প্রবাহিত মনুষ্যত্ব - শঙ্খ ঘোষ | রবিবারের প্রবন্ধ ২

রবিবারের প্রবন্ধ ২
প্রবাহিত মনুষ্যত্ব
শঙ্খ ঘোষ
আর অন্যদিকে, একজন বর্ষীয়সী মহিলাকে জানি, মানুষখেকো বাঘেরা বড়ো লাফায় বইটি পড়ে এর কবিকে যিনি একটি চিঠি লিখবার জন্য ব্যাকুল হচ্ছিলেন৷ এর তাপ আর বিক্ষোভ, এর প্রাত্যহিকতা আর পথচারিতায় খুব সহজেই নিজের মন মিলিয়ে নিতে পেরেছিলেন সেই মহিলা৷ বাংলা কবিতার প্রেমিক একজন বিদেশী মানুষকেও জানি, কলকাতায় এসে যিনি কবিতার মধ্যে খুঁজছিলেন এদেশের সাময়িকতার চাপ, এর প্রতিদিনের রক্তক্ষরণ৷ আমাদের মতো দেশে কিংবা লাতিন আমেরিকায় বা আফ্রিকায় যে-ধরণের প্রতিবাদের কবিতা বিদীর্ণ হয়ে উঠবার কথা এখন, তিনি খুঁজছিলেন সেইটে৷ আর এই কাজে প্রচুর সন্ধানের পর তিনি নির্বাচন করে নিয়েছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা––সমস্তরকম লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে আর্তনাদ যেমন লাভাস্রোতে বেরিয়ে আসে ওঁর রচনায়, সেটা মুগ্ধ করেছিল তাঁকে৷ প্রতিবাদের এই প্রত্যক্ষতাতেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষতম কবিতার পরিচয়, এইখানেই তাঁর কবিতার সঙ্গে একাত্মবোধ করেন তাঁর আজকের দিনের পাঠক৷

কিন্তু আমরা, যাঁরা অনেকদিন ধরে তাঁর কবিতা পড়ছি, আমাদের তখন অন্য একটা ভাবনাও এসে পড়ে মনে৷ অনেকদিন আগে যখন তিনি জেগে উঠেছিলেন যেন জীবনানন্দের ভূমি থেকে, তার চেয়ে এখনকার জগৎ কি তবে সরে এসেছে একেবারে? পূর্বাশা-র পৃষ্ঠায় যখন তিনি লিখছিলেন “ক্লান্তি ক্লান্তি”র মতো কবিতা, ‘এমন ঘুমের মতো নেশা’ কিংবা ‘এমন মৃত্যুর মতো মিতা’কে এড়িয়ে জীবন চান না বলে জানাচ্ছিলেন যখন, একাধিক কবিতায় যিনি দেখছিলেন ‘শরবতের মতো সেই স্তন’ তাঁর কবিতায় তখন সদর্থেই একটা প্রচ্ছন্ন আবহ ছিল জীবনানন্দের৷ এটা হতেই পারে যে আজ দীর্ঘ পঁচিশ বছরের অভ্যাসে তিনি অল্পে অল্পে––কিংবা হঠাৎই একদিন––একেবারে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন সেই আবহ থেকে, মৃত্যুর থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন ক্ষুধার্ত জীবনের দিকে৷ এটা হতেই পারে যে তাঁর কবিতা এখন আর আলোছায়ার কোনো প্রদোষ রাখবে না কবিতায়, হয়ে উঠবে স্পষ্ট এবং রূঢ়, সাময়িকতার প্রয়োজনে অত্যন্ত নির্মমরূপে বাস্তবিক ––ঘোষিত এবং দলীয়৷

