অন্তঃপাতী নর্থাম্বারল্যান্ড থেকে। আর একজন ছিলেন পর্তুগিজ জাহাজের ক্যাপ্টেন। অন্য একজন পূর্বপুরুষ আর্জেন্টিনার গৃহযুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেছিলেন। শিক্ষাসংস্কৃতির দিক থেকেও তিনি মিশ্র ঐতিহ্যের মানুষ। কিছুদিন সুইটজারল্যান্ডের জেনিভায়, কিছুদিন স্পেনে তিনি অধ্যয়ন করেন। স্পেনে তিন বছর অধ্যয়নকালে তিনি Ultraista কবিগোষ্ঠীর সংস্রবে আসেন এবং ১৯২১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি আর্জেন্টিনার Ultraismo কবিতার প্রবর্তক ও নেতা হন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত কবিতা-লেখক। তাঁর মুক্তছন্দে লেখা কবিতায় বুয়েনোস এয়ার্সের দৃশ্য ও পরিমণ্ডল মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই সময়ের কবিতায় তাঁর পরবর্তী গদ্যের নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, তাঁর প্রথম যুগের কবিতা অনেক বেশি হার্দ্যগুণে মণ্ডিত। সময়স্রোত ও মৃত্যুচেতনা সেই কবিতাবলিতে প্রমূর্ত ও প্রতিধ্বনিত, এক চরম তাড়নায় যেন তারা পরস্পর একাকার হয়ে গেছে। কবিতা ছাড়া তিনি এই সময় লিখতেন সাহিত্যবিষয়ে প্রবন্ধ।
১৯৩০-এর পর তাঁর রচনায় এক মৌলিক পরিবর্তন এল। তাঁর গদ্যে গল্প লেখার বাইরের ইতিহাস বড় বিচিত্র। একবার পড়ে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান এবং অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী ছিলেন। কয়েক মাস একটি অক্ষরও লেখেননি, কবিতা লেখায় হাত দিতে সাহসই পাননি। তাঁর ভয় হয়েছিল হয়তো লেখার শক্তি চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। অবশেষে তিনি এই ভেবে গল্প লেখায় সন্তর্পণে হাত দেন যে তাঁর গল্প একটা নতুন ব্যাপার হবে এবং পাঠকেরা পুরোনো লেখার সঙ্গে নতুন লেখাকে তুলনা করে খারাপ বলার সুযোগ পাবে না, যেহেতু দুই ধরনের লেখার ধর্ম একেবারে আলাদা। এইভাবে গল্পের উৎস খুলে গেল। তাঁর গদ্যরচনায় হাত দেওয়ার ব্যাপারে এই ঘটনা থেকে যতটা আকস্মিক মনে হয় ততটা আকস্মিক নয়, তার পিছনে আন্তরিক প্রবর্তনাও ছিল। এই মাধ্যম পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। তাঁর কবিতার ইন্দ্রিয়জ জগৎ হয়ে উঠেছিল অবাস্তব, হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। ইন্দ্রিয়জ জগৎ অবাস্তব হয়ে উঠেছিল, কারণ তাঁর বাবা, তাঁর শিল্পী বোন নোরা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের মতো তিনিও দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছিলেন। ইন্দ্রিয়জ জগৎ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনায় পেরোনের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায়। যে আর্জেন্টিনাকে তিনি 'this dismantled republic' বলেছিলেন তার রাজনীতিতে যোগ দেবার উৎসাহ তাঁর ছিল না। রাজনীতিতে নিরুৎসাহ হলেও কিন্তু পেরোনের একনায়কত্বে তাঁকে কম বিব্রত হতে হয় না। প্রথমে মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে সামান্য চাকরি নিয়ে তিনি প্রচুর এলোমেলো অধ্যয়নের যে সুযোগ পেয়েছিলেন তা থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। পেরোন তাঁকে বরখাস্ত করে নিযুক্ত করে হাঁসমুরগির খামারের ইন্সপেকটর পদে। এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে বন্ধুদের উদ্যোগে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন। তাঁদের চেষ্টায় তিনি ইংরেজিমার্কিন সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন, যে বিষয়ে তাঁর সন্দেহাতীত যোগ্যতা ছিল। এইসব অভিজ্ঞতার বশেই হয়তো একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রের চিন্তা তাঁকে কম ভারাক্রান্ত করেনি। Deutsches Requiem গল্পে তাই সহজেই তিনি বক্তার মুখ দিয়ে নাজি-মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে পারেন। The secret Miracle গল্পের চেক নায়ক একদিনভোরে শোনে
বোর্হেসের গোলকধাঁধা
