আপনি তুমি রইলে দূরে | রফিক কায়সার | রবিবারের প্রবন্ধ ৬

আপনি তুমি রইলে দূরে
রফিক কায়সার

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে কবি-প্রয়াণের পর থেকেই। তাঁকে নিয়ে কবির জীবৎকালেও ব্যক্তিবিশেষের নেতিবাচক মতামত বা মন্তব্যকে কবি যথেষ্ট গুরুতব দিয়ে খন্ডন করেছেন বা জবাব দিয়েছেন। ব্যক্তিবিশেষের মন্তব্য বা মতামত কবির জীবৎকালে সামাজিক পরিবাদ বা শান্তিনিকেতনে রথীন্দ্রনাথবিরোধী জনমত তীব্রতা পায়নি। কবি-প্রয়াণের পর থেকেই রথীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন নিয়ে শান্তিনিকেতনের বাসিন্দাদের জনরব তৈরি হতে থাকে। তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মী নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। যৌক্তিক কারণেই রবীন্দ্রনাথের পরিবারের পক্ষ থেকে এই সম্পর্ক নিয়ে কথা ওঠে, তাঁর গোচরে আনা হয় সামাজিক লোকনিন্দার প্রসঙ্গ। এ-প্রসঙ্গে রথীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল নেতিবাচক – তিনি মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে অস্বীকার না করে শান্তিনিকেতন থেকে প্রস্থানকে বিবেচনায় আনেন। ইন্দিরা চৌধুরী সরাসরি রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। বিশ্বভারতীর আচার্য ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কানেও খবরটি পৌঁছে যায়। রথীন্দ্রনাথের ছোট বোন মীরা ঠাকুর প্রথম থেকেই এই সম্পর্ক নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অগ্রজের প্রতি, আবার লুপ্ত করেননি অগ্রজের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধাবোধ। ভ্রাতৃবধূর প্রতি অব্যাহতভাবে জ্ঞাপন করেছে সহমর্মিতা এবং সহানুভূতি। রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি কটাক্ষ করেছেন রথীন্দ্রনাথের ভাগ্নি নন্দিতা।

রথীন্দ্রনাথের সম্পর্ক-বহির্ভূত আচরণ যেমন শান্তিনিকেতনে নিন্দার ঝড় তুলেছিল, তেমনি উপাচার্য হিসেবে তাঁর কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জড়িয়ে পড়েন তহবিল তছরুপের মামলায়। একপর্যায়ে মামলায় হাজিরা দিতেও অনাগ্রহী হয়ে পড়েন রথীন্দ্রনাথ। এই পর্যায়ে সবকিছু ছাপিয়ে মীরা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাজারীবাগে ‘হাওয়া বদল’ করতে যাওয়ার ঘটনা তাঁর পদমর্যাদা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। বিশ্বভারতীর স্থানীয় এবং দিল্লির প্রধানমন্ত্রীর দফতর ঘটনাটিকে সহজভাবে নিতে পারেনি। রবীন্দ্রানুরাগী নেহেরু নিজেও রথীন্দ্রনাথের বিষয়ে বিব্রত হন। প্রশান্ত মহালনবীশকে দিয়ে তাঁর কাছে খবর পাঠানো হলো যে, ‘বার্তা’র সারমর্ম হলো, চট্টোপাধ্যায় দম্পতিকে শান্তিনিকেতন থেকে হটাও। রথীন্দ্রনাথ উল্লিখিত ‘বার্তা’র মর্মার্থ গ্রহণ না করে বেছে নিলেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত। অভিমান করে ছেড়ে এলেন শান্তিনিকেতন। সঙ্গে এলেন মীরা চট্টোপাধ্যায়। জীবনের শেষ আট বছর অতিবাহিত করেছেন এই নারীর সান্নিধ্যে – দেরাদুনে। এই ঘটনাক্রম বিশ্বভারতীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে কমবেশি জানা।

বোর্হেসের গোলকধাঁধা | অশ্রুকুমার সিকদার


অশ্রুকুমার সিকদার
বোর্হেসের গোলকধাঁধা

কোনও লেখক নোবেল পুরস্কার পেলে তখনই তাঁকে নিয়ে আমাদের কাগজে হইচই করা হয়। ইয়োর্গে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges) এখনও নোবেল পুরস্কার পাননি, তাছাড়া তিনি এমন এক দেশের মানুষ যার কথা খবরের কাগজের চূড়ায় সচরাচর জায়গা পায় না, তাই তাঁর সম্বন্ধে পত্রপত্রিকার এমন নীরবতা। আমাদের দেশেরই বা দোষ কী, বস্তুত ১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে ফেরমেন্টর পুরস্কার পাবার আগে দক্ষিণ আমেরিকার অন্তর্গত আর্জেন্টিনার এই লেখক সম্বন্ধে ইয়োরোপও সাধারণভাবে অজ্ঞ ছিল। অথচ এই বহুপাঠী চিন্তাশীল লেখক যে অন্ধকারময় গোলকধাঁধার জগৎ রচনা করেছেন তা বিশেষভাবে আধুনিক মানুষের উপযোগী। ১৮৯৯ সালের ২৪ অগস্ট বুয়েনোস এয়ার্সে বোর্হেসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বুদ্ধিজীবী লেখক মানুষ। তাঁরই বিশাল গ্রন্থাগারে শৈশব থেকে বোর্হেসের ইচ্ছামতো মানসিক ভ্রমণ আরম্ভ হয়। তাঁর মা এখনও জীবিত, এই অকৃতদার লেখকের ব্যক্তিগত জীবনে তিনিই কেন্দ্রস্বরূপ। বোর্হেসের ধমনীতে হিস্পানি, ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ইহুদি পূর্বপুরুষের রক্ত প্রবহমান। তাঁর একজন পূর্বপুরুষ এসেছিলেন ইংল্যান্ডের অন্তঃপাতী নর্থাম্বারল্যান্ড থেকে। আর একজন ছিলেন পর্তুগিজ জাহাজের ক্যাপ্টেন। অন্য একজন পূর্বপুরুষ আর্জেন্টিনার গৃহযুদ্ধে অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়কত্ব করেছিলেন। শিক্ষাসংস্কৃতির দিক থেকেও তিনি মিশ্র ঐতিহ্যের মানুষ। কিছুদিন সুইটজারল্যান্ডের জেনিভায়, কিছুদিন স্পেনে তিনি অধ্যয়ন করেন। স্পেনে তিন বছর অধ্যয়নকালে তিনি Ultraista কবিগোষ্ঠীর সংস্রবে আসেন এবং ১৯২১ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি আর্জেন্টিনার Ultraismo কবিতার প্রবর্তক ও নেতা হন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত কবিতা-লেখক। তাঁর মুক্তছন্দে লেখা কবিতায় বুয়েনোস এয়ার্সের দৃশ্য ও পরিমণ্ডল মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই সময়ের কবিতায় তাঁর পরবর্তী গদ্যের নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, তাঁর প্রথম যুগের কবিতা অনেক বেশি হার্দ্যগুণে মণ্ডিত। সময়স্রোত ও মৃত্যুচেতনা সেই কবিতাবলিতে প্রমূর্ত ও প্রতিধ্বনিত, এক চরম তাড়নায় যেন তারা পরস্পর একাকার হয়ে গেছে। কবিতা ছাড়া তিনি এই সময় লিখতেন সাহিত্যবিষয়ে প্রবন্ধ।

১৯৩০-এর পর তাঁর রচনায় এক মৌলিক পরিবর্তন এল। তাঁর গদ্যে গল্প লেখার বাইরের ইতিহাস বড় বিচিত্র। একবার পড়ে গিয়ে তিনি প্রচণ্ড আঘাত পান এবং অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী ছিলেন। কয়েক মাস একটি অক্ষরও লেখেননি, কবিতা লেখায় হাত দিতে সাহসই পাননি। তাঁর ভয় হয়েছিল হয়তো লেখার শক্তি চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেল। অবশেষে তিনি এই ভেবে গল্প লেখায় সন্তর্পণে হাত দেন যে তাঁর গল্প একটা নতুন ব্যাপার হবে এবং পাঠকেরা পুরোনো লেখার সঙ্গে নতুন লেখাকে তুলনা করে খারাপ বলার সুযোগ পাবে না, যেহেতু দুই ধরনের লেখার ধর্ম একেবারে আলাদা। এইভাবে গল্পের উৎস খুলে গেল। তাঁর গদ্যরচনায় হাত দেওয়ার ব্যাপারে এই ঘটনা থেকে যতটা আকস্মিক মনে হয় ততটা আকস্মিক নয়, তার পিছনে আন্তরিক প্রবর্তনাও ছিল। এই মাধ্যম পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। তাঁর কবিতার ইন্দ্রিয়জ জগৎ হয়ে উঠেছিল অবাস্তব, হয়ে উঠেছিল বিপজ্জনক। ইন্দ্রিয়জ জগৎ অবাস্তব হয়ে উঠেছিল, কারণ তাঁর বাবা, তাঁর শিল্পী বোন নোরা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষের মতো তিনিও দ্রুত দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছিলেন। ইন্দ্রিয়জ জগৎ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনায় পেরোনের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায়। যে আর্জেন্টিনাকে তিনি 'this dismantled republic' বলেছিলেন তার রাজনীতিতে যোগ দেবার উৎসাহ তাঁর ছিল না। রাজনীতিতে নিরুৎসাহ হলেও কিন্তু পেরোনের একনায়কত্বে তাঁকে কম বিব্রত হতে হয় না। প্রথমে মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে সামান্য চাকরি নিয়ে তিনি প্রচুর এলোমেলো অধ্যয়নের যে সুযোগ পেয়েছিলেন তা থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন। পেরোন তাঁকে বরখাস্ত করে নিযুক্ত করে হাঁসমুরগির খামারের ইন্সপেকটর পদে। এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে বন্ধুদের উদ্যোগে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন। তাঁদের চেষ্টায় তিনি ইংরেজিমার্কিন সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন, যে বিষয়ে তাঁর সন্দেহাতীত যোগ্যতা ছিল। এইসব অভিজ্ঞতার বশেই হয়তো একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রের চিন্তা তাঁকে কম ভারাক্রান্ত করেনি। Deutsches Requiem গল্পে তাই সহজেই তিনি বক্তার মুখ দিয়ে নাজি-মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে পারেন। The secret Miracle গল্পের চেক নায়ক একদিনভোরে শোনে

নজরুলের কবিতা - জীবনানন্দ দাশ

নজরুলের কবিতা
জীবনানন্দ দাশ

মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়।
নজরুল ইসলাম অনেক দিন থেকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর দৈহিক ওজন আমাদেব জানা আছে, আত্মিক, ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।

জনগণ, ভদ্র সাধারণ এখনও মরে বেঁচে আছে, আসছে সার্বিক নিপাট মৃত্যু এদের জন্যে এবং তার ভিতর থেকেই আরো এবার বেঁচে ওঠবার অধ্যায় - জীবনকে নতুন করে প্রতিপালন করবার প্রয়োজনে।

কিন্তু আমাদের সামাজিক জীবনে এই মৃত্যু ও জীবন যে যার কাছে দুরতিক্রম্য নয়। যতদূর ধারণা করতে পারি, এই মানুষের পৃথিবীতে অনেকদিন থেকে এইরকমই চলেছে, একটা সময় - বৈশিষ্ট্য ক্ষয়িত হয়ে নতুন সাময়িকতাকে নিয়ে আসে। এতে সমাজ কাজে উন্নত না হোক (বা হোক), মূল্যচেতনায় স্থিরতর হবার অবকাশ পায় বলেই তো মনে হয়। প্রবীণ বিরস মনীষীরা যাই ভাবুন না কেন, সাধারণের মানব-মন মনে করে যে ভোর আসছে। একেই কখনো বুদ্ধের, ধর্মাশোকের বা ফরাসী বিপ্লবোত্তর মানবীয় প্রাতঃকাল বলে মনে হয়েছে। সে সব প্রাতঃকাল উন্মেষেই মিলিয়ে গিয়েছে বার বার। ইতিহাসে দীর্ঘ সুদিন কোথায় পেলাম আমরা - এবং সুদীর্ঘ সুরাত্রি? কিন্তু তবুও আবারও ভোর আসছে।

এর থেকে নিরাশার মতামতে উপস্থিত হওয়া যায়, কিংবা জীববিজ্ঞানীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে এই মর্মে উপস্থিত হওয়া যায় যে মানুষ এখনও শিশু – তার সভ্যতার অন্তিমক্ষণ এত দূরে যে আমাদের পক্ষে তা নেই, আমরা এসেছি কেবলমাত্র ভূমিকার ভাঙা গড়ার ভিতর।

আমরাও তাই ভাবি। একটা যুগ ভেঙে যাচ্ছে দেখে আমাদের কারো কারো সাহিত্য স্বভাব ভাঙনের লিপিরচনায় উদ্বেলিত হয়েও যা আজও পাওয়া যায়নি, এমন কোনো নতুন সময়ে আভাসে প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু স্থিরতা পায় কি, অর্থসফলতা লাভ করে ? ফলে আমাদের আগামী যুগের কবিতা হয় অত্যন্ত স্থূল হয়ে দাঁড়ায়, যে সব নিয়মের প্রভাবে আগামীকাল ক্রমে ক্রমে এসে পড়ছে তাদের ভিতর থেকে কয়েকটি প্রতীক বা প্রবর্তয়িতার মত চালিয়ে দিয়ে আমাদের কবিতা কি নবীন হয়ে ওঠে কিংবা কবিতা হয়? আর তা নয় তো, বস্তুশক্তির দুরন্ত ক্রিয়াকৌশলের পরিহাসের দিকে লক্ষ্য রেখেও একান্তভাবে ভাবনানিষ্ঠ হতে গিয়ে আধুনিক ও আগামীকালের কবিতা কারো কারো হাতে এত বেশী তনু সূক্ষ্ম হয়ে দাঁড়ায় যে আজকের কর্তব্যাসক্ত মানসের বিচারে সে কবিতার শব্দ, ভাষা, ইঙ্গিত সমস্তই অসঙ্গত, আচ্ছন্ন বলে মনে হয়। এখনকার বাংলা কবিতায় এই দুটি স্বভাবই লক্ষিত হয়। প্রথমটি নিশান হাতে নিয়ে অগ্রসর হয়েছে নিজের বা অপরের মুখে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত দিব্য দিনের কিছু না কিছু স্বাদ পেয়েছে বলে। কিন্তু এই দুই প্রকৃতির মিশ্রণে ভালো কবিতা পেয়েছি --- নিতান্ত কম নয়।

এ কালের বাংলা কবিতার এই সব অভিব্যক্তির আগে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন। (তখন তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হত)। আমাদের দেশে যে বিশেষ সময়রূপ অনেক দিন থেকে কাজ করে যাচ্ছিল, তেরোশো পঁচিশ আটাশ তিরিশে এক দিক থেকে যেমন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছিল অন্যদিকে কয়েকটি ইতিহাসোত্থিত কারণে এবং অঙ্গাঙ্গী নতুন সময় পর্ব তাকে উদ্বুদ্ধ করছিল বলে তা একটা আশ্চর্য রক্তচ্ছটা রঞ্জিত হয়ে উঠেছিল। যাকে মৃত্যুর বা অরুণের জীবনেরও বলে মনে করতে পারা যেত। নজরুলের অনেক কবিতাই সেই সময় লেখা হয়। মনের উৎসাহে লিখতে তিনি প্রলুব্ধও হয়েছিলেন, নিভে যাবার আগে বাংলার সমপর্যায় তখন বিশেষভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বলে। এ রকম পরিবেশে হলে শ্রেষ্ঠ কবিতা জন্মায় না, কিংবা এতেই জন্মায়, কিন্তু মনন প্রতিভা ও অনুশীলিত সুস্থিরতার প্রয়োজন। নজরুলের তা ছিল না। তাই তাঁর কবিতা চমৎকার কিন্তু মনোত্তীর্ণ নয়। জনগণ তখন আজকের মত ঈষৎ উন্নীত নয় কিংবা রূপান্তরিত? - ছিল না, চমৎকার কবিতা চাচ্ছিল, (আজো জনমানস রকম ফেরে, তাই ই চায় যদিও), নজরুল সেই মন স্পর্শ করতে পেরেছিলেন এমনভাবে যে আজকের কারো কোনো জনসাধারনের জন্য তৈরি কবিতা বা গদ্য কবিতা ফলত পদ্যের স্তরে নেমে ও তা পেয়েছে কিনা বলা কঠিন। তখনকার দিনে বাংলা লোকোত্তর পুরুষ কম ছিলেন না। -- শ্মশানের পথে সন্তানোৎসব জমেছিল বেশ খানিকটা উদ্যোক্তা। নজরুল ইসলামের আগ্রহ পুষ্ট হয়েছিল, তিনি অনেক সফল কবিতা উৎসারিত করতে পেরেছিলেন। কোনো কোনো কবিতায় এত বেশি সফলতা যে কঠিন সমালোচকও বলতে পারেন যে নজরুলী সাধনা এইখানে --- এইখানে সার্থক হয়েছে - কিন্তু তবুও মহৎ মান এড়িয়ে গিয়েছে। কোনো এক যুগে মহৎ কবিতা বেশি লেখা হয় না। কিন্তু যে বিশেষ সময় ধর্ম, ব্যক্তিক আগ্রহ ও একান্ততার জন্যে নজরুলের অনেক কবিতা সফল ও কোনো কোনো কবিতা সার্থক হযেছিল -- জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতার মূল্য ও মাত্রা চেতনায় খানিকটা সুস্থির হয়েও আজকের দিনের অনেক কবিতাই যে সে তুলনায় ব্যাহত হয়ে যাচ্ছে তা শুধু আধুনিক বিমুখ সময়রূপের জন্যেই নয় -- আমাদেব হৃদয়ও আমাদের দিরূপাচার করে, অনেক সময়ই আমাদের মনও আমাদের নিজেদের নয়, এই সাময়িকতার নিয়মই হয়ত তাই।

কিন্তু নজরুলের ব্যক্তিকতা ও সময় এই বুদ্ধি সর্বস্বতার হাত থেকে তাঁকে নিস্তার দিয়েছিল। আধুনিক অনেক কবিতা থেকে তাঁর কোনো কোনো কবিতার অঙ্গীকার তাই বেশী, ধ্বনিময়তাও উৎকর্ণ না করে এমন নয়। কিন্তু নিজেকে বিশোধিত করে নেবার প্রতিভা এই এ সব কবিতা বিধানে, শেষ রক্ষার কোনো সন্ধান নেই।

পরার্থপরতার চেয়ে স্বার্থসন্ধান ঢের হেয় জিনিষ, স্বার্থসাধন কিছুই নয়, কিন্তু কবি মানসের আত্মোপকার প্রতিভাই তাকে নির্মাতার ওপরের ভূমিকায় ওঠাতে সাহায্য করে, কবিতাকে তার অন্তিম সঙ্গতির পথে নিয়ে যায়। এরই স্বভাবে সৃষ্ট কবিতা যতদূর ব্যাপ্ত ও গভীর হয়ে উঠতে পারে নজরুল ইসলামের প্রথম ও শেষ কবিতা এরই অভাবে একই সূচনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ততদূর স্থান হারিয়ে ফেলছে।

কবি আহসান হাবীব শেষ দেখা | হুমায়ূন আহমেদ

একজন মমতাময়ী লেখকের তাঁর প্রিয় কবিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ।

কবি আহসান হাবীব শেষ দেখা
হুমায়ূন আহমেদ

অসুস্থ কবিকে দেখতে গেলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তারিখ ৯ই জুলাই-তার মৃত্যুর আগের দিন। আমি, নির্মলেন্দু গুণ এবং সালেহ চৌধুরী। ঢুকবার মুখেই বাধা। একজন রুগী মারা গেছে। তার মেয়ে কিংবা তার স্ত্রী আকাশ ফাটিয়ে কাঁদছে। মনটাই খারাপ হয়ে গেলাে।

ওয়ার্ডে ঢুকে দেখি সারি সারি রুগীর মাঝখানে হাবীব ভাই। গেঞ্জি গায়ে বিছানায় পড়ে আছেন। শিশুর মত লাগছে তাকে। মাথার কাছে তাঁর ছেলে মইনুল আহসান মুখ কালাে করে দাঁড়িয়ে আছে। সমস্ত পরিবেশটিই মনের উপর চাপ তৈরি করে। দেশের একজন সেরা কবির জন্যে এমন দীন ব্যবস্থা কেন? মইনুল আহসান বললাে-“এটাই ভাল ব্যবস্থা। চোখের সামনে একজন ডাক্তার সব সময় থাকেন। হবে হয়তাে। আমি অবশ্যি আশা করেছিলাম অসুস্থ কবির শয্যাটি হবে অন্য রকম। একটু আলাদা।

হাবীব ভাইয়ের মাথার কাছে একটা চার্ট ঝুলছে। সেখানে ইংরেজিতে লেখা-পােয়েট আহসান হাবীব। তার জন্যে মিকশ্চারের একটি বােতল এলাে; সেখানেও লেখা-পােয়েট আহসান হাবীব। দেখতে ভালই লাগলাে। হাসপাতাল মনে রেখেছে এই রুগী একজন কবি।

মইনুল আহসান বললাে-“আব্বার তেমন কোন অসুবিধা নেই। তার জন্যে আগামীকাল মেডিক্যাল বাের্ড বসবে।” বুঝতে পারছি সে নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দিচ্ছে। সে কি বুঝতে পারছে সময় ফুরিয়ে আসছে?

সালেহ চৌধুরী এবং নির্মলেন্দু গুণ কবির পায়ে পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ছােটখাটো কথাবার্তা হতে থাকলাে।

তিনি জানালেন, তাঁর শরীর ভালই আছে। কিন্তু কিছু খেতে পারছেন না। কিছুই হজম হয় না। এছাড়া, আর অন্য কোন অসুবিধা নেই। তিনি গেঞ্জি টেনে পেট অনেকখানি উদাম করে ফেললেন। নির্মলেন্দু গুণ পেটে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। এক সময় বললেন-‘হাবীব ভাই, টিভিতে আপনার ইন্টারভুটা দেখলাম, খুব ভাল হয়েছে।' হাবীব ভাই হাসলেন। আমার মনে হলাে, হাবীব ভাই তাে ভালই আছেন। কথাবার্তা অবশ্যি বলছেন নিচু স্বরে। এবং বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করলাম ফিসফিস করে নিজের মনে কি যেন বলছেন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলছেন, তখন (কণ্ঠ কিছুটা জড়ানাে হলেও) চিন্তার কোন অসংলগ্নতা নেই। এক পর্যায়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-‘তােমার বইয়ের সংখ্যা কত?' একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষ, যার সেই মুহূর্তে নিজেকে নিয়েই চিন্তা করার কথা, তিনি অন্যের প্রসঙ্গে কীভাবে এতটা আগ্রহ রাখেন কে জানে?

একটি ছেলে তার জন্যে লাল মিকশ্চারের একটি বােতল নিয়ে এলাে। হাবীব ভাইকে পেছনে বালিশ দিয়ে বসানাে হলাে। তিনি বললেন, তাঁর ক্ষিধে পেয়েছে। সােয়াপ্রােটিন বিসকিট সম্পর্কে দুই একটা কথা বললেন। লক্ষ্য করলাম তিনি আমরা কি কথাবার্তা বলছি সেগুলি খুব মন দিয়ে শুনতে চেষ্টা করছেন। মাঝে মাঝে ধরতে পারছেন না। তখন জিজ্ঞেস করছেন-‘সালেহ কী বললাে? নির্মলেন্দু কী বললাে?'

হাবীব ভাইয়ের সহকারী তরুণ কবি নাসির আহমেদকে দেখলাম সারাক্ষণই কবির সেবা করবার সুযােগ খুঁজছেন। কখনাে পায়ে হাত বুলাচ্ছেন, কখনাে গায়ে হাত বুলচ্ছেন। কি গভীর ভালবাসা তার চোখেমুখে। তাতাে হবেই হাত ধরে এদের কবিতার অলিগলি চিনিয়েছেন, এসেছেন ঋণ শােধ করতে।

একটি মেয়ে এলাে কবিকে দেখতে। হাবীব ভাই ক্ষীণকণ্ঠে তার খোঁজ-খবর করলেন। মেয়েটিকে মনে হলাে সে কেঁদে ফেলবে। গল্পকার ভাস্কর চৌধুরী এলেন। তাঁর গায়ে ইউএসএ ছাপ মারা ঝলমলে টি-শার্ট, কিন্তু মুখটি বিষন্ন।

আমরা সবাই তাকে ঘিরে বসে রইলাম। ছােটখাটো কথা বলতে লাগলাম নিজেদের মধ্যে। হাবীব ভাই বসে আছেন বালিশে হেলান দিয়ে। তার মাথা ভর্তি শরতের মেঘের মত ধবধবে সাদা চুল। হাবীব ভাইকে লাগছে প্রাচীন কালের ঋষিদের মত। একটু দূরে বসে থাকা নার্স বার বার কৌতুহলী হয়ে তাকাচ্ছে আমাদের দিকে।

আমরা প্রায় দেড় ঘন্টার মত থাকলাম তাঁর সঙ্গে। আমার খুব ইচ্ছা করছিলাে তার পা ছুয়ে সালাম করি। কিন্তু তিনি যদি মনে করেন। আমি তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছি, সেই ভয়েই ওদিকে গেলাম না। বললাম-হাবীব ভাই, হাসপাতালের পরিবেশটা আমার ভাল লাগছে না। আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন বাড়ি চলে যান।'

হাবীব ভাই মৃদুস্বরে বললেন-“হ্যা, ফিরে যাব। আমার বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে।”
কবির বাড়ি ফেরা হয়নি। কিংবা কে জানে হয়তাে ফিরেছেন। আঁধার বাড়ির কোন রহস্যইতাে আমাদের জানা নেই।

প্রাপ্তি:
কিছু হুমায়ূন (হুমায়ূন আহমেদের অগ্রন্থিত গদ্য ও পত্রগুচ্ছ) (হার্ডকভার) - পিয়াস মজিদ
প্রকাশকাল: ২০১৯
প্রকাশক: অন্বেষা

নিশিন্দা নারী - আল মাহমুদ

নিশিন্দা নারী
আল মাহমুদ

রাত আড়াইটার দিকে এক অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে নিশিন্দার শরীরটা একটু মুচড়ে উঠলেও সে স্বপ্নটার মধ্যে সারাদিন না খেতে পাওয়ার জ্বালা খানিকটা জুড়িয়ে নেয়ার জন্যই যেন পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। প্রথমে একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ভেঙে বেরিয়ে এলেও এখন ছোট ছোট নিঃশ্বাসের দোলায় তার নরম দু’টি উচু স্তন কাঁপছে। ক্ষুধা ও ঘুম একসাথে থাকলে মানুষের স্বপ্ন চটে যায় না। নিশিন্দা দেখছে এই জনমানবহীন চারণভূমির যতদূর চোখ যায় কোথাও ঘাস আর সবুজ নেই। সর্বত্র যেন শুকিয়ে হুলুদ প্রান্তরের মতো ধু-ধু করছে। খলার মধ্যে যে কয়টা গরুর বাথান বা খলাঘর আছে এর সবগুলো গরুর শিংয়ের মধ্যে মানুষের রক্ত। যেন গরুর পাল খলাঘরগুলোর রক্ষক রাখালদের গুঁতিয়ে মেরে দলে দলে ছুটে আসছে নিশিন্দাদের উঠোনের দিকে। স্বপ্নের মধ্যেই যেন নিশিন্দা দিশেহারা হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে গরুর পাল এসে নিশিন্দার উঠোনে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। নিশিন্দার মনে হল ঘাসের অভাবে ক্ষিপ্ত ক্ষুধার্তের পাল যেন তাকে তাদের নেত্রী ভেবে একটা কিছু প্রতিকারের জন্য তার কাছে ভিড় জমিয়েছে। যেমন সে নিজেও আবদুল্লাহ মাঝির গত পনেরো দিন যাবৎ উধাও হয়ে যাওয়ার একটা বিহিত ব্যবস্থা খুঁজছে। গরুর পালের মধ্যে গাই আর দামড়ির সংখ্যাই বেশি। পালের পেছনে কয়েকটা মিনমিনে চেহারার ষাঁড়ও আছে। তবে ষাঁড়গুলোকে গাভীগুলোর মত ক্রুদ্ধ মনে হল না। ষাঁড়গুলো ঘাড় নুইয়ে শিং লুকোতে চায় যেন। যেন বলতে চায়—অত বড় ধারালো বাঁকা সিং গজানোর জন্য তো আমরা নিজেরা দায়ী নই। এগুলো নিয়ে এখন আমরা আর কি করব? যখন সারা বিল এলাকা তিতাসের এপারের দত্তখোলা থেকে শুরু করে বাঁ দিকের আখাউড়া সিঙ্গারবিল আর ডানদিকের শাহবাজপুর সরাইল মৌজা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ। গরু আর মানুষের এখন সত্যিকার খাওয়ার কিছু থাকলে তা আছে তিতাসের শেওলা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বাসিন্দাদের রাঁধা ভাত আর ফেনপানি। গরুগুলো যেন বলতে চায় এরাও এখন আবদুল্লাহ মাঝির ডাকাত দলে নাম লেখাতে এসেছে। স্বপ্নের মধ্যেই নিশিন্দার মনটা নরম হয়ে এল। সে এক ঝটকায় শাড়িটা কোমরে পেঁচিয়ে বারান্দা থেকে দ্রুত উঠোনে নেমে জিজ্ঞেস করল, এই গাইয়ের পাল আমার উঠোনে দল বেঁধে কেন ঢুকেছিস? মতলব কি তোদের?’

প্রকাশক : রিটন খান, সম্পাদকমন্ডলী : এমরান হোসেন রাসেল, রিটন খান
Copyright © 2020. All rights reserved by বইয়ের হাট