তবু, এইটেই কি তাঁর সব পরিচয়? বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা লক্ষ করে পড়লে দেখা যাবে যে তাঁর এই মুহূর্তের রচনায় বিষাক্ত ধিককারের সঙ্গে সঙ্গে রয়ে গেছে এক প্রগাঢ় কোমলতা৷ এই অর্থে, মনে হয়, তাঁর অতীত তাঁকে ছেড়ে যায়নি পুরো, বরং কবিতার ভিতরকার পর্দায় সেটা এক মস্ত সামর্থ্য এনে দিচ্ছে৷ প্রথম যৌবনে যে স্বপ্নমদির জগৎ তিনি দেখছিলেন তা আর প্রত্যক্ষে এখন কথা বলে না সত্যি, কিন্তু দেশে দেশে কালে কালে ‘প্রবাহিত মনুষ্যত্ব’র প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসা একটা মমতাময় ধমনী রেখে দেয় তাঁর কবিতার অন্তরালে৷ তখন, এ-রকমই অভিমান আর ক্রোধে মিশে গিয়ে তৈরি হয়ে ওঠে তাঁর ছোটো এক-একটি কবিতা

নাচো হার্লেমের কন্যা, নরকের উর্বশী আমার

বিস্ফারিত স্তনচূড়া, নগ্ন উরু, …লিতবসনা

মাতলামোর সভা আনো, চারদিকের নিরানন্দ হতাশায়,

হীন অপমানে

নাচো ঘৃণ্য নিগ্রো নাম মুছে দিতে মাতলামোর জাত নেই,

পৃথিবীর সব বেশ্যা সমান রূপসী৷

নাচো রে রঙ্গিলা, রক্তে এক করতে স্বর্গ ও হার্লেম৷

যেমন আমাদের অভিজ্ঞতারও আছে দিন আর রাত্রি, যেমন দিনের অনেক রৌরব আমরা মুছে নিই রাত্রিবেলার নির্জন আত্মক্ষালনে, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিণত কবিতাতেও তেমনি আমরা দেখতে পাব সেই দুই ছায়াপাত৷ সামাজিক যে-কোনো ঢেউয়ের আঘাতে কেঁপে ওঠেন এই কবি, বিবেচনার কোনো সময় পাবার আগেই ঝাঁপ দিয়ে পড়েন স্রোতে, ভেঙে ফেলতে চান সব ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান––কারোই মুক্তি নেই তাঁর সর্বনাশা রোষ থেকে৷ কিন্তু এইসব ভয়ংকর মুহূর্তেও তিনি হঠাৎ এক-একবার এসে দাঁড়াতে পারেন সেই ঘুমন্ত সীমায়

ভুবনেশ্বরী যখন শরীর থেকে

একে একে তার রূপের অলংকার

খুলে ফেলে, আর গভীর রাত্রি নামে

তিন ভুবনকে ঢেকে

এই হলো তাঁর কবিতার রাত্রি, এইটেই তাঁর কবিতার আত্মস্থ অবকাশ, এইখানে তাঁর কবিতার পলিমাটি৷ এই পলি আছে বলেই তার উপর জেগে ওঠা সমস্ত দিনের শস্য একটা স্বতন্ত্র আলো পেয়ে যায়, হয়ে ওঠে সমকালীন অন্যান্য চিৎকৃত বিক্ষোভের চেয়ে অনেক স্বতন্ত্র৷ তাঁরও আছে চিৎকার, কিন্তু অনায়াস সত্য থেকে উঠে আসে বলে তাঁর সেই চিৎকারে প্রায়ই লিপ্ত থাকে একটা মন্ত্রের স্বাদ

