
সময়গ্রন্থির কবি জীবনানন্দ
সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়
ধূসর পাণ্ডুলিপি-র হেমন্তের জগতে স্বভাবতই ফুলের প্রসঙ্গ প্রায় অনুচ্চারিত। ইয়েটস যে অর্থে ডরোথি ওয়েলেসলিকে বলেছিলেন, Why can’t you English poets keep flowers out of your peotry? - কবি জীবনানন্দের এই ফুল-বিমুখতার সঙ্গে সে অর্থের কোনও সংযোগ নেই। এই অনুচ্চারণ একটা অস্তিবাচক সত্য। আমরা যখন রবীন্দ্রনাথ সত্যেন্দ্রনাথ নজরুলের রৌদ্ররাগ এবং পুষ্পরাগের পরিমণ্ডল পেরিয়ে সেই ধূসর ম্লানতায় প্রথম প্রবেশ করলাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। যে সন্ধ্যায় মনে হয়, সূর্যাস্তের ওপারের সূর্যের কথা, এ সন্ধ্যা সে সন্ধ্যা নয়। এ হেমন্তের সন্ধ্যায় যেন কোনও দুর্মর অন্ধকারের বার্তা পাওয়া গেল। তাই ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে কবিসত্তার স্বনিয়মী স্বাভাবিকতায় ফুলের ব্যবহার ঘটেনি বললেই হয়। ক্বচিৎ এক আধটি শসাফুল, বিনষ্ট শসার পাশে অথবা বাসি বা ছেঁড়া করবীর এক আধটি পাপড়ি ফুলের বিস্মৃতিকে রোধ করার জন্য প্রয়াসী। নতুবা ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ফুল নেই। ফুল নেই সে সন্ধ্যায়-সে অভবিষ্য অস্পষ্ট অনালোকে মৃত প্রেমিকাদের মুখের মতো বিমর্ষ নক্ষত্রেরা ফুটে উঠেছে। জীবনানন্দের সমগ্র কবিজীবনে অতঃপর নক্ষত্র স্থায়ী কাব্যপ্রসঙ্গ। ধূসর পাণ্ডুলিপিতে এবং কমবেশি তারপরেও জীবনানন্দ শুধু হেমন্তের কবি নন-হেমন্তের সন্ধ্যার কবি। কেবলমাত্র হেমন্তের অনুষঙ্গ, অন্তত বাংলাদেশে কিছুতেই বিষণ্ণতাবাচক নয়। হেমন্তের অনুষঙ্গে ফসল তোলার আশা আনন্দই বাঙালি কৃষকের মনে জড়িত। কিন্তু হেমন্তর সন্ধ্যার নিরুদ্যমতাকে জীবনানন্দ অন্যতর অর্থে নিযুক্ত করতে পেরেছেন। বিশ্বব্যাপী যে স্লাম্প বাঙালি যুবকেরও উত্তাপ ও উৎসাহকে জুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল জীবনানন্দের হেমন্ত-সন্ধ্যা কতকাংশে সেই নিরুদ্যমতার প্রতীক। আর গভীরতর অর্থে ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ক্রমশই একটা কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে জীবনানন্দ মানুষের বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের কবি। আক্ষরিকভাবে বাস্তববাদিতাকে যদি বেশি প্রশ্রয় দেওয়া যায় তাহলে আবারও বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যার জন্য প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর জীবনের মন্দস্রোতের কথা ওঠে। কিন্তু এ সৌন্দর্যবোধের বিপন্নতারও ইতিহাস আছে। হয়তো তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রোমান্টিকতার ভাবসংকটের জের, জড়িয়ে আছে শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী ব্যক্তির আত্মচ্যুতির অভিজ্ঞতা; জড়িয়ে আছে ক্রমবর্ধমান আত্মসম্বিতের ফলে সঞ্জাত ব্যক্তির নৈঃসঙ্গের চেতনা। হয়তো শেষ পর্যন্ত এই সবকিছুরই ফলে কবিচেতনার তরঙ্গ এক উপলব্ধির তটে প্রহত হয়েছে-মৎস্যকন্যাদের গান আমাকে উদ্দেশ্য করে নয়। কবি জীবনানন্দের মধ্যে মানুষের সেই বিপন্ন সৌন্দর্যবোধের চেতনা নক্ষত্রের প্রতীকে রূপস্থ হয়ে উঠেছে। 'বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল', আর নারকেল নাড়ু বিতরণকারিণী বাসমতী চাল ধোয়া হাতে বিনুনি বাঁধা মেয়ে সেই চেতনারই ইঙ্গিত নিয়ে পরে দেখা দিয়েছে।