কোনও লেখক নোবেল পুরস্কার পেলে তখনই তাঁকে নিয়ে আমাদের কাগজে হইচই করা হয়। ইয়োর্গে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) এখনও নোবেল পুরস্কার পাননি, তাছাড়া তিনি এমন এক দেশের মানুষ যার কথা খবরের কাগজের চূড়ায় সচরাচর জায়গা পায় না, তাই তাঁর সম্বন্ধে পত্রপত্রিকার এমন নীরবতা। আমাদের দেশেরই বা দোষ কী, বস্তুত ১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে ফেরমেন্টর পুরস্কার পাবার আগে দক্ষিণ আমেরিকার অন্তর্গত আর্জেন্টিনার এই লেখক সম্বন্ধে ইয়োরোপও সাধারণভাবে অজ্ঞ ছিল। অথচ এই বহুপাঠী চিন্তাশীল লেখক যে অন্ধকারময় গোলকধাঁধার জগৎ রচনা করেছেন তা বিশেষভাবে আধুনিক মানুষের উপযোগী। ১৮৯৯ সালের ২৪ অগস্ট বুয়েনোস এয়ার্সে বোর্হেসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বুদ্ধিজীবী লেখক মানুষ। তাঁরই বিশাল গ্রন্থাগারে শৈশব থেকে বোর্হেসের ইচ্ছামতো মানসিক ভ্রমণ আরম্ভ হয়। তাঁর মা এখনও জীবিত, এই অকৃতদার লেখকের ব্যক্তিগত জীবনে তিনিই কেন্দ্রস্বরূপ। বোর্হেসের ধমনীতে হিস্পানি, ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ইহুদি পূর্বপুরুষের রক্ত প্রবহমান। তাঁর একজন পূর্বপুরুষ এসেছিলেন ইংল্যান্ডের অন্তঃপাতী নর্থাম্বারল্যান্ড থেকে। আর একজন ছিলেন পর্তুগিজ জাহাজের ক্যাপ্টেন। অন্য একজন পূর্বপুরুষ আর্জেন্টিনার গৃহযুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেছিলেন। শিক্ষাসংস্কৃতির দিক থেকেও তিনি মিশ্র ঐতিহ্যের মানুষ। কিছুদিন সুইটজারল্যান্ডের জেনিভায়, কিছুদিন স্পেনে তিনি অধ্যয়ন করেন। স্পেনে তিন বছর অধ্যয়নকালে তিনি Ultraista কবিগোষ্ঠীর সংস্রবে আসেন এবং ১৯২১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি আর্জেন্টিনার Ultraismo কবিতার প্রবর্তক ও নেতা হন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত কবিতা-লেখক। তাঁর মুক্তছন্দে লেখা কবিতায় বুয়েনোস এয়ার্সের দৃশ্য ও পরিমণ্ডল মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই সময়ের কবিতায় তাঁর পরবর্তী গদ্যের নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, তাঁর প্রথম যুগের কবিতা অনেক বেশি হার্দ্যগুণে মণ্ডিত। সময়স্রোত ও মৃত্যুচেতনা সেই কবিতাবলিতে প্রমূর্ত ও প্রতিধ্বনিত, এক চরম তাড়নায় যেন তারা পরস্পর একাকার হয়ে গেছে। কবিতা ছাড়া তিনি এই সময় লিখতেন সাহিত্যবিষয়ে প্রবন্ধ।
১৯৩০-এর পর তাঁর রচনায় এক মৌলিক পরিবর্তন এল। তাঁর গদ্যে গল্প লেখার বাইরের ইতিহাস বড় বিচিত্র। একবার পড়ে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান এবং অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী ছিলেন। কয়েক মাস একটি অক্ষরও লেখেননি, কবিতা লেখায় হাত দিতে সাহসই পাননি। তাঁর ভয় হয়েছিল হয়তো লেখার শক্তি চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। অবশেষে তিনি এই ভেবে গল্প লেখায় সন্তর্পণে হাত দেন যে তাঁর গল্প একটা নতুন ব্যাপার হবে এবং পাঠকেরা পুরোনো লেখার সঙ্গে নতুন লেখাকে তুলনা করে খারাপ বলার সুযোগ পাবে না, যেহেতু দুই ধরনের লেখার ধর্ম একেবারে আলাদা। এইভাবে গল্পের উৎস খুলে গেল। তাঁর গদ্যরচনায় হাত দেওয়ার ব্যাপারে এই ঘটনা থেকে যতটা আকস্মিক মনে হয় ততটা আকস্মিক নয়, তার পিছনে আন্তরিক প্রবর্তনাও ছিল। এই মাধ্যম পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। তাঁর কবিতার ইন্দ্রিয়জ জগৎ হয়ে উঠেছিল অবাস্তব, হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। ইন্দ্রিয়জ জগৎ অবাস্তব হয়ে উঠেছিল, কারণ তাঁর বাবা, তাঁর শিল্পী বোন নোরা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের মতো তিনিও দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছিলেন। ইন্দ্রিয়জ জগৎ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনায় পেরোনের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায়। যে আর্জেন্টিনাকে তিনি 'this dismantled republic' বলেছিলেন তার রাজনীতিতে যোগ দেবার উৎসাহ তাঁর ছিল না। রাজনীতিতে নিরুৎসাহ হলেও কিন্তু পেরোনের একনায়কত্বে তাঁকে কম বিব্রত হতে হয় না। প্রথমে মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে সামান্য চাকরি নিয়ে তিনি প্রচুর এলোমেলো অধ্যয়নের যে সুযোগ পেয়েছিলেন তা থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। পেরোন তাঁকে বরখাস্ত করে নিযুক্ত করে হাঁসমুরগির খামারের ইন্সপেকটর পদে। এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে বন্ধুদের উদ্যোগে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন। তাঁদের চেষ্টায় তিনি ইংরেজিমার্কিন সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন, যে বিষয়ে তাঁর সন্দেহাতীত যোগ্যতা ছিল। এইসব অভিজ্ঞতার বশেই হয়তো একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রের চিন্তা তাঁকে কম ভারাক্রান্ত করেনি। Deutsches Requiem গল্পে তাই সহজেই তিনি বক্তার মুখ দিয়ে নাজি-মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে পারেন। The secret Miracle গল্পের চেক নায়ক একদিনভোরে শোনে