অন্ন বাক্য অন্ন প্রাণ অন্নই চেতনা

অন্ন ধ্বনি অন্ন মন্ত্র অন্ন আরাধনা৷

অন্ন চিন্তা অন্ন গান অন্নই কবিতা,

অন্ন অগ্নি বায়ু জল নক্ষত্র সবিতা৷

অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্বধর্মসার

অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওংকার

সে অন্নে যে বিষ দেয়, কিংবা তাকে কাড়ে

ধ্বংস করো, ধ্বংস করো, ধ্বংস করো তারে৷

এই কবিতা একটা সমগ্র ক্ষুৎকাতর যুগের জাতীয় স্লোগান হয়ে উঠবার যোগ্য৷

এটা ঠিক যে এই কবিতাটিতে, কিংবা এ-পর্যন্ত উদ্ধৃত তিনটি রচনাতেই তাঁর শিল্পসুমিতির যে ধরণ, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষ পর্যায়ের কবিতার সেইটেই সাধারণ লক্ষণ নয়৷ তাঁর কবিতা অসমান, অনেকসময়েই তাঁর কবিতা বরং তুলে নিয়ে আসে ঈষৎ ভাঙা চলন, যার ছন্দে ছবিতে শব্দের ব্যবহারে হঠাৎ কখনো মনে হতে পারে যে অশুদ্ধ হলো সুর৷ কিন্তু সেইটেই যেন তাঁর আনন্দ, যেন কিউবার কবি নিকোলাস গ্যিয়েন-এর মতো তিনিও আজ বলে উঠতে পারেন নিজেকে অশুচি বলেই ঘোষণা করছি আমি৷ এই কবিও একদিন ‘নিজের মধ্যে নিহিত থেকে অর্কেস্ট্রা বাজানো’র ভঙ্গি জানছিলেন, যুক্ত ছিলেন তাঁর ভাষার মডার্নিজম-এর আন্দোলনে আর তার থেকে আজ বেরিয়ে এসে এখন তিনি চার পাশে দেখতে পান এক বিশাল চিড়িয়াখানা৷ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও আজ তাঁর ছোটো ছোটো বইগুলির মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন আমাদের আক্রমণকারী সমকালীন ভণ্ড পৃথিবী, আর তাই মুণ্ডহীন ধড়্গুলি আহ্লাদে চিৎকার করে বা বাহবা সময় তোর সার্কাসের খেলা এইসব হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা-বইয়ের নাম৷ এর অন্তর্গত কবিতাগুলি পড়তে পড়তে কোনো পাঠকের মনে হতে পারে যেন তিনি হেঁটে চলেছেন ধান-কেটে-নেওয়া কোনো জমির ওপর দিয়ে, থেকে-থেকে কাঁটা বেঁধে পায়ে, পিঠে এসে লাগে রোদ্দুরের ফলা সেখানে নেই কোনো সমতল মসৃণতা বা শিল্পসুষমার কোনো সচেতন আয়োজন৷ এর অন্তর্গত কবিতাগুলি পড়তে পড়তে পাঠক কেবলই ঘূর্ণির মতো ঘুরতে থাকবেন এই পাঁচ-দশ বছরের কলকাতার গ্লানিময় ইতিবৃত্তে, সমস্ত ভারতবর্ষের নিরন্তন পচন-লাঞ্ছনায়৷ আর সেই পটভূমি মনে রাখলে এই অসমান ঊষর আঘাতময় শিল্পধরণকে মনে হয় অনিবার্য, অনিবার্য মনে হয় এর আপাতশিল্পহীনতা৷ আপাত, কিন্তু সম্পূর্ণত নয় কেননা অনেকদিনের কাব্যময়তাকে যিনি রেখে দিয়েছেন তাঁর ভিতরে, আজ এই স্পষ্ট ভর্ৎসনার উচ্চারণের সময়েও তাঁর ভাষা হয়ে ওঠে এ-রকম ‘আকাশের দিকে আমি উলটো করে ছুঁড়ে দিই কাঁচের গেলাস’ অথবা ‘ব্রাহ্মমুহূর্তে কারা ছায়ার মতো ছেড়ে গেছে ঘর’ কিংবা ‘কলকাতার ফুটপাথে রাত কাটায় এক লক্ষ উন্মাদ হ্যামলেট/তাদের জননী জন্মভূমি এক উলঙ্গ পশুর সঙ্গে করে সহবাস’ আর ‘আমাদের সন্তানের মুণ্ডহীন ধড়গুলি তোমার কল্যাণে ঘোর লোহিত পাহাড়৷’ তখন বুঝতে পারি কবির যোগ্য সমস্ত ইন্দ্রিয় তাঁর ভিতরে কাজ করে যায় কীরকম সন্তর্পণে, বুঝতে পারি কোথায় আছে পুরোনো সেই কবির সঙ্গে আজকের কবির নিবিড় কোনো যোগ৷

বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ - সৌরীন ভট্টাচার্য | রবিবারের প্রবন্ধ ১

বইয়ের দৌরাত্ম্য, পুঁথির আক্রমণ
সৌরীন ভট্টাচার্য

শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর আলোচনা উঠে আসে এর মধ্যে নিশ্চয়ই খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী ও সেই টানে শ্রীনিকেতন প্রসঙ্গও যখন চলে আসে তখন এই প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশে স্বাভাবিকভাবেই আমরা মেতে উঠি৷ ঠিক এই মুহূর্তে এরকম অনেকগুলো নজির আমাদের চোখের সামনে রয়েছে৷ বিশ্বভারতী প্রকল্প যে মূলত ব্যর্থ সে-বিষয়েও যেন প্রায় একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷ এখন শুধু এই মীমাংসা বাকি, এই ব্যর্থতার দায় কতটা কার৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই কি এর জন্য মূলত দায়ী নন? নাকি তাঁর জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সম্পদ’ বহন করে নিয়ে চলেছে যে সোনার তরী তার দিশাহারা নাবিকেরাই এর জন্য দায়ী? নাকি সমগ্র বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকেই বহন করতে হবে এর দায়ভার? নাকি সরকারি ঔদাসীন্য? নাকি রাজনীতির কুটিল আবর্ত? আধুনিক যুগটা নাকি প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার৷ কাজেই যুগোপযোগী হতে গেলে প্রযুক্তিবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনাবিদ্যা শিক্ষার আয়োজন থাকা চাই৷ খুব সম্প্রতি এরকম আয়োজনের সূত্রপাতও হয়েছে৷ কিন্তু তাতেও কি হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে? নাকি কালের ইশারায় নিজের স্বভাবের খোঁজখবর তেমন করে না নিয়ে আমরা যতই বদলাবার চেষ্টা করছি ততই আরও জটিল জালে জড়িয়ে পড়ছি?

সাফল্য-ব্যর্থতার কথা যখন আমরা বলি, তখন ঠিক কী ভাবি আমরা? কোনো ব্যক্তির জীবনেও যখন এ-প্রশ্ন ওঠে, তখন ঠিক কী থাকে আমাদের চিন্তায়? কে কী হতে চায়, কে কেমনভাবে কাটাতে চায় তার জীবন, সেসব কথা বাদ দিয়ে সাফল্য-ব্যর্থতার অঙ্ক কষার কোনো মানে হয় না৷ গড়পড়তা আর-পাঁচ জন যেমন হবে প্রত্যেককেই যদি সেই মাপে ছাঁটাই করার চেষ্টা হয়, তা হলে সবই তো এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যাবে৷ বৈচিত্র্যের কী দশা হবে তবে? সৃষ্টির জগতে বৈচিত্র্যের দাম আছে৷ শুধু ভিন্নতার খাতিরেই নয়, প্রয়োজনীয়তার খাতিরেও বৈচিত্র্য জরুরি৷ তাই সবই লেপে পুঁছে বেমালুম একাকার করে দিতে না চাইলে বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হয়, তাকে সম্মান জানাতে হয়৷ আর তখন সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবনিকেশ আর অত সোজাসাপটাভাবে করলে চলে না৷ কথাটা যেমন ব্যক্তির স্তরে সত্য, তেমনই প্রতিষ্ঠানের স্তরেও তা সত্য৷ সব প্রতিষ্ঠান এক উদ্দেশ্যে তৈরি হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এক হয় না, সব প্রতিষ্ঠানের পিছনের আবেগ ও কল্পনাও যে এক থাকে তা নয়৷ তা হলে এসব প্রশ্ন একেবারে ছেঁটে ফেলে বাদ দিয়ে একমাত্র এই মুহূর্তের প্রয়োজন, লক্ষ্য কিংবা চালু ধরনকে সম্বল করে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিচার করতে বলা কি খুব সমীচীন? অনেক স্বপ্ন কল্পনা আদর্শ এই মুহূর্তের নিরিখে যদি মনে হয় ভাবালুতা, তা হলে ঢাকিসুদ্ধ সেই ভাবালুতা বিসর্জন দেওয়ার আগে নিরিখটাকেই কি একবার মেপে নেওয়া উচিত না? নইলে ক্ষণমুহূর্তই একমাত্র ধ্রুবসত্য, এ-কথা মেনে নিতে হয়৷ কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা ইতিহাসের দিকে তাকালে বারবার দেখা যায়৷ মুহূর্তের নিরিখ যে কতটাই ভঙ্গুর তা যদি বারবার এমনভাবে প্রতীয়মান না হত তা হলে তো পরিবর্তনের জন্য কোনো ফাঁক বের করে নেওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য হত৷ কিন্তু ইতিহাসে পরিবর্তন তো অবশ্যই আছে৷ ক্ষণমুহূর্তের কত কত মানদণ্ড একেবারে জলস্রোতের মতো ভেসে গেছে৷ সমস্ত মূল্যমান ও বিচারের নিরিখ ইতিহাসে নিতান্ত অচিরস্থায়ী৷ কাজেই প্রতিষ্ঠানের বিচারের সময়ে মানদণ্ডের বিপর্যয়-সম্ভাবনা বিষয়ে সজাগ থাকা চাই৷ আর শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী-শ্রীনিকেতনের বিচারে নজর কি শুধুই ডিগ্রি, পাঠক্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ঘেরে আটকে থাকবে? একটা প্রতিষ্ঠানের আবহ ও রণন কি কেবলমাত্র ওইসব জিনিসে ধরা পড়ে? তার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করে নানাদিকে তাকাতে হয়৷ সেই আবহ অনেকসময়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ দৈনন্দিনের মধ্যেও টের পাওয়া যায়৷ দোকান-বাজারের মানুষ, রিক্সাচালক, রাজমিস্ত্রি––এই-যে স্তর, যে-স্তরে সাধারণ জীবনের মানটা ধরা থাকে, সেখানে যদি চকিতে চোখে পড়ে এমন কোনো সরলতা বা সজীবতা যা মুহূর্তের জন্য প্রাত্যহিকের কলুষ থেকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়, তা হলে কি ভাবতে ইচ্ছে করে না যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সবটাই ডিগ্রির গণ্ডিতে আটকে থাকে না হয়তো৷ আর রণন? যেসব বিচারে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ বলে রায় ঘোষণা হয়েই গেছে, যদি দেখা যায় যে, সেইসব বিচারেই অনুজ কোনো প্রতিষ্ঠান দারুণ সফল, আর সে-প্রতিষ্ঠানও ভাবনার আদলে অগ্রজ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণী, তা হলে?


ছোটগল্প | উত্তরপুরুষ দেবদ্যুতি রায়

উত্তরপুরুষ
দেবদ্যুতি রায়



এক
এবার এই ‘আগন’ মাসেই কেমন মাঘের মতো শীত পড়েছে। চার পাঁচদিন থেকে সূর্যের দেখা মিলছে না একেবারে। গায়ের ভারি সোয়েটারের ওপর আলোয়ানটা ভালো করে জড়ায় রতন। আজকাল শরীরটা শীত, গরম কিছুই সহ্য করতে পারে না একদম। কে জানে, শীতের এই ক’টা মাস কী করে কাটবে এবার। ওদের এই এলাকায় শীতের তীব্রতা এমনিতেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি।

মণ্ডলপাড়ার একেবারে মাঝ বরাবর রতনদের এই ছন্নছাড়া বাড়িটা। এ বাড়ির খাপছাড়া মাপের দুটি ঘরের মাঝখান জুড়ে ছোটমোট বারান্দাটাই আজকাল রতনের সারাদিনের থাকার জায়গা। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ভাঙ্গাচোরা শরীরটা টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এখানেই বসে সে। খাওয়ার লম্বা টেবিলটার মাপে বানানো বেঞ্চটায় বসে থাকে। যখন আর পারে না, শুয়ে পড়ে ওখানেই। খুব মন চাইলে বাড়ির মানুষদের একটু উঠানে নামার কথা জানায়। নড়বড়ে কাঠের চেয়ারটায় উঠানে তখন খানিক সময় বসা হয় ওর। গত বছর পর্যন্ত তবু কলপাড় বা ল্যাট্রিনে যাওয়া আসা করতে পারত একা একা, এবার সেটাও প্রায় অসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। মা, আবার কখনও সখনও সুমিও ওকে ধরে ধরে সব জায়গায় নিয়ে যায় আজকাল।

ছোটগল্প | বিবর্ণ রেখায় বিপন্ন সুখ | নাসরীন নঈম

বিবর্ণ রেখায় বিপন্ন সুখ
নাসরীন নঈম



জুম্মনের কঙ্কালসার দেহটাকে গোর দিয়ে এসে দাওয়ায় বসে হাত পা ছুঁড়ে বিলাপরতা গোলাপীকে লক্ষ্য করে লাল মিয়া সান্তনার বাণী বর্ষণ করলো— ‘আর কাইন্দা কি করবা। খসম কি আর মাইনসের জিন্দেগানি বইরা বাইচা থাকে’!
ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে উঠোনের এক পাশে ধপ্ করে বসে পড়লো লাল মিয়া। তারপর দৃষ্টিটা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে আবার বললো— মাইয়াটার দিগে চায়আ কোনরহমে কষ্ট-মষ্ট কইরা খসমের এই ভাঙ্গা ঘরটায় ইজ্জত বাচাআ চইলা যাও। খোদায় চাইলে দিন ফিরবারও পারে।
করিমের বউ তখন ভাত খেয়ে এঁটো বাসনটার পানি ফেলতে ফেলতে মুখটা বিকৃত করলো- বেওয়া বেকসের দিগে খোদা ব্যাটাও চায় না।

জুম্মনের সদ্য বিধাব বউ গোলাপী কারও কথায় কর্ণপাত না করে আলু থালু বেশে আপন মনে মর্সিয়ার মতো করে বিলাপ করছে- হায়রে খোদারে। আমারে... ফালায়া... থুইয়া...কই...গেলগারে...। অখন আমারে...আর ক্যাঠা দেখবরে...।

ছোটগল্প | জরুরী অবস্থা | শুভেন্দু বিকাশ চৌধুরী

জরুরী অবস্থা
শুভেন্দু বিকাশ চৌধুরী



‘ভোট দিবেন কুনখানে?’ প্রশ্ন করে মিছিলের সামনে চলতে থাকা আট-দশজন।

পেছন থেকে সমস্বরে জবাব আসে, ‘গাই বাছুরের মাজখানে’। আজ কয়েকদিন হল এইরকমই মিছিল চলছে বিভিন্ন দলের। সময়-অসময় নেই, প্রায় সারাদিনই গাঁয়ের রাস্তায়, কোন না কোন দলের মিছিল চলছে। সবাই ওই একই প্রশ্ন করে, কোথায় ভোট দেবেন? শুধু উত্তর আলাদা – গাই-বাছুর না লাঙল-কাঁধে-চাষা। মাটির বাড়ির দেওয়ালগুলো সব ভরে গেছে নির্বাচনী প্রতীক চিহ্নে আর লেখায়। যেমন - আসন্ন ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচনে আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রে ভারতীয় লোকদল প্রার্থী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করুন। দেশ বাঁচান, গণতন্ত্র বাঁচান। স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধীর কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। প্রশ্নও আছে কিছু - ইন্দিরা গান্ধীর মাইলো, কী দিয়ে খাইলো? নিচে ইন্দিরা গান্ধীর বিকৃত মুখচ্ছবি, নাকটা যেন অস্বাভাবিক লম্বা। মনে পড়ে, বছর কয়েক আগের কথা। খাবারের খুব কষ্ট! একফসলি জমি, ঘরে ঘরে চাল বাড়ন্ত। তখন রেশনে গম, মকাই, মটকলাই এসব দেওয়া হত। পাশের দেওয়ালে আবার ইন্দিরা গান্ধীর সুন্দর মুখ, সঙ্গে গাই-বাছুর। উমাশশীর ভারি ভাল লাগে এইসব দেখতে। ঘুঁটে দেওয়া বন্ধ করে হাঁ করে দেখতে থাকে মিছিলের চলে যাওয়া। কেমন সবাই দলবেঁধে লাইন দিয়ে চলেছে – একপাড়া থেকে অন্য পাড়া, এক গাঁ থেকে অন্য গাঁয়ে। মনে হয় সেও বুঝি চলে যায় ওদের সঙ্গে। যেমন অমল চলে যেতে চেয়েছিল দইওলার সঙ্গে!
প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট