Showing posts with label জীবনানন্দ দাশ. Show all posts
Showing posts with label জীবনানন্দ দাশ. Show all posts

নজরুলের কবিতা - জীবনানন্দ দাশ

নজরুলের কবিতা
জীবনানন্দ দাশ

মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়।
নজরুল ইসলাম অনেক দিন থেকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর দৈহিক ওজন আমাদেব জানা আছে, আত্মিক, ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।

জনগণ, ভদ্র সাধারণ এখনও মরে বেঁচে আছে, আসছে সার্বিক নিপাট মৃত্যু এদের জন্যে এবং তার ভিতর থেকেই আরো এবার বেঁচে ওঠবার অধ্যায় - জীবনকে নতুন করে প্রতিপালন করবার প্রয়োজনে।

কিন্তু আমাদের সামাজিক জীবনে এই মৃত্যু ও জীবন যে যার কাছে দুরতিক্রম্য নয়। যতদূর ধারণা করতে পারি, এই মানুষের পৃথিবীতে অনেকদিন থেকে এইরকমই চলেছে, একটা সময় - বৈশিষ্ট্য ক্ষয়িত হয়ে নতুন সাময়িকতাকে নিয়ে আসে। এতে সমাজ কাজে উন্নত না হোক (বা হোক), মূল্যচেতনায় স্থিরতর হবার অবকাশ পায় বলেই তো মনে হয়। প্রবীণ বিরস মনীষীরা যাই ভাবুন না কেন, সাধারণের মানব-মন মনে করে যে ভোর আসছে। একেই কখনো বুদ্ধের, ধর্মাশোকের বা ফরাসী বিপ্লবোত্তর মানবীয় প্রাতঃকাল বলে মনে হয়েছে। সে সব প্রাতঃকাল উন্মেষেই মিলিয়ে গিয়েছে বার বার। ইতিহাসে দীর্ঘ সুদিন কোথায় পেলাম আমরা - এবং সুদীর্ঘ সুরাত্রি? কিন্তু তবুও আবারও ভোর আসছে।

এর থেকে নিরাশার মতামতে উপস্থিত হওয়া যায়, কিংবা জীববিজ্ঞানীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে এই মর্মে উপস্থিত হওয়া যায় যে মানুষ এখনও শিশু – তার সভ্যতার অন্তিমক্ষণ এত দূরে যে আমাদের পক্ষে তা নেই, আমরা এসেছি কেবলমাত্র ভূমিকার ভাঙা গড়ার ভিতর।

আমরাও তাই ভাবি। একটা যুগ ভেঙে যাচ্ছে দেখে আমাদের কারো কারো সাহিত্য স্বভাব ভাঙনের লিপিরচনায় উদ্বেলিত হয়েও যা আজও পাওয়া যায়নি, এমন কোনো নতুন সময়ে আভাসে প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু স্থিরতা পায় কি, অর্থসফলতা লাভ করে ? ফলে আমাদের আগামী যুগের কবিতা হয় অত্যন্ত স্থূল হয়ে দাঁড়ায়, যে সব নিয়মের প্রভাবে আগামীকাল ক্রমে ক্রমে এসে পড়ছে তাদের ভিতর থেকে কয়েকটি প্রতীক বা প্রবর্তয়িতার মত চালিয়ে দিয়ে আমাদের কবিতা কি নবীন হয়ে ওঠে কিংবা কবিতা হয়? আর তা নয় তো, বস্তুশক্তির দুরন্ত ক্রিয়াকৌশলের পরিহাসের দিকে লক্ষ্য রেখেও একান্তভাবে ভাবনানিষ্ঠ হতে গিয়ে আধুনিক ও আগামীকালের কবিতা কারো কারো হাতে এত বেশী তনু সূক্ষ্ম হয়ে দাঁড়ায় যে আজকের কর্তব্যাসক্ত মানসের বিচারে সে কবিতার শব্দ, ভাষা, ইঙ্গিত সমস্তই অসঙ্গত, আচ্ছন্ন বলে মনে হয়। এখনকার বাংলা কবিতায় এই দুটি স্বভাবই লক্ষিত হয়। প্রথমটি নিশান হাতে নিয়ে অগ্রসর হয়েছে নিজের বা অপরের মুখে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত দিব্য দিনের কিছু না কিছু স্বাদ পেয়েছে বলে। কিন্তু এই দুই প্রকৃতির মিশ্রণে ভালো কবিতা পেয়েছি --- নিতান্ত কম নয়।

এ কালের বাংলা কবিতার এই সব অভিব্যক্তির আগে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন। (তখন তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হত)। আমাদের দেশে যে বিশেষ সময়রূপ অনেক দিন থেকে কাজ করে যাচ্ছিল, তেরোশো পঁচিশ আটাশ তিরিশে এক দিক থেকে যেমন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছিল অন্যদিকে কয়েকটি ইতিহাসোত্থিত কারণে এবং অঙ্গাঙ্গী নতুন সময় পর্ব তাকে উদ্বুদ্ধ করছিল বলে তা একটা আশ্চর্য রক্তচ্ছটা রঞ্জিত হয়ে উঠেছিল। যাকে মৃত্যুর বা অরুণের জীবনেরও বলে মনে করতে পারা যেত। নজরুলের অনেক কবিতাই সেই সময় লেখা হয়। মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়। জনগণ তখন আজকের মত ঈষৎ উন্নীত নয় কিংবা রূপান্তরিত? - ছিল না, চমৎকার কবিতা চাচ্ছিল, (আজো জনমানস রকম ফেরে, তাই ই চায় যদিও), নজরুল সেই মন স্পর্শ করতে পেরেছিলেন এমনভাবে যে আজকের কারো কোনো জনসাধারনের জন্য তৈরি কবিতা বা গদ্য কবিতা ফলত পদ্যের স্তরে নেমে ও তা পেয়েছে কিনা বলা কঠিন। তখনকার দিনে বাংলা লোকোত্তর পুরুষ কম ছিলেন না। -- শ্মশানের পথে সন্তানোৎসব জমেছিল বেশ খানিকটা উদ্যোক্তা। নজরুল ইসলামের আগ্রহ পুষ্ট হয়েছিল, তিনি অনেক সফল কবিতা উৎসারিত করতে পেরেছিলেন। কোনো কোনো কবিতায় এত বেশি সফলতা যে কঠিন সমালোচকও বলতে পারেন যে নজরুলী সাধনা এইখানে --- এইখানে সার্থক হয়েছে - কিন্তু তবুও মহৎ মান এড়িয়ে গিয়েছে। কোনো এক যুগে মহৎ কবিতা বেশি লেখা হয় না। কিন্তু যে বিশেষ সময় ধর্ম, ব্যক্তিক আগ্রহ ও একান্ততার জন্যে নজরুলের অনেক কবিতা সফল ও কোনো কোনো কবিতা সার্থক হযেছিল -- জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতার মূল্য ও মাত্রা চেতনায় খানিকটা সুস্থির হয়েও আজকের দিনের অনেক কবিতাই যে সে তুলনায় ব্যাহত হয়ে যাচ্ছে তা শুধু আধুনিক বিমুখ সময়রূপের জন্যেই নয় -- আমাদেব হৃদয়ও আমাদের দিরূপাচার করে, অনেক সময়ই আমাদের মনও আমাদের নিজেদের নয়, এই সাময়িকতার নিয়মই হয়ত তাই।

কিন্তু নজরুলের ব্যক্তিকতা ও সময় এই বুদ্ধি সর্বস্বতার হাত থেকে তাঁকে নিস্তার দিয়েছিল। আধুনিক অনেক কবিতা থেকে তাঁর কোনো কোনো কবিতার অঙ্গীকার তাই বেশী, ধ্বনিময়তাও উৎকর্ণ না করে এমন নয়। কিন্তু নিজেকে বিশোধিত করে নেবার প্রতিভা এই এ সব কবিতা বিধানে, শেষ রক্ষার কোনো সন্ধান নেই।

পরার্থপরতার চেয়ে স্বার্থসন্ধান ঢের হেয় জিনিষ, স্বার্থসাধন কিছুই নয়, কিন্তু কবি মানসের আত্মোপকার প্রতিভাই তাকে নির্মাতার ওপরের ভূমিকায় ওঠাতে সাহায্য করে, কবিতাকে তার অন্তিম সঙ্গতির পথে নিয়ে যায়। এরই স্বভাবে সৃষ্ট কবিতা যতদূর ব্যাপ্ত ও গভীর হয়ে উঠতে পারে নজরুল ইসলামের প্রথম ও শেষ কবিতা এরই অভাবে একই সূচনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ততদূর স্থান হারিয়ে ফেলছে।

সময়গ্রন্থির কবি জীবনানন্দ | সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় | রবিবারের প্রবন্ধ ৫


সময়গ্রন্থির কবি জীবনানন্দ
সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়

ধূসর পাণ্ডুলিপি-র হেমন্তের জগতে স্বভাবতই ফুলের প্রসঙ্গ প্রায় অনুচ্চারিত। ইয়েটস যে অর্থে ডরোথি ওয়েলেসলিকে বলেছিলেন, Why can’t you English poets keep flowers out of your peotry? - কবি জীবনানন্দের এই ফুল-বিমুখতার সঙ্গে সে অর্থের কোনও সংযোগ নেই। এই অনুচ্চারণ একটা অস্তিবাচক সত্য। আমরা যখন রবীন্দ্রনাথ সত্যেন্দ্রনাথ নজরুলের রৌদ্ররাগ এবং পুষ্পরাগের পরিমণ্ডল পেরিয়ে সেই ধূসর ম্লানতায় প্রথম প্রবেশ করলাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। যে সন্ধ্যায় মনে হয়, সূর্যাস্তের ওপারের সূর্যের কথা, এ সন্ধ্যা সে সন্ধ্যা নয়। এ হেমন্তের সন্ধ্যায় যেন কোনও দুর্মর অন্ধকারের বার্তা পাওয়া গেল। তাই ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে কবিসত্তার স্বনিয়মী স্বাভাবিকতায় ফুলের ব্যবহার ঘটেনি বললেই হয়। ক্বচিৎ এক আধটি শসাফুল, বিনষ্ট শসার পাশে অথবা বাসি বা ছেঁড়া করবীর এক আধটি পাপড়ি ফুলের বিস্মৃতিকে রোধ করার জন্য প্রয়াসী। নতুবা ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ফুল নেই। ফুল নেই সে সন্ধ্যায়-সে অভবিষ্য অস্পষ্ট অনালোকে মৃত প্রেমিকাদের মুখের মতো বিমর্ষ নক্ষত্রেরা ফুটে উঠেছে। জীবনানন্দের সমগ্র কবিজীবনে অতঃপর নক্ষত্র স্থায়ী কাব্যপ্রসঙ্গ। ধূসর পাণ্ডুলিপিতে এবং কমবেশি তারপরেও জীবনানন্দ শুধু হেমন্তের কবি নন-হেমন্তের সন্ধ্যার কবি। কেবলমাত্র হেমন্তের অনুষঙ্গ, অন্তত বাংলাদেশে কিছুতেই বিষণ্ণতাবাচক নয়। হেমন্তের অনুষঙ্গে ফসল তোলার আশা আনন্দই বাঙালি কৃষকের মনে জড়িত। কিন্তু হেমন্তর সন্ধ্যার নিরুদ্যমতাকে জীবনানন্দ অন্যতর অর্থে নিযুক্ত করতে পেরেছেন। বিশ্বব্যাপী যে স্লাম্প বাঙালি যুবকেরও উত্তাপ ও উৎসাহকে জুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল জীবনানন্দের হেমন্ত-সন্ধ্যা কতকাংশে সেই নিরুদ্যমতার প্রতীক। আর গভীরতর অর্থে ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ক্রমশই একটা কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে জীবনানন্দ মানুষের বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের কবি। আক্ষরিকভাবে বাস্তববাদিতাকে যদি বেশি প্রশ্রয় দেওয়া যায় তাহলে আবারও বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যার জন্য প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর জীবনের মন্দস্রোতের কথা ওঠে। কিন্তু এ সৌন্দর্যবোধের বিপন্নতারও ইতিহাস আছে। হয়তো তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রোমান্টিকতার ভাবসংকটের জের, জড়িয়ে আছে শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী ব্যক্তির আত্মচ্যুতির অভিজ্ঞতা; জড়িয়ে আছে ক্রমবর্ধমান আত্মসম্বিতের ফলে সঞ্জাত ব্যক্তির নৈঃসঙ্গের চেতনা। হয়তো শেষ পর্যন্ত এই সবকিছুরই ফলে কবিচেতনার তরঙ্গ এক উপলব্ধির তটে প্রহত হয়েছে-মৎস্যকন্যাদের গান আমাকে উদ্দেশ্য করে নয়। কবি জীবনানন্দের মধ্যে মানুষের সেই বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের চেতনা নক্ষত্রের প্রতীকে রূপস্থ হয়ে উঠেছে। 'বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল', আর নারকেল নাড়ু বিতরণকারিণী বাসমতী চাল ধোয়া হাতে বিনুনি বাঁধা মেয়ে সেই চেতনারই ইঙ্গিত নিয়ে পরে দেখা দিয়েছে।